আনতারা সোনিয়া
প্রকাশিত ০১ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
অভিমানী গুরু’র শিল্প সৃষ্টির তাড়না
আনতারা সোনিয়া

নক্ষত্রের পতন এবং
চলচ্চিত্র একদিকে যেমন বিনোদনের অফুরন্ত ভাণ্ডার, অন্যদিকে সমাজকে দেখার এক মোক্ষম হাতিয়ারও। চলচ্চিত্র কখনো প্রতিবাদের ভাষা শেখায়, আবার কখনো দু’চোখে স্বপ্ন ছড়িয়ে দেয়। এই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রক্ষমতা বোঝার জন্য চলচ্চিত্রের সমতুল্য মাধ্যম শুধু চলচ্চিত্রই। সেই চলচ্চিত্র নিয়ে ব্যক্তিমানুষ নানা সময়, নানাভাবে কাজ করেছে। কেউ আবার চলচ্চিত্রকে ধারণ করেছে নিজের ভিতরে। এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তেমনই এক নাম গুরু দত্ত। বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষটি অভিনয়, প্রযোজনা, পরিচালনা, চিত্রনাট্য লেখাসহ সবকিছুতেই অনন্যতা দেখিয়েছেন। আগেই বলেছি, কেউ কেউ চলচ্চিত্রকে ধারণ করে; আর গুরু সেটাই করেছেন। মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে তিনি তার ফলও পেয়েছিলেন। তিনি খুবই স্বল্প সময় চলচ্চিত্রাকাশে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার রেশ আছে বহুকাল; থাকবেও। তার অনবদ্য সৃষ্টিকর্ম সমকালেও তার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই আলোচনা গুরু দত্ত ও তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র পিয়াসা নিয়ে।
জীবন পুষ্পের রঙিন কলি
কিছু কিছু মানুষ পরিবেশ কিংবা পরিস্থিতির কারণে গতানুগতিক পদ্ধতিতে জীবন ভেলা ভাসায়। আবার কেউ কেউ বৈরী পরিবেশের বিরুদ্ধে নিরলস প্রচেষ্টায় হয়ে ওঠে অনন্য সাধারণ। তেমনই একজন গুরু দত্ত। স্বল্প সময়ে তার কর্মজীবনের যে বিস্তৃত পরিসর, তা সত্যিই বিরল। তাইতো এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্র-নির্মাণ নিয়ে কথা বলতে গেলে গুরুর নাম পাওয়া যাবে প্রথম সারিতে। মাত্র ২০ বছরের চলচ্চিত্র-জীবনে গুরু সৃষ্টি করেছেন ৩২টি চলচ্চিত্র। গুণে-মানেও কম যায় না, তার একেকটি সৃষ্টি। পিয়াসা কিংবা কাগজ কা ফুল দেখলেই গুরু দত্তের অভিনয় সুনিপুণতা সম্পর্কেও আন্দাজ পাওয়া যায়। মানুষ হিসেবে অনেকাংশে আবেগী আর অগোছালো হলেও অভিনয় ও চলচ্চিত্রের নানা ক্ষেত্রে গুরু ছিলেন অসম্ভব রকমের সাজানো-গোছানো।
গুরু দত্তের জন্ম ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুলাই ভারতের মাইসুর প্রদেশের ব্যাঙ্গালুলুর শহরে (বর্তমানে কর্ণাটক)। তার পুরো নাম বসন্ত কুমার শিব শঙ্কর পাড়ুকোন। পারিবারিক ঐতিহ্যের দিক দিয়ে তারা ছিলেন ব্রাহ্মণ। কর্ণাটকে জন্ম হলেও কলকাতার ভবানীপুরে শৈশব কাটে তার। সেখানেই বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি গুরুর ভালোবাসা শুরু। বড্ড ভালোবেসে ফেলেন বাঙালি সংস্কৃতিটাকে; এমনকি পর্দায় ব্যবহারের জন্য বেছে নেন বাঙালিয়ানা ঢঙের নাম ‘গুরু দত্ত’। গুরুর বাবা-মা দুজনেই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তাই পারিবারিক আবহেই তার সংস্কৃতি চর্চার হাতেখড়ি হয়েছিলো। তিনি নৃত্য শিখেছিলেন আলমোরার উদয় শংকর ডান্স অ্যাকাডেমিতে। বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষটির শিক্ষাজীবন কাটে কলকাতায়।
জীবনের নৌকা চলে হেলেদুলে
গুরু দত্তের পেশাজীবন শুরু কলকাতার ‘লেবিয়ার ব্রাদার্স’ নামে এক ফ্যাক্টরিতে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে। যার জীবন, স্বপ্ন, প্রত্যাশা সবই সংস্কৃতিকে ঘিরে তার কি আর অপারেটরের কাজে মন বসে! তাই শীঘ্রই গুরু সেই কাজে ইস্তফা দিয়ে মুম্বাই চলে যান। মুম্বাইয়ে বেশ কিছুদিন থাকার পর ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি পুনে যান এবং বিখ্যাত ‘প্রভাত ফিল্ম স্টুডিও’তে তিন বছর কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। এই বছরেই তিনি প্রথম চান্দ চলচ্চিত্রে শ্রী কৃষ্ণের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে গুরু অভিনয় করেন লাখরানীতে। অভিনয়ের পাশাপাশি এতে সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন।
পরের বছর পি এল সান্তোসির হাম এক হেইন-এ সহকারী পরিচালক ও নৃত্য পরিচালক হিসেবে কাজ করেন গুরু। ‘প্রভাত স্টুডিও’তে কাজ করার সময় অভিনেতা রেহমান ও দেব আনন্দ’র সঙ্গে গুরুর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে প্রভাত স্টুডিওর সঙ্গে তার চুক্তি শেষ হয়ে যায়। এরপর তিনি প্রভাত ছেড়ে দিয়ে বেশকিছু দিন নির্মাতা বাবুরাও পাই-এর সহকারী হিসেবে কাজ করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে গুরু এই কাজটিও ছেড়ে দিয়ে মুম্বাই ফিরে আসেন এবং সেখানে পরিবারের সঙ্গে কিছু সময় অতিবাহিত করেন। এই সময় তিনি ইংরেজি লেখালেখির চর্চা করেন এবং ‘দ্য ইলাসট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়া’ নামক একটি স্থানীয় ইংরেজি ম্যাগাজিনে ছোটোগল্প লেখেন।
মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে
প্রত্যেক মানুষেরই কিছু চাওয়া-পাওয়া, নেশা, ইচ্ছা থাকে। তবে সব মানুষই তার মন মতো কাজ করতে পারে না, অনেকে বন্দি হয় সমাজের বেড়াজালে। বেশিরভাগই তা ছিন্ন করতে পারে না। ফলে কারো কারো মনের গোপনে লালিত স্বপ্নগুলো হয়তো স্বপ্নই থেকে যায়। কিন্তু গুরু এসবের মধ্যে থেকেও নিজের স্বপ্নটাকে একেবারে হারিয়ে যেতে দেননি। প্রভাত স্টুডিও ছেড়ে আসার পর থেকে তিনি কিছুদিন অন্য কাজের চেষ্টা করলেও চলচ্চিত্রকে ছেড়ে দেননি। এই সময়ে গুরু বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা অমিয় চক্রবর্তীর গার্লস স্কুল ও গয়ান মুখার্জীর সংগ্রাম-এ কাজ করেন।
ইতোমধ্যে গুরুর বন্ধু দেব আনন্দ ‘নবকেতন’ নামে নতুন একটি প্রোডাকশন কোম্পানি চালু করেন। কিন্তু ‘নবকেতন’-এর প্রথম চলচ্চিত্রটি ব্যবসাসফল না হওয়ায় তিনি পরের চলচ্চিত্রটি নির্মাণের দায়িত্ব গুরুকে নিতে বলেন। গুরুও যেনো এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি সানন্দে বন্ধুর এই প্রস্তাবে রাজি হন। নবকেতনে গুরুর নিজের পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র বাজি মুক্তি পায় ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে। এটি ছিলো ‘ফিল্ম নয়ার’ ধারার চলচ্চিত্র। বাজিতে এক যুবককে প্রথমে দেখা যায় দিনভর জুয়া খেলতে। পরে সাংসারিক নানা টানাপড়েনে তিনি জড়িয়ে পড়েন একটি গ্যাঙের সঙ্গে। সেখানে তিনি জুয়া খেললেও তার মধ্যে নানা মানবিক গুণাবলি দেখা যায়। একসময় ওই যুবক অর্থশালী হয়ে ওঠেন। গত শতকের ৪০ ও ৫০-এর দশকের প্রথমার্ধে মূলত হলিউডে অপরাধ, দুর্নীতি ও রহস্যের গোপন জগৎ নিয়ে এক ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। এসব চলচ্চিত্রে ভারি আবহাওয়া, অবসন্ন মনোভাব, ধূসর সুর ও অন্ধকার হতাশা আচ্ছন্ন পরিবেশ উপস্থাপন করা হতো। ফরাসি সমালোচকরা এ ধরনের চলচ্চিত্রের নাম দেন ফিল্ম নয়ার। গুরুর বাজি এসব বৈশিষ্ট্য নিয়েই হাজির হয়েছিলো বলিউডে।
একপর্যায়ে দুই বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নেন, গুরু চলচ্চিত্রনির্মাতা হলে দেব হবেন সেই চলচ্চিত্রের নায়ক; আর দেব আনন্দের চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তো আছেই। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে গুরু পরিচালনা করেন জাল। বাজি এবং জাল দুটোই সুপার হিট হয়। শর্তানুযায়ী জাল-এর নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন দেব আনন্দ। এরপর ১৯৫৩ ও ৫৪ খ্রিস্টাব্দে গুরু পর পর নির্মাণ করেন বাজ ও আর পার। বাজ বক্স অফিসের সেরা চলচ্চিত্রের খেতাব পায়। অন্যদিকে আর পার-এ গুরু প্রথমবারের মতো প্রযোজক, সঙ্গে পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবেও হাজির হন।
১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে গুরু নির্মাণ করেন মিস্টার অ্যান্ড মিসেস। এতে তিনি অভিনয়ও করেন। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে গুরুর প্রযোজনায় নির্মিত হয় সি আই ডি। একই বছর তিনি পরিচালনা করেন সয়লাব। পরের বছর গুরু নির্মাণ করেন পিয়াসা ও গৌরী। যদিও গৌরীর কাজ তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। পিয়াসায় এক ব্যর্থ কবির (বিজয়) গল্প বলা হয়েছে। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত গুরুর প্রযোজনা ও পরিচালনায় সর্বশেষ চলচ্চিত্র কাগজ কা ফুল। এতে গুরুর বিপরীতে নায়িকা ছিলেন ওয়াহিদা। কাগজ কা ফুল-এর সাবলীল চলচ্চিত্রভাষা, দক্ষ পরিচালনা ও সুনিপুণ অভিনয় থাকা সত্ত্বেও কেনো জানি ব্যবসাসফল হয়নি! সময়ের বিচারে যদিও পরে চলচ্চিত্রটি ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পায়।
এছাড়া গুরুর প্রযোজিত আরো দুটি চলচ্চিত্র হচ্ছে, সাহেব বিবি অউর গোলাম (১৯৬২) ও বাহরাইন ফির ভি আয়েঙ্গি (১৯৬৬)। প্রযোজনা, পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয়টাও গুরুর নখদর্পণেই ছিলো। পিয়াসার জন্য নায়ক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিলো দিলীপ কুমারকে। কিন্তু দিলীপ কুমারকে না পেয়ে গুরু নিজেই নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের সিদ্ধান্ত নেন। নিজে পরিচালক হলেও কোনো চরিত্রে অভিনয়ের ব্যাপারে গুরু অত্যন্ত খুঁতখুঁতে ছিলেন। তিনি যেকোনো চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করে তারপর তা পর্দায় উপস্থাপন করতেন। তিনি এ ব্যাপারে এতোটাই খুঁতখুঁতে ছিলেন যে, পুরো শুটিংয়ের পর নিজের অভিনয় দেখে তিনি যদি সন্তুষ্ট না হতেন, তাহলে তা বাতিল করে পুনরায় অভিনয় করতেন। ‘সি এন এন’-এর তালিকা অনুযায়ী গুরু এশিয়া মহাদেশের সেরা ২৫ অভিনয়শিল্পীর একজন।১ গুরুর অভিনীত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে-সানঝ অউর সাবেরা (১৯৬৪), সুহাগান (১৯৬৪), বাহুরানী (১৯৬৩), ভরসা (১৯৬৩), সওতেলা ভাই (১৯৬২), চাউধিভান কা চাঁদ (১৯৬০), হাম এক হেইন (১৯৪৬)।
‘যা ছুয়িলে প্রাণে মরি
এই জগতে তাইতে তরী’
শিল্পী মাত্রই সাধারণত আবেগী, স্পর্শকাতর। গুরুও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। আবেগ, ভালোবাসায় কাতর এই মানুষটি একটুতেই কেমন জানি ভেঙে পড়তেন। তখন তিনি প্রচুর মদ খেতেন, ধুমপান করতেন। জীবনের শেষ সময়ে এসে এই মানুষটি হয়ে গিয়েছিলেন একেবারে একা। গুণী এই নির্মাতার শেষ সময়ে তার আপনজনরা কেউই তার পাশে পর্যন্ত ছিলো না। অনেকটা শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এর মতো,
যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সেসময় যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে-যেন একটিও করুণাদ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন সে কাহারো এক ফোটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।
গুরু বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে প্রখ্যাত প্লেব্যাক শিল্পী গীতা রায় চৌধুরীর সঙ্গে। ভালোই চলছিলো সেই জীবন। একে একে ঘরে আসে তিন সন্তান। গীতা তখন দুর্দান্ত প্লেব্যাক শিল্পী। ঠিক সেই সময় গুরু তাকে গান ছাড়তে বলেন। একপর্যায়ে গীতা গান ছেড়েও দেন। গুরু ততোদিনে চলচ্চিত্র জগতে বেশ সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। হঠাৎ করেই চলচ্চিত্রের লোকজনের এক আড্ডায় তেলেগু চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পী ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে তার আলাপ হয়। গুরু তাকে বলিউডে অভিনয়ের কথা বলেন। ওয়াহিদাও তার প্রস্তাবে রাজি হন।
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ওয়াহিদা রহমান খলচরিত্রে অভিনয় করেন গুরুর সি আই ডি-তে। নিজের প্রযোজিত এই চলচ্চিত্রে গুরু অভিনয় করেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয়ের পর থেকে গুরু-ওয়াহিদা সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়। এসব কথা নানাভাবে গীতার কান অবধি পৌঁছায়। সাংসারিক জীবনে শুরু হয় নানা টানাপড়েন। একপর্যায়ে গুরুকে ছেড়ে চলে যান গীতা। একদিকে স্ত্রীর চলে যাওয়া, অন্যদিকে নানা রটনা, সবমিলিয়ে গুরু তখন খানিকটা বিধ্বস্ত। গুরুর সন্তানদের ঠিকানা হয় মামা আর চাচার বাড়িতে। তবে ধীরে ধীরে গুরু আর ওয়াহিদার সম্পর্কটা নতুন দিকে মোড় নিতে থাকে। গুরু-ওয়াহিদা জুটির চলচ্চিত্রগুলোও দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তাও পায়। পর্দার রসায়নের মতো গাঢ় হতে থাকে গুরু-ওয়াহিদার বাস্তবের রসায়নও।
একপর্যায়ে গুরু আর ওয়াহিদার সম্পর্কের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গুরুর সন্তানরা ওয়াহিদাকে অনুরোধ করে তাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য। ওয়াহিদা একসময় গুরুর জীবন থেকে দূরে সরেও যান। যাতে গুরু স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু গীতা কখনো আর গুরুর কাছে ফিরে আসেননি। ঘটনার উল্টোক্রমে গুরু হয়ে যান সম্পূর্ণ একা। তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোও জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। ওয়াহিদার ধারণা ছিলো, তিনি চলে গেলে গুরু হয়তো আবার আগের জীবনে ফিরে যাবেন। অথচ একাকিত্ব আর হতাশা গুরুর জীবনকে গ্রাস করে ফেলে। তিনি বেছে নেন আত্মহননের পথ।
১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর মদের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পান করেন গুরু। অতিরিক্ত মদ্যপান ও ঘুমের ওষুধের বিষক্রিয়ায় গুরু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। চলচ্চিত্রজগৎ হারিয়ে ফেলে গুরু দত্ত নামের গুণী এই শিল্পীকে। শোনা যায়, গুরু নাকি এর আগেও দুইবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
মৃত্যুর আগে গুরু সর্বশেষ ফোন করেছিলেন আশা ভোশলের বাড়িতে গীতার সঙ্গে কথা বলার জন্য। কিন্তু এ শেষ ইচ্ছাটিও তার পূরণ হয়নি।
পিয়াসার কথা
পিয়াসা হিন্দি শব্দ, যার অর্থ তৃষ্ণার্ত। সাদা-কালো এই চলচ্চিত্রটির দৈর্ঘ্য দুই ঘণ্টা ২৬ মিনিট। বিশ্বখ্যাত ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এর সেরা একশো চলচ্চিত্রের একটি পিয়াসা।২ পিয়াসার প্রধান চরিত্রগুলো হচ্ছে, বিজয় (কবি), মীনা (বিজয়ের প্রেমিকা), গুলাব (একজন যৌনকর্মী)। এসব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শুরুতে নাকি যথাক্রমে দিলীপ কুমার, নার্গিস ও মধুবালাকে নির্বাচন করা হয়েছিলো। কিন্তু নার্গিস আর মধুবালার মধ্যে কে গুলাব আর কে মীনা হবে এ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন নির্মাতা। অন্যদিকে দিলীপ কুমারের নাকি বিজয় চরিত্রটিই পছন্দই হয়নি, তাই তিনি এতে অভিনয়ে অসম্মতি জানান। সবমিলিয়ে শেষ পর্যন্ত গুরু নিজেই বিজয় চরিত্রে এবং মালা সিনহা (মীনা) ও ওয়াহিদা রহমানকে (গুলাব) বাকি দুটো চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্বাচিত করেন।
ব্যর্থ কবি বিজয়। তার একটা কবিতাও ছাপা হয় না। নিজের বড়ো ভাই বিজয়ের কবিতাগুলো পুরনো কাগজের সঙ্গে বিক্রি করে দেন। একমাত্র মা-ই বিজয়ের এই কষ্ট বোঝেন, এতোকিছুর পরও তাকে ভালোবেসে কাছে টানেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন হয় যে, মা বিজয়কে খেতে দিলে, তার ভাইয়েরা সেই খাবার পর্যন্ত ফেলে দিতে বলে। শেষ পর্যন্ত লজ্জা আর অপমানে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। প্রেমিকা মিনা, আগেই বিত্তবান এক প্রকাশককে বিয়ে করে দূরে সরে গেছেন। ছন্নছাড়া বিজয় পেটের দায়ে কুলির কাজ পর্যন্ত করেন। কিন্তু তাতে খাবারের দাম পরিশোধ হয় না; হোটেল মালিক বিজয়কে অপমান করেন। ঠিক এই মুহূর্তে যৌনকর্মী গুলাব এসে বিজয়ের খাবারের দাম মেটান। গুলাব অবশ্য আগে থেকেই নীরবে বিজয় ও তার কবিতা খুব পছন্দ করতেন।
একদিন কলেজের পুনর্মিলনীতে বিজয়কে কবিতা পাঠের জন্য ডাকা হলে, তিনি কবিতা পাঠ না করে একটি গান করেন। বিজয়ের এই গান শুনে ব্যথিত হয়ে প্রকাশক ঘোষ তাকে চাকরি দিতে চান। বিজয় পরে ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে গেলে, তিনি তাকে বাসায় ভৃত্যের কাজ দেন। আগেই বলেছি, এক প্রকাশককে বিয়ে করেছেন মীনা, সেই প্রকাশকই হলেন ঘোষ। ফলে ঘোষের বাড়িতে মীনার সঙ্গে বিজয়ের দেখা হয়। ভৃত্য বিজয় ঘরোয়া এক বৈঠকে পানীয় পরিবেশন করতে গিয়ে একটি গান করেন, সেটা শুনে মীনা খুব নস্টালজিক হয়ে পড়েন। এরপর মীনা ও বিজয়ের মধ্যে কথা হয়। তাদের সেই আলাপচারিতা শুনে ফেলেন ঘোষ এবং তিনি মীনার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেন। বিজয় এই পরিস্থিতিতে ওই বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
একদিন রাস্তায় বিজয় এক ভিক্ষুককে ছেঁড়া কাপড় পরা অবস্থায় দেখে তার গায়ের কোটটি তাকে দিয়ে দেন। এরপর ওই ভিক্ষুক বিজয়ের পিছু পিছু হাঁটতে থাকেন। ঘটনাক্রমে ভিক্ষুকের পা রেললাইনে আটকে যায়। এবং বিজয়ের কোট পরা অবস্থায় সেখানে তার মৃত্যু হয়। গায়ে বিজয়ের কোট পরা ওই লোককে দেখে পত্রিকায় খবর বের হয়, বিজয় মারা গেছেন। বিজয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে তার কবিতা নিয়ে গুলাব প্রকাশক ঘোষের কাছে যান। ঘোষ কবিতাগুলো দিয়ে ‘প্রচ্ছায়া’ নামের একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। ‘প্রচ্ছায়া’ খুব জনপ্রিয়তা পায় এবং অনেক বিক্রি হয়।
এদিকে ভিক্ষুককে বাঁচাতে গিয়ে আহত বিজয় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এক নার্সের মুখে নিজের কবিতার আবৃত্তি শুনে তার জ্ঞান ফেরে। বিজয় বলতে থাকেন, এটা তার লেখা কবিতা এবং তিনিই কবি বিজয়। ডাক্তার ও নার্সরা তাকে পাগল ভেবে পাগলাগারদে পাঠিয়ে দেয়। খবর পেয়ে ঘোষ পাগলাগারদে যান বিজয়কে দেখতে। সেখানে গিয়ে ঘোষ তার পরিচিত একজনের মাধ্যমে জানতে পারেন, লোকটি আসলেই বিজয় নন।
ফলে মৃত কবি বিজয় স্মরণে সভার আয়োজন করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, সেই সভায় বিজয় ফিরে আসেন। ঘোষ, গুলাব ও মীনা চিনতে পারে বিজয়কে। ফলে স্মরণসভা বন্ধ করে পরে বিজয়ের সম্মানার্থে নতুন করে সভার আয়োজন করা হয়। সেই সভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে, সবার আচরণে বিরক্ত বিজয় নিজেই বলতে থাকেন, তিনি আসলে বিজয় নন। তারপর সবকিছু ছেড়ে গুলাবকে সঙ্গে নিয়ে বিজয় অজানার পথে বেরিয়ে পড়েন। এভাবে ব্যর্থতা, প্রেম, স্বার্থপরতা, মানবচরিত্রের এমনসব জটিল বিষয়ের অসাধারণ উপস্থাপন ধরা পড়ে পিয়াসায়।
লেখক : আনতারা সোনিয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
soniaislam.kgc@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. https://goo.gl/5H6Fh7; retrieved on: 10.04.2018; 6.00 PM
২. রহমান, মুম (২০১২ : ৭৭); বিশ্বসেরা ৫০ চলচ্চিত্র; ভাষাচিত্র, ঢাকা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন