তাসনিয়া মিন্নি
প্রকাশিত ১৮ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
হারিয়ে যাওয়া তারকার খোঁজে; সন্ধান নেই মায়া হাজারিকার
তাসনিয়া মিন্নি

২০১২ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুলাই। রাজধানীর ভাটারা থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের হিমাগারে ১৩ দিন পড়ে থাকার পরও তাদের কোনো পরিচয় মেলে না। পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টাও করা হয়। কিন্তু তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একপর্যায়ে পুলিশ তদন্ত করে নিশ্চিত হয়, নিহত দুই জন সহোদর। নাম জাবেদ ও জামশেদ। পরিচয়পত্র ও প্রতিবেশী সূত্রে জানা যায়, তারা প্রয়াত অভিনয়শিল্পী মায়া হাজারিকার সন্তান। জাবেদ ও জামশেদের পাসপোর্টে বাসার ঠিকানা দেওয়া আছে ৭৬ বড় মগবাজার, ঢাকা। কিন্তু পুলিশ ওই ঠিকানায় গিয়েও কোনো স্বজনের দেখা পায় না। মায়া হাজারিকার মৃত্যুর সনদ থেকে জানা যায়, বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ নভেম্বর মারা যান তিনি। হাসপাতালে খোঁজ নিয়েও কেবল মায়া হাজারিকার স্বামীর নাম ও মগবাজারের ঠিকানাই মেলে। এমনকি মায়া হাজারিকার বিদেশ ভ্রমণের সময় বিমান বন্দরে দেওয়া তথ্যও যাচাই করে পুলিশ। সব জায়গায় একই ঠিকানা থাকায় এক্ষেত্রেও কোনো সুবিধা হয় না। এফ ডি সি’তে গিয়েও পুলিশের পক্ষ থেকে মায়া হাজারিকার কোনো স্বজন বা সুহৃদ আছে কিনা খুঁজে দেখার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু কোথাও কারো খোঁজ মেলে না। অবশেষে জাবেদ ও জামশেদের মরদেহ ওই বছরের ২ আগস্ট বেওয়ারিশ হিসেবে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। তবে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা রহস্যই থেকে যায়।১
এক সময়ের জবরদস্ত অভিনয়শিল্পী মায়া হাজারিকা সম্পর্কে জানতে গিয়ে সার্চ জায়ান্ট গুগলে তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে এ তথ্যটুকুই কেবল জানা যায়। এর বাইরে সবকিছুই ধোঁয়াশা। বাংলায় ‘অভিনেত্রী মায়া হাজারিকা’ লিখে সার্চ দিলে তার কোনো ছবিও আসে না। আসে কেবল অন্যদের ছবি ও কণ্ঠশিল্পী ভূপেন হাজারিকার প্রতিবিম্ব। ইংরেজিতে সার্চ দিলেও একই ফলাফল পাওয়া যায়। কোথাও লিখিত কোনো তথ্যের হদিশও মেলে না। ফলে ‘আসল’ মায়া হাজারিকা দেখতে ঠিক কেমন, সেটা নিয়েই তৈরি হয় সন্দেহ! হ্যাঁ, বাস্তবতা আসলে এমন পর্যায়ে এসেই ঠেকেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্ধশতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এ রকম জবরদস্ত অভিনয়শিল্পীকে নিয়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো কেনো? তিনি কি আসলেই নিজের স্বকীয় কোনো জায়গা তৈরি করে যেতে পারেননি? নাকি আমরাই তাকে ধরে রাখতে পারিনি? পাকিস্তান শাসনামল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অভিনয়জগৎ দাপিয়ে বেড়ানো এ অভিনয়শিল্পীর এমন ‘গায়েব’ হয়ে যাওয়াটা আসলেই কি স্বাভাবিক? এ প্রবন্ধ হারিয়ে যাওয়া মায়া হাজারিকার সন্ধানেই।
দুই.
মায়া হাজারিকাকে নিয়ে যখন কোনো তথ্য পাওয়াই যাচ্ছিলো না, তখন তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিলো এমন কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ, চলচ্চিত্রনির্মাতা মতিন রহমান, চিত্রসম্পাদক আবু মূসা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রফিকুজ্জামান ও পরিবেশক, প্রযোজক, প্রেক্ষাগৃহের মালিক মালতি দে’র বড়ো ছেলে প্রযোজক অশোক কুমার দে। তাদের কাছ থেকেই জানা যায়, মায়া হাজারিকার জন্ম আসামের শিলংয়ে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে। তিনি মূলত পাহাড়ি অমুসলিম ছিলেন। পরে তিনি সিরাজুল ইসলাম নামে চট্টগ্রামের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বিয়ে করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ঢাকায় স্থায়ী হন। তবে ঢাকায় তার আগমনের সময়কাল সম্পর্কে কেউই নিশ্চিত নয়। সিরাজুল ইসলাম পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের প্যাট্রল ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে অবসরে যান। গবেষক অনুপম হায়াৎ ও সাংবাদিক রফিকুজ্জামান জানান, মায়ার স্বামী সিরাজুল ইসলাম চট্টগ্রামের ছেলে। কিন্তু পুলিশের তথ্যানুযায়ী তারা দুজনেই বিহারি।
‘ইত্তেফাক’-এর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রফিকুজ্জামান জানান, একজন সাংবাদিক হিসেবেই মায়া হাজারিকার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তাদের মধ্যে চেনাজানা সেই ৭০ দশকের শেষ থেকে। মায়ার চেহারায় ছিলো অসমিয় ছাপ। মগবাজারে মায়া হাজারিকার বাড়ির কাছাকাছি থাকলেও তার স্বামীর সঙ্গে কখনোই দেখা হয়নি রফিকুজ্জামানের। ঢাকায় তার আর কোনো আত্মীয় আছে বলেও তিনি জানেন না। প্রথম দিকে অশোক ঘোষ নামের এক পরিচালকের চলচ্চিত্রে নাকি মায়া সবচেয়ে বেশি অভিনয় করেছিলেন। মায়া দুই ছেলে সন্তানের পাশাপাশি এক মেয়েকে দত্তক নেন। তার ছেলে-মেয়েদের কেউই চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলো না। প্রযোজক অশোক কুমার দেও একই রকমের তথ্য দেন। তবে তার পর্যবেক্ষণ আরেকটু গভীরে। তার ভাষায়,
মায়া হাজারিকার দুই ছেলে জাবেদ ও জামশেদ আমার বন্ধু ছিলো। তারা থাকতো মগবাজারে আমাদের বাড়ির পাশেই একটা ভাড়াবাড়িতে। মায়া হাজারিকা সে সময়ের মেয়েদের থেকে বেশ এগিয়ে ছিলেন। বর্তমানে যেসব ছেলে-মেয়েরা নিজেদের আধুনিক বলে, তিনি সেই সময় ঠিক এ রকমই ছিলেন। অর্থাৎ জীবনযাপনে অত্যন্ত ফাস্ট ছিলেন। তার হাতব্যাগে সবসময় সে সময়কার বৃটিশ সিগারেট ‘ডানহিল’ থাকতো। অনেকে তাকে একটু উচ্ছৃঙ্খল বললেও তিনি অত্যন্ত ব্যক্তিত্ববান ছিলেন। কে কী বললো, সেটা কখনোই পরোয়া করতেন না। তার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যেতো। উনার স্বামীর সঙ্গে মগবাজারের বাড়িতে কখনো দেখা হয়নি। তবে আমার ধারণা, ব্যক্তিজীবনে স্বামীর সঙ্গে তার একটু দূরত্ব ছিলো। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে তার দুই ছেলের একটা ব্যান্ডদল ছিলো, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তারা ইংরেজি গান করতো। পরে মাদকের কারণে এই দুই ছেলের অবস্থা একেবারেই বদলে যায়। তবে তার মেয়ের সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না। যতোদূর মনে পড়ে, তিনি অনেক আগেই বিদেশে চলে গিয়েছিলেন।
অশোকের মতে, সবকিছুর পরে মায়া হাজারিকা অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি জানান, তার মা মালতি দে’র সঙ্গে মায়া হাজারিকার খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। মায়ের চেয়ে বয়সে ছোটো হলেও তাদের সম্পর্ক ছিলো অত্যন্ত মধুর। নিয়মিত একজন আরেকজনের বাড়িতে যেতেন, কোনো উৎসব আসলে একে অন্যকে দাওয়াত করতেন। অশোক বলেন, ‘আমার মা কয়েক বছর আগে মারা গেলেন। অথচ মায়া হাজারিকা আমার মায়ের চেয়ে বয়সে ছোটো হয়েও ১৯৯৬ সালেই চলে গেলেন। তার এতো দ্রুত চলে যাওয়ার কথা ছিলো না। তিনি অনেক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। আমার মা তার অভিনয়ের ভীষণ প্রশংসা করতেন।’
মায়াকে নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন করেছেন চলচ্চিত্রনির্মাতা মতিন রহমান। তার ভাষায়,
উনাকে আমি ইচ্ছা করেই মায়া দি বলে ডাকতাম; কারণ উনি একটা মায়ার জাল বুনে রাখতেন সবসময়। অন্তত আমার সিনেমার শুটিংয়ের সময় আমি তাই-ই দেখেছি। ১৯৭২ সালে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ও যোগাযোগ। বিশেষ করে যখন থেকে আজিজুর রহমানের সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন তখন থেকে। আসলে প্রথম অবস্থায় তার কাছে যাওয়ার সাহস পেতাম না আমরা। কারণ তিনি সবসময় সুন্দর ভাষায় কথা বলতেন। সব কিছুতেই একটা সতর্ক, পরিচ্ছন্নতাবোধ ছিলো। সেগুলোর সঙ্গে আমাদের ধাতস্থ হতে হয়েছে। তার চলচ্চিত্র জীবনটা খুবই গোছালো ছিলো। তিনি খুব সতর্কভাবে এই জীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। তার ব্যক্তিজীবন আমরা কখনোই দেখতে পাইনি কিংবা তিনি তা প্রকাশও করেননি। তবে আমরা দূর থেকে শুনতাম, মায়া দি’র জীবনে কষ্ট আছে, জীবনে কিছু অতৃপ্তিও আছে।
চিত্রসম্পাদক আবু মুসা দেবু’র কথাতেও মতিন রহমানের তথ্যের মিল পাওয়া যায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী শেষ জীবনটা মায়া হাজারিকার অত্যন্ত কষ্টে কেটেছে। পারিবারিক ব্যাপারগুলো তিনি কখনোই কাউকে জানাননি। তবে বাইরে থেকে সবসময় মনে হতো, ব্যক্তিজীবনে তিনি সুখী ছিলেন না। আর একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক। পারিশ্রমিক নিয়েও কারো সঙ্গে কখনো তার বসচা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। উনি ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে কাজ করে গেছেন অবিরাম। একজন সত্যিকারের শিল্পীর ক্ষেত্রে যেমনটা হওয়ার দরকার, ঠিক তেমনটাই ছিলেন মায়া হাজারিকা।
তিন.
১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে জিল্লুর রহমান পরিচালিত এইতো জীবন চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই বাংলা চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করেন মায়া হাজারিকা। ক্যায়সে কহুঁ, শাওলী, মাশাল্লা ও সঙ্গমসহ তিনি অনেক উর্দু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন। এছাড়া বিশ্ব প্রেমিক (১৯৯৫), কমান্ডার (১৯৯৪), সতর্ক শয়তান (১৯৯৩), চাকর (১৯৯২), ছুটির ফাঁদে (১৯৯০), দোলনা (১৯৯০), বজ্রমুষ্টি (১৯৮৯), যোগাযোগ (১৯৮৮), দায়ী কে (১৯৮৭), মায়ের দাবী (১৯৮৬), মা ও ছেলে (১৯৮৫), মনা পাগলা (১৯৮৪), নাগ পূর্ণিমা (১৯৮৩), লাগাম (১৯৮১), ছক্কা পাঞ্জা (১৯৮০), আরাধনা (১৯৭৯), মাটির ঘর (১৯৭৯), সূর্য সংগ্রাম (১৯৭৯), তুফান (১৯৭৮), অমর প্রেম (১৯৭৭), জ্বালা (১৯৭৭), মতি মহল (১৯৭৭), সন্ধ্যা রাগ (১৯৭৭), সূর্যকন্যা (১৯৭৭), সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), অনুভব (১৯৭৭), সূর্য গ্রহণ (১৯৭৬), এপার ওপার (১৯৭৫), বাদী থেকে বেগম (১৯৭৫), বিনিময় (১৯৭০), মধু মিলন (১৯৭০), পিচ ঢালা পথ (১৯৬৮), নয়ন তারা (১৯৬৭), আখেরী স্টেশন (১৯৬৫), সাতরং, গুনাই বিবি, মিলন, যে আগুনে পুড়ি, দিনের পর দিন, কন্যা বদল, বাসর ঘর, রূপালী সৈকতে, অনুরাগ, মধুমতি, স্বামী, বউরাণী, অংশীদার, মৌ চোর, সুখের সংসার, মাসুম, ভাঙা গড়া, রসের বাইদানী, আশা নিরাশা, লড়াকুসহ অর্ধশতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), সতর্ক শয়তান (১৯৯৩) ও কমান্ডার (১৯৯৪) চলচ্চিত্রের জন্য তিনি বেশ পরিচিতি লাভ করেন।
সাধারণত উচ্চবিত্তের দ্বিচারিণী স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয়ে মায়া হাজারিকার সমকক্ষ কেউই ছিলো না। পর্দায় ক্লাবে গিয়ে মদ খাওয়া, পর পুরুষের সঙ্গে প্রেম, সংসারে ভাঙন ধরানোর জন্য ষড়যন্ত্র, কর্তৃত্ববাদী মা--এসব চরিত্রেই অভিনয় করতেন তিনি। অভিনয়ের মাধ্যমে মায়া নিজের আলাদা জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে একটা দীর্ঘসময় খল নারী চরিত্র মানেই মায়া হাজারিকার অবয়ব দর্শকের মনে ভেসে উঠতো। আর সেটা নিজের অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার জন্যই তিনি করতে সক্ষম হন। চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন,
ভ্যামগার্লের ভূমিকায় অভিনয় করতেই মায়া হাজারিকা বেশি পছন্দ করতেন। বাংলা, ইংরেজি ও উর্দুতে তার বেশ দখল ছিলো। ১৯৬০-এর দশকের প্রথম দিকে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের শাওলী, নাহিদ, মাশাল্লাসহ বেশকিছু সিনেমায় অভিনয় করেন। আমি যতোদূর জানি, আর্ট কালচার চর্চায় মায়া হাজারিকার পারিবারিক কোনো ঐতিহ্য ছিলো না। কাজী জহিরের নয়ন তারা সিনেমার মাধ্যমে তাকে আমি গভীরভাবে দেখি। জহির রায়হানের উর্দু সিনেমা সঙ্গম-এ তিনি একজন কলেজ শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেন, যিনি আরেক কলেজের শিক্ষকের সঙ্গে প্রেমে জড়ান। এই চরিত্রে তিনি অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন। অসমীয় মেয়ে হওয়ায় তার চেহারার মধ্যে অন্যরকমের একটা আভিজাত্য ছিলো।
আলমগীর কবীর, জহির রায়হান, কাজী জহিরের মতো বিখ্যাত নির্মাতারা মায়া হাজারিকাকে দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন। অনুপম হায়াতসহ অনেকেই মনে করেন, মায়া হাজারিকার অভিনয়ের যে দক্ষতা ছিলো সে অনুযায়ী অন্যান্য নির্মাতারা তাকে ব্যবহার করতে পারেনি। তিনি অধ্যাপক, শিক্ষিত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের মা, ভাবি, খালা এ ধরনের চরিত্রেও নিজেকে অসাধারণভাবে মেলে ধরতে পারতেন। যার প্রমাণ জহির রায়হানের সঙ্গম এবং আলমগীর কবীরের সীমানা পেরিয়ে। এখানে মায়া হাজারিকা নিজেই নিজের মূর্তিকে চূর্ণ করেছেন। একই সঙ্গে বুঝিয়ে দিয়েছেন খলচরিত্র ছাড়াও অন্য চরিত্রেও তিনি কতোটা পারদর্শী।
সাংবাদিক রফিকুজ্জামানের ভাষ্য মতে, মায়া হাজারিকা মা চরিত্রেই বেশিরভাগ সময় অভিনয় করতেন। তার সমসাময়িক সুমিতা দেবী, রানী সরকারও মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করতেন। তবে মায়া হাজারিকার শারীরিক গঠন, উচ্চতা, গায়ের রঙ সবকিছু মিলিয়ে অনেকটা গ্লামারাস ছিলো বলেই মনে করেন রফিকুজ্জামান। তিনি আরো বলেন,
৮০’র দশকেও মায়া হাজারিকা দাপিয়ে অভিনয় করেছেন। কিন্তু ৯০ দশকের দিকে এসে ওই ধারাটা একটু একটু চলে যেতে থাকে, সঙ্গে মায়া হাজারিকাও পিছনে চলে যেতে লাগলেন। পর্দায় তাকে আমরা যেভাবে দেখি, দর্শকের মানসপটে যা ভেসে ওঠে, ব্যক্তিজীবনে তিনি মোটেও তেমন ছিলেন না। তিনি অত্যন্ত নরম মনের মানুষ ছিলেন। কথাবার্তা, চালচলনে মার্জিত ও রুচিশীল ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী।
মায়া হাজারিকা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে চলচ্চিত্রনির্মাতা মতিন রহমান জানান, মায়া হাজারিকা নিজেকে এমন সব চরিত্রের জন্য প্রস্তুত করে রাখতেন বা নিজেকে এক্সপোজ করতেন, যেগুলোতে তার ফ্যাশন সচেতনতা বা তার ভাষাশৈলীতে অত্যন্ত সুমিতবোধের ব্যবহার থাকতো। চলচ্চিত্রে তার ব্যক্তিজীবনের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যেতো। ব্যক্তিজীবনে তিনি যেভাবে চলাফেরা করতেন, সাজপোশাকে আধুনিকতার স্পর্শ রাখতেন, সেই বিষয়টিকে অনেক নির্মাতা ধরে ফেলেছিলেন। ফলে নির্মাতারা মায়া হাজারিকাকে মাথায় রেখেই চরিত্র নির্মাণ করতো। মুস্তাফিজ, এহতেশামের চলচ্চিত্রেও এভাবেই মায়া হাজারিকা হাজির হয়েছেন। মতিন রহমান আরো বলেন,
মায়া হাজারিকাকে দিয়ে পরিচালকরা যে সংলাপ উচ্চারণ করাতেন সেগুলোতে শুদ্ধ ভাষা ও ইংরেজির মিশ্রণ থাকতো। তার উচ্চারণ ভঙ্গিও ছিলো খুব স্মার্ট। তার অভিনীত বেশিরভাগ চলচ্চিত্র স্টাডি করলে এই মায়া হাজারিকাই হাজির হন। আমরা মায়া হাজারিকাকে অন্যভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। আমার চলচ্চিত্রে একেবারেই ভিন্নধর্মী একটি চরিত্রে তাকে দিয়ে অভিনয় করিয়েছিলাম। আমি তার পোশাক-আশাককে প্রাধান্য দিইনি কিন্তু তার স্মার্টনেসকে প্রাধান্য দিয়েছি। গ্রামের এক নারী চরিত্রে তাকে দিয়ে অভিনয় করিয়েছিলাম; সেখানে তার কস্টিউম ছিলো গ্রাম্য। এখানে তিনি গ্রামের ভাষায় কথা বলেছেন; কিন্তু তার ভিতর একটা দাম্ভিকতা, আভিজাত্য ছিলো।
আর ব্যক্তিগতভাবে মায়া দি অসম্ভব সঙ্গপ্রিয় এবং স্নেহশীল ছিলেন। শুটিং ইউনিটে কোনো সমস্যা হলে বা খাবার আনতে দেরি হলে উনি কখনোই কোনো কর্মীকে হয়রানি করতেন না বা চিৎকার করতেন না। শুটিং ইউনিটের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন সারাক্ষণ। এটা তার একটা বড়ো গুণ। কোনো একটি শট্ বার বার নেওয়া লাগলেও তিনি কোনো সমস্যা করতেন না। তিনি সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন আবার ক্যামেরার সামনে গিয়ে ঠিকই সাবলীল অভিনয় করতেন। এমনও দেখেছি, তাকে আগে থেকে কস্টিউম নিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু তিনি একবারের জন্যও প্রশ্ন করেননি, কেনো তাকে আগে থেকে এভাবে পোশাক পরিয়ে বসিয়ে রাখা হলো। আমাদের সঙ্গে সেসময় আনোয়ারা কাজ করেছেন, তার মধ্যে কিন্তু এটা ছিলো না। শাবানা আপা ও ববিতার মধ্যে যে পার্থক্যটা, শাবানা আপা মানেই মাটির মানুষ আর ববিতা মানেই ...। পরিচালকের সঙ্কটের জায়গাগুলো বুঝতেন মায়া দি। আমি তার এ বিষয়গুলোতে মুগ্ধ হয়েছি, মনে মনে তাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করেছি।
চার.
অভিনয় পাগল মানুষ মায়া নিজের ব্যক্তিগত জীবন সবসময় মানুষের কাছে আড়াল করে গেছেন। নিজের মধ্যে গভীর কষ্টকে লুকিয়ে রাখলেও কারো কাছে তা প্রকাশ করেননি। সহকর্মীরা কখনো কিঞ্চিৎ আঁচ করলেও তাকে জিজ্ঞাসা করার সাহস পায়নি। তবে জীবনের লুকানো কষ্টের ছাপ অভিনয়ে ফেলতে দেননি তিনি। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সাবলীলভাবে অভিনয় করে গেছেন মায়া হাজারিকা। কিন্তু দাপটের সঙ্গে অভিনয় করা, নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে অন্যকে বিমোহিত করা এ অভিনয়শিল্পীকে কেউ মনেই রাখলো না! দীর্ঘসময় ধরে অভিনয়ের পরও তাকে ভুলে যাওয়ার কারণ কী? এ বিষয়ে সাংবাদিক রফিকুজ্জামান বলেন,
সাংবাদিক হিসেবে আমাদেরকে যারা লাইম লাইটে আছে তাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। সেজন্য উনার সঙ্গেও ধীরে ধীরে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়তে থাকে। রানী সরকার কিছুদিন আগে মারা গেলেন; মারা যাওয়ার আগে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের এখন তো আর কেউ ডাকে না, আপনারাও আর খোঁজ নেন না।’ এই হলো অবস্থা। এটাই দুনিয়ার নিয়ম। রানী সরকার দীর্ঘ সময় মঞ্চেও অভিনয় করেছেন। তিনি দেখতে সুন্দর ছিলেন, তরুণ ছিলেন, দাপটের সঙ্গে মঞ্চে অভিনয় করেছেন। আমি ফেরারী বসন্ত নামে একটি চলচ্চিত্র বানিয়েছিলাম, সেখানেও তিনি অভিনয় করেছেন। তিনি দজ্জাল নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন। তাকে নিয়ে খুবই ছোটো একটা সংবাদ হয়েছে। আসলে মৃত্যুর পর মায়া হাজারিকাকে নিয়ে আলোচনা না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, আমার কাছে মনে হয়, উনি ছিলেন শুধুই অভিনয়শিল্পী। যদি সুমিতা দেবীর সঙ্গে তার তুলনা করি, তাহলে তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেত্রী, প্রযোজক, নির্মাতা। সুমিতা দেবীর মতো তারকাখ্যাতি ছিলো না তার। যার কারণে খবর হয়েছে মাত্র, কোনো আলোচনা হয়নি।
কিন্তু মায়া হাজারিকা এতোগুলো চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেন, সাংস্কৃতিক উন্নয়নে অবদান রাখলেন। অথচ রাষ্ট্র তার স্মৃতি রক্ষার্থে কিছুই করলো না! কেনো তাকে নিয়ে কোনো তথ্যই খুঁজে পাওয়া যায় না--এমন প্রশ্নের জবাবে চিত্রসম্পাদক আবু মুসা দেবু বলেন, ‘তখন এতো সুযোগ ছিলো না। এখন একজন শিল্পী অসুস্থ হলে প্রধানমন্ত্রী হাত বাড়িয়ে দেন। আসলে এটা ভাগ্যেরও ব্যাপার, উনি এ সুযোগটি পাননি। আবার আগে সেভাবে ফিল্ম আর্কাইভও ছিলো না যে তাকে নিয়ে কোনো কাজ করবে।’ চলচ্চিত্র প্রযোজক অশোক কুমার দে বলেন,
খলনায়িকার অভিনয় কেমন হওয়া উচিত সেটা একমাত্র মায়া হাজারিকার কাছ থেকেই শেখা উচিত বলে আমি মনে করি। কিন্তু তার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। আমার মা মালতি দে বাংলাদেশের প্রথম নারী হল মালিক, পরিবেশক, প্রযোজক একই সঙ্গে তিনি একজন অভিনয়শিল্পীও। কিন্তু তাকে নিয়েও কোথাও কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কেউ এসব তথ্য জানেও না। কিছুদিন আগে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ একটি লেখা ছাপিয়েছে। আমার মা কেমন নারী ছিলেন, চলচ্চিত্রের জন্য কেমন নিবেদিত প্রাণ ছিলেন, সেটা ওই লেখা না পড়লে বোঝা সম্ভব নয়। এই একটা লেখা ছাড়া কোথাও আমার মায়ের সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যাবে না। কারণ এসব মানুষকে খুঁজে বের করার মানুষ নেই। তাদের কথা কেউ তুলে না ধরার কারণেই কোথাও তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না বা তাদেরকে কেউ খুঁজে পায় না। ফলে মায়া হাজারিকাদের হারিয়েই যেতে হয়।
তবে চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে দেখেছেন। তিনি মনে করেন, মায়া হাজারিকাদের মতো অভিনয়শিল্পীদের হারিয়ে যাওয়া বা মনে না রাখার বিষয়টি আসলেই স্বাভাবিক নিয়ম। তিনি বলেন, ‘কোনো অভিনয়শিল্পীকে বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে, পরিস্থিতি অনুযায়ী যদি চরিত্রে অভিনয় করতে না দেওয়া হয়, তাহলে তো তিনি হারিয়েই যাবেন। দর্শক তাকে মনে রাখবে না। তারপরও মায়া হাজারিকা জহির রায়হান, আলমগীর কবীরের সিনেমার মধ্যে বেঁচে আছেন, টিকে থাকবেন।’
পাঁচ.
মায়া হাজারিকার দুই সন্তানের মৃত্যুর পর পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ছোটো ছেলে জামশেদ অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। আর বড়ো ছেলে জাবেদ একটি বায়িং হাউসে চাকরি করতেন। তার আগে তিনি একটি ব্যাংকে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শিক্ষানবিশ জেনারেটর অপারেটর হিসেবেও কাজ করেছেন। অথচ একসময় তারা কতো বিলাসী জীবনই না যাপন করেছেন! নিজেদের ব্যান্ডদল নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ নানা জায়গা মাতিয়েছেন। মৃত্যুর পর তাদের মরদেহ গ্রহণের মতো কোনো স্বজনেরও দেখা মেলেনি। বেওয়ারিশভাবে তাদের ঘুমাতে হলো আজিমপুর কবরস্থানে। তাদের কবরে হয়তো কোনো এপিটাফ নেই। সেটা থাকা অবশ্য জরুরিও নয়। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তাদের মায়ের এপিটাফ না থাকাটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। এর কারণ বোঝা, জানাটা মনে হয় ভীষণ জরুরি।
একজন অভিনয়শিল্পী সম্পর্কে কোথাও কোনো তথ্য নেই, তথ্য সংগ্রহের চেষ্টাও নেই! বর্তমান প্রজন্ম তাকে চেনে না, জানে না। অথচ এই মায়া হাজারিকা চলচ্চিত্রের বিকাশে, এই শিল্পের জন্য তার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে গেছেন, কী পেলেন না পেলেন সেটা নিয়ে কখনো কারো কাছে কোনো অনুযোগও করেননি। ত্যাগের এই প্রতিদান কতো ভয়ঙ্কর, অদ্ভুত, বৈচিত্র্যময়!
লেখক : তাসনিয়া মিন্নি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষে বর্তমানে চাকরিপ্রার্থী।
tasniyaminnimcj@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. https://www.kalerkantho.com/print-edition/campus/2012/08/03/275008; retrieved on: 10.03.2019
বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন