Magic Lanthon

               

ইতি সাহা

প্রকাশিত ২২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

তাহাদের চলচ্চিত্রকথা

ইতি সাহা

এবারের ঈদুল আজহা’র ছুটিটা ২০ দিনের মতো ছিলো। তাই রাজশাহী থেকে ঠাকুরগাঁও যাওয়ার সময় ছোট্ট অথচ কঠিন একটা কাজ সঙ্গে করে নিয়ে যাই। কঠিন বলছি এ কারণে যে, আগে এ ধরনের কাজ আমি করিনি। কাজ বলতে, গ্রামে আমাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে প্রবীণ কারো সঙ্গে খানিক সময় গল্প করা¾তাদের অতীত, বিশেষ করে কৈশোর, যৌবনে বিনোদনের মাধ্যমগুলো ঠিক কেমন ছিলো জানা। সেই মতো বাড়িতে গিয়ে এ নিয়ে তো আমি মহা টেনশনে; একেই নতুন কাজ, তার ওপর আবার আমি খুব সহজে কারো সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে পারি না। তাই বিষয়টি নিয়ে প্রথম দুইÑতিন দিন তো রীতিমতো শঙ্কার মধ্যে ছিলাম।

বাড়িতে গিয়ে শুরু থেকেই মনে মনে এমন একজনকে খুঁজছিলাম, যার সঙ্গে এ নিয়ে একটু কথাবার্তা বলা যায়। শেষ পর্যন্ত একজনকে পেয়েও যাই, নাম ঘনশ্যাম। গ্রাম সম্পর্কে তিনি আমার কাকা। ঘনশ্যাম কাকার বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ, ওই জায়গায় বেশ কয়েকটা মন্দির থাকায় লোকে বড়োধাম বলে ডাকে। সেখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা হয়। মন্দিরগুলোকে একসঙ্গে ‘বড়োধাম চৌষট্টি যুগনী দেবদেবীর মন্দির’ বলা হয়। এই মন্দিরে পূজা হয় পাঁচ বছর পর পর। সেই পূজার আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য প্রায় চারÑপাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সেখানে চৌষট্টি যুগনীর অংশ হিসেবে ৭০Ñ৮০টি দেবদেবীর মূর্তি তৈরি হয়। পূজায় দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর লোকের আগমন ঘটে। লোকমুখে শোনা যায়, মানুষ তাদের মনের ইচ্ছা এখানকার দেবদেবীর কাছে জানালে অনেকক্ষেত্রে তা পূরণ হয়। ইচ্ছা পূরণ হলে ভক্তরা খুশি হয়ে মন্দিরে দান করে আবার অনেকে মানতও করে।

ঘনশ্যাম কাকার বাড়িটা রাস্তার পাশে থাকা মন্দিরের ঠিক বিপরীতে সামান্য ভিতরে। ৫৬Ñ৫৭ বছরের ঘনশ্যাম কাকা পেশায় কৃষক। একদিন দুপুরে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েই বাজার থেকে ফিরছিলেন তিনি। হঠাৎ কী যেনো মনে হতেই তাকে ডাক দিই। এরপর আমার উদ্দেশ্যের কথা তাকে বুঝিয়ে বলি। প্রথমে কাকা কেমন জানি খানিকটা ইতস্ততবোধ করলেন। এক ফাঁকে আমাকে বলেই বসলেন, এখন ব্যস্ত আছি রে মা, পরে কথা বলিস। সুযোগ পেয়ে আমি খানিকটা দাবি নিয়েই তাকে বলতে থাকি, একটু কথা বলেন কাকা, আমি আপনার বেশি সময় নেবো না। পরে একরকম বাধ্য হয়েই কিছু সময় কথা বলেন তিনি। অবশ্য আমার বাড়ির লোকজনের সঙ্গে এ নিয়ে আগে কথা বলার সময়ই সিনেমাপাগল হিসেবে ঘনশ্যাম কাকার নাম শুনেছিলাম। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার ব্যাপারে গ্রামে একসময় তার নাকি বেশ সুনাম ছিলো। তারপরও শুরুতেই তাকে জিজ্ঞেস করি, প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে কি কখনো চলচ্চিত্র দেখেছেন? উত্তরে কাকা বলেন, “হ্যাঁ, অনেক সিনেমা দেখছি। তখন তো ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া, গড়েয়া, আটোয়ারী সব জায়গায় সিনেমাহল ছিলো। ঠাকুরগাঁও সদরে ছিলো ‘বলাকা’, ‘নাজ’, ‘ভাই ভাই’ ও ‘সুশ্রী’।” এই সব প্রেক্ষাগৃহে তিনি বিভিন্ন সময় চলচ্চিত্র দেখেছেন বলে জানান।

কথায় কথায় ‘নাজ’-এ নিষ্পাপ (১৯৮৬) নামে একটি চলচ্চিত্র দেখার কথা জানান কাকা। তার ভাষায়, ‘এই সিনেমাটা বোঝার মতো সামাজিক সিনেমা।’ এছাড়া বেদের মেয়ে জোস্না (১৯৮৯) নাকি খুব ভালো লেগেছে কাকার। একপর্যায়ে আমি সেই সময়ে চলচ্চিত্র ছাড়াও আর কী কী বিনোদন মাধ্যম ছিলো¾জানতে চাই তার কাছে। প্রথমেই ‘হলির ধামের গান’-এর কথা বলেন ঘনশ্যাম কাকা। কাকার বর্ণনায়, খোলা মঞ্চে অভিনয়শিল্পীরা নাচগান সহযোগে অভিনয় করতো। মূলত কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর লিখিত স্ক্রিপ্ট নিয়ে একজন মঞ্চের পাশে বসতো, তিনি সংলাপ বললে তা শুনে সেই মতো অভিনয় করতো মঞ্চের শিল্পীরা। তবে এই অভিনয়শিল্পীদের সবাই থাকতো পুরুষ, এমনকি নায়িকাও। তার কথায় যতোখানি বুঝলাম, তাতে বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এটাকে আমার যাত্রাপালার মতোই মনে হলো।

‘হলির ধামের গান’ সাধারণত ফাল্গুনের দোল পূর্ণিমা ও কার্তিকের লক্ষ্মী পূর্ণিমার তিথিতে হয়। কাকা বলেন, আগে এসব আয়োজন করা হতো বছরে দুই বার করে। কিন্তু এখন আর হয় না। আগে মানুষ এসব গান শোনার জন্য সকাল-দুপুর-রাত গানের আসরে ভিড় জমাতো। কিন্তু বর্তমানে তো সব ইতিহাস হয়ে গেছে। তবে কাকা জানান, বর্তমানে লক্ষ্মী পূর্ণিমার তিথিতে মাঝে মধ্যে এসব গান হয়। দোল পূর্ণিমায় আর হয় না। এর পরিবর্তে এখন অষ্টনাম কীর্তন হয়।

এরপর কাকা ‘পার্টির গান’-এর কথাও বলেন। শীতের শেষের দিকে গ্রামে ধান কাটার পর সেই জমিতে যে মেলা বসতো, সেখানকার একটা পর্ব ছিলো এই ‘পার্টির গান’। তার ভাষায়, ‘পার্টির গান কিন্তু খুব সামাজিক ছিলো, ওর মধ্যে সুন্দর গল্প থাকতো। কিন্তু পরে ওদের ভঙচঙ বেড়ে যায়। তাই আমরাও পার্টির গান শুনতে যাওয়া বাদ দিয়ে দিই।’ তবে এতো সবকিছুর বাইরেও ঘনশ্যাম কাকা তখন নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখতেন বলে জোর দিয়ে জানান।

তখন আমি তাকে প্রশ্ন করি এখন চলচ্চিত্র দেখেন না? শুনেই কেমন জানি নাক সিটকান কাকা। আমি বোঝার চেষ্টা করি, যে মানুষগুলোর কাছে একসময় বিনোদন বলতে চলচ্চিত্র ছাড়া তেমন কিছু ছিলো না, অথচ তারাই আজ চলচ্চিত্রের কথা শুনলে দশ হাত পিছনে চলে যায়; কেনো? এ নিয়ে আলাপ তুলি তার সঙ্গে। কাকার ভাষায়, ‘ সেসময় শাবানা, ববিতা, রাজ্জাকের সিনেমাগুলোতে চিন্তাভাবনা করার মতো অনেক জিনিস ছিলো। এই সিনেমাগুলো সামাজিক ছিলো। একটা সংসারে ঠিক কী ঘটে সেগুলো গভীরভাবে উঠে আসতো ওই সিনেমায়। দেখার পর সেগুলো মনে গেঁথে যেতো।’ কাকা আরো জানান, ওইসব চলচ্চিত্র মানুষকে এতোটাই প্রভাবিত করতো যে, গ্রামের অনেক যাত্রাপালার কাহিনি চলচ্চিত্রের কাহিনির মতো হয়ে যেতো।

কাকা জানান, তার জীবনে প্রথম চলচ্চিত্র দেখা এবং স্বাধীনতার পরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসার দিনটি ছিলো একই! যুদ্ধ শেষে সেদিন কেবল তারা ভারত থেকে ফিরে এসেছে, তারপর খবর আসে শিবগঞ্জের বিমান ঘাঁটিতে বিমান নেমেছে। সেখানে বিমান দেখতে যাই; তারপর সেখান থেকে সোজা চলে যাই প্রেক্ষাগৃহে। জীবনের প্রথম সেই চলচ্চিত্র তিনি দেখেন ঠাকুরগাঁওয়ের ‘বলাকা’ প্রেক্ষাগৃহে। চলচ্চিত্রটির নাম বা কাহিনির কোনোটাই আজ অবশ্য কাকার আর মনে নেই। তার ভাষায়, ‘এতো দিনের কথা কি আর মনে থাকে মা! তখন আমার বয়স এই ধরো ১৪Ñ১৫ বছর হবে।’

বলাকা সিনেমা হলের একাংশ এখন ডায়াগনস্টিক সেন্টার

কাকা জানান, তখন ঠাকুরগাঁও শহরে চারটি প্রেক্ষাগৃহ ছিলো। কিন্তু বর্তমানে ‘বলাকা’ ছাড়া আর কোনো প্রেক্ষাগৃহ নেই। বড়ো বড়ো এই ভবনগুলো এখন তালাবদ্ধ অবস্থায়। হয়তো এই ভবন আর কোনোদিনই খুলবে না! মানুষের আনাগোনায় মুখরিত হবে না এর চারপাশ। শুধু ঠাকুরগাঁও সদর নয়, কাকার সঙ্গে কথা বলার পর একটু খোঁজ নিয়ে জানতে পারি পাশের রূহিয়া থানার প্রেক্ষাগৃহগুলোও এখন আর চলে না। অথচ এই আমি আটÑনয় বছর আগে রুহিয়ার সেই প্রেক্ষাগৃহে জীবনের প্রথম গিয়েছিলাম মনপুরা (২০০৯) দেখতে। তার আগে অবশ্য আমি বেশিরভাগ চলচ্চিত্র টেলিভিশনেই দেখতাম। কিন্তু তখন শুনেছিলাম মনপুরা নাকি টিভিতে দেখানো হবে না। তাই আমি, পিসি, দাদা-দিদিরা সবাই মিলে প্রেক্ষাগৃহে মনপুরা দেখার পরিকল্পনা করি। যেহেতু আগে কখনোই প্রেক্ষাগৃহে যাইনি, তাই এ নিয়ে খুবই আগ্রহী ছিলাম। সঙ্গে অবশ্য ভয়ও লাগছিলো, শেষ মুহূর্তে যদি মা যেতে না দেন! তবে এ নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। সত্যিই অনেক ভালো লেগেছিলো প্রেক্ষাগৃহে মনপুরা দেখে। সেদিন অনুভব করেছিলাম, প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখার মজাই আলাদা। ঘনশ্যাম কাকার মতো সেই দিনটি এখনো আমার কাছেও স্মরণীয় হয়ে আছে।

যাক সেসব কথা। ঘনশ্যাম কাকাকে জিজ্ঞাসা করি, কখনো কাকীকে নিয়ে চলচ্চিত্র দেখতে যাননি? ‘গিয়েছিলাম তো। তার সঙ্গে দুইটা সিনেমা দেখেছি। এর মধ্যে একটা দেখার কথা তো এখনো বেশ মনে আছে; বেদের মেয়ে জোস্না। সেটাই অবশ্য তোমার কাকীর জীবনের প্রথম সিনেমা দেখা। যাওয়ার সময় তো তার চোখ-মুখ খুশিতে জ্বলজ্বল করছিলো।’ খুব আগ্রহ নিয়ে সেদিন কাকী চলচ্চিত্রটি দেখেছিলেন বলে জানান কাকা। কথাগুলো বলতে বলতে কাকা হঠাৎ-ই কেমন জানি আনমনা হয়ে যান। আমি বিষয়টা লক্ষ করে একটু থেমে যাই। সামান্য এই নীরবতায় হয়তো কাকা সেই দিনে ফিরে গিয়েছিলেন। এরপর কাকাকে জিজ্ঞাসা করি, কাকীকে পরে আর কোনোদিন চলচ্চিত্র দেখতে নিয়ে যাননি, কিংবা তিনি যেতে চাননি? হাসি মুখে কাকা এবার বলে উঠেন, ‘ যেতে চায়নি আবার! কিন্তু আমিই নিয়ে যাইনি। মেয়েমানুষদের অতো সিনেমা দেখে কী কাজ!’

সেই সময়ের প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ ঠিক কেমন ছিলো, সেটা আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছিলো। কাকাকে একটু উসকে দিতেই বলতে শুরু করলেন¾ ‘তখন সিনেমাহলের পরিবেশ বেশ স্বাভাবিক ছিলো। সিনেমায় অন্তত খারাপ কিছু দেখানো হতো না। ঠিক যতোটুকু দরকার ততোটুকুই দেখানো হতো, সেটা সামাজিক ছিলো। তখন কিন্তু ছেলেমেয়ে সবাই সিনেমা দেখতে যেতো। যদিও মেয়েদের সংখ্যা কিছুটা কম ছিলো। তবে অনেক মেয়ে বেদের মেয়ে জোস্না দেখতে গিয়েছিলো, এখনো আমার মনে আছে।’

এখনকার চলচ্চিত্র কেমন লাগে, জানতে চাই কাকার কাছে। তার ভাষায়, আগের দিনের শাবানা, ববিতা, রাজ্জাকের সিনেমাগুলো সামাজিক ছিলো। বার বার ঘনশ্যাম কাকার মুখে ‘সামাজিক সিনেমা’ শুনে শেষে জিজ্ঞেস করেই ফেলি¾এই ‘সামাজিক সিনেমা’টা আসলে কী কাকা? প্রশ্ন শুনে কাকার সহজসরল উত্তর, ‘সামাজিক সিনেমায় নায়ক-নায়িকার সাজ-পোশাক খুব ভালো থাকে, কাহিনির মধ্যেও খারাপ কিছু থাকে না; ছেলেমেয়ে, মা-বাবা, বউ পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে সেই সিনেমা দেখা যায়। বর্তমানের সিনেমায় তো সেটা মোটেও সম্ভব নয়।’ তাই বেশিরভাগ মানুষের এখন চলচ্চিত্র নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই বলে কাকা মনে করেন। এগুলো দেখে কিছু শেখা যায় না বলেও তিনি জানান। তবে রূপবান, কমলার বনবাস, বাবা কেন চাকর এই চলচ্চিত্রগুলোও কাকার খুব ভালো লেগেছিলো। এখনো টেলিভিশনে ওই চলচ্চিত্রগুলো দেখানো হলে তার দেখতে ভালো লাগে।      

একপর্যায়ে কাকাকে জিজ্ঞাসা করি, আচ্ছা, আগের আর এখনকার চলচ্চিত্রের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়? খানিকটা গম্ভীর হয়ে একটু সময় নিয়ে কাকা বলেন, ‘আগের সিনেমাগুলো দেখলে অনেক কিছু বোঝা যেতো, আর এখনকার সিনেমা দেখে ছেলেমেয়েরা অনেক কিছু শেখে। আগের সিনেমায় জ্ঞান ছিলো। সেখানে জীবন সংসারের গভীরতা, ভাঙাগড়া, ওঠা-নামা ফুটিয়ে তোলা হতো। একটা সংসার কীভাবে ভেঙে যায় কিংবা গড়ে ওঠে, এর পিছনে কে কে থাকে, কীভাবে থাকে, সিনেমা দেখে সব বোঝা যেতো। আর থাকতো ভিলেন¾ভিলেন ছাড়া তো আর সিনেমা হয় না। ভিলেনের চক্রান্তে সংসারের করুণ পরিণতি হতো। এক একজন মানুষ এক এক দিকে চলে যায়, আস্তে আস্তে আবার তাদের মধ্যে জোড়া লাগে। সবাই এক হয়ে শয়তান বা ভিলেনকে শাস্তি দেয়, তার পতন ঘটায়। যেমনটা আমাদের সংসারেও ঘটে। আগের ওই সিনেমাগুলোর সঙ্গে বাস্তব জীবনের অনেক মিল আছে। বাবা কেন চাকর দেখলে সেটা বোঝা যায়; সেখানে দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে বাবা-মার সংসার। খুব কষ্ট করে তাদের পড়াশোনা করিয়ে চাকরি ধরিয়ে দেন বাবা-মা। কিন্তু সেই বাবা-মা বৃদ্ধ হলে বড়ো ছেলে ও তার বউ তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। শেষে খুব কষ্ট নিয়ে মা মারা যান, তার লাশ নেওয়ার মতোও কেউ থাকে না। বাবা বাড়ির কাজের লোকের সঙ্গে ঠেলাগাড়িতে করে মায়ের লাশ গ্রামের বাড়ি নিয়ে যান। সবার শেষে ভুল বুঝতে পেরে সেখানে ছেলে, ছেলের বউ এসে হাজির হয়। নিজেদের ভুল স্বীকার করে মাফ চায় বাবার কাছে।’ কাকা এক নিঃশ্বাসে বলতে থাকেন, ‘অথচ এখনকার সিনেমা হলো¾ধরো মারো কাটো। কীভাবে খুন করা যায়, সহজেই অপরাধ করা যায়, সেগুলো দেখানো হয় এখনকার সিনেমায়।’ রূহিয়া’র একটি প্রেক্ষাগৃহে রাধাকৃষ্ণ নামে একটি চলচ্চিত্র দেখার কথা জানান ঘনশ্যাম কাকা। তার ভাষায়, রাধা-কৃষ্ণের মূল যে কাহিনি, তার আংশিকটা উঠে এসেছে ওই সিনেমায়। ওই চলচ্চিত্রটাও নাকি তার খুব ভালো লেগেছিলো।

এছাড়া কমলার বনবাসও খুব ভালো লেগেছিলো ঘনশ্যাম কাকার। যদিও তার মতে, এই কাহিনিটা খানিকটা দীর্ঘ ও জটিল। তবে এতো বছর পরও কী সুন্দর করে সেই চলচ্চিত্রের কাহিনি বললেন ঘনশ্যাম কাকা! আমি শুনি আর অবাক হই। এখন আমরা চলচ্চিত্র দেখে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হয়েই তার গল্প বলতে পারি না। সব গল্প একই রকম মনে হয়! এটার মধ্যে ওটা কীভাবে যেনো ঢুকে যায়!

কাকার মুখে কমলার বনবাস-এর গল্প শুনতে থাকি। নায়ক-নায়িকার বিয়ের পরে আসল কাহিনি শুরু হয়। যে বংশে কমলার বিয়ে হয় সেখানে একটি রীতি আছে¾বিয়ের পর সংসার জীবনে প্রবেশের আগে স্বামীকে দূরদেশে বাণিজ্য করতে যেতে হয়। তাই নিয়ম অনুযায়ী কমলার বিয়ের পর তার স্বামীকে ১২ বছরের জন্য দূরদেশে বাণিজ্য করতে পাঠিয়ে দেন মা। মায়ের কথামতো বাণিজ্যে চলে যান ছেলে। এর কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন রাতে ছেলে স্বপ্ন দেখেন, কে যেনো তাকে তার স্ত্রীর কাছে যেতে বলছে। এবং সেখানে গেলে স্বামী-স্ত্রীর মিলনে যে সন্তান জন্ম নেবে, তার মুখ দিয়ে মণি-মুক্তা ঝরবে। অবশ্য এর জন্য তাকে নয় দণ্ড সময় বেঁধে দেওয়া হয় এবং একটি পঙ্খীরাজ ঘোড়াও (মানিক হংস) দেওয়া হয়। ছেলেটি সৃষ্টিকর্তার (মুর্শিদ/পীর) দেওয়া সেই পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে তার স্ত্রীর কাছে চলে যান এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরে আসেন।

সকালবেলা কমলার ঘরের দরজা খোলা দেখে তাকে ভুল বোঝেন শ্বাশুড়ি এবং বনবাসে পাঠিয়ে দেন। বনবাসে কমলা ঘুরতে ঘুরতে এক সাঁওতালের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানেই জন্মগ্রহণ করে কমলার সন্তান। সেই সন্তান দেখেই দাঈমা বুঝতে পারেন, এই বাচ্চা কোনো সাধারণ বাচ্চা নয়। তাই তিনি বাচ্চাটিকে চুরি করে কমলাকে বলেন, তুমি মৃত বাচ্চা জন্ম দিয়েছো। এদিকে ১২ বছর পর কমলার স্বামী ফিরে আসেন এবং তার মায়ের কাছে সব ঘটনা শোনেন। তিনি মাকে জানান, সেদিন রাতে তিনি নিজেই এসেছিলেন কমলার ঘরে। এতে তার মা ভুল বুঝতে পারেন। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর কমলাকে খুঁজে পাওয়া গেলেও বাচ্চাটিকে তখনো পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য বাচ্চাটিকেও পাওয়া যায়।

ঘনশ্যাম কাকা এতো সাবলীলভাবে গল্পটি বলছিলেন যেনো একটার পর একটা দৃশ্য চোখে ভেসে উঠছিলো। যদিও চলচ্চিত্রটির নাম বেশ কয়েকবার শুনেছি, কিন্তু দেখা হয়ে ওঠেনি।

লেখক : ইতি সাহা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

itisaha.ru64@gmail.com

https://www.facebook.com/itisaha.saha.14

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন