জাহাঙ্গীর আলম ও রুবেল পারভেজ
প্রকাশিত ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
আজিমের চলচ্চিত্রময় এক জীবন
জাহাঙ্গীর আলম ও রুবেল পারভেজ

‘তোমারে লেগেছে এতো যে ভালো/ চাঁদ বুঝি তা জানে’¾তালাত মাহমুদের কণ্ঠের এই গান বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা রোমান্টিক গানগুলোর অন্যতম। গানটি রাজধানীর বুকে চলচ্চিত্রের; মুক্তি পায় ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে, নির্মাতা এহতেশাম। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন রহমান, শবনম, সুভাস দত্ত, নার্গিস ও গোলাম মুস্তাফা। আরো একজন অভিনয় করেছিলেন। তবে তার কোনো সংলাপ ছিলো না। নাম তার আজিম।
একটু পিছনে ফেরা যাক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা ও প্রযোজক আজিমের চলচ্চিত্রে আগমন একেবারেই আকস্মিক। রাজধানীর বুকে’র শুটিং চলছিলো। চলচ্চিত্রটির সুরকার রবীন ঘোষ ছিলেন আজিমের বন্ধু। তিনিই ওই চলচ্চিত্রে একটি সংলাপহীন চরিত্রে তাকে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। এরপর আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র হারানো দিন-এ একটি ছোটো চরিত্রে অভিনয় করেন আজিম। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া এহতেশাম পরিচালিত নতুন সুর-এ খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন আজিম। ওই বছরই নায়ক হিসেবে তিনি তিনটি চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হন¾পয়সে, মেঘ ভাঙা রোদ ও বেওয়াকুফ। পয়সে’তে তার বিপরীতে ছিলেন শবনম। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় মালা। এ চলচ্চিত্রে আজিমের অভিনয় খুবই প্রশংসিত হয়। মাত্র তিন বছরের ক্যারিয়ারেই তিনি নায়ক হিসেবে প্রথম সারিতে উঠে আসেন।
‘আজিম ভাই’
আজিমের পুরো নাম নূরুল আজিম খালেদ রউফ। জন্ম ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুলাই, সিলেটের হবিগঞ্জে। আজিমের বাবা ছিলেন মুন্সেফ; ফলে চাকরির সুবাদে তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। পরে ঢাকা হাটখোলার ভবগতি ব্যানার্জি সড়কে তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রথম দিকের ‘সুদর্শন’ নায়কদের অন্যতম আজিম। ১৯৬৩Ñ১৯৭৪ পর্যন্ত তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। সমান তালে অভিনয় করে গেছেন বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ও পাকিস্তানে। উড়োজাহাজের টিকিট নাকি সবসময় তার পকেটেই থাকতো। এমনও হয়েছে, সকালে তিনি বাংলাদেশে অভিনয় করে বিকেলে পাকিস্তানে শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
শুধু অভিনয় নয়, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবেও নিজেকে চালিত করেন আজিম। চলচ্চিত্রের মোহে পড়ে একসময় তিনি নিজের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালিতে একটি প্রেক্ষাগৃহও নির্মাণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অভিনয়শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘দুই হাতে খরচ করতেন বলে কোনো সঞ্চয় ছিলো না আজিমের। কিন্তু তার পরও একটা সময় তিনি স্বপ্ন দেখলেন একটি সিনেমাহল বানানোর। এই স্বপ্নে তিনি এতোটাই আচ্ছন্ন ও মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে, হলটি বানানোর জন্য ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় তার দুটো বাড়ি তিনি বিক্রি করে দিয়েছিলেন।’
আজিম সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে এফ ডি সি’তে তার সময়ের নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী এমনকি প্রোডাকশন বয়দের সঙ্গে কথা হয়। তাদের সবাই একবাক্যে এ মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। নির্মাতা সি বি জামান কিংবা প্রোডাকশন বয় মনোয়ার হোসেন মনু, সবারই ভাষ্য¾কার সাহায্যে না আজিম এগিয়ে এসেছেন! সি বি জামান বলেন, ‘আজিম ভাই আমার চেয়ে বয়সে বড়ো ছিলেন। তার সঙ্গে কাজ করেছি সাত ভাই চম্পা, অরুণ বরুণ কিরণ মালা, রাজা সন্ন্যাসী’তে। কাছ থেকে দেখেছি তিনি এফ ডি সির মানুষদের অকাতরে ভালোবাসতেন, দুই হাত উজাড় করে সাহায্য করতেন। বড়ো ভালো মানুষ ছিলেন তিনি।’ মনোয়ার হোসেন মনুর ভাষায়, ‘আমরা উচ্চপদের মানুষ না হলেও তিনি আমাদের কখনো অন্য চোখে দেখেননি। তার কাছে সবাই সমান ছিলো। তিনি ছিলেন এফ ডি সির আজিম ভাই।’ মূলত পরোপকারী চরিত্রের জন্য এফ ডি সিতে সবাই তাকে ‘আজিম ভাই’ বলে সম্মোধন করতো।
একাত্তরের রণাঙ্গন ও একজন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা
এফ ডি সির সুদিনে আজিম সবার কাছের বন্ধু ছিলেন; ছিলেন রুপালি পর্দার নায়ক। ঠিক সেভাবেই তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো কঠিন সময়েও এফ ডি সির মানুষদের প্রতি অভিভাবকসুলভ দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের মায়া তাচ্ছিল্য করে চলচ্চিত্রের মানুষদের জীবন পর্যন্ত বাঁচিয়েছেন বাস্তবের নায়ক আজিম। অথচ চাইলেই তিনি সেসময় অন্য অনেকের মতো যুদ্ধের দামামা বাজার আগেই দেশ ছেড়ে প্রবাসে গিয়ে নিরাপদ জীবন যাপন করতে পারতেন। রুপালি পর্দায় অভিনয়ের মতো বাস্তবেও যে তিনি কতোটা সাহসী আর পরোপকারী, তার উদাহরণ মেলে একাত্তরের সেই দুঃসহ দিনগুলোর স্মৃতি হাতড়ালে।
স্বাধীনতাযুদ্ধের ওই দুঃসহ পরিস্থিতিতে খুব ঠাণ্ডা মাথায় আজিম অনেক কিছু একহাতে সামলে চলচ্চিত্র জগতের অনেক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেন। এ নিয়ে তার স্ত্রী ও অভিনয়শিল্পী সুজাতা আজিমের ভাষ্য, নৃত্য পরিচালক জাভেদকে নয় মাস তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন। পরে জাভেদ ভাই আমাকে বলেছিলেন, আজিম ভাই না থাকলে আমি না খেয়ে মরে যেতাম। নির্মাতা নারায়ণ চক্রবর্তীকে পাক বাহিনীর হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের অফিসের ভিতর তালা দিয়ে রাখতেন আজিম। সেখানে সময় মতো খাবার পৌঁছে যেতো। এগুলোর কোনো কিছুই তাৎক্ষণিক আমরা জানতে পারিনি। নয় মাস পরে বিষয়গুলো ওয়াকিবহাল হই। নির্মাতা কুমকুম, হায়দার আলী, খলিলুল্লাহ খলিল, মজনুকেও তিনি সহায়তা করেছেন। মজনু, খান জলিল তো আমার বাসাতেই থাকতেন। আমাদের হাটখোলার বাসার পিছনে একজন বিহারীর বাসা ছিলো। তার দুটো মেয়ে ছিলো। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাতে ওই মেয়েদের তিনি আমাদের বাড়িতে রেখে যেতেন, আবার ভোরে ওদের বাড়িতে রেখে আসতেন। এভাবে একপর্যায়ে তারা নিরাপদে বিহারী ক্যাম্পে চলে যায়।
তবে শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি আজিম। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার কারণে এবং তাদের সম্পর্কে গোপন তথ্য পাওয়ার জন্য পাক সেনারা আজিমকে প্রায় দেড় মাস আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করে। কিন্তু এতো নির্যাতেনের পরেও তিনি একবারের জন্য মুখ খোলেননি। যদিও শেষ পর্যন্ত উপায় না পেয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে পাক সেনাদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে আজিমকে ভারতে চলে যেতে হয়েছিলো। এরপর দেশ স্বাধীন হলে ফিরে এসে আবারও সেই চলচ্চিত্রে পুনরুদ্যমে কাজ শুরু করেন আজিম।
চলচ্চিত্রের সঙ্গে বাস্তবেও রোমান্টিক
আজিম ছিলেন তার সময়ের সেরা রোমান্টিক নায়ক। তার প্রথম দিকের রোমান্টিক চলচ্চিত্রের অন্যতম ডাকবাবু। এতে তার নায়িকা ছিলেন সুজাতা। এ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময়ে আজিম ও সুজাতার মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে তারা বিয়ে করেন। পরে আমির সওদাগর, বেহুলা সুন্দরী, মধুমালা, স্বর্ণকমল, সাইফুল মূলক বদিউজ্জামান, রাখাল বন্ধু প্রভৃতি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এ জুটি।
তারকা জুটির বিয়ের পর অনেক সময় তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা যায়। অনেক সময় সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য নারী অভিনয়শিল্পীকে এই জগৎ থেকে দূরে সরে যেতে হয়। তবে আজিম ও সুজাতার সংসারে এমন কিছুই ঘটেনি। সুজাতাকে সবসময় আজিম অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দিয়ে গেছেন। আজিমের পরিবার থেকেও তেমন কোনো বাধা আসেনি। ফলে সুজাতার ক্যারিয়ার এগিয়ে গেছে নির্বিঘ্নে। সুজাতার নিজের ভাষ্যে অবশ্য এর প্রমাণ মেলে,
১৯৬৭ সালের জুলাইয়ে আজিম সাহেবের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পরও সিনেমায় অভিনয় করেছি। আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনো বাধা আসেনি। যদিও আমার শাশুড়ি একটু পর্দা করতেন। তবে কোনো দিন আমি মেকআপ মুখে শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে যাইনি। তারা আমাকে মেয়ের মতো স্নেহ করেছেন। বিয়ের ১০ বছর পর আমাদের ঘর আলো করে সন্তান ফয়সাল জন্ম নিল। আমি সংসার ও চলচ্চিত্র দুটি দিকই একসঙ্গে চালিয়ে গিয়েছি। কোনো অসুবিধা হয়নি।১
ফরমুলাভিত্তিক বাণিজ্যিক ধারার সফল প্রতিনিধি
আজিম শুধু অভিনয়শিল্পীই নন, নির্মাতা, প্রযোজক ও পরিবেশক। সুজাতা প্রোডাকশনস, এস এ ফিল্ম ও সুফল কথাচিত্রের ব্যানারে তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন। এখান থেকে নির্মিত হয়েছে চেনা অচেনা, টাকার খেলা, প্রতিনিধি, অর্পণ, রূপবানের রূপকথা, বদলা, রং বেরং, এখানে আকাশ নীল প্রভৃতি চলচ্চিত্র।
পাকিস্তান আমলে উর্দু আধিপত্যের যুগে আজিমের অভিনয় শুরু। তিনি নিজেও উর্দু চলচ্চিত্রে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। ৬০-এর দশকের শুরুতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু চলচ্চিত্র নির্মাণের হিড়িক চলছিলো। রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রশিল্পেও এর প্রভাব পড়ে। এক্ষেত্রে বাক বদলের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র রূপবান। সালাউদ্দিন পরিচালিত চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন সুজাতা। লোককাহিনিভিত্তিক রূপবান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর চলচ্চিত্রে জোয়ার সৃষ্টি হয় এই ধারার। উর্দু চলচ্চিত্রকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে থাকে বাংলা চলচ্চিত্র। আজিম অভিনীত, পরিচালিত ও প্রযোজিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্র এই ধারার। মূলত ফরমুলাভিত্তিক বাণিজ্যিক ঘরানার সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের পরও এই ধারায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
আজিমের বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের উত্থান ও সাফল্য চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছেন বাংলাদেশে চলচ্চিত্রে অন্যতম প্রধান চলচ্চিত্র ইতিহাস সংগ্রাহক ও ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ গ্রন্থের রচয়িতা অনুপম হায়াৎ। তৎকালীন সুপারডুপার হিট উর্দু চলচ্চিত্র মালা’তে অনুপম হায়াৎ প্রথমবারের মতো আজিমের অভিনয় দেখেন। রঙিন ও লোককাহিনিনির্ভর এ চলচ্চিত্র নিয়ে হায়াৎ বলেন,
এখনকার অনেকে ভাবতেই পারবে না যে, সেসময় কী পরিমাণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো ছবিটি! ছবিটির বিষয়বস্তু একেবারেই আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে। তখন আমার কাছে মনে হয়েছিলো, এ ছবিতে আজিম যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, সে চরিত্রের জন্য তিনি একেবারে যুতসই। ডাকবাবু’তে তিনি অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন; আয়না ও অবশিষ্ট ছবিও ভালো ছিলো। নয়নতারা’য় সুচন্দার সঙ্গে জুটি বেঁধেছিলেন তিনি। দুজনই চমৎকার কাজ করেছেন তাতে। আর জুটি হিসেবে তো সুজাতা ও আজিম যথাযথই ছিলেন। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ছবি করার ক্ষেত্রে আজিম চলচ্চিত্র জীবনে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন এহতেশাম, মুস্তাফিজদের মতো নির্মাতাদের।
আজিমকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনুপম হায়াৎ আরো বলেন,
১৯৭৬ বা ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে আজিমের নির্মিত রঙিন ছবি প্রতিনিধিতে অভিনয় করেছিলেন রাজ্জাক। এ ছবিতে অনন্য অভিনয়ের সুবাদে রাজ্জাককে নায়করাজ উপাধি দেওয়া হয়েছিলো। মানে আজিম পরিচালিত ছবি দিয়েই রাজ্জাক নায়করাজ উপাধি লাভ করেছিলেন। এই উপাধিটা দিয়েছিলেন সম্ভবত আহমেদ জামান চৌধুরী। বলা চলে, নিজের সময়ের সব বাণিজ্যিক ছবির সার্থক নায়ক ছিলেন আজিম।
মারপিটনির্ভর চলচ্চিত্রের পৃষ্ঠপোষক
পারিবারিক-সামাজিক গল্পনির্ভর চলচ্চিত্র দিয়েই ঢাকাই চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু। দর্শক মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের কারণ ও সময়ের ধারাবাহিকতায় এতে পর্যায়ক্রমে নিত্যনতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় একটা সময় গিয়ে এদেশের চলচ্চিত্রে মারপিট উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন নির্মাতা, প্রযোজকরা। এক্ষেত্রে অভিনয়শিল্পী জসিমের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি দলই অগ্রপথিকের দায়িত্ব পালন করে। মূলত এ দলটি পরিচিত পেয়েছিলো জ্যাম্ব’স গ্রুপ নামেই (এই দলের চার সদস্য জসিম, আমান, মাহাবুব, বাবুলের নামের প্রথম অক্ষর যোগ করে জাম্ব’স নামকরণ করা হয়)। যতোদূর জানা যায়, জ্যাম্ব’স গ্রুপই এদেশের চলচ্চিত্রে মারপিট ও অ্যাকশননির্ভর বিষয়গুলো প্রচলনে সহায়তা করে। এ দলটির পৃষ্ঠপোষকতা করেন আজিম এবং নতুন নতুন মারপিটনির্ভর সব চলচ্চিত্রে জ্যাম্ব’স গ্রুপকে দিয়ে অভিনয় করান। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জ্যাম্ব’স গ্রুপের সদস্যরা আজিমকে ‘বাবা’ বলে সম্মোধন করতো। অন্য অনেকের মতো এ নিয়ে গবেষক ও ইতিহাস সংগ্রাহক অনুপম হায়াৎও একমত পোষণ করেন। তার ভাষ্য এমন¾
আজিম বেশিরভাগই বাণিজ্যিক ঘরানার ছবিতে কাজ করেছেন। নান্দনিক ছবি বলতে যা বোঝায় তার অভিনীত ছবিগুলো সেরকম নয়। উনার সান্নিধ্যে একটা দল গড়ে উঠেছিলো এফ ডি সিতে। জ্যাম্ব’স গ্রুপের সদস্যরা আজিমকে বাবা বলে সম্মোধন করতো। এতেই বোঝা যায়, মারপিটনির্ভর ছবি নির্মাণে আজিম কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।
জ্যাম্ব’স গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রুহুল আমিন বাবুল। যিনি কাছ থেকে আজিমকে দেখেছেন, মিশেছেন এবং তার সান্নিধ্য পেয়েছেন। তিনি আজিমের সঙ্গে তার সম্পর্কের শুরু এবং আজিমের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় জ্যাম্ব’স গ্রুপ গড়ে ওঠার স্মৃতিচারণ করেন এভাবে,
গুলিস্তানে এমএসকো ফিল্ম নামে একটি পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ছিলো। আজিম ছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রযোজক। ঘটনাক্রমে একদিন এমএসকো ফিল্মের মালিক আসলাম সাহেবের সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছিলো। তখন আমরা তাকে বললাম, কী সব ছবি বানান, ভারত মারামারি-অ্যাকশন ছবি করছে। আর আপনারা কিছুই করছেন না। তখন উনি বললেন, আমরা অ্যাকশন ছবি কীভাবে করবো? তখন বললাম, আমরা অ্যাকশন, মারামারি করে দেবো। ততোদিনে জসিম মারপিটে দক্ষ হয়ে উঠেছেন, আমিও জুডো কারাতে শিখেছিলাম। উনি বললেন, আমাদের একটা ছবি আছে উৎসর্গ, এতে আপনারা মারামারি করে দেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি আজিম ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাকে বললেন, আজিম তোমার ছবিতে এদের কাজে লাগাতে পারবে। এরা ভালো ফাইট জানে। তখন আজিম খুব আগ্রহ নিয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার ছবিতে তো ফাইটের দৃশ্য রাখতে চাচ্ছি। এরপরই আমরা শুটিং শুরু করি এফ ডি সিতে। এখানেই ঘটনার শেষ নয়। শুটিং চলাকালীন অভিনেতা রাজ্জাক এসে দেখলেন। এবং আজিম ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন আমাদের ব্যাপারে। আজিম তারপর রাজ্জাকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। তখনই আমরা রাজ্জাকের রংবাজ ছবির মারপিটের দৃশ্যগুলো করি। এবং আমাদের প্রথম ছবি উৎসর্গ-এর আগেই সেটি মুক্তি পেয়ে যায় এবং ব্যবসাসফল হয়। আর এভাবেই আমরা আজিমের হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করি।
নায়ক, প্রযোজক নাকি নির্মাতা আজিম এগিয়ে
আজিম অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র রাজধানীর বুকে। আর নায়ক হিসেবে পায়েল। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে¾আযান (উত্তরণ), হারানো দিন, বেয়াকুফ, মেঘ ভাঙা রোদ, সাগর, মালা, রাজা সন্ন্যাসী, আপন দুলাল, ডাকবাবু, আয়না ও অবশিষ্ট, সাইফুল মুলক বদিউজ্জামাল, নয়নতারা, তানসেন, ছোটসাহেব, জংলী মেয়ে, মধুমালা, রাখাল বন্ধু, আবির্ভাব, চেনা অচেনা, কুলি, শহীদ তীতুমীর, অরুন বরুন কিরণ মালা, শীত বসন্ত, সন্তান, পদ্মা নদীর মাঝি, পিয়াসা, বেদের মেয়ে, অবাঞ্চিত, ভানুমতি, মিশর কুমারী, লাভ ইন সিঙ্গাপুর ও সকাল সন্ধ্যা।
তার পরিচালিত চলচ্চিত্র টাকার খেলা, প্রতিনিধি, জীবন মরণ, বদলা, গাদ্দার, দেবর ভাবী। এছাড়া তার প্রযোজিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্র সেসময় ব্যবসাসফল হয়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, চলচ্চিত্রময় এক জীবনে আজিম সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছেন কোন মাধ্যমে¾নির্মাতা, নায়ক নাকি প্রযোজক? এ প্রশ্নের উত্তরে তাকে কাছ থেকে দেখা সবাই একবাক্যে জানিয়েছে, আজিম সবক্ষেত্রে সফল। কিন্তু কোন মাধ্যমে বেশি সফল তা নিয়ে একেক জন একেকভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছে।
অনুপম হায়াৎ মনে করেন, বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে আজিম বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। মালা, ডাকবাবু, অরুন বরুন কিরণ মালা’য় নির্মাতারা তার অভিনয় সত্তাকে দক্ষতার সঙ্গে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। আজিম এতোটাই লম্বা ও চওড়া শরীরের অধিকারী ছিলেন যে, তার সমান নায়িকা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তো। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, অভিনয়শিল্পী হিসেবে রাজ্জাক, ফারুক যেভাবে মূল্যায়িত হয়েছেন, আজিমকে কেউ ওইভাবে মূল্যায়ন করেননি পরবর্তী সময়ে।
আজিমের তুখোড় অভিনয়শৈলী নিয়ে অনুপম হায়াতের এ কথার মিল পাওয়া যায় হাসান ইমামের বক্তব্যে। তার মতে ‘নায়ক হিসেবে তিনি সুদর্শন ছিলেন, চেহারা ভালো ছিলো এবং জনপ্রিয়ও ছিলেন। আমার মতে, পরিচালনার চাইতে অভিনেতা হিসেবে আজিম বেশি জনপ্রিয় ছিলেন।’ তবে এর সম্পূর্ণ বিপরীত মত দেন নির্মাতা সি বি জামান। তার বক্তব্য, ‘আজিম পরিচালক হিসেবে অনেক সাহসী কাজ করেছেন। উনি ভালো ভালো শিল্পী নিয়ে, দারুণ সব সেট বানিয়ে লোকেশন ভিত্তিক ছবি বানাতেন। উনি বাণিজ্যিক ছবির পুরো বিষয়টি বুঝতেন এবং সেভাবেই এগোতেন। তবে আমার মতে, অভিনেতা হিসেবে তিনি ততোটা নন। যদিও দর্শক তাকে পছন্দ করতো।’
অবশ্য সি বি জামান চলচ্চিত্রনির্মাতা আজিমকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছেন সেভাবে বিষয়টি দেখছেন না অনুপম হায়াৎ। অনুপমের ভাষ্য,
আজিম রোমান্টিক বা লোকছবির নায়ক হিসেবে সফল হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি নির্মাতা হিসেবে যে ধরনের ছবি বানিয়েছেন সেগুলো তার অভিনীত ছবির মতো নয়। তিনি অন্যের পরিচালনায় যে ধরনের ছবিতে অভিনয় করে সফল ও সমাদৃত হয়েছেন, অর্থ খ্যাতি পেয়েছেন। কিন্তু নিজে ওই ধাঁচে ছবি করেননি। করতে পারতেন কি না সেটা অন্য আলোচনা কিন্তু তিনি তা করেননি।
তবে জ্যাম্ব’স-এর রুহুল আমিন বাবুল এগিয়ে রাখলেন আজিমের প্রযোজনার বিষয়টিকে। তার ভাষায়,
অভিনেতার চেয়ে প্রযোজক হিসেবে আজিম বেশি ভূমিকা রেখেছেন। তার প্রযোজনার ধরন ছিলো একেবারেই স্বতন্ত্র ও আলাদা। আমি তো বলবো, তিনি রাজার মতো প্রযোজক। আরামপ্রিয় লোক হওয়ায় তিনি ধীরে সুস্থে লোকেশনে আসতেন, শুটিং করতেন। অন্যান্য প্রযোজকরা যেখানে সবসময় ব্যস্ত থাকতো, বলতো আজকের মধ্যেই অমুক কাজ তমুক কাজ শেষ করতে হবে, না হলে ক্ষতি হয়ে যাবে। কিন্তু আজিম ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। তাড়াহুড়ো দেখলেই তিনি বলতেন, আজ হবে না, কাল এসো। এর ফলে ওই সময় তিনি যে ছবিগুলো বানিয়েছিলেন অন্যান্যদের তুলনায় সেগুলো মানগত দিক থেকে অনেক অনেক ভালো ছিলো। এসব ছবি ব্যবসাও করেছে সুপারহিট।
আজিমের প্রযোজনা নিয়ে অনুপম হায়াতের একেবারে ভিন্ন একটা পর্যবেক্ষণ আছে¾ ‘অভিনয় দিয়ে জীবন শুরু করে রাজ্জাক যেভাবে নিজের একটা শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছিলেন, প্রোডাকশন হাউজ খুলেছিলেন, ছেলেদেরও ছবিতে আনলেন। আজিম কিন্তু তা করতে পারেননি।’
সুজাতার চোখে আজিম
২০১৮-এর সেপ্টেম্বরের এক সন্ধ্যায় রাজধানীর পশ্চিম রামপুরার মহানগর আবাসিকে নিজ বাসায় কথা হয় আজিমের স্ত্রী ও অভিনয়শিল্পী সুজাতার সঙ্গে। আজিমের চলচ্চিত্রে আগমন, এই শিল্প নিয়ে ভাবনা ও স্বপ্ন, পরোপকারী মনোভাব এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন সুজাতা। আজিমকে নিয়ে উপরের পুরো আলোচনার একটা সারাংশ সুজাতার মূল্যায়নের সঙ্গেও জানি অনেকটা মিলে যায়।
সুজাতা তার কথার শুরুতেই বলেন, চলচ্চিত্রে আসার বিষয়ে আজিমের পরিবারের খুব বেশি সম্মতি ছিলো না। ভাইদের মধ্যে তিনি সেজ ছিলেন। তারপরও সংসারে তার কথার গুরুত্ব ছিলো। আমার শ্বশুর তাকে খুব ভালোবাসতেন। তার কথা শুনতেন। শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে আমরা দুজন থাকতাম। এ মানুষটি চলচ্চিত্রকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনি কোনো রকম সম্মানী ছাড়াই অভিনয় করেছেন বহু চলচ্চিত্রে। এমনকি অনেক প্রযোজক-পরিচালককে নিজের টাকা দিয়ে চলচ্চিত্র তৈরিতে তিনি সাহায্য করেছেন। টাকাপয়সা নিয়ে তার কোনো সমস্যা ছিলো না, তার বাবা বিচারক ছিলেন। চাওয়ামাত্রই তিনি টাকা পেয়ে যেতেন বাবার কাছ থেকে।
আজিম কতোটা বিলাসবহুল ও স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করতেন তার প্রমাণও মেলে সুজাতার বক্তব্যে¾
আজিম তখন একমাত্র নায়ক যার গাড়ি ছিলো। তিনি সেই গাড়িতেই যাতায়াত করতেন। অনেক শিল্পীকে নিয়মিত বাড়িতে পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন সেই গাড়িতে। তিনি যখন কোনো চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত হতেন, সেখানে সবকিছু দিয়ে সাহায্য করতেন। ৬৭Ñ৬৮ সালের কথা। তখন শুটিং হতো দুই শিফটে¾সকাল ১০ থেকে সন্ধ্যা ছয়টা আবার রাত ১০টা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত। ভোরে প্রোডাকশনের পক্ষ থেকে অনেককে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হতো। আজিম সাহেব নিজের গাড়িতে করে জুনিয়র আর্টিস্টসহ নায়িকাদের বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। শুধু তাই নয়, প্রোডাকশনের কোনো কর্মচারী যদি আর্থিক সমস্যায় পড়তেন, তাদেরও তিনি সাহায্য করতেন।
সুজাতা জানান, মূলত নতুন সুর চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে রুপালি জগতে পুরোদস্তুর পথচলা শুরু হয় আজিমের। আজিম সেখানে খলচরিত্রে অভিনয় করেন মাত্র একটা দৃশ্যে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি নায়ক হয়ে ওঠেন। সুজাতার সঙ্গে প্রথম ডাকবাবু’তে অভিনয় করেন আজিম। সুজাতা আরো বলেন, ‘তখন ছিলো একদিক দিয়ে চলচ্চিত্রের সুদিন, অন্যদিকে দুর্দিন। কারণ তখন অভিনয়ে তেমন সম্মানী পাওয়া যেতো না। কিন্তু চলচ্চিত্রের গল্প ছিলো বাস্তবধর্মী, পারিবারিক। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সেগুলো দেখা হতো। পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেও আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম।’
আজিম চলচ্চিত্রের জন্য নিজেকে কতোটা বিলিয়ে দিয়েছেন, চলচ্চিত্রকে ভালোবেসেছেন, তার উদাহরণ সুজাতা দেন এই ভাবে¾
জসিমের সিনেমা দোস্ত-দুশমন। এতে আজিম শুধু অভিনয় করেননি, ওই সিনেমার খরচও জুগিয়েছেন। নিজের টাকায় সিনেমার প্রিন্ট করে দিয়েছেন। এতো উদার মন ছিলো তার। আমি বিষয়টা তখন জানতাম না। তার মৃত্যুর পর ওই সিনেমার ফাইটার মোসলেহউদ্দিন বিষয়টা আমাকে জানায়। আসলে আমি অনেক কিছুই জানতে পারতাম না। কারণ কাউকে তিনি সাহায্য করলেও তা বলে বেড়াতেন না; আমাকেও কিছু বলতেন না।
সুজাতা জানান, দেশ স্বাধীনের পর আজিম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রতিনিধি নামে একটা চলচ্চিত্র করেন। বাম্পার ব্যবসা করে প্রতিনিধি। এরপর টাকার খেলা, বদলা’সহ বেশকিছু চলচ্চিত্র তিনি পরিচালনা করেন। একদিকে তিনি নিজে পরিচালক হয়েছেন, সঙ্গে আরো চারÑপাঁচ জনকে পরিচালনায় নিয়ে আসেন। ইন্ডাস্ট্রির জন্য এটা অনেক বড়ো ব্যাপার ছিলো সেসময়। অনেক নির্মাতা আজিমের হাত ধরে এই জগতে এসেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ইয়ার খান, আকবর কবির পিন্টু, নাজমুল হুদা মিন্টু প্রমুখ।
সবশেষে আজিমের এক অজানা অধ্যায় প্রকাশ করেন সুজাতা। তিনি বলেন, আজিম শুধু শুটিং স্পটে দক্ষ পরিচালকই ছিলেন, তা নয়। সিনেমার প্রিপ্রোডাকশন পর্যায়ে আমাদের বাসায় সবাইকে নিয়ে বসতেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সত্য দা (সত্য সাহা), আজাদ রহমান, আনোয়ার পারভেজ সকাল ১০টার মধ্যে বাসায় চলে আসতেন। সবাই মিলে আলোচনা করতেন কোন দৃশ্যের পর কী হবে, দর্শক কী পছন্দ করবে ও কোন ধরনের গান থাকবে। তারা এও বলতেন, দর্শক তার পরিশ্রমের পয়সা দিয়ে সিনেমা দেখবে, তাদের ঠকানো যাবে না। ভালোভাবে সিনেমা তৈরি করতে হবে।
একটি প্রশ্ন, উত্তর জরুরি নয়
‘আমি সাহায্যের জন্য কারও কাছে হাত পাততে চাই না, কাজ চাই। মাসে যদি ১৫ দিন কাজ পাই, তাহলে সন্তান আর নাতিদের নিয়ে বেঁচে যাই।’২ এটা আজিম অভিনীত বা নির্মিত কোনো চলচ্চিত্রের সংলাপ নয়। এটা তার স্ত্রী ‘রূপবান’ সুজাতার কথা। উর্দু চলচ্চিত্রের আধিপত্য থেকে বাংলা চলচ্চিত্রের জোয়ার দেখেছেন আজিম। স্বাধীনতার পর ৭০ ও ৮০’র দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘স্বর্ণ সময়ে’ অভিনয়, পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছেন। এরপর প্রত্যক্ষ করেছেন এই শিল্পের অধগমন¾চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বন্ধ হচ্ছে প্রেক্ষাগৃহ। তবে মৃত্যুর আগে সবটা দেখে যেতে পারেননি আজিম। তিনি অসুস্থ হওয়ার পর হাটখোলার বাড়ি বিক্রি করে তার চিকিৎসা করা হয়। সুজাতা এখন ছেলে ফয়সাল আজিম ও দুই নাতিকে নিয়ে থাকেন ভাড়া বাসায়। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন আজিম। অর্থ সঙ্কটে পড়ে তার পরিবার। এই সঙ্কটের মধ্যেও সুজাতা বলেন, ‘আমি জানি দর্শক আজও আমাকে মনে রেখেছেন, এখনও তারা আমাকে ভালোবাসেন, সম্মান করেন। এটা বিশাল এক প্রাপ্তি। বাকি জীবনটা এ ভালোবাসা নিয়ে সুখে শান্তিতে সচ্ছলভাবে বাঁচতে চাই।’৩ আজিম যদি আজ পরপার থেকে ফিরে আসেন, তাহলে তার পরিবারের এই দুরবস্থা নিয়ে কি আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন?
লেখক : জাহাঙ্গীর আলম ও রুবেল পারভেজ, যথাক্রমে প্রথম আলো ও বণিক বার্তায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
তথ্যসূত্র
১. সুজাতা; ‘এখনো অভিনয় ভালোবাসি’; কালের কণ্ঠ-এর শুক্রবারের বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘কথায় কথায়’; ১১ আগস্ট, ২০১৭।
২. ভালো নেই রূপবান সুজাতা; বাংলাদেশ প্রতিদিন; ২১ ডিসেম্বর ২০১৬।
৩. ভালো নেই রূপবান সুজাতা, বাংলাদেশ প্রতিদিন; ২১ ডিসেম্বর ২০১৬।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন