আনতারা সোনিয়া
প্রকাশিত ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সুতপার ঠিকানা
গল্পটা কেবলই সুতপার, সব নারীর নয়
আনতারা সোনিয়া

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি
দেখা এবং চিন্তা
মানবসত্তার লিঙ্গীয় বিভাজনের রূপ দুটি¾পুরুষ ও নারী। সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোতে পুরুষের ধারণা, তারা উপার্জন করবে, রাজনীতি করবে, জ্ঞান/ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। আর নারী কেবলই তাদের মনোরঞ্জন, সেবা, রান্না করবে, সংসার গোছাবে, তাদের যৌনসঙ্গী হবে। নারীর যৌন আচরণও হবে আত্মসমর্পণধর্মী। পুরুষতন্ত্র ভাবে নারী সবসময়ই পুরুষ সত্ত্বার বিপরীতে, তবে কখনোই পুরুষের সমকক্ষ নয়। তাই নারীকে নিয়ে পুরুষকে সচরাচর বলতে শোনা যায়,
স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটা বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপেন। স্বামী যখন কল্পনা-সাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহ নক্ষত্রমালাবেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূর্যমন্ডলের ঘনফল তুলাদন্ডে ওজন করেন এবং ধূমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাউল, ডাল ওজন করেন এবং রাধুনীর গতি নির্ণয় করেন।১
পুরুষ সবসময়ই চায় নারীকে এই কাঠামোর মধ্যে রাখতে। গ্রামসির মতো করে বলতে গেলে, ব্যাপারটা অনেকটা মানুষের চৈতন্যে ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্মতি উৎপাদনের মতো। তাই নারীর ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠাও সহজ হয়। এই আধিপত্য চর্চায় চলচ্চিত্র এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আবিষ্কারের শত বছর পরে এসে চলচ্চিত্রে নারীর অধঃস্তনতা যেনো পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। তবে এর উপস্থাপনার ধরনে এসেছে নানা বৈচিত্র্য। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে যে, সাদামাটা চোখে দেখলে চলচ্চিত্রে নারী আসলে ঠিক কোন অবস্থায় আছে, সেটা বোঝা মুশকিল। সেখানে পুরুষের আধিপত্য এতোটাই প্রবল যে, নারীও যে মানুষ, এটা বোঝাই যায় না! প্রসূন রহমান নির্মিত সুতপার ঠিকানা (২০১৫) যতোবার দেখেছি, ততোবারই ঘুরেফিরে এই চিন্তাগুলো মাথায় এসেছে। এই লেখা সেই চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ।
সূত্রে বাঁধা সরল অঙ্ক সুতপার ঠিকানা
সুতপার ঠিকানার কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন এক নারী¾সুতপা। যে নারীর জীবনের একরৈখিক গল্পই এর উপজীব্য। সুতপা গ্রামের এক চঞ্চল কিশোরী, সদ্য এস এস সি পাস; যার নেশা এখনো খেলাধুলা, গ্রাম চষে বেড়ানো। দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে সেই অর্থে তার কোনো ধারণাই নেই। ঠিক তখনই বেজে ওঠে সুতপার বিয়ের সানাই। তার সব স্বপ্ন, ইচ্ছা, অনুভূতির ‘মৃত্যু’ ঘটে সানাইয়ের সুর বাজার মধ্য দিয়ে। অতঃপর শুরু হয় শ্বশুরবাড়িতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পালা।
সুতপার স্বামী চাকরিজীবী হওয়ায় তিনি বাইরে থাকেন। শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সঙ্গে গ্রামে থাকেন সুতপা। কিছুদিনের মধ্যে স্বামী শহরে সরকারি বাসা পেলে সুতপাকে সেখানে নিয়ে যান। শুরু হয় সুতপার নিজের সংসার। এই সংসার অবশ্য বেশিদিন স্থায়ী হয় না। হঠাৎ-ই স্বামীর মৃত্যু সবকিছু উলটপালট করে দেয়। অসময়ে বৈধব্য গ্রহণ করতে হয় তাকে। অবশ্য সুতপা তখন এক ছেলের মা। ছেলেকে ঘিরেই তার বেঁচে থাকার সবকিছু ঘুরপাক খেতে থাকে। স্বামী মারা যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে চিঠি আসে সরকারি বাসা ছাড়ার। একদিকে আশ্রয় হারানো, অন্যদিকে একমাত্র ছেলের লেখাপড়া, ভবিষ্যৎ। শেষ পর্যন্ত ছেলের পড়ালেখার কথা ভেবে সুতপা শহরেই থেকে যান। এবার তার নতুন ঠিকানা বড়ো ভাইয়ের সংসার।
সেখানে অবশ্য সুতপাকে তেমন কিছু করতে দেখা যায় না। ভাইয়ের সংসারে ছেলের দেখভাল আর অনেকটা শুয়ে-বসেই সময় কাটে তার। ধীরে ধীরে সুতপার ছেলে বড়ো হয়। পড়ালেখা শেষ করে গ্রামের বাড়ির ভাগের জমি বিক্রি করে সেই টাকায় ছেলে ব্যবসা শুরু করেন। একপর্যায়ে ফ্ল্যাট কিনে মাকে নিয়ে ওঠেন সেখানে। নতুন সংসারে সুতপার দিন ভালোই কাটছিলো। এবার ঘরে ছেলের বউ আসার পালা, আসেও। কিন্তু ওই যে ভালো সময় স্থায়ী হয় না, সুতপার ক্ষেত্রেও তাই হয়। এবার আর নতুন কোনো ঠিকানায় নয়, অজানা পথে একা যাত্রা করেন সুতপা। সারাজীবনের সম্বল ছেড়ে, সামান্য কাপড় আর দেয়ালে টাঙানো স্বামীর ছবি নিয়ে বেরিয়ে যান নিজের ঠিকানার সন্ধানে।
নারীর কি আসলেই কোনো দেশ নেই
পুরুষের এতো এতো সাফল্যের ভিড়ে নারীর সামান্যতম অবদান প্রায় সব পুরুষই মনে রাখতে নারাজ। পুরুষতন্ত্র ধরেই নেয়, সমাজের যতো প্রগতিশীল কাজ তাতে পুরুষের অবদান সংখ্যাগরিষ্ঠ আর নারীর সবসময়ই সংখ্যালঘিষ্ঠ। যেনো একমাত্র সত্ত্বা পুরুষ।
সুতরাং, মানবতা [humanity] হচ্ছে পুরুষ, আর পুরুষ নারীকে নারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত না করে তাকে পুরুষের সাপেক্ষে করে; নারীর কোনো স্বতন্ত্র সত্ত্বা নেই ... পুরুষ নারীকে যা ভাবে নারী তাই; সুতরাং, নারী হচ্ছে ‘লিঙ্গ’, যার অর্থ, পুরুষের দৃষ্টিতে একমাত্র নারীর-ই আছে যৌন পরিচয়। পুরুষের কাছে নারী হচ্ছে যৌনতা, নিরেট যৌনতা, আর-কিছু নয়। নারীকে পুরুষের সাপেক্ষে সংজ্ঞায়িত করা হয়, পুরুষের তুলনায় পৃথক ভাবা হয়, পুরুষকে নারীর সাপেক্ষে নয়। নারী হচ্ছে আনুষঙ্গিক এবং অকস্মাৎ। পুরুষ হচ্ছে অপরিহার্য। পুরুষ বিষয় (সাবজেক্ট), পুরুষ সর্বসর্বা [সর্বেসর্বা]। নারী তার ‘অপর’।২
নারীর এই সত্ত্বাহীন অবস্থান দৈনন্দিন সব কাজেই বিরাজমান। নারী তাদের কাছে কেবল স্ত্রী, মা, বোন, রক্ষিতা, পরিচারিকা, পরিবেশিকা, সেবাদাসী ও যৌন-বস্তু।
এবার পাঠককে নিয়ে যেতে চাই একটু পিছনে, কেমন ছিলো সেকালের নারীরা? ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের আগে নারীকে নারীসুলভ হয়ে ওঠার আগেই পাঠানো হতো স্বামীর ঘরে, অন্য পুরুষের সেবাদাসী করে। বিদ্যাসাগরের ভাষায়, তখন মনে করা হতো ‘অষ্টমবর্ষীয়া কন্যা দান করিলে পিতা-মাতার গৌরীদানের জন্য পূন্যোদয় হয়; নবম-বর্ষীয়াকে দান করিলে পৃথ্বীদানের ফল লাভ হয়; দশমবর্ষীয়াকে পাত্রসাৎ করিলে পরত্র পবিত্রলোকপ্রাপ্তি হয়।’৩ তখন বাবা-মার চোখের সামনেই মৃত জামাতার সঙ্গে চিতায় পোড়ানো হতো আদরের মেয়েকে। বাবা-মায়ের পক্ষে এও মেনে নেওয়া সম্ভব ছিলো! কারণ যারা চিতার আগুনে পুড়তো তারা মেয়ে, সন্তান নয়।
এই জীবন্ত নারী পোড়ানোর প্রক্রিয়া চলেছিলো প্রায় দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে। এরপর এই অমানবিক বর্বর অবস্থা থেকে নারীর মুক্তি আসে রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে। তার উদ্যোগে সতীদাহ প্রথা রদ হয়। স্বামীর সঙ্গে চিতায় জ্বালা বন্ধ হলেও শুরু হয় আরেক আগুনে পোড়া। বৈধব্য জীবন ছিলো রঙহীন, রসহীন, জীবন্মৃত। বিধবাদের পরনের জন্য নির্ধারিত ছিলো সাদা থানের কাপড়, ন্যাড়া মাথা, নিষিদ্ধ ছিলো মাথায় তেল, পায়ে আলতা, অলংকার পরা। স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে নিজে দাহ না হলেও, দাহ হয়ে যেতো তাদের সব স্বাদ-আহলাদ। ‘খাবার বেলাতে কতোশত নিয়ম। সূর্যদেবতার মুখদর্শন বিনা খাওয়া নিষেধ। আমিষ খেতে মানা, তরকারি হবে রসুন, পেঁয়াজ মুক্ত। সেই আমিষের মধ্যেও পঞ্চ-শস্য (যব, সরিষার তেল, তিল, ডাল, আতপ চাল) খেতে বারণ, কারণ এসব খাবার উত্তেজক।’৪ বিধবাদের জীবনে ছিলো শুধু অবহেলা আর সহস্র শৃঙ্খলের বেড়াজাল।
এরপর একসময় রঙহীন জীবনে আসে রঙের ছোঁয়া। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চেষ্টায় পাস হয় বিধবাবিবাহ আইন। তাৎক্ষণিকভাবে মনে হয় নারীর মুক্তি মিললো। নারীকে হেয় করার অন্তত একটি পথ বন্ধ হলো। হয়তো হয়েছেও তাই, কিন্তু মুক্তি মেলেনি। কালপরিক্রমায় নারী এগিয়েছে, তবে সেই এগোনোয় কিন্তু ছিলো/আছে। আজ প্রায় দুইশো বছর পর এসে আধুনিক ও উত্তরাধুনিক সমাজে পা রেখেছে নারী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেউ হলফ করে বলতে পারবে না, নারীর অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে; আবার এটাও বলা ঠিক হবে না যে, নারী সেই আগের অবস্থানেই আছে। কিন্তু কোনো কালেই অস্বীকার করার উপায় নেই, নারী সমাজ বিনির্মাণে নীরবে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছে।
গ্রামবাংলা থেকে শহর, শহরতলীর কোনো নারীই বসে থাকে না। ঘরের বাইরে কাজ না করলেও সংসারের বিশাল ঘানি তাদের টানতে হয়েছে দিনের পর দিন। যদিও পুরুষ তার স্বীকৃতি দেয়নি। গ্রামবাংলার অনেক নারী, পুরুষের সমান তালে ক্ষেত-খামারে কাজ করে। শহরে নারীরা দিব্যি কাজ করছে কল-কারখানায়। দেশরক্ষা থেকে শুরু করে ট্রেন, বিমান চালনা, মহাকাশ গবেষণা, কোথায় নেই নারী! মোটকথা সৃষ্টির গোড়া থেকেই এগিয়ে যাওয়ার মিছিলে নারী কখনো কোনোদিন পিছিয়ে থাকেনি। কিন্তু নারীর এই কাজের স্বীকৃতি দিতে কেবল নারাজ ছিলো/আছে পুরুষ প্রাধান্যশীলতা।
আরো নির্দিষ্ট করে বললে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড়ো অংশ টিকিয়ে রেখেছে নারী। রপ্তানি পণ্যের প্রথম স্থানে থাকা পোশাকশিল্প দাঁড়িয়ে আছে নারীশ্রমিকের ওপর। পরিসংখ্যান মতে, গার্মেন্ট কারখানার প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মীই নারী।৫ এর বাইরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিবছর প্রবাসীদের কাছ থেকে যোগ হয় প্রায় এক হাজার পাঁচশো মিলিয়ন মার্কিন ডলার।৬ এই বিপুল পরিমাণ অর্থযোগের কারণে প্রবাসীদের নিয়ে অহংকারের আলোয় মান হয়ে যায় প্রদীপের ঠিক নিচে থাকা নারী। যে শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে টাকা রোজগার করে, তাদের পরিবার-সংসার দেখার দায়িত্ব থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো না কোনো নারীর ওপর। অনেকে সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা রেখে যান। তাদের সবার অভিভাবক হয়ে ওঠে কোনো না কোনো নারী। স্বামীর অভাবে বিনিন্দ্র রাত কাটলেও দায়িত্ব পালনে এই নারীরা এতোটুকু পিছপা হয় না। তবে ওই নারীর সামান্য ত্রুটিকে বড়ো করে দেখার লোকের অভাব হয় না এই পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে।
তার পরও নারী সব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে নিজেকে স্বমহিমায় টিকিয়ে রেখেছে। নিজে শিক্ষা-উচ্চশিক্ষা না পেলেও সন্তানকে তার সবটুকু দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে। অনেকে বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, এসিড নিক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। সমাজ হয়তো নারীর এই অগ্রগতির যথাযথ মূল্যায়ন করছে না। তবে এটাও ঠিক, এই মূল্যায়ন পুরুষতান্ত্রিকতা করবে বলে খুব বেশি আশাও করা যায় না। নারী যদি কোনো ‘পতিত পাবন’-এর আশায় বসে থাকে, সেটা হবে বড়ো ভুল। কারণ নারীর নিজেকেই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে।
সুতপা যেনো এক বাধ্য রাজকন্যা
বাবা-মায়ের আদরের মেয়ে সুতপা। হেসে খেলেই কাটছিলো তার দিন। আদরের মেয়ে হলেও বাবা-মায়ের কথার বাইরে যাওয়ার উপায় তার নেই। বাবা রাগী, তার সিদ্ধান্ত অলঙ্ঘনীয়; কিন্তু মেয়েকে খুব ভালোবাসেন। সুতপার মা গ্রামের সাধারণ নারী, তার স্বকীয় কোনো চিন্তা নেই। তিনি কেবলই স্বামীর হুকুম বাস্তবায়নের মাধ্যম। সুতপা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরুতে না পেরুতেই তার বিয়ের আলাপ শোনা যায়। বিয়ের কথাটাও প্রথম শোনা যায় তার মায়ের মুখ থেকেই। হঠাৎ একদিন পাত্রপক্ষ সুতপাকে দেখতে আসে। তারা সুতপার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। প্রথমেই ছেলের মামাকে জিজ্ঞেস করতে শোনা যায়, তোমার নাম কি মা? উত্তরে সুতপা বলেন, ‘সুতপা’। এর মধ্যে সুতপার বাবা খানিকটা রেগে গিয়েই ফোড়ন কাটেন, ‘তোমাকে কি এই শেখানো হয়েছে, পুরো নাম বলো, মোসাম্মত সহকারে বলো।’ ধাক্কাটা সামলে নিয়ে সুতপাকে বলতে শোনা যায়, মোসাম্মত শামসুন্নাহার। এরপর ছেলের মামার মুখে সুতপার প্রশংসা শোনা যায়, ‘মাশাল্লাহ্, মেয়ের কণ্ঠ তো ভারি মিষ্টি’। তিনি এবার সুতপাকে প্রশ্ন করেন, তোমরা কয় ভাইবোন? পড়ালেখা কতো দূর? ছেলের মামাকে আরো বলতে শোনা যায়, ‘পবিত্র কোরআন থেকে সুরা ইখলাসটা তেলাওয়াত করো তো মা।’ সুতপা একে একে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকেন। অবশ্য উত্তর না দিয়ে কোনো উপায়ও নেই, পাত্রপক্ষকে তো সন্তুষ্ট করতে হবে!
এরপর পাত্রী দেখার দলে থাকা প্রধান শিক্ষকের প্রশ্ন করার পালা। তার বিষয় ইংরেজি¾ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা যাওয়ার ইংরেজি অনুবাদ করতে হবে। এখানে শেষ হলেও ভালো হতো। এবার সুতপাকে চুল দেখাতে বলা হয়। সবশেষে ছেলের মামাকে বলতে শোনা যায়, ‘যাওনের সময় জুতা দুইডা খুইলা খালি পায়ে হাঁইটে চইলা যাবা।’ ‘বাধ্য’ মেয়ে সুতপা তাই করেন। সুতপা চেয়ার থেকে উঠে কেবলই হাঁটতে শুরু করেছেন, ঠিক তখনই পিছন থেকে ছেলের মামা অকস্মাৎ পানি ফেলে দেয় মাটিতে! সেই পানিতে শুধু মাটি ভিজে না, ভিজে যায় সুতপার কাপড়ও। ক্ষোভে সুতপা পিছন ফিরে তাকান, কিন্তু কিছুই করার নেই।
ফলাফল পাওয়া যায়, সুতপা সব পরীক্ষায় পাস। তাকে পুত্রবধূ বানানোর সিদ্ধান্ত আসে। যদিও সুতপার বয়স কম, তাতে কী; পাত্র তো শিক্ষিত, চাকরিজীবী; সুতপার বাবা অমত করেন না। সুতপার মানসিক অবস্থা, ইচ্ছা কিছুরই ভ্রক্ষেপ নেই সেখানে।
‘সফল সমাজের ভিত্তি হলো বিয়ে’৭¾পুরুষ হিসেবে সুতপার বাবা হয়তো এতেই বিশ্বাসী। সমাজকে সফল করার জন্য তারও একটা অবদান রাখা দরকার। তাই তো মেয়ে বিয়ে দিয়ে অন্য কোনো পুরুষের অধীনে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রয়াস দেখা যায়! চলচ্চিত্রের ২৩ মিনিট চার সেকেন্ডে সুতপার মাকে উদ্দেশ করে বাবাকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমার মেয়েকে তো তারা পছন্দ করে ফালাইছে, আগামী শুক্রবার কাবিন হয়ে যাবে’। এরপর বেশ কিছুক্ষণ সুতপার মায়ের সঙ্গে গল্প করেন বাবা; ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমার মেয়েটাকে একটু ভালো মন্দ খাওয়াও, ও আর বেশিদিন আমাগো কাছে নাই।’ বাবার এই নির্মম কথায় বোঝা যায়, নারীর বিয়ে মানেই এতো দিনের এই চেনা-পরিচিত, ভালোবাসার সংসার থেকে একেবারে বিদায়। নির্বাক মা-ও যেনো সেটা মেনে নেন, কথা বাড়ান না!
চলচ্চিত্রের ২৪ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে দেখা যায়, সুতপা মাকে জড়িয়ে উচ্চস্বরে কাঁদছেন। তার কান্নার সঙ্গে ভেসে আসে বিয়ে না করার, শ্বশুরবাড়ি না যাওয়ার আকুতি। সুতপার মা মেয়েকে বুকে চেপে ধরেন। তার হয়তো এর বেশি কিছু করারও ছিলো না। কিন্তু সুতপার সে কান্না তার বাবার কান অবধি পৌঁছায় না। তার এই কান্নায় মায়া-আবেগ আছে, কোনো প্রতিবাদ নেই!
সংসার যেনো ভুলিয়ে দিলো সব জয়ের নেশা
বিবাহের মাধ্যমে সুতপার অনুপ্রবেশ ঘটে সংসারে। ভয়েসওভারে ধারাভাষ্যকার যেমনটা বলেন, ‘সুতপার স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে সংসারে প্রবেশের মাধ্যমে। নারীর বিসর্জন যতো, সংসারে সুখ ততো।’ কিন্তু যতোক্ষণ না সুতপার স্বামী মারা যান, ততোক্ষণ নারী হিসেবে তার এই স্বপ্নের মৃত্যু, বিসর্জন পরিলক্ষিত হয় না। সুতপার বাড়িতে স্বামী আসলে তার খুশি হওয়া; শহরে সংসার শুরু করা; নিজের মতো করে সংসার সাজানো, কেনাকাটা, সাজগোজ ইত্যাদি দেখে বোঝার উপায় নেই তার মনে কোনো কষ্ট আছে। চলচ্চিত্রের ৪২ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে স্বামী শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে আসলে সুতপাকে বেশ খুশি হতে দেখা যায়। আবার স্বামী চলে গেলে তাকে দেখা যায় মন খারাপ করতে।
এসব দেখে তাৎক্ষণিক মনে হয়, সুতপাকে সুখী করার জন্য তার স্বামীই যথেষ্ট। একপর্যায়ে স্বামীর হাত ধরে তিনি শহরে চলে আসেন। সেখানে দুই কক্ষের ফ্লাটে ঢুকে ৪৫ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে সুতপার স্বামীকে বলতে শোনা যায়, ‘এটা তোমার সংসার এবং তাই আমি কিছু কিনিনি’। তিনি সুতপাকে নিজের মতো করে সংসারটা সাজিয়ে নিতে বলেন। এ কথা শুনে সুতপাকে তার স্বামীর বুকে মাথা রাখতে দেখা যায়। এরপর শুরু হয় সংসার সাজানো। সুতপা হয়ে ওঠেন ‘লক্ষী বউ’। আর এই লক্ষ্মী বউ হওয়ার ইচ্ছে যেনো তার সব স্বপ্ন ও ইচ্ছে ভুলিয়ে দেয়। ‘... সত্যিকারের নারীত্ব সুলভ নারীরা ক্যারিয়ার, উচ্চশিক্ষা, রাজনৈতিক অধিকার চায়না ...’৮; তারা ঘর সাজানো, স্বামীর সেবা, কীভাবে স্বামীকে দীর্ঘক্ষণ পাশে রাখা যায়, কী করলে স্বামী অন্য নারীর প্রতি আসক্ত না হয়, তাই শিখতে চায়; ঘরের বাইরের বিষয়গুলো মাথায় না আনাই তাদের জন্য মঙ্গলজনক¾সুতপাও যেনো এমনটা হয়ে গিয়েছিলো।
যদিও ধারাভাষ্যকার বলছেন, লক্ষ্মী বউ হওয়ার জন্য সুতপাকে অনেক ত্যাগ করতে হয়েছে, স্বপ্ন ও ইচ্ছের মৃত্যু হয়েছে। তবে সেটা শুধু ধারাভাষ্যকারের কথাতেই, চলচ্চিত্রের বাস্তবতায় নয়। চলচ্চিত্রের ৫১ মিনিট ২৮ সেকেন্ডে স্বামী বাসায় ফিরলে সুতপা যে খুশি খুশি চেহারা নিয়ে তাকে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর দেন, তা দেখে মনে হওয়ার কোনো উপায় নেই তিনি কষ্টে আছেন কিংবা স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। তাহলে কি সংসারই তাকে তার সব জয়ের নেশা ভুলিয়ে দিয়েছে!
কর্তা না থাকলেই যতো সমস্যা
সুতপার ঠিকানায় সুতপা ট্রেনে ভ্রমণ করছেন আর স্মৃতিপটে তার শৈশব, কৈশোর, বৈবাহিক জীবন, বৈধব্য ভেসে আসছে। তার সেই শৈশব, কৈশোর ও বৈবাহিক জীবনের চিত্র সুন্দর ও নির্মল। এই সময়ে শিশু সুতপাকে সবুজ ধান ক্ষেতের আইল ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে বড়ো হতে দেখা যায়। সবুজ ধান ক্ষেতের মাঝে এই দৌড়ানোটা ঘুরেফিরে কয়েক বার এসেছে চলচ্চিত্রে। হয়তো সুখের মোটিফ হিসেবে এটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। সংসার জীবন ভালোই চলছিলো, হঠাৎ সুতপার স্বামীর মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনে নেমে আসে দুঃখ-কষ্ট। তিনি যেনো সবকিছুতে খেই হারিয়ে ফেলেন। তার ভিতরে শৈশবের সেই চাঞ্চল্য, স্বপ্নচারিতা আর দেখা যায় না। বৈধব্য যেনো কেড়ে নেয় তার সব জৌলুস। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা তিন মিনিট ২১ সেকেন্ডে সরকারি বাসা ছাড়ার নির্দেশ আসে। সুতপা কোনো কিছু না ভেবেই ছেলেকে নিয়ে ভাইয়ের বাসায় ওঠেন। সেই জীবন একেবারেই নতুন। সেখানে নির্ভরশীলতা যেমন আছে, আছে অদৃশ্য দায়বদ্ধতা। সেই নির্ভরশীলতা নিয়ে সুতপার মন বিষণ্ন থাকলেও, দায়বদ্ধতা নিয়ে তার মধ্যে কোনো তাড়না কাজ করে না। অনেকটা শুয়ে-বসেই সেখানে সময় কাটান সুতপা। তাকে সেখানে কোনো কাজ করতেই দেখা যায় না! সম্ভাবনাময় জীবনকে অনেকটা খাটে বসেই কাটিয়ে দেন তিনি। যদিও তার ভাবীকে কখনো কখনো তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে দেখা যায়। সুতপা খুব সহজেই সেই আচরণের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন বলে মনে হয়। তার মধ্যে কোনো রাগ, ক্ষোভ কিংবা নিজেকে প্রকাশের প্রবণতা একেবারেই লক্ষ করা যায় না। ঘুরেফিরে কেবল স্বামীর অনুপস্থিতি এবং তার সঙ্গে কাটানো ভালো সময়গুলো তার চোখে ভাসে।
চলচ্চিত্রের ৪৪ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে ট্রেনে বসা অবস্থায় সুতপার চোখ পড়ে এক বিবাহিত যুগলের ওপর। তাদের সম্পর্ক দেখে তার বিষণ্ন চেহারায় এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে, আর পর্দায় দেখানো হয় ট্রেন ভ্রমণের সময় স্বামীর সঙ্গে তার আমড়া খাওয়ার দৃশ্য। এরপর ধারাবাহিকভাবে পর্দায় আসে সুতপার সুখের সংসার সাজানোর নানা স্মৃতি। ৪৬ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে ড্রেসিং গ্লাসের আয়নায় সুতপার হাসিমাখা মুখ দেখে মনে হয় কতো সুখই না ছিলো স্বামী থাকাকালীন! মানুষ দুঃখের সময় সুখের স্মৃতি আওড়িয়ে সব ভুলতে চায়। ঠিক যেনো সুতপাও বৈধব্য জীবনে, বৈধব্য-পূর্ব সময়ের কথা মনে করে একটুখানি স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন।
এই পরিস্থিতিতে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, স্বামী ছাড়া সমাজে নারীর কোনো অস্তিত্ব নেই! স্বামী থাকলে সব আছে, তা ছাড়া নেই! আর স্বামীর অনুপস্থিতিতেই কেবল নারী নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়!
নয়নের মণি তবু ঘরে হয় না ঠাঁই
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২৪ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে দেখা যায়, সুতপাকে নিয়ে তার ছেলে অপু গাড়িতে ওঠেন। সুতপাকে বলতে শোনা যায়, কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমায়? উত্তরে তার ছেলে বলেন, চলো না মা। তারপর মা, ছেলে গিয়ে ওঠে নতুন ফ্ল্যাটে। সুতপা অবাক হয়! এরপর ছেলেকে মায়ের কাঁধে হাত রাখতে দেখা যায়। ভয়েসওভারে ধারাভাষ্যকারকে বলতে শোনা যায়, ‘বুদ্ধি থাকলে ঘটে, এ আর তেমন কিছু নয়, তোমার জন্য আর একটি চমক রাখা, তোমার যেনো আর একলা না লাগে, মিষ্টি একটা সঙ্গী শীঘ্রই হবে পাওয়া, তুমি বললে তুলে আনবো শীত আসারই আগে।’
ধারাভাষ্যকার বললেও কথাগুলো আসলে তার ছেলেরই। বোঝা যায়, মায়ের প্রতি ছেলের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সম্মানের কমতি নেই। ধারাভাষ্যকার আবারও বলেন, ‘কার্তিক শেষে শীত ছুঁই ছুঁই অগ্রহায়ণ আসে, সুতপার মনে সুখ সংশয় সমান্তরাল বয়, নাতি-নাতনির মুখের ছায়া দু-চোখ জুড়ে ভাসে; বউ এলে কি ছেলে হয় পর? জাগে এমন ভয়!’ অর্থাৎ সুতপা একদিকে যেমন সুখ অনুভব করেন, অন্যদিকে ঠিক ততোখানি ছেলেকে হারানোর ভয় কাজ করে তার ভিতর। কারণ ছেলের বউ। ছেলের বউয়ের আচরণের ওপরই হয়তো মা-ছেলের সম্পর্ক নির্ভর করবে।
ছেলের বউ ঘরে আসে। নতুন বউয়ের আচার-আচরণ মার্জিত, শ্বাশুড়ির প্রতি তার ভক্তি-শ্রদ্ধার কমতি নেই। এক ঘণ্টা ৫৪ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে সুতপাকে বলতে শোনা যায়, ‘তুমি আমার বউ না, তুমি আমার মেয়ে।’ উত্তরে বউমাও বলেন, ‘আমিও আপনাকে আমার মা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারি না।’ কথোপকথনে বোঝা যায়, তাদের মধ্যকার সম্পর্ক মধুর। সুতপার জীবন আবার সুখে ভরে ওঠে। আবার পর্দায় ভাসে ধান ক্ষেতের আইল ধরে শিশু সুতপার দৌড়ানোর মোটিফ।
হঠাৎ একদিন অপুর শ্বাশুড়ি বেড়াতে আসেন তাদের বাসায়। ছোটো ফ্ল্যাটে অতিথি থাকার আলাদা কোনো কক্ষ নেই। তাই অপুর শ্বাশুড়ির থাকার ব্যবস্থা হয় সুতপার ঘরেই। মেঝেতে ঘুমানোর অভ্যাস থাকায় সুতপার খুব বেশি অসুবিধে হচ্ছিলো না। কিন্তু সমস্যা বাঁধে অপুর শ্বাশুড়িকে নিয়ে। একপর্যায়ে তিনি সুতপাকে বলেই ফেলেন, ‘ভাবছিলাম মেয়ের বাসায় কয়েকটা দিন থেকে যাবো, আপনি না হয় এই ক’টা দিন আপনার ভাইয়ের বাসা থেকে ঘুরে আসুন।’ বোঝা যায়, এ ধরনের কথার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না সুতপা। তাই খানিকটা নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকেন। পরদিন ভোরে কাউকে কিছু না বলেই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েন সুতপা। চলচ্চিত্রজুড়ে সবকিছু মেনে নেওয়া সুতপার এমন দ্রোহে দর্শকও অবাক হয়!
নিরুদ্দেশ যাত্রা
চলচ্চিত্রজুড়ে সুতপাকে দেখা যায় বাবা, স্বামী, ভাই ও ছেলের আশ্রয়ে থাকতে। এর বাইরেও যে একটা জীবন আছে, সেটা উপলব্ধির সুযোগই নেই সেখানে। কেনো জানি পরাশ্রয়েই সুতপা কাটিয়ে দিলেন মূল্যবান এক জীবন! নির্মাতা কেনো সেটা করলেন, তা তিনিই ভালো জানেন।
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৪২ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে ট্রেনে সুতপাকে অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়। আবহে ভেসে আসে গানের সুর¾ ‘ ... আমি কেনো ভাসলাম গো ভবে নারীর জনম লইয়া/ চিরদিন পরের অধীন পরের স্বাধীন গো/ সদাই থাকি পরের মন জোগাইয়া।’ গানের কথা শুনে মনে হয়, নারীর পুরো জীবনই একটা বোঝা, অন্যের অধীন হয়ে থাকা, অন্যের সেবা করা। পুরুষের কথার বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। স্বামীর মৃত্যুর পর দেবরের সঙ্গে সুতপার কথা হয়েছিলো, স্বামীর পাশেই তার কবর হবে, যদি তিনি আগে মারা যান। চলচ্চিত্রের শেষের দিকে ট্রেনে সুতপাকে তার ভ্রমণসঙ্গীর সঙ্গে কথোপকথনের সময় আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায়, ‘আমি আসলেই জানি না, আমি কোথায় যাবো! মানুষের শেষ ঠিকানা হলো কবর, আমার তো সেই জায়গাটাও অনিশ্চিত।’ নারীর জীবন কি আসলেই এতোটা অনিশ্চিত! এক সুতপার জীবন এটা হলেও, সব নারীর জীবনও কি তাই!
এর শেষ হওয়া জরুরি
সুতপার ঠিকানা উৎসর্গ করা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার নারীদেরকে। কিন্তু কেনো এই উৎসর্গ তার উত্তর সুতপার ঠিকানায় নেই, দর্শক হিসেবে অন্তত বুঝিনি। শুরুতেই বলেছিলাম, গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রে নারীর অবস্থানের কথা। নির্মাতা সেই ঠিকানাতেই নারীকে পৌঁছে দিলেন।
যদিও শেষ মুহূর্তে এক আত্মপ্রত্যয়ী সুতপাকে পাওয়া যায়। যিনি সব গ্লানি মুছে একা নতুনের পথে ট্রেন থেকে নেমে পড়েন, হাতে ঘড়ি পরে নেন। কিন্তু ততোদিনে সেই ঘড়িতে ধারণ করা সময় সুতপার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। সুতপার জীবনের সেই সময় হারিয়ে গেলেও দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি নারী এখনো সুতপার থেকে নিজেদেরকে আলাদাই ভাবেন।
লেখক : আনতারা সোনিয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
soniaislam.kgc@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100010523371229
তথ্যসূত্র
১. রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, উদ্ধৃত; গোলাম মুরশিদ (২০১৩ : ১৮৯); ‘প্রথম নারীবাদী : রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’; নারীপ্রগতির একশো বছর : রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া; অবসর প্রকাশনা, ঢাকা।
২. আহমেদ, রেহনুমা (২০১৬ : ১৫); “‘অসুখী বিয়ে’। বাম ধারা ও নারীবাদ”; প্রবল ও প্রান্তিক ৩; সিরিজ সম্পাদক : রেহনুমা আহমেদ; পাবলিক নৃবিজ্ঞান, ঢাকা।
৩. বিদ্যাসাগর, ঈশ্বরচন্দ্র (১৯৯৭ : ৫২৪); ‘বাল্যবিবাহের দোষ’; বিদ্যাসাগর রচানাবলী-১; সম্পাদনা : তীর্থপতি দত্ত; তুলি-কলম, ভারত।
৪. খুশি, হালিমা ও রায়, রুম্পা; ‘সতী, অন্তর্জলী যাত্রা ও ওয়াটার : দাহ নারীর সেকাল একাল’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, সংখ্যা ৪, বর্ষ ২, জানুয়ারি ২০১৩, পৃ. ১২৮।
৫. https://goo.gl/E1he6i; retrieved on: 26.09.2018
৬. https://tradingeconomics.com/bangladesh/remittances; retrieved on: 28.09.2018
৭. পির্টাস্, সিনথিয়া; ‘বিয়ে কি নিরাপত্তা দেয় নাকি নিয়ন্ত্রণ করে’; অনুবাদ : রন্জন; চন্দ্রাবতী; সম্পাদনা : সুস্মিতা চক্রবর্তী; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, সংখ্যা ১, বর্ষ ১, ২০০৬, পৃ. ৯৮।
৮. ফ্রাইডেন, বিটি; ‘যে সমস্যার নাম নেই’; অনুবাদ : সুস্মিতা চক্রবর্তী ও রবি রফিক; চন্দ্রাবতী; সম্পাদনা : সুস্মিতা চক্রবর্তী; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, সংখ্যা ১, বর্ষ ১, ২০০৬, পৃ. ৮৯।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন