Magic Lanthon

               

সালাহউদ্দিন নীল

প্রকাশিত ২০ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘তোমাকে বুঝিনি, থিও’

এক দার্শনিক নির্মাতার চিন-পরিচয়

সালাহউদ্দিন নীল



তোমায় বুঝিনি থিও

ঘটনাক্রমে বইটি হাতে পাই ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের পহেলা মে সন্ধ্যায়; যখন বই পড়ার আগ্রহ হারিয়ে গেছে, মনের মজ্জায় জ্ঞানের পৃথিবীটা ধুকে ধুকে মরছে। এই ধুকধুকানিটা অবশ্য শুরু হয়েছিলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ সনদটি ২০১২ খ্রিস্টাব্দে হাতে পাওয়ার পর থেকেই। সচরাচর সনদপত্র হাতে পেলেই জ্ঞান আহরণের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, আর ভাবনাটাও গণ্ডিবদ্ধ হয়ে যায় পৃথিবীতে কী করে টিকে থাকা যায় তা নিয়ে। এই টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্যেই বইটির মলাটের দিকে তাকিয়ে দেখি ‘তোমাকে বুঝিনি, থিও’; তার নিচে ছোটো ফন্টে লেখা ‘থিও এনজেলোপুলুসের সিনেমা, সাক্ষাৎকার ও ভাবনা’; ঠিক তার নিচে আবার একটু বড়ো ফন্টে লেখা ভাষাবদল ও গ্রন্থনা : সৈকত দে। ঠিক ওই মুহূর্তের আগ পর্যন্ত থিও কিংবা সৈকত দে, দু’জনেরই নাম কোনোদিন শুনিনি। বইটি হাতে নিয়ে নতুন করে নামকরণ করলাম, তোমাকে বুঝতে চাই থিও। সঙ্গে সঙ্গে বইটিতে তারিখ লিখে রাখলাম। আর উপরের তারিখের হদিসটা বইয়ে লিখে রাখার বদৌলতেই জানাতে পারছি; ভাগ্যিস ওই দিন তা লিখে রেখেছিলাম। আর বিনম্র শুকরিয়া সৈকত দের প্রতি, তিনি থিওর প্রেমে পড়ে বইটির কাজ শেষ করেছিলেন বলেই একজন মহান মানুষ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এই জানানোর খেলার শুরুটা অবশ্য সেই আদিম কালের গুহার আঁকিবুকি থেকেই, যেটা আজও বয়ে চলেছে এবং নিরন্তর বয়ে যাবে ভাবনার অন্তর থেকে অন্তরে।

লেখকের মগজে থিওর দর্শন

এই বইয়ে মোট অধ্যায় রয়েছে ১৪টি, যার মধ্যে ১২টি নিজের চলচ্চিত্র নিয়ে থিওর সাক্ষাৎকার এবং প্রথম দুটি অধ্যায় লেখকের নিজের লেখা; তাতে থিওর ভাবনা ও কাজের উল্লেখ রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ের শুরুতেই থিওর জন্মের ১৫ বছর আগের গ্রিসের রাজনীতির অন্ধকার যুগ নিয়ে আলোচনা করেছেন সৈকত। তাতে উঠে এসেছে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে গ্রিসের নিয়ন্ত্রক আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সমস্যা, প্রজাতন্ত্র আর রাজতন্ত্রের বিরোধ, অবশেষে সামরিক শক্তির উদয়ের প্রসঙ্গ। গ্রিসের এই রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়াবহতার মধ্যেই ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ এপ্রিল অ্যাথেন্সে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম মহান নির্মাতা থিওডোরাস এনজেলোপুলুস।

থিওর জন্মের এক বছরের মধ্যেই কমিউনিস্টদের বিলোপ করার অজুহাতে সামরিক শাসন আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে; সেই আবহের মধ্যেই থিওর বেড়ে ওঠা। বইটিতে থিওর জীবনকাহিনি বলতে, অ্যাথেন্সে আইন পড়া, কিছুদিন সামরিক বাহিনীতে কাজের পর প্যারিসের সরবোন-এ পড়তে যাওয়া; আবার অল্প কিছুদিনের মাথায় সরবোন ছেড়ে আই ডি এইচ ই সি ফিল্ম স্কুলে (Institute for Advanced Cinematographic Studies, France) পড়া এবং গ্রিসে ফিরে বামপন্থি দৈনিক ‘আল্লাগি’তে চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে কাজ শুরু করা--হুবহু এতোটুকুই।

থিও অল্প কিছুদিন কেনো সরবোন ছেড়ে ফিল্ম স্কুলে পড়তে গেলেন, সে বিষয়টি লেখক পরিষ্কার করেননি, যেটার প্রেক্ষাপট জানার আগ্রহ পাঠক হিসেবে থেকেই যায়। এছাড়া প্রায় সব চলচ্চিত্রে স্পাইরোস নামের চরিত্র রাখতেন থিও, যেটা তার বাবার নাম। কারণ হিসেবে লেখক উল্লেখ করেন, নয় বছর বয়সে থিওর বাবা ডানপন্থি এবং বামপন্থিদের যুদ্ধের মধ্যে আটক হন; তাকে হত্যা করতে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের বাইরের পেরিসটোরি এলাকায়। সেখানে অন্য বহু মানুষের মরদেহের মধ্যে থিও তার বাবাকে খুঁজেছিলেন। ছোটোবেলার সেই ট্রমা থেকে বের না হতে পেরেই নিজের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতে ঘুরেফিরে স্পাইরোস নামের চরিত্র রাখেন থিও। কিন্তু থিওর বাবার আটক হওয়ার বিষয়টি তো আসলে গুজব ছিলো। সুতরাং পেরিসটোরি এলাকায় অন্যদের মরদেহের মধ্যে বাবাকে খোঁজা নাকি ভিন্ন কোনো কারণে স্পাইরোস চরিত্র বার বার এসেছে, সেটা কিন্তু থিও তার কোনো সাক্ষাৎকারেই স্পষ্ট করে বলেননি। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ওই বয়সে অনেকের মরদেহের মধ্যে নিজের বাবাকে খুঁজে ফেরার যে মানসিক চাপ পড়েছিলো থিওর শিশুমনে, পরে বাবাকে ফিরে পেলেও সেই ট্রমা থেকে হয়তো তিনি বের হতে পারেননি।

থিওর সমগ্র জীবন আর কাজ হলো নিজেকে খুঁড়ে খুঁড়ে নিজের ইতিহাস, শিকড় বোঝার চেষ্টা। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, দেশীয় স্বৈরতন্ত্র নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি গ্রিসের পৌরাণিক পরিচয় থেকে বাস্তবিক পরিচয়কে তুলে ধরেছিলেন মানুষের সামনে। যেসব ব্যাপারে নিজের জানার আগ্রহ হতো থিওর এবং যে বিষয়গুলো তিনি অন্যদের জানানোর তাগিদ অনুভব করতেন, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সেসবের অনুসন্ধান করে অন্যদের সামনে তুলে ধরতেন। এভাবে তিনি একে একে নির্মাণ করেছেন ১৩টি চলচ্চিত্র--রিকন্সট্রাকশন (১৯৭০), ডেইজ অব থার্টি সিক্স (১৯৭২), দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স (১৯৭৫), দ্য হান্টার্স (১৯৭৭), আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট (১৯৮০), ভয়েজ টু সাইথেরা (১৯৮৪), দ্য বিকিপার (১৯৮৬), ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট (১৯৮৮), দ্য সাসপেন্ড স্টেপ অব দ্য স্টর্ক (১৯৯১), উলিসেস গেজ (১৯৯৫), ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে (১৯৯৮), দ্য উইপিং মিডো (২০০৪), দ্য ডাস্ট অব টাইম (২০০৯)। তার ডেইজ অব থার্টি সিক্স, দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স, দ্য হান্টার্সকে একত্রে ‘ট্রিলজি অব হিস্ট্রি’; ভয়েজ টু সাইথেরা, দ্য বিকিপার, ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট চলচ্চিত্রকে একত্রে ‘ট্রিলজি অব সাইলেন্স’; এছাড়া ‘ট্রিলজি অব বর্ডার’ বলা হয় দ্য সাসপেন্ড স্টেপ অব দ্য স্টর্ক, উলিসেস গেজইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’কে।

তার সর্বশেষ তিনটি চলচ্চিত্র ছিলো গ্রিসের আধুনিক ইতিহাস নিয়ে। এই ত্রয়ীর শেষ চলচ্চিত্র দ্য আদার সি নির্মাণের সময় মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান থিও। এছাড়া তিনি একাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যেখানে গ্রিসের অনুসন্ধানী ইতিহাস এসেছে বার বার। জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বদলে সেটার গূঢ় অর্থ থিও তুলে ধরার চেষ্টা করেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। থিও মানুষের চিন্তার যে দর্শন, সে দর্শনকে সমৃদ্ধ করতে শিখিয়েছেন, সত্য দেখিয়ে সত্য চিনিয়েছেন।

লেখক এই অধ্যায় শেষ করেছেন থিওর প্রথম চলচ্চিত্র রিকন্সট্রাকশন নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে। সাদা-কালোয় নির্মিত চলচ্চিত্রটি নব্য-বাস্তববাদ ধারার হলেও একই সঙ্গে গ্রিসের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আর সংস্কৃতির পতন কেনো ঘটলো, তার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টাও রয়েছে। চলচ্চিত্রটি দেখেই থিওর প্রেমে পড়েন সৈকত দে। কৌতূহল জাগানিয়া একটা তথ্য হলো, থিওর ১৩টি চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফার একজন এবং সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন একজনই। থিও নিজেও রিকন্সট্রাকশন-এ সাংবাদিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

রিকন্সট্রাকশন-এ জার্মান ফেরত এক ব্যক্তি তার স্ত্রী ও স্ত্রীর প্রেমিকের হাতে খুন হন, এ ব্যাপারে তদন্তে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও একজন সাংবাদিক। যারা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে খুনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে চায়। তবে এটা শুধু হত্যার ঘটনা এবং তার উন্মোচন নয়; বরং মানব সম্পর্কের দার্শনিক ও অনুভূতির মৃত্যু ঘটে যাওয়ার রহস্য বোঝার চেষ্টা। চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সময় গ্রিসের সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসে, শিল্পচর্চার ওপর আরোপ করা হয় কঠোর নিয়ন্ত্রণ। লেখক মনে করেন, পৃথিবীর দেশে দেশে জান্তাদের এটাই কাজ। জান্তাদের নেতারা ছিলো গ্রামের মানুষ, যারা ভাবতো গ্রামের নৈতিক মূল্যবোধ রসাতলে চলে গেছে এবং ধর্মের মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ ঘটানো জরুরি। সৈকত মনে করেন, থিওর মতো বামপন্থির জন্য এটা খুব কঠিন, কেননা তিনি এই সব মূল্যবোধকে প্রশ্ন করেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চান। থিও তার রিকন্সট্রাকশন-এ গ্রিসের সামরিক সরকারের হার্মাদপনার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। দমনের চেহারা খুঁজে বের করাই ছিলো তার কাছে প্রধান কাজ; আমৃত্যু সেই ব্রত পালন করেছেন থিও।

২০১২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি রাস্তা পারাপারের সময় মোটর সাইকেলের ধাক্কায় আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে থিও না ফেরার দেশে চলে যান। থিওর মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ করার সময় বন্ধনীতে ‘কাকতালীয়ভাবে, চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস’ উল্লেখ করেন লেখক। কেনো  তিনি থিওর মৃত্যুর তারিখের সঙ্গে এই দিবসের কথা উল্লেখ করেছেন, তা পাঠক হিসেবে আমার কাছে খানিক খটকা লাগে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে লেখক পুনরায় থিওর পরিচয় ও জন্ম তারিখের পুনরাবৃত্তি করেন। পরে তিনি থিওর জীবনব্যাপী কাজের বড়ো দিক হিসেবে বলেন, থিও গ্রিসকে পৌরাণিক পরিচয় থেকে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। তার চলচ্চিত্রের চরিত্ররা অলিম্পাস পর্বতে থাকে না, থাকে ক্লেদদীর্ণ দিনানুদিনেই, প্রায় তারা অতি সাধারণ মানুষ, শরণার্থী, একটু ভালো করে বাঁচতে চায়, একা হয়ে পড়েছে ভিতর থেকে, স্বপ্নে দেখা কোনো পিতৃ-পরিচয়ের অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে হয়তো কেউ।

থিও নির্মিত প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ব্রডকাস্ট মুক্তি পায় ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে। এতে তিনি দেখান বিজ্ঞাপনী ব্যবস্থার বিপুল মোহের বিপ্রতীপে সেই ব্যবস্থার সঙ্গেই সংযোগের সঙ্কটের প্রকৃত চেহারা। লেখকের দর্শনে মুখ বিজ্ঞাপনে ঢেকে গেলেও আমরা মূক হয়ে থাকি, আবিষ্কার করতে পারি না বিজ্ঞাপনের সর্বগ্রাসী অবস্থার সামনে আমাদের আমিত্বকে এবং এই ভাবেই একটা আত্মপরিচয়ের দীনতা আমাদের গ্রাস করে। এই অংশে এসে লেখক পুনরায় নির্মাতার প্রথম চলচ্চিত্র রিকন্সট্রাকশন নিয়ে আলোচনা করেন। চলচ্চিত্রটিতে যে খুনের গল্প, সেটা আসল কথা নয়; এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় সারা গ্রিসের গ্রামগুলোর পরিস্থিতি। পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে চলে তদন্ত এবং তার ভিতর দিয়েই সত্য তুলে ধরেন থিও।

লেখক এখানে বলেন, এই চলচ্চিত্র যিনি দেখবেন তিনি উপলব্ধি করবেন, আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল রয়েছে। কিন্তু তার পরেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়; আইনি তদন্তের দিকগুলো হয়তো আমাদের দেশের সঙ্গে মিলে যায়; তবে অভিবাসনের ফলে গ্রিসের গ্রামের পর গ্রাম যেভাবে জনশূন্য হয়ে পড়েছে, তার ঠিক উল্টো চিত্র কিন্তু আমাদের দেশে; এখানে গ্রামের জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে এবং সেটা অব্যাহতভাবে।

এর পরে থিওর দ্বিতীয় ট্রিলজি নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলেছেন সৈকত। ট্রিলজি অব সাইলেন্স-এর তিনটি চলচ্চিত্র হলো ভয়েজ টু সাইথেরা, দ্য বিকিপারল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট। তিনটি চলচ্চিত্রই যাত্রাপথের গল্প বলে। ভয়েজ টু সাইথেরা’তে ফিরে আসা বিপ্লবী বাবা স্পাইরোসের যাত্রা, নিজের অতীত আর বর্তমানের মধ্যকার সংযোগ চেষ্টার ভিতর; দ্য বিকিপার-এ স্কুল শিক্ষক বাবা নিজের ভিতরই যাত্রা করেন নিজের মৌমাছি পালনের বাক্সগুলোকে সঙ্গে নিয়ে, আর ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট-এ দুই ভাই-বোনের যাত্রা নিজেদের বাবার কাছে যাওয়ার, যিনি বাস্তবে অনুপস্থিত।

ভয়েজ টু সাইথেরা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লেখক চলচ্চিত্রের কিছু সংলাপ তুলে ধরেন, যেখানে ৩২ বছর পর নির্বাসন থেকে স্পাইরোসের ফেরার পর তার সন্তান ও স্ত্রীর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়। লেখকের ভাষ্যমতে, শুধু এই চলচ্চিত্র নয়, থিওর প্রত্যেকটা চলচ্চিত্রে সংলাপের অল্প ব্যবহারে দর্শক অবাক হবে, আবিষ্কার করবে তার চলচ্চিত্র কতো ব্যঞ্জনাময়। এর পরে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দৃশ্যের বর্ণনা করা হয়। বিপ্লবী স্পাইরোস সেখানে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, অন্যদিকে গ্রামবাসী তাকে মেনে নিতে চায় না। তাদের মনোভাবে প্রকাশ পায়, দেশ এখন আর অতীতের সঙ্গে আপসে সম্মত নয়। দ্য বিকিপা’র সম্পর্কে লেখক বলেন, একজন অত্যন্ত একা মানুষের গল্প, যার বলার মতো কোনো কথা নেই, যে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না। মধ্যবয়স্ক মানুষ, যিনি স্কুল শিক্ষক, মেয়ের বিয়ের দিন চাকরি ছেড়ে, স্ত্রী ছেড়ে, শহর ছেড়ে তার মৌমাছি পালনের বাক্সগুলোকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পুষ্প সন্ধানে; যা থেকে সেরা মধু হতে পারে। চলতি পথে এক তরুণীকে গাড়িতে আশ্রয় দেন; যে তরুণীর কোনো স্মৃতি, বেদনা বা অনুশোচনা নেই; মেয়েটি কেবল বর্তমানেই বাঁচে। এই তরুণী এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে, যার কিছুতেই কিছু এসে যায় না। স্মৃতিহারা অতীত সম্পর্কে মমতাহীন প্রজন্ম কেবল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভেসে বেড়াচ্ছে। লেখক এখানে মধ্যবয়স্ক মানুষটির নাম স্পাইরোস উল্লেখ করতে গিয়ে, থিও বার বার কেনো এই নাম তার চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন তার কারণ পুনরায় ব্যাখ্যা করেন; যেটা পাঠকের আর জানার প্রয়োজন ছিলো না।

এই ট্রিলজির শেষ চলচ্চিত্র ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট, নির্মাতার অন্যতম কাজ। লেখকের অনুভূতিতে চলচ্চিত্রটি দর্শককে একেবারেই স্বস্তি দেয় না। এ এক অন্যতর যাত্রাপথের গল্প। দুই ভাই-বোনের যাত্রা, যারা তাদের উৎস খুঁজে পেতে চায়; যে উৎসের শেষ কখনো না দেখা ‘বাবা’। অন্যান্য চলচ্চিত্রের মতোই থিও এতে গ্রিসের প্রকৃতি, সংস্কৃতি আর বর্তমান তুলে ধরেন। এখানে লেখক চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দৃশ্যের বর্ণনা দেন। পরে তিনি নির্মাতার প্রিয় কবি জর্জ সেফেরিসের একটি কবিতা তুলে ধরেন। আসলে এই কবিতাটিই হচ্ছে চলচ্চিত্রের আত্মা, যা কিনা এন্ড্র হর্টনের (থিওকে নিয়ে দুটি প্রবন্ধের বই সম্পাদনা করেছেন এন্ড্র হর্টন, তিনি থিওর চলচ্চিত্রের গবেষকও) বরাতে লেখক জানতে পারেন। পরিশেষে তিনি চলচ্চিত্রের আরো দুটি দৃশ্যের কথা তুলে ধরেন। আসলে দৃশ্য বর্ণনার মাধ্যমে লেখক থিওর দর্শনকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন আর সেগুলোর ব্যাখ্যায় তিনি বার বার পড়েছেন থিওর প্রেমে; নতুন করে আবিষ্কার করেছেন তাকে।

ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট-এর শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, যাত্রা শেষে সীমান্তের কাছে পৌঁছে ওই দুই ভাই-বোন, অন্ধকারে নদী পার হয়। সীমান্তরক্ষীদের দিক থেকে ভেসে আসে গুলির শব্দ। ভোরে, কুয়াশায় সেই দুই ভাই-বোন জেগে ওঠে। দূরে একটা গাছ দেখা যায়, আর ওরা গাছটাকে জড়িয়ে ধরতে ছুটে যায়। লেখকের ভাষ্য, ‘এই গাছটাই একটা আশার প্রতীক তাদের জন্য আর আমাদের জন্য।’ এই বাক্যেই বোঝা যায় থিওর প্রেমিক হিসেবে সৈকতও কম যান না!

থিওর মগজে দর্শনের বিনির্মাণ

থিও তার আলাদা আলাদা চলচ্চিত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পৃথকভাবে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে যেসব কথা বলেছেন, এই পর্যায়ে এসে সেগুলো তুলে ধরেছেন সৈকত। থিওর মগজ কীভাবে চলতো তা প্রথমেই বলে নেওয়া দরকার থিওর বক্তব্যেই। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, আমি অনুভব করি যে আমার সৃজনশীল কাজ আমার বোধবুদ্ধির সমান তালে চলতে থাকে; দৃশ্যধারণ করার সময় কিংবা কাজ না করে বসে থাকার সময়ও। অবশ্য ঘটনাটার মূল্যায়ন ঘটে পরে, যখন আমি কাজ করি নিজেকে মুক্ত অনুভব করি, আমাকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। আমি তাই করি, যা আমার দরকার, আমার আত্মা যা চায়। ঠিক এমনটাই থিও। যা ভাবনা তাই কাজ, প্রযোজকের কথায় তিনি নিজের কোনো চলচ্চিত্রের কোনো কিছুই বদলান না।

থিও তার চলচ্চিত্রে স্বৈরতন্ত্রের ধরন আর শিকড়কে বিশ্লেষণ করেছেন; তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো লেখক/শিল্পী যদি এই সময়টাকে আন্তরিকভাবে বোঝার চেষ্টা করে, তবে অতীতের উজ্জ্বল উদ্ধার অপরিহার্য এবং একটা দৃশ্যমান ঘটনা থেকে আরেকটা দৃশ্যমান ঘটনার কারণ অনুসন্ধানও সম্ভব। অসংখ্য লোকের কোনো অতীত নেই, যাদের আছে, তাদের নিয়ে থিও-ও ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী ছিলেন। তার কথায়, অতীত কখনো অতীত হয় না; এটা বর্তমান আর ভবিষ্যতের মধ্যে থেকে যায়। সে জন্যই হয়তো থিওর বেশিরভাগ চরিত্র অতীতচারী। আশপাশের ঘটা ঘটনার সাপেক্ষে নির্মাতা নিজেকে কখনো ইনোসেন্ট ভাবতে পারেননি। তার কাছে একজন শিল্পীর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। অন্য দেশের প্রযোজকদের বহু লোভাতুর প্রস্তাবের পরেও থিও বিশ্বাস করতেন, যে ছোটো দেশে তার জন্ম, সেই দেশের ইতিহাসের পুনর্নির্মাণই তার ব্রত। নিজ দেশের সঙ্গে সঙ্গে অন্য দেশ ও ছোটো ছোটো জাতির প্রতি থিও ছিলেন অনুভূতিপ্রবণ। তার মগজে এটাই কাজ করতো যে, আমরা টুকরো টুকরো ভূমিতে বিভক্ত মাত্র, আমাদের পরস্পরের পাশে থাকা উচিত।

থিওর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে, তিনি যা করতেন এবং যা পর্দায় দেখাতেন, সেটাই তিনি। চলচ্চিত্র নির্মাণ ছিলো তার কাছে জীবনযাপনের একটা পদ্ধতি, আরেকটা সমান্তরাল জীবন। খ্যাতি নয়, পুরস্কার নয়, সম্মান নয়, এমনকি অন্যের তুষ্টির জন্যও তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি। ফকনার যেমনটা বলেন, ‘দুনিয়াটা তৈরি হয়েছিলো উপন্যাস হয়ে যেতে’; তেমনই থিও বিশ্বাস করতে ভালোবাসতেন, পৃথিবী তৈরি হয়েছিলো চলচ্চিত্র হয়ে যেতে। তার কাজগুলো হচ্ছে একধরনের টেস্টামেন্ট বা ইচ্ছাপত্র। যখন একটা শিল্পকাজের সত্যতার শিল্পমূল্য থাকে, তা ভবিষ্যতের আজ্ঞাপত্র। সত্যিকারের সিগনিফিকেন্ট কাজগুলো আসলে আগামীর জন্য। এর ধ্রুপদী উদাহরণ হলো ব্যাটেলশিপ পটেমকিন; যা দর্শকের কাছে প্রাথমিকভাবে ব্যর্থ একটা চলচ্চিত্র ছিলো। এজন্য থিও নিজেই বলে গেছেন, ‘আমি জানি না আমার চলচ্চিত্রগুলো কালের কষ্টিপাথরে উতরে যাবে কিনা’; অথচ থিওর চলচ্চিত্র দেখলে দর্শক নিজের চিন্তাগুলোকে ভাবতে, অবসর দিতে অনেকটাই বাধ্য হবে; নতুন করে বাঁচতে শেখাবে মানুষের মতো মানুষ হয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, মানুষের কাছে গিয়ে।

ব্যক্তিগতভাবে থিও আশাবাদী বা হতাশায় ভোগা টাইপ লোক ছিলেন না। তার কথায়

আশাবাদী মানেই হলো, বাস্তব দৃষ্টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার অভাব। হতাশাবাদী হওয়া মানেই রিজাইন দেওয়া, হেরে যাওয়া, সুযোগগুলো হাতছাড়া হতে দেওয়া, ভালোতর পৃথিবীর স্বপ্ন মুছে ফেলা। দুটো চিন্তাই শেষ অবধি কানাগলি। আমি ব্যক্তিকভাবে, যৌক্তিকভাবে ভাবার চেষ্টা ভালোভাবে করতে চাই, পরিষ্কারভাবে দেখতে চাই সব।

ঠিক যেনো ঋত্বিক ঘটকের মগজের ভাবনার মতো, ‘ভাবো, ভাবা প্রাকটিস করো।’

থিওর প্রথম চলচ্চিত্র রিকন্সট্রাকশন-এ তার মূল কাজ ছিলো একটা বিধ্বস্ত অঞ্চল দেখানো, যা সমগ্র দেশের ভাগ্য হতে চলেছে। এটি নির্মাতার একটা ব্যক্তিগত শোকগাঁথা এমন এক ভূমির জন্য, যা তার অধিবাসীর দ্বারা পরিত্যক্ত হচ্ছে। তার কাছে অসহায়ভাবে দেশত্যাগ করতে থাকা মানুষ দেখা খুবই বেদনার ছিলো; কেননা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তারা চলে গেলে একটা গোটা সভ্যতা অস্তিত্বের হুমকির মধ্যে পড়বে। সেখানকার যে গ্রামীণ সংস্কৃতি, তা কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।

সেই বিষয়টি তুলে ধরতে জনা পাঁচেক কর্মী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে নেমে পড়েন থিও। মাত্র দুজন অভিনয়শিল্পী ছিলো সেখানে; তাদের আবার কেউই পেশাদার নয়। স্বল্প বাজেটে জনা কয়েক জনবল নিয়ে টানা ২৫ দিন দৃশ্যধারণ করেছেন থিও। চাষিদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তাদের সঙ্গেই রাত্রিযাপন করেছেন, সংগ্রহ করা অল্প কিছু খাবার দিয়ে দিন পার করেছেন, আর মালামাল স্থানান্তরের ট্রাকে চড়ে যাতায়াতের পাশাপাশি তাতে বিশ্রামও নিতেন থিও। এভাবেই ত্যাগ আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার একেকটি চলচ্চিত্র নির্মিত।

থিওর দ্য ডেজ অব থার্টি সিক্স কমবেশি সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। এবং আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সেই সময়ের কাহিনি মিলে যায়। একজন স্বৈরশাসকের গল্প, যিনি অনুভূতি গোপন রেখে ভিন্ন অবস্থার ভান করেননি এবং বিবেকজনিত দ্বিধার মধ্যেও পড়েননি। স্পষ্টতই নিজের কর্তৃত্ব প্রকাশ করতেন। নইলে গ্রিস হয়তো আরেকটা স্বৈরতন্ত্রের ভিতর পড়তো না। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ হয়ে গেলো। যাদের অবস্থা কিছুদিন আগেও খারাপ ছিলো, সেই পুলিশের অবস্থা দুম করে ভালো হয়ে গেলো। অনেককে অবসর নিতে বাধ্য করা হচ্ছিলো। একেকটা সরকারি অফিস কব্জা করাই যেনো প্রধান লক্ষ্য। দেশের এরকম পরিস্থিতিতে বড়ো রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সংলাপের চেষ্টায় কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে না। আর শাসকও বুঝে গিয়েছিলো এই অবস্থায় সমঝোতা করলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেকোনো সময় তৃতীয় কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। এই চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট সন্ত্রাসের এমন এক কাল, যেখানে রাষ্ট্র একজন মানুষকে মেরে ফেলছে, আইনের মাধ্যমে তার বিচারের সুযোগ ছাড়াই। থিওর মগজ আসলে এসবের মুখোমুখি দাঁড়াতে চেয়েছে, কারণ তিনি মনে করতেন গ্রিসের নিয়তি মাত্র দুশো পরিবারের হাতে নিয়ন্ত্রিত। আমাদের দেশের নিয়ন্ত্রণটাও তো ঘটনাক্রমে গুটিকয়েক পরিবারের হাতেই!

দ্য ডেজ অব থার্টি সিক্স যেমন একনায়কতন্ত্রের চেহারাটা তুলে ধরে, তেমনই দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স (যা ট্রিলজি অব হিস্ট্রির দ্বিতীয় চলচ্চিত্র) একনায়কতন্ত্রের চরিত্রকে সুনির্দিষ্টতা দেয়। চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্য ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের কথা বলে আর শেষ দৃশ্যে দেখা যায় ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ। অর্থাৎ থিও এখানে উল্টো করে এগিয়ে যাওয়া দেখান। এখানে থিওর মগজের দর্শন প্রতিটি ঘটনার মধ্যে আরো পুরনো ইতিহাস বপনের স্বাধীনতা দেয়। এক্ষেত্রে থিওর একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়, ‘ইতিহাস পরিস্থিতিকে আক্রান্ত করে, বদলায় এবং পরিবর্তিত করে।’ এই চলচ্চিত্রে রাস্তায় আন্দোলনরত মানুষ এবং তাদের প্রতিক্রিয়ার প্রতি থিওর মনোযোগ ছিলো, সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতি নয়। তিনি মনে করতেন, বিপ্লবকে মানুষ নিজস্ব বিপ্লব বলে ভাবলেই মুক্তি দৃশ্যমান হয়। অন্যদিকে সহিংসতা সম্পর্কে থিওর বিশ্বাস, যেকোনো সহিংস ঘটনার মূল শিকড় হচ্ছে কোনো ধরনের যৌন তাড়না।

এবার আসা যাক থিওর চলচ্চিত্রনির্মাণ ভাবনা প্রসঙ্গে। থিও তার চলচ্চিত্রে ধারাবাহিক শট্ নিতেন একেবারেই ব্যক্তিগত ভাবনা থেকে। তিনি মনে করতেন, এটি অনেক বেশি স্বাধীনতা দেয়, যা প্রথাগত সম্পাদনার সঙ্গে মেলে না। তবে লঙ ট্র্যাকিং শটটা থিও ধার করেছেন ইতালির গিওভানি পাস্তোন-এর কাছ থেকে। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে গিওভানি প্রথম এ ধরনের শট্ ব্যবহার করেন। পরে মুরনাউ, ফেদেরিকো ফেলিনি, অরসন ওয়েলস ব্যবহার করেন এ ধরনের শট্। থিও-ও অনেক সময়ই লঙ ট্র্যাকিং শট্ নিয়েছেন। তিনি নিজেও বলতেন, লঙ ট্র্যাকিং শট্ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে তার ভালো লাগে। সাহিত্যে দীর্ঘ ও ছোটো শব্দগুচ্ছের যেমন থাকার অধিকার থাকে; তেমনই চলচ্চিত্রেও ছোটো ছোটো শটের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে নেওয়া শটও থাকার অধিকার রাখে। দীর্ঘ দৃশ্যের ভালোবাসায় আটকে পড়া মানুষ ছিলেন থিও।

দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স নিয়ে আলোচনার সময় থিও বলেন, অনেকেই মনে করে আমার চলচ্চিত্রের শৈলী আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। তবে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় আমি অনেক কিছুই পাল্টে ফেলি। তবে তিনি ক্যামেরা মুভমেন্ট কিংবা ক্যামেরার অবস্থান, শুটিং স্ক্রিপ্টে থাকা নির্দেশনামাফিক রাখার চেষ্টা করতেন; যদিও প্রয়োজন অনুসারে সেটা বদলে নিতেন। এমনকি তার চলচ্চিত্রের নির্দিষ্ট কোনো চিত্রনাট্যও থাকতো না; উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে তিনি নির্মাণ করেছেন ১৬ নম্বর চিত্রনাট্য দিয়ে।

থিও নিজেই বলেছেন, আমি সেই সব নির্মাতার মধ্যে পড়ি, যারা ভীষণ অনিশ্চয়তার মধ্যে চলচ্চিত্রের নির্মাণ শুরু করেন। এমনকি চলচ্চিত্রটির নির্মাণ শেষ হলেও যারা নিশ্চিত হতে পারেন না, আমি তাদের দলে পড়ি। যেসব চলচ্চিত্রের ব্যাপারে তিনি একটু হলেও নিশ্চিন্ত ছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই নিশ্চয়তার ফলে তাকে ভুগতে হয়েছে। তিনি মনে করতেন, কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুতে কোনো ব্যাপারে ঠিক যতোটা নিশ্চিত থাকবে, ঠিক ততোটাই নিজেকে ঠকাবে, প্রতারণার শিকার হবে। সে কারণে অন্যের চোখগুলো দেখতেন থিও। দর্শকের চোখে মূল্যায়ন করতেন, তিনি নিজে আসলে কী নির্মাণ করেছেন। দর্শকের চোখের ওই দেখাটুকু ছাড়া তিনি বুঝতে পারতেন না ভালো করেছেন কি না; এমনকি যা বলতে চেয়েছেন সেটাও ঠিকমতো বলতে পেরেছেন কি না।

শুটিংয়ের সময় তিনি যখন দেখতেন, মনের মধ্যে যা কিছু কল্পনা করেছেন তা বাস্তবে ঘটছে; সে ক্ষেত্রে ভীষণ আনন্দিত হতেন। তবে কল্পনামাফিক দৃশ্য চোখের সামনে না দেখলেই তার মন খারাপ হতো। ফলে একটা অতৃপ্তি থেকেই যেতো; এসব কারণে তার চলচ্চিত্রের স্বাভাবিক সমাপ্তিও দেখা যায় না।

এবারে প্রত্যাশা

বেশিরভাগ তাত্ত্বিক বিষয় সম্পর্কে জানার শুরুতেই সংজ্ঞা এমনকি সেই শব্দের উৎপত্তিস্থল হিসেবে গ্রিসের নাম সবার আগে চলে আসে। তবে চলচ্চিত্রাঙ্গনে গ্রিসের সেই আধিপত্য একেবারেই চোখে পড়ে না। এমনকি বিশ্ব চলচ্চিত্রেও সেভাবে গ্রিসের চলচ্চিত্র কিংবা চলচ্চিত্রকাররা অবস্থান করে নিতে পারেননি; যেভাবে অন্যান্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্থান করে নিয়েছেন তাত্ত্বিকরা। অথচ গ্রিসেও জন্মেছেন থিওর মতো বিখ্যাত নির্মাতা; আজীবন গ্রিসে থেকে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে গেছেন।

অথচ বাংলাদেশি দর্শকের কাছে থিও কিংবা তার চলচ্চিত্র একেবারেই অজানা অচেনা। এমনকি তথ্যভাণ্ডার ইন্টারনেটেও সার্চ দিয়ে বাংলায় থিও সম্পর্কে কোনো তথ্যই পাওয়া যায় না। তবে গুণী এই নির্মাতাকে বাংলাদেশি দর্শকের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মহান ব্রত নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে খাটাখাটুনি করেছেন সৈকত দে। থিওর সবগুলো চলচ্চিত্র নানা জনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে ধৈর্য সহকারে দেখার পর সেগুলো নিয়ে আবার পাঠকের জন্য আলোচনা করেছেন তিনি।

সেখানেও থেমে না থেকে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া থিওর সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করে ভাষান্তর করে সেগুলো একত্রে বই আকারে পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন। এতে করে বাংলাদেশের দর্শকের কাছে থিও এনজেলোপুলুস যেমন কিছুটা হলেও পরিচিত হয়ে ওঠেন; তেমনই থিওকে নিয়ে নতুনভাবে কাজের দুয়ার উন্মুক্ত হয়। সৈকত দের কাছে আশা করা যেতেই পারে, ভবিষ্যতে তিনি থিওর বিস্তর কাজ নিয়ে হাজির হবেন; সেই সঙ্গে থিওর মতো আড়ালে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অন্য নির্মাতাদের কথাও তুলে নিয়ে আসবেন।

বইয়ের নাম                 : তোমাকে বুঝিনি, থিও : থিও এনজেলোপুলুসের সিনেমা সাক্ষাৎকার ও ভাবনা

ভাষাবদল ও গ্রন্থনা         : সৈকত দে

প্রকাশক                     : খড়িমাটি, চট্টগ্রাম

প্রথম প্রকাশ                 : ফেব্রুয়ারি ২০১৮

প্রচ্ছদ                        : খালিদ আহসান

মূল্য                          : ৩০০ টাকা

 

লেখক : সালাহউদ্দিন নীল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে নিতান্ত পেটের দায়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন।

neelanthro@gmail.com

https://www.facebook.com/salahuddin.neel

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন