Magic Lanthon

               

কাওসার বকুল

প্রকাশিত ০৯ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে

সীমান্তহীন শরণার্থীর বয়ে চলা জীবনের গল্প

কাওসার বকুল

জীবন যখন শুকায়ে যায়

করুণাধারায় এসো।

সকল মাধুরী লুকায়ে যায়,

গীতসুধারসে এসো।

 ... আপনারে যবে করিয়া কৃপণ

কোণে পড়ে থাকে দীনহীন মন,

দুয়ার খুলিয়া হে উদার নাথ,

রাজ-সমারোহে এসো।

বাসনা যখন বিপুল ধুলায়

অন্ধ করিয়া অবোধে ভুলায়

ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র,

রুদ্র আলোকে এসো।

সহজ মানুষ ভজে দেখেন দিব্যজ্ঞানে

আমি আশাবাদী কিংবা হতাশায় ভোগা টাইপ লোক নই। আশাবাদী হওয়ার মানেই হলো, বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার অভাব; অন্যদিকে হতাশাবাদী হওয়ার মানেই হাল ছেড়ে দেওয়া, হেরে যাওয়া, সুযোগ হারিয়ে ফেলা, উন্নত পৃথিবীর স্বপ্ন মুছে ফেলা। ব্যক্তিগতভাবে আমি যৌক্তিকভাবে সবকিছু চিন্তার চেষ্টা ভালোভাবে করতে চাই, পরিষ্কারভাবে সবকিছু দেখতে চাই¾কথাগুলো গ্রিসের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা থিওডোরাস এনজেলোপুলুসের। পরীক্ষানিরীক্ষা চালানোর জন্যই হয়তো চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুতে তিনি আধেয় সম্পর্কে নিশ্চিত থাকতেন না; এমনকি চলচ্চিত্র নির্মাণের শেষে এসেও কোনো কোনো ব্যাপারে তিনি অনিশ্চিতই থেকে যেতেন। বিষয়গুলোর মূল জায়গায় না পৌঁছে কাছাকাছি পৌঁছেছেন বলেও ধরে নিতেন। সে কারণে হয়তো তার কোনো চলচ্চিত্রেই স্বাভাবিক সমাপ্তি দেখা যায় না; একটা পর্যায়ে গিয়ে চলচ্চিত্রটি শেষ করে দেন। থিও নিজেও বহুবার বলেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ তার কাছে একেকটা বিষয়ে অনুসন্ধানের মতো; অনেকটা সমুদ্রযাত্রার মতো। সেই অনুসন্ধানে সুনির্দিষ্ট অনেক কিছুই তিনি বুঝে উঠতে পারেন, আবার কিছু বিষয়ে অতৃপ্তিও থেকে যায়।

   একেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুর দিকে যেসব ধারণা থাকে, থিও ধীরে ধীরে সেগুলো বদলে ফেলেন; অবশেষে দেখা যায় প্রথম দিককার ধারণার ঠিক উল্টোটা হয়ে গেছে। আবার চলচ্চিত্র নির্মাণ শেষেও যেসব ব্যাপারে অসন্তুষ্টি কাজ করে, প্রেক্ষাগৃহে সেই চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী দেখে হয়তো আগের চিন্তা অনেকটাই শাণিত হয়। এসব কারণে নির্দিষ্ট কোনো চিত্রনাট্য থাকে না তার চলচ্চিত্রে। দৃশ্যধারণের সময় তিনি প্রয়োজনানুযায়ী বার বার তা বদলান। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে-এর কথা বলা যেতে পারে; ১৬ নম্বর চিত্রনাট্য দিয়ে এটি নির্মিত।

   চলচ্চিত্রের বিষয় নির্বাচনের দিক থেকেও থিও অন্যদের চেয়ে আলাদা। নিজের মনের মধ্যে যেসব ব্যাপারে চিন্তাভাবনা হয়, যেসবের উত্তর তিনি খুঁজে পান না, কিংবা নিজের যেসব কথা অন্যদের জানানো দরকার বলে মনে করেন; তা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে অন্যদের জানাতেন। এজন্য অভিনয়শিল্পীদের কোনো দৃশ্যে অভিনয়ের ব্যাপারে তিনি তেমন একটা নির্দেশনাও দিতেন না। বরং নিজের কল্পিত কোনো দৃশ্য অভিনয়শিল্পীরা ঠিক কীভাবে ফুটিয়ে তোলে, সেদিকে তাকিয়ে থাকতেন। কল্পনামাফিক দৃশ্যধারণ সম্ভব হলে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হতেন; যদিও বেশিরভাগ সময় এর বিপরীতই হতো। অন্যদিকে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে তিনি অপেক্ষা করতেন দর্শকের অনুভূতি জানার। দর্শকের অনুভূতি থেকে তিনি বুঝতে পারেন, চলচ্চিত্রটি ঠিক কেমন হয়েছে¾ভালো নাকি খারাপ; এমনকি যা বলতে চেয়েছেন সেটাও ঠিকমতো বলা হয়েছে কি না।

থিওর চলচ্চিত্র পথচলা

থিওডোরাস এনজেলোপুলুসের জন্ম ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ এপ্রিল, গ্রিসের অ্যাথেন্সে। থিও এমন একসময় জন্মগ্রহণ করেন, যখন গ্রিসের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রান্তিকাল পার করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে নানা সঙ্কটের কারণে একদিকে নেতৃত্বের পালাবদল ঘটছে, অন্যদিকে রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে রূপ নিয়ে আবারও সেটা ফিরে গেছে রাজতন্ত্রে। থিওর জন্মের পরের বছরই সেনাপ্রধান মেট্যাক্যাস সামরিক আইন জারি করে একনায়ক শাসনতন্ত্র কায়েম করেন।

   এমন পরিস্থিতিতে মাত্র নয় বছর বয়সে বড়ো ধরনের ধাক্কা পান থিও। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরের ঘটনা। গৃহযুদ্ধের মধ্যেই অ্যাথেন্স শহর থেকে আটক করা হয় তার বাবা স্পাইরোসকে। স্পাইরোসকে হত্যার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় শহরের বাইরের পেরিসটেরি এলাকার একটি ফাঁকা মাঠে। পরে সেখানে অন্য বহু মানুষের মরদেহের মধ্যে নিজের বাবাকে খুঁজেছেন থিও। সেই ঘটনা থিওর শিশুমনে দাগ কেটে যায়। জীবদ্দশায় আর সেই ঘা শুকায়নি তার মন থেকে। সে কারণেই হয়তো থিও নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতে বার বার ফিরে আসে স্পাইরোস চরিত্র।

   ইউনিভার্সিটি অব অ্যাথেন্সে আইন বিষয়ে ভর্তি হন থিও। এই সময় কিছুদিন সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণের জন্য যেতে হয় থিওকে। প্রশিক্ষণ শেষ করে থিও আর অ্যাথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাননি। এবার তিনি ভর্তি হন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় সরবোন-এ। কিন্তু সরবোনে তার পড়তে ভালো লাগে না। অল্পদিনের মধ্যেই সেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন আই ডি এইচ ই সি (ইন্সটিটিউট ফর অ্যাডভান্সড সিনেমাটোগ্রাফিক স্টাডিজ) ফিল্ম স্কুলে। সেখানে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। এ সময় থিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুণী নির্মাতার চলচ্চিত্র দেখতে থাকেন, জানাশোনা হয় অনেক বিখ্যাত মানুষের সঙ্গে; টুকটাক চলচ্চিত্র সমালোচনাও শুরু করেন।

কিন্তু তার মন পড়ে থাকে গ্রিসে। থিও মনে করতেন, শিকড়বিহীন সংলাপ দুঃসাধ্য। সে কারণে পড়াশোনা শেষ করে উন্নত জীবন যাপনের আশায় ইউরোপ কিংবা আমেরিকা পাড়ি না দিয়ে ফিরে যান নিজের জন্মভূমিতে। অ্যাথেন্সে ফিরে চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে কাজ শুরু করেন বামপন্থি ‘দৈনিক আল্লাগি’তে। যদিও সেখানে খুব বেশিদিন কাজ করতে পারেননি, ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দেই ওই পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় তৎকালীন গ্রিসের আধা-সামরিক সরকার। এরই মধ্যে অ্যাথেন্সের রাস্তায় হাঁটার সময় পুলিশের এক সদস্য অকারণে আঘাত করেন থিওকে। পুলিশের আঘাতে থিওর চশমার কাচ ভেঙে যায়। এই আঘাতের কারণ অনুসন্ধান করতে চান তিনি; আর মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন চলচ্চিত্রকে।

   শৈশবে বাবাকে হারানোর স্মৃতি, ফ্রান্সে চলচ্চিত্র বিষয়ে শিক্ষা ও সমালোচনার অভিজ্ঞতা থেকে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন থিও। শুরু হয় তার প্রথম চলচ্চিত্র রিকন্সট্রাকশন নির্মাণের কাজ। ইতোমধ্যে অবশ্য তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য দ্য ব্রডকাস্ট ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ইউরোপের চলচ্চিত্র নিয়ে অনুষ্ঠিত থ্যাসালোনিকি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে সমালোচকদের বিচারে সেরা নির্বাচিত হয়।

   রিকন্সট্রাকশন-এর বাজেট বলতে ছিলো চাচাতো এক ভাই ও বন্ধুদের দেওয়া সামান্য কিছু অর্থ এবং সঙ্গে জনাপাঁচেক অপেশাদার লোক। যদিও মনোবল কখনোই হারাননি থিও; সে কারণেই চলচ্চিত্র নির্মাণের ঝোঁকে ছুটে গেছেন গ্রামে। সেখানে চাষিদের সঙ্গেই রাত্রিযাপন করেছেন। গ্রিস বলতেই যে ফর্সা, ‘সুন্দর’ চামড়া আর দেবদেবীদের রূপকথা, তার বাইরে গিয়ে প্রথম চলচ্চিত্রেই গ্রিসের আবরণ ভেঙে তুলে এনেছেন আড়ালের কথা। সেখানকার গ্রামীণ জনপদের বেহাল দশা ফুটিয়ে তুলেছেন সাবলীলভাবে। রিকন্সট্রাকশন নির্মাণ করে বেশ নামডাক হয় থিওর। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে থ্যাসালোনিকি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে রিকন্সট্রাকশনও সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়। এছাড়া সে বছর গ্রিসের সেরা আর্টফিল্ম ও নতুন নির্মাতা ক্যাটাগরিতে তিনি পুরস্কার জেতেন। পরের বছর চলচ্চিত্রটি ফ্রান্সে প্রদর্শিত বিদেশি ভাষার সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার জিতে নেয়। বার্লিনেও স্পেশাল ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়ে পুরস্কার জেতে রিকন্সট্রাকশন।

   থিও পরে একে একে নির্মাণ করেন ১৩টি চলচ্চিত্র। বরাবরই তার চলচ্চিত্রের আধেয়জুড়ে থাকে শোষিত, নিগৃহীত একেবারেই সাধারণ মানুষ। ১৩টি চলচ্চিত্রের মধ্যে তিনটি ট্রিলজি নির্মাণ করেছেন থিও। ডেইজ অব থার্টি সিক্স (১৯৭২), দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার্স (১৯৭৫) ও ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত দ্য হান্টার্স মিলিয়ে ইতিহাসবিষয়ক তার প্রথম ট্রিলজি। এরপর ভয়েস টু সাইথেরিয়া (১৯৮৪), দ্য বিকিপার (১৯৮৬) ও ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট মিলিয়ে নীরবতার ট্রিলজি নির্মাণ করেন; সীমান্ত নিয়ে তার ট্রিলজিতে রয়েছে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত দ্য সাসপেন্ডেড স্টেপ অব দ্য স্টর্ক, উলিসেস গেজ (১৯৯৫) এবং তার কালজয়ী চলচ্চিত্র ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে (১৯৯৮)। গ্রিসের আধুনিক ইতিহাস নিয়েও ত্রয়ী নির্মাণের পরিকল্পনা ছিলো থিওর। সে অনুযায়ী দ্য উইপিং মিডো (২০০৪) এবং দ্য ডাস্ট অব টাইম (২০০৯) নির্মাণও করেন তিনি। এই ত্রয়ীর তৃতীয় চলচ্চিত্র দ্য আদার সির নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি থিও না ফেরার দেশে চলে যান।

জীবদ্দশায় ১৩টি পূর্ণদৈর্ঘ্যরে বাইরেও বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন থিও। সেই স্বল্পদৈর্ঘ্যগুলোতেও ইতিহাস খুঁড়ে খুঁড়ে দেখার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। দ্য ডাস্ট অব টাইম ছাড়া পূর্ণদৈর্ঘ্য ১২টি চলচ্চিত্রের জন্য বিভিন্ন উৎসবে ৫৬টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে ৪৬টিতেই পুরস্কার জিতে নেয় থিওর চলচ্চিত্র। এছাড়া বিশ্বের খ্যাতনামা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে গ্রাজুয়েট ও সম্মানজনক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছে। জীবদ্দশায় বহু মানুষের ভালোবাসা আর সম্মান পেয়েছেন; পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও কাজের মধ্যেই বেঁচে আছেন থিও। কেননা তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বর্তমান সময়ে এসেও প্রাসঙ্গিক।

   ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’র কথাই ধরি, ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত চলচ্চিত্রটি ২০১৮-তে এসেও প্রাসঙ্গিক। চলচ্চিত্রটি দেখার পর যে কারো মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এটি সমকালীন বাস্তবতায় নির্মিত। এই আলোচনা থিওর ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’কে কেন্দ্র করে।

পেয়েছেন অমূল্য নিধি বর্তমানে

ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’র কাহিনি গ্রিসের ৭০ বছর বয়সি কবি আলেকজান্দ্রেকে ঘিরে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর যিনি হতাশা আর একাকিত্বে ভুগে চিকিৎসকের সহায়তায় নিজের জীবনের অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। মারা যাওয়ার আগের দিন একে একে তার মনে হতে থাকে শৈশবের স্মৃতি, স্বজনদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, স্ত্রী-সন্তানের কথা। গত তিন বছর তার পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ওরানিয়ার কাছ থেকে বিদায় নেন, পোষা কুকুর ক্যাটেরিনাকে তুলে দেন তার কাছে, শেষবারের মতো মেয়ে ও মায়ের সঙ্গে দেখা করেন।

   এরই মধ্যে গ্রিসের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সোলানিকির রাস্তায় দেখা হয় আলবেনিয়ার কয়েকজন শরণার্থী শিশুর সঙ্গে। ঘটনাক্রমে পুলিশের হাত থেকে তাদেরই একজনকে বাঁচান আলেকজান্দ্রে। কিন্তু খানিকবাদেই ছয়-সাত বছর বয়সি আলবেনিয় শিশুটি অপহরণকারীদের খপ্পরে পড়ে। শুরু হয় শিশুটিকে বাঁচিয়ে নিরাপদে গ্রিস থেকে ফেরত পাঠানোর লড়াই। ওইদিন রাত অবধি চেষ্টার পর অজানার উদ্দেশে একটি জাহাজে করে শিশুটিকে পাঠিয়ে দেন আলেকজান্দ্রে। শিশুটি গ্রিস থেকে চলে গেলেও আলেকজান্দ্রেকে শিখিয়ে যান অনেক কিছুই। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ আর অতীত স্মৃতি আলেকজান্দ্রেকে মারা যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। নতুন করে বাঁচার সাধ জাগে আলেকজান্দ্রের।

   ইটারনি’টি দেখার সময় বার বার কেনো জানি ইরানের বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামির কথা মনে পড়েছে। আব্বাসের চলচ্চিত্রের সঙ্গে থিওর চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্যগত বহু মিল পাওয়া যায়। আব্বাস যেমন অপেশাদার অভিনয়শিল্পীদের দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় করাতেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একই কাজ করেছেন থিও-ও। চিত্রনাট্য লেখার দিক থেকেও দুজনের ব্যাপক মিল, দুজনেরই নির্দিষ্ট কোনো চিত্রনাট্য থাকতো না। দুজনই কখনো চলচ্চিত্রের স্বাভাবিক সমাপ্তি দেখাননি; তার বদলে দর্শককে কোনো ব্যাপারে নিজেদের মতো করে ধরে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। ক্যামেরার ব্যবহারের দিক থেকেও মিল ছিলো¾আব্বাস যেমন ফ্রেম ঠিক করে দীর্ঘক্ষণ ক্যামেরা চালু রেখে দৃশ্যধারণ শেষে বন্ধ করতেন, থিও ঠিক একই কাজ করেছেন। ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’তেও দীর্ঘ সময় ধরে শট্ নিয়েছেন তিনি। 

   মজার বিষয় হলো, গাড়ির বহুল ব্যবহার; দুজনই চলচ্চিত্রের কোনো চরিত্রকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে গাড়ি ব্যবহার করতেন। ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’তে আলেকজান্দ্রে বাড়ি থেকে বের হওয়া থেকে পুরো সোলানিকি শহর ঘুরে আবারও বাড়ি আসা পর্যন্ত বহুবার গাড়ি ব্যবহার করেছেন থিও। বলতে গেলে কাহিনি এগিয়েছে গাড়িতে চড়েই। এছাড়া দুজনের চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রে বরাবরই থেকেছে সাধারণ মানুষ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জীবন-মৃত্যু নিয়ে বেশ তাৎপর্যপূর্ণভাবে ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে টেস্ট অব চেরি নির্মাণ করেন আব্বাস; পরের বছর নির্মিত ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’র অনেকটাই প্রায় একই থিমের ওপর দাঁড়িয়ে।

   ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ক্লোজ আপ-এ চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ ভেঙে ফিকশন আর নন-ফিকশনকে এক করে ফেলেন আব্বাস; সেখানে কাহিনিচিত্র আর প্রামাণ্যচিত্রের সীমানা নিয়ে রীতিমতো পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছেন। অন্যদিকে ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’তে হুবহু আব্বাসের মতো না হলেও, পরাবাস্তবভাবে বর্তমানের সঙ্গে শত বছরের অতীতকে পর্যন্ত হাজির করেছেন থিও। ইটারনিটির ৫৯ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে যখন আলবেনিয় শিশুকে ১৯ শতকে মারা যাওয়া কবি ডায়োনিসিয়স সলোমস-এর গল্প শোনান আলেকজান্দ্রে, তখন একই ফ্রেমে ঢুকে পড়েন ওই কবি। এমনকি চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৪৭ মিনিটে তিনি বাসে উঠে আলেকজান্দ্রেকে পরামর্শও দেন।

   এছাড়া আলেকজান্দ্রে যখন মেয়ের বাসায় গিয়ে তাকে তার মায়ের একটি চিঠি পড়তে দেন; ১৬ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে দেখা যায়, ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের দৃশ্যে ফ্রেমের মধ্যে ঢুকে পড়েন তার মৃত স্ত্রী। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যেও এ ধরনের ঘটনা দেখা যায়।

এর উত্তর পাওয়া যায় থিওর কাছেই। থিও মনে করেন, ‘অতীত কখনোই অতীত হয় না, বরং বর্তমান আর ভবিষ্যতের মধ্যে তা থেকে যায়।’ সে কারণে হয়তো ইটারনিটি’তে বর্তমানের দৃশ্যে ঢুকে পড়ে অতীতের কোনো চরিত্র। আলোচনার মধ্য দিয়ে বিষয়গুলো আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে।

নিজের হতাশার আবরণে ব্যর্থ রাষ্ট্রের চিত্রায়ণ

সোলানিকি শহরের সমুদ্র তীরবর্তী অ্যাপার্টমেন্টে নিঃসঙ্গ জীবন কাটছে আলেকজান্দ্রের। এমনকি গত কয়েক মাসে তেমন কারো সঙ্গে কথাই হয়নি তার। বাড়িতে আছে কেবল পরিচারিকা ওরানিয়া আর পোষা কুকুর ক্যাটেরিনা। পাশের ভবনের কারো সঙ্গেও পরিচয় নেই; নীরবতা তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। নীরবতা ভেঙে কিছুটা আত্মতৃপ্তির জন্য নিজের ক্যাসেট প্লেয়ার বাজিয়ে করুণ সুর শোনেন আলেকজান্দ্রে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে আলেকজান্দ্রের সেই সুরের পাল্টা জবাবও আসে পাশের ভবন থেকে। ঠিক একই সুরে আলেকজান্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন পাশের ভবনের অচেনা বাসিন্দা।

   প্রথমবার ইটারনিটি দেখার সময় ধারণা হয়, সেটি আসলে প্রতিধ্বনি। কিন্তু বেশ কয়েকবারের দেখায় সেই ভুল ভেঙে যায়। কারণ, আলেকজান্দ্রে ক্যাসেট প্লেয়ারটি বন্ধ করে দেওয়ার পর পাশের ভবন থেকে সুর ভেসে আসা শুরু হয়। কিন্তু প্রতিধ্বনি হলে এমনটা হওয়ার কথা নয়; খুবই অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সুর ভেসে আসে।

   এদিকে আলেকজান্দ্রে কখনো সেই ভবনের বাসিন্দাকে দেখেননি। তবে তার ধারণা, স্কুলে যাওয়ার আগে কিংবা স্কুল থেকে ফেরার পর অল্পবয়সী কোনো ছেলে-মেয়ে হয়তো প্রতিবেশীর সঙ্গে এভাবে যোগাযোগ করে। কিংবা হতেও পারে সেই ব্যক্তি তারই বয়সি, তার মতোই ভীষণ একা; আবার সেটা নাও হতে পারে। আলেকজান্দ্রে বহুবার ভেবেছেন, পাশের ভবনে গিয়ে অপরিচিত সেই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করে আসবেন; একদিন বেরও হয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসেন; দেখা করার বদলে অচেনা সেই ব্যক্তিকে নিয়ে নিজের মতো কল্পনা করার সিদ্ধান্ত নেন। দর্শকেরও অচেনা থেকে যায় সেই ব্যক্তি।

   এ ধরনের উপস্থাপনে বেশ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন থিও; কারণ সরাসরি ওই ব্যক্তিকে না দেখিয়ে দর্শককেও কল্পনা করার সুযোগ দিয়েছেন। অন্যভাবে বিবেচনা করলে, সেই ব্যক্তিও হয়তো আলেকজান্দ্রের মতো ভীষণ একা; যে রকমটা ইঙ্গিত দিয়েছেন আলেকজান্দ্রেও। সেই বাসিন্দাকেও হয়তো একাকিত্ব গ্রাস করে ফেলেছে। তিনিও হয়তো জীবনের মায়া ত্যাগ করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। 

   আবার বিষয়টিকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। বর্তমান সময়ের সমাজতাত্ত্বিকদের অনেকেই ‘কোয়ালিটি পিপল প্রোডাক্ট’-এর কথা বলছেন; অন্যদিকে যুগ যুগ ধরে দাদা-দাদি, মা-বাবারা হীরার টুকরো ছেলে চেয়ে আসছেন। কারণ, কলিম খানের ভাষায়,

কোনও সমাজব্যবস্থা বা তন্ত্র, তা সে ধনতন্ত্র গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র রাজতন্ত্র মিলিটারিতন্ত্র যে তন্ত্রই হোক, মানুষের অস্তিত্ব ও বিকাশের পথে অনুকূল কি না; তার এক এবং একমাত্র মাপকাঠি হল, ব্যবস্থাটি হীরের টুকরো প্রজা সৃষ্টি করতে পারে কি না। যে-ব্যবস্থা কৃষি শিল্প সুরক্ষা প্রভৃতি সমস্ত ক্ষেত্রেই সফল, কিন্তু হীরের টুকরো প্রজা সৃষ্টি করতে অপারগ; সেটি একটি অযোগ্য সমাজব্যবস্থা।

সেই হীরার টুকরো ছেলে আর আলেকজান্দ্রে যে সম্পূর্ণ আলাদা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যিনি স্বপ্ন দেখা তো দূরের কথা, নিজের জীবনটাই রাখতে চান না। আর আত্মহত্যাকামী মানুষ যে কেবল আলেকজান্দ্রে একাই নন, থিও সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন আলেকজান্দ্রের অচেনা প্রতিবেশীর উপস্থাপনে। ফলে কলিম খানের তত্ত্বানুসারে, মানুষের অস্তিত্ব ও বিকাশের পথে অনুকূল পরিবেশ নেই গ্রিসে; গ্রিসের সমাজব্যবস্থাটি যে অযোগ্য ও অচল সেটিও হতাশাগ্রস্ত আলেকজান্দ্রের জীবনাবসানের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন থিও।

   ঘটনা এখানেই শেষ নয়; নিজের জীবন অবসানের জন্য একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন আলেকজান্দ্রে। সেই চিকিৎসকের সঙ্গে তার আলাপচারিতায় বোঝা যায়, মারা যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ব্যাপারে চিকিৎসক তাকে বহুভাবে বুঝিয়েছেন; কিন্তু আলেকজান্দ্রে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। তবে মৃত্যুর পরের অবস্থা নিয়ে ওইদিন চিকিৎসকের সঙ্গে বেশ আন্তরিকভাবে আলাপ শুরু করেন তিনি। যদিও চিকিৎসক সে ব্যাপারে কথা বলতে তেমন আগ্রহ দেখাননি। এ ঘটনার পর আলেকজান্দ্রের মুখভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, তিনি চিকিৎসকের ওই আচরণ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি; তার কথায় অনেকটা হতাশ হয়েছেন। তার এই হতাশা হয়তো জীবনাবসান ঘটানোকে চিকিৎসকের পছন্দ না হওয়ায়।

   আরেকদিন আলেকজান্দ্রের উদ্দেশে ওই চিকিৎসক বলেন, ‘আমাদের প্রজন্ম আপনার লেখা বই আর কবিতা পড়ে বড়ো হয়েছে।’ তার মানে যিনি গত ৫০ বছর ধরে গ্রিসের কয়েক প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সেই তিনিই স্বপ্ন হারিয়ে ফেলেছেন। আরেকটু কঠিন করে বললে, রাষ্ট্র তার স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে, ঠেলে দিয়েছে আত্মহননের পথে। পথ প্রদর্শকই যদি পথ না চেনে, তাহলে সেই জাতিকে পথ দেখাবে কে? এ ধরনের উপস্থাপনে রাষ্ট্রের একেবারে অন্তঃসারশূন্য অবয়বই ফুটে ওঠে।

   মজার বিষয় হলো, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলে চোখ রাঙিয়ে আঙুল তোলা সত্ত্বেও ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে গ্রিসের সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে এবং সেরা নির্মাতা নির্বাচিত হন থিও। সে বছর গ্রিসে মোট সাতটি পুরস্কার পায় চলচ্চিত্রটি। এছাড়া ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের কান চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রটি পাম ডি’অরসহ দুটি পুরস্কার পায়। এমনকি ৭১তম অস্কারে বিদেশি ভাষার সেরা চলচ্চিত্র ক্যাটাগরিতে মনোনয়নের জন্য গ্রিস থেকে চলচ্চিত্রটি পাঠানো হয়। যদিও অস্কার কর্তৃপক্ষ মনোনয়ন দেয়নি। মনোনয়ন না দেওয়ার কারণও অবশ্য অজানা নয়; অস্কার কর্তৃপক্ষ যেভাবে সমর্থন পছন্দ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার দায়ভার বহন করে, এই চলচ্চিত্রে তার উল্টো চিত্র দেখানো হয়েছে। নিচে শরণার্থী সম্পর্কিত আলোচনায় সেটা উঠে আসবে।

মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি

নিজের জীবনের অবসান ঘটাতে চান আলেকজান্দ্রে। আর মাত্র একটি দিন বাকি। পরের দিনই চিকিৎসকের কাছে যাবেন। কিন্তু তার আগের দিন গৃহপরিচারিকা ওরানিয়াকে কৃতজ্ঞচিত্তে বিদায় দেন। যদিও আলেকজান্দ্রের সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন ওরানিয়া। এ সময় তাকে উদ্দেশ করে আলেকজান্দ্রে বলেন, ‘বিষয়টি (জীবনাবসানের সিদ্ধান্ত) সেরকমভাবে কঠিন করে নেওয়ার কিছু নেই। আগে আর পরে, সবকিছু কি শেষ হয়ে যায় না?’ এ ব্যাপারে কথা না বাড়িয়ে ওরানিয়া জানান, টেবিলে তার জন্য কফি রাখা আছে এবং স্যুটকেসও গুছিয়ে দিয়েছেন।

   যদিও ওরানিয়ার এই কাজকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বর্ণনা করেন আলেকজান্দ্রে। এবার ওরানিয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি ভালো জানেন।’ কিছুটা অভিমানের সুরে ওরানিয়া সর্বশেষ কথাটি কেনো বললেন, সেটা তিনভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, জীবনাবসানের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আলেকজান্দ্রে হয়তো তার সঙ্গে পরামর্শ করেছেন; তবে ওরানিয়া এ ধরনের কাজে সমর্থন না দিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য বার বার অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, আলেকজান্দ্রে সবসময় এতোটাই অন্তর্মুখী যে, নিজের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করেন; ফলে এক্ষেত্রেও ওরানিয়ার তাকে সমর্থন না দেওয়ার বিকল্প থাকে না। আর তৃতীয় বিষয়টি হতে পারে, যেহেতু গত তিন বছর ধরে নিঃসঙ্গ আলেকজান্দ্রেকে কিছুটা সঙ্গ দিয়েছেন ওরানিয়া, তার কথা আলেকজান্দ্রে না রেখে পারেন না। ফলে জীবনাবসানের সিদ্ধান্তে ওরানিয়ার কথার মূল্যায়ন না করা এবং হাসপাতালে তাকে যেতে সম্মতি না দেওয়ায় অভিমানে হয়তো এ ধরনের কথা বলেছেন। অবশ্য ওরানিয়ার অভিমান ভাঙানোর চেষ্টাও করতে দেখা যায় আলেকজান্দ্রেকে; বলতে শোনা যায়, গত তিন বছর এখানে কাটানোর জন্য ধন্যবাদ, তোমাকে ছাড়া দিনগুলো যে কীভাবে পার হতো ভেবে পাই না। যদিও আলেকজান্দ্রের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে চলে যান ওরানিয়া।

   আরেকটি বিষয় খেয়াল করলে দেখা যায়, আলেকজান্দ্রে কিন্তু ওরানিয়াকে বলেননি আগে কিংবা পরে সবকিছু শেষ হয়ে যায়। তার বদলে এ ধরনের ব্যাপারে ওরানিয়ার মতামত জানতে চেয়েছেন। থিও যে তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অনুসন্ধান চালান, এটাই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি সিদ্ধান্ত না দিয়ে ফলাফল জানার চেষ্টা করেছেন।

   এই ফাঁকে বলে রাখি, নিজের একাকিত্ব আর হতাশার জায়গা থেকে জীবনাবসানের সিদ্ধান্ত নেন আলেকজান্দ্রে। নেপথ্য কণ্ঠে সেই বর্ণনা উঠে আসে; তবে আলবেনিয় শিশুর কাছেও নিজের একাকিত্বের কথা মুখ ফুটেই তিনি বলেন। তবে তিনি নিজে নিজে আত্মহত্যা করতে চান না; চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গ্রিক ভাষায় জীবনের এ ধরনের অবসান কিংবা আত্মহত্যাকে বলে ইউথানসিয়া। ইউথানসিয়া অর্থ হলো, জীবনাবসানের ক্ষেত্রে মৃত্যু-যন্ত্রণা ও ভোগান্তি থেকে বাঁচতে কোনো কিছুর সহায়তা নেওয়া। সাধারণত যেসব রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা একেবারেই থাকে না কিংবা বেঁচে থাকলে যাদের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়; তাদের মধ্যে যারা জীবনাবসানের সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের কিছু ওষুধের মাধ্যমে মারা যেতে সহায়তা করে চিকিৎসকরা। যদিও ইউথানসিয়া যৌক্তিক নাকি দোষের, তা নিয়ে ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিকদের মধ্যে ব্যাপক মত-পার্থক্য রয়েছে। তার পরেও ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে এসেও নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, কলম্বিয়া, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, জার্মানিসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশকিছু রাজ্যে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য ইউথানসিয়া বৈধ। কিন্তু ‘সুস্থ’ আলেকজান্দ্রে আসলে নিজের একাকিত্ব আর হতাশার কারণে জীবনাবসান ঘটাতে চান।

   আলেকজান্দ্রের একাকিত্ব আর হতাশার কারণও খুঁজে পাওয়া যায়। বাড়িতে তার সঙ্গী বলতে পোষা কুকুর ক্যাটেরিনা, অসুস্থ মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, স্ত্রী আন্না গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে; আর স্বামীর সঙ্গে আলাদা বাড়িতে থাকেন মেয়ে। কেবল আলাদাই থাকেন না, বাবার পছন্দ অপছন্দের মূল্যায়নও করেন না মেয়ে। ক্যাটেরিনা নামে যে পোষা কুকুর আলেকজান্দ্রের সার্বক্ষণিক সঙ্গী, তাকে দু’চোক্ষে দেখতে পারেন না তার জামাই। এমনকি তাচ্ছিল্য ভরে ‘কুত্তা’ বলতেও শোনা যায়। এদিকে আলেকজান্দ্রের শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটি তাকে না জানিয়েই বিক্রি করে দেয় তার মেয়ে ও জামাই। এতে চরম কষ্ট পান আলেকজান্দ্রে।

   মায়ের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করতে গিয়ে অবশ্য নিজের একাকিত্ব নিয়ে ভিতরে জমে থাকা কষ্ট উগরে দেন আলেকজান্দ্রে। এতোদিন হাসপাতালে না আসার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে মাকে জানান, শেষবারের মতো দেখা করতে এসেছেন, চিরদিনের মতো চলে যাচ্ছেন। একথা শুনে চমকে যান মা; কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দাঁড়ান জানালার পাশে। জানালার পর্দা কিছুটা সরিয়ে বাইরের দিকে মুখ করে ভাঙা গলায় ডাকতে থাকেন আলেকজান্দ্রের নাম ধরে; সেই সঙ্গে বলতে থাকেন টেবিলে খাবার দেওয়া আছে। যেমনটা তিনি বলতেন আলেকজান্দ্রের শৈশব-কৈশোরে; এমনকি যুবক আলেকজান্দ্রের জন্যও টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে এভাবেই ডাকতেন তিনি।

   মায়ের স্মৃতিচারণে যুক্ত হন আলেকজান্দ্রেও। ফিরে যান ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের এক দিনে; সোলানিকির পার্শ্ববর্তী এক দ্বীপে স্বজনরাসহ নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলো তারা। সেখানে অনেক হাসি-আনন্দে তাদের দিনটি কাটে। তবে এতোগুলো বছর পরেও আলেকজান্দ্রের মা পুরনো সেই ঘটনাকে গতকালের বলে উল্লেখ করেন। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে পাশে বসে আলেকজান্দ্রে তার মায়ের উদ্দেশে বলতে থাকেন, কেনো আমরা যা চাই সে অনুযায়ী সবকিছু ঘটে না? কেনো একাকিত্বে ভুগতে হয়, কেনো কষ্ট পেতে হয়? কেনো আমাকে নিঃসঙ্গ জীবন পার করতে হচ্ছে? বাড়িতে কথা বলার সময় কেনো কেবল নিজের কণ্ঠস্বরই শুনতে পাই? ঠিক কী কারণে নীরবতার মধ্যে আমি আমার শব্দ হারিয়ে ফেলি? কেনো বাড়িতে সবসময় কেবল নিজের পদচারণার শব্দ কানে বাজে? কেউ কেনো ভালোবাসার কথা শুনতে চায় না?

   হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামতেই পিছন থেকে আলেকজান্দ্রেকে ডেকে শেষবারের মতো বিদায় জানায় আলবেনিয় শিশুটি। কাকতালীয়ভাবে আলেকজান্দ্রে যেভাবে তার মায়ের কাছে বিদায় চেয়েছেন, আলবেনিয় শিশুটিও তার কাছে একইভাবে বিদায় চায়। শিশুটি চলে যেতে উদ্যত হলে আলেকজান্দ্রে ওই শিশুকে তার সঙ্গে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। জাহাজ ছাড়ার আরো যেহেতু দুই ঘণ্টা বাকি আছে, সেই সময়টুকু শিশুটির সঙ্গ পেতে চান।

মারা যাওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগেও কেনো আলেকজান্দ্রে সুখের খোঁজ করছেন, বিষয়টি বেশ ভাবিয়ে তোলে। হয়তো শিশুটির কাছ থেকে দুই ঘণ্টা সময় অচেতনেই চেয়ে ফেলেন আলেকজান্দ্রে। কারণ, মানুষের আদিসত্তা সবসময় দুঃখকে এড়িয়ে সুখ ভোগ করতে চায়। আদিসত্তা যুক্তিহীন হওয়ায়, ন্যায়-অন্যায় বা ঠিক-বেঠিক বিচারের ক্ষমতা নেই। বিষয়টি অনেকটাই ক্ষুধার্ত মানুষের আচরণের মতো, ক্ষুধার্ত কোনো মানুষের সামনে যেমন ভালো খাবারের ছবি ভাসে, তেমনই বিচার-বিবেচনা না করেই বিভিন্ন জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয় আদিসত্তা। যেমনটা ঘটে আলেকজান্দ্রের ক্ষেত্রে।

   তাছাড়া যে ব্যক্তি জীবনের মায়া ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই তিনিই একটি শিশুকে বিপদসঙ্কুল পথের ভয় দেখাচ্ছেন। যে মানুষটিকে মৃত্যু ভয় কাবু করতে পারে না, তাকে দুর্গম পথের ভয় পেয়ে বসে কী করে! কী করে শিশুটিকে আলেকজান্দ্রে বলতে পারেন, তুমি কি আজ রাতে মরার সিদ্ধান্ত নিয়েছো? এর উত্তর অবশ্য আলেকজান্দ্রের কাছেই পাওয়া যায়। তিনি শিশুকে উদ্দেশ করে যখন বলেন, আমার সঙ্গে থেকে যাও। তাহলে কি মৃত্যু নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে করতে সেই ব্যাপারে আলেকজান্দ্রের ভয় ধরে গেছে, নাকি জীবনের প্রতি তার ভালোবাসা জন্মেছে? তিনি যদি আসলেই মরে যেতে চান, তাহলে কেনো এই পিছুটান? নাকি ওই শিশুর সঙ্গে তার বন্ধু সেলিমের মরদেহ দেখতে গিয়ে এবং শরণার্থীদের ভেসে বেড়ানো দেখে জীবনের আরো বীভৎস পরিস্থিতি তার দৃষ্টিগোচর হয়েছে? নাকি মারা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও তিনি বেঁচে থাকার প্রেরণা খুঁজে ফিরেছেন? সে কারণে হয়তো শিশুকে সাহস জুগিয়ে আলেকজান্দ্রেকে বলতে শোনা যায়, তোমার সামনে অপার সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে। তোমার সামনে উন্মুক্ত আছে পুরো বিশ্ব।

   যদিও তারপরেও মারা যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন না আলেকজান্দ্রে। সময় যতো ঘনিয়ে আসতে থাকে, একের পর এক স্মৃতি ধরা দেয় তার মনে। আলেকজান্দ্রের প্রাক-চেতন মন থেকে একের পর এক স্মৃতি চেতনে উঠে এসে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। বর্তমানের কোনো দৃশ্যে অতীতের চরিত্রকে দৃশ্যত হাজির করেন থিও। তিনিও হয়তো চেয়েছেন, মানুষের মনের চিন্তাভাবনা বাস্তবে দেখাবেন। সেজন্য আলেকজান্দ্রের অতীত স্মৃতিগুলো হাজির করেছেন বর্তমানে। বর্তমান দৃশ্যের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক চরিত্রের উপস্থিতি দেখিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি করে দিয়েছেন মানুষের চিন্তায়।

সীমান্তহীন শরণার্থী প্রাণ

সোলানিকি শহরের রাস্তায় ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়ানো গাড়ির সামনের কাচ পরিষ্কার করে দিচ্ছে আলবেনিয়া থেকে আসা কয়েকজন শরণার্থী শিশু। অনতিদূরে আলেকজান্দ্রের গাড়ির উইন্ডশিল্ড পরিষ্কার করা শুরু করে তাদেরই একজন। কিন্তু পিছন থেকে পুলিশের তাড়া খেয়ে অন্য শরণার্থী শিশুদের পালিয়ে আসতে দেখে সেও ভয়ে কুঁকড়ে যায়। এ সময় শিশুটির জন্য নিজের গাড়ির দরজা খুলে দেন আলেকজান্দ্রে; বাঁচিয়ে দেন পুলিশের হাতে আটক হওয়া থেকে। এরপর গাড়িতে করে তাকে কিছুদূর এগিয়ে নামিয়ে দিলে কৃতজ্ঞচিত্তে সে আলেকজান্দ্রের উদ্দেশে প্রাণখোলা হাসি দেয়। সেই হাসি কিছুটা হলেও প্রশান্তি আনে আলেকজান্দ্রের ছন্নছাড়া জীবনে।

   খানিকবাদেই ফার্মেসিতে ওষুধ নিতে গিয়ে আলেকজান্দ্রে দেখেন, সোলানিকির রাস্তা থেকে ওই শিশুকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে অপহরণকারীরা। এরপর শুরু হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অর্থের বিনিময়ে শিশুকে উদ্ধার করে গ্রিস থেকে ফেরত পাঠানোর লড়াই।

   থিও যদিও এক সাক্ষাৎকারে পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে সীমান্ত কিংবা শরণার্থী ইস্যুকেন্দ্রিক নয়; বরং জীবন আর মৃত্যুর মধ্যকার সীমান্ত নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। কিন্তু কোনো টেক্সট তৈরির পর তো আসলে অথরের মৃত্যু ঘটে। ফলে থিও যে অবস্থান থেকেই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন না কেনো, একজন দর্শক কিংবা সমালোচক হিসেবে ইটারনিটি’র বৃহৎ জায়গাজুড়ে শরণার্থী ইস্যুই চোখে পড়ে। সেটাও রূপক কিংবা একেবারে ঝাপসাভাবে নয়; চলচ্চিত্রটির উপস্থাপনে উঠে আসে শরণার্থীবিষয়ক সমকালীন বাস্তবতা। একটু পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বব্যাপী ৬৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষ নিজেদের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। তার মধ্যে ২২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ শরণার্থী হিসেবে দিন পার করছে; রাষ্ট্রহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করছে আরো এক কোটি মানুষ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ছেড়ে কেবল বাংলাদেশেই পালিয়ে আসা ১১ লাখ ১৮ হাজার পাঁচশো ৫৭ জনের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হয়েছে।৬ এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কানাডা আর ফ্রান্সে তো রীতিমতো শরণার্থীর ঢল নামছে। আর সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাকি শরণার্থী দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত ইস্যু।

   তার পরেও কথা থেকেই যায়। ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’তে থিও যদি কেবল জীবন-মৃত্যুর উপস্থাপনেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইতেন, তাহলে শরণার্থী শিশুকে আধেয়ে ঢুকিয়ে নিলেন কেনো? যেহেতু চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে থিও নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য ব্যবহার করতেন না, সেক্ষেত্রে আধেয়ের মধ্যে ছোটোখাটো অন্য বিষয়াদি ঢুকে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে চলচ্চিত্র তো আসলে ডিরেক্টরস মিডিয়াম; সেখানে নির্মাতার ওপর চলচ্চিত্রের আধেয়ের সম্পূর্ণটা নির্ভর করে। বলা হয়ে থাকে, একজন নির্মাতার অনুমতি ছাড়া ফ্রেমের মধ্যে গাছের একটা পাতাও নড়ে না। তবে কি অচেতনভাবেই শরণার্থী ইস্যুকে ইটারনিটি’র আধেয়ে স্থান দিয়ে ফেলেছেন থিও?

   অবশ্য থিও বহুবার বলেছেন, গ্রিসে নিজেকে তার আগন্তুক বলে মনে হয়। আলবেনিয় শিশুটি যখন নিজের শঙ্কিত হওয়ার কথা বলে, আলেকজান্দ্রেও তাকে জানান, তিনিও শঙ্কিত। আলেকজান্দ্রেকে দিয়ে প্রকাশ করা শঙ্কা কি তাহলে থিওর নিজের? তাছাড়া নিজের দেশে থিও কীভাবে আগন্তুক কিংবা অভিবাসী হতে পারেন? স্কুল-কলেজ থেকে পড়ে আসছি, যে গাছের শেকড় উপড়ে অন্য জায়গায় বসানো হয়েছে, তাকে অভিবাসী বলে; আর বংশানুক্রমিকভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বলে অধিবাসী। অভিবাসীদের জীবন-সংগ্রাম চিরচেনা পরিবেশের বাইরে, কখনো ইচ্ছায় আবার কখনোবা অনিচ্ছায়। যদিও রুটিরুজির টানে কিংবা নিরাপত্তার আশায় স্বপ্ন নিয়ে মানুষজন অভিবাসী হয়; সেখানে তাদের স্বপ্ন যে ভাঙে না, সেটাও নয়। বাংলাদেশের নওগাঁর প্রত্যন্ত কোনো গ্রাম থেকে যে নারী রাজধানী ঢাকায় এসে কোনো গার্মেন্টে কাজ করে বস্তিতে থাকেন, কিংবা শহর ঢাকা থেকে যার দৌড় গিয়ে থেমেছে ইউরোপ আমেরিকার কোনো শহরে¾এক অর্থে তারা সবাই বিশ্বজোড়া অভিবাসী সমাজের নাগরিক। সেই হিসেবে থিও কিংবা আলেকজান্দ্রের এ ধরনের ধারণা অমূলক নয়।

ভেসে বেড়ানোই শরণার্র্থীর জীবন

নিজের কাছে থাকা সম্পূর্ণ অর্থের বিনিময়ে অপহরণকারীদের কাছ থেকে আলবেনিয় শিশুকে ছাড়িয়ে নিয়ে রাস্তার পাশে অস্থায়ী এক দোকানে খাবার কিনে দিতে যান আলেকজান্দ্রে। সেসময় রাস্তায় গাড়ি নিয়ে মহড়া দিতে থাকা অপহরণকারীদের দেখে ভয় পেয়ে যায় ওই শিশু। খানিকবাদে সেখান থেকে রেস্টুরেন্টে গেলে পুলিশের কয়েকজন সদস্যকে দেখে শিশুটি আবারও ভয় পেয়ে যায়। এমনকি ভয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে পালিয়ে রাস্তার পাশের এক ভবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। বোঝার বাকি থাকে না, শরণার্থীদের পদে পদে বিপদ। সেই বিপদ যেমন নিজের দেশে, ভিনদেশেও। বন্ধু সেলিম মারা যাওয়ার পর তার ‘শেষকৃত্যে’ ওই শিশুর নেপথ্য কণ্ঠেও প্রকাশ পায় সে ধরনের আক্ষেপ¾‘সেলিম, এখানে আমি আতঙ্কিত, এই সমুদ্রও বিশাল। এখানে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে আর তুমিইবা কোথায় যাচ্ছো সেলিম? কোন জায়গায়, কোথায় আমরা যাচ্ছি? পাহাড় হোক আর সমতলই হোক, পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনী; আমাদের তো ফিরে তাকানোর ফুরসতও নেই। আমরা তো কেবল সমুদ্রের মতো বহমান, যে ভেসে চলার শেষ নেই।’

আলবেনিয়ায় দাদির কাছে ফেরত পাঠানোর জন্য শিশুকে সঙ্গে করে সীমান্তে যাওয়ার পর আলেকজান্দ্রে জানতে পারেন, শরণার্থী ওই শিশুর আসলে আপন বলতে কেউই বেঁচে নেই; দাদি বেঁচে থাকার ব্যাপারে শিশুটি আসলে মিথ্যা বলেছে। সত্য জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে শিশুকে নিয়ে দৌড়ে সীমান্ত থেকে পালিয়ে গাড়িতে ওঠেন আলেকজান্দ্রে। এর পরের দৃশ্যে দেখা যায়, পাহাড়ঘেঁষা নদীর স্রোত বয়ে যাচ্ছে সেতুর নিচ দিয়ে। আর চলন্ত গাড়িতে করে ওই শিশুকে নিয়ে আসছেন আলেকজান্দ্রে। দৃশ্যটি কিন্তু বেশ অর্থবহ। শরণার্থীদের জীবনও নদীর স্রোতের মতোই। কোথাও তাদের কোনো ঠাঁই নেই; ভেসে বেড়ানোই যেনো তাদের নিয়তি। বাস্তবেও শরণার্থীদের ভিনদেশে যাওয়াটা আসলে প্রবাসী কিংবা অভিবাসীদের মতো নয়। গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে দুর্ভিক্ষসহ নানা কারণে নিজেদের দেশ ছেড়ে দলে দলে অন্য দেশে প্রবেশ করে আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে শরণার্থীরা। সাময়িক আশ্রয় নেওয়ার পর নিজেদের দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার একটা গরজ থাকে। অন্যদিকে শরণার্থীরা ফিরে যাবে বলেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যুগে যুগে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু চিরকাল সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা হয়নি বলেই শরণার্থীরা আজও সারাবিশ্বে অবাঞ্ছিত, সন্দেহভাজন।

   রোহিঙ্গাদের কথাই ধরি, মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগে ২৫ আগস্ট ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে সে দেশের কতিপয় উগ্র বৌদ্ধ ও সেনাবাহিনী মিলে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ওপর তাণ্ডব শুরু করে। বাধ্য হয়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা গত এক বছরে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকার আর তাদের ফেরত নিচ্ছে না। অবশেষে জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নানা মহলের চাপে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের শর্তসাপেক্ষে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। এজন্য সেই রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারের নাগরিক, তার বৈধ নথিপত্র দেখাতে হবে; অন্যথায় দেশে ফেরা হবে না তাদের। সেটাও অতোটা চটজলদি নয়; দৈনিক মাত্র তিনশো৭ জন করে ফিরিয়ে নেবে বলে শর্ত জুড়ে দিয়েছে মিয়ানমার। যদিও ফিরে যাওয়ার পর তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো রকম বন্দোবস্ত করা হয়নি। ফলে শরণার্থী আশ্রয় শিবিরে মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে লাখো রোহিঙ্গাকে।

   ক্ষুদ্র এলাকার ভিতর দিনাতিপাত করা এসব মানুষের স্মৃতিটাও অতোটা মধুর নয়; দুঃসহ অনেক স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হয় তাদের। যেমন দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হয় আলবেনিয় সেই শিশুকে। সীমান্তে যাওয়ার পর ওই শিশু আলেকজান্দ্রেকে সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেয়¾‘অস্ত্রধারীরা (আলবেনিয়ার) রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, পুরুষদের প্রতিরাতে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। তারা বাড়িতেও ঢুকে পড়ে, বাচ্চারা তখন কাঁদতে থাকে; পুরো গ্রাম ফাঁকা হয়ে গেছে।’ রাখাইন রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারাও নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে অসংখ্য নারী অভিযোগ করেছে, তাদের ধর্ষণ করা হয়েছে, সন্তানকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে তাদের সামনেই, খুন করা হয়েছে বাড়ির পুরুষদের, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘরবাড়ি।

   নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে ভিনদেশে পাড়ি দেওয়ার পথও যে সুখকর নয়, সেটাও উঠে এসেছে আলবেনিয় শিশুর বয়ানে। আলেকজান্দ্রেকে ওই শিশু জানায়¾সীমান্তের পথে প্রান্তরে মাইন পুঁতে রাখা আছে। সে কারণে সচেতনভাবে সামনে অগ্রসর হতে হয়েছে তাদের। বড়ো আকারের পাথর তুলে সামনের দিকে সেটা নিক্ষেপ করে উপুড় হয়ে বসে থাকতো তারা; যদি সেখানে কোনো মাইন পোঁতা থাকতো, তবে সেটা বিস্ফোরিত হতো। অন্যথায় সামনের দিকে অগ্রসর হতো তারা। সেটাও নির্বিঘ্নে নয়; বরফে আচ্ছাদিত ধু-ধু প্রান্তরে দিক ঠিক রেখে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে থাকতো পার হওয়ার বাধ্যবাধকতা। অন্যথায় সেখানেই মারা পড়ার আশঙ্কা আছে।

   শরণার্থী মাত্রই এ ধরনের ঝুঁকি নিতে হয়। রোহিঙ্গারাও ছোটো ছোটো ডিঙি নৌকায় চেপে গাদাগাদি করে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। পথিমধ্যে বহু রোহিঙ্গার জীবন সাঙ্গ হয়েছে; পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে উড়ে গেছে পা, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে শরীর। পত্রিকার পাতায় স্থান পেয়েছে বহু রোহিঙ্গার নিথর দেহের চিত্র; স্রোতের টানে নৌকা ডুবে যাওয়ায় বহুজনের দমও ফুরিয়ে গেছে চিরতরে। এতোকিছুর পরে কোনো স্থানই যে আসলে শরণার্থীদের জন্য অনুকূল নয়, অজানার উদ্দেশে আলবেনিয় শিশুকে বিদায় দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেটিও দেখিয়েছেন থিও।

স্বপ্ন দিয়েই শেষ

১৯ শতকের কবিতা লেখার কাজ শুরু করেছিলেন আলেকজান্দ্রে। কিন্তু স্ত্রী আন্না গত হওয়ার পর সেই কাজ আর শেষ করতে পারেননি। লেখাটি অসম্পূর্ণ থাকার ব্যাপারে মেয়ের করা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না। তবে আমি হয়তো শব্দ খুঁজে পাইনি।’ আলবেনিয় শরণার্থী সেই শিশু এবং নিজের মায়ের কাছে গিয়েও একাকিত্বের কথা বলেন আলেকজান্দ্রে। আলেকজান্দ্রে সবসময় চেয়েছেন, নিজের ইচ্ছানুযায়ী যেনো সবকিছু ঘটে, তার বাড়ি যেনো কোলাহলপূর্ণ থাকে, কথা বলার সময় যেনো কেউ তার প্রতিক্রিয়া দেয়; ভালোবাসার মতো মানুষ যেনো থাকে। তার এই চাওয়াগুলো আসলে অমূলক নয়। কারণ, মানুষ তো আসলে সুখই চায়।

   কিন্তু ‘প্রেরণা বাদে মানুষ কোনো কাজই সম্পাদন করতে পারে না। সুখবাদের প্রতিপাদ্য হলো, আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে মানুষের সকল কাজের অন্তর্নিহিত প্রেরণা।’ স্ত্রীর মৃত্যুর পর কাজের ব্যাপারে আলেকজান্দ্রের মনে আর সেই আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়নি। তাকে সেভাবে কেউ প্রেরণাও দেয়নি; ফলে লেখাটা তো শেষ করতে পারেনইনি, উল্টো পৌঁছে গেছেন মৃত্যুর দুয়ারে। আলেকজান্দ্রের এই দুরবস্থা দেখে বার বার কেনো জানি বিখ্যাত লেখক, চলচ্চিত্রশিক্ষক ও নির্মাতা গ্যাব্রিয়েল গর্সিয়া মার্কেজের কথা মনে পড়ে যায়; মার্কেজের মতে, মানুষ বুড়ো হয়ে যায় বলে স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেয় না, বরং মানুষ স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেয় বলেই বুড়ো হয়ে যায়। যেমনটা ঘটে আলেকজান্দ্রের ক্ষেত্রে।

   ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডের একেবারে শেষ দৃশ্যে স্ত্রী আন্নার কাছ থেকে বেঁচে থাকার প্রেরণা পান আলেকজান্দ্রে। তার মনে হতে থাকে আন্নার লেখা একটি চিঠির কথা, যেখানে আলেকজান্দ্রেকে উদ্দেশ করে আন্না বলছেন, সমুদ্রের পাশে বসে এই চিঠি লিখছি; এখানে আমি তোমার জন্য লিখছি, তোমার সঙ্গে কথা বলছি। যখন এই দিনগুলোর কথা মনে হবে, মনে রেখো, আমি দু’চোখ ভরে তোমাকে দেখছি, তোমার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে আছি, উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছি।

   তারপরই ফ্রেমে ঢুকে পড়ে আন্না বলতে থাকেন, নাচবে? আমি জানি তুমি এটা পছন্দ করো না। কিন্তু আজকে তো আমার দিন। এরপর আলেকজান্দ্রের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে কাছে ডেকে দুজনে অন্তরঙ্গভাবে নাচতে থাকে; তাদের চারপাশে নাচতে থাকে স্বজনরাও। আন্নার মোহে পড়ে একপর্যায়ে আলেকজান্দ্রে বলে উঠেন, আমি হাসপাতালে যেতে চাই না আন্না। আমি আগামীকালের জন্য প্রোজেক্ট তৈরি করবো। আলেকজান্দ্রে নিজেই বলেন, পাশের ভবনের অচেনা প্রতিবেশী আমাকে একই সুরে জবাব দেয়। সেখানে নিশ্চয় কেউ আছে, যে আমার কাছে শব্দ বিক্রি করে। খানিকবাদে তিনি একটি কবিতাও আওড়াতে থাকেন; যে শব্দগুলো তিনি কিনেছেন আলবেনিয় সেই শিশুর কাছ থেকে। এভাবেই সাধারণ মানুষ আর নিজের স্মৃতির ঝুলি খুঁড়ে খুঁড়ে পরবর্তী প্রোজেক্টের রসদ খুঁজে পান আলেকজান্দ্রে; সরে আসেন জীবনের অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত থেকে। আর জীবন-মৃত্যুর মধ্যকার সীমান্ত এবং হতাশার দেয়াল ভেঙে দিয়ে স্বপ্নের পথে পা বাড়ানোর বিষয়াদি নিয়ে ইটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে’র মাধ্যমে অনুসন্ধান চালান থিও।

লেখক : কাওসার বকুল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠ-এ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

bokulmcj71@gmail.com

https://wwws.facebook.com/kawsar.bokul.9


 

তথ্যসূত্র

১. লাইন কয়টি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

২. এনজেলোপুলুস, থিও (২০১৮ : ৪৪); ‘অতীত কখনো অতীত থাকে না’; তোমাকে বুঝিনি, থিও : থিও এনজেলোপুলুসের সিনেমা, সাক্ষাৎকার ও ভাবনা; ভাষাবদল ও গ্রন্থনা : সৈকত দে; খড়িমাটি, চট্টগ্রাম।

৩. প্রাগুক্ত; এনজেলোপুলুস (২০১৮ : ১৪৯)।

৪. প্রাগুক্ত; এনজেলোপুলুস (২০১৮ : ৩৮)।

৫. খান, কলিম (২০০০ : ১৭); ‘হিরোর হাইটটাই প্রবলেম ১’; ফ্রম এন্লাইটেন্মেন্ট টু ইমোশনাল বন্ডেজ : জ্যোতি থেকে মমতায়; হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, কলকাতা।

৬. https://goo.gl/K5ssWT; retrieved on:11.10.2018

৭. https://goo.gl/45LS1L; retrieved on: 17.10.2018

৮. করিম, সরদার ফজলুল ( ২০০৬ : ১৯০); ‘Hedonism : সুখবাদ’; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন