Magic Lanthon

               

ভূমিকা ও ভাব-ভাষান্তর; আলি আহমেদ নিশান

প্রকাশিত ১৮ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আলফ্রেড জেমস পাচিনো

আমার যা শিক্ষা থিয়েটার থেকেই পেয়েছি

ভূমিকা ও ভাব-ভাষান্তর; আলি আহমেদ নিশান


পুরো নাম আলফ্রেড জেমস পাচিনো। জন্ম নিউ ইয়র্ক শহরে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে। বাবা সালভাতোরে পাচিনো আর মা রোজ পাচিনো’র একমাত্র সন্তান পাচিনো; যিনি আল পাচিনো নামেই অধিক পরিচিত। মাত্র দুই বছর বয়সে বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর পাচিনো বড়ো হন মা ও নানা-নানির কাছে ব্রুনক্সে। ছোটোবেলা থেকেই লাজুক প্রকৃতির পাচিনোর পড়াশোনায় মনোযোগ ছিলো না বললেই চলে। একপর্যায়ে তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। এর ফল হিসেবে ১৭ বছর বয়সে তিনি হাইস্কুল থেকে ড্রপ আউট হন। এই ঘটনার পর পাচিনো ঠিক করেন অভিনয় শিখবেন। অভিনয়ের অভিজ্ঞতা বলতে স্কুলের অনুষ্ঠানে টুকটাক মঞ্চে ওঠা ছাড়া তেমন কিছু ছিলো না। তার ওপর অভিনয়ের সিদ্ধান্ত ঠিক মেনে নিতে পারে না পাচিনোর পরিবার। একপর্যায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি। হাতে কোনো টাকাকড়ি নেই; কিন্তু অভিনয় শিখতেই হবে। তিনি চলে যান নিউ ইয়র্কের হার্বাট বারঘফ (এইচ বি) স্টুডিওতে। ঝোঁকের মাথায় ভর্তি হয়ে যান সেখানে। ভর্তি হওয়ার পর তার জীবন আরো কঠিন হতে থাকে। অভিনয় শেখার খরচ জোগাতে সেসময় তাকে কখনো কাজ করতে হয়েছে ঝাড়ুদারের, কখনো রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের, কখনোবা ডাক পিয়নের। আধপেটা হয়ে পাচিনোকে থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন।

এইচ বি স্টুডিওতেই পাচিনোর সঙ্গে পরিচয় হয় আমেরিকান অভিনয়শিক্ষক চার্লি লাফটন-এর। তার কাছ থেকে পাচিনো অভিনয়ের প্রাথমিক শিক্ষা পেতে শুরু করেন। আর এখানেই তার সুযোগ মেলে নাটকে অভিনয় করার। একে একে তিনি অভিনয় করেন উইলিয়াম সারোয়ান-এর ‘হ্যালো, আউট দেয়ার’, ‘ডাজ অ্যা টাইগার ওয়্যার নেকটাই?’-এর মতো নাটকে।

অনেক কষ্টের পর খানিকটা ভালো সময় পার করছিলেন পাচিনো, ঠিক এই সময়ে তার জীবনে সবচেয়ে দুঃখের ঘটনা ঘটে। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তার মা মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মারা যান। একই বছর মারা যান নানাও। পরের বছর এইচ বি ছেড়ে পাচিনো যোগ দেন অ্যাক্টরস স্টুডিওতে ( পেশাদার অভিনয়শিল্পী, চিত্রনাট্যকার ও নির্দেশকদের সংগঠন)। যেখানে তিনি দেখা পান লি স্ট্রাসবার্গের; যার কাছ থেকে পাচিনো ‘মেথড অ্যাক্টিং’ শেখেন। লি পরবর্তী সময়ে অবশ্য পাচিনোর সঙ্গে কয়েকটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।

অ্যাক্টরস স্টুডিওতে আসার পর পাচিনো প্রচুর নাটকে অভিনয় করতে থাকেন এবং সেসময় অভিনয়শিল্পী হিসেবে তার কিছুটা নামডাক হতে থাকে। তার অভিনয় চোখে পড়ে মার্কিন চলচ্চিত্র প্রযোজক মার্টিন বার্গম্যানের। বার্গম্যান অবশ্য পরে পাচিনোর ব্যক্তিগত ম্যানেজার হিসেবেও কাজ করেন। বার্গম্যান এ সময় প্রবলভাবে পাচিনোকে উৎসাহিত করতে থাকেন চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরুর জন্যে। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে পাচিনোর চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয় মি নাতালি নামের  ছোট্ট একটি চরিত্র দিয়ে। এর তিন বছর পর পাচিনো অভিনয়ের সুযোগ পান বিখ্যাত চলচ্চিত্র দ্য গডফাদার (১৯৭২) এ। এরপর আর তাকে পিছনে তাকাতে হয়নি। একে একে অভিনয় করতে থাকেন সারপিকো (১৯৭৩), দ্য গডফাদার : পার্ট-২ (১৯৭৪), ডগডে আফটারনুন (১৯৭৫), স্কারফেইস (১৯৮৩), সেন্ট অব আ উইম্যান (১৯৯২), হিট (১৯৯৫), ডনি ব্রাসকো (১৯৯৭)-এর মতো বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রে।

গুণী এই অভিনয়শিল্পীর পেশাগত জীবনে প্রাপ্তিও কম নয়। এখন পর্যন্ত আটবার অস্কারের জন্য মনোনীত হওয়া পাচিনো সেন্ট অব আ উইম্যান-এর জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী হিসেবে অস্কার জিতেন। এছাড়াও তিনি একবার বৃটিশ অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, চারবার গোল্ডেন গ্লোব, দুইবার প্রাইমটাইম এমি অ্যাওয়ার্ড, দুইবার স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড ও মঞ্চনাটকের জন্য দুইবার টনি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।

জন্মস্থান নিউ ইয়র্ক শহরের প্রথম মাল্টিপ্লেক্স ‘কোয়াড সিনেমা’তে ‘পাচিনোস ওয়ে’ শিরোনামে আল পাচিনোর রেট্রোস্পেকটিভ হয় ২০১৮-এর মার্চে। সেখানে পাচিনোর সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন মার্কিন অভিনয়শিল্পী জেসিকা কাস্টেইন, ইংরেজ নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান, মাইক নেওয়েল ও মাইকেল র‌্যাডফোর্ড। তাদের সেই আলোচনা অনুলিখন করে ২৯ মার্চ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করে আমেরিকান ওয়েবপোর্টাল ‘ইন্টারভিউ’। ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকের জন্য সেই আলোচনাটি বাংলায় ভাব-ভাষান্তর করা হয়েছে।

জেসিকা কাস্টেইন : সুখ বিষয়টাকে আপনি ঠিক কীভাবে দেখেন?

আল পাচিনো : আমার কাছে সুখ হলো ব্যস্ততা, মনোযোগ আর লেগে থাকা। আমার তো মনে হয় মানুষ তখনই সুখী, যখন সে জানেই না, সে আসলে সুখী কি না। মানে সুখ নিয়ে যখন সে কোনো চিন্তাই করে না। ‘হ্যামলেট’-এ শেক্সপিয়র বলেছেন, ‘Happy, in that we are not over-happy; On fortune’s cap we are not the very button.’ এটা আমার খুব পছন্দের লাইন।

কাস্টেইন : আচ্ছা, কোন ভুলগুলো আপনাকে বার বার সহ্য করতে হয়?

পাচিনো : সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছি; যে কারণে আমি এখন অনেকের অনেক ভুলই সহ্য করে নিতে পারি। ধরো, কেউ একটা ভুল করছে, তার মানে একই ভুল যেকোনো সময় আমিও করতে পারি। তুমি কি জানো, তুমি কী করবে? যদিও এটা সহজ কোনো বিষয় নয়, তারপরও যতোটা পারো মানুষের ভুলগুলোকে এড়িয়ে চলো। আর পারলে তাকে সাহায্য করো।

কাস্টেইন : আপনার অভিনীত কোন চরিত্রটি থেকে আপনি সবচেয়ে বেশি শিখেছেন বলে মনে করেন?

পাচিনো : এটা আসলে বলা কঠিন। কেননা, আমি এমন অসংখ্য চরিত্রে কাজ করেছি। পৃথিবীর অনেক জিনিসই মানুষকে বদলে দিতে পারে, বিশেষ করে চলচ্চিত্র। কারণ একেকটা চলচ্চিত্র ছোটো পৃথিবীর মতো, এখানে তোমাকে ছোটোখাটো যুদ্ধে নামতে হয়; যেখানে নির্মাতা হচ্ছে তোমার জেনারেল। আমি অনেক অভিনয়শিল্পীকে দেখেছি যারা এ যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। এখানে সবাই যোদ্ধা। অভিনয়শিল্পী নারী, পুরুষ যেই হোক, সবাইকে এ যুদ্ধের ভিতর দিয়েই যেতে হয়।

যদি তুমি পারো, তোমার সক্ষমতা থাকে, তবে নিজেকেই চ্যালেঞ্জ করো আর সুযোগ নাও। তবে এখানে ক্যারিয়ার নিয়ে কেউ বেশি চিন্তা করলে তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে, সে পিছলে পড়বে। ক্যারিয়ার হচ্ছে অনেক কিছুর যোগফল মাত্র, আর কিছুই না। ২০ বছর বয়সে যখন আমি কেবল তরুণ একজন অভিনয়শিল্পী, তখন কেউ একজন আমার সঙ্গে ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলেছিলো। সত্যি বলতে কি, আমি সেসময় বুঝতেই পারিনি ওটা দিয়ে কী বোঝায়! আমি তখন জানতামই না ক্যারিয়ার কী! তখন আমাদের গ্রামে, ক্যাফে, থিয়েটারে প্রতি সপ্তাহে আমরা ১৬টা করে নাটকের কাজ করতাম। কখনোবা সেখানে আমাকে কেবল ঝুড়ি বয়ে নিয়ে বেড়াতে হতো। তখন এভাবেই দিন যেতো আমাদের। এটা করেই আমাদের খাবার জুটতো। হয়তো আমি তখন অনেক অগোছালো কাজ করেছি, কিন্তু কখনোই মাথায় আসেনি এতে ঝুঁকি বা অন্যকিছু থাকতে পারে। আমি তখন শুধু ওই কাজগুলোই করে যাচ্ছিলাম।

কাস্টেইন : আচ্ছা, আপনি অভিনয়শিল্পী না হলে কী হতেন?

পাচিনো : ঝুড়ি বুনতাম (হাসি)। আমার এক বন্ধু প্রায়ই বলতো, ‘যদি অভিনয়ের দিক থেকে আমি পিছনে পড়ে যাই, অন্তত ঝুড়ি বানিয়ে এগিয়ে থাকতে পারবো।’ হয়তো এমন একটা চাকরি করতাম, যেখানে আমার সঙ্গে আরো মানুষ কাজ করতো, এই ধরো রান্নাবান্নার কাজ। একটা চলচ্চিত্রে কাজ করার সময় কিছুদিনের জন্যে আমি রাঁধুনির কাজও করেছিলাম। চলচ্চিত্রটির নাম ফ্র্যাঙ্কি অ্যান্ড জনি (১৯৯১)। আমি সেসময় এই বিষয়টি বেশ উপভোগ করেছিলাম বলতে পারো। রেস্তোরাঁয় সবচেয়ে বেশি যেটা ভালো লেগেছিলো, একে অন্যের প্রতি আস্থা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করা। এ ব্যাপারটা আমার মাথার মধ্যে গেঁথে গেছে।

ক্রিস্টোফার নোলান : স্ক্রিপ্ট-নির্ভর নিয়ম-শৃঙ্খলা আর স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ--এই দুইয়ের সমন্বয় করাটা কীভাবে আয়ত্ত করলেন?

পাচিনো : এটা স্ক্রিপ্টের ওপর নির্ভর করে, তবে বার বার রিহার্সেল করতে হয়। অদ্ভুত হলেও আসল কথা হচ্ছে, তুমি যতোবার রিহার্সেল করবে ততোই বেশি স্বতঃস্ফূর্ত হবে। মানুষ অবশ্য এর উল্টোটাই ভাবে। অবশ্য যে অভিনয়শিল্পীরা রিহার্সেলে অভ্যস্ত নয়, তারাই এগুলো বলে থাকেযখনকার কাজ, তখন স্বতঃস্ফূর্ত হলেই হলো। আর এভাবেই এখন অনেকে বেশিরভাগ চলচ্চিত্র করে যাচ্ছে। রিহার্সেলের জন্য তাদের কোনো সময়ই নেই। অথচ রিহার্সেলে তুমি একটা কাজ নানাভাবে দেখতে পারবে। একটা উদাহরণ দিই, সিডনি লুমেট (মার্কিন চলচ্চিত্রনির্মাতা) তোমার সঙ্গে কোনো কাজ করলে স্ক্রিপ্টের ওপর তিন সপ্তাহ শুধু রিহার্সেলই করাবে। কেউ একজন একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘পুনরাবৃত্তিই নাকি আমাকে স্বতঃস্ফূর্ত রাখে।’ একটা জিনিস ঘরে বসে পড়া, আর বাইরে সে কাজটা ফুটিয়ে তোলার মধ্যে পার্থক্য আছে।

সিডনির সঙ্গে কাজ করার সময় (সারপিকো, ১৯৭৩ ও ডগ ডে আফটারনুন, ১৯৭৫) উনি বলতেন, ‘শট্ পেলাম; তবে তেমন যুতসই হলো না। চলো, আরেকটু কাজ করা যাক।’ সেখানে মানে একেবারে সেটেই তিনি এভাবে বলতেন। এরপর তিনি আমাকে আর বাকি অভিনয়শিল্পীদের দিয়ে আবার ওই একই কাজ করাতেন। অবশ্য আমাদেরও তেমন কোনো সমস্যা হতো না। কেননা, দেখা যেতো আমরা কয়েক সপ্তাহ, মাস ধরে রিহার্সেল করে যাচ্ছি, ফলে চরিত্রের সঙ্গে আমরা ততোদিনে ভালোভাবেই পরিচিত হয়ে গেছি। এভাবে আমরা একই শট্ তিনভাবে দিতাম। উনি তিনটার মধ্যে সুন্দর সমন্বয় করে ফেলতেন। স্ক্রিপ্টজুড়ে অবশ্য এই কাজ করতে হতো না; গুরুত্বপূর্ণ নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় করতে হতো। একবার ১৫ মিনিটের এ ধরনের একটা দৃশ্য ছিলো। আসলে এভাবেই কাজগুলো উঠে আসে, সোনার চেয়ে মূল্যবান একেকটা দৃশ্য উঠে আসে।

নোলান : আপনি একাধিকবার সিডনি লুমেট, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা ও ব্রায়ান ডে পালমা’র সঙ্গে কাজ করেছেন। এ ধরনের আলাদা মেজাজের নির্মাতাদের সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য ঠিক রাখতেন কীভাবে?

পাচিনো : যখন নবীন ছিলাম তখন বুঝতে খুব সমস্যা হতো। তখন প্রায়ই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যেতাম। আসলে সবাই তো আলাদা। তবে এহেন পরিস্থিতিতে নির্মাতাদের সঙ্গে রিহার্সেল খুব কাজে আসে। এতে করে নির্মাতাদের চেনা যায়। এমনকি তারা কীভাবে কাজ করে তা দেখেও শেখা যায়। আবার কখনো কখনো কারো সঙ্গে কাজ করতে না পারলেও ভালো বোঝা যায় চলচ্চিত্রটা। আর শেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, সেই কাজটি করা। একসময় আমি নিজে যখন চলচ্চিত্র শুরু করলাম, তখন আমি সেখান থেকে অনেক কিছু শিখেছি। অন্য নির্মাতাদের কাজের ঢঙ চিনতেও তখন সমস্যা হয়নি। এই ব্যাপারটা হচ্ছে ‘সমানুভূতি’র।

নোলান : মঞ্চ কিংবা চলচ্চিত্র যেকোনো একটাকে বেছে নিতে বললে আপনি কোনটাকে নিতেন? আর কেনোইবা নিতেন?

পাচিনো : আমি থিয়েটার দিয়েই শুরু করেছিলাম, আর তাই থিয়েটারেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তবে চলচ্চিত্রেও আমার অনেক কাজ হয়ে গেছে, তাই এটাতেও এখন আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। থিয়েটারে সরাসরি দর্শকের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া হয়। ফলে সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় দর্শকের। তাছাড়া কেনো জানি আমার মনে হয়, থিয়েটারে কাজ করা একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য অনেক ক্ষেত্রেই স্বাচ্ছন্দ্যের। শেক্সপিয়রের নাটকগুলোতে কাজ করতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য লাগে। কারণ এসব নাটক অনেক বেশি সমৃদ্ধ, এখানে অনেক কাজ করার থাকে।

নোলান : আপনার আজকের অর্জন অনেক নতুন অভিনয়শিল্পীর জন্যেই আকাঙ্ক্ষিত। তো অভিনয় জগতে এসে আপনি কি কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন; সেখানে কি আপনি পৌঁছাতে পেরেছেন?

পাচিনো : শোনো, একটা জিনিস আমি সবসময় মানি; এটা আমার স্বভাবও বলতে পারো, আমি কখনো নিজের প্রতি খুব বেশি নিষ্ঠুর হই না। নিজের জন্যে খুব বেশি কিছু দাবি করারও চেষ্টা করি না; অস্বস্তি লাগে। তুমি জানো? কেউ একজন হয়তো সবসময়ই এই কারণটা খোঁজে। আমি কেনো এটা করছি? নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যে। প্রত্যেকটি চরিত্র যখনই আমি করি, আমি পুরোপুরি করার চেষ্টা করি, সেই চরিত্র যেমনই হোক অবহেলা করি না। অনেকবারই এমন হয়েছে, আমার চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও কোনো কাজ পুরোপুরি করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এবং এখানেই মনে হয়, কিছু একটা আমাকে করতে হবে। নিজের কাছেই এ পরিস্থিতিকে আমার রহস্যজনক মনে হয়। চরিত্রটি যেভাবে ফুটিয়ে তোলা প্রয়োজন আমি কখনো কখনো সেখানে পৌঁছাতে পারিনি। অন্য কেউ হয়তো এই চরিত্রটা করলো, তখন হঠাৎ-ই সেখানে নতুন কিছুর সৃষ্টি হয়। আসলে জীবনের সবকিছুই একে অন্যের সঙ্গে জড়িত।

নোলান : একবার আপনার এক সহকর্মী আমাকে বলেছিলেন, আপনি নাকি যেকোনো পরিস্থিতিতে অভিনয় করতে পারেন; যেকোনো জায়গায় রিহার্সেল চালিয়ে যেতে পারেন। তো আপনি এভাবে প্রয়োজন মতো চরিত্রে ঢুকে পড়েন কীভাবে?

পাচিনো : আসলে আমি এমনটাই করি। আমি খুব ছোটো বয়সেই এমনটা করতাম। আর কৈশোরে তো নিউ ইয়র্কের রাস্তায়ও করেছি। আমি এটা খুবই উপভোগ করি। এটা করতে আমার মজা লাগে। অভিনয়শিল্পীরা সাধারণত ভালো কাজ খুব বেশি পায় না। এরকম একটা কাজ পেতে কোনো অভিনয়শিল্পীকে ভাগ্যবান হতে হয়। এখন কোনো অভিনয়শিল্পী যদি তার পছন্দের চরিত্র না পায়, তবে সে কী করবে? আমার মনে হয়, এজন্য সেই অভিনয়শিল্পীর গ্রামে যাওয়া প্রয়োজন। এ কারণেই আমি কিছু নির্দিষ্ট জায়গা পছন্দ করি, যেখানে অভিনয়শিল্পী হিসেবে যাওয়া যায়। একজন অভিনয়শিল্পীর এমন একটি জায়গা খুঁজে বের করা জরুরি। একবার যদি সে ধরনের একটা জায়গা পাওয়া যায়, যেখানে নিজের একটা জায়গা থাকবে এবং সেখানে গিয়ে আপনি রিহার্সেলসহ নিজেকে তৈরির রসদ পাবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে নানা মাত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষা পছন্দ করি, চেষ্টা করি এর মধ্য দিয়ে কিছু বের করে আনতে। আমার মনে হয়, যখন আমি কোনো চরিত্রের মধ্যে নিজেকে দেখতে পাবো, সেটা করতে আমার ভালো লাগবে।

মাইক নেওয়েল : আপনি যখন বড়ো হচ্ছিলেন আপনার বাড়ির কর্তা কে ছিলো?

পাচিনো : আমি এমন একটা পরিবারে বড়ো হয়েছি যেখানে তিন জন নারী আর আমার নানা থাকতেন--আমার মা, তার ছোটো বোন আর আমার নানা-নানি। তারাই রাজত্ব করতেন আর কী! তারা সবাই একেকজন রাজা ছিলেন। দক্ষিণ ব্রুনক্স মানে যেখান থেকে আমি এসেছি, সেখানে খুব উত্তেজনাপূর্ণ দিন গেছে আমার। আমরা গরিব ছিলাম বটে; তবে বেশ ভাগ্যবান। কারণ পরিস্থিতি খারাপ হতে না হতেই আমি সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। আমি রাস্তায় নেমেছি, দুঃসাহসিক অভিযান করেছি। বলতে গেলে বড়ো হওয়া আমার জন্যে যথেষ্ট কঠিন ছিলো। তবে আমি কিছু মানুষের কাছে আজীবন ঋণী। প্রথম আমার নানি, যিনি সংসারটা চালাতেন; তারপর আমার মা। তারা তুলনামূলক অল্পবয়স্কই ছিলেন। আর আমি তো তখন খুবই ছোটো। সেসময়টার কাছে আমি মারাত্মকভাবে ঋণী। ঋণী আমার নানার কাছেও।

নেওয়েল : তারা কি আপনাকে অভিনয়ে উৎসাহ দিতো?

পাচিনো : ব্যাপারটা মোটেও সেরকম ছিলো না। তারা আমাকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে মেনে নিয়েছিলো। তারা সবসময়ই বলতো, ‘আমি অভিনয়শিল্পী’। কিন্তু আমার প্রাথমিক উৎসাহটা এসেছে স্কুল থেকে। শিক্ষকরা আমার মাকে এ নিয়ে বলতো। আমি তাদের ভুলবো না। তবে আমি কখনোই জানতে পারিনি, ওরা মাকে কী বলতো। কিন্তু সবসময় তারা নাকি ভালো ভালো কথা বলতো। তার পরেও আমি স্কুল ছেড়ে দিলাম। হাইস্কুল ছেড়ে আমি কাজের খোঁজে বের হলাম। তাই আমার যা শিক্ষা ওই থিয়েটার থেকেই পেয়েছি; আর পেয়েছি কিছু মানুষের কাছ থেকে। যেমন চার্লি লাফটন। তিনি আমার অন্যতম অভিভাবক ও বন্ধু। তারপরে আছেন লি স্ট্র্যাসবার্গ ও মার্টিন বার্গম্যান। আমি তাদের নাম উল্লেখ না করে আসলে কিছুই বলতে পারি না। মার্টিন বার্গম্যান ছিলেন একজন প্রযোজক এবং সর্বোপরি আমার ব্যবস্থাপক। তিনি আমাকে সন্তানের মতো দেখতেন। তিনি আমাকে যা বলতেন তা আর কেউ বলতো না। যখন আমার বয়স ২৫, তিনি আমার নাটক দেখতে আসেন। তারপর আমাকে বললেন, ‘আমি তোমাকে স্পন্সর করবো।’ এরকম আর কেউ বলেনি।

নেওয়েল : অভিনয় যখন শুরু করলেন, তখন কি ভেবেছিলেন ঠিক কোন ধরনের অভিনয়শিল্পী হতে চান? মানে আপনার স্বপ্নগুলো কেমন ছিলো?

পাচিনো : আমি আসলে সবকিছুকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। যা শিখছিলামসাহিত্য থেকে শুরু করে শহর, শহরের মানুষ আর নিজেদের জগৎসবকিছুরই যেনো প্রেমে পড়ে যাচ্ছিলাম। আমি দুর্দান্ত রকমের একজন পাঠক ছিলাম। দরিদ্রতা ছিলো, কিন্তু যুবক বয়সে এর মধ্য দিয়ে যাওয়া কোনো ব্যাপারই ছিলো না, এগুলো মানিয়ে নিতে হয়। এক খণ্ড পিৎজাও তখন অনেক দূর পথের সঙ্গী হয়। আর সেসময়টাতে এক টুকরো মাংস পাওয়া তো বিশাল ব্যাপার ছিলো। এক টুকরো মাংসের জন্য তখন দিতে হতো ১.১৯ ডলার। ওই বয়সটাতে যা পেয়েছি, তা খেয়েই বেঁচে থাকা যেতো। তখন মনে হতো এটা কোনো ব্যাপারই না। পিৎজার প্রতিটি কামড়ের নির্যাস যেনো শুষে নিতে হতো।

নেওয়েল : আদৌ কি কখনো আপনার কারণে কোনো শট্ নষ্ট হয়েছে কিংবা কোনো দৃশ্য দৃঢ়ভাবে করার পরও এমন অনুভুতি কখনো হয়েছে?

পাচিনো : আমার মনে হয়, এমন কিছু সময় আসে যখন আপনি নিজেকে একটি বলয়ের ভিতর অনুভব করেন, যেভাবে তারা বলে আর কী। আপনি যে কাজ করেন, কখনোই সেটাকে সঠিক বা ভুল হিসেবে তকমা দেওয়া যায় না। কিন্তু যখন আপনি একটি বলয়ে জড়িয়ে যান এবং বুঝতে পারেন, সবচেয়ে ভালো কাজটুকুই আপনি করছেন, বিশেষ করে কাজটা যদি হয় থিয়েটারের বলয়ে। এবং পরের রাতেও আপনাকে যদি একই কাজ করতে হয়, সেক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হয়, আগের কাজটির পুনরাবৃত্তি বা একইভাবে দ্বিতীয়বার করতে না যাওয়া। কেননা যদি আপনি মনে রাখেন এটা আগে করা হয়েছিলো, তাহলে আর সেটা হবে না। আপনার কাজের উৎস কী ছিলো; আপনি যা করেছেন, তা করতে কী আপনাকে বাধ্য করেছিলো? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আপনার জানা না থাকে, তবে তা ভুলে যাওয়াই উত্তম।

থিয়েটারের এই যে চ্যালেঞ্জ, এটাকেই আমি ভালোবাসি। এর মতো আর কিছুই হয় না। তাই আপনি সেখানে যান এবং নিজেকে প্রকাশ করুন।

মাইকেল র‌্যাডফোর্ড : থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের পার্থক্যের জায়গাগুলোকে গভীরভাবে বোঝে এরকম অল্প যে কয়েকজন অভিনয়শিল্পী রয়েছে, আপনি তার মধ্যে অন্যতম। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, আপনি এখনো দুর্দান্তভাবে দুটোই চালিয়ে যাচ্ছেন। মার্চেন্ট অব ভেনিস (২০০৪)-এ আমরা একসঙ্গে কাজ করার পর কিছুদিনের মধ্যেই আপনি নিউ ইয়র্কের একটি থিয়েটারে শাইলক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা আমি কখনোই ভুলতে পারবো না। একেবারে দুই রকমের দুটো চরিত্র। এতো অল্প সময়ে কীভাবে দুটোকেই সামলে নিলেন?

পাচিনো : প্রথমত, চরিত্রটি নিয়ে আমার বোঝাপড়া ও একধরনের বোধ ছিলো। আমি মনে করি, নির্মাতা হিসেবে আপনি চলচ্চিত্রটি নির্মাণে খুবই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আপনি তো দুর্দান্ত এক শেক্সপিয়রিয়ান চলচ্চিত্র বানিয়েছেন। এখন অন্য এক যুগে এসে পার্ক প্রোডাকশনের অধীনে একই চরিত্র করতে গিয়ে দেখলাম নাট্যপরিচালক ড্যানিয়েল সুলিভানও অনন্য এক সম্পদ। ড্যানিয়েল সত্যিই আমাকে খুব সাহায্য করেছিলো মঞ্চে চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে। আমি চলচ্চিত্র থেকে মঞ্চে যাওয়ার ক্ষেত্রে তার ওপর অনেকটা নির্ভর করেছি। আরেকটা কথা না বললেই নয়। আমি দেখলাম, চরিত্রটা ভালো হওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ হলো রিহার্সেল। রিহার্সেলই অনেক কিছু বদলে ফেলতে পারে, যদি কোনো চরিত্র সম্পর্কে একটু বোঝাপড়া থাকে।

র‌্যাডফোর্ড : চলচ্চিত্রে উপস্থিতি আর মঞ্চে উপস্থিতির মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে, একটু বলবেন কি?

পাচিনো : দেখো, এক্ষেত্রে চলচ্চিত্র এবং মঞ্চ, দুটোর ওপরই তোমার একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এতে করে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। নির্মাতার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আমি মনে করি, একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য নির্মাতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। বোস্টনে থাকার সময় আমি ‘রিচার্ড-থ্রি’ তে কাজ করছিলাম; তখন আমার বয়স ৩০-এর কাছাকাছি। তখন দ্য গডফাদার (১৯৭২) মুক্তি পেয়েছে, আমি সবে কিছুটা পরিচিতি পেয়েছি। কামান থেকে গোলা বিস্ফোরণের মতোই কেবল যেনো আমিও বের হলাম, জীবনে বড়ো ধরনের পরিবর্তন চলে আসলো। জানোই তো জীবনে কখনো কখনো এমন হয়, আমার তখন তেমনটাই হচ্ছিলো। তাই আমি তখন বোস্টনে থিয়েটারে ফিরে এসেছি। কারণ আমি তখন থিয়েটারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলাম। বিখ্যাত হলে মানুষ যে ধরনের জীবন যাপন করে, আমি তাই করছিলাম। তো আমি তখন রিচার্ড চরিত্রটি করি এবং আমার মনে হয়, ওটা আমার জীবনের সবচেয়ে পেশাদার চরিত্র ছিলো। চার্লি লাফটন সেসময় আমার সঙ্গেই ছিলেন এবং নানাভাবে নানা কথা বলে তিনি আমাকে সাহায্য করছিলেন। আমার তখন ভীষণ জ্বর। ওই পরিস্থিতির মধ্যেই আমি বর্বরভাবে কেমন জানি সবকিছুই করছিলাম। মদ্যপান থেকে সবকিছুই চলছিলো পুরোদমে। তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছো পরিস্থিতিটা। আমি শুধু সেখানে ছিলাম, আর যা ঘটার সব ঘটছিলো আমার সঙ্গে।

আমি প্রথম দৃশ্য শেষ করে পরের দৃশ্যের জন্যে ফিরেছি। দর্শক সারিতে চোখ বুলাতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম; দেখি দুই তৃতীয়াংশ দর্শক উঠে চলে গেছে। বাড়িয়ে বলছি মনে হতে পারে, কিন্তু সত্যিই দুই তৃতীয়াংশ দর্শক ছিলো না। আমি শুধু বললাম, ‘ওই লাল সিটগুলোর কী ব্যাপার (হাসি)!’ এরপর আমি কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজ করলাম আর চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করতে শুরু করলাম। সব ভালোভাবে শেষও হলো। এবার আমার যাওয়া দরকার। কিন্তু চার্লি বললেন, এখনই চলে যেও না। অবশ্য নাটকটির নির্দেশক ডেভিড হুইলার’কে আমি খুবই ভালোবাসতাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘একটা গির্জা পেয়েছি, নাটকটা আমরা ওখানে করবো।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে।’ আমরা গির্জায় এলাম এবং কাজ শুরু করলাম।

যেকোনোভাবেই হোক আমার জীবনের অনেক কিছু এইটুকু সময়ের মধ্যেই ঘটছিলো। ঠিক এই সময়ে ‘টাইম ম্যাগাজিন’ আমার ব্যাপারে অনেকখানি মনোযোগী হয়, যা আমাকে দেশের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করে। কিন্তু সেসময় আমি আসলে উপলব্ধি করতে পারিনি, আমার জীবনে তখন এমন কিছু ঘটছিলো, যার মধ্য দিয়ে আমি জীবনে প্রবেশ করছিলাম। একদিক থেকে বলতে গেলে, এটা ছিলো আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটা বড়ো ঘটনা। আমি ওটা আর কখনোই করিনি। বোস্টনের ওই গির্জায় আর যেতে পারিনি আমি। আমি সেই নাটকটা নিউ ইয়র্কে করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারি নিউ ইয়র্কের মঞ্চটা আসলে সেই গির্জা নয়, একটা বড়োসড়ো মঞ্চ।

সূত্র: https://www.interviewmagazine.com/film/jessica-chastain-christopher-nolan-al-pacino-retrospective;  retrieved on: 23.07.2018


ভূমিকা ও ভাব-ভাষান্তর,

আলি আহমেদ নিশান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

nissan.mcj26@gmail.com

https://www.facebook.com/profile.php?id=100007251015129


বি. দ্র. এই সাক্ষাৎকার ম্যাজিক লণ্ঠন ১৬তম সংখ্যা , জানুয়ারি ২০১৯ প্রথম প্রকাশ হয়েছে।

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন