অমিতাভ রেজা চৌধুরী
প্রকাশিত ১১ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণশৈলী
অমিতাভ রেজা চৌধুরী

শেষ কিস্তি.
দর্শক : বাংলাদেশের বেশিরভাগ সিনেমাই দক্ষিণ ভারতের ফরমেটে তৈরি, কলকাতার ফরমেটে তৈরি। বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো ফরমেট আছে কি না? থাকলে, সেটা নিয়ে বলুন।
অমিতাভ রেজা চৌধুরী : বাংলাদেশের সিনেমার কোনো আলাদা জাত নাই। মানে সিনেমার কোনো দেশ নাই। আলাদা কোনো ফরমেট নেই। সিনেমা একটি আন্তর্জাতিক ভাষা। আপনি আপনার গল্প বলবেন। আপনার মতো করে গল্প বলবেন। আপনার ভাষায় গল্প বলবেন। আর দক্ষিণ ভারতীয় বা অন্য কিছু নকল করে কিছু সিনেমা নির্মাণ হয়, এটা যেকোনো নকল জিনিসের মতো করে একটা চর্চা মাত্র। এর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য জড়িত।
দর্শক : ফিল্ম আর কম্পোজিশনের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি?
অমিতাভ : ফিল্ম আর কম্পোজিশনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। কারণ ফিল্ম এক জিনিস আর কম্পোজিশন আরেক জিনিস। মানে দুইটা দুই জিনিস। আলু আর কলা এক নয়।
দর্শক : বাংলাদেশের সিনেমার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
অমিতাভ : উজ্জ্বল।
দর্শক : আমরা যখন বাংলাদেশি সিনেমা দেখি, সেটাকে নাটক মনে হয়। কেমন জানি সিনেমা হয়ে ওঠে না। এরকম একটা কথা প্রচলিত আছে। তো সিনেমা দেখে নাটক মনে হয় কেনো?
অমিতাভ : এটা ভুয়া কথা। আপনার কেনো নাটক লাগে জানেন? নাটকের অভিনেতারা যখন সিনেমায় অভিনয় করে, তখন সেটাকে দেখে নাটক মনে হয়। আর কোনো সমস্যা নাই। শাকিব খান অভিনয় করলে সিনেমা লাগে, সেটা যতোই যাত্রার মতো অভিনয় করুক না কেনো; আর আমাদের জয়া আহসান অভিনয় করলে নাটক লাগে; কারণ আমরা তার নাটকই বেশি দেখেছি। তার মানে সমস্যাটা আপনার।
কাজী সুস্মিন আফসানা, শিক্ষক, রা বি : আপনি বলতে চাচ্ছেন এর বাইরে কোনো সমস্যা নাই?
অমিতাভ : এর বাইরে সিনেমা হয়ে ওঠা নিয়ে সমস্যা হতে পারে। এ সিনেমাটা ভালো না, এটা খারাপ সিনেমা। তবে এটা নাটক কি না, যাত্রা কি না, সেটা কোনো বিষয় না। এটা খারাপ সিনেমা। আজকে টেলিভিশনের জন্য করা কোনো একটা কাজ কোনো কারণে সেখানে সম্প্রচারিত হলো না, সেটা সিনেমাহলে গিয়ে চালায় দেন, এটা কোনো ব্যাপার না। সেটা সিনেমা হিসেবে চলবে। চলবে না? কেউ তো বলবে না, এটা নাটক। যদি এটা না বলা হয়, টেলিভিশনের জন্য বানানো, তাহলে এটা কি হবে? সিনেমা। কথা হচ্ছে, এটা খারাপ সিনেমা। এটা আপনাকে বিনোদন দিতে পারেনি। সিনেমা হিসেবে আপনাকে বিনোদন দিতে পারেনি। এটা আপনার কাছে ভালো লাগেনি। কিন্তু সিনেমা হয়নি, নাটক হয়েছে, বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়।
কাজী সুস্মিন : নাটক, সিনেমা হিসেবে বিনোদিত করে কখনো কখনো।
অমিতাভ : না, না, সিনেমা হিসেবে নাটক আপনাকে কখনো বিনোদিত করে না। কিন্তু নাটক অবশ্যই আপনাকে বিনোদিত করে। তবে তা সিনেমা হিসেবে নয়। আপনি যেকোনো ইমেজকে সিনেমাহলে দেখেন -- এখন তো আর সিনেমাহলই তেমন নাই, আমরা ফোনসেটে দেখি, যেকোনো মাধ্যমেই দেখি না কেনো -- যেভাবে দেখতে চান, যে ভিজ্যুয়াল লাইনে/অ্যাঙ্গেলে দেখতে চাচ্ছেন, তা যখন আপনি পাচ্ছেন না; তখন সেটা খারাপ সিনেমা। সিনেমা অডিও ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন। প্রথম কথা, এটা নাটক নয়। এটা নির্ভর করে আপনার ওপর। যেটা ডেইলি সোপ সেটা ডেইলি সোপই, যেটা টেলি প্লে সেটা তাই-ই। কিন্তু এটা কোনোভাবেই নাটক নয়। প্রত্যেকটার আলাদা নাম আছে। সিনেমাহলে দেখার পর সিনেমা থেকে আপনি যে বেসিক রস চান, সেটা আপনি পান না। সেকারণে এটা ভালো লাগে না।
কাজী সুস্মিন : তাহলে আমরা সিনেমা এবং নাটক সম্পর্কে যে ধারণাগুলো নিয়ে বড়ো হচ্ছি, বেসিক সমস্যা সেখানেই?
অমিতাভ : অবশ্যই, সেখানেই গণ্ডগোল আছে। কারণ টিভি নাটকের সিঙ্গেল এপিসোড নিয়ে আমাদের যে চর্চা আছে, সেই চর্চাই হচ্ছে প্রধান সমস্যা। নাটকের সিঙ্গেল এপিসোড কখনো টেলিভিশনে সম্প্রচার হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের দেশে টেলিভিশন নাটকের সিঙ্গেল এপিসোডের একটা চর্চা তৈরি হয়েছে। যা প্রধান সমস্যা।
দর্শক : চলচ্চিত্রের কোনো কোনো ভাষা ধর্মীয় সম্প্রদায়, জাতি বা কারো অনুভূতিতে আঘাত করে। এটা কতোটা যৌক্তিক?
অমিতাভ : কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা অবশ্যই যৌক্তিক নয়।
দর্শক : আচ্ছা, কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে কোন জিনিসটি মাথায় রাখা দরকার -- দর্শকের চাহিদা নাকি নিজের অভিব্যক্তি?
অমিতাভ : অবশ্যই নিজের অভিব্যক্তি। দর্শক স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তুত হয়, যখন আপনি চিন্তা করতে শুরু করেন। হোয়েন ইউ থিঙ্ক, ইউর অডিয়েন্স ইজ রেডি। তাই দর্শক অনুযায়ী আপনি চিন্তা করবেন না। আমি বিশ্বাস করি না, দর্শক কী চিন্তা করছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি কী চিন্তা করছি; আমি কোন গল্পটা বলতে চাই দর্শকের কাছে। যদি আমি আমার গল্পে বিশ্বাস অটুট রাখি, তবে আমি আমার গল্পটা বলতে পারবো।
মো. হারুন-অর-রশিদ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রা বি : আয়নাবাজি’কে আপনি কতোটা সময়োপযোগী চলচ্চিত্র মনে করেন? একজন নির্মাতা হিসেবে আয়নাবাজি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
অমিতাভ : আমি যদি আমার দেখা প্রিয় পাঁচ হাজার চলচ্চিত্রের তালিকা করি আয়নাবাজি হবে পাঁচ হাজারতম। এটা একটা মিডিওকার ফিল্ম। আমার প্রথম চলচ্চিত্র। আমি আমার অভিজ্ঞতাটা শেয়ার করার চেষ্টা করেছি। যে গল্পটা আমার স্ক্রিপ্টে লেখা ছিলো, সেটা আমি আমার মতো করে বলার চেষ্টা করেছি। এবং এটা কিছু হয় নাই। কিছু মানুষের হয়তো ভালো লেগেছে; নির্মাণশৈলীর কারণে হতে পারে বা কী কারণে আমি ঠিক জানি না। আর মূল্যায়ন করার কথা যদি বলেন, ইটস অ্যা ব্যাড ফিল্ম। ইটস নট অ্যা গ্রেট ফিল্ম।
দর্শক : লাইটিং চলচ্চিত্রের ভাষা তৈরি করে কি না?
অমিতাভ : অবশ্যই। এটা দিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি হয়।
দর্শক : আপনার পরবর্তী চলচ্চিত্র রিকশা গার্ল সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন কি?
অমিতাভ : এ নিয়ে আমি নিজেও খুব বেশি জানি না ভাই। রিকশা গার্ল নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। খুবই যুদ্ধ করছি। কীভাবে বানাবো, কী ফর্মে বানাবো, কী ধরনের শৈলী হবে -- সেটা নিয়ে প্রতিদিন চর্চা করে যাচ্ছি। এখনো কোনো পথ পাইনি, সিনেমাটা ঠিক কীভাবে বানাবো।
দর্শক : নির্মাণশৈলী বা গল্প কোনটি সিনেমাকে সিনেমা হিসেবে পরিচয় করায়?
অমিতাভ : দেখেন, নির্মাণশৈলী কিন্তু আলাদা কিছু না। নির্মাণশৈলী হচ্ছে আপনি ন্যারেটিভকে কীভাবে উপস্থাপন করেন। এটা আলাদা কিছু না যে, আপনার সিনেমার গল্পটা ভালো, নির্মাণ ভালো না; কিংবা নির্মাণ ভালো গল্পটা ভালো না। দুইটা মিলিয়েই আপনার ভিতরে ইমোশন ইভোক করে। সেটাই এটার কাজ। বা আপনার চিন্তায় যেটা তৈরি হয়, সেটাই সিনেমার কাজ।
নির্মাণশৈলী আর গল্পকে আলাদা করতে গেলে তা বিপদের কথা হয়ে যাবে। যেমন ধরেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ সিনেমা কারা বানায়? হলিউড। কেনো না। ওদের সিনেমার নির্মাণশৈলী আছে, গল্প নাই। ওরা একই গল্প বার বার বানায়। সারাজীবনে ওদের ভাষা ছাড়া, অন্য ভাষায় যারা কথা বলে তারা খারাপ। এতোদিন ওরা চিৎকার করেছে ভিয়েতনাম খারাপ, তারপর চিৎকার করেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন খারাপ। আর এখন বলছে, মুসলিমরা খারাপ। ওরা সারাজীবন এই গল্পই বার বার বলে যাচ্ছে। কিন্তু ওদের কাছে আমরা কী শিখছি? ওরা সুন্দর করে গল্প বলতে পারে। দে আর ব্রিলিয়ান্ট স্টোরি টেলার। ব্রিলিয়ান্ট অ্যাক্টরও ওখানে আছে। সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ।
কিন্তু আমি যদি আমার দেখা সেরা ১০টা সিনেমার কথা বলি, তার মধ্যে ট্যাক্সি ড্রাইভার (১৯৭৬) আর টেল মি লাইস (১৯৬৮) ছাড়া একটা নামও বলতে পারবো না। এটা অবশ্য একান্তই আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। ওরা এতো সিনেমা বানিয়েছে -- আর যাই হোক সিনেমাটা ওরা বানাতে পারেনি। এটা ওদের সমস্যা। কিন্তু নির্মাণশৈলীর কথা যদি বলেন, তাহলে তো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নির্মাণশৈলী হলিউডের কাছে আছে। বা আমাদের এই এলাকার নির্মাণশৈলী বলিউডের কাছে আছে। অনেক ভালো সিনেমা বানাতে পারে ওরা। এতো ভালো ক্যামেরার কাজ, এতো সুন্দর অভিনয়, এতো সুন্দর দেখতে যে, আস্ত বড়ো একটা গুহা বানিয়েছে রামলীলায়! এখন কি না বানিয়েছে, পদ্মাবত। এর নির্মাণশৈলীও অদ্ভুত সুন্দর। তাই বলে কি এটি সিনেমা!
কাজী সুস্মিন : কোন কারণে এটা খারাপ, আপনার উত্তরটা যদি দেন।
অমিতাভ : আমার কাছে এটা খারাপ, কারণ চলচ্চিত্র ইমোশন ইভোক করে, কিন্তু এটা আমার কাছে কোনো কিছু কানেক্ট করে না। এটা আমার কাছে খুবই ফেইক লাগে। এটার ভাবনা, এটার ভঙ্গি, যে উদ্দেশ্যে এটাকে কানেক্ট করার চেষ্টা করে, তার কোনো কিছু আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। পলিটিকালি আমি কোনোভাবে এটাকে কানেক্ট করতে পারি না। এটা ভালো কোনো গল্প বলে না। অনেক সুন্দর নির্মাণশৈলী। কিন্তু এটা কতো সুন্দর করে বানানো হয়েছে, তার চেয়ে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, এটাতে কী আছে। কী ইমোশন আমাকে ইভোক করছে। কী চিন্তা আমাকে ইভোক করছে। এগুলো আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কাজী সুস্মিন : আপনি যখন দর্শক তখন?
অমিতাভ : আমি যখন দর্শক তখনকার কথাই বলছি।
কাজী সুস্মিন : আপনি একটু আগে বললেন, চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে আপনি প্রথম নিজের চিন্তাকে নেওয়ার চেষ্টা করবেন, দর্শকের কথা না। কিন্তু আপনি দর্শক হিসেবে আরেকজনকে খারিজ করে দিচ্ছেন। আবার এই ফিল্মটাই যখন আমি দেখছি, আমি ভাবছি, এটা এতো আনন্দ দিচ্ছে আমাকে।
অমিতাভ : তার মানে এটা আপনার কাছে ভালো সিনেমা।
কাজী সুস্মিন : এটা ভালো বা মন্দ লাগার বিষয় না।
অমিতাভ : দর্শক হিসেবে আপনার কাছে কোনো সিনেমা ভালো লাগতেই পারে। আপনাকে সেটা বিনোদিত করতে পারে। তবে আমার অধিকারের জায়গা থেকে বা আমার সিনেমা দেখার জায়গা থেকে আমি এটাকে খারিজ করতে পারবো। কারণ এটা আমাকে কানেক্ট করে না। আমাকে এন্টারটেইন করে না। যেমন ধরেন, পৃথিবীতে অনেক ধরনের সিনেমা আমরা দেখি, কিন্তু আমার দেখা ব্যক্তিগতভাবে যদি ভালো সিনেমার কথা বলি, মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা, স্টকার ...। এই কয়টা সিনেমা আমাকে সবচেয়ে বেশি কানেক্ট করে। আমার কাছে সেটাই সিনেমা, যেটা আমাকে কানেক্ট করে। কেনো কানেক্ট করে, সেটা বলতে গেলে প্রত্যেকটা সিনেমা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে হবে। সেটা আলাদা বিষয়।
এসব সিনেমার ভাবনা, নির্মাণ, সবকিছু -- একটা সিনেমার ক্ষেত্রে আমি যা যা বিশ্বাস করি, যা কিছু কানেক্ট করার চেষ্টা করি -- তার সবই আমি মেঘে ঢাকা তারায় পাই। আমি এই সিনেমাটি কমপক্ষে একশো বার দেখেছি। কারণ এর সবকিছু আমাকে কানেক্ট করে। ইট ইজ সামথিঙ দ্যাট আই কানেক্ট, দ্যাট আই বিলিভ। আমার পলিটিকাল পজিশন কী সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমি একজন দর্শক হিসেবে যখন দেখি, তখন আমি কোন অবস্থান থেকে তা দেখার চেষ্টা করি; সেটাকে আমি বাদ দিতে পারবো না। এবং ওই পজিশন থেকে যদি আমি দেখার চেষ্টা করি, তখন ওই সিনেমাটার ভাবনা যেনো আমার চিন্তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। তখন এটা আমার কাছে ভালো সিনেমা হয়ে ওঠে।
কাজী সুস্মিন : আপনি যখন আপনার ভাবনা, দর্শন বাংলাদেশের দর্শকের কাছে পৌঁছাতে যাবেন; বাংলাদেশের দর্শক কী শিক্ষায় শিক্ষিত সেটা আপনাকে জানতে হবে। তার পরেই আপনাকে তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। আপনি যদি দর্শককে খারিজ করে দেন, তাহলে কী করে হবে?
অমিতাভ : অবশ্যই। আমি দর্শককে কখনোই খারিজ করিনি।
কাজী সুস্মিন : সেটা তো একটা প্রশ্নেই এসেছে।
অমিতাভ : তার উত্তরে আমি বলেছি, কোনটা আমি আগে চিন্তা করবো -- দর্শকের চাহিদা নাকি আমার চিন্তা। আমার কাছে দর্শকের চাহিদাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু দর্শক গুরুত্বপূর্ণ। এখন ধরুন, দর্শক দেখতে চায় পর্ন। আমি তো আর পর্ন বানাতে যাবো না। একজন শিল্পীর ক্ষেত্রে তার নলেজ/জ্ঞান, য়েস্থেটিকস এবং অনুশীলন বা চর্চা গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটা জিনিস দিয়ে একজন আর্টিস্ট তৈরি হয়। আমি অন্যের কথা বলতে পারবো না। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার নলেজ কোথা থেকে তৈরি করি? আমার নলেজ তো আকাশ থেকে পড়ে নাই। আমি ছোটোবেলা থেকেই সাহিত্য চর্চা করতাম। আমি আসলে ইলিয়াস (আকতারুজ্জামান ইলিয়াস) স্যারের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমার নলেজ মূলত ছিলো সাহিত্যের মধ্যে। ইলিয়াস স্যার পড়তে পড়তে আমি মার্কসবাদ পড়া শুরু করি। এরপরে আমার অনুপ্রেরণা ছিলো চে গুয়েভেরা, কর্ণেল তাহের। এই জিনিসগুলো পড়তে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, বাংলাদেশকে তথা আমার দেশকে বুঝতে গেলে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চর্চা হচ্ছে পলিটিকাল চর্চা। আর সেটা হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আপনি যদি সত্যিই চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চান, আপনাকে আপনার দেশের মানুষকে বুঝতে হবে। আপনি যদি আপনার দেশের মানুষকে বুঝতে না পারেন, আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারবেন না। এ কারণেই একজন শিল্পী/নির্মাতা হয়ে উঠতে নলেজ এবং প্র্যাকটিস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কাজী সুস্মিন : এ কারণেই হয়তোবা আয়নাবাজি’র চেয়েও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে আপনি ‘মার্চ মাসের শুটিং’ নামে যে টেলিভিশন নাটকটি করেছিলেন, ওটা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো বলে আমার কাছে মনে হয়। তাই কি?
অমিতাভ : ওটা তো একটা টেলিভিশন ন্যারেটিভ। টেলিভিশন ন্যারেটিভ আর সিনেমার গ্রহণযোগ্যতা বিচার করতে পারবো না। তবে ডেফিনেটলি আমার কাছে ওইটা বেটার ফিল্ম। আয়নাবাজি কতো দর্শক দেখেছে, কতো টাকা আয় করেছে সেটা বড়ো কথা না। তার চেয়ে ‘মার্চ মাসের শুটিং’ আমার কাছে ভেরি ক্লোজ টু মাই হার্ট।
দর্শক : ছোটোবেলা থেকেই কি আপনার চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার ইচ্ছা ছিলো নাকি হঠাৎ করে?
অমিতাভ : না, হঠাৎ করে ইচ্ছা হয়নি। আবার ছোটোবেলা থেকেও ইচ্ছে ছিলো, এমন নয়। খুব ছোটোবেলায় অনেক কিছু হওয়ার ইচ্ছা ছিলো। নৃবিজ্ঞানও একবার পড়তে চেয়েছিলাম। তবে বলতে গেলে, ঋত্বিকের সুবর্ণরেখা দেখার পরেই আসলে ইচ্ছে হয়েছিলো চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার।
দর্শক : আয়নাবাজি’র পরিচালক হিসেবে বাংলাদেশে নির্মিত চলচ্চিত্রের ব্যবসার বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
অমিতাভ : বাংলাদেশের সিনেমা এখন একটা অদ্ভুত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতারা আসছে। তারা বড়ো সিনেমা বানানোর চেষ্টা করছে। আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলের অবস্থা খুবই খারাপ। কারণ কোনো সিনেমাই ভালোভাবে পরিবেশনের সুযোগ নেই। আমাদের সিনেমাহল অনেক কমে গেছে এবং যাচ্ছে। তবে সিনেমা দেখানোর প্লাটফর্ম তৈরি হচ্ছে অন্য জায়গায়। আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম, ইউডি প্লাটফর্ম তৈরি হচ্ছে। সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে এক্সিবিশনের। মানে ডিস্ট্রিবিউশনের নতুন চ্যানেল তৈরি হচ্ছে। যেহেতু ডিস্ট্রিবিউশনের নতুন চ্যানেল তৈরি হচ্ছে, তাই চলচ্চিত্র নির্মাণ, উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরেন, চলচ্চিত্র জন্মের শুরুতে যদি নিকেলোডিয়ান (Nickelodean, ব্যবসায়িকভাবে কোনো থিয়েটারে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর স্থান। ১৯০৫ থেকে ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এসব স্থানেই চলচ্চিত্র প্রদর্শন হতো। তখন টিকেটের মূল্য ছিলো পাঁচ সেন্ট) চালু না হতো, তাহলে হয়তো চলচ্চিত্রের এমন উন্নতি আমরা দেখতাম না। এটা একশো বছর আগে যেমন সত্য, এখনো সত্য।
পুঁজিবাদী সমাজে অটো মোবাইল ইন্ড্রাস্টি যেভাবে উন্নতি করেছে, চলচ্চিত্র ইন্ড্রাস্ট্রিও ঠিক সেভাবেই উন্নতি করেছে। এটা সেম কাইন্ড অব ডিভিশন লেবার, সেম কাইন্ড অব প্রোডাকশন, ডিস্ট্রিবিউশন। এবং এটা সরাসরি গণমানুষের কাছে বিক্রি করা যায় টিকিটের মাধ্যমে। তাই বলা যায়, চলচ্চিত্র একটি সোসিও-পলিটিকাল ফেনোমেনা। ফলে যদি এটার এক্সিবিশন, ডিস্ট্রিবিউশন ঠিক না থাকে, তাহলেও আসলে ভালো চলচ্চিত্র উৎপাদন সম্ভব না।
অ্যাকাডেমিকালি সম্ভাবনার কথা যদি বলি, আমাদের দেশে নতুন জায়গা তৈরি হয়েছে। আপনি অবশ্যই সিনেমা নির্মাণ করতে পারেন; আপনার সিনেমা যদি কোনো জায়গায় দেখানোর ব্যবস্থা নাও হয়, মনে রাখবেন কেউ না কেউ আপনার জন্য বসে আছে কোনো জায়গায়, সেই সিনেমা ডিস্ট্রিবিউট করার জন্য। আপনি ফোনেও আপনার সিনেমা দেখাতে পারেন। আমি এটাতে কোনো অসুবিধা দেখি না। সিনেমাহলে সনাতনী ধারায় সিনেমা দেখা যেমন বাস্তবতা, আবার এখানে বসেও আপনি সিনেমা দেখতে পারেন সেটাও আজকের দিনের বাস্তবতা। এটাও সিনেমা। পৃথিবীর অনেক সিনেমা ইউডি প্লাটফর্মে চালু আছে। যেমন, আপনি যদি দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা বঙ জুন-হু’র ওকজা’র (Okja, 2017) কথা বলেন, সিনেমাটা কান-এ গেলে কর্তৃপক্ষ খুবই বিরক্ত হয়। কারণ এই সিনেমাটা তো সিনেমাহলের জন্যই বানানো হয় নাই (২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জুন ওকজা অনলাইনভিত্তিক ভিডিও প্রদর্শনীর প্লাটফর্ম নেটফ্লিক্স-এ মুক্তি পায়)। তাহলে এটা কীভাবে ফেস্টিভালে যেতে চায়! কিন্তু এখন আসলে এগুলো হয়ে গেছে। এটা কোনো ব্যাপার নয়। কোনো সিনেমা আসলে সিনেমাহলের জন্য বানানো নাকি মোবাইলফোন সেটে দেখানোর জন্য বানানো, সেটা এখন আর কোনো ব্যাপার নয়। এখন হাজার হাজার বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে সিনেমাতে। অথচ সেগুলো সিনেমাহলে দেখানোই হচ্ছে না। তার পরও ওগুলো সিনেমা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সব ফেস্টিভালে যাচ্ছে। তাই সিনেমার জার্নিটা আমার মনে হয় এখনকার সময়ে খুব আলাদা হয়ে গেছে।
কাজী সুস্মিন : আপনার পরবর্তী চলচ্চিত্র কবে দেখছি? সেটা সম্পর্কে কিছু বলুন।
অমিতাভ : আমার পরবর্তী চলচ্চিত্র রিকশা গার্ল-এর শুটিং করবো সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। আমরা যদি চলচ্চিত্রটির কাজ শেষ করতে পারি, আমার ইচ্ছা আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে (২০১৯ খ্রিস্টাব্দ) এটি রিলিজ দেওয়ার। এটা আন্তর্জাতিকভাবেও রিলিজ পাবে। রিকশা গার্লও আয়নাবাজির মতোই একটি প্রজেক্ট; যেটা আমার কাছে এসেছে পরিচালনা করার জন্য। নিজের সিনেমা যদি বলি একদমই ব্যক্তিগত, সেটা হয়তোবা রিকশা গার্ল-এর পরে করবো। সেটার নাম পুনরুজ্জীবন। খুব সম্ভবত সেটাই হবে আমার প্রথম চলচ্চিত্র।
দর্শক : আমি একটা গল্প দেবো, সেটা নিয়ে পরিচালক কাজ করবেন। কিন্তু পরিচালকের লিভিং অ্যা পার্ট বলতে কিছু আছে কি?
অমিতাভ : ঠিক ওইভাবে নাই। সমস্যা হয় কী, নাটকের যে ফর্ম, যে ভাষা, যে ব্যাখ্যা, সেটা সিনেমায় নিয়ে যদি আমরা কম্পেয়ার করতে যাই, তাহলে অনেক জটিলতার মধ্যে পড়তে হবে। একটা উদাহরণ দিই, সিনেমাকে আসলে সিনেমার মতো করে ব্যাখ্যা করতে হয়। নাটকের যে মিজ-অঁ-সেন, সেটাকে আপনি নাটকে সেভাবেই ব্যবহার করেন। এটাকে অবশ্যই আলাদাভাবে বর্ণনা করতে হয়। সুতরাং নাটকের বিষয়গুলো নিয়ে সিনেমাকে বিচার-বিশ্লেষণ করাটা আমার কাছে খুবই টলোমেটিক ডিস্ক্রাবশন মনে হয়। যেমন ধরেন, পিটার ব্রুক-এর ‘মহাভারত’। ওটা তো ফিল্মে দেখেছেন না আপনারা? এটা তো ফিল্ম, আপনি ইচ্ছা করলে সিনেমাহলে গিয়ে দেখতে পারেন। কিন্তু এটা অবশ্যই থিয়েটার। এবং থিয়েটার থেকেই শুরু করেছে। তবুও এটা আপনারা ফিল্মের মতো করে দেখেন। এবং প্রোপারলি শট্ ডিভিশন করা, প্রোপার্টি তো একই।
আসলে সিনেমাকে এক জায়গায় একইভাবে দেখার চেয়ে ডিফারেন্ট ডিফারেন্ট এক্সপেরিমেন্ট থেকে দেখাটা জরুরি। আমরা কখনো ‘মহাভারত’কে সিনেমা বলি, শাকিব খানের সিনেমাকেও সিনেমা বলি। সিনেমা তো বিভিন্ন ধরনের হয়ে যাচ্ছে। এটা নির্ভর করে আপনি পরিচালক হিসেবে, দর্শক হিসেবে কোন সিনেমা বানাবেন, কোন সিনেমা দেখবেন। এটা আপনার পছন্দ। এটাকে কোনো একটা ব্যাখ্যার মধ্যে ফেলে দেওয়া ঠিক নয় বলে আমার কাছে মনে হয়।
সুজন নাজির, শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, রা বি : আপনি দীর্ঘদিন বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছেন। তারপর প্রথম চলচ্চিত্র আয়নাবাজি। আয়নাবাজি নির্মাণের যে ভাষা, সেটার স্ক্রিপ্ট তো আপনি তৈরি করেননি, আপনি কেবল চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন। আপনি আয়নাবাজি’র স্ক্রিপ্ট হাতে পেয়ে কতোটুকু ছেঁটে ফেলে দিলেন এবং নির্মাণের জায়গা থেকে কতোটুকু রেখে দিলেন? আপনি গল্পে কতোটুকু প্রাধান্য দিয়েছেন আর নির্মাণে কতোটুকু? একজন নির্মাতাকে গল্পে কতোটুকু আর নির্মাণে কতোটুকু প্রাধান্য দিতে হয়?
অমিতাভ : আমার কাছে একটা সিঙ্গেল লাইনের গল্প ছিলো। তো এই সিঙ্গেল লাইনের গল্পটা যখন আমরা স্ক্রিপ্ট আকারে করেছি -- প্রথমত যেটা করতে হয় -- গল্প লেখার পর একজন ফিল্মমেকারের কাজ হয় সেটা নিয়ে গবেষণা করা। অর্থাৎ গল্পটাতে কী কী আছে। আয়নাবাজি‘র গবেষণার বিষয় ছিলো অভিনয়, অভিনয় ব্যাপারটা কী, অভিনয় কীভাবে করে, না কী? তারপর জেলখানার জীবন এবং ঢাকা শহর। এই তিনটা জিনিস নিয়েই আমাকে গবেষণা করতে হয়েছে। যেমন, এখন আমরা গবেষণা করছি রিকশা গার্ল, রিকশা পেইন্টিং, রিকশাচালকের জীবন এগুলো নিয়ে। তারপরে চরিত্র নির্বাচন, স্ক্রিন টেস্ট, লোকেশন নির্মাণ -- সবকিছু।
প্রথমত, এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা করতে হয়। তারপর প্রতিদিন লোকেশনে যাওয়া এবং লোকেশন আর্ট। অর্থাৎ কী কী কালার লোকেশনে আছে। উই সেম্পল এইটটি এইট লোকেশন আর্ট এবং আমরা প্রতিটার কালার দেখেছি। এরপরে আমরা সিদ্ধান্ত নিবো ফিল্ম লুক কী হবে। তারপর গবেষণা করা হবে ফিল্ম লুক নিয়ে। পৃথিবীতে ফিল্ম লুক নিয়ে কী কী কাজ হয়? কালার কীভাবে কাজ করে, কন্ট্রাস্ট কীভাবে কাজ করে? আমাদের দেশের কালার কীভাবে কাজ করে? আমরা ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণা করছিলাম। এভাবে আমরা লুক ঠিক করি। কালার টোন, স্কলার টোন কীভাবে কাজ করে, ওয়ার্ন কীভাবে কাজ করে? এর মানে সবকিছু নিয়ে গবেষণার দরকার হয়।
আপনারা আয়নাবাজি’তে দেখবেন ভালো লুক হলো পেস্ট। আর খারাপের লুক দেখবেন লাল। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সব খারাপের রঙ লাল। এজন্য আয়নাবাজি করতে গিয়ে আমি তিন মাস লাল কোনোকিছু পরি নাই; স্পর্শও করি নাই। এরপর কথা হয়েছিলো, আমরা আসলে কী বলতে চাই। আয়নার একটা নিজস্ব জার্নি আছে; ইনার জার্নি। অভিনয় অভিনেতার রক্তে টগবগ করে -- এটা হচ্ছে ইনার জার্নি। আর আউটার জার্নি হচ্ছে -- ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সুন্দর জীবন কাটাতে চাওয়া। ইনার জার্নি হচ্ছে অভিনেতা। এটা বেসিকালি হিরো’জ জার্নি। হিরো’জ জার্নি কীভাবে, কোন ফরমেটে করা? এই স্ক্রিপ্টটাকে তখন আমার সেই ফরমেটে করতে হয়েছে। হিরো অর্ডিনারি লাইফ থেকে কল ফর অ্যাকশনে যায়, তার মেন্টর থাকে; ট্রান্সফরমেশন হয়। এবং সে ফাইনালি রিটায়ার করে তার জায়গা থেকে। তার মানে স্ক্রিপ্ট নিজের মতো করে তৈরি করে নিতে হয়।
সাধারণ গল্পে আছে হিরো জেল খাটবে। আর আমি বলতে চেয়েছি, ঢাকা শহরের ভিতরে আরেকটা ঢাকা শহর আছে। গল্প থেকে এটা আমার নেওয়া। আমি যখন গল্প বলতে যাবো, আমি এর লোকেশন, ফ্রেম, লেন্সসহ সবকিছু নিশ্চিত হয়ে নেবো। একটা লোকেশনকে নিজের মতো করে নির্মাণ করে নেবো। আমি ঠিক করে নেবো, কোনটা কীভাবে কোন অ্যাঙ্গেলে শট্ নেওয়া হবে। আয়নাবাজি নিয়ে আমাদের তিন বছর কাজ করতে হয়েছে। এর মধ্যে প্রি-প্রোডাকশন ছিলো একবছর। পোস্ট প্রোডাকশন একবছর। রিকশা গার্ল-এর স্ক্রিপ্ট নিয়ে আমরা তিন বছর ধরে কাজ করছি। এখন এসে অন্তত একটা বিশ্বাস তৈরি হয়েছে, আমরা এটা নিয়ে কাজ করতে পারবো। এটাই কাজ করার পদ্ধতি।
দর্শক : শটের অ্যাঙ্গেল নিয়ে যদি কিছু বলতেন। আমি আসলে জানতে চাচ্ছিলাম সিনেমায় শট্ নেওয়ার সময় ১৮০ ডিগ্রি ...।
অমিতাভ : ১৮০ ডিগ্রি কী? ১৮০ ডিগ্রি হচ্ছে -- থিয়েটারে দেখবেন এক পাশে দর্শক থাকে আরেক পাশে মঞ্চ। তেমনই সিনেমাও তো এক পাশ থেকে দেখতে হয়। আপনি তো ওই পাশে কখনো যাবেন না। চরিত্র আপনার সামনে যে লাইন তৈরি করে, ফিল্মের ভাষায় ওটাকে ইমাজিনারি লাইন বা ১৮০ ডিগ্রি বলে। আপনি এ বিষয়ে ইউটিউবে সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন।
আহমেদ মাসুম, সাবেক শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, রা বি : আয়নাবাজি নির্মাণ করতে গিয়ে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা সঙ্কটের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো কি?
অমিতাভ : সবই প্রতিবন্ধকতা। আমি আমার চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাই, এটাই সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধকতা। আমি কী চাই, এটাই সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধকতা। এর চেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধকতা আর কী হতে পারে।
দর্শক : একজন পরিচালককে ক্যামেরা সম্পর্কে কতোটা জানতে হয়?
অমিতাভ : কিচ্ছু জানতে হয় না। জিরো। আল্লাহর কসম আমি কিছুই জানি না। আপনাকে একজন ভালো ক্যামেরাম্যান ভাড়া করতে হবে। আপনাকে জানতে হবে, একজন ভালো সিনেমাটোগ্রাফার কে/কী? আপনি শুধু গল্প জানবেন, ভালোবাসা জানবেন, এদেশের মানুষকে জানবেন। বাকি সব লোক ভাড়া করবেন। আপনি যতো টাকা দিতে পারবেন, ততো ভালো কাজ হবে। কারণ এটা সিনেমা। টাকা বেশি যার দাম বেশি তার; ভালো কাজ তার।
আপনি সিনেমা বানাবেন তো আপনি সিনেমা দেখবেন না! দেখতে দেখতেই কিছুটা হয়। আমার যেমন প্রেম হয়ে যায় সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে। ভালো সিনেমাটোগ্রাফার না হলে তো আমার বিপদ। আমাকে সিনেমাটোগ্রাফারের প্রেমে পড়তে হয়। এটা না হলে আমার হয় না। কারণ ওর সঙ্গে আমার এতো বেশি কথা বলতে হয়, ফিলোসোফিকালি এতো কথা বলতে হয় যে, ভালো না হলে হয় না। আর একজন ভালো সিনেমাটোগ্রাফারকে ফিলোসোফিকালি রিচ হতে হয়। এটা শুধু ফ্রেমিং করা নয়। যেমন, আমার প্রিয় সিনেমাটোগ্রাফার বিজয় কার্তিক। ওর সঙ্গে আমি একটা বিজ্ঞাপন শুট করেছিলাম। আমরা এক সঙ্গে তিন দিন ছিলাম। আমরা শুধু কিউবা নিয়ে কথা বলেছি। এর বাইরে সিনেমা নিয়ে কোনো কথা হয়নি। বিজ্ঞাপন বানিয়েছি গ্রামীণফোনের। শট্ নেওয়ার সময় ও কী করবে, কোন লেন্স ব্যবহার করবে সেটা আমি জানি না। সিনেমা ইজ ভেরি এস্পিরিচুয়াল জার্নি হোয়েন ইউ আর শুটিং।
দর্শক : লেন্স তো অনেক প্রকার হয়। কিন্তু কোন লেন্স কখন ব্যবহার করা হবে সেটা তো জানতে হবে, না কি?
অমিতাভ : এটা নির্ভর করে ফটোগ্রাফার কীভাবে নির্দেশনা দেয় তার ওপর। এটা একটা কমনসেন্স। একটা ফ্রেম করার পর আপনি অবশ্যই জানবেন লেন্স কী; এটা দরকার এটার জন্য। এটা জানাও তো কঠিন কিছু না। আটটা লেন্স বুঝতে আর কতোক্ষণ লাগে। আপনি কাল আসবেন, আমি এক ঘণ্টা সময় নিবো। এর মধ্যেই শেখা যাবে।
কাজী মামুন হায়দার, শিক্ষক, রা বি : এখানে তো বেশিরভাগই তরুণ। আপনি তরুণদের নিয়ে কিছু বলুন।
অমিতাভ : তরুণদের নিয়ে একটাই কথা আছে বলার, ফিল্ম একটি অপার সম্ভাবনার জায়গা। এর দুইটা দিক -- এক, প্রফেশনাল; দুই, ভিজ্যুয়াল য়েস্থেটিক, বর্ণনার দিক থেকে। ক্যারিয়ার হিসেবে যদি আপনি সিনেমাকে নিতে চান, তবে সিনেমার অনেকগুলো ডিসিপ্লিন আছে; আপনি আপনার ডিসিপ্লিনটা পছন্দ করে নিবেন। ডিরেকশন দেওয়ার আগে কোনো একটা ডিসিপ্লিনে আপনি পারদর্শিতা অর্জন করে নিবেন, এটাই শ্রেয়। অ্যাকাডেমিকালি আমরা যা বলি, কোনো কিছু প্রফেশনালি নিতে হলে কোনো একটা টেকনিকাল বিষয় আপনার জানা জরুরি। সেটা আর্ট ডিরেকশন, সাউন্ড, সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং যেকোনো একটি হতে পারে। সবাই প্রোডিউসার হতে পারে। এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে কোনো একটা বিষয়ে আপনার পারদর্শিতা থাকলে ক্যারিয়ার হিসেবে সিনেমা আপনার জন্য নিরাপদ হবে। ডিরেকশন এমন একটা জিনিস -- আপনি ভালো না খারাপ ডিরেক্টর -- যদিও আপনি এটা জানেন না। সেটা কেউ জানে না। সুতরাং আপনাকে তো কাজটা শিখতে হবে, জানতে হবে, করতে হবে। কারণ এটাকে আপনি ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চান। তাই বেস্ট হচ্ছে সিনেমার অন্য যে দিকগুলো আছে তার কোনো একটাতে নিজেকে ডেভেলপ করা।
বাংলাদেশে প্রোডিউসিংয়ে স্কিলড মানুষ খুব কম আছে। তাই এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর সাউন্ডের লোক একদম নাই-ই বলা চলে। সিনেমাটোগ্রাফি মোটামুটি চলে। তবে এডিটিংয়ে তেমন কোনো লোকই নাই। বাংলাদেশে হাতেগোনা দুই-তিন জন ছাড়া ভালো এডিটর নাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে কাজের জন্য এর বাইরে পাই না কাউকে। এমনকি প্রোডাকশন ডিজাইন করার মতো লোকও আমাদের নাই। পোস্ট-প্রোডাকশন, গ্রেডিংয়েও লোক নাই। দেখুন, একটা সিনেমার পিছনে অনেক লোকের নাম থাকে। এই লোকগুলো কারা? এই লোকগুলো তো লাগবে। এরা না থাকলে তো সিনেমা হবে না। এই যে বিশাল ক্রু দরকার, এটা নাই আমাদের। সিনেমা শুধু একজন পরিচালক দিয়ে হয় না। এই ক্রুদের দরকার আছে। এরাই মূলত সিনেমাটা নির্মাণ করে। তাই এগুলোতে নাম লেখান।
ক্যারিয়ার ছাড়া অন্য কথা যদি বলি। পৃথিবীতে ভালো সিনেমা প্রচুর হচ্ছে। ভালো সিনেমা দেখতে হবে। সিনেমাহলে গিয়ে সিনেমা দেখার চর্চা করতে হবে। আর আমরা কী সিনেমা বানাবো, এটা নির্ভর করবে আমরা দেশকে, দেশের মানুষকে কতো ভালোবাসি, কতোটা কানেক্ট করতে পারি তার ওপর। এটা বোঝার একমাত্র উপায় হচ্ছে আমাদের দেশ সম্পর্কে পড়াশোনা করা। আমাদের দেশের সাহিত্য, কবিতা, পেইন্টিং -- এই সবগুলোর চর্চা না করলে এ সম্পর্কে অবগত হওয়া যায় না, বোঝা যায় না আমি কী উপস্থাপন করবো। এ প্রসঙ্গে একটা কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ -- হোয়াট ইজ নেসেসারি টু বি অ্যা ফিল্মমেকার? রিড রিড রিড অ্যান্ড রিড।
এটা এমন নয় যে, আপনি দুইশো সিনেমা, পাঁচশো সিনেমা দেখলেন আর আপনি ফিল্মমেকার হয়ে গেলেন। সিনেমা বুঝতে, নির্মাণ করতে, সমাজকে বুঝতে হলে আপনাকে অনেক পড়াশোনা করতে হবে। কারণ প্রতিটা শিল্পমাধ্যমই পলিটিকাল। প্রতিটি চলচ্চিত্রই খুবই পলিটিকাল। চলচ্চিত্রের একটা আলাদা পলিটিকাল মোটিভেশন আছে। যেটা খুব সহজে আমরা বুঝতে পারি না। তবে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে তা বোঝা যায়। রাষ্ট্রকে বুঝতে হলে, বিশ্বকে বুঝতে হলে আপনাকে চলচ্চিত্র বুঝতে হবে। আর সেজন্য পড়াশোনা করতে হবে। যদি তা না করেন, তবে আপনি এমন কিছু অখাদ্য নির্মাণ করবেন, যা এই সমাজ, রাষ্ট্রকে কিছুই দিতে পারবে না। চলচ্চিত্র নির্মাণ করাটা আমার কাছে এখন আর এক্সাইটিং মনে হয় না। তার চেয়ে চলচ্চিত্র দেখতে, চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে অনেক ভালো লাগে। তারপরও লাইটেনশনের বাইরে থাকতে পারি না। এভাবেই জীবন কাটাই।
amitabhcinema@icloud.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন