Magic Lanthon

               

প্রিয়াংকা দেবনাথ

প্রকাশিত ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

পর্দার বাইরেও অভিনয়ই করেছিলেন শ্রীদেবী

প্রিয়াংকা দেবনাথ

জীবনের চোরাগলি ধরে

‘কেন জানি না এক অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছে’¾২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ১১টায় এমনটাই টুইট করেন ভারতীয় চলচ্চিত্র তথা বিশ্বচলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা ও প্রভাবশালী অভিনয়শিল্পী অমিতাভ বচ্চন। তার ঠিক কিছু সময় পরই খবর আসে বলিউডের একজন সুপারস্টার পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে রঙিন পর্দা কাঁপানো এক নক্ষত্র, যার আকাশ কালো মেঘে ঢাকা পড়ে যায় হঠাৎ-ই। জীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তিনি কাটিয়েছেন ৫৪ বছর। ৮০-৯০ এর দশকে তিনি রাণী হিসেবে রাজত্ব করে গেছেন বলিউড ও টলিউডে। একের পর এক সুপারহিট সব চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন দর্শককে। তিনি বলিউডের প্রথম নারী সুপারস্টার শ্রীদেবী। তিনি শুধু চলচ্চিত্রে নানা দিকে বৈচিত্র্য রেখে গেছেন এমন নয়, তার ছিলো বৈচিত্র্যময় এক জীবনও। তবে সেই জীবনে অনেকগুলো অন্ধকার চোরাগলি ছিলো। দিনশেষে সেই চোরাগলিতেই হারিয়ে গেলেন তিনি।

ভারতের তামিলনাড়ুতে ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ আগস্ট জন্ম শ্রীদেবীর। তার বাবা ছিলেন আইনজীবী। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র চার বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন তামিল চলচ্চিত্র থুনাইভান-এ। তার অভিনীত প্রথম হিন্দি চলচ্চিত্র জুলি। মাত্র ১০ বছর বয়সে শ্রীদেবী প্রথম নায়িকা হিসেবে অভিনয় শুরু করেন। পাঁচ দশক ধরে তিনি অভিনয় করেছেন প্রায় তিনশোটি চলচ্চিত্রে। এতো অল্প বয়সে ‘নায়িকা’, তারপর সুপারস্টার এবং একজন অভিনয়শিল্পী হয়ে ওঠার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে শ্রী’কে। সমাজ, চলচ্চিত্রকে ধরে শ্রীদেবীর জীবনের সেই দীর্ঘ পথটাকে একটু ভিন্নভাবে দেখাই এই প্রবন্ধের লক্ষ্য।

একটি পরিসংখ্যান, কিছু প্রশ্ন

পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কমপক্ষে একশো ৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন শ্রীদেবী। অর্থাৎ এই সময়ে বছরে গড়ে তিনি অভিনয় করেছেন ১৩টি চলচ্চিত্রে। এর মধ্যে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে সবচেয়ে বেশি ২১টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি অভিনয় করেন ১১টি চলচ্চিত্রে। এই চলচ্চিত্রগুলোতে শ্রীদেবীর চরিত্রের মধ্যে যথেষ্ট বৈচিত্র্যও ছিলো। আখরি রাস্তায় শ্রীদেবী অভিনয় করেন পুলিশের ডি আই জি’র মেয়ে বিনীতা’র চরিত্রে। পরে তার প্রেম হয় অমিতাভের সঙ্গে। ঘর সংসার-এ শ্রীদেবী ধনী পরিবারের মেয়ে রাধা, মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে প্রকাশের (জিতেন্দ্র) প্রেমে পড়ে তার বাড়িতে তিনি কাজের মেয়ে সেজে থাকেন। তিন কয়েদীকে নিয়ে উগ্রবাদী একটি সংস্থা ধ্বংসের জন্য বাহিনী তৈরি করা হয় কারমায়। সেই তিন কয়েদীর একজনের প্রেমিকা রাধা হিসেবে পর্দায় হাজির হন শ্রীদেবী। অবশ্য জানবাজ-এ অল্প সময়ের জন্য অতিথি চরিত্রে প্রেমিকা হিসেবে শ্রীদেবীকে দেখা যায়।

ধরম অধিকারীতে গ্রামের সহজসরল মেয়ে প্রিয়া। যিনি কিনা শাড়ির কারখানায় কাজ করেন। আবার সালতানাত-এ একেবারে উল্টো চরিত্রে এক রাজ্যের শাহাজাদি ইয়াসমিন হিসেবে শ্রীদেবীকে দেখা যায়। ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্র নাগিনায় তিনি ছিলেন ইচ্ছাধারী এক নাগিন রজনী (ইচ্ছেমতো রূপ ধারণ করতে পারে)। ধনী পরিবারের ছেলে রাজীব (ঋষি কাপুর) অনাথ মেয়ে রজনীর প্রেমে পড়েন। সুহাগান-এ শ্রীদেবী গ্রাম্য এক কৃষকের মেয়ে জানকি। যিনি পরে শহরে পড়াশোনা করেন। আগ আউর সোলা-এ প্রভাবশালী নাগেশের বোন উষাকে (শ্রীদেবী) ভালোবাসে গরীব রাজু। নান আদিমায় ইল্লাই-এ ধনী বাবার মেয়ে প্রিয়া। বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করেন বিজয়কে (রজনীকান্ত)।

১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া ১১টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ১০টিতে শ্রীদেবী যে যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন তার একটি চিত্র এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এই হিসাব থেকে সহজেই বোঝা যায়, ১০টি চরিত্রের কোনোটির সঙ্গে কোনোটির সেই অর্থে কোনো মিল নেই। ব্যস্ত অভিনয়শিল্পী শ্রীদেবীকে মোটামুটি একই সময়ে এই চরিত্রগুলো ধারণ করতে হয়েছে। এখন প্রশ্ন এক বছরের মধ্যে অল্প সময়ের ব্যবধানে ১০টি চরিত্র ধারণ করা কী খুব সহজ কোনো ঘটনা! শ্রীদেবীর নিজের ভাষ্যমতে, শিশুশিল্পী থাকাকালীনই তাকে দুই শিফটে কাজ করতে হতো। পরবর্তী সময়ে নায়িকা হিসেবে যখন অভিনয় শুরু করেন, সেসময় ভোর ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত চার শিফটে কাজ করতেন তিনি। তার এই কথা থেকে বোঝা যায়, কতোটা ব্যস্ত একজন তারকা তিনি ছিলেন। তিনশো চলচ্চিত্রে অভিনয় করা শ্রীদেবী যদিও বলতেন, ‘যেকোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেই আমার মনে হতো এটাই আমার প্রথম চলচ্চিত্র এবং আমি এই প্রথম অভিনয় করছি।’

অথচ যেকোনো চরিত্রকে পর্দায় দাঁড় করাতে হলে তার পিছনে অনেক সময়, পরিশ্রম ও সাধনার দরকার হয়। সেই চরিত্রটাকে নিয়ে অনেক গবেষণা করতে হয়। চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে হয়। বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচীর ভাষায়, আমি চার বছর অপেক্ষা করে মাটির ময়না করেছি। তারপর দুই বছর অপেক্ষা করে অন্তর্যাত্রা। আমার ২০ বছরের ক্যারিয়ারে আমি কিন্তু ২০টি চলচ্চিত্রও করিনি! আমার টেলিভিশন ও মঞ্চ মিলিয়ে প্রায় ২৭ বছরের ক্যারিয়ার। আমি কিন্তু দুশো নাটকে অভিনয় করিনি। দু’বছর হয়েছে যে শিল্পীর, তার কিন্তু পাঁচশো নাটকে অভিনয় হয়ে গেছে! আমি এখনো দুশো নাটকে অভিনয় করিনি ২৭ বছরের ক্যারিয়ারে। পুরস্কার পেয়েছি ২০টিরও বেশি; সম্মাননা পেয়েছি দুশোরও বেশি; ভালোবাসা পেয়েছি একশো কোটিরও বেশি। এটাই হচ্ছে দায়িত্ব, এটাই হচ্ছে শিল্পীর সেই দায়িত্বশীল হওয়ার জায়গা।

শ্রীদেবীর চেয়ে রোকেয়া প্রাচী ভালো/বড়ো/গুণী শিল্পী কিনা এই বিতর্ক আলোচনার বিষয় নয়। তবে একজন অভিনয়শিল্পীর অভিনয় করতে গিয়ে কী ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় এবং কী ধরনের দায়িত্বশীলতার মধ্যে থেকে তাকে অভিনয় করতে হয়, সেটা বোঝানোর জন্যই এই বক্তব্যের অবতারণা।

কিন্তু শ্রীদেবীর প্রতিদিনের রুটিন দেখে এটা স্পষ্ট যে, শিল্পের প্রতি এতো দায়িত্বশীল হওয়ার পরিস্থিতি হয়তো তার ছিলো না। তবে এটা ঠিক তার চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসা করেছে, দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছে। তাহলে কী চলচ্চিত্রের মধ্যে তিনি গড়পড়তা কাজ করে গেছেন; যেখানে খুব দায়িত্বশীল না থাকলেও কোনো প্রভাব পড়েনি! আবার এ প্রশ্নও জাগে, চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি কী কোনো বিশেষ মসলার কাজ করেছেন মাত্র! একথা সত্যি যে, তার অভিনীত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই জনপ্রিয়তার সঙ্গে ব্যবসাসফলও হয়েছে। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার বোঝা দরকার, ব্যবসাসফল মানেই শিল্প সফল নিশ্চয় নয়। ব্যবসায়িক সফলতা তাকে হয়তো প্রথম নারী সুপারস্টার হিসেবে পরিচিত করেছে। তবে অভিনয়শিল্পী হিসেবে তিনি কতোটুকু কৃতিত্ব দেখিয়েছেন, সে প্রশ্ন বোধ হয় থেকেই যায়।

কেবলই সুপারস্টার!

প্রথম ভারতীয় নারী সুপারস্টার বলা হয় শ্রীদেবীকে। তো কেমন ছিলো এই নারী সুপারস্টারের কর্মজীবনের সবচেয়ে ব্যস্ততম সময়টা! যতোদূর জানা যায়, আর দশজন ভারতীয় নারীর মতো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার ফুসরত মেলেনি শ্রীর। কেবল অভিনয়ই করে গেছেন আমৃত্যু। যে অভিনয়ই তাকে সুপারস্টার বানিয়েছে। একজন সুপারস্টারকে যে আলো-ঝলমলে পরিবেশের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়, সেখানে দিনশেষে প্রকৃত মানুষটাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রকৃত যে মানুষটা শ্রীদেবীকে ধারণ করে, যেটা শ্রীদেবীর সত্তাকে ধারণ করে, সেই মানুষটাকে এই ঝলমলে জীবনে হয়তো খুঁজে পাওয়া যায় না। সেটা যেকোনো মানুষের জন্যই। দুর্ভাগ্য যেটা তা হলো, এই সুপারস্টাররা এতো বেশি জনপরিসরের মধ্যে থাকে যে, তাদের পক্ষে নিজেকে নিজের সেই অস্তিত্বের জায়গায় নিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দিনশেষে প্রায় সব সুপারস্টারের মনে হয়তো একটা কষ্ট, দুঃখ বাসা বাঁধে। তার ওপর নারী হলে তো সেই কষ্টে আরো নতুন মাত্রা যোগ হয়।

কেননা একজন শ্রীদেবী তো আর একদিনে হয়ে ওঠে না। দিনের পর দিন সময় লাগানোর মাধ্যমে তৈরি হয় একজন শ্রীদেবী। রঙিন জগতের সঙ্গে যার পথ চলার শুরু চার বছর বয়সে। এরপর ১০ বছরে নায়িকা। এই পরিস্থিতিগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করাটাও নিশ্চয় খুব সহজ ছিলো না তার জন্য। তাকে দিয়ে হয়তো অভিনয়টা করানো হয়েছে; শ্রী অভিনয়টা করেছেনও। এবং শেষ দিন পর্যন্ত করেই গেছেন। কিন্তু বিষয়টাকে যদি একটু অন্যভাবে দেখা যায়, যে সময়টাতে সাধারণত ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে, সেই সময়টা শ্রীদেবীর (চার বছর বয়স থেকেই শ্রীদেবীকে নিয়মিত দুই শিফটে অভিনয় করতে হয়েছে) অন্যভাবে কেটেছে। অর্থাৎ জন্মের দিন থেকে (ফ্রয়েডের মতে) প্রিজেনিটাল স্টেজ পর্যন্ত যে সময়, অভিনয়ের কারণে তাকে সেই সময়ে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে। ফলে ব্যক্তিত্ব বিকাশের সময়টা মোটেও স্বাভাবিক হয়নি শ্রীদেবীর। তাই শ্রীদেবীর ব্যক্তিত্বের গঠন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

শ্রীদেবীর মৃত্যুর পর বলিউড নির্মাতা রাম গোপাল ভার্মা তাকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক মন্তব্য করেন। টুইটারে করা ভার্মার সেই বক্তব্যে বলা হয়, ‘ব্যক্তিগত জীবনে চরম অসুখী ছিলেন [শ্রীদেবী]। সাদা চোখে যা দেখা যায়, তার থেকে বাস্তব জীবন কতটা বিপরীত হতে পারে, তার চরম দৃষ্টান্ত ছিলেন শ্রীদেবী।’

ভার্মার ওই টুইট থেকে আরো জানা যায়, বনি কাপুরকে যখন বিয়ে করেছিলেন শ্রীদেবী, তখন তার অবস্থাও বেশ খারাপ। ঠিক এই সময় তার বোন সম্পত্তির ভাগ দাবি করেন। যদিও সম্পত্তির সবটা ছিলো শ্রীদেবীর কষ্টার্জিত উপার্জন। তার নিজের উপার্জিত সম্পত্তি বোনের দাবির কারণে ভাগাভাগি হয়ে যায়। তখন তাকে অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে পড়তে হয়। তার মানে সুপারস্টারদের জীবনেও এ ধরনের সঙ্কটগুলোও থাকতে পারে। অথচ দর্শক যখন দূর থেকে তাদের দেখে, তারা হয়তো ভাবে সুপারস্টার হলো সুপারম্যান। কিন্তু বাস্তবে সুপারস্টাররাও তো আর দশ জনের মতোই মানুষ। পার্থক্য কেবল নিজের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের বাধ্যবাধকতায়। তাই হয়তো শ্রীদেবীকে নিয়ে ভার্মার মন্তব্য অনেকখানি যথার্থ মনে হয়¾ ‘জীবনে শুধুমাত্র ক্যামেরার সামনে কাটানো সময়টুকুই ছিল তাঁর [শ্রীদেবী] কাছে সবচেয়ে সুখের।’ এসবের বিপরীতে হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে সেই সুখের জায়গাতে তিনি যেতেই পারেননি। কারণ দর্শকের বৃহৎ চাহিদা মেটাতে গিয়ে সারা পৃথিবীর সুপারস্টাররা তো তাদের নিজেদের জায়গাটাই হারিয়ে ফেলে। ক্যামেরার সামনে তাকে যেমন হাসিখুশি, প্রাঞ্জল দেখাতো, বাস্তব জীবনে হয়তো ততোটাই অসুখী ছিলেন তিনি। তিনি এমন এক জীবনের সাক্ষী যেখানে চাকচিক্যে ভরা জীবনের বাইরে থেকে যায় অনেকখানি অন্ধকার।

মুক্তি আর আসে না!

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম নারী কবি হিসেবে খ্যাত চন্দ্রাবতী। তাকে কখনো পরিচয় করানো হয় ১৬ শতকের ‘মনসামঙ্গল’-এর কবি দ্বিজ বংশীদাসের মেয়ে আবার কখনো বিখ্যাত কবি দ্বিজ বংশীদাসের মেয়ে (বিভিন্ন গ্রন্থে) হিসেবে। তিনি কিন্তু কবি নন, নারী কবি, স্ত্রীকবি। ‘এভাবে, চন্দ্রাবতীর নিজপরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাঁর পিতৃপরিচয়’ এবং লিঙ্গের পরিচয়। এ তো গেলো স্রষ্টা হিসেবে নারীর অবস্থান। অন্যদিকে সাহিত্যেও নারীর যে উপস্থাপন তা দেখে বোঝাই যায় নারীর অবস্থান আসলে কোথায়? সেখানে নারীকে কখনো কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নেই। ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’-এর নারীচরিত্র সীতা, সাবিত্রী’র কথাই ধরা যাক। তারা পুরুষকে ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে পুজো করেছে। পুরুষের জন্য উৎসর্গ করেছে নিজেদের; জীবন কাটিয়েছে পুরুষের ওপর নির্ভর করে। অবশ্য এই চরিত্রগুলোই সমাজে বেশি পছন্দনীয়। তারাই নারীদের ‘আদর্শ’। কথায় কথায় তাদের উদাহরণ দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ‘মহাভারত’-এর দ্রৌপদী কিংবা রাধা কিন্তু বাঙালির আদর্শ নারী হয়ে উঠতে পারেননি। কেননা দ্রৌপদী ছিলেন পাঁচ জন পুরুষের স্ত্রী, আর রাধা তো একজনের স্ত্রী হয়েও কৃষ্ণের সঙ্গে অভিসারে গিয়েছিলেন। এ কারণে তাদেরকে আর যাই হোক নারীর ‘আদর্শ’ বলা সাজে না। এ চরিত্রগুলো পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থি। তার মানে নারীর আদর্শ হতে হলে তাকে অবশ্যই চিরাচরিত নিয়মের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। আর সেই নিয়মগুলোও অবশ্যই তৈরি হতে হবে পুরুষের দ্বারা।

শুধু সাহিত্যে বা মহাকাব্যেই নয়, সমাজের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ হিসেবে নারী তার প্রাপ্য সম্মান বা অধিকার কোনোটাই যথাযথ পায়নি। আর তাই আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সমাজে নারীদের অবস্থান নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলতে হয়। আলাদা করে প্রশ্ন তুলতে হয় নারীর সত্ত্বা নিয়ে। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যম বিশেষ করে চলচ্চিত্রেও নারীর পরিবেশনা হয়েছে অন্য সবকিছুর সমান্তরালে।

প্রচলিত সমাজ বাস্তবতার মতো পুরুষ প্রাধান্যশীলতার ব্যাপক প্রভাব চলচ্চিত্রেও বিদ্যমান। এখন পর্যন্ত নির্মিত বিশ্বের অধিকাংশ চলচ্চিত্রই পুরুষ চরিত্রকেন্দ্রিক। ওই চরিত্রকে ধরেই চলচ্চিত্রের কাহিনি এগোয়। প্রয়োজনে নারীরা পর্দায় আসলেও তারা কাহিনির সঙ্গে কতোটা সংশ্লিষ্ট তার গুরুত্ব বোঝাই মুশকিল। নারী যেনো কাহিনিতে থেকেও নেই। পর্দায় যখন ক্ষমতাসীনদের প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র নিয়ে পুরুষ হাজির হয়, তখন নারী আসে কেবল পুরুষের ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হওয়ার জন্য, তার কাছে নত হওয়ার জন্য!

অর্থাৎ চলচ্চিত্রের বাইরে নারীর যে জীবন, সেটা আর রুপালি পর্দা খুব আলাদা কিছু নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের নারী, বাস্তবের নারী কাছাকাছি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে। অবশ্য এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে নারীর শুরুটা খুব বেশি ইতিবাচক ছিলো না। নানান সমালোচনাকে পিছনে ফেলে তারা আজকের এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। যে পর্যায়েও তাকে ভালোভাবে দাঁড়াতে নানান প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় প্রতিনিয়ত।

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম নারী হিসেবে অভিনয় শুরু করেন নটী বিনোদিনী (১৮৬২ Ñ১৯৪১)। পেশায় ছিলেন যৌনকর্মী। শুরু থেকেই তাকে নানাভাবে বঞ্চনা ও প্রতারণার স্বীকার হতে হয়েছে। এমনকি তার অভিনয় গুরুও তার সঙ্গে প্রতারণা করেন। কেননা তাকে অভিনয়শিল্পী বা সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখা হতো না। বাংলাদেশের একেবারে শুরুর দিকের চলচ্চিত্র লাস্ট কিস-এর (১৯২৯) নায়িকা ছিলেন ললিতা। তিনিও পেশায় ছিলেন যৌনকর্মী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শুরু থেকেই কেনো যৌনকর্মী নারীদেরকেই চলচ্চিত্রে আনা হলো? তার মানে চলচ্চিত্রে সেই সময়টাতে হয়তো ‘সাধারণ মেয়েরা’ আসতে চাইতো না। কারণ সমাজও সেসময় চায়নি যে কোনো ‘সাধারণ মেয়ে’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করুক এবং কোনো নারীও হয়তো সেসময় সেটা চায়নি। চলচ্চিত্রের প্রয়োজনেই তাই সেসময় যৌনকর্মীদের আনতে হয়েছিলো। আর দর্শকও তাদের পছন্দ করেছিলো কিংবা পছন্দ করতে বাধ্য হয়েছিলো। তার মানে শুরু থেকেই চলচ্চিত্রে নারীর যে ইমেজ সৃষ্টি হয়, তা মোটেও ইতিবাচক ছিলো না।

পঞ্চাশের দশকের অভিনয়শিল্পী মধুবালা, যাকে ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে সেরা ‘সুন্দরী’ হিসেবে সবাই একনামে চেনে। প্রতিভা, যশ, খ্যাতি কোনো কিছুরই কমতি ছিলো না তার। অভিনয় করতে করতে দিলীপ কুমারের সঙ্গে মন দেওয়া নেওয়া হয়।

কিন্তু বাঁধা হয়ে দাঁড়ান মধুবালার বাবা আতাউল্লা খান। তিনি প্রথমে তাদের বিয়েতে রাজি ছিলেন। কিন্তু তিনি পুরো বিষয়টিকে দেখছিলেন ‘একটি বিজনেস ডিল’ হিসেবে। আতাউল্লা খান ততদিনে একটি প্রোডাকশন হাউসের মালিক। তার পরিকল্পনা ছিল দিলীপ কুমার ও মধুবালার বিয়ের পর তারা শুধুমাত্র তার প্রোডাকশনের সিনেমাতেই অভিনয় করবেন। কিন্তু আতাউল্লা খানের এ ধরনের অর্থলোভী আচরণ দিলীপ কুমারের পছন্দ হয়নি। তিনি সরাসরি জানিয়ে দেন সিনেমা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব পদ্ধতির বাহিরে যাবেন না, এমনকি তার নিজের প্রোডাকশন হাউস হলেও তিনি এ ধরণের সিদ্ধান্ত নিতেন না। এর ফলে আতাউল্লা খান ক্ষুব্ধ হন এবং মধুবালার সাথে দিলীপ কুমারের সম্পর্কের বিরোধিতা করতে শুরু করেন। পিতৃভক্ত মধুবালা পড়েন বিপাকে।

মধুবালার মতো সুপারস্টারকে পিতৃতন্ত্রের কাছে মাথা নুইয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে নানান প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। বাবার শাসন আর বাধা-নিষেধের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে নিজের যে একটা ব্যক্তিগত জীবন ছিলো সেটাই যতোদূর সম্ভব ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। এর পরের ঘটনা সবারই জানা, মধুবালা বিয়ে করেন কিশোর কুমারকে। কিশোর কুমারকে বিয়ে করলেও ভালোবাসতেন দিলীপ কুমারকে। বিবাহিত জীবনে তিনি একদমই সুখী ছিলেন না। এবং বিয়ের মাত্র নয় বছরের মাথায় তিনি মারা যান।

উপমহাদেশের প্রথম অস্কার বিজয়ী নারী ভানু আথাইয়া’র কথা ধরা যাক। ‘১৯৮৩ সালের ১১ এপ্রিল অস্কারের ৫৫তম আসরে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ইতিহাস গড়েছিলেন ভানু আথাইয়া। আজ পর্যন্ত নারী হিসেবে তার এ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেনি কেউ। এই অর্জন ভানু আথাইয়াকে অনন্য করে রেখেছে।’ উপমহাদেশের আরেকজন অস্কারজয়ী পুরুষ সত্যজিৎ রায়, যাকে শতকরা ৭০ জন মানুষ চেনে। আর এই অস্কার বিজয়ী নারী ভানুর কথা হয়তো বেশিরভাগ মানুষই জানে না। এতো কিছুর পিছনে কি তবে একটাই কারণ, এরা নারী?

আজকের ক্যাটরিনা, কারিনা কিংবা ঐশ্বরিয়া কি ভিন্ন কোনো বার্তা দেয়? তাহলে পরিবর্তনটা আসলে কোথায়! নাকি আজকের নারীও সেই নটী বিনোদিনীর জায়গাতেই পড়ে আছে। আর যদি সেটা না-ই হবে, তাহলে কেনো এই আইটেম সঙ, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নারী শরীরই বা তাহলে কেনো! তাদেরকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে নয় বরং আইটেম সঙ-এর প্রয়োজনে একধরনের আইটেম পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আবার কখনো নায়কের প্রয়োজনেও পর্দায় আসে নারী কথিত সুন্দরী, মায়াবী, আবেদনময়ী হিসেবে। হলিউড, বলিউড, ঢালিউড সব ইন্ডাস্ট্রিতেই নারী শুধু কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রকে উজ্জ্বল করে। উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, টাইগার জিন্দা হে, পিকে, সুলতান যেখানে মুখ্য করে তোলা হয়েছে পুরুষ চরিত্রগুলোকে। নারীর অস্তিত্ব সেখানে খুবই ক্ষীণ। এক্ষেত্রে অভিনয়শিল্পী হিসেবে নারী কতোখানি নিজেকে ইন্ডাস্ট্রিতে উপস্থাপনের সুযোগ পাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

প্রথম নারী সুপারস্টার শ্রীদেবীও এই প্রশ্ন, এই চর্চার বাইরে যেতে পারেননি। ভার্মার ভাষায়, শ্রীদেবী ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন এক বন্দি পাখির মতো।১০ আর সুপারস্টার শ্রীদেবী ছিলেন পুরুষ প্রাধান্যশীল চর্চায় বন্দি। মৃত্যু কি শ্রীদেবীদের এই বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে?

অভিনয়শিল্পী শ্রী

একজন শিল্পী যখন অভিনয় করেন, তখন অভিনয়শিল্পী হিসেবে তিনি নিজেকে কতোখানি উৎসর্গ করবেন, সেটা শুধু তার ওপরই নির্ভর করে না। এর জন্য তার চারপাশে অনেকগুলো বিষয় জড়িয়ে থাকে। একই সঙ্গে কী চরিত্রে তিনি অভিনয় করছেন, সেটা যেমন জরুরি, চরিত্রটাকে নির্মাতা কীভাবে পর্দায় দেখাতে চায় সেটাও জরুরি। এমনকি অভিনয়শিল্পীও তার কাজের জন্য কতোখানি নিষ্ঠাবান, সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রত্যেক অভিনয়শিল্পীর মধ্যে কোনো না কোনোভাবে অভিনয়ের ক্ষমতা থাকে। এটা চর্চার মধ্য দিয়ে, সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বেরিয়ে আসে। সেটা যে শুধু বেরিয়ে আসে তা নয়, কখনো কখনো জোর করে বের করে আনতেও হয়।

এই আলোচনায় অভিনয়শিল্পী হিসেবে শ্রীদেবীর অবস্থানকে মূল্যায়ন করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে এটা করা খানিকটা কঠিনও। কারণ ৫০ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি বিপুল পরিমাণ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় নানা কারণে তাকে নানাধরনের চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে হয়েছে। এ কারণে ঠিক কোন চলচ্চিত্রগুলো সময় বা কালের পরিপ্রেক্ষিতে টিকে যাবে কিংবা টিকে থাকবে, এটা বলার সময় এখনো আসেনি। এ আলোচনা সেদিকে না নিয়ে বরং দুটি ভিন্ন সময়ে নির্মিত তার দুটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়শিল্পী শ্রীদেবী বিষয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে। যার একটি মুক্তি পেয়েছিলো শ্রীদেবীর ক্যারিয়ারের শুরুর কিছুটা পরে, আরেকটি তার প্রায় ৩৫ বছর পরে।

বালু মহেন্দর নির্মিত সদমাতে (১৯৮৩) নেহালতা (শ্রীদেবী) একজন আধুনিক চিন্তাভাবনার মেয়ে। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় স্মৃতি হারিয়ে ফেলেন। নেহার (ডাকনাম) মানসিক অবস্থা হয়ে যায় পাঁচ বছরের শিশুর মতো। নার্সিংহোম থেকে একজন লোক তাকে অপহরণ করে যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দেন। সেখান থেকে নেহাকে উদ্ধার করে সোমু (কমল হাসান)। সোমু নিজের বাড়ি নিয়ে যান রেশমিকে (যৌনপল্লিতে নেহার ছদ্মনাম)। সোমুর আদরে-যত্নে অনেকদিন পার হয়ে যায়। এদিকে নেহার পরিবারের লোকজন পাগলের মতো তাকে খুঁজতে থাকে। একসময় তারা নেহার খোঁজ পায়। অন্যদিকে সোমু রেশমিকে গ্রামের এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। সারাদিন ধরে চিকিৎসা চলতে থাকে। সোমুকে একটি বিশেষ কাজে গ্রামের বাইরে যেতে হয়। সারাদিনের চিকিৎসায় অদ্ভুতভাবে রেশমি সুুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি দুর্ঘটনার পর থেকে সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত সব স্মৃতি ভুলে যান। তিনি ফিরে যান বাবা-মায়ের কাছে। সোমু গ্রামে ফিরে সব জানতে পারেন এবং স্টেশনে ছুটে যান। ট্রেনে নেহাকে দেখতেও পান। চিৎকার করে, নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে রেশমিরূপী নেহাকে ডাকতে থাকেন তিনি। কিন্তু অতীতের কথা নেহার কিছুই মনে পড়ে না। ট্রেন চলে যায়, সঙ্গে নেহাও।

এই চলচ্চিত্রে শ্রীদেবীকে দুটি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে হয়। পশ্চিমা চিন্তাভাবনায় প্রভাবিত মেয়ে হিসেবে নেহা সারাক্ষণ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আনন্দে মেতে থাকেন। অন্যদিকে মানসিকভাবে পাঁচ বছরের শিশুর চরিত্র রেশমি হিসেবেও তাকে অভিনয় করতে হয়। ছোটো শিশুরা যেভাবে হাঁটে-চলে, কথা বলে, বায়না করে¾সবকিছুকে গভীর মমতায় অনুধাবন করতে হয়েছে শ্রীকে। চলচ্চিত্রে ২৮ মিনিট ২০ সেকেন্ডে রেশমির শিশুর মতো আইসক্রিম খাওয়া, বাচ্চাদের মতো পোশাক সামলাতে না পারা, অভিনয়ে অন্য মাত্রা যোগ করে। রেশমির সব আবদার মেটাতে বেচারা সোমুকে কখনো বানরের মতো খেলা দেখাতে, কখনো ঘোড়া সাজতে হয়। এতো ভালোবাসা পাওয়া রেশমি আবার মুহূর্তের মধ্যে নেহা হয়ে যায়। পাশাপাশি অথচ একেবারে ভিন্ন দুটি চরিত্রে কী দুর্দান্ত অভিনয়ই না করেছেন শ্রীদেবী, সেই ৩৫ বছর আগে, ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুতে!

রবি সাবাওয়ালের নির্মিত মম-এ (২০১৭) শ্রীদেবী অভিনয় করেছেন ৫৩ বছর বয়সে। এটি তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র। মম-এ শ্রীদেবী স্কুলশিক্ষিকা দেবকি। তিনি যাকে বিয়ে করেন তার আগের স্ত্রীর এক মেয়ে আছে। আর বিয়ের পর তার একটি মেয়ে হয়। নতুন দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকেই সেই মেয়ের সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা করতে থাকেন দেবকি। কিন্তু শত চেষ্টার পরেও মেয়ের মনে কোথাও একটা চাপা অভিমান ছিলো শুরু থেকেই। যে কারণে দেবকি সৎ মেয়ের মনে মায়ের আসন করতে পারছিলেন না। তারপরও দুই মেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে ভালোই দিন কাটছিলো তাদের। কিন্তু একটি ঘটনা সবকিছু উলটপালট করে দেয়¾রাতে এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে ধর্ষিত হন সৎ মেয়ে। এই ঘটনার পর মায়ের প্রতি মেয়ের অভিমান আরো দৃঢ় হয়। এদিকে চার অভিযুক্ত ধরা পড়লেও প্রমাণের অভাবে আদালত তাদের বেকসুর খালাস দেন। তবে মেয়ের ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন দেবকি। নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে ধর্ষকদের খুঁজে শাস্তি দিতে সক্ষম হন মা। এবং মা-মেয়ের মান অভিমানের পালা শেষ হয়।

গল্পটা শুনতে সাদামাটা মনে হলেও মা চরিত্রে শ্রীদেবী যেভাবে হাজির হয়েছেন তা সত্যিই ভিন্ন কথা বলে। মায়ের প্রকৃত সাহস, শক্তিকে কতোভাবে প্রকাশ করা যায়, তার দৃষ্টান্ত মম। এটা শুধু সৎ মা ও মেয়ের চিরাচরিত মন কষাকষির গল্প নয়। পরোক্ষভাবে মা-মেয়ের এক অসাধারণ সম্পর্কই তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে মেয়ে চেতনে-অচেতনে মাকে নানা অসংলগ্ন কথা বললেও, মা খুব কৌশলে সেগুলো মানিয়ে নেন; হাজার দূরে সরালেও মেয়েকে কাছে টেনে নেন। মেয়ের মন জুগিয়ে চলতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন মা। ভয়, দুর্বলতা শব্দগুলো যেনো মা শব্দটির বিপরীত। ধর্ষণ পরবর্তী সময়ে মেয়ের কষ্ট ভাগ করে নিতে না পারার যন্ত্রণা শ্রীদেবী অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন দেবকি চরিত্রে। শেষ পর্যন্ত মায়ের আর্তনাদকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে দেবকি অপরাধীদের শাস্তি দিয়েছেন। মেয়ের জন্যই সমাজ ও আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

৩৫ বছরের ব্যবধানে যে দুটি চলচ্চিত্র নিয়ে এই আলোচনা, সেটাই কিন্তু কেবল শ্রীদেবী নন। এই শ্রীদেবী কিন্তু সুপারস্টার। আজকের ক্যাটরিনা, প্রিয়াঙ্কা, দীপিকা কিংবা সানি’রও কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যের চলচ্চিত্র আছে। তার মানে এই নয় যে, নারী অভিনয়শিল্পী হিসেবে শ্রীদেবীসহ অন্যরা সবকিছু উতরে অভিনয়শিল্পী হয়ে উঠেছে। এখনো অনেক চলচ্চিত্রে ক্যাটরিনাদের কেবল নারী শরীরসর্বস্ব আইটেম সঙ-এ হাজির হতে দেখা যায় চরিত্রের বিন্দুমাত্র গুরুত্ব ছাড়াই। সেখানে নারী শরীরের বিপরীতে টাকার অঙ্কটা একটা বড়ো ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। শ্রীদেবী তার ৫০ বছরের ক্যারিয়ারে এই চক্র থেকে বের হতে পেরেছেন কি? 

শ্রীদেবীকে মরিয়া প্রমাণ করিতে হইলো ...

প্রথমে জানা যায়, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শ্রীদেবী মারা গেছেন। কিন্তু পরে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হলো, ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ড্রাউনিং’। পুরো প্রতিবেদনে আর সবকিছুর থেকে উজ্জ্বল ছিলো এই দুটি শব্দ। ফরেনসিক বিভাগ এ নিয়ে আর কিছুই সেই অর্থে ব্যাখ্যা করেনি। হতে পারে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বা অন্য কোনো কারণে চৌবাচ্চায় ডুবে গেছেন। হতে পারে তার গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিলো। ময়নাতদন্তে এর কোনো কথাই বলা হয়নি। কিংবা স্বামী বনি কাপুর তাকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টা করলেন কি না, তারও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা কোথাও নেই। কোনো কোনো জায়গায় বলা হচ্ছে, অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্য পানিতে ডুবে গিয়েছিলেন শ্রী। কিন্তু শ্রীদেবীকে যারা ব্যক্তিগতভাবে জানতো তারা বলেছে, শ্রী খুবই নিয়মমাফিক জীবনযাপন ও ডায়েট করতেন। তাই অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে এই ঘটনা হয়েছে তা মেনে নেওয়াই কঠিন। এমনকি প্রতিবেদনে অ্যালকোহলের পরিমাণ নিয়েও কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি। আর কোনো মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত নাকি আত্মহত্যা নাকি অন্যকিছু¾তা তো ফরেনসিক বিভাগের নির্দিষ্ট করে বলার কথা নয়, তারা শুধু মৃত্যুর কিছু লক্ষণ বলতে পারে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার জন্য পুলিশি তদন্ত কিংবা আদালতের সাক্ষ্য-প্রমাণের দরকার পড়ে। তাই শ্রীদেবীর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আগেই বলেছি, শ্রীদেবীর জীবনের গল্পটা মোটেও মসৃণ ছিলো না। তারপরও এই অমসৃণ পথ ধরেই তিনি হেঁটেছেন ৫৪টা বছর। এই জীবনে তিনি নাকি ২৯ বার অস্ত্রোপচার করিয়েছেন! বার বার অস্ত্রোপচার, ফেস লিফটিং¾নিজের শরীরের ওপর কি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন শ্রীদেবী? মদ্যপানের সঙ্গে সেই ভারসাম্যহীনতা শ্রীদেবীর অকালমৃত্যুতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।১১ ‘সুন্দর’ থাকার প্রতিযোগিতা আর ভালো থাকার অভিনয় করতে করতেই হয়তো তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে অচিন দেশে। যেখানে তাকে হয়তো আর এখন কোনো প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয় না।

লেখক : প্রিয়াংকা দেবনাথ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সঙ্গীত চর্চা করেন।

priyankadebnath422@gmail.com

https://www.facebook.com/priyanka.debnath.31521

 

তথ্যসূত্র

১. https://bit.ly/2CHXpX8; retrieved on: 28.08.2018

২. https://www.youtube.com/watch?v=kuS_Fe-uKy0; retrieved on: 28.08.2018

৩. প্রাচী, রোকেয়া; ‘অভিনয় ও পেশাদারিত্ব’; ম্যাজিক লন্ঠন; সম্পাদক : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ১৪, বর্ষ ৭, জানুয়ারি ২০১৮, পৃ. ২৫২।

৪. https://goo.gl/qeHwyJ; retrieved on: 10.09.2018

৫. https://goo.gl/GuaLqA; retrieved on: 13.09.2018

৬. চক্রবর্তী, সুস্মিতা; “চন্দ্রাবতীর রামায়ণ: নারীর ‘ইতিহাস’, নারীর স্বর”; চন্দ্রাবতী; সম্পাদনা : সুস্মিতা চক্রবর্তী; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ১, বর্ষ ১, পৃ. ৫৩।

৭. ইসলাম, শফিকুল; ‘বৃহৎ এই বিনোদন কারখানা চায়, কেবল একই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ হোক’ শিরোনামের সাক্ষাৎকারের ভূমিকা থেকে নেওয়া; ম্যাজিক লন্ঠন; সম্পাদক : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ১৩, বর্ষ ৭, জুলাই ২০১৭, পৃ. ৩৪০।

৮. https://roar.media/bangla/main/history/madhubala-the-beauty-with-tragedy/; retrieved on: 20.09.2018

৯. হায়দার, কাজী মামুন; “নারী-ভানুর গান্ধী জয়, শিল্পে জয়ী নারীর ‘পরাজয়’”; ম্যাজিক লন্ঠন; সম্পাদক : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সংখ্যা ৭, বর্ষ ৪, জুলাই ২০১৪, পৃ. ৭১।

১০. https://bit.ly/2yfxang; retrieved on: 28.09.2018

১১. https://bit.ly/2QOxH6x; retrieved on: 28.09.2018

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন