আসিফ রহমান সৈকত
প্রকাশিত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
অত্যর নির্মাতা কুয়ারন একাই সব করেন
আসিফ রহমান সৈকত

চলচ্চিত্র তো দেখতেই পারি! পছন্দ মতো দেখতেও থাকি বিভিন্ন মাধ্যমে; যখন ইচ্ছা তখনই। তারপরেও কি তা তৃষ্ণা মেটাতে পারে সবসময়—সব রকম অনুভূতি বা এমন কোনো অনুভূতি, যা হয়তো এখন ততোটা রিয়েল নয় বা ডিস্টোপিয়ান। অথবা একেবারে ব্যক্তিগত জীবন, যা আসলে ঠিকঠাক চিত্রায়িত করাটা যতোটা সহজ মনে হয়, ততোটা নয়। নির্মাতারা কি সেটা নির্মাণ করতে গিয়ে সবসময় নির্মোহ থাকতে পারে বা প্রোপাগান্ডার পথ রুখে দিতে পারে? আলফোনসো কুয়ারন হয়তো এই কাজটি অনেকখানি পেরেছেন তার রোমা (২০১৮) চলচ্চিত্র দিয়ে। ব্যক্তিগত সত্য ঘটনা, তার অনুভূতি এবং এসথেটিক সেন্সের প্রয়োগ ঘটানোর দারুণ এক উদাহরণ রোমা! যা চলচ্চিত্রকে জীবনের কাছে এবং জীবনকে চলচ্চিত্রের কাছে নিয়ে যায়!
এর ঠিক বিপরীতে এই নির্মাতার সৃষ্টি, টেকনোলজিকালি সমৃদ্ধ গ্রাভিটির (২০১৩) অভাবনীয় সিনেমাটোগ্রাফি এবং এডিটিং দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে বসে মহাকাশে ঘোরার অসাধারণ একটা অনুভূতি দেয়! এটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের টেকনোলজিকাল জ্ঞান, পড়ালেখা ও এডিটিং দক্ষতা না থাকলে প্রায় অসম্ভব। আমাদের সময়ের—একই সময়ে সকালে হয়তো কোথাও তিনি নাস্তা করছেন, কথা বলছেন বা চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন—এ রকম একজন অত্যর নির্মাতাকে নিয়ে আমরা আজ কথা বলবো। বিশেষ করে ওনার চলচ্চিত্র নিয়ে, যাতে ওনার এই জার্নিতে আমরা শরিক হতে পারি, চিন্তাশীল দর্শক হিসেবে।
দুই.
আলোচনার শুরু করছি সেই রোমা দিয়ে। রোমা আলফোনসো কুয়ারনের কেবল অতি ব্যক্তিগত একটা গল্পই নয়, এটা একটা মাস্টারপিস! আলফোনসো কুয়ারনের নিজের শৈশবের সময়টা ছিলো মেক্সিকোর জন্যও একটা অস্থির সময়; সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে প্রভাবিত করে। রোমার মধ্য দিয়ে কুয়ারন ২০০১-এ মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র ওয়াই তু মামা তাম্বিয়েন-এর অনেক দিন পর এই ধরনের চলচ্চিত্র নিয়ে পর্দায় প্রত্যাবর্তন করেন। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর দর্শক ও সমালোচকরা চলচ্চিত্রটিকে তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। এর প্রতিটি মুহূর্ত দর্শককে এক অসাধারণ অনুভূতি দেয়, যা অনেকের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। এতো গতিশীল অথচ ধীরে চলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে কমই চোখে পড়ে।
রোমার ঠিক আগেই গ্রাভিটির মতো অসাধারণ আরেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন কুয়ারন। সেখানে তিনি যে দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন, তা স্পেস বা মহাকাশবিষয়ক চলচ্চিত্রের জায়গায় একটা মাইলফলক বলা যায়। চলচ্চিত্রের গল্পে একটি স্পেসশিপে জ্বালানি ও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে, তাতে থাকা দুইজন নভোচারী—একজন নারী ও পুরুষ—অভিনব এক সিদ্ধান্ত নেয়। পুরুষ নভোচারী বলেন, এখানে একজনকে বেঁচে থাকতে হবে। তখন তিনি স্পেসশিপের সঙ্গে তার সংযোগটি কেটে দিয়ে মহাকাশের অনন্তের পথে চলে যান। দর্শক তখন শুনতে পায়, ‘কী সুন্দর’-এর মতো সংলাপ। একজন মানুষ তার জীবনের শেষ সময়ে মহাকাশের অনন্ত রূপ দেখছেন; উপভোগ করছেন জীবনের সব থেকে সেরা মুহূর্তটি! অদ্ভুত এক শিহরণ জাগানো অনুভূতি!
অভাবনীয় ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রটি যদি কেউ বড়ো পর্দায় না দেখে—যদিও বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ দর্শকের পক্ষে বড়ো পর্দায় চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ কম—তাহলে এর অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য অনুভব করতে ব্যর্থ হবে। বড়ো পর্দায় দেখলে মনে হবে দর্শক মহাকাশে থাকার অনুভূতি কিছুটা হলেও বুঝতে পারছে! সেভাবেই এর দৃশ্যায়ন করা। চলচ্চিত্রটির ইমেজের সঙ্গে ব্যবহৃত সাউন্ড ইফেক্ট কারো কারো জন্য ভয়ের কারণও হতে পারে! এতো বাস্তবভাবে এটা নির্মিত।
যেকোনো নির্মাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রাভিটির মতো চলচ্চিত্র নির্মাণের পর রোমা নির্মাণ করা! গ্রাভিটি প্রযুক্তিগত বিষয়ে ভরা, এটা নির্মাণে চ্যালেঞ্জেও ছিলো। মহাকাশযানের প্রযুক্তিগত বিষয় এবং তা বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপনের যে চ্যালেঞ্জ গ্রাভিটিতে ছিলো, নির্মাতা তা দারুণভাবে অতিক্রম করেছেন। অবশ্য কুয়ারন এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, রোমার নির্মাণও তার জন্য কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না।
রোমা সাদাকালোয় নির্মিত। আর পুরোটাই আলফোনসো কুয়ারনের স্মৃতি থেকে উৎসারিত। কুয়ারন নাকি এই চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় এর চিত্রনাট্য, গল্পটা অভিনয়শিল্পীদের থেকেও আড়াল করেছিলেন। তারা এগুলো কেবল তখনই জানতে পারতো, যখন তারা কোনো দৃশ্য নিয়ে কাজ করতে যেতো। কুয়ারনের ক্রিয়েটিভ টিমও নাকি এগুলো আগে জানতো না। সেট ডিজাইন, পোশাক কী হবে সেটা নিয়ে তিনি বিস্তারিত বলতেন, কিন্তু সেগুলো দিয়ে কী হবে, কেনো হবে, ইত্যাদি ব্যাখ্যায় যেতেন না তার প্রোডাকশন টিমের সঙ্গে। তিনি নিজে এই চলচ্চিত্রের ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি ছিলেন।
রোমায় কুয়ারন ওনার প্রিয় সিনেমাটোগ্রাফার এমানুয়েল লুবেজকি’কেও নেননি। বরং নিজে প্রতিটি দৃশ্যের সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে এতো সময় দিয়েছিলেন যে প্রতিটি শটে, প্রতি মুহূর্তে তিনি উপস্থিত ছিলেন। কুয়ারনের সঙ্গে একসঙ্গে বসে রোমা দেখেছিলেন সাংবাদিক জো উটিচি। উটিচির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কুয়ারন এর গল্প নিয়ে বলেন এভাবে—
রোমার ৯০ শতাংশ দৃশ্যই, যা আপনি পর্দায় দেখবেন, পুরোটাই এসেছে আমার স্মৃতি থেকে। আমি বলছি না, এর সবকিছুই একদম রৈখিক। কিন্তু আমি যেটা করেছি, আমার তিন বছরের স্মৃতিটাকে ১০ মাসের একটা ন্যারেটিভের মধ্যে নিয়ে এসেছি। প্রায় প্রতিটি দৃশ্যেই এমন কিছু আছে, যা আমি স্মৃতি থেকে নিয়েছি। এছাড়া এর অনেক কিছু বাস্তবের ক্লিও’র (চলচ্চিত্রে ইয়ালিতজা আপারিসিও অভিনয় করেছেন ক্লিও চরিত্রে) জীবন থেকে নেওয়া। আমি ওনার সঙ্গে কথা বলে, যা যা ওনার মনে আছে, তার সব নিয়েছি।১
তিন.
ডিস্টোপিয়ান সোসাইটি বা সমাজে শাসনব্যবস্থার আদর্শ কোনো অবস্থা থাকে না। সেখানে নিপীড়ন থাকে, একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক সরকার থাকেপুলিশ-সেনাবাহিনী দিয়ে তারা দেশ চালায়। আইন বলতে থাকে শুধু ক্ষমতা, অস্ত্র, পেশীশক্তির ব্যবহার। যুবসমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে এ ধরনের ব্যবস্থায় অনেক সময় মাদক ছড়িয়ে তাদেরকে নেশায় বুদ করে রাখা হয়; মাত্রাতিরিক্ত ক্রিকেট-ফুটবল-গান-যৌনতা দিয়ে মাতিয়ে রাখা হয়; অথবা নিজেকে মিথ্যা স্টার ভাবার নতুন কৌশল, যেমন টিকটক, ফেইসবুক দিয়েও মাতিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। ধরেন, আপনি ভাবলেন, আপনার যুবসমাজ সারাদিন টিকটক নিয়ে ব্যস্ত থাকুক; মোবাইল অপারেটরদের সহযোগিতা নিয়ে আপনি পানির দরে টিকটক ব্যবহারের প্যাকেজ ঘোষণা করলেন। বিপরীতে খবর শুনতে, আর্টিকেল পড়তে, আপনাকে হয়তো বেশি দামে ইন্টারনেট কিনতে হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ডিস্টোপিয়ান স্টেটে বা রাষ্ট্রে হতে পারে। অথবা আপনি মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে মানুষ মারতে যুবসমাজ, তরুণকে উদ্বুদ্ধ করলেন। অথবা বাচ্চাদের কাছে, তরুণদের কাছে নিজেকে জনপ্রিয় করতে, নিজের ক্ষমতা পোক্ত করতে, শিক্ষকদের ওপর তাদেরকে দিয়ে হামলা করাতেও পিছপা হলেন না।
কল্পিত সময় ২০২৭ খ্রিস্টাব্দের ইংল্যান্ড—২০০৬-এ নির্মিত চিল্ড্রেন অব ম্যান এ রকম একটা ডিস্টোপিয়ান রাষ্ট্রের গল্প বলে। যেখানে রিফিউজিরা একেবারে অনাকাক্সিক্ষত, নির্যাতিত, কুকুর-বিড়ালের মতো বন্দি; দেশজুড়ে সরকার ও রিফিউজিদের মধ্যে মারামারি, সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে। সবমিলিয়ে একটা বিশৃঙ্খল সমাজ। এর মধ্যে ১৮ বছর ধরে পৃথিবীতে নতুন কোনো মানুষ বা কারো সন্তান জন্ম নিচ্ছে না। এক অদ্ভুত পরিস্থিতি! পৃথিবীতে নতুন মানুষের জন্ম না হওয়ায় সবাই শঙ্কিত ভবিষ্যত নিয়ে! এ নিয়ে পৃথিবীজুড়ে যুদ্ধাবস্থা আর চরম হতাশাজনক পরিস্থিতি। সভ্যতা একেবারে ধ্বংসের শেষ পর্যায়ে!
অন্যদিকে পুলিশি সেই রাষ্ট্র কুকুরের মতো রিফিউজিদের ধরে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে রাখছে। এ নিয়ে রিফিউজিদের মধ্যে চরম ক্ষোভ। রিফিউজি আর বৃটেনের মানবিক মানুষদের নিয়ে গড়া সশস্ত্র সব দল সরকারের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি আমলা থিও ফেরন-এর প্রাক্তন স্ত্রী জুলিয়ান টেনলর-এর সশস্ত্র দল থিও-কে ধরে নিয়ে গিয়ে একটি অ্যাসাইনমেন্ট দেয়। ৫,০০০ পাউন্ডের লোভ দেখিয়ে থিও’কে একজনের জন্য একটা ট্রানজিট পেপার (Transit Paper) জোগাড় করে দিতে বলা হয়। পরে দেখা যায়, সেটা আসলে কী (Kee) নামের এক তরুণীর জন্য, যিনি কিনা দীর্ঘদিন পর প্রথম সন্তানসম্ভবা হয়েছেন। এই নারী সম্পর্কে সরকার কিছুই জানে না।
টাকার লোভেই হোক আর সাবেক স্ত্রীর কারণেই হোক, থিও ওই সম্ভাব্য মায়ের জন্য ট্রানজিট পাস জোগাড় করে দেন। এখানে একটি কথা না বললেই নয়, থিও ও জুলিয়ানের বাচ্চা ছোটোবেলাতেই মারা গিয়েছিলো। এটা তাদের মধ্যকার সম্পর্কে চিড় ধরায়। থিওর বিরুদ্ধে জুলিয়ান এটা নিয়ে অভিযোগও করেন। জুলিয়ান মনে করেন, থিও তার পাশে না থেকে সন্তান হারানোর পুরো কষ্টটা এড়িয়ে গেছেন।
যাহোক, ট্রানজিট পাশ জোগাড়ের পর থেকে সন্তানসম্ভবা ওই মাকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার মিশনকে ঘিরেই গল্প এগোতে থাকে। তবে চলচ্চিত্রের দৃশ্যায়ন, পরিকল্পনা, সম্পাদনা সবমিলিয়ে আলফোনসো কুয়ারন এখানে দৃশ্যমাধ্যমে যে জগৎ নির্মাণ করেন, তা অনন্য! চলচ্চিত্রের কাহিনির সঙ্গে ভিজ্যুয়ালের যে তীব্রতা, অভিনবত্ব, লঙ টেক, ক্যামেরা মুভমেন্ট, গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য, মব সন্ত্রাসের উপস্থাপন, তা চলচ্চিত্রের অ্যাকাডেমিক পরিসরে একেবারে অভিনব সংযোজন!
সন্তানসম্ভবা ওই তরুণীকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার পথেই জুলিয়ান মারা যান। ফলে জুলিয়ানের সঙ্গে থিও'র আর দেখা বা কথা হয় না। কারণ তখন পর্যন্ত থিও নিজেও জানতো না, আসলে ঘটনাটা কী। তবে কী নিজে থিও-কে জানিয়েছিলেন, তিনি গর্ভবতী। এবং এর জন্যই জুলিয়ান জীবন দিয়েছেন। ১৮ বছরের বেশি সময় পর পৃথিবীতে প্রথম কোনো শিশু জন্মের খবর তারা পেতে যাচ্ছে! ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবেও খুবই স্পর্শকাতর। জুলিয়ান আসলে কী’কে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন ‘হিউম্যান প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্পে, যেখানে মানুষের বন্ধ্যাত্ব নিয়ে কাজ করছে বিজ্ঞানীদের একটি দল।
চলচ্চিত্রে থিও চরিত্রে ক্লাইভ ওয়েন-এর অভিনয় অসাধারণ! যা অ্যাকশনধর্মী সায়েন্স ফিকশন গল্পেও গভীর দ্যোতনা তৈরি করেছে। প্রতিটি চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আলফোনসো কুয়ারন তাই হয়তো যথার্থই বলেন, ‘আমি নতুন নতুন দুনিয়া, নতুন নতুন ইউনিভার্স, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী। আমি সবসময় বলেছি, নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণের একমাত্র কারণ কোনোকিছু অর্জন করা নয়, বরং পরের চলচ্চিত্রের জন্য তুমি কী শিখলে সেটা (নিয়ে ভাবা)।
চিল্ড্রেন অব ম্যান-এর পর ২০১৩-তে আমরা পাই গ্রাভিটি, তারপর রোমা। বোঝা যায়, আগের চলচ্চিত্র থেকে তিনি পরের নতুন চলচ্চিত্রের জন্য শিখেছেন। কোনো পুনরাবৃত্তি নেই জনরার জায়গা থেকে, ক্যামেরা আর এডিটিংয়ের জায়গা থেকেও। তখন বুঝতে পারি ওনার কথার মর্ম। অত্যর নির্মাতাদের মানে যারা নিজেদের চলচ্চিত্রের প্রায় সবকিছু নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তারা এভাবেই কাজ করে। এছাড়া শেষ তিনটি চলচ্চিত্রে তিনি চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও সিনেমাটোগ্রাফিতেও নিজে যুক্ত থেকেছেন পুরোপুরিভাবে। এখন তো প্রযোজনাও করছেন নিজে। তার মানে একেবারে স্বাধীনভাবে তিনি কাজটা করতে পারেন; আর্থিক জায়গা থেকেও কারো ওপর তার নির্ভরতা নেই। এগুলো নিশ্চয় আলফোনসো কুয়ারনকে নতুন কিছু ভাবতে শিখিয়েছে।
চার.
সমসাময়িক চলচ্চিত্রে একজন লিজেন্ড নির্মাতার গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি অনুধাবন করতে হলে আলফোনসো কুয়ারনের তিনটি চলচ্চিত্র চিল্ড্রেন অব ম্যান, গ্রাভিটি আর রোমা আপনাকে দেখতে হবে, বুঝতে হবে। আপনি চাইলে একা কিংবা দল বেঁধে চলচ্চিত্রগুলো উপভোগ করতে পারেন। তাতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হয় না।
আলফোনসো কুয়ারন ২০২৪-এ নিয়ে এসেছেন টিভি সিরিজ ‘ডিসক্লেইমার’। এটা সাইকোলজিকাল ইরোটিক থ্রিলার মিনি সিরিজ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ওটিটি যেহেতু বৈশ্বিক দৃশ্যমাধ্যমে কর্তৃত্ব করছে, সেই দিক থেকে এই টিভি সিরিজ আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ওটিটি ইন্ডাস্ট্রির জন্যও এটা বড়ো বিষয়! কারণ আলফোনসো এমন এক নির্মাতা তাকে দিয়ে এ ধরনের কাজ করিয়ে নেওয়াও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রেনে নাইট-এর উপন্যাস ‘ডিসক্লেইমার’ (২০১৫) অবলম্বনে এটা নির্মিত। কেইট ব্লানশেট, লাইলা জর্জ, কেভিন ক্লাইন, সাচা বারোন কোহেন-এর মতো বিশ্বজয়ী অভিনয়শিল্পীরা এতে কাজ করেছেন। ৮১তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এটা প্রথম প্রদর্শন হয়। পরে ওটিটি প্লাটফর্ম ‘অ্যাপল টিভি প্লাস’-এ মুক্তি পায় ১১ অক্টোবর ২০২৪-এ।
কোনো নির্মাতা যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে আসে, তখন সবচেয়ে বড়ো যে সমস্যাটা দেখা যায়, পুঁজি তাকে নানাভাবে ব্যবহার করতে চায়। অনেকে এই ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের আর খুঁজেও পায় না। এই উদাহরণ আছে। কিন্তু আমরা আশাবাদী আলফোনসো কুয়ারনের ক্ষেত্রে নিশ্চয় এটা হবে না। আরো অনেক দিন তিনি কাজ করুন; দর্শক তার কাছ থেকে নতুন ধরনের চলচ্চিত্র, টিভি সিরিজ, ডকুমেন্টারি পাক, সেই প্রত্যাশাই করি।
লেখক : আসিফ রহমান সৈকত, চলচ্চিত্র সংসদকর্মী, লেখক ও সমালোচক। এছাড়া তিনি প্রশিক্ষণ ও নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত আছেন।
saikatfpdu@gmail.com
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. পুরো সাক্ষাৎকারটা পড়তে পারেন এই লিঙ্কে : https://deadline.com/2018/08/roma-alfonso-cuaron-venice-film-festival-netflix-interview-1202455061/; retrieved on: 08.12.2025
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন