ইব্রাহীম খলিল
প্রকাশিত ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম
প্রযুক্তির জয়রথে তটস্থ বিশ্বচলচ্চিত্র
ইব্রাহীম খলিল

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি
রুচি, অরুচি কিংবা পরিস্থিতির ‘অজুহাত’
সময়ের এ মহাসমুদ্রে নির্দিষ্ট রুচি-অরুচি নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা ভীষণ মুশকিল। ভালো বা মন্দ বলে কোনো বিষয়ে নিজেকে প্রতিক্রিয়াশীল বা প্রগতিশীল ভেবে সারাজীবন চালিয়ে যাওয়াটাও প্রায় অসম্ভব। আজ যেটা করবো না বলে অনেককে সাক্ষী মানছি, পরশু হয়তো সেটা করতে বাধ্য হচ্ছি। একই সঙ্গে সেটা নিজের কাছে গ্রহণযোগ্যতার জন্য দাঁড় করছি নানা যুক্তি। এর অন্যতম কারণ সময়-পরিবেশ-পরিস্থিতি ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে; প্রযুক্তির কল্যাণে তৈরি হচ্ছে নানা উপকরণ। ফলে পুঁজির বানে কারণে অকারণে তৈরি হওয়া এসব উপকরণ পুরো পরিস্থিতিই বদলে দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রিয় অভিরুচি নিয়ে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে তাল মিলিয়ে চলাটাও যেনো অপরাধের শামিল! যেমন, একসময় যে মোবাইলফোন সেট থাকাটা ছিলো বিলাসিতা; এখন তা না থাকাটাই যেনো অকল্পনীয়। চিনা কোম্পানিগুলো নামমাত্র মূল্যে তাদের মোবাইলফোন সেটও চাহিবামাত্র ঘরের দরজার সামনে নিয়ে হাজির! ফলে কানাডিয়ান দার্শনিক মার্শাল ম্যাকলুহান বিশ্বকে ছোট্ট গ্রামের সঙ্গে তুলনা করে যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন সেটাও যেনো আজ সেকেলে! কারণ ইন্টারনেট আর নানা প্রাযুক্তিক পণ্যের সাহায্যে বিশ্ব আজ শুধু গ্রাম নয়, রীতিমতো একটি পরিবারে পরিণত হয়েছে!
সময়ের ঘূর্ণিপাকে এ পরিবর্তন হয়তো অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সব পরিবর্তনই কি ইতিবাচক? কিংবা ইতিবাচক বা নেতিবাচকের মধ্যেই কি সব পরিবর্তন সীমাবদ্ধ? মানুষের আবেগ, আবেদন, স্মৃতির কি কোনো মূল্য নেই? হয়তো পরিবর্তন নতুন কিছু বয়ে নিয়ে আসে; তারপরও একটু মুনাফা, নতুন সুযোগ, কল্পিত কথিত স্বাধীনতার জন্য সোনালি সেই অতীতকে হেঁয়ালির বশেই উড়িয়ে দেবো? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো হ্যাঁ কিংবা না দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে এমন কিছু বিষয় থাকে যেগুলো পরিবর্তনের ফলে মনের কোথায় যেনো হু হু করে ওঠে। আর সে কারণেই এসবের স্থান হয় জাদুঘর, গল্প কিংবা স্মৃতিতে। তৈরি করে নানা তর্ক-বিতর্ক। তবুও প্রকৃতির নিয়মে পরিবর্তন কেউ থামিয়ে রাখতে পারে না। কারণ এটা মহাকালের আবর্তে চলমান; অগ্রাহ্য করা অসম্ভব।
অনলাইনভিত্তিক ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম
অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও দেখার সুবিধা নিয়ে বর্তমানে সারাবিশ্বে নানাধরনের ওয়েবসাইট তৈরি হচ্ছে। যেখানে হাজার হাজার চলচ্চিত্র, সোপ অপেরা, ওয়েব সিরিজ, ভিডিওগেম ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানসহ বিচিত্র রকমের সব অনুষ্ঠান দেখার সুবিধা রয়েছে। তাদের সংগ্রহশালায় থাকা এসব কনটেন্ট ডাউনলোড করা ছাড়াও সারাবিশ্বে একযোগে টেলিভিশন, ওয়েব সিরিজ কিংবা কোনো চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী লাইভ দেখারও ব্যবস্থা রয়েছে। এই ধরনের ভিডিওভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলোকেই অনলাইনভিত্তিক ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম বলা হয়। এক্ষেত্রে জনপ্রিয় ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট ইউটিউবের কথা বলা যেতে পারে। ওয়েবসাইট র্যাংকিংকারী প্রতিষ্ঠান অ্যালেক্সার তথ্যানুযায়ী ইউটিউবের অবস্থান সারাবিশ্বে দ্বিতীয়। ফলে সহজেই অনুমান করা যায়, বিশ্বের কতো মানুষ প্রতিদিন এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
তবে ইউটিউব ছাড়াও বিশ্বে কয়েকশো ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট রয়েছে। এর মধ্যে নেটফ্লিক্স, আইফ্লিক্স, কন্টাস ভিপ্লে, ব্রাইটকোভ, ভিমো, কালচুরা, প্যান্ডো, ডিকাস্ট, হুলু, অ্যামাজন প্রাইম, টেড, ভাইন, ক্রাকেল, ইয়াহু ভিউ, ওভিগাইড, সুইচ টিভি, ফানি অর ডাই ও ভিডিও ডিরেক্ট অন্যতম। বাংলাদেশেও বায়োস্কোপ, থার্ডবেল, ঢাকাএফটিপি, বাংলাফ্লিক্স, পপকর্ন, র্যাবিটহোলবিডি ও বঙ্গবিডিসহ প্রায় ডজনখানেক ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট রয়েছে। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামেও কিন্তু ভিডিও দেখার সুবিধা রয়েছে। তবে এগুলোকে ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের আওতায় ধরা হয় না। কারণ ভিডিও ক্যাটাগরিটি এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি অন্যতম সেবা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনলাইনভিত্তিক ভিডিও স্ট্রিমিং সাইটের আধিপত্য এতোটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে, সারাবিশ্বেই প্রেক্ষাগৃহ হুমকির মুখে পড়েছে। হলিউড, বলিউডের মতো আধিপত্য বিস্তারকারী চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিও পড়েছে বিপাকে। অস্তিত্ব রক্ষার ঝুঁকিতে আছে টালিউড, ঢালিউডসহ বিশ্বের নানা দেশের চলচ্চিত্রশিল্প।
এসব ভিডিও স্ট্রিমিং সাইটের মধ্যে জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান নেটফ্লিক্স। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনপ্রিয় এ প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে। শুরুতে তাদের কাজ ছিলো স্বল্প মূল্যে ডি ভি ডি ভাড়া দেওয়া। একই সঙ্গে সেটা সরাসরি গ্রাহককে না দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কাজটাও তারা করতো। তবে তাদের মুনাফা লাভের মূল খাত ছিলো গ্রাহকের দেওয়া ডি ভি ডি ফেরতের বিলম্ব ফি।১ কিন্তু একসময় ডি ভি ডি ছেড়ে গ্রাহকরা অনলাইনভিত্তিক ভিডিও প্লাটফর্ম ইউটিউবের দিকে ঝুঁকতে থাকে। গ্রাহকদের এ প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ বাজারের কথা মাথায় রেখে ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে ব্যবসা দাঁড় করায় নেটফ্লিক্স। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় অনলাইনভিত্তিক এ ভিডিও স্ট্রিমিং সেবা। তবে সঙ্গে ডি ভি ডি’র ব্যবসাটাও চালিয়ে যায় তারা। দেখতে দেখতে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা ডি ভি ডি ব্যবহারকারীদেরকেও ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে সারাবিশ্বে অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিংয়ে প্রায় ১৪ কোটি গ্রাহকের পাশাপাশি ৫০ লাখ ডি ভি ডি ব্যবহারকারীও রয়েছে নেটফ্লিক্সের।
নেটফ্লিক্সের পাশাপাশি একই সময় তৈরি হতে থাকে ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের অন্য সাইটগুলোও। নেটফ্লিক্সসহ এরা সবাই সাধারণত সাবস্ক্রাইব প্রক্রিয়ায় কাজ করে। মানে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট কিছু অর্থের বিনিময়ে সারাবিশ্বের মানুষ এসব সার্ভারে থাকা কনটেন্ট উপভোগ করতে পারে। এসব ভিডিও স্ট্রিমিং সাইটগুলো ইউটিউবের মতোই ভিডিওভিত্তিক ওয়েবসাইট; তবে ইউটিউবের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, যদি কারো জিমেইল অ্যাকাউন্ট থাকে তাহলে সে ভিডিও দেখার পাশাপাশি নিজেও ইউটিউবে যেকোনো ভিডিও আপলোড করতে পারবে এবং সেটা অন্যরাও দেখতে পারবে। শুধু তাই নয়, ওই ভিডিও অন্যরা দেখলে সেখান থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থও ভিডিওদাতার অ্যাকাউন্টে যোগ হবে। আবার যদি কারো জিমেইল অ্যাকাউন্ট না থাকে তাহলেও সে বিনামূল্যে ভিডিও দেখতে পারবে। কিন্তু নেটফ্লিক্স, আইফ্লিক্সের মতো ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে এসব সুবিধা নেই। এখানে কেবলই একটা নির্দিষ্ট অর্থ বা নিয়মের মাধ্যমে গ্রাহক হওয়া যায়।
বর্তমানে ইংরেজি, হিন্দি, আরবি, কোরিয়ান, মান্দারিনসহ ১৭টি ভাষায় বিভিন্ন সংস্করণ চালু করেছে নেটফ্লিক্স। প্রতিষ্ঠানটি এখন ভাষাভেদে বিভিন্ন দেশের ভিডিও কন্টেন্টের সাব টাইটেলও তৈরি করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র স্টুডিও, নির্মাতা, অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গেও চুক্তি করছে তারা। যারা প্রতিনিয়ত নেটফ্লিক্সের জন্য কনটেন্ট সরবরাহ করবে। সেই ধারাবাহিকতায় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা, হলিউডের কিংবদন্তি মার্টিন স্করসিস, আলফনসো কুয়ারন, পল গ্রিনগ্রাস, জেরেমি সাউলনিয়ার, উইল স্মিথসহ অসংখ্য অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে নেটফ্লিক্স। এছাড়া বলিউডের শাহরুখ খান, নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকী, সাইফ আলী খান, ইমরান হাশমি, রাধিকা আপ্তের মতো বাঘা বাঘা অভিনয়শিল্পীরাও নেটফ্লিক্সের চলচ্চিত্র ও ওয়েব সিরিজে অভিনয় করছে। বাংলাদেশেও নেটফ্লিক্স কাজ করা শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করা শুরু করেছে নেটফ্লিক্সের হয়ে। হালের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রনির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর টেলিভিশন ও ডুব চলচ্চিত্র দুটিও কিনে নিয়েছে নেটফ্লিক্স।
অন্যদিকে পিছিয়ে নেই ইন্দোনেশিয়াভিত্তিক ভিডিও স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠান আইফ্লিক্সও। মোবাইল অপারেটর রবির হাত ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তারা। বিশ্বব্যাপী দুইশো ২০টি স্টুডিও ও পরিবেশকদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে গ্রাহকদের জন্য আন্তর্জাতিক, স্থানীয়, বহুল প্রশংসিত টিভি সিরিজ ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নিয়ে বাজারে আসে আইফ্লিক্স। প্রত্যেক গ্রাহক ফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, টিভি ও অন্যান্য ডিভাইসসহ পাঁচটি পর্যন্ত ডিভাইসের মাধ্যমে আইফ্লিক্সে অ্যাকসেস করতে পারে।২ পাশাপাশি একই সময়ে দুটি ভিন্ন ডিভাইসেও শো উপভোগ করতে পারে গ্রাহকরা। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, গিয়াস উদ্দিন সেলিম, অনিমেষ আইচ, নুহাশ হুমায়ূন, মাহমুদুর রহমান হিমিসহ অনেকেই আইফ্লিক্সের হয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। চলচ্চিত্রনির্মাতাদের এসব প্রতিষ্ঠান এতোটাই সুবিধা দিচ্ছে যে, অনেকে তো বলেই ফেলেছে সম্ভব হলে তারা আজীবন তাদের সঙ্গেই কাজ করে যাবে!
এই ধারাবাহিকতায় পিছিয়ে নেই দেশীয় ভিডিও স্ট্রিমিং সাইটগুলোও। তারাও প্রতিনিয়ত নিজেদের কনটেন্ট বাড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ তরুণ নির্মাতাদের দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করছে, আবার কেউ অন্যদের কাছ থেকে কিনে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বড়োপর্র্দার নিপুণ, পরিমণি, পপি, তিশা, আঁচলসহ অসংখ্য অভিনয়শিল্পী এসব ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে অভিনয় শুরু করেছেন। এমনকি চলচ্চিত্রশিল্প ক্রমেই নিম্নমুখী হওয়ায় একটু লাভের আশায় বাংলাদেশের অধিকাংশ নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজকরা এসব স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের দিকেই ঝুঁকছে।
প্রেক্ষাগৃহ বনাম ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম
পর্দায় দেখানো জীবন প্রকৃত জীবন না হলেও চলচ্চিত্রকে জীবনের প্রতিচ্ছবি বলা হয়। প্রেক্ষাগৃহ তো সেটা কোনোভাবে বুঝতেই দেয় না আসলেই সেটা জীবন নয়। চলচ্চিত্রের যে ক্ষমতা বা ম্যাজিক আছে সেটাই বার বার দর্শককে প্রেক্ষাগৃহের দিকে নিয়ে যায়। মাঠঘাট পেরিয়ে দলবদ্ধভাবে চলচ্চিত্র দেখার কতো স্মৃতি মানুষের; ফাঁক পেলে সেটা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে কতো গল্প। নিজের অজান্তেই চলচ্চিত্র দেখতে দেখতে বয়ে যাওয়া অশ্রু কেউ দেখার আগেই নিঃশব্দে কতোজন মুছেছে কতো বার। ছুটির ঘণ্টা, ভাত দেসহ অনেক চলচ্চিত্র দেখার সময় প্রেক্ষাগৃহে কতো নারী/পুরুষকে স্বশব্দে কাঁদতে দেখা গেছে; শো শেষ করে কেঁদে চোখ লাল করে কেউ কারো দিকে তাকায়নি অনেকক্ষণ। কিন্তু ‘ভালো’ চলচ্চিত্র নির্মাণের অভাব আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকহীনতায় সেসবই আজ স্মৃতি। প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের যে মিছিল সেটাও ক্রমে বেড়ে ঠেকেছে গুটিকতকে। আবার হাতেগোনা যে কয়টি প্রেক্ষাগৃহ টিকে আছে সেগুলোও হুমকির মুখে পড়েছে হালের আলোচিত অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের কারণে। এ দৃশ্য কেবল বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের। কারণ এসব স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম কোনোভাবেই তাদের নির্মিত চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিতে নারাজ। সেটাতে প্রেক্ষাগৃহ থাক কিংবা না থাক তাদের কোনো কিছুতেই কোনো কিছু আসে যায় না।
অবশ্য অনেকেই মনে করে চলচ্চিত্রের সেই ম্যাজিক আর নেই। ফলে মোবাইলফোন সেট কিংবা ল্যাপটপে হলেও চলচ্চিত্র দেখতে পারলেই তারা খুশি। আর সেই ধারাবাহিকতায় ক্রমেই ব্যস্ত হয়ে পড়া মানুষও আস্তে আস্তে এসব মাধ্যমে চলচ্চিত্র দেখায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। কিন্তু চলচ্চিত্রের ইমেজের যে ম্যাজিক, সেট, লঙ শট্, মাস্টার শট্, টপ শট্, বার্ডস আই ভিউ শটের যে বিশালত্ব, সঙ্গে এসব দৃশ্যের যে ভাষা সেটা কি কখনোই মোবাইলফোন সেট কিংবা ল্যাপটপে বোঝা সম্ভব? এ প্রশ্ন আজ চলচ্চিত্র বোদ্ধাদেরও।
২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ৭০তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে এ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। কারণ ওই উৎসবে প্রথমবারের মতো নেটফ্লিক্সের বঙ জুন-হু’র ওকজা ও নোয়াহ বোমবাক-এর দ্য মায়োরিদজ স্টোরিজ নামের দুটি চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। উৎসবের শর্তানুযায়ী ওই সব চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিতে হবে। কিন্তু নেটফ্লিক্স তাদের চলচ্চিত্র কোনো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি না দিয়ে তাদের ওয়েবসাইটে মুক্তি দিতে অনড়। উৎসবের প্রথম দিনে সংবাদ সম্মেলনে জুরিবোর্ডের প্রধান পেদ্রো আলমোদোভার জানান, কোনো চলচ্চিত্র যদি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি নাই-ই দেওয়া হয়, তাহলে সেটা পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবে কেনো? সঙ্গে তিনি এটাও বলেন, তার মানে এই নয়, তিনি খোলা মনের নন বা নতুন প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাতে পারছেন না। কিন্তু তিনি যতোদিন বেঁচে আছেন, ততোদিন বড়ো পর্দার পক্ষেই বলবেন। কারণ বড়ো পর্দায় চলচ্চিত্রের যে সম্মোহনী রূপ ধরা পড়ে, ছোটো পর্দায় তা পড়ে না।৩
তবে পেদ্রোর সঙ্গে আরেক বিচারক হলিউড তারকা উইল স্মিথ দ্বিমত করেন। তার মতে, প্রেক্ষাগৃহে ও নেটফ্লিক্সে চলচ্চিত্র দেখার মধ্যে তেমন কোনো বিরোধ নেই। বরং নেটফ্লিক্সের কারণেই তার ছেলে-মেয়েরা এমন সব চলচ্চিত্র দেখে, যেগুলো অন্যভাবে দেখার উপায় নেই। বিশ্ব চলচ্চিত্রের বোধ বাড়াতে নেটফ্লিক্স সাহায্য করছে বলেই মনে করেন তিনি।৪ বৈশ্বিকভাবে বিবেচনায় নিলে স্মিথের কথাও হয়তো সত্য। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দেশের কথা বিবেচনায় নিলে সেই দেশের প্রেক্ষাগৃহের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সেটা হয়তো স্মিথরা ভাবেন না। কান কর্তৃপক্ষ সেটা ভেবেছিলো। ফলে তারা নেটফ্লিক্সকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, কানে প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র মুক্তি দিতেই হবে। আর সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে কান-এ নিষিদ্ধ হয়ে ছিটকে পড়ে নেটফ্লিক্স।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নেটফ্লিক্সও বসে নেই। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরেই ৯০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেটে নেটফ্লিক্স নির্মাণ করে ব্রাইট। উইল স্মিথসহ খ্যাতনামা অনেকে এতে অভিনয় করলেও চলচ্চিত্রটি কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয়নি। এর প্রিমিয়ারও নেটফ্লিক্সের ওয়েবসাইটেই করা হয়। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে কমপক্ষে ৮০টি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেয় এ প্রতিষ্ঠানটি। ইতোমধ্যে তারা সেসব লক্ষ্য পূরণেরও দ্বারপ্রান্তে। সঙ্গে বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ তো চলছেই। ফলে বিশ্বের খ্যাতনামা নির্মাতা, অভিনয়শিল্পীরা ক্রমেই নেটফ্লিক্সমুখী হচ্ছে। আর সেই ধারাবাহিকতায় কান চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো মত বদলানোর দিকে ঝুঁকছেন। তিনি বলেন, আমি নেটফ্লিক্সের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনোটাই নই। আমার কাজ কেবল সিনেমার পরিস্থিতি দেখানো। এটা এমন একটা সময়, যখন মার্টিন স্করসিস নেটফ্লিক্সে সিনেমা মুক্তি দিতে যাচ্ছেন। ২০১৭ সালে উৎসব বোর্ড আমাকে বলে, প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি না দেওয়া কোনো সিনেমাকে গ্রহণ না করতে।৫
তাহলে কান উৎসবে নেটফ্লিক্সের ভাগ্য কী হবে, নেটফ্লিক্সের সিদ্ধান্তের কাছে কি কান নমনীয় হবে? এ প্রসঙ্গে থিয়েরি ফ্রেমো বলেন, ‘আমি আমার পছন্দের সব ছবিই উৎসবে দেখাতে চাই। নেটফ্লিক্সের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০১৮ সালে এ রকম অনেক পছন্দের ছবি আমন্ত্রণ জানাতে পারিনি। দেখা যাক, ২০১৯ সালে কী করা যায়। আগামী উৎসব পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’৬ আসলে পুঁজির যে চাপ সেটার কাছে বশ্যতা স্বীকার ছাড়া কোনো উপায় হয়তো কান-এর কাছেও নেই। এরকম একটি উৎসবও হয়তো খ্যাতনামা তারকাদের চলচ্চিত্র দেখানোর আশায় নেটফ্লিক্সের কাছে নত স্বীকার করবে। যেটার বিষয়ে ইতোমধ্যেই তাদের নমনীয়তা দেখা গেছে।
আমাদের দেশের তরুণ চলচ্চিত্র প্রযোজক আরিফুর রহমান ইতোমধ্যে মাটির প্রজার দেশে নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করে আলোচনায় এসেছেন। এছাড়া আইফ্লিক্সের হয়েও বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন তিনি। তার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, যদি ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের জন্য চলচ্চিত্র বানাতে থাকেন তাহলে তো প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখার যে আনন্দ, সংস্কৃতি সেটা ধ্বংস হয়ে যাবে, হাতেগোনা যে কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহ আছে সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। উত্তরে আরিফুর বলেন, না; পুরোপুরি বন্ধ হবে না। আমি মনে করি পুঁজির যে প্রবাহ তাতে করে প্রতিটি জেলায় সিনেমাহলের বদলে একটি করে সিনেপ্লেক্স তৈরি হবে। তবে হ্যাঁ, এটার খারাপ প্রভাব হিসেবে সিনেপ্লেক্সে রিকশাচালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সমাগম কমে যাবে। আসলে আমাদের মতো যারা ফিল্মমেকার তাদের জন্য রাস্তাটা সহজ নয়। দেখেন আমার চলচ্চিত্রটিকে আর্ট ফিল্ম ভেবে কোনো পরিবেশক পরিবেশনার জন্য এগিয়ে আসেনি। চলচ্চিত্রটির প্রচারণায় নানা জায়গায় ধরনা দিয়েও কোনো টাইটেল স্পন্সর পাইনি। নিজের টাকায় সিনেমা বানিয়ে নিজেকেই পরিবেশনা, ডিস্ট্রিবিউটের কাজ করতে হয়েছে। অর্থ সঙ্কটের কারণে সামনে সিনেমা বানানোর স্বপ্ন পূরণে ভিন্নভাবে পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। হল মালিকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে সবশেষে মাত্র তিনটা সিনেমাহল পেয়েছি। সিনেপ্লেক্সে আমার সিনেমাটার হাউজফুল থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সিনেমা চলে আসায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাহলে আমরা কীভাবে কাজ করবো? ফলে যেকোনোভাবে সিনেমা বানিয়ে নিজের স্বপ্নটার বাস্তবায়ন করাটাই এখন প্রধান বিষয়। তবে আমার যদি সেই ফান্ড জোগাড় হয় তাহলে অবশ্যই আমি সিনেমাহলের জন্য সিনেমা বানাবো।
তার কাছে দ্বিতীয় প্রশ্ন করেছিলাম, প্রেক্ষাগৃহের পর্দায় চলচ্চিত্র দেখে যে আনন্দ, অনুভূতি সেটা কি বাড়িতে বসে ল্যাপটপ, মোবাইলফোন সেট কিংবা টিভিতে পাওয়া সম্ভব? কিংবা বৃষ্টি পড়ার যে দৃশ্য, বাহুবলি, ট্রয়-এর সেটের যে বিশালতা কিংবা চলচ্চিত্রের যে ভাষা সেগুলো এখানে পাওয়া সম্ভব কি না? কিংবা আদৌ এগুলো মাথায় রেখে স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের জন্য চলচ্চিত্র বানান কি না? এর উত্তরে তিনি বলেন, হ্যাঁ, এগুলো হয়তো এখানে বোঝানো সম্ভব নয়। তবে আস্তে আস্তে সিনেমা হয়তো ল্যাপটপ, মোবাইল, টেলিভিশনে দেখানো হবে ভেবেই বানানো হবে। তখন আবার এসব চলচ্চিত্র সিনেমাহলে দেখে মজা পাওয়া যাবে না। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আর যাই হোক আমি কিন্তু আমার গল্পটা বলতে পারছি। আর এই গল্পটা দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারলেই আমি খুশি।
কী সন্ধানে যায় সেখানে ...
সম্প্রতি ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের দিকে নির্মাতা ও প্রযোজকদেরই বেশি আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কাজ না পেয়ে আড়ালে চলে যাওয়া অভিনয়শিল্পীদের অনেকেই এর মাধ্যমে ফেরার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্বজুড়ে এসব নির্মাতা, প্রযোজক কিংবা অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে হঠাৎ কী এমন ঘটলো, যার কারণে তারা এ মাধ্যমটির প্রতি এতো আকৃষ্ট হচ্ছে? এ বিষয়ে আয়নাবাজিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা অমিতাভ রেজার বক্তব্য এমন, প্রধান কারণ স্বাধীনতা। এতে একসঙ্গে অনেক স্বাধীনতা পাওয়া যায়। চিত্রনাট্য ও কথার স্বাধীনতা, কম বাজেটে ছবি বানানোর তুলনামূলক স্বাধীনতা এবং ছবির চরিত্র নির্বাচনের বেলায়ও অপার স্বাধীনতা পাওয়া যায়। কারণ ওয়েবে এখনো তারকাবহুল কথাটির সে রকম মানে তৈরি হয়নি। এসব স্বাধীনতা যেকোনো সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যা ওয়েবের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব।৭
ফলে নিজের সেই স্বাধীনতার জন্য যদি সম্ভব হয়, তাহলে বড়ো পর্দা ছেড়ে নেটফ্লিক্স বা আইফ্লিক্সের মতো ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের জন্যই চলচ্চিত্র বানাবেন বলে জানিয়েছেন অমিতাভ।৮ কারণ বড়ো পর্দার চলচ্চিত্র দর্শকদের বিভ্রম তৈরির সক্ষমতা রাখে কি রাখে না, তাতে তিনি আর মাথা ঘামান না। তিনি মনে করেন, তার কাজ গল্প বানানো এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলেই তিনি খুশি। সম্প্রতি আলোচনায় আসা প্রজন্ম টকিজের বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের নির্মাতা সালেহ সোবহান বলেন, ‘টেলিভিশনে সব কাজ করা যায় না। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে। দেখা যায়, যে বিষয় নিয়ে আমরা গল্প বলতে চাই, সেটি টেলিভিশনের অনেক নিয়মকানুনের জন্য আটকে যায়। অনলাইনে এই সমস্যাটা নেই। যেকোনো বিষয় নিয়ে পরিচালক সৃজনশীলভাবে গল্পটি বলার সুযোগ পান।’৯ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে প্রযোজক আরিফুর রহমান বলেন, স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের প্রধান সুবিধা হলো এখানে কোনো ধরনের সেন্সর নেই। আপনি যা বলতে চান সেটাই বলতে পারবেন। একই সঙ্গে নির্মাণের জন্য যে অর্থ প্রয়োজন সেটাও আপনি পেয়ে যাবেন। শুধু তাই নয়, সে অর্থ দিয়ে আপনার পরবর্তী সিনেমা নির্মাণের স্বপ্নও দেখতে পারবেন। এছাড়া সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশন কিংবা সিনেমাহলে দেখানোর জন্য কোনো ঝামেলা নেই। আবার এখানে কাকে দিয়ে অভিনয় করাচ্ছেন সেটাও কোনো মুখ্য বিষয় নেই। কারণ স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে সেই অর্থে কোনো অভিনয়শিল্পী মুখ্য বিষয় নয়। এখানে আপনি কীভাবে গল্পটি উপস্থাপন করছেন সেটাই মূল কথা। ধরুন, আমি আইফ্লিক্সের জন্য ১৫ থেকে ২০মিনিটের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করলাম। তারা আমাকে এর জন্য সর্বনিম্ন তিন হাজার মার্কিন ডলার দিবে। মানে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা। আবার মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অভিতাভ রেজা কিংবা রুবাইয়াত হোসেনের মতো যারা একটু পরিচিত নির্মাতা তারা কিন্তু আরো বেশি টাকা পায়। এরকম শর্টফিল্ম বানিয়ে অন্য কোথাও দিলে কিন্তু আপনি এ টাকা পাবেন না। এখানে আপনি কতো টাকা পাবেন সেটা নির্ভর করছে আপনি তাদের সঙ্গে কীভাবে চুক্তি করছেন। আবার নেটফ্লিক্সে যারা কাজ করছে সেখানে আরো বেশি বাজেটে কাজ পাওয়া যায়। কারণ তাদের বিনিয়োগটাও বিশাল।
তবে আমরা কিন্তু সরাসরি আইফ্লিক্স বা নেটফ্লিক্সের সঙ্গে চুক্তি করতে পারি না। আমরা যে টাকা পাই সেটা তৃতীয় মাধ্যমের কাছ থেকে। মানে আইফ্লিক্স ও আমাদের মাঝখানে আরেকটি মাধ্যম রয়েছে। কারণ তারা সচারচর সবাইকে দিয়ে সরাসরি সিনেমা বানায় না। তারাই মূলত তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে আইফ্লিক্সের হয়ে চুক্তি করে। কিন্তু কতোতে তারা চুক্তি করছে, সেটা ভায়া প্রতিষ্ঠানটি আমাদের কাছে বলে না। ধরুন, আমরা আমেরিকান প্রতিষ্ঠান ফিল্ম কারাভানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে আইফ্লিক্সের হয়ে সিনেমা বানাই। এরপর তারা যে চুক্তি করে সেটা থেকে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ রেখে বাকিটা আমাদেরকে দেয়। তারপরও এটা যথেষ্ট ভালো অবস্থানে রয়েছে। এখন পর্যন্ত স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম যেভাবে চলছে, তাতে এ খাতকে একটি সম্ভাবনাময় খাত বলেই মনে করছি। ফলে যদি সবাই ভালো কনটেন্ট তৈরি করে তাহলে তরুণ নির্মাতাদের জন্য এটা ভালো কিছু বয়ে নিয়ে আসবে। কারণ তরুণরা পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের গল্প বলতে পারছে না। কতো সম্ভাবনাময় নির্মাতা টিকে থাকতে না পেরে হারিয়ে গেছে। ফলে এখন স্ট্রিমিং প্লাটফর্মটি সেটা তৈরি করে দিচ্ছে। সবমিলে এটা অবশ্যই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য একটি আশার আলো।
তবে বিদেশি স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে যে স্বাধীনতা, দেশীয় স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানে ঠিক ততোটুকু নেই বলে আরিফুর রহমানও স্বীকার করেন। কারণ দেশীয় সাইটগুলোতে সেন্সরবোর্ড এখনো হস্তক্ষেপ না করলেও নির্মাতা কিংবা স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানগুলো নিজে থেকেই অনেক সতর্ক। তবে ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে কাজ করা আরিফুর, অমিতাভদের মতো অধিকাংশই মনে করেন, এখানে স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা দেখানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণ-অভিনয়-অর্থ উপার্জনেও রয়েছে ঈর্ষণীয় হাতছানি। কিন্তু এভাবে নির্মাতা-প্রযোজক-অভিনয়শিল্পীরা যদি স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে দিকে ঝুঁকে যায়, তাহলে দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের কী হবে? ধুক ধুক করে চলা গুটিকতক প্রেক্ষাগৃহের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটা নিয়ে তাদের অধিকাংশই উদাসীন। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হওয়ার যুগে অর্থায়ন ও কথিত ‘স্বাধীনতার’ সুবিধা কতোদিন থাকবে সেটাও তারা জানে না। যদিও এর মান ধরে রাখার ব্যাপারে নির্মাতা অমিতাভ রেজা বেশ আশাবাদী। তার ভাষায়, ‘আমি এ বিষয়ে সিরিয়াস। এজন্য গল্পের ব্যাপারেও সিরিয়াস থাকার চেষ্টা করছি।’১০ তবে দেশের চলচ্চিত্রশিল্প, প্রেক্ষাগৃহকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে অমিতাভরা কতোদিন সিরিয়াস থাকতে পারবেন, সেটা হয়তো সময় বলে দিবে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প ও ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম
বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে হঠাৎ-ই হারিয়ে গিয়েছিলেন অভিনয়শিল্পী আঁচল। একসময় অভিনয়ে অনিয়মিত হয়ে যাওয়ায় অর্থ সঙ্কটে ঢাকা থেকে সপরিবারে গ্রামের বাড়িতেও ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। বর্তমানে ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম বায়োস্কোপের হয়ে ওয়েব সিরিজে অভিনয়ের মাধ্যমে আবারও নিয়মিত হচ্ছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে আঁচল বলেন, ‘এখন সিনেমার বাজার এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে এক শাকিব খানের ছবি ছাড়া অন্যদের সিনেমা তেমন একটা চলছে না। সিনেমা তৈরিও কম হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কম বাজেটের সিনেমা না করে ওয়েব সিরিজ করা অনেক ভালো।’১১ তার সঙ্গে অনেকটা সুর মিলিয়ে ওয়েব সিরিজে অভিনয় করা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী পপি বলেন, ‘বর্তমান যুগে কাজের ধারা পরিবর্তন হয়ে গেছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে হবে। ওয়েব সিরিজ, ওয়েব কনটেন্টের যুগ তো শুরু হয়ে গেছে। ভালো কাজ হলে সব মাধ্যমেই কাজ করতে চাই। এখন তো টালিউড, বলিউডের তারকারাও ওয়েব সিরিজে নিয়মিত কাজ করছেন।’১২
আঁচল কিংবা পপির বক্তব্যের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। বর্তমানে দেশের চলচ্চিত্রশিল্প খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। হাতেগোনা কয়েকজনের চলচ্চিত্র ছাড়া অন্যগুলো ব্যবসা করছে না। আর্থিক সঙ্কটের কারণে ছিটকে পড়েছে অনেক অভিনয়শিল্পী। ফলে অভিনয়শিল্পী, কলাকুশলী, নির্মাতারা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি অন্য জায়গাতেও কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আইফ্লিক্স নিয়ে হাজির হয় রবি। প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার ইমরুল করিম বলেন, ‘আমরা বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিশীল এবং স্থানীয় সৃজনশীল শিল্পীরা যেন তাদের নান্দনিক কাজগুলোকে বৈশ্বিক প্লাটফর্মে তুলে ধরতে পারেন সে সুযোগ তৈরিতে আগ্রহী।’১৩
কিন্তু আইফ্লিক্সের প্লাটফর্মেও যে সবাই তেমন সুযোগ পাচ্ছে তেমনও নয়। কারণ তাদের নিজেদের কাজের বাইরে আইফ্লিক্সের হয়ে যারা কাজ করছেন তারা অধিকাংশই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। ফলে রবি আইফ্লিক্সের মাধ্যমে ব্যবসা করলেও এদেশের নির্মাতা, অভিনয়শিল্পীদের যতোটা সুযোগ থাকার কথা, সেটা এখনো তৈরি হয়ে ওঠেনি। আবার এই প্লাটফর্মে তারকা অভিনয়শিল্পী খুব গুরুত্বপূর্ণ না হওয়ায়, যে কাউকে দিয়ে অভিনয় করালেই চলে। কিন্তু তাতে করে অভিজ্ঞ অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা ও কলাকুশলীরা বাদ পড়ছে। ফলে ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে তরুণ শিল্পীরা উঠে আসলেও একটা প্রজন্ম চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। যদিও এফ ডি সি কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রেও যে অভিজ্ঞ, বয়স্ক অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা ও কলাকুশলীরা খুব একটা সুযোগ পাচ্ছে এমনও নয়। যাহোক, দেশীয় স্ট্রিমিং ওয়েবসাইটগুলোকে আইফ্লিক্স ও নেটফ্লিক্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে। কারণ এসব বিদেশি প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ বরাদ্দ দিচ্ছে তাতে করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাবস্ক্রাইব প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সরাসরি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কনটেন্ট ফ্রি দেখানোর রাস্তায় হাঁটতে হচ্ছে। তাদের আয়ের একমাত্র পথ কেবলই প্রদর্শিত বিভিন্ন কোম্পানির পণ্যের বিজ্ঞাপন!
অন্যদিকে সরকারের চোখের সামনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভিডিও স্ট্রিমিং নেটফ্লিক্স অবৈধভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছে। প্রতিবছর দেশ থেকে কোনো ধরনের শুল্ক ছাড়াই প্রায় দুইশো কোটি টাকারও বেশি নিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। যার কোনো খবর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই।১৪ অথচ ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি। ওই বছরের এপ্রিলে যখন প্রতিষ্ঠানটি এশিয়ার বাজারে প্রবেশ করে তখন নেটফ্লিক্সের সি ই ও রিড হ্যাস্টিংস বলেছিলেন, ‘এশিয়ায় তাদের সাফল্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।’১৫ আসলে ঘটেছেও তাই-ই। বর্তমানে শুধু বাংলাদেশেই নেটফ্লিক্স ব্যবহারকারীর সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স রেগুলেটরি কমিশন (বি টি আর সি)।১৬ যাদের কাছ থেকে মাসে গড়ে অন্তত ১০ ডলার করে সাবস্ক্রাইবস চার্জ নিচ্ছে নেটফ্লিক্স। যার জন্য কোনো ভ্যাটও আরোপ করা হয়নি। এমনকি দেশীয় স্ট্রিমিং সাইটগুলো এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে বলিউডি চলচ্চিত্রে নেটফ্লিক্স ভরে গেলেও ভারত কিন্তু ঠিকই লাইসেন্সের মাধ্যমেই কাজ করার সুযোগ দিয়েছে নেটফ্লিক্সকে। একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া চুক্তি ছাড়া তাদের দেশে নেটফ্লিক্সকে ঢুকতেই দেয়নি।
প্রশ্ন হলো, যে রাষ্ট্র গুজবের অজুহাতে শত শত ওয়েবপোর্টাল বন্ধ করে, রাত বেরাতে কারণ ছাড়াই যে কাউকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়, খামখেয়ালিপনায় নানা মানুষের ফোনালাপ উন্মোচন করে ঘৃণিত প্রমাণের চেষ্টা চালায়, তারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্পের ক্ষেত্রে সত্যিই কি এতোটা উদাসীন? যারা ক্ষমতার মসনদে নিরাপদে টিকে থাকতে নিজের নাগরিকদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর জন্য কোটি কোটি টাকায় বিদেশ থেকে নানা যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যস্ত থাকে, মুহূর্তেই যে কাউকে নাগালের মধ্যে নিয়ে আসায় তীর ঘাম ছোটায়, তারা অবশ্য এক্ষেত্রে একটু উদাসীন হলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই! কারণ তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তিত। ফলে একে একে দেশের প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের মিছিলে তাদের নেই কোনো ভ্রক্ষেপ; অবহেলায়, চিকিৎসাহীনতায় মৃত্যুশয্যায় থাকা কিছু ‘অসহায়’ গুণীদের মুষ্টিমেয় অর্থের চেক দিয়ে মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করাকেই তারা শ্রেয় মনে করে। তাতে তাদের মমত্ববোধ আরো জাগ্রত হয়। শিরোনামের পর শিরোনাম হয়, তারা শিল্পমনস্ক মানুষের সঙ্গেই আছেন! অথচ ঠিক এভাবেই না দেখার ভান করায় কালো ছায়ায় ঢেকে গেছে পুরো চলচ্চিত্রশিল্প। শুরু হওয়ার আগেই হুমকির মুখে পড়েছে দেশের স্ট্রিমিং প্লাটফর্মও।
তবে আরেকটি আষাঢ়ে গল্পের অপেক্ষায় ...
তথ্য প্রযুক্তির এ সময়ে তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভোর। নতুন এ মাধ্যমে প্রতিদিন নানাধরনের দর্শক-শ্রোতা তৈরি হওয়ায় অনলাইনের নানা স্তরে তাদের পদচারণা। ফলে অনলাইনে তারা নিজেরাই নিজেদের জায়গা খুঁজে চলেছে। একই সঙ্গে কাগুজে নোট ছেড়ে মানুষ আস্তে আস্তে ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে ঝুঁকছে। আর সেই সূত্র ধরেই প্রতিনিয়ত অনলাইনে প্রসারিত হচ্ছে কার্যক্রম। জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠতে গিয়ে একজন আরেকজনের চাইতে অবাক করা ভিডিও বা সেলফি দিতে অবলীলায় জীবনকেও তুচ্ছজ্ঞান করছে। ফলে প্রতিযোগিতার বাজারে অনলাইন যেনো মানুষকে ফেলে চলেছে আরো গভীর খাদে। একই সঙ্গে ভার্চুয়াল জগতে বিভোরে থাকায় ব্যক্তিগত দূরত্বের পাশাপাশি নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষায়ও কেনো জানি তরুণ প্রজন্ম একেবারেই উদাসীন।
তবে বিষয়টি এমন নয় যে, এই অবস্থান প্রযুক্তি, পরিবর্তনের বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রযুক্তি যদি যথাযথভাবে পরিচালনা করা না হয়, তাহলে অনেক কিছুর সঙ্গে দেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র শিল্প হুমকির মুখে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি। প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের কারণে দেশেও স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের যেমন দ্রুত উত্থান ঘটেছে, তাতে তাদের জন্য সুযোগও তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখানোর সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থেই ধরে রাখতে হবে। তা না হলে প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখার সংস্কৃতি হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আষাঢ়ে গল্পে পরিণত হবে!
লেখক : ইব্রাহীম খলিল, বণিক বার্তা সংবাদপত্রে শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
ibrahimrumcj@gmail.com
https://www.facebook.com/ibrahimrumcj
তথ্যসূত্র
1. https://bit.ly/2PncvTY; retrived on: 25.11.2018
2. https://bangla.bdnews24.com/business/article1417335.bdnews; retrived on 25.11.2018
3. https://bit.ly/2QCExQ2; retrived on: 25.11.2018
4. https://bit.ly/2QCExQ2; retrived on: 25.11.2018
5. https://bit.ly/2RDDrAG; retrived on: 25.11.2018
6. https://bit.ly/2RDDrAG; retrived on: 25.11.2018
7. https://bit.ly/2UjI19c; retrived on: 25.11.2018
8. https://bit.ly/2UjI19c; retrived on: 25.11.2018
9. https://www.prothomalo.com/entertainment/article/1431931; retrived on: 25.11.2018
10. https://bit.ly/2UjI19c; retrived on: 25.11.2018
11. https://bit.ly/2RK6i6o; retrived on: 25.11.2018
12. https://bit.ly/2RK6i6o; retrived on: 25.11.2018
13. https://bangla.bdnews24.com/business/article1417335.bdnews; retrived on: 25.11.2018
14. https://bit.ly/2UmlYhZ; retrived on: 25.11.2018
15. https://bit.ly/2UmlYhZ; retrived on: 25.11.2018
16. https://bit.ly/2UmlYhZ; retrived on: 25.11.2018
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন