তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি
প্রকাশিত ০২ মে ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
গণতন্ত্রের অস্থিমজ্জায় নকশালি, ভূতের ভয় নিউটন
তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি

ভারতীয়দের চোখে নিউটন
২০১৭ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে ভারতের নয়া দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হই। নতুন দেশ নতুন মানুষ নিয়ে স্বভাবসুলভ কৌতূহল ছিলোই, পাশাপাশি আগ্রহ ছিলো পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি বলিউড নিয়ে। কারণ ইতোমধ্যেই প্রায় সব শ্রেণির মানুষের কাছে বলিউড অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান বাংলাদেশে। তবে আমার কৌতূহলের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলো ভারতীয় দর্শক, তারা কীভাবে দেখছে বলিউড ইন্ডাস্ট্রিকে। এক্ষেত্রে প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, বাংলাদেশে বসে আমরা বলিউডকে যেভাবে সর্বভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখি, বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। মূলত হিন্দি ভাষার রাজ্যগুলোতেই বলিউড নিয়ে উন্মাদনা। আর অন্য ভাষাভাষী রাজ্যের মানুষ এখনো নিজেদের স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্রকেই সেরা মনে করে। আমি যখন চলচ্চিত্র নিয়ে মহারাষ্ট্র বা দক্ষিণ ভারতের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলি; তাদের মত, বলিউড শুধু বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, সামাজিক সমস্যাগুলো পাশ কাটিয়ে নিছক বিনোদন দেওয়ার চেষ্টায় থাকে। অথচ এর তুলনায় মারাঠি বা মালায়লাম চলচ্চিত্রগুলো বেশি জীবন-ঘনিষ্ঠ ও বাস্তবধর্মী। এছাড়াও হিন্দি ভাষার আগ্রাসন নিয়েও তাদের চিন্তিত হতে দেখেছি। যা দেখে এটাই প্রতিপন্ন হয়, ভারতে হিন্দি ভাষা বনাম অন্যান্য ভাষার চলচ্চিত্রের মধ্যে একধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলমান। এই চিন্তা থেকেই আমি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া নিউটন চলচ্চিত্রটি নিয়ে তাদের মতামত বোঝার চেষ্টা করি।
অমিত ভি মাসুরকার পরিচালিত নিউটন মুক্তি পেলে সহপাঠীদের মধ্যে আগ্রহ দেখতে পেলাম মূলত দুটি কারণে¾প্রথমত, এর নাম ভূমিকায় রয়েছেন রাজকুমার রাও, যাকে মূলধারার বলিউড চলচ্চিত্র বলতে যা বোঝায় সে ধরনের চলচ্চিত্রে কম দেখা যায়। তার মানে দর্শক ধরে নিয়েছে নিউটন-এর গল্প একটু ভিন্ন। দ্বিতীয়ত, অস্কারে এর অফিসিয়াল এন্ট্রি। ২০১৭-এর দিওয়ালির ছুটির দিনে আমরা বেশ কয়েকজন মিলে নিউটন দেখতে যাই নয়া দিল্লির বিলাসবহুল একটি বিপণিবিতানের সিনেপ্লেক্সে। সেই শো-এ আমরাসহ সর্বসাকুল্যে দর্শক ২৫ জন। আমি ঠিক আঁচ করতে পারলাম না, ছুটির দিন বলে দর্শক এতো কম, নাকি একটু ভিন্ন গল্পের চলচ্চিত্র বলে; আবার এমনও হতে পারে এই সিনেপ্লেক্সটি কেবল উচ্চ মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত শ্রেণির নাগালের মধ্যে। দর্শক সংখ্যা যাই হোক আমি এক নিঃশ্বাসেই সেদিন শেষ করেছিলাম নিউটন। শো শেষে ভারতীয় সহপাঠীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম কেমন লাগলো? তাদের উত্তর ছিলো এক কথায় অসাধারণ। অসাধারণ ঠিক কী কী কারণে বলছে, তারা এর উত্তরে যা বলেছিলো তার সারাংশ নিচে তুলে ধরছি। এখানে একটা কথা বলা দরকার মনে করছি, এই উত্তরদাতাদের বেশিরভাগই কিন্তু আমার মতোই সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী।
ভারতীয় যে কজন দর্শকের সঙ্গে কথা বলেছি, একটি ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত ছিলো যে, পুরো সময়টি ধরে নাম ভূমিকায় রাজকুমার রাওয়ের অভিনয় ছিলো এক কথায় অসাধারণ। এছাড়া পঙ্কজ ত্রিপাঠী, অঞ্জলি পাটিলরাও তাকে সঙ্গত করেছে নিজেদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে। পাশাপাশি আবহসঙ্গীতের ব্যবহার ও ক্যামেরার কাজে নির্মাতা যেনো সত্যি সত্যি দর্শককে নিয়ে যেতে পেরেছেন ছত্তিশগড়ের নির্জন অরণ্যে। এছাড়াও একটি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রকাঠামোর ভিতর একজন সৎ সরকারি কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে, যাকে প্রতি মুহূর্তে লড়তে হয়েছে সহকর্মীদের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে নিউটন-এ বর্তমান ভারতের বাল্যবিবাহ, যৌতুকপ্রথা, বর্ণপ্রথার মতো বেশকিছু সামাজিক সঙ্কট উঠে এসেছে। এছাড়া পূর্বাঞ্চলের নকশাল অধ্যুষিত ছত্তিশগড় রাজ্যের রাজনৈতিক সঙ্কট তো আছেই। যেখানে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠী শুধু রাজনৈতিক নেতাদের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এর বাইরে তাদের কোনো অস্তিত্ব ভারত রাষ্ট্রে নেই। আবার এই নির্বাচনি ব্যবস্থারও কোনো প্রভাব এই আদিবাসীদের জীবনে পড়ছে না, কারণ তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতনই নয়। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে কীভাবে হিন্দি ভাষার আগ্রাসনের সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের; শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় medium of instructionহলো হিন্দি; যদিও এই সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষই তা বোঝে না। এছাড়াও পুলিশ ও নকশাল উভয়ের দ্বারা আদিবাসীরা কীভাবে নিগ্রহ এবং নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে এবং এই দুই পক্ষের কাছ থেকেই তারা যে মুক্তি পেতে চায় সেটিও নিউটন-এ উঠে এসেছে।
আমি যখন সহপাঠীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম নকশাল বা মাওবাদীদের সম্পর্কে তোমাদের মতামত কী? আমার একজনের উত্তর ছিলো এমন¾নকশালবাদীরা ওইসব এলাকায় নিয়মিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়, তাদের আরোপিত নিয়মকানুন না মানলে আদিবাসীদের শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। তারা আদিবাসীদের হত্যা, বিভিন্ন অঙ্গহানি করে এবং নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়। আরেকজনের মতে, নির্মাতা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অসহায়ত্ব তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন আত্মা সিং চরিত্রের মাধ্যমে। তারও মত, মাওবাদীরা যে সহিংস পথ অবলম্বন করছে সেটি সঠিক নয়।
এছাড়া নিউটন-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর প্রধান চরিত্রটি দলিত বা নিম্নবর্ণের মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী। আমার এক সহপাঠী বলে, ‘বলিউডে নায়ক হিসেবে তুমি মিশ্র, মেহতা এদেরকেই বেশি দেখবে, কুমার সহজে দেখতে পাবে না; অথচ নিউটন হলো কুমার, (এই নায়ক বলতে সে বলিউড চলচ্চিত্রগুলোতে উপস্থাপিত কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোকে বুঝিয়েছে, যেখানে বেশিরভাগ কাহিনিই আবর্তিত হয় ঋগ্বেদ এ বর্ণিত চতুর্বর্ণ¾ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্রকে কেন্দ্র করে। নিউটন এই চার বর্ণের বাইরের মানুষ) তার মানে পরিচালক বলিউডের মূলধারা ভাঙতে চেয়েছেন। আর এতোসব প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিম্নবর্ণ থেকে উঠে আসা নিউটন নিজের সততা ও দায়িত্বশীলতার প্রতি অটল থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করে গেছেন, যা দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্যই অনুসরণীয়।’
অল্প কথায় নূতন কুমার তথা নিউটন-নামা
অমিত মাসুরকারের নিউটন’কে বলা হচ্ছে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে বলিউডে নির্মিত সর্বোৎকৃষ্ট রাজনৈতিক স্যাটায়ার।১ নিউটন ৬৩তম Filmfare Award G Best Film I Filmfare Award for Best Story বিভাগ দুটিতে পুরস্কৃত হয়। এছাড়াও রাজকুমার রাও সেরা অভিনয়শিল্পী হিসেবে জিতে নেন Asia Pacific Screen Award। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে হিন্দি ভাষার সেরা কাহিনিচিত্র বিভাগে নিউটন পুরস্কার পায় এবং পঙ্কজ ত্রিপাঠী জিতে নেন বিশেষ পুরস্কার।২ এতোসব পুরস্কারের বাইরে নিউটন নিয়ে আলোচনার আরো গুরুত্বপূর্ণ যে কারণগুলো আছে সেগুলো হলো :
ক. নিউটন-এর বিষয়বস্তু ভারত রাষ্ট্রের অন্যতম সঙ্কটময় রাজ্য ছত্তিশগড়কে কেন্দ্র করে।
খ. সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দাবিদার ভারত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পোস্টমর্টেম।
গ. রাষ্ট্র বনাম মাওবাদী দ্বন্দ্ব উপস্থাপনায় নির্মাতার ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান।
যদিও দর্শক (আমার সহপাঠীরা) এবং কোনো কোনো চলচ্চিত্রবোদ্ধার৩ মতে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের৪ দাবিদার ভারত রাষ্ট্রের মুখে সজোরে চপেটাঘাত করেছে নিউটন। কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, এই চপেটাঘাতের গতিবেগ ঠিক কতোটুকু এবং কীভাবে ছিলো? এর আঘাতে কি এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধসে পড়বে অথবা এই ব্যবস্থার সংস্কার সাধন সম্ভব হবে; নাকি স্বমহিমায় বিগত বছরের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড তৈরি করে শক্তপোক্ত হয়ে গেঁড়ে বসবে, বিস্তৃত করবে তার শেকড়?
প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করার আগে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে নিউটন-এর গল্প উপস্থাপন জরুরি। ভারত রাষ্ট্রের ছত্তিশগড় প্রদেশের দলিত পরিবারের সন্তান নূতন কুমার। যে কিনা বন্ধুদের হয়রানি থেকে নিষ্কৃতি পেতে নূতন থেকে নিউটন হয়ে যান। ভারতীয় জাতীয় নির্বাচনে নিউটনের অভিজ্ঞতা নিয়ে গড়ে উঠেছে নিউটন-এর কাহিনি। নিউটন সদ্য গ্রাজুয়েশন শেষ করে কালেক্টরেট অফিসের ক্লার্ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজের অফিসে সরকারি কর্মকর্তাদের অসততা নিয়ে তিনি অত্যন্ত পীড়িত; যার বর্ণনা উঠে আসে চলচ্চিত্রের ১৪ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে ইলেকশন ইন্সট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্বরত সঞ্জয় মিশ্রের সঙ্গে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। নিউটনের ভাষ্য, ‘অফিসে লোকজন তাস খেলে, আঙুল কাটে, বসে বসে সময় কাটায়, বিনা ঘুষে কোনো কাজ করে না।’ কাহিনির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিউটনের এই সততা ও দায়িত্বশীলতার গল্পই উপস্থাপিত হয়েছে বার বার। যার শুরুটা হয় অল্পবয়সী নারীকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানানোর মধ্য দিয়ে এবং পরিসমাপ্তি ঘটে নিয়মানুবর্তিতা পালনের স্বীকৃতি হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে। এবার মূল গল্পে প্রবেশ করা যাক। নিউটন একবার নির্বাচনের সময় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্য কোনো স্বেচ্ছাসেবী যেতে রাজি না হওয়ায় তিনিই ছত্তিশগড় প্রদেশের নকশাল আতঙ্কিত এলাকা কুন্দনার-এ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নেন। নির্বাচনি এলাকায় পৌঁছার পর ভোট গ্রহণের উদ্দেশ্যে তিনি ভোটকেন্দ্রে যেতে চাইলে, সেখানে দায়িত্বরত পুলিশের সহকারী কমান্ডার আত্মা সিং তাদেরকে সেখানে নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ হিসেবে তিনি যুক্তি দেখান, যেখানে ভোটকেন্দ্রটি অবস্থিত, সেখানে মাত্র ছয় মাস আগেও সরকারি বাহিনীর অভিযান চলেছে, গ্রামের লোকজন কেউ সেখানে থাকে না। উপরন্তু নকশালবাদীরা ভোট বয়কট করেছে। তিনি এও বলেন, সেখানকার গ্রামবাসীরা মূর্খ ভোট হলো কি হলো না, সেটা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। আর এ ধরনের স্পর্শকাতর এলাকায় এভাবেই নির্বাচন হয়। উদাহরণস্বরূপ তিনি কাশ্মীরের শ্রীনগর এবং মনিপুরের উদাহরণ দেন।
এতো কিছুর পরও নিউটনকে নিরাশ করতে পারেন না আত্মা সিং; দলবল নিয়ে তাদের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে বেশ কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে দেখা হওয়ায় নিউটন তাদেরকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা না বোঝায় নিউটনকে ফাঁকি দিয়ে স্থানীয়দের ভোট দেওয়ার সময় নিয়ে মিথ্যে তথ্য জানায় পুলিশ। পরে স্থানীয় বিএলও মালকো নেতামের সাহায্যে তাদেরকে সঠিক তথ্য জানাতে সক্ষম হন নিউটন। তবে ভোট শুরুর অনেক পরেও কোনো ভোটারকে ভোট দিতে আসতে দেখা যায় না। নিউটন তখন পুলিশদের অনুরোধ করেন গ্রামে গিয়ে ভোটারদের নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু এক্ষেত্রে পুলিশ অস্বীকৃতি জানায়। অথচ তার কিছুক্ষণ পরেই পুলিশের বড়ো কর্মকর্তার ফোনে বিদেশি সাংবাদিক আসার খবরে তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ। এরপর জোর করে গ্রামের লোকজনদের ভোট দিতে নিয়ে আসা হয়। আদিবাসীরা কেনো ভোট দিতে আগ্রহী না, কারণ হিসেবে বলা হয়¾তারা উভয় সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে, ভোট দিতে আসলে তারা নকশালবাদীদের চক্ষুশূল হবে, না দিলে পুলিশের। সহজসরল মানুষ আসলেই বুঝতে পারে না ভোট দিলে তাদের কী লাভ? এর উত্তর পাওয়া যায় নিউটনের সহায়তাকারী স্বেচ্ছাসেবী লোকনাথের কণ্ঠে, ‘এখানে একটি মাত্র পরিবর্তন আসে। ভোটের পর নেতাদের ছবির পরিবর্তন হয়। মানুষ খেতে পাক, না পাক তাদেরকে ভোট দিতে হয়।’ তবে গ্রামবাসীদের ধরে নিয়ে আসার পর নির্বাচন কর্মকর্তারা আরেক সঙ্কটে পড়ে¾গ্রামের সাধারণ মানুষ ডিজিটাল ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন সম্পর্কে একেবারেই অনভিজ্ঞ। তাদেরকে ভোটিং মেশিনের ব্যবহার শেখানোর সময় নিউটন খেয়াল করেন এখানকার কোনো প্রার্থীকেই ভোটাররা চেনে না!
একসময় আদিবাসী ভোটাররা প্রশ্ন করে বসে, ভোট দিয়ে তাদের কী লাভ? নিউটন তার সমগ্র প্রচেষ্টা দিয়ে ভোট দেওয়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর চেষ্টা করেন। এদিকে সাংবাদিক এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পৌঁছানোর উপক্রম হলে ভোট গ্রহণের দায়িত্ব আত্মা সিং তার নিজের হাতে তুলে নেন। আত্মা সিং সামন্তীয় প্রক্রিয়ায় নিপীড়িত আদিবাসীদের বুঝতে বাধ্য করেন, এই সাহেবরা কষ্ট করে শহর থেকে এসেছে তাদের ভোট নিতে; আর ভোট দেওয়াও তাদের দায়িত্ব। তিনি এও বলেন, নেতাদের চেনার কোনো প্রয়োজন নেই; ভোটের প্রতীকগুলো অনেকটা খেলনার মতো, যেটা ভালো লাগবে তারা যেনো সেটাতেই ভোট দেয়। ভোট গ্রহণ শুরু হয় এবং সাংবাদিকরা সম্প্রচার শুরু করে এ ধরনের মাওবাদী সন্ত্রাসী কবলিত এলাকাতেও কীভাবে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভোটারদের উপস্থিতি দেখে ভীষণ খুশি হয়। এবং পরোক্ষভাবে তারা নিউটনকে বোঝানোর চেষ্টা করে ৭৬ জন ভোটারের মধ্যে ৩৯ জনের ভোট গ্রহণ সম্ভব হয়েছে, এখন ভোট গ্রহণ শেষ করলেও কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু নিউটন তার দায়িত্বে অটল থাকেন এবং নির্ধারিত সময়েই ভোট গ্রহণ শেষ করতে চান। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা চলে যাওয়ার পর পরই গুলির শব্দ শোনা যায় এবং পুলিশ বলতে থাকে তাদের ওপর হামলা হয়েছে। ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা পুরো দলটি দ্রুত সব গুছিয়ে নিরাপদ স্থানের উদ্দেশে রওনা হয়। ফিরে যাওয়ার সময় নিউটন বুঝতে পারেন তাকে ভোটকেন্দ্র থেকে সরানোর জন্যই হামলার ঘটনা সাজানো হয়েছে। ফলে তখনই তিনি পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে আবার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ তখনো তিনটা বাজতে বাকি, ভোটাররা এসে ফিরে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে পালাতে বাধা দেয়। এর কিছুক্ষণ পর তাদের সঙ্গে দেখা হয় কয়েকজন ভোটারের, যারা কিনা ভোট দেওয়ার জন্য যাচ্ছিলো। নিউটন তাদের ভোট নিতে চাওয়ায় পুলিশ বাধা দিলে তিনি পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদেরকে বাধ্য করেন ভোট নিতে। নিউটন এ সময় আত্মা সিংকে প্রশ্ন করেন, কেনো এরকম নাটক সাজানো হলো? আত্মা সিং জানান, সরকার তাদের এই ধরনের অনিরাপদ স্থানে অবস্থান বা অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি দেয়নি, তাই তিনি জেনেশুনে এই নির্বাচন পিকনিকের জন্য তরুণ কর্মকর্তাদের বিপদের সম্মুখীন করতে পারবেন না। এজন্য তিনি যতো দ্রুত সম্ভব এই জায়গা ত্যাগ করতে চান।
এর প্রত্যুত্তরে নিউটন জানান, আত্মা সিংয়ের কাছে এটা পিকনিক হতে পারে, কিন্তু তার কাছে এটি দায়িত্ব। তাই নিউটন তার দায়িত্ব পালন করেন ঘড়ি ধরে নির্ধারিত সময় বিকেল তিনটা পর্যন্ত। মূলত এটিই চলচ্চিত্রের মূল প্লট; চলচ্চিত্রজুড়েই নিউটন ও আত্মা সিংয়ের যে দ্বন্দ্ব দেখা যায় সেটা কিন্তু দায়িত্ববান ও দায়িত্বহীনের দ্বন্দ্ব নয়; বরং দুই দায়িত্ববানের দ্বন্দ্ব। নিউটন তার দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে ভোট গ্রহণ করতে তৎপর, বিপরীতে আত্মা সিং তৎপর তার বাহিনীর লোকজনকে বাঁচাতে। তবে শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের জন্য পুরস্কার পেতে দেখা যায় নিউটনকে। ফলে নিউটন হয়ে ওঠে একজন সৎ ও দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার গল্প।
শেষ থেকে শুরু
নিউটন-এর দুটি দৃশ্য এবং সর্বশেষ গানটি মনোযোগ দিয়ে লক্ষ না করলে যেকোনো দর্শকই মনে করতে পারে, প্রধান চরিত্র নিউটন ভারত রাষ্ট্রের ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কার সাধনে উঠে পড়ে লেগেছেন। প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে হয়তো এই ধরনের ব্যবস্থা পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু আসলেই কি তাই? এবার দেখা যাক কী আছে সেই গানে।
গানটি বাংলায় ভাষান্তর করলে এরকম দাঁড়ায়¾ ‘চলো নিজের কাজ করো/ নিজ বুদ্ধির পরিচয় দেওয়া/ কাউকে পরামর্শ দেওয়ার দরকার নেই/ আশপাশে কী চর্চা হচ্ছে তাতে মনোযোগ না দিয়ে/ নিজের কাজ করে যাওয়া।’ এখন প্রশ্ন, এভাবে নিজের কাজ করে গেলে আসলে কী হবে? চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে নির্বাচন ইন্সট্রাক্টর ও নিউটনের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নির্মাতা নিজেই এর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই নিউটন-এর ১৫ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে ইলেকশন ইন্সট্রাক্টর সঞ্জয় মিশ্রকে দিয়ে নিউটনের তথা দর্শকের উদ্দেশে নির্মাতা উপদেশ বাণী উচ্চারণ করেন এভাবে¾ ‘সততার সঙ্গে আপনি আপনার কাজ করতে থাকেন, দেখবেন দেশ এবং সমাজ আপনা-আপনি এগিয়ে যাবে।’ আবার এক ঘণ্টা ২১ মিনিট আট সেকেন্ডে মালকো নেতামও প্রায় একই ধরনের উপদেশ বাণী শোনান নিউটনকে¾ ‘কোনো বড়ো কাজ একদিনে হয় না, জঙ্গল তৈরি হতেও বছরের পর বছর লেগে যায়।’ এই সংলাপের মাধ্যমে নির্মাতা আসলে কী বলতে চেয়েছেন? সমাজ বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন না করে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করলে তা এমনি পরিবর্তন হয়ে যাবে? সেটা কি সম্ভব? যদি সম্ভবই হয়, তাহলে নিউটন ইন্সট্রাক্টরের সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে যখন সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার কথা বর্ণনা করেন, তখন ১৪ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে ইন্সট্রাক্টরকে বলতে শোনা যায়¾ ‘চাকরির প্রথম প্রথম সবাই তোমার মতোই চিন্তা করে, কিন্তু ধীরে ধীরে তুমিও সেই কর্মকর্তাদের মতোই হয়ে যাবে।’ এর মধ্যে দিয়ে নির্মাতা নিজেই তার বক্তব্যকে দ্বান্দ্বিক করে তোলেন।
দর্শক মনেও এ প্রশ্নটা জাগা স্বাভাবিক, কোন পথে সমাজের মানুষের মুক্তি সম্ভব¾মানুষ কি তার সততার মাধ্যমে আদৌ সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, নাকি দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজকাঠামোর ভিতরে বাস করতে করতে নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে? যদিও নির্মাতা প্রথম পথটি বেছে নিয়েছেন, কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়, কেনো এই পথ নির্মাতা বেছে নিলেন? Movies and the Reagan Presidency: Success and Ethics গ্রন্থে অধ্যাপক ক্রিস জর্ডান (Chris Jordan) বর্ণনা করেন, ৮০’র দশকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট এবং জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী রোনাল্ড রিগানের নেতৃত্বে হলিউড চলচ্চিত্রের কাহিনি বিন্যাসে প্রটেস্ট্যান্ট এথিক্সের ছাপ পড়া শুরু হয়। যেখানে কাহিনিগুলোর মূল বক্তব্যই ছিলো¾ ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। তোমার অলসতা এবং অযোগ্যতার কারণেই তুমি দরিদ্র, দরিদ্রতা দূর করতে হলে অবশ্যই তোমাকে পরিশ্রম করতে হবে।’ এই সময় থেকেই চলচ্চিত্রে সামাজিক জটিল সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং নায়কের পরিশ্রম এবং সাহসিকতা প্রদর্শনই কাহিনির মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
আর হলিউডের এই চলচ্চিত্রের সাফল্য দেখে অন্যান্য দেশের নির্মাতারাও তাদের অনুসরণ করা শুরু করে।৫ অমিতকেও অনেকটাই প্রটেস্ট্যান্ট এথিক্স আক্রান্ত নির্মাতা বলে মনে হয়েছে। যেখানে তিনি রাষ্ট্র এবং আদিবাসী সম্পর্ক, রাষ্ট্র এবং নকশালবাদীদের সম্পর্ক, কিংবা আদিবাসী এবং নকশালদের মধ্যকার সম্পর্ক অনেকটাই ধোঁয়াশা রেখে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সততাকে। এখানে লক্ষ করার বিষয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়েও নির্মাতা বর্তমান সময়ের প্রবণতাগুলোকে অনুসরণ করে মূল চরিত্রের গায়ে অরাজনৈতিক ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকেই যায়, অরাজনৈতিক হয়ে কি রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব?
দলিত রাজনীতি নিয়ে দুটি কথা
চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম নূতন কুমার তথা নিউটন কুমার, এখানে তিনি নিজের নামের শেষে কোনো পদবি ব্যবহার করছেন না। কিন্তু আমার একজন সহপাঠী যখন বললো, এই চলচ্চিত্রটির নায়ক দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন, আমার একটু খটকা লাগলো। নিউটন পুনরায় দেখতে গিয়ে খেয়াল করলাম তিন মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে নিউটনের ঘরে বাবাসাহেব আম্বেদকার-এর ছবি ঝোলানো। তার মানে দর্শক ধরেই নিচ্ছে, আম্বেদকারের ছবি ঘরে থাকা মানে দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত। হিন্দু সমাজের বর্ণ বিভাজন নিয়ে বেশিরভাগ মানুষই জ্ঞাত। ঋগ্বেদ আধারে বিভাজিত চার বর্ণ¾ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র। তবে এর বাইরেও কিছু মানুষের অস্তিত্ব ভারতজুড়েই রয়েছে। যারা জন্ম ও পেশাগত কারণে যুগের পর যুগ ধরে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার। উচ্চবর্ণীয় মানুষেরা এদেরকে অস্পৃশ্য মনে করে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জ্যোতিরাও ফুলে প্রথম দলিত শব্দটির ব্যবহার করেন এই বিভাজিত শ্রেণির উদ্দেশে। যদিও ভারতীয় সংবিধান দলিত শব্দটি গ্রহণ না করে schedule casteক্যাট্যাগরির অন্তর্ভুক্ত করেছে তাদের।
১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর ড. আম্বেদকার এই অস্পৃশ্য মানুষের পক্ষ নিয়ে হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন, যা পরবর্তী সময়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।৬ এরপর থেকেই দলিত জনসাধারণ নিজেদের আম্বেদকারের অনুগামী হিসেবে মনে করে এবং নিজেদের দলিত হিসেবে অস্বীকার করে আম্বেদকারপন্থি হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুরু করে। কিন্তু এখনো নিম্নবর্ণের মানুষদের চিহ্নিত করতে দলিত শব্দটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বহুল প্রচলিত। আর এই সম্প্রদায়ের মানুষ সামাজিক নিগ্রহ থেকে রেহাই পেতে নিজেদের পদবি ব্যবহার না করে কুমার ব্যবহার করে থাকে। নিউটন-এর কেন্দ্রীয় চরিত্রকেও নির্মাতা তেমনভাবেই উপস্থাপন করেছেন। এবং যখন নিউটনের ঘরে আম্বেদকারের ছবি ঝোলানো হয় এবং এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট করা হয় নিউটনের বর্ণ পরিচয়, তখন প্রশ্ন উঠে নির্মাতা কি গৎবাঁধা নিয়মের বাইরে যেতে পেরেছেন? এর মধ্য দিয়ে আম্বেদকার অনুসারী মানেই দলিত¾এ ধারণারই পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় সেখানে। যতোদিন পর্যন্ত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র এই চার বর্ণের মানুষ আম্বেদকারের হিন্দুত্ববিরোধী আন্দোলনের মর্ম বুঝতে না পারবে, ততোদিন পর্যন্ত কি নিম্নবর্ণের মানুষের মুক্তি সম্ভব?
ছত্তিশগড়ের অভয়ারণ্যে জুজুর ভয়
মাওবাদী বা নকশালবাদীদের সম্পর্কে চারটি বাক্য দিয়ে শুরু করা হয় নিউটন; যেখানে বলা হয়¾মধ্যভারতের খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ ছত্তিশগড় রাজ্যের ঘন অরণ্য কমিউনিস্ট গেরিলারা নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। যাদের প্রধান লক্ষ্য সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো। আর এই যুদ্ধ চলছে প্রায় তিন যুগ ধরে। তথ্যটি দেওয়ার পর পরই প্রথম দৃশ্যের শুরু হয়, যেখানে নির্বাচনি প্রচারণায় স্থানীয় নেতা মঙ্গল নেতাম বক্তৃতা করেন। এবার একটু লক্ষ করা যাক, কী ছিলো সেই বক্তব্যে? সাধারণত ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান এই এলাকার নির্বাচনি সংস্কৃতি যদি আমরা লক্ষ করি তবে দেখতে পাবো, ভোটপ্রার্থীরা নির্বাচনি বক্তব্যে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনায় মুখর থাকে। কিন্তু এখানে মঙ্গল নেতাম তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনা না করে আসলে কার সমালোচনা করছেন?
চলচ্চিত্রের এক মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে নেতাম তার বক্তব্যে বলেন¾ ‘আমি এখানে ভোট চাইতে আসিনি বরং এই এলাকার উন্নয়ন চাই, এখানকার প্রতিটি শিশুর একহাতে ল্যাপটপ এবং অন্য হাতে মোবাইলফোন থাকবে সেই স্বপ্ন দেখি। আর এই উন্নয়নের পথে ওরা কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’ এই কাঁটা আসলে কারা? বক্তব্যের পরের অংশেই সেটা স্পষ্ট করেন মঙ্গল নেতাম¾ ‘আগার ও লাল হ্যা তো মে কামাল হু, আগার ও তীর হে তো মে তোপ হু’ (যদি ও লাল হয়, তবে আমি কামাল/ ও যদি তীর হয়, তবে আমি তোপ)। দর্শকের বুঝতে কষ্ট হয় না, তার প্রতিদ্বন্দ্বী নকশালবাদীরা¾লাল রঙ যাদের প্রতীক। এর মাধ্যমে নির্মাতা আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন? মঙ্গল নেতাম ছাড়া নির্বাচনে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই? নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও ভোট হলে সেখানে নেতামই যেকোনো উপায়ে জয়লাভ করবেন? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবেই নির্মাতা দেখানোর চেষ্টা করেছেন ওই এলাকায় নকশালবাদীরাই গণতন্ত্রের সব থেকে বড়ো শত্রু।
নিউটন-এর দ্বিতীয় দৃশ্যে দেখানো হয়, অরণ্যপথে মঙ্গল নেতামের গাড়ি আটকে একদল সন্ত্রাসী তাকে হত্যা করে। এবং তিন মিনিট পাঁচ সেকেন্ড থেকে তিন মিনিট ১৫ সেকেন্ড পর্যন্ত ঘন শান্ত অরণ্য দেখানোর মাধ্যমে আসলে কী বোঝানোর চেষ্টা করেন নির্মাতা? এই ঘন অরণ্য সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে ঘাঁটি হিসেবে। কারা এরা? তিন মিনিট ১৬ সেকেন্ডে টেলিভিশন সংবাদে এর উত্তর পাওয়া যায়¾ ‘মাওবাদীরা আবার আক্রমণ করেছে, গত দুই সপ্তাহে এটি ছিলো তৃতীয় আক্রমণ এবং সরকার এদের প্রতিহত করতে অতিরিক্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।’ এই দুটো দৃশ্যেই এটা বোঝানোর চেষ্টা করানো হয় যে, নকশালবাদীরা নির্বাচনবিরোধী এবং তারা যেকোনো উপায়ে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। কারণ ভোটের মাধ্যমে জয়ী কোনো নেতাই কেবল পারে ওই এলাকায় তাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে। চলচ্চিত্রের পাঁচ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে দর্শক এটা জানতে পারে ইলেকশন ইন্সট্রাক্টরের মুখ থেকে। আর এও জানা যায়, মাওবাদীরা নির্বাচন বয়কট করেছে, তাইতো মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় ভোট গ্রহণ করতে যেতে কামাল কিশোর রাজি না। তার পরিবর্তে নিউটন এই দায়িত্ব পান। ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার পথেই পুলিশ কর্মকর্তার মুখে ভোট গ্রহণকারী দল জানতে পারে, গত নির্বাচনে এই জেলায় ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং এ নকশাল অধ্যুষিত এলাকাকে তারা পাকিস্তান বলে। ফলে এটাও পরিষ্কার হয়, পাকিস্তান বিদ্বেষ ভারতে এতো প্রকট যে শত্রু আর পাকিস্তান কীভাবে সমার্থক হয়ে উঠেছে! পুলিশ ক্যাম্পে পৌঁছেও পুলিশ কর্মকর্তাদের মুখে নানাভাবে শুনতে হয়, মাওবাদীরা কতো অনিরাপদ করে রেখেছে এই জঙ্গল। এছাড়াও
১. ২৫ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ কিংবা ২৮ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে গাছের শুকনো ডাল ভেঙে পড়ার শব্দে পুলিশের ভয় পেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. এক ঘণ্টা ৫৯ সেকেন্ডে যখন পুলিশ গ্রামবাসীদের ভোট দেওয়ার জন্য নিয়ে আসতে যায়, তখন তাদের অতি সাবধান ও সতর্ক যাত্রা, অনিরাপদ অনুভূতিযুক্ত আবহসঙ্গীতের ব্যবহার।
৩. এক ঘণ্টা ১৭ মিনিট ২২ সেকেন্ডে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে যখন পুলিশ বলে, সরকার থেকে পাওয়া ৩৫ মিলিয়ন ডলার মাওবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য যথেষ্ট নয় বরং তাদের আরো উন্নত অস্ত্র ও সরঞ্জাম প্রয়োজন।
৪. এক ঘণ্টা ৩৫ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে নিউটনের প্রশ্নের উত্তরে আত্মা সিংয়ের দেওয়া উত্তর¾সরকার তাদের এই ধরনের অনিরাপদ স্থানে অবস্থান বা অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়নি, তাই তিনি জেনেশুনে এই ‘নির্বাচন পিকনিকের’ জন্য তরুণ কর্মকর্তাদের বিপদের সম্মুখীন করতে পারবেন না।
এই প্রতিটি ঘটনার মধ্য দিয়ে নির্মাতা মাওবাদীদের যে বৈশিষ্ট্য চিত্রিত করেছেন তাতে দর্শক সহজেই অনুভব করতে পারবে একদল অদৃশ্য শক্তিকে, যারা কিনা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর থেকেও শক্তিশালী! একপাক্ষিক এই বর্ণনায় শুধু পুলিশের মুখ থেকেই দর্শক মাওবাদীদের সম্পর্কে জানতে পারে, কিন্তু মাওবাদীদের নিজস্ব কোনো ভাষ্য জানার অবকাশ দর্শক পায় না। যদিও নিউটন-এর ৩৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে আদিবাসী পোড়া গ্রামের ভগ্নাবশেষ দেখানোর চেষ্টা করেছেন নির্মাতা; কিন্তু সেখানে নিউটন যখন প্রশ্ন করেন, কারা গ্রামটি পুড়িয়ে দিয়েছে? এর উত্তর পুলিশ কর্মকর্তা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, যারাই পোড়াক না কেনো এখন তো এখানে শান্তি প্রতিস্থাপিত হয়েছে, সেটাই জরুরি।
নিউটন-এর এক ঘণ্টা ৩১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে আদিবাসীদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার অভিযান শুরু হয়, সেখানে আদিবাসীদের ওপর পুলিশের নির্যাতনের এক ঝলক দেখতে পায় দর্শক। আবার এক ঘণ্টা ১২ মিনিট ১০ সেকেন্ডে আদিবাসী নারীর মুখে উচ্চারিত হয়¾‘ভোট দিলে মাওবাদীরা অত্যাচার করবে, না দিলে পুলিশ।’ কিন্তু এক ঘণ্টা ৩৩ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে দেখা যায়, গ্রামের কয়েকজন যুবক-যুবতী তাদের দৈনন্দিন কাজ শেষ করে স্বেচ্ছায় ভোট দিতে আসছে এবং তারা বয়স্ক গ্রামবাসীদের থেকে অপেক্ষাকৃত সচেতন; কাকে ভোট দিতে হবে সেটাও তারা জানে। যদি ওই এলাকায় মাওবাদীদের দৌরাত্ম্য এতো বেশি হয়, তাহলে তো এই যুবক-যুবতীদের ভোট দিতে আসার কথাই ছিলো না। অথচ আদিবাসী নারীর মুখ দিয়ে বলানো হচ্ছে, ‘ভোট দিলে মাওবাদীরা অত্যাচার করবে, না দিলে পুলিশ’¾এই উপস্থাপন কি নির্মাতার ইচ্ছাপ্রসূত? মাওবাদ সম্পর্কিত নেতিবাচক মনোভাব দর্শকমনে সঞ্চারের উদ্দেশ্যে? অথচ দিনশেষে আত্মা সিংকে একজন অতি দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবেই চিত্রিত করা হয়। চলচ্চিত্রের শেষ অংশে দেখানো হয়, স্বল্প বেতনের এই পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনার সামর্থ্যও সবসময় থাকে না। আর দিনশেষে চলচ্চিত্রজুড়ে অদৃশ্য মাওবাদীরা ভয়ঙ্কর প্রাণি হিসেবেই থেকে যায়!
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নিউটন-এ কি সবকিছু নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, নাকি ভারত রাষ্ট্র ঠিক যতোটুকু তার নাগরিকদের জানাতে চায়, ঠিক ততোটুকুই অমিত মাসুরকার জানিয়েছেন তার দর্শককে?
মূলত ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরে নকশালবাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা আন্দোলনকেই ভারতে বিপ্লবের মডেল হিসেবে গণ্য করা হয়। সেখান থেকেই জনপ্রিয় হয়েছে নকশালবাদ শব্দটি। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের ত্রুটির কারণে সামাজিক অসমতা ও দারিদ্র্যের হার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে বিশেষ করে নিম্নবর্গ ও আদিবাসীরা এর ভুক্তভোগী হয়। বঞ্চিত এসব মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির আবির্ভাব। ১৯৫০-এর দিকে কমিউনিস্টরা অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলামে আদিবাসীদের ব্যাপকভাবে সংগঠিত করতে সক্ষম হয়। এবং ১৯৬৭-এর শেষভাগে জমি ও ফসল দখলে এ আন্দোলন দেখা দেয় বিস্ফোরণ আকারে। যদিও ১৯৭০-এর দশকে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। ১৯৭৩-এ আন্দোলনের নেতা চারু মজুমদার বন্দি অবস্থায় মারা যাওয়া এবং ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারি ইত্যাদি নানা কারণে এ আন্দোলন বিভাজিত ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে ক্রমেই।৭
১৯৯০-এর দশকে ভারত সরকার নয়া উদারনীতি গ্রহণ করলে পুনরায় মাওবাদীদের উত্থান ঘটে। বিশেষ করে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ‘পিপলস ওয়ার গ্রুপ’(PWG) গেরিলা আক্রমণ শুরু করে পুলিশ, ভূমিমালিক এবং ব্যবসায়ীদের ওপর। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে পিপলস ওয়ার গ্রুপ এবং মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি সম্মিলিতভাবে দ্য কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া গড়ে তোলে। তাদের এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, উত্তরপ্রদেশসহ আটটি প্রদেশে। এ প্রদেশগুলোতে PWG-এর টিকে থাকার একটা প্রধান কারণ ছিলো তেলেঙ্গানার বড়ো সংখ্যক জেলাতে তাদের বিস্তার; যেখানে এ গ্রুপটি সংরক্ষিত অরণ্য কেটে চাষবাস করতে আদিবাসীদের উৎসাহ দেয়; তেন্দু পাতার (বিড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত একধরনের উদ্ভিদ) ঠিকাদারদের একটা ভালো মাত্রায় মজুরি বাড়াতে বাধ্য করে এবং বন কর্মকর্তা ও পুলিশের দ্বারা আদিবাসীদের ওপরে যে হয়রানি হতো তা বন্ধ করে।৮ আবার বিহারের সম্পন্ন চাষি ভূমিহার, যারা নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে দাবি করে, তাদের কাছে দরিদ্রদের দাবিয়ে রাখাটা ছিলো অনেকটা মর্যাদার লড়াই। অর্থাৎ মজুরি ও জমির অধিকারের প্রশ্নে নিম্নবর্গদের যেকোনো উপায়ে দাবিয়ে রাখতে সবসময় তৎপর ছিলো তারা। এক্ষেত্রে দলিতরাও জানতো, তাদের সঙ্গে নিপীড়নের বিরুদ্ধে চলা এই প্রতিরোধ একদিন সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নিতে পারে।
গবেষণা থেকে জানা যায়, কোনো কোনো রাজ্যের অনেক জনগণই চাইতো মাওবাদীরা তাদের সঙ্গে থেকে যাক, তা না হলে শোষকের নির্যাতন তাদের ওপর আরো বেশি করে নেমে আসবে।৯ এ ধরনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ছত্তিশগড়ে সরকারের সহায়তায় মাওবাদীদের বিরুদ্ধে ‘সালোয়া জুডুম’ (Salwa Judum, সরকার সমর্থিত গণবাহিনী) আন্দোলন শুরু হয়।১০ তারা শুধু মাওবাদীদের বিরুদ্ধে কাজ করতো তা নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরেও চালাতো অবর্ণনীয় নির্যাতন। এর মাত্রা এতো বেড়ে যায় যে, সালোয়া জুডুম-এর বিরুদ্ধে তদন্ত চলে এবং ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এ ধরনের সামরিক আক্রমণকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু তারপরেও খণ্ডযুদ্ধ চলতে থাকে সেখানে। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে সালোয়া জুডুম-এর প্রতিষ্ঠাতাকে হত্যা করা হয়। এর পর পরই সরকার সেখানে সামরিক আক্রমণ তীব্রতর করে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর জোর দেয় কমিউনিস্টদের প্রতিহত করতে। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাওবাদীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে, এতে মাওবাদীরা আরো তৎপর হয়ে ওঠে। এ বছর নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় গেরিলা, পুলিশ ও সাধারণ মানুষসহ কমপক্ষে ৪০ জন প্রাণ হারায়।
এবার বেশকিছু তথ্য উপস্থাপন করা যাক সামরিক বাহিনী এবং সালোয়া জুডুম সরকারি সহায়তায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীদের সঙ্গে কী করেছে সে বিষয়ে¾আদিবাসীদের শিক্ষা দিতে ১৯৮০-এর দশকে তেলেঙ্গানা ও আশপাশের বনাঞ্চলের গ্রামগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা মাওবাদীদের সাহায্য না করে। ১৯৮০Ñ২০০৭ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার আটশো মানুষকে এনকাউন্টারে হত্যা করে পুলিশ, যাদের বেশিরভাগই দলিত, আদিবাসী। এবং মাওবাদীদের সঙ্গে যাদের অনেকেরই কোনো যোগাযোগ ছিলো না।১১ এ ধরনের এনকাউন্টারকে উৎসাহিত করতে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পয়েন্টের ব্যবস্থা রয়েছে। পয়েন্ট গণনার পদ্ধতি এরকম¾একজন সন্ত্রাসীকে হত্যা করতে পারলে পাঁচ পয়েন্ট, গ্রেপ্তারে দুই পয়েন্ট এবং আত্মসমর্পণ করাতে পারলে তিন পয়েন্ট পাওয়া যায়। অনেক সময় নির্ধারিত পয়েন্টে পৌঁছাতে কিছু ঘাটতি থেকে গেলে তারা নিরপরাধ আদিবাসী বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে হত্যা করতো।১২ যদিও নিউটন-এ ৪৮ মিনিট নয় সেকেন্ডে সাজানো আত্মসমর্পণের বিষয়টি তুলে ধরেছেন নির্মাতা, কিন্তু সাজানো এনকাউন্টারের ব্যাপারে থেকেছেন নিশ্চুপ।
এছাড়াও ছত্তিশগড়-অন্ধ্রপ্রদেশ-বিহার প্রভৃতি রাজ্যে গ্রামবাসীদের জোর করে অভ্যন্তরীণ বিস্থাপিত লোকজনের ক্যাম্পে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে করে তাদের সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।১৩ আবার রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানকার জনগোষ্ঠীর একাংশকে ব্যবহার করে অন্যদের নিপীড়ন করা হয়; আর সেগুলো প্রকাশ্যে নিয়ে আসলে মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবীদের গ্রেপ্তার, প্রাণনাশের হুমকি ইত্যাদির মাধ্যমে এমন অবস্থা তৈরি করা হয়, যাতে সেখানকার খবর বাইরে না পৌঁছায়। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে দরবা জঙ্গলে মাওবাদী দমনের নামে বদ্রিমাহু গ্রামের পাঁচ আদিবাসীকে রাজ্য পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গ্রামবাসীদের বক্তব্য, তাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। বদ্রিমাহু থেকে সাংবাদিক সন্তোষ যাদব এই ঘটনার বিবরণ পাঠানোর পাশাপাশি আদিবাসীদের জগদলপুরের আইনি সহায়তা কেন্দ্রের সঙ্গেও যোগাযোগ করিয়ে দেন। যাতে তারা আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিরোধিতা করতে পারে। এ ঘটনার পর পরই ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সন্তোষ যাদব গ্রেপ্তার হন। তার অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়, সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সাহায্য করা।
বেল ভাটিয়া নামের একজন গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী কয়েকজনের সাহায্য নিয়ে অক্টোবর ২০১৫ থেকে জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাহিনীর অবাধ যৌন অত্যাচারের বিরুদ্ধে, আদিবাসী মেয়েদের এফ আই আর করতে সাহায্য করেছিলেন। বর্তমানে তাকে বিভিন্নভাবে হুমকির শিকার হতে হচ্ছে।১৪ এই ঘটনাগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায়, ভারত রাষ্ট্র মাওবাদীদের কার্যক্রমের কথা ফলাও করে গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে চাইলেও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর করা নির্যাতন এবং অত্যচারের কথা কোনোভাবেই বাইরে প্রকাশ করতে চায় না। আর কেউ সেটা প্রকাশ করতে চাইলে তাদের মাওবাদী ট্যাগ লাগানোর চেষ্টায় মরিয়া হয়ে ওঠে। একই ধরনের ঘটনা দেখা যায়, ২০১৮-এর ২৮ আগস্ট, মহারাষ্ট্র থেকে ভারভারা রাও, গৌতম নাভেলখা, সুভা ভারাদয়াজসহ পাঁচ জন বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের অপরাধ হিসেবে দেখানো হয় নকশালদের সহায়তা।১৫ যেখানে রাষ্ট্রীয় ছত্রচ্ছায়ায় প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং গণবাহিনী সালোয়া জুডুমের অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হতে হয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে; ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আদিবাসী-রাষ্ট্র সম্পর্ক, আদিবাসী ও তথাকথিত উচ্চবর্গীয় শ্রেণি সম্পর্ক, আদিবাসী-মাওবাদী সম্পর্ক এগুলো বিবেচনা না করেই নির্মাতা যখন একটি ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন¾স্থানীয় জনগণ, সরকার ও মাওবাদীদের মাঝখানে আটকে পড়েছে, সেটা কতোটুকু যুক্তিযুক্ত? আবার পুলিশ কর্মকর্তার মুখ দিয়ে যখন বর্ণনা করানো হয়, সরকার উন্নত অস্ত্র সরবরাহ না করায় মাওবাদীদের কাছে তারা অনেকটা অসহায়, সেটাইবা কতোটুকু যুক্তিযুক্ত? আর পুরো বনাঞ্চলকে মাওবাদীদের অভয়ারণ্য এবং মাওবাদীরা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর, যাদের ভয়ে পুলিশ ও আদিবাসী দুই-ই তটস্থ¾এই ন্যারেটিভ কি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য? উপরে মাওবাদীদের সম্পর্কে করা আমার সহপাঠীদের মন্তব্যও ঠিক এরকমই ছিলো¾মাওবাদীরা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। তার মানে ভারতের জনগণের মনে ইতোমধ্যেই এই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত। নির্মাতা কি সেই ধারণাটিই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন?
দ্য মিশন সিভিলিয়াস্তিক১৬
চলচ্চিত্রজুড়ে আদিবাসীদের উপস্থাপন self এবং other-এর ধারণাকে স্মরণ করিয়ে দেয়; যেখানে আদিবাসীরা হলো otherবা অপর। বেশিরভাগ রাষ্ট্রই আদিবাসীদের শত্রু বলে গণ্য করে। নিউটন-এ বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই সত্যটাই বার বার উঠে আসে। রাষ্ট্রের বন্ধু সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিভিন্ন আচরণেও সেটি প্রকাশিত। চলচ্চিত্রের ২৬ মিনিট ১০ সেকেন্ডে মালকো নেতামের সঙ্গে পুলিশের আচরণ কিংবা ৫৪ মিনিট ২০ সেকেন্ডে আদিবাসী শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদের দৃশ্য বার বার এটাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আদিবাসীরা রাষ্ট্রের শত্রু, তাদের কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না। এমনকি আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার গাছের ডাল থেকে বনের মুরগি পর্যন্ত কোনো কিছুই রাষ্ট্রীয় সন্দেহ তালিকার বাইরে নয়। তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২২ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে আত্মা সিংয়ের সংলাপের মধ্য দিয়ে¾ ‘এ জাংলি আন্ডা হ্যায় ইহাকা মুরগিয়া ভি ক্রান্তিকারি হ্যায় দো ঘান্টা ইন্টারোগেট কি তাব যা কে ইয়ে দিয়া’ (এটা জংলি ডিম, এখানকার মুরগিও বিপ্লবী, দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করার পরে ডিম পাড়লো)। এভাবেই আদিবাসী বা তথাকথিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে উপস্থাপন করা হয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন মাধ্যমে, চলচ্চিত্রও এর বাইরে নয়। নির্মাতা অমিতের নিউটনও এই বৃত্ত ভাঙতে পারেনি।
এ তো গেলো আদিবাসীদের শত্রু বিনির্মাণের মিশন; নিউটন আরো ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যায়, সিভিলাইজেশন মিশন যেমনটা ইউরোপিয়রা তাদের কলোনিতে করেছিলো¾দ্য মিশন সিভিলিয়াস্টিক। চলচ্চিত্রটির এক ঘণ্টা এক মিনিট ১৩ সেকেন্ডে পুলিশ যখন গ্রামে প্রবেশ করে, তারপর থেকে ক্যামেরার প্রতিটি শটে ফুটে ওঠে আদিবাসীদের নিম্নমানের জীবনযাত্রা, তাদের ঘরবাড়ি, পোশাক-আশাক-ভাষা অসভ্যতা-অসহায়ত্বের নিদর্শন। এক ঘণ্টা সাত মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে একজন আদিবাসী যখন ই ভি এম মেশিন চালাতে না পেরে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন অসহায়ত্ব যেনো আরো প্রকট হয়ে ওঠে। আর এক ঘণ্টা আট মিনিট ২০ সেকেন্ডে যখন লোকনাথ সেই অসহায়ত্ব নিয়ে উপহাস করেন¾‘ইলেকশন মেশিন ওর বাপও মনে হয় কোনোদিন দেখেনি।’ তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না, সংখ্যাগরিষ্ঠ তথাকথিত শিক্ষিত সভ্য মানুষেরা সংখ্যালঘু আদিবাসীদের কোন চোখে দেখে। আর এই অসভ্য সমাজকে সভ্য করে তোলার পথ হিসেবে নির্বাচনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে চলচ্চিত্রজুড়ে।
এটা সেই নির্বাচন যেখানে আদিবাসীদের নিজেদের মধ্য থেকে কোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। এক ঘণ্টা নয় মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে নিউটন আদিবাসীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, এই গণতান্ত্রিক নির্বাচনে তাদের কী কী লাভ হবে¾ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করলে গ্রামে বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট, সামাজিক ন্যায়বিচার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা হবে। অথচ যখন নিউটনকে মালকো বলেন¾তাদের হাজার বছরের নিজস্ব আইনকানুন রয়েছে সমাজ পরিচালনার জন্য¾তখন নিউটন কোনো উত্তর দিতে পারেন না। ঘুরেফিরে সভ্য হয়ে ওঠার যেনো একটাই রাস্তা¾ইউরোপিয়ানরা যেমন তাদের কলোনির মানুষদের সভ্য করার মিশনে নেমেছিলো, ঠিক তেমনই ভারত রাষ্ট্রেও সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ক্ষমতাবানরা ইউরোপিয়ানদের প্রতিনিধিত্ব করছে। আদিবাসীরা পড়ষড়হরুবফ-দের ভূমিকায় অবতীর্ণ, যেখানে খোদ ভারত রাষ্ট্র সভ্যতা থেকে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে সভ্য করার মিশনে নেমেছে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে। আর আদিবাসীদের মধ্যে মালকো নেতাম ও পুলিশকে সাহায্যকারী আদিবাসীরাই যেনো কিছুটা সভ্য হয়ে উঠেছে এই সহায়তাগুলো গ্রহণ করে। কারণ তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বা তথাকথিত সভ্য সমাজের ভাষা হিন্দি আয়ত্ব করতে পেরেছে এবং সভ্য সমাজে মিশে যেতে পারছে। এরা সেই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছে, যারা ইউরোপিয়ান শিক্ষাদীক্ষায় সভ্য হয়ে উঠে ইউরোপিয়ানদের কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলো।
এহেন গণতন্ত্র-গণতন্ত্র খেলা খেলিয়া ভারতীয় জনগণ কী করিবে!
গণতন্ত্র শব্দটি প্রাচীন গ্রিক ধারণা প্রসূত, যার মানে জনগণের দ্বারা শাসিত। আব্রাহাম লিঙ্কনের দেওয়া সব থেকে জনপ্রিয় এবং বহুল প্রচলিত সংজ্ঞাটিও যদি লক্ষ করি, সেখানেও গণতন্ত্র হলো¾ ‘Government of the people, by the people, for the people’।১৭ এবার দেখি নিউটন-এ ভারত রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের যে চিত্র দেখানো হয়েছে, তা গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটির শর্ত পূরণ করে কি না¾
প্রথমত, চলচ্চিত্রের চার মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের জন্য আয়োজিত কর্মশালায় ইলেকশন ইন্সট্রাক্টরের দেওয়া বক্তব্য¾ভারতীয় নির্বাচন এমন এক নির্বাচন, যেখানে ৩০ হাজার কোটি রুপি বেশি খরচ, ৮৪ কোটি ভোটার, ৯০ লাখ ভোটিং বুথ ব্যবহার হয়; যা পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে গ্রিনিচ বুকে রেকর্ড গড়েছে। আমরা প্রমাণ করেছি, এখানে অনেক সময় হয়তো দুর্বৃত্তরা ভোটে জিতে সংসদে চলে যায়, কিন্তু ভোটকেন্দ্রে কোনো গুণ্ডামি হতে দেওয়া হয় না। কারণ নির্বাচনি স্বেচ্ছাসেবীরা এটা হতে দেয় না। ইলেকশন কমিশন স্বেচ্ছাসেবীদের একটাই লক্ষ্য ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন।
দ্বিতীয়ত, এবার আসুন দেখা যাক ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ ইলেকশনের নমুনা কী¾নির্বাচনি এলাকায় গিয়ে নিউটন যখন ভোটকেন্দ্রে যেতে চান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তখন তাকে যেতে নিষেধ করে। চলচ্চিত্রের ২৩ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে আত্মা সিং বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক গিয়ে ভোট নিয়ে আসবে কারণ ওই এলাকা নিরাপদ নয়। তিনি এও বলেন, সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে এভাবেই ভোট পরিচালনা করা হয়, এমনকি কাশ্মীর এবং মনিপুরে এভাবেই ভোট পরিচালনা হয়।
তৃতীয়ত, চলচ্চিত্রের ৩১ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে আদিবাসীদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে পুলিশ কর্মকর্তা সেখানেই তাদের ভোট গ্রহণ করতে চায়। কিন্তু নিউটন তাকে বাধা দিলে পুলিশ আদিবাসীদের নির্বাচনের সময় সংক্রান্ত ভুল তথ্য দেয়। এতেই প্রমাণিত হয় পুলিশ ভোট গ্রহণে তেমন আগ্রহী নয়।
চতুর্থত, ভোটকেন্দ্রে অনেক সময় পার হয়ে গেলেও কোনো ভোটারকে আসতে দেখা যায় না। এ নিয়ে কোনো তাগিদ দেখা যায় না পুলিশের মধ্যে। অথচ ৫৯ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এক ফোনেই পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে ভোটারদের জোর করে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে। কারণ গণমাধ্যমের সামনে দেখাতে হবে ভোটাররা কতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছে।
পঞ্চমত, নিউটন-এর এক ঘণ্টা ১১ মিনিট ১২ সেকেন্ডে মালকো যখন প্রার্থীদের নাম ভোটারদের পড়ে শোনান, তখন জানা যায় ভোটাররা একজনকেও চেনে না। তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের কোনো লোকও ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না।
ষষ্ঠত, যেহেতু ভোটাররা কোনো প্রার্থীকেই চেনে না, তাহলে ভোট দেবে কীভাবে? এই সমস্যার সহজ সমাধান করে দেন আত্মা সিং। এক ঘণ্টা ১৩ মিনিট চার সেকেন্ডে তিনি আদিবাসীদের উদ্দেশে বলেন¾ভোটিং মেশিন হলো খেলনার মতো, যেখানে বিভিন্ন রকম প্রতীক রয়েছে¾গাজর, জাহাজ, মোটর সাইকেল, ফুল, পশু ইত্যাদি। তোমাদের যেটা ভালো লাগে সেই বাটন প্রেস করো। শেষ পর্যন্ত এভাবেই ভোট পরিচালিত হয় এবং ৭৬ জন ভোটারের মধ্যে থেকে ৩৯টি ভোট গণনা করা হয়; যা শতাংশের হিসাবে ৫৫.৭১। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও বেশ খুশি দেখা যায়, মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় এতো সংখ্যক ভোট পড়ায়। এর পরপরই পুলিশ গোলাগুলির নাটক সাজায়, যাতে করে নিউটনকে ফেরত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
উপরের প্রত্যেকটি ঘটনার মধ্যে নির্মাতা ভারত রাষ্ট্রের চতুরতা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। যেখানে গণতন্ত্রের চর্চাকারী রাষ্ট্রগুলোতে সংখ্যালঘু মানুষের ভোটের কোনো মূল্যায়নই নেই; কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠদের কথা মাথায় রেখেই সবধরনের নীতি নির্ধারণ করা হয়। সংখ্যালঘুদের শোষণ-নিপীড়নের মাধ্যমে এমনভাবে অধঃস্তন করে রাখার চেষ্টা চালানো হয়, যাতে তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে না পারে। কারণ তারা সচেতন হলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রেরই ক্ষতি। তাদেরকে ততোটুকুই জানতে দেওয়া হয়, যতোটুকু জানলে শোষকদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে না। চলচ্চিত্রে এক ঘণ্টা ১৬ মিনিট ১১ সেকেন্ডে একজন সাংবাদিক পুলিশের ডি আই জি’র উদ্দেশে বলেন¾ ‘কিছু লোকের মতে এখানে যে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে করে আদিবাসীদের উৎখাতে শুধু মাইনিং কোম্পানির লাভ হবে।’ এর উত্তরে পুলিশকে বলতে শোনা যায়, যারা এসব বলছে তারা নকশালদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এছাড়াও এক ঘণ্টা ৩৮ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে ছোটো একটি দৃশ্যে মাটি খনন দেখানো হয়। কিন্তু সেটা মাইনিং কোম্পানির কি না সেটা বোঝা যায় না। নিউটন-এর শুরুতে নির্মাতা খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ অরণ্যের কথা বললেও পরবর্তী সময়ে সেগুলো নিয়ে চলা বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনীতির কথা এড়িয়ে গেছেন সুকৌশলে। তবে এখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্বাচনের আয়োজন করা হয়, যাতে করে নির্বাচিত প্রতিনিধি বুর্জোয়াদের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করতে পারে, জনগণের নয়। শেষ পর্যন্ত এই ভোটের রাজনীতি একধরনের খেলা হয়েই থেকে যায়, যেখানে গণতন্ত্র আর জনগণের হয়ে ওঠে না।
হেজেমনির ফেরিওয়ালা অমিত
চলচ্চিত্র নিছক বিনোদন দেওয়ার চেষ্টায় নির্মিত হয় না, বরং দর্শকের উদ্দেশে বার্তা প্রদানেরও চেষ্টা থাকে তাতে। নিউটন আসলে কী বার্তা দিতে চেয়েছে দর্শককে? নিউটন-এ নিপীড়নকামী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু সেই কাঠামো ভেঙে বেরিয়ে আসার বা পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত নির্মাতা করেননি। কেন্দ্রীয় চরিত্র নিউটন কিংবা আদিবাসী মালকো দুজনই দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু কেউই প্রতিবাদ করে না; শেষ পর্যন্ত বরং এর ভার বয়ে বেড়ায়। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কী চায়, সেটা যদি খুব ভালোভাবে লক্ষ করা যায়, তাহলে দেখতে পাবো¾রাষ্ট্রও এটাই চায় যে তার নাগরিকরা সচেতন হয়ে না উঠুক। আর যদি সচেতন হয়েও ওঠে, তবুও যেনো রাষ্ট্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে কথা না বলে চুপচাপ নিজের কাজটুকু করে যায়।
নিউটন কিংবা মালকো নেতাম কি রাষ্ট্রের অনুগত নাগরিকের প্রতিনিধিত্বই করছে না? এর উত্তর খুঁজে বের করার দায়িত্ব পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে আমার নিজস্ব মত হলো, অমিত প্রটেস্ট্যান্ট এথিক্সের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে গেছেন বার বার¾ ‘তুমি নিজে সৎ হও, নিয়মানুবর্তী হও, দায়িত্বশীল হও, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’ মজার ব্যাপার হলো, আমার সমাজবিজ্ঞান পড়ুয়া সহপাঠীরাও এটাকে ইতিবাচকভাবেই মেনে নিয়েছেন। যেনো এটাই দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো মেরামতের একমাত্র রাস্তা। আবারও প্রশ্ন দিয়ে লেখা শেষ করতে চাই। সত্যিই কি অরাজনৈতিক হয়ে রাজনীতিকে পরিবর্তন করা সম্ভব? নাকি শাসক শ্রেণি রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক চায় না তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই; এবং অমিতরা কি সেই রাষ্ট্রীয় হেজেমনির পুনরুৎপাদন করেন নিউটন-এর মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে?
লেখক : তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফোকলোর বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্বে অধ্যয়ন করছেন।
taniahtinni@gmail.com
https://www.facebook.com/taniah.tinni
তথ্যসূত্র
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন