Magic Lanthon

               

প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম

প্রকাশিত ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চলচ্চিত্রের কথা

প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম

পর্ব ৬)

নোয়ার ও জনরা

১৯৪০-এর দশকে হলিউড চিত্রজগতে দুটি নতুন শব্দের আবির্ভাব ঘটায়। এগুলো হলো ‘জনরা’ (genre) ও ‘নোয়ার’ (noir)। জনরা শব্দটি ব্যবহৃত হয় চলচ্চিত্রের প্রকারভেদ বোঝানোর জন্য। অন্যদিকে, নোয়ার বিশেষভাবে অপরাধমূলক চলচ্চিত্র বোঝাতেই ব্যবহার করা হয়। অভিধানের ভাষায়,

Crime fiction featuring hard-boiled cynical characters and bleak sleazy settings an example of classic noir. A movie about crime that uses dark shadows and lighting to show the complicated moral nature of the subject.62

যদিও চূড়ান্তভাবে নোয়ারকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন, তবে এ কথা অনেকেই মেনে নিয়েছে যে, সাদা-কালোয় নির্মিত নোয়ার অপরাধমূলক চলচ্চিত্র, যা ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে নির্মাণ হয়। অনেকে একে একটি জনরা হিসেবে উল্লেখ করেছে; যা একটি মুভমেন্ট, একটি সার্কেল বা একটি হাইব্রিড বা একটি স্টাইল কিংবা এদের মধ্যবর্তী একটি ধরন। আবার কেউ একে উল্লেখ করেছে ‘কনসেপচুয়াল ব্লাকহোল’ বলে। উদাহরণ হিসেবে Double Indemnity (১৯৪৪) ও Out of the Past(১৯৪৭) চলচ্চিত্র দুটির নাম বিশেষভাবে শোনা যায়। এ ধরনের চলচ্চিত্র শুরুতে নির্মাণ হয়।

১৯৪০Ñ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে এ ধরনের চলচ্চিত্র আলোচনার শিখরে উঠে আসে এবং ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এর ধ্রুপদী কাল শেষ হয় Touch of the Evil-এর মধ্য দিয়ে। তবে নোয়ার চলচ্চিত্র সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয় জনরা সম্পর্কীয় আলোচনা প্রসঙ্গে। নোয়ার ও স্টাইল নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে। স্টাইল বলতে সমালোচকেরা সাধারণত চলচ্চিত্রের চেহারা বুঝিয়ে থাকে। এছাড়া অনেক ধরনের দৃশ্যমান মোটিফ এ ধরনের চলচ্চিত্রকে একত্রে বেঁধে রাখে। যেমন, রাত্রিকালীন দৃশ্য, ক্যামেরার কারুকাজ প্রভৃতি। উইলিয়াম পার্ক-এর মতে, নোয়ার চলচ্চিত্রগুলো একটি সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালের নব্য-বাস্তববাদী চলচ্চিত্র, ১৯৬০-এর দশকের ফরাসি নিউওয়েভ চলচ্চিত্র এবং ১৯৪০Ñ১৯৫০ এর দশকের অপরাধমূলক চলচ্চিত্র। হাইব্রিড বলতে সমালোচকেরা একাধিক জনরার সংমিশ্রণ বুঝিয়েছে। নোয়ার চলচ্চিত্রের একদিকে যেমন গোয়েন্দা কাহিনি অন্যদিকে রয়েছে মেলোড্রামা।৬৩

নোয়ার সম্পর্কিত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ হলো জেমস নিয়ারমোর-এর ‘More than Night, film noir In its context’। এখানে আলোচনার প্রেক্ষাপটে বলতে চাওয়া হয়েছে, নোয়ার চলচ্চিত্রের কোনো আলাদা বৈশিষ্ট্য নেই। এছাড়া আরো অনেকে নোয়ার সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এর প্রেক্ষাপট, লেখক ও এর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক নিয়ে আলোচনা করেছে। তারা নোয়ারের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি চেষ্টা করেছে দর্শকের অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের। পরিশেষে জেমস নিয়ারমোর বলতে চেয়েছেন, নোয়ার চলচ্চিত্রে এসেন্স বলে কিছু নেই। নোয়ার সম্পর্কে কতিপয় মন্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো :

·      Alain silver, in his introduction to his Film Noir Reader, and Paul Schrader, in his 1972 `Notes on Film Noir' say that it began in 1941 with The Maltese Falcon and ended in 1958 with Touch of Evill.

·      Michael Stephens (Film Noir: A Comprehensive Illustrated Reference to Movie, Terms, and Persons) believes that stranger on the Third Floor (1940) was `the first true film noir' and that `film noir was never really gone away, but has involved into new sub-genres.'

·      Forsters Hirsch, states in The Dark side of the screen that the most sensible view has film noir `extending from the early forties to the late fifties'.

·      Lee Server, in his introduction to hard-Boiled (Great lines from Classic Noir Films) by Peggy Thompson and Sacko Usukawa, points to Citizen Kane (1941) and The Maltese Falcon (1941) as the `true catalysts for the genre.' (The authors, though, include a line from 1940's stranger on the Third Floor) Server has the classic period ending with Touch of Evil and Vertigo (both 1958).

·      Paul Duncan, in Film Noir: Films of Trust and Betrayal, says that film noir classic period ran from 1940 through 1960, but none of the more than 500 films lists are from 1960.

·      David N. Meyer (A Girl and A Gun: The Complete Guide to Film Noir on Video) believes the classic period began with The Maltese Falcon (1941) and ended with Touch of Evil (1958).

·      Spencer Selby, in Dark City: The Film Noir says the classic periood started with Rebecca (1940) and ended with Odds Against Tomorrow (1959).

·              Aurthur Lyons, in Death on the Cheap: The Lost B movies of Film Noir! believes that `1939 was actually the year that inaugurated the film noir with the release of three prototypical films: let us live, Rio and Blind Alley.64

অপরাধ সর্বজনীন এবং সর্বত্রই দেখা যায়। চলচ্চিত্রে যখন অপরাধ দেখানো হয়, তখন সেই চলচ্চিত্র দর্শক আলাদাভাবে চিত্রিত করে। আর্থার লিওনস সবধরনের ‘বি মুভিজ’ ক্যাটাগরির অপরাধ চলচ্চিত্রকে নোয়ারে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে অনেকে ক্রাইম ফাইটার্স, প্রিজম ফিল্ম, স্পাই ও সিক্রেট এজেন্ট ইত্যাদি চলচ্চিত্রকেও নোয়ারের পর্যায়ভুক্ত করে। আঁদ্রে বাঁযা অবশ্য পুলিশ এবং গ্যাংস্টার ফিল্মকে ‘গ্রান্ড জনরার’ মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন। গ্যাংস্টার ফিল্ম একটি আলাদা জনরার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। Little Caesur (১৯৩১), The Public Enemy (১৯৩১) ও Scarfaceচলচ্চিত্রগুলো সেই মোতাবেক গ্যাংস্টার চলচ্চিত্র হিসেবে পরিগণিত হয়। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে Bullitt (১৯৬৮), The French Connection(১৯৭১), Dirty Harry (১৯৭১) এই চলচ্চিত্র তিনটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। তবে I. A. Confidential (১৯৯৭) চলচ্চিত্রটিকে সাধারণভাবে নব্য নোয়ার হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে পার্ক, উপরের তিনটি চলচ্চিত্রের মতো এটিকেও পুলিশের ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। তৃতীয় আরেকটি ক্যাটাগরি ১৯৩০-এর দশকে প্রসিদ্ধ হয়, তা হলো ‘রহস্য’ চলচ্চিত্র। প্রশ্ন থেকেই যায়, নোয়ার চলচ্চিত্র যাবতীয় অপরাধ চিত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, নাকি একটি আলাদা জনরা হিসেবে বিবেচিত হবে। By Widespread consensus, film noir begins to come into focus in October, 1941 when Warner Brothers released the third version of the novel The Maltese Falcon (1930).65

Double Indemnity (১৯৪৪) নোয়ার চলচ্চিত্রের একটি ক্ষুদ্রমূর্তি। এটি জনরা হিসেবে একটি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়। এক দম্পতি একজন লোককে খুন করে বীমার অর্থের জন্য। এটি তাদের সার্বিক সর্বনাশ বয়ে আনে। গল্পটি ফ্লাশব্যাকে দোষী ব্যক্তির বয়ানে বেরিয়ে আসে, তখন সে তার প্রিয়তমাকে খুন করে এবং নিজেও তার হাতে গুলিবিদ্ধ হয়। এ ধরনের গল্প বলা চলচ্চিত্রে একটি নতুন ধারা সৃষ্টি করে এবং প্রশংসিত হয়। প্রথমত, গল্পটি কোনো বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়নি বরং বক্তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বলা। এতে দর্শক উৎকন্ঠা, নৈতিক ব্যর্থতা ও আবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়। এ ধরনের কাহিনিচিত্র অধঃপতন, বীরত্ব বা উদয়নের বিষয় হতে পারেনি। যা A Tale of Two cities(১৯৩৫) পেরেছিলো।

Much of film noir invites us to experience its stories from the inside out. Many films underscore their narrator's subjectivity with the soundtrack presence of that person's voice interwoven with scenes dramatizing events in that story; the subjectivity is further underscored by Expressionistic visuals evoking the narrator's nightmares, feelings of entrapment, and hallucinations. This focus upon interiority, particularly upon that of doomed people struggling to contain their own escalating panic, often foregrounds distortions of perception as well as states paralyzing despair. This accounts for the preponderance of nightmares and of hallucination in film noir and for the particular value that Freudian theory had not only in the conceptualizing of many of the films but also for the ongoing study of the genre.66

দ্বিতীয় ইফেক্ট হিসেবে পশ্চাৎমুখী বর্ণনা সাসপেন্স হিসেবে গল্পের বিকাশকে ব্যাহত করে। গল্পটি যতোই অগ্রসর হয়, দর্শক কী হতে যাচ্ছে, তার চেয়ে কী হচ্ছে সেদিকেই মনোনিবেশ করে। এ ধরনের অপরাধ নিরসনের দিকে সনাতন অপরাধ চিত্রগুলোর দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। অপরাধীর ব্যাপারে ততোটা নাক গলায় না। গল্পটি সবসময় সামনের দিকে এগোতে থাকে এবং দর্শক এর ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু আলোচিত A Tale of Two cities-এ এ ঘটনা পিছন দিকে অগ্রসর হয়।

তৃতীয় ইফেক্টটি হলো, ঘটনা বর্ণনাকারীর অবসন্ন মন, যা দেখে তাকে শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে যন্ত্রণাকাতর মনে হয়। এ পর্যায়ে অপরাধী আশাবাদী থাকে না বরং তাকে অস্থির মনে হয়। দেখা যায়, বন্ধুবান্ধব অথবা মনিবের কাছে সে তার অপরাধ স্বীকার করছে। নোয়ার চলচ্চিত্রের ইফেক্ট সম্বলিত কেন্দ্রিকতা একটি কাঠামোয় পরিণত হয়। Yanki Doodle Dandy (১৯৪২), Why We Fight (১৯৪২Ñ১৯৪৫) একই ধরনের নোয়ার চলচ্চিত্র হিসেবে দেখা যায়। অন্য জনরাগুলো যেমন ওয়েস্টার্ন, রোমান্টিক কমেডি ইত্যাদি চলচ্চিত্রগুলো কোনো বিশেষ চরিত্রে সাফল্যজনক পরিসমাপ্তি দেখায়; যেখানে নোয়ার চলচ্চিত্র ভ্রমাত্মক চরিত্রের দুঃস্বপ্নগাঁথা দেখাতে বেশি আগ্রহী।

এদিক থেকে হরর চলচ্চিত্রের সঙ্গে নোয়ারের সাদৃশ্য দেখা যায়। তবে হরর চলচ্চিত্রের মতো অতিপ্রাকৃতিক বিষয় এখানে নেই। অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বা সামাজিক অবিচারের মধ্য থেকে তারা ব্যক্তি নির্বাচন করে, যারা অসুস্থ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা, মনস্তাত্ত্বিক বিরক্তি, অপরাধমূলক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের খোরাক হয়ে থাকে। চরিত্রগুলোর হিস্টিরিয়া আক্রান্ত অবস্থা দারুণভাবে অপরাধপ্রবণ সমাজের অন্তর্নিহিত রূপকে তুলে ধরার চেষ্টা করে।This environment of doom, evil, and failure paralled the trouble subjectivity of many of the films. It generated the sense that the characters deepest fears were becoming palpable.67

নোয়ার চলচ্চিত্র সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী মার্কিন চলচ্চিত্র, যা ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকের সামাজিক রাজনৈতিক চলচ্চিত্র থেকে উদ্ভাবিত। অনেকে মনে করে, ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে এটি উদ্ভাবিত হলেও ১৯৬০-এর দশকে হলিউডের পতিত অবস্থা ও রঙিন চলচ্চিত্রের আবির্ভাব বাণিজ্যিকভাবে সফল চলচ্চিত্রের ইতি টানে। তবে ১৯৭০-এর দশকে নতুনভাবে অতীতমুখী নোয়ার চলচ্চিত্রের আবির্ভাব লক্ষ করা যায়। অনেকে একে নব্য নোয়ার বা পুনঃনোয়ার বলেছে। তবে কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধ্রুপদী হলিউড চলচ্চিত্রায়নে ৪০ ও ৫০-এর দশকের চলচ্চিত্র নির্মাণ, সাদা-কালো চলচ্চিত্রের স্মৃতি এবং পুরুষ ও নারীত্বের হৃত স্টাইল এই পুনঃআবির্ভাবের কারণ? আগেই বলেছি, নোয়ার চলচ্চিত্রে কোনো রঙের ব্যবহার ছিলো না, কিন্তু ২১ শতকের নোয়ার চলচ্চিত্রের গভীর লাল লিপস্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকে অবশ্য এই লাল ঠোঁটের মধ্যে রঙ না দেখে একটি ফর্ম আবিষ্কার করছে। তারা মনে করছে, এটির প্রলোভনাত্মক মুক্তি হয়েছে। এটি নতুন ধরনের নোয়ার চলচ্চিত্রের নতুনতর প্রেক্ষাপট তৈরি করবে। তবে স্মৃতি ও স্মৃতির বিনাশ আজকের নোয়ার চলচ্চিত্রের প্রধান পাথেয়।

Many crime-films produced from the 1950’s to the present day have become incorporated within the `genre’ of film `noir’. In this regard I would advice a certain degree of caution, for such film need to be considered not only in regard to the films noirs of the 1940’s but also in regard to the cinematic and cultural-ideological contexts in which and for which they were produced. For the conditions which `germinated’ the films noirs of the 1940’s were … specific to the 1940’s. To generalized beyond this risks destroying the credibility of both the films noirs and the crime films apres noir.68

উইলিয়াম লুর কয়েকটি নোয়ার চলচ্চিত্রের ওপর আলোচনা করেন। এদের মধ্যে MurderMy Sweet(১৯৪৪) অন্যতম। এই চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে দৃশ্য ও শ্রবণগত নতুনত্বের কৌশল, জটিল বর্ণনামূলকতা এবং চরিত্র নির্মাণ বিশেষভাবে উল্লেখ্য। চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক, চিন্তাশীল ও মতাদর্শগত কাঠামোর বিন্যাস লক্ষ করা যায়। প্রাচুর্য ও ঘনীভূত নির্মাণ কৌশল দর্শকের কাছে নোয়ার চলচ্চিত্রের উদাহরণ হিসেবে এই চলচ্চিত্রকে তুলে ধরে। লেখক এই চলচ্চিত্রের প্রধান আঙ্গিক ও বর্ণনামূলক বিষয় অতীত গোয়েন্দা উপন্যাসের আলোকে বিধৃত করেছেন। গোয়েন্দা কাহিনির মধ্য দিয়ে সূত্রপাত হলেও এটি ক্রমান্বয়ে যৌনতা ও যৌন-বিকৃতির কেন্দ্রিকতার দিকে অগ্রসর হয়। এই চলচ্চিত্রটি ৩০ বছর পর Fairwell My Lovely নামে নব্য নোয়ারের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। লেখক জেমস নিয়ারমোর নোয়ারের বৈশিষ্ট্যসহ তারকাদের ভাবমূর্তি এবং নব্য নোয়ার হিসেবে এর আবির্ভাবের কারণগুলো ব্যাখ্যা করেন।

পরবর্তী সময়ে যে চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে লেখক আলোকপাত করেন, সেটি হলো Out of the Past(১৯৪৭)। যেখানে নোয়ার চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যসমূহের ক্রসকারেন্ট লক্ষ করা যায়। আবার নব্য-নোয়ারের সঙ্গে যে পার্থক্য তাও সহজেই অনুধাবন করা যায়। বর্ণনাবিন্যাস ও চরিত্রের দ্ব্যর্থবোধকতা ক্রিটিকাল নোয়ার চলচ্চিত্রের দিকে ধাবমান। পশ্চাৎমুখী বর্ণনা এখানে অনেকটা অতীত অভিজ্ঞতার ফ্রয়েডীয় উন্মোচনকে নির্দেশ করে। এর অবপাঠ্যমূলক কৌশল ও প্রতীকী অর্থায়ন যুদ্ধ-পরবর্তী জনরার রেস ও জাতীয় ক্ষমতার ডিনামিক্সকে তুলে ধরে। চলচ্চিত্রটির বিষয় বৈশিষ্ট্যের কারণে অর্ধশতক পরে নব্য-নোয়ার হিসেবে পুনর্নির্মিত হয়।

এরপর জেমস নিয়ারমোর যে চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন, তা হলো Kiss Me Deadly। এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ হয় ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে, যখন নোয়ার চলচ্চিত্রে পতনের যুগ শুরু হয়েছে। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর ‘বি মুভি’ ক্যাটাগরি হিসেবে ইংরেজি-ভাষী দর্শকের কাছে অবহেলিত ও সমালোচিত হয়; তবে ফরাসি দেশে তা প্রশংসিত হয়। বর্তমানে চলচ্চিত্রটি একটি মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত। চলচ্চিত্রের গল্পটি সোজা-সরল। শুরুতে মাইক হ্যামারের সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ানার দেখা হয়, যে কিনা একজন ভয়ঙ্কর নারী। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া হাইওয়েতে দৌড়াচ্ছিলেন হত্যাকারীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু হত্যাকারীরা ক্রিশ্চিয়ানাকে ধরে ফেলে এবং বর্বরোচিত অত্যাচার চালায়। ক্রিশ্চিয়ানা কিছু বলার আগেই মারা যান। হত্যাকারীরা তার লাশ একটি গাড়ির মধ্যে চেতনাহীন মাইকের পাশে রাখে এবং গাড়িটি বোমায় উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। মাইক সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তিনি ক্রিশ্চিয়ানার হত্যাকারীদের কাছ থেকে একটা বড়ো কিছু আশা করেছিলেন, যা চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার সহিংসতা দেখা দেয়। তিনি আবার বোমায় আহত এবং তার এক বন্ধু নিহত হন। এবং পরে বিশ্বস্ত সহকারী ভেলদাকে তারা অপহরণ করে। কিন্তু মাইক সেই ইপ্সিত বস্তুটি না পাওয়ার কারণে লস এঞ্জেল্সের অপরাধ জগতের ক্ষতি সাধন করে।

অবশেষে তিনি বস্তুটির সন্ধান পান। সেটি ছিলো মূলত একটি রেডিওঅ্যাকটিভ ভর্তি বাক্স। যা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং একজন নারী মারা যান। বিস্ফোরণ চলাকালীন হঠাৎ করেই চলচ্চিত্রটির সমাপ্তি ঘটে। কিছু কিছু কারণে কিস মি ডেডলি ধ্রুপদী নোয়ার চলচ্চিত্রের পর্যায়ে পড়লেও এটির পুনাবির্ভাব ঘটে নব্য-নোয়ারের আদলে। সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে চলচ্চিত্রটি বর্বর অনৈতিক চরিত্রের লোলুপতাকে তুলে ধরে, যা আত্মবিধ্বংসী পরিণতিতে সমাপ্ত হয়। আণবিক যুগের কনজ্যুমারিজম এই চলচ্চিত্রের আরেকটি আবহ সৃষ্টি করে। এছাড়া বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির স্বাদও এখানে পাওয়া যায়।

পরবর্তী সময়ে যে চলচ্চিত্রটি নিয়ে লেখক আলোচনা করেছেন, সেটি হলো The Long Goodbye (১৯৭৩)। একে নব্য-নোয়ারের শুরুর দিকের চলচ্চিত্র বলা হয়। এর আগে Kulte (১৯৭১) ও Dirty Harryচলচ্চিত্র দুটি নির্মাণ হয়। দ্য লঙ গুডবাই-এর পাশাপাশি নির্মাণ হয় Chinatown নামেও একটি চলচ্চিত্র। চায়নাটাউন জমকালো চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও ক্রিটিকাল বা কর্মাশিয়াল সাফল্য লাভ করতে পারেনি। সেদিক থেকে চায়নাটাউন নব্য-নোয়ার চলচ্চিত্র হিসেবে প্রশংসিত হয়। চলচ্চিত্রটি নানারকম জটিল কাহিনি নিয়ে আবর্তিত। বেসরকারি গোয়েন্দা জেক গেটসকে ‘লস এঞ্জেলস ওয়াটার পাওয়ার কোম্পানি’র প্রধান প্রকৌশলী হলিস মুলরে’র ওপর গোয়েন্দাগিরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। গেটস এ দায়িত্ব পান হলিসের স্ত্রী মিসেস মুলরে’র কাছ থেকে। কারণ হলিস একজন অল্পবয়সী নারীর সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। এরকম একটি ছবিও পত্রিকায় প্রকাশ হয়। পরদিন ওই ছবি ইভলিন নামে এক নারী নিজের দাবি করে, আইনজীবী নিয়ে হাজির হন হলিসের অফিসে। হলিসের সঙ্গে আইনজীবীর কথোপকথনের একপর্যায়ে বোঝা যায়, যে নারীর সঙ্গে হলিস ঘুরেছেন বলে ছবি প্রকাশ হয়েছে, বাস্তবে আসলে সেই নারীর কোনো অস্তিত্বই নেই। হলিসের নামে স্ক্যান্ডাল ছড়ানোর জন্যই এটা করা হয়েছে, সেটা তিনিও বুঝতে পারেন। এদিকে হলিস শহরে তখন অত্যন্ত আলোচিত ব্যক্তি। কারণ প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে তিনি শহরে প্রস্তাবিত বাঁধের বিরোধিতা করছেন। যদিও পুরো শহর তখন খরায় আক্রান্ত, পানির প্রয়োজন। পুরনো একটি বাঁধ ভেঙে বেশকিছু মানুষের প্রাণহানি ঘটায়, হলিস শহরে নতুন কোনো বাঁধ নির্মাণের ঝুঁকি নিতে চাইছিলেন না। অন্যদিকে চাষিদের অভিযোগ, হলিস পানি চুরি করছেন। এরকম জটিল থেকে জটিলতর ঘটনার মধ্য দিয়ে চায়নাটাউন শেষ হয়।

চায়নাটাউন নব্য-নোয়ার চলচ্চিত্রের শুরুতেই মুক্তি পায়। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে মুক্তির পর এক দশক এটি সাফল্যজনক চলচ্চিত্র হিসেবে টিকে ছিলো। বেস্ট অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে হিসেবে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে চলচ্চিত্রটি। একই সময়ে গডফাদার পার্ট ২ ছয়টি পুরস্কারসহ সেরা চলচ্চিত্র ঘোষিত হয়। তবে চায়নাটাউন পরবর্তী সময়ে গোল্ডেন গ্লোব-এ বেস্ট মোশন পিকচার, বেস্ট ডিরেক্টর ও বেস্ট অ্যাক্টর বিভাগে পুরস্কার পায়।

১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে চায়নটাউন ন্যাশনাল ফিল্ম রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্মান অর্জন করে। জেমস নিয়ারমোর চায়নাটাউন-এর নোয়ার চরিত্র সম্যকভাবে তুলে ধরেন। চোরা চরিত্রগুলোর বর্ণনা দেন এবং আলোকপাত করেন আইন-বহির্ভূত কার্যক্রমের ওপর। এছাড়া লস এনজেল্সে চায়নাটাউন সম্পর্কে জনপ্রিয় প্রত্যক্ষণকেও তিনি তুলে ধরেন। বলা বাহুল্য লস এঞ্জেলসের সামাজিক ইতিহাস চলচ্চিত্রটির প্লট তৈরি এবং চরিত্র চিত্রায়ণে বিশেষভাবে কাজে লাগে।

লেখক : প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

himam_ru@yahoo.com

 

 

তথ্যসূত্র

62. Merrium-Webster Dictionary On Li.

63. Park, William (2011: 02); What is Film Noir?; Bucknell University Press, Lanham Maryland.

64.  Keane. F, Michael (2003:13); Film Noir Guide; Mefarland and company, Inc. North Carolina.

65. Luhr, William ( 2012: 73-­80); Film Noir; Wiley Blackwell, London.

66. cÖv¸³; Luhr (2012: 90-120).

67. cÖv¸³;Luhr (2012: 121-190).

68. Krutnik (1989: 329); cited in Luhr, Willium (2012: 6); Film Noir; Wiley Blackwell, London.

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন