শৈবাল চৌধূরী
প্রকাশিত ০৮ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বেরনার্দো : বিশ্বজনীন ও মানবিকতায় ভরপুর এক স্বপ্নবান স্রষ্টা
শৈবাল চৌধূরী

গৌরচন্দ্রিকা
একেকজন মায়েস্ত্রো যখন বিদায় নেয়, তখন এক চরম শূন্যতা ও হতাশা বোধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। ৭০-এর দশকের শেষ দিকে আমরা যখন চলচ্চিত্র সংসদ চর্চায় যুক্ত হই, তখন বিশ্বচলচ্চিত্রের ভরভরন্ত অবস্থা। বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্র মায়েস্ত্রোরা দাপটে কাজ করে চলেছে। কার কাজ ছেড়ে কার কাজ দেখি, রীতিমতো আলো ঝলমলে এক সময়। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, বৃটিশ কাউন্সিল, ভারতীয় হাইকমিশন, আমেরিকান সেন্টার, জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার সবাই যেনো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত; কে কার দেশের সেরা নির্মাতার চলচ্চিত্রটা দেখাবে! আমরাও নেশায় বুঁদ। লেখাপড়াও লাটে উঠতো কখনো সখনো।
বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে মায়েস্ত্রোরা বিদায় নিয়েছে। হাতেগোনা কজন আছে এখন। কিন্তু শূন্যতা ও হতাশার কথা ওঠে তখনই, যখন দেখি সেরকম আর কেউ উঠে আসলো না। ভালো নির্মাতা সব জায়গায় দুয়েকজন যে নেই তা নয়, তবে মায়েস্ত্রো সে অর্থে আর কেউ উঠে এলো না।
বেরনার্দো বের্তোলুচি এবং মৃণাল সেনের প্রয়াণের পর এসব কথা মনে পড়ছে আরো বেশি করে। এরা দুজনেই মাথার ওপর বিশাল ছায়া হয়ে ছিলেন, প্রিয় অভিভাবকের মতো।
ইদানীং একটা কথা খুব শোনা যায়, ‘চলচ্চিত্রের ধরন এখন পাল্টেছে। নতুন প্রজন্ম অন্য ধরনের চলচ্চিত্র দেখতে চায়।’ কথাটি সত্যি এবং আপেক্ষিক। আপেক্ষিক এজন্য, চলচ্চিত্রের ধরন যুগে যুগেই পাল্টেছে; নতুন প্রজন্মও কিছুদিন পর পর উঠে এসেছে কালের নিয়মে। কিন্তু এখন যেটা হয়েছে, চলচ্চিত্র চলে এসেছে হাতের তালুতে, মাথা নিচু করে দেখতে হয়। মাথা উঁচু করে সামনের দিকে তাকিয়ে চলচ্চিত্র এ প্রজন্ম বোধ করি দেখতে চাইছে না। তার হাতে চলচ্চিত্র দেখার প্রচুর সুযোগ, উপকরণ। আগে যেটা ছিলো একটাই--প্রেক্ষাগৃহ। একেকটা প্রেক্ষাগৃহ ছিলো একেকটা স্বপ্নপুরী। একেকটা প্রেক্ষাগৃহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতো একেকটা লোকালয়। আজ আর সেই প্রেক্ষাগৃহ নেই; নেই সেই স্বপ্নও। সবকিছু এখন হাতের মুঠোয়। তার পরও স্বপ্ন যেমন থাকে, থাকবে চলচ্চিত্রও। নতুনভাবে। নতুন স্বপ্নে। কীভাবে সেটা অনাগত দিনই বলবে।
স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
ফিরে যাই স্বপ্নের এক ফেরিওয়ালার কথায়। ড্রিম মার্চেন্ট। বেরনার্দো বের্তোলুচি (Bernardo Bertolucci)। স্বপ্ন ফেরি করতে যিনি পাড়ি দিয়েছিলেন অতলান্তিকের পশ্চিম পাড়ে। আরেক স্বপ্নের দেশ ইতালি থেকে। সভ্যতা, সংস্কৃতি আর শিল্পের স্বপ্নভূমি ইতালি, যেখানে তার জন্ম ১৬ মার্চ ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যখন তিনি শৈশবে সেখানে বেড়ে উঠছিলেন। ইতালি ছিলো অক্ষশক্তির বড়ো দোসর। শৈশব থেকেই যুদ্ধের নৃশংসতা, বীভৎসতা ও মূল্যবোধের চরম বিপর্যয় দেখে তাকে বড়ো হতে হয়েছে। স্বভাবতই এতোকিছু বোঝার বয়স তখন তার হয়নি। কিন্তু শিশু বয়স থেকেই জীবনের কঠিন কর্কশ রূপ তাকে দেখতে হয়েছে চোখের সামনে। অনেকটা চলচ্চিত্র দেখার মতো। এসব কিছু তার শিশুমনে প্রভাব তৈরি করেছিলো, যার স্থায়িত্ব ছিলো আজীবন। তাই তার প্রতিটি চলচ্চিত্রেই জীবনের সেই ক্রূর দিকগুলোর চিত্র নানাভাবে উঠে এসেছে। শান্তির অন্বেষণে তার ছিলো আজীবনের অনুসন্ধান। লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস, দ্য কনফরমিস্ট, ট্র্যাজেডি অফ অ্যা রিডিকুলাস ম্যান, দ্য লাস্ট এম্পেরর, বিসিজড, দ্য ড্রিমারস এবং শেষ চলচ্চিত্র মি অ্যান্ড ইউতে দেখা যায় সেই শান্তির অন্বেষণ। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে বেরনার্দো নির্মাণ করেন লিটল বুদ্ধ, যে চলচ্চিত্রের সঙ্গে তার আগের কিংবা পরের কোনো চলচ্চিত্রেরই মিল বা সংযোগ নেই, সেই চলচ্চিত্রের সামগ্রিক অন্বেষণ শান্তি। তাই শান্তির অন্বেষক গৌতমের শরণে কি তার যাত্রা? শান্তির বরপুত্রের জীবনচিত্রের আলোকে জীবনের সত্য অনুসন্ধানের অভীপ্সা? দ্য লাস্ট এম্পেরর-এর অন্তর্নিহিত বক্তব্যও তাই।
বেরনার্দো বের্তোলুচির (ইতালিয় উচ্চারণে বের’ নার্দো বের্তোলুৎজি) জন্ম ইতালির পারমা শহরে। মা নিনেতা জিয়োবানারদি ছিলেন স্কুলশিক্ষক। বাবা আত্তিলিও বের্তোলুচি ইতালির নামকরা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। একাধারে কবি, সাহিত্য সমালোচক, শিল্প ইতিহাসবিদ, চলচ্চিত্র সমালোচক এবং প্রকাশক। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রথিতযশা। এহেন বাবার ছেলে যে ভাবীকালে বের্তোলুচি পরিবারের নামযশ আরো বৃদ্ধি করবে বিশ্বজুড়ে, এ তো খুবই স্বাভাবিক।
শৈশব থেকেই এক পরিশীলিত জীবন চর্যার পরিমণ্ডলে বড়ো হয়ে ওঠেন বেরনার্দো। মায়ের কাছে পেয়েছেন শিক্ষা আর সামাজিক মূল্যবোধের উন্নত ধারণা। আর বাবার কাছে শৈল্পিক পারিপার্শ্বিকতার সৃষ্টিশীল আনন্দময় আবহ। দুইয়ে মিলে শৈশব থেকেই পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার তালিম ও প্রেরণা পেয়ে গেছেন, যা খুব কমজনেরই ভাগ্যে হয়। ছোটোবেলা থেকেই আরেকটি মূল্যবোধ জারিত করেছে তাকে--বিশ্বজনীনতা। এটা তিনি পেয়েছিলেন মা নিনেতার কাছে। নিনেতার জন্ম অস্ট্রেলিয়ায়, ইতালিয় বাবা ও আইরিশ মায়ের সংসারে। যৌবনে নিনেতার পরিবার ফিরে আসে ইতালিতে। জ্যেষ্ঠ ছেলের প্রতি নিনেতার ভিন্ন রকমের পরিচর্যা ছিলো। বাবা-মা দুজনেই তাদের এই সন্তানটির মধ্যে হয়তো ভাবীকালের এক বড়ো শিল্পকারের বীজ খুঁজে পেয়েছিলেন।
লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী বেরনার্দোর ছোটোবেলা থেকেই সৃষ্টিশীল কাজকর্মের দিকে ঝোঁক ছিলো বেশি। ১৫ বছর বয়সেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। মূলত কবিতা লেখার হাতটি তার বেশ সড়গড় ছিলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের সম্মানজনক অনেক সাহিত্য পুরস্কার তার অধিকারে এসে যায়। তরুণ বয়সেই তিনি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের জন্য অর্জন করেন ইতালির সেরা একটি সাহিত্য পুরস্কার ‘Premio Viareggio’। তার এই ক্যারিয়ারের নেপথ্যে অবশ্য বাবার খ্যাতি বড়ো ভূমিকা পালন করে।
পিয়ের পাওলো পাসোলিনি পর্ব
চলচ্চিত্রের স্বর্ণভূমি ইতালি বিশ্বচলচ্চিত্রকে উপহার দিয়েছে নব্য-বাস্তববাদী চলচ্চিত্র আন্দোলন। যার প্রভাব ও কার্যকারিতায় ১৯৪০-এর মধ্যবর্তী সময় থেকে বদলে গেছে চলচ্চিত্রের গদাই লস্করি ধারা। চলচ্চিত্র মুক্ত হয়েছে কৃত্রিমতার নাগপাশ থেকে। ইতালি উপহার দিয়েছে অনেক অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা, কলাকুশলী, অনেক প্রযোজক ও পরিবেশক; ভেনিসের মতো চলচ্চিত্র উৎসব, যেটি বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্র উৎসবও বটে। বিশ্বচলচ্চিত্রে স্ব স্ব ক্ষেত্রে এদের অনেকেই জ্যোতিষ্মান নক্ষত্র। এদেরই অন্যতম পিয়ের পাওলো পাসোলিনি (১৯২২-১৯৭৫)। রোমে আসার পর পাসোলিনি প্রথমে ঔপন্যাসিক হিসেবেই তার ক্যারিয়ার নির্মাণে ব্রতী হন। লেখেন বেশ কটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস, এর সূত্র ধরেই তার সঙ্গে সংযোগ ঘটে ইতালির চলচ্চিত্র জগতের। তখন কেবল ইতালির চলচ্চিত্র পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ঝুঁটি ধরে নাড়া দিয়েছে প্রবল জোরে। নির্মিত হয়েছে রোম ওপেন সিটি, বাইসাইকেল থিভস্; এসে গেছেন ভিত্তোরিও ডি সিকা, রসির, ফেলিনি, রসোলিনি, জাভাত্তিনি, আন্তোনিওনির মতো দুঁদে চলচ্চিত্র কারিগরেরা; যারা ভাষা পরিভাষা পাল্টে দিয়ে চলচ্চিত্রকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে এনেছে। এহেন সময়ে পাসোলিনির আগমন চিত্রনাট্যকার হিসেবে। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ফেলিনি এবং রসির চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করার মধ্য দিয়ে নিজের শক্তিমত্তার পরিচয় রাখেন। আর এও অনুধাবন করেন যে, স্বাধীনভাবে কাজ করতে হলে তাকেও চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করতে হবে। ১৯৬১-তে পরিচালনা শুরু করলেন পাসোলিনি, Accattone চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আমাদেরও তাই আবার ফিরে যেতে হবে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে।
পাসোলিনি যখন রোমে এলেন এবং উপন্যাস লিখতে শুরু করলেন, তখন তা প্রকাশের বিষয়টি সামনে আসে। পাসোলিনির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে বেরনার্দোর। বেরনার্দোর বাবা আত্তিলিও বের্তোলুচি রোমের বেশ নামকরা প্রকাশক। ছেলের অনুরোধে তিনি পাসোলিনির প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। এটা বেশ পাঠক সমাদর পায়। পাসোলিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হন এর পর। তারই লেখা উপন্যাস, সেটি সমাজের নিম্নশ্রেণি, ছিন্নমূলদের নিয়ে লেখা-সেই উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে তিনি নির্মাণ করলেন প্রথম চলচ্চিত্রAccattone । কৃতজ্ঞতা ও স্নেহবশত পাসোলিনি প্রধান সহকারী হিসেবে নিলেন বেরনার্দোকে। বেরনার্দোরও ততোদিনে প্রবল আগ্রহ জন্মেছে চলচ্চিত্রের মায়ায়। শুরু হলো গুরু-শিষ্যের এক নতুন অধ্যায়।
নতুন এক পথ চলা
গুরু পাসোলিনির শিল্পদর্শন বেরনার্দোকে প্রভাবিত করেছিলো। মার্কসবাদের প্রতি বিশ্বাস ও খ্রিস্টীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ, এই দুইয়ের মিশেলে গড়ে উঠেছিলো পাসোলিনির দর্শন। গুরুর দর্শনে প্রভাবিত হলেও বেরনার্দোর দর্শনে মিশে ছিলো বিশ্বজনীনতা। বৈশ্বিক বৈচিত্র্যের কারণেই তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে; কখনোবা দক্ষিণে; চলচ্চিত্রের অবারিত পাখনায় ভেসে। তাই আমরা পাই যেমন, বিফোর দ্য রেভল্যুশন (১৯৬৪), পার্টনার (১৯৬৮), দ্য কনফরমিস্ট (১৯৭০), লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস (১৯৭২), তেমনই পাই দ্য লাস্ট এম্পেরর (১৯৮৭), লিটল বুদ্ধ (১৯৯৩) এবং বিসিজড (১৯৯৮)।
১৯৬০-১৯৬১ জুড়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে হাতেকলমে অনেক কিছুই শেখেন বেরনার্দো। এ সময় চলচ্চিত্রের মায়া তাকে আরো আচ্ছন্ন করে। এবার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন পরিচালনার। গুরু-শিষ্যের প্রায় একই সময় পথ চলা শুরু। পরের বছর ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দেই মাত্র ২২ বছর বয়সে বেরনার্দো পরিচালনা করলেন দ্য গ্রিম রিপার। পাসোলিনি লিখলেন এর চিত্রনাট্য। আখ্যানভাগও তার। গুরুর অনুরোধে শিষ্যের চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করলেন সেসময়ের বড়ো প্রযোজক টনিনো কার্ভি। এক বারবনিতার আত্মহনন ও একটি খুনের ঘটনায় অনেকটা ক্রাইম থ্রিলার ধাঁচের এই চলচ্চিত্রটিতে রোমের ছিন্নমূল ও অন্ধকার জগতের জীবন চিত্রিত হয়েছে। সমালোচকেরা প্রথম চলচ্চিত্রেই বেরনার্দোর মার্কসীয় রাজনৈতিক দর্শন আবিষ্কার করলো, যা তিনি আজীবন ধরে রেখেছিলেন।
চলচ্চিত্রের মায়া
সব শুরুরও একটা শুরু থাকে। চলচ্চিত্রে আসার আগে বেরনার্দোর সাধ ছিলো বাবার মতো কবি হওয়ার। বাবারও এতে স্বস্নেহ সায় ছিলো। তিনি ভর্তিও হয়েছিলেন রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক সাহিত্য বিভাগে, ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ অবধি পড়লেনও। কিন্তু পাসোলিনির পাল্লায় পড়ে কবি হওয়ার বাসনায় দিলেন জলাঞ্জলি। আগেই বলেছি, পাসোলিনির সহকারী হয়ে পুরোপুরিই তিনি মজে গেলেন চলচ্চিত্রের প্রেমে। গ্রাজুয়েশন আর শেষ করা হলো না; হলো না কবি হওয়া। তবে হলেন চলচ্চিত্রের কবি। গুরু-শিষ্য দুজনেই বলতেন, ‘সিনেমা ইজ দ্য ট্রু পোয়েটিক ল্যাঙ্গুয়েজ।’
চলচ্চিত্র বিশ্লেষক মিহির সেনগুপ্ত বলেন,
... বাইশ বছর বয়স হওয়ার আগেই পাসোলিনির গল্প নিয়ে তিনি নিজেই বানালেন ছবিদ্য গ্রিম রীপার। পাসোলিনির দৃষ্টিকোণের সঙ্গে তাঁর মিল-অমিল এই ছবিতেই স্পষ্ট হয়ে যায়। ছবিটিতে রশোমন ও সিটিজেন কেনের প্রভাব আছে। পরের ছবি ও প্রক্বতপক্ষে [প্রকৃতপক্ষে] তাঁর প্রথম স্বাধীন ছবি বিফোর দি রেভলিউশন। এই ছবি থেকেই তাঁর সৃষ্টিতে মার্কস ও ফ্রয়েডের, বামপন্থী রাজনীতি ও উগ্র আবেগের তীব্র ও দ্বন্দ্ববিধুর সহবাস শুরু হয়। যে উগ্রতা প্রায়ই মুক্তপ্রাণ যৌনতার রূপ নেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ও দ্বান্দ্বিকতার দিক থেকে তিনি বিশেষভাবে গদারের দ্বারা প্রভাবিত।১
দ্বিতীয় চলচ্চিত্র বিফোর দ্য রেভল্যুশন তাকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। চলচ্চিত্রটি কান-এ ক্রিটিকস উইকের তালিকায় স্থান পায় আর বেরনার্দোও প্রতিষ্ঠা পেয়ে যান নির্মাতা হিসেবে।
১৯৬৬-তে বেরনার্দো টেলিভিশনের জন্য নির্মাণ করেন IL CANALE । তবে এটি তেমন সাড়া জাগায়নি। চতুর্থ চলচ্চিত্র পার্টনার, যেটি দস্তয়েভস্কির উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত, তাকে আবার সর্বজন সম্মুখে নিয়ে আসে। এর পরের কাজ Agonia (১৯৬৯) বেরনার্দোকে তেমন তুলে ধরে না।
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দেই বেরনার্দো বের্তোলুচির প্রকৃত আবির্ভাব ঘটে দ্য কনফরমিস্ট-এর মধ্য দিয়ে। আলবার্তো মোরাভিয়ার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্রে তিনি ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে অভিনয়শিল্পী নেন। বিশেষ করে মুখ্য চরিত্রে শক্তিমান ফরাসি অভিনয়শিল্পী জ্যঁ লুই ত্রিতিঙগা’র অভিনয় দ্য কনফরমিস্টকে দুর্দান্ত সাফল্য এনে দেয়। এটি বিশ্বচলচ্চিত্রে বেরনার্দোকে অধিষ্ঠিত করে প্রথমবারের মতো। নির্মাতা হিসেবে বেরনার্দো অর্জন করেন প্রথম অস্কার মনোনয়ন। সমালোচকদের মতে, দ্য কনফরমিস্ট বেরনার্দোর জীবনের একটি সেরা কাজ, যেটি সেই সমসাময়িক নির্মাতা ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা, মার্টিন স্করসিস, স্টিভেন স্পিলবার্গদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। এ চলচ্চিত্রের পর ১৯৭০-এ তিনি নির্মাণ করেন তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ দ্য স্পাইডার’স স্ট্র্যাটাজেম।
সমালোচকদের অনেকেই পার্টনার, দ্য কনফরমিস্ট ও দ্য স্পাইডার’স স্ট্র্যাটাজেম-এর মধ্যে মিল খুঁজে পেলো। কেউ কেউ এই তিনটি চলচ্চিত্রকে বেরনার্দোর রাজনৈতিক ট্রিলজি বলেও অভিহিত করে। মিহির সেনগুপ্তের মতে,
এই ছবি তিনটিতে রাজনৈতিক মতবাদের উপস্থাপনায় সচেতন প্রত্যয় ও চিত্রভাষায় বিস্ময়কর পারদর্শিতা আছে। এদের রাজনৈতিকও বলা যায়, আবার অনেক দূর পর্যন্ত এরা মনস্তাত্ত্বিকও। বস্তুত রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত তথা মনস্তাত্ত্বিক অনুষঙ্গের সংমিশ্রণের ক্ষেত্রে বের্তোলুচ্চি ততদিনে প্রধান শিল্পী, এক অসাধারণ শক্তিশালী ও উজ্জ্বল চলচ্চিত্রকার। তার ছবিতে তখন মিশে আছে কাব্যময়তা, দ্বান্দ্বিকতা ও দৃশ্যাড়ম্বর।২
এদিকে ততোদিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিনয়শিল্পীরা বেরনার্দোর সঙ্গে কাজ করতে উতলা হয়ে উঠেছে। অনেক মার্কিন, সুইডিশ, ফরাসি ও জার্মান প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তার জন্যে উদগ্রীব। তিনিও চাইছিলেন একটু হাত ছড়িয়ে কাজ করতে। সিদ্ধান্ত নিলেন হলিউডে গিয়ে কাজ করার।
হলিউড যাত্রা এবং লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস পর্ব
বেরনার্দো বের্তোলুচির জীবনে হলিউড পর্বটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। প্রতিনিধিত্বশীল চলচ্চিত্রগুলো এ পর্বেই তিনি নির্মাণ করেন। পরস্পর বিরোধিতা, অতিরিক্ত যৌনতা, অহেতুক ক্লাইম্যাক্স এসব অভিযোগ এবং নানা রকমের স্ক্যান্ডাল (যার কোনোটাই সত্য নয় বলে পরে প্রমাণিত) নিয়ে হলিউড যাত্রার প্রথম পর্বে অবশ্য তিনি যথেষ্ট বিতর্কিত হয়ে পড়েন। মূলত লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিসকে কেন্দ্র করেই এতোসব তর্ক-বিতর্ক।
১৯৭১-এ বেরনার্দো হলিউডে যান। এর আগে ইতালিতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দেই La Salute e Malada ও 12 December নামে দুটি চলচ্চিত্র তিনি নির্মাণ করেন। এরপর অনেকটা পাকাপাকিভাবে হলিউডে থিতু হন। হলিউডে গিয়ে তিনি পরিকল্পনা করেন লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস নির্মাণের। ইতোমধ্যেই হলিউডের অনেক নামকরা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তাকে আমন্ত্রণ জানায়। তবে তিনি এর নির্মাণে ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিকে যুক্ত করতে চাইলেন। এই তিন দেশ থেকে প্রযোজক যেমন নিলেন, তেমনই নিলেন কলাকুশলীও। মূল চরিত্রে মার্লোন ব্রান্ডো (হলিউড), মারিয়া স্নাইডার (জার্মানি), জ্যঁ পিয়েরে লেয়াদ (ফ্রান্স) ও ম্যাসিমো জিরোতি’কে (ইতালি) নিলেন। সিনেমাটোগ্রাফার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে নিলেন তার প্রিয় দুই সহকর্মী ভিত্তোরিও স্তোরারো ও গ্যাটো বারবিয়েরি’কে। এককথায় একটি বহুজাতিক চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রত্যেকেই দুর্দান্ত কাজ করলেন অভিনয় ও কারিগরি কুশলতায়। কিন্তু চলচ্চিত্রের কাহিনিরেখা ও বক্তব্যের সাহসিয়ানা এটাকে একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও চরম বিতর্কিত করে তুললো। মধ্যবয়সি এক মার্কিনি ও একজন ফরাসি তরুণীর উদ্দাম প্রেম চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য। এ ধরনের কাহিনিরেখায় আরো অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও প্রয়োগ শৈলী এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন ও অবাধ যৌনতার চিত্রায়ণের কারণে এটি যথেষ্ট বিতর্কিত হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও নিষিদ্ধও হয়। বিশেষ করে চলচ্চিত্রের একটি ধর্ষণদৃশ্য নিয়ে নানা মহলের দর্শক ও সমালোচকদের এখনো অনেক আপত্তি। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস (১৯৭২) বেরনার্দো বের্তোলুচির একটি অসাধারণ কাজ। মার্লোন ব্রান্ডো ও মারিয়া স্নাইডারের দুর্দান্ত অভিনয় চলচ্চিত্রাভিনয়ের দুটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। চলচ্চিত্রটি যখন বিশ্বজুড়ে বিতর্কের ঝড় তোলে, তখন মার্লোন ব্রান্ডো, মারিয়া স্নাইডারও নানান অভিযোগ তোলেন। তারা বলেন, শুটিংয়ের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বেরনার্দো নাকি বিশেষ ওই দৃশ্যটি সম্পর্কে তাদের কিছু বলেননি এবং চিত্রনাট্যেও বিশদে তা ছিলো না। কিন্তু বেরনার্দো তখন এবং পরেও দীর্ঘদিন এ বিষয়ে মুখ খোলেননি।
তবে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে বেরনার্দো সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব বলে দিয়েছিলেন টিমের সবাইকে। তিনি আরো বলেন, তখন যেটাকে ভালগারিটি ও ভায়োলেন্স বলে সবাই তাকে দোষী করেছিলো, এমনকি মারিয়া স্নাইডারও এই অভিযোগ করেছিলেন, তিনি দীর্ঘ সময় নিয়েছেন এটার উত্তর দিতে; কারণ সময়ই সঠিক উত্তর দেবে, সময়ই বলবে এই দৃশ্য কিংবা এসব দৃশ্য বাস্তবসম্মত, শিল্পসম্মত ও কাহিনি অনুগ ছিলো। মিহির সেনগুপ্ত বলেন,
বিপ্লবাত্মক মনোভাব ও প্রত্যক্ষ যৌনতা, এই দুয়ের সংমিশ্রণ আরও বিতর্কিত, আরও বিস্ফোরক, প্রায় চূড়ান্তরূপ পায় লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস (১৯৭২)-য়ে। ব্র্যাণ্ডোর অনবদ্য অভিনয়ে, চমকপ্রদ রঙের প্রয়োগে ও অসাধারণ নির্মাণ পদ্ধতিতে সমৃদ্ধ এই ছবি কামনা ও যন্ত্রণা ও হতাশার (নায়কের ও নায়কের স্ত্রীর একাকিত্ব, নায়কের নায়িকার ওপর ধর্ষকামী আচরণ, নায়কের স্ত্রীর আত্মহত্যা, নায়িকার নায়ককে হত্যা) এক ক্বষ্ণ [কৃষ্ণ] চিত্ররূপ। কিন্তু তাও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে জড়িত।৩
অবারিত যাত্রা
লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস বেরনার্দোকে সারাবিশ্বে পরিচিত করে তুললো। নিত্য নতুন বিষয় বৈচিত্র্য ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার অন্বেষণ তাকে করে তুললো সাহসী। কারণ এই চলচ্চিত্রটির জন্য তাকে অনেক কোর্ট-কাচারিও করতে হয়। এমনকি প্রিন্ট নষ্ট করে ফেলারও হুকুম জারি হয়। শেষে ইতালির বোলোগনা আদালত আপিল রুল নিশি জারি করে বলেন, পুরো ব্যাপারটিই বেরনার্দোর ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার বিরোধী। তারা চলচ্চিত্রের ওপর বিধি-নিষেধ জারিতে আপত্তি তুলে এটি সবখানে প্রদর্শনের অনুরোধ করেন এবং তিনটি প্রিন্ট ইতালির জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভসে সংরক্ষণের আদেশ দেন। আসলে এসব কোর্ট-কাচারি, শিল্প-সংস্কৃতির অনেক ক্ষতি করেছে; বিশ্বজুড়ে তার অগুনতি উদাহরণ রয়েছে।
যাহোক এরপর বেরনার্দো একে একে নির্মাণ করলেন ১৯০০ (১৯৭৬), লা লুনা (১৯৭৯),L’addio a Enrico Berlinguer (১৯৮৪), দ্য শেলটারিং স্কাই (১৯৯০), স্টিলিং বিউটি (১৯৯৬), টেন মিনিটস ওল্ডার : দি চেলো (২০০২) এবং শেষ মি অ্যান্ড ইউসহ (২০১২) ১৩টি চলচ্চিত্র।
এর সবকটি চলচ্চিত্র সমান তালের না হলেও একের পর এক তার ক্রমোন্নতি লক্ষণীয়। চলচ্চিত্রগুলো ক্রমশ সাহিত্য, চিত্রকলা, অপেরার প্রভাবে সমৃদ্ধ হতে থাকলো। বিষয় বৈচিত্র্য ও নির্মাণের আঙ্গিকে প্রতিটি চলচ্চিত্র ভিন্ন রকমের। নিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা তিনি চালিয়ে গেছেন। নির্দিষ্ট কোনো শৈলীতে বৃত্তাবদ্ধ থাকেননি। ফলে বেরনার্দো বের্তোলুচির আঙ্গিক বলে কিছু গড়ে ওঠেনি বা গড়ে ওঠার সুযোগ তিনি দেননি। ক্যামেরা শৈলী ও দৃশ্য রচনার মুন্সিয়ানায় প্রতিটি চলচ্চিত্রই অন্যতম সেরা। বিশেষ করে ১৯০০, দ্য লাস্ট এম্পেরর, বিসিজড, লিটল বুদ্ধ ও দ্য ড্রিমারস। এই চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে দ্য লাস্ট এম্পেরর ও লিটল বুদ্ধ সারাবিশ্বের সাধারণ ও সচেতন দর্শককে তৃপ্ত করতে পেরেছে। আর বিসিজড ও দ্য ড্রিমার্স সচেতন দর্শকের কাছে উল্লেখযোগ্য দুটি চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচিতি পায়।
১৯০০, যে চলচ্চিত্রটির অন্য নামNovecento; এর বিষয়বস্তু ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত ইতালির সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। সমালোচকরা Novecento কে ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের মর্যাদা দিয়েছে। আবার দ্য ড্রিমার্স ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের ছাত্র আন্দোলনের ঘটনার সঙ্গে তিন তরুণ চিত্র-রসিকের সম্পৃক্ততার মনোগ্রাহী চিত্রায়ণ। বিসিজডও চরম মানবিক আবেদন সম্পন্ন চলচ্চিত্র--একজন শ্বেতাঙ্গ মেডিকেল শিক্ষার্থী ও একজন কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান শরণার্থীর সম্পর্কের আবর্তে এর আখ্যান গড়ে উঠেছে। আফ্রিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে চমৎকার ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফি সমৃদ্ধ অসাধারণ চলচ্চিত্র বিসিজড। ১৯০০-তে বেরনার্দো একত্রিত করেছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিনয়শিল্পীদের। যদিও চলচ্চিত্রটি ইতালিয় পটভূমিতে নির্মিত। এতে হলিউড থেকে যেমন ছিলেন রবার্ট ডি নিরো, ডোনাল্ড সাদারল্যান্ড, তেমনই ব্রিটেন থেকে ছিলেন বার্ট লাঙকাস্টার, স্টার্লিং হেডেন, ফ্রান্স থেকে জেরার দেপারডিউ ও ডমিনিক সান্দা। সারাবিশ্বকে একই করতলে আনার এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের বিশ্বাস তিনি অর্জন করেছিলেন মার্কসীয় মানবিক দর্শন থেকে।
দ্য লাস্ট এম্পেরর ও লিটল বুদ্ধ পর্ব
১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে বেরনার্দো নির্মাণ করেন তার চলচ্চিত্রকাব্য দ্য লাস্ট এম্পেরর । চিনের শেষ সম্রাট আইসিন জিয়োরো পুয়ি’র জীবনকাহিনি এ চলচ্চিত্রের উপজীব্য। বায়োপিক ঘরানার হলেও চলচ্চিত্রটি তিনি সে আঙ্গিকে নির্মাণ করেননি। এক মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপটে বেরনার্দো অনেকটা নিজের মতো করে নির্মাণ করলেন চলচ্চিত্রটি। এটাকে তিনি বায়োপিক বলতেও রাজি ছিলেন না। দ্য লাস্ট এম্পেরর-এ তিনি প্রযোজক হিসেবে পেয়েছিলেন বিখ্যাত বৃটিশ প্রযোজক জেরেমি থমাসকে, যার সঙ্গে বেরনার্দোর আগেও কাজের অভিজ্ঞতা ছিলো। তবে জেরেমি নিজের ইচ্ছায় এককভাবে এই বিশাল বাজেটের চলচ্চিত্রটি প্রযোজনার দায়িত্ব নেন। বেরনার্দো মার্ক পেপলোর সঙ্গে যুতভাবে দ্য লাস্ট এম্পেরর-এর কাহিনি ও চিত্রনাট্য রচনা করেন। চলচ্চিত্রটিতে চিনকে রাজতন্ত্রের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়ার চিত্র পাওয়া যায়। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে রেড আর্মি যখন বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষ সম্রাট পুয়িকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে বিচারের জন্যে কারাগারে আটকে রাখে, তখন তিনি সেখানে স্মৃতিচারণের মাধ্যমে শৈশব এবং যৌবনের স্বেচ্ছাচারী ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনের কথা ভাবতে থাকেন। সেসময়ের নিষিদ্ধ নগরী বেইজিংয়ের নানা দৃশ্য ভাবতে থাকেন তিনি। ফ্ল্যাশব্যাকে চমৎকারভাবে চলচ্চিত্রে তা দেখানো হয়। চিত্রভাষার এক অপূর্ব সন্নিবেশ ঘটেছে বেরনার্দোর এ চলচ্চিত্রে। পুয়ির চরিত্রে অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন জন লোন। এই চলচ্চিত্রটিতেও চিন, জাপান ও আমেরিকার অভিনয়শিল্পীরা কাজ করে; জন লোন, পিটার ও টুল হলিউড থেকে, জাপান থেকে রাইয়ুচি সাকামোতো ও চিন থেকে জোয়ান চেন, ভিকটর ওয়াঙ।
দ্য লাস্ট এম্পেরর বেরনার্দোকে প্রথম অস্কার এনে দেয়। তাও নয় নয়টা। ৬০তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে এটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, নির্মাতা, চিত্রনাট্য, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, কস্টিউম ডিজাইন, শিল্প নির্দেশনা, সঙ্গীত ও শব্দের জন্য পুরস্কার অর্জন করে। দ্য লাস্ট এম্পেরর হচ্ছে প্রথম কোনো বিদেশি চলচ্চিত্র, যেটিকে চিন সরকার সে দেশে চিত্রায়ণের অনুমতি দেয় এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে। চলচ্চিত্রটি চিনে প্রদর্শিতও হয়।
এরপর ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে বেরনার্দোর আরেকটি স্মরণীয় কাজ লিটল বুদ্ধ । এটিও আরেকটি মহাকাব্যিক কাজ। এই চলচ্চিত্রটির দুটি স্তর। মহামতি বুদ্ধের জীবনকাহিনির সমান্তরালে এতে বৌদ্ধ ধর্মের জন্মান্তরবাদ দর্শন ও অবতার তত্ত্বের চমৎকার সন্নিবেশ ঘটেছে। তিব্বত সন্নিহিত নেপাল ও ভারতের (চলচ্চিত্রটির বর্তমান প্রেক্ষাপট তিব্বত ও অতীত প্রেক্ষাপট ভারত) বিভিন্ন অঞ্চলে নয়নাভিরাম দৃশ্যায়ন ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দুর্দান্তভাবে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন বেরনার্দো। নিঃসন্দেহে এটি তার নির্মাতা জীবনের অন্যতম সেরা কাজ। লিটল বুদ্ধতেও তিনি ইউরোপ, আমেরিকা ও ভারতবর্ষের নামকরা বিভিন্ন অভিনয়শিল্পীকে নেন। বিশেষ করে সিদ্ধার্থের চরিত্রে কিয়ানু রিভস, শুদ্ধোধনের চরিত্রে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং মার্কিনি সমন্বয়কের চরিত্রে ক্রিস আইজাকের স্মরণীয় অভিনয় চলচ্চিত্রটিকে অনন্যতা দিয়েছে। এতে আরো অভিনয় করেন হলিউডের ব্রিজেট ফন্ডা, জার্মানির আলেক্স ভিয়েসেনডেঞ্জার। চলচ্চিত্রটির অসাধারণ সঙ্গীতায়োজন করেছিলেন জাপানের রাইয়ুচি সাকামোতো (দ্য লাস্ট এম্পেরর-এর অভিনয়শিল্পী ও সঙ্গীতকার)। বেরনার্দো এতে কাব্যধর্মী সিনেমাটোগ্রাফি করেছিলেন প্রিয় চিত্রগ্রাহক ইতালির ভিত্তোরিও স্তোরাতোকে দিয়ে। এর মূল প্রযোজক বৃটেনের জেরেমি থমাস হলেও বেরনার্দো সঙ্গে নিয়েছিলেন ফ্রান্স, ইতালি ও হলিউডের প্রযোজকদের। সোজা কথায় বেরনার্দো চলচ্চিত্রটিতে সারাবিশ্বের সম্পৃক্ততা চেয়েছিলেন।
কথা ছিলো ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের বসন্তে বেরনার্দো তার নতুন চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করবেন। চিত্রনাট্যও প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু মরণদূত ক্যান্সার তা আর সম্ভব হতে দিলো না। ফুসফুসের ক্যান্সার ৭৭ বছর বয়সে কর্মক্ষম এক সদাচঞ্চল শিল্পস্রষ্টাকে থামিয়ে দিলো ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬ নভেম্বর সকালে। প্রিয় শহর রোমেই তার জীবনাবসান হয়। জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনি নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন। শেষ চলচ্চিত্রটি করেন ২০১২ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই। মি অ্যান্ড ইউ--এই চলচ্চিত্রটি তিনি করেন প্রখ্যাত ইতালিয় ঔপন্যাসিক নিকোলো আমানিতি’র একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে। বেরনার্দো এর চিত্রনাট্য করেছিলেন আমানিতি ও উমবার্তো কন্তারেলো’কে সঙ্গে নিয়ে। থ্রি ডাইমেনশন পদ্ধতিতে চলচ্চিত্রটি তিনি করতে চেয়েছিলেন। পরে অধিক বাজেটের কারণে সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে মি অ্যান্ড ইউ-এর একটি বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় কান উৎসবে।
বেরনার্দোর রাজনীতি
কাল মার্কসে বেরনার্দোর বিশ্বাস জন্মেছিলো বাবার সূত্রে। পরে সেটা আরো পোক্ত হয় গুরু পাসোলিনির সংস্পর্শে। রাজনৈতিক এই মূল্যবোধ তিনি আজীবন জারিত রাখতে পেরেছিলেন নিজের মধ্যে। প্রচলিত কোনো ধর্ম বিশ্বাসে তার আস্থা ছিলো না। বেরনার্দোর প্রতিটি চলচ্চিত্রই রাজনৈতিক। চলচ্চিত্রকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন নিজের রাজনৈতিক দর্শন প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। দ্য কনফরমিস্ট-এ ফ্যাসিজমকে প্রচণ্ডভাবে আক্রমণ করেছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রটিতে মুসোলিনির প্রচণ্ড রকমের সমালোচনা ছিলো।
এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে নিয়মিতভাবেই সোচ্চার থেকেছেন বেরনার্দো। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে যে কজন সাহসী মানুষ রোমান পোলানস্কি’র মুক্তি দাবিতে সুইজারল্যান্ড সরকারের বিরুদ্ধে স্বাক্ষর অভিযানে শরিক হয়, বেরনার্দো বের্তোলুচি তাদের অন্যতম।
২০১৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের সাভারে গার্মেন্ট রানা প্লাজায় যে ভয়াবহ, নির্মম দুর্ঘটনা হয়, তার প্রতিবাদেও সোচ্চার হয়েছিলেন বেরনার্দো। এমনকি ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৪ এপ্রিল তিনি তার টুইটারে বিভিন্ন ফ্যাশন শোয়ের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে তাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন রানা প্লাজার শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের কথা।
নিজের জীবনে
বেরনার্দোর পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের কথা শুরুর দিকেই বলেছি। পাশ্চাত্য জীবনধারার মূল্যবোধের সঙ্গে অনেকটাই পার্থক্য ছিলো তাদের জীবন চর্যায়। বরং তার সাদৃশ্য পাওয়া যায় প্রাচ্যরীতির সঙ্গে। তার পুরো পরিবার শিক্ষাদীক্ষায় যেমন উন্নত, তেমনই শিল্প-সংস্কৃতির চর্চায় নানাভাবে সম্পৃক্ত ছিলো। বেরনার্দোর একমাত্র কনিষ্ঠ ভ্রাতা জিউসেপ ছিলেন নাট্যকার ও নাট্য পরিচালক। আর চাচাতো ভাইয়ের ছেলে জিয়োভান্নি বের্তোলুচি ইতালির স্বনামখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজক।
১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে বেরনার্দো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ইতালিয় অভিনয়শিল্পী মারিয়া পাওয়া মাইনোর সঙ্গে। এই সম্পর্ক অক্ষুণ্ন ছিলো ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে মারিয়ার আকস্মিক প্রয়াণ পর্যন্ত। সাত বছর বিরতির পর ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে বেরনার্দো বিয়ে করেন বৃটিশ চিত্রনাট্যকার, নির্মাতা ও প্রযোজক ক্লারে পেপলো (Clare Peploe) কে। ক্লারে নিজে ১০টির বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এগুলোর মধ্যে দ্য ট্রায়াম্ফ অফ লাভ, রাফ ম্যাজিক, হাই সিজন, কাপলস অ্যান্ড রোবারস বেশ বিখ্যাত।
বেরনার্দোর অনেক চলচ্চিত্রের সহচিত্রনাট্যকার ক্লারে ছিলেন তার বাকি জীবনের সঙ্গী। দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছরের এই দাম্পত্য জীবন পশ্চিমা বিশ্বে প্রায় ব্যতিক্রম। বিশেষ করে গণমাধ্যমের জগতে তো অবশ্যই।
লেখক : শৈবাল চৌধূরী, একাধারে চলচ্চিত্রনির্মাতা, লেখক এবং সভাপতি, চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্র। এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে চলচ্চিত্র পড়ান।
https://www.facebook.com/shaibal.chowdhury.56
তথ্যসূত্র
১. সেনগুপ্ত, মিহির (১৯৯৪ : ৩৭৬); ‘বেরনার্দো বের্তোলুচি’; চলচ্চিত্র অভিধান; সম্পাদনা : ধীমান দাশগুপ্ত; বাণীশিল্প, ভারত।
২. প্রাগুক্ত; সেনগুপ্ত (১৯৯৪ : ৩৭৭)।
৩. প্রাগুক্ত; সেনগুপ্ত
(১৯৯৪ : ৩৭৭)।
বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) সংখ্যায় ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন