Magic Lanthon

               

শাকিল আহাম্মেদ

প্রকাশিত ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

শেরপুরের প্রেক্ষাগৃহ

মোহভঙ্গের পরে এখনো স্বপ্ন দেখে তারা

শাকিল আহাম্মেদ


অনলাইন থেকে নেয়া কাকলি সিনেমা হল ভাঙার ছবি



একেবারে শুরুর কথা

সেদিন ফেইসবুকে লগ ইন করেই নিউজ ফিডের একেবারে শুরুর দিকেই চোখে পড়ে প্রতিবেদনটি¾ ‘ভেঙে ফেলা হলো শেরপুরের কাকলি সিনেমা হল’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবেদনটি ঠিক কে শেয়ার দিয়েছিলো মনে নেই। তবে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুলাই প্রকাশিত ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এর এই প্রতিবেদনটি দেখা মাত্রই পড়ে ফেলি এক নিঃশ্বাসে। পড়ার পর থেকেই কেমন জানি একটা শূন্যতা অনুভব করতে থাকি নিজের মধ্যে। মনে হচ্ছিলো কী যেনো হারিয়ে ফেলছি একের পর এক। কতো মানুষের হাসি-কান্না, আবেগ-অনুভূতি, ভালোবাসাই না জড়িয়ে ছিলো দেশব্যাপী গড়ে ওঠা এই বিনোদন-কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে! এরকম মনে হওয়ার অবশ্য অন্য কারণও আছে। ২০১৮-এর শুরুতেই জামালপুরের প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। তখন এ নিয়ে কথা বলতে হয়েছিলো নানা পেশার মানুষের সঙ্গে। প্রেক্ষাগৃহকে ঘিরে সমাজ, রাষ্ট্র কীভাবে আলোড়িত হয়েছিলো একসময়, তাদের সঙ্গে কথা না বললে হয়তো আমার জানাই হতো না। সেই আলোড়ন এখন আর নেই। সঙ্কটে ভুগছে দেশের চলচ্চিত্রশিল্প। প্রেক্ষাগৃহের মালিকপক্ষ কোনো উপায় না দেখে একের পর এক ভেঙে ফেলছে তাদের আবেগ, ভালোবাসা, ঐতিহ্যের সেই প্রতিষ্ঠান। একসময় সারাদেশে প্রায় এক হাজার তিনশো প্রেক্ষাগৃহ থাকলেও এখন আছে সবমিলে আড়াইশো। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই হয়তো হারিয়ে যাবে দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ, সঙ্গে হুমকির মুখে পড়বে চলচ্চিত্রশিল্প। কারণ চলচ্চিত্রের এক অংশে নির্মাণ থাকলে আরেক অংশে আছে প্রদর্শন। আর এ প্রদর্শনের উপযুক্ত জায়গা হলো প্রেক্ষাগৃহ, যার মধ্য দিয়েই সফল বাস্তবায়ন ঘটে একটি চলচ্চিত্রের। তাই চলচ্চিত্রশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বাঁচিয়ে রাখতে হবে প্রেক্ষাগৃহকে। চলচ্চিত্র, প্রেক্ষাগৃহ যেনো হাতের এপিঠ-ওপিঠ। যদিও বিপুল প্রযুক্তির এই সময়ে এ নিয়ে নানা বিতর্ক আছে, কিন্তু গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের যে ম্যাজিক সেটা দেখার জায়গা একমাত্র প্রেক্ষাগৃহই। তবে তার আকার, অবস্থান, প্রদর্শন-কৌশল নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

শের আলী গাজীর শেরপুর

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এক জেলার নাম শেরপুর। প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত এ অঞ্চলের আদি নাম ছিলো দশকাহনিয়া। বাংলার নবাবী আমলের গাজী বংশের শেষ জমিদার শের আলী গাজী এ অঞ্চল দখল করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে তার নামানুসারেই দশকাহনিয়া থেকে এ অঞ্চলের নাম হয়ে যায় শেরপুর।

বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে অবস্থিত এ জেলাটি বর্তমানে ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এর উত্তরে ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে ও পশ্চিমে জামালপুর ও পূর্বে ময়মনসিংহ জেলা অবস্থিত। ১৩শো ৬৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এ জেলা বৃটিশ আমল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। ফকির বিদ্রোহ, বৃটিশবিরোধী আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনসহ ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে এ অঞ্চল। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও শেরপুর অঞ্চল পিছিয়ে ছিলো না। পশ্চিমে যমুনা নদী, দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদ থাকায় অন্যান্য জায়গার সঙ্গে এ অঞ্চলের ভালো যোগাযোগ ছিলো। পাশের জেলা ময়মনসিংহ একসময় ছিলো লোকসংস্কৃতির তীর্থস্থান। শেরপুর অঞ্চলেও এর দারুণ প্রভাব পড়ে এবং দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে মৈমনসিংহ গীতিকাসহ এখানকার বিভিন্ন লোকসঙ্গীত।

যাত্রা-নাটক, কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি, ঘাটু, জারি, সারি, মুর্শিদি গান ছিলো একসময় এ অঞ্চলের মানুষের বিনোদনের মাধ্যম। এছাড়া খেলার মধ্যে নৌকাবাইচ, ঘোড়দৌড় ও হাডুডু ছিলো অন্যতম। এরই ধারাবাহিকতায় একসময় বিনোদনের আরেকটি মাধ্যম হিসেবে আবির্ভাব ঘটে চলচ্চিত্রের। প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা হলে তা সবকিছুকে পিছনে ফেলে মানুষকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। ৫০-এর দশকেই শেরপুরে প্রথম প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা হয়। সুধাংশু কুমার রায় নামে একজন সংস্কৃতিমনা চিকিৎসক শখ করেই ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘রূপকথা’ নামের প্রেক্ষাগৃহ। দর্শকের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে শেরপুরে গড়ে ওঠে ‘সত্যবতী’, ‘পদ্মা’, ‘মেঘনা’, ‘কাকলি’, ‘লিখন’ নামে আরো পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহ। যদিও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র দুটি। এ প্রবন্ধ শেরপুরের এসব প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে।

‘রূপকথা’ কিন্তু রূপকথা নয়

ঈদুল আজহা’র জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ছিলো ১৫ দিন। আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম, ছুটিতে বাড়ি গিয়ে শেরপুরের প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে কাজ করার কথা। বাড়িতে গিয়ে নানা কাজে ঈদের আগে আর শেরপুর যাওয়া হয়নি। তবে ঈদের তৃতীয় দিনেই যাত্রা করি শেরপুরের উদ্দেশে। জামালপুর শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটারের পথ শেরপুর। শেরপুর-জামালপুর পথে যাতায়াতের বাহন বলতে সি এন জি-চালিত অটোরিকশা আর লোকাল বাস। ঈদের কারণে তখনো ভাড়া দ্বিগুণ, তারপরও উঠে পড়লাম সি এন জি-চালিত অটোরিকশায়। আমার আসন চালকের ঠিক পাশেই। তার অবশ্য একটা উদ্দেশ্যও ছিলো। যেতে যেতে দুই-এক কথায় চালকের কাছ থেকে শেরপুরের প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে যদি কিছু তথ্য পাওয়া যায়। কারণ তখন পর্যন্ত আমার কাছে শেরপুরের প্রেক্ষাগৃহের তথ্য বলতে শুধু ‘বিডিনিউজ’-এর সেই প্রতিবেদনটি।

যে অটোরিকশায় উঠলাম, তার চালক শেরপুরের। সেজন্যই হয়তো শেরপুর নিয়ে কথা তুলতেই তিনি বেশ আগ্রহ নিয়েই আমার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। যেতে যেতে তার সঙ্গে কথা হয় প্রেক্ষাগৃহসহ শেরপুরের নানা দিক নিয়ে। এতে শহরে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহের অবস্থান ও কিছু প্রাথমিক তথ্য পেয়ে যাই। শহরে এখন প্রেক্ষাগৃহ বলতে শুধু ‘রূপকথা’ ও ‘সত্যবতী’। তাই সবচেয়ে পুরনো ‘রূপকথা’তেই প্রথমে যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিই।

শেরপুর শহরে যেখানে নামলাম মানে সেই অটোরিকশা স্ট্যান্ড থেকে কাছেই ‘রূপকথা’। চালক বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে হাতের ইশারায় আমাকে দেখিয়ে দিলেন ‘রূপকথা’র অবস্থান। সেখান থেকে মিনিট পাঁচেক হেঁটে ‘রূপকথা’ সহজেই খুঁজে পেলাম। খানিকটা দূর থেকেই চোখে পড়েছিলো প্রেক্ষাগৃহের সামনের দেয়ালে টাঙানো মনে রেখো নামের চলচ্চিত্রের পোস্টার। বোঝা যাচ্ছিলো এই ঈদে মুক্তি পাওয়া মনে রেখো চলছে। প্রথমেই লক্ষ করি, প্রেক্ষাগৃহটির চারপাশে কোনো খোলা জায়গা নেই। মানে জেলা শহরের পুরনো প্রেক্ষাগৃহগুলো সাধারণত ফাঁকা জায়গায় হয়। অনেক ভবনের মধ্যে স্বতন্ত্রভাবে প্রেক্ষাগৃহটি ছোটোখাটো একটা হাতির মতো দাঁড়িয়ে থেকে তার অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। কিন্তু এখানে চারপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দালানকোঠায় একেবারে ঢাকা পড়েছে ‘রূপকথা’। পোস্টার টাঙানো না থাকলে বা একেবারে কাছে না গেলে বোঝার উপায় নেই, এখানে একটা প্রেক্ষাগৃহ আছে। যাহোক, যখন প্রেক্ষাগৃহে ঢুকলাম তখন মনে রেখোর তিনটা-ছয়টার শো চলছিলো। প্রথমেই কথা হয় ‘রূপকথা’র ব্যবস্থাপক হারেছ-এর সঙ্গে। তিনি প্রেক্ষাগৃহের ভিতরেই একটি ছোটো দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পান খাচ্ছিলেন। আমার পরিচয় দিয়ে সেখানেই উনার সঙ্গে কথা বলা শুরু করি। কিছুক্ষণ পর সেখানে হাজির হন প্রেক্ষাগৃহের মালিক সুব্রত রায়। সুব্রত আসার পর হারেছ কথা বলতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিলেন। তবে সে অস্বস্তিতে তাকে বেশিক্ষণ থাকতে হয়নি, কারণ পরিচয় পেয়ে সুব্রত আমাকে ডেকে তার চেম্বারে নিয়ে যান। আমি ইশারায় হারেছের কাছ থেকে তখনকার মতো বিদায় নিই।

সুব্রতর চেম্বারে ঢুকে খেয়াল করি, চারপাশে পুরনো কিছু আসবাবপত্র অযত্নে পড়ে আছে। চেয়ার-টেবিলের রঙ চটে গেছে। তবে সেগুলোতে আভিজাত্যের ছাপ ছিলো তখনো। আন্দাজ করা যাচ্ছিলো চেম্বারটি একসময় বেশ চাকচিক্য ছিলো। সুব্রতর সঙ্গে সৌজন্যমূলক কথা বলতে বলতে এসবই ভাবছিলাম। ‘আমার দাদু সুধাংশু কুমার রায়। কলকাতার নীলরতন মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পড়েছিলেন। তিনি ছিলেন শহরের সেসময়ের পণ্ডিত ব্যক্তিদের একজন। ছোটোবেলা থেকেই নাকি দাদুর ঝোঁক ছিলো যাত্রা-নাটকের প্রতি। পড়াশোনার পাশাপাশি অভিনয়ও করতেন বিভিন্ন যাত্রাপালায়। চেহারা দুধে আলতা হওয়ায় যাত্রাপালায় নাকি মেয়ে সেজেও অভিনয় করতেন দাদু।’ দেয়ালে টাঙানো একটি ছবি দেখিয়ে এমনটাই বলছিলেন সুব্রত রায়।

সুব্রত জানান, কলকাতা থেকে পড়ালেখা শেষ করে দেশে ফেরেন সুধাংশু। তখন তিনি পুরোপুরি চিকিৎসক। কিন্তু পুরনো ঝোঁক মাথা থেকে যায়নি। চিকিৎসা পেশায় ব্যস্ত থাকায় সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ডে আগের মতো সময় দিতে পারছিলেন না তিনি। তাই মনে মনে হয়তো একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিলো। সেই শূন্যতা থেকেই হয়তো বিনোদনপ্রিয় এই মানুষটি ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন ‘রূপকথা’।

 

অনলাই থেকে নেয়া রূপকথা সিনেমা হলের ছবি

সুব্রত বলেন, ‘ব্যবসার উদ্দেশ্য দাদুর ছিলো না। দাদু মূলত শখ করেই সিনেমাহল করেন। কারণ আমাদের অর্থ-সম্পদের অভাব ছিলো না। ফলে আলাদা করে সিনেমাহল থেকে টাকা আসতে হবে এ চিন্তা আমার দাদুকে করতে হয়নি। বরং তিনি সবসময় অসহায় মানুষদের বিনামূল্যেই চিকিৎসা করতেন।’ তবে দাদু না চাইলেও সেসময় প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেশ আয়-রোজগার হতো বলে জানান সুব্রত।

এই টাকা দিয়েই যতোদূর সম্ভব মৃত্যুর আগে সুধাংশু ‘সত্যবতী’ নামে শহরে আরো একটি প্রেক্ষাগৃহের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বলে সুব্রত জানান। পরের অংশে ‘সত্যবতী’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকছে। যাই হোক, শেরপুরে যখন ‘রূপকথা’ প্রতিষ্ঠা হয়, তখন দেশে প্রেক্ষাগৃহ স্থাপনের একেবারেই সূচনাকাল। দেশের অল্প কয়েক জায়গায় তখন কেবল প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করা শুরু হয়েছে। ওই সময়ে প্রেক্ষাগৃহের এরকম চমৎকার ও অর্থপূর্ণ একটা নামের জন্য সুধাংশু অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখেন। আমি ভাবি, সুধাংশু হয়তো চিন্তা করেছিলেন, চলচ্চিত্রের জগৎটাই রূপকথা। যদিও রূপকথার সেই রূপ আজ অনেকটাই বর্ণহীন। এখানে আর আগের মতো টিকিটের জন্য দর্শকের লম্বা সারি হয় না; দুই-তিন ঘণ্টা আগে থেকেই দর্শক এসে অপেক্ষা করে না; শোনা যায় না কর্মচারীদের হাঁকডাক; চলচ্চিত্র দেখে দর্শক আর চোখ মুছতে মুছতে বের হয় না! অন্যদিকে মালিকপক্ষকেও ব্যস্ত থাকতে হয় না আগামী ছয় মাসের চলচ্চিত্রের বুকিং নিয়ে।

সামান্য পরেই সুব্রতর কথার মধ্যে আমার উপলব্ধির মিল খুঁজে পাই। সুব্রতর ভাষায়, জন্মের পর থেকে আমি সিনেমাহলের সঙ্গেই বড়ো হয়েছি। তাই খুব ছোটোবেলায় সিনেমা দেখাটা আমাদের কাছে কোনো বিষয় ছিলো না। তখন সিনেমাহলের চারপাশে এতো দালান, দোকানপাট ছিলো না। সিনেমাহলকে কেন্দ্র করেই পরে আস্তে আস্তে সব গড়ে ওঠে। আগে সিনেমাহলের এক কাঠা জমির ওপর শুধু টিকিট কাউন্টারই ছিলো তিনটি। তখন দর্শক তাড়াতাড়ি টিকিট পাওয়ার জন্য লাইনে থাকা সামনের জনকে লুকিয়ে পিঠে ব্লেড মারতো। এরকম ঘটনা ঘটতো মাঝেমধ্যেই। তখন খুব হট্টোগোল হতো। তার পরেও দর্শকের কমতি ছিলো না। নতুন সিনেমা আসলেই হুমড়ি খেয়ে সবাই সিনেমা দেখতে আসতো।

কথা বলার একপর্যায়ে সুব্রত খানিকটা আবেগী হয়ে পড়েন। ব্যবসার বর্তমান অবস্থা নিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলতে থাকেন, আগে সিনেমা দেখা একটা বিনোদন ছিলো, উৎসব ছিলো। আর এখন সিনেমা দেখাকে মানুষ পাপ মনে করে। মোবাইল সেটে মানুষ বিভিন্ন খোলামেলা গান, খারাপ ভিডিও দেখে, তাতে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু একটা সিনেমার পোস্টারে কোনো নায়িকার হাঁটুর উপর কাপড় উঠলেই সেটা খুব খারাপ হয়ে যায়। সমাজের কতো লোকজন কতো ধরনের সমালোচনা করে, তার কোনো ইয়ত্তা নাই। এটার জবাব দিতে দিতে আমাদের জান শেষ। মনে হয়, সিনেমার ব্যবসা করে আমরা মহাপাপ করেছি। অথচ দেখো, আমার এই জায়গাটার দাম এখন ১০ কোটি টাকা, সিনেমাহলের কথা না হয় বাদই দিলাম। এই ১০ কোটি টাকা খাটাইতাছি; সিনেমা আনার সময় আরো লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করতাছি, ৮-১০ জন কর্মচারী রাখছি। এতোকিছুর পরও মানুষের মনে হয় আমরা পাপ করতাছি। সিনেমাহলে এসে যারা সিনেমা দেখে আর যারা সিনেমাহল চালায় তারা কী মহাপাপ করছে! কিন্তু আগের ব্যাপারটা ভিন্ন ছিলো। সব শ্রেণির মানুষ সিনেমা দেখতে আসতো। তখন সমাজের কেবল একশ্রেণির মানুষ পাপ মনে করতো সিনেমা দেখাকে। আর এখন সব শ্রেণিই মনে করে! যে কারণে এখন শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ আর কিছু শিক্ষার্থী সিনেমা দেখতে আসে।

সুব্রতর এসব কথা থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না, কতোটা প্রতিবন্ধকতা ও খারাপ অবস্থা এখন এই ব্যবসার। কিছুদিন আগেই আমি নিজেও প্রেক্ষাগৃহে যেতে ভয় পেতাম। মনে সবসময় একটা শঙ্কা কাজ করতো, এলাকার কেউ যদি দেখে ফেলে, চলচ্চিত্র দেখতে প্রেক্ষাগৃহে আসছি! সুব্রতর কথায় আমার চারপাশে থাকা মানুষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি যেনো মিলে যায়।

একটি চলচ্চিত্রের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সুব্রত বলেন, “তখন আমি খুব ছোটো। বাবার কাছে শুনেছি। রাজ্জাক-ববিতা অভিনীত নাগ নাগিনী নামে একটা সিনেমা আনা হইছিলো ‘রূপকথা’য়। গুজব রটলো, সেই সিনেমার বিনের সুরে সিনেমাহলে নাকি সাপ চলে আসে। এই গুজব চারদিকে এতো ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লো যে, হাজার হাজার মানুষ ‘রূপকথা’য় আসতে থাকে শুধু বিনের সুরে সাপ আসার দৃশ্য দেখার জন্য।” সুব্রতর এসব কথা অবাক হয়ে শুনছিলাম আর ভাবছিলাম জেলা শহরের একসময়ের দাপুটে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘রূপকথা’র মাথা আজ কীভাবে নুয়ে পড়েছে! শহরে এখন তার অবস্থা বলতে ইট-পাথরের তৈরি শুধুই একটা দালান। দেশের অন্য প্রেক্ষাগৃহগুলোর অবস্থাও ‘রূপকথা’র চেয়ে খুব বেশি ভালো নয়। একদিকে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, অন্যদিকে ব্যবসা না হওয়ায় মালিকপক্ষের হতাশা; দুইয়ে মিলে প্রেক্ষাগৃহকে টিকিয়ে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছে প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসা ছেড়ে দিতে। প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে সেখানে গড়ে তুলছে আবাসিক ভবন বা অন্য কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ‘রূপকথা’ আর কতোদিনইবা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে থাকবে? ‘রূপকথা’র ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে এমন সুরেই কথা বলছিলেন সুব্রত রায়। তার ভাষায়, “ভবিষ্যৎ অন্ধকার ‘রূপকথা’র। আর কিছুদিন পরে হয়তো এটা জাদুঘরে পরিণত হবে। তার পরেও আমরা চাই না, বাপ-দাদার প্রতিষ্ঠা করা একটা ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান নষ্ট হয়ে যাক। আমরা যতোদিন পারি, এটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করবো।” দর্শকের ওপর কোনো রকম দোষ না চাপিয়ে সুব্রত বলেন, আসলে সিনেমার প্রতি মানুষের আর কোনো দরদ নাই। আগের থেকে মানুষ এখন অনেক বেশি ব্যস্ত। সিনেমাহলে এসে দুই-তিন ঘণ্টা বসে সিনেমা দেখার মতো সময় তাদের নাই। তার ওপর মোবাইল ফোন, ট্যাব তো এখন সবার হাতে হাতে। সবাই এখন ঘরে বসে, গাড়িতে বসে, কাজের মধ্যে এমনকি কৃষকও কোমরে মোবাইল গুজে গান শুনতে শুনতে ধান কাটে। তাহলে তারা কেনো সিনেমাহলে আসবে। তাছাড়া গ্রামে প্রত্যেকটা চায়ের দোকানে সিডি, টিভি ও ডিশের সংযোগ। দুই দিন আগে মুক্তি পাওয়া সিনেমা চায়ের সাথে সাথে সেখানে বসে সবাই দেখতে পারছে। তাহলে তাদের তো সিনেমাহলে আসার দরকার নাই, আমি হলেও হয়তো আসতাম না।

সুব্রত জানান, সুধাংশু ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে মারা গেলে তার দুই ছেলে সুবিমল রায় ও পরিমল রায়ের মধ্যে সুবিমলের পরিচালনায় ‘রূপকথা’ চলতে থাকে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে সুবিমল রায়ও মারা যান। সুব্রত রায় অনেক আগে থেকেই ‘রূপকথা’র সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু বাবা সুবিমল রায়ের মৃত্যুর পর তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন এটাতে। বর্তমানে তার তত্ত্বাবধায়নেই পরিচালিত হচ্ছে ‘রূপকথা’। প্রেক্ষাগৃহ ছাড়াও তাদের গাড়ির ব্যবসা রয়েছে।

‘সত্যবতী’র গল্প

‘রূপকথা’র পাশাপাশি শেরপুর শহরে আর যে প্রেক্ষাগৃহটি এখনো টিকে আছে তা ‘সত্যবতী’। শহরে প্রেক্ষাগৃহ দুটোর অবস্থানও কিছুটা পাশাপাশি। তার কারণ আগেই বলেছি। সুধাংশু রায় জীবনের শেষ সময়ে ‘সত্যবতী’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিলেন। পরে তার দুই ছেলে মিলে এটা নির্মাণ করেন। সুবিমল ‘রূপকথা’র দায়িত্বে থাকলেও পরিমল পান ‘সত্যবতী’র। ‘রূপকথা’য় সুব্রত রায়ের সঙ্গে সেদিন কথা শেষ করে বের হয়ে দুই মিনিট না হাঁটতেই চোখে পড়ে ‘সত্যবতী’র সাইনবোর্ড। কাউকে জিজ্ঞেস না করে এতো তাড়াতাড়ি ও সহজে ‘সত্যবতী’ পেয়ে যাওয়ায় খানিকটা আনন্দই পাই। সাইনবোর্ডটি খুব বেশি উঁচুতে না থাকায় সেটির ফ্যাকাসে ও মরিচা পড়া রঙটা সহজেই নজরে আসে। অনেক দিন যাবৎ হয়তো সেটা পরিষ্কার বা রঙ করা হয়নি।

‘সত্যবতী’র সামনের দেয়ালে ক্যাপ্টেন খান-এর সারি সারি পোস্টার লাগানো। ঈদের তৃতীয় দিন হওয়ায় দর্শক ভালোই বলে মনে হলো। প্রধান সড়কের সঙ্গে ‘সত্যবতী’ একেবারে লাগালাগি হওয়ায় ‘রূপকথা’ থেকে এর পরিবেশটা অনেকটাই কোলাহলপূর্ণ ও খানিকটা জমজমাটও। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে নয়টার শো তখন শুরু হয়ে গেছে। টিকিট কাউন্টারে তখনো কিছু দর্শক দেখতে পাই। নির্দিষ্ট কোনো টিকিট বিক্রেতা না থাকায় প্রেক্ষাগৃৃহের ব্যবস্থাপকই (পরে জানতে পারি) টিকিট দিচ্ছেন। প্রথমেই গেইটম্যান হাসেমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। হাসেম জানান, তিনি শুধু ঈদে ঈদেই এখানে কাজ করেন; অন্য সময় থাকেন না। ব্যবস্থাপক হযরত আলীকে দেখিয়ে দিয়ে তিনি দর্শকের কাছ থেকে টিকিট নিয়ে তাদের ভিতরে ঢুকানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে আমি আর তাদের বিরক্ত না করে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকি। কিছু সময় পর কাউন্টারের সামনে আর কোনো লোক দেখতে না পেয়ে হযরত আলীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। হযরত হিসাব গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আমার কাছে ১৫ মিনিট সময় চান।

তার কথা মতো আমি বাইরে অপেক্ষা না করে প্রেক্ষাগৃহের চারপাশটা ঘুরে দেখার জন্য বের হই। ঘুরে দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগে এ জায়গাটা কি ঠিক এরকমই ছিলো? নাকি এখানে অবাধ যাতায়াত ছিলো দর্শকের? বিভিন্ন উৎসবে কি এখানে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মিলনমেলা হতো? এখানে এসে তারা কি দুঃখ-কষ্ট ভুলে একসঙ্গে চলচ্চিত্রে ডুবে থাকতো? ‘সত্যবতী’ প্রেক্ষাগৃহের নামেই কি মানুষ জায়গাটা চিনতো? সেই দিনগুলোর কথা তাদের এখনো কি মনে পড়ে? এসব নানা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। সেই সঙ্গে মনে পড়ে ‘মহাভারত’-এর কথা; সেখানকার হস্তিনাপুরের সম্রাজ্ঞী সত্যবতীর কথা। শুরুতে তার কী প্রাধান্যই না ছিলো পুরো রাজ্যে! কিন্তু সময় গড়িয়ে বংশে নতুন প্রজন্ম আসায় একপর্যায়ে মূল্যহীন হয়ে পড়েন মাতা সত্যবতী। মৎস্যকন্যা খ্যাত এই মহীয়সী পরিশেষে বাধ্য হন বনবাসে গিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে। আমার সামনে থাকা ‘সত্যবতী’রও আজ ‘মতাভারত’-এর মাতা সত্যবতীর মতোই অবস্থা। অনেকটা মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম দুই সত্যবতীর মধ্যে। এসব ভাবতে ভাবতেই লোক পাঠিয়ে আমাকে ডেকে নেন হযরত। ভিতরে গিয়ে প্রেক্ষাগৃহ সম্পর্কে কথা বলতে চাইলে হযরত জানান, তিনি ১৮ বছর ধরে এখানে কর্মরত আছেন। খানিকটা ক্ষোভ নিয়েই হয়রত বলেন, ‘এটা নিয়ে কথা বলে আর লাভ কী বলেন! আগের সেই সিনেমাহল এখন আর নাই। সিনেমা ভালো হলে কিছু দর্শক আসে, তা না হলে আসে না।’ আর বেশি কিছু বলার আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন না তিনি। একপর্যায়ে মালিকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে সেখান থেকে হযরত চলে যান। যাওয়ার আগে আমি তার কাছ থেকে মালিকের ফোন নম্বর ও নাম জেনে নিই।

প্রেক্ষাগৃহের মালিক পরিমল কুমার রায়ের সঙ্গে তখনই ফোনে কথা বলি। ১০ মিনিটের মধ্যেই তিনি প্রেক্ষাগৃহে আসছেন বলে জানান। আমি ততোক্ষণ প্রেক্ষাগৃৃহের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে থাকি। ভিতর থেকে ক্যাপ্টেন খান-এর গানের শব্দ ভেসে আসছিলো, সঙ্গে দর্শকের হইচই।

১০ মিনিটের মধ্যেই চলে আসেন পরিমল। এসে আমাকে সঙ্গে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহের ভিতরে ঢুকে যান। প্রথমে নিচতলায় দুটো চেয়ারে বসেই আমরা কথা বলতে শুরু করি। কিন্তু সত্তরোর্ধ্ব পরিমল ভিতর থেকে আসা শব্দে আমার কথা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। এ অবস্থায় তার পরামর্শেই আমরা দোতলায় গিয়ে অফিস কক্ষে বসি। সেখানে আগে থেকেই একজন বসে ছিলেন। পরে জানতে পারি তিনি পরিমলের ছেলে স্মরণ রায়। স্মরণই বর্তমানে ‘সত্যবতী’ দেখভাল করেন। তার সঙ্গে পরিচয় পর্ব শেষে চা খেতে খেতে আবার কথা বলতে শুরু করি পরিমলের সঙ্গে।

১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি নির্দোষ নামের চলচ্চিত্র দিয়ে উদ্বোধন হয় ‘সত্যবতী’র। তবে প্রেক্ষাগৃহের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিলো আগেই। শহরের প্রাণকেন্দ্রে থানা মোড় এলাকায় প্রধান সড়কের একদম পাশেই প্রেক্ষাগৃহটি গড়ে তোলা হয়। স্ত্রী সত্যবতীর নামে সুধাংশু এ প্রেক্ষাগৃহের নাম রাখেন। পরিমল জানান, তাদের দুই ভাইয়ের জন্য বাবা দুইটা প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা করে যান। তিনি  নাকি চেয়েছিলেন দুই ভাই দুইটা প্রেক্ষাগৃহ চালাবে। যদিও ‘সত্যবতী’ হওয়ার আগে দুজনই ‘রূপকথা’ দেখাশোনা করতেন। কিন্তু ‘সত্যবতী’ হওয়ার পর পরিমল এখানে চলে আসেন।

প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি পরিমলের আইসক্রিম ও গাড়ির ব্যবসাও ছিলো। ফলে ব্যবসায়ী হিসেবে শহরে একসমসয় তার বেশ নামডাক ছিলো বলে মনে হলো। তবে সবমিলে প্রেক্ষাগৃহের বর্তমান অবস্থা নিয়ে অত্যন্ত হতাশ পরিমল। তার ভাষায়,

অনেক দিন ধরেই আমি সিনেমাহলের সঙ্গে জড়িত। আগের ব্যবসা এখন আর নাই। একসময় ‘রূপকথা’ চালাইতাম, এখন ‘সত্যবতী’। এই দীর্ঘ সময়ে কতো কিছু দেখলাম। কী জমজমাট ব্যবসা ছিলো একসময়! সবাই আমাদের সিনেমাহলের মালিক বলে চিনতো, আলাদা সম্মান করতো। সেই ব্যবসায় একটা আভিজাত্য, আনন্দ ছিলো। আজ এই অবস্থার কথা কোনোভাবে ভাবতেই পারি নাই।

আমাকে উদ্দেশ করে তিনি বলতে থাকেন, ‘এখন এই সিনেমাহলের ব্যবসা করে আপনি কী করবেন? তার চেয়ে যদি মার্কেট বা ফ্ল্যাট করে ভাড়া দিতাম, তার চেয়ে অনেক ভালো চলতো।’

পরিমল কথার একপর্যায়ে জামালপুরের সবচেয়ে পুরনো ‘ইন্তেজার’ (১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে আগুন লেগে বন্ধ হয়ে যায়) প্রেক্ষাগৃহের কথা স্মরণ করেন। ‘ইন্তেজার’-এর মালিক আব্দুল কাদের পাহ্লোয়ানের সঙ্গে নাকি তার ভালো সম্পর্ক ছিলো। তার কথা উল্লেখ করে পরিমল জানান, পাহ্লোয়ান সাহেব প্রায়ই তার কর্মচারীদের বলতেন, ‘আমি সিনেমাহলের মালিক; সিনেমা দেখার জন্য যতো লোক আসে, তার চেয়ে বেশি আসে আমাকে দেখার জন্য।’ পাহ্লোয়ান সাহেবের সেই কথা থেকে বোঝা যায়, শুধু প্রেক্ষাগৃহ নয়, তার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষরাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো সেসময়। এরপর প্রবীণ পরিমল আর কথা বলার আগ্রহ দেখান না। আমিও আর কথা এগোই না।

পরিমলের সঙ্গে কথা বলার সময় পাশেই ছিলেন ছেলে স্মরণ রায়। স্মরণ রায় তার বাবার কথার ফাঁকে ফাঁকে নিজে থেকেই কিছু তথ্য যোগ করছিলেন। প্রেক্ষাগৃহ ছাড়াও দেশের চলচ্চিত্রের নানা দিক উঠে আসছিলো তার কথায়। তাই পরিমলের সঙ্গে কথা শেষ করে কৌশলে তার দিকে মনোযোগ দিই। ‘সত্যবতী’র আগের ব্যবসার বর্ণনা দিয়েই কথা শুরু করেন স্মরণ। তার ভাষায়, সেসময় বছরে প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসার ছয়টা মৌসুম ছিলো। দুটি ঈদ ছাড়াও দুই ঈদের মাঝামাঝি সময়, পূজা, জুন-জুলাই ও ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাস। জুন-জুলাইয়ের দিকে কৃষকের ঘরে ফসল তোলা শেষ হলে তারা পরিবার নিয়ে চলে আসতো প্রেক্ষাগৃহে। তখন একটা দারুণ ব্যবসা হতো। আবার ডিসেম্বরে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা শেষ হয়। সেসময় বন্ধুবান্ধব, অনেকে বাবা-মার সঙ্গে চলচ্চিত্র দেখতে আসতো। অবশ্য কিছু প্রেমিক-প্রেমিকাও লুকিয়ে আসতো চলচ্চিত্র দেখতে। এর বাইরেও কিছু ‘দুষ্টু ছেলে’ ছিলো, যারা চলচ্চিত্র দেখার জন্য বাড়ি থেকে ধান পর্যন্ত চুরি করতো। ধান চুরির টাকায় চলচ্চিত্র দেখতো আর হোটেলে খেতো। তখন তো ছেলে-মেয়েরা আজকের দিনের মতো এতো মাদক নিতো না, তারা অসভ্যও ছিলো না। ধান চুরির টাকায় চলচ্চিত্র দেখাই তাদের কাছে মহা আনন্দের ছিলো বলে জানান স্মরণ।

স্মরণ আরো জানান, ‘সত্যবতী’তে আগে নারীদের জন্য একশো আসন সংরক্ষিত ছিলো। তাদের জন্য কাউন্টারও ছিলো আলাদা। নারীরা যে আগে শুধু দিনে চলচ্চিত্র দেখতে আসতো, তা না। রাত নয়টা-১২টার শোতেও অনেক নারী দর্শক আসতো। স্বামী-সন্তানের জন্য রাতের রান্নাবান্না ও অন্যান্য কাজ গুছিয়ে তারা কয়েকজন মিলে চলে আসতো চলচ্চিত্র দেখতে। সেই সময়ে বাংলার বধূ নামে একটি চলচ্চিত্রের কথা মনে করেন স্মরণ। এই চলচ্চিত্রের বেশিরভাগ দর্শক ছিলো নারী। ক্ষোভ নিয়ে স্মরণ বলেন, ‘আর এখন তো মহিলারা আসেই না, তাদের ছেলে-মেয়েদেরও সিনেমাহলে আসতে নিষেধ করে। সিনেমাহলের একটা নেতিবাচক প্রভাব সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। পড়বেই না কেনো, সিনেমা তো আর আগের মতো নেই।’

স্মরণ বলেন, গত ১০ বছরে বাংলাদেশে পাঁচটি সিনেমাও পরিবারের সবাই মিলে দেখার মতো হয়নি। অশ্লীলতা হয়তো একটা দিক; কিন্তু অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালকদের অদক্ষতাও এর বড়ো কারণ। কিছুটা আক্ষেপের সঙ্গে স্মরণ জানান, আগে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় মঞ্চনাটকের মতো রিহার্সেল হতো, শুটিং শুরুর তিন মাস আগে থেকেই তারা অভিনয়ের অনুশীলন করতেন। কোন শট্ কীভাবে কী করতে হবে, সেটা আগে থেকে তাদেরকে শেখানো হতো। আর আজকাল অভিনয়শিল্পীরা জানেই না কাল শুটিংয়ে তাদের কোন শট্ হবে! ফলে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে।

বাবার চরিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে স্মরণ বলেন, এখন তো চলচ্চিত্রে বাবার চরিত্র বলে কিছু নেই। একসময়ে বাবার চরিত্রে অভিনয় করতেন রাজ্জাক, এ টি এম শামসুজ্জামান, আলমগীর, আনোয়ার হোসেন, গোলাম মোস্তফা, রাজীব। রাজীব যেমন ভিলেন ছিলেন, তেমনই শক্তিমান বাবাও ছিলেন। রাজা সাহেব-এ রাজীব অত্যাচারী জমিদার চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেন। এ টি এম শামসুজ্জামান তো একাধারে ভিলেন, বাবা আর কমেডিয়ান ছিলেন। আর হুমায়ুন ফরীদির মতো ভিলেন তো এখন একজনও নাই। তিনি যখন পর্দায় আসতেন, দর্শকের সে কী প্রতিক্রিয়া! দাঁত-মুখ বিকৃত করে দর্শক তার প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ প্রকাশ করতো। ওই অভিনয়শিল্পীদের অভিনয় করানোর মতো গল্পই নাই এখন।

চলচ্চিত্রে মায়ের উপস্থাপন নিয়েও কথা বলেন স্মরণ। তার ভাষায়, সিনেমায় একসময় কবরী, শাবানা, ববিতা, ডলি জহুর, আনোয়ারার মতো অভিনয়শিল্পী ছিলো। শাবানা দর্শকের কাছে ‘বিউটি কুইন’ নামে খ্যাত ছিলেন; আর কবরী পরিচিত ছিলেন ‘মিষ্টি মেয়ে’ নামে। তারা যেমন নায়িকা চরিত্রে দর্শকের মন জয় করেছিলো, তেমনই চমক দেখিয়েছে মা’র চরিত্রেও। তারা কেউই এখন চলচ্চিত্রে নাই। তাদের শূন্যতা আর কেউ পূরণ করতে পারছে না। ফলে সিনেমাহলে মধ্যবয়সি ও বয়স্ক দর্শক কমে যাচ্ছে।

চলচ্চিত্রে বর্তমান অবস্থার জন্য নির্মাতাদের অদক্ষতা অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করেন স্মরণ। পরিচালকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভালো পরিচালক হতে গেলে শকুনের মতো চোখ লাগে। যে চোখ দিয়ে তারা উপযুক্ত অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট অনেক কিছুই সঠিকভাবে বেছে নিতে পারে। আগের পরিচালকদের সেরকম চোখ ছিলো। বর্তমানের পরিচালকদের সেই চোখটা নাই। তারা চরিত্র মতো শিল্পীই নির্বাচন করতে পারে না। আসলে সিনেমা-নির্মাণ ক্ষেত্রটা এখন কিছু অসাধু, অদক্ষ লোক টাকার জোরে, ক্ষমতার জোরে দখল করে নিয়েছে। আগে পরিচালক হতে গেলে কমপক্ষে পাঁচ-ছয়টা সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হতো। আর এখন যার টাকা আছে সেই পরিচালক হয়ে যাচ্ছে; তাদের নেই কোনো চলচ্চিত্র-জ্ঞান, কোনো অভিজ্ঞতা!

কিছুটা ব্যঙ্গ করেই স্মরণ বলেন, কী আর বলবো! এখনকার সিনেমার নাম বলে কিছু নাই! পাংকু জামাই, চিটাগাইঙ্গা পোয়া নোয়াখাইল্যা মাইয়া, মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা ছাড়া তারা সিনেমার নামই খুঁজে পায় না। অথচ আগে কী সুন্দর সুন্দর নাম ছিলো¾লোভ লালসা, বাংলার বধূ, বাংলার মা, বদনাম, রংবাজ, বেঈমান¾এসব নাম শুনলেই সিনেমা দেখতে মন চাইতো। আর এখন ঘৃণা লাগে। দর্শক টাকা খরচ করে সিনেমা দেখে। এটা পরিচালককে মাথায় রাখতে হবে। তারা সিনেমা উপভোগ করতে চায়। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যাতে দর্শক সিনেমা বুঝতে পারে, উপভোগ করে, সেই চিন্তা মাথায় রেখেই সিনেমা বানাতে হবে। তাহলে দর্শক আসবে।

গান হচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দর্শকের অনেকেই একসময় প্রেক্ষাগৃহে আসতো শুধু গান শোনার জন্য। অনেক সময় চলচ্চিত্রের চেয়ে গান জনপ্রিয়তা পেতো। সেই গান থাকতো দর্শকের মুখে মুখে। সেই গান গেয়ে কৃষক ধান কাটতো, শ্রমিকরা কাজ করতো, প্রেমিক-প্রেমিকা বিরহে কাতর হতো। কিন্তু বর্তমান চলচ্চিত্রের গান দর্শককে আর টানে না। চলচ্চিত্রের গান নিয়ে অনেকটা এভাবেই কথা বলছিলেন স্মরণ রায়। তিনি জানান, এখন গানকেন্দ্রিক ভালো চলচ্চিত্রের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। এখনকার চলচ্চিত্রের গানে কোনো অর্থ নাই। দর্শক সেই গানকে আর ধারণ করতে পারে না। প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হওয়ার পরই গানের কথা ভুলে যায়।

আগের দিনের কথা বলতে গিয়ে স্মরণ এবার প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের সঙ্গে প্রযোজক, পরিবেশকদের সম্পর্কের কথা বলতে থাকেন। ‘সত্যবতী’র মালিকপক্ষের সঙ্গে নাকি এফ ডি সি’র লোকজন, প্রযোজক, পরিবেশকদের খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। স্মরণ বলেন,

বাবাকে সবাই পরিমল দা বলেই ডাকতো। বৃহত্তর ময়মনসিংহের সিনেমাহল মালিকদের মধ্যে যে কয়জন এফ ডি সি’তে সম্মান পাইছে, বাবা তাদের মধ্যে অন্যতম। বাবাকে সবাই সম্মান করতো, এখনো করে। আমি শুরু থেকেই বাবার সঙ্গে যাইতাম। এতে করে অনেকের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০০০ সাল পর্যন্ত এফ ডি সি একটা পরিবারের মতো ছিলো। সেখানে আমি কাউকে চাচা, কাউকে ভাই, ফুপা, ফুপি, আপা, কাউকে আন্টি ডাকতাম। সেসময় সিনেমা সংশ্লিষ্ট লোকদের মধ্যে আন্তরিকতার কোনো কমতি ছিলো না।

এসব বলতে বলতে স্মরণ আবার প্রেক্ষাগৃহের পুরনো সেই রমরমা ব্যবসার কথায় ফিরে যান। অনেকটা হতাশার সুরে তিনি বলেন,

কী ব্যবসা করছি রে ভাই, আজ মনে হলে কান্না আসে! একসময় ‘সত্যবতী’তে কর্মচারীই ছিলো ২২ জন। সেসময় আমার ধ্যান-জ্ঞান সবই ছিলো সিনেমাহলকে ঘিরে। বিশ্বাস করেন, সিনেমাহলকে আমি আমার সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম। আপনাকে দুই ঘণ্টা সময় দেওয়া তো দূরের কথা, তখন কারো সঙ্গে এক মিনিট বাড়তি কথা বলার সময় ছিলো না। আর আজ ‘সত্যবতী’র মালিক, ম্যানেজার, অ্যাকাউন্টেন্ট, কেয়ারটেকার সবই আমি।

এ সময় স্মরণ কিছুটা আবেগ-আপ্লুত হয়ে যান। ছলছল হয়ে ওঠে তার চোখ। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি তার দিকে। সম্পর্ক কতোটা গভীর হলে একজন মানুষ প্রেক্ষাগৃহকে তার সন্তানের সঙ্গে তুলনা করতে পারে! দীর্ঘ আলোচনার শেষদিকে ‘সত্যবতী’র ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে স্মরণ জানান, তারা দুই বছর সময় নিয়েছে। এই দুই বছরের মধ্যে যদি ব্যবসার উন্নতি হয়, তাহলে প্রেক্ষাগৃহ থাকবে; না হলে ভেঙে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

আগেই বলেছিলাম, শেরপুরে প্রেক্ষাগৃহ বলতেই এখন ‘রূপকথা’ ও ‘সত্যবতী’। দুটোই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুধাংশু কুমার রায়। একটা ১৯৫৭, আরেকটা ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে। দুটোর অবস্থাই এখন দেশের অন্য প্রেক্ষাগৃহের মতোই দর্শকশূন্য। কতোদিন চলবে এভাবে? কতোদিন থাকবে স্মরণের এই সন্তান? আমি জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি, হৃদয় ভাঙা হাহাকার নিয়ে বেঁচে থাকবে ‘সত্যবতী’, ‘রূপকথা’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষগুলো। জীবন হয়তো থেমে থাকবে না। কিন্তু স্মৃতির হাহাকার হাতড়িয়ে বেড়াবে তাদের বাকি জীবন!

একই ভবনে ‘কাকলি’ ও ‘পদ্মা’

শেরপুরে দ্বিতীয় প্রেক্ষাগৃহ হিসেবে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা হয় ‘কাকলি’। শহরের মুন্সিবাজারে পরশমনি চলচ্চিত্র দিয়ে যাত্রা হয় এ প্রেক্ষাগৃহের। বছরের পর বছর লোকসানের পর ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুলাই ভেঙে ফেলা হয় ঐতিহ্যবাহী এ প্রেক্ষাগৃহটি। ‘কাকলি’তে শেষ প্রদর্শিত হয় পোড়ামন ২। এই তথ্যগুলো ‘বিডিনিউজ’-এর সেই প্রতিবেদন থেকে আগেই জেনেছিলাম। কিন্তু এতোটুকু জেনে সন্তুষ্ট ছিলাম না। তাই ‘সত্যবতী’ নিয়ে কথা শেষ করে সেখান থেকে সরাসরি চলে যাই মুন্সিবাজারের কাকলি মার্কেটে। সেখানে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশেই চোখে পড়ে ‘কাকলি’র ভাঙা দালান।

দালান ভাঙার কাজ তখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। প্রেক্ষাগৃহের কাঠামো তখনো খানিকটা বোঝা যাচ্ছিলো। ভাঙা দালানের পাশেই কয়েকজন শ্রমিককে দেখি রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিতে। কথা হয় তাদের সঙ্গে। এরাই ‘কাকলি’ ভাঙার কাজ করছে। তবে প্রেক্ষাগৃহ সম্পর্কে তারা তেমন কিছু বলতে পারে না। এরপর প্রেক্ষাগৃহের উল্টো পাশের এক ঘড়ি মেরামতের দোকানে যাই। সেখানে বসে থাকা ঘড়ি মেকানিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি।

কাকতালীয়ভাবে তখন সেই দোকানেই বসে কয়েকজনের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন ‘কাকলি’র সাবেক ব্যবস্থাপক ফরহাদ আলী। ঘড়ি মেকানিক রবি’র কাছে ‘কাকলি’ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ফরহাদ আলীকে দেখিয়ে দেন। পরিচয় দিয়ে কথা বলা শুরু করি তার সঙ্গে। ফরহাদ জানান, ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘কাকলি’তে ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করে শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন। এ প্রেক্ষাগৃহের মালিক গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া লিটন শেরপুর পৌরসভার বর্তমান নির্বাচিত মেয়র। মুন্সিবাজার জুড়ে গড়ে ওঠা কাকলি মার্কেটটিও তাদের। ফরহাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্যটি তিনি দেন তা হলো, ‘কাকলি’ প্রেক্ষাগৃহের তৃতীয় তলায় ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে ‘পদ্মা’ নামের আরেকটি প্রেক্ষাগৃহ প্রতিষ্ঠা হয়। অর্থাৎ একই ভবনের নিচতলায় ‘কাকলি’ এবং উপরে ‘পদ্মা’ ছিলো। অনেকটা আজকের দিনের সিনেপ্লেক্সের মতো। ফরহাদ আলীর সঙ্গে যখন ‘কাকলি’ নিয়ে কথা বলছিলাম, তখন উঠে আসে ‘পদ্মা’র কথাও। তবে ‘পদ্মা’ নিয়ে খুব বেশি তথ্য দিতে পারলেন না ফরহাদ। তবে খায়রুন সুন্দরী নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফরহাদ বলেন, “এই সিনেমাটি একই সঙ্গে দুইটা হলেই এক মাস চলেছে। আমরা জায়গা দিয়ে কুলাতে পারি নাই। প্রচুর মহিলা আসছিলো সিনেমাটি দেখার জন্য। ‘কাকলি’তে তো মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিলো, তার পরও ‘পদ্মা’র পুরোটাই আমরা নারীদের জন্য দেখার ব্যবস্থা করি। কোনো উপায় ছিলো না!” বেশি রাত হওয়ায় সেদিন আর ফরহাদের সঙ্গে কথা হয় না। তার কাছ থেকে মালিক লিটনের ফোন নম্বর নিয়ে সেদিনের মতো চলে আসি।

পরদিন ফোনে কথা হয় লিটনের সঙ্গে। লিটন জানান, তার বাবা নিজামউদ্দিন আহমদ শহরের কেন্দ্রস্থল মুন্সিবাজার এলাকায় ৩৫ শতক জমির ওপর পুকুর ভরাট করে ‘কাকলি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তখন চলচ্চিত্রের ব্যবসা খুব ভালো হওয়ায় মূলত তিনি এটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। লিটন বলেন, ‘শেরপুরে তৎকালীন মুসলিম ব্যবসায়ীদের মধ্যে আমার বাবা ছিলেন অগ্রগণ্য। তিনিই প্রথম শেরপুরে পেট্রোল পাম্প স্থাপন করেন। বাবা বড়ো রাজনীতিবিদও ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি শেরপুর মহকুমা আসনের সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে বাবা মারা যান।’

লিটন জানান, আগে নিয়মিতভাবে ‘কাকলি’তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। সেই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে নায়করাজ রাজ্জাক, ববিতাসহ অনেক বড়ো বড়ো অভিনয়শিল্পীরা অংশ নিতো। ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষী এই প্রেক্ষাগৃহটি ভেঙে ফেলার কারণ জানতে চাইলে লিটন বলেন, ‘সিনেমা ব্যবসায় এখন লাভ তো দূরের কথা, খরচও তুলতে পারছিলাম না। তাই এটা রাখা সম্ভব হলো না।’ লিটন কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, একসময় শেরপুর শহরে ছয়টি সিনেমাহল ছিলো। ঢাকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন সিনেমা মুক্তি দেওয়ার প্রতিযোগিতা হতো হলগুলোর মধ্যে; ব্যবসাও ছিলো জমজমাট।

‘পদ্মা’ সম্পর্কে লিটনের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ‘পদ্মা’ আসলে নির্মাণ করা হয়েছিলো অন্য ভাষার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলো দেখানোর জন্য। তখন শহরে একশ্রেণির উচ্চশিক্ষিত ও আগ্রহী দর্শক ছিলো যাদের নিজ দেশের বাইরেও অন্য দেশের চলচ্চিত্রের প্রতি ঝোঁক ছিলো। ভালো ব্যবসা ও তাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই ‘পদ্মা’ নির্মাণ করা হয়। সেখানে অন্য দেশের চলচ্চিত্র বিশেষ করে হলিউড, বলিউডের চলচ্চিত্রই বেশি দেখানো হতো। সেসময় ‘পদ্মা’য় দেখানো সানফ্লাওয়ার, রিটার্ন অব দ্য টাইগার, হান্ড্রেড রাইফেলসসহ তখনকার জনপ্রিয় কয়েকটি বিদেশি চলচ্চিত্রের নামও উল্লেখ করেন লিটন। তবে শুরুতে শুধু অন্য ভাষার চলচ্চিত্র দেখানো হলেও পরে দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী ‘পদ্মা’য় বাংলা চলচ্চিত্রও চালানো হয়।

একসময় আগুন লেগে বন্ধ হয়ে যায় ‘পদ্মা’। তবে ঠিক কবে এ দুর্ঘটনা ঘটে সেটা বলতে পারেন না লিটন।

‘লিখন’ যেনো এক পুরাকীর্তি

শেরপুরের প্রেক্ষাগৃহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এক হাজার দুইশো আসন নিয়ে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা হয় ‘লিখন’। জায়গাটা ছিলো মূল শহরের একটু বাইরে খরারপাড় এলাকায়। জনশ্রুতি আছে, যশোরের ‘মনিহার’-এর পর এটি নাকি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রেক্ষাগৃহ ছিলো। শুধু আসনের দিক থেকেই বড়ো নয়, কী অপূর্ব ‘লিখন’-এর নকশা! নিজ চোখে না দেখলে কারো জন্য এটা অনুভব করা একটু কঠিনই। যদিও সময়ের টানে সেই নকশা এখন অনেকটাই মলিন। তারপরও আমি যখন ‘লিখন’-এ যাই, তার বিচিত্র নকশা দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছিলাম; একই সঙ্গে মনটাও খারাপ হয়। কী দুর্দান্ত একটি প্রেক্ষাগৃহ অবহেলায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রধান ফটকের সামনে জমে থাকা পানিতে ছোটো ছোটো ঘাস জন্মে জায়গাটা স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে। সেখানে ভাঙাড়ি মালে ভর্তি কয়েকটি বড়ো বড়ো বস্তা সারি করে ফেলে রাখা। দেয়ালের রঙ বিবর্ণ হয়ে গেছে। হঠাৎ দেখে ‘লিখন’কে কোনো পুরাকীর্তি মনে হতে পারে।

অনলাইন থেকে নেয়া লিখন সিনেমা হলের ছবি

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, পাঁচ-ছয় বছর আগে ‘লিখন’ বন্ধ হয়। প্রেক্ষাগৃহের পাশেই কথা হয় রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী তাইজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, ওয়াজেদ আলী নামে এক ব্যবসায়ী এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাকে ময়না নামেই বেশিরভাগ মানুষ চেনে। লিখন তারই ছেলের নাম। প্রেক্ষাগৃহের পাশেই আব্দুল হালিম হলু নামের এক পান বিক্রেতা বলেন, ‘এখানে সিনেমাহল যখন শুরু হয়, সেই শুরুর দিকে দর্শক সকাল আটটায় এসে বসে থাকতো সিনেমা দেখার জন্য। স্বজন, গাড়িয়াল ভাই সিনেমা টানা এক মাস চলছে এখানে।’

পরে ওয়াজেদ আলীর আরেক ছেলে লিটনের সঙ্গে কথা হয় ‘লিখন’ নিয়ে। লিটনের খোঁজ পাওয়ার গল্পটা আগে বলে নিই। এই প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছিলাম, শেরপুর-জামালপুরের মধ্যে যাতায়াতের যানবাহন বলতে বাস আর সি এন জি-চালিত অটোরিকশা। আমি দ্বিতীয়বার বাসে করেই শেরপুরে যাচ্ছিলাম। শেরপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছার পর বাসের চালকের সহকারী আল আমিনকে জিজ্ঞেস করি, ‘ভাই, লিখন সিনেমাহলটা কোথায়?’ আল আমিন আমাকে জায়গার নাম বলে বুঝিয়ে দেন কীভাবে যেতে হবে। আমি বিদায় নিতে চাইলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘ওইহানে যাইয়ে কী করবেন? ওইডা তো এহন বন্ধ।’ আমি তাকে জানাই, ‘ওই সিনেমাহল সম্পর্কে আমার কিছু তথ্য দরকার।’ তখন লিটনের নাম উল্লেখ করে আল আমিন বলে ওঠেন, ‘ওইডা তো আমগোর মালিকেরই হল। এই গাড়িও তার।’ এরপর তার কাছ থেকে লিটনের ফোন নম্বর নিয়ে চলে যাই ‘লিখন’-এ।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলার পর ফোন দিই লিটনের কাছে। তিনি ব্যস্ত থাকায় তখন সময় দিতে পারবেন না বলে জানান। পরদিন ফোনেই কথা হয় তার সঙ্গে। লিটন জানান, তার বাবা ওয়াজেদ আলীর আগে থেকেই ইচ্ছা ছিলো একটা প্রেক্ষাগৃহ করার। অবশেষে তিনি ব্যাংক ঋণ ও জমি বিক্রি করে ‘লিখন’ প্রতিষ্ঠা করেন। শহর থেকে একটু বাইরে হওয়ায় শুরুতে প্রচুর দর্শক হতো বলে জানান লিটন। পরে আস্তে আস্তে দর্শক কমতে থাকে। শেষদিকে দর্শক না থাকায় দিনে দুইটা শো চালানো হতো। তার পরও দর্শক হতো না। একপর্যায়ে তারা বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দেয় ‘লিখন’। তার বাবাও ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। ‘লিখন’-এ সর্বশেষ প্রদর্শিত চলচ্চিত্র ছিলো লালটিপ।

‘মেঘনা’ এখন চালের গুদাম

‘মেঘনা’ প্রতিষ্ঠা করেন ‘কাকলি’র প্রতিষ্ঠাতা নিজামউদ্দিন আহমদের ভাই জুলহাসউদ্দিন আহমেদ। এটিই ছিলো শহরে নির্মিত সর্বশেষ প্রেক্ষাগৃহ। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর জুলহাসউদ্দিন মূল শহরের বাইরে বিদ্যানারায়ণপুর এলাকায় ‘মেঘনা’ প্রতিষ্ঠা করেন। ‘মেঘনা’র পরিত্যক্ত ভবনের দেয়ালে লাগানো ফলক থেকে এই তথ্য জানা যায়।

শহরের বাকি পাঁচটা প্রেক্ষাগৃহ সম্পর্কে মোটামুটি জানা হয়ে গেলে সবশেষে ‘মেঘনা’তে যাই। ‘মেঘনা’র অবস্থা অনেকটা ‘লিখন’-এর মতোই; ভবনটি পরিত্যক্ত পড়ে আছে। আমি যখন সেখানে যাই, তখন প্রেক্ষাগৃহের পাশে এক চায়ের দোকানে অনেকে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। এক কাপ চা নিয়ে আমিও তাদের পাশে থাকা বেঞ্চে বসি। ‘মেঘনা’ সম্পর্কে দু-এক কথা জানতে চাইলে তাদের মধ্যে কয়েকজন আগ্রহের সঙ্গে নানা কথা বলতে শুরু করে। এরই মধ্যে একজন বলে ওঠেন, ‘ওই যে সিনেমাহলের মালিক মারুফ ভাই।’ পরে জানতে পারি জুলহাসউদ্দিনের ছেলে মারুফ।

মারুফ ওই ব্যক্তির ডাকে সাড়া দিয়ে দোকানে আসেন। আমি কোনো কিছু বলার আগেই দুই জন আমার পরিচয় তাকে জানায়। তারপর মারুফ সেখান থেকে আমাকে সঙ্গে নিয়ে ‘মেঘনা’র একেবারে সামনের একটা দোকানে নিয়ে যান। সেখানে বসেই আলাপ শুরু হয় তার সঙ্গে। ‘মেঘনা’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মারুফ বলেন, “দুটো কারণে আমরা সেসময় ‘মেঘনা’ বানিয়েছিলাম। এক, এখানে আগে চাউলের মিল ছিলো। মিলের কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছিলো; অনেকেই এটা নিয়ে অভিযোগ করতো। আর এর পাশেই ছিলো তৎকালীন ডি সি’র বাসা। সব মিলে সমস্যা দেখা দেয়। অন্যদিকে সেসময় সিনেমাহলের ব্যবসা ভালো হওয়াই আমরা সিদ্ধান্ত নেই ‘মেঘনা’ প্রতিষ্ঠা করার।”

মারুফ আরো বলেন, “‘মেঘনা’ প্রতিষ্ঠার সময় সরকার এই ধরনের ব্যবসায় ব্যাংক লোন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। বাবা তখন নিরুপায় হয়ে জেলার বিভিন্ন জায়গায় থাকা আমাদের চারটি চালের মিল বিক্রি করে ‘মেঘনা’ নির্মাণ করেন।” তিনি জানান, এই প্রেক্ষাগৃহে মিশা সওদাগর, জাম্বু, নাসির খান, শাবানা, শাকিল খান, পপি প্রমুখ নামকরা শিল্পীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে গেছে। এখন সবই স্মৃতি! আগে অনেক অভিনয়শিল্পীর সঙ্গেই তাদের ভালো সম্পর্ক ছিলো। এখন তারাও চলচ্চিত্রে নাই, দর্শকও নাই। ক্ষোভ নিয়ে মারুফ বলেন, ‘আমরা এখন মূল্যহীন হয়ে গেছি। ফলে একসময় বাধ্য হয়েছি সিনেমাহল বন্ধ করে দিতে।’

সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মারুফ জানান, গুরু নামে একটি হিন্দি চলচ্চিত্র একবার চালানো হয়েছিলো ‘মেঘনা’য়। হিন্দি চলচ্চিত্র হওয়ায় প্রচুর দর্শক হয়েছিলো সেটা দেখার জন্য। তখন অন্য দেশের চলচ্চিত্র দেখানো নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু তারা একটু কৌশলে গুরু দেখাতে পেরেছিলেন। এজন্য অবশ্য জেলা প্রশাসন ও বিশেষ কয়েকটা জায়গায় লাভের একটা অংশ দিতে হয়েছিলো। সপ্তাহখানেক চলেছিলো গুরু।

মারুফ আরো জানান, তার বাবা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উপজেলার চেয়ারম্যানও ছিলেন একসময়। তিনি ‘মেঘনা’ প্রতিষ্ঠা করলেও তারা তিন ভাই প্রেক্ষাগৃহ পরিচালনা করতো। দুই বছর পর পর একেকজন এটি চালানোর দায়িত্ব পেতো। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বাবা মারা যান। বছর পাঁচেক হলো ‘মেঘনা’ বন্ধ। এখন চাউলের গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি মারুফ। তার কথায় বুঝতে পারি, প্রেক্ষাগৃহটি এখনই না ভেঙে আরো কিছুদিন দেখবে তারা। তার ভাষায়, ‘যদি সিনেমার ভালো দিন আসে তাহলে আবার চালু করবো।’

শেষ কথা

চলচ্চিত্রনির্মাতা ও শিক্ষক হায়দার রিজভী বলেন, ‘ফিল্মের বাহিরে আলাদা কোনো দুনিয়া আছে কি না আমার জানা নেই।’ তার এই কথা দিয়ে বোঝা যায়, সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রভৃতি¾এমন কিছু নেই যা চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু নয়। চলচ্চিত্র মানেই পৃথিবীর ভিতরে আরেকটা পৃথিবী। আর এ পৃথিবীকে যথাযথ দেখা, বোঝা ও অনুভবের জায়গা প্রেক্ষাগৃহ। প্রেক্ষাগৃহই একমাত্র জায়গা যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে বসে চলচ্চিত্র উপভোগ করে। সেখানে তারা কখনো হাসে, কাঁদে, কখনোবা আনন্দে হাততালি দেয়; ডুবে যায় আরেকটা পৃথিবীতে। এর চেয়ে গণতান্ত্রিক কোনো জায়গা পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি বোধহয় নেই।

১৯৫৬-১৯৯১ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে শেরপুর শহরে গড়ে উঠেছে ছয়টি প্রেক্ষাগৃহ মানে ছয়টি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এর চারটিই এখন নেই। ‘সত্যবতী’ ও ‘রূপকথা’র ভবিষ্যতও অনিশ্চিত। আর কতো? সেই ২০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয়েছে। দেশের এক হাজার তিনশো প্রেক্ষাগৃহের জায়গায় এখন আছে মাত্র দুইশো ৭৪টি। ২৫ জেলা বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহশূন্য। যেগুলো আছে, সেগুলোও চরম লোকসানের কবলে। অথচ একসময় এর সঙ্গে যেমন জড়িত ছিলো ব্যবসা, মোহ; তেমনই ক্ষমতা, আভিজাত্য। প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষদের লোকে আগে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতো। তাদেরকে মূল্যায়ন করতো সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে। আজ এর কোনোটাই নেই। মোহ টিকে থাকলেও ভেঙে পড়েছে ব্যবসা ও আভিজাত্য। সমাজে তাদের সম্পর্কে তৈরি হয়েছে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এসবের একটাই কারণ; প্রেক্ষাগৃহে দর্শকশূন্যতা। এই দর্শকশূন্যতা কাটিয়ে উঠতে এখন আর শুধু মোহ দিয়ে কাজ হবে না, এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে, বাঁচাতে হবে দেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে। প্রেক্ষাগৃহকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চলচ্চিত্রশিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নের বিকল্প নেই।

 

লেখক : শাকিল আহাম্মেদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

shakilmcj26@gmail.com

 

 

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. ‘সিনেমা হলশূন্য ২৫ জেলা’; বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮।

২. চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমবিষয়ক পত্রিকা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র কলাভবনের ১২৩ নম্বর কক্ষে ‘৭৫-এ হায়দার রিজভী’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেই আয়োজনে ‘চলচ্চিত্র ও আমার জীবন’ শীর্ষক বক্তৃতায় চলচ্চিত্রশিক্ষক ও নির্মাতা হায়দার রিজভী একথা বলেন। লেখকের কাছে সেই বক্তৃতার রেকর্ডিং সংরক্ষিত আছে।

৩. ‘সিনেমা হলশূন্য ২৫ জেলা’; বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন