Magic Lanthon

               

সৌমিত্র দস্তিদার

প্রকাশিত ২০ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

প্রসঙ্গ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ; তত্ত্ব এবং বাস্তবতার ফারাক

সৌমিত্র দস্তিদার


সিনেমা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হবে। যতোদিন যাচ্ছে ততোই প্রযুক্তির বদৌলতে সিনেমা--তা আপনি কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র বা বিজ্ঞাপন যাই বলুন না কেনো--নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ দিকে বাঁক নিচ্ছে। স্পিলবার্গ থেকে কিম কি দুক, নির্মাণশৈলীর যতোই পার্থক্য থাক, প্রযুক্তির প্রভাব আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। তরুণ প্রজন্ম এখন যে ধরনের সিনেমা করছে এবং পছন্দও করছে, বলা বাহুল্য সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির এক বড়ো ভূমিকা আছে। আমার ভুল হতে পারে, তবুও আমার মনে হয়েছে, যে তরুণ নির্মাতারা সিনেমা করছে--এমনকি যারা দর্শক--তাদের মধ্যে তথাকথিত আধুনিকতার নামে প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটু যেনো চমক দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। অনেক তরুণের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও মনে হয়েছে তারা অধিকাংশই স্মার্ট মেকিংয়ে বিশ্বাসী। অ্যানিমেশন, দ্রুত কাট, ঝলমলে ছবি, দূরন্ত এডিটিং--সবমিলিয়ে একধরনের ঝকঝকে প্রোডাক্ট। এই প্রোডাক্ট, প্রেজেন্টেশন, প্যাকেজিং শব্দগুলোর সঙ্গে খেয়াল করে দেখুন শিল্পের চেয়ে করপোরেট পুঁজির যোগসূত্র বেশি। আসলে বাজার অর্থনীতি যেমন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রেই ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, তা সিনেমা শিল্পকেও যে বাদ দেবে না সেটাই স্বাভাবিক।

   ফলে চেতনে-অচেতনে সিনেমা নিয়ে আলোচনা হলেই পুঁজি, লগ্নি, বাজার, বিপণন, মুনাফা--এই চক্রব্যুহ থেকে নিস্তার পাওয়া আপাত অসম্ভব। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি অন্য ধারার সিনেমা বলে কিছু থাকবে না! বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে যারা বিকল্প সিনেমা, প্রামাণ্যচিত্র বা তথ্যচিত্র নির্মাতা কিংবা যাই বলি না কেনো, তাদের পুঁজির এই সাঁড়াশি আক্রমণ থেকে বাঁচার পথ কোথায়!

দুই.

একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে; পৃথিবীর সিনেমা বৃত্তান্ত খুটিয়ে পড়লে দেখবেন, আদি পর্ব থেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী সিনেমা নিজেকে বদলাতে বদলাতে নির্মাতার মনোভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজের পথ ঠিকই খুঁজে নিয়েছে। অনেকটা নদীর মতো একদিকে বাধা পেলে সে প্রয়োজন মতো বিকল্প রাস্তা বের করে নেয়। কোনো বাধাই তাকে আটকাতে পারেনি। নদীর এই প্রবল প্রাণশক্তি যেমন তাকে বছরের পর বছর বাঁচিয়ে রেখেছে, তেমনই সিনেমা নির্মাতাদের নতুন নতুন উদ্ভাবনী ক্ষমতাও এই শিল্পকে শুধু বাঁচিয়ে রাখেনি, নিত্য-নতুন রসদ যুগিয়েছে তাকে চির নতুন করে রাখতে। মুশকিল হচ্ছে যে, আমাদের অনেকের কাছেই এটা পরিষ্কার নয়, কেনো সিনেমা বানাতে এলাম! মুখে যাই বলি না কেনো, অধিকাংশই সিনেমা করতে আসেন মূলত গ্ল্যামারের হাতছানিতে। তথ্যচিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রেও কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়।

   সিনেমার প্রিমিয়ার, ফেস্টিভাল, অ্যাওয়ার্ড, মিডিয়া সব মিলিয়ে প্রচারের আলো কীভাবে নিজের দিকে টেনে আনা যায়, তার একটা অশ্লীল প্রতিযোগিতা চলে নির্মাতাদের মধ্যে। কেউ যদি অন্য ধারার সিনেমা করতে চায়, তাহলে তাকে অবশ্যই কিছু বিষয়ে সচেতন হতে হবে। যেমন, কেউ যদি অজ পাড়াগ্রামে আউটডোর লোকেশনে যায়, তখন তার পোশাক-আশাক নিয়ে ভাবতে হয়। এটা কোনো ড্রেসকোড বা পোশাক বিধির আওতায় পড়া না পড়ার প্রশ্ন নয়। এটা কাজের স্বার্থে করা দরকার। অনেক সময় শুধু পোশাক নয়, নির্মাতাদের আচরণও চারপাশের লোকজনের সঙ্গে সিনেমা ইউনিটের দূরত্ব তৈরি করে। আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, দরিদ্র আদিবাসী গ্রামে অকারণে অ্যাকশন, কাট, সাইলেন্স ইত্যাদি, গ্রামীণ ডিসকোর্সে প্রায় অজানা শব্দ ব্যবহার না করাই ভালো। আমরা যখন সিনেমা করতে এসেছিলাম তখন এক একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম ইউনিটে কম করেও ১০-১২ জন যেতো। নির্মাতা, তার সহকারী, প্রোডাকশন ম্যানেজার, সহকারী ম্যানেজার, ক্যামেরাম্যান ও তার সহকারী, খাবার সরবরাহের লোক--সে এক এলাহী ব্যাপার! রাজসূয় যজ্ঞ। মানসিকভাবে নির্মাতাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিলো সামন্ত মানসিকতার। প্রযুক্তি সহজ লভ্য হবার পর ইউনিট ছোটো হয়ে গেলো। কিন্তু মানসিকতায় আমরা অনেকেই আজও সামন্ত ঘরানার রয়ে গেছি।

   খেয়াল করলে আরো দেখবেন যে, আধুনিক, টেক-স্যাভি তরুণ নির্মাতারা ইউনিটের অনেকের সঙ্গে একধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করে। নিজের লাগেজ বইতে অস্বস্তি বোধ হয় তরুণ নির্মাতার। আসলে তিনি কখন কীভাবে যেনো গুরুগম্ভীর নির্মাতা হয়ে অজান্তেই অন্যের চেয়ে মনে মনে আলাদা হয়ে গেছেন। এই শ্রেণি বৈষম্য আর যাই হোক সিনেমায় সাম্যবাদ আনতে পারে না।

তিন.

আমি কিন্তু যে সিনেমা ঘরানার শিক্ষার্থী, সেই অ্যাকটিভিস্ট সিনেমা মেকিং নিয়ে আলোচনা করছি। তবে যে ঘরানার নির্মাতাই হোন, যতো প্রযুক্তিনির্ভর সিনেমা বানান, এটা নিশ্চিত যে সিনেমার আসল হলো নির্মাতার মনন। মনন তৈরি করে দর্শন চোখ ও বোধ। যা ঠিক করে আপনি কোন ঘরানার সিনেমা বানাতে আগ্রহী। আমি এখনো বিশ্বাস করি, ফর্মের চেয়ে কনটেন্ট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই ফর্ম নিয়ে ভাবতে হবে। ফর্মে পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগও বেশি। কিন্তু ফর্ম অতিরিক্ত প্রাধান্য পেলে অনেক সময় বিষয় হারিয়ে যায়। ‘টুওয়ার্ডস অ্যা পুওর থিয়েটার’ প্রবন্ধে অন্য ধারার বিশিষ্ট থিয়েটারবিদ গ্রটোভস্কি একবার বলেছিলেন, প্রসেনিয়াম থিয়েটারের যাবতীয় বক্তব্য হারিয়ে যায় অবান্তর-অকারণে, তার চোখ ধাঁধানো ফর্মের জৌলুসে।

বিষয়টি আর একটু বিশদে বলি। ধরুন, আপনার নাটক মঞ্চস্থ হবার পর অনেকের বাহবা পেলেন। জিজ্ঞেস করে দেখবেন অনেকেই মঞ্চের আলো, সঙ্গীত, অভিনয় নিয়ে আলাদা আলাদা করে প্রশংসা করবে। বিষয়, এমনকি দলের সামগ্রিক দক্ষতা নিয়ে তাদের কোনো কথা শুনতে পাবেন না। রাজনৈতিক সিনেমায় ফর্ম নয়, গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্ট। ঋত্বিক ঘটকের একটা অবসেশন ছিলো দেশভাগ নিয়ে। তার নির্মাণে বার বার ফিরে ফিরে এসেছে দেশভাগের হাহাকার, বিষাদ, যন্ত্রণা। প্রায় তার সব সিনেমাতেই ফেলে আসা সাধের পূর্ব বাংলা নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের কষ্ট আজও আমরা ভুলতে পারি না। ঋত্বিক সবসময় ওপারের জনপদকে দেখতেন অতীতের চোখ দিয়ে। সেই পদ্মা, শাপলা, দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ, সব নিয়ে ঋত্বিক এতোটাই ঘোরে থাকতেন যে, রাজশাহীর জেল হত্যা, নাচোলের আদিবাসী সংগ্রাম, ইলা মিত্র কিছুই কখনো তার সিনেমার বিষয় হয়নি। ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় আবহ তৈরি করেছে বাংলাদেশের অসাধারণ প্রকৃতি। কিন্তু দেশভাগের পর ওই ভূখণ্ডের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সম্ভবত ঋত্বিক মননে সেভাবে প্রভাব ফেলেনি। তাই আদ্যন্ত রাজনৈতিক এক নির্মাতার সিনেমা হয়ে গেছে নিতান্তই এক সামাজিক সিনেমা।

   ঋত্বিক প্রসঙ্গ আনলাম এই কারণে যে, সিনেমার ন্যারেটিভ-নির্মাণ নির্ভর করে আপনি কীভাবে বিষয়কে দেখেন তার ওপর। তাই সবসময় সিনেমা তাত্ত্বিক গাঁস্ত রোবের্জ-এর কথা সবাইকে বলি, অ্যাকটিভ সিনেমার জন্যে চাই অ্যাকটিভ দর্শক। এর জন্যে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা দরকার। সিনেমা নির্মাণ শুধু ক্যামেরা, এডিটিং নয়। নিয়মিত স্টাডি সার্কেল করতে হবে। সেখানে সিনেমার পাশাপাশি চর্চা জরুরি শিল্পের অন্যান্য ধারার ও ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতির নানা শাখার। এই নিবিড় অনুশীলন, অধ্যবসায় একদিন আপনাকে অন্য ধারার নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেবে।

(চলবে)

লেখক : সৌমিত্র দস্তিদার, ভারতের প্রখ্যাত প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা। তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের মধ্যে রয়েছে  নাথিং অফিসিয়াল, জেনোসাইড অ্যান্ড আফটার, সীমান্তআখ্যান, মুসলমানের কথা প্রভৃতি।

sdastidar27@gmail.com

https://www.facebook.com/profile.php?id=100008406968120

 

বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন