সেলিম আহ্মেদ
প্রকাশিত ২৫ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
তারুণ্যে সারথি মুহম্মদ খসরু
সেলিম আহ্মেদ

৭০ দশকের শেষ বছর। আমি ঢাকা আর্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। এক বিকেলে কলেজের গেইট লাগোয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ছোটোখাটো একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয়। ঘাড়ে ঝোলানো ব্যাগ খুলে বই খুঁজে আমার হাতে দেওয়ার সময়ে ভদ্রলোককে দেখছিলাম, উসকোখুশকো মাথার চুল, গোঁফ আছে, ক্লিন শেভড্, গায়ে জলপাই রঙের হাফহাতা শার্ট, গাঢ় হলুদ রঙের প্যান্টে গোজানো, পায়ে পিছন দিয়ে বেল্ট লাগানো স্যান্ডেল। খসখসে গলায় শহীদ শাহ্নেওয়াজ হলের এক সিনিয়র ভাইকে বইটা দিতে বললেন। তখন আর্ট কলেজের ওই একটাই হোস্টেল নিউ মার্কেটের পাশে। আমি সেই হোস্টেলে বড়ো ভাইদের স্নেহে ফ্লোরিং রুমমেট। আমাদের হলের সামনে একটা মাঠ ছিলো আর মাঠের পাশে রাস্তায় যাবার গেইটের কাছে ফেলে রাখা বড়ো বড়ো পাইপে আমাদের সন্ধ্যা থেকে রাত্রিকালীন একটা আড্ডা ছিলো। রাতের খাবারের পর আমাদের পাইপে বসা আড্ডায় জানতে পারলাম সেই ভদ্রলোক বিসিক নকশা কেন্দ্রের ফটোগ্রাফার, রাজেন তরফদারের পালঙ্ক সিনেমার সহকারী পরিচালক মুহম্মদ খসরু।
১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ, আমি তখন স্কুলের ছাত্র। আমার স্কুল সময়ে বাংলাদেশে যৌথ সিনেমা প্রযোজনার এক দারুণ সময় ধীরে বহে মেঘনা, তিতাস একটি নদীর নাম, সূর্যকন্যা, পালঙ্ক। পালঙ্ক’তে কিছু বিস্ময় ছিলো। আনোয়ার হোসেনকে নতুনভাবে জেনেছি আর দেখেছি ভারতীয় অভিনয়শিল্পী সন্ধ্যা রায়কে। সেসময়ের সিনে সাংবাদিকরা লিখেছিলেন সন্ধ্যা রায়ের বাবার বাড়ি যশোরের বেজপাড়াতে। আর পরিচালক রাজেন তরফদার রাজশাহীতে জন্ম নিয়ে কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে স্নাতক করেছিলেন ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে। গ্রাফিক ডিজাইনার হয়ে কাজ করেছেন ‘ডে ওয়াল্টার থমসন’ এজেন্সিতে, অভিনয় করেছেন মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে, খণ্ডহর-এ ও শ্যাম বেনেগালের আরোহন-এ। পরিচালক রাজেন তরফদারের পালঙ্কও একটা গানের দৃশ্য আমি ভুলতেই পারি না। সেই সিনেমার সহকারী পরিচালক এই খসরু ভাই।
সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, আর পি গুপ্ত, বংশী চন্দ্রগুপ্ত ও অন্যান্যরা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত সের্গেই আইজেনস্টাইন পরিচালিত দ্য ব্যাটেলশিপ পটেমকিন কলকাতা ফিল্ম সোসাইটিতে প্রদর্শিত প্রথম চলচ্চিত্র। সেই ফিল্ম সোসাইটির অনুপ্রেরণায় ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিষ্ঠায় আনোয়ারুল হক খান, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, ওয়াহিদুল হক, মোশাররফ হোসেন চৌধুরী, আবদুস সবুর, সালাহ্উদ্দিন, মনিরুল আলম, মুহম্মদ খসরুসহ অনেকেই ছিলেন। কিন্তু ব্যস্ত জীবনে উদ্যোক্তাদের অনেকে হারিয়ে গেলে ধীরে ধীরে খসরু ভাই-ই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন।
খসরু ভাই একটু মাথা ঝুঁকে রাখতেন, চটজলদি মাথা না ঘুরিয়ে পুরো শরীর ঘুরিয়ে তাকে চলাফেরা করতে হতো। দিন কয়েক পর সেই কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিকেলে অঁলিয়স ফ্রঁসেসে ডাকলেন সিনেমা দেখতে, মিথ অব অরফিউস। সিনেমাহল ছাড়া আমার দেখা প্রথম সিনেমা এটি। সিনেমা শেষে মিরপুর রোডের রাস্তায় দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে খসরু ভাই বললেন, ‘কেমন?’ আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কিছুদিন আগে আমি অরফিউস ও ইউরিডাইস প্রথম পড়েছি; গ্রীক দেবতাদের এমন শহরে অফিসে ট্রামে নিয়ে আসাটা খুব ভালো লেগেছে। মিথোলজি এমন সময়ে সাধারণ মানুষের চরিত্রে ফিরে আসাটা দারুণ। খসরু ভাই আড়চোখে আমার দিকে একটু তাকিয়ে হাসলেন। কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় কলেজের উল্টোদিকে উদ্যানের গেইটে মোল্লার দোকানে চা পুরি খাচ্ছি, খসরু ভাই এসে হাজির, বললেন, ‘যাবি নাকি?’ আমরা হাঁটছি টি এস সি, বাংলা একাডেমি হয়ে কার্জন হলের দিকে। হঠাৎ খসরু ভাই বললেন, ‘হাংরি জেনারেশনের কার লেখা তোর ভাল লাগে?’ আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি। খসরু ভাই বললেন, ‘ওদের কথা জানিস না?’ আমি বললাম, না। খসরু ভাই হাংরি আন্দোলনের কথা বলছেন--‘১৯৬১ সালে পাটনায় এই আন্দোলন দানা বাঁধে। আমার জন্ম কিন্তু হুগলিতে। বাবা তখন হুগলি জুটমিলে কাজ করতেন। জব চার্নক ১৬৫৬ সালে প্রথম ভারতে আসেন এরপর আর কখনো তিনি ইংল্যান্ডে ফেরত যাননি, কিছুদিন কাশিমবাজার ও হুগলিতে থাকেন। হুগলিতে কিছুকাল থেকেই হঠাৎ চার্নক পাটনায় চলে যান। আর ধীরে ধীরে তিনি ভারতীয় আদবকেতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। হুগলি থেকে পাটনা যাওয়ার পথে চার্নক ইংরেজদের মধ্যে প্রথম চুল ছোটো করে ভারতীয় পোশাক গায়ে তুলে ফেলেন। মানে বুঝেছিস? হুগলি থেকে পাটনা ভারতবর্ষের অমাবশ্যার রাস্তা।’ কথাগুলো বলে ফ্যাসফ্যাস করে হাসতে থাকলেন খসরু ভাই। আমি বললাম, ভাই কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি প্রথম যে সিনেমাটা দেখিয়েছিলো তা আইজেনস্টাইনের দ্য ব্যাটেলশিপ পটেমকিন, আর আপনারা প্রথম কোন সিনেমাটা দেখালেন? একটু মৃদু হেসে তিনি বললেন, ‘একটা রাশিয়ান সিনেমা, মিখাইল কালাতফের ক্রেনস্ আর ফ্লায়িং। কিন্তু এটা দেখানো হয়েছিলো মার্কিন তথ্য কেন্দ্রে, তোপখানায় ইউসিস অডিটোরিয়ামে’ বলে হাসতে থাকলেন। সে সন্ধ্যায় খসরু ভাইয়ের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে স্টেডিয়ামের দোতলায় একটা লাইব্রেরিতে যাই, ম্যারিয়েটা। খসরু ভাই সেখানে দেখছিলেন নতুন নতুন বই, আর আমি দেখছিলাম পুরো লাইব্রেরি, আমার প্রথম দেখা ম্যারিয়েটা। ‘বিজ্ঞাপনপর্ব’ একটা সংখ্যা আমাকে কিনে দিলেন, এই ‘বিজ্ঞাপনপর্ব’-ই পরে আমাকে হাসান আজিজুল হক, স্বাধীন বিশ্বাস ও এন্টি গল্প উপন্যাসের সুবিমল মিশ্র এবং লিটল ম্যাগাজিনে প্রবেশ করবার সুযোগ এনে দেয়। মনে আছে তখন খুঁজে খুঁজে পড়েছি সুবিমল মিশ্রের ‘হারাণ মাঝির বিধবা বউয়ের মড়া বা সোনার গান্ধী মূর্তি’, ‘নাঙা হাড় জেগে উঠছে’, ‘দু-তিনটে উদোম বাচ্চা ছুটোছুটি করচে লেবেলক্রসিং বরাবর’।
এ সময় আমি শহীদ শাহ্নেওয়াজ হলের ১২ নম্বর রুমে থাকতে শুরু করি, চারজন বোর্ডার হলো শাহ্ আজিজ, ওয়াকিলুর রহমান, সাইদুল হক জুইস ও আলী মোরশেদ নোটন। বোর্ডার ছাড়া হাবিবুর রহমান এবং আমি, সঙ্গে যুক্ত হলো তারেক মাসুদ। ১২ নম্বর রুমের নিয়মিত আড্ডায় শিল্পী এমদাদ হোসেনের দুই ছেলে অপু ও নিসার, পাশের রুম থেকে সমীর দত্ত, নিচতলার শিশির ভট্টাচার্য্য। আমরা তখন দল বেঁধে সিনেমা দেখতে যাই জার্মান কালচারাল সেন্টার, রাশান কালচারাল সেন্টার, ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার, অঁলিয়স ফ্রঁসেস, মার্কিন বাইসেন্টিনিয়ান হলে। খসরু ভাইয়ের সব আয়োজনে এই দলটার তখন প্রবেশাধিকার ছিলো; কারণ এই দলটাই ‘ধ্রুপদী’ পত্রিকার অলঙ্করণ ও নান্দনিক কাজের দল। বেশ কিছুদিন পর শাহবাগে মৌলি রেস্টুরেন্টের বাইরের বারান্দায় খসরু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমি সুবিমল মিশ্রের কথা বলতে শুরু করলাম, খসরু ভাই শুনলো কি শুনলো না, বুঝতে পারি নাই। উনি মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন--‘কাল থেকে কিন্তু রেইনার ওয়ার্নার ফাসবাইন্ডারের ছবি, চেষ্টা করিস সব দেখতে।’ ফাসবাইন্ডারের বানানো সিনেমা দেখছি আর আমার কেমন কুয়াশার মতো একটা ঘোর চারপাশ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করছে। আলি : ফিয়ার ইটস দ্য সোল দেখে একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। কীভাবে একজন পরিচালক এমন ভাবনা তৈরি করতে পারে? মাত্র ৩৭ বছরের জীবন, কোকেনে আসক্ত ছিলেন। মৃত্যুর জন্য অধিক মাত্রার নেশা দায়ি। শর্ট ফিল্ম, টেলিভিশনের জন্য ফিল্ম এবং ফিল্ম সবমিলিয়ে সংখ্যা ৪৩; মঞ্চ নাটকের পরিচালক, চিত্রনাট্য লেখক, অভিনেতা, সিনেমাটোগ্রাফার, এডিটর ইত্যাদি। আমার বোধে তখন রেইনার ওয়ার্নার ফাসবাইন্ডার ভারী কুয়াশার মতো। খসরু ভাইকে এই পরিচালক নিয়ে অনেক কথা বলবার ছিলো কিন্তু দেখা হতেই তিনি বললেন--‘জার্মান ফিল্ম মেকার পিটারসনের ছবি আজ আছে, চলে আসিস।’ আমার আর কিছুই বলা হয় নাই।
বাইসেন্টিনিয়ান হলে এ্যালেক্স হ্যালীর রুটস দেখছি, সে এক অন্য জীবনের গল্প। এক সন্ধ্যায় শহীদ শাহ্নেওয়াজ হলের সামনে কাদের ভাইয়ের দোকানে বিকেলে সেদ্ধ ছোলা খাচ্ছি, এই ছোলার প্লেটকে আমি হর্স পাওয়ার বলতাম। খসরু ভাই এসে বসলেন, আমি বললাম একটানা কয়েক ঘণ্টা রুটস দেখেছি। খসরু ভাই বললেন, ‘শানে নুযুল বলতো?’ আমি শুরু করলাম--আফ্রিকার সবচেয়ে ছোটো দেশটির নাম গাম্বিয়া, আর মানব গোষ্ঠীর নাম মান্দিকা। গাম্বিয়ার এক গ্রামের নাম জুফুরি, সে গ্রামের মানুষ ছিলেন কুন্তা কিন্তে। ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ। কুন্তার বয়স ১৭ হয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে কাঠ কাটতে গিয়েছিলো জঙ্গলে। একটি ড্রাম বানাতে চেয়েছিলো। কুখ্যাত লর্ড লিগোনিয়ার নামের জাহাজটি তখন জুফুরির কাছেই ভিড়ে ছিলো। সেদিন দাস শিকারিরা হঠাৎ কুন্তা কিন্তে আর তার বন্ধুদের পেয়ে যায় জঙ্গলে। বন্ধুরা তাকে পালাতে বলে। কিন্তু সে ওদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দস্যুরা সংখ্যায় বেশি ছিলো, তাই কুন্তা পরাজিত হয়। এর পর থেকে আর তার দেখা পায়নি জুফুরির মানুষ। খসরু ভাই বললেন, ‘বাহ, তোর দেখি মনে ধরেছে। কারণ কী? আর কে কে ছিলো?’ বললাম অনেকেই তো, নায়িকা জয়শ্রী কবির ছিলো। প্রথম কোনো সিনেমার নায়িকা দেখলাম, আমি পাশের চেয়ারে তাকিয়ে দেখি নায়িকা, তার পরের চেয়ারে পরিচালক আলমগীর কবির। চট করে খসরু ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুই কি আলমগীর কবিরের পাল্লায় পড়েছিস নাকি?’ আমি বললাম, উনি কি বিপজ্জনক? শোন--‘আলমগীর কবির ছিলো ইংল্যান্ডে, এখানে এসে সাংবাদিক হলো। সাংবাদিক কিন্তু ভালোই ছিলো, কী কারণে যেনো জেল হলো। জেল থেকে ফেরার পর আমিই তো ওকে ফিল্ম সোসাইটিতে নিয়ে এলাম, সবাই মিলে কিছু করা যায় কি না। এরপরই সাংবাদিকতা, সিনেমা বানানো সব ছেড়ে ফেডারেশনের ইলেকশন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। ও একটা প্যানেল আর বাদল রহমান একটা প্যানেল, ইলেকশনে লাভ বলতে একদম দুইটা স্বচ্ছ গ্রুপ তৈরি হলো। আমাদের রেষারেষি শুরু। জিতলো অবশ্য বাদল। বাদল জিতে কী হলো? বাদল কোনো কাজ করে নাই। আর কবির বানালো শর্টফিল্ম ফোরাম, একটা হিংসার ফসল। এরে তুই ভালো মানুষ বুঝলি?’ আমি বললাম সিনেমা তো ভালো বানায়। খসরু ভাই হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘অ্যাই নাম বল, কোনটা সিনেমা?’ ভয়ে বলতে শুরু করলাম, কেনো সূর্যকন্যা তো ভালো, নায়কের এক ধরনের সুররিয়ালিস্টিক সিকোয়েন্স আছে। খসরু ভাই এবার ক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং চিৎকার করতে শুরু করলেন--‘অ্যাই সুররিয়ালিজম তুই কী বুঝিস? তোর কোনো শিক্ষিত মাস্টার আছে? আর্ট কলেজ আমি চিনি না?’ এই সব বলে দ্রুত নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারের দিকে চলে গেলেন। হলের গার্ড কুদ্দুস আর কাদের ভাই অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন আমি অপমানিত হয়েছি কি না, অথবা বিষয়টা কী। সে রাতে আমার মন ভীষণ খারাপ হতে থাকে, বিংশ শতাব্দীর শিল্প আন্দোলন ফভিজম, এক্সপ্রেশনিজম, ফিউচারিজম, কিউবিজম, ডাডাইজম, সুররিয়ালিজম পড়ে আমার কি কোনো বোধোদয় হয় নাই?
কয়েকদিন খসরু ভাইয়ের সঙ্গে আর দেখা হয় নাই। মনখারাপটা ফিকে হয়ে গেছে। এরপর এক সন্ধ্যায় মোল্লার দোকানে কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা বই আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘মনোযোগ দিয়ে পড়িস’। রেনে মাগ্রিতের একটা বই, বেলজিয়ান সুররিয়ালিস্ট আঁকিয়ে, তার একটা সেল্ফ পোর্ট্রেটে আমিতো মুগ্ধ, পরে জেনেছিলাম এটি একটি জনপ্রিয় পেইন্টিং ‘দ্য সন অফ ম্যান’। ছবিটিতে ওভারকোট এবং বোলার হ্যাট পরিহিত একজন মানুষের মুখ প্রায় ঢেকে দিয়েছে পড়ন্ত একটি সবুজ আপেল। মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন একটি নিচু দেয়ালের সামনে আর ছবিটির ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করেছে সমুদ্র এবং মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। আরেকটি ব্যাপার লক্ষ্যণীয়, তা হলো, লোকটির বাঁ হাতের কনুই উল্টো দিকে ভাঁজ করা। ছবিটি সম্পর্কে রেনে মাগ্রিতের কথা--
এটি মুখের কিছু অংশ ঢেকে ফেলছে আবার কিছু অংশ দেখতে সাহায্য করছে। অর্থাৎ, এটি একই সাথে কিছু দেখাচ্ছে আর কিছু গোপন করছে। এ ব্যাপারটি আমাদের সাথে প্রতিনিয়তই হতে থাকে: আমরা যা কিছুই দেখি না কেন, তা অন্যকিছুকে আমাদের থেকে আড়াল করছে। আমরা সবসময় দেখতে চেয়েছি যা আমাদের থেকে আড়াল করা, আর সে বিচার আমরা করি যা আমরা দেখতে পাই তা দিয়ে। আমরা তাই সিদ্ধান্তে আসতে পারি না যে কি আসলে আমাদের চোখের সামনে রয়েছে আর কি আড়াল করা হয়েছে। এ ব্যাপারটি আমাদের জন্য মহা বিভ্রান্তির।
পড়তে পড়তে আমি অবাক হতে থাকি আর আমার জীবনে নতুন নতুন ভাবনার দরজা খোলে। একদম সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলাম খসরু ভাই এমন রাগ করতেই পারে, এমন চিৎকার গালিগালাজ তাকে মানায়।
এভাবেই জীবন চলতে থাকে, পরিচয়ের সীমানা বাড়ে আর কর্মজীবন সবকিছু থেকে সরিয়ে ঘূর্ণির মতো অপরিচিত জীবনে এনে বসিয়ে দেয়। আহা জীবন। আমি পুরানা পল্টনে ডিজাইন স্টুডিও তৈরি করে তখন দিনরাত ডিজাইনের কাজ করি, আমার অফিস ছিলো দ্বিতীয় বাসা। বহু বছর পর একদিন খসরু ভাই এসে হাজির, হাতে আমার জন্য একটা মার্কিন ডিজাইনের বই। গল্প চলতে চলতে খসরু ভাই বললেন, ‘এই নে সত্যজিৎ রায়ের ছবি, বিশাল পোস্টার বানাতে চাই। তুই তাড়াতাড়ি ডিজাইন কর।’ এরপর কতোদিন কতো কথা, ফন্ট কেমন হবে, ডিজাইন কেমন হবে, কোনো বিষয়ে খসরু ভাই টু শব্দ করে না। খুব বিরক্ত করায় অফিসে একদিন দুপুরে খেতে খেতে বললেন--‘তুই তো বড়ো হয়ে গেছিস, ডিজাইনের য়েস্থেটিক নিয়ে তুই লেখাপড়া করেছিস। আমি তো শুধু সাধারণ জ্ঞানে ওসব বুঝি তাই একদম চুপ থাকবো। আর পোস্টারে তোর নাম লিখতে হবে, এইটা কিন্তু ফাইনাল।’ সে পোস্টার ছাপা হয়েছিলো, খসরু ভাই খুব খুশি ছিলেন সেই পোস্টারের সবকিছুতে।
এরপর আবার বহু বছর গত হয়েছে, আমার অফিস মিরপুর স্টেডিয়ামের পাশে। হঠাৎ খসরু ভাই হাজির এবং বলতে শুরু করলেন, ‘তোর অফিস অনেক দূর, তাই ঠিক করেছি যেদিন আসবো সেদিন একদম সারাদিন অন্য কোনো কাজ তুই রাখবি না। ধ্রুপদীর ষষ্ঠ সংকলন, ভিতরে এবং কাভার তোর কাজ। অনেক কাজ কিন্তু। আজকে আড্ডা হবে শুধু নামহীন গোত্রহীনের।’ আমি বললাম, ‘নামহীন গোত্রহীন’ কেনো? সে তো আপনার সিনেমা, সিনেমাটা আর বানালেন না খসরু ভাই। এমন একটা স্ক্রিপ্ট কিন্তু সরকার অনুদানে রাজি হলো না, দুঃখজনক। খসরু ভাই বললেন, “দুঃখ করিস না, সরকার তো ভালো ছবির জন্য অনুদান দেয় না, সব সরকারের বাছাই কমিটির কিন্তু একটাই চেহারা। হাসান আজিজুল হকের গল্প ‘নামহীন গোত্রহীন’-এর স্ক্রিপ্ট, আমি দু’বার আওয়ামী জমানায়, দু’বার বিএনপি জমানায় চিত্রনাট্য জমা দিলাম; আমারে অনুদান দেয় না। স্ক্রিপ্ট নিয়া বইসা আছি, কই, আমি তো একজনও প্রডিউসার জোগাড় করতে পারলাম না। এই দেশে কি আমি কম মানুষ চিনি? যাক বাদ দে এসব, নামহীন গোত্রহীন-এর আলাপ শুরু করছিলাম তোর বোঝার সুবিধা হবে। ওই যে শেষে মুক্তিযোদ্ধা চোরাবালিতে ডোবার শট্, ওই শটের একটা স্টিল হইলো এইবারের ধ্রুপদীর কাভার। বুচ্ছিস?”
২০০৬ খ্রিস্টাব্দে একটা দীর্ঘ সময়ে আমাদের এ কাজটা শেষ হয়েছিলো, এ সময়ে এ কাজের পরতে পরতে আরো আছে কতো গল্প। ৭২৪ পাতার এক বই ধ্রুপদী কিন্তু কম না।
লেখক : সেলিম আহমেদ স্নাতক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে ভাস্কর্যে। দীর্ঘ সময় হস্তশিল্প, ফ্যাশন ও গ্রাফিক্সের সঙ্গে তার বসবাস। বর্তমানে তৈরি হচ্ছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য।
Selim24march@yahoo.com
(বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজকি লণ্ঠন ১৭তম সংখ্যা , জুলাই ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়ছে।)
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন