Magic Lanthon

               

তানভীর শাওন

প্রকাশিত ০৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

অনলাইন প্লাটফর্ম

ভিডিওর উৎপাত আর কৌতূহলী মানবজন, নেপথ্যচারী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণমাধ্যম

তানভীর শাওন



‘ভিজ্যুয়াল কালচার’-এ মোড়া যুগটা যখন শুধুই ‘আমি’র

এই মুহূর্তে চারপাশে একটা দেখাদেখির সময় চলছে। কেউ একজন হয়তো কিছু একটা দেখাচ্ছে, তো অনেকে সেটা দেখছে। কিন্তু কী দেখানো সেটা মুখ্য নয়। কিছু একটা দেখতে পারাটাই মুখ্য। এলিজাবেথীয় যুগের সেই ‘রিডিং কমিউনিটি’ যখন আজ প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম, তখন মানুষ নেমেছে নিজে নিজেই একাকী রিডার হওয়ার এক কর্মযজ্ঞে। সবাই এখন একা একা পড়ে, চুপিচুপি আলাপচারিতা সেরে নেয়; ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন প্লাটফর্মে শুধু নিজেকেই দেখায়; আবার একা একা দেখেও। পুঁজির অসুস্থ বিকাশের ফলে মানুষ হয়ে যাচ্ছে আত্মসর্বস্ব। ফলে অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে মার্কসের ‘কাল্পনিক চাহিদা’ তত্ত্ব। মানুষ এই অযৌক্তিক, অসীম চাহিদা মেটাতে গিয়ে দায়সারাভাবে নিজেকে করে ফেলছে ভয়ঙ্কর রকমের একা। কারণ স্বল্পপুঁজি নিয়ে এতো চাহিদা মেটাতে গেলে কোনো প্রকারেই কোনো কমিউনিটি গড়ে তোলা সম্ভব নয় তার পক্ষে। তাতে করে কাঁধে ‘অহেতুক’ কিছু দায় চেপে যায়; অনেকের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়।

    এই ‘আমিযুগ’-এ (অনেকেই এই যুগে বেশ আত্মসর্বস্ব, তাই ‘আমি’ শব্দটা মুখ্য হয়ে পড়েছে) কেউ সে দায় নিয়ে ‘ভদ্রসমাজের’ কাছে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেবে না নিশ্চয়ই। হ্যাঁ, সত্যিই অবশেষে আমরা ‘জেনারেশন আমি’-তে পদার্পণ করেছি। সেলফি, উইফি, ফেইসবুকের মতো ‘সামাজিক’ মাধ্যমগুলো, ইউটিউবের মতো ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলো তার লক্ষণ। আধুনিক সব প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মানুষের মনে আত্ম-দেখনদারীর যে বাসনা সুপ্ত ছিলো এতোদিন, তারই অভাব পূরণে উদ্ভাবিত হয়েছে সেলফি। যেখানে মানুষ শুরু থেকে শেষে শুধু নিজেকেই দেখায়, অবশ্য শেষ যদি থাকে। একইভাবে ইউটিউবের মতো প্লাটফর্মেও মানুষ সেলফির থেকে ভয়াবহ আত্মবাদী হয়ে নিজেকে প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছে। খুলে নিচ্ছে নিজের নিজের একেকটা চ্যানেল। তাতে ছড়াচ্ছে নিজের খেয়ালমাফিক বানানো নানা ভিডিও। অর্থাৎ সবমিলিয়ে যে কালচারটা চলছে সেটাকে ‘ভিজ্যুয়াল কালচার’ বলা যায়।

     মিডিয়ার সেগমেন্টেশনের ফলে মানুষ এক স্মার্টফোনেই পাচ্ছে একযোগে টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা, ক্যামেরা, প্রেক্ষাগৃহসহ নানাবিধ ব্যবস্থা। ফলে চলচ্চিত্রের পাখির মতো মুক্ত উড়াল দেওয়ার বিকাশের পিছনে ‘ক্যামেরা আর ফিল্মের কালি-কলমের মতো সস্তা হওয়ার’ যে শর্তের কথা শুনেছিলাম, তা পূরণ হলেও চলচ্চিত্রের সেই মুক্তি ঘটলো কি না তা সহসা বলে দেওয়া যায় না। কারণ চলচ্চিত্র ভিজ্যুয়াল কালচারের একটা অংশ বটে, কিন্তু তা শিল্পের দাবি মেটাতে গিয়ে একটি আদর্শের জায়গা থেকে আত্মদেখনদারীকে প্রশ্রয় দিতে পারে না। সমাজের একটা বড়ো অংশ ঠিক যেভাবে যেটুকু হাস্যরস নেয়, বার্তা গ্রহণ করে, সর্বোপরি তাদের যতোটা বিনোদন চাই, সে সুস্থ কিংবা অসুস্থ হোক, শিল্পসম্মত হোক কিংবা না হোক, মোটাদাগে চলচ্চিত্র কিন্তু সেসবও অবিচ্ছিন্নভাবে যোগান দেওয়াকেও প্রশ্রয় দেয় না। যদিও এ নিয়ে চলচ্চিত্রে কোনো বিধিমালা নেই। তাই আজকাল চলচ্চিত্রে ঠিক তাই হচ্ছে, যা হওয়ার কথা ছিলো না!

    তাই একটা ‘সুন্দর’ সমাজে চলচ্চিত্র যেমন স্রোতের সঙ্গে বয়ে যেতে পারে, তেমনই একটা ‘অসুস্থ’ সমাজে প্রায়শই চলচ্চিত্রকে চলতে হয় উল্টো স্রোতে। এ রকম নানা বৈশিষ্ট্যে ভরপুর এই ভিজ্যুয়াল কালচার কিন্তু সমাজে উল্টো পথে, ভিন্ন মতে চলছে না। অথচ সমাজটাকে বাঁচিয়ে রাখতে কী গভীরভাবে ভিন্ন পথে চলতে হতো এই ভিজ্যুয়াল কালচারকে! তাই এটি সামনে কোন দিকে এগোবে, অদূর ভবিষ্যতে সমাজে এটি কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে বিস্তর ভাবার আছে বৈকি। ইদানীং ভিজ্যুয়াল কালচারের চালিকা হিসেবে কাজ করছে একটি বড়ো উপাদান; সেটি  ‘ভ্লগ’ ।

‘ভ্লগ’সংস্কৃতি

ভ্লগ(Vlog) শব্দটি ব্লগ-এর আরো শক্তিশালী, বর্ধিত রূপ। ব্লগে যেমন ব্যক্তি তার দিনলিপি লেখেন বা বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশিমতো কথা বলেন কিংবা সমালোচনা করেন, ঠিক একই কাজ ভ্লগ-এও করা হয়। তবে তা ওয়েবে লিখে নয়, ভিডিও বানিয়ে। অর্থাৎ ভ্লগ মূলত ‘ভিডিও ব্লগ’। আর এই কাজটি যারা করেন তাদের বলা হয় ভ্লগার। ইউটিউবার’রা (যারা ইউটিউবের জন্য নিজের উদ্যোগে ভিডিও নির্মাণ, সংগ্রহ ও প্রকাশ করে) বিশেষ একধরনের ভ্লগার। অন্যান্য ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যারা নিজেদের বানানো ভিডিও দাখিল করে চলেছে, তাদেরও কিন্তু বৃহৎ অর্থে ভ্লগার বলা যায়।

    ক্যামব্রিজ ডিকশনারি ভ্লগের ব্যাপারে বলছে, ‘Vlog; a video blog: A record of your thoughts, opinions, or experiences that you film and publish on the internet অর্থাৎ ব্যক্তির চিন্তা, মতামত, অভিজ্ঞতা ভ্লগে স্থান পায় এবং তা অবশ্যই ‘ফিল্মিং’ করতে হবে এবং ইন্টারনেটে প্রকাশ করতে হবে। এর মানে ভ্লগের নামেই আছে এর জনমণ্ডলে পৌঁছানোর এক ইঙ্গিত। কারো তৈরি কোনো ‘ফিল্ম’ ইন্টারনেটে দৃষ্টিগোচর না হলে, তা কোনোভাবেই ভøগ হয়ে ওঠে না। ভ্লগ-এ ‘টার্গেট অডিয়েন্স’ বলে কোনো কথা নেই, বরং অডিয়েন্স যেনো ভ্লগ-এর মধ্যে মিশে থাকা একটা ব্যাপার। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সংজ্ঞায় সচেতনভাবেই ‘ফিল্ম; শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। তার মানে প্রত্যেকটি ভ্লগ দেখতে গেলে, একভাবে ফিল্ম-ও হয়ে ওঠে; তাতে ফিল্ম-ধর্ম থাকে।

    ভ্লগ এর অর্থ নির্মাণে অন্যত্র বলা আছে, A video log. A journalistic video documentation on the web of a person's life, thoughts, opinions, and interests. A vlog can be topical and timeless, instructional and entertaining. The main thread is trying to communicate on a personal level with your audience.1   

এই উদ্ধৃতি অনুযায়ী ভ্লগ হলো সাংবাদিকতার ঢঙে তথ্যচিত্রের আকারে ভিডিও নির্মাণ। যেটা কোনো ব্যক্তি বিশেষের জীবন, চিন্তাভাবনা, মতামত ও আগ্রহের বিষয় ধরে তৈরি হয়। ভ্লগে প্রাসঙ্গিকতা থাকতে পারে, সাধারণের আগ্রহ আছে তেমন কোনো বিষয় ঘিরেও হতে পারে। অথবা এটি হতে পারে শুধুই বিনোদনমূলক। কিংবা সব সমসাময়িকতাকে ছাড়িয়ে এটি হতে পারে নিরন্তর কোনো গুরুত্বপূর্ণ, জ্ঞানমূলক বিশেষ এক টোটকা। অর্থাৎ ভ্লগ শুধু চটুল বিষয়গুলোই তুলে ধরে না, গভীর বিষয়ও ধারণ করে। ভ্লগ প্রচলিত গণমাধ্যমগুলোর মতো অডিয়েন্সের বৃহত্তর অংশকে একত্রে না ধরে, ব্যক্তিক পর্যায়ে গিয়ে যোগাযোগীয় কর্ম সম্পাদন করে। কেননা, ভ্লগ-এ উপাদান হিসেবে ব্যক্তি পর্যায়ের ছোটোখাটো বিষয়গুলো বেশি স্থান পায়।

    অথচ চলচ্চিত্রের মতো একটি শক্তিশালী মাধ্যমেরও টার্গেট অডিয়েন্স থাকে। একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা সব শ্রেণির দর্শকের জন্য চলচ্চিত্র বানায় না কিংবা সে আশাও করে না; তা সম্ভবও নয়। মোটাদাগে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগেই কিন্তু তার দর্শক নির্ধারণ হয়ে যায়। তার মানে চলচ্চিত্রের অডিয়েন্সের যে একটা সীমাবদ্ধতা আছে তা পরিষ্কার। কিন্তু বলতেই হয়, ভ্লগ-এর অডিয়েন্সগত কোনো সীমারেখা টানা নেই। কারণ, ভ্লগ জিনিসটার পুরো প্রকৃতিই অর্থাৎ এর ভিতরে কী থাকবে, থাকবে না এমন একটা বিষয়ও সংজ্ঞায়িত নয়। তাই এই ভ্লগ কারোরই নয়, আবার সবারই। তাহলে, যে জিনিসটা স্পষ্টতই কাউকে লক্ষ করে তৈরি নয়, অথচ যার যেভাবে সেটা চোখে পড়ছে, সে দেখে নিচ্ছে। ফলে এর একটা শীতল প্রভাব খুব গভীর থেকে সমাজের ওপর প্রভাব ফেলে এবং এর ফলে যেসব পরিবর্তন আসছে সমাজে, তা মনে হয় খোলা চোখে দেখার সময় এসেছে।

    ভ্লগ নেটিজেনদের কতোটা গা-ঘেঁষা একটা জিনিস হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা অনুমান করতে বিশেষ কিছু ভাবতে হয় না। ইউটিউবের মতো ভিডিওকেন্দ্রিক সাইটগুলোর ভ্লগ, ভিজিটরদের মনিটরজুড়ে ছড়িয়ে থাকে। তাই যে কারো সেসব দেখতে না চাওয়ার অভিপ্রায় থাকা সত্ত্বেও সেসব চোখে পড়ে। কখনো এক ভেলকিতে সেসব দেখা হয়ে যায়। তাই নেটিজেনদের ওপরে তার প্রভাব যে কতো গভীর তা বলা বাহুল্য। চারদিকে ভ্লগ-এর বহুল আয়তনিক যে বিকাশ ঘটে চলেছে, তা থেকে বোঝা যায়, মানুষ ঠিক বুঝে কিংবা না বুঝে ভ্লগ-এর গুনগুন শুনে চলেছে। ইন্টারনেটজুড়ে নানা প্লাটফর্ম ঘিরে থাকে নানারকম ভিডিও কনটেন্ট। কনটেন্টের আধেয় পরিলক্ষণে এখানে ইউটিউবকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল : কনটেন্টের ধরন

ইউটিউব চ্যানেলগুলো কখনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালিত হয়, কখনো ব্যক্তির দ্বারা। তবে ব্যক্তি মালিকানাধীন চ্যানেলই বেশি। কারণ ইউটিউবের ব্যবহারকারী মাত্রই নিজের একটি চ্যানেল খুলে নেওয়ার অধিকার থাকে। তবে ব্যবসায়ী চ্যানেলগুলোর বিভিন্ন রকমফের আছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের পণ্যের প্রচারণার জন্যই এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। অন্যদিকে অনেক বৃহৎ চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইউটিউবে তাদের চ্যানেল সক্রিয় রাখে। সেগুলোও প্রচারণাসর্বস্ব। তাতে করে তাদের নিজেদের চলচ্চিত্র, সঙ্গীত আসা-যাওয়ার খবরের পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখিয়ে থাকে তারা। কেননা তাদের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা থাকে অত্যধিক। ফলে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে বিজ্ঞাপন পরিবেশনের চুক্তি করে থাকে। তাদের বিজ্ঞাপনটি এসব চ্যানেলগুলো কতোবার দেখাতে পারছে তা মূল্যায়ন করে ইউটিউব তাদেরকে অর্থ দিয়ে থাকে। জনসাধারণ বিশেষত তরুণরা এই উপায়ে বিজ্ঞাপন পাওয়ার আশাতেই মূলত ইউটিউবে চলে আসছে; হয়ে যাচ্ছে একেকজন ইউটিউবার তথা ভ্লগার। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সবাই আসলে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে অর্থ আয়ের নিমিত্তেই এখানে আসছে। যদিও আত্মপ্রচার ও সামাজিক-রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিও উল্লেখযোগ্য কারণ। তবুও উপার্জনটাই মুখ্য। ফলে ইউটিউবাররা ‘ভিউয়ারস্’-এরও (ভ্লগাররা তাদের অডিয়েন্সকে এটা বলে সম্বোধন করে) নজর কাড়তে নানারকম চটকদার প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বিষয়কেন্দ্রিক ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করছে। ইউটিউবে প্রতিদিন যেসব ভিডিও আপলোড হয়, জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে সেগুলোকে ক্রমানুসারে উল্লেখ করলে দেখা যায় Product reviews (ইউটিউবার পণ্য কিনে সেটির ব্যবহারযোগ্যতা যাচাইয়ের পর তার ভিউয়ারস্কে ওই পণ্যটির সম্পর্কে নানা ধারণা দিয়ে থাকে অথবা ওই পণ্যের কোম্পানিও এটা করে থাকে), How-to’s/Tutorials (এসব ভিডিওতে বিভিন্ন ছোটোখাটো, উদ্ভাবনী কাজকর্মের নির্দেশনা দেওয়া থাকে), Vlog, Gaming, Comedy, Haul Videos (এ ধরনের ভিডিওতে ইউটিউবার তার সদ্য কেনা নানা জিনিস দেখিয়ে থাকে), Educational, Prank, Celebrity Gossip, Parodies,Self-Improvement, Covers,  Couple Vlog, Cooking সহ নানাকিছু।

    এছাড়া ইউটিউবে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে যোগ দিচ্ছে অসংখ্য ব্যবহারকারী, বাড়ছে ভিউয়ারস্, বাড়ছে ভিডিও। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে ইউটিউব নিয়ে করা একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ‘বর্তমানে ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩০ কোটি। প্রতি মিনিটে ৩০০ ঘণ্টা সময়সীমার ভিডিও এখানে আপলোড হচ্ছে। ব্যবহারকারীরা প্রতিদিন পাঁচ বিলিয়ন ভিডিও দেখে থাকে। প্রতিদিন এই ওয়েবসাইট ভিজিট করে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ভিজিটর। ব্যবহারকারীদের প্রতি ১০ জনের আটজনই ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী। প্রত্যেকে গড়ে প্রতিদিন ৪০ মিনিট ইউটিউব দেখে থাকে। সময়টা বছরে ৫০ শতাংশ হারে বেড়ে চলেছে।’ এছাড়া অ্যালেক্সার র‌্যার্কিংয়ে সারাবিশ্বের ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইউটিউব। তবে তরুণ ব্যবহারকারীদের ইউটিউবে কাটানো সময়টা আরো বেশি। তাই যে ভিডিওগুলো প্রতিদিন আপলোড হচ্ছে, ভিজিটরদের রেটিনায় আলো ফেলছে, মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলছে, সেসবের শিল্পমান তথা সার্বিক মান নিয়ে বোঝাপড়ার থাকে অনেক কিছু।

বিনোদন ক্ষুধা মেটানোর কোনো ব্যবস্থাই কি নেই এই উন্নয়নের ভূমিতে?

নজরুল একদা বলেছিলেন, ‘আমরা পেটের ক্ষুধা স্বীকার করে নিয়ে মাঠের পর মাঠ ধানচাষ করে অরণ্যে পরিণত করি অথচ মনের যে সৌন্দর্য্যক্ষুধা, তা মেটাতে একটা গোলাপ গাছও রোপন করি না।’ বর্তমান প্রজন্ম অনেকটাই সৌন্দর্য্যবিমুখ। বিনোদন ক্ষুধা তাদের মধ্যে আছে। তবে তা জাগতে দেয় না। অন্য কারো মধ্যে সে ক্ষুধার বহিঃপ্রকাশ ঘটলেও সেটাকে তারা পাগলামি বা বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেয়। বিনোদন ক্ষুধা মেটানোর উদ্যোগ, সে সত্যিই দুরাশা এই দেশে। চলচ্চিত্র, থিয়েটার, সঙ্গীত, সাহিত্য সবকিছুই যে সময়টিতে পুঁজির খপ্পরে ধরাশায়ী, তখন সমাজের একটা অংশের বিনোদনে ক্ষুধাতুর হয়েও অনাহারী মননে দিন কাটাতে হচ্ছে। এর একটি কারণ এই শিল্পমাধ্যমগুলোর মুনাফা-কেন্দ্রিকতা। এই মাধ্যমগুলোর পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগে পুঁজিপতিরা এসবকে শেষমেষ একেকটা ব্যবসায় হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করছে। তারা ভুলে যাচ্ছে, সমাজের প্রতি এই শিল্পমাধ্যমগুলোর দায়-দায়িত্ব। তাই বাজারে আসা নতুন এসব শিল্পজাত ফসল বেশিরভাগই আসছে পঙ্গু হয়ে। তাতে সেটুকুই থাকছে, যা শুধুই মানুষকে সস্তাভাবে বিনোদিত করে।

    সাম্প্রতিককালে, তরুণরা বই পড়ে কিন্ডলে’তে (অনলাইনে কিংবা অফলাইনে ট্যাবলেটে বই পড়ায় সহায়ক একটি বিশেষ অ্যাপ্লিকেশন), গান শোনে আইটিউন-এ (মিউজিক সম্পর্কিত একটি ওয়েবসাইট), চলচ্চিত্র দেখে নেটফ্লিক্স-এ (একটি ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম)। বলা বাহুল্য, এ সবে টাকা খরচ হয় যথেষ্ট। এই তরুণদের অনেকেই যে ধনিক শ্রেণির ‘দুলাল’দের প্রতিনিধিত্ব করে তা খানিকটা বোঝাই যায়। আবার মধ্যবিত্ত শ্রেণির কিছু তরুণও এই ‘দুলাল’ সাজতে চায়। কারণ মধ্যবিত্ত তরুণদের একটি বিশেষ শ্রেণি বর্তমানে সমাজে অনেকটা অসংজ্ঞায়িত ভূমিকা পালন করছে। এদের অনেকে অদ্ভুত রকমের অপরিণামদর্শী। তাদের সাধ্যের গণ্ডিতে অর্থনৈতিক কাঁটাতারের সীমারেখা ঝোলানো থাকলেও তাদের বেশিরভাগই সাধের জোরে ওটা ফুঁড়ে বেরোতে চায়। তাদের হাতে হয়তো বইপত্র কেনার টাকা নেই, কিন্তু স্মার্টফোন কিনতে চায়! তারপর ইন্টারনেট খরচ, অনলাইনে দাপিয়ে বেড়ানো তো আছেই। আর সেজন্যই হয়তো নেটফ্লিক্স বিগত বছরে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে গেছে কোটি কোটি টাকা। দিন দিন এদেশে তাদের ব্যবসা বেড়েই চলেছে।

    কিন্তু তারপরও কথা থাকে। সমাজে ‘দুলাল’-এর থেকে ‘দুখু’-ই তো বেশি। তাহলে সিংহভাগ দুখুদেরও যে বিনোদনক্ষুধা রয়েছে, তা তারা মেটাবে কী করে! তাদের তো এতোসব পেইড ওয়েবসাইট পোষার মতো টাকাকড়ি নেই। তারা এসবেও যেতে পারে না, আবার শত টাকা খরচ করে প্রেক্ষাগৃহ-সিনেপ্লেক্সেও ঢুকতে পারে না। আসলে আবহমানকালের সেই প্রেক্ষাগৃহগুলো উঠে যাওয়ার পর বর্তমানে যে সিনেপ্লেক্স গড়ে উঠেছে/উঠছে সেগুলো দেশের প্রধান দর্শকশ্রেণি অর্থাৎ নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তদের জন্য ক্রমশই প্রতিকূল হয়ে উঠছে। পপকর্ন সংস্কৃতির ধারক এসব সিনেপ্লেক্সে একটি চলচ্চিত্র দেখতে নিমেষেই হাজার টাকা উড়াতে হয়। তাই অনেকে চাইলেও এ পথে ভিড়তে পারে না। এছাড়া দেশের মঞ্চনাটকের অবস্থাও তথৈবচ। দিনকেদিন নাটক প্রদর্শনীও কমে যাচ্ছে। সামগ্রিক সংস্কৃতির মান ধসের ফলে থিয়েটারগামী মানুষের সংখ্যা আজ হাতেগোনা। তাছাড়া থিয়েটারে জড়িত শিল্পীরা তাদের চমৎকারিত্ব দেখিয়ে নতুন তরুণ দর্শককে টানতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে এই দুখুর দলের অনেকেই বর্তমানে অপেক্ষাকৃত সহজ আর সস্তা অনলাইন স্ট্রিমিং সাইট ইউটিউবে এসে ঠাঁই নিচ্ছে। মোদ্দাকথা, অধিক মানসম্মত বিনোদন সাইটগুলো পেইড সিস্টেম থাকায় এবং অন্যান্য ব্যবস্থাও হাতের নাগালে না থাকায় ইউটিউব ও সামাজিক মাধ্যমগুলোই আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    আর এই ইউটিউবের মতো মাধ্যমগুলোতে আসলে কী নেই তা খুঁজে বের করা মুশকিল। আধুনিক জীবন তো আছেই, যাবতীয় জীবনের জন্য লাগসই যা কিছুর অস্তিত্ব এ দুনিয়ায় আছে তা নিয়ে দিক নির্দেশনা, ধারণা তার সবই আছে এই ইউটিউবে। শুধু সঠিক কি-ওয়ার্ড চেপে সার্চ করার দেরি, সে বিষয়ের সমাধান নিয়ে হাজারটি সাজেশন চলে আসতে একটুও দেরি নেই। প্রযুক্তিগত জিনিসের নতুন উদ্ভাবনী জ্ঞান চান কিংবা নতুন কোনো ভাষা শিখবেন, সে বিষয়ে চোখের পাতা ফেলতেই পেয়ে যাবেন অসংখ্য ভিডিও। জ্ঞান চর্চা বলি কিংবা কোনো প্রশিক্ষণ, তা এখন আর সার্টিফিকেট নির্ধারণ করে না, এটা কড়ায় কড়ায় টের পাইয়ে দিচ্ছে এই মাধ্যমগুলো। সত্যিই তো, কী নেই এতে! এভাবেই সবকিছুর যোগান দেয় এরা। তবে যেসব ভিডিও ইউটিউবজুড়ে থাকে, তার অধিকাংশের ভাষা কিংবা সংস্কৃতিজাত উপস্থাপন কিন্তু সাধারণের ভাষা বা সংস্কৃতিতে সবসময় খাপ খায় না। ফলে এসব ভিডিও দেখে উপকৃত হওয়ার মতো লোক কম, কারণ অনেকেই এই বাধাগুলো অতিক্রম করে ভিডিও দেখতে উদ্যোগী হয় না। প্রশ্ন ওঠে, দেশের মানুষের জন্য দেশের মানুষের তৈরি তথাকথিত উপকারী কনটেন্ট কতোটা নির্মাণ হচ্ছে, যেগুলো এসবের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে?

    বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংবাদমাধ্যম, চলচ্চিত্র কিংবা টেলিভিশনের মতো পুঁজিবাদী গণমাধ্যমগুলো ভিন্নমত কিংবা সাধারণের রাজনীতি বা সমাজ সচেতনতাকে জাগ্রত হতে দেয় না। তারা অসঙ্গতিতে পূর্ণ বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে যেকোনোভাবে টিকিয়ে রাখতে চায়। যাতে মানুষ রাজনীতি সচেতন হয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার দাবি না করে বসে। এছাড়া ক্রমাগত যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে মুনাফা টিকিয়ে রাখতে তারা ‘অসুস্থ’ সংস্কৃতির যোগান দেয়। অর্থাৎ তারা প্রত্যেকে হয়ে ওঠে ‘সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রির’ একেকটি উৎপাদ। সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রি হলো ‘বানানো সংস্কৃতি’, যা বাইরে থেকে আরোপিত এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও মতাদর্শে দীক্ষিত। আসলে সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রি সংস্কৃতির নামে তৈরি করে এমন কিছু বিনোদন যা আর দশটি পণ্যের মতো বিপণন করা যায়। তাই ইউটিউব ছাড়াও যাবতীয় গণমাধ্যমগুলো মূলত এই সংস্কৃতির বিপণনের মাধ্যমে মুনাফার বিকাশ নিশ্চিত করে বিদ্যমান পুঁজিতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে। আর এ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া জনসাধারণ তাদের কাছে নিছক এক পরিসংখ্যানিক সত্ত্বা মাত্র। এর একটুও বেশি কিছু নয়। তাই ইউটিউবের ভিডিওগুলো শিল্পসম্মত হলো কি না তা মুখ্য নয়; বেশিরভাগ জনসাধারণের রুচিবোধে খাপ খেয়ে তা যেনো অধিক মুনাফা আনতে পারে আর বিদ্যমান সমাজকাঠামোকে ঠিক এভাবেই এগিয়ে নেয় এটাই মূল কথা। কারণ পুঁজিবাদী এসব প্রতিষ্ঠান শিল্প বোঝে না, বোঝে ব্যবসা।

    এজন্যই ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের বিখ্যাত দুই তাত্ত্বিক অ্যাডোরনো ও হর্কহেইমার বলেন, “‘সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রি’ বিনোদনের নামে বিরাজমান সমাজকে ‘স্বাভাবিক’ বলে প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে নানা চলতি ঘটনা-দৃশ্যকল্প গণমাধ্যমে এমনভাবে অহরহ পুনরুৎপাদন ও পুনরাবৃত্তি করতে থাকে যাতে মানুষ সেগুলোকেই স্বাভাবিক ধরে নেয়।” এর ফলে সমাজে বিদ্যমান যাবতীয় শোষণ, অসঙ্গতি, ঘটনার বিকৃত উপস্থাপন কিংবা আরো সিরিয়াস কোনো বিষয়ও হাস্যরসে পরিণত হয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের টিভি নাটক বা চলচ্চিত্রে, কাজের মেয়েদেরকে হাসি-ঠাট্টার চরিত্রের মাধ্যমেই উপস্থাপন করা হয়। অথচ ওই চরিত্রগুলো সবসময় মোটেই হাস্যরস যোগানোর ন্যারেটিভে অবতীর্ণ হয় না। তা সত্ত্বেও এইসব নাটক-সিরিয়াল জনমণ্ডলে খুবই জনপ্রিয়। কেননা এতোদিনে সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রির ঢালাও বর্ষণে জনসাধারণের রুচিবোধ সস্তা ও একাট্টা করে ফেলা হয়েছে। ফলে এ রকম অসঙ্গতি তাদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ বলেই মনে হয়। বৃহত্তর অর্থে তাদের প্রাপ্য যাবতীয় রাজনৈতিক অধিকার বোধও তারা এভাবেই হারিয়ে ফেলে। তারা যে শোষিত হচ্ছে, সেটা তাদের বোধগম্যই হয় না। নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমের অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে ইউটিউব ভিডিওর অবস্থা যে তথৈবচ, তা বলাই বাহুল্য। ফলে মানুষের মধ্যে জন্মাচ্ছে একধরনের ‘অসুস্থ’ বিনোদনক্ষুধা। কিছু মানুষ কিন্তু ঢালাওভাবে নয় বরং সচেতনভাবেই শাসক কিংবা পুঁজিপতিদের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন কিছু শুনতে, বলতে বা দেখতে ইন্টারনেটে নানা বিকল্প মাধ্যমের খোঁজে চলে আসছে।

    উপরের আলোচনার অর্থ হলো, নানাভাবে সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রির যোগানদার হলেও ইউটিউব, ফেইসবুকের মতো মাধ্যমগুলো কিন্তু এই সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রির কূটচাল থেকে বেরিয়ে ভিন্ন কথা বলার ক্ষমতাও রাখে। কারণ ফেইসবুক কিংবা ইউটিউব সর্বাপেক্ষা বড়ো শেয়ারিং ওয়েবসাইট হলেও একটি কনটেন্টও এরা নিজেরা তৈরি করে না। অর্থাৎ এর ব্যবহারকারীদের ভিতরেই একদল বানায় আর একদল তা দেখে। এই বিকল্প মাধ্যমগুলো তাই হয়ে উঠতে পারে কোনো আন্দোলন, মানুষকে কোনো বিষয় জানানোর গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাতে দেখা যায়, এগুলোর লাগসই ব্যবহার করে আন্দোলনকারীরা সারাবিশ্বের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবহারকারীরা ঠিক কতোটা মানসম্মত কিংবা কার্যকর কনটেন্ট বানাচ্ছে? তা নিয়ে ভাবাটা এই সময়ে জরুরি বটে। কেননা, দিনশেষে জনগণ কী দেখছে সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

    ৬০ কিংবা ৭০-এর দশকে এদেশীয় চলচ্চিত্রে মোটামুটি একটি মান বজায় ছিলো বলে মধ্যবিত্ত দর্শক তা দেখেছে এবং সেটা অবশ্যই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে। কিন্তু ৮০’র দশকের প্রারম্ভে টিভি ও ভি সি আর-এর ব্যাপক চল শুরু হয়। ফলে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তের অনেকেই প্রেক্ষাগৃহে যাওয়া কমিয়ে দেয়। এদিকে প্রেক্ষাগৃহের ওই ফাঁকা স্থানটি কিন্তু ফাঁকা থাকেনি। সেখানে খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ কিংবা কমবয়সি তরুণেরা ঢুকে পড়ে। এ দুই শ্রেণির সাংস্কৃতিক বোধ খুব বেশি জাগ্রত নয়। এ সুযোগ নিয়ে প্রথমত, ওই সময়ের নির্মাতারা চলচ্চিত্রের প্রথাগত শৈল্পিক মান থেকে কোথাও একটু সরে আসে। তারা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ঝুঁকে পড়ে অতিবিনোদন যোগাতে। এ ধারাবাহিকতায় ৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে নির্মাতাদের অতিবিনোদন দেওয়ার এই প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নেয়। ফলে এইসব চলচ্চিত্রে যৌন সুড়সুড়ি তো ছিলোই, পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের তারা নানারকম যৌন দৃশ্য সম্বলিত ‘কাটপিস’ দেখাতে শুরু করে। এ ধারা চলে ২০০৬-২০০৭ অবধি। ফলে এ সময়টায় প্রেক্ষাগৃহ নারী-দর্শক পুরোপুরিই হারিয়ে ফেলে। পরে সেইসব নারী টেলিভিশনে স্যাটেলাইট চ্যানেলে অভ্যস্ত হতে থাকে।

    এরপর প্রেক্ষাগৃহবিমুখ এই দর্শকের একটি বড়ো অংশ আর মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী পুরুষের একটি অংশের বিনোদন কেন্দ্র হয়ে ওঠে চায়ের দোকানগুলো। আরো পরে হাতে হাতে মোবাইল ফোনসেটে চলচ্চিত্র দেখার সংস্কৃতি চালু হলে সে ধারাও টেকেনি। তারপর চল হয় ইন্টারনেটের। বর্তমানে তরুণদের হাতে হাতে চলে এসেছে ইন্টারনেট সংযোগযুক্ত স্মার্টফোন। ফলে যে ‘কাটপিস’ দেখিয়ে নিম্নবিত্ত দর্শক ও তরুণদের ধরে রাখা হয়েছিলো তারাও প্রেক্ষাগৃহ বিমুখ হয়। কেননা ওরকম শত শত ‘কাটপিস’ এখন তরুণদের পকেটে পকেটে ঘোরে। ফলে তারা আর ওসব দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যাবে কেনো! তাছাড়া সবমিলিয়ে অন্য কোনো স্বার্থ না থাকলেও দর্শক একটি শিল্পমানহীন আর অন্তঃসারশূন্য চলচ্চিত্র দেখতেও প্রেক্ষাগৃহে যাবে কেনো! ফলে সব শ্রেণির দর্শক হারিয়ে এদেশের প্রেক্ষাগৃহ ব্যবস্থাপনা হয়ে গেলো ‘আধুনিক আলাদিনের প্রদীপ’। কিন্তু তা ঘষলে আর দৈত্য বেরোয় না।

    টেলিভিশন যখন পুরোপুরি স্যাটেলাইট চ্যানেলের দখলে, তখন বিনোদনভূক মানুষ এটাতে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক আদর্শের ধারক। ফলে তাদের মনোযোগ আর দর্শককে বিনোদিত করার দিকে নেই। যেকোনো অনুষ্ঠানে এখন এতোই বিজ্ঞাপন সম্প্রচারিত হয় যে, দর্শক অনুষ্ঠান দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এছাড়া অনুষ্ঠানগুলোর শিল্পমান নিয়েও অনেক দর্শকই সন্তুষ্ট নয়। এর ফাঁকে ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর একদিকে যেমন অনুপ্রবেশ ঘটছে, তেমনই এগুলো বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। এর কারণ অবশ্য চ্যানেলগুলোর অসাধারণ বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনা এবং ডেইলি সোপ অপেরার ‘চমকপ্রদ’ আধেয়। এই চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপন দৌরাত্ম্য মোটামুটিভাবে বাংলাদেশের থেকে কম। ফলে দর্শক বিশেষত নারীরা এসব চ্যানেলের অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

    আধুনিককালে প্রতিটি পরিবারে সংস্কৃতি ও বিনোদনের চর্চায় নানা ভিন্নতার দেখা মিলছে। আর এই ভিন্নতার কদর্য চেহারা উন্মোচন করেছে তাত্ত্বিকদের দেওয়া ‘লিভিং টুগেদার সেপারেটলি’ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব মতে, একই বাড়িতে বাবা দেখছে নিউজ চ্যানেল, মা দেখছে সোপ অপেরা। আর সন্তান? সে এগুলোর কোনোটাই না দেখে চলে যাচ্ছে ইন্টারনেটে। সেখানে নানারকম সাইটে চলছে তার বিচরণ। ফলে দেখা যাচ্ছে একই বাড়িতে ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে একাধিক টেলিভিশন, ল্যাপটপের উপস্থিতি। তাছাড়া বড়ো কথা হলো, সম্পূর্ণ ভিন্ন রুচিবোধ সম্পন্ন অন্তঃকরণ নিয়ে কয়েকটা মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেও কতোটা মেরুকরণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ফলে পারিবারিক অশান্তি তো বাড়ছেই, সঙ্গে এসব একাকী মানুষের চাহিদার যোগান দিতে গিয়ে পুঁজি ঠিকই ফুলে ফেঁপে উঠছে। এছাড়া মানুষ এখন আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা চাইলেই এখন চলচ্চিত্র দেখার সময় জোগাড় করে উঠতে পারে না। তারা খুব কম সময়ে প্রতিদিনের হালচাল কিংবা পরিস্থিতি পত্রিকা থেকে জেনে নেয়। এর বাইরে বিনোদন বলতে হঠাৎ সোস্যাল সাইট ঘুরে আসা কিংবা ইন্টারনেট থেকে কিছু একটা দেখে নেওয়া। ফলে দর্শকের অনেকের গন্তব্য হয়ে উঠছে ইউটিউবের মতো নানা মাধ্যম। তাই ইন্টারনেটের উক্ত কনটেন্টগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

তাহলে তরুণদের গন্তব্য!(?)

‘সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না; এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে। ... সুতরাং তাহার চেহারা এবং ভাবখানা অনেকটা প্রভুহীন কুকুরের মতো হইয়া যায়’--রবীন্দ্রনাথ বয়ঃসন্ধিকালে উপনীত কিশোরের সমাজবিচ্ছিন্নতা আর খাপছাড়া প্রকৃতি বোঝাতে এ কথা বলেছিলেন ‘ছুটি’ গল্পে। বর্তমান প্রজন্মের বয়ঃসন্ধি পেরোনো নানা তরুণের জন্যও এ কথাগুলো আজও সমান যৌক্তিক। তারাও আজ দারুণ রকম খাপছাড়া। তাদের বড়ো একটা কোথাও যাওয়ার নেই। গ্রাম্য তরুণরা যথাতথা আর শহুরে তরুণরা তো আজকাল ভীষণ রকম একঘেয়ে জীবনে অভ্যস্ত। তারা বাবা-মা, শিক্ষকের নজরদারির মধ্যে একরকম খাঁচার হরিণটি হয়ে আছে। তাদের নেই কোনো খেলার মাঠ, নেই কোনো খোলা হাওয়ার প্রান্তর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত অনেক তরুণই আত্মপক্ষ সমর্থনে বলে থাকে, তারা ফেইসবুক কিংবা টুইটারে প্রেম করে বেড়ায় না। বরং তারা নাকি এখানে পুরো দুনিয়াটার অনেক কিছু খুঁজে পায়। এ থেকে বোঝা যায়, তাদের করার যেমন কিছু নেই, কোথাও যাওয়ারও নেই। তাদের জন্য সাজানো গোছানো বিনোদন ব্যবস্থা তো নেই-ই। ফলে তারা করবে কী! অসহায় একটি অংশ মাদক বেছে নিচ্ছে। আর একটি অংশ করছে একদম বিচ্ছিন্ন একাকী জীবনযাপন। পরিণামে বেড়ে যাচ্ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। কারণ তাদের ঐকান্তিক কথাগুলো বলারও কেউ নেই।

যখন ‘ভ্লগার’ এদেশের তরুণরা

বাংলাদেশে অনলাইন যতোই সর্বস্তরের এক নিত্য ব্যবহার্য জিনিস হয়ে উঠছে, ততোই বাড়ছে ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা। অনলাইনে অনেকে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে এলেও একটি বড়ো অংশই কিন্তু সময় কাটাতে অথবা যোগাযোগ রক্ষার্থেই আসে। তবে প্রান্তিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অনেকটা কৌতুহল থেকেই। তারা মূলত অনলাইনে অংশ নিয়ে কিছু ‘ভালো’ সময় পার করতে চায়। সারাদিন যে লোকটা এই যান্ত্রিক সভ্যতার দ্বারা নিতান্তই পেটের দায়ে পিষে যায়, সে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় একটু ভালো সময় কাটাতে চাইবেই। তাছাড়া, যে ছেলেটা সারাদিন ওই একঘেয়ে বাজারি পড়ালেখা করতে করতে বিরক্ত, সে-ও মাঝেমধ্যে ফাঁকি দিয়ে অনলাইনে ঢু মারে। আর ইন্টারনেটে আসা এ দলের অধিকাংশই ফেইসবুক ব্যবহার করে, গান শোনে, নানারকম ভিডিও দেখে। সেজন্য তারা ইউটিউবের মতো প্লাটফর্মকে সাধারণত বেছে নেয়। এর বাইরে একটা অংশ কিছু প্রয়োজনীয় কাজও করে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সম্প্রতি ফেইসবুক, ‘ওয়াচ’ নামের যে ভিডিও স্ট্রিমিং অপশনটি চালু করেছে সেটিও ব্যাপক জনপ্রিয় হচ্ছে।

    এই যে একটা দ্রুতগতি নিয়ে ইউটিউব ব্যবহারকারী বাড়ছে, তাতে প্রত্যেকটি ভিডিওর ভিউয়ারও বাড়ছে। ফলে এরই মধ্যে অনেক কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণ নিজস্ব চ্যানেল খুলে নিয়ে তাতে নিজের করা নানা ভিডিও আপলোড করছে। ভিডিও সাইটের জন্য নিয়মিত ভিডিও তৈরি করেন, এমন একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর কাছে ‘কেনো এইসব ভিডিও বানান?’ জানতে চাইলে তিনি সোজা উত্তর দেন, ‘টাকার জন্য।’ এমনকি তার বলার ধরনে একধরনের একাগ্রতা লক্ষ করা যায়। এরপর ‘টাকা ছাড়াও তো অনেকে নিজস্ব খ্যাতি, পরিচিতি কিংবা নানা অভিপ্রায় নিয়ে প্রচারণার জন্য এসব বানাচ্ছে। তার লক্ষ্য শুধুই কি অর্থ উপার্জন?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, সাধারণত অনলাইনে যেসব ভিডিও তরুণরা পোস্ট করে, তার দুটি নিস (Niche) আছে। একটি ফেইসক্যাম (যেখানে ভিডিওমেকার নিজে হাজির হয়), অন্যটি নন-ফেইসক্যাম (যেখানে ভিডিওমেকার নেপথ্যে থেকে শুধুই কৌতুহলাশ্রয়ী তথ্য প্রদান করে)। প্রথমটির জন্য দরকার হয় ভালো চেহারা, ভাষাগত জ্ঞান, উপস্থাপন দক্ষতা, দামি ক্যামেরা, বিভিন্ন চমকপ্রদ জায়গায় ভ্রমণের জন্য অর্থনৈতিক প্রস্তুতিসহ নানাকিছু। আর দ্বিতীয়টির জন্য এসব দরকার হয় না। ফলে অবধারিতভাবেই ফেইসক্যামে অর্থ উপার্জন ছাড়াও নিজেকে প্রদর্শন করে খ্যাতি আদায়ের একটা প্রত্যাশা চলে আসে। আর তার মতো যারা নন-ফেইসক্যামে আড়ালে থেকে ভিডিওর মাধ্যমে তথ্য দিয়ে থাকে তারা শুধু অর্থনৈতিক লাভটাই দেখে। কিন্তু তাদের এসব ভিডিও মানুষ কেনো দেখে? এ বিষয়ে অবশ্য বিশাল ব্যাখ্যা দেন ওই শিক্ষার্থী। বলেন, ‘মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতি মানুষ আস্তে আস্তে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে, কিন্তু আমরা যারা অ্যামেচার, তাদেরকে দর্শক বিশ্বাস করে। জনসাধারণের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি ধারণা কিন্তু রয়েছে, তরুণরা কোনো একটি ঘটনা সরাসরি ভিডিও করে (Raw Footage) অনলাইনে আপলোড করে থাকে কিংবা তারা এডিটিং করে কম। সম্ভবত দর্শকের আর একটি ধারণা থাকে, তারা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে এই ভিডিওগুলো ছাড়ছে না কিংবা এই ভিডিওমেকাররাও যে টাকা উপার্জন করে তা নিয়ে দর্শক ওয়াকিবহাল নয়। তাই তারা আমাদের ভিডিও দেখে থাকে। এছাড়াও থাম্বনেল (ভিডিওর কভারে থাকা ছবি; ভিডিওতে ঢোকার আগে যে ছবি দিয়ে তারা দর্শক আকৃষ্ট করে থাকে) আর টাইটেল (ভিডিওর নাম) বলে যে দুটো অপশন আছে, সেগুলোও আমাদেরকে দর্শক টানতে সাহায্য করে। এগুলোর বিপরীতে আমরা কখনো কখনো দর্শকের বিশ্বাস অর্জনে চ্যানেল বা পেইজ খুলে থাকি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো নাম দিয়ে, ব্যক্তির নামে নয়। কারণ দর্শকরা কখনো কখনো ব্যক্তির মতোই প্রতিষ্ঠানকেও মূল্যায়ন করে থাকে। আমাদের চ্যানেলগুলো প্রতিষ্ঠানের মতো দেখায়, যদিও তা কোনো প্রতিষ্ঠান নয়।’

    শেষোক্ত কথায় বোঝা যায়, স্বাভাবিকভাবেই তাদের ভিডিওর চটুলতা আর সস্তা রসিকতায় আকৃষ্ট হয়ে সাধারণ দর্শকের একটি বড়ো অংশ সেসব দেখছে। কেননা সাধারণ একজন লোকের একটি ভিডিওর শিল্পমান কিংবা সার্বিক বার্তা বিবেচনা করার মতো অবকাশ বা ইচ্ছে কম থাকে। আগেই বলা হয়েছে, মানুষ এখন অনেক ব্যস্ত। তাছাড়া ওই শ্রেণিটির একাংশ এইসব মান বিবেচনা করার জন্য সচেতনও নয়। ফলে যা হচ্ছে, এই তরুণদের বানানো এসব ভিডিও ভিউয়ারস্ বিবেচনায় জনপ্রিয় হচ্ছে। এতে ইউটিউব থেকে বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের পথ খুলে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তি প্রসঙ্গে ওই শিক্ষার্থীর থেকে জানা যায়, একটি চ্যানেল খুললেই এবং যতো ভালো ভিডিও বানানো হোক না কেনো, তবুও অর্থ আয় সম্ভব নয়, যদি না কিছু শর্ত পূরণ হয়। ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন পেতে গেলে কোনো পেইজে ১০ হাজার ফলোয়ার, ৩০ হাজার মিনিট ওয়াচটাইম, পেইজের মেয়াদ এক মাস হতে হবে। এ ব্যাপারে তার কাছে আরো জানা যায়, একজন অ্যামেচার পেইজের স্বত্বাধিকারী নাকি এই বিশাল ওয়াচটাইমে পৌঁছানোর জন্য দর্শকের কৌতুহলটা কাজে লাগান। যেমন, অনেক ভিডিওতে দেখা যায়, ‘পৃথিবীর মানুষখেকো ১০টি গাছ’, ‘সেরা ১০ ধনী দেশ’, ‘১০টি ভুতুড়ে জায়গা’সহ এ রকম নানা চমকপ্রদ টাইটেল। আর এই ভিডিওগুলোর অধিকাংশই তারা ইংরেজি বা হিন্দিভাষী কোনো চ্যানেল থেকে নিয়ে বাংলায় ডাবিং করে। এ রকম কয়েকটি ইউটিউব চ্যানেলের নাম বক্সটিউব, ফানিফ্রগ, মায়াজাল, এন এস টি ভি। এই কাজে তারা যে কপিরাইট ভঙ্গ করে সেকথাও বলা বাহুল্য।

    তাছাড়া এগুলোর তথ্যগত সঠিকতা নিয়ে তারা অনেক সময় খোঁজ না নিয়েই নিশ্চিত থাকে কিংবা আপগ্রেড হওয়া তথ্যের ব্যাপারে তারা সতর্ক নয়। এসব ভিডিওতে ব্যবহৃত তথ্য কতোটা নির্ভরযোগ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশিরভাগ তথ্য মোটেও নির্ভরযোগ্য নয়। এ নিয়ে তার যুক্তি হলো, ‘এগুলো ভুল হলেও ক্ষতি নেই। দর্শক বড়ো কোনো বিপদে পড়বে না। কেননা এগুলো ইস্যুভিত্তিক নয়।’ তার মতে, ইস্যুভিত্তিক কাজের সময় তরুণরা আইনি জটিলতা নিয়ে ভয়ে থাকে। কিন্তু তারপরেও তারা ওই ফলোয়ার আর নির্দিষ্ট ওয়াচটাইম পূরণে (ঠিক যতো সময় ভিডিওগুলো দর্শক দেখেছে) নানারকম অপকর্ম চালাতেই থাকে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও জনমনে ক্রিয়াশীল কয়েকটি চুলকানিকে পুঁজি করে আমার ভিডিওর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াই। এখানে ধর্ম, রাজনীতি, যৌনতা এই তিনটি বিষয়কে আমি আমলে নিই। এগুলোর প্রতি মানুষের যে আগ্রহ, কৌতুহল কিংবা সংবেদনশীলতা আছে, তা আশ্রয় করেই আমি ভিডিও বানাই।’

    বোঝা যায়, অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এই ইউটিউবাররা অতিরিক্ত ভিউ পেতে ভিডিওগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক প্রোপাগান্ডা, গুজব ছড়াতেও দ্বিধা করে না। তারা হয়ে উঠছে অপরিণামদর্শী। সব থেকে ভয়ানক ব্যাপার হলো, ওই শিক্ষার্থীর মতো অনেকেই মনে করে, তারা এসব করে সমাজের কিছুটা হলেও উপকার করছে। তার মানে তারা তাদের সমস্ত ভুলের উর্ধ্বে গিয়েও কাজটিকে মোটামুটিভাবে উপকারী একটি কাজ ভাবে। আর ওই ভ্লগার তো একপর্যায়ে কথাচ্ছলে বলেই ফেললেন, তার কাজগুলো নিয়ে তিনি আশাবাদী। তিনি বিশ্বাস করেন, তার মৃত্যুর পরেও লোকে যুগ যুগ ধরে এই ভিডিওগুলো দেখবে। এভাবে নানা অলীক ভাবনায় ডুবতে ডুবতে তার মতো অনেক যুবক শেষমেষ হয়ে উঠছে কালচার ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদক। তারা সস্তা হাস্যরসের যোগান দিতে গিয়ে অনেক সময় সমাজের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কিংবা বর্ণকে নিয়ে হাস্যরস উৎপাদনের খেলায় মেতে উঠছে। এমনকি নারীকে অবমাননা করে, এ রকম ভিডিও-ও তারা হরহামেশাই ছড়াচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের প্রথম সারির ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরের কথা বলা যেতে পারে। যাকে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ দেশের সেরা ইউটিউবার হিসেবে পুরস্কৃত করেছিলো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ‘অশোভন’, ‘অমূলক’, ‘অশ্লীল’ নানা ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে তাকে সম্প্রতি পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।৭ এছাড়া ইউটিউবে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে আটক, গ্রেপ্তার তো নৈমিত্তিক ব্যাপার। কপিরাইট আইন লঙ্ঘনের দিক দিয়েও ইউটিউবের মতো প্লাটফর্ম আর দুটি নেই।

    এই ধারার ইউটিউবাররা তারপরও নিজেদেরকে ভ্লগার বলে দাবি করে থাকে! অথচ ভøগারের কর্মকাণ্ডের মধ্যে উপরোক্ত কোনো কাজই পড়ে না। তাছাড়া ভ্লগারের সংজ্ঞায় একটি ভিডিও ভ্লগ হতে গেলে তাকে মূলত ফিল্মধর্মী হতে হয়। অর্থাৎ সাধারণভাবেই তাতে শিল্পমান থাকতে হয়। কিন্তু এই ভ্লগারদের করা বেশিরভাগ ভিডিও এর আওতায় পড়ে না। তাদের ভিডিওতে হয়তো ক্যামেরার ব্যবহার, আলো-সঙ্গীতের (এখানেও তারা অন্যের মিউজিক কনটেন্ট কপিরাইট ভঙ্গ করে ব্যবহার করে কখনো কখনো। যদিও শোনা যায়, অতিরিক্ত ১০ সেকেন্ড পর্যন্ত মিউজিক ব্যবহার করা যায়) ব্যবহার যথারীতি হয় কিন্তু তারা ফিল্মের তাত্ত্বিক দিকটি বেমালুম ভুলে গিয়ে এসব ‘অখাদ্য’ তৈরি করে। অথবা তাত্ত্বিক দিকটি তাদের জ্ঞানের পরিসীমা ছাড়িয়ে। তারা এই ভিডিওগুলো ভ্লগ নামে প্রচার করে থাকে। অথচ তা তো ভ্লগ হয়ে ওঠে না। এইসব ভ্লগাররা কী করছে তা বোঝাতে গেলে প্রসঙ্গত বলতে হয় এরা ফেইসক্যাম, শিক্ষায় বা সংস্কৃতিতে নয় বরং অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত হাই ক্ল্যাসিফায়েড। এই ভ্লগাররা এদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের যাবতীয় ঘোরাঘুরি, খাইদাই দেখাতেই ব্যস্ত। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ যা দেখেনি, শোনেনি তাই এরা দেখায়। হয়তো তাদের তৈরি একটি ভিডিওর টাইটেলে লেখা থাকলো ‘প্লেন থেকে লাফ দিলাম’। দর্শক যখন সেটা দেখতে যাবে, তখন দেখবে ওই ভ্লগার তার অত্যাধুনিক ফ্ল্যাটের জাঁকজমক রুমে ঘুমিয়ে। তারপর সে জেগে উঠে ওই অত্যাধুনিক ফ্ল্যাটের দৈনন্দিনে করা যাবতীয় আধুনিক সামগ্রির ব্যক্তিক ব্যবহার ভিডিওতে হাজির করছে। কিংবা আধুনিক শাওয়ার, বাথটাবে গোসল করছে, দামি খাবার খাচ্ছে, পোশাক পরছে। এসব দেখে দর্শক কিন্তু ওই ‘প্লেন থেকে লাফ দেওয়া’ দেখার কথা ভুলেই গেছে। উল্টো তার যাবতীয় বিলাসিতার রসনায় সুড়সুড়ি দেওয়াতে দর্শক কল্পনায় ভাসছে। এরপর ওই ভøগার বাসা থেকে দামি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এয়ারপোর্ট, বিমান ভ্রমণ, বিদেশে ঘোরাফেরা সব দেখানো হয়ে গেলে ‘লাফ দেওয়া’র পালা চলে আসে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ভয়ানক আত্মপ্রচার। তবুও দর্শক দেখতে থাকে। যার ফলেই তো সেসব ভিডিওর ভিউ সংখ্যা মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশে ফেইসক্যাম-নির্ভর কিছু ‘ভ্লগ’-এর কাঠামো এভাবেই দাঁড়িয়ে যায়। শুধু সস্তা চমক লাগানো বিষয়ের যা ভিন্নতা থাকে, সেটুকুই আলাদা। তবে ভোগবাদিতা আর বিকৃত হাস্যরসের চর্চা হওয়া সেসব ভিডিওতে ভাষা, সংস্কৃতির বিকৃতিটা ভয়াবহ রকমের পারদর্শিতায় হয়ে থাকে।

    নির্ভরযোগ্য না হলেও ভ্লগার কিংবা ইউটিউবার পেশায় জড়িতরা কিন্তু বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকে। তার বড়ো উদাহরণ হলো সালমান মুক্তাদির, ছোটো আজাদ, তৌহিদ আফ্রিদির মতো দেশজুড়ে পরিচিত কিছু ইউটিউবার। এদের ‘ফেইসক্যাম’ধর্মী ভিডিওতে এরা যেভাবে হাজির হয় বিভিন্ন আলোচিত ব্যক্তির সঙ্গে আড্ডা, সাক্ষাৎকার, নানারকম প্রাঙ্ক (হাস্যকর কিংবা অদ্ভুত কাজ করে দর্শককে মজা বা পরিতৃপ্তি দেওয়া হয় যে ভিডিওতে), মিউজিক্যাল ভিডিও থেকে এরা নেহাত কম আয় করে না। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ওই ইউটিউবারকে আয় কেমন হয় এমন প্রশ্ন করা হলে বলেন, ‘আমি এখনই যা আয় করি, সে পরিমাণ অর্থ আমার সহপাঠীরা পড়াশোনা শেষে অন্য কাজে আয় করতে পারবে না।’ তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে  তিনি জানান, পড়ালেখা শেষ করার পরও তিনি এই কাজেই যুক্ত থাকবেন। তাকে এই কাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা সম্পর্কে যখন জানাই তখন তিনি বলেন, ‘এজন্য সামনে আরো কয়েকটা প্লাটফর্মে চ্যানেল খুলবো, সব সোস্যাল মিডিয়াতে থাকবো, যেনো একটি চ্যানেল নষ্ট হয়ে গেলে বাকিগুলো থেকে অর্থ আয় করতে পারি। এছাড়া একটি ওয়েবসাইটও খুলবো।’ যদিও তার এই পরিকল্পনা থেকে এ কাজের কোনো নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায় না।

সাম্প্রতিক কিছু গলদঘর্ম, অতঃপর অনলাইনিয় স্নান

একটি প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়, সেফুদার (সেফাত উল্লাহ সেফুদা) মতো লোকেরা অনলাইনের ভিডিও প্লাটফর্মগুলোতে কেনো এতো জনপ্রিয় হচ্ছে? তার কার্যকলাপ জনপ্রিয়তা পাওয়ার আদৌ কোনো কারণ আছে কী! সেফুদার লাইভে এসে ছড়ানো অসংখ্য ভিডিও থেকে এটা সহজেই উপলব্ধ, লোকটি মানসিকভাবে ‘অসুস্থ’ কিংবা কোনো কারণে এদেশের প্রতি তার তীব্র ক্ষোভ আছে। উনি লাইভে এসে অদ্ভুত আর ‘অশ্লীল’ যে কথাগুলো বলেন, তা কি এদেশের সব লোকের দেখার প্রয়োজন আছে? তার ভিডিওগুলো যারা শেয়ার কিংবা লাইক-কমেন্ট করে তাকে প্রমোট করে, আলোচিত ব্যক্তি করে তোলে, তারাই বা সেটা কেনো করে? এখানে মূলত কয়েকটা মানসিকতা কাজ করে। তার ফেইসবুকের প্রতিটা লাইভের রেকর্ড ইউটিউবে পাওয়া যায়। অসংখ্য অপরিচিত চ্যানেলে সেসব ভিডিওর ছড়াছড়ি। কেনো এই ছড়াছড়ি? কারণ ওই চ্যানেলওয়ালারা এসব ছড়িয়ে টাকা কামাতে পারে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, সেফুদার মতো অহেতুক লোকদের কর্মকাণ্ড জনপ্রিয় হওয়ার একটি বড়ো কারণ অর্থনৈতিকভাবে একটি শ্রেণির লাভবান হওয়ার চেষ্টা। এ রকম অগণিত ভাইরাল হওয়া বিষয় কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে এযাবৎকাল। যেমন, হিরো আলম, সানাই, খান হেলালসহ অনেকে।

    কিন্তু এখানেও প্রশ্ন আছে, ছড়িয়ে দিলেই লোকজন এই ভিডিওগুলো দেখবে কেনো? এজন্য যারা ভাইরাল হচ্ছে তাদের দিকে তাকালেই এ বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। সেফুদার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, এদেশের তরুণরা গত এক দশকে রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর যে পরিমাণ ত্যক্ত-বিরক্ত, তার তুলনায় তারা এর সমালোচনা করার সুযোগ পায় কমই। ফলে যখন কেউ একজন এ রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে সেই কথাগুলো বলে, তখন সেই কথাগুলোকে হয়তো তাদের নিজেদের কথাই মনে হয় (কথা বলার ধরন নিয়ে নানা মত থাকতে পারে)।

    তবে নিউমিডিয়াকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, পুরো অনলাইন ভিডিও ব্যবস্থার মধ্যে যে গণ্ডগোল চলছে, তাতে এর ব্যবহারকারী বিশেষত তরুণদের রুচিবোধ কিংবা বিচারবোধে জট পাকিয়ে গেছে। ফলে তাদের জন্য কোনটা প্রতিবাদ, কোনটা যথেচ্ছাচার তা ঠাহর করা একটু কঠিনই হয়ে পড়ে। আজকাল অনেক পরিবারই তাদের শিশুসন্তানের হাতে বুঝে, না বুঝে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছে। সেই স্মার্টফোনে বাচ্চারা দেখছে নানারকম ভিডিও। তাদের ওয়াচ লিস্টে কিন্তু বড়ো-ছোটোর ভিডিও মিলেমিশে একাকার। অনেকক্ষেত্রে তারা ভিডিওর কৌতুহলোদ্দীপক নানা টাইটেলে আকৃষ্ট হয়ে আজগুবি নানা সিদ্ধান্ত বা মতামত চাপিয়ে দেওয়া এসব ভিডিও দেখে ভুল যুক্তিবোধে দীক্ষিত হচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নানা বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতা। অনেক অস্বাভাবিক ঘটনা বা জিনিস স্বাভাবিক করে দেখার এমন এক অভ্যস্ত চোখ তাদের তৈরি হচ্ছে, যাতে তাদের বিবেক বোধের চর্চাও ব্যাহত হচ্ছে।

    অনলাইনে অনেক ভিডিও দেখে বোঝা যায়, সেই ভিডিওতে থাকা লোকজনের সঙ্গে ভিডিওমেকারের কোনো ধরনের সম্পর্কই নেই। অর্থাৎ পথেঘাটে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, জনসমাবেশে অন্যের অনুমতি ছাড়াই ভিডিও করে অনেকে অনলাইনে ছাড়ছে। ফলে অনেকের প্রাইভেসি আর থাকছে না। কিছু টাকা কামানোর জন্য আর নিত্য-নতুন ভিডিও পাওয়ার নেশায় মানুষের প্রাইভেসি তাদের কাছে আজ গৌণ। এমনও ভিডিও দেখা গেছে যে, এক ভ্লগার লাইভে এসেছে, তার পিছে একটি লেক, সেখানে বেশকিছু আদিবাসী নারী গোসল করছে। কিন্তু ভøগার ওই নারীদের প্রাইভেসির চিন্তা না করে জায়গাটির গুণ বর্ণনায় ব্যস্ত। তবে কখনো কখনো বিনা অনুমতিতে করা ভিডিও প্রতিবাদের ভাষাও হয়ে উঠতে দেখা যায়।

     এছাড়াও ২৮ মার্চ ২০১৯-এ ঘটে যাওয়া বনানীর এফ আর টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডে নাঈম নামের এক বালক ‘সাহসী ভূমিকা’র (ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের অগ্নি নির্বাপনে ব্যবহৃত পানির পাইপলাইনের ফুটো চেপে ধরে পানির অপচয় রোধ করছিলো নাঈম) জন্য খুব আলোচিত হয়। রীতিমতো দেশজুড়ে নাঈমকে নিয়ে যখন সবার মাতামাতি, তখন পুড়ে যাওয়া অসহায় মানুষগুলোকে সবাই ভুলতে শুরু করেছে। এখন প্রশ্ন, নাঈমকে ভাইরাল করলো কে? যারা এ কাজটি করেছে সেই দলের একটি বড়ো অংশ কিন্তু অনলাইনে চমকের খেল দেখিয়ে টাকা কামায়। সেদিন ঘটনাস্থলে নাঈম ছাড়া আর কেউ যে এগিয়ে আসেনি তা নয়, তবুও নাঈমকেই তাদের ভাইরাল করতে হলো কেনো? কারণ এতে আবেগের বিকিকিনি করে কিছু ডলার কামানো সহজ হয়। তাই তারা নাঈমকেই বেছে নেয়। এভাবে যখন নাঈমের ‘বীরত্ব’ গগণচুম্বি, তখন জনগণ ভিক্টিমদের কষ্ট ভুলতে বসেছে। জান খোয়ানো লোকেরা তখন হয়ে যায় ঘটনার গৌণ বিবরণ।

কী লাভ তোমার চক্ষু খুলে, অভাজনের কথায় ভুলে?

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ক্রাইস্টচার্চ হত্যাকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ওই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসীকে বিশ্বজুড়ে মূলধারার তাবৎ বড়ো বড়ো গণমাধ্যম লাগাতার খবরের শিরোনামে এনেছে। ওই সন্ত্রাসীর উদ্দেশ্য, তার শৈশবের কথা, বেড়ে ওঠা, আদর্শগত প্রেরণার কথা গণমাধ্যমগুলো জানাতে ব্যস্ত। এই ইস্যুটি ধরে আপাতত তাই বলা যায়, গণমাধ্যমের কাজ প্রতিদিন এ রকম ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ ধরে ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে ‘কৌতুহলোদ্দীপক’ সব আর্টিকেল ভোক্তার গলা দিয়ে নামানো। মোটকথা, ওইসব গণমাধ্যম যেখানে অপরাধীর অপরাধ জানানোর পরেও তার নিষ্প্রয়োজনীয় জীবনী জানাতে তৎপর থাকে, সেখানে ভিক্টিমদের সবার নামও জানানো হয় না। তাদের অসহায়ত্ব আর দুর্দশা জানানো তো দূরের কথা। এ ইস্যুতেও ভিক্টিমরা, অর্থাৎ নিহত ৫০ জন যেনো শুধুই একটি সংখ্যা। এই প্রক্রিয়াই হলো সংস্কৃতি কারখানা। এভাবেই মূলত সংস্কৃতি কারখানা সমাজে, রাষ্ট্রে চলা যাবতীয় অসঙ্গতি, অনাচার, ভুয়ো সিস্টেমকে নেতিবাচক বলে চিনতে দেয় না; লোকের চোখে-কানে-অনুভূতিতে যাবতীয় অসঙ্গতিকে মূলধারার গণমাধ্যম নামে এসব সংস্কৃতি উৎপাদ শুধুই বিনোদন বলে চালিয়ে দেয়। এসবের বাইরে মানুষকে কোনো ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করতে কিংবা মাথা ঘামাতেই দেওয়া হয় না।

    এখানে এতোগুলো কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, চারপাশে ঠিক এই সময়টায় ভøগিং বলি বা অনলাইন ভিডিও ওয়াচিং বলি, এসব কর্মকাণ্ডের নামে যা কিছু চলছে তার অধিকাংশই ঠিক একই প্রক্রিয়ায় দিনশেষে স্রেফ সংস্কৃতি কারাখানাতেই পর্যবসিত হচ্ছে। ইউটিউবে তরুণরা ‘ভøগিং’ বা অনলাইনে ভিডিও বানানোর নামে নিজেরাই নিজের অজান্তে একেকজন হয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতি উৎপাদক। কারণ, তারা আসলে জানে না তারা কী বানাচ্ছে। আগেই বলেছি, কীভাবে সেগুলো ভøগ-ও হয়ে ওঠে না। তাই সেসব আধেয়কে কেবল নানা নামে চালিয়ে দিলেই বাঁচে। বাংলাদেশের তরুণরাও তাই করছে। তারা তাদের বানানো নানা অসংজ্ঞায়িত আধেয়গুলোকে ভøগ নামের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে চালিয়ে দিতে সচেষ্ট। তো সবমিলিয়ে যদি এইসব কার্যক্রমকে একটা অসঙ্গতি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, আর এর কাঁধে তৎসম্পর্কীয় একটি ঘটনা চাপানো যায়, তবে বিষয়টাও মোটামুটিভাবে পরিষ্কার হবে।

    ঘটনাটি হলো, গত বছর (২০১৮) থেকে মুঠোফোন অপারেটর কোম্পানি বাংলালিংক আয়োজন করছে ‘বাংলালিংক নেক্সট টিউবার’ নামের একটি অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটি ওইসব তরুণদের একই প্লাটফর্মে মিলিত করে, যারা নিজেদেরকে ইউটিউবার বলে দাবি করে এবং তারা ভ্লগিং করে টাকা আয় করতে চায়; সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে ‘পরিচিত’ করতে চায় বিশ্বের কাছে।১০ অনুষ্ঠান আয়োজক কর্তৃপক্ষও তাদের ভাষ্যে, ওই তরুণদের কিছু বিশেষ দলে ভাগ করে বেশ ক’দিনে ‘গ্রুম’ করায়। এরপর শুরু হয় তাদের তথাকথিত ভিডিও নির্মাণের পালা। অবশেষে দেশের শিল্পী সমাজের হাত দিয়েই বিজয়ীদের হাতে পদক তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানজুড়ে এও দাবি করা হয়, এইসব তরুণের পড়াশোনা ব্যতিরেকে শুধু ইউটিউবার হয়েও একটি নির্ভরযোগ্য ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, একজন ভ্লগার তার এতো কষ্টে গড়ে তোলা চ্যানেল কিন্তু হারাতে পারে এক মুহূর্তেই। সে যেরকম বেপরোয়াভাবে কপিরাইট আইন ভঙ্গ করে অন্যের ভিডিও নিজের বলে চালায়, ‘অশ্লীলতা’, গুজব, প্রচারণার চর্চা করে, সমসাময়িক অতি নাজুক রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক ইস্যুতে নিজেকে যেভাবে জড়ায়, তাতে নেটিজেনদের নেতিবাচক অভিযোগ কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার হস্তক্ষেপে তার পেইজ বা চ্যানেল যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে এটা নির্ভরযোগ্য পেশা হতে পারে কি না সে বিষয়েও আপত্তি ওঠে।

    এই আয়োজন থেকে আরো নানা প্রশ্ন আসে। উক্ত আয়োজনটা সমাজের হাজারও তরুণের ভুল পথে হাঁটার যে ঘটনা, তাকেই কোনোভাবে আড়াল করে নাতো! এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে না তুলে ধরে, সংস্কৃতি কারখানার ভূমিকায় সস্তা বিনোদন হিসেবে তুলে ধরে ব্যবসায়িক প্রচারণা কামাবারই নামান্তর নয় কি? তাছাড়া, ঠিক যে সময়টায় এদেশ থেকে গণতন্ত্র, সুশাসন, জবাবদিহিমূলক শাসন ঠিক উধাও, যে সময়টায় দেশে বেকার সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতায় তরুণদের স্বপ্ন এক রকম জলাঞ্জলি হওয়ার জোগাড়; তরুণরা কোথায় যাবে, কী করবে তার ঠিক নেই, এই সময়ে দাঁড়িয়ে তরুণদেরকে ‘ইউটিউবার’ হয়ে একটি শক্ত ক্যারিয়ার গঠনের উপদেশ দেওয়াটা অপলাপ ছাড়া আর কিছু হতে পারে কী?

     অধিকন্তু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মাতানো নানারকম আজেবাজে ভিডিওকে এইসব গণমাধ্যম যখন আশকারা কিংবা স্বীকৃতি দেয়, তখন গণমাধ্যমের সুষ্ঠু ভূমিকা কিংবা সামাজিক দায়িত্বশীলতা নিয়ে সংশয় হয়। দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমগুলো মোটের ওপর পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান হলেও তাদের সামাজিক সুষ্ঠু ভূমিকা কতোখানি তা খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়ে। গত বছর ‘অপরাধী’ শিরোনামে একটি গান ইউটিউবে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। গানটির কথা বিবেচনায় বোঝা যায়, এটি আগাগোড়া ভয়ঙ্কর নারীবিদ্বেষী। যাতে ইঙ্গিত করা হয়েছে নারীরা মোটেও স্বজন হতে পারে না, তারা দুর্জন, তারা অপরাধী। অথচ ইউটিউব মাতানো সেই গানটি ‘প্রথম আলো’ আয়োজিত ‘মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০১৮’-এ আরো তিনটি গানের সঙ্গে চূড়ান্ত মনোনয়ন পায়। যদিও শেষ পর্যন্ত গানটি পুরস্কার পায়নি, তবু এটা তো সত্যি এ ধরনের আয়োজনে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া আর পুরস্কারের মধ্যে পার্থক্য সামান্যই। কেননা, শেষাবধি হাতেগোনা কিছু কাজকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়ে আয়োজক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদেরকে পরোক্ষভাবে এমন একটি বার্তা দিয়ে থাকে যে, তাদের প্রত্যেকের কাজই আসলে পুরস্কারের যোগ্য। শেষমেষ যদিও দর্শকের ভোটে কে পুরস্কার পাবে তার অনেকটাই ঠিক হয়। তাহলে ‘প্রথম আলো’ যেখানে নিয়মিত নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, নারীর প্রতি বৈষম্য রোধে ও এসবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সরব থাকতে সচেষ্ট, সেখানে তারই আয়োজনে একটি প্রতিযোগিতায় নারীবিদ্বেষী কোনো গানকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া তাদের আদর্শবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না এমন প্রশ্ন এসেই যায়। গণমাধ্যম যখন অপরাধের সমালোচনা, ভর্ৎসনা না করে, তাকে পুরস্কৃত করে বা করতে উদ্যত হয়, তখন বুঝে নেওয়া চলে আসলেই তার সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধে বড়ো ঘাটতি আছে।

আর রাষ্ট্র, সে তো ...

ভ্লগার কিংবা ইউটিউবাররা কী করছে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন রাষ্ট্রের, বুদ্ধিজীবীদের, গণমাধ্যমের আছেও বৈকি! কিন্তু রাষ্ট্র এক্ষেত্রে যা করে তা মোটামুটিভাবে তথাকথিত ‘অশ্লীলতা’ দমনেই সীমাবদ্ধ। এর দু-একটি উদাহরণ সম্প্রতি দেখা যায়, মডেল ও অভিনয়শিল্পী সানাই এবং ইউটিউবার সালমান মুক্তাদিরকে ‘অশ্লীলতা’ ছড়ানোর অভিযোগে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। এর বাইরে গত কয়েক মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ও নির্বাচনকালীন ‘গুজব’-এর ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কথা হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিও সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো একটি অযৌক্তিক আইন ঝুলিয়ে শুধু ‘গুজব’ আর ‘অশ্লীলতা’ নিয়ন্ত্রণেই রাষ্ট্রের কর্তব্য শেষ হয়ে যায়? এর বাইরে দেশে ভিডিওর নামে যা তৈরি হচ্ছে, ছড়ানো হচ্ছে এ নিয়ে যেনো রাষ্ট্রের কিছুই বলার নেই। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিজের অস্তিত্ব লোপের হুমকিস্বরূপ রাষ্ট্র যদি গুজব নিয়ন্ত্রণে এতোসব নজরদারিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে, তাহলে নাগরিকের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে যে দেশীয় সংস্কৃতি তাকে ঠিক রাখতেও রাষ্ট্রের নানারকম ভূমিকা নেওয়া উচিত। না হলে ক্ষমতায় থাকার বাহানা হিসেবে ‘উন্নয়নের’ বাঁশি বাজিয়ে জনগণকে খুব বেশিদিন বেঘোরে রাখা সম্ভব হবে না। এর প্রমাণ বার বার নানামুখী দাবি নিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলো।

    সংস্কৃতি যদি হারিয়ে যায় তবে স্বাধীনতার আর কোনো মূল্য থাকে না। আর পরাধীন পাখি ডানা ঝাপটালে খাঁচা ভাঙবেই, যদি অগুনতি পাখা হয়। তাই রাষ্ট্রীয় জনবান্ধব উদ্যোগের অভাবে অভিভাবকহীন, সংস্কৃতি খোয়ানো, শেকড়হীন সব মানুষের সংখ্যা যতোদিন এভাবে বাড়তে থাকবে, ততোদিন খাঁচাভাঙা পাখা বাড়তেই থাকবে, খাঁচাও ঠিক ভাঙবেই। এ হুঁশ রাষ্ট্রের হওয়া উচিত।

 

লেখক : তানভীর শাওন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

shawonmcj26@gmail.com

https://www.facebook.com/tanveeshawon

 

তথ্যসূত্র

১.  https://www.urbandictionary.com/define.php?term=vlog; retrieved on: 12.02.2019

২.  https://blog.printsome.com/top-20-types-of-videos-with-most-views-on-youtube/; retrieved on: 20.02.2019

৩.  http://videonitch.com/2017/12/13/36-mind-blowing-youtube-facts-figures-statistics-2017-re-post/; retrieved on: 20.02.2019

৪. গায়েন, কাবেরী; ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রির ধারণা : একটি তত্ত্বীয় পর্যালোচনা’; Administration, Communication and Society; সম্পাদনা : সেলিম রেজা নিউটন; সেন্টার ফর সোশাল সায়েন্স রিসার্চ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ভলিউম ১, সংখ্যা ১, ১৯৯৭, পৃ.৭৬।

৫. এ্যাডরনো ও হর্কহেইমার (১৯৭২); উদ্ধৃত; শুভ, শাতিল সিরাজ ও মাহমুদ, শামীম আল (২০০৬ : ৯৬); ‘‘চলচ্চিত্র যখন নেহায়েতই ‘সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রি’র উৎপাদ : পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’’; চলচ্চিত্রের সময় সময়ের চলচ্চিত্র; সম্পাদনা : ফাহমিদুল হক ও শাখাওয়াত মুন, ঐতিহ্য, ঢাকা।

৬. শুভ, শাতিল সিরাজ ও মাহমুদ, শামীম আল (২০০৬ : ৯৬); ‘‘চলচ্চিত্র যখন নেহায়েতই ‘সংস্কৃতি ইন্ডাস্ট্রি’র উৎপাদ : পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’’; চলচ্চিত্রের সময় সময়ের চলচ্চিত্র; সম্পাদনা : ফাহমিদুল হক ও শাখাওয়াত মুন, ঐতিহ্য, ঢাকা।

৭. https://bit.ly/2U4f5RO; retrieved on: 12.03.2019

৮.  https://bit.ly/2FwC6Hc; retrieved on: 21.03.2019

৯.  https://bit.ly/2FwCG7Q; retrieved on: 27.03.2019

১০.  https://www.youtube.com/watch?v=jI6_O4f5dV4; retrieved on: 20.04.2019

 

বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭সংখ্যা) সংখ্যায় ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন