Magic Lanthon

               

নাঈম রেজা

প্রকাশিত ১৪ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

নাটোরের প্রেক্ষাগৃহ

প্রযুক্তি, পুঁজির টানে ব্যর্থ মনোরথ

নাঈম রেজা


 প্রতীকি ছবি


স্মৃতি, সময় ও ইতিহাস

চলচ্চিত্রের জন্ম মাত্র একশো বছরের কিছু সময় আগে। লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের হাত ধরে চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু করলেও সেই সময়ে মানুষের কাছে সেটা শুধু যন্ত্র সৃষ্ট ম্যাজিকই ছিলো। কিন্তু এই ম্যাজিক পরবর্তী সময়ে নানা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শিল্প (art) হয়েছে। সেই শিল্প দিয়ে মানুষের কথা, পরিবর্তনের কথা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের কথা, কতো কী-ই না তুলে ধরা যায়! এক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের গল্প ও নির্মাণশৈলী তো বটেই, সঙ্গে এর প্রদর্শন ব্যবস্থাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্র তখনই দর্শকের কাছে প্রভাবনের উপাদান হয়ে ওঠে, যখন এর প্রদর্শনের পরিবেশ এমন হয় যে, যেখানে যে কেউ চলচ্চিত্র দেখার সময় নিজেকে এর অংশ মনে করে। আর এমন পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে একমাত্র প্রেক্ষাগৃহে।

   কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে পুরো পৃথিবীতেই একক প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগে যেখানে প্রেক্ষাগৃহগুলো মহীরুহ হয়ে একা দাঁড়িয়েছিলো, এখন সিনেপ্লেক্সের নামে তা কোনো বৃহৎ বিপণিবিতানের অংশ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের অবস্থা তো আরো ভয়াবহ। চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির নানা সমস্যায় এখানে দিনের পর দিন একক প্রেক্ষাগ্রহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বিপরীতে গড়ে ওঠেনি কোনো সিনেপ্লেক্সও। দেশে যেখানে একসময় প্রেক্ষাগৃহ ছিলো ১২ শোর কিছু বেশি, শেষ পর্যন্ত তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে একশো ৭৪টিতে।

   তাহলে কি দর্শক বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রকে বাদ দিয়ে অন্য কিছু বেছে নিয়েছে! যদি তাই হয়, তাহলে সারা পৃথিবীতেই নির্মাতারা এতো এতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে কেনো? একদিকে প্রযুক্তির উৎকর্ষে একক প্রেক্ষাগৃহের আধুনিক রূপ নিয়েছে সিনেপ্লেক্স। অন্যদিকে নতুন সঙ্কট/সম্ভাবনা হিসেবে হাজির হয়েছে অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম। এসব প্ল্যাটফর্মের আধিপত্য দিন দিন যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে অল্প কিছুদিনের মধ্যে আধুনিক সিনেপ্লেক্সের অবস্থাও যে কী হবে তা বলা মুশকিল! অথচ একসময় একক প্রেক্ষাগৃহগুলোই দেশের মানুষের বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র ছিলো। অবসর পেলেই মানুষ ছুটে যেতো এসব প্রেক্ষাগৃহে, খানিক বিনোদন, খানিক শিক্ষা, সামাজিকতার আশায়। একক এসব প্রেক্ষাগৃহ যেনো হয়ে উঠেছিলো সামাজিক মিলনের কেন্দ্র। সারাদেশের মতো নাটোর সদরে সেই ৪০-এর দশকে প্রথম গড়ে উঠেছিলো প্রেক্ষাগৃহ নামক সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিনোদন কেন্দ্র। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, কালীমন্দিরের মতো ধর্মীয় স্থানে গড়ে ওঠে জেলার প্রথম প্রেক্ষাগৃহ ‘রামরাজ টকিজ’। মূলত কালীমূর্তিকে পিছনে রেখে সামনে সাদা কাপড় টাঙিয়ে নাটোরে চলচ্চিত্রের প্রথম প্রদর্শনী শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় নাটোর জেলা সদরে ৮০’র দশক পর্যন্ত গড়ে ওঠে আরো কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহ। প্রত্যেকটি প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব ইতিহাসের উপাদান। যদিও আজকের দিনে সেসব প্রেক্ষাগৃহ কেবলই স্মৃতি। কিন্তু স্মৃতি তো কেবলই কিছু গল্প নয়, সেটা একটা সময়, একটা ইতিহাস। নাটোরের প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠার সেই সময় ও ইতিহাসকে ধরার চেষ্টা থাকবে এই আলোচনায়।

গল্পটা ‘রামরাজ টকিজ’-এর

বৃটিশ আমলে ৪০-এর দশকে নাটোর শহরের কাপুুড়িয়া পট্টিতে প্রতিষ্ঠা হয় প্রথম প্রেক্ষাগৃহ ‘রামরাজ টকিজ’। কাপুড়িয়া পট্টির যে স্থানে প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো, সেটি মূলত একটি কালীমন্দির। বগুড়া থেকে আসা এক ব্যক্তি এই কালীমন্দির ভাড়া নিয়ে চলচ্চিত্র দেখানো শুরু করেন। কালীমূর্তির ঠিক সামনে পর্দা টাঙানো ছিলো আর প্রজেক্টর মেশিন থাকতো মন্দিরের দোতলায়। মন্দিরের দোতলাটি অবশ্য তখন নারী দর্শকের জন্যও বরাদ্দ ছিলো, আর নিচে বসানো হতো পুরুষদের। মন্দিরের সামনে ছোটো একটা দোকানে বসা ছিলেন প্রবীণ ধীরেন্দ্রনাথ প্রামাণিক।

নাটোরের প্রেক্ষাগৃহ ‘রামরাজ টপিজ’ এর যাত্রা এই মন্দিরেই

১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দুপুরে কথা হয় ৮৫ বছরের ধীরেন্দ্রনাথের সঙ্গে। কথায় কথায় জানতে পারি, তারা এখানকার পুরনো জমিদার, মন্দিরের জায়গাও একসময় তাদেরই ছিলো। ধীরেন্দ্রনাথ বলেন, ‘বগুড়ার ওই লোকের সঙ্গে চুক্তি ছিলো কালী পূজার সময় আমাদেরকে মন্দির ছেড়ে দিতে হবে। তাছাড়া বাকি সময় তিনি সিনেমা চালাতে পারবেন।’ ধীরেন্দ্রনাথ আরো জানান, ওখানে শুধু চলচ্চিত্র নয়, একসময় যাত্রাও দেখানো হতো। ১৯৫৫-১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে চলচ্চিত্র দেখানো হয়। পাশে একটি মসজিদ নির্মাণের পর থেকে প্রেক্ষাগৃহটি আর চলতে দেওয়া হয়নি।

   তবে অন্য সূত্রে জানা যায়, ‘রামরাজ টকিজ’ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে এর মালিকানা পরিবর্তন হয়ে নাম হয় ‘লাকি টকিজ’। একই বছরের শেষের দিকে ‘লাকি টকিজ’ও বন্ধ হয়ে যায়।

‘ছায়াবাণী’ : একই অঙ্গে কতো রূপ

আগেই কিছুটা খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, ‘রামরাজ টকিজ’-এর পর নাটোরের অপেক্ষাকৃত পুরনো ও সবশেষ বন্ধ হওয়া প্রেক্ষাগৃহের নাম ‘ছায়াবাণী’। তাই ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সকালে নাটোরে পৌঁছে প্রথমেই সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। নাটোর জেলা কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই ‘ছায়াবাণী’র অবস্থান। নাস্তা শেষ করে রিকশাযোগে রওনা হই ‘ছায়াবাণী’র উদ্দেশে। কিছু সময় রিকশায় গিয়েই পাওয়া যায় ‘ছায়াবাণী’। তবে ‘ছায়াবাণী’ এখন আর প্রেক্ষাগৃহের আকৃতিতে নেই; হঠাৎ দেখে মনে হয় কোনো বিপণিবিতান। ‘ছায়াবাণী’তে যাওয়ার আগেই কথা হয় মধ্যবয়স্ক এক পান দোকানদারের সঙ্গে। তিনি জানান, বছর খানেক হলো প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হয়ে গেছে। এ নিয়ে কার সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে--এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই সিনেমাহলের মালিক ছিলো কয়েকজন। তারা শেয়ারে এই সিনেমাহলটি করেছিলো। এখন মোহন নামে একজন দায়িত্বে আছেন। মোহন হলো মনসুর রহমানের ছেলে। তার ছেলে একটাই। ওর সঙ্গে কথা বললেই কাজ হতে পারে।’

বন্ধ হয়ে গেছে ‘ছায়াবাণী’

পান দোকানদারের সঙ্গে কথা শেষ করে এগিয়ে যাই ‘ছায়াবাণী’র দিকে। সেখানে একটি ঘড়ির দোকানে পঞ্চাশোর্ধ্ব একজনকে দেখে কথা বলি তার সঙ্গে। নাম ধীমান। পরিচয়ের পরেই ধীমান জানান, তার বাবাও মাঝে মাঝে ‘ছায়াবাণী’তে কাজ করেছেন। কিছুদিন আগে তার বাবা গত হন। আমাদের পরিচয় পেয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বলেন ধীমান। তিনি জানান, বছর খানেক হলো ‘ছায়াবাণী’ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগেও অবশ্য মাঝে মাঝে চলতো। ধীমান বলেন, ‘সিনেমাহলে এখন আর কাস্টমার নাই। তাই ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ।’ তবে প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হওয়ার আরো একটি কারণের কথা জানান ধীমান--প্রেক্ষাগৃহের জমির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে গণ্ডগোল।

   এখন প্রেক্ষাগৃহটির মালিক কে জানতে চাইলে ধীমান বলেন, ‘এই সিনেমাহলটি প্রথমে করেছিলো প্রতাপ ঘোষ আর বৃন্দাবন নামে দুজন। তারপরে মালিক পরিবর্তন হতে হতে এটা এখন জয়নাল আবেদীন জুলি মিয়ার বংশধরদের কাছে রয়েছে।’ এর বেশি তথ্য ধীমানের কাছে নেই বলে তিনি জানান। তবে তিনি রনজিৎ সাহা নামে এক লোকের কথা বলেন, যিনি নাকি এ বিষয়ে আরো তথ্য দিতে পারবেন। রণজিতের বাসা শহরের লাল বাজারে। ধীমানের কাছ থেকে রণজিতের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে রিকশাযোগে যাই সেখানে।

   যখন পৌঁছালাম তখন রনজিৎ বাড়িতে ছিলেন না। তার বাড়ির লোক আমাকে আধা ঘণ্টা পর আসতে বলে। সেই মতো আধা ঘণ্টা পর বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায় রণজিৎকে। আমার যাওয়ার কারণ জেনে ভিতরের ঘরে নিয়ে বসান সত্তরোর্ধ্ব রণজিৎ। তিনি জানান, ‘ছায়াবাণী’র শুরুটা হয়েছিলো ‘নাটোর টকিজ’ নামে। রণজিতের ভাষায়, “আমি শুনেছি, সিনেমাহলটা তৈরির সময় অনেক পার্টনার ছিলো; তাদের নাম ঠিক আমি জানি না। তবে এটুকু জানি, হালিম মিয়া ও জুলি মিয়া জড়িত ছিলেন। পরে ‘মিনার সিনেমাহল’ও হালিম মিয়া ও জুলি মিয়াই চালাচ্ছিলেন। কিন্তু ৭০ দশকের শুরুর দিকে দুই জনের অন্তর্দ্বন্দ্বে হালিম মিয়া সিনেমাহল ছেড়ে চলে যান। তখন সিনেমাহল চলে যায় জুলি মিয়ার একার মালিকানায়। জুলি মিয়া তখন এর নাম দেন ‘ছায়াবাণী সিনেমাহল’। জুলি মিয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর তার ছেলে মনসুর রহমানসহ অন্য ছেলেরা সিনেমাহলের সঙ্গে জড়িত হতে শুরু করে।”

   রণজিৎ আরো বলেন, আমি যতোটুকু জানি, সিনেমাহলটা এরা চালালেও এই জায়গাটা ছিলো শহরের নবীনা ক্লথ স্টোরের মালিক বৃন্দাবন বিহারী বসাকের মায়ের। মনসুরকে বৃন্দাবনের মা দেখতেন ছেলের মতোই। তাই ৮০’র দশকের শুরুর দিকে তিনি ওই জায়গাটা মনসুরের কাছে বিক্রি করে দেন। তখন সিনেমাহলের মালিক হন জুলি মিয়া আর জায়গার মালিক তার ছেলে মনসুর। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে জুলি মিয়া মারা গেলে সিনেমাহলের পুরো দায়িত্ব চলে আসে মনসুরের কাছে। কিন্তু মনসুরের অন্য ভাইয়েরা এটা মেনে নিতে পারেনি। রণজিৎ জানান, তখন পরিবারে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এর কিছুদিন পর মারা যান মনসুর। অবশ্য তার আগে থেকেই মনসুরের ছেলে মাহবুবুর রহমান মোহন প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে যুক্ত হন। মনসুর মারা যাওয়ার পর পারিবারিক দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে।

   একনাগাড়ে এসব তথ্য দিয়ে থামেন রনজিৎ। এবার তার কাছে জানতে চাই, ‘ছায়াবাণী’র পুরনো আর কোনো কর্মচারীর খোঁজ তিনি জানেন কি না। রণজিৎ জানান, পুরনো কর্মচারীদের কেউই এখন বেঁচে নেই। তবে ‘মিনার সিনেমাহল’ থাকার সময় ব্যবস্থাপক ছিলেন নারায়ণ শাহ্ নামে একজন। তার বাড়ি ছিলো ঢাকায়। আর জুলি মিয়ার সময় রাজশাহীর এক লোক ব্যবস্থাপক ছিলেন। তার নাম অবশ্য রণজিৎ মনে করতে পারছিলেন না। তবে শেষের দিকে নাকি মনসুর নিজেই প্রেক্ষাগৃহটা পরিচালনা করতেন।

‘নাটোর টকিজ’ থেকে ‘মিনার

রনজিতের কাছে বিদায় নিয়ে আবার যাই ‘ছায়াবাণী’র সামনের সেই ঘড়ির দোকানদারের কাছে। সেখানে গেলে ধীমান বলেন, মোহন এসেছে; আপনারা চাইলে ওর সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এরপর ধীমান আমাকে মোহনের কাছে নিয়ে যান। মোহন বেশ ভালোভাবেই আমাদের গ্রহণ করেন। মোহনের সঙ্গে পরিচয় শেষে ‘ছায়াবাণী’র শুরুটা কীভাবে হলো জানতে চাই। তিনি বলেন, “‘ছায়াবাণী’ তো নাটোরের সবচেয়ে পুরনো সিনেমাহল, এটা আমার দাদা প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে আমরা উর্দু সিনেমা চালিয়েছি পাকিস্তান আমলে।” মোহনকে একটু থামিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করি, ‘রামরাজ টকিজ’ নামে তো আরো পুরাতন একটি প্রেক্ষাগৃহ নাটোরে ছিলো? তখন মোহন বলেন, ‘হ্যাঁ ওটাও তো আমাদেরই ছিলো।’ তার ভাষায়, “ওই সিনেমাহলটা মূলত কালীবাড়ি মন্দির ছিলো। জায়গাটার মালিক ছিলেন নাটোরের শ্রীকৃষ্ণ বস্ত্রালয়ের মালিক বৃন্দাবন বিহারি বসাক। উনার (বৃন্দাবন) সঙ্গে আমার দাদার ভালো সম্পর্ক ছিলো। তখন আজকের মতো নাটোর-ঢাকা রোড ছিলো না, কয়লার ডিপো ছিলো। তো উনারা একদিন আমার দাদাকে বললো, বন্ধু এ জায়গাটা ছেড়ে দাও, এখানে আমরা বড়ো করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করবো। তুমি ওখানে (এখন যেখানে ছায়াবাণী আছে) সিনেমাহল করো; ভবিষ্যতে ঢাকা রোড হবে, তোমার ব্যবসাও ভালো চলবে। তাই দাদা ওখান থেকে শিফট করে বর্তমান জায়গায় আসেন। ৪৭-এ দেশভাগ হওয়ার পর পরই এ জায়গায় ‘ছায়াবাণী’ আসে; সময়টা ১৯৫২-১৯৫৩ সালের দিকে হতে পারে। এই জায়গাটা অবশ্য প্রথমে আমরা লিজ নিই; পরে মেয়াদ শেষ হলে ১৯৮০ সালে জায়গাটা আমার বাবা কিনে নেয়।” তিনি আরো জানান, এটা ছিলো প্রথমে ‘নাটোর টকিজ’, নতুন জায়গায় এসে নাম হয় ‘মিনার সিনেমাহল’ এবং স্বাধীনতার পরে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে সেই নাম পাল্টে রাখা হয় ‘ছায়াবাণী’।

   তবে অন্য একটি সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ‘নাটোর টকিজ’ প্রতিষ্ঠা হয় শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদের পশ্চিম পাশে। ‘নাটোর টকিজের’ প্রথম শো ছিলো তারকা রাক্ষসী নামের চলচ্চিত্র। ওই বছরের শেষের দিকে ‘নাটোর টকিজের’ নাম পরিবর্তন হয়ে ‘মিনার সিনেমাহল’ হয়। এই নামেই প্রেক্ষাগৃহটি স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত চলে। স্বাধীনতার পর এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ছায়াবাণী সিনেমাহল’।

   বর্তমানে ‘ছায়াবাণী’র কী অবস্থা জানতে চাইলে মোহন বলেন, ‘সিনেমাহল এখনো আছে। বিল্ডিংয়ের নিচে মার্কেট উপরে সিনেমাহল। চাইলে যেকোনো সময় মেশিন এনে সিনেমা চালানো যাবে। আমি ব্যবসার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি, সিনেমার অবস্থা ভালো হলে আবার এটা চালু করবো। আর যদি না হয়, তাহলে ভেঙে ছয়তলা মার্কেট করার পরিকল্পনা আছে।’

কথায় কথায় তার দাদা সম্পর্কে জানতে চাই মোহনের কাছে। এতো ব্যবসা থাকতে কেনো সেসময় প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন তিনি? দাদার কথা শুনে মোহনের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। তিনি বলতে থাকেন, ‘আমার দাদা খুব শিল্পমনা মানুষ ছিলেন। এলাকার সব নাটক-যাত্রা তাকে ছাড়া চলতোই না! একসময় এগুলো করে মনে হয় তার মন ভরছিলো না। তখন সিনেমা জগতে চলে যান, সেখানে অভিনয়ও করেন। পরে অবশ্য ওখান থেকেই সিনেমাহল ব্যবসার লাইনটা তিনি পান। তার কিন্তু ভালো পয়সা-কড়িও ছিলো, ফলে যখন যা মনে হয়েছে করেছেন।’

   কথা বলতে বলতে বাবা সম্পর্কেও মজার তথ্য দেন মোহন। তার ভাষায়, “আমার দাদা যখন নাটক করেছেন, তখন আমার বাবা বললেন আমি যাত্রা করবো। তিনি ‘মঞ্চবাণী’ নামে একটা যাত্রার দল করে ফেললেন। নাটোরে তখন ১০-১২টা যাত্রার দল ছিলো, তার মধ্যে নাকি আমার বাবার দল ছিলো এক নম্বরে। তার দলে ৫২ জন স্টাফ ছিলো, পোশাক-আশাক কতো কী! কিছু কিছু এখনো আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর ওই ব্যবসায় আমরা আর যাইনি; আর ওই ব্যবসা এখন আর চলেও না।” প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন জানতে চাই মোহনের কাছে। তিনি বলেন, ‘বাবা বেঁচে থাকতে তার সঙ্গে সিনেমাহল দেখাশোনা করতাম, তার মৃত্যুর পর পুরোপুরি দায়িত্ব নিতে হয়। আর যেহেতু এটা আমাদের পৈত্রিক ব্যবসা, সেদিক থেকে সিনেমাহলের পয়সা খেয়েই তো বড়ো হয়েছি।’

   মোহন জানান, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝিতে ‘ছায়াবাণী’ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ চলেছিলো শাকিব খানের শিকারী। মোহন বলেন, “পত্র-পত্রিকায় দেখি সরকার সাহায্য দিবে সিনেমাহল চালুর জন্য; বিনা সুদে লোন দিবে, রিপেয়ারিং, এসি লাগানোর জন্য; কিন্তু খালি গপ্পো, আমাদের কাছে কখনো কোনো চিঠি আসেনি, কোনো কিছু দেয়নি। আমরা যা কিছু করেছি নিজের ক্যাশ টাকায়। আগে যখন সিনেমা আনতাম, সেটা তিন-চার সপ্তাহ চলতো; এখন প্রতি সপ্তাহে সিনেমা আনতে হয়। এ রকম অনেক রেকর্ড আছে আমাদের, যেমন, ঘর সংসার টানা আড়াই মাস চলেছে ‘ছায়াবাণী’তে। ডাকু মনসুর চালিয়েছি অনেক দিন।”

   ‘ছায়াবাণী’ বন্ধ করলেন কেনো--উত্তরে মোহন বলেন, ‘বেদের মেয়ে জোস্না আমরা প্রায় তিন মাস চালিয়েছি। কারণ এ ধরনের সিনেমা তখন মানুষ দেখেছে, এখন দেখে না তাই চালাই না। নাটোর যেহেতু হিন্দু প্রধান এলাকা, এখানে ইলিয়াস কাঞ্চন আর রোজিনার রাধাকৃষ্ণ প্রায় দেড় মাস চলেছিলো। আরো কিছু ভালো সিনেমা ছিলো, যেগুলা দর্শক দেখেছে, আনন্দ করেছে। হলের ভিতরে দর্শক যদি আনন্দ করে, শিটি দেয়, তখনই আমরা বুঝি সেটা খাবে বা চলবে। এজন্য আমরা বাপ-চাচাদের আমল থেকেই দর্শককে উৎসাহিত করার জন্য সিনেমাহলে বিভিন্ন প্রোগ্রামও করেছি।’

   মোহন আরো বলেন, ‘আমরা রাজ্জাক সাহেবকে নিয়ে এসেছি, তাকে নিয়ে নাটকও করেছি। পরে ইলিয়াস কাঞ্চন, অঞ্জু, সুচরিতাকেও আনা হয়েছিলো। নিকাহ ছবির শুটিং আমরাই করিয়েছি নাটোরে। ঢাকা থেকে শিল্পীসহ পুরো ইউনিট আমাদের এই হলে নিয়ে এসেছি। সেই ছবি আবার এই সিনেমাহলেই চালিয়েছি; লোকে লোকারণ্য। আঁখি মিলন, সোহাগ এই সিনেমাগুলো আমার চাচা আতিয়ার রহমান আতিকের হাতের ছবি। উনি ক্যামেরাম্যান ছিলেন।’

এ কথাগুলো বলার সময় বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিলো মোহনকে। মোহন জানান, ‘ছায়াবাণী’ নামটা তার দাদার দেওয়া। তার ভাষায়, ‘আমরা শুনেছি, দাদা এই নাম দিয়েছিলেন এভাবে যে, ছায়া মানে ছবি আর বাণী মানে গান; দুটো মিলে ছবি আর গান। আসলেও তো তাই, এটাতো ছায়াছবিরই ব্যবসা। তাই আমরা আর পরে নাম চেঞ্জ করিনি। তবে সরকারের কথা মতো, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে যদি রিপেয়ারিং করি, এসি লাগাই, নতুন করে চালু করি, তাহলে নাম নিয়ে নতুন করে চিন্তা করবো।’

অংশীদারিত্বের গণ্ডগোল, ‘মিনার’ যখন ‘ছায়াবাণী

মোহনকে থামিয়ে এবার জিজ্ঞাসা করি, আপনার দাদা ‘মিনার’ থেকে প্রেক্ষাগৃহের নাম পরিবর্তন করলেন কেনো? মোহন বলেন, “এটা মুক্তিযুদ্ধেরও আগের ঘটনা। মূলত যুদ্ধের পরে আমরা সিনেমাহলের একক মালিক হয়েছি। তো আমার দাদা প্রথম দিকে যখন মিনার সিনেমাহল করলেন, তখন উনার কয়েকজন পার্টনার ছিলো। কোনো একটা বিষয় নিয়ে পার্টনারদের মধ্যে গণ্ডগোল, মামলা-মোকদ্দমা অনেক কিছুই হয়েছিলো। সেই মামলা আমরা জিতে যাই, তারপর দাদা এর নাম দেন ‘ছায়াবাণী’।”

   মোহনের কাছে এবার সেই সময়ের দর্শকের কথা জানতে চাই। মোহন বলেন, ‘একটা সময় ছিলো যখন মানুষ গরমে, রোদে পুড়ে সিনেমা দেখেছে। আমি এমনও দর্শক দেখেছি, সিনেমাহল থেকে যখন বের হতো, দেখে মনে হতো গোসল করে বের হয়েছে। কারণ আমাদের হলের ক্যাপাসিটি ছিলো সাতশো, কিন্তু লোক থাকতো ১২ শো। লোক বেশি হলে বাইরে থেকে চেয়ার ঢোকানো হতো। দর্শকের চাপে আমরা এটা করতে বাধ্য হতাম।’

   প্রেক্ষাগৃহের বর্তমান মালিকানার অবস্থা কী সে ব্যাপারে মোহন বলেন, ‘আমার দাদা সিনেমাহলের ব্যবসা শুরু করলেও আমার বাবা ও চাচা আতিয়ার রহমান ছিলেন মূল উদ্যোক্তা। আমার বাবারা সাত ভাই হলেও সিনেমাহল শুরু করেছিলেন এই তিন জন মিলে। ১৯৮৮ সালে দাদা এবং তার তিন বছর পরে ১৯৯১ সালে বাবা মারা যান। আর ১৯৯৬-এ মারা যান আতিয়ার চাচা। মূলত ৯১ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই আমি দায়িত্ব নিই। তবে মাঝখানে আমি কিছুদিন ছিলাম না, তখন আমার চাচা ও চাচাতো ভাইয়েরা এটা চালায়। এরপর ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আমি তখন রাগ করেই সিনেমাহল ছেড়ে দিয়ে ওদের বললাম, তোরাই চালা। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে প্রায় ১৫ বছর। এরপর ২০০৮ সালের দিকে শেষ পর্যন্ত সিনেমাহলের পাশের কিছু জায়গা চাচাতো ভাইদের ছেড়ে দিতে হয়। এখন অবশ্য পুরো সিনেমাহলের মালিকানা আমার।’

   চলচ্চিত্র নিয়ে মোহন অনেক ক্ষোভের কথা বলেন। তিনি জানান, মূলত তার ক্ষোভ সরকারের ওপর। তার ভাষায়, “এই নাটোর মহিলা কলেজ আমাদের সিনেমাহলের টাকায় করা। আমরা প্রতি টিকিটে এক-দুই টাকা করে চাঁদা দিতাম কলেজ তৈরির জন্য; সেটা ডি সি’র নির্দেশেই হতো। তিনি আমাদের বললেন, একটা প্রতিষ্ঠান করতে চাই, আপনারা অর্থ কালেকশন করে দেন। আমি সরকারকে সহায়তা করেছি। কিন্তু সরকার আমাদের কখনো দেখেনি। শুধু আমরাই না, পরে ‘গীতি’ ও ‘রোজী’ সিনেমাহলও কলেজ তৈরির টাকা জোগাড় করে দিয়েছে। শুধু কলেজ নয়, অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আমরা এভাবে চাঁদা দিয়েছি। কিন্তু আমাদের জন্য, সিনেমাহলের জন্য, আমাদের জীবিকার নিরাপত্তার জন্য সরকার কিছুই করেনি। এখানে আমাদের বহু মাস্তান, ক্যাডারদের ফেইস করতে হয়েছে। আমরা প্রশাসনের কোনো সহায়তা পাইনি। সরকারকে আমরা মাসে ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত রাজস্ব দিয়েছি; তাহলে নিরাপত্তা চাইলে নিরাপত্তা পাবো না কেনো!”

   প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে মোহন বলেন, ‘এখন সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর সরকার আজকে আমাদের হাত-পা ধরছে সিনেমাহল চালানোর জন্য। আমি সরকারকে যদি ১০ টাকা রাজস্ব দিই, তাহলে এখন এই দুঃসময়ে সরকারের আমাদেরকে এক টাকা হলেও তো দেওয়া উচিত। না হলে অন্তত মুখের কথা তো বলা যায়, বাবা ভালো থাকিও। কিন্তু আমরা সেটাও কখনো পাইনি।’

   সেই সময়ের প্রচারণার কথা জানতে চাইলে মোহন জানান, আগে ঘোড়ার গাড়িতে প্রচার-প্রচারণা চলতো। দুইটা ঘোড়ার গাড়ি থাকতো এবং মাইক আর একজন করে লোক থাকতো। পুরো শহরের আনাচে-কানাচে তারা প্রচার করে আসতো। পরে অবশ্য মিনিবাস দিয়ে প্রচার চালানো হতো। শহরের বাইরে উপজেলা পর্যন্ত চলতো প্রচার। তখনো উপজেলাগুলোতে প্রেক্ষাগৃহ হয়নি।

   মোহনের সঙ্গে কথা শেষ করে আবার ফিরে আসি ‘ছায়াবাণী’র পাশের ওই ঘড়ির দোকানে ধীমানের কাছে। তার কাছে জানতে চাই আর কার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলা যেতে পারে। ধীমান জানান, জুলি মিয়ার দ্বিতীয় পক্ষের এক ছেলে আছে, তিনিও প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নাম আবেদুর রহমান। ‘ছায়াবাণী’র জায়গায় তারও ভাগ আছে। কিন্তু সেদিন আর আবেদুরের দেখা পাওয়া যায় না। সেদিনের মতো আমি অন্য প্রেক্ষাগৃহের তথ্য সংগ্রহে চলে যাই। পরে ২৬ মার্চ ২০১৯ আবার নাটোরে গিয়ে প্রথমেই যোগাযোগ করি আবেদুরের সঙ্গে। ‘ছায়াবাণী’র নিচতলায় দোকানে ছিলেন আবেদুর। ‘ছায়াবাণী’ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে একেবারে ভিন্ন তথ্য দেন তিনি।

   আবেদুর জানান, তার বাবা মূলত ব্যবসায়ী ছিলেন, ফলে তখনকার রাজধানী কলকাতায় তাকে (জুলি মিয়া) মাঝে মাঝেই যেতে হতো। সেখানে তিনি ব্যবসায়িক কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘোরাফেরা করতেন, সিনেমাও দেখতেন। কলকাতায় ‘মিনার সিনেমাহল’ নামে একটা প্রেক্ষাগৃহ ছিলো; সেখানে তিনি নাকি নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখতেন। এভাবে প্রেক্ষাগৃহটা তার খুব পছন্দ হয়ে যায় এবং তিনি মালিকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। একপর্যায়ে তিনি প্রেক্ষাগৃহের নকশাটা পাঁচশো টাকায় কিনে নেন! এরপর তিনি ওই নকশার আদলে নাটোরে এসে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে একটি প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন। আবেদুর আরো জানান, তার বাবা বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। কিংবদন্তি পরিচালক এহতেশামের বন্ধু ছিলেন তার বাবা। তার হাত ধরেই নাকি জুলি মিয়া চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ছোটোবেলায় বাবার কাছে গল্প শোনা আবেদুর স্মৃতি হাঁতড়িয়ে বলতে থাকেন, ‘হারানো দিন নামের সিনেমাতে জমিদার চরিত্রে ছিলেন মোস্তফা আর তারই নায়েবের চরিত্রে অভিনয় করেন আমার বাবা। সেখানে নায়ক-নায়িকা ছিলো রহমান ও শবনম।’

   আবেদুর আরো বলেন, ‘কলকাতার মিনার সিনেমাহল কেনো জানি বাবার খুব পছন্দ ছিলো। শুরুতে তিনি ওই নামেই এটার নামকরণ করেন।’ এই কথা শুনে আমি আবেদুরকে জিজ্ঞাসা করি, যতোদূর জানি শুরুতে ‘ছায়াবাণী’র নাম ‘নাটোর টকিজ’ ছিলো; আপনি ‘মিনার’ বলছেন! সঙ্গে সঙ্গে এ কথার উত্তরে আবেদুর বলেন, “ও ‘নাটোর টকিজের’ কথা বলছেন। ওটাও আমার বাবাই প্রতিষ্ঠা করেছিলো ১৯৪০ সালে। নাটোরে কালীবাড়ি মন্দিরের নাম শুনেছেন; ‘নাটোর টকিজ’ হয়েছিলো ওই কালীবাড়ি মন্দিরে। তারপরে উনি যখন দেখলেন ব্যবসা ভালো হচ্ছে, তখন এখানে (‘ছায়াবাণী’র জায়গায়) জায়গার ব্যবস্থা করে বিল্ডিং করেন।”

   প্রেক্ষাগৃহটির আরেক অংশীদার হালিম মিয়া সম্পর্কে কারো কাছেই তেমন কোনো তথ্য পাচ্ছিলাম না। যদি আবেদুরের কাছে কোনো তথ্য পাওয়া যায় তাই হালিম মিয়া সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া। শেষ পর্যন্ত হালিম মিয়া সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায় আবেদুরের কাছেই। তার ভাষায়, “হালিম মিয়া সম্পর্কে বলতে গেলে ‘নাটোর টকিজ’ থেকেই বলা ভালো। যে এহতেশামের কথা বললাম, তার সঙ্গে আমার বাবার একটা ভালো সম্পর্ক ছিলো এবং তার কারণেই বাবা হয়তো এগুলি করতে পেরেছিলেন; এটাও সত্য কথা। উনার (এহতেশাম) কাছ থেকেই প্রথমে মেশিন আনা হয়। ফলে এহতেশামই কাগজে-কলমে সিনেমাহলের অংশীদার ছিলেন। তো তিনি এখানে একজন ম্যানেজার নিয়োগ করেন, তার নাম হলো হালিম মিয়া।”

   আবেদুর আরো বলেন, “পরবর্তী সময়ে বাবা জানতে পারেন, এহতেশাম তার স্বত্বটা হালিম মিয়ার কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন এবং উনি এসে ধান্দা করেছেন গোটাটাই নেওয়ার জন্য। এ নিয়ে হালিম চাচার সঙ্গে মামলা শুরু হয়। এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীনের পর মামলায় আমরা জিতে যাই। সিনেমাহলের পুরোপুরি দখল পাওয়ার পর নাম পরিবর্তন করে ‘ছায়াবাণী’ করা হয়। বাবা তখন একাই মালিক হন।” এদিকে ‘নাটোর টকিজ’কে অনেকে ‘বেবি টকিজ’ বলছে, কারণ কী জানতে চাই আবেদুরের কাছে। তিনি বলেন, “আসলে ‘বেবি টকিজ’ একটা কোম্পানির নাম; তারা ‘মিনার সিনেমাহল’ ভাড়া নিয়ে কিছুদিন চালিয়েছিলো। তবে হলের মালিক আমার বাবাই ছিলেন। সে থেকেই হয়তো অনেকে ‘বেবি টকিজ’ বলছে।”

‘গীতি সিনেমা’ : স্বাধীনতার পরে নাটোরের প্রথম প্রেক্ষাগ্রহ

‘ছায়াবাণী’ সংলগ্ন ঘড়ির দোকানদার ধীমানের কাছেই মূলত ‘গীতি সিনেমাহলের’ মালিকের নাম জানতে পারি, নূরুল ইসলাম নুকুল। নুকুল নাটোরের গাড়িখানা গোরস্থানের পাশেই থাকেন বলে ধীমান জানান। তার দেখানো পথেই রিকশা নিয়ে রওনা হই। তখন সন্ধ্যা হতে অল্প সময় বাকি। বাড়ির বারান্দায় টাঙানো নুকুলের ব্যক্তিগত সাইনবোর্ড দেখে ওখানেই নেমে যাই। তারপর সেখানে মিনিট দুয়েক দাঁড়াতেই ভিতর থেকে সাড়া পাই নুকুলের। কারণ বারান্দার দরজা খোলা থাকায় ঘর থেকেই তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, কেউ এসেছে তার খোঁজে। ঘরের ভিতর থেকেই কথা বলেন নুকুল। আমার আসার উদ্দেশ্য জেনে ভিতরে আসতে বলেন। ভিতরে ঢুকেই দেখি তিনি ইফতার নিয়ে বসে আছেন। আমাকে বসতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, কোথা থেকে এসেছি।

   বিশাল দাড়ি, বাবরি চুল ও অসময়ে রোজা রাখা দেখে আমি কিছুটা ঘাবড়ে যাই শুরুতে। কিন্তু একটু পরেই সেই ভয় কেটে যায়। কথা বলার চেষ্টা করলে, তিনি সায় দেন। কিন্তু অনুমতি নিয়ে রেকর্ডার চালু করতেই তিনি কথা বলতে অনাগ্রহ দেখান। পরে তাকে রেকর্ড করা আলোচনা কোথাও সম্প্রচার কিংবা প্রমাণ হিসেবে দেখানো হবে না বলে আশ্বস্ত করলে, তিনি কথা বলতে রাজি হন। আমার মনের ভিতরে এতোক্ষণ ধরে ঘুরপাক করতে থাকা কথাটা শুরুতে নিজেই বলে ফেলেন নুকুল, ‘আমাকে দেখে কি মনে হয়, আমি একসময় সিনেমাহলের মালিক ছিলাম!’ সত্যিই তার বর্তমানের পোশাক-পরিচ্ছদ আর ঋষির মতো চুল-দাড়ি দেখে বোঝার কোনো জো নেই তিনি কোনো একসময় প্রেক্ষাগৃহের মালিক ছিলেন! কথায় কথায় আরো জানা যায়, তিনি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের (বেওয়ারিশ লাশ দাফন করার সংগঠন) নাটোর জেলা শাখার বর্তমান উপ-পরিচালক। পাঁচ দিন ছাড়া পুরো বছর রোজা রাখেন। নুকুল নিজেই জানান, যখন তিনি প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন, তখন এমন চিন্তাভাবনা তার মধ্যে ছিলো না। মূলত ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসতে শুরু করে। একপর্যায়ে কিছুটা মজা করে নুকুল বলেন, “তোমরা যদি লেখো যে, এই লোক সিনেমাহলের মালিক ছিলো, তো তোমাদের পত্রিকাই বন্ধ হয়ে যাবে! তার পরও কী আর করা, তোমরা আমাকে হলের মালিকই লেখো, আমি নূরুল ইসলাম নুকুল, ‘গীতি সিনেমাহলের’ প্রোপাইটার এবং আমি একাই।”

‘গীতি সিনেমা’ এখন গুদাম ঘর

এরপর নুকুল নিজে থেকেই তার প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বলা শুরু করেন। তার ভাষায়, “স্বাধীনতার পরে একটা সময় নাটোরে কোনো সিনেমাহল চালু ছিলো না। তখন ‘ছায়াবাণী’ ছিলো; তবে ওটার নাম ছিলো ‘মিনার সিনেমাহল’। পার্টনারশিপ নিয়ে দ্বন্দ্বে মামলা হয়ে সিনেমাহলটা বন্ধ ছিলো তখন। এ সময় ভাঙ্গুড়ার এক লোক এসে বললো, তোমাদের নাটোরে তো সিনেমাহল নাই, আসো একটা করি। তোমার তো একটা বড়ো গুদামঘর আছে, ওই জায়গাটাতে সিনেমাহল করা যাবে। আর ওখানে (ভাঙ্গুড়ায়) আমার একটা সিনেমাহল আছে, ওটা ভেঙে জিনিসপত্র এখানে নিয়ে আসবো। তখন আমি তাকে বললাম, দেখো, আমি সিনেমাহলের ব্যবসা-ট্যাবসা করবো না; তুমি যদি পারো তো করো। এদিকে গুদামটাও আমার একার ছিলো না, মানে জায়গাটা লিজ দেওয়া ছিলো। যাকে দেওয়া ছিলো, সে আবার ঢাকায় থাকতো। তো ঢাকার ওই লোকের সঙ্গে কথা বলে আমি জায়গাটা ফিরিয়ে নিলাম। তারপর ভাঙ্গুড়ার ওই লোকসহ সেখানে সিনেমাহল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ভাঙ্গুড়া থেকে প্রজেক্টর, ওয়াগান ও সিটিংয়ের সব মালামাল আসার পর দেখা গেলো, এগুলা এখানে প্রসেস করা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি দেখে তো ভাঙ্গুড়ার ওই লোক পালালো। তখন আমি তো পড়ে গেলাম বেকায়দায়। উপায় না দেখে নিজেই সিনেমাহলের কাজ শুরু করলাম। নতুন করে জিনিসপত্র কিনতে হলো।”

   একটু বিরতি দিয়ে আবার বলতে শুরু করেন নুকুল, “এরপর শুরু হলো লাইসেন্সের ঝামেলা। প্রথমে তো লাইসেন্স দিতো সেন্সর বোর্ড, পরে ডি সি। তখন তো রাজশাহী জেলা আর নাটোর হলো মহকুমা। তো মহকুমা প্রশাসকের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে তার মাধ্যমেই প্রথমে টেম্পোরারিভাবে তিন মাসের জন্য এবং পরে পার্মানেন্টলি অর্ডার নিয়ে আসি। ১৯৭৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর চকরামপুরে যাত্রা শুরু করে ‘গীতি’। এর প্রথম সিনেমা ছিলো জিঘাংসা। যাহোক, ‘গীতি সিনেমাহল’ আমিই শেষ পর্যন্ত চালিয়েছি, কারো কাছে হ্যান্ডওভার করিনি। কোনো পার্টনারও আমার ছিলো না। তবে একেক সময় একেক ভাইকে দিয়ে আমি এটা চালিয়েছি।”

   এ পর্যায়ে ‘গীতি সিনেমাহল’ সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য জানার জন্য নুকুলকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে হয়। কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্ত্রীকে প্রেক্ষাগৃহের মালিকানার দলিল আনতে বলেন। এরপর সেই দলিল খোঁজা নিয়ে বাড়িতে একটা হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে যায়। তবে স্বস্তির কথা হলো শেষ পর্যন্ত দলিলটা পাওয়া যায়। দলিলটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে নুকুল বলেন, সিনেমাহল নিয়ে তোমাদের যা যা দরকার সব তথ্য এখানে পেয়ে যাবে। তারপরও আমি জোর দিয়ে বলি, দলিল নয়, গল্পটা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই। তখন নুকুল বলেন, ‘আমি তো কাগজ (দলিল) ছাড়া কিছুই বলতে পারবো না। তার চেয়ে তোমরা ওটাই (দলিল) পড়ো।’ দলিল নিয়ে যখন এসব কথা চলছে, পাশ থেকে নুুকুলের স্ত্রী খানিকটা রেগে বলে ওঠেন, ‘ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কখনো তো উনি বসেননি। সবসময় ভাইদের দিয়ে চালিয়েছেন; কেমন করে উনি সিনেমাহলের তথ্য দেবেন! উনি তো নিজে কোনোদিন হিসাবটা পর্যন্ত নেননি।’

   স্ত্রীর এই অভিযোগের উত্তর অবশ্য নুকুল কথায় কথায় দেন। তার ভাষায়, ‘দেখো বাবা, আমি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গেলে খুব অস্থির লাগে, থাকতে পারি না। এমনকি টিভির আওয়াজও আমি শুনতে পারি না। উনি (স্ত্রীকে দেখিয়ে বলেন) মাঝে মাঝে পাশের ঘরে টিভি চালান; আমার সেটাও সহ্য হয় না। সেই লোক আমি ব্যবসার হিসাব কীভাবে নিই!’ শেষ পর্যন্ত অবশ্য দলিলের ফটোকপি নিয়েই আমাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবে বিদায়ের আগে নুকুলের কাছে তার পুরাতন কোনো কর্মচারীর খোঁজ, ঠিকানা বা ফোন নম্বর চাই। কিন্তু নুকুল সেটাও দিতে পারেন না। তবে চাইলে তার যে ভাই মানে নূর ই এলাহী চাম্পা, শেষের দিকে প্রেক্ষাগৃহটি দেখাশোনা করেছেন তার সঙ্গে কথা বলতে পারি বলে তিনি জানান। এবং নিজে ফোন করে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগও করিয়ে দেন। অবশ্য নুকুল এও জানান, তার যে ভাই নুরুল আহসান প্রেক্ষাগৃহের শুরু থেকেই এর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তিনি ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মারা গেছেন। এরপর নুকুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কথা বলতে যাই নূর এলাহীর কাছে। যাওয়ার আগে নুকুল জানান, নূর এলাহী শহরের নিচাবাজারে আমার জন্য অপেক্ষা করবেন।

   নুকুলের কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে নূর এলাহীর উদ্দেশে রওনা হই। নুকুলের বাড়ি থেকে বের হতে হতে ততোক্ষণে অবশ্য সন্ধ্যা হয়ে গেছে। নিচাবাজার পৌঁছেই নূর এলাহীকে ফোন করি। তিনি আমার পরিচয় জেনে একটি দোকানের ঠিকানা দেন। সেখানে গেলে নূর এলাহী-ই আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, কারো খোঁজ করছি কি না? তার নাম বললে তিনি আমাকে বসতে বলেন। শুরুতেই নূর এলাহী জিজ্ঞাসা করেন, তার কাছে ঠিক কী জানতে চাই। আমি বলি, ‘গীতি সিনেমাহল’ প্রতিষ্ঠার গল্প। তিনি কোনো ভূমিকা না করেই বলতে শুরু করেন, “সেসময় নাটোরে কোনো সিনেমাহল ছিলো না। ভালো ব্যবসা হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো। তাই আমরা ব্যবসায়িক দিক চিন্তা করেই তখন সিনেমাহল প্রতিষ্ঠা করি। কিন্তু পরে আর আমরা এই ব্যবসাটা ধরে রাখতে পারিনি। তবে শুধু নাটোর নয়, সারাদেশেই সিনেমাহল বন্ধ হয়ে গেছে। এই ব্যবসার চেয়ে যদি মার্কেট বা কোনো কমপ্লেক্স করে বেশি বেনিফিট হয়, তাহলে সিনেমাহল রেখে কী লাভ! দিনাজপুরে ‘লিলি’ ও ‘বোস্তান’ সিনেমাহল ছিলো; তারা সিনেমাহলের ব্যবসা ভালো থাকতেই ভেঙে মার্কেট করে ফেলেছে। রাজশাহীর ‘বর্ণালী’ বিক্রি হয়ে গেছে, আবার ‘কল্পনা’ ভেঙে কমপ্লেক্স করা হয়েছে। কিছুদিন আগে শুনলাম ‘উপহার’ও নাকি ভেঙে ফেলেছে। এভাবে ঢাকা, চট্টগ্রামের বহু সিনেমাহল ভেঙে ব্যবসায়িক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। মূল ঘটনা হলো, ব্যবসা করে যদি খরচ না ওঠে, তাহলে এটা রেখে কী লাভ! তার ওপর সিনেমার মান নাই, দর্শক নাই।”

   অনেকটা ক্ষোভ নিয়ে নূর এলাহী বলেন, ‘টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচুর ইন্ডিয়ান সিনেমা দেখাচ্ছে, ভালো সিনেমাগুলো পাইরেসি হয়ে যাচ্ছে। আবার সালমান, মান্নার মতো ভালো আর্টিস্ট হঠাৎই মারা গেলো। তখন থেকেই ব্যবসায় ধস নামা শুরু। আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, নাটোরের মতো ছোটো একটা শহরে চারটা সিনেমাহল ছিলো; চারটা সিনেমাহলের উপযোগী জায়গা এটা নয়।’

   কথা বলার একপর্যায়ে প্রেক্ষাগৃহের নাম কেনো ‘গীতি’ রাখা হলো জানতে চাই নূর এলাহীর কাছে। তিনি জানান, বড়োভাই নুকুল মূলত তার বন্ধুর মেয়ের নামে প্রেক্ষাগৃহটির নাম রাখেন। এর একটা কারণও ছিলো। তখন লাইসেন্স নিতে হতো জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে। সেটাও পাওয়া যেতো এক বছরের জন্য। এক বছর পর পর নতুন করে অনুমতি নিতে হতো। সেটাও খুব সহজ ছিলো না। প্রশাসন প্রেক্ষাগৃহের প্রজেকশন, অন্যান্য মেশিন, অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা, সার্বিক নিরাপত্তা, আসন, টয়লেট ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নিয়ে পুনরায় অনুমতি দিতো। নূর এলাহী বলেন, ‘তখন যেকোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি পাওয়া একটু কঠিনই ছিলো। সেসময় আমার বড়োভাইয়ের (নুকুল) এক বন্ধু পুঠিয়া-দুর্গাপুর সার্কেলের সি আই ছিলেন। উনার নাম আবদুল্লাহ চৌধুরী। উনি যখন নাটোরের ও সি ছিলেন তখনই উনার সঙ্গে বড়োভাইয়ের সম্পর্ক হয়। আবদুল্লাহ চৌধুরীর বোনজামাই সেসময় রাজশাহী জেলার ডি সি ছিলেন। তখন বড়োভাই গিয়ে তার বন্ধুকে ধরে বললেন, আমি একটা সিনেমাহল করতে চাচ্ছি, আপনি একটু ব্যবস্থা করে দেন। মূলত প্রশাসনিক ঝামেলা এড়ানোর জন্যই তখন বড়োভাই তার বন্ধুর কাছে গিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ সাহেব তখন ভাইকে বললেন, আপনি দরখাস্ত করেন, আমি দেখছি। পরে উনার সুপারিশেই সবকিছু হয়। প্রথমে আমরা টেম্পোরারি লাইসেন্স পাই। দুই-তিন বছর পরে অবশ্য পার্মানেন্ট লাইসেন্স হয়। মূলত আবদুল্লাহ সাহেবের বড়োমেয়ের নাম ছিলো গীতি। আবদুল্লাহ সাহেবকে বড়োভাই বললেন, ভাই, আপনি এতো কিছু করলেন, অনুমতি দিলে আমি ভাতিজির নামে সিনেমাহলের নামকরণ করতে চাই। উনি বললেন, করেন, সমস্যা কী; আপনি বন্ধু মানুষ।’

   নুকুলের তথ্য মতে, শুরু থেকেই তার যে ভাই প্রেক্ষাগৃহ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি মারা গেছেন ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে। তাহলে নূর এলাহী কখন থেকে প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে যুক্ত হলেন, জানতে চাই তার কাছে। নূরের ভাষায়, ‘যখন সিনেমাহলটি প্রতিষ্ঠিত হয় তখন আমি ছাত্র ছিলাম। প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর থেকেই বড়োভাই (নুকুল) সিনেমাহলে কম আসতে থাকেন। কারণ তিনি ওই সময়টাতে কেবল আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছেন। আমি মূলত বিভিন্ন সময় সিনেমাহলে দায়িত্ব পালন করি। কারণ আমরা ভাইয়েরা সময় ভাগ করে নিয়ে এটা চালাতাম। প্রথমবার ১৯৯১-১৯৯২ সালে, তারপর ২০০১-২০০৩ সালে এবং সর্বশেষ সিনেমাহল বন্ধের আগের তিন বছর আমিই দায়িত্বে ছিলাম। আমার ছোটোভাই নুরুল হায়দারও কিছুদিন চালিয়েছেন।’

   যে বছরে প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হয়ে যায় সে বছর মনপুরা (২০০৯) ভালো ব্যবসা করে বলে জানান নূর এলাহী। প্রায় ছয় সপ্তাহ চলেছিলো এটি। যারা প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলো এ রকম অনেকেই চলচ্চিত্রটি দেখতে আসে। এর আগে নানা সময়ে দাঙ্গা, লুটতরাজ, আম্মাজান, ধর, ভাত দে, গোলাপি এখন ট্রেনে ইত্যাদি চলচ্চিত্রগুলো ভালো ব্যবসা করে বলেও নূর এলাহী জানান। সবচেয়ে ব্যবসা করেছিলো বেদের মেয়ে জোস্না; এটি টানা এক মাস চলে।

   নূর এলাহী বলেন, ‘মূলত ২০০৪-এর পর থেকেই সিনেমাহলের অবস্থা বেশি খারাপ হতে থাকে। দর্শক আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আর কিছু দর্শক ছিলো যারা ওই কাটপিস সিনেমা ছাড়া দেখবেই না। সিনেমায় কাটপিস থাকলে দর্শক আসে, না হলে নাই। সেসময়ের কয়েকজন প্রভাবশালী প্রযোজক লাভের জন্য এটা করতো। মূলত কিছু ব্যবসায়ী কালো টাকা সাদা করার জন্য এখানে ঢুকেছিলো। এরা ব্যবসা নয়, মজা-মাস্তি করার জন্য এসেছিলো। এর মধ্যেও কিছু ভালো প্রযোজক ছিলো; তবে তাদের সিনেমা পাইরেসি হয়ে যেতো। এটাও ওই প্রভাবশালীরাই করতো। তবে সরকারও দায়ী ছিলো। তারা চাইলে এটা হয়তো বন্ধ করতে পারতো, কিন্তু করেনি। এর আগে একবার ভি সি আর, ভি সি ডি সিনেমাহল ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিলো। তারপরে আসলো ডিশ লাইন। আর এখন তো সবার হাতে হাতে মোবাইলফোন, ইন্টারনেট। সবশেষে এরাই পুরো ব্যবসাটাকে ধ্বংস করে দিলো।’

   গীতি সিনেমাহল ঘুরে দেখা যায়, বিশাল ভবনটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রেক্ষাগৃহে ঢোকার প্রধান ফটকটি বন্ধ করে কয়েকটি দোকানঘর বানানো হয়েছে। দোকানগুলোও এখন খোলে বলে মনে হয় না। এছাড়া প্রেক্ষাগৃহের ভিতরে ময়লা, আবর্জনা জমে নষ্ট হয়ে গেছে সব। তবে নিচতলায় একটি কক্ষ পরিষ্কার করে গুদাম হিসেবে কুরিয়ার সার্ভিসের একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়।

অস্তিত্ব নেই ‘রোজী’র

‘ছায়াবাণী’র পাশের ঘড়ির দোকানদার ধীমানের কাছে আগেই জেনেছিলাম ‘রোজী সিনেমাহলে’র মালিকের নাম রওশন। তিনিও নাটোর শহরের লাল বাজারেই থাকেন। এদিকে ‘ছায়াবাণী’ ও ‘হাসিনা’র তথ্য সংগ্রহ করতে প্রায় বিকেল হয়ে যায়। তখন আমি লাল বাজারে যাই রওশনের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু রওশনকে বাড়িতে পাওয়া যায় না; ফোনও বন্ধ। রওশনকে না পেয়ে নাটোর স্টেশন বাজারে যাই ‘রোজী সিনেমাহল’ দেখতে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহের কোনো অস্তিত্ব নেই; ‘রোজী সিনেমাহল’ এখন ‘রোজী মার্কেট’। আধুনিক এ বিপণিবিতানটি দেখে বোঝার উপায় নেই, এখানে একসময় প্রেক্ষাগৃহ ছিলো! রোজী মার্কেটের কয়েকজন দোকানদারের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ১০ বছরেরও বেশি সময় হলো এটি বন্ধ হয়ে গেছে। ‘রোজী মার্কেট’ ঘুরে সেদিনের মতো রাজশাহী ফিরে আসি।

   পরের বার যখন নাটোরে যাই, সেদিন অবশ্য ‘রোজী মার্কেটে’ গিয়ে রওশনের ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপকের ফোন নম্বর পাই। ফোনে কথা হয় তার সঙ্গে; তিনি জানান, রওশনের সঙ্গে সেদিনও কোনো কথা বলা যাবে না। তিনি অন্যদিন আসতে বলেন। ফলে আমি ফিরে আসি। তবে অন্য একটি সূত্র থেকে জানা যায়, প্রেক্ষাগৃহটি ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৬-এ বন্ধ হয়ে যায়।

মাত্র ১৩ বছরেই বন্ধ ‘হাসিনা’

মূলত ‘ছায়াবাণী’র পাশের ওই ঘড়ির দোকানদার ধীমানের কাছ থেকেই নাটোরের সব প্রেক্ষাগৃহ মালিকের নাম-ঠিকানা এবং কে কোথায় কাজ করে জেনেছিলাম। ধীমানের কাছে ‘হাসিনা সিনেমাহলের’ মালিকের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওটার মালিক তো মিঠু ভাই; মজিবুর রহমান মিঠু। সামনে একটু এগিয়ে গেলেই তার কাপড়ের দোকান। তার কথা মতো ‘ছায়াবাণী’ থেকে একটু এগিয়ে যেতেই পেয়ে যাই মিঠুর কাপড়ের দোকান। দোকানে ঢুকেই খোঁজ করি মিঠুর, তখন মিঠু নিজেই পরিচয় দেন, “আমি ‘হাসিনা সিনেমাহলের’ মালিক।” ব্যবসায়ী মিঠুকে প্রথম দেখাতেই পুরোদস্তুর ধার্মিক মনে হয়। তার কাছে নিজেদের পরিচয় ও আসার উদ্দেশ্য জানালে তিনি নিজে থেকেই জানতে চান, কী বলতে হবে বলেন।

   মিঠু জানান, প্রেক্ষাগৃহটি ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠিত। মাত্র ১৩ বছর চলেই ২০০২ খ্রিস্টাব্দে এটি বন্ধ হয়ে যায়। সেসময় এতো ব্যবসা থাকতে কেনো প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা করলেন? আবার কেনোইবা এতো অল্প সময়ের মধ্যে বন্ধ করলেন জানতে চাই মিঠুর কাছে। মিঠু বলেন, ‘তখন সিনেমাহলে ভালো ব্যবসা হতো, আর একটা জায়গাও পছন্দ ছিলো। সবমিলেই সিনেমাহল প্রতিষ্ঠা করি। কিন্তু পরে তো দর্শক থাকলো না; দর্শক না থাকলে সিনেমাহল চলবে কী করে? লস দিতে দিতে প্রায় ২০-৩০ লাখ টাকা লসের পর বন্ধ করে দিয়েছি। এখন সারা বাংলাদেশের সিনেমাহল শেষ, সব বন্ধ হয়ে গেছে; যে কয়টা চলছে তাও বন্ধ হয়ে যাবে।’ মিঠু জানান, প্রেক্ষাগৃহ ভবনের কাঠামোটি এখনো ভালো আছে। পরে মিঠুর কাছে প্রেক্ষাগৃহের ছবি তোলার অনুমতি চাইলে, তিনি খানিকটা অবজ্ঞার সুরেই বলেন, ‘তোলেন; কিন্তু ছবি তুলে, গবেষণা করে, লেখালেখি করে কী লাভ! হল মালিকদের কোনো লাভ হবে, উপকার হবে? এ নিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে ১০ বার মিটিং করেছি, কোনো লাভ হয়নি। তোমরা গবেষণা করে কী করবে? রাজশাহীতে কোনো সিনেমাহল আছে, নাই। একটা বিভাগীয় শহরে কোনো সিনেমাহল নাই! সব ডেড। এসব গবেষণা করে কোনো লাভ নাই।’

   ‘হাসিনা সিনেমাহল’ নাটোর শহর থেকে একটু বাইরে ভাটুদারায় অবস্থিত। ফলে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ হওয়ার সময় তা ভেঙে অন্য কিছু নির্মাণ করলে লাভজনক হতো না বলেই হয়তো মালিক প্রেক্ষাগৃহের কাঠামোটি ভাঙেননি। তবে এ নিয়ে মিঠু একেবারে ভিন্ন কথা বলেন, ‘দেখেন, একটা প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার তো কোনো যুক্তি হয় না। স্বপ্ন এখনো দেখি। সরকার যদি কখনো সহায়তা করে তাহলে সিনেমাহল চালাবো, তাছাড়া তো ভেঙেই ফেলতে হবে। আমরা এফ ডি সি’তে তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকবার মিটিং করেছি। সেখানে বলেছি, আমরা সিনেমাহল চালাতে আগ্রহী না। এতোদিন আমরা ট্যাক্স দিয়েছি, এখন আপনারা সহায়তা করেন। দৃশ্যত, কোনো কাজ হয়নি।’

   কথা বলতে বলতে কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন মিঠু। তার ভাষায়, ‘দেখো, আমার কাছে এতো কিছুর অনুসন্ধান করে কোনো লাভ নাই! এফ ডি সি’তে চলে যাও, সেখানে গিয়ে এম ডি’কে ধরো--কেনো সিনেমাহল চলে না, কেনো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? সব তথ্য ওখানে আছে, পেয়ে যাবে। এতো সব তথ্য নিয়ে কী লাভ! স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, এফ ডি সি’র এম ডি এর সঙ্গে জড়িত; পাঁচ-ছয়বার আমার হল ভিজিট করে গেছে; যে হলগুলো এখন অবশিষ্ট আছে সেগুলো নিয়ে কিছু করা যায় কি না তার জন্য। সবই ঠিক আছে কেবল কাগজে-কলমে! বাস্তবে কোনো অনুদানও নাই, টাকাও নাই। তারা ডিজিটাল মেশিনপত্র, নতুন সিট, এসি করে দেওয়ার কথা বলেছে। যদি করে, সরকারের হাতে হল ছেড়ে দেবো। সরকার যদি চালায় অসুবিধা কী? ১০ জনের কর্মসংস্থান তো হবে। নাটোরে এখন একটাই হল, বাকি সব ভেঙে ফেলেছে। আমরা তো এর মধ্যে নতুন করে পয়সা খরচ করতে পারবো না; সিনেমাহলের স্বাদ মিটে গেছে। আর এখন সিনেমাহলে সিনেমা দেখবে কে? হলে যাওয়ার তো কোনো যুক্তিই নাই। মানুষ এখন প্রযুক্তিনির্ভর, দেশেই ২৬টি চ্যানেল, তার ওপর বিদেশি চ্যানেল, মোবাইল ফোনে সবকিছু পাওয়া যায়; আর কী দরকার!’

   দোকানে ক্রেতার ভিড়, মিঠুর কথা বলার অনাগ্রহ এবং তার কাছে যে আর তেমন কোনো তথ্য নেই, সেটা বুঝতে পেরেই তাকে সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে বলি। মিঠু স্মৃতি হাতড়িয়ে জানান, মূল প্রেক্ষাগৃহটি ২৮ শতক জায়গার ওপর হলেও এখানে মোট জমি রয়েছে তিন বিঘার বেশি। ৯০০ আসনের এই প্রেক্ষাগৃহটি তিনি নামকরণ করেছিলেন মা হাসিনা বেগমের নামে। ‘হাসিনায়’ প্রথম প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের নাম রাম রহিম জন। চলচ্চিত্রটি ভালো ব্যবসা করেছিলো। শুরুর দিকে প্রেক্ষাগৃহে ৩৬ জন কর্মচারী কাজ করতো। ব্যবসাও খুব ভালো চলছিলো বলে জানান মিঠু। দাঙ্গা, সিপাহী, ত্রাস চলচ্চিত্রগুলো সেসময় টানা তিন মাস করে চলেছিলো। ‘হাসিনা সিনেমাহলে’ নাকি মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ নিয়ে যে চলচ্চিত্রগুলো আসতো সেগুলো ভালো ব্যবসা করতো। তখন একটা চলচ্চিত্র মুক্তি পেলে মিনিবাসের দুই পাশে মাইক ও পোস্টার লাগিয়ে পুরো নাটোরে প্রচারণা চালানো হতো। মিঠু বলেন, ‘এরপর ধীরে ধীরে ব্যবসা খারাপ হতে থাকলো। কর্মচারীও কমতে কমতে শেষ পর্যন্ত ১২ তে এসে থামলো। ২০০২ সালে আমরা সিনেমাহলটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলাম। শেষ সিনেমা ছিলো এ মন তোমাকে দিলাম ।’

যে গল্পের শেষ আছে

‘পৃথিবীটা নাকি ছোটো হতে হতে/ স্যাটেলাইট আর ক্যাবলের হাতে/ ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দি’ এই গানের মতো বর্তমান পৃথিবী সত্যি সত্যি বোকা বাক্সে বন্দি হয়ে গেছে। তফাৎটা কেবল বর্তমানের ‘বোকা বাক্স’ এখন বসার ঘরে নয়, সবার হাতে হাতে। যদিও এই বাক্স আর এখন বোকা নয়, এটা মানুষের তথ্য প্রাপ্তিকে যেমন সহজ করেছে, তেমনই মানুষকে ঠেলে দিয়েছে বিশ্বায়নের দিকে। আগে যে মানুষের বিনোদনের উৎস ছিলো পুঁথিপাঠ, কবিগান, বিয়ের গীত, যাত্রা, থিয়েটার, সেই মানুষই একসময় বিনোদনের খোরাক মেটাতে প্রেক্ষাগৃহে গেছে। সেই প্রেক্ষাগৃহের অবস্থা আজ ম্লান। শুরুতেই বলেছি, বন্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগ প্রেক্ষাগৃহ। নাটোরও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের অন্য অনেক জেলার মতো নাটোরও এখন প্রেক্ষাগৃহ শূন্য। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে প্রখ্যাত নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর কথা দিয়েই এই আলোচনার ইতি টানতে চাই--

... তারা ভাবছেন ভারতীয় ছবি এলেই তাদের সব সমস্যার সমাধান হবে, তাতে অন্যের সমস্যা যাই হোক। বলে নেওয়া দরকার, এই দাবি করা হচ্ছে মূলত সিঙ্গেল স্ক্রিন থিয়েটারগুলোকে বাঁচানোর জন্য।

তাহলে আমরা একটু খোদ ভারতের দিকেই তাকাই। দেখি আমাদের সিঙ্গেল স্ক্রিনকে বাঁচাতে যাদের সাহায্য নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে তাদের ওখানে সিঙ্গেল স্ক্রিনের কী অবস্থা। পশ্চিম বাংলাজুড়েই সিঙ্গেল স্ক্রিন থিয়েটার বন্ধের হিড়িক চলছে গত কয় বছর ধরেই। ২০১৫ সালে একযোগে চল্লিশটা সিঙ্গেল স্ক্রিন থিয়েটার বন্ধ হয়েছে পশ্চিম বাংলায়।

... এই হচ্ছে খোদ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা, যেখানে ভারতীয় ছবিই চলে, অন্য কিছু নয়। আমি জানি না বাঁচার জন্য পশ্চিমবঙ্গের ওইসব সিনেমা হলের মালিক কোন দেশের সিনেমা আমদানির দাবি তুলবেন!

লেখক : নাঈম রেজা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

nayemreza3@gmail.com

https://www.facebook.com/naimreza.naim

 

তথ্যসূত্র

১.  https://sarabangla.net/post/sb-231119/; retrieved on: 15.04.2019

২. ‘নাটোরের ১৯ সিনেমা হলের মধ্যে ১৬টিই বন্ধ’; দৈনিক আমাদের সময়, ২৪ মে ২০১৬।

৩. ‘নাটোরের ১৯ সিনেমা হলের মধ্যে ১৬টিই বন্ধ’; দৈনিক আমাদের সময়, ২৪ মে ২০১৬।

৪. ‘নাটোরের ১৯ সিনেমা হলের মধ্যে ১৬টিই বন্ধ’; দৈনিক আমাদের সময়, ২৪ মে ২০১৬।

৫.https://www.bd-pratidin.com/bd-pratidin-10-years-anniversary/2019/03/17/408712~; retrieved on: 01.05.2019

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন