মানস চৌধুরী
প্রকাশিত ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং অতঃপর
'আমি দেখি নেক্সাসগুলো, কে কার সঙ্গে আঁতাত করেছে'
মানস চৌধুরী

১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ৫০ বছরের বেশি সময়েও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। সরকার পরিবর্তন তথা ক্ষমতার পালাবদলের সময় এটা ভালোভাবেই টের পাওয়া যায়। টানা ১৭ বছরের শাসন শেষে ২০২৪-এ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে; সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। এই ঘটনাকে কেউ গণঅভ্যুত্থান বলছে, কেউ বলছে বিপ্লব। অনেকে `দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবেও অভিহিত করছে। যে পরিভাষাই ব্যবহার করা হোক না কেনো, এটা ইতিহাসের অভূতপূর্ব ঘটনা।
তবে কেউ কেউ জুলাই ২০২৪ দিয়ে ’৭১-কে ‘রিপ্লেস’ও করতে চায়। কেউ এই ঘটনাকে বলে মেটিকুলাস ডিজাইন। এ ঘটনার মাস্টারমাইন্ড নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে।
’৭১-এ প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আর ’২৪-এ প্রতিপক্ষ জনগণের ‘নির্বাচিত সরকার’, যারা পরে ভোটের অধিকার হরণ করেছে; ক্রমেই হয়ে উঠেছে কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিবাদী। ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যাপ্তিকাল ও হতাহতের সঙ্গে ’২৪-এর তুলনা চলে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে মিল তো আছেই—গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব আর কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতা চলছে। ’৭১-এর পুরো কৃতিত্ব দখলে নিতে চেয়েছে আওয়ামী লীগ। যার পরিণতিতে জনযুদ্ধ পরিণত হয়েছে মধ্যবিত্তের রোমান্টিক যুদ্ধে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলো শিক্ষার্থীরা। বামপন্থি, মধ্যপন্থি, ডানপন্থি সব দলই আন্দোলনে মাঠে নেমেছে। তাদের মধ্যে ঐক্য হয়েছে সরকার পতনের এক দফায়। বিজয়ের পর স্বাভাবিকভাবে সেই ঐক্য আর থাকেনি। বরং রাজনৈতিক পুঁজির দখলে এর কৃতিত্ব নিয়ে লড়াই শুরু হয়েছে। সামনে হয়তো তা আরো তীব্রতর হবে। এসব বিষয় নিয়েই কথা হয়েছে মানস চৌধুরীর সঙ্গে।
মানস চৌধুরীর নানা পরিচয়। নৃবিজ্ঞানী; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে পড়ান। বিদ্যাজগতে মূলত বাংলা মাধ্যমে লেখালেখি করেছেন। আর পাশাপাশি নানাবিধ অবিদ্যাগত ফোরামেও রয়েছে তার লেখালেখি। নানা শাস্ত্রে পড়িয়েছেন তিনি—আলোকচিত্র, গণমাধ্যম অধ্যয়ন, সাহিত্য, স্থাপত্য ইত্যাদি। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যস্ত থেকেছেন নানা ধরনের পাঠচক্র ও সংঘে; ছাত্রজীবনে প্রচলিত রাজনীতিতেও ছিলেন। একটা পর্যায়ে কথাসাহিত্যে কাজ করার আগ্রহ নিয়ে বেশকিছু ছোটোগল্পও লিখেছেন। তবে গল্পকার হিসেবে পরিচয়ের তুলনায় বক্তা হিসেবে তিনি অধিক পরিচিত।
মানস চৌধুরীর সঙ্গে আলাপের অন্যতম কারণ তিনি ‘বৃত্তের বাইরে’ থেকেও দেখতে আগ্রহী এবং সেটা তিনি পারেনও। ডমিন্যান্ট ও পপুলার ভাষ্যের বাইরে কথা বলতে যে সাহস ও সততা প্রয়োজন হয়, সেটাও তার আছে।
‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর পক্ষ থেকে মানস চৌধুরীর সঙ্গে গত ১০ সেপ্টেম্বর ও ২০ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে আলোচনায় অংশ নেন জাহাঙ্গীর আলম। চলতি সংখ্যায় এই আলোচনার প্রথম কিস্তি প্রকাশ করা হলো। দীর্ঘ এই আলোচনাটি পরবর্তী সময়ে বই আকারে প্রকাশ করা হবে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হলো—হিংসা, হানাহানির রাজনীতির পরিবর্তন হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসবে। এক বছর পর অনেকেরই সেই আশা ভঙ্গ হয়েছে। অভ্যুত্থানের বছরপূর্তিতে সংবাদপত্রের কলামে, টেলিভিশন টকশোগুলোতে তার প্রতিফলনও ছিলো। তাহলে এই ধরনের পরিস্থিতি কি অনিবার্য ছিলো? আপনি নিজে কেমন আশা করছিলেন; আপনার আশা ভঙ্গের মাত্রাই বা কেমন?
মানস চৌধুরী : আচ্ছা, ফরমালি আপনাকে ধন্যবাদ। প্রথম বিষয় হচ্ছে, আমার রাজনীতির পারসেশন কী? কোন লেন্স থেকে দেখি? আমি অন্য কলিগদের কথা জানি না, কলিগ ব্যাপক অর্থে বোঝাচ্ছি। তারা নৃবিজ্ঞানের হতে পারেন, অন্য শাস্ত্রেরও হতে পারেন। সাংবাদিক হতে পারেন, সতীর্থ হতে পারেন। আপনি যা বলছিলেন, আমি প্রস্তাবনা একটু বদলে নিই। অনেকে আশাবাদ ব্যক্ত করছিলেন, নতুন কিছু হবে। আমি কেনো বদলে নিতে বলছি—যে যে-ধরনের আশা আমরা করতে চেয়েছিলাম, তাই-ই করেছি। কিন্তু অনেকে আবার ভীষণ ভয়ার্ত বা বাংলায় বলবো সংশয়ী ছিলেন। কী হতে যাচ্ছে? যে স্থিতাবস্থা ছিলো বলে তারা ভাবছিলেন, সেই স্থিতাবস্থাটা বিনষ্ট হবে কিনা? আওয়ামী লীগ সরে যাওয়াতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে কিনা? এই ধরনের সংশয়-সঙ্কটের লোকজন যে আমরা চিনতাম না, তা তো নয়! তারাও মধ্যবিত্ত। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আর যদি কেউ পেশা, বর্গ ধরে বলে—মাস্টারদের মধ্যে অমুক জিনিসটা বেশি ছিলো, ডাক্তারদের মধ্যে তমুকটা বেশি ছিলো—এ রকম হয়তো বলা যায়। মানে আমি বলতে চাচ্ছি—ধরুন, শিক্ষক থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পেশাজীবীদের কথা যদি বলি—সাংবাদিক বলুন, অভিনেতা বলুন, যাদেরকে মধ্যবিত্ত অঙ্গনে হোয়াইট কালার পেশাজীবী হিসেবে দেখি, তাদের ভেতরে আশাবাদ যদি লক্ষ করে থাকেন বা থাকি, তাহলে তাদের ভেতরে আতঙ্ক, শঙ্কা, নতুন কিছুর প্রতি—নতুন কিছুতে কী পরিণতি হবে তার অনিশ্চয়তা যথেষ্ট ছিলো। এবং কী কী ধরনের পরিবেশ অটুট থাকবে। কী কী ধরনের পরিবেশ বিনষ্ট হবে। নতুন পরিবেশ কি তার জীবনে বাধা সৃষ্টি করবে?
এই ধরনের আশঙ্কাগুলো আমার ধারণা আপনারা সবাই পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফলে ওইখানে আমি একটু থাকতে চাইলাম—মানুষজন আশা করেছে, কিন্তু তাদের ভেতরে ভিন্নতা ছিলো। একপক্ষ একেবারেই সিঁটকে বসেছিলো। আমি যদি একটু নির্দয়ভাবে সমালোচনা করি, তাহলে এভাবে বলতে পারি—ধরুন, অন্য কিছু বাদ দেন, মধ্যবিত্ত জীবনে না ঢুকে, যারা বহু বছর ধরে ভ্যানগার্ড পলিটিক্স করে এসেছেন, সংখ্যায় তারা যতোজনই হন না কেনো—আমি খানিকটা দুষ্টুমি করে তোপখানা বাম বলি—তাতে বুঝতে সুবিধা হয়। যদি খেয়াল করে দেখেন, গত ১৩ মাসে তাদের কোনো কার্যকরী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, কর্মকাণ্ড, তৎপরতা, মিটিং, মিছিল নেই। নবীন প্রজন্মের অনেকেই আছেন বটে, আপনি নামগুলো জানেন। কিন্তু পুরাতনদের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা নেই।
১৩ আগস্ট ২০২৪-এ জাসদ একটা কাজ করলো। তারা তাদের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারিকে বহিষ্কার করলো—ইনু সাহেব আর শিরীন আখতারকে। এই একটা কর্মকাণ্ড যা কিনা পাতে দেওয়ার মতো। আমার প্রসঙ্গটা কিন্তু কে কোন পক্ষে আছে তা নয়। আমি বলতে চাই, আপনারা এটাকে কীভাবে পাঠ করবেন? তার মানে এতোগুলো দিন যারা ভ্যানগার্ড পলিটিক্সের একটা প্রতিনিধি তারাও কী করবে বুঝতে পারছে না! এর কারণ কী? যে কিছুটা বুঝতে পারছে, সে কিছু করেছে, অন্তত শাহবাগে যাচ্ছে, অমুক জায়গায় যাচ্ছে, এটুকু করছে। এই যে এদের কোনো এক্সিবিশনাল প্রোগ্রামও নাই। প্রোগ্রামভিত্তিক কোনো চিন্তাভাবনাও নাই। তারা যদি এতে আতঙ্কিত নাও হন—বাংলায় যাকে বলে, তারা ভ্যাবদা মেরে গেছেন।
তাহলে আমি বলতে চাইলাম, আশাবাদী অংশ ছিলো মধ্যবিত্তের ভেতরে; আশঙ্কা বোধ করেছেন এমন অংশ ছিলো এবং ভ্যাবদা মেরে কী করণীয় বুঝতে পারছেন না—এমন অন্তত তিনটা অংশ আমিই দেখতে পেরেছি। এগুলোই আমি পরিষ্কার করে নিলাম।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ৫ আগস্টের এই পরিবর্তনকে গণঅভ্যুত্থান বলবেন নাকি অন্য কোনো পরিভাষা ব্যবহার করবেন?
মানস : অভ্যুত্থান বলতে কোনো সমস্যা দেখি না। আপনি ব্যাঙ থেকে ব্যাঙাচি আলাদা করতে পারেন। কিন্তু সামাজিক কনসেপ্টগুলোকে নামতার মতো বলা যায় না। যারা বিপ্লব বলছেন, তাদের কটাক্ষ না করে আমি একটা ভাষা ব্যবহার করি। অভ্যুত্থান অপেক্ষাকৃত জেনেরিক, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইংরেজিতে আপরাইজিং বললে, তার কাছাকাছি হয়। আমার বড়ো কোনো সংস্কার নেই। তবে সতর্কতা আছে। অন্যরা ভিন্ন কিছু বললে মুখ চেপে ধরার কারণ নেই।
আধুনিক রাষ্ট্রের রাজনীতিটা হয় প্রধানত চিহ্ন নিয়ে, ন্যারেটিভ নিয়ে। চিহ্ন, স্মারক, কে কোন তিলক ধারণ করে কালচারালের জন্য। এখানেই মূলত রাজনীতিটা হয়। এটা বলার মাধ্যমে আমি এই রাজনীতিটা পছন্দ করি, তা বলছি না। রাজনীতির সংঘর্ষটা ওখানে হতে থাকে সেটা বলছি। সম্ভবত অন্য কিছু মানুষজন, ধরা যাক আমি, আমরা তো আশা করতে থাকি, রাজনীতিটা হোক সমাজের সহায় সম্পদের পুনর্বণ্টন, পুনর্বন্দোবস্ত নিয়ে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এটাকে সাম্যের রাজনীতি বলা যাবে?
মানস : সাম্য যদি প্রোপাগান্ডিস্টও মনে হয়, অন্তত যে অনাচার চলছে, যে বেইনসাফ চলছে, তাতে যদি কিছু নিষ্পত্তি হয়, এই তো। সেটা শ্রমিক মজুরি থেকে শুরু করে অনেক লম্বা লিস্ট বলা যায়। মুশকিলটা হচ্ছে, চিহ্নের যে রাজনৈতিক তৎপরতাগুলো তা কিছুতেই সম্পদ ও অধিকারভিত্তিক যে রাজনীতি তার রাস্তাকে সহায়তা প্রদান করে না, বরং বাধা প্রদান করে। এভাবে বলার কারণে বেশ সরল মনে হলো। আমি জানি জিনিসটা সরল নয়। কিন্তু আমার বোঝাবুঝির জন্য বছরের পর বছর কাটাতে হয়েছে। এই ভাষাটা আমাকে কেউ সরবরাহ করেন নাই, মানে সামনে থেকে কেউ সেটা এভাবে বলে দেন নাই। এটা আমাকে যুগপৎ আনন্দিত করতে পারে এবং বিষণ্নও করে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এটাকেই কি আমরা প্রো-পিপল পলিটিক্স বা জনকল্যাণের রাজনীতি বলবো?
মানস : এটাতে রেটোরিকে পড়ে যাওয়ার ভয় আছে। বাংলাদেশে এখন যে নেতৃত্ব আছে, তারা তো গত এক বছরে সারাক্ষণ পিপল পিপল করছে। এতো লোক পিপল শব্দটা ব্যবহার করে, আমি সর্তক হয়ে গেছি, প্রো-পিপল আর বলার বিষয় আছে কিনা। এটা প্রো-পিপল হলে ঠিক আছে, প্রো-আল্লাহ হলেও আমার সমস্যা নেই।
আওয়ামী লীগের সম্পদ চুরি নিয়ে আলাপ; যদি চুরি হয়ে পাচারকৃত নাও থাকতো তাহলে সম্পদগুলো কুক্ষিগত থাকতো—ব্যাপারটা তো এই। এখন পর্যন্ত ডিসকোর্সের একটা বড়ো জায়গা হলো, সম্পদ পাচার হয়ে গেছে। তাহলে এইভাবে এই হারে অ্যাকুমুলেশন হচ্ছে কীভাবে? সম্পদ জোগাড়ের উপায় নিয়ে প্রশ্নটা তো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
চুরি যদি না হয়ে থাকে তাহলেও তো নৈতিকতার প্রশ্নটা জরুরি। গার্মেন্টের মজুরি ঠিক আছে? পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠিক আছে? সম্পূর্ণ ডিফারেন্ট সেট অব আলাপ আছে। সে আলাপটা যখন কিনা হয় জনসম্পদ, জনপদের মানুষের একটু নড়াচড়া, একটু মবিলিটি, একটু খোলা মনে হাসতে পারা, একটু অবসর থাকা, অবকাশ থাকা, বিশ্রাম নিতে পারা। এসব প্রসঙ্গ যখন আসবে, জীবন যাপনের প্রসঙ্গ যখন আসবে, এই রাজনীতির ব্যাকরণটা আমার বিবেচনায় কমপ্লিটলি আলাদা। এবং চিহ্নের রাজনীতির ব্যাকরণটা কমপ্লিটলি আলাদা। যতো বেশি চিহ্নের রাজনীতি বাড়তে থাকে, স্মারকের রাজনীতি বাড়তে থাকে, ওই রাজনীতি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এইখান থেকে যদি বলি, আমি আশা করেছি কীভাবে! আগস্টের ৩Ñ৪ তারিখ পর্যন্ত যাই ভাবি না কেনো, ৬-৭ তারিখে বুঝতে পেরেছি আমাদের বিজয়ীরা গার্মেন্টশ্রমিক নিয়ে চিন্তিত নন এবং কোনো শ্রমিক নিয়ে চিন্তিত নন। সেটা প্রমাণ হয়ে গেলো যখন তাদের মিছিলগুলোকে বলা হলো স্বৈরাচারের দোসর। এগুলো আগস্টেই ঘটলো কিন্তু! তার মানে দেখেন, আনসার আসছে যখন স্বৈরাচারের দোসর, পুলিশ কনস্টেবল যখন জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করছে, তখন স্বৈরাচারের দোসর। শ্রমিকেরা যখন বকেয়া মজুরির কথা বলছে, তখনো সে স্বৈরাচারের দোসর।
ওই যে মার্কা, তথা চিহ্ন, এই যে আমরা ট্যাগিং বলি এখন, এই চিহ্নের রাজনীতি যে প্রকট হয়ে সামনে আসলো, এটা দেখবার জন্য অন্য অনেক বন্ধুর মতো আমি মাসের পর মাস অপেক্ষা করিনি। এটা বোঝা আমার জন্য দুই-তিন দিনের ব্যাপার ছিলো। এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন—যেমন আজ সকালেও একজন জানতে চাচ্ছিলেন, আমি এ রকম শান্ত আছি কীভাবে? যারা ধরেন তিন, চার, পাঁচ, ছয় মাস ধরে আশা করছেন, কিন্তু পূরণ হচ্ছে না তাদের তুলনায় আমি তো শান্ত থাকবই। আমি জীবনে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত গতিতে—ঠিক সিদ্ধান্ত বলবো না—চিন্তার ফ্রেমওয়ার্ক, পরিকাঠামো বা দেখার চশমাটা পাই। ৫ আগস্টে শেখ মুজিবের বাড়ি বা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা পর্যন্ত ভাবতে পারেন যে, ইংরেজিতে বলে ইন দ্য ফ্লো বা গতির চোটে হয়ে গেছে। যখন সেটা ৬ তারিখে হয়, ৭-এ হয়, ৮-এ হয়, এবং প্রতিনিধিত্বশীল কণ্ঠস্বর বলছে না ‘খামোশ, এখন না’, যখন এই স্বর নেতাদের কাছ থেকে শুনছি না, তখন প্রস্তুত হবো না কেন! আমি নেতা বলছি, মানে আমি কিন্তু খুব স্পষ্ট করে মিন করছি নেতা। যারা আগস্টে নেতৃত্ব দিলেন তারা তো নেতাই। তাদের বয়স নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি কমবেশি কিছু নিয়ে বিচলিত হই না। সেই যে সকালে একজন ব্যাখ্যা চাইলেন, উনি যে ঘটনা উল্লেখ করলেন, তারপরও আমার মুখে হাসি আছে কীভাবে? কারণ, আমি সবকিছুর জন্য তৈরি থাকি। সেটা হয়তো আমার প্রজ্ঞা।
ওই যে [৫ আগস্ট] বারোটার সময় ওয়াকার সাহেব আসলেন সেখান থেকে সবটা বিশ্লেষণের সুযোগ আছে। আমি এভাবে অ্যানালিসিস করবো। দফায় দফায় বিভিন্ন বর্গ, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ধরনে তাদের আশা ভঙ্গ হয়েছে। সেক্যুলার, প্রগতিশীলদের একভাবে হয়েছে, নগরের অতো পলিটিকাল পার্টি কেয়ার করে না যারা, তাদের আশাও ভঙ্গ হয়েছে। শ্রমিকদের আশা প্রথম ভঙ্গ হয়েছে—এগুলো খেয়াল করার দরকার আছে।
ফলে বিভিন্ন বর্গ—আমি বর্গ বলতে শুধু পার্টি বোঝাচ্ছি না—পার্টি নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিলো না। সমাজে যে বর্গগুলোর নানা দফায়, নানা সমস্যায় আশা ভঙ্গ হয়েছে। এটা বলাও অত্যুক্তি হবে না যে আমি তো মনে করি এনসিপিরও বিভিন্ন সময় আশা ভঙ্গ হয়েছে। এরকমভাবে ম্যাজিকের মতো সমাজ চলে না! গত আগস্টের অগ্নিস্ফুরণ তো আর পরের বছর এপ্রিলে গিয়ে পাচ্ছেন না। সমাজের কতোগুলো জিনিস আছে ক্ষয়ে যায়, কিছু রয়ে যায়, অনেক কিছু বদল হয়ে যায়। এটা তো ঘটতে থাকে। ঘটমান প্রবণতা। বরং এভাবে বলবো, আমি সতর্ক হয়েছি। আশা শব্দটা আমার জন্য প্রযোজ্য নয়।
আমি সতর্ক হয়েছি, ওয়াকার সাহেব যখন বক্তৃতাতে ফাম্বল করেছেন, তখনই। তবে সেটাও হয়তো বিষয় না। সেনাবাহিনীর প্রধানকে ভালো বক্তা হতে হবে তা নয়। সকাল থেকে তার কষ্টটা ভাবেন, মানে পেরেশানিটা! আমি মনে করি, উনি সাকসেসফুলি দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি কটাক্ষ ছাড়াই বলছি। একজন সেনাপ্রধান হিসেবে, ওই মুহূর্তের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানকে নিরাপত্তা প্রদানের ইচ্ছা হিসেবে বিবেচনা করলাম। কারণ এগুলো খুবই কমপ্লিকেটেড জায়গা—রাষ্ট্র কিংবা সরকার প্রধানকে এ রকম একটা উত্তুঙ্গ সময়ে হেফাজতে সজীবন বের করে দিতে পেরেছেন; তাকে পার করে দিতে পেরেছেন; আমি কিন্তু গিভেন দ্য কনটেক্স এই কাজটাকে সেনাপ্রধানের সাফল্য হিসেবে দেখি। কেনো দেখি? রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আমার কোনো নীতি-নৈতিকতা নেই। তার মানে এই না যে, প্রত্যেক সরকারের দ্বারা আরেক সরকারকে খুন করা একটা সলিউশন। ফলে ওই দিনকার যে পর্ব, সেখানে তিনি ঠান্ডা মাথায় তার নিয়োগদাতাকে সরিয়ে দিতে পেরেছেন। এখানে দুটো জিনিস—একটা সরকার বা রাষ্ট্র প্রধান, আর তার নিয়োগদাতা। তাকে উনি সেফলি বের করে দিতে পেরেছেন। এটা তার পেশাগত সাফল্য হিসেবে দেখছি। সেটুকু তো ঠিক আছে। ঠিক নেই যেটা, সেটা হলো তরুণ নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে বিকেলের আগেই সেনাবাহিনীকে ক্লিনচিট দিয়ে দেওয়া।
বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা অভ্যুত্থান হলো, এটার নাম যে যাই দিক না কেনো, ৯০-এর পরে উদাহরণ দিতে পারি, এমন অভ্যুত্থান হয়নি। অভ্যুত্থান হলো, আর সেনাবাহিনী আমাদের গণতন্ত্রের বন্ধু—এই পজিশনটা প্রতারণামূলক ছিলো। এটা গাদ্দারি ছিলো। এটা বিশ্বাসঘাতকতা ছিলো। এখন এই বিশ্বাসঘাতকতা কার সঙ্গে করেছে? বলতে চাইলে আমি বলতে পারি জনগণের সঙ্গে বেইমানি হয়েছে। আবার জনগণই বা কোথায়? এক জনগণ চেয়েছে বেতন; আরেক জনগণ টিভিতে দেখছে যে এর থেকে খারাপ কিছু হচ্ছে কিনা—এই তো! ফলে আমি ওই রেটোরিকে যাবো না যে, জনগণের সঙ্গে বেইমানি হয়েছে। আমি শুধু বলেছি, কনসেপচুয়াল যে ফ্রেমওয়ার্কটা—একটা রাষ্ট্র ও তার সরকার কীভাবে দিনের পর দিন নিপীড়নমূলক হয়ে উঠেছে। তাহলে পরের প্রশ্নটা আসে, এই নিপীড়নের একটা ধরন যদি হয় সামাজিক এক্সপ্রেশন নিয়ন্ত্রণ, ভাষা নিয়ন্ত্রণ, গলা চেপে ধরা; আরেকটা পদ্ধতি হচ্ছে, জনগণের সম্পত্তি আত্মসাৎ করা। আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আত্মসাৎ করে দেশের বাইরে যাওয়া। আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আত্মসাতের জন্য সাধারণ ইকোনোমিক্সের মুনাফা অবলম্বন করা হয় নাই; চৌর্যবৃত্তি করা হয়েছে। তাহলে আরেকটা বাস্তবতা হচ্ছে, এই ধরনের একটা কাজ করার জন্য রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনী একত্রে কাজ করেছে, নেক্সাস তৈরি হয়েছে।
এখন বাহিনী বলার মাধ্যমে আমি সব পুলিশ, মিলিটারিকে দায়ী করতে চাই না। আপনি কি সব মাস্টারকে বিশ্ববিদ্যালয় পতনের জন্য দায়ী করবেন? পয়েন্ট তো সেটা না। সিস্টেম যখন বলছে, কয়েকজন করাপ্ট পুলিশ, হাই অফিসিয়াল মিলিটারি, হাই অফিসিয়াল বণিক-করপোরেট—এদের নেক্সাস ছাড়া এটা ঘটবে না। আমি শুধু আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগ বলে মাতম বা টার্গেট করার লোক না। আমি দেখি নেক্সাসগুলো, কে কার সঙ্গে আঁতাত করেছে। সেই আঁতাতে সিভিল হেডকোয়ার্টার থাকা সম্ভব, আমলা হেডকোয়ার্টার থাকা সম্ভব, পলিটিকাল পার্টির হেডকোয়ার্টার থাকা সম্ভব, বণিকদের হেডকোয়ার্টার থাকা সম্ভব, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টার এবং সেনা হেডকোয়ার্টার থাকা সম্ভব। কিন্তু তরুণেরা বললেন, এরা আমাদের বন্ধু হিসেবে আছেন। এটাই প্রতারণা। প্রতারণা কাকে করা হয়েছে?
আমি যা রাজনীতি বুঝি, আমার প্রজ্ঞার সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। আমি হতাশ হইনি, আমি এমন সেয়ানা; এমন যে হবে তা ধারণা করেছি। কিন্তু আমার সেয়ানাত্মক ধরন আমার বেদনাকে রিপ্লেস করে না। আমার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তো রিপ্লেস করে না। আমি সেয়ানা, এটার জন্য তৈরি ছিলাম। তার মানে আমার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কমে গেছে, তা নয়। আমি সতর্ক হয়েছি ৫ তারিখে যখন যুবক নেতৃবৃন্দের বিষয়ে—আমি যুবক বলার মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্বকে বোঝাচ্ছি—যাদের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান হয়েছে। শেখ হাসিনা যাকে মেটিকুলাস ডিজাইন বলেছেন। আর শেখ হাসিনারই বা কী দোষ দেবো; আমাদের প্রধান উপদেষ্টাও তো মেটিকুলাস ডিজাইন বলে খাটো করেছেন। এতো বড়ো জনসমুদ্র মেটিকুলাস হওয়া সম্ভব না। আমরা যারা রাস্তাঘাটে ছিলাম, ক্যাম্পাস সামলিয়েছি, তারা জানি ডিজাইন করে এটা করা যায় না। সারাংশটা হলো, দফায় দফায় যে যার প্রজ্ঞা অনুযায়ী আশা-নিরাশার কথা বলছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের আন্দোলনের পর কোটা তুলে দেওয়া হলো। আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে সরকার আবার কোটা ফিরিয়ে আনলো। এর প্রতিবাদে জুলাই থেকে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হলো। কখন আপনার মনে হলো, এটা বড়ো কিছু হতে পারে? সরকার পতনের মতো ঘটনা ঘটতে পারে?
মানস : এটা যে সরকার পতনের দিকে যেতে পারে তা দুই-তিনটা লক্ষণে মনে হয়েছে। প্রথম মনে হয়েছে, পুলিশ যখন রাতে রেইড দিতে শুরু করেছে। সেটা শুরু হয় ১৮ Ñ১৯ তারিখে [জুলাই]। ঢাকার বিভিন্ন ব্লকে রেইড দিয়ে দিয়ে ছাত্রাবাস থেকে শিক্ষার্থী তুলতে শুরু করলো, ওইটা আমার কাছে বড়ো সিগনাল মনে হয়েছে। মনে হয়েছে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এটা বেখাপ্পা পদ্ধতি। আপনাদের মনে পড়তে পারে, সে ভরসায় বলছি, আর একটু পরে ২৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ দেখা করতে গেছেন। দেখা করতে গেছেন এটা বলতে যে, ওনারা বিভিন্ন ক্যাম্পাসে নিগৃহীত হচ্ছেন, নিরাপত্তা নেই। এটা তারা বলছেন ২৮ জুলাই দেখা করে; তাহলে তাদের এই নিগ্রহের অভিজ্ঞতা ঘটছে ২২ Ñ২৩ জুলাই থেকে। ২২ Ñ২৩ জুলাই থেকেই বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ মানে এই গুন্ডা বাহিনী অশান্তিতে পড়তে শুরু করলো। এগ্জ্যাক্ট মনে নেই, তারা ইডেন ছাড়লো সম্ভবত ২৪ Ñ২৫ জুলাই। নিরাপত্তাহীনতার কারণে হল ছেড়ে দিলো। যে দেখতে শিখেছে, সে এটাকেও লক্ষণ হিসেবে নিয়েছে। এটা তো একটা সিগনিফিকেন্ট সাইন। আপনি দেখেন, মানুষ ভিটা ছাড়ে কখন? বন্যা আসে তবুও গরুটা ধরে বসে থাকে, তাই না? মানুষ কোন জিনিসটা ছাড়তে চায় না? তারা এতোদিন একেকটা ক্যাম্পাসে রাজত্ব তৈরি করেছে, এখন কোনো না কোনো আশঙ্কায় তা ছাড়তে হচ্ছে। এই যে ২২ Ñ২৪ জুলাই থেকে বিল্ডআপ হচ্ছে, পুলিশ রেইড দিচ্ছে, আরেক দিকে ছাত্রলীগ তাদের স্ট্রংহোল্ডের জায়গাগুলো ছাড়তে শুরু করছে। এটা থেকে কেউ যদি নোট না নেয়, তাহলে তো খুব মুশকিল।
শেষ যেটা ভালোভাবে বোঝা গেলো, ২ আগস্ট সেনাবাহিনীর গুপ্ত বৈঠকে! সেনাবাহিনীর কোনো গুপ্ত বৈঠক যখন ফেইসবুকে কপি করে করে সবাই পড়ে, তখন এর থেকে মিনিমাম দুটো জিনিস বুঝতে হবে। এক, ‘গুপ্ত’ বৈঠকটা সেনাবাহিনী গুপ্ত রাখতে চায়নি বলেই আপনারা জানেন। আরেকটা হলো, সেনাবাহিনী এটা আপনাকে জানানোর চাইতেও ভাসুরকে জানাতে চেয়েছে। যার যা আক্কেল! গ্রাম দেশের একটা কথা আছে, ‘বোঝোস না তো কিছু, বিচিরে কস লিচু’। এটা ছোটোবেলায় খুব অরুচিকর লাগতো। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয়, এই অরুচিটা সংস্কার ছিলো, এটার যে পাওয়ার তা ভোলার নয়। আমি মাস্টারি করি, আমি বড়োজোর এনালিস্ট। আমাদের অনেক বন্ধু টিভি-টকশোতে বসে প্রায় পলিটিশিয়ানের মতো ভঙ্গি করে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না পরিশেষে আমি মাস্টারি করি, সাংবাদিকতা করি। আমরা পলিটিশিয়ানদের বিকল্প না। এখন পলিটিক্স যিনি করেন, তিনি তো এগুলো খেয়াল করবেন। তার তো এটা কর্তব্য।
আমি অন্তত তিনটা সাইন পেয়েছি—এক, বিভিন্ন আবাসিকে পুলিশ রেইড দিচ্ছে; দুই, ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ছেড়ে যাচ্ছে; এবং তিন, সেনাবাহিনীর ‘গুপ্ত’ মিটিং ফেইসবুকের পাতায় পাতায় পড়া যাচ্ছে। তারা প্রকাশ্যে বলে দিলো, সমস্যা বাড়ার জন্য দায়ী পুলিশ। এইটা থেকে না বোঝার কি আছে? মিলিটারি তার দায়মোচনের একটা স্কেপ রুট চাচ্ছে।
আমি যেভাবে রাজনীতি বুঝি—একদম পরিষ্কার আমি বুঝে গেছিলাম, আন্দোলনকারীরা কখন কোন দফা দেবেন সেটা তাদের হিসাব, কিন্তু শেখ হাসিনা রেজিমের জন্য সময় টাইট হয়ে যাচ্ছে।
পার্টি প্রেসিডেন্ট যখন নির্দয়, রুথলেস, ঘৃণা করে কথা বলেন, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলেন, তখন অন্তত একজন সেক্রেটারি থাকেন, যিনি কিনা টোন ডাউন করেন। যেমন আশরাফ সাহেব ছিলেন। অনেকে তার বদনাম করেন। কিন্তু তার সুনাম পার্টির বাইরেও ছিলো। বিএনপি ও অন্য পার্টির লোকজন তাকে সম্মান করতেন। হানিফ সাহেবও একজন রানার বা দাবিদার ছিলেন। খেয়াল করে দেখেন, আওয়ামী লীগের শেষ কয়েক বছর কেটেছে—প্রধানমন্ত্রী তো লাগাম ছাড়া বটেই—একে গালি দিচ্ছেন, ওকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন, সেক্রেটারিও একই কাজ করছেন। সেক্রেটারি পদটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেক্রেটারি তো পি আর ম্যানেজমেন্ট করেন। খেয়াল করে দেখেন, পার্টির প্রধানের লিডারের যখন পি আর ভালো না, তখন সেক্রেটারির পি আর-এ চলে। আশরাফ সাহেবের পি আর-এ প্রতিপক্ষ সামলানোর দারুণ গুণ ছিলো। আপনি ভাবেন, মির্জা ফখরুল সাহেব আপনাকে এড্রেস করছেন, চলুন কথা বলি। আপনি অন্য পার্টি করেন, তাহলে কী করবেন?
এটাও একটা সাইকোঅ্যানালিসিস হতে পারে, শেষ ৩Ñ৪ বছর আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই পদে ছিলেন দুজন নিষ্ঠুর নেতা, যারা কেবল অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। এটা কিন্তু ডেডলি ডেঞ্জারাস যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য। এটা এমন না যে, এটা থেকেই সরকার পতনের বিষয় বুঝতে শুরু করেছি।
আমি মনে করি, যেহেতু একবারও শেখ হাসিনার নম্র স্বর শুনি নাই—নম্র স্বর হলে কী ঘটতো বলা মুশকিল। আমার মনে হয়, ২৯Ñ৩০ জুলাই পর্যন্ত শেখ হাসিনা বা তার সেক্রেটারি নম্র স্বর দেখাতেন, তাহলে শেষের তিন দিনের এস্কেলেশন হতো না। এটা জাস্ট হাইপোথিসিস।
ম্যাজিক লণ্ঠন : জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হলো। এজন্য কাকে কৃতিত্ব দেবেন? এই আন্দোলনের নেতৃত্বের দাবিদার কারা? একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর এর নেতৃত্ব নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, পক্ষ-বিপক্ষের শক্তি নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও কি একই ঘটনা ঘটবে?
মানস : বিষয়টা ইন্টারেস্টিং! রাজনীতির একটা আলাপ করলাম—চিহ্ন আর ন্যারেটিভ সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। এর মধ্যকার অন্য একটা জায়গা ক্যারিশমা—রাজনীতিতে ক্যারিশমার গুরুত্ব কী? আমার ধারণা, যদিও এটা খুবই বুর্জোয়া অ্যানালিসিস হবে, তবে আমরা এমন একটা সমাজে বসবাস করি সেখানে বুর্জোয়া অ্যানালিসিস নিয়ে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। এটা তো একটু আগে যে আলাপটা করলাম, একজন আশরাফ সাহেব, আর একজন কাদের সাহেব, একজন হানিফ সাহেব কী সিগনিফিকেন্ট পার্থক্য আনতে পারেন সেদিক থেকে। ওই ব্যক্তিত্বসমূহের পার্থক্য কী ধরনের কনসিকোয়েন্স বহন করে? সেই ক্ষেত্রে আমি বলবো, আগস্ট মাসের যে দায়িত্বগুলো বিজয়ী অংশের ছিলো, সেই দায়িত্বগুলো হিস্টোরিকালি নিতে হতো, মানে আমি যা দায়িত্ব হিসেবে দেখি, তারা তা নেন নাই। প্রথম দায়িত্ব ছিলো সংযম। ভাষায় সংযম। যারা ধার্মিক তারা আরো ভালো জানেন। ধর্মে খুবই আলাদা করে বলা হয়েছে, বিজয়ীর সংযম বিষয়ে। বিজয়ের দাম্ভিকতা খুব সমস্যা তৈরি করে। আমি ধার্মিক লোক না, তাও শিক্ষাটা জানি বলে বলছি।
এখন পয়েন্ট হলো, প্রথম দরকার ছিলো বিজয়ী অংশের সব বর্গের জন্য সহিষ্ণু ভাষা। তারা কিন্তু এক Ñদুইবার ওইটা মুখস্তের মতো বলেছিলেন বটে যে সবাইকে হেফাজত দেওয়া হবে, তাদের কর্মকাণ্ডে এর বিন্দুমাত্র নজির ছিলো না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : মাহফুজ আলমের বক্তৃতায় বিষয়টা এসেছে। তিনি রিকনসিলেশন-এর কথা বলেছিলেন।
মানস : প্রসঙ্গ আসলো যেহেতু, মাহফুজ আলম সাহেবকে প্রথম তো মাস্টারমাইন্ড হিসেবে জানি না। প্রথম জেনেছি একজন স্কলার হিসেবে। মাস্টারমাইন্ডের প্রতি আমার আলাদা করে কোনো বিদ্বেষ নেই, মুগ্ধতাও নেই। এই ধরনের তত্ত্বের প্রতি আমার আসলে আস্থাই নেই। জনস্রোত এভাবে তৈরি করা যায় না। কিন্তু পয়েন্ট সেটা না। পয়েন্ট হচ্ছে, যখন তিনি বক্তৃতা দিলেন, সম্ভবত ১৮Ñ১৯ আগস্ট, প্রথমবারের মতো পাবলিক বক্তৃতা। ওখানে তিনি বলেছিলেন, ওনার বক্তৃতার কনটেন্ট ধরে যেনো লোকজন ক্রিটিক করে। যেহেতু সেটা খোলা বক্তৃতা এবং একটা লোক আত্মপ্রকাশ করছেন, লোকটা যেকোনো লোক না! সদ্য হওয়া অভ্যুত্থানের অন্যতম কারিগর, অন্যতম তাত্ত্বিক নেতা, সংগঠক। ফলে সেই সম্বন্ধ থেকেই উনি যেহেতু ক্রিটিক চেয়েছেন, আমি ক্রিটিক করেছি। আমার দুটো ক্রিটিকের কথা মনে আছে। একটা ক্রিটিক করেছি, ওই যে ৫ তারিখে সেনাবাহিনীকে ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হলো সেটা ঠিক হয়নি। আরেকটা ক্রিটিক করেছি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যে অজস্র ফেইসবুক পাতা আছে, এখন সময় এসেছে এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনার। উনি উত্তর করেছেন; আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
পয়েন্টটা কী ছিলো? খেয়াল করে দেখেন, সেনাবাহিনীকে তো ছাড়পত্র দিয়েই দিয়েছেন। দ্বিতীয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের পরিচালক। এতে কোনো সন্দেহ নেই তো? প্রধান উপদেষ্টা ফ্রান্স থেকে আসুন, কিংবা অ্যান্টার্কটিকা থেকেই আসুন না কেনো! বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা চালাচ্ছেন দেশটা। তারা তখন কিনা পাঁচÑসাতটা ফেইসবুক আইডিতে যার যা ইচ্ছা করছেন—দ্যাট ওয়াজ দ্য টাইম সেগুলো গ্রিপে নিয়ে আসার। আপনি বলেন, ‘এটাই আমাদের প্রধান পাতা।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পেইজগুলোতে তখন সমানে গালাগালি, ‘মাইরা ফেলাইমু, কাইটা ফেলাইমু’ চলতেছে! এর অন্য মানে কী দাঁড়ায়? আমার জন্য কী অর্থ? আমার জন্য অর্থ এই নয় যে, মাহফুজ সাহেব আমার কথা শোনেননি। আমি এমন কেউ নই যে আমার কথা শুনতে হবে। কিন্তু যে পয়েন্টটা আমি বলেছিলাম, সেই পয়েন্টটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। যদি আপনি একটা কণ্ঠস্বরকে তখন রেসপন্সিবল কণ্ঠস্বর বানাতে চান, তাহলে আপনাকে অবশ্যই বলতে হবে, ‘আমি জাহাঙ্গীর [সাক্ষাৎকারগ্রহীতাকে উদ্দেশ করে], কিন্তু নীল জামা পরে যে আছে, সে আরেকজন, সে কিন্তু জাহাঙ্গীর না।’ এইটাই সেই সময় যেখানে ১৭ রকমের লোক ১,৭১৭ রকমের গোবর নিয়ে এসে মাখামাখি শুরু করেছে। তাহলে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ, তৃতীয় সপ্তাহ, চতুর্থ সপ্তাহ; সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ, দ্বিতীয় সপ্তাহ এটা ছিলো ফর্মিং কাল। স্টার্টিং ফ্রম স্ক্র্যাচ, তাই তো? এই যে শূন্য অবস্থা থেকে শুরু করার যে দায়িত্বটা ছিলো, ওইখানেই আমি বলছিলাম সংযমী নেতৃত্ব জরুরি ছিলো।
বাড়তি বলতে হচ্ছে, ছাত্র নেতৃত্বের বয়স নিয়ে লোকজনের আলাপ চালু আছে। পলিটিক্সে বয়স করে আসতে হয় এরকম ধরনের কথাবার্তা চালু আছে। এই বাজে থিসিস আমার কাছে নাই। এতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। বুর্জোয়া গণতন্ত্র আসার আগে বহু সম্রাটের বয়স ছিলো ১৪Ñ১৫ বছর। তারা কীভাবে চালাতে পারতেন? কারণ রাষ্ট্র বা রাজ্য চলে পরিশেষে একটা নিউক্লিয়াস দিয়ে। একটা লোক কেবল সামনে থাকেন। চলে তো একটা নিউক্লিয়াস দিয়ে। তাই না? সেই নিউক্লিয়াসটা যদি ফাংশন করে, একটু প্রজ্ঞাবান হয়, একটু অন্যের প্রতি মমতা, একটু প্রতীতি, যেকোনো এক্সপ্রেশনের প্রতি সহিষ্ণু এবং যেকোনো গালাগালকে অন্তত আপৎকাল পর্যন্ত, ফর দ্য টাইম বিইং নিষিদ্ধ করে; এবং সবার কথা শোনার ফোরাম তৈরি করে, ইত্যাদি। এইসব বলতে বোঝাচ্ছি পেশাজীবিতার প্রয়োজনীয়তা। আমি তো মনে করি, প্রথম দেড় মাস যদি প্রতিদিন দুইÑচার ঘণ্টা শ্লট করে করে বিবিধ বর্গের সাথে আলোচনা করা যেতো, ভালো হতো। এটা তো অনেকে রিড করতেই পারে নাই, হিন্দুরা হঠাৎ করে জড়ো হলো কেনো? কমনসেন্স ধরে এগিয়ে যান। বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক প্রবাহ ছিলো তাতে আগস্টের ৫ তারিখে বিভিন্ন প্রান্তের, বিভিন্ন বর্গের মনে হয়েছে, ‘হতে পারে এখন এমন একটা সময় যখন আমার সমস্যাগুলো কেউ শুনবে।’ এইভাবে তো দেখার সুযোগ আছে।
হিন্দুদের পেটে এ রকম ভাবনা ছিলো নাকি তারা আসলেই মোদির কাছ থেকে গোমূত্র খেয়ে এসেছিলো, সেটা নিয়ে পরে তদন্ত হতে পারে, বা পারতো। প্রশাসক হিসেবে প্রথম ভাববার সুযোগ আছে কিনা, আজকে সুইপাররা জড়ো হচ্ছেন, পাটকল শ্রমিকেরা জড়ো হচ্ছেন, রিকশাওয়ালারা জড়ো হচ্ছেন, পার্বত্যবাসীরা জড়ো হচ্ছেন। হতে পারে এই কারণে যে, বিগত সময়ে বাংলাদেশে কেউ কোথাও জড়ো হওয়ার সুযোগ পাননি। আমি তো মনে করি, সুইডেন-সুইজারল্যান্ড যাওয়ার চেয়ে উপদেষ্টাদের জন্য এটা জরুরি ছিলো। যেখান থেকে প্রসঙ্গটা আসছে যে, সংযম, ক্যারিশমা কেনো গুরুত্বপূর্ণ। ক্যারিশমা শব্দটা বেশি নায়কোচিত শোনায়। বলতে চাইলাম যে, ওই মুহূর্তে যারা দায়িত্বশীলÑইংরেজিতে যেটাকে বলা হয় পিপল-ইন-দ্য-চেয়ার—তারা কী ভাষায়, কী ভঙ্গিতে, কী নম্রতায় সিচুয়েশনটাকে এড্রেস করছেন তা লং টার্ম ঘটনাবলিকে প্রভাবিত করে।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আগস্টÑসেপ্টেম্বরÑঅক্টোবর সময়কালে যারা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তাদের বহু পরিচয়বর্গ পেশাজীবী এবং শ্রমিকদের প্রতি কনসিস্টেন্ট চিন্তাপ্রসূত শান্ত মমত্ব লক্ষ করা যায়নি। ‘দায় ও দরদ’ তারা সম্প্রচার করেছিলেন মাত্র, পালন করেননি। এবং সেটার কনসিকোয়েন্স খুব দ্রুত খারাপ হয়েছে। তাদের সামনে গালাগালি করে পার পাওয়া যাবে—এই ধরনের লক্ষণ দেখা গেছে খুব দ্রুতই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব ও কৃতিত্ব দাবির বিষয়ে জানতে চাই। আমরা দেখেছি, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সব কৃতিত্ব আওয়ামী লীগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের ন্যারেটিভের বাইরে গেলেই রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। বিএনপি দেখলো, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনীতির সব ফায়দা আওয়ামী লীগ তুলে নিচ্ছে। জিয়াউর রহমান জীবিত থাকার সময় স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি। তার মৃত্যুর পর বিএনপি ওই দাবি করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলেন শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে তারা রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। এর কৃতিত্ব দাবি করছেন। বিএনপির কয়েকজন নেতাও একই ধরনের দাবি করেছেন—এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমান। মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব নিয়ে যে রাজনীতি হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরেও কি একই রাজনীতি চলতে থাকবে?
মানস : সাম্প্রতিক বাংলাদেশের যে দশা, তাতে মনে হয় না এটা সরবে। কারণ রাজনীতিটার ভরকেন্দ্র কী তার ওপর নির্ভর করছে কী ধরনের প্রবণতা চলবে। আমি বলছিলাম, চিহ্ন-মার্কা যদি রাজনীতি হয়, তাহলে তো তাজ-মুকুটের প্রয়োজন পড়বে। যদি বিএনপির কথাই বলি, ২০০৬ সালের বিএনপি নিয়ে আসলে তিন ঘণ্টা ধরে লাগাতার নিন্দা করতে পারবো। সে পরিবেশ তারা তৈরি করেছিলেন। এখন সেটা কেউ বলতে পারে, ‘বিএনপি করে নাই, অন্যরা এমনটা করেছে। বিএনপি না, ম্যাডাম অন্তত ভালো ছিলেন। তারেক রহমান করেছেন।’ সেটা তাদের বিশ্লেষণ হবে। যদি রেজিম আকারেও বলি, তাহলে ২০০৫Ñ০৭ খ্রিস্টাব্দে আমরা কিন্তু ভেবেছিলাম, কুৎসিততম রেজিম দেখা হয়ে যাচ্ছে! তার পরে তো কপালে এই ছিলো!
পয়েন্টটা হলো ২০০৯Ñ১০ এর পর আমার বিবেচনায় বিএনপির তিনÑচারটা মেজর অধিক-লোকের, গরিব লোকের স্বার্থের পক্ষে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে। খুবই দুঃখজনক যে, ‘সুযোগ’ বলছি—রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনা। তাজরীনে অগ্নিকাণ্ড, যা রানা প্লাজা ধসের ঘটনার অল্প সময় আগে ঘটলো। শ্রমিকেরা অনিরাপদ পরিবেশের মধ্যে কাজ করেন, কম বেতনে কাজ করেন, আধাপেটা নিয়ে কাজ করেন। বিএনপির জন্য এটা হতে পারতো রাজনীতিতে মেজর প্যারাডাইম শিফট। পৃথিবীতে বহুত উদাহরণ আছে, সেন্ট্রিস্ট পার্টি লেফট হয়েছে, চলতি ভাষায় বলছি, বা রাইট উইং পার্টি সেন্ট্রিস্ট হয়েছে।
আপনি ভাবেন, ৮০’র দশকে কেউ ভেবেছে, বিজেপি ক্ষমতায় আসবে? বিজেপি তখন কই ছিলো? তখন তো জনতা পার্টি ছিলো, সেন্ট্রিস্ট। দুটো একই দল না, কিন্তু ভোট রিপ্লেস তো করেছে। এখন পয়েন্টটা হলো, বিএনপির সুযোগ ছিলো। রামপালে সুযোগ ছিলো। ফুলবাড়িতে সুযোগ ছিলো। ফুলবাড়ির সময় তো মাহমুদুর রহমান সাহেব মন্ত্রী। বিনিয়োগ বোর্ডের পদে ছিলেন, প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়। পাটকল বন্ধ হয়ে গেলো। বাংলাদেশে শ্রমঘনিষ্ঠ অন্তত ২০টা খাতের কথা বলতে পারবো—আমি মেজর চারটা বললাম, যেগুলো মনে এসেছে—যেগুলোতে বিএনপি এন্ট্রান্স নিতে পারতো। তাদের চিরায়ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার কিছু বদল আনতে হতো। মানুষের তো ঐতিহাসিক ভূমিকাতে বদল হয়। কর্তব্য তো বদলায়। বিএনপি তো একটা সময় কাজ করেছে একভাবে; তার মানে আরেকটা সময়ে আরেকভাবে তার পলিটিকাল কোর্স বদলাতে পারবে না, তার কোনো কারণ নেই।
রানা প্লাজা নিয়ে বুক কেঁপে যায়নি পৃথিবীর এমন কোনো লোক নেই। এবং এটা শ্রমিকদের দুর্দশার একটা ইতিহাস। লোকজন কী কী নিয়ে আক্ষেপ করলো? বাংলাদেশের পোশাকের বাজার পড়ে যাচ্ছে। কী পরিমাণ স্বার্থপর পরিস্থিতিতে আমরা বসবাস করি! কথা হচ্ছে শ্রমিকের মৃত্যু, তার বেতন, তার জীবন নিয়ে। আর যে আলাপ পলিটিকাল অঙ্গনে মূল হিসেবে দেখা দিলো, তা হচ্ছে ওই দুর্ঘটনার কারণে ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি নিয়ে! মানে এই জায়গাগুলোতে আমি মনে করি, বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে এগুলো নেয়নি। নিতে চায়নি। এখন কেউ বলবে, ‘এটা বিএনপির এজেন্ডা না।’ আরেক দল বলবে ‘বিএনপির এটা ইমম্যাচুরিটি।’ আমি বলবো, বিএনপি এই রাজনীতি-ই করেছে। বিএনপি কখনো শ্রমিকপক্ষীয় রাজনীতি করতে চায় নাই। সম্ভবত বামগন্ধী হবার ভয় পালন করেন তারা।
ম্যাজিক লণ্ঠন : গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলো। কীভাবে এই সরকার গঠিত হলো? সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগ হলো? আপনার পর্যবেক্ষণ কী এ নিয়ে?
মানস : আমরা যখন কোনো একটা অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে চাই, তখন তো আমরা পরিত্রাণই পেতে চাই। কনসিকোয়েন্স তো সবসময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমার দিক থেকে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আমি যখন চেয়েছি, এনাফ ইজ এনাফ। শেখ হাসিনার পরে আমি তো আরেকজন স্বৈরাচার চাই না। আমি কোনো প্রসঙ্গই না। আমি কি ইউনূস সাহেবকে চেয়েছি? চাইবো কেনো? কী কারণ থাকতে পারে? এইখানে এই ‘আমি’টা খুব অর্থোডক্স, আত্মকেন্দ্রিক—দুষ্টুমি করেই বললাম। আমি মনে করি, সংগঠন পরিচালনায় সবসময় আলোচনা সম্ভব হয় না। আমার সমস্যা আলোচনা করেননি তা নিয়ে নয়, প্রশ্ন হচ্ছে কাণ্ডজ্ঞানের। পরিস্থিতি যা ছিলো, নাহিদরা আটকা ছিলেন, কমিউনিকেশন বন্ধ ছিলো। তবে ৫ আগস্টের পর আলোচনা করলে ভালো লাগতো। আলোচনা করলেও তো তা আমার পর্যন্ত তা আসতো না। আমার পারসোনালি মাথাব্যথা নেই। কিন্তু অন্তত আসিফ নজরুলের সঙ্গে তো করেছেন।
পয়েন্ট হলো, কারো সঙ্গে আলাপ করুন বা না করুন, প্রথমে তারা কী প্রমাণ করলেন? আমাদের তরুণরা প্রথম প্রমাণ করলেন, তাদের আন্তর্জাতিক তারকা দরকার!
ম্যাজিক লণ্ঠন : অনেকে বলছেন, এ রকম টালমাটাল সময়ে, বিশেষত ভারত যেখানে শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে গেছে, সেখানে অধ্যাপক ইউনূস ভালো চয়েজ।
মানস : অন্যদিক থেকে ভেবে দেখেন, এভাবে চিন্তা করেন, আমরা যদি রাজনীতির একদম অ আ ক খ ভাবি, একদম বটম লাইন প্রশ্ন, ভারতের পক্ষে সামরিক কোনো শক্তি প্রয়োগ করার সম্ভাবনা কি ছিলো? ১৩ মাস পরে কি আছে? নাই। অনেক উছিলা করে চিমটি কেটেও যদি ভারতের আদৌ কোনো সামরিক প্রজেক্ট হয় এটা, কীভাবে হবে? কতোদিন ধরে গালাগালি চলছে? ডিপ্লোম্যাটিক চিঠি চালাচালি হয়েছে। এর মধ্যে ইলিশও গেছে। ডিপ্লোমেসি যারা বোঝেন, পলিটিক্স যারা বোঝেন, তাহলে এটা তো তাদের বোঝার কথা—দুইÑতিনÑচার মাসের মধ্যে ভারত আক্রমণ করতে যাচ্ছে না। ৫, ৬, ৭ আগস্টে ওয়াকার সাহেবের হাতেই বা কী ছিলো? ওয়াকার সাহেবকে বলার মাধ্যমে আমি শুধু তাকে বোঝাচ্ছি না, তিনি যে অফিসটা মেইনটেইন করেন সেটা বোঝাচ্ছি। সামরিক বাহিনীর হাতে কোনো অপশন ছিলো না। এই তরুণদের হাতে সিভিল ক্ষমতা দেওয়া ছাড়া, মানে আস্থা জ্ঞাপন ছাড়া, ওনার জন্য, ওনাদের জন্য কোনো অপশন খোলা ছিলো না। ১৩ মাস হয়ে গেছে, এখনো কোনো অপশন নাই।
অধ্যাপক মানস চৌধুরী আলোকচিত্রী : মো. মইনুল ইসলাম
কারণ জগৎ বদলে গেছে। যুদ্ধ এখন হয়ে গেছে প্রক্সিযুদ্ধ। যুদ্ধ হয় থার্ড পার্টির মাধ্যমে। আপনারা কাতারে হামলা দেখেছেন। দুনিয়ার পলিটিক্সের পুরনো মডেলটি বদলে গেছে। ওনাদের পক্ষে প্রত্যক্ষ ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়। ওদিকে জাতিসংঘের চাকরিগুলো লোভনীয়। প্রত্যক্ষ ক্ষমতায় গেলে জাতিসংঘ নেবে না। এই বাণিজ্য নষ্ট হবে, যখন সে পলিটিক্সে ঢুকবে। গত ২০ বছরে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধানত বাণিজ্য করেছে। সিভিল গভর্নমেন্টই তাদের সেতু বানানোর কন্ট্রাক্ট দিয়েছে। মিলিটারি যেখানে বিড করে, সেখানে আর কেউ বিড করে না। আর যদি কেউ বিড করেও তা মিলিটারির ভায়া বা প্রক্সি হয়ে করে; সিভিল মুখোশে মিলিটারিদের প্রতিষ্ঠান। হোমওয়ার্ক করলে এটা আরো নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব।
৫ আগস্টে এই লোকগুলোর হাত-পা বাঁধা। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আমি মনে করি, প্রথম বিষয় হচ্ছে, ইউনূস সাহেব ইজ নট দ্য পারসন। তার থেকেও বড়ো কথা হলো ইউনূস সাহেব একজন প্রমাণিত দরিদ্রের স্বার্থবিরুদ্ধ মানুষ। ঠিক এই ভাষাটাই আরেকজন ব্যবহার না করতে পারেন। কিন্তু অঙ্কটা তো দুই পক্ষই মানেন। যে ঐকিক নিয়মের অঙ্কে তার ব্যাংক চলে, সেটা তো কোনো পক্ষের অজানা থাকার কথা না। লোকজন এটাও জানে, গ্রামীণ একটা প্রক্সি অর্গানাইজেশন—এটা টেলেনর-এর, নরওয়ের কোম্পানি। তাহলে এইটা মডার্ন যে পুঁজিবাদ, যদি প্রতারণা শব্দটা স্ট্রং হয়ও, তাতেও তো ছদ্মবেশী ব্যবসা বলা চলে। যে মানুষটি ইতোমধ্যেই ব্যাংকিংয়ের সেই মডেল পরিগ্রহণ করেছেন, যে মডেলে দারিদ্র্য জাদুঘরে তো যাবেই না, বরং তা দীর্ঘায়িত করছে তার নিয়ত নিয়ে কথা হচ্ছে। ফলে প্রতারণা যদি নাও বলি, লোকটা ছদ্মবেশী বিদেশি কোম্পানির লোকাল প্রতিনিধিত্ব বলতে অসুবিধা নেই।।
গ্রামীণের বিজ্ঞাপনগুলো খেয়াল করেন। প্রথম ১০ বছর মডেলিং করেছে গরিব মানুষ। গ্রামের কৃষকদের মডেল বানানো হয়েছে, মনে আছে? গ্রামীণে এখনো বছরে একটাÑদুটো ওই রকম মডেল নেওয়া হয়। তখন গ্রামীণফোনের লোগো ছিলো লাল আর সবুজে। তার মানে, যে লোকটা এ রকম আন্তর্জাতিক করপোরেট মডেলে বিজনেস করছে, যে লোকটার ব্যাংকিং মডেল এ রকম, সেই লোকটা আমার রাষ্ট্রের শাসক; আমার চয়েজ এটা কীভাবে হয়! কিন্তু আমি কি বিরোধিতা করেছি? দুটো কারণে আমি বিরোধিতা না করতে পারি। একজন ‘আমি’ এখানে অত্যন্ত গৌণ, কিন্তু আমি আমার কথাই বলছি, বলতে পারি। এক, আমার জানের ভয়। দুই, গণতন্ত্রের বা উত্তরণের একটা পরিস্থিতি হিসেবে দেখা। জানের ভয় থাকাটা দোষের কিছু না। তবে এখানে পরিস্থিতিটা ভিন্ন। ৫ তারিখে যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমাদের নেতৃবৃন্দ অর্থাৎ এই যুবকেরা যাকেই বাছাই করেছেন, তার প্রতি সমর্থন করা আমাদের ঐতিহাসিক কর্তব্য ছিলো। যুবকদের বাছাই করা নেতার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন করা ছাড়া কী চয়েজ ছিলো? বরং তখন আশা করেছি, ঠিক আছে, উনি যাইহোক না কেনো, অন্তত তিনি কিছু দক্ষ কর্মকর্তা বাছাই করবেন।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এই কথা শোনা যায়, উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য ছাত্রনেতারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কসহ (ইউ টি এন) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মিডিয়ার সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
মানস : কিছু কথা আমার কানেও এসেছে। আমি শুধু আমারটা বলি। নাহিদ, সারজিস বা হাসনাত সাহেবের মতো কেন্দ্রীয় নেতারা, এমনকি জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্র নেতারা, এ রকম কারোর সঙ্গেই আমার যোগাযোগ হয়নি। আমি আমারটা বলে দিচ্ছি আগে। এই না-যোগাযোগের কারণও আমি জানি। যে পলিটিকাল সংগঠন আমি ছাত্রজীবনে করতাম—ছাত্র ইউনিয়ন—যেসব সংগঠন আমার বন্ধুপ্রতীম, মৈত্রী, ফ্রন্ট, কিংবা যে ভূগর্ভস্থ রাজনৈতিক দল—ধরা যাক সর্বহারা পার্টি—এদের কেউ আমার সঙ্গে সারাজীবনেই বিশেষ কোনো যোগাযোগ করেনি। কেনো করেনি? কারণ আমি মাস্টার। ব্যস্ত ধরনের মাস্টারি করি। অন্য আরেকটা কারণ থাকতে পারে, আমি তাদের আরামদায়ক মিত্র নই। আরামদায়ক মিত্র কোনো দিন ছিলাম না, হতেও চাইনি।
শুধু এটুকু বলতে পারি, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর কাজী মামুন হায়দার গত ১৫ বছরে আমার সঙ্গে যেভাবে সম্পর্কটা রক্ষা করেছেন, এর সঙ্গে তুলনীয় মডেলের সম্পর্ক রক্ষা করা কঠিন। মামুন হায়দারের বোধহয় একটা বিশাল কলিজা আছে, উনি যেকোনোভাবে আমাকে ডিল করতে পারেন। আমাকে ডিল করতে পারেন মানে, ওর একটা রাস্তা আছে। উনি আমার সঙ্গে কানেকশনটা ধরতে পারেন। এখন আমি, এই ‘আমি’ ‘আমি’ করছি কেনো? একটা নার্সিসিস্টিক দিক থাকতে পারে। আমি সেটার কারণে বলছি না। আমি বলছি, মানুষজন সংঘবদ্ধ হয় প্রায়শই পরিতৃপ্ত হতে পারে এমন কথা শোনার জন্য। আপনাদের গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, পরিতৃপ্তিমূলক কথা বলতে আমি বাধ্য না। বড়ো হওয়ার পর মনেই পড়ে না আমি পরিতৃপ্তমূলক কথা বলেছি। ফলে কোনো দশাতেই আমার সাথে যোগাযোগ না হওয়াটা আমার জন্য বোধগম্য।
নাহিদ সাহেবদের সঙ্গে পরিচয় নেই খুবই ন্যায্য কারণে। এখানেও তাদের যারা প্রতিনিধি ছিলেন, ৫ আগস্টের পর তাদের সঙ্গে একাধিক সভা হওয়ার সুযোগ ছিলো, আমি একাধিক প্রমাণও পেয়েছি; তবে এটা প্রমাণ করতে পারবো না, এভিডেন্স নাই। এখানকার সমন্বয়কারীরা আমার সঙ্গে কথা বলতে আরাম বোধ করেননি। তাহলে আমি বিরল এক কেইস, যার সঙ্গে কথা বলতে অনেক লোকের আরাম নাই! হয়তো কিছু লোক থাকে এই ধরনের। তবে এই প্রশ্নে আমি ভালো উদাহরণ না। কিন্তু সামিনা লুৎফা বা কাজী মারুফ বা তানজীমউদ্দিন থেকে শুরু করে অন্যান্য যে বন্ধু আছেন, তাদের কথা যদি বলি—সামিনার ছাত্র নাহিদ, আসিফ নজরুলের ছাত্র মাহফুজ। আসিফ সাহেব ইউ টি এন-এ ছিলেন না, তিনি শেষের দিকে ইউ টি এন-এর সব ব্যানার ধরেছেন। উনি খুব কমপ্লিকেটেড। উনি কখন জাতীয়তাবাদী, কখন বিএনপি—উনি খুব সহজ লোক নন। একসময় গণআদালতের সংগঠক ছিলেন। ওনার জীবন বর্ণাঢ্য, সেটা সম্মান রেখেই বলি। কখনো হয়তো এদের সঙ্গে কথা হয়ে থাকতে পারে অভ্যুত্থান-নেতৃবৃন্দের।
কিন্তু পাবলিক যে হারে ভাবে শিক্ষক নেটওয়ার্কের লোকদের সঙ্গে অভ্যুত্থানকারীদের নিবিড় যোগাযোগ ভাবে, বিশেষত ০৫ আগস্টের পর, সেরকম কিছু নেই। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, যদিও শিক্ষক নেটওয়ার্কের সঙ্গে আমি আর যুক্ত নেই। ২২ নভেম্বর ২০২৪ থেকে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। পুরনো বন্ধু হিসেবে কিংবা একসময় একসঙ্গে কাজ করেছি সে জায়গা থেকে বলতে পারি, ৫ আগস্টের আগের ব্যাপার একটু আলাদা। ৫ আগস্টের পর ওই টেনশনই নেই, রেজিমের অপসারণ ঘটেছে, তখন যে ধরনের কথাবার্তা হতে পারতো, আমার বিবেচনায় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সঙ্গে অভ্যুত্থান বিজয়ী যুবকরা কার্যকরী কোনো যোগাযোগ রাখেননি। বরং একাধিক লক্ষণ আছে, প্রমাণ আছে যে, ওরা পাবলিকলি দূরত্বই তৈরি করতে চেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে দেখে বুঝেছি যে, ওরা বামগন্ধী কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চান না। একটা লক্ষণ হিসেবে এটা যদিও ইউ টি এন-এর লোকজন বললেই ভালো হয়, কিন্তু ০৫ তারিখের পরে এটা প্রকটভাবে বোঝা গেছে।
দেখেন, পৃথিবীর ইতিহাস খুব ইন্টারেস্টিং। আমি বলতে চাইছিলাম নির্মম! কিন্তু পরে দেখলাম নির্মম বলার কোনো মানে হয় না। ইরানের বিপ্লব তো একটা ক্লাসিক উদাহরণ। কীভাবে আপনার মৈত্রী গঠিত এবং বিনষ্ট হয়। ইরানে কোনোভাবেই সম্ভব ছিলো না, শাহকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাকিংসমেত হটানো। ইরানীয় কমিউনিস্টদের পক্ষে এই হটানোটা সম্ভব হতো না, যদি ইসলামিস্টরা একত্রিত না হতেন। কারোর একার পক্ষেই হটানো সম্ভব ছিলো না। ওরা একত্রিত হয়ে শাহকে হটিয়েছে। একত্রিত হয়ে সরকার গঠন করেছে। ৭৯-এর পরের ঘটনা, খোমিনি সরকার ক্ষমতায়, কথিত আছে ৪,০০০ কমিউনিস্টকে মেরে ফেলা হয়েছে কেবল ১৯৮১Ñ৮২-তেই। কমিউনিস্ট সামগ্রিক হত্যার সংখ্যা ৪০,০০০ পর্যন্ত ভাবা হয়।
যেটা এই মুহূর্তে বাংলাদেশে বলা হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ; কিন্তু কর্নেল তাহের যদি না থাকতেন, তাহলে জিয়া মুক্ত হতেন না, হওয়া সম্ভব ছিলো না। খালেদ মোশারফ ঠিক বুঝেছিলেন কিনা, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। খালেদ মোশারফ যখন জিয়াদের বন্দি করেছিলেন, তখন তো আসলে তিনি ভেবেছিলেন, মুজিব হত্যার স্টেক এরা, তাইতো? ৭ নভেম্বরের রেভ্যুলেশন, যা তারা বলেন, করেছেন কে? কর্নেল তাহের। তাহলে তার ফাঁসি হয় কী কারণে! মুক্ত জিয়া ফাঁসির ব্যবস্থা করেন। রাজনীতিতে এগুলো আছে।
আমি ইউ টি এন-এ নেই বলে বন্ধুদের খাটো করার জন্য বলছি না। দুইÑএকজন পদপ্রাপ্তিতে আহ্লাদিত হয়ে থাকতে পারেন, মিষ্টি কিনেও খেতে পারেন। কিন্তু অন্য দুই-চার জন আছেন, যারা কিনা এইখান থেকে দেখেন না। যারা দেখেন, এটা তার পেশা বা কর্তব্যের এক্সটেনশন হিসেবে। আমি মাস্টারি করতে এসেছি, কারো লাঙ্গুর ধরার জন্য না। আমার তো ভয়েস থাকবার কথা। এই ধরনের লোকজন আগামীতেও ঠিক সেই কাজটাই করবেন।
পক্ষান্তরে বিজয়ী অংশ কাকে রাখবেন, আর কাকে রাখবেন না, সেটা তাদের বিষয়। এদের কথা বাদ দেন। খেয়াল করে দেখেন, আমরা কী পাচ্ছি? আমি ইউনিক কথাই বলছি। আমরা পাচ্ছি, সারজিস, হাসনাতের মতো সাবেক ছাত্রলীগ কিংবা নির্বাচিত ফরহাদ সাহেব, নির্বাচিত জি এস, তাকে মোবারকবাদ জানাই। এবং সাদিক কায়েমদের মতো ছাত্রলীগ পাচ্ছি। সাবেক ছাত্রলীগ পাচ্ছি, যার একাংশ বিপ্লবী, সাবেক ছাত্রলীগ পাচ্ছি যার একাংশ শিবির। ছাত্রলীগের কর্মীরা যারা দীর্ঘদিনের আনুগত্য প্রত্যাহার করে ছাত্রলীগকে অরক্ষিত করে দিয়েছেন, তারা কই? আনুগত্য যদি প্রকাশই করতে থাকবে, তাহলে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ অনিরাপদ থাকবে কেনো? তারা তো মিছিল করলে দেড় হাজার লোক আসবে। আমার প্রশ্নটা লজিকাল না? এই বাহিনী যখন জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে কম জোর হতে শুরু করলো। ছাত্রলীগের পতাকাতলে থাকা এই শয়ে শয়ে লোকজনের আনুগত্য প্রকাশ যদি অটুট থাকতো, তাহলে সে কমজোর হবে কেনো? যদি নাম না-জানা ছাত্রলীগ কর্মীদের—বিদ্রোহী শব্দ যদি নাও ব্যবহার করতে চান—আনুগত্য প্রত্যাহারকারীরা, তারা কোথায় গেলো? খালি শিবিরের কৌশলগতভাবে ছাত্রলীগে থাকার গল্প দিয়ে এই বিপুল নীরব ছাত্রলীগের কর্মী ব্যাখ্যা করা যাবে না।
পলিটিক্স যদি এতোটুকু বুঝি, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ঠিক আগের মাসেই ছাত্রলীগের মিছিলে অংশ নিয়েছে, এমন লোকজন জুলাইয়ের ১৫ তারিখে পরে অংশ নেয় নাই বলেই ছাত্রলীগ অনিরাপদ হয়েছে। তার মানে, আগস্টে আমরা বুঝি নাই কার সঙ্গে কার কানেকশন আছে, এখন তো প্রমাণিত। যার সঙ্গে যার আরাম লাগছে তার সাথে যোগাযোগ করছে। আমি বলতে চাচ্ছি, বিজয়ী অভ্যুত্থানের পর শাসনভার কার হাতে যায়, তখন তারা ওই সময় কাকে মিত্র জ্ঞান করেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের অজস্র ডিসরাপশন, অ্যাবরাপশন আছে। অজস্র বিচ্যুতি আছে। আমাদের আইডিয়ালি মন খারাপ হতে পারে, যে কারণে ৭৯’র [ইরান বিপ্লব] গল্পটা করলাম।
এই মুহূর্তে ক্লাসের কী অবস্থা? আমি বৃহত্তর সমাজবিদ্যা পড়াই। বিশ্বাস করেন, সিমপ্লি অনেক শিক্ষার্থী জানেন না, ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রাম একটা স্বাধীনতার সংগ্রাম। অনেক নিষ্পাপ বাচ্চার ধারণা, ইনোসেন্ট ভাবনা—ওরা ভাবে, ইহুদিদের সঙ্গে মুসলমানদের লড়াই হচ্ছে। এটা যে একটা মাদারল্যান্ড-ফাদারল্যান্ড যাই বলি না কেনো, হোমল্যান্ডের লড়াই, এটা যে একটা অস্তিত্বের লড়াই, এটা যে রুটিরুজির লড়াই, এটা যে পরিশেষে একদম বেঁচে থাকবার লড়াই—এইটা বোঝানোর জন্য যে কতো কথা খরচ করতে হয়! প্যালেস্টাইনিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামের ৬০ বছর পরও, যারা প্রথম দিকের সমর্থক—বাংলাদেশ তথা শেখ মুজিব তথা এই অঞ্চলের একাধিক দেশ—সেরকম একটা জনপদে ৬০ বছর পরও উচ্চশিক্ষার স্থানে শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হয়, এটা ইহুদিদের সঙ্গে মুসলমানদের লড়াই নয়। তার মানে কীভাবে ন্যারেটিভ তৈরি হয়? কীভাবে নতুন নতুন ন্যারেটিভ আপন-পরকে ভেদ করে? যখনই কিনা ভেদাভেদ কাজ করে, তখন তো ধরেন শাসকেরও ভেদজ্ঞান কাজ করে।
আমার তো মনে হয়, সারজিস সাহেব ও হাসনাত সাহেব অনেক আলামত দিয়েছেন। নাহিদ সাহেব যেহেতু কম কথা বলেন, ওনার কথাবার্তা ডিকোড করাও কঠিন। ফলে তাকে বাইরে রাখছি। কিন্তু যদি অন্য দুজনের কথা বলি, তারা অত্যন্ত লাউড। তাদের বলতেও হয় প্রচুর, যেহেতু পাবলিক কমিউনিকেশন করেন। দুজনের ভাষাতেই আপনি শুধু আগস্ট-সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, এই ৮৫ দিনের ভাষাও যদি স্ক্রিনে নিয়ে অ্যানালিসিস করেন, দেখবেন ওনারা সব ধরনের ইঙ্গিত দিয়ে ফেলেছেন। যা কিছু তোমার পছন্দ না, তা সাইজ করে দাও! এখন ঠিক এই ভাষাতেই তারা বলেন নাই, কিন্তু বুঝতেও তো অসুবিধা হয় না কী বলছেন। এটাকে বলে সিমান্টিকস। কোনো একটা ঘটনা সমাধান করতে গিয়ে তারা যে ভাষায় কথা বলেছেন, যে ভঙ্গি দেখিয়েছেন, যেভাবে গিয়ে উপনীত হয়েছেন, এইখানে প্রশাসকের যে ভূমিকার কথা বলছিলাম, যে গাম্ভীর্য, যে সংযম প্রয়োজন ছিলো, সেটা তারা মিস করেছেন। ঠিক আছে দুজন মানুষ মিস করতেই পারেন। কেউ তো থামাবেন। থামাবেন বলতে আমি এখানে বোঝাচ্ছি, ভাষাভঙ্গি রিঅর্গানাইজ করবেন। তার ভাষার প্রণালী থেকে আরেকটু সংযত হওয়ার পরামর্শ দেবেন। বন্ধুরা পরামর্শ দেবেন, টিচাররা দেবেন।
এখন এই প্রশ্নের উত্তর শেষ করি, আপনাদের কি মনে আছে আগস্টের পুরো মাস ‘আওয়ামী লীগ আসবে, আওয়ামী লীগ আসবে’ বলে প্রচার হয়েছে। খেয়াল করেছেন? এদিক দিয়ে ঢুকবে, ওদিক দিয়ে ঢুকবে। এই গাঁজাখুরি থিউরিটা যারাই হোক মার্কেটিং করতে পেরেছে। তাহলে আমরা কোন দেশে বসবাস করি? আচ্ছা, সেটা অনেকে প্যারিসবাসী জনপ্রিয় ইউটিউবারকে নিয়েও বলে যে, ‘একটা লোক দেশ চালাচ্ছে।’ সেটা তার ক্যারিশমা। আমার তার মডেল পছন্দ না, কিন্তু উনি তো সাকসেসফুল। এখানে খেয়াল করে দেখেন, যারাই হোক একটা থিওরি দিয়েছে—আসবে, আসবে। গাঁজাখুরি কেনো বলছি? আগস্টের ২ তারিখ পর্যন্ত ময়দানে মিলিটারি আছে। মিলিটারি কতোগুলো গুলি করেছে ব্যাপার না। পুলিশ জানে তার পেছনে মিলিটারি প্রটেকশন আছে। এটা তো গুরুত্বপূর্ণ, সাইকোলজিকালি গুরুত্বপূর্ণ। সে তো বিপক্ষের লোক না। এটা তো তারা বলে নাই যে, এর মধ্যে তারা নাই। সীমান্তে বান্দর ধরা পড়লেও আই এস পি আর ব্রিফ করে। সেটা তো তারা বলতে পারতো—জনগণের সঙ্গে যেটা হচ্ছে, সেখানে তারা নাই। কিন্তু বলে নাই। ফলে বদমায়েশী ধরার জায়গা আছে। এটার জন্য রকেট সায়েন্স জানা লাগে না।
এরপর হলো কী দেখেন? আগস্টের ৪ তারিখ পর্যন্ত এতোগুলো বাহিনী আছে। কৃষক লীগ থেকে শুরু করে শিশু লীগ পর্যন্ত ময়দানে আছে। পঞ্চগড়ের পেছন দিক দিয়ে, সাতক্ষীরার গর্ত দিয়ে আওয়ামী লীগ ঢুকবে! এটা কোনো কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ, যিনি সাধারণ খাবার খান, গাঁজা পর্যন্ত খান না, তাকে কি এই প্রচার খাওয়াতে পারার কথা? খেয়াল করে দেখেন যে, প্রোপাগান্ডা কী পরিমাণ পাওয়ারফুল! এটা লোকজন শুধু খেলোই না, ভাবলো ১৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ আসবে। তখন ধানমন্ডিতে হামলা হলো। এরপর ৩১ আগস্ট। খেয়াল করে দেখেন, এই জুজুবুড়ির ভয়টা, মানে আওয়ামী জুজুবুড়ি কীভাবে কাজ করলো?
আপনি যদি বলেন, ‘মোদিকে বিশ্বাস করা যায়?’ আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আমি বলবো, মোদিকে কেনো, আপনি কোন প্রতিবেশীকে বিশ্বাস করতে চান? ডিপ্লোমেসি ইজ নট অ্যাবাইট ফেইথ। ডিপ্লোমেসি মানে প্রতিবেশীকে বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়, ডিপ্লোমেসি মানে এমন রাস্তা বা পথ তৈরি করা, যাতে দুজন হাঁটতে পারা যায়। আমার বক্তব্য পরিষ্কার করতে পারছি?
বিষয় হচ্ছে কমনসেন্স কী বলে, যেটা আগে প্রশ্ন করেছিলাম। ইন্ডিয়া কি বাংলাদেশ অ্যাটাক করতে যাচ্ছে? তাহলে আপনি কী করতে পারতেন? তাহলে আপনি জুজুবুড়িটা নিয়ে তদন্ত করতে পারতেন, এটা ছড়াচ্ছে কে? আমি জানি। জানি মানে, আমি বুদ্ধি দিয়ে এটা জানি, উপলব্ধি করতে পারি। এই জুজুবুড়িটা তার দরকার ছিলো যে সব কিছুতেই রাস্তাঘাটে কারলেঙ্গে মারলেঙ্গের মুডে আছে যারা তাদের সরাতে চাচ্ছে না। ফলে ওই যে আগে সংযমের রাজনীতির কথাটা বলছিলাম, এই সংযমের রাজনীতিটা যারা চায় না, তাদের বানানো জুজুবুড়ি এটা।
(চলবে)
মানস চৌধুরী
manosh@juniv.edu
জাহাঙ্গীর আলম, প্রথম আলোপত্রিকায় জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
alamrumcj@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন