মৃধা রেজাউল
প্রকাশিত ২৬ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
মুহম্মদ খসরুকে নিয়ে খোলা চিঠি
মৃধা রেজাউল

প্রিয় সম্পাদক,
শুভেচ্ছা নিবেন। আশা করি ভালো আছেন। আপনি আস্থা রেখে যে লেখাটা আমার কাছে চেয়েছিলেন, সেটা লেখার সামর্থ্য আমার আসলে নেই। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা পথিকৃৎ মুহম্মদ খসরুর মতো এতো বড়ো মানুষকে নিয়ে লিখবার যোগ্য লেখক আসলে আমি নই। তারপরও ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর মতো একটি পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশ হবে এই গৌরবটা পেতে ইচ্ছে করছিলো। তাই আকারে ইঙ্গিতে আপনাকে বুঝিয়েছিলাম, আমি লিখতে পারবো। ‘ধ্রুপদী’ সম্পর্কে, মুহম্মদ খসরু সম্পর্কে আমি যা জানি, তাকে বার্ডস আই ভিউ-ও বলা যায় না।
মুহম্মদ খসরুর সঙ্গে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে চায়ের টেবিলে প্রথম কথা হয়। খুবই অল্প কথা। তারপর অনেকবার ফোন করে করে ২০১১-তে রোহিতপুরে উনার বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি পাই একবার। ওই দিনই বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ হয় তার সঙ্গে। এরপর কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার যে, উনার দেওয়া একটা দায়িত্ব অনেকবার সময় নিয়েও আমি করে দিতে পারিনি। আড়াই বছরের মাথায় শেষবার সময় দেওয়ার সময় খসরু ভাই বলেছিলেন, এবার যদি তুমি কাজটা করে না দাও, তাহলে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ। এবং সত্যিই আমি শেষবারের বেঁধে দেওয়া সময়েও কাজটি করতে ব্যর্থ হই। এরপর ফোন দিলে যখনই বুঝতে পারতেন আমার ফোন, খসরু ভাই লাইনটা কেটে দিতেন। এভাবেই অনেক কষ্টে খুঁজে পাওয়া যোগাযোগের সূত্রটা আমি নিজ দোষে খুইয়ে ফেলি।
রোহিতপুরের মোহনপুরে খসরু ভাইয়ের আধা-পাকা টিনের ঘরটা দেখা আমার জন্য তীর্থ দেখার মতো। সরকারি ইয়াছিন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আলতাফ হোসেন আর আমি গিয়েছিলাম উনার সেই বাড়িতে।
ফ্লাশব্যাক
খ্যাতিমান প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ইয়োরিস ইভেন্স একবার মস্কোয় গিয়েছিলেন আইজেনস্টাইনের বাসায়। গিয়ে দেখেন আইজেনস্টাইনের ঘরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ছয়টি ভাষার নামকরা সব বইয়ে ঠাসা। সেই সঙ্গে রয়েছে প্রত্যেক শতকের চিত্রকলার নমুনা। ইউরোপের প্রধান ভাষাগুলো আয়ত্তে থাকায় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সব শাখায় আইজেনস্টাইনের দখল ছিলো রাজার মতো ঐশ্বর্যময়। সত্যজিৎ রায়ের খুব শখ ছিলো আইজেনস্টাইনের ঘরের চাবিটা একটু হাতে পাওয়ার। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে মস্কোর আইজেনস্টাইন আর্কাইভের অধ্যক্ষ নাউম ক্লাইমান এসেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের কলকাতার বাসায়। বাঙালি ভদ্রতা মোতাবেক বিদায় দেওয়ার সময় অতিথিকে দোরগোড়া পর্যন্ত এগিয়ে দেন সত্যজিৎ। আহ্লাদ মাখা নরম গলায় অচরিতার্থ এক খেদের কথা নাউম ক্লাইমানকে সত্যজিৎ জানান--‘আমার একটা শখ আছে। আইজেনস্টাইনের ঘরে গিয়ে একবার বসবো, তার বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করবো।’ জবাবে আইজেনস্টাইন-আর্কাইভ-অধিপতি বললেন, ‘আপনার হাতে তার ঘরের চাবি তুলে দেবো। যতোক্ষণ খুশি থাকবেন সেই ঘরে।’ যে ঘরটাকে আইজেনস্টাইন আর্কাইভ বানানো হয়েছিলো তা আসলে মিউজিয়াম মাপের বড়োসড়ো আহামরি কোনো দালান-কোঠা নয়। ঘরটা আসলে আইজেনস্টাইনের বান্ধবী পেরা আতাশেভার ঘর। মৃত্যুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার আইজেনস্টাইনের ছোটো ফ্ল্যাটটি অন্য একজনকে বন্দোবস্ত দিয়ে দেয় সরকার। কাছেই ছিলো পেরার ফ্ল্যাট। অগত্যা সেই ঘরেই তাড়াহুড়ো করে পেরা নিয়ে তোলেন আইজেনস্টাইনের যাবতীয় ব্যক্তিগত জিনিসপত্র--বই, ফাইল, পাণ্ডুলিপি, ছবি, উপহার, বাসনকোসন, কাপ-প্লেট। বড়ো আঁটসাঁট চাপাচাপির মধ্যে, বড়োই দারিদ্র্যের মধ্যে কেটে গেছে বিশ্বচলচ্চিত্রের এই সর্বাধিনায়কের জীবন। ভাগ্যের কী নির্মম বিদ্রুপ যে, এতো বড়ো একজন তাত্ত্বিক দার্শনিক নির্মাতার মৃত্যুর পর বইপত্র, পাণ্ডুলিপি, স্কেচ, অ্যালবাম রাখার মতো মামুলি ফ্ল্যাটের বরাদ্দটুকুও কাটা পড়ে গিয়েছিলো।
একার আর্কাইভ
২০১১ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ খসরুর মামুলি চারচালা ঘরের ভিতর ঢুকে আমার মনে হলো ক্লান্ত, অবসন্ন এক মুসাফিরের জীর্ণ জোব্বার ভিতর লুকানো সোনার দিরহামের খোঁজ পেয়েছি। বই, বই আর বই। তাকে, সেলফে, আলমারিতে, টেবিলে, চেয়ারে, বিছানায়, মেঝেতে কোথায় নেই বই! কেবল চলচ্চিত্রের বই-ই নয়, সাহিত্য, শিল্প চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি নন্দনতত্ত্ব ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি বিচিত্র বিষয়ে বেশুমার বই। মুহম্মদ খসরু নামের মানুষটাকে দেখে আমার মনে হলো আন্তন চেখভের ‘বেট’ গল্পের নায়ককে দেখছি। নিয়তির সঙ্গে বাজি ধরে যেনো তিনি স্বেচ্ছা অন্তরীণের জীবন বেছে নিয়েছেন। বইবিমুখ একটি জাতির যাবতীয় মূর্খতার ঋণ তিনি একা পরিশোধ করে দেবেন বলে নিভৃতে নিরালায় পড়ে যাচ্ছেন আর গুছিয়ে রাখছেন হাজার হাজার বই।
১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে সৎ সৃজনশীল শিল্পিত চলচ্চিত্রের বিকাশের লক্ষ্য নিয়ে স্থাপিত হয় ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংসদের ব্রত হয়ে দাঁড়ায় নির্মল চলচ্চিত্রের একটা শক্ত বুনিয়াদ গড়ে তোলা। এজন্য তারা নিয়মিত বিদেশি ধ্রুপদী চলচ্চিত্র দেখাতো, চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা প্রকাশ করতো। এজন্য আমেরিকান, বৃটিশ, ভারতীয় দূতাবাস ও এশিয়া ফাউন্ডেশনসহ নানা চ্যানেল থেকে মূল্যবান সব হীরের টুকরা বই খসরু তখন সংগ্রহ করতেন। প্রায় অর্ধ-শতাব্দী ধরে একাই মস্ত এক মহাফেজখানা গড়ে তুলেছেন হাজার হাজার বইয়ের।
কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্সে ফিল্মের সিলেবাস পড়ায় আটশো নম্বরের। সেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক মুহম্মদ খসরুকে বলেছিলেন, তাদের ফিল্ম ডিপার্টমেন্টেও খসরুর মতো এতো বই নেই। খসরু ভাইয়ের ঘরে বসেই নাগিব মাহফুজের নোবেল বক্তৃতার খানিকটা অংশ আমার মাথায় ভেসে ওঠে।
একবার বাইজানতিয়ামের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভের পর মুসলিম বাহিনীর হাতে অনেক যুদ্ধবন্দি আটকা পড়ে। সোনাদানা, অর্থবিত্ত কিংবা কোনো ভূখণ্ড নয়, মুসলিম বাহিনী যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দিয়েছিলো গ্রিক দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গণিতশাস্ত্রের ওপর লিখিত মূল্যবান বইয়ের বিনিময়ে। যদিও বিজয়ী বাহিনী ইসলামে বিশ্বাসী আর পরাজিতরা পৌত্তলিকতার অনুসারী ছিলো। এভাবেই পাশ্চাত্য সভ্যতার শ্রেষ্ঠ দান ইউক্লিড, আর্কিমিডিস, হেরোডোটাসরা চলে আসে আরবদের হাতে। এসবের চর্চা থেকেই বহুধা পল্লবিত হয়ে ওঠে মরুভূমির আরব সভ্যতা।
চলচ্চিত্রের সিপাহসালার হিসেবে মুহম্মদ খসরুর বিভিন্ন দূতাবাসের কাছ থেকে বিদেশি বই সংগ্রহও ছিলো উষর মরুতে নতুন সভ্যতা পত্তনের মতো। খসরু ভাইয়ের জানা ছিলো পরাধীন ভারতে ফিল্ম পড়ার কোনো অ্যাকাডেমি নেই। অন্তপ্রেরণার selfmade অ্যাকাডেমিতেই চলচ্চিত্রের তালিম নিয়েছিলেন ঋত্বিক, সত্যজিৎ, মৃণাল সেনরা; শান্তিনিকেতনে চিত্রকলা পড়তেন সত্যজিৎ রায়। অবসরে আর্ট ডিপার্টমেন্টের লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতেন। পড়তে পড়তেই একদিন তার হাতে আসে পল রোথার ‘দ্য ফিল্ম টিল নাউ’, রেমন্ড স্পটিসের ‘অ্যা গ্রামার অব দ্য ফিল্ম’। অভিভূত সত্যজিৎ বইগুলো পড়ে সংকল্প করলেন জীবনে যদি কিছু হতেই হয় তো ফিল্মমেকারই হবেন।
প্রতিদিন টানা নয় ঘণ্টা ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে পড়তেন মৃণাল সেন। এখানেই একদিন হাতে পান রুডলফ আর্ন হেইমের ‘ফিল্ম’ বইটি। ভূমিকম্প ঘটে যায় মৃণাল সেনের ভাবনার পৃথিবীতে। দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি হয়ে যায়--ফিল্মমেকার হওয়ার চেয়ে মহত্তর কিছু হতেই পারে না।
তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে ঢাকায় এলে মুহম্মদ খসরুকে ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, ৪০-এর দশকে তাদের কারোরই সামর্থ্য ছিলো না চলচ্চিত্র তৈরির। বিদেশি ভালো চলচ্চিত্র দেখারও তেমন সুযোগ ছিলো না। সেই সীমাবদ্ধতার যুগে নিজেদের সিরিয়াস অ্যাটিচিউডটা শাণিয়ে রাখার জন্য তারা ক্রমাগত পড়তেন আইজেনস্টাইনের ‘ফিল্ম ফর্ম’, ‘ফিল্ম সেন্স’, পুদভকিনের ‘ফিল্ম টেকনিক অ্যান্ড ফিল্ম অ্যাকটিং’ এবং ক্রাকাওয়ে, পল রোথা, রজার ম্যানভেলের বই। এই কথাগুলো মুহম্মদ খসরুর মাথায় ছিলো। এ কারণেই চলচ্চিত্র সাহিত্য যতো পেরেছেন, দুই হাতে সংগ্রহ করেছেন। অথচ পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে বইগুলোর করুণ দশা চোখে পানি আসার মতো।
কথা প্রসঙ্গে খসরু ভাই বলেছিলেন, ফ্রান্স থেকে শুধু ক্যামেরা নির্ভর একটি পত্রিকা বের হয়। সেটাও তার সংগ্রহে আছে। একই ঘরের মধ্যেই খসরু ভাইয়ের থাকার ঘর, পড়ার ঘর, বসার ঘর, রান্না ঘর। চির অকৃতদার খসরু ভাইয়ের একার সংসার। কাজের বুয়া এসে কেরোসিন তেলের স্টোভে রান্না করে দেয়। সামান্য একটু ভুলে ভস্মিভূত হতে পারে খসরু ভাইয়ের আত্মার উদ্যান।
কথার ফাঁকে খসরু ভাই হাত দিয়ে ভিতরবাড়ির আধখোলা বারান্দার দিকে নির্দেশ করলেন। তাকিয়ে দেখি নারকেল পাতায় বড়ো একটা শাখা। খসরু ভাই বললেন, আরে ওটা না। ওই যে পাশের চেয়ারটার কাছে যাও। গিয়ে দেখি চেয়ারের উপরে মলাটে মোড়া মোটা একটা বই। ধূলিধূসর জীর্ণ মলাট। পৃষ্ঠার খানিকটা পোকা খাওয়া। খসরু ভাই বললেন, আরে বইটা খোলো না। খুলে দেখি বৃটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটের পত্রিকা ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’-এর কয়েকটা সংখ্যা একত্র বাঁধাই করা। হায়রে ভাগ্য! কী জিনিস কীভাবে পড়ে আছে! কয়েকটা আলমারি আর সেলফে থরে থরে সাজানো বইগুলো দেখালেন তিনি। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র পণ্ডিতদের হীরের টুকরো সব বই। আইজেনস্টাইন, পুদভকিন, আন্দ্রে বাঁজা, ভ্লাদিমির নিলজেন, রজার ম্যানভেল, আর্ন হেইম, পল রোথা, ক্রাকাওয়ে আরো কতো কে! নক্ষত্রের পর নক্ষত্র দিয়ে সাজানো চলচ্চিত্রবিদ্যার মস্ত এক ছায়াপথ ভেসে যাচ্ছিলো আমাদের চোখের সামনে দিয়ে। আমি অবাক হয়ে গেলাম, এতো বই লেখা হয়েছে চলচ্চিত্র নিয়ে। এবং তার অনেকগুলোই আছে আমাদের আঁরি ল্যাঙ লোয়া (Henri Langlois) খসরু ভাইয়ের কাছে। যে আঁরি ল্যাঙ লোয়ার হাত দিয়ে তৈরি হয় ফরাসি ফিল্ম আর্কাইভ (Cinémathèque Française)। সূচিত হয় ফরাসি চলচ্চিত্রের নতুনতর ধারা ‘নিউওয়েভ’। নাকি খসরু ভাই আমাদের কুলেশভ, যার ওয়ার্কশপ থেকে উঠে এসেছিলেন আইজেনস্টাইন, পুদভকিন, কুজনেৎসভ। কুলেশভ সম্পর্কে পুদভকিন বলেছিলেন, ‘আমরা চলচ্চিত্র সৃষ্টি করে থাকি; কিন্তু কুলেশভ সৃষ্টি করেছেন চলচ্চিত্র বিজ্ঞান, ... কুলেশভ আমাদের দেখার চোখ তৈরি করে দিয়েছেন এবং তিনিই আমাদেরকে মন্তাজ রীতির অ-আ-ক-খ শিখিয়েছিলেন।’
প্রায় একই রকম কথা তারেক মাসুদ বলেছিলেন মুহম্মদ খসরু সম্পর্কেজ্জ‘আমরা সবাই খসরু ভাইয়ের ওভার কোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এসেছি।’ সূর্য দীঘল বাড়ীর খ্যাতিমান নির্মাতা শেখ নিয়ামত আলী বলেছেন, ‘আমাদের ছবি করার পেছনে যা কিছু প্রেরণা, তা পেয়েছি চলচ্চিত্র সংসদের কাছ থেকে।’
খসরু ভাইয়ে টিনের চালের নিচে বসে সেদিন আরো কতো কী যে মনে হয়েছিলো। দূরবীন হাতে নাবিকের দূরদর্শিতায় ৬০-এর দশকের গোড়াতেই তিনি এঁকে ফেলেছিলেন আমাদের চলচ্চিত্রের রোডম্যাপ; শুদ্ধ চলচ্চিত্রকে শক্ত বুনিয়াদে সোজা মেরুদণ্ডে দাঁড় করাবার জন্য কোমর বেঁধে খেটেছিলেন মানুষটি। বাকি সবাই ছিলেন পার্ট টাইমার, উনি একা ছিলেন লাইফ টাইমার। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে খসরু ভাই বলেন,
১৯৬৩ সালের ২৫ অক্টোবর বিশিষ্ট সংস্কৃতিসেবী প্রয়াত আশরাফ আলী চৌধুরীর ঢাকাস্থ ২৬০ নম্বর পুরানা পল্টন লাইনের বাড়িতে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ নামে যে সংগঠনটির জন্ম হয়, তা শুধু পূর্ব বাংলার নয়, সমগ্র পাকিস্তানের জন্য ছিলো একমাত্র চলচ্চিত্র সংসদ। সূচনা পর্বে যেসব চলচ্চিত্রপ্রেমীদের উদ্যোগে সেদিন এই সংগঠনের জন্ম হয়েছিলো, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ওয়াহিদুল হক, পপুলার ফিল্মস ও ফিল্ম ট্রাস্ট নামক প্রযোজক পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোশাররফ হোসেন চোধুরী, ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল হক খান, চলচ্চিত্রকার সালাউদ্দিন, এফ ডি সি’র শিল্পনির্দেশক আব্দুস সবুর, পি টি ভি’র ডিজি মনিরুল আলম ও মুহম্মদ খসরু। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আনোয়ারুল হক খান। পরবর্তী সময়ে পি টি ভি’র সংবাদ বিভাগের প্রধান ফারুক আলমগীর এবং ইয়াছিন আমিন ও জামাল খান সংসদের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সংসদের কোনো সভাপতি ছিলো না। সংসদের প্রথম সভাপতির পদ গ্রহণ করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন।
বিভোর বালকের বায়োস্কোপ
খসরু জন্মেছিলেন হুগলিতে; ওখানেই তাদের বাড়িঘর ছিলো। নৈহাটি জুট মিলে বাবা কাজ করতেন। ছোটোবেলা থেকেই তিনি পোকা ছিলেন চলচ্চিত্রের। ৮-১০ জনের দল করে তারা বহু দূর জায়গায় চলে যেতো চলচ্চিত্র দেখতে। সেসব দিনে গৌরিপুরে ছিলো ‘রামকৃষ্ণ টকিজ’ আর ছিলো ‘নৈহাটি সিনেমা’। পুরো পরিবারের সঙ্গেও খসরু চলচ্চিত্র দেখেছেন বিভোর হয়ে। তন্ময় বিভোরতার মগ্ন চৈতন্যের ঘূর্ণি আবর্তের কেন্দ্রানুগ বলের লব্ধি থেকে তৈরি হয় তার সিনেমার অবসেশন।
ঘোর বৃষ্টি বাদলায়
বীজপত্র চোখ মেলে চায়
ইতিহাসের গতিতে অক্ষরেখার চারপাশে পৃথিবী নামের মহাজাগতিক লাটিমটি অনেকবার ঘুরেছে। আর সে গতির আবর্তের টানে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার গুটিকয় তরুণ মিলে গড়ে তোলে ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’। সোসাইটির জোগাড়-যন্ত্রীরা হলেন সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, বংশি চন্দ্রগুপ্ত, মনোজ মজুমদার। ইতালি, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জনরার শিল্পিত চলচ্চিত্র দেখে দেখে এরা সেসবের অ্যানাটমিক অ্যানালিসিস করে যাচ্ছে। এক বছর বাদেই ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে মৃণাল সেনের উদ্যোগে ছোটো একটি ফিল্ম ক্লাবের সূচনা হয়। ক্লাবের উৎসাহী সদস্যরা বেঙ্গল ফিল্মস ল্যাবরেটরিতে আইজেনস্টাইন, পুদভকিন প্রমুখের চলচ্চিত্র দেখে। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রথম অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। প্রথমবারের মতো কলকাতাবাসী দেখতে পায় কুরোশাওয়া, রসোলিনি, ভিত্তোরিও ডি সিকা’র মতো বিশ্বখ্যাত নির্মাতাদের চলচ্চিত্র।
ওদিকে কেরানীগঞ্জের রোহিতপুরের মোহনপুরে পৈত্রিক ভিটেয় ফিরে আসেন চলচ্চিত্রের খাস খাদেম খসরু। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের খবর সোৎসাহে ছাপে ‘পরিচয়’ পত্রিকা। ‘পরিচয়’-এর পাতাতেই মুহম্মদ খসরুর পরিচয় হয় বিশ্বচলচ্চিত্রের বুধমণ্ডলীর সঙ্গে। রোজনামচায় কাজের রোডম্যাপটা রেওয়াজের বাস্তবতায় নিয়ে আসেন তিনি। দ্বার থেকে দ্বারে ফেরেন ফিকিরে, কোথা গেলে মিলে যায় সিনেমারসিকেরে। মুহম্মদ খসরু বুঝে ফেলেছেন চলচ্চিত্র কুটিরশিল্প নয়, এর ভাষা হাইলি টেকনিকাল, অ্যাপ্রোচটা আরবান কসমোপলিটান। চলচ্চিত্র বানানোর যন্ত্রজটিল কাজটা তাকে শিখতে হবে। ঘুম হারাম হয়ে যায় খসরুর। চলচ্চিত্রে পৃথিবী কোন শৃঙ্গশীর্ষে উঠে গেছে। পাশের পড়শি কলকাতাও কতো এগিয়ে, অথচ আমরা এখনো কুম্ভকর্ণের ঘুমে। নষ্ট করার সময় কই। তাই কষ্ট করেই কেষ্ট হাসিল করতে হবে। আর কেষ্ট ধরার প্রথম ফাঁদ ফিল্ম সোসাইটি। ততোদিনে মুহম্মদ খসরু চাকরিতে ঢুকেছেন। বিসিকের অ্যাসিসট্যান্ট ফটোগ্রাফার। এ সময়ই একদিন দেখা হয় ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে। তার কাছে পেশ করলেন ফিল্ম সোসাইটির কথা। ওয়াহিদুল হক বললেন, আমরাও তো ও রকম ভাবছি। তো হয়ে গেলো মণিকাঞ্চন যোগ। ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে যোগ দিলেন কলিম শরাফী। কিন্তু মূল কাজের দায়িত্বটা চাপলো মুহম্মদ খসরুর ওপর। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বছর খানিক পর ধলেশ্বরীর চর অঞ্চলে রোহিতপুরে আইয়ুববিরোধী এক নির্বাচনি অভিযানের সময় মুহম্মদ খসরুকে ওয়াহিদুল হক বলেন, ‘চলচ্চিত্র সংসদের জন্য কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না, সংগঠনের যাবতীয় কাজকর্মের দায়িত্ব এখন থেকে তোমাকেই নিতে হবে।’ সেই থেকে চোয়ালচাপা দৃঢ়তায় জুড়ে ছিলেন সংসদের সঙ্গেই। কখনো পিছু হটেননি। দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পর খসরুর প্রধান দায়িত্ব হয়ে পড়ে সংসদ আন্দোলনের জন্য কর্মী জোগাড় করা।
কর্মী সংগ্রহের তিনটি নমুনা
আলমগীর কবির তখন ইংল্যান্ড থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়ে ঢাকায় ফিরেছেন। মুহম্মদ খসরু একদিন রাত ১২টায় তার বাসায় গিয়ে হাজির। ঘুম থেকে টেনে তুলে তাকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে নামিয়ে দিলেন। বিদেশি অর্জিত অ্যাকাডেমিক জ্ঞান-অভিজ্ঞতা-চিন্তা দিয়ে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে পুরো ভাগে থেকে আজীবন নেতৃত্ব দিয়েছেন। চলচ্চিত্র আন্দোলনে আলমগীরও একজন প্রধান কাণ্ডারি।
স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত চলচ্চিত্রসংক্রান্ত লেখাগুলো গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়তেন মুহম্মদ খসরু। সেসময় সাপ্তাহিক ‘চিত্রালী’তে পর পর দুটি সংখ্যায় চমৎকার দুটি লেখা পড়ে তিনি আকর্ষণ বোধ করেন। ইতালীয় নব্য-বাস্তববাদ ও ফরাসি নব তরঙ্গের ওপর দুটি প্রবন্ধ লেখেন জামাল খান ও ফারুক আলমগীর। লেখা দুটোর মধ্যে মুহম্মদ খসরু মনীষা ও আগ্রহের দ্যুতি দেখেছিলেন। এক রবিবার বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডায় তিনি তাদেরকে চলচ্চিত্র সংসদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। লেখকদ্বয়ও আনন্দের সঙ্গে সম্মত হন। এদের সঙ্গে আরো একজন ছিলেন ইয়াছিন আমিন। এই ত্রয়ী বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদে দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন।
১৯৬৭ বা ওই রকম সময়ে প্রথমবারের মতো এদেশে সের্গেই আইজেনস্টাইনের চলচ্চিত্র অক্টোবর দেখানোর জোগাড়-যন্ত্র করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ। মুহম্মদ খসরু তার কার্ড বিতরণ করে বেড়াচ্ছেন। স্টেডিয়াম মার্কেটে আইডিয়াল বইয়ের দোকানে এসে দেখেন দীর্ঘকায় এক তরুণ পার্কার টেইলারের সচিত্র গ্রন্থ ‘ক্লাসিক্স অব দ্য মডার্ন ফিল্ম’ নেড়েচেড়ে দেখছেন এবং পছন্দ হওয়ায় শেষে কিনে ফেলেন। শিকার হাতছাড়া করার লোক খসরু নন। তরুণটির সঙ্গে কথা বলেন। অক্টোবর দেখার কথা বলে কার্ড দেন। কব্জায় এনে ফেলা বিশ্বচলচ্চিত্রের পাঠক এই তরুণের নাম মসিহউদ্দিন শাকের, সূর্য দীঘল বাড়ীর অন্যতম পরিচালক।
জুম ইন
কেবল সদস্য জোগাড় করে দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের বিকাশের জন্য বিশ্বখ্যাত ধ্রুপদী চলচ্চিত্রগুলো দেখাশোনার আয়োজনও করতে হয় তাকে। এসব চলচ্চিত্র জোগাড় করা হতো বিভিন্ন দূতাবাস থেকে। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তারা দেখানোর জন্য হল দিয়েও সহায়তা করতো। রাশিয়ান, আমেরিকান, বৃটিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মানি ও ভারতীয় দূতাবাস থেকেই মূলত সহায়তা নেওয়া হতো। সোভিয়েত চলচ্চিত্র দিয়ে শুরু হয় ফিল্ম সোসাইটির কার্যক্রম। তখন কোল্ড ওয়ার তুঙ্গে। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, রাশিয়ান চলচ্চিত্র ক্রেনস আর ফ্লাইং দেখানো হচ্ছে আমেরিকান কালচারাল সেন্টারে। আমেরিকান চলচ্চিত্র তো দেখানো হতোই। অরসন ওয়েলস, মার্টিন স্করসেস-এর চলচ্চিত্রও তারা দেখিয়েছিলো। দূতাবাস ছাড়া সাধারণ প্রেক্ষাগৃহেও চলচ্চিত্র দেখিয়েছিলো। তবে অফ পিকে। গুলিস্তান সিনেমাহলে প্রায়ই তারা চলচ্চিত্র দেখাতো। হল কর্তৃপক্ষের ব্যবসার ক্ষতি যাতে না হয়, সেজন্য সবচেয়ে অফ পিরিয়ডে সকাল সাড়ে সাতটা-আটটার দিকে শুরু হতো শো। সেসময়ে দেখানো চলচ্চিত্রের একটি বিখ্যাত আমব্রেলা অব শেরবুর। এছাড়া ত্রুফো, গদার, রিভেত-এর নিউওয়েভ ধারার কতো বিচিত্র ধরনের চলচ্চিত্র তারা দেখিয়েছিলো। খসরু ভাইয়েরাই ঢাকায় প্রথমবারের মতো ফরাসি চলচ্চিত্র সমাবেশের আয়োজন করে। প্রদর্শিত চলচ্চিত্রের মধ্যে ক্রিস মার্কারের লা জেটি এবং ফ্রাসোয়াঁ ক্রফোর জুল অ্যান্ড জিম অনেকদিন পর্যন্ত খসরু ভাইকে মুগ্ধ করে রেখেছিলো। এই সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের মহানগর দেখা নিয়ে খসরু ভাইয়ের অভিজ্ঞতাটি জুড়ে দেওয়া যায়, ‘ঢাকার দর্শকের নিকট সত্যজিৎ রায়ের মহানগর যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো তার অন্য কোনো দৃষ্টান্ত উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীর ইতিহাসে আছে বলে আমার জানা নেই। মহানগর-এর টিকিট দেওয়া হয়েছিলো ঢাকা স্টেডিয়ামের কাউন্টারে। সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও একটা টিকিট পাইনি।’
ভালো চলচ্চিত্র দেখা ও দেখানোটা তখন খসরু ভাইদের একটা ঘোরে পরিণত হয়েছে। তার ভাষায়, ‘এমনও হয়েছে যে, বাড়ি থেকে লোকজনকে ধরে এনে ছবি দেখাইছি।’
ওয়াইড অ্যাঙ্গেল
বিশ্বচলচ্চিত্রের মানচিত্র ততোদিনে বেশ খানিকটা অধিগত হয়ে গেছে খসরু ভাইদের। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব হয়। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অল ইউনিয়ন ইন্সটিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফি’। স্বয়ং লেনিন মনে করতেন, ‘Cinema is the most important of all arts.’ ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই রাশিয়ায় ছয়টি ফিল্ম ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। আইজেনস্টাইন, পুদভকিন, দভজেন্কো, কুজনেৎসভ, ঝিগা ভের্তভের অবিশ্বাস্য সাফল্য এই সব পটভূমির কারণে সম্ভব হয়েছে।
বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক বেলা বালাজ হাঙ্গেরিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বুদাপেস্ট অ্যাকাডেমি অব সিনেমাটোগ্রাফিক আর্ট’। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পোলান্ডে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘লডজ ফিল্ম স্কুল’। এখানকার ছয় বছর মেয়াদি ফিল্ম কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা ছিলো অত্যন্ত কঠিন। এই ফিল্ম ইন্সটিটিউটের তালিম পেয়েই তৈরি হন আন্দ্রে ভাইদা, আন্দ্রে মুঙ্ক, রোমান পোলানস্কির মতো নির্মাতা।
বিশিষ্ট চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক লুইজি চিয়ারিনির পরিচালনায় ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে প্রতিষ্ঠিত হয় পশ্চিম ইউরোপের প্রাচীনতম চলচ্চিত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘চেন্ত্রো স্পেরিমেন্তালে দি চিনেমাতা গ্রাফিয়া’। চেন্ত্রো স্পেরিমেন্তালের শিক্ষক প্যানেলের নাম দেখলেই বোঝা যায়, কোন স্কেলের শিক্ষা দেওয়া হতো এখানে। চার্লি চ্যাপলিন, রেনে ক্লেয়ার, জ্যঁ রেঁনোয়া, রোবের ব্রেসোর মতো চলচ্চিত্রকাররা এখানে পড়িয়েছেন। লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রশিক্ষার স্থপতি ফার্নান্দো বিরি, তমাস গুতিমেরেস, আলেয়া, হুলিয়ো গার্সিয়া এসপিনোসা এবং নোবেল বিজয়ী কথাশিল্পী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ সবাই ছিলেন চেন্ত্রো স্পেরিমেন্তালের শিক্ষার্থী।
মার্কেজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো। কাস্ত্রোর মতো উচ্চায়ত শিল্প-সমঝদারি কম রাষ্ট্রনায়কের মধ্যেই দেখা যায়। কিউবার বিপ্লবী সরকারের আইন মন্ত্রণালয় স্বাধীন দেশে সর্বপ্রথম যে আইনটি পাশ করে তা হলো কিউবায় ফিল্ম ইন্সটিটিউট নির্মাণের আইন। এবং এর ফলে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মার্চ নতুন সরকার ফিল্ম ইন্সটিটিউট স্থাপনের আইন অনুমোাদন করে। কেবল কিউবা নয়, গোটা মহাদেশের (লাতিন আমেরিকা) চলচ্চিত্রকে শক্ত ভিত দিতে কাস্ত্রোর সহযোগিতাকে মার্কেজ দারুণভাবে কাজে লাগান। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফাউন্ডেশন অব দ্য নিউ লাতিন আমেরিকান সিনেমা’। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রনির্মাতারা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। ফাউন্ডেশনের কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য ছিলো প্রধান দেশগুলোতে একটি করে ফিল্ম স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্যেই ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে আর্জেন্টিনার পরিচালক ফার্নান্দো বিরির পরিচালনায় হাভানায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইন্তারন্যাশিওন্যাল দে সিনে ই তেভে’ (International School of Cinema and T.V)। এখানে শিক্ষাদান প্রণালি কয়েক স্তরভিত্তিক। তৃতীয় স্তরের নাম ‘ডায়ালগ অব হায়ার স্টাডিজ’; উচ্চতর সেমিনারের ব্যবস্থা করা এই পর্যায়ের লক্ষ্য। ‘হাউ টু টেল অ্যা স্টোরি’ শীর্ষক সেমিনারে প্রতিবছর মার্কেজ নিজেই চিত্রনাট্য সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনা করতেন। মার্কিন সরকারের নিষেধ সত্ত্বেও সেমিনারটির তাৎপর্যের কারণে হলিউডের অনেক খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার এই আলোচনায় যোগ দেয়। এই কর্ম কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠা, কর্মচারীদের বেতন, শিক্ষার্থীদের খাওয়া ইত্যাদি খরচ বহন করে কিউবা সরকার। এর বেশি সাধ্য নেই এদের, তাই প্রতিষ্ঠানটির বিপুল খরচের একটা বড়ো অংশ মার্কেজ নিজের বইয়ের রয়্যালটি থেকে বহন করতেন। বাকি টাকার যোগান আসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দান থেকে।
বৃটেনের চলচ্চিত্রের উন্নয়নে ‘বৃটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটের’ ভূমিকা অপরিসীম। এর পরিচালনা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয় কাউন্সিল অব লর্ড থেকে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেরই সেরা চলচ্চিত্রের প্রিন্ট সংরক্ষিত আছে এই সংরক্ষণাগারে। স্থিরচিত্রের বিশাল এই সংগ্রহশালায় রয়েছে লক্ষাধিক স্থিরচিত্র। একইভাবে আমেরিকায় আছে ‘মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট’, ফ্রান্সে আছে ‘সিনেমা থেক ফ্রাসেজ’।
পথের পাঁচাল’র বিশ্বখ্যাতির পর ভারত সরকার চলচ্চিত্র বিষয়টাকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে। তারা বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত মারি সিটনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারতে আনে। দিল্লী ও কলকাতায় অনেকগুলো সেমিনার করেন তিনি। শিক্ষা দপ্তর পাঠ্যসূচিতে কীভাবে চলচ্চিত্রকে অভিযোজিত করা যায় সে বিষয়ে মারি সিটনের দিকনির্দেশনা চায় ভারত। সেই মোতাবেক মারি সিটন চলচ্চিত্রের টেক্সট বুক হিসেবে লিখে দেন দু-খণ্ডের ‘দ্য আর্ট অব ফাইভ ডিরেক্টরস : ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন।’
প্রিয় মামুন ভাই,
আমার এতোক্ষণের বকবকানি আপনার কাছে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ মনে হতে পারে। তবে এর থেকে একটা কথা বলা যায়, চলচ্চিত্রের মতো একটা বিশাল ব্যাপারে--Art IIndustryউভয় অর্থেই যারা ভালো করেছে--সেখানে সরকারের বিরাট সহায়তা ছিলো। প্রতি তুলনায় আমাদের এখানে খসরু ভাইয়ের আমলে তেমন কিছুই হয়নি। অগত্যা দায়িত্বটা তাদেরকেই নিতে হলো।
১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ প্রতিষ্ঠার পর পরই ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ‘বৃটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউটের’ সদস্যপদ লাভ করে। নিয়মিত আসতে শুরু করে ইন্সটিটিউটের পত্রিকা ‘সাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ এবং ‘মান্থলি ফিল্ম বুলেটিন’। এই সদস্যপদ প্রাপ্তির কারণে পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ উপমহাদেশের একমাত্র সংগঠন হিসেবে বৃটিশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে চলচ্চিত্র এনে সদস্যদের দেখানোর যোগ্যতা অর্জন করে। খসরু ভাই একদম গোড়াতেই হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছিলেন, অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা ছাড়া চলচ্চিত্রে আমরা কিছুই করতে পারবো না। এজন্য স্বাধীনতার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যখন আমাদের হাতে, ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট, পুনে’র ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন বিভাগের অধ্যাপক সতীশ বাহাদুর’কে ঢাকায় এনে এক মাস মেয়াদের একটি ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশনের কর্মশালা করান মুহম্মদ খসরু। কর্মশালা পরিচালনার সময় সতীশ বাহাদুর ভারতীয় ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ভালো ভালো বিদেশি চলচ্চিত্র, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকান চলচ্চিত্র এনেছিলেন। ফলে এই ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়। বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংসদের শতাধিক কর্মী ছাড়াও চলচ্চিত্রকার, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকরা এই কর্মশালায় অংশ নেয়। আমাদের এখানে চলচ্চিত্রের পঠন-পাঠনের জন্য একটি ফিল্ম ইন্সটিটিউট এবং চলচ্চিত্র ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য ফিল্ম আর্কাইভের প্রয়োজনটা তখন সবার কাছেই চাক্ষুস হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে সতীশ বাহাদুরকে অনুরোধ করা হয় ফিল্ম ইন্সটিটিউট ও ফিল্ম আর্কাইভের খসড়া কাঠামো প্রণয়ন করে দিতে। সতীশ বাহাদুর একটা খসড়া কাঠমোও প্রণয়ন করে দেন। সেটা যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হয়। সেই সঙ্গে সভা-সেমিনার করে, পত্রিকা প্রকাশ করে, লেখালেখির মাধ্যমে ফিল্ম ইন্সটিটিউট ও ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার দাবিকে জোরালো করা হয়। এভাবে ক্রমাগত চাপ ও তদবিরের ফলে ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট ও ফিল্ম আর্কাইভ। যা এদেশের চলচ্চিত্র শিক্ষা ও সংরক্ষণে প্রথম পদক্ষেপ।
একটি ভাড়া বাড়িতে আর্কাইভের কার্যক্রম শুরু হয়। একজন কিউরেটর নিয়োগ দেওয়া হয়। নির্মিত হয় ৩৫ ও ১৬ মিলিমিটারের চলচ্চিত্র দেখানোর প্রজেকশন সুবিধাসহ অডিটোরিয়াম। এ যাবৎ নির্মিত বাংলাদেশের যাবতীয় চলচ্চিত্রের প্রিন্ট সংগ্রহ করা শুরু হয়। চলচ্চিত্রবিষয়ক বইপত্র নিয়ে সমৃদ্ধ একটি পাঠাগারও স্থাপিত হয়।
সতীশ বাহাদুর এদেশে অবস্থানকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ তার সম্মানে একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করে। এ সভায় তৎকালীন উপাচার্য ড. মতিন চৌধুরী কথা দিয়েছিলেন অচিরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র বিষয়ে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই ‘অচিরেই’ শব্দটার অর্থ প্রলম্বিত হতে হতে ৩৫ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। এই যখন আমাদের দেশের হাল, তখন সেই দুর্যোগের মধ্যেও চলচ্চিত্রের হাল ধরে রেখেছিলেন চোয়ালচাপা সংকল্পের শক্ত পেশীর মাঝি মুহম্মদ খসরু।
এরপর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আয়োজন করে ‘হীরালাল সেন স্মৃতি বক্তৃতা ও কর্মশালা’। কর্মশালা পরিচালনার জন্য আনা হয় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট, পুনের স্বনামধন্য শিক্ষক হৈমন্তী ব্যানার্জিকে। এছাড়া মুহম্মদ খসরুর অনুরোধেই বৃটিশ চলচ্চিত্রবিদ লন্ডনের ‘সেøড স্কুলের’ শিক্ষক জেমস লিহি বাংলাদেশে আসেন চলচ্চিত্র কর্মশালা পরিচালনা করতে। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয় কর্মশালাগুলো। এই কর্মশালায় আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্র অন্তর্ভুক্ত থাকায় আমাদের শিক্ষানবিশদের কাছে এগুলো হয়ে ওঠে মস্ত বড়ো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই সব কর্মশালা থেকেই বেরিয়ে আসে তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম, মসিহউদ্দিন শাকের, সালাউদ্দিন জাকী, মানজারে হাসিন মুরাদ, সাজেদুল আউয়াল, বাদল রহমান প্রমুখ।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে খসরু ভাইয়ের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ। এবং এই পাটাতন থেকেই পুনের ফিল্ম ইন্সটিটিউটসহ বিদেশের বিভিন্ন ইন্সটিটিউটে পড়বার সুযোগ অবমুক্ত হয় আমাদের তরুণদের জন্য। মুহম্মদ খসরু একবার জানিয়েছিলেন, ‘বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও ডিপ্লোমাধারীদের সংখ্যা এখন প্রায় জনা ত্রিশের মতো হবে।’
আমাদের চলচ্চিত্রবোধে অন্ধত্বের নিদারুণ যেসব অভিজ্ঞতা খসরু ভাইয়ের হয়েছে, তাই হয়তো সারাক্ষণ অতন্দ্র তাকে তাতিয়ে রেখেছে। চলচ্চিত্রের স্থিরচিত্র দিয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ করায় একবার এক কবি আপনার সামনেই জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ কিনে নতুন বইয়ের মলাট ছিড়ে নর্দমায় ফেলে দেন। বিস্ময়ে বিমূঢ় হওয়া ছাড়া তখন কীইবা করার ছিলো। আরেকজন কবিরও কদর্য অভিজ্ঞতা তার হয়েছিলো; ১৯৮১’র দোরগোড়ায় আরেক কবি মহোদয় সম্ভবত খসরু ভাইয়ের পীড়াপীড়িতেই দেখেন বিশ্বখ্যাত কিছু চলচ্চিত্র আকিরা কুরোশাওয়ার রশোমন, থোন অব ব্ল্যাড, বার্গম্যানের ওয়াইল্ড স্ট্রবেরি, ফেদেরিকো ফেলেনির এইট অ্যান্ড হাফ, চার্লি চ্যাপলিনের গোল্ডরাশ। এই সব মহান ধ্রুপদী চলচ্চিত্র দেখে কবি প্রবরের মন্তব্য, ‘এই সব ছবিটবি দেখে মনে হলো, চলচ্চিত্র এখনো বড়ো কোনো আর্টের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।’ এরপর খসরু ভাইয়ের উপসংহার। ‘যদিও আমি শুধু দুজনের কথা উল্লেখ করলাম, মোটামুটি আমাদের সমগ্র বিদ্বৎ সমাজের এই একই অবস্থা।’
আমাদের ফিল্ম লিটারেসির এমন হাল দেখেই হয়তো আপনি ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এক লেখায় লিখেছিলেন “বেরনার্দো বের্তোলুচির মতো আমরাও বিশ্বাস করি ‘সিনেমা সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণের একমাত্র উপায় হলো সিনেমা দেখা।” প্রিয় খসরু ভাই, আপনার কবি বন্ধুদ্বয় হয়তো জানেই না বিশ্বখ্যাত পথের পাঁচালী নির্মাণের ওয়ার্ম আপ পর্যায়ে সত্যজিৎ রায় শুধু রবার্ট ফ্লাহাটির লুইজিয়ানা স্টোরি দেখেছিলেন ৯৯ বার। তাই আপনি চলচ্চিত্র সংসদের দায়িত্বের কথা আবারও স্মরণ করিয়ে বলেন, ‘চলচ্চিত্র সংসদের মূল কাজ হলো ভালো সিনেমা প্রদর্শন এবং তার রস আস্বাদনের মাধ্যমে সিরিয়াস দর্শক তৈরি করা।’
অথচ দর্শককে চলচ্চিত্র দেখানোর মতো মহৎ কাজও আপনাদেরকে ঠিকমতো করতে দেওয়া হয়নি। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে ঠেকাতেই তৈরি হয় ‘চলচ্চিত্র সংসদ রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৮০’। এই কালা কানুনের কোপে পড়ে সেন্সরের ছেচনার নিচে থেতলে গেছে সংসদকর্মীদের কতো সুখের স্বপ্ন। অপ্রদর্শিত অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে কতো ভালো ভালো চলচ্চিত্র। সত্যজিতের জন-অরণ্য, ঋত্বিকের যুক্তি তক্কো গপ্পো, গদারের উমান ইজ উমান, জোলতান ফাবরীর ফিফর্থ সীল ইত্যাদি কতো মহৎ চলচ্চিত্রই না আটকে দেওয়া হয়েছে। মুহম্মদ খসরুর আক্ষেপ, ‘সাতাত্তরের মাঝামাঝি সরকারি নির্দেশে সংসদগুলোর উপরে শুরু হয় ব্যাপক গোয়েন্দা অনুসন্ধান। জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তর এবং সামরিক নিরাপত্তা দপ্তর কর্তৃপক্ষের কাছে চলচ্চিত্র সংসদগুলোর যাবতীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং তাদের হাজার রকম প্রশ্নের জবাবদিহিতা করতে হয়।’
এফ ডি সি, ফিল্ম আর্কাইভ, চলচ্চিত্র সংসদ, শিল্পকলা একাডেমি, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগ নিয়েও খসরুর অনেক দুঃখ ও ক্ষোভ ছিলো। দেশের চলচ্চিত্র উন্নয়নে এসব প্রতিষ্ঠান প্রভূত ভূমিকা রাখতে পারতো। উদাহরণস্বরূপ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগ বা ডি এফ পি’র কথা বলা যায়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান সাধারণত সরকারি প্রচারচিত্র তৈরি করে থাকে। পাশাপাশি দেশকাল, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, সংস্কৃতি ও বরেণ্য ব্যক্তিদের জীবনী নিয়েও তারা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে। খসরু ভাই আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংসদের তরুণরা নানা বিষয়ে ছোটো চলচ্চিত্র এবং প্রামাণ্যচিত্রের চিত্রনাট্য পকেটে নিয়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর্থিক আনুকূল্য পাওয়ার জন্য। ডি এফ পি’র উচিত ছিলো এই সব তরুণদের আর্থিক অনুদান ও যান্ত্রিক সহায়তা দিয়ে তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথকে সুগম করে দেয়া।’ অথচ ‘বছর কয়েক আগে বিরাট জায়গাজমি নিয়ে বিশ্বব্যাংক থেকে প্রাপ্ত প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে পৃথিবীর সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত হয়ে নির্মাণ করেছে তার নিজস্ব নতুন স্টুডিও কমপ্লেক্স।’
আবার এর ভিন্ন চিত্রও দেখা যায় অন্যত্র। দুর্গম মরু এলাকার প্রচণ্ড শীতের মধ্যে বরফের উপর দিয়ে শত শত মাইল হেঁটে রবার্ট ফ্লাহার্টি নানক অব দ্য নর্থ-এর শুটিং শেষ করেন। শুটিং শেষে পুরো নেগেটিভ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সব কষ্ট, চেষ্টা জলে যায় ফ্লাহার্টির। অগত্যা নতুন করে গোড়া থেকে শুটিং শুরু করতে হয়। তখন অন্য এক প্রযোজক এগিয়ে আসে দ্বিতীয় দফা শুটিংয়ের ব্যয়ভার বহন করতে। এবং এভাবেই একজন নির্মাতা, একজন প্রযোজকের পক্ষে সম্ভব হয় মহাকালের গায়ে নিজস্ব স্বাক্ষর এঁকে দেওয়ার। একই চলচ্চিত্রের জন্য ফ্লাহার্টিকে দুবার দুজন প্রযোজক টাকা দিয়েছিলো। অথচ আমাদের তরুণরা গোটা জীবনে একটা সুযোগও পায় না। আমাদের এই সব তরুণের বুকে আশার প্রদীপ দীপ্ত করে রাখতে খসরু ভাই প্রকাশ করেছেন ‘ধ্রুপদী’ ও ‘চলচ্চিত্রপত্র’-এর মতো উচ্চাঙ্গের পত্রিকা। ‘ধ্রুপদী’কে উপমহাদেশের অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পত্রিকা বলে অভিহিত করেছেন রজত রায়। আঁদ্রে বাঁযা সম্পাদিত ‘কাইয়্যে দ্যু সিনেমা’ পত্রিকা এতো উচ্চমানের ছিলো যে, নির্মাতা গদার বলেছিলেন, ‘কাইয়ে’র পাতায় লেখা ছিলো প্রায় একটা ফিল্ম তৈরি করার শামিল। খসরু ভাইয়ের ‘ধ্রুপদী’ ছিলো বাংলাদেশের ‘কাইয়্যে দ্যু সিনেমা’।
দুর্ভাগ্য এই যে, ‘ধ্রুপদী’ আর বেরোবে না। বাংলাদেশের অগণিত চলচ্চিত্র অন্তঃপ্রাণ তরুণের মাথার ওপর থেকে বিরাট একটা ছায়া সরে গেলো। খসরু ভাইয়ের কীর্তির কথা বলার জন্য সত্যিই আমার কলম অযোগ্য। খসরু ভাই যেখানে যেভাবে আছেন, ভালো থাকবেন।
ইতি
আপনার বন্ধুবর
মৃধা রেজাউল
ফরিদপুর
লেখক : মৃধা রেজাউল, ফরিদপুরের ‘মৃণাল সেন চলচ্চিত্র সংসদ’ এর যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং সাহিত্য পত্রিকা উঠোন-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য।
(বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজকি লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা , জুলাই ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়ছে।)
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন