Magic Lanthon

               

ফারুক আলম

প্রকাশিত ০৬ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘রীনা ব্রাউন’ : যে জ্বালায় অন্তর জ্বলে

ফারুক আলম

‘কে হায়, হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!’ ¾রূপসী বাংলার জীবনানন্দ দাশ রক্তাক্ত হৃদয় দিয়ে জানতেন, হৃদয় খুঁড়লে ভিতরের রক্তক্ষরণে ভেসে যায় অন্তর্জগৎ। অনুভূতির অব্যক্ত সঙ্কটে মনোদৈহিক পরিবর্তন পরিস্ফুট হয়। শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে তার নান্দনিক প্রতিচ্ছবি, প্রতিধ্বনি সৃজন কর্মকে মহৎ, চিরন্তন ও সর্বজনীন করে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলো তেমনই শিল্পকর্ম। প্রামাণ্যচিত্র স্টপ জেনোসাইড আজও আমাকে স্তব্ধ করে, শিউরে উঠি ওরা ১১ জন দেখে। ভিন্ন ভাবের উপস্থাপনায় ভাবতে বসি মাটির ময়না নিয়ে; পুনর্বিন্যাস করি চিন্তাকাঠামোর। এই চিন্তাভাবনার বিন্যাস সমাবেশে অধুনা সন্নিবেশিত হয়েছে রীনা ব্রাউন। এর আগে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যেসব চলচ্চিত্রের নাম জানা যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য¾স্টপ জেনোসাইড, অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, রক্তাক্ত বাংলা, সূর্যগ্রহণ, জয় বাংলা, ধীরে বহে মেঘনা, মেঘের অনেক রং, আবার তোরা মানুষ হ, আলোর মিছিল, আগামী, নদীর নাম মধুমতী, একাত্তরের যীশু, আগুনের পরশমণি, মুক্তির কথা, মুক্তির গান, শ্যামল ছায়া, শ্রাবণ মেঘের দিন, হাঙর নদী গ্রেনেড, মেঘের পরে মেঘ, মেহেরজান, আমার বন্ধু রাশেদ, যুদ্ধশিশু, খেলাঘর, গেরিলা, জয়যাত্রা, জীবনঢুলী, মেঘমল্লার, অনিল বাগচীর একদিন, ভুবন মাঝি ইত্যাদি। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নির্মিত জীবন থেকে নেয়া’তেও পাই স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের সাধ। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এসব চলচ্চিত্রের বাইরে রীনা ব্র্রাউন-এ বিচ্ছিন্ন এক সম্প্রদায়ের ভিন্ন এক জীবন সংগ্রাম, ভিন্ন এক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে রীনা ব্রাউন অনন্ত বিতর্কিত এক বিষয়কে সামনে এনেছে¾মানুষ না ধর্ম, রাষ্ট্র না মানুষ? এর অনুসন্ধান যদি দর্শককে ব্যথিত-মথিত-আন্দোলিত করে; যদি নিজের গণ্ডির বাইরে একটুখানি তাকিয়ে দেখার জন্য মনের চোখ জাগ্রত হয়; যদি মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের মৌলিক চার মূলনীতিকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়; তাহলে রীনা ব্রাউন-এর নির্মাতা শামীম আখতার শুধু নন; চলচ্চিত্রটির নামকরণের জন্য যে গল্পের নায়িকা রীনা ব্রাউনের শরণাপন্ন্ন হতে হয়, সেই সপ্তপদীর নির্মাতা অজয় কর বা ঔপন্যাসিক তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় বেঁচে থাকলেও তৃপ্ত হতেন।

সময়, সুযোগ ও পরিবেশের অজুহাতে প্রেক্ষাগৃহে যেয়ে চলচ্চিত্র না দেখলেও প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে এখন ঘরে বসে তা দেখে দুধের স্বাদ পানিতে পূরণ করা যায়। সহজে বললে, স্বাধীনতার পুরোপুরি ব্যবহার। মাঝে মাঝে আমিও সেই সুযোগ নিই; কখনো মনোযোগ দিয়ে, আবার তেমন হলে গভীর মনোযোগে অনুরণিত হই; আবেগে আপ্লুত হই; প্রাণবন্ত হই। মনমরা হতে হতে অসুস্থ হয়ে পড়ি। দুÑচার লাইন লিখেও ফেলি কখনো কখনো। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সম্পাদক স্নেহাস্পদ ছোটোভাই কাজী মামুন হায়দার তাগাদা দিয়ে সেই লেখা জোগাড় করে নিয়ে পরম যত্নে ছাপিয়ে আমার লেখালেখিতে অনুপ্রেরণা জোগায়। শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র যেমন, আমির খান অভিনীত তারে জমিন পার, থ্রি ইডিয়টস, পিকে যতোবার দেখতে শুরু করি, ততোবার পারিবারিক পরিবেশে দর্শকের কাতারে আটকে যাই। সম্ভবত চলচ্চিত্র এমনই এক মাধ্যম, যেখানে ভাষা কোনো সমস্যা তৈরি করে না। ইংরেজি, হিন্দি, উর্দুর কথা না হয় বাদই দিলাম; গুজরাটি, তামিল, মালায়লাম, ইরানি, কোরিয়ান, আরবি, পশতু যে ভাষাতেই চলচ্চিত্র তৈরি হোক না কেনো, তার কাহিনি কিন্তু ঠিকই বুঝে ফেলি, মূলবার্তা অনুভব করি। রীনা ব্রাউন তেমন সাড়া জাগিয়ে আমার কাছে আসেনি বরং মামুন হায়দার আমাকে দেখতে দিয়েছিলো, আর দেখেই আমি এতে আটকে যাই। যদিও শেষতক আশাবাদের ইঙ্গিত আছে, তবুও প্রচণ্ড মন খারাপ হওয়ার মতো এর গল্প ও দৃশ্যায়ন। এ নিয়ে তাই দুÑচার কথা না লিখলেই নয়। এ নিয়ে লিখতে গেলেই শরৎচন্দ্রের কথা মনে পড়ে¾ ‘পা থাকলে হাঁটা যায়, হাত থাকলেই লেখা যায় না।’ তারপরও ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর জন্য লিখি; এটা প্রকাশের অপেক্ষায় থাকি।

   আমি যখন অকালপ্রয়াত ভারতীয় নির্মাতা বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাঁটাতার কিংবা সৃজিতের রাজকাহিনী দেখেছিলাম, তখন প্রথম রাষ্ট্র সীমানা নিয়ে সত্যিকার সাহসী প্রশ্ন আমাকে আগ্রহী করে তুলেছিলো। ওটা ছিলো একটি সর্বসাধারণ বিবেচ্য ও বোধগম্য অভীক্ষার বীক্ষণ। মার্কস-এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইশতেহার থেকে জেনেছি ও বুঝেছি, আধুনিক মানুষের সব যন্ত্রণার মূল নায়ক হলো রাষ্ট্রযন্ত্র। রাষ্ট্র তার হাত-পাসহ সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে মানুষকে শোষণ করে। বিশ্বায়নের এই যুগে রাষ্ট্রকে আরো শক্তিশালী করার জন্য নানান কলাকৌশলের পাশাপাশি বিবিধ ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে। পুঁজি স্বাধীন, বিশ্বজুড়ে তার বিনিয়োগ অবাধ। করপোরেট পুঁজি, ব্যাংক, কলকারখানায় বিনিয়োগ হয়ে এদেশের সস্তা শ্রমের বাজার থেকে শ্রম শোষণ করে মুনাফা লুটছে। মজুরি, দাম, মুনাফা বিশ্লেষণ করে বোঝা গেছে, পুঁজিপতি পুঁজি বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে যে লাভ করে, তা আর কিছুই নয় শ্রমিকের শ্রম শোষণ। কারণ পুঁজির সঙ্গে শ্রম যোগ হয়ে তা বাজারজাত হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না মেধা ও বিপণন কৌশল শ্রম থেকেই বেরিয়ে আসে।

   রাষ্ট্রের যোগ-বিয়োগও এই খেলার অংশ। যা ৯০-এর দশকে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে দুই জার্মানিকে এক করতে পেরেছিলো। যতো আবেগ আকাক্সক্ষাই থাকুক না কেনো, পুঁজির মোড়লদের অনুমোদন না থাকলে সে আবেগের বাস্তব রূপায়ণ অনুপস্থিতই থেকে যেতো। তেমনই সাম্রাজ্যবাদের খেলায় ভারতবিভক্তি। ফলাফল বাংলাভাগ। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ বাংলার বিভাজনে মথিত হয়েছিলেন; গেয়েছিলেন, আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালবাসি। এই ভালোবাসায় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বাংলার বিভক্তি রদ হলেও তা আর ৪৭-এ ঠেকানো যায়নি। ভালোবাসার জোরে পূর্ব বাংলা ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে বটে, কিন্তু দুই বাংলাকে আর জোড়া লাগানো যায়নি। প্রশ্ন, কেনো? উত্তরটা অবান্তর ঠেকলেও বাস্তব হলো, বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে দুই ভাই গলাগলি করতে পারেনি। লুকিয়ে থাকা বেদনার ভয়ে হৃদয়কে লুকিয়ে রেখেছে হৃদয়ের গহীনে। এই যে বেদনা লুকানোর কবিতা জীবনানন্দ দাশ লিখলেন, তারপর কতো বছর লাশ কাটা ঘরে পড়ে আছি, তার ইয়ত্তা নেই। এখন তো টালিউড, বলিউড এমনকি ঢালিউডের চলচ্চিত্রে এর ছায়াপাত ঘটে। রীনা ব্রাউন দেখতে যেয়ে কতো কথা মনে পড়ে। সেই রবীন্দ্রনাথ দিয়েই শুরু করতে হয়¾ ‘যা পাই তা চাই না, যা চাই তা ভুল করে চাই।’ মনে পড়ে হুমায়ুন আজাদের ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ কিংবা ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’-এর কথা।

দুই.

রীনা ব্রাউন দেখতে দেখতে পাই প্রথমত, রাষ্ট্রচিন্তা; পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ তথা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ; প্রেম বিচ্ছেদের বিরহ-যাতনা, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তি। স্বাধীনতার পর মুক্তিকামী মানুষের অভ্যন্তরীণ ও বহিরঙ্গের বদল। সাধারণ থেকে ব্যতিক্রম। ঘাড়ের আয়েশি গামছা হয়েছে গলার ফাঁস ইউরোপিয়ান টাই, সাদা-মাটা পোশাকের মানুষ হয়েছে স্যুটেড-বুটেড। আগেই বলেছি, রীনা ব্রাউন নামের সঙ্গে মিশে যায় একাধারে লেখক তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস এবং অজয় কর পরিচালিত, উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত সপ্তপদী। যার মূল বক্তব্য ধর্মের চেয়ে মানুষ বড়ো। ঈশ্বর বেঁচে থাকে মানুষের মধ্যে, অন্যথায় সে মৃত, তার কোনো মূল্য নেই। সপ্তপদী’তে রীনা ব্রাউনের কথায়, ‘ঈশ্বর নেই, মানুষ তাকে মেরে ফেলেছে।’

অনেক আগে শেলি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর মারা গেছে।’ কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবন নদীর পাড় যখন ভাঙছে; বৃটিশ উপনিবেশে দেশীয় মাতৃগর্ভের ইংরেজ শাসকদের ঔরসজাত সন্তানরা যখন জন্মের পর আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে যন্ত্রণাকাতর; সমাজ নিপীড়িত জীবন যাপনে বাধ্য; তখন রীনা ব্রাউনরা গভীর সঙ্কটে। চলচ্চিত্রের নাম যাই হোক, এ দেশীয় এক ইংরেজ পরিবারের মেয়ে স্যান্ড্রাকে কেন্দ্র করে, তার প্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার প্রেম, বিরহ, যুদ্ধ ও জীবন সংগ্রাম নিয়ে কাহিনি বিনির্মাণের পাশাপাশি, মুক্তিযুদ্ধোত্তর ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্কট আমাকে বার বার আহত করেছে।

   মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সবার জানা। তবু এ চলচ্চিত্রে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের শাসন শোষণের বিরুদ্ধে সেই ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ থেকেই বাঙালিদের মনে সন্দেহ ও সংগ্রাম দানা বাঁধতে থাকে। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ভিতর দিয়ে তা দৃশ্যমান। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে বিশাল মহিরুহে রূপান্তর। এরপর দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের মোড়কে পেটি বুর্জোয়া ছাত্র যুবকের লড়াই; শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক শ্রমিক জনতার সশস্ত্র সংগ্রাম; পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বাঙালি নেতৃত্বের রাজনৈতিক সংঘর্ষ; পাকিস্তান পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে বাঙালি সামন্ত ও মুৎসুদ্দি পুঁজির সংঘাত।

   বাঙালির জন্ম ও বিকাশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, বহু লড়াইয়ের পর আর্যদের বৈদিক ধর্মের সঙ্গে সমন্বয় করে জীবন, ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলো এরা। বাঙাল মুল্লুকে সাদা-কালোর সংমিশ্রণে কালী-শিব-দূর্গা-গণেশদের সমন্বিত আধিপত্য বিস্তারের মধ্য দিয়ে সামন্তবাদী সমাজ বিকশিত হচ্ছিলো। অতঃপর সামন্তদের বর্ণবাদী অত্যাচারের বিরুদ্ধে নীরব বিদ্রোহে বৌদ্ধধর্ম বিকাশ লাভ করে এবং গ্রামভিত্তিক কৌম সমাজব্যবস্থা চলতে থাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সেন শাসনের শেষভাগে বর্ণবাদী সামন্তদের মাত্রাজ্ঞানহীন অত্যাচারসহ বৌদ্ধদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাজশক্তিতে তাদের অনুপস্থিতিতে প্রতিরোধহীন মুসলিম আগমনে সামন্ততান্ত্রিকতার অভ্যন্তরীণ ভাঙাগড়া চলতে থাকে। চলে ক্ষমতার পালাবদল। এখানে ইসলাম প্রচারকদের অধিকাংশ ছিলো সুন্নি। সুফি দর্শনের বিরাট প্রভাব ছিলো তাদের ওপর। কাজেই ধর্মের সঙ্গে কর্মের সংযোগ, তথা উৎপাদন ও বংশবৃদ্ধির বিষয়টা খুবই গুরুত্ব পেয়েছিলো। ইসলাম ধর্মের প্রচারকদের পর পরই মুসলমান শাসকদের আধিপত্যে ইসলাম ধর্মের প্রসার চলতে থাকে।      পরবর্তী সময়ে বৃটিশ আগমনে ঘটতে থাকে পুঁজির বিকাশ। কলকাতাকেন্দ্রিক নব্য বণিক সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটে। দেশীয় সামন্ততান্ত্রিক শাসন ও বৃটিশ বেনিয়াদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করতে এরা দুই নৌকায় পা রাখে। এদের সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হয় উঠতি মধ্যবিত্তরাও। শুরু হয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। ধর্ম দিয়ে নিজেদের সংঘাতকে উসকে দেয়। বৃটিশদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল পুরোপুরি কার্যকর হয়। অসাম্প্রদায়িক দর্শনের বিপরীতে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষের বীজ পায় অনুকূল পরিবেশ। আর সেই বিষবৃক্ষের বিষ ফলে বাংলা হয় দুই ভাগ। কেনো? তা সবাই জানে, মোটেই জনস্বার্থে নয়, শাসকদের স্বার্থে, স্বার্থান্বেষীদের চক্রান্তে; উভয় ধর্মের উপরতলার দ্বন্দ্বে।

   সেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্যাক্টের আমলে মুসলমানদেরকে ৫৫ শতাংশ বলা হতো। অবশ্য কবি নজরুল বলতেন ৬০ শতাংশ। বর্তমানে তা হয়তো ৬৫ শতাংশ। মুসলমান বাড়তে বাড়তে বাঙালির বড়ো অংশই তো মুসলিম। সুতরাং মুসলমানরা শিক্ষা, সমাজ ও অর্থনীতিতে পিছিয়ে থাকলেও অনেক আগে থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তারা অগ্রগামী। বর্তমান হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে ১৭ কোটির মধ্যে ১৬ কোটি আর পশ্চিমবঙ্গে নয় কোটির মধ্যে প্রায় এক কোটি, মোট ১৭ কোটি মুসলমান আর নয় কোটি হিন্দু। এসব নিষ্ফল, নিষ্প্রয়োজন, মূর্খের তর্ক বন্ধ হচ্ছে না বলেই বলছি। তবুও একধরনের হিন্দুরা নিজেদেরকে বাঙালি বলে হিন্দুত্ব জাহির করে, আর মুসলমানেরা তা মেনে নেয়। গোঁড়া মুসলমানরা বিজাতীয় হওয়ার চেষ্টায় মনে করে বাঙালিত্ব বিসর্জন দেওয়াটাই তাদের ধর্ম। পাকিস্তানিদের শাসন আমলে কবি র্ফরুখ আহমদ যা করলেন! কাজী নজরুলের কোনগুলো কবিতা মুসলমানদের পড়া যাবে, আর কোনগুলো যাবে না, তার তালিকা করলেন। ইংরেজদের মতন পাক সরকারও নজরুলের অসংখ্য কবিতা নিষিদ্ধ করলো। বাংলা ভাষা উর্দু অক্ষরে লেখা হবে কি না, তার পরীক্ষানিরীক্ষা চললো। সেসব অতীত হলেও অনেক চলচ্চিত্রের মতো রীনা ব্রাউন-এও সব উঠে এসেছে।

তিন.

ধর্ম ইসলাম বা হিন্দু যাই হোক না কেনো, জাতি হিসেবে বাঙালি তার ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিসহ সভ্যতা, উদারতা ও মানবিকতার কারণে সারা পৃথিবীর অনন্য সাধারণ সেরা জাতি। কোনো ধর্মের সঙ্গে তার নিজস্ব কৃষ্টির কোনো বিরোধ নেই। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধুরা তর্কাতীতভাবে মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন। তারা শের-ই-বাংলার সঙ্গে অবিভক্ত বাংলারই পক্ষে ছিলেন। কিন্তু হিন্দু ও মুসলিম সামন্তরা নিজেরা একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে ঘর-সংসার, ব্যবসা-বাণিজ্য করলেও ক্ষমতার ভাগাভাগিতে শেষ পর্যন্ত বাংলাকে ভাগ করে দিলো। বৃটিশ গেলে রাজত্বের আশায় ধর্ম দিয়ে দেশভাগ করে সহজে শাসন ক্ষমতায় বসে পড়লো। তাই জনতার প্রাণ গেলেও সামন্তদের কারো স্বার্থের চিড় ধরেনি। ‘মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই’ কথাটা একদিনও চললো না। দেশ ভাগ হলো ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ মাঝরাতে। রাত পোহাতেই জিন্নাহ সাহেব ঘোষণা করলেন, ‘আমরা হিন্দু নই, আমরা মুসলিম নই, আমরা সবাই পাকিস্তানি।’ পাকিস্তানের আইন মানতে হবে, শাসন মানতে হবে। বাংলায় চললো পাক শাসন, ১৯৭১ পর্যন্ত। রীনা ব্রাউন-এ শাসন শোষণের সেই ইতিহাস ঘুরেফিরে আসে; আসে মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামী মনোভাব; বাস্তবিক যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি ও প্রত্যয়।

কাহিনির নায়ক দারা। সংগ্রামী। পাক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি জানেন বৃটিশদের দুশো বছরের শাসনের অবসান এমনি এমনি হয়নি। তা ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, প্রীতিলতার মতো সহস্র সংগ্রামীর শত সংগ্রামের ফসল। একদিকে গণআন্দোলন অন্যদিকে সশস্ত্র সংগ্রাম। ইংরেজ শাসকদের ওপর আক্রমণ। আত্মঘাতী সংগ্রামীরা ইংল্যান্ডে গিয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগের কসাই লেফটেন্যান্ট ও’ডায়ারকে (১৯১২Ñ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাঞ্জাবের গভর্নর লেফটেন্যান্ট মাইকেল ও’ডায়ার) হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। সুতরাং ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ৭০-এর নির্বাচন দিয়ে যেমন পাকিস্তানিদেরকে গণপ্রতিরোধের সম্মুখীন করা গেছে, তেমনই সশস্ত্র মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও দারা’রা ভেবেছে।

   নায়কের সঙ্গে তার বোনের বান্ধবী অ্যাঙ্গলো-ইন্ডিয়ান স্যান্ড্রার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রেমের প্রস্তুতি পর্বে অম্ল-মধুর সম্পর্কের মাধ্যমে স্যান্ড্রার নাম বদলে নতুন নাম দেন দারা। স্যান্ড্রা হয়ে যান রীনা ব্রাউন। শুরু হয় ব্যক্তি প্রেম ও স্বদেশ প্রেমের কাহিনি। সবচেয়ে বড়ো হয়ে আসে দেহাতীত প্রেম; শুধু প্রেম; শুধু ভালোবাসা; নিঃস্বার্থ নির্ভেজাল; তা পরোয়া করেনি কোনো স্বার্থের; আশা করেছে মহানুভবতার, মানবিকতার। এখানে বার বার বলা হয়েছে, ভালোবাসা মানে স্বাধীনতা, আর সে স্বাধীনতা কারো হাতে এমনি এসে ধরা দেয় না। অনেক মূল্যে কিনতে হয়, এমনকি রক্ত দিয়েও।

চার.

   রীনা ব্রাউনের নামেই চলচ্চিত্রের নামকরণ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০১৪Ñ২০১৫ অর্থবছরে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে রীনা ব্রাউন’কে অনুদান দেয়। পরে চলচ্চিত্রটির সঙ্গে সহপ্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয় ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও শামীম আখতার। রীনা ব্রাউন-এর গল্প শামীম আখতারের নিজের। সাগরের ঢেউ আর গিটারের সুরের আবহে কুশীলবদের পরিচয় পর্ব শেষ হয়। ১৯৭১। গুলির শব্দ ও রাতের দৃশ্যে একজনের দৌড়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের শুরু। দিনের আলোতে নদীর কূলে ভাসমান শবদেহ খুবলে খাচ্ছে কুকুর। বয়স্ক মানুষের এক জোড়া চোখ। জুতার ফিতা বাঁধার দৃশ্য। একজনের সিঁড়ি বেয়ে লোহার ব্রিজে ওঠা। এ ব্রিজ চিন্তাকাঠামোর ব্রিজ; সমাজ তথা রাষ্ট্রকাঠামোর ব্রিজ। দুই দেশ বা দুই ব্যক্তির মধ্যে ব্যবধান ও সম্পর্কের ব্রিজ।

   মধ্যবয়সি সেই মানুষের হাঁটা। সাবলীল ভঙ্গি। ব্রিজের নিচে পানি। পানিতে প্রতিচ্ছবি। পিছনে সবুজ বাগান। হাঁটতে হাঁটতে বিশাল বটবৃক্ষ পেরিয়ে বাড়ির ডাইনিং টেবিল। রিমোট কন্ট্রোলে টেলিভিশন অন করা। টি পট থেকে চা ঢেলে নিয়ে টেলিভিশন সংবাদের সঙ্গে চা পান। এটা সংবাদপত্রের সঙ্গে রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে বারান্দায় বসে চা পানের দৃশ্য নয়। স্ত্রীর আগমনে রিমোট দিয়ে চ্যানেল চেঞ্জ ও ভলিউম বৃদ্ধি। কী দারুণ অবজ্ঞা! স্ত্রীর পরিবেশিত সংসার সংবাদ চলতে থাকে। তিনি নীরবে সবই শুনছেন; সইছেন। একসময় স্ত্রীর প্রতিবাদ¾‘সে একই তো খবর, কী এতো দেখো বলো তো? এসব দেখে ডিপ্রেশন বাড়ে।’ বাড়তি অভিযোগ। স্ত্রী ডাকেন মেয়ে মৌরীকে। মেয়ে বাবাকে অনুরোধ করে লিফ্ট দেওয়ার জন্য। সংসারের প্রতি যত্নশীল মা/স্ত্রী, সবাইকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। মায়ের সমালোচনা থেকে বেরিয়ে আসে বাবার বর্তমান অবস্থা। তিনি এখন উদাসীন। সারাক্ষণ কী যেনো ভাবেন, অথবা কী যেনো তাকে তাড়া করে ফিরছে। মেয়েও অংশ নেন এই আলোচনায়। তার প্রশ্ন, ‘কী হয়েছে মা?’ মায়ের উত্তর, ‘রাতে ডিস্টার্ব স্লিপ হচ্ছে। ও মনে করে আমি টের পাই না।’

এই কী পোড়ার গন্ধ রে¾এমন কথার মধ্য দিয়ে দৃশ্য বদলে যায়। তারপর বাংলাদেশের সংসদ ভবন। আমেরিকান স্থপতি লুই আই কান-এর নকশা। শুরু করেছিলেন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান আর উদ্বোধন করেছিলেন বাংলাদেশের স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ। হায়রে গণতন্ত্র! বাগানের গাঢ় সবুজ। গতিশীল গাড়ি। রেড সিগনাল। মেয়ের প্রশ্ন, বাবার উত্তর। লীগ অব নেশনস তারপর ইউ এন নিয়ে আলোচনা। জাতিসংঘ যে ঠুঁটো জগন্নাথ তা আরেকবার শোনা। মেয়ের চোখের সমস্যা, দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর এক চমৎকার প্রতীকী প্রতিবাদ। ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতীক, পাঁচ যুবকের বাহু বন্ধনের রাজু ভাস্কর্য। অফিস। রুটিন ওয়ার্ক। ফাইল সই। অতঃপর সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ। ব্যক্তিগত সহকারীকে বলে ফোন কল ঠেকিয়ে দেওয়া। পাজেল গেম খেলতে খেলতে স্মৃতির জগতে ভাসা। পায়রার উড়াউড়ি। কতো স্মৃতির সেই পুরনো শহর। লক্ষ্মীবাজারের গলি। রঙ চটা, পলেস্তারা ওঠা দালান। গান। বনলতা সেন। লেকের ধার ঘেঁষে আসতে আসতে বাড়িতে মেয়ের সঙ্গে লুডো খেলা। জীবনের সঙ্গে সাপ লুডো খেলে ক্লান্ত পথিক এখন কাটাকুটি খেলছেন, আপন সত্তার সঙ্গে, নিজের মেয়ের সঙ্গে।

মেয়ে বাবাকে বলেন, ‘ওল্ড ফ্রেন্ড দারুণ ব্যাপার! জানো বাবা, আমি আমার ভীষণ পুরনো বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছি।’ ‘গুড, কোথায়?’ ‘ফেইসবু-কে।’ ‘ফেইসবু...ক? সময়ের অপচয়।’ ‘তুমি তো বলবেই।’ পুরনো ধারণার মানুষেরা এমনটাই বলে। দৃশ্যের পরিবর্তনে আসে চিত্র প্রদর্শনী। বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম। সবাই দেখছে। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পপ্রেমী, গৃহিণী। বাড়িতে ফেরা। কম্পিউটার নিয়ে নাড়াচাড়া। মুক্তিযুদ্ধের ছবি। মাউসের ক্লিকে মনিটরের ইমেজে পরিবর্তন। গৃহিণীর অভিযোগ। ‘তোমাকে নিয়ে কী করি বলো তো?’ ‘মানে?’ ‘আসলে তুমি একটা সময়ে আটকে আছো। সেদিন বলছিলে না, মুক্তিযুদ্ধটা তোমাদের ...। ওঠো, শোবে চলো, কম্পিউটারেও তো মন নেই দেখছি।’ কী হয়েছে, তিনি নিজেও জানেন না। শুধু জানেন, যাপিত জীবনের দায়ভারে তিনি জর্জরিত।

   পরদিন সেই চেনা অফিস। চেনা ব্যস্ততা। মিটিং। মনোযোগহীনতা। আঁকাআঁকি। যুব বয়সের স্মৃতি গলিয়ে কোনো এক নারীর মুখ। এর ফাঁকে এক নারীর ফোন কল আটকে যায় ব্যক্তিগত সহকারীর কাছে। বাড়িতে রাত নামে। সেখানে গৃহিণীর কাব্যচর্চার নিষ্প্রাণ সঙ্গী হওয়া। তবু কথা বলতে হয়। বড়ো অনিচ্ছায় সেই বলা। গৃহিণী রুবিনার আবার সেই একই অভিযোগ। তিনি ক্লাবে যান না, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিশেন না। মুক্তিযুদ্ধে আটকে থাকা। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে করা সেই অভিযোগের অর্থ একেবারে ব্যক্তিগত। বয়স বাড়ার অভিযোগ। পরদিন আবার অফিস। সেই ফোন কল। ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা। ক্লাবে না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যায় ওসব তার ভালো লাগে না বলা। স্ত্রীর আয়োজনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে আসা। (২০ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড) আবার অফিস। স্মৃতির পটে ভেসে ওঠা চুলের ঝুঁটি দোলানো নারী। ফোনের রিঙ বাজলে ব্যক্তিগত সহকারীকে আবারও আগামী আধ ঘণ্টা ফোন না দেওয়ার আদেশ। আদেশ অমান্য করায় গুরুগম্ভীর ভর্ৎসনা। বাংলাদেশের পতাকা। মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ। ফুলের ডালি সাজানো। গান। আবার বাড়ি। গান। গানের শেষ লাইন¾কেবল চড়া অভিমান বুকে নিয়ে চলে গেছে জীবনানন্দ দাশ।

   এবার গলায় টাই বাঁধার দৃশ্য। দেরি দেখে স্ত্রীর প্রশ্ন, কী হচ্ছে? উত্তর, গলায় ফাঁসির দড়ি বাঁধছি। গলায় তার যে ফাঁস আটকেছে তার মুক্তি নেই। আবার অফিস। ফোনের রিঙ বাজলে আবারও আদেশ অমান্য করায় ব্যক্তিগত সহকারীকে গুরুগম্ভীর ভর্ৎসনা। আগামী আধ ঘণ্টা ফোন না দেওয়ার আদেশ। বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত সহকারীর বক্তব্য, ‘উনি আপনাকে দুদিন ধরে খুঁজছেন। বাধ্য হয়ে ...।’ ‘কে?’ ‘জি স্যার, একজন ম্যাম।’ ‘কে? মহিলা! আমাকে।’ বিরক্তি ঝরে পড়া। ব্যক্তিগত সহকারীর বক্তব্য। ‘সে আজকে চলে যাচ্ছে। সে আপনার খুব পুরনো বন্ধু, তাই দেখা করতে চাচ্ছে।’

অবশেষে কথা হয়। আর সেকথা এমন একজনের সঙ্গে যার স্মৃতি তাকে ৪০ বছর তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। যাকে তিনি খুঁজছেন সর্বত্র। কথা হয় দুজনের। (২৩ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড) এতোদিন পরে কথা, অনুমানেরও অতীত। চিনতে পারা কঠিন। ওপাশ স্থির, নিশ্চিত। ‘গেজ হু?’ ‘কে বলছেন?’ ‘ভুলে গেছো? ন্যাচারাল। কতোদিন আগের কথা!’ এ দিক থেকে বিরক্তি।

রেগে যাচ্ছো কেনো? লক্ষ্মীবাজারে যাও তো?

লক্ষ্মীবাজার! আপনি কে বলছেন?

স্যান্ড্রা। ভুলে গেলে?

স্যান্ড্রা!

স্মৃতির ঘোমটা খুলতে থাকে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন¾স্যান্ড্রা?

স্যান্ড্রা, রীনা, রীনা ব্রাউন।

রীনা ব্রাউন! কোথা থেকে?

শুরু হয় দুই পরিচিতের সংলাপ। কাছে আসার আকুল আকুতি। আজই চলে যাওয়ার তাড়া। সন্ধ্যায় ফ্লাইট। অবশেষে দেখা হয়, এই পড়ন্ত বয়সে ভর দুপুরে, বিখ্যাত রেস্তোরাঁর খাবার টেবিলে। এর মাঝে অবশ্য স্মৃতির পাখিরা উড়ে আসে। পর্দায় দেখা যায়, সেই যুবক দারাকে। চিরকুটে লেখা পড়ে সাইকেলে চলছে সংগ্রামীদের ডেরায়। সেখানে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার মহান ব্রত নিয়ে কথা হবে, পরিকল্পনা হবে। সাথিরা সবাই একেকজন সূর্য সৈনিক। যাত্রা পথে সুন্দর নারীদের দুষ্ট-মিষ্টি প্রতিবন্ধকতা।

চলচ্চিত্রের ২৮ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। ‘দুশো বছরের বৃটিশ গোলামি তারপর আবার ২২ বছরের পাঞ্জাবিদের।’ আলাপ করছেন তিন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি। তাদেরকে বাস্তবতার দহনে পোড় খেয়ে পোক্ত হতে হয়েছে।

বাঙালিরা অদ্ভুত জাতি।

বাংলা ভাগ হয়ে গেলো। একদিকে অভিজাত ব্রাহ্মণ হিন্দু আরেক দিকে মুসলমান জোতদার।

ভাঙা-ভাঙিতে কার লাভ হলো?

লাভ হলো পলিটিশিয়ানদের এবং কায়েমি স্বার্থবাদীদের। চিরকাল যাদের লাভ হয়ে থাকে তাদেরই লাভ হয়েছে। সাধারণ মানুষ¾ডিভাইড অ্যান্ড রুল। ভাগ হইয়া গেলো। পাকিস্তান আন্দোলন এই বাঙালি মুসলমানরাই শুরু করলো।

৪৬-এ মুসলিম লীগের বাক্সে কারা ভোট দিলো? ওই পাঞ্জাব থেকে এসে পাঞ্জাবিরা তো আর ভোট দেয় নাই?

আচ্ছা, এই উর্দুটা কার ভাষা? সিন্ধুর না, বাঙালির না, বেলুচির না¾তো কার ভাষা?

না, না, কয়েকজন শাসকের, যারা জিন্নাহর কাঁধে ভর করেছিলো। উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা। বাঙালি পড়তেও জানে না, লিখতেও জানে না। তবে একখান বাপের ব্যাটা এই ধীরেন দত্ত।

ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে বললেন, বাংলাই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।

তখন এই ধীরেন দত্তকে যা তা বলে গাল মন্দ করলো, এই ব্যাটা লিয়াকত।

ক্ষমতার এই টানাটানিতে বেরিয়ে আসলো ইউনিফর্ম পরা আইয়ুব খান।

রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ করা হলো। মেয়েদের কপালে টিপ দিলে ...।

এর ফলেই হইলো সাধের পাকিস্তান।

আমি শেক্সপিয়রের সেই বিখ্যাত নাটক ‘হেমলেট’-এর একটা জায়গায় পড়ছিলাম¾টু বি অর নট টু বি দ্যাট ইজ দ্য কোশ্চেন। আমাদের অবস্থা এখন অনেকটা তাই। আমরা এই ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সমুদ্র তীরে দাঁড়িয়ে কি অস্ত্র তুলে নেবো, নাকি মাথা অবনত করবো?

এই স্বল্প আলোচনায় বাঙালির ইতিহাস উঠে আসে।

পাঁচ.

রীনা ব্রাউন-এর ৩০ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে জন নামক এক অবাঙালিকে দেখা যায়। এরা ইঙ্গ-ইন্ডিয়ান, আঞ্চলিক ভাষায় যাদেরকে বলা  হতো ফিরিঙ্গি। তারা নিজেদের ব্যবসা ও পরিবার নিয়ে ব্যস্ত।

   পরের দৃশ্যে আবার সেই রাজনৈতিক সচেতন তিন ব্যক্তির আলোচনা :

তবে এখন হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সকলে এক কাতারে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাছয় দফার তাগদ আছে।

এর পরেই বাঙালিরা স্বায়ত্তশাসন বোঝে।

কীভাবে মানুষ জেগে উঠেছে, খেয়াল করেছেন কি!

আইয়ুব খান কিন্তু পারবে না। কেবল আমরাই তার বিরুদ্ধে নই পাকিস্তানিরাও তার বিরুদ্ধে। আর্মির মধ্যে অসন্তোষ শুরু হয়ে গেছে। আইয়ুব গ্যাঁড়াকলে পড়ে গেছে। শেখ বড্ড জেদি। কখন না বলে বসে, এ মামলা সত্যি।

বলেন কী?

তখন ওর ভাগ্যে যে কী ঘটবে, কে জানে? তবে আইয়ুব খান ওর বিরুদ্ধে মামলা করে ওকে কিন্তু অনেক পপুলার করে দিয়েছে।

সবার হাসির মধ্য দিয়ে আলাপচারিতা শেষ হয়। 

এরপর একদল তরুণ যুবক বসে আলোচনা করছে (৩২ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে) ¾ ‘যেখানে যাকে পাচ্ছে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এর মোদ্দা কথা হলো ভয়। আইয়ুব শাহী ভয় পেয়েছে। একটা গণঅভ্যুত্থানের রূপ নিচ্ছে, ওরা সেটা জানে। ... ভয় না পেলে এরকম গণগ্রেপ্তার হয় না।’ ‘কিন্তু আমাদের কাজ করাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, সাকি ভাই।’ ‘আজাদ ভাই সেদিন মহা বাঁচা বেঁচে গিয়েছেন।’

   পরিস্থিতির ভয়াবহতা সবাই উপলব্ধি করে। সাকি ভাইকে বলতে শোনা যায়, ‘শুধু সামনে নয় পিছনেও একজোড়া চোখ থাকতে হবে। দমানোর চেষ্টা।’ একজন নারীর বক্তব্য, ‘চাইলেই কি দমাতে পারবে?’ আরেক নারী বলে ওঠেন, ‘কৃষক শ্রমিক সবাই জেগে উঠেছে। সবার কাছে স্পষ্ট এটা, পশ্চিমারা সব কিছু লুটে নিয়ে যাচ্ছে।’

   সাকি ভাইয়ের প্রশ্ন, তোমরা কী ভাবো, দেশপ্রেম এতো সোজা? ১৯৩১ সালের ডিসেম্বর মাস। বৃটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামী কুমিল্লার দুই মেয়ে ১৫ বছরের শান্তি ঘোষ ও ১৪ বছরের সুনীতি চৌধুরী ইংরেজ জেলা প্রশাসক স্টিফেনের কক্ষে দরখাস্ত নিয়ে হাজির হয়ে কীভাবে তাকে গুলি করে হত্যা করেছিলো! তারা জেল খেটেছে, দ্বীপান্তরে গেছে, কিন্তু সাহস হারায়নি। ওরা ছিলো যুগান্তরের সদস্য। যুগান্তর ও অনুশীলন চক্র বৃটিশদের মনে কাঁপন তুলেছিলো। এসব উদাহরণ দিয়ে সাকি তার সহযোদ্ধাদের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করেন।

   একপর্যায়ে সাকি ভাই বলতে থাকেন, পাকিস্তান কী? আমার দেশের সম্পদ নিয়ে পাকিস্তান তৈরি করা হচ্ছে। এই পাকিস্তান হলো কতিপয় সামরিক জান্তা আর ভুট্টোর মতো পলিটিশিয়ানদের পাকিস্তান। রুখে দাও। সাকি আরো স্পষ্ট করে বলতে থাকেন,

এদেশ আমার। চাষি, মজুর, শ্রমিক, এদের রক্তে ঘামে তৈরি হওয়া ফসল সব পাকিস্তানে উঠছে। আমাদের দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। শেখ মুজিব সেটা ছয় দফায় স্পষ্ট করেছেন। ভাসানীও বলে এসেছেন, ওয়ালাইকুম আস সালাম। দেশপ্রেমিক তৈরি করো¾সুনীতির মতো, শান্তির মতো, ক্ষুদিরামের মতো। ঘরে ঘরে তৈরি হও, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শেখ মুজিবকে মুক্ত করে আনতে হবে আমাদের।

এসব আলোচনার পর রবীন্দ্র সঙ্গীত শুরু হয়, ‘বড়ো আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও ফিরাইও না জননী।’ সাকির এই ঐতিহাসিক বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা তুলে ধরে।

   পরের দৃশ্যে পুলিশের তাড়া। যুবকের দৌড়। (৩৯ মিনিট ২০ সেকেন্ড) দারারা দৌড়ে আত্মরক্ষা করছে। হাতে চোট পায়। বোনেরা সেবা শুশ্রুষা করে। অযথা হয়রানির জন্যে যেমন বকে, তেমনই ভাইয়ের জন্য গর্ব অনুভব করে। দারারা আগামীতে আরো বড়ো লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী অ্যাঙ্গলো-ইন্ডিয়ান এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক। শত্রু শত্রু খুনসুটি থেকে বন্ধুত্ব। প্রেম।

ছয়.

পর্দায় এবার বর্তমান। পূর্ব-নির্ধারিত রেস্তোরাঁয় দারা এসে পেয়ে যান স্যান্ড্রা অর্থাৎ তার প্রেমিকা রীনা ব্রাউনকে। দুজনের বয়স বেড়েছে। ৪০ বছর পর তাদের দেখা। এ যেনো নতুন বাংলাদেশ, নতুন ঢাকায় দুজন দুই আঙ্গিকে এক জায়গায়। স্বল্প সময়ের জন্য। কৈফিয়ত কে কাকে দেবে বোঝা যায় না। রীনা বলেন, ‘আমি ভেবেছি আর দেখা হবে না।’

   দারা এখন আগের মতো নন¾স্যুটেড-বুটেড। তাই তাদের দুজনেরই পরিচিত ফ্রান্সিসের সঙ্গে দারার দেখা হলেও কথা হয়নি। রীনা তার কাছ থেকেই দারার নম্বর পেয়েছেন। আজ দেখা হওয়ার পর রীনার শুধু মনে হচ্ছে, মানুষ বদলায় তাই বলে দারার মতো এতো! ফ্রান্সিস তাকে লক্ষ্মীবাজারে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই গলি, সেই চার্চ দেখে তার অতীত স্মৃতি ভেসে ওঠে। নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হন। সেসব কথা তিনি অকপটে বলে যাচ্ছেন।

   ঢাকায় রীনার আসার মূল কারণ হলো একটি সেমিনার। এর সঙ্গে তিনি খুঁজবেন দারাকে, যাবেন লক্ষ্মীবাজারের সেই পুরাতন গলিতে। রীনা এখন নারীবাদী। চারদিকে মেয়েদের নিয়ে যে অন্যায় হচ্ছে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে তার প্রতিবাদ করেন তিনি। ঢাকায় তার সব কাজ শেষ, এখন ফিরে যাবেন। তবে তার সব মনে আছে। এই ঢাকাতে তিনি বড়ো হয়েছেন। দারার সঙ্গে প্রেম তিনি ভুলতে পারেননি। অবশ্য ভুলতে চানও না।

   সেসময় দারা খুব সিরিয়াসলি রাজনীতি করতেন। বাড়ির লোকেরা সব মেনে নিয়েছিলো; তাকে সহযোগিতাও করতো। সময়ের মূল্যায়নে সেই সময় ছিলো দারার কাছে সেরা সময়; বিপরীতে স্যান্ড্রার কাছে সব চাইতে খারাপ সময়। কারণ যুদ্ধ মানুষকে দূরের করে দেয়। সব বদলে যায়। তবে দারা তার যুক্তি দেয়, সেই সময়ে তারা দুজন কাছে এসেছিলো। অবশ্য যুদ্ধের প্রাপ্তি বা অর্জন অনেক বড়ো; তবে তার জন্য মূল্য দিতে হয় অনেক বড়ো রকমের।

   দারার স্মৃতির পাতায় জমা আছে কতো কথা। স্যান্ড্রার সঙ্গে আছে তার অনেক স্মৃতি। তা বোঝাতে বাছাই করা সব স্মৃতি এক এক করে আসতে থাকে। সেসময়ের চায়ের দোকান; সেখানকার পুরনো আমলের বিশাল রেডিও। তাতে মেহেদি হাসানের গান¾‘মুঝে তুম কাভিভি ভুলা না সাকোগে .../ মুঝে তুম নজরসে ...।’ (এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে) দারা আর তার বন্ধু পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করছে। চাদর জড়ানো এক লোক তাদের পিছনে বসা। সহজে বোঝা যায় গুপ্তচর। সহজে বোঝানোর জন্য চলচ্চিত্রে হয়তো এমনটা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত গুপ্তচরদের ধরতে পারাটা এতো সহজ হয় না।

   সেই কঠিন পরিস্থিতিতে স্যান্ড্রার সঙ্গে নিয়মিত সময় কেটেছে দারার। কখনো বাড়ির সেই শিশুকালের লুকোচুরি খেলার চিলেকোঠায়, কখনো মাঠে ময়দানে, কখনো বুড়িগঙ্গায়। স্যান্ড্রা নিজেকে বাঙালি বানানোর চেষ্টা করেন। শাড়ি পরেন, বাংলায় কথা বলেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা শিখতে থাকেন। দারা তার রাজনীতির কারণ ও লক্ষ্য স্যান্ড্রাকে বোঝাতে সক্ষম হন। বাংলার এই নদী, মাটি, মানুষ সব আমার। স্যান্ড্রা বলেন, কবিতার মতো দেশ। কিন্তু তা আমার থেকেও আমার না। একদল বিদেশি লুটেরা তা দখল করে রেখেছে। তাদের সম্পর্কের কথা ক্রমান্বয়ে সবাই জানতে পারে। বন্ধুরা এর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বন্ধু মারুফ কথা বলেন।

   স্যান্ড্রার বাড়িতে আলোচনা হয়। বাবা জন তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন। তাকে বোঝান। ওই বাঙালিরা খুব জেদি, খুব অহংকারী, কখনো তোকে মেনে নেবে না। কেনো এসব করছিস? এটাতে সারাজীবন সাফার করবি। স্যান্ডি, আমার বাছা, তুই ওকে ভুলে যা। স্যান্ড্রার নিরুত্তোরতায় তার দৃঢ়তা প্রকাশ পায়।

   দারার বাড়িতে আলোচনা হয়। বাবার প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় দারার মাকে। ‘এ বাড়িতে বিজাতীয়রা ঢুকবে আমি ভাবতেই পারি না।’ তবু তাদের সম্পর্ক অটুট থাকে। চিঠিপত্র, দেখা-সাক্ষাৎ চলতে থাকে। দারা প্রতিবাদ করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, স্যান্ড্রা এ বাড়িতে আসবে। 

   স্যান্ড্রা ও দারার ধর্ম বিশ্বাসের জায়গা থেকে আদম ও হাওয়া সৃষ্টির যে কাহিনি ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মে বিবৃত আছে, তা নিয়ে দুজনের কথা হয়। ধর্ম বিশ্বাসে মিল থাকলেও এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের অনেক অমিল। ধর্ম মানুষকে এক না করে আলাদা করে তোলে। বিষয়টা বেশ মজার! ইভ অর্থাৎ হাওয়া হলো পৃথিবীর প্রথম প্রতিবাদী নারী। অর্থাৎ সৃষ্টির শুরুতেই সৃষ্টি পরিচালনায় ঈশ্বরের বিধি-বিধান নিয়ে নারীদের আপত্তি ছিলো, কারণ তারা জন্মের পর থেকে স্বয়ং ঈশ্বর দ্বারা নিপীড়িত। স্যান্ড্রা ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে বলেন, গড, আদম ও ইভকে তৈরি করার আগে তৈরি করেছিলো আদম ও লিলেথকে। আদমকে সিজদা করতে লিলেথ অস্বীকার করায়, গড রেগে গিয়ে তাকে ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে আদমের পাঁজরের হাড় দিয়ে ইভকে তৈরি করলো। এ সেই চিরকালের বিতর্ক। কে কার কর্তৃত্ব মানবে¾জ্ঞানের না শক্তির। ইয়াজিদি সম্প্রদায় তো ইবলিশকে সঠিক মনে করে। যুক্তি হলো, ঈশ্বরের সৃষ্টি একমাত্র ঈশ্বরকে ছাড়া আর কাউকে সিজদা করতে বা উপাসনা করতে পারে না। তাই ইবলিশ যখন বলেছিলো, এক ঈশ্বর ছাড়া আর কাউকে সিজদা করবে না, তখন তো সে ঠিকই বলেছিলো। সুতরাং সে গডের অনুগত, কখনোই শয়তান নয়। এসব কথা ছাড়িয়ে স্যান্ড্রাকে দারা শেখায়, ভালোবাসা মানে স্বাধীনতা।

সাত.

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ। ১০ ও ১৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে একশো ৬০টির মধ্যে একশো ৫৮টি কেন্দ্রে এবং প্রদেশে তিনশো ১০টির মধ্যে দুইশো ৯৮টি আসন পায়। এলো ১৯৭১। বঙ্গবন্ধু ১৫ জানুয়ারি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি ডাকার অনুরোধ করলেন। কিন্তু তার কথা রাখা হলো না। উত্তাল দেশ। ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো ষড়যন্ত্রে মেতে উঠলো। শেখ মুজিব, ভুট্টো তথা পশ্চিমাদের আধিপত্য মেনে নিলেন না। তাই তিনি ১৪ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে নির্বাচিত নেতাদের শপথ করালেন। ঘোষণা করলেন ছয় দফার ভিত্তিতে তিনি এগোবেন; ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে বসে সংবিধান প্রণয়ন করবেন। পশ্চিমারা ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি নিয়ে টালবাহানা করছে। এলো মার্চ। ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ক্ষমতা হস্তান্তর অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলেন। ২ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে হলো মিছিল বিক্ষোভ। সেখানে গুলি হলো। হতাহত হলো অনেক। ৩ মার্চ এক সংক্ষিপ্ত সভায় বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। ইয়াহিয়া খান ১০ মার্চ গোলটেবিল বৈঠক এবং ২৫ মার্চ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে আমন্ত্রণ জানালেন বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু তার এই আমন্ত্রণকে নতুন ষড়যন্ত্রের পায়তারা বলে অভিহিত করলেন। এরপর জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি করলেন এবং ৭ মার্চ ভাষণের মধ্য দিয়ে ডাক দিলেন স্বাধীনতার। দেশের পরিস্থিতি তখন ভীষণ খারাপ। দারা ও স্যান্ড্রার বিশেষ দেখা হয় না। ব্যস্ত হয়ে পড়েন দারা। স্যান্ড্রার তখন অপেক্ষার পালা। বর্তমানে বসে দুজন সেই সময়টাকে স্মরণ করেন।

   বেলুচের কসাই টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রধান করে পাঠানো হয়। গভর্নর নিযুক্ত হন। আসে চরম আঘাত। ২৫ মার্চ রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে শুরু হয় অপারেশন সার্চ লাইট। নির্বিচারে গুলি করে চালানো হয় বাঙালি নিধন। বাঙালিদের প্রতিরোধে এ নিধন রূপান্তর হয় মুক্তিযুদ্ধে। ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়। ধর্ষিত-লাঞ্চিত হয় দুই লাখ নারী। সে যুদ্ধে দারাকে যেতে হয় ভারতে। সব অবাঙালিদের মতো স্যান্ড্রাদেরকেও সে যুদ্ধের খেসারত দিতে হয় অনেক বেশি। তার চাচাকে হত্যা করা হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তাদের গোডাউন। তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে হয়। বাড়ি থেকে করাচি যাওয়ার কথা উঠলে স্যান্ড্রা প্রতিবাদ করেন। ঠিক হয় কনভেন্টে মাদার রোজের আশ্রয় নিবে তারা।

   যুদ্ধ শেষ হয়। দারার বাবা চলে যান না ফেরার দেশে। সংসারের হাল ধরতে হবে তাকে। মা তাকে আশ্বস্ত করেন। স্কলারশিপ নিয়ে দারা চলে যান জার্মানি। ফিরে এসে স্যান্ড্রাকে বিয়ে করবেন। যুদ্ধ সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। বাস্তবতা মোকাবিলা করতে শিখেছেন স্যান্ড্রা। কঠিন আঘাতে স্যান্ড্রাকে দেশ ছাড়তে হয়। দেশে ফিরে স্যান্ড্রাকে কোথাও খুঁজে পান না দারা। মারুফকে জিজ্ঞাসা করেন। উল্টো তিনি দারাকে বলেন, তোরা তো চিঠি লিখতিস? জবাবে দারা যা বলেন তা বিস্ময়কর¾ও যা লিখতো তা বোঝা কষ্টকর। কেমন যেনো কষ্ট, খাপছাড়া। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চরম সেই কথাটা বলে ফেলেন দারা, ‘মারুফ, এই জন্যে যুদ্ধ করেছিলাম। অন্য একটি সম্প্রদায়কে ঘৃণা করার জন্য। একটা কমিউনিটিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার জন্য। এ দেশটা তো ওদেরও ছিলো। এমন তো কথা ছিলো না। এদেশটা আমাদের সবার হবার কথা ছিলো।’ মারুফের উত্তর দর্শককে বিদ্রোহী করে তোলে। তার ভাষায়, ‘একটা দেশ, স্বপ্ন; ভাবি, এই জন্য কি আমরা যুদ্ধ করেছিলাম? এতোকিছুর পরেও আমরা দেশটাকে বদলাতে পারলাম না।’

   আবার বর্তমানে এসে পরিস্থিতি বর্ণনা করেন স্যান্ড্রা, ‘পাপা আমাদেরকে ইউ কে পাঠিয়ে দিলো জোর করে। একটা নতুন স্থান, নতুন দেশ আমি তোমাকে সবকিছু জানিয়েছিলাম।’ ততোদিনে ঠিকানা বদল হয়েছে দারার, ফলে স্যান্ড্রাকে তিনি হারিয়ে ফেলেন।

   শেষ দিকে এসে স্যান্ড্রাকে জিজ্ঞাসা করেন দারা, ‘আচ্ছা রীনা, এ দেশটাতে কেনো থেকে গেলে না? এদেশটাকে কেনো নিজের করে নিলে না?’ রীনার উত্তরটা অভাবনীয়, ‘এদেশ কখনো আমার ছিলো না। ইংল্যান্ডে গিয়েও বুঝলাম ওটাও আমার দেশ না। আসলে আমরা রুটলেস। আমার কোনো দেশ নেই।’ সেই সপ্তপদীর যন্ত্রণা আজও রয়ে গেছে পৃথিবীতে¾রাষ্ট্র সীমানার শোষণ-যন্ত্রণা, সভ্যতার যন্ত্রণা, অসভ্যতামি¾এ চলছে, চলতে থাকবে। ‘রাষ্ট্রযন্ত্র শুকিয়ে মারার যে লড়াই’ তা আজ সুদূর পরাহত।

এজন্য তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত দেশ খুঁজছো? এটা খুবই দুঃখের। তুমি বুঝবে না। স্যান্ড্রা বলেন। দারা ক্ষমা চেয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাতে যেয়েও পারেন না। আবারও প্রশ্ন করেন, ‘আচ্ছা রীনা, তোমরা যদি এদেশ ছেড়ে না যেতে তাহলে কী হতো?’ ‘আমাদের কিছু কি হতো?’ ‘নিশ্চয় হতো। তোমাদের একটা জন্মগত অধিকার আছে।’ ‘আউটকাস্ট। আমি আউটকাস্টই থাকতাম। হয়তো তোমার সঙ্গে সামাজিকভাবে বিয়ে হতো।’ দারা অন্য প্রসঙ্গে গেলেও স্যান্ড্রা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা যেনো আমাদেরকে কী বলে ডাকতে?’ ‘ফিরিঙ্গি। আমি কিন্তু কখনো বলতাম না।’ ফিরিঙ্গি শব্দটা স্যান্ড্রা এমনভাবে উচ্চারণ করেন তাতে বোঝা যায়, মনের ভিতরে বিতৃষ্ণা চনমন করে ওঠে। বার বার প্রশ্ন জেগে ওঠে দেশটার চার মূলনীতির অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে; যা সবকিছুর সঙ্গে ষড়যন্ত্রকারীদের কব্জায় চলে গেছে। বার বার মনে হয়েছে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা অনেক কঠিন।

আট.

রীনা, দারা দুই জনের মনের গভীরের অনুভূতি নিয়ে কথা হয়। স্যান্ড্রা অকপটে স্বীকার করেন অতীত তাকে তাড়িত করে, ব্যথিত করে মথিত করে। দারার অভিব্যক্তিও ব্যতিক্রম হবার নয়। দুজনে সেসব মেনে নেয়। দারা বলেন, ‘এই যে টিপিকাল লাইফস্টাইলএ আমি চাইনি। কিন্তু অতীত আমাকে কখনো ছাড়েনি। অনেকে অবশ্য সব ভুলে গেছে। তারা প্রকৃত সুখী।’ অতীত কাউকে ছাড়ে না, ‘হে অতীত তুমি কাজ করে যাও গোপনে।’ এ প্রশ্ন বার বার ফিরে আসবেবাংলার অতীত কি বাংলাকে, বাঙালিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে অতীত সুখী, সমৃদ্ধ জীবনে?

   সূর্য অস্তাচলে। স্যান্ড্রার ফেরার সময় হয়। চারিধারে গোধূলি বেলার মায়াবী রঙের মেলা। শেষ কাপ চা-ও শেষ হয়ে যায়। স্যান্ড্রার ‘ফুলিশ চাইল্ড’ নিয়ে কথা বলতে বলতে আবার ২৫ মার্চ। কাহিনির শেষটা এরকমই, স্যান্ড্রারা কারো মাধ্যমে নয় বরং জন্মসূত্রে এই মাটির সঙ্গে জড়িত।

   মুক্তিযোদ্ধারাও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাদের শহীদ সাথিরা তাদের সঙ্গেই আছে। দারার কথায়, ‘এসব কিছু কেউ বোঝে না। এটাই বুঝি নিয়তি, এটাই বাস্তব।’ আর স্যান্ড্রার কথা হলো, ‘যুদ্ধের শিক্ষা হলো যুদ্ধমুক্ত পৃথিবীর আকাক্সক্ষা।’ কিন্তু রীনা ব্রাউন শেষ হয়েও শেষ হয় না। বাস্তবে ফিরে আসেন দারা। ভালোবাসা মানে স্বাধীনতা। এই প্রত্যয় নিয়ে জীবন চলবে। দারা ও স্যান্ড্রা এই সত্য মেনে নিয়ে যে যার গন্তব্যে ফিরে চলেন। সামনে চলাটাই জীবন।

লেখক : ফারুক আলম, সাহিত্যিক ও ছড়াকার। তিনি খুলনায় একটি কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়ান। তার প্রকাশিত ছড়ার বই ‘গোলাপ-কাঁটা’।

falamsmc@gmail.com

 

  

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন