Magic Lanthon

               

সুশান্ত সিনহা

প্রকাশিত ২৪ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

প্রসঙ্গ সম্প্রচার সাংবাদিকতা

প্রতিবেদক ও প্রতিবেদন, একে অন্য পরিপূরক

সুশান্ত সিনহা




সম্প্রচার সাংবাদিকতা নিয়ে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর ধারাবাহিক আলোচনার শুরুটা ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের জুলাই, সংখ্যা ৯ থেকে। গেলো কয়েক বছরে একে একে প্রকাশ হয়েছে ব্রেকিং নিউজ, পি টি সি, সরাসরি সম্প্রচার, টিকার বা স্ক্রল, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, আউট অব ভিশন নিয়ে পৃথক প্রবন্ধ। এসব প্রবন্ধে সম্প্রচার সাংবাদিকতায় সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় ধরে ধরে আলোকপাত করেছেন সুশান্ত সিনহা। সর্বজনীন এসব বিষয়ের আলোচনার ধারাবাহিকতায় একজন প্রতিবেদক বা সংবাদকর্মীর গুণাবলি সংক্রান্ত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ প্রতিবেদন কখনোই গুণে মানে উন্নত হবে না, যতোক্ষণ পর্যন্ত একজন প্রতিবেদক মৌলিক কিছু গুণ বা বৈশিষ্ট্য না ধারণ করবে এবং মেনে চলবে। এ সংক্রান্ত দুই পর্বের আলোচনার শেষ পর্ব প্রকাশ করা হলো এই সংখ্যায়। [সম্পাদক]

‘ছোট্ট’ চা দোকানি যখন বড়ো সোর্স

১৩ আগস্ট ২০১৩, দেশের চলচ্চিত্র ও সাংবাদিকতা জগতের দুই দিকপাল তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরকে হারিয়ে থমকে গিয়েছিলো বাংলাদেশ। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোঁকা নামের স্থানে বাস-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে অকালে ঝরে যায় বাংলার দুই কীর্তিমানসহ পাঁচ জনের জীবন। সেদিন দুপুর ১২টার দিকে দুর্ঘটনা ঘটার কিছুক্ষণের মধ্যে মর্মান্তিক সেই ঘটনার ব্রেকিং সংবাদ (সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল ‘সময়’-এর ব্রেকিং সংবাদটি ‘সদ্যপ্রাপ্ত’ হিসেবে যায়) দিয়েছিলো ‘সময়’। মিশুক মুনীর তখন ‘এটিএন নিউজের’ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। অন্যদের মতো মিশুক স্যারের কর্মস্থলের আমরা [লেখক তখন সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল ‘এটিএন নিউজ’-এ কর্মরত ছিলেন] তাকিয়ে ছিলাম ‘সময়’-এর পর্দায়। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, ‘সময়’-এর মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানার আগেই ঢাকায় বসে দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়েছিলেন এর বার্তা প্রধান। মাঠের রিপোর্টিং বহু বছর আগে ছেড়ে দেওয়া মানুষটি কীভাবে সবার আগে খবর পেলেন! ঘটনার সময়ই শুনেছিলাম, দুর্ঘটনাস্থলের কাছের কোনো এক দোকানি ‘সময়’-এর বার্তা প্রধান তুষার আব্দুল্লাহকে জানিয়েছিলেন ঘটনাটি। এই লেখার সময় সেদিনের চা দোকানি সোর্স প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তুষার আব্দুল্লাহ বলেন,

     সাধারণত টেলিভিশনের কোনো কিছুর শুটিং করতে বাইরে গেলে স্থানীয় দোকানে চা খেতে যাওয়া হয়। সেরকমই কোনো একবার ঢাকা-আরিচার সড়কের পাশে মানিকগঞ্জের ঘিওর এলাকায় ছোট্ট একটি দোকানে চা খাওয়ার সময় আলাপ হয়েছিলো দোকান মালিকের সঙ্গে। আলাপের পর আমার বিজনেস কার্ডটি দিয়েছিলাম তাকে। কাকতালীয়ভাবে মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদের মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি হয় ওই চা দোকান থেকে সামান্য একটু দূরে। দুর্ঘটনার পর ওই দোকানি সেখানে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফোনে আমায় বিষয়টা জানিয়েছিলেন বলেই সবার আগে সংবাদটা ‘সময়’ দিতে পেরেছিলো।

    ক্ষণিকের আলাপচারিতায় একজন মানুষও যে সাংবাদিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ এটি। সেদিনের সেই ব্রেকিং সংবাদের কারণে প্রশাসনও যতোটা সম্ভব দ্রুত আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলো। ফলে একজন সাংবাদিক যখন যেখানেই যাক না কেনো, তাকে সাংবাদিক হিসেবে নিজের গুণাবলি আর বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে হবে। হাসিঠাট্টার মধ্যেও বজায় রাখতে হবে নিজের স্বকীয়তা। তার মানে এই নয় যে, তাকে হাম্বরি ভাব দেখাতে হবে। সেদিন তুষার আব্দুল্লাহ চা খেতে গিয়ে দোকানির সঙ্গে সম্পর্কের যে বীজ বুনেছিলেন, তার ফল তিনি পেয়েছেন। আর ব্যক্তির এই উদ্যোগী ভূমিকার কারণে উপকৃত হয়েছিলো ‘সময়’। কমবেশি সব সাংবাদিকই ঢাকার বাইরে গেলে এমন চা-নাস্তা বা খাবারের জন্য স্থানীয় দোকানে ঢু মারে। কিন্তু চায়ের কাপে চুমুক শেষেই উঠে পড়ে আর পিছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন মনে করে না। ফলে চলার পথে তারা নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পারে না। ছকে বাঁধা ভাবনার কারণে তাদের আর মানুষের আস্থা অর্জন তথা সোর্সের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হয় না। অথচ নতুন সোর্স গড়ে তুলতে না পারলে, একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে হতোদ্যম হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে একজন প্রতিবেদকের।

    এ তো গেলো অপরিচিত সোর্স বা ঘটনাকেন্দ্রিক সোর্সের কথা। এ ধরনের মানুষ বা সোর্সের সঙ্গে সাধারণভাবে যোগাযোগের প্রয়োজন ও সুযোগ থাকে না। কিন্তু উল্টোটা হয় অফিস আদালতের দাপ্তরিক দায়িত্বে থাকা সোর্সদের সঙ্গে। এদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হয়; তাদের খোঁজখবর রাখতে হয়। তাৎক্ষণিকতার কারণে টিভি সাংবাদিকের জন্য সংবাদপত্রের সাংবাদিকের মতো সোর্সকে সময় দেওয়া কঠিন। কিন্তু প্রযুক্তির বদৌলতে এখন অনেক মাধ্যমে দূরে থেকেও কারো কাছে থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাই আন্তরিকতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারলে দূরের সোর্সকে বোঝানো এবং আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন নয়। মনে রাখতে হবে, যার যতো বেশি সোর্স, সে ততো নতুন নতুন সংবাদ দিতে পারে।

বন্ধু তোমার পথের সাথিকে চিনে নিও

পরিচিত হোক বা অপরিচিত, মানুষের সঙ্গে একটু হাসিমুখে কথা বলা বা সম্পর্ক রাখা যে কতোটা কাজে আসে তার বড়ো প্রমাণ উপরের ঘটনা। সাংবাদিকতা হলো মানুষ নিয়ে ওঠাবসার কারবার। ফলে মানুষে মানুষে যতো বেশি সম্পর্ক, ততো বেশি সোর্স বাড়বে; বাড়বে নিজের আত্মবিশ্বাস। মনে রাখা দরকার, সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের নিবিড়তাও বাড়ে। ফলে এই মানুষগুলোর মধ্যে কখন যে কে মহামূল্যবান হয়ে উঠবে তা বলা মুশকিল। তাই খাজা বাবার দরবারের মতো সাংবাদিককে দিল দরিয়া হতে হয় যোগাযোগ স্থাপনে। প্রাণখুলে কথা বলা, সদা হাস্যোজ্জ্বল ও ভালো ব্যবহার সম্পর্ক তৈরির সিঁড়ি হিসেবে কাজ করে। ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান বা সুবিধা পেতে নয়, আমৃত্যু সাংবাদিকতায় নিজের ভিত মজবুত করতেই এই চর্চার বিকল্প নেই। বিশেষ করে বিদেশ-বিভুঁইয়ে তো বিষয়টি আরো মাথায় রাখতে হয়। ২০১২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাস; তখন কাজ করি ‘এটিএন নিউজ’-এ। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় অংশ নিতে মস্কো পৌঁছেছি বি কে এম ই এ-এর আয়োজনে। পাঁচ দিনের আয়োজনের প্রথম দিনে কাজ শেষের আগেই মাথায় বাজ পড়লো সহকর্মী ক্যামেরাপার্সনের কথায়। হুট করেই ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গেছে, কোনোভাবেই তা ঠিক হচ্ছে না। ক্যামেরা কাজ করছে না, দুই জন তখন চোখে সরষে ফুল দেখছি।

    এমতাবস্থায় বি কে এম ই এ-এর ভাড়া করা ট্যাক্সিচালক সোহাগের সঙ্গে প্যাভিলিয়নের বাইরে দেখা হয়। সেই দিন সকালেই তার সঙ্গে দেখা ও পরিচয়। আমাদের শুকনো মুখে ঘটনা শুনে হেসে উঠলেন বৃহত্তর সিলেটের তরুণ এই প্রবাসী। বললেন, ‘সমস্যা নেই, গাড়িতে ওঠেন আমি ব্যবস্থা করছি। আপনাদের যেখানে নিয়ে গেলে কাজ হবে সেখানেই নিয়ে যাচ্ছি।’ খানিক বাদে গাড়ি থামলো বাণিজ্যমেলার চত্বর থেকে সামান্য দূরে একটি ভবনের সামনে। শীতপ্রধান দেশ হওয়ায় রাশিয়ার বিপণিবিতানগুলো আমাদের মতো নয়; বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। সোহাগের পিছু পিছু বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্যামেরা নিয়ে আমি ও ক্যামেরাপার্সন সোহেল। বিপণিবিতানে ক্যামেরা বিক্রি ও মেরামতের এক দোকানির সঙ্গে সোহাগ আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমাদের বিপদের কথা শুনে দোকানি আলমারি থেকে একটা নতুন ক্যামেরা নামাতে বললেন কর্মচারীকে। তারপর আমাদের বললেন, ‘আপনাদেরটা দেশে নিয়ে গিয়ে মেরামত করে নিয়েন। আর এইটা দিয়ে আপাতত কাজ করেন। দেশে ফেরার আগে ক্যামেরাটা ফেরত দিলেই হবে।’ ভাবতেও পারিনি, কয়েক লাখ টাকার নতুন ক্যামেরা এভাবে চেনাজানা নেই এমন কাউকে শুধু মুখের কথায় দিয়ে দিতে পারে কেউ! আমরা কোন হোটেলে উঠেছি বা ফোন নম্বর কোনো কিছুই জানার চেষ্টা করলেন না তিনি। প্রবাসী কোনো বাংলাদেশির হৃদয় কতোটা বড়ো ও আন্তরিক হলে তারা এমন উদার হতে পারে!

    প্রবাসী ওই বাংলাদেশির নাম মির্জা রফিক, বাড়ি দিনাজপুর জেলায়। ধন্যবাদ দিয়ে বের হলাম আমরা। আমাদের উপকারে আসতে পেরে সোহাগের সে কী উচ্ছ্বাস! আমাদের চেয়ে ওর চোখে-মুখে খুশির রোশনাই দেখবার মতো। রাশিয়া থেকে ফেরার আগের দিন আবারও সোহাগের গাড়িতে চড়ে মির্জা ভাইকে ক্যামেরা ফেরত দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। প্রবাসীরা দেশের মানুষকে পেলে কতোটা ভালোবাসতে পারে সারাজীবনেও তা ভুলবার নয়। মাত্র একদিনের পরিচয়ে সোহাগ ও মির্জা ভাইয়ের এমন সহযোগিতা না পেলে রাশিয়া সফরে কোনো কাজই করতে পারতাম না হয়তো আমরা। ফলে কখন কোথায় কে বিপদের বন্ধু হতে পারে তা বলার উপায় নেই। ক্ষণিকের পরিচয়ে যেমন কেউ সংবাদের সোর্স হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আবার হয়ে উঠতে পারে ত্রাতা। তাই প্রতিটি সম্পর্কই একজন সংবাদকর্মীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

    চোখের সামনে মির্জা ভাইয়ের হাসিমাখা মুখটা এখনো ভাসে। তবে ভাবতে পারিনি আনন্দময় স্মৃতির মানুষটা এতো দ্রুত নিজেই স্মৃতিতে পরিণত হবেন! বছর দুয়েক আগে হঠাৎ খবর পাই, মির্জা ভাই আর নেই। ঈদের ছুটিতে দেশে এসে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। তার স্ত্রী ও সন্তানের হঠাৎ ফোন পেয়ে আঁতকে উঠেছিলাম, ভাষা হারিয়েছিলাম সান্ত্বনা দেওয়ার। তবে সোহাগ এখনো বছরে কয়েক বার ফোন করে জানতে চান দেশের খবর; রাশিয়া সফরে আরো যারা গিয়েছিলো তাদেরও খোঁজ নেন।

ছবি নয়, জীবন আগে

২০১৬-এর ঈদুল ফিতরের দিনে শুভেচ্ছা বিনিময়ের খবর সংগ্রহে গিয়েছি জাতীয় পার্টির বনানীর কার্যালয়ে। সংবাদ সংগ্রহ শেষে অফিসে যাত্রা শুরু করবো; হঠাৎ দেখি এক ব্যক্তি তার তিন-চার বছরের এক শিশুকে কোলে নিয়ে ছুটছে। শিশুর মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছে; যে গামছা দিয়ে মাথাটা বাঁধা সেটাও ততোক্ষণে ভিজে গেছে রক্তে। কোনো যানবাহন না পেয়ে আহত সন্তানকে কোলে নিয়েই দৌড়াচ্ছেন বাবা। চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে ক্যামেরাপার্সনসহ দুজনে সিদ্ধান্ত নিয়ে অফিসের গাড়িতে শিশুসহ তিন জনকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটলাম। যেতে যেতে শুনলাম, বিছানার উপর খেলছিলো বাচ্চাটি আর ঘরের মেঝেতে তরকারি কাটছিলো তার মা। খেলতে খেলতে হঠাৎ বাচ্চা গড়িয়ে বটির উপরে পড়ে কপালের অনেকটা কেটে গেছে। সেদিন রাস্তা ফাঁকা থাকায় দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা পায় শিশুটি। পথেঘাটে এ ধরনের বহু ঘটনার সাক্ষী হতে হয় সংবাদকর্মীদের। বেশিরভাগ সংবাদকর্মী চেষ্টা করে সাধ্য অনুযায়ী আহতদের উদ্ধারে সহযোগিতা করতে। যদিও মাঝে মাঝে দুই-একজন সংবাদকর্মীর অবিবেচকের মতো আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ করে সংবাদকর্মী তথা পুরো গণমাধ্যমকে!

সাংবাদিকতা পেশাকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছিলো ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে নেপালে বিধ্বস্ত ইউ এস বাংলা এয়ারলাইন্সের আহতদের দেশে আনার ঘটনা। নেপাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আনা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষগুলোকে হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়েছিলো সংবাদকর্মীদের ছবি তোলার হিড়িকে। একজন অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলার পথে বার বার বিড়ম্বনা সৃষ্টি করেছিলো সংবাদকর্মীরা। টেলিভিশনের ক্যামেরাপার্সনসহ ছবি-সাংবাদিকদের ভিড়ে সেদিন মনে হচ্ছিলো এটা যেনো হাসপাতাল নয়, মাছের বাজার। ‘এই ভাই মোবাইল সরান; মাথা সরান; এই দিকে তাকান; আরে ভাই ক্যামেরাটা সরান’--এরকম চিৎকার, চেঁচামেচিতে হাসপাতাল চত্বরের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিলো। কেউ কেউ তো এমন চিৎকার করছিলেন যে, সবাই থমকে যাচ্ছিলো। হয়তো সংবাদকর্মীরা সেসময় ভুলে গিয়েছিলো, আহত মানুষগুলোকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশে আনা হয়েছে। তাদের জীবনের চেয়ে ছবি তোলা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই ধৈর্য, সংযম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেউ দেখাতে পারছে না। সাংবাদিকতা এমন এক দায়িত্বশীল পেশা, যেখানে সাংবাদিকের সামান্য বেখেয়ালি আচরণে অন্যের অনেক বড়ো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

অনেকে বলতে পারে, বার্তাকক্ষ তো ছবি চায় এবং তা হতে হবে সবচেয়ে ভালো ছবি। তা না হলে টিভি চ্যানেল/সংবাদপত্র/অনলাইন পোর্টাল পিছিয়ে পড়বে প্রতিযোগিতায়। অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছেড়ে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিলে ছবির সমস্যা সমাধানের যথেষ্ট সুযোগ আছে। দর্শককেও তো শেখাতে হবে টেলিভিশন সংবাদ মানে এই নয় যে, মুমূর্ষু রোগীর মুখের ছবি দেখাতেই হবে। একইভাবে বার্তাকক্ষের সংশ্লিষ্টদেরও বুঝতে হবে উড়োজাহাজ বা অ্যাম্বুলেন্স থেকে স্ট্রেচারে করে নামানোর ছবি দূর থেকে নিলেই যথেষ্ট সংবাদের জন্য। দুই মিনিটের ছবি হলেই প্রতিবেদন তৈরি সম্ভব। সবক্ষেত্রে ভালো ছবি মানে অন্যের ওপর অত্যাচার করে ছবি নেওয়া নয়। হয়তো প্যানেলে প্রতিবেদন তৈরির সময় ভিডিও এডিটরও বলতে পারে ক্যামেরাপার্সন ভালো ছবি আনেনি ইত্যাদি। তাকেও বোঝাতে হবে আর পাঁচটা ঘটনার মতো এক্ষেত্রেও গতানুগতিক ছবি থাকবে তা নয়। প্রয়োজনে কীভাবে অল্প ছবি দিয়েই কাজ করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে।

    একই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে বিরল রোগে আক্রান্ত মুক্তামণির অস্ত্রোপচারের দিনে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকরা পরীক্ষানিরীক্ষা শেষে অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে আই সি ইউ-তে নিতে ব্যস্ত। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে আগস্টের সেই দিনে মুক্তামণিকে বহন করা ট্রলির সামনে তখন অসংখ্য ক্যামেরা। একের পর এক ছবি-সাংবাদিকদের ক্লিকের আওয়াজ। সঙ্গে চলছে লাইট জ্বালিয়ে টিভি ক্যামেরাগুলোর ছবি তোলার হিড়িক। কেউ ভালো ছবি পাচ্ছে না, কেউ পেলেও এখনো সন্তুষ্ট নয়-দাঁড়ান দাঁড়ান বলে চলছে চিৎকার, চেঁচামেচি; এই ভাই মাথা সরান, মাথা সরান বলে শোরগোল পড়ে যায়। পারলে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সরিয়ে দেয় টিভি ক্যামেরাগুলো! একে অসুস্থ, তার ওপর শিশু, রীতিমতো ভয়াবহ পরিস্থিতি। ফলাফল আই সি ইউ-এ যেতে অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকা। এরপরে আছে চিকিৎসকের সাক্ষাৎকার গ্রহণের হুড়োহুড়ি!

শৃঙ্খলা : বিড়ালের গলায় ঘণ্টা পরাতে হবে

ছবি কাণ্ডের পর মহাকাণ্ড শুরু হয় চিকিৎসকদের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে। এক্ষেত্রে ক্যামেরাপার্সনের সঙ্গে যোগ হয় সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি। কেউ তারযুক্ত মাইক্রোফোন, কেউ তারবিহীন মাইক্রোফোন নিয়ে জড়ো হন বক্তার সামনে। ছবির মতো এখানেও রীতিমতো অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ঘটনাস্থল পরিণত হয় হাটবাজারে। চিকিৎসকসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা চেয়ে চেয়ে দেখে সংবাদকর্মীদের নিজেদের মধ্যে শৃঙ্খলহীন আচরণ। ডা. সামন্ত লাল সেনকে বহুবার এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে দেখেছি। এখানেও সংবাদকর্মী একটু সচেতন হলে, কোনো ধরনের হইচই ছাড়াই ভালোভাবে সাক্ষাৎকার নেওয়া সম্ভব। এজন্য উপস্থিত সংবাদকর্মীরা নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলে নিলেই হয়। তারা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে গুছিয়ে কাজ যে করে না, বা হয় না তা নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হতে দেখা যায় না। সব সময়ই এগুলো মেনে চলার বিকল্প নেই। সাংবাদিকদের কথার ভিড়ে কয়েকবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে বক্তব্য দিতে দিতেই চিৎকার করে বলতে দেখা গেছে-চুপ করেন, একদম কথা বলবেন না ইত্যাদি।

    মনে রাখা দরকার, একফোঁটা গরুর মূত্র পুরো বালতির দুধ নষ্ট করতে যথেষ্ট। তেমনই দুই-একজন সংবাদকর্মীর না বোঝা, অতি আগ্রহ বা দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় মাঠে মারা যায় ওই চ্যানেলের দায়িত্বশীলতা। এতে পুরো সম্প্রচার সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। কখনো কখনো সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গেও যে ধরনের ব্যবহার করা হয়, সেটাও অত্যাচারের পর্যায়ে পড়ে। সম্প্রতি ঝড়ে গাছ চাপায় নিহত হন বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডের (বিডা) পরিচালক প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান। ফায়ার সার্ভিস তার মরদেহ উদ্ধার করে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে আসলে শোকাহত স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে থানার পরিবেশ। আর সেই কান্নার ছবি তুলতে দিনের বেলায় স্বজনদের মুখের ওপর জ্বলে ওঠে টেলিভিশনের ক্যামেরা-লাইট। মনে প্রশ্ন জাগে, নিভে যাওয়া মানুষটির স্বজনের মুখে আলোর ঝলকানি ফেলে ছবি তোলা কি খুবই জরুরি? ক্যামেরা-লাইট কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের মুখে ধরলেই সে অস্বস্তিতে পড়ে। তাহলে প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকাহত কারো জন্য এটা কতোটা যন্ত্রণার, কষ্টের; কতোটা অমানবিক তা বুঝতে নিশ্চয় বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সম্প্রচার সংবাদকর্মী হয়তো দায় চাপাবে তার ক্যামেরাপার্সনের ওপর। কিন্তু না, এর দায় প্রতিবেদকের। কারণ তারই দায়িত্ব ক্যামেরাপার্সনকে জানানো, কোনটা নেওয়া যায় আর কোনটা নেওয়া যায় না। প্রতিবেদকের উদাসীনতা আর দায়িত্বহীনতা ঘটনাস্থলে নিজের চ্যানেলকে দুর্নামের মধ্যে ফেলে দেয়।

    ঘটনার শেষ এখানেই নয়, প্রতিবেদক এবার নিহতের ছেলের সাক্ষাৎকার তলব করে বসেন। একটু আগে বাবাকে হারানো সন্তানের কাছে সংবাদের জন্য জানতে চাওয়া কি খুব জরুরি? নিশ্চয় নয়। কারণ ঘটনাস্থলে প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়াও আছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও পুলিশের কর্মকর্তা। ফলে শোকাহত স্বজনদের মুখে ক্যামেরা তাক না করেই সংবাদ করার মতো যথেষ্ট বক্তব্য নেওয়া যেতো। স্বজনদের বিব্রত না করেই সংবাদের গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব। তবে ক্ষেত্র বিশেষে স্বজনদের সাক্ষাৎকার জরুরি হয়ে পড়ে; বিশেষ করে গুম, হত্যাকাণ্ড বা লাশ উদ্ধার হলে। সেখানেও মাথায় রাখতে হবে, স্বজনদের যতোটা সম্ভব বিরক্ত বা বিব্রত না করে বক্তব্য নেওয়া যায়।

এমনকি রোগীর অনুরোধের পরও কোনো কোনো টিভি সংবাদকর্মী তা পাত্তাই দেয় না। বুঝতে চায় না ওই ক্যামেরার লাইটে তার সমস্যা হচ্ছে বলেই তিনি অনুরোধটুকু করছেন। ন্যূনতম দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি কি অসুস্থ বা রোগীর চোখে-মুখে লাইট জ্বালিয়ে প্রশ্ন করতে পারে! মানুষের জন্যই তো গণমাধ্যম, সেই গণমানুষের একজন তো রোগী, তাকে বিরক্ত করে সংবাদ করা কতোটা যৌক্তিক? আর একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। রাজধানীর ফার্মগেটে বাসের চাপায় পা থেতলে যাওয়া রুমি আক্তার হাসপাতালে ভর্তি। ওই অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হন সদ্য চাকরিতে যোগ দেওয়া রুমি। সাক্ষাৎকার ছাড়াও অনেকটা সময় ধরে লাইট জ্বালিয়ে ছবি নেওয়ায় রোগীর তাকাতে কষ্ট হচ্ছিলো। একপর্যায়ে রোগী বাধ্য হয়েই বার বার বলতে থাকেন লাইট ও সাক্ষাৎকার বন্ধ করার জন্য। কিন্তু কে শোনে কার কথা, রোগীর আবেদন অরণ্যে রোদনে পরিণত হয়। তীব্র আলো জ্বালিয়েই ‘মহা সমারোহে’ নিজের কাজটুকু সেরে বেরিয়ে আসেন সংবাদভিত্তিক একটি টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদক। আগেই বলেছি, উপস্থিত সহকর্মীদের মধ্যে একটু আলাপ করে নিলেই বিরক্তি উৎপাদন না করেও প্রয়োজনীয় কাজ করা যায়। সেই চেষ্টাও করেননি সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক।

    হাসপাতালে উপস্থিত দুটি চ্যানেলের একজন সাক্ষাৎকার নেওয়ার অনুরোধ জানালে রোগীর স্বজনরা তাদের একসঙ্গে নেওয়ার কথা বলে। কিন্তু একজন প্রতিবেদক একটু আগে শুরু করে দেওয়ায়, দ্বিতীয়জন একসঙ্গে নিতে অপারগতা জানান। পরে দ্বিতীয় প্রতিবেদক মেয়ের কষ্টে ভেঙে পড়া হৃদরোগী বাবাকে আবেগী প্রশ্ন করে কাঁদিয়ে বক্তব্য সংগ্রহ করেন। সত্যিই তো, ক্লাইমেক্স না থাকলে কি জমে সংবাদ! জমে না; তাই নাটকীয় ভাব আনতে হয় সংবাদে। অশ্রুসিক্ত চোখে বাবা-মাসহ স্বজনদের বক্তব্য তুলে আনতে না পারলে দর্শককে কি ‘খাওয়ানো’ যাবে? প্রয়োজনে কাঁদতে বাধ্য করা আর কী! এতে না হয় রোগীর কষ্টই বাড়লো আর স্বজনের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হলো সেখানকার পরিবেশ। তাতে সাংবাদিকের কী? আরে মশাই পেশাদারিত্ব বলে কথা, আলোকোজ্জ্বল ভালো ছবি তোলাটাই তো সংবাদকর্মীর কাজএমন মনোভাবও দেখেছি দুই-একজনের ভিতরে।

জিজ্ঞাসা কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদ নয়

দুর্ঘটনাসহ যেকোনো সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর জানতে হয় সংবাদকর্মীকে। তথ্য সংগ্রহ ভালো হলেই কেবল সংবাদটি ভালোভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। তাই জানতে চাওয়া বা প্রশ্ন করা খুবই জরুরি। তবে কোথায় কী প্রশ্ন করতে হবে বা কাকে করতে হবে, সে সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে সংবাদকর্মীকে। কোন প্রশ্নটা করা যায়, আর কোনটা যায় না তাও মাথায় রাখতে হয়। কিন্তু কখনো কখনো সংবাদকর্মীর অতি উৎসুক প্রশ্নে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়; যার দায়ভার বর্তায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর।

    ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর গভীর রাতে নিজ বাসায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ও শ্রমিক নেতা নূরুল ইসলাম। অগ্নিকাণ্ডের রাতেই পুড়ে মারা যান তাদের ছেলে তমোহর ইসলাম। ওই সময় নূরুল ইসলামের স্ত্রী ও মেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। রাতের পালার প্রতিবেদক হিসেবে আগুনের খবর শুনে ঘটনাস্থল লালমাটিয়ার বাসায় ছুটে যাই আমিসহ মোট তিনটি টিভি চ্যানেলের সংবাদকর্মী। প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানায়, ঘটনাস্থলেই ছেলের মৃত্যু হয়েছে। আর অগ্নিদগ্ধ বাবাকে হাসপাতালে পাঠানোর কথা শুনে আমরা রওনা হই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মুখের অল্প কিছু জায়গা ছাড়া পুরো শরীর ব্যান্ডেজ অবস্থায় কাতরাচ্ছেন রাজনীতিবিদ নূরুল ইসলাম। তার পরও অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। রাতে খাবার খেয়ে বাবা ও ছেলে নিজেদের ঘরে শুয়ে ছিলেন। মাঝরাতে আগুনের তাপ ও ধোঁয়ায় ঘুম ভেঙে উঠতে গিয়ে তারা অগ্নিদগ্ধ হন। তার দুই-একটি কথার উত্তর পেতে না পেতেই এক সংবাদকর্মীর প্রশ্ন, বাড়িতে আপনার স্ত্রী ছিলো না? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, স্ত্রী বিদেশে আছেন। ওই প্রতিবেদকের প্রশ্নের ঢঙ দেখে মনে হলো, তিনি এখনই আগুনের রহস্য উদঘাটনে নেমেছেন। হয়তো সহজ সমাধান হিসেবে ধরেই নিয়েছেন, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বের কারণে আগুন লেগেছে! দ্বিতীয় দফায় খানিকটা জিজ্ঞাসাবাদের সুরেই ওই প্রতিবেদক প্রশ্ন করেন, উনি বিদেশে কেনো? ‘আমার স্ত্রী ও মেয়ে জরুরি কাজে আমেরিকা গিয়েছে। কদিন বাদেই তাদের দেশে ফেরার কথা।’

    একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান, পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে যিনি পরিচিত, সর্বোপরি একজন মৃত্যু পথযাত্রী বাবা, যার নিজের শরীরের প্রায় পুরোটা পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রণার সঙ্গে আছে ত্রিশোর্ধ্ব সন্তান হারানোর বেদনা! হাসপাতালের বিছানায় সেই তাকেই ব্যাখ্যা করে বলতে হচ্ছে, পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে নয়, জরুরি কাজে তার স্ত্রী বিদেশে গিয়েছেন। মৃত্যুর আগে প্রতিবেদকের অবান্তর প্রশ্নের ব্যথায় জর্জরিত নূরুল ইসলাম কাউকে সেই তিক্ত ঘটনার কথা বলতে পারেননি। কিন্তু সেদিনের সেই প্রশ্নোত্তর আজও কানে বাজে, তাড়া করে ফেরে। সেই রাতে জিজ্ঞাসার নামে সংবাদকর্মীর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের সেই অযাচিত চর্চার দায় কি সংবাদকর্মী হিসেবে আমি ভুলতে বা এড়াতে পারি? সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার বার্তাকক্ষের কেউ হয়তো জানবেই না তার চ্যানেলের প্রতিবেদক এমন বিরক্তি উৎপাদন করেছে। তাদের জানার সুযোগও নেই। কারণ যে প্রতিবেদক এমন কাজ করবে সে নিশ্চয় তা ফলাও করে বলবে না। আর ক্যামেরাপার্সন তার সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করলেও বার্তাকক্ষের কাউকে তা জানাবে না। ফলে এতে সংশোধন হওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রতিবেদক হয়তো বুঝতেই পারে না, কোনটা তার করা উচিত আর কোনটা নয়।

গল্প আছে প্রশ্ন নেই

সাংবাদিকতার সঙ্গে প্রশ্নের সম্পর্ক খুবই জড়ানো। প্রশ্ন যতো বেশি হবে ততোই লেখনী হবে ক্ষুরধার। এক কথায় প্রশ্ন ছাড়া সাংবাদিকতা চলে না। কেনো এবং কী তা জানতে প্রশ্নের বিকল্প নেই। তার মানে এই নয় যে, শুধু অন্যকে জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন করতে হবে। সবার আগে নিজেকেই প্রশ্ন করে শেখা দরকার। কারণ নিজে কতোটা দায়িত্বশীল বা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ করছে, তার মূল্যায়ন সবচেয়ে ভালো করতে পারে সংবাদকর্মী নিজেই। আবার সংবাদকর্মী কী পারে আর পারে না, সেই প্রশ্নের উত্তরও মিলে আত্মজিজ্ঞাসায়। আর এই প্রশ্নেই মিলতে পারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, সংবাদ উপকরণ। যে যতো ভালো সংবাদকর্মী তার প্রশ্ন ততো ভালো হবে, এটাই স্বাভাবিক। আর কেউ প্রশ্ন তখনই করতে পারবে, যখন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানাশোনা থাকবে। বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে প্রশ্নকর্তা নিজেই বুঝতে পারে না যে, কী তার জানতে চাওয়া? এ কারণেই মাইক্রোফোন হাতে মিনিটের পর মিনিট কথা বলার পরও প্রশ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। উত্তরদাতার অবস্থা রবী ঠাকুরের ‘অনেক কথা যাও যে ব’লি, কোনো কথা না বলি/ তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলি’ গানের মতো। পরিস্থিতি এমন হয় যে, উত্তরদাতা বাধ্য হয়ে জানতে চান--আপনার প্রশ্নটা কী, অনুগ্রহ করে প্রশ্ন বলুন। আসলে তার কোনো প্রশ্ন নেই, নিজের উপস্থিতি জাহির করতেই মাইক্রোফোন হাতে নেন। তারপরও যা জানতে চান তার কতোটুকু সংবাদমূল্য আছে, তা নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট প্রশ্ন। আবার কখনো কখনো দলীয় আনুকূল্য, নির্লজ্জ তৈলমর্দনের লক্ষ্যেও কেউ কেউ প্রশ্ন করতে দাঁড়িয়ে যায়। তবে তথাকথিত প্রশ্নকারীদের সংখ্যাটা বেশি নয়।

    অনেক সময় দেখা যায়, হুট করেই প্রশ্ন করে বসে কেউ কেউ। আগে কেউ একই প্রশ্ন করেছে এবং উত্তর দিয়েছে কি না তা না জেনেই প্রশ্ন করাটা বালখিল্য সুলভ। এতে জনমানুষের মধ্যে নিজের তো বটেই, সাংবাদিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাবের সৃষ্টি হয়। যৌক্তিক বিষয়ের উত্তর পেতে কীভাবে অল্প কথায় গুছিয়ে জানতে চাইতে হয়, তা প্রতিনিয়ত শিখতে হবে, আয়ত্ত করতে হবে। এজন্য একটু হলেও হোমওয়ার্ক করা জরুরি। দৈনিক পত্রিকাগুলো পড়ার অভ্যাস বাড়াতে হবে। আর এখন তো হাতে হাতে স্মার্ট ফোনসেট। ফলে ইন্টারনেটেই প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেওয়ার সুযোগ আছে। লোক দেখানো প্রশ্ন নয়, একজন সংবাদকর্মীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বা মীমাংসা করার ক্ষমতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে সংবাদকর্মীর জানা উচিত, তিনি কী জানেন না, কী তার জানতে চাওয়া!

হোয়াট নেক্সট-এ মিলবে সমাধান

নিশ্চয়, সংবাদের জন্য ভালো ছবি দরকার। কিন্তু তথাকথিত ভালো ছবি তুলতে গিয়ে আহত বা রোগীসহ কাউকে বিব্রত করার সুযোগ নেই। সেটা সম্প্রচারসহ সব সংবাদকর্মীকেই সবার আগে মাথায় রাখতে হবে। আর জনবহুল এই দেশে উৎসুক জনতার কমতি থাকে না ক্যামেরা দেখলে। ফলে এতো ক্যামেরা দেখে হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজনদের, দর্শকের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। যাদের অনেকে মোবাইলফোন সেটে ছবি তুলতে গিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলে। এতে একদিকে সংশ্লিষ্ট রোগীর চিকিৎসা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে হাসপাতালে আসা অন্যান্য রোগীদের আনা-নেওয়াসহ স্বাভাবিক কাজ হয় ব্যাহত। যা হয়তো অনেকে খেয়ালই করে না। একটু দূর থেকে ছবি নেওয়ার সুযোগ আছে প্রতিটি ভিডিও ক্যামেরায়। সেই কাজে সংবাদকর্মীর উচিত যতোটা সম্ভব দূর থেকে ছবি নেওয়ার জন্য ক্যামেরাপার্সনকে বলা। আর এটা হলে সুশৃঙ্খলভাবে ছবি নেওয়া যায়, খুব বেশি বিরক্তি উৎপাদন না করেই। ফলে সবাই যখন সমস্যা নিয়ে হইচই করবে, তখন প্রতিবেদক পথ খুঁজবে বিকল্পের। সমস্যা সবাই দেখাবে কিন্তু সাংবাদিক সমাধানের চেষ্টা করবে। এটা শুধু ছবি নেওয়ার ক্ষেত্রে নয়, প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্ট বা ঘটনার সংবাদ সংগ্রহের সময় মাথায় রাখতে হয়। আর এই ‘হোয়াট নেক্সট’ চিন্তার সুবিধা আছে। এটা মাথায় থাকলেও বাড়তি রসদ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কখনো কখনো আরো ভালো কোনো সংবাদের খোরাক পাওয়া যেতে পারে।

    নভেম্বর ২০১৭, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দখল-দূষণ নিয়ে কাজ করছি। নদীর ভিতরে ঘুরতে না পারলে দখল-দূষণের ভালো ছবি খুঁজে পাওয়া যায় না। নদী তীরের কারখানাগুলোর দূষিত বর্জ্য নদীতে ফেলতে মাটির নিচ দিয়ে পাইপ এনে নদীর ভিতরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে উপর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, কারখানার বিষ পড়ছে নদীতে। এমনকি নদীর পাড় থেকে ছবি নিয়ে এমন অভিনব কৌশল তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই এই ছলচাতুরী ধরতে ছোটো নৌকাতে ডেমরা ব্রিজ থেকে শীতলক্ষ্যা দিয়ে চলছি কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত। দূষণের ছবি নিতে নিতে নদীর মধ্যে ক্যামেরায় ধরা পড়লো ডিজেল-পেট্রোল বিক্রির পাম্প মেশিন। একটু অবাক হয়ে দেখি, দিব্যি রাস্তার পাশে ফিলিং স্টেশনের মতোই এখানে তেল নিচ্ছে পণ্যবাহী একটা জাহাজ/জলযান। সেই ছবি ধারণ করতে করতেই এগিয়ে গেলাম ভাসমান তেল পাম্পের দিকে। কথায় কথায় জানলাম একটা-দুটো নয়, এই এলাকায় শীতলক্ষ্যার বুকে এমন ডজনেরও বেশি ভাসমান তেল পাম্প রয়েছে। নদীপথে চলাচলকারী যানবাহনগুলো পথিমধ্যে জ্বালানি তেল ফুরিয়ে গেলে এসব ভাসমান তেল পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে। আবার তেলের বিক্রি বাড়াতে জাহাজের মাস্টার/সুকানীদের জন্য কাপড় ধোঁয়া ও গায়ে ব্যবহারের সাবান উপহার দেওয়া হয়। এ দেখে ক্যামেরাপার্সনের আগ্রহও যেনো একটু বেড়ে গেলো। মূল প্রতিবেদনের পাশাপাশি বোনাস হিসেবে ব্যতিক্রমধর্মী এই প্রতিবেদনটিও অফিসে বেশ সমাদৃত হয়েছিলো। ভিজ্যুয়াল মাধ্যম হওয়ায় ভাসমান তেল পাম্পের ছবি একটু অন্যরকম, তাই ব্যবসায়িক প্রতিবেদন হিসেবে মন্দ নয়।

এফ এম মেথড : এক বাজারেই কিস্তিমাত

প্রতি শুক্রবারে মাছ-মাংস-তরকারিসহ রাজধানীর কাঁচাবাজার নিয়ে প্রতিবেদন থাকে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে। এখন তো সঙ্গে সরাসরি সম্প্রচার যোগ হয়েছে। এই কাঁচাবাজারের প্রতিবেদন করতে গিয়ে দেখেছি, সাধারণ মানুষ খুব একটা ভালো চোখে দেখে না। কেউ কেউ তো বিরক্তি দেখিয়ে বলেই ফেলে ‘মিডিয়ার কারণেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ে’। অন্যরা মুখে কিছু না বললেও এসব সংবাদ যে আমলে নেয় না তা স্পষ্ট বোঝা যায়। এর বড়ো কারণ ঘুরেফিরে ঢাকার কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক প্রতিবেদন। সেখানকার চেনা মুখ, চেনা দোকানিদের বক্তব্য নেওয়ায় বাজারের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না বেশিরভাগ সময়ই। কারওয়ান বাজারের কিছু মাছের দোকানি রীতিমতো চাহিদা অনুযায়ী বক্তব্য দিতে দিতে বিশেষ দক্ষ হয়ে উঠেছে। উল্টো দিক থেকে প্রতিবেদকরাও তাদেরকে ‘বাজারের হিরো’ বানিয়ে ফেলেছে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, বাজারে গেলে সামনের দিকের দোকানিদের কাছ থেকে চাল-ডাল-সবজির তথ্য সংগ্রহ করছে। ফলে তাদের বলা দাম আর বাজারের প্রকৃত চিত্রের মধ্যে তফাৎ আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হয় না।

কেনো দাম বেড়েছে খতিয়ে দেখতে সেই প্রশ্নও করা হয় না অনেক সময়। এমনকি গত সপ্তাহের চেয়ে চার-পাঁচ টাকা কেজিতে বেড়েছে বললেও সেটা আদৌ কতোটা সত্য তা মিলিয়ে দেখা হয় না অনেক সময়। অথচ প্রতি সপ্তাহেই কিন্তু এই বাজারদরের সংবাদ হচ্ছে। অফিসে বসে আগের সপ্তাহের স্ক্রিপ্টের সঙ্গে মিলিয়ে নিলেই হয়। বার কয়েক চেষ্টা করেছি ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন ছাড়া দোকানে যেতে। পরে যখন ক্যামেরার সামনে জিজ্ঞাসা করেছি, তখন দোকানি আগের দাম বলেননি। একই বাজারে একই জিনিসপত্রের দামে ফারাক কেনো? তৎক্ষণাৎ উত্তর, এটা ময়মনসিংহের বেগুন, রুই রাজশাহীর, কিংবা এটা নরসিংদীর বরবটি ইত্যাদি। বাহানার যেনো শেষ নেই!

   অপেক্ষাকৃত নতুন প্রতিবেদকরা বেশি খপ্পরে পড়ে এসব মতলববাজ দোকানিদের। ফলে একটু আগেভাগে বেরিয়ে অন্য দুই-একটি বাজার ঘুরে দ্রব্যমূল্যের সংবাদ না করায় এর গ্রহণযোগত্য কমে যায়। মনে রাখতে হবে, প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস এই রাজধানীতে, অসংখ্য বাজার রয়েছে বিশ্বের অন্যতম এ মেগাসিটিতে। ফলে ন্যূনতম দুই-তিনটি বাজারের তুলনামূলক চিত্র না থাকলে রাজধানীর বাজারদরের প্রকৃত চিত্রের প্রতিফলন পাওয়া সম্ভব নয়। সঙ্গত কারণেই বাজারে আসা মানুষের আগ্রহ ও আস্থা কোনোটাই থাকে না সাপ্তাহিক বাজারদরের প্রতিবেদনে। আশার কথা, বর্তমানে সংবাদভিত্তিক চ্যানেলগুলোতে মাঝে মাঝে কয়েকটি বাজার ঘুরে প্রতিবেদন করা হচ্ছে। অন্তত অন্য একটি বাজারে গিয়ে লাইভ দেওয়ার মাধ্যমে তুলনামূলক চিত্র দেখাচ্ছে। বাজারদরের প্রতিবেদন নিয়েও বার্তাকক্ষের সম্পাদকদের খুব বেশি নজরদারি থাকে না বললেই চলে। গৎবাঁধা একটা প্রতিবেদন লাগবে ফলে প্রতিবেদক যা বাজার করে এনেছে, তা দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেই দায় শেষ। মসলা কম হয়েছে বা কিছু বাদ পড়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার সময় কই! অন্তত স্ক্রিপ্টগুলো দেখলেই তা বোঝা যায়।

    শর্টকাট এই মেথড সাপ্তাহিক কাঁচাবাজারের সংবাদ ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রেও মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন বা বাজেট সংক্রান্ত বক্তব্য তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক, সি পি ডিসহ বিভিন্ন সংস্থা। বক্তব্য উপস্থাপনের পর চলে প্রশ্নোত্তর পর্ব--‘এক বাক্যে বলুন আপনাদের প্রতিক্রিয়া কী?’ আর এক বাক্যে উত্তর পেলেই তা টেলিভিশনের স্ক্রল বা টিকারে দিতে পারে ওই প্রতিবেদক। একটু মাথা খাটিয়ে সংবাদের মূল বক্তব্য বা ইন্ট্রোটা খুঁজে বের করার মতো পরিশ্রমটুকুও করতে চায় না তারা। এই শর্টকাট তরিকা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নেমে আসবে বড়ো দুর্ভোগ। নিজে খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন করার মানসিকতা হারালে ক্ষতি হবে নিজেরই, সি পি ডি বা বিশ্বব্যাংকের নয়।

কমন সেন্স হারালে চলবে না

সম্প্রচার সাংবাদিকতায় প্রতিবেদন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত মন্ত্রী, এম পি, ব্যাংক-বীমাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি, বেসরকারি দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, শিক্ষকসহ বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষকদের সাক্ষাৎকার নিতে হয়। পত্রিকার জন্য মন্তব্য টেলিফোনে নেওয়া সম্ভব হলেও টেলিভিশনে তা সম্ভব নয়। আর সম্প্রচারমাধ্যম যেহেতু টিমওয়ার্ক তাই প্রতিবেদকের সঙ্গে ক্যামেরাপার্সনও থাকে। সংশ্লিষ্ট সাক্ষাৎকারটি যেনো স্পষ্ট হয়, সেজন্য নয়েজ বা অযাচিত শব্দ পরিহার করতে সর্তক থাকে ক্যামেরার পিছনের মানুষটি। এক্ষেত্রে ওই ঘরের এয়ারকন্ডিশন, ফ্যানের সুইচটি বন্ধ রাখার অনুরোধ করে প্রতিবেদক। সঙ্গে মোবাইলফোন সেটটি সাইলেন্স মুড-এ রাখার অনুরোধ করা হয় সাক্ষাৎকারদাতাকে। অবশ্য অনেকে বলার আগেই এই কাজটি করে এবং কেউ কেউ অফিসের টেলিফোন সেটটি তুলে রাখে যাতে সাক্ষাৎকারে অসুবিধা না হয়। বক্তার পাশাপাশি অতি প্রয়োজনীয় এ কাজগুলো প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপার্সন উভয়ই করে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো প্রতিবেদক নিজের মোবাইলফোন সেটটি সাইলেন্স মুড-এ রাখতে ভুলে যায়। ফলে অনেক সময় সাক্ষাৎকার চলাকালে প্রতিবেদকের নিজের সেটের রিঙ টোন বেজে ওঠে। এতে ভীষণ বিরক্ত হয় বক্তা, যদিও ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলে না।

    অন্যদিকে সংবাদকর্মীদের প্রায় সবারই দুটো মোবাইলফোন সেট থাকে। কখনো কখনো একটা সাইলেন্ট করে তো আরেকটি করে না। শুধু ফোন কল নয়, ইন্টারনেট সংযোগ থাকার কারণে ঘন ঘন বেজে উঠে ফেইসবুক মেসেঞ্জার।

বাস্তব কিন্তু সত্য নয়

রেল স্টেশনে চিঠি লিখে বৃদ্ধ মাকে ফেলে গেছে সন্তান। উচ্চশিক্ষিত ও বড়ো চাকরি করা ছেলের সুন্দর হাতের লেখায় মায়ের প্রতি এমন অবিচারের নাতিদীর্ঘ বর্ণনাও রয়েছে ওই চিঠিতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সেই চিঠি। ফেইসবুকে ঝড় ওঠে; একের পর এক আবেগঘন ও গালমন্দে ভরা মন্তব্যে উড়তে থাকে চিঠিটি। একহাত দুহাত করে সেই চিঠি পৌঁছায় সাংবাদিকদের মাধ্যমে চ্যানেলে চ্যানেলে। হৃদয়গ্রাহী সেই চিঠি ধরে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল সংবাদও সম্প্রচার করে। কিন্তু দিনের আলো ফুরানোর আগেই জানা গেলো, চিঠির ঘটনা বাস্তব কিন্তু সত্য নয়। অনেকটা ক্রসফায়ারের মতো। মানুষের প্রাণ গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে, কিন্তু তাদের ভাষ্য বন্দুকযুদ্ধে। মৃত্যুর ঘটনা বাস্তব, কিন্তু বন্দুকযুদ্ধ সংঘটনের যে বর্ণনা তা সত্য নয়। ফলে বাস্তব হলেও ঘটনার বর্ণনা সত্য নয় বলে গণমাধ্যমগুলো দায় এড়াতে লিখে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার কথা। ফলে ঘটনা ঘটলেই যে তা সত্য হবে, তা সাংবাদিকদের মাথায় রাখা ঠিক হবে না। সেদিন রেল স্টেশনে পড়ে থাকা মায়ের উদ্দেশে লেখা চিঠিটাও সত্যি। তবে তা ফেইসবুকে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটি বাংলাদেশের বলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেউ ছড়িয়েছিলো। কিন্তু বৃদ্ধ মাকে স্টেশনে ফেলে যাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাই এখানে চিঠি বাস্তব হলেও মাকে ফেলে যাওয়ার ঘটনা সত্য নয়।

    ফেইসবুক উন্মাদনার এই যুগে অনেকে মাঝে মাঝে গণমাধ্যমের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে গুলিয়ে ফেলে। দুটো দুই ধরনের মাধ্যম এবং কাজ আলাদা বলে ভুলে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক কিছু পাওয়া যেতেই পারে যা সংবাদের ক্লু বা সূত্র হিসেবে কাজ করে। কিন্তু কোনো মতেই তা সংবাদ নয়। ওই সূত্র বা ক্লু ধরে সংবাদকর্মী কাজ শুরু করে বিস্তারিত তুলে আনলেই তা হবে সংবাদ। তার নজিরও আছে। যেমন, একবার প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের বেশ কয়েকটি ঘটনা সংবাদ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ভর্তি পরীক্ষার দিনে প্রশ্নের হুবহু কপি ছড়িয়ে পড়ে ফেইসবুকে। যা ধরে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও প্রশ্নফাঁসের ঘটনা স্বীকার করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তার পরও হাল ছাড়েনি সাংবাদিকরা; ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আবারও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন করে এবং শেষ পর্যন্ত নতুন করে পরীক্ষা নিতে বাধ্য হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পরে দেখা যায়, প্রশ্নফাঁস হওয়া পরীক্ষায় মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকাদের কেউ কেউ দ্বিতীয় দফায় নেওয়া পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বরও তুলতে পারেনি!

    দুটো ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া। একটির সূত্র ধরে কাজ করে শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের হিসাবনিকাশ আমূল পাল্টে গেছে। আর অন্যটি সত্য ধরে সংবাদ করায় গণমাধ্যমের বারোটা বেজেছে! ফলে কোনটা সংবাদ আর কোনটা ক্লু সে সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। দিন যতো যাচ্ছে ততোই বাড়ছে এ ধরনের প্রোপাগান্ডামূলক কর্মকাণ্ড। মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতেও এমন গুজব ছড়ানো হয়। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে এমন গুজব ছড়ানো হয়েছিলো ফেইসবুকে। এতে এমনই যুদ্ধাংদেহী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো যে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিলো বেশ কয়েকজন। ফলে কেউ এসে যা বলছে তা কতোটুকু সত্য তা যাচাই করতে হবে।

    মেসেজ যেনো মেসেঞ্জারের (বার্তাবাহক) না হয় সেটা বোঝার বা ধরার মতো বিচক্ষণতা থাকতে হবে প্রতিবেদকের। শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, সংঘবদ্ধ হয়েও এমন প্রোপাগান্ডা ছড়াতে রীতিমতো অনলাইন নিউজ পোর্টাল খোলা হয়েছে! মিথ্যা আর গোঁজামিল তথ্যের সেসব সংবাদ এমনভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে, যা দেখে বোঝার উপায় নেই কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা। সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার, সম্প্রতি ‘প্রথম আলো’র মতো প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিকের নাম-লোগো-ফন্ট হুবহু নকল করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যা বুঝে না বুঝে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার, মন্তব্য করেছে। অন্য আরো দুই-একটি সংবাদমাধ্যমের নাম-লোগো ব্যবহার করে এমন মারাত্মক অপরাধ ঘটানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেভাবে না বুঝে ফেইসবুকে ঝড় তোলে, সেভাবে ভাবার ও দেখার সুযোগ নেই সংবাদকর্মীর। সবারই দুটো চোখ, কিন্তু প্রতিবেদকের অন্তর্নিহিত চোখের কারণে সাধারণ মানুষের মতো তার ভাববার অবকাশ নেই।

যানজট, তবু যেতে হবে আগে

অন্য পেশার চেয়ে সাংবাদিকতা কতোটা আলাদা তা আলোচনার শুরুতেই তুলে ধরা হয়েছে। শুধু দায়িত্বশীলতা বা জবাবদিহিতার দিক দিয়ে নয়, কাজের ধরনের দিক দিয়েও বেশ আলাদা। অন্য পেশাজীবীরা ঢাকার দুর্বিষহ যানজট ঠেলে অফিসে পৌঁছাতে পারলেই হলো। কিন্তু সংবাদকর্মীকে সকালে বাসা থেকে অফিসে পৌঁছানোর পর আবারও রাস্তায় নামতে হয়। সংবাদ সংগ্রহে অফিস থেকে অ্যাসাইনমেন্ট স্থলে ছুটতে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় পড়তে হয় যানজটে। সেখান থেকে ফেরার পথে আবারও একই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সচিবালয়ের কোনো কর্মকর্তা বাসা থেকে সচিবালয়ে পৌঁছেই কাজ শুরু করে। কিন্তু একজন সাংবাদিককে বাসা থেকে অফিসে পৌঁছেই সচিবালয়ে পৌঁছাতে হয় নির্ধারিত সময়ের আগেই।

    দিন যতো যাচ্ছে ততো বাড়ছে যানজটের ভোগান্তি। তার পরও এই দুর্ভোগ মোকাবিলা করেই সাংবাদিককে কাজ করতে হয়। যানজট, তবুও সময়ের আগেই যেতে হবে। মনে রাখা দরকার, ঘটনাস্থলে একটু আগে উপস্থিত হলে কিন্তু ক্ষতি নেই। বরং অনুষ্ঠানের শুরু থেকে সবকিছু শুনতে ও দেখতে পারলেই উপকার হয়। আর এতো চ্যানেলের ভিড়ে এখন তো ঘণ্টায় ঘণ্টায় সরাসরি বা লাইভ সম্প্রচারের প্রতিযোগিতা চলে। ফলে লাইভে ভালো করতে হলে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে অনুষ্ঠান শুরুর আগে। তাতে দর্শকের জন্য কিছু বাড়তি তথ্য দিয়ে তথ্যবহুল ও প্রাঞ্জল সম্প্রচার করা সম্ভব হয় প্রতিবেদকের। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটে (পি আর আই) আলোচনার সময় টিকার বা স্ক্রল দিয়েছিলাম। ‘ব্যাংকিং খাতে লুটপাট বন্ধ না হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হবে না’ সংক্রান্ত টিকারটি সদ্যপ্রাপ্তে চলেছিলো। তখনো অন্যান্য চ্যানেলের সব সাংবাদিকরা পৌঁছায়নি বলে ‘যমুনা টেলিভিশন’ দ্রুত স্ক্রল দিয়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পেরেছিলো। ফলে তীব্র যানজটের কারণে সময় মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারিনি, সেটা বলার কোনো সুযোগ নেই। পথে বাড়তি সময় লাগবে ধরে নিয়েই অ্যাসাইনমেন্টে যেতে আগেভাগেই বের হওয়া নিরাপদ।

    আবার ঠিক সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মনোযোগ দিয়ে না শুনলেও বিপদ কম নয়। কারণ মনোযোগী শ্রোতা ছাড়া ভালো বক্তা হওয়া সম্ভব নয়। এতে আলোচনার মূল সুর কী তা দ্রুত ধরা যায় এবং সংবাদের টপ লাইন স্ক্রল বা টিকারে দেওয়া সহজ হয়। কিন্তু অনেক সময় একটু জটিল বিষয়ে আলোচনা হলে প্রতিবেদক বাইরে ঘোরাঘুরি করে। সঙ্গে আবার ঘণ্টায় ঘণ্টায় সংবাদ বুলেটিনে লাইভ দিতে যেতে হয় মিলনায়তনের গেটের বাইরে। সে কারণেও গুরুত্বর্পূণ তথ্য বাদ পড়ে যেতে পারে। যেমন, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসের দিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফ বি সি সি আই-এর প্রাক-বাজেট পরামর্শক সভায় এমন এক বিপত্তিতে পড়েছিলাম। সরাসরি সম্প্রচারের জন্য মিলনায়তনের বাইরে থাকায় করমুক্ত আয় সীমা বৃদ্ধির কোনো ইঙ্গিত অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে ছিলো কি না তা জানতে চেয়েছিলাম আরেক টেলিভিশনের সহকর্মীর কাছে। তিনি বেশ দরাজ গলায় জানান, করমুক্ত আয় সীমা বেড়ে হচ্ছে দুই লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। তার কাছ থেকে শুনে টেলিভিশনে স্ক্রল বা টিকার দিয়েছিলাম। কিন্তু ঘোর কাটতে বেশি সময় লাগেনি, একটু খতিয়ে দেখতে সংবাদপত্রের এক সহকর্মীর কাছে জিজ্ঞাসা করে জানলাম আসলে করমুক্ত আয় সীমা বাড়ছে এমন কোনো কথা বলেননি অর্থমন্ত্রী! তবে মানুষের জীবন যাপনের ব্যয় বৃদ্ধিসহ আর্থিক উন্নয়নের কারণে আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়ানোর প্রস্তাব অনেকে দিয়েছে বলে আলোচনায় জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। আর সেই প্রস্তাবের বক্তব্য খণ্ডিত আকারে ‘বাড়ছে’ ধরে নিয়েছিলেন সেই টেলিভিশন সাংবাদিক। আর তা যাচাই না করার কারণে ভুল সংবাদটি ‘যমুনা টেলিভিশনের’ স্ক্রলে চলে মিনিট দশেক! এ ধরনের বিপত্তি এড়াতে তাই মনোযোগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। আর পুরো অনুষ্ঠান না হলেও অন্তত প্রধান ও বিশেষ অতিথিদের বক্তব্য মন দিয়ে শুনতেই হবে এবং নোট নিতে হবে। এতে ভুলের পরিমাণ কমে; বাড়ে নিজের দক্ষতা-যোগ্যতা ও সক্ষমতা।

রুটিন সাংবাদিকতার গণ্ডি ভাঙতে হবে

দক্ষ সাংবাদিক হয়ে কেউ জন্মায় না, কাজের মাধ্যমেই নিজেকে বিকশিত করতে হয়। বাংলাদেশসহ দেশে দেশে সাংবাদিক হিসেবে যারা বিখ্যাত হয়েছে, তারা সবাই সাধারণ সংবাদকর্মী হিসেবেই পথচলা শুরু করেছিলো। নিজের কাজের প্রতি, সমাজ, দেশ সর্বোপরি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের কারণেই তারা স্মরণীয় হয়ে আছে। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা, এমনকি জীবনের বিনিময়ে তারা দেখিয়েছে কীভাবে গতানুগতিক বা রুটিন সাংবাদিকতার গণ্ডি ছাড়াতে হয়। তারা কেউই ইতিহাসে নাম লেখানোর আকাক্সক্ষায় কাজ করেনি, কিন্তু তাদের কাজই পরিণত হয়েছে ইতিহাসে। মানুষ, প্রাণ-প্রকৃতি আর পরিবেশ রক্ষায় তাদের অসংখ্য কাজ স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করছে, যা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে হাজার মাইল দূরে। লক্ষ্য স্থির করে নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিতে না পারলে বৃত্ত ভাঙার সাংবাদিকতা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশেও এমন ঘটনার নজির নেহায়েৎ কম নয়।

    ‘কাজের যোগ্যতা দেখিয়েই সংবাদ এ ঢুকতে হবে। পকেটের পয়সা খরচ করে এদিকে-ওদিকে ট্যুর শুরু করলাম। ব্যাপারটা জেদের মতো হয়ে দাঁড়ালো। এমন সব খবর আর ছবি পাঠাবো, সংবাদ যেনো ছাপতে বাধ্য হয়। এজন্যে অবশ্য লক্ষ রাখতে হবে, পত্রিকাটি কী ধরনের নিউজ চায়, তার পলিসি কী।’ ‘একটা চাকুরী’ শিরোনামে সাংবাদিকতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এভাবেই নিজের কথা তুলে ধরেছিলেন প্রখ্যাত চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। ভালো কাজ, ব্যতিক্রমী কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করে জায়গা করে নিয়েছিলেন এই প্রথিতযশা সংবাদকর্মী। ফলে একবার দুইবার নয়, প্রতিটি ঘটনায় সবসময় সাংবাদিকতায় নিজেদের দায়িত্বশীল কাজের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলতে হয় সাংবাদিককে। গতানুগতিকতার বাইরে বাড়তি কিছু, নতুন কিছু করার আকাক্সক্ষার ফলাফল যে কতো বিশাল হতে পারে তারও উদাহরণ আছে হাল আমলের সাংবাদিকতায়।

    প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ ও বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন। সেদিন খুলনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে সুন্দরবনের শেষ ছয়টি বাহিনীর ৫৪ জলদস্যু স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশায় ৫৮টি আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেয়। তবে তারা র‌্যাবের মাধ্যমে অস্ত্র জমা দিলেও প্রতিটি বাহিনীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে তাদেরকে সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন একজন টেলিভিশন সাংবাদিক; নাম মোহসিন উল হাকিম। দস্যুমুক্ত সুন্দরবনের একক কর্তৃত্বের দাবিদার যেনো তিনি। অবস্থা এমনই যে, সুন্দরবন আর মোহসিন উল হাকিম একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। এই সাংবাদিকের হাত দিয়ে একে একে আত্মসমর্পণ করেছে ৩২টি বাহিনীর তিনশো ২৮ দস্যু। জমা পড়ে বন্দুকসহ চারশো ৭০টি অস্ত্র ও সাড়ে ২২ হাজার গোলাবারুদ। একজন সাংবাদিকের হাত ধরে সশস্ত্র দস্যুবাহিনীর এমন আত্মসমর্পণের ঘটনা কেবল বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বে নজিরবিহীন! ‘যমুনা টেলিভিশন’-এর বিশেষ প্রতিনিধি মোহসিন উল হাকিমের সহকর্মী হওয়ার সুবাদে বিস্ময় সৃষ্টিকারী সেই অর্জনের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। যদিও এতো বড়ো অর্জনের পরও বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে খুব বেশি সংবাদ চোখে পড়েনি। ফলাও করা তো দূরের কথা, সংবাদে তার নাম ব্যবহারেও বেশ কার্পণ্য দেখিয়েছে দেশের সাংবাদিকরা। বি বি সি, ডয়েচে ভেলেসহ আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি মাধ্যমে সংবাদ হওয়ায় তা এখন পৌঁছেছে বিশ্ববাসীর কাছে।

    অথচ মাত্র ক’বছর আগেও পুরো সুন্দরবনে ত্রাসের রাজত্ব করতো ৩২টি সশস্ত্র বাহিনীর তিনশোর বেশি জলদস্যু। মাছ ধরতে আসা সাধারণ জেলে, কাঁকড়া শিকারি, মধু সংগ্রাহকসহ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষের কাছে মুক্তিপণ আদায় ছিলো এদের নিয়মিত ঘটনা। টাকা দিতে না পারলেই নেমে আসতো অকথ্য নির্যাতন, এমনকি মৃত্যু। সেই আতঙ্কের সুন্দরবন এখন দস্যুমুক্ত। কীভাবে সম্ভব হলো এমন দুঃসাহসিক সুন্দরবন অভিযান? এ নিয়ে বহুবার আলাপ হয়েছে মোহসিন উল হাকিমের সঙ্গে। শিক্ষণীয় এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন,

২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে দুর্ধর্ষ মাস্টারবাহিনীর ৫১টি অস্ত্র, হাজারো গুলিসহ ১৩ সদস্য আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় সুন্দরবন দস্যুমুক্ত অভিযান। দুই বছর ধরে আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শেষে দস্যুমুক্ত হয় সুন্দরবন। শুরুটা হয়েছিলো ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ঘুর্ণিঝড় আইলা’র সংবাদ সংগ্রহের সময়। দস্যুমুক্ত অভিযানের নয় বছরে কাজ করেছি যমুনাসহ চারটি টেলিভিশনে। সবমিলিয়ে ১৩৮ বার গিয়েছি সুন্দরবনে, দিনের পর দিন থেকেছি নৌকা ও ট্রলারে। এর মধ্যে ৩৫/৪০ বার ক্যামেরা ছাড়াই গিয়েছি দুস্যদের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগ করতে। কখনো কখনো বিশ্বাস অর্জনের জন্য জলদস্যুদের বাড়িতে গিয়েও যোগাযোগ করেছি। অফিসের অ্যাসাইনমেন্টের বাইরে নিজের ডে অফ বা সাপ্তাহিক ছুটি না নিয়ে গিয়েছি সুন্দরবনে।

একজন সাংবাদিকের ওপর ভরসা করে তিনশোর বেশি সশস্ত্র জলদস্যু স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে, এর চেয়ে বড়ো অর্জন আর কী হতে পারে? আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংবাদ করতে গিয়ে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের ভিতরের স্থায়ী কষ্টের মূলোৎপাটনের সফল ঘটনা ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। দিন আনি দিন খাই সাংবাদিকতার বাইরে নিজের জন্য কিছু একটা করার মানসিকতা সবসময় থাকতে হবে সাংবাদিকের। ‘এমন একটা সংবাদ ও ছবি পাঠাবো যাতে সংবাদ ছাপাতে বাধ্য হয়’--প্রখ্যাত চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের সেই চিন্তার সফল বাস্তবায়ন করেছেন সাংবাদিক মোহসিন উল হাকিম।

জানার আকাঙ্ক্ষা

সংবাদকর্মী মানেই যে সবকিছু জানবে তা কিন্তু নয়। না জানলে সমস্যা নেই, কিন্তু জানার আগ্রহ থাকতে হবে। আর এই আগ্রহ থাকলেই সাংবাদিক হিসেবে অন্যদের চেয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব। এজন্য ঘটনাস্থলে আগে যাওয়ার গুরুত্ব ইতোমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে। অফিস থেকে বের হওয়ার আগে দৈনিক পত্রিকাগুলোর কয়েকটি পড়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস থাকলে যেমন আপডেট থাকা যায়, তেমনই লেখার সামর্থ্য বাড়ে। অল্প কথায় গুছিয়ে পুরো সংবাদ তুলে ধরার কৌশল আয়ত্ত করা সহজ হয় সংবাদপত্র পড়ার মাধ্যমে। আর এখন তো সবার হাতে হাতে স্মার্ট মোবাইলফোন সেট। ফলে অফিস থেকে অ্যাসাইনমেন্ট স্থলে যাওয়ার পথে গাড়িতে বসেই সংবাদপত্র পড়া যায়। এছাড়াও সংবাদ কাভার শেষে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের কাছ থেকেও কিছু বিষয় বুঝে নেওয়া যায়। টেলিভিশন সাংবাদিকতার শুরুতে দেখেছি বিটের জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে নতুনদের আলাপ করতে। সংবাদের টপ লাইন হিসেবে যা ধরতে পেরেছি তা ঠিক কি না তা বহুবার বুঝে নিয়েছি। ভুল যাওয়ার চেয়ে অন্যের কাছ থেকে জেনে নেওয়া সবসময়ের জন্যই উত্তম পন্থা। যদিও এখন অপেক্ষাকৃত নতুনদের মধ্যে বুঝে নেওয়ার আগ্রহ খানিকটা কম।

    অনেক সময় দেরিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে কোনো কোনো টেলিভিশন প্রতিবেদককে বেশ হম্বিতম্বি করতে দেখেছি। আয়োজক প্রেস রিলিজ রাখে নাই কেনো; সাংবাদিকদের বসার জায়গা এতো কম রেখেছে কেনো ইত্যাদি বিষয়ে ক্ষোভের প্রকাশ করতে দেখেছি তাদের। যদিও সময় মতো আসার বদলে তিনি এসেছেন বেশ পরে। আর টেলিভিশন, অনলাইনসহ গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আয়োজকদের আনা প্রেস রিলিজ মুহূর্তেই ফুরিয়ে যায়। এজন্য আয়োজকদের একহাত নেওয়া সত্যিই অশোভন বৈকি। অনেক সময় এ নিয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তার যোগ্যতা-দক্ষতা নিয়েও সংবাদকর্মীরা বিরূপ মন্তব্য করে থাকে। এদের কারো কারো ভাবটা এমন, যেনো জনসংযোগ কর্মকর্তা মানেই সাংবাদিকদের খেদমতে ব্যস্ত থাকবে! এ ধরনের ব্যবহারে মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের।

    চলন-বলনে সহনশীল আচরণের পাশাপাশি রুচিশীল পোশাক পরিধানও সাংবাদিকদের জন্য জরুরি বিষয়। বিশেষ করে টেলিভিশন, সম্প্রচারমাধ্যম হওয়ায় রঙচঙা পোশাক বা টিশার্টের মতো পোশাক পরিহার করতে হয়। এমন কোনো আচরণ বা শব্দ প্রয়োগ করা যাবে না যাতে কোনো ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের কেউ আহত হয়। এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সংবাদ না হলেও সমস্যা নেই, কিন্তু সংবাদকর্মীর একটি শব্দের সাম্প্রদায়িক ফায়দা লুটতে পারে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। অচেতনে বা বেখেয়ালে কখনো কখনো এমন প্রশ্নবিদ্ধ কিছু শব্দ সংবাদকর্মীরা ব্যবহার করে ফেলে।

উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে ভাস্কর্য স্থাপনের সময়ে অনেককেই বলতে শুনেছি ‘মূর্তি’ স্থাপনের কথা বলতে। মূর্তি আর ভাস্কর্য দুটো দুই জিনিস। হেফাজতসহ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতা উসকানি দিতে পরিকল্পিতভাবে মূর্তি শব্দ ব্যবহার করে। কিন্তু সংবাদকর্মীর কাছে তা বর্জনীয়। কোনোভাবেই সেটা ব্যবহার করা যাবে না। ঠিক একইভাবে রাজনৈতিক চেতনা সম্পন্ন হতে হবে, কিন্তু বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবে না প্রতিবেদক। সরকারবিরোধী নয়, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতি-অসঙ্গতি তুলে ধরবে সাংবাদিক। মনে রাখতে হবে, সাংবাদিক কখনো সরকারবিরোধী বা পক্ষের হতে পারে না; হওয়ার সুযোগও নেই।

প্রতিটি শব্দই গুরুত্বের দাবিদার

২০১৭ খ্রিস্টাব্দে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে বাজেটে অনেকগুলো পণ্যের আমদানি শুল্ক কমবেশি করেছিলো সরকার। এর মধ্যে আমদানি নিষিদ্ধ কয়েকটি পণ্যে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়। যার শুরুতেই ছিলো শুকরের মাংস আমদানিতে ছাড়ের বিষয়টি। যে পণ্য আনা নিষিদ্ধ সেখানে ছাড় দেওয়ার মানে কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রতিবেদনটি করেছিলাম। প্রতিবেদনটি সম্প্রচারে নিজের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নিজের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হই। প্রতিবেদন নিয়ে নয়, সংবাদের সুপার নিয়ে (টেলিভিশনের পর্দায় সংশ্লিষ্ট সংবাদের মূল বিষয়টি স্ক্রিনে তিন লাইনে তুলে ধরাকে সুপার বলে)। সুপারের ভাষা ছিলো--‘আমদানি নিষিদ্ধ শুকরের মাংসে শুল্ক ছাড়।’

সংবাদমূল্য যতোই ভালো হোক না কেনো, সংবাদকর্মীকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি মাথায় রেখে সংবাদ উপস্থাপন করতে হয়। চাইলেই সব কথা হরদরে বলার সুযোগ নেই সংবাদকর্মীর। স্পর্শকাতর বিষয় বলে সংবাদের সুপারে ‘আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যে শুল্ক ছাড়’ লিখলেই যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু এক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতার সম্পর্কে বড়ো ধরনের গাফিলতি পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেদনটি তৈরি করতে গিয়ে বেশ রাত হওয়ায় সুপারটি বার্তাকক্ষের ডেস্কের একজনকে দিতে বলেছিলাম। সংবাদের গুরুত্ব অনুযায়ী সে হয়তো সুপারে তা উল্লেখ করেছিলো। প্রতিবেদকের প্রতিবেদন, তাই ভালো হলে যেমন প্রশংসা, খারাপ বা ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে দায়ও তার। অন্য একজন দিয়েছিলো বলে সেটার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই প্রতিবেদকের। পরদিন সকালে নিজে অফিসে আসার পর এক সহকর্মী ফোনে বলেন, আপনার কাছ থেকে এ ধরনের অবহেলা প্রত্যাশা করিনি। সংবিৎ ফিরে পাওয়া মাত্র সুপারের লাইনটি সংশোধন করি। পীড়াদায়ক এই ঘটনার শিক্ষাটা বড়ো, যা ভবিষ্যতে প্রতিবেদন তৈরিতে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি সচেতন করবে।

লেখক : সুশান্ত সিনহা, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টেলিভিশন-এর বিশেষ প্রতিনিধি।

sinhasmp@yahoo.com

sinhaspb@gmail.com

 

(বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজকি লণ্ঠন ১৬তম সংখ্যা , জানুয়ারি ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়ছে।)                        

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন