Magic Lanthon

               

সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী

প্রকাশিত ২৭ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ম্যাজিক স্মৃতি

ঋত্বিক বললেন, ‘তোর কথার জবাব আমি দেবো জাকী’

সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী



ফিল্ম ইন্সটিটিউট নিয়ে স্বচ্ছ কোনো ধারণা তখন আমার ছিলো না। এমনকি এ বস্তু গায়ে দেওয়ার জিনিস নাকি অন্য কিছু, এসবও তখন জানতাম না। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর জয়া ভাঁদুড়ী, শবনমের মতো মানুষদের নাম শুনলাম। এরপর বাদল রহমান আর আমি ভারতের পুনে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট-এ পড়ার জন্য আবেদন করি। কিছুদিন পর হাই কমিশন থেকে আমাদের সাক্ষাৎকারের তারিখ জানানো হয়। অবশ্য ওইদিন কেনো জানি আমি ভুলে গিয়েছিলাম, সাক্ষাৎকার দিতে যাওয়ার কথা। সেই দিন আমরা বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ঝুপড়ি ঘরের মধ্যে, সবাই ওটাকে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন বলতো। হঠাৎ দেখি বাদল রহমান দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। এসেই আমাকে বললো, ‘আপনার না আজকে ইন্টারভিউ দেয়ার কথা, চলেন তাড়াতাড়ি।’ আমি বললাম, ‘ধুর, কী হবে ওটা দিয়ে।’ তারপর বাদল অনেকটা টানাহ্যাঁচড়া করে আমাকে সাক্ষাৎকার দিতে নিয়ে গেলো। গিয়ে দেখি সাক্ষাৎকার পর্ব শেষ, যথারীতি ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্যরাও রুম থেকে বের হয়ে গেছে। এদের মধ্যে করুণা ব্যানার্জি ছিলেন। সত্যিই আমি জানতাম না, করুণা ব্যানার্জিও ইন্টারভিউ বোর্ডে উপস্থিত থাকবেন!


যাহোক, সবচেয়ে আতঙ্কের কারণ ছিলো ভারতীয় হাই কমিশনের প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন আমার ভাই কামাল। কেনো দেরি করলাম, এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ে উনি আমাদের কিছুক্ষণ গালাগালি করলেন। এরপর বললেন, ‘আমি আবার ইন্টারভিউ নেওয়ার ব্যবস্থা করছি, তোমরা অপেক্ষা করো।’ এরপর যথারীতি সাক্ষাৎকার দিলাম, পুনেতে পড়ার জন্য নির্বাচিতও হলাম। সেই সময় ওখানে পড়তে যাওয়ার সুযোগের মধ্যে অবশ্য অন্য কোনো ব্যাপার ছিলো না। তবে সিনেমা নিয়ে ফরমাল পড়ালেখার ব্যাপারটি পুনেতে না গেলে হয়তো হতো না।


সেই কবেকার কথা! এখনো আমাকে পুনের সেইসব স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায়। তবে আমার পুনে-স্মৃতির অনেকটা জায়গাজুড়ে একজন মানুষ ভর করে আছেন, তিনি ঋত্বিক ঘটক। ঋত্বিক আমার শিক্ষক, আমার গুরু। মুহূর্তের মধ্যে উনি ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক করে ফেলতে পারতেন। তিনি খুব খারাপ ভাষায় ছাত্রদের গালি দিতেন। বিশেষ করে তার ক্লাসে যদি কখনো টুঁ শব্দটিও হতো, তিনি রেগে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। উনি নিজে ‘পাগল’ ছিলেন, কিন্তু ক্লাসের মধ্যে কোনো পাগলামি সহ্য করতেন না। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আমার কথা শুনলে শুনবি, নইলে ক্লাস থেকে বের হয়ে যাবি, শালা শুয়োরের বাচ্চা।’ এটা ছিলো তার ভাষার নমুনা! এভাবে গালাগালি করে হুলস্থূল বাধিয়ে দিতেন ঋত্বিক, তারপর আবার ফিরে আসতেন মূল আলোচনায়। গভীর ধ্যানে একটানা বলে যেতেন আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনতাম, কী সুন্দর তার সেসব কথা! আসলে উনি প্রত্যাশা করতেন, ক্লাসে যেনো আমরা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনি।


এ তো গেলো দিনের বেলার কথা। প্রায়ই রাত দুইটা-তিনটার দিকে হোস্টেলে ছাত্রদের কক্ষে গিয়ে সজোরে লাথি মারতেন ঋত্বিক; আর বলতেন-‘ফিল্মমেকাররা কোনোদিন ঘুমায় নাকি। বের হ হারামজাদারা, শুয়োরের বাচ্চারা।’ এভাবে ঘাড় ধরে আমাদের সবগুলোকে বের করে আনতেন। তারপর হঠাৎই ওই শীতের রাতে উনি বসে যেতেন আমগাছ তলায়। শুরু করে দিতেন কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা। এই রকমই ছিলো উনার কার্যকলাপ। উনার জীবনটাও আসলে এ রকমই ছিলো। আমি তো ইন্সটিটিউটে সত্যজিৎ রায়ের ক্লাসও পেয়েছি। তিনি ছিলেন নিখুঁত ও মাপ জানা দর্জির মতো। কেটেকুটে সবকিছু সুন্দর ও ছিমছাম করে ফেলতেন। মৃণাল দা’কেও (মৃণাল সেন) আমি ছাত্রাবস্থায় চার বছরে তিনবার পেয়েছি। তিনিও গুছিয়ে চলতেন। তবে ঋত্বিক ছিলেন বোহিমিয়ান, অগোছালো। তার হাত চলতো খুব, রেগে গেলে তেড়ে যেতেন। আর এতোই খারাপ ভাষায় গালি দিতেন যে, তা বাইরের কারো পক্ষে শোনাই সম্ভব ছিলো না।


চলচ্চিত্রনির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের একটা ব্যর্থতা আমার চোখে ধরা পড়েছিলো পুনেতে পড়তে এসে-তার সিনেমা দেখে এবং তাকে খুব কাছ থেকে দেখে। উনি ৪৭-এর দেশভাগকে কখনো র‌্যাশনাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে পারেননি। সবসময় আবেগীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। শুধু তিনি নন, ওই ধরনের নস্টালজিয়া পুনেতে পড়াকালীন কলকাতার অনেক জ্যেষ্ঠদের ভিতরও আমি দেখেছি। তাদের সবার ভিতর এ রকম একটা নস্টালজিয়াআহা, আমার সেই নারকেল গাছ, সেই তাল গাছ, সেই পুকুর পাড়! ৪৭-এর আগের সবকিছুই যেনো তাদের সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো! নিজেদের মধ্যে আবেগ প্রকাশের সময় তারা এ রকম ভিজ্যুয়ালাইজেশন করতেই পারে, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু ৪৭ নিয়ে সিনেমা বা অন্য কোনো মহাফেজ তৈরির ক্ষেত্রে ও পূর্ণাঙ্গ গবেষণার পথে এই আবেগ অবশ্যম্ভাবী বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ কোনো একটি বিষয়ে প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যদি তাতে আবেগ চলে আসে, তাহলে সেখান থেকে পরিপূর্ণ কিছু বের করা যায় না, সম্ভবও নয়।


এই যে বললাম, ঋত্বিক অদ্ভুতভাবে ক্লাস নিতেন, গাছতলায় অথবা রুমের মধ্যে বসে। মাঝে মাঝে উনার পা খুব ফুলে যেতো, কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! এ রকম পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি বালতির হালকা গরম পানিতে পা ডুবিয়ে বসতেন আর আমরা তার সামনে কারপেটের উপর বসতাম। অনেক ছাত্রই উনাকে তখন প্রশ্ন করতো, উনিও উত্তর দিতেন। এ রকমই একদিন আমি তাকে একটা প্রশ্ন করে বসি। আমার প্রশ্নটি ছিলো এ রকম-আপনার কোমলগান্ধার-এর মূল চরিত্র পদ্মার এপারে বসে খুব আওড়ায়, ওপারে সমস্ত স্বপ্ন, সুখ ও শান্তি। পূর্ব বাংলার আকাশ-বাতাস এবং তার ভিতরের মানুষ সবাই একেবারে সোনার সিংহাসনে বসা, সেখানকার আকাশ থেকে মধু, দুধ পড়ে, সবাই খায়। অথচ যে সময়ের কথা আপনার নায়ক বলছে, সে সময় আইয়ুব খানের মার্শাল ল চলছে। আপনি পলিটিকাল সিনেমা করছেন, সেখানে যদি পলিটিকাল আবহাওয়াটাই না আসে, তাহলে তো একটা শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে এই সংলাপটা দেওয়া হলো, তাই নয় কী?


এটা শুনেই ঘটক আমার উদ্দেশে তেড়ে এসে বললেন, ‘এই জানোয়ারের বাচ্চা, বানচোদ, ওই শালা, হারামজাদা, কী বললি!’ এরপরই আমাকে মারলেন এক লাথি। লাথির তোড়ে তার বালতির সব পানি ক্লাসের মধ্যে পড়ে একাকার হয়ে গেলো। পুরো জায়গায় পিনপতন নীরবতা। ঘটকও একদম চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। এরপর ঋত্বিক বললেন, ‘তোর কথার জবাব আমি দেবো জাকী।’ অবশ্য এরপর তিনি তো আর কোনো প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সুযোগই পাননি। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছিলো তাকে।


তার এই হাসপাতালে থাকা নিয়েও গল্প আছে। তিনি তো প্রচুর মদ খেতেন, ওখানে ভর্তির পর তা দেওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। মোটকথা, একদম কড়াকড়ি আরোপ করা হলো। এমনকি পাহারাদারও বসানো হলো। একদিন এক ডাক্তার আমাকে ডেকে বললেন, ‘জাকী, আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে, উনি কোথা থেকে যেনো অ্যালকোহল পাচ্ছেন।’ তারপর আমরা গোয়েন্দাগিরি শুরু করলাম। দেখা গেলো হাসপাতালের এক সেবিকাকে উনি মা বানিয়ে ফেলেছেন। তাকে নাকি ঋত্বিক এভাবে বলেছেন, ‘মা তুমি তোমার সন্তানের মৃত্যু চাও? মদ না খেলে আমি তো মরে যাবো, আমাকে একটু মদ দাও না, মা।’


এমন আকুতি কি আর ভদ্রমহিলা ফেলতে পারেন! ঋত্বিককে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করার তালিকায় আরেকজনের নাম রয়েছে, তিনি আমাদের ইন্সটিটিউটের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা রহমান। পুনেতে দাঙ্গার সময় রহমান ও তার পুরো পরিবারকে আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন ঋত্বিক। এজন্য ঋত্বিকের প্রতি তার কৃতজ্ঞতার সীমা ছিলো না। ফলে রহমানকে উনি যা বলতেন অন্ধভাবে তিনিও তাই করে ফেলতেন। রহমানকে ডেকে নিয়ে নাকি ঋত্বিক বলেছিলেন, ‘তোমাকে তখন বাঁচাইছি, এখন তুমি আমারে বাঁচাও।’ কী আর করা, রহমান কি আর তার কথা ফেলতে পারেন! ইনিও যথারীতি ঋত্বিকের হাতে মদের বোতল তুলে দেন। আর তা হাতে আসা মাত্র, ঋত্বিক সময়-সুযোগ বুঝে ঢক ঢক করে তা খেয়ে আবার ভদ্রলোকের মতো শুয়ে পড়তেন। অবশ্য এসবই ধরা পড়লো একটা সময় গিয়ে। এবং মদ আসার এ পথগুলোও বন্ধ করা হলো। যদিও ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিলো।


ইন্সটিটিউটে উনার জন্য গেস্ট হাউজে একটা রুম বরাদ্দ ছিলো। হঠাৎই উনি গেস্ট হাউজে থাকবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তারপর আমাদের কাছে এসে বললেন, ‘তোদের রুমের কোনো একটা দে আমাকে। আমি এখানেই থাকবো।’ আমি বললাম, আমার রুমে থাকবেন? উনি বললেন, ‘থাকবো।’ এরপর আমি আমার রুমটা উনাকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার রুমে বসে শেষ করা সিগারেটের প্যাকেটটা তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর দীর্ঘদিন যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম। যদিও সে প্যাকেটটি পরে আর খুঁজে পাইনি, কীভাবে যেনো আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। এখন খুব মনে হয়, সিগারেটের সেই প্যাকেটটি থাকলে ভালো হতো, তার মতো মানুষের ফেলে দেওয়া একটি জিনিসের মূল্য কি আর কোনো কিছু দিয়ে মাপা যায়; যায় না। সত্যিই ঋত্বিক ঘটক আপনি অসাধারণ।


লেখক : সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী, চলচ্চিত্রনির্মাতা ও শিক্ষক।


দায়স্বীকার : ঢাকার গুলশানে ১৭ মে ২০১৭, সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীর সঙ্গে কথা বলে সেটি অনুলিখন করেছেন রুবেল পারভেজ।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন