হায়দার রিজভী
প্রকাশিত ২৮ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সাক্ষাৎকার
আমার মাথায় ফিল্ম ছাড়া অন্য কোনো সাবজেক্ট নাই
হায়দার রিজভী

আগে থেকেই তার সঙ্গে কথা বলার সময় নির্ধারণ করা ছিলো। সন্ধ্যা ছয়টায় যখন হায়দার রিজভীর বাসায় পৌঁছাই, তখন তিনি মাগরিবের নামাজ পড়ছিলেন। বাসার তত্ত্বাবধায়ক আমাদের সেই ঘরেই নিয়ে যান। আমরা ঘরের এক পাশে থাকা সোফায় গিয়ে বসি। মেরুন রঙের টানা লম্বা সোফা; তার পাশেই একটা বইয়ের আলমারি। ঘরে ঢোকার দরজার ঠিক পাশেই একটা চেয়ারে বসে রিজভী নামাজ পড়ছিলেন। অল্প সময় পর নামাজ শেষ করে তিনি সরাসরি সোফায় এসে বসেন। কালো প্যান্ট চেক শার্ট পরা রিজভীর সঙ্গে সামান্য কুশল বিনিময় করেই কথা শুরু হয়। রিজভীর বাবা পাকিস্তান আমলের সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। ছেলেকে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর বিলেতে পাঠান ব্যবসা প্রশাসন নিয়ে পড়তে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তা না করে, তিনি অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যান। পরে অভিনয়ের ওপর ডিপ্লোমা করে দেশে ফিরে আসেন রিজভী। তার ভাষায়, ‘তখন অভিনয় নিয়ে এতোই ঘোরের মধ্যে ছিলাম যে, কুয়াশার মধ্যে শেক্সপিয়রের সংলাপ বলতে বলতে লন্ডনের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কতো দিন যে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছি!’
দেশে ফিরে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। সেখানে প্রযোজনার পাশাপাশি অনেকগুলো টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেন। এছাড়া বাংলাদেশের অন্যতম নাট্যদল ‘থিয়েটার’-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন রিজভী। চাকরি আর অভিনয় ভালোই চলছিলো। এরই ফাঁকে সুযোগ হয় বিদেশে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ালেখা করার। উচ্চতর শিক্ষার জন্য পোল্যান্ড সরকারের বৃত্তি নিয়ে চলে যান সেখানে। পরিচালনার ওপর চার বছর মেয়াদি (১৯৭৬-৮০) কোর্স সম্পন্ন করেন পোল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ন্যাশনাল ফিল্ম স্কুল ইন লড্জ’ বা ‘লড্জ ফিল্ম স্কুল’-এ। সেখানে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে Prussian Officer নামে গ্রাজুয়েট ফিল্ম নির্মাণ করেন। এরপর বিভিন্ন সময় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন স্টিফেন স্পিলবার্গ, রোমান পোলানস্কি, আন্দ্রে ভাইদা, লার্স ভন তিয়ার-এর মতো বিশ্বখ্যাত নির্মাতাদের সঙ্গে। পরে নিজে পোলিশ ভাষায় নির্মাণ করেন Nursery Rhymes নামে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। দীর্ঘদিন পোল্যান্ডে থাকাকালীন রিজভী বেশকিছু টিভি সিরিয়াল নির্মাণ করেন। বর্তমানে দেশে ফিরে রিজভী শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও পড়ান। গত ১ মার্চ ২০১৭ গুণী এই নির্মাতা, চলচ্চিত্রশিক্ষকের সঙ্গে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পক্ষ থেকে কথা বলেছেন রাজীব আহসান ও জাবের হাসান। চলতি সংখ্যায় সেই আলোচনার তৃতীয় ও শেষ পর্ব প্রকাশ করা হলো।
তৃতীয় পর্ব.
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্মৃতি কিছু বলেন।
হায়দার : তখন তো টেলিভিশন ডি আই টি ভবনে। টেলিভিশনের ৯০ শতাংশ অনুষ্ঠান তখন সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। তবে রবিবারের নাটকটা আমরা রেকর্ড করতাম। একবার হলো কী, নাটক পুরোটা রেকর্ড হয় নাই, শেষ অংশটা বাকি আছে। সম্প্রচারের দিন আমরা সবাই কস্টিউম পরে প্রস্তুত হয়ে আছি, রেকর্ডিং অংশটা শেষ হওয়ার পর বাকিটুকু আমরা সরাসরি করবো।
ঠিক সেদিন আমার বাবা-মা কোথায় যেনো বেড়াতে গেছিলেন, ফেরার সময় মনে করেছেন ছেলেকে অফিস থেকে নিয়ে যাবেন। তারা সেই সরাসরি সম্প্রচারের ঠিক কিছুক্ষণ আগে আমার অফিসে এসে হাজির। আমি মাকে বললাম, আমি তো এখন যেতে পারবো না; কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাবা তো রাগী মানুষ-কেনো যেতে পারবে না? বাবা কোনোভাবেই সেটা শুনতে রাজি নয়। শেষমেষ আমি খুলেই বললাম, একটা নাটকের কিছু অংশ বাকি আছে, সেটাতে সরাসরি অভিনয় করতে হবে আর কিছুক্ষণ পরে।
বাবা তখন আমার কথাটা বুঝলেন। তিনি আর এ নিয়ে কোনো কথা বললেন না। আমি বললাম, আব্বা আমি প্রোডিউসারের রুমটা খুলে দিচ্ছি, ওখানে আপনারা বসেন, টেলিভিশন আছে; কাজটা শেষ করেই আমরা যাবো। তারপর বাবা-মা ওখানে বসলেন। আমিও নাটকটা লাইভ করে বেরিয়ে আসলাম। তারপর গাড়িতে করে আমরা বাড়ি ফিরছি। আমি ড্রাইভারের পাশের সিটে আর পিছনে বাবা-মা। কিছুক্ষণ পর দেখি, বাবা মাকে বলছে, না, ভালোই অভিনয় করেছে! খুব কষ্টের কাজ। আমি তো মনে মনে বলি, এটাই তো চেয়েছিলাম। আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছি, এখন যা ইচ্ছা করেন।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, আপনি তো মঞ্চ নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেসময়ের মঞ্চ নাটক নিয়ে তো কিছু বললেন না!
হায়দার : স্বাধীনতার পরে হলো ‘নাগরিক’, এরপর হলো আমাদের দল ‘থিয়েটার’। রামেন্দ্র মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, আবদুল্লাহ আল মামুন, কেরামত মওলা, আমি মিলে করলাম ‘থিয়েটার’। এটা ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের দিকে। তখন টেলিভিশন, মঞ্চ দুই জায়গাতেই অভিনয় চলেছে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, ওই সময়ের কথা আরো কিছু বলেন।
হায়দার : না, থিয়েটার নিয়ে আর কী বলবো। তবে টেলিভিশনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলি। আমি দুর্নীতি জিনিসটা কখনোই পছন্দ করতাম না। কিন্তু সেসময় আমার সঙ্গে যারা ছিলো, তাদের অনেকেই এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। একটা ঘটনা বলি, শোনো। তখন রবিবারের নাটক করতাম আমি। আমাকে স্ক্রিপ্ট দেওয়া হলো ১০ কপি। তখন আমাদেরকে বাইরে থেকে একজন করে লোক দেওয়া হতো সহকারী হিসেবে। আমার সঙ্গে ছিলেন গাজী সাহেব নামে একজন। আমি তাকে বুঝিয়ে দিলাম, এখানে গোলাম মোস্তফা মানে চাঁন ভাই, ফজলে লোহানী ভাই অভিনয় করবেন। তারপর ঠিক হলো পরের দিন সকাল ১০টায় রিহার্সেল হবে। গাজী বললো, ঠিক আছে ভাইয়া।
বাংলাদেশে তখন দুইজন অভিনেতার অধিকার ছিলো আমাকে তুমি বলে সম্বোধনের। একজন গোলাম মোস্তফা আরেকজন লেবু ভাই মানে ফজলে লোহানী। তারা আমাকে আমার ডাকনাম মহারাজ বলে ডাকতেন। যাহোক, আমরা রিহার্সেল করছি, হঠাৎই একটা ছেলে মহড়া কক্ষে এসে আমাকে বলছে, আমার স্ক্রিপ্টটা কই? আমি একটু বিস্মিত হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, কার স্ক্রিপ্ট, কীসের স্ক্রিপ্ট আর আপনিইবা কে? ছেলেটা বললো, কেনো আমি নাটকের তৃতীয় পথচারী। আমি বললাম, আপনি তৃতীয় পথচারী!
এই বলে আমি লেবু ভাইকে বললাম, আপনারা চালিয়ে নেন, আমি একটু বাইরে থেকে আসছি। তারপর ছেলেটাকে বললাম, ভাই, বাইরে চলেন। বাইরে এসে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, কে আপনাকে এই অভিনয়ের কথা বলেছে? ছেলেটা বেশ বিস্ময় নিয়ে বললো, কেনো গাজী ভাই বলেছে! তখন দেখি, একটু দূরেই গাজী দাঁড়িয়ে আছে। আমি তো ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। তারপর গাজীকে ডেকে কোনো কথা না বলে জোরে এক চড় মেরে বললাম, আজকের পর থেকে আপনি আর কোনোদিন এই বিল্ডিংয়ে ঢুকবেন না। যদি ঢোকেন, তাহলে আপনার খবর আছে।
তারপর আবদুল্লাহ আল মামুন আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, এই মিয়া তুমি এটা কী করলা, বয়স্ক মানুষ! আমি বললাম, আপনি জানেন, ওই লোক কী করেছে! আমার কাছে প্রমাণ আছে, গাজী অভিনয়ের কথা বলে ওই লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। তারপরও মামুন ভাই বললেন, আরে যা হয়েছে হয়েছে; মিটমাট করে ফেলো, ওকে মাফ করে দাও। আমি বললাম, না মামুন ভাই, আমি সরি, এটা করতে পারবো না।
আতিকুল হক চৌধুরী মানে আতিক ভাই আমাকে ডেকে বললেন, রিজভী এটা আপনি কী করলেন! আমি বললাম, কেনো, কী হয়েছে! আমি কোনোভাবেই এটা মেনে নিতে পারছি না, আমার শরীর ঘিন ঘিন করছে। তারপর কী হলো, ওরা জানে আমি একজনের প্রতি উইক, তিনি হলেন মুস্তাফা মনোয়ার মানে মন্টু ভাই। ওরা দুইজন মিলে তাকে গিয়ে ধরছে। মন্টু ভাই তখন আমাকে ডেকে নিয়ে পান খেতে খেতে বলেন, আরে মিয়া, তুমি একা এই দেশটারে ঠিক করতে পারবা! একজনকে চড় মেরে তুমি দুর্নীতি বন্ধ করতে পারবা?
তখন আমি বললাম, স্যার আপনি যদি বলেন ...। তিনি আমার সেন্টিমেন্টে আঘাত করলেন, দেখো লোকটা বিবাহিত; তার দুটো সন্তান আছে, চাকরি গেলে লোকটা কী করবে? এখানে চুক্তিভিত্তিক কাজ করে, সে সপ্তাহে হাজার আড়াইয়েক টাকা পায়। তাই দিয়ে চলে। শেষ পর্যন্ত কী আর করা-এই হলো পরিস্থিতি।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, বাংলাদেশ টেলিভিশনে আপনি ৭২ থেকে ৮৫ পর্যন্ত ছিলেন, তার মানে এই পুরো সময় কি আপনি দেশেই ছিলেন?
হায়দার : না, পুরো সময় দেশে ছিলাম না। ওখান থেকে পাঁচ বছর কমিয়ে দাও।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্বাধীনতার পর চার বছর আপনি কাজ করলেন বি টি ভি’তে। তারপর ৭৫ থেকে ৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আপনি ছিলেন পোল্যান্ড ফিল্ম স্কুলে। পোল্যান্ডে কীভাবে গেলেন?
হায়দার : একবার বি টি ভি থেকে আমাকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হলো, ব্রিটিশ কাউন্সিলে নানা দেশের কূটনীতিকরা শেক্সপিয়রের ‘দ্য টেমিং অব দ্য শ্রু’ নাটকটা করবে, সেটা নিয়ে একটা রিপোর্ট করতে হবে। আমি সে মোতাবেক গেলাম সেখানে।
বৃটিশ হাই কমিশনার জানতো আমি লন্ডন থেকে অভিনয়ের ওপর পড়াশোনা করে এসেছি। বি টি ভি’র প্রোডিউসার হিসেবেও তখন বিভিন্ন মহলের লোকজন টুকটাক আমাকে চিনতো। তো অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার আগে অন্য একটা অনুষ্ঠানে বৃটিশ হাই কমিশনারের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সেখানে তিনি আমাকে বলেন, মি. রিজভী আমরা একটা নাটক করতে চাচ্ছি, কিন্তু সবাই তো অ্যামেচার, খুব ভালো কিছু বুঝি না; আপনি আমাদের তিন-চার দিন একটু রিহার্সেল করান। আমি মনে মনে ভাবি, ভালোই। একথা শোনার পর থেকে আমার সেই ইংল্যান্ডের স্মৃতি মনে পড়ে যায়, সেই সময়ের অভিনয়, কানে আমি ইংরেজি শব্দ শুনতে থাকি। যাহোক, তারপর নির্দিষ্ট দিনে নাটক বেশ ভালোই হলো।
তখন বাংলাদেশে পোল্যান্ডের দূতাবাস ছিলো। এখন অবশ্য নেই। এক অনুষ্ঠানে পোল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমার কথা হয়। তিনি আমাকে একপর্যায়ে বলেন, ‘আপনি টেলিভিশনে কাজ করেন, ফিল্ম নিয়ে আপনাদের আগ্রহ নেই? আপনি এক কাজ করেন, আমাদের পোল্যান্ডে চলে যান, ওখানে একটা ফিল্ম স্কুল আছে খুব নামকরা, সেখান থেকে পড়াশোনা করে আসেন। আপনি চাইলে আমরা আপনার জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’
আমি তখন ভাবি, কমিউনিস্ট দেশ, কীভাবে সেখানে যাবো-পাগল নাকি! তখন পোল্যান্ডে ফুল কমিউনিজম, তারা বলে সোস্যালিজম। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাইয়ের কথা এটা। রাষ্ট্রদূত আমাকে জানালেন, অক্টোবরে কোর্স শুরু হবে, সেপ্টেম্বরে আপনাকে এই দেশ ছাড়তে হবে। আমি বললাম, ঠিক আছে।
তখন হঠাৎই এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (এ বি ইউ) থেকে আমাদের কাছে মানে বি টি ভি’তে চিঠি আসলো। ঢাকার কল্যাণপুরে তাদের অফিস, সেখান সুন্দর ট্রেনিং সেন্টার আছে। ওরা কী করলো, সিনেমা নিয়ে তিন সপ্তাহের একটা ওয়ার্কশপ করলো। আমি যেহেতু ভালো ইংরেজি বলি এবং সিনেমা নিয়ে কথাও বলি, তখন বি টি ভি থেকে আমাকে সেই ওয়ার্কশপে পাঠানো হলো।
ওয়ার্কশপে কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান, জাপানি, মালয়েশিয়ান শিক্ষক ছিলো। সারাদিন ওয়ার্কশপ শেষে সন্ধ্যায় যা হয় আরকি, একটু গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া আবার কোনো কোনো দিন বিশেষ কারো বাড়িতে দাওয়াত। এভাবেই বেশ চলছিলো। সেখানে পিটার বলে এক বিদেশির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। কথা প্রসঙ্গে তাকে বলি, পোলিশ ফিল্ম স্কুলে পড়ার ব্যাপারে আমার একটা স্কলারশিপের সুযোগ আছে, কী যে করি? পিটার একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, কী বলো তুমি, কোনো কথা নেই, এই ওয়ার্কশপ বন্ধ করে যতো দ্রুত পারো তুমি সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নাও।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তার মানে এটা যে এতো বিখ্যাত একটা ফিল্ম স্কুল সেটা আপনি তখনো ভালো জানতেন না নিশ্চয়?
হায়দার : আরে না, আমি কিছুই জানতাম না। আচ্ছা, তুমিই (রাজীব আহসানকে উদ্দেশ করে) বলো, তোমাকে যদি এখন বলা হয় উত্তর কোরিয়া যাওয়ার কথা, তুমি কী করবে?
ম্যাজিক লণ্ঠন : আমি যাবো না, স্যার।
হায়দার : তখন ভাবো আমার অবস্থা ঠিক ওই রকম। কারণ আমার আগের শিক্ষা তো লন্ডনে। যাহোক, অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের একজন শিক্ষক অ্যালেন জোনস আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, পিটার বললো, তুমি নাকি পোলিশ ফিল্ম স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছো? আচ্ছা, এটা স্কলারশিপ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন জোনস বললো, আমি নিজে তো ওখানে পড়তে যাওয়ার জন্য অনেকদিন ধরে চেষ্টা করছি।
জোনস তারপর বললো, এই ওয়ার্কশপ করার তোমার আর দরকার নাই, তুমি যতো তাড়াতাড়ি পারো পোল্যান্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা করো। ওয়ার্কশপ থেকে ফিরে জুলাইয়ে আমি অ্যাম্বাসিতে দেখা করলাম, সব ঠিক। কিন্তু সেপ্টেম্বর শেষ হয়ে যাচ্ছিলো, টিকিটের কোনো কথাবার্তা নাই। তখন আমি আবারও একদিন অ্যাম্বাসিতে গিয়ে দেখা করলাম। ওরা আমাকে বললো, সরি, আসলে আপনার সব ঠিক হয়ে গেছে, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু একটা বিষয় আপনাকে বলা হয়নি, ওই স্কুলটি পোল্যান্ডের এডুকেশন মিনিস্ট্রি নয়, কালচারাল মিনিস্ট্রির অধীনে। তাই একটু সমস্যা হয়েছে। অথচ আমি মনে করেছিলাম, ওটা এডুকেশন মিনিস্ট্রির অধীনে। ওরা প্রতিবছর আমাদের ১০জন শিক্ষার্থীকে স্কলারশিপ দিতো।
এসব শুনে আমি বললাম, ঠিক আছে। তখনো আসলে এ নিয়ে আমার তেমন একটা আগ্রহ নাই। আমি ভাবতেছি, হলে হবে, না হলে নাই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তারপর কী হলো?
হায়দার : ওই বছরে আসলে আমার আর যাওয়া হলো না। তবে আমার কাছে একটা চিঠি আসলো যে, লজ ফিল্ম স্কুলে আমার অ্যাডমিশন হয়ে গেছে দুই বছরের কোর্সে পড়াশোনার জন্য এবং আমাকে ইংরেজি ভাষায় লেখাপড়া করতে হবে। বি টি ভি’তে আমি তখন সিনিয়র প্রোডিউসার। এখন আমাকে দুই বছরের ছুটির জন্য আবেদন করতে হবে। আবেদন করলাম, ছুটি পাওয়ার ব্যাপারে মুস্তাফা মনোয়ার সাহেব আমাকে সেসময় খুবই হেল্প করেছেন। উনি আমাকে ডেকে বললেন, চিন্তা করো না, আমি সব দেখছি। তখন প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু। ছুটি নিয়ে অবশ্য কোনো সমস্যা হয় নাই।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তারপর আপনি শেষ পর্যন্ত পোল্যান্ডে গেলেন?
হায়দার : হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত পোল্যান্ডে গিয়ে নামলাম। আমাকে যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছিলো, ট্যাক্সি নিয়ে সেই হোস্টেলে গিয়ে উঠলাম। যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। পরের দিন সকালবেলা আমি ওদের জিজ্ঞাসা করলাম, ফিল্ম স্কুলটা কই? ওরা দেখি নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, আরে এই লোক তো ইংরেজিতে কথা কয়!
আমি ওদের জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কীসের হোস্টেল? ওরা বললো, এটা ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুল। আমি মনে মনে ভাবলাম, বোধ হয় ওদের ভুল হয়েছে; আমি ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলে কী করবো, কারণ আমি তো ইংরেজি মাধ্যমে পড়বো। তারপরও ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলের ডিরেক্টরের সঙ্গে কথা বললাম, উনি বললেন, ইংরেজি জানেন ভালো কথা, কিন্তু আপনাকে অ্যাম্বাসি থেকে যে চিঠিটা দেওয়া হয়েছে, সেটা ভুলভাবে গেছে। কারণ আমি যতোদূর জানি, আমাদের ফিল্ম স্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা হয় না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তার মানে এই কথা শুনে নিশ্চয় আপনার অবস্থা খারাপ।
হায়দার : হ্যাঁ। আমি বললাম, দেখেন আমি দেশে সরকারি চাকরি করতাম, ছুটিতে এসেছি। আমার জন্য তো এটা সমস্যা। তখন ডিরেক্টর আমাকে বললো, ঠিক আছে ফিল্ম স্কুল কাছেই, আপনি কাল ট্রামে করে ফিল্ম স্কুলে গিয়ে কথা বলেন। পরের দিন ফিল্ম স্কুলে গিয়ে ডিরেকশন ডিপার্টমেন্টের ডিন-এর সঙ্গে দেখা করলাম। বয়স্ক মানুষ, ২০-২২টি সিনেমা করেছেন। এখনো সেই মহিলা বেঁচে আছেন, গত বছর যখন (২০১৬) পোল্যান্ডে গিয়েছিলাম দেখা হয়েছিলো, এখন অবশ্য বুড়িয়ে গেছেন।
ওখানে গিয়ে দেখি এক লাইন ইংরেজি নাই! তারপর শেষ পর্যন্ত আমি ডিনকে বোঝালাম, উনি বুঝতে পারলেন। একপর্যায়ে উনি করলেন কী, যুগোশ্লোভাকিয়ার একটা ছেলে-নাম আলেকজান্দ্রার শাসা, আমার এক বছরের সিনিয়র-ওকে নিয়ে আসলেন আমার কথা অনুবাদ করার জন্য। আমি শাসাকে সব খুলে বললাম, দেখো আমার কাছে চিঠি আছে ইংরেজিতে পড়ার ব্যাপারে। তখন শাসা বললো, দেখো, এই চিঠির কোনো মূল্য নেই এখানে। কারণ এখানে পড়তে গেলে তোমাকে পোলিশ ভাষা শিখতে হবে এবং তাতেই পড়তে হবে।
এছাড়া আরো যে কথা শুনলাম, তা শোনার পর তো আমার অবস্থা খারাপ। আমার নাকি ফিল্ম স্কুলে এখনো অ্যাডমিশনই হয়নি! এটা শোনার পর তো আমার মাথা খারাপ। কারণ আমি সরকারি চাকরিতে ছুটি নিয়ে এসেছি, এখানে পড়ার জন্য। এই পরিস্থিতি হলে তো সমস্যা।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তারপর কী করলেন?
হায়দার : তখন পোল্যান্ডে আমাদের অ্যাম্বাসেডর ছিলেন খান সারওয়ার মুরশিদ স্যার। স্কুল থেকে ফিরে এসেই আমি ফোন করলাম তাকে; বললাম, স্যার আমার সঙ্গে তো এরা নানাধরনের সমস্যা করছে, এখন নাকি আমাকে পোলিশ ভাষায় পড়ালেখা করতে হবে! সিনিয়র মানুষ মুরশিদ স্যার, আমাকে বললেন, বুঝেছি, বুঝেছি; তুমি এক কাজ করো, কালকে সকালে ট্রেনে করে আমার অফিসে চলে আসো। তুমি কাল সারাদিন আমার সঙ্গে থাকবে, খাওয়াদাওয়া করবে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : তারপর আপনি মুরশিদ স্যারের কাছে গেলেন?
হায়দার : পরের দিন গেলাম তার কাছে। উনি আমাকে বললেন, আরে মিয়া ইউরোপে আসছো, দুই বছরে একটা ভাষা অন্তত শিখে যাও, কি এমন সমস্যা। আমি বললাম, স্যার আপনি এটা কী বলেন! আমি কি চাকরিতে ছুটি নিয়ে এখানে ভাষা শেখার জন্য আসছি! আপনি তো জানেন স্যার, আমি চাকরি করি, আমি এখানে আসছি ফিল্ম পড়ার জন্য।
মুরশিদ স্যার তখন বললেন, আমি তোমার সম্পর্কে সব জানি, তোমার পুরো ইতিহাস আমার কাছে আছে। তাই বলছি, রাগারাগি করো না, তুমি ঠাণ্ডা হয়ে বসো। তারপর উনি আমাকে চা খাওয়ান, এটা খাওয়ান, ওটা খাওয়ান। যাহোক, শেষ পর্যন্ত আমি তাকে বললাম, ঠিক আছে স্যার আমি আপনার কথামতো না হয় এক বছর ভাষা শিখলাম; কিন্তু ওরা যে বলছে, এরপর তিন দিন ধরে পরীক্ষা দিতে হবে, সেটার কী হবে? আমি যদি তাতে ফেইল করি? তখন আমার কী হবে! তখন আমি ঢাকায় গিয়ে কীভাবে মুখ দেখাবো!
ম্যাজিক লণ্ঠন : তার মানে তখন আপনার ইগোটাও খুব জোরালোভাবে কাজ করছে?
হায়দার : হ্যাঁ, সেটা তো অবশ্যই। তারপর আমি মুরশিদ স্যারকে বললাম, ফিল্ম স্কুল থেকে আমাকে বলছে, যদি পাস করতে না পারি, তাহলে না হয় অন্য কিছু পড়বে। আমি বললাম, অন্য কিছু পড়বো মানে-কেনো ইকোনোমিক্স, সোসিওলজি, জিওগ্রাফি? আরো কতো সাবজেক্ট আছে। আমি বললাম, ভাই, আমার মাথায় ফিল্ম ছাড়া অন্য কোনো সাবজেক্ট নাই। আমি সবসময় অভিনয়, সিনেমা এগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকি। তাই আমাকে ওটাই পড়তে হবে।
তারপর মুরশিদ স্যার আমাকে বললেন, বাবা রিজভী তুমি যাও, চিন্তা করো না। পোলিশ ভাষা ও তো ভালো করে তোমার শেখার দরকার নাই। কোনোভাবে ভাষাটা একটু শেখো, এখন তো নভেম্বর মাস, আর বেশি সময়ও নাই, সামনের বছরের সেপ্টেম্বরে তোমার পরীক্ষা। আমি মনে মনে বলি, পরীক্ষাই তো সমস্যা। শেষে মুরশিদ স্যার বললেন, দেখো, ওরা যখন তোমাকে স্কলারশিপ দিয়ে এখানে নিয়ে আসছে, তাহলে কিছু না কিছু তো তোমাকে দিয়ে করাবেই।
আমি বললাম, স্যার, ডিন আমাকে বলেছে, কোনো কনসিডারেশন নাই। পাস করলে ঢুকবা, না করলে বাড়ি; না হয় অন্য কোনো সাবজেক্ট। যাহোক, শেষ পর্যন্ত মুরশিদ স্যার আমাকে ঠাণ্ডা করে আবার স্কুলের হোস্টেলে পাঠিয়ে দিলেন। ফিরে এসে আমি ভাষা শেখা শুরু করলাম। এর মধ্যে আমার সঙ্গে পরিচয় হলো সাউথ আমেরিকা, বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলার লোকজনের সঙ্গে। তারাও ভাষা শিখছে, ফিল্ম স্কুলে ঢোকার জন্য।
ম্যাজিক লণ্ঠন : স্যার, ওদের অবস্থা কেমন? ওরা কি আপনার চেয়ে এগিয়ে ছিলো?
হায়দার : আরে না, সবার একই অবস্থা। সবমিলে ভাষা শেখা চললো। তারপর সেই পরীক্ষা! সেপ্টেম্বর মাসে পরীক্ষায় বসলাম; আমার মনে হলো, ওরা বোধ হয় চিন্তা করেছে, বাংলাদেশ থেকে আসছে, ওরে একটু ছেড়ে দিই। পরীক্ষার তিন দিন পর রেজাল্ট হলো; কী আশ্চর্য, হায়দার রিজভীর নাম এক নম্বরে!
আমার সঙ্গে এক যুগোশ্লোভাকিয়ান বন্ধু ছিলো-হারমোনিকা বাজিয়ে সে খুব ভালো গান করতো, সুন্দর অয়েল পেইন্টিংও করতো-এখনো অবশ্য ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। ফিল্ম স্কুলে ভর্তির জন্য এবার পেইন্টিংয়ের পরীক্ষা হলো। পরীক্ষায় একটা স্টিল লাইফ করতে দিয়েছে; আমার সেই যুগোশ্লোভাকিয়ান বন্ধু কী সুন্দর ছবি এঁকেছে! আমি তো ত্যাড়া করে কী যেনো এঁকেছি। পেইন্টিংয়ের শিক্ষক এসে এখন আমাকে বলছে, তুমি কি দুনিয়াটাকে এ রকম ত্যাড়া করে দেখো নাকি? আমি বললাম, কীসের ত্যাড়া, স্যার? পরে দেখলাম, আমার সেই যুগোশ্লোভাকিয়ান বন্ধু ফেইল করেছে পেইন্টিংয়ে!
ও আমাকে এসে বলছে, আরে দোস্ত আমি দেখলাম তুমি ত্যাড়া করে আঁকছো। অথচ আমি ফেইল করলাম! পরে অবশ্য ও সোসিওলজিতে পড়েছে। ওর বাবা যুগোশ্লোভিয়ার মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার সমিতির সভাপতি। উনি খুব প্রভাবশালী ছিলেন, ছেলের জন্য ফোন করলেন পোল্যান্ডের কালচারাল মিনিস্ট্রিকে। এতে অবশ্য কাজ হয়েছিলো। তারপর ২ অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু হলো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : এই কোর্সটা কয় বছরের ছিলো স্যার?
হায়দার : চার বছরের। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে আমি দেশে ফিরে আসি। এই সময়ে ওখানে আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। পোল্যান্ডেই এক মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়, তারপর বিয়ে।
ম্যাজিক লণ্ঠন : বিষয়টা তখন বাড়িতে জানিয়েছিলেন?
হায়দার : তখন তো বাবা-মা নেই, শুধু বড়ো ভাই ছিলো। তাকে জানিয়েছিলাম। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে আমি আবার বি টি ভি’তে যোগ দিলাম। আমি তো বউকে পোল্যান্ডে রেখেই দেশে চলে এসেছিলাম। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে আমার বউ বাংলাদেশে আসলো। ও দেশে আসার পর সেকি আনন্দ! পুরো বি টি ভি’তে তাকে ঘোরানো, খাওয়াদাওয়া করা, নানাধরনের উপহার-আরো কতো কী!
যাহোক, তখন তো পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট শাসন, ওরা আমার বউকে পাসপোর্ট দেবে না। তারপর আমি আমাদের দেশে নিয়োজিত পোল্যান্ডের অ্যাম্বাসেডরের কাছে গেলাম। তখন তো আমি ভালো পোলিশ বলি। তারাও বেশ খাতির করে। অ্যাম্বাসেডরকে বললাম, আমার বউ দেখা করার জন্য বাংলাদেশে আসবে, অথচ আপনারা নাকি তাকে পাসপোর্ট দিচ্ছেন না। অ্যাম্বাসেডর সব শুনে বললো, তাই নাকি! আপনি এক্ষুনি সাদা কাগজে আমাকে একটা দরখাস্ত দেন। দরখাস্তে আমি লিখলাম, আমি নিজেকে পোল্যান্ডের বন্ধু মনে করি, এই জাতীয় আরো কিছু কথাবার্তা লিখে শেষে বললাম, অথচ আপনারা আমার স্ত্রীকে পাসপোর্ট দিচ্ছেন না। এর কয়েকদিন পর বউ আমাকে জানালো, পাসপোর্ট অফিস থেকে তাকে ফোন করেছে পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য।
বাংলাদেশে আসার পর আমার বড়ো ভাই বললো, তুমি তো এখানে বিয়ে নিয়ে কিছুই করলে না, চলো ওর আসা উপলক্ষে সোনারগাঁয়ে অন্তত একটা পার্টি দিই। এই উপলক্ষে একদিন বাড়ির নীচতলায় বসে বড়োভাই, ভাবীসহ আমরা সবাই মিলে আলাপ আলোচনা করছিলাম। এটা দেখে ক্রিস্টিনা আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমরা কী নিয়ে আলাপ করছো? তো এই কথা শুনে আমার বড়োভাই-তিনি পেশায় বিমানবাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন, এই কিছুদিন আগে মারা গেলেন-আমাকে বললেন, ক্রিস্টিনা কী বললো? আমি বললাম, আমরা কী করছি ও জানতে চাইলো? তখন হঠাৎই আমার বড়োভাই বলে বসলো, ওকে বলো, ইটস নান অব হার বিজনেস। এরপর তিনি আমাকে বললেন, আমি যা বলেছি, ঠিক তাই তুমি ক্রিস্টিনাকে হুবহু বলো।
এই কথা শোনার পর ক্রিস্টিনার মুখ কালো হয়ে গেলো। আসলে ও তো এই ধরনের পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলো না।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনি সেটা বললেন?
হায়দার : আমার ধারণা এটা শোনার পর সে বুঝে গেলো, এখানে তার (ক্রিস্টিনার) আসলে কোনো স্থান নেই। তার অবস্থা অনেকটা ঘরে ফার্নিচারের মতো-থাকলেই কী, না থাকলেইবা কী? দেখো, আমার কাছে আশ্চর্য লাগে কী, আমার বড়োভাই যদি গ্রামের মূর্খ মোড়ল হতো, তাহলে তার মুখে এই ধরনের কথা মানাতো! কিন্তু সে পৃথিবী ঘুরে বেড়ানো মানুষ!
ক্রিস্টিনার মূলত প্রাথমিকভাবে এখানে তিন মাস থাকার কথা ছিলো। তারপর সে দেশে ফিরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে একেবারে চলে আসবে। কিন্তু এই ঘটনার তিন সপ্তাহ পরেই ক্রিস্টিনা বলতে লাগলো, তোমাদের দেশে আমি থাকবো না। আমি তো পড়লাম বিপদে! তারপর দাওয়াত হলো, আরো নানা কিছু হলো। কিন্তু বেচারা কোনোভাবেই আর থাকতে চাইলো না। তার আসলে মন উঠে গেছে। তারপর ও চলে গেলো।
ম্যাজিক লণ্ঠন : আপনি তখন কী করছেন?
হায়দার : ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়োজিত অ্যাম্বাসেডর ছিলেন মিসেস কুওন, তার স্বামী ছিলেন নেপালের অ্যাম্বাসেডর। তো কুওনের সঙ্গে আমার দেখা হলেই তিনি বলতেন, হাই মি. কে জি বি। এভাবে দেখা হলেই তার সঙ্গে আমার ইয়ার্কি-ফাজলামি চলতো। এক মাস পর হঠাৎ দেখা হলে, তিনি আমাকে একটা স্কলারশিপের কথা বলেন। তার কথার ভঙ্গিটা ছিলো অনেকটা এ রকম যে, আগে তো কে জি বি ছিলে, এখন সি আই এ এজেন্ট হয়ে যাও!
এটা ছিলো এক মাসের জন্য আমেরিকা ঘুরে আসার একটা স্কলারশিপ। এই এক মাস প্রত্যেকদিন আমাকে ৯৬ ডলার করে দেওয়া হবে। এটা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্কলারশিপ। ফলে আমার কাগজপত্র পরীক্ষার জন্য তারা কমপক্ষে একশো জায়গায় পাঠালো। আমাকে জিজ্ঞাসাও করলো, কী কী দেখার ইচ্ছে আছে।
সব ঠিকঠাক হয়ে গেলো, সবাই জানতো আমি এক মাসের জন্য একটা স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকা যাচ্ছি। এক মাস পরেই ফিরে আসবো। কিন্তু আমার প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, মহিলা মানুষ তো, তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন-এই ব্যাটা আর ফেরত আসবে না। তারপরও তিনি বার বার বলতেন, রিজভী তুমি যাচ্ছ যাও, ঠিক এক মাস পর ফিরে আসবে।
তারপর আমেরিকায় গেলাম। ঘোরাঘুরির পর সব শেষে আমাকে পাঠানো হলো নিউ ইয়র্কে। যে হোটেলে ছিলাম, সেখানে দিনে চার-পাঁচবার করে ফোন আসছিলো স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে। আমাকে বলা হলো, দেশে তোমার প্রমোশন হয়ে গেছে, তুমি ফিরে গিয়ে সেখানে জয়েন করো। আমি খালি বলতেছি, জি জি।
তারপর ফেরার সময় হলো আগস্টে। ফেরার টিকিটটায় ভায়া ছিলো লন্ডন। লন্ডন এয়ারপোর্টে নেমে আমি টিকিটটা ছিড়ে ফেললাম। তারপর নিজের পয়সা দিয়ে বোনের কাছে গেলাম ব্রাসেলসসে। ব্রাসেলস থেকে এরপর পোল্যান্ডে। তারপর থেকে আমি পোল্যান্ডেই।
বি টি ভি’তে খবর পড়তো শামীম নামে একজন। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ও আমাকে ফোন করে বললো, হায়দার ভাই, একটা নতুন স্যাটেলাইট চ্যানেল শুরু করতে হবে, আপনি যদি আসতেন। তারপর এসে শুরু করলাম ‘বৈশাখী’। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ডিসেম্বর ‘বৈশাখী’ অন এয়ারে গেলো। আমি তখন ছিলাম ওটার প্রধান নির্বাহী, যদিও এখন ওরা এটা স্বীকার করে না। অবশ্য সেটা কোনো সমস্যাও নয়। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট পর্যন্ত আমি ‘বৈশাখী’তে ছিলাম।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন