Magic Lanthon

               

সারা মনামী হোসেন

প্রকাশিত ০৪ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ক্যামেরা সুরের জাদুকর আনোয়ার হোসেন

সারা মনামী হোসেন



কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার একটি কবিতায় বলেছিলেন, ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি/ দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী!’ কিন্তু বাস্তবতা বলে, কপালে যে কয়টি পয়সাই জুটুক না কেনো, আগে খেয়ে-পরে জান বাঁচানো প্রয়োজন। বাদবাকি পরে দেখা যাবে। সত্যেন্দ্রনাথের মতো যারা ভাবতে পারে, তারা জীবনকে ভিন্ন চোখে দেখে, বোঝার চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টা থেকেই মনের মধ্যে জন্ম নেয় স্বপ্ন; সেই স্বপ্ন ডানা মেলে উড়তে শেখে, বলতে শেখে নতুন কোনো গল্প। 

দুই.

পুরান ঢাকার আগানবাব দেউড়ি। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে এর সরু গলিতে থাকা বেড়ার ঘরে জন্ম নিলো এক শিশু। দরিদ্র পরিবারে শিশুটি ভোরে উঠে পড়াশোনা করে বেরিয়ে পড়তো বস্তা নিয়ে। এলাকার বাজারে কাঠ চেরা হতো, সেই কাঠ বস্তায় ভরে সে বাড়িতে আনতো। কারণ কাঠ কিনে রান্না করার মতো অবস্থা তাদের ছিলো না। এদিকে স্কুল থেকে বিভিন্ন সময়ে শিশুটি বৃত্তি পেলেও মাসিক বেতন পরিশোধ করতে পারতো না সময়মতো। ফলে তিন মাস পর পর হাজিরা খাতা থেকে তার নাম কাটা পড়তো; ছিলো না স্কুলের পোশাকও। তবে চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত অফিসে বাবার চাকরির সুবাদে ছেলেটি প্রচুর চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পেয়েছিলো। চলচ্চিত্রের পোস্টারে ঘর ভরা ছিলো তার। এই পোস্টারগুলোর নান্দনিকতা দেখে প্রথমে শিশুটি চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও, কলেজ জীবনে এসে বৃত্তির টাকায় কিনে ফেললেন আগফা ক্লাক ক্যামেরা। সেই ছবি তোলার নেশা নতুন করে জন্ম দিলো আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনকে। যিনি এ দেশে ক্যামেরার ভাষাকে শিল্পের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তিন.

আনোয়ার হোসেন ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ভর্তি হন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। ছবি তোলার নেশা তখন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বৃত্তির টাকায় বন্ধুর কাছ থেকে ৩০ টাকা দিয়ে কেনা ক্যামেরা নিয়ে ভোর হতেই তিনি ছুটে যেতেন বুড়িগঙ্গার পাড়ে। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে পড়ার সুযোগ পেয়ে যান পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে। এরপর ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফিরে সূর্য দীঘল বাড়ী’র চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেটাই ছিলো আনোয়ারের প্রথম চলচ্চিত্র। পরে চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রাহক হিসেবে তিনি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

    প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক আবু ইসহাকের উপন্যাস অবলম্বনে শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহ্উদ্দিন শাকের পরিচালিত এ চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে প্রথম সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর নাটোরের একটি প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্রটি প্রথম মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি পরে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও পরিচালকসহ আটটি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পায়। ওই বছরই চলচ্চিত্রটি ছয়টি বিভাগে বাচসাস পুরস্কারও লাভ করে। বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র আসরে অংশ নিতে এটিকে ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে ম্যানহেইম চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে তিনটি পুরস্কার ও পর্তুগালে ফিগুএরা দ্য ফোজ উৎসবে অর্জন করে একটি পুরস্কার। ডন কিহটে পুরস্কারও পায় এটি।

    অর্থ সঙ্কটে অপেক্ষাকৃত কম দামের ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিলো সূর্য দীঘল বাড়ী। মাত্র ২১ দিনে এর কাজ শেষ করা হয় শুধু অর্থের অভাবে। অথচ দৃশ্যগুলো কতোটা বাস্তব, নিরেট তা চলচ্চিত্রটি না দেখলে বোঝা অসম্ভব! আবু ইসহাক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন উপন্যাসটি। গল্পের মূল চরিত্র জয়গুন সমাজের শ্রেণি বৈষম্য ও পুরুষতান্ত্রিকতার যাঁতাকলের বিরুদ্ধে টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত এক নারী। স্বামী তাকে ঘর থেকে বের করে দেন। বেঁচে থাকার জন্য ছেলে-মেয়ে নিয়ে শহরে পাড়ি জমান তিনি; কিন্তু কাজ না পেয়ে গ্রামেই ফিরতে হয়। সমাজ তাকে খাবারের যোগান দেয় না, অথচ কাজের সন্ধানে গ্রামের বাইরে গেলে ফতোয়া জারি করে। বয়স কম বলে পুরুষের লোলুপ দৃষ্টিও পড়ে তার শরীরে। কিন্তু জয়গুন হেরে যাওয়ার মানুষ নন। অবশেষে চক্রান্ত করে তাকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে সমাজপতিরা। নিজের সন্তান ও ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তিনি অজানার পথে পা বাড়ান। সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষের প্রতিদিনের এই সংগ্রামের গল্প শোনার কোনো মানুষ নেই। জয়গুনদের কষ্ট তাই চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

চার.

চলচ্চিত্রের ভাষা হলো ইমেজ। আর এই ইমেজকে ধারণ করার কাজটি করে সিনেমাটোগ্রাফার বা চিত্রগ্রাহক। শিল্পী যেমন কাগজে তুলির আঁচড় কাটে, চিত্রগ্রাহক সেই কাজটি করে ক্যামেরা দিয়ে। গল্প অনুযায়ী গোধূলির রঙ কিংবা মানুষের অনুভূতি ফুটিয়ে তোলে তারা। কৌশলে নিজেকে লুকিয়ে রেখে অন্যের চোখ খুলে দেওয়ার চেষ্টা করে একজন চিত্রগ্রাহক। নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহকের জুটি তাই হওয়া চাই শক্তিশালী। পরিচালক যা চাইবে, চিত্রগ্রাহক ফুটিয়ে তুলবে তার গভীরতম অর্থ। অস্কারজয়ী স্প্যানিশ চিত্রগ্রাহক নেস্তোর আলমেন্দ্রোস-এর মতে, নির্মাতা হলো একটি চলচ্চিত্রের চালিকাশক্তি।

    ইতালির চলচ্চিত্রকার মাইকেল অ্যাঞ্জেলো আন্তোনিওনি একবার বলেছিলেন, মানুষ হিসেবে একজন নির্মাতার যেমন আইডিয়া আছে, তেমনই শিল্পী হিসেবে কিছু কল্পনাও আছে। প্রতিদিন সে যা দেখে তা থেকেই তৈরি হয় নতুন কোনো সৃষ্টি। ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে তাই দিয়ে তিনি তৈরি করেন একেকটি দৃশ্য। বাংলাদেশে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র তুলনামূলক কমই নির্মাণ হয়। তারপরও আব্দুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনায় শহীদুল্লাহ কায়সারের লেখা উপন্যাস সারেং বউ (১৯৭৮), সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলামের হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭), হুমায়ূন আহমেদের লেখা ও পরিচালনায় আগুনের পরশমণি (১৯৯৪), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস অবলম্বনে তানভীর মোকাম্মেলের লালসালু (২০০১) ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা কিশোর উপন্যাস নিয়ে মোরশেদুল ইসলামের দীপু নাম্বার টু (১৯৯৬) উল্লেখযোগ্য। উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাতাকে অনেক বেশি কৌশলী হতে হয়। কারণ উপন্যাস যখন পাঠক পড়ে, তখন নিজের মতো করে এর সবকিছু কল্পনা করে নেয়। শব্দ, বাক্য ও রূপকল্প মিলিয়ে একটি বিচিত্র পৃথিবী তার সামনে তৈরি হয়। অন্যদিকে নির্মাতা যখন সেই পাঠককে দর্শকে রূপান্তর করে, তখন তার কল্পনাশক্তি এমন হতে হয় যাতে দর্শক নতুন কিছু পায়, আবার পাঠক হিসেবে সে যেভাবে ভেবেছিলো তাই যেনো খুঁজে পেতে সক্ষম হয়। সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের এই সঙ্কট চিরন্তন।

    নির্মাতার সঙ্গে সঙ্গে জটিল এ বিষয়টি তাই মাথায় রাখতে হয় চিত্রগ্রাহককেও। সবসময় নির্মাতা যেভাবে বলে সেভাবেই চিত্রগ্রাহককে কাজ করতে হবে, তা নয়। অনেক সময় চিত্রগ্রাহক তার শিল্পী মন দিয়ে তৈরি করতে পারে নান্দনিক ও অর্থপূর্ণ কোনো দৃশ্য। সূর্য দীঘল বাড়ী’র ক্যামেরার কাজ ‘জীবন্ত ছবির মতো’ বলে মন্তব্য করেছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আলোকচিত্র শিল্পী থেকে চিত্রগ্রাহক হয়ে ওঠার গল্পে আনোয়ার হোসেনকে দেখা যায়, খণ্ড খণ্ড শট্ ডিভিশন ব্যবহার করতে। জুম ইন ও জুম আউটের ব্যবহার, ফ্রেমের ভিতর ফ্রেমও (ফ্রেম উইদ ইন ফ্রেম) আছে কিছু জায়গায়, প্যানিং-রিভার্স প্যানিং এর ব্যবহারও আছে। এছাড়া ক্লোজ আপ, চোকার (শুধু চরিত্রের ভ্রু থেকে থুতনি পর্যন্ত শট্), মিড ক্লোজ আপ, মিড লঙ শট্, লঙ শট্, ফুল শট্, হাই অ্যাঙ্গেল শট্, লো অ্যাঙ্গেল শট্ প্রভৃতি খুব পরিশীলিতভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন আনোয়ার। যা চলচ্চিত্রটিকে আলাদা ছন্দ ও গতি দিয়েছে।

    চলচ্চিত্রের শুরুতে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিমান, বোমা বর্ষণের কিছু দৃশ্য; সত্যিকারের কিছু ফুটেজ। এরপরই আসে বস্তায় ভরা আনাজ আর জয়নুল আবেদীনের আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবি, হাড় জিরজিরে মৃত শিশু, উড়ে বেড়ানো শকুন আর ক্ষুধায় ক্রন্দনরত শিশুদের ছবি। এগুলো স্ট্যাবলিশিং শট্। গল্পের প্রেক্ষাপট দর্শককে জানান দেওয়ার জন্য এ ধরনের শট্ নেওয়া হয়ে থাকে। ছবির ক্রেডিট লাইনে এর পর দেখা যায় ক্যামেরা ডলি শটে চলছে শহরের বস্তির সামনে দিয়ে। লঙ শটে হঠাৎ এক নারীকে দেখা যায় দেয়ালে গোবর লেপতে। পর মুর্হূতেই স্ন্যাপ জুম শটে এসে তার চেহারা ও অভিব্যক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরের ক্লোজ শটে বাতাসে ক্ষেতের ধানের দোলা দেখতে দেখতে এক্সট্রিম লঙ শটে আসে কিছু মানুষ। ক্ষেতের কিনার ধরে আসতে থাকা বিভিন্ন বয়সি মানুষগুলোকে তখনো দর্শক চিনতে পারে না। ক্ষেত পার হয়ে বাঁশ বাগানের দিকে আসতেই ক্যামেরা জুম করে চলে যায় শহরের সেই নারীর দিকে। কিছুক্ষণ পরই দর্শক ফুল শটে ওই নারীর পরিচয় যে জয়গুন তা জানতে পারে। ফুল শটের বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে চরিত্রের আবেগ বা অনুভূতির চেয়ে তার কর্মকাণ্ডকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। আনোয়ার হোসেন এখানে জয়গুন ও তার পরিবারের লো অ্যাঙ্গেল একটি শটও নেন। শহরে থেকে দুর্দশাগ্রস্ত জয়গুন গ্রামে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, তারই ইঙ্গিত বহন করে শটটি।


জুম শটের বেশ ভালো রকম ব্যবহার এ চলচ্চিত্রে লক্ষ করা যায়। দৃশ্যপটে পরিবর্তন আনা কিংবা নাটকীয়তা বাড়াতে এ ধরনের শটের প্রচলন আছে। জয়গুন যখন অন্যের বাড়িতে মাটি লেপতে গিয়ে গৃহকর্ত্রীর বকা খান, তখন শটটি জুম আউট হতে শুরু করে। হাসু মালামাল মাথায় নিয়ে যাওয়ার সময় কিংবা হাঁস আনার খুশিতে মায়মুনের উচ্ছ্বাসে এর ব্যবহার দেখা যায়। বাজারে বেহালাবাদকের সুর আর চলচ্চিত্রের শেষে কেরামত মওলার মৃতদেহ হাই অ্যাঙ্গেল থেকে জুম করে আনা হয়। এ ধরনের জুম শটের ব্যবহার চলচ্চিত্রে দেখা যায় মাঝেমধ্যে। এ ধরনের শট্ কোনো বিষয় বা বস্তুকে কাছ থেকে দেখা এবং আশপাশের অন্যান্য কর্মকাণ্ড থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রেখে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এতে দর্শক ওই নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। ৬০ ও ৭০-এর দশকের চলচ্চিত্রে এ ধরনের শটের প্রচুর ব্যবহার ছিলো। বর্তমানে ডলি শটের সঙ্গে জুম ব্যবহার করা হয়। যেকোনো দৃশ্যের ক্ষেত্রে ক্যামেরা মুভমেন্ট যাতে অর্থবোধক হয় সে বিষয়টি লক্ষ রাখতে হয়।

    তবে এ দুটো শটের মধ্যে পার্থক্য আছে। ডলি শট্ হলো চাকা লাগানো প্লাটফর্মের ওপর ক্যামেরা বসিয়ে ক্যামেরাম্যানসহ তাকে এগিয়ে নেওয়া। বলা হয়, ডলি শটের ক্ষেত্রে ক্যামেরার লেন্স যখন বিষয়বস্তু বা চরিত্রের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, তখন দর্শকের মনে হয় সে হেঁটে হেঁটে কাছে চলে আসছে। এতে সে ওই বিষয় বা চরিত্রের সঙ্গে বেশি একাত্ম হয়; আর জুম হলো ফ্রেমকে বর্ধিত করা। দর্শকের মনে হতে পারে তাকে বাধ্য করা হচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু দেখার জন্য। অনেক সময় চোখের বিভ্রান্তি তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হয়। যেমন, আলফ্রেড হিচককের ভার্টিগোতে দেখা যায়, প্রেমিকাকে বাঁচাতে নায়ক জন স্কটি সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময়, নিচে থাকাতেই সিঁড়ি লম্বা হয়ে যায়। এটি করা হয়েছিলো কারণ স্কটির উচ্চতা ভীতি ছিলো। দৃশ্যটি দেখলে দর্শকেরও মনে হতে পারে, তিনি অনেক ওপরে আছেন। ক্যামেরা কোণকে একটু ভিন্নভাবে ব্যবহার করে এ ধরনের তিনটি দৃশ্য তৈরি করেছিলেন হিচকক। সূর্য দীঘল বাড়ীতে জুম শটের অন্য ধরনের ব্যবহারও আনোয়ার করেছেন। জয়গুনের পরিবার গ্রামে ঘর তোলার সময় জোবেদ ফকির দূর থেকে উঁকিঝুঁকি দেন। তার দৃষ্টি বোঝানোর জন্য তিনি জুম করেন। দর্শক জোবেদের চোখে জয়গুনদের কর্মযজ্ঞ দেখতে থাকে।

চলচ্চিত্রটিতে চোকার শটের বেশ কয়েকটি ব্যবহারও আছে। এটি অনেকটা এক্সট্রিম ক্লোজ আপ শটের মতোই। এ ধরনের শট্ মূলত ক্লোজ আপ ও এক্সট্রিম ক্লোজ আপের মাঝামাঝি হয়ে থাকে। জয়গুন গ্রামে ফিরে দাদার সঙ্গে কথা বলার সময়, জয়গুনের ছেলে হাসুর জোবেদ ফকিরের সঙ্গে কথা বলার সময় কিংবা শফির মায়ের সঙ্গে করিম বক্সের আলোচনায়--এ ধরনের শটের ফলে চরিত্রগুলোর সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি বোঝা সম্ভব হয়েছে। তবে এ ধরনের শট্ সাধারণত একটু ভেবেচিন্তে নিয়ে থাকে চিত্রগ্রাহক। কারণ সবক্ষেত্রে এটি মানানসই হয় না।

    সূর্য দীঘল বাড়ীর আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, চিত্রগ্রাহক কাট টু কাট পদ্ধতিতে এক ফ্রেম থেকে অন্য ফ্রেমে চলে গেছেন। এক্সট্রিম লঙ শটে জয়গুনদের দেখাতে দেখাতে তারা কাছে আসা পর্যন্ত এক ফ্রেম। কাছ থেকে তারা হেঁটে চলছে তখন আবার আরেকটি ফ্রেম। হাসু রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় ট্রেনের পাদানিতে বসে। এই লঙ শট্ থেকে পাদানি এবং সেখানে বসার পর আরেকটি ফ্রেম পাওয়া যায়। এছাড়া হাসু যখন রেলস্টেশনে কুলির কাজ খোঁজেন, তখন চিত্রগ্রাহক নিশ্চয় কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে হাসুর পিছনে পিছনে দৌড়েছেন। ভিড়ের মধ্যে ক্যামেরার লেন্স এমনভাবে উঁকি দেয় যে, দর্শকের মনে হয় সেও ভিড়ভাট্টার মধ্যে হাসুকে চোখে চোখে রাখছে। তিনি শহরের রাস্তা দিয়ে চলার সময়ও ক্যামেরা ঝাঁকি খায়। মানুষের যে স্বাভাবিক হাঁটা তা যে মসৃণ নয়, সেটা সবাই জানে। আনোয়ারও বিষয়টি মাথায় রেখে হয়তো কাজটি করেছিলেন। ফলে ভিড়ভাট্টা ও কোলাহলের সঙ্গে তিনি দর্শককে এক করতে পেরেছিলেন। দর্শকও যেনো হাসুকে মানুষের ভিড়ে খুঁজে বের করতে চায়।

    সূর্য দীঘল বাড়ীতে একটি চমৎকার শট্ আছে। প্যান ও রিভার্স প্যান শটের ব্যবহার দৃশ্যটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। প্যান শট্ হলো নিজ অক্ষের ওপর ক্যামেরা যখন আনুভূমিকভাবে ঘোরে। চাল বিক্রির জন্য জয়গুন যখন ট্রেনে করে যেতে থাকেন, তখন দুই ব্যক্তির মধ্যে ভারত-পাকিস্তান ভাগ নিয়ে কথা হয়। তারা মুখোমুখি বসে কথা বলতে থাকে। আর ক্যামেরা একবার প্যান ও আরেকবার রিভার্স প্যান হতে থাকে। এছাড়া পাকিস্তান নিয়ে যে ব্যক্তি আলোচনা শুরু করেন, তাকে দেখানো হয় হাই অ্যাঙ্গেল থেকে। এর মানে হলো, আলোচনাকে মূলত যৌক্তিকভাবে তিনি এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তার কথাগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চিত্রগ্রাহক দাঁড়িয়ে চলন্ত ট্রেনে শটটি নিয়েছেন বোঝা যায়।

    এখানে আরেকটি বিষয় হলো, আলোচনার শুরুতে ফ্রেম উইদ ইন ফ্রেমে পাঞ্জাবি-টুপি পরিহিত এক ব্যক্তিকে পত্রিকা পড়তে দেখা যায়। ফ্রেমের ভিতর ফ্রেমে কোনো চরিত্র বা বিষয়কে দেখানোর অর্থ হলো, পরে দেখা যায় ওই ব্যক্তি সব যৌক্তিকতাকে উড়িয়ে দিয়ে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র চাই নীতিতে বিশ্বাসী। অর্থাৎ কিছু গোঁড়া মানুষ রাজনীতির খেলা বুঝতে না চেয়ে ধর্ম ধর্ম করে জীবন পার করে দিচ্ছে, তারই প্রতীক যেনো ওই ব্যক্তি। আবার হাসু যখন লুকিয়ে তার ছোটোভাই কাসুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তখন দুই গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে হাসুকে দেখান নির্মাতা। দর্শক হাসুর সেই ভয়াতুর অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারে। ঈদের জন্য মায়মুন নতুন কাপড় চায় মায়ের কাছে। এই শটটি আনোয়ার এমনভাবে ধারণ করেন যে, মনে হয় কেউ ঘরের পাশ থেকে তাদের দেখছে।

বিশেষ ক্যামেরা কোণ, বিশেষ দৃশ্য বা ভাব-অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলে। বলা হয়, ক্যামেরা কোণের তিনটি তল আছে। আর সেগুলো হলো, ক্যামেরায় চরিত্রকে ক্ষমতাশালী করতে লো অ্যাঙ্গেল শট্, অসহায় অবস্থা বোঝাতে হাই অ্যাঙ্গেল শট্। তৃতীয়টি আই লেভেল শট্। সূর্য দীঘল বাড়ীতে কয়েকটি জায়গায় দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও মনোবলের অধিকারী জয়গুনকে লো অ্যাঙ্গেল থেকে দেখানো হয়েছে। আবার, কাসুকে নৌকায় একা দেখে জয়গুন তাকে আখ খাওয়ায়। কাসুর বাবা কেরামত বক্স এসে ঘটনা দেখে জয়গুনকে গালমন্দ করে। এ সময় কেরামতকে লো অ্যাঙ্গেল থেকে দেখান চিত্রগ্রাহক। জয়গুনকে তওবা করাতে আসা হুজুরও থাকে একই ধরনের শটে। পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা বলে একদিন স্ত্রী জয়গুনকে বাড়ি থেকে বের করে দেন তিনি। মেয়ে আর ছেলে নিয়ে জয়গুন সেখান থেকে বেরিয়ে এলেও ছোটো ছেলে কাসুকে জোর করে কেরামত রেখে দেন। দর্শক তাই বাবার কাছ থেকে হাসুকে পালাতে দেখে হাই অ্যাঙ্গেল শটে। কারণ সে অসহায়, ভীত। বাবার ছোঁড়া ইটের টুকরো থেকে বাঁচতে সে পালাতে থাকে। এছাড়া ইটভাটার শ্রমিকদেরও দেখা যায় একই শটে। কেরামত মওলার মৃত্যুর পর গেদু প্রধানের লোকেরা প্রচার করতে থাকে তাকে জ্বীন মেরেছে। অথচ হত্যা করেছে গদু প্রধান নিজেই। সহজেই ভূত-প্রেতের গল্প বিশ্বাস করে ফেলে কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামবাসী। হাই অ্যাঙ্গেল থেকে এ দৃশ্য দেখে বুঝতে বাকি থাকে না, গেদু প্রধানের অপরাধ আড়ালেই থেকে যাবে।

এক্সট্রিম লঙ শটের কিছু ব্যবহার আছে এ চলচ্চিত্রে। শুরুর দিকে একটি শটের কথা বলা হয়েছে আগেই। কাসুকে নিয়ে কেরামত যখন জয়গুনের বাড়িতে আসেন, তখন শুরুতে তাকে এ ধরনের শটে দেখানো হয়। চলচ্চিত্রের শেষে জয়গুনরা গ্রাম ছাড়লে আবারও তাদের টপ শট্ আর এক্সট্রিম লঙ শটে পাওয়া যায়। সাধারণত কোনো বিষয়কে স্ট্যাবলিশ বা প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ ধরনের শট্ ব্যবহৃত হয়। এতে ওই পরিবেশের সঙ্গে চরিত্রের আবেগ-অনুভূতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে চরিত্রকে পুরোপুরি বোঝা যেতে হবে, এমনটি এখানে না হলেও চলে।

    চলচ্চিত্রের চিত্রগত উপাদানগুলোর বিন্যাসে পরিমিতিবোধের পরিচয় পাওয়া গেছে। ফ্রেমে কী রাখা হবে আর কী রাখা হবে না, কিংবা কতোটুকু রাখা হবে তার বিন্যাসকে বলা হয় কম্পোজিশন। এটি দর্শককে আকৃষ্ট ও মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। বলা হয়, নির্মাতা এখানে তার শিল্পকর্মকে বাইরের রূপ দিতে থাকে আর দর্শক তা নিজের মতো করে বুঝে নেয়। তারা নিজেদের মতো বিষয়টিকে বিশ্লেষণের সুযোগ পায়।১০ চলচ্চিত্রের গ্রামীণ পরিবেশে ছোট্ট দুটি ছনের ঘর, ফসলী জমি, নদীতে ছোটো ডিঙি নৌকা অথবা বাতাসে দোল খেতে থাকা গাছ আর আশপাশে গৃহপালিত পশুর আনাগোনা প্রকৃত আবহ তুলে ধরে। এছাড়া ছোটো ছোটো ডিটেইলের দিকেও যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন নির্মাতা। জয়গুনের ঘরে কয়েকটি মাটির তৈজসপত্র, দুটি হাঁস, কুপি, পাখির পালক দিয়ে পায়ে মলম লাগানো--দৃশ্যগুলোকে সহজ ও স্বাভাবিক করে তোলে। এখানে মজার একটি গল্পও বলা যায়। ডিটেইল ঠিক রাখার জন্য নির্মাতা নাকি সাভার থেকে একটি তালগাছ কিনে এনে জয়গুনের বাড়ির পাশে লাগিয়েছিলেন। তালগাছটি নৌকায় করে আনা হয়েছিলো। এর মধ্যে তালগাছটি নাকি একবার হুমড়ি খেয়ে পড়েও যায়। আর পাকিস্তানের পতাকা উড়ানো হয়েছে যে গাছে, সেটিও আনা হয়েছিলো শুটিং স্পট থেকে আড়াই মাইল দূরে একটি জায়গা থেকে।১১

    চলচ্চিত্রটির কিছু জায়গায় আলোর পরিমাণ একটু বেশি বলে মনে হয়েছে। অনেক সময়ই চরিত্রদের মাথা ফ্রেম থেকে বেরিয়ে গেছে। এতে একটু অস্বস্তিবোধ হতে পারে। এছাড়া শেষের দিকে একটি দৃশ্য--যেখানে গেদু প্রধানের লোক নদীর পাড়ের এক অংশে বসে কথা বলতে থাকে; ওই পাড়ে তখন শ্রমিকের তুমুল কর্মযজ্ঞ চলছে; হৈ-হুল্লোড় পরিবেশ। এ দৃশ্যটির সময় ক্যামেরা এতো দ্রুত প্যান করে যে, বুঝতে কষ্ট হয় শ্রমিকেরা কী কাজ করছে। জয়গুনের একটি দৃশ্য, যেখানে তিনি বলেন, ‘ভিক্ষা করে খাই না, কাম করে খাই’; শেষে অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্যের কিছু অংশ হঠাৎ জুম হয়ে বেশি ঝাপসা হয়ে গেছে। এতে দেখার সময় কিছুটা ছন্দপতন ঘটে।

পাঁচ.

তানভীর মোকাম্মেলের পরিচালনায় চিত্রা নদীর পাড়েতে চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন আনোয়ার। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। ১৯৪৭-এর দেশভাগ পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিলো তা নিয়ে এগিয়ে চলে চলচ্চিত্রের কাহিনি। ১৯৪৭-১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গল্পের স্থায়িত্ব।

উকিল শশীভূষণ নড়াইলে তার দুই সন্তান মিনতি ও বিদ্যুৎ এবং বিধবা বোন অনুপ্রভাকে নিয়ে বসবাস করেন। ৪৭-এর দেশভাগের সময় হিন্দুদের অনেকেই পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে চলে যায়। শশীর ওপর দেশত্যাগের চাপ থাকলেও তিনি বাপ-দাদার ভিটা ও বাড়ির পাশে বয়ে চলা চিত্রা নদী ছেড়ে যেতে রাজি হন না। তবে তার একমাত্র ছেলে বন্ধুদের কাছে হেনস্তার শিকার হয়ে কলকাতা চলে যায়। এদিকে বড়ো হওয়ার পর মিনতির সঙ্গে ছোটোবেলার বন্ধু বাদলের ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু বাদল মার্শাল ল বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। আবার শশীর বিধবা ভাতিজি ধর্ষণের শিকার হয়ে চিত্রা নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করে। এ ঘটনায় শশী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং পরে অসুস্থ হয়ে নদীর পাড়ে মারা যান। মিনতি আর অনুপ্রভা শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

   আনোয়ার হোসেনের চিত্রগ্রহণে এটি একটি রঙিন চলচ্চিত্র। এখানে একটি বিষয় বেশ চমৎকার--চিত্রা নদী ও একে ঘিরে থাকা জীবনের ছিমছাম চিত্রায়ণ। নদীর পাড়ে ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের খেলতে দেখার দৃশ্য কিংবা সূর্যাস্তের রঙ হয়তো অনেককেই নিয়ে যাবে তাদের শৈশবে। চলচ্চিত্রে জুম ইন, জুম আউট, লঙ শট্, ফুল শট্, ক্লোজ আপ, এক্সট্রিম ক্লোজ আপ, মিড শট্, টিল্ট আপ, টিল্ট ডাউন, প্যান শট্, হাই অ্যাঙ্গেল শট্, টপ শট্ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে। আনোয়ার প্রায় অনেক জায়গায় ব্যবহার করেছেন জুম আউট। চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে নাপিত বিজয় শশীর বাড়ি আসে চুল-দাড়ি কাটতে। তখন শশী দাড়ি কাটার সময় একবার জুম আউটে তার সহকারীকে আসতে দেখা যায়। আবার শশী ও অনুপ্রভার সঙ্গে বিজয় কথা বলতে থাকার সময় একবার একই শট্ নেওয়া হয়। নদীতে এক বৃদ্ধ গোসল করার সময় এবং শশী তার বড়ো ভাইয়ের বাড়িতে গেলে একই শটে দেখানো হয়।  

    মিনতি-বাদলের শৈশবে বন্ধুদের সঙ্গে থাকা দৃশ্যগুলো বেশ ভালো। সবচেয়ে ভালো লেগেছে বাদলের ঘুড়ি উড়ানোর দৃশ্য। ঘুড়ি যখন এদিক-ওদিক উড়ে, তখন ক্যামেরার লেন্সও ওঠানামা করতে থাকে। এছাড়া টিল্ট ডাউন করে টপ শটে নরেন বাবুর পুরনো ভাঙাচোরা বাড়িতে মিছেমিছি চড়ুইভাতি করতে থাকা শিশুদের দৃশ্যটিও বেশ সুন্দর। মনে হয় পুরো শৈশবটাই সামনে ধরা পড়ছে। ধূলো-মাটিতে গড়াগড়ি, বন্ধুদের সঙ্গে নিজের ভিতরে থাকা ইচ্ছের ফুলঝুরি বিনিময়, জগতের কঠিন বাস্তবতা যেখানে স্পর্শ করে না--সবকিছুর একটি প্রতীকী চিত্রায়ণ ঘটে এখানে।

    চলচ্চিত্রের কম্পোজিশনে ওপেন ফ্রেম বলে একটি কথা আছে। চিত্রগ্রাহক যখন গল্পের চরিত্র বা বিষয়বস্তুর জন্য আশপাশের উপাদানগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থান নির্বাচন করে, তখন তাকে বলা হয় ফ্রেম। আর কম্পোজিশন যদি নির্মাতা এমনভাবে করেন, যাতে মূল বিষয়টি ফ্রেমের বাইরে বলে মনে হয়, তবে সেটি হলো ওপেন ফ্রেম। শৈশব ধর্ম মানে না। শিশুরা কখনো ভাবে না কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান। তাই তারা সদলবলে প্রতিমা বানায়। এখানেই ওপেন ফ্রেমে প্রতিমার হাত গড়তে দেখা যায় একজনকে। ফ্রেমে ক্লোজ শটে সেই চরিত্রের শুধু হাতটাই চোখে পড়ে। এতে স্বভাবতই দর্শকের মনে কৌতূহল তৈরি হয় হাতের মালিককে দেখার জন্য। পরের শটে এক্সট্রিম ক্লোজ শটে প্রতিমার কারিগরকে চোখে পড়ে। এরপর এক্সট্রিম ক্লোজ আপ শটে বাদলের হাত থেকে তার মুখে এসে লেন্স স্থির হয়। ছোটো আরেক শিশু, মিনতি সবাইকে দেখা যায় আনাড়ি হাতে প্রতিমা বানানোর চেষ্টা করতে। নিষ্পাপ সেই মুখগুলোতে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ নেই। আছে উৎসবের আনন্দ।

    বলা হয়, নির্মাতা যখন কোনো বিষয়বস্তুকে আরো নির্দিষ্ট করে দেখাতে চায়, তখন চিত্রগ্রাহকের সহায়তায় ফ্রেম উইদ ইন ফ্রেম পদ্ধতি ব্যবহার করে। পারিপার্শ্বিক উপাদান থেকেই ফ্রেমের ভিতরে সিনেমাটোগ্রাফার আরেকটি ফ্রেম তৈরি করে। আনোয়ার তার প্রথম চলচ্চিত্রেই শৈল্পিকভাবে এ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শশী তার বৌদির সঙ্গে কথা বলার সময় এ ধরনের দুটি ফ্রেম ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে একটি ফ্রেমে শশীর ভাতিজিকে একপাশে ফোকাস করে রাখা হয়। যেনো ইঙ্গিত দেওয়া একসময় মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষের বলি হতে হবে মেয়েটিকে। এছাড়া ঘরের উঠানে বসে মিনতির গান গাওয়া, আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো দুজন ব্যক্তির মধ্য দিয়ে বিচারককে দেখানো, কলেজের ক্লাস শেষে বন্ধুদের নিয়ে মিনতির বাড়িতে ফেরা ছাড়াও মিষ্টি একটি দৃশ্যও আছে--বাদলের শেষবারের মতো গ্রাম ছাড়ার সময় মিনতির সঙ্গে ছোটোবেলার নরেন বাবুর ফটকে দাঁড়িয়ে কথা বলা। সব সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে দুজনের একটি আলাদা পৃথিবী যেনো এখানে গড়ে ওঠে; কেউ দেখছে না, কেউ প্রশ্ন তুলছে না। শান্ত চিত্রা নদীর মতোই সহজসরল ভালোবাসার স্নিগ্ধ গল্প বয়ে চলছে তাদের ঘিরে। এছাড়া বাদল যখন আন্দোলনে জড়িয়ে যায়, তখন সে আর তার বন্ধু প্রেসে ছাপার কাজ করতে যায়। ছাপাখানার একটি ছোটো চারকোণা খোপে তাদের দেখানো হয়। আবার চলচ্চিত্রের শেষ দিকে দর্শক শশীর মৃত্যুকেও দেখে ফ্রেমের ভিতর ফ্রেমে।

ঘটনার পরিক্রমায় একপর্যায়ে গল্প ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের সামরিক শাসনের সময়ে চলে আসে। এ আইনের কাছে সেসময় মানুষ কতোটা অসহায় ছিলো তা একটি শট্ দিয়ে বোঝানো হয়। শশী আদালতে যখন তার দুই মক্কেলের জামিন পাওয়ার জন্য আবেদন করেন, তাকে তখন দেখানো হয় হাই অ্যাঙ্গেল শটে। এর মাধ্যমে তার অসহায়ত্ব বোঝানো হয়। তিনি যতোই যুক্তি আদালতে উপস্থাপন করুন না কেনো মার্শাল ল আইনে জামিন নামঞ্জুর হবেই। ক্যামেরা এ সময় টিল্ট আপ হয়ে আদালতের দেয়ালে টাঙানো আইয়ুব খানের ছবিতে গিয়ে স্থির হয়। এর পরের দৃশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামরিক আইন বিরোধী মিছিলকে লো অ্যাঙ্গেল শটে দেখানো হয়। যার অর্থ ক্ষমতার প্রকাশ। ছাত্রদের মেধা, বিবেক ও সাহসের প্রতিচ্ছবি এটি। তাদের প্রতিবাদ ও আন্দোলন যে সামরিক সরকারের ভিত টালমাটাল করার ক্ষমতা রাখে, এ শটে তাই বোঝান নির্মাতা।

চিত্রা নদীর পাড়ের একটি দৃশ্য আছে, যেখানে লক্ষণের দোকানে দাড়ি কাটাতে আসেন বাদল। আয়নার মধ্য দিয়ে বাদলের দাড়ি কাটা দেখান সিনেমাটোগ্রাফার। আর পাশে থাকে প্রতিমার ছবি। এও একধরনের ঐক্যই বটে। একদিকে কিছু মানুষ যখন হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলছে, আর কিছু মানুষ ‘মুসলমান’ ছুঁয়ে দিলে জাতপাত হারানোর চিন্তায় ব্যস্ত, তখন দুইজন মানুষ একে অন্যের প্রয়োজনে পাশাপাশি চলছে, আয়নায় মিশে গেছে। এখানে কেউ ভাবছে না ছুঁয়াছুঁয়ির কথা।

চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শট্ হলো ডিপ ফোকাস। চিত্রা নদীর পাড়েতে তিন জায়গায় এ ধরনের শট্ ব্যবহার করেন সিনেমাটোগ্রাফার। ডিপ ফোকাসে আশপাশের সব উপাদান একই শার্পনেসে রাখার চেষ্টা করা হয়। এর ডেপথ অব ফিল্ড বেশি থাকে। যে ডিটেইলগুলো প্রয়োজন তাও থাকে স্পষ্ট। দর্শক বাদলকে বন্ধুদের সঙ্গে কার্জন হলের মাঠে আড্ডা মারতে দেখে। শশীকে অনুপ্রভার সঙ্গে কথা বলতে দেখে, পাশে মিনতি দাঁড়িয়ে। আবার অনুপ্রভা, মিনতি ও বাদলের বোন শশীর বাড়ির সিঁড়িতে বসে থাকার সময় প্রতিবেশী দিপালী টাকা ধার চাইতে আসে। এ সময় সবাইকে একই ফোকাসে দেখানো হয়। পাশে ঝোলানো খাঁচায় কিছু পাখি চোখে পড়ে। এদের যেনো শশীর মতোই দশা। নিজের দেশে থেকেও ছটফট করছে। রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে আর স্বার্থের কারণে নিজভূমে শিকারির ফাঁদে পড়া কিছু প্রাণীর মতোই তাদের অবস্থা।

    কাট টু কাট শটের ব্যবহার এ চলচ্চিত্রেও আছে। অনুপ্রভা এসে বাদলকে তাদের বাসায় দেখতে পেয়ে খুশি হয়। এ সময় অনুপ্রভাকে প্রথমে দেখানো হয় কলসি কাঁখে হেঁটে আসতে। ক্যামেরা প্যান হয়ে যেতে যেতে জুম আউট হতে হতে বাদল আর মিনতিকে দেখা যায়। এখানে হাই অ্যাঙ্গেল শট্ ব্যবহার করেন আনোয়ার। বৃদ্ধ বিধবা অনুপ্রভার এ বয়সেও কাজ করতে হচ্ছে। তার শরীরে দেখা দিয়েছে বার্ধক্যজনিত রোগও। একাকী অনুপ্রভা আক্ষেপ করেন, কষ্ট পান। ছোটো একটি ট্র্যাক শটও আছে। বাদল নাড়ু খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে এ দৃশ্যটি ট্র্যাক শটে ধারণ করা।

    সামরিক আইন বিরোধী মিছিলে বাদলের গুলি খাওয়ার দৃশ্যটি সিনেমাটোগ্রাফার ধারণ করেছেন লো অ্যাঙ্গেল থেকে। কারণ বাদলের মতো মানুষেরা বীর। তাদের রক্ত কোনোদিন বৃথা যায়নি। গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যে দেখা যায়, হাই অ্যাঙ্গেল শট্। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফেস্টুনের মধ্যে তিনি লুটিয়ে পড়ে আছেন। নিজেকে তিনি রক্ষা করতে পারেননি। হাই অ্যাঙ্গেল থেকে জুম হয়ে ক্যামেরার লেন্স পড়ে বাদলের মুখে, রক্তে। আর তার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছালে দেখা যায়, শুষ্ক পাতা শূন্য একটি গাছ। আর মিনতির মনের ঝড় প্রকাশ পায় প্রকৃতির ঝড়ে; অশান্ত ঝড়ো বাতাস আর তুমুল বৃষ্টির ছটায়। এদিকে শশীর ভাইয়ের মেয়ে বাসন্তী নিপীড়নের শিকার হয়ে আত্মহত্যার জন্য যখন নদীর দিকে হেঁটে যেতে থাকেন, তখন তাকেও দেখানো হয় লো অ্যাঙ্গেল থেকে। আবহে বাজতে থাকে দেবী দূর্গাকে বির্সজনের সময়ের ঢাক আর কাসার ঝুনঝুন। এক দিকে দেবীর বির্সজন, অন্যদিকে বির্সজন নিপীড়িত এক নারীর। দূর্গা শক্তির প্রতীক। আর প্রত্যেক নারী দূর্গারই প্রতিচ্ছবি। কিন্তু মর্তের এই দূর্গারা শুধু অপমানের ভয়ে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে জানে।

চলচ্চিত্রটিতে ডিটেইলের দিকে ভালো নজর দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি দৃশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে টপ শট্। এ ধরনের শট্ শুধু উপর থেকে আশপাশের বিষয়বস্তু দেখাতে সাহায্য করে। ফলে এ শটে শশীর বড়োভাই নিধুবাবু বাড়িতে প্রবেশ করলে তাকেসহ ঘরের উঠানে নারিকেলের ছোবড়া শুকাতে দেওয়া দেখা যায়। ছোট্ট মিনতির বাড়ির উঠানে কুতকুত খেলা কিংবা খেলার সাথিদের সঙ্গে চড়ুইভাতিকেও এ ধরনের শটে দেখানো হয়েছে। এতে পারিপার্শ্বিকতার একটি ধারণা পাওয়া যায়। গ্রামীণ আবহ ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। এছাড়া শশীর বাড়ির অফিস ঘরের দেয়ালে ও নিজ ঘরে প্রতিমার ছবি; অন্য একটি ঘরে মৃত স্ত্রীর ছবি, টিকটিক করতে থাকা ঘড়ি, মিনতির ঘরে প্রতিমার ছবি, উঠানে সরস্বতীর প্রতিমা, ঝোলানো কাপড়, আদালতপাড়ায় ভিক্ষুক, রাস্তায় মুচি ইত্যাদি ডিটেইল পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিকঠাক মতোই ছিলো।

চলচ্চিত্রের গল্পে নান্দনিকতা ও সমতা আনার জন্য সুচিন্তিত কম্পোজিশন জরুরি। ল্যান্ডস্কেপ ভিউগুলোও চমৎকার। গোধূলির আলোয় চিত্রা নদীতে নৌকা চলার দৃশ্য, গাছপালার উপর ঝরে পড়া বৃষ্টির পানি, দর্শকের মনে ক্ষণিক শান্তির পরশ বোলায়। আনোয়ার চিত্রা নদীর শান্ত-স্নিগ্ধ রূপটি বেশিরভাগ সময় ডুবন্ত সূর্যের আভায় তুলে ধরেছেন। নিজ দেশের বৃষ্টি আর নদীর পাড়ে একাকী বসে থেকে যে শান্তি, তা অন্য দেশে কী পাওয়া যায়!

আলোর ব্যবহারেও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সিনেমাটোগ্রাফার। আলোর ব্যবহারও পরিমিত। তবে কিছু কিছু জায়গায় স্বল্প আলোতেও একটু বেশি উজ্জ্বল লেগেছে। বাদলদের প্রেসে থাকার দৃশ্য, হারিকেনের আলোয় যতীনের সঙ্গে শশীর গল্প কিংবা দলবলসহ শশীর রেডিও শোনার দৃশ্যগুলোতে এক্সপোজার বেশি চোখে পড়ে। হারিকেনের এমন উজ্জ্বল আলো একটু অবাস্তবই মনে হয়।

ছয়.

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ। মুক্তিযোদ্ধারা যখন প্রাণ বাজি রেখে মরণপণ লড়াই করছিলো, তখন সাধারণ মানুষের অনেকেই প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলো। শ্রেণি-পেশা, ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ তখন ছিলো না। সবাই ছুটছিলো। কেউ এ সময় টিকে থাকতে পেরেছে, কেউ পারেনি। এমনই গল্প নিয়ে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন শ্যামল ছায়া। চিত্রগ্রাহক হিসেবে আনোয়ারের নবম চলচ্চিত্র শ্যামল ছায়া। সরাসরি যুদ্ধ না থাকলেও যুদ্ধের আবহ সুন্দরভাবে এই চলচ্চিত্রে ফুটে উঠেছে।

   শ্যামল ছায়ার কাহিনি এগিয়ে চলে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও অত্যাচার থেকে পালিয়ে বেড়ানো একদল মানুষকে নিয়ে। যারা জানে না তারা কোথাও আশ্রয় পাবে কি না। জীবনটা থাকবে কি না। এ রকম পরিস্থিতিতে একসময় তারা একটি পরিবারের মতো হয়ে যায়। বিপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়। একমাত্র ছেলে ও নাতিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যা করলে ছেলের বৌকে সঙ্গে নিয়ে বয়স্ক এক বাবা প্রাণভয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে পালানোর সময় সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার আরো পাঁচটি পরিবার আশ্রয় নেয়। শেষের দিকে গানের দলের ছদ্মবেশে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা নৌকাটিতে উঠে। কিছুদূর এগোতেই তারা দেখতে পায় পাক সেনাদের নৌকা। পরে নৌকার যাত্রীদের সহায়তায় তাদের ওপর আক্রমণ চালায় মুক্তিযোদ্ধরা। তাদের সাহায্য করতে গিয়ে গুলিতে গুরুতর আহত হন নৌকার যাত্রী আশালতা। মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যোগ দেন যাত্রী মোসলেম মাওলানা। অবশেষে নৌকাটি স্বাধীন অঞ্চলে এসে পৌঁছালে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

    শ্যামল ছায়ার স্ট্যাবলিশমেন্ট শটটি শুরু হয় নৌকার সামনের অংশ দিয়ে। এরপর এর বিভিন্ন অংশ দেখানো হয়। কালিপড়া ঝুলন্ত হারিকেন, এবড়োথেবড়ো পাটাতনের পাশে হেলানো বৈঠা, লেগে থাকা দড়ি, পর্দায় দেখানো হয়। আবহে শোনা যায়, অনিশ্চিত যাত্রার অনিশ্চিত সুর। দর্শককে শুরতেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়, নৌকা ও এর কিছু যাত্রীকে ঘিরে কাহিনি আবর্তিত হবে। পুরো চলচ্চিত্রটিতে লঙ শট্, এক্সট্রিম লঙ শট্, ফুল শট্, টপ শট্, মিড ক্লোজ আপ, জুম, ফ্রেম উইদ ইন অ্যা ফ্রেমের ব্যবহার ঘটনাকে গতিশীল করেছে। যুদ্ধের সময়ে নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তাও কিছুটা অনুভব করা গেছে।

    শ্যামল ছায়ার শুরুর দিকে সব পরিবারকে বিভিন্ন ছোটো ছোটো দৃশ্য ও সংলাপের মাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এসব দৃশ্যের কিছু জায়গায় ওপেন ফ্রেমের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ওপেন ফ্রেমের বৈশিষ্ট্য হলো এটি দর্শকের মনে কৌতূহল বা প্রশ্ন তোলে। নৌকায় ওঠার পর থেকে বয়স্ক ব্যক্তিটিকে অসহিষ্ণু দেখানো হয়। সবকিছুতেই তিনি বিরক্তি প্রকাশ করতে থাকেন। এমন সময়ে ছেলের বউকে কিছু দেখানোর ইঙ্গিত করলে পায়ে নূপুর, হাতে শাখা ও লাল চুড়ির একটি হাতকে পায়ে আলতা লাগাতে দেখা যায়। দর্শকের মনে স্বাভাবিক কৌতূহল জাগে হাতটি কার তা জানার। এরপর ডিপ ফোকাসে পায়ের মালিক আশালতাকে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর একটি শটে আলতা পরা আরো একজোড়া পা দ্রুত লুকানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। ক্যামেরা প্যান হয়ে উপরে উঠলে বোঝা যায় সেটি মোসলেম মাওলানার স্ত্রীর পা।

পরে পাকসেনাদের হত্যাকাণ্ড চালানোর দৃশ্যে তাদের চেহারার বদলে পা দেখানো হয় বেশিরভাগ সময়ে। একবারই আগ্রহী দর্শক পাকবাহিনীর কমান্ডারের চেহারা দেখতে পায়। সেই সঙ্গে নৌকার এক যাত্রী, যাকে দেখলে অবস্থাপন্ন ঘরের লোক মনে হয় তার হাতে গ্রেনেড দিতে গেলে তিনি ভয়ে সেটি ধরেন না। এখানে ঘটনাক্রমে সবাই জানে একজন মুক্তিযোদ্ধাই তাকে গ্রেনেডটি চালানোর জন্য দিতে চেয়েছে। কিন্তু চিত্রগ্রাহক এখানে কৌতূহল জারি রেখে হাতের মালিককে আর দেখাননি। পর্দার বাইরের মানুষদের তাই অনুমানই সম্বল হয়ে ওঠে।

    লঙ শট্, টপ শট্ ও ডিপ ফোকাসের ব্যবহার বেশকিছু দৃশ্যে লক্ষ করা গেছে। নির্মাতার উদ্দেশ্য ছিলো সবার গল্পগুলোকে একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া; পরিবেশ ও মানুষের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরি করা। পাকিস্তানি স্পিডবোট, নদীর ধারে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকা লাশ, গোলাগুলির মধ্যে পালাতে থাকা মানুষ, নৌকায় বয়ে চলা কয়েকটি জীবন লঙ শটে তুলে ধরা হয়। এখানে এক্সট্রিম লঙ শটের একটি দৃশ্যও আছে। নৌকাটি ছেড়ে দেওয়ার পর দুই শিশুসহ একজন পুরুষ ও নারীকে নৌকার পিছনে দৌড়াতে দেখা যায়। কিন্তু তারা নৌকার নাগাল পায় না। আশ্রয়ের জন্যই তারা হুড়মুড়িয়ে দৌড়াচ্ছিলো তা বোঝা যায়। কিন্তু দর্শক তাদের চেহারা দেখতে পায় না। তারপরও তাদের এ বিপদে মনের মধ্যে বেদনা স্পর্শ করে।

    এছাড়া নৌকার কর্মযজ্ঞ বোঝাতে টপ শট্ ব্যবহার করেন চিত্রগ্রাহক। টপ শটে দেখা যায়, দূরে পাকবাহিনীর অবস্থান দেখতে পেয়ে সবাই নৌকার পাটাতনের নিচে লুকানো জায়গায় নামার জন্য হুড়োহুড়ি করছে। আবার নৌকা চরে আটকা পড়লে যাত্রীরা সবাই যখন সেটিকে ছুটিয়ে আনে ক্যামেরা তখন ক্রেনের মাধ্যমে উপরে উঠে যায়। কাহিনির প্রয়োজনে আনোয়ার ডিপ ফোকাস ব্যবহার করেন--মাওলানা যখন মোনাজাত ধরেন, তখন পিছনে ছোটো একটি অংশে মাঝির সহকারী কাল্লুকেও দেখা যায়। আশালতাকে যখন প্রথমবারের মতো দেখানো হয়, তখনো এ ধরনের শট্ পাওয়া যায়। ডিপ ফোকাসের শৈল্পিক ব্যবহার দেখা গেছে অরসন ওয়ালেসের বিখ্যাত চলচ্চিত্র সিটিজেন কেইন-এ। তবে ব্যাকগ্রাউন্ড ও ফোরগ্রাউন্ডকে আলাদা করে ফোকাস করার পদ্ধতি এখানে ভেঙে ফেলা হয়েছিলো।

    কোনো বিষয় বা চরিত্রকে আলাদা গুরুত্ব বা মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হলে ফ্রেম উইদ ইন অ্যা ফ্রেম ব্যবহার করে চিত্রগ্রাহকেরা। এখানে দর্শক কোনো জানালা বা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে, এমন কিছু খুব একটা অনুভূত না হলেও পরিস্থিতি বিচারে বোঝা যায় কোনো ঘটনা বা চরিত্র গুরুত্ব পাচ্ছে। নৌকা চরে আটকা পড়লে আনোয়ার তাই কাল্লুকে এই দুঃখের সংবাদ বলার সময় দুই দরজার মধ্য থেকে ধারণ করেন। আর তার ওস্তাদকে দেখানো হয় নৌকার নড়বড়ে দুই কাঠের স্তম্ভের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে যাত্রীদের কাছে সাহায্য চাইতে। নৌকা বন্ধ থাকায় সবাই পাড়ে এসে বিশ্রাম নেয়। মাওলানার স্ত্রীকে দেখা যায়, একমনে কোরআন পড়তে। কারণ তার স্বামীকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে যাওয়ায় তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাইছেন। কিছুক্ষণ পর নৌকার আরেক যাত্রী তার মাথার উপর ছাতা মেলে দেন। যুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম কোনো ভেদাভেদ নেই। মানুষ হিসেবে হিন্দু যুবক পিতম্বর তাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। নৌকায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যগুলো দেখার মতো অনুভব হয় দর্শকের। মুক্তিযোদ্ধারা যখন পাকসেনাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে, তখন গাছের পাশ থেকে জুম শটে ফ্রেম উইদ ইন অ্যা ফ্রেমে সবাইকে দেখা যায়। কাহিনির একপর্যায়ে গাছের ফাঁক দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনকে দেখা যায় এ ধরনের ফ্রেমে। মনে হয়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে তারা আসছে, আর কোনো ভয় নেই।

    দুর্দশাগ্রস্ত পরিবার হিসেবে এই আশালতার পরিবারকে হাই অ্যাঙ্গেল শট্ থেকে দেখানো হয়েছে বেশকিছু জায়গায়। তারা হিন্দু বলে যুদ্ধের ডামাডোলে এমনিতেই কোণঠাসা। এদিকে নৌকায় নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার জন্য নৌকা যিনি ভাড়া করেছেন এবং একজন যাত্রী তাদের চাপ দেয়; দুর্ব্যবহার করে। গ্রামের অন্য দুই নারীও দূরে দূরে থাকে। এমন অবস্থায় হিন্দু এ পরিবারটি অসহায়বোধ করে। আশালতার শাশুড়ি ছেলের কাছে বউকে ঘেঁষতে দেয় না। এদিকে বউয়ের কাছাকাছি থাকার ইচ্ছা থাকলেও মায়ের জন্য ছেলে সেটা পারে না। শাশুড়ির প্রতাপ তাই চিত্রগ্রাহক ফুটিয়ে তুলেছেন লো অ্যাঙ্গেল শটে। এই একটি শটে মেয়েটিকে তার হাসির জন্য শাশুড়ির ধমক খেতে দেখা যায়।

    এক রাতে নৌকায় রাজাকার মজিদ তার দলবলসহ ডাকাতি করতে হানা দেয়। এ সময়ও যাত্রীদের হাই অ্যাঙ্গেল শট্ থেকে দেখান সিনেমাটোগ্রাফার। রাতের অন্ধকারে অসহায় যাত্রীদের কাছ থেকে তারা জিনিসপত্র কেড়ে নিতে থাকে। এ শটটি আবার ব্যবহার করা হয়, যখন মজিদ আশালতাকে জোর করে তুলে নিয়ে যেতে চায়। এর প্রতিবাদে মজিদ যখন যাত্রীদের আক্রমণের মুখে পড়েন, তখন তার পরিস্থিতি এ শটের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। চার-পাঁচ জনের প্রতিরোধের মুখে তিনি যে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারবেন না বলাই বাহুল্য। পরে মজিদকে অনেকক্ষণ আটকে রেখে যাত্রীরা ছেড়ে দিলে একসময় তিনি পাকবাহিনীসহ ফিরে আসেন। এ সময় ভয়ে তটস্থ সবার সামনে মজিদকে সিনেমাটোগ্রাফার তুলে ধরেন লো অ্যাঙ্গেল থেকে। মজিদকে দেখে মনে মনে শঙ্কা হতে থাকে, সামনে কী বিপদ তিনি নিয়ে আসছেন! অনিশ্চিত একটি অনুভূতি এখানে জন্ম নেয়। আবার নদীর পাড়ে পাকসেনাদের হাতে নিহত মানুষদের লাশ দেখা যায় হাই অ্যাঙ্গেল থেকে।

ভালোলাগার মতো আরো একটি দৃশ্য আছে চলচ্চিত্রের শেষের দিকে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার যখন নৌকার তরুণ ভদ্রলোক যাত্রীকে গ্রেনেড চালানোর কথা বলেন। এ দৃশ্যে কথোপকথনের সময় কমান্ডার মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকে আর যাত্রীটি নদীর পাড়ের কিছু মাটির ঢেলার উপর। এজন্য তাকে সামান্য উঁচু দেখা যায়। আনোয়ার এখানে লো অ্যাঙ্গেল শট্ নিয়ে যেনো বুঝিয়ে দেন, যতো উচ্চতায় কেউ উঠুক না কেনো একজন মুক্তিযোদ্ধার সাহসিকতা আর বীরত্বের উচ্চতার বরাবর কেউ নেই। জার্মান ফেরত ইঞ্জিনিয়ার এই যুবক গল্পজুড়ে শুধু যুদ্ধের খবরই শোনার চেষ্টা করে গেছেন। অন্য যাত্রীদের বিপদে-আপদে সামান্যতম কোনো সাহায্য করেননি। তিনি নিজেকে বরাবরই উঁচু শ্রেণির ভেবেছেন; আর বাকিদের মূর্খ, বর্বর। আরামে থাকা এ মানুষটি যুদ্ধ করতে ভয় পান; ‘ঝামেলা’ এড়িয়ে চলতে চান। এর পরের দৃশ্যেই হাই অ্যাঙ্গেল শটে দেখা যায়, অন্ধ বাবা আর অশীতিপর বৃদ্ধ দিদিমাকে রেখে যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন পিতাম্বর।

    কিছু জায়গায় প্রতীকী চিত্রায়ণ আছে। সংলাপ ছাড়াই যা বলে দিয়েছে অদেখা গল্প। প্রথম দিকে আশালতার আলতা নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। নদীর পানি লাল হয়ে যায় রক্তের মতো। এ যেনো যুদ্ধের রঙ, নির্মমতা ও নির্যাতনের রঙ। এছাড়া আশার খাঁচার ময়না পাখি দুটি ফ্রেমে অনেকবার পাওয়া যায়। মেয়েটির অবস্থা ওই পাখিদের মতোই। তিনি চঞ্চল, প্রাণবন্ত; কিন্তু বদমেজাজি শাশুড়ি আর মেরুদণ্ডহীন স্বামীর বউ হয়ে তার পা শিকলে আটকা। আশাকে মজিদ তুলে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হওয়ার পর মেয়েটি বুঝতে পারে চরম বিপদেও স্বামী তাকে কোনো সাহায্য করবে না। ভগ্ন হৃদয়ে আশা একাকী বসে থাকেন। এ সময় বাইরে তুমুল ঝড় আশার মনের ঝড়ের কথা প্রকাশ করে।

    মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের নৌযানটি বোমা মেরে উড়িয়ে দিলে পানিতে আগুনের আভার প্রতিবিম্ব দেখা যায়। এ শটটি বেশ দৃষ্টিনন্দন মনে হয়েছে। হঠাৎ মনে হয় পানিতেও যেনো ছড়িয়ে পড়েছে আগুন। সেই সঙ্গে গোধূলির আলোয় আশা যখন তার ময়না পাখিদের সঙ্গে খেলা করে, আলোটা তখন ঠিক খাঁচার ওপর পড়তে দেখা যায়। দৃশ্যটি দেখলে মন ভালো হয়ে যাওয়ার অনুভূতি হয়। টেনশন আর অনিশ্চিত ঘটনার ভিড়ে একটু যেনো আরাম বোধ হয়।

    চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে চমৎকার বিষয়টি হলো আলোর ব্যবহার। আলো-আধারির খেলায় টেনশন বাড়িয়ে তুলতে পেরেছেন আনোয়ার। তবে পরিবেশের স্বাভাবিক অবস্থাটিও বজায় ছিলো। বিশেষ করে নৌকায় রাতে টিমটিমে হারিকেনের আলোয় যখন আলাদা করে প্রত্যেকটি চরিত্রকে দেখা যায়, তখন কোনো বিরক্তির সৃষ্টি হয় না। কিংবা কিছু দৃশ্যে চারপাশ একদম অন্ধকারই ছিলো বলা যায়। আবছা আলোয় যাত্রীদের কর্মকাণ্ড বুঝে নিতে হয়। তবে নদীতে থাকা অবস্থায় হারিকেনের আলো স্থির থাকার কথা নয়। কিন্তু কিছু দৃশ্যে হারিকেনের আগুন একদম স্থির! যাত্রীদের মুখে পড়া আলোও স্থির! একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে এ নিয়ে প্রশ্ন জাগতেই পারে। কিছু কিছু জায়গায় আলো প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশিই মনে হয়েছে। তবে পরক্ষণেই মনে হয়েছে, অতোটুকু না হলে হয়তো কাউকে স্পষ্ট দেখা যেতো না।

   যাত্রীদের মালামাল, গৃহপালিত পশু, নৌকা ঠিক করার যন্ত্রপাতি, নৌকার দেয়ালে মক্কা শরীফের ছবি, ঝুলতে থাকা হারিকেন দেখলে বোঝা যায় ডিটেইল চিন্তাভাবনা করেই করা হয়েছে। পাশাপাশি রঙের টোনের বিষয়টিও লক্ষণীয়। কখনো কখনো উজ্জ্বল আর আধা ফিকে টোনের ব্যবহার বেশি চোখে পড়ে। যেমন, দিনের বেলা দৃশ্যগুলো উজ্জ্বল আবার লাশ দেখানোর সময় আধা ফিকে। আশার কষ্ট বোঝাতে গিয়েও এ ধরনের রঙ ব্যবহার করা হয়েছে কয়েক জায়গায়। আলো আর রঙ যে ঘটনাকে আরো অর্থবহ করে তা এ দৃশ্যগুলো দেখলে বোঝা যায়।

    কয়েকটি ভালো ভালো ল্যান্ডস্কেপ ভিউ চলচ্চিত্রে পাওয়া যায়। আকাশের ঘন মেঘে ঢেকে যাওয়া সূর্য, নদীর তীর ঘেঁষে হেঁটে চলা বক কিংবা ঝোপের আড়ালে থাকা অস্তমিত সূর্য চলচ্চিত্রের ইমেজকে আলাদা রূপ দেয়। যাত্রীদের মতো দর্শকও দেখে জীবনের আরেক রূপ। এই সুন্দর মুহূর্তগুলোর জন্যই বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে। পৃথিবীর কদর্য রূপটিকে ভুলিয়ে দিয়ে নতুন আশা জাগাতে পারে নতুন একটি দিন।

সাত.

মাত্র ১১টি চলচ্চিত্রে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন আনোয়ার হোসেন। ক্যামেরার কারিকুরিতে সেগুলোতে যে অসাধারণ দক্ষতার ছাপ রেখেছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার কাজের একটা ধরন বা প্যাটার্ন, যাকে বলে নিজস্ব শৈলী আছে। তার চিত্রগ্রহণে করা চলচ্চিত্রগুলো দেখলে বোঝা যায়। নির্মাতা চলচ্চিত্রের মূল চালক হলেও চিত্রগ্রাহকেরও স্বাধীনতা থাকে নিজের কল্পনা ও দর্শন যোগ করার। নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহকের মন ও মনন যদি একই সুতোয় গাঁথা হয়, তবে সেখানে সাফল্য অবধারিত। আনোয়ার এমন একসময় ক্যামেরা হাতে নিয়েছিলেন যখন ক্যামেরা লেন্স অন্যের গল্প বলতো ঠিকই, কিন্তু তাতে ছিলো না কোনো সুর, কোনো ছন্দ। ক্যামেরার কম্পোজিশন, ইমেজ, ডিটেইল, সিম্বল--সবকিছু নিয়ে যে জাদুকরী সুর তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার রেশ থেকে যাবে অনেক অনেক বছর।

লেখক : সারা মনামী হোসেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন-এ পড়ান।

saramonami@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

1.http://www.gunijan.org.bd/GjProfDetails_action.php?GjProfId=52; retrieved on: 30.03.2019

2.https://www.jugantor.com/national/117384; retrieved on: 30.03.2019

3.http://www.bmdb.com.bd/movie/228/; retrieved on: 30.03.2019

4.http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2010-01-22/news/54859; retrieved on: 02.04.2019

5. https://bangla.bdnews24.com/glitz/article1109799.bdnews; retrieved on: 02.04.2019

6. http://fq.ucpress.edu/content/38/4/57.1; retrieved on: 02.04.2019

৭. পত্রী, পূর্ণেন্দু (১৯৯১ : ১২); সিনেমা সংক্রান্ত; দে’জ পাবলিশিং, ভারত।

8. https://bit.ly/30rUkDc; retrieved on: 02.04.2019

9. https://nofilmschool.com/2017/02/visual-and-emotional-effects-using-dolly-and-zoom-shots-your-film; retrieved on: 03.04.2019

১০. দাশগুপ্ত, ধীমান (১৯৮৮ : ৪১Ñ৪৪); ‘শট ও শট বিভাজন’; চলচ্চিত্রের টেকনিক ও টেকনোলজি; সম্পাদনা : ধীমান দাশগুপ্ত; বাণীশিল্প, কলকাতা।

11. https://www.youtube.com/watch?v=sTbyOpnWI0c; retrieved on: 03.04.2019

 

(বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজকি লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা , জুলাই ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়ছে।) 


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন