Magic Lanthon

               

সুবোধ ঘোষ

প্রকাশিত ২৬ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ম্যাজিক পুনর্পাঠ

পরিণামের পথে ছায়াছবি

সুবোধ ঘোষ


 

গ্রীসের পৌরাণিক কল্পনার আসরে যখন মিউজ দেবীরা দেখা দিলেন, তখন মানুষের জীবনের আসরে যে-সব বিদ্যা ও বিনোদক কলানুশীলন ছিল, তারা আজও আছে। মিউজ দেবীদের কেউ সঙ্গীতের কেউ নৃত্যের এবং কেউ বা নাটকের ভাগ্য প্রসন্ন করবার দায়িত্ব নিলেন। আধুনিক সমালোচনার আসরে এমন প্রশ্ন শোনা যায় যে, যদি সেকালে একালের ছায়াছবি তথা চলচ্চিত্রের অনুরূপ কোন রকম অনুশীলন থাকতো, তবে নয় [জন] মিউজ দেবীর কোন দেবী ছায়াছবির ভাগ্য প্রসন্ন করবার দায়িত্ব নিতেন? যিনি নাটকের অধিষ্ঠাত্রী মিউজ দেবী, তিনিই কি ছায়াছবির ভাগ্য রক্ষা করবার দায়িত্ব নিতেন না? এই প্রশ্নের মধ্যে যে বিচার পরিস্ফুট হতে দেখা যায়, সেটা এই যে, ছায়াছবি তথা চলচ্চিত্র বস্তুত নাটকেরই একটি প্রকারান্তর। মৌল গুণে ও প্রকৃতিতে ছায়াছবি অভিনীত নাটক থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বিশিষ্ট কোন কলানুশীলন নয়। এই বিচারের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তিতর্কের সমান প্রবলতা দেখা যায়। একটি অভিমতের কথা এই যে, সেকালে সত্যই যদি ছায়াছবি থাকতো, তবে পৌরাণিক কল্পনার আসরে নয়জন মিউজ দেবী নয়, দশজন মিউজ দেবী আবির্ভূত হতেন। এবং দশম দেবী ছায়াছবিকে একটি সমূহ স্বতন্ত্র প্রকৃতির এবং রুপের [রূপের] কলানুশীলন বলে মনে করে তাঁর ভাগ্য প্রসন্ন করবার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন।


ভারতীয় আলংকারিক নাটককে ‘দৃশ্য কাব্য’ বলে অভিহিত করেছেন। বুঝতে অসুবিধে নেই, নাটকের রুপ ও প্রকৃতির এ রকম প্রশস্ত পরিচয়ের ছায়ার মধ্যে ছায়াছবিও এসে দাঁড়াতে পারে। ছায়াছবিও তার রুপেগুণে ও প্রকৃতিতে ‘দৃশ্য কাব্য’, যদিও এর অধিষ্ঠান অভিনীত নাটকের মঞ্চের মতো কোন সীমিত পরিবেশের মধ্যে আশ্রিত নয়। কণ¦মুনির আশ্রম থেকে শকুন্তলার বিদায় নিয়ে চলে যাবার ঘটনা যে করুণতা সৃষ্টি করেছিল, সে করুণতার পারিবেশিক রুপ ছায়াছবি যতটা প্রাণময় করে ফুটিয়ে তুলতে পারে, অভিনীত নাটকের মঞ্চের পক্ষে ততটা ফুটিয়ে তুলবার সাধ্য নেই।


কলানুশীলন হিসাবে [হিসেবে] ছায়াছবির যোগ্যতা ও শক্তির এই বিশেষ অধিকার ছায়া-ছবিকে বিশেষভাবে গুণান্বিত করেছে। জীবনের যে রুপ রসানুগ আবেদন অভিব্যক্ত করে কাব্য হয়, সেই রুপ প্রতিভাসিত করতে ছায়াছবিকে মঞ্চে অভিনীত নাটকের তুলনায় অনেক বেশী [বেশি] যোগ্য বলে মনে করতে হয়। কোনো সন্দেহ নেই, পারিবেশিক রূপ নির্মাণের প্রয়াসে আধুনিক মঞ্চের নাটক আধুনিক টেকনোলজির তথা কারিগরী [কারিগরি] বিজ্ঞানের অনেক সাহায্য গ্রহণ করে তার ব্যবহারিক কারুমিতির উৎকর্ষ বাড়িয়েছে। কিন্তু এই ব্যাপারেও মঞ্চের অভিনীত নাটকের যোগ্যতা ছায়াছবির যোগ্যতার তুলনায় খুবই সীমিত। আধুনিক টেকনোলজির সমূহ সাহায্য ছায়াছবিই গ্রহণ করতে পেরেছে। সুতরাং অনুমান করলে নিশ্চয়ই ভুল হবে না যে, দৃশ্য কাব্য নয়নাভিরাম করে ফুটিয়ে তোলবার এই বিশেষ শক্তিতে ছায়াছবি মঞ্চে অভিনীত নাটকের তুলনায় বিশিষ্ট।


বয়সের হিসাবে অন্য সব কলানুশীলনের ছায়াছবিকে বয়ঃকনিষ্ঠ বলতে হয়। কিন্তু এই বিস্ময়ের সত্যটি অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, এই বয়ঃকনিষ্ঠ কলানুশীলনই আজ বিশ্বের জনজীবনের উপর [ওপর] তার বিনোদক কৃতিত্বের বিপুল প্রভাব সঞ্চারিত করে ফেলতে পেরেছে। ছায়াছবির এ প্রভাব অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে যে বিপুলতর হবে, তাতে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা বলতে পারেন, নবতর সম্ভাবনার যে পথ ধরে ছায়াছবির পরিণাম অগ্রসর হয়ে চলেছে, সে পথের আলো-ছায়ার রূপ কেমনতর। দুরূহতার কী বাধা ও কত বাধা জয় করে, কত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ছায়াছবি তার নবতর সার্থকতা অন্বেষণ করছে, সে তথ্য না জেনেও ধারণা করতে অসুবিধে নেই যে, বিশ্বের জনজীবনের প্রাত্যহিক আগ্রহের সঙ্গে ছায়াছবির সম্বন্ধ আরও ব্যাপক এবং আরও ঐকান্তিক হবে। ছায়াছবির সেই ভবিষ্যৎ পরিণামরমণীয়। নিতান্ত চিত্তবিনোদনের ভূমিকার মধ্যে ছায়াছবির কর্তব্য ও কৃতিত্ব সীমায়িত হয়ে থাকবে না। এমনও হতে পারে যে, ছায়াছবিরই উদার বৈচিত্র্যে বিদ্যা এবং জ্ঞানও সর্বজনের অধিগত বৈভবে পরিণত হবার প্রথম সৌভাগ্য লাভ করবে। তবু প্রশ্ন করা চলে, চিত্তবিনোদনের কলানুশীলন হিসাবে [হিসেবে] ছায়াছবি কি তার কৃতিত্বের ও কর্তব্যের একটি আদর্শ উদ্ভাবিত করে ফেলতে পেরেছে? সার্কাস এবং ম্যাজিকও মানুষের চিত্ত বিনোদিত করে। কিন্তু কেউ নিশ্চয় এমন অভিমত সমর্থন করবেন না যে, যে-আনন্দ সার্কাস বা ম্যাজিকের দান, সে-আনন্দের অনুরূপ কোন রম্যতার দৃশ্য পরিবেষণ [পরিবেশন] করা ছায়াছবির আদর্শ হতে পারে। ছায়াছবির রূপ সমগ্রগ্রাহিতার একটি সৃষ্টি বটে। গানে ও নাচে যে আনন্দ আছে, সে আনন্দ ছায়াছবিরও আত্মরূপের সংগঠনের প্রয়োজনে গৃহীত হতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ছায়াছবিকে নিশ্চয়ই একটি বিশেষ এবং স্বকীয় রম্যতায় অভিব্যক্ত হতে হবে। সরল করে বলা চলে, দৃশ্য কাব্য হিসাবে অভিব্যক্ত হবার যোগ্যতায় মঞ্চের নাটকের বৈশিষ্ট্য যে সীমার কাছে এসে ফুরিয়েছে, ছায়াছবিকে সেই সীমার বাহিরে অন্বেষণ করে অতিরিক্ত একটি রুপরম্য ও রসানুগ অনুভূতি প্রতিচ্ছবিত করতে হবে। নইলে সমালোচকের পুরাতন অভিযোগটি থেকেই যাবে যে, সিনেমা বস্তুত কলের থিয়েটার ছাড়া আর কিছুই নয়।


ছায়াছবি তার স্বকীয় কৃতিত্বের কোন আদর্শ উদ্ভাবিত করতে পেরেছে কি না, এই প্রশ্নের সঙ্গে আর একটি কঠিন প্রশ্ন অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে রয়েছেজ্জজনসাধারণ কি তার আগ্রহের অথবা অভিরুচির কোন আদর্শ নির্ধারিত করে ফেলতে পেরেছে? সিনেমা ভবনের সম্মুখে সাধারণ দর্শক-জনতার আগ্রহ ও উল্লাসের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যে অদ্ভুত অথবা অতিবাস্তব একটি সত্য প্রকট হবে, সেটা ছায়াছবির সম্পর্কে জন-অভিরুচির একটি নৈরাজ্যের পরিচয়। ছায়াছবির কাছ থেকে কেমনতর আনন্দের প্রাপ্তি আশা করা উচিত এবং উচিত নয়, সাধারণ জন-অভিরুচিতে এই বিচার সুস্পষ্ট কোন রূপ গ্রহণ করেনি। ছায়াছবি যেন কল্পতরু, নাচ গান সার্কাস ম্যাজিক সবই তার দান হয়ে ঝরে পড়বে। ছায়াছবিতে শুধু নাচ ও গানের সমারোহ দেখেই আশার ও অভিরুচির পেট ভরে যায়, এমন দর্শকের অভাব নেই। ছায়াছবির বিশেষ শিল্প-স্বরূপের সম্যক পরিচয় এই শ্রেণীর দর্শকের চিন্তায় ও ধারণাতে সংজ্ঞায়িত হয়ে ওঠেনি। এর  ফলে এমন এক শ্রেণীর ছায়াছবির সৃষ্টি হয়েছে ও হয়ে চলেছে, যা বস্তুত কলারীতির এবং রূপতত্ত্বের সম্বন্ধ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং অপচারিত এক শ্রেণীর পণ্য-সামগ্রী মাত্র।


বিংশ শতাব্দীর সাংস্কৃতিক কৃতিত্বে ছায়াছবি নামের যে রম্য রূপশিল্প উদ্ভূত হয়েছে, তার বয়সের নবীনতাই বোধহয় প্রধান কারণ, যার জন্য ছায়াছবিকে এধরনের উদভ্রান্তি সহ্য করতে হচ্ছে। তার আবেগ একটি বিশিষ্ট সৌকর্যের আদর্শ অন্বেষণ করবার জন্য নানা পথে প্রবাহিত হচ্ছে, কিন্তু পরিণামের সুস্পষ্ট রাজপথ এখনও তার দৃষ্টিগোচর হয়নি। এটা স্বাভাবিক। ছবি দেখে দর্শকের আনন্দ নতুন বিস্ময়ে ভরে গিয়েছে, এমনতর উৎকর্ষের অনেক ছবির কথা বিশেষজ্ঞরা বলে দিতে পারবেন। স্বীকার করতে হবে, জলস্রোতের অস্থিরতাময় আবর্তের মধ্যেই সুন্দরতার অনেক পদ্ম ফুটেছে। কিন্তু তাতে এমন কোনো সত্য নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয়ে যায় না যে, ছায়াছবি তার বিশেষ রুপ ও প্রকৃতির স্নিগ্ধ অভিষেক পেয়ে গিয়েছে।


প্রবন্ধের লেখক তার তরুণ বয়সের একটি দিনে ‘দেবদাস’ ছবি দেখে যে মুগ্ধতায় অভিভূত হয়েছিল, আজ সেই ছবি দেখে ঠিক তেমনতর মুগ্ধতায় নিশ্চয়ই অভিভূত হবে না। বাংলা ছবি সেদিনের তুলনায় আজ নূতনতর অনেক বিস্ময় সৃষ্টি করবার শক্তি ও যোগ্যতা লাভ করেছে। বাংলা ছায়াছবি পরিণামের পথে কোথাও এবং একই স্থানে থিতিয়ে থাকেনি। বাংলা ছবির সৌকর্য বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আর্টের বিচারে শুধু নতুন হয়ে যাবার ক্রিয়াটাই উন্নত হয়ে যাবার ক্রিয়া নয়। রূপতত্ত্বের জগতে সকল রম্যকলার যেমন রমণীয় সৌকর্যের পোশাক থাকে, তেমনই একটি রমণীয় প্রাণও থাকে। ঠিক কথাটা বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন, প্রবন্ধের লেখক তাঁর অতি অল্পাভিজ্ঞতার সম্বল নিয়ে শুধু এটুকু বলতে পারে যে, চমৎকার সৃষ্টি বলে অভিনন্দিত অনেক ছায়াছবির মধ্যে যথার্থ রম্যকলাসম্মত এই প্রাণস্বরূপ নেই। রীতি পদ্ধতি ও কৌশলের কীর্তিকারিতা বিস্ময়কর হতে পারে, এবং সে বিস্ময় আনন্দ প্রদান করতেও পারে, কিন্তু ছায়াছবির পক্ষে শুধু এগুলিই তার স্বার্থক সিদ্ধির গৌরব হতে পারে না। ইউটিলিটিবাদী দার্শনিকও স্বীকার না করে পারেন নি যে, একটি রম্যকলার কীর্তির মধ্যে খণ্ড খণ্ড বৈচিত্র্যের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ যতই মধুর হোক না কেন, তাদের সকলে যদি একটি আত্মিক সম্বন্ধে যুক্ত না থাকে, তবে রম্যকলার সেই কীর্তির কোন বিশেষ রম্যতার স্বাদ সত্য হয়ে উঠতে পারে না।  রূপের ও বৈচিত্রের টোটালিটি যেমন সাধারণ বস্তুর তেমনি রুপকলারও বিশেষ স্বাদুতার রস প্রত্যক্ষানুভূতির অধিগত করে। বাংলা ছবির সমালোচনায় এই অভিযোগের মন্তব্য প্রায়ই শোনা যায় যে, অমুক ছবির মধ্যে খণ্ড-খণ্ড ঘটনার দৃশ্যগুলিতে যথেষ্ট সুন্দরতা থাকতেও সমগ্রভাবে ছবিটি ব্যর্থ হয়েছে।


প্রসঙ্গত পরিচালকের প্রতিভার প্রশ্নটি এসে পড়ছে। বাংলা ছায়াছবির অভিজ্ঞ ও কৃতী পরিচালকেরা সকলেই উপলব্ধি করেন, কারও কাছে এই সত্যটি অজানা নয় যে, ছায়াছবিতে পরিবেষিত [পরিবেশিত] কোন খণ্ড বৈচিত্র্যের মধ্যে অজস্র বিস্ময়ের প্রকাশ সম্ভব করলেই ছায়াছবির সৌষ্ঠব বিলসিত [বিলাসিত] হয়ে উঠতে পারে না। ছবি তার সমগ্রতার মধ্যেই সত্য। দুঃখের বিষয়, তবু দেখা যায় যে, অনেক ক্ষেত্রে খণ্ড বৈচিত্র্যের প্রতি পরিচালকের মোহ ও অনুরাগের আতিশয্যে ছবির সমগ্র আবেদন বিস্বাদ হয়ে গিয়েছে। এমন ব্যাপারও দেখা যায় যে, অভিনেতা অথবা অভিনেত্রীর বিশেষ ইচ্ছা আগ্রহ অথবা সুবিধার জন্য কাহিনীর [কাহিনির] ঘটনা চরিত্র ও প্রধান আবেদনের নিদারুণ রদবদল হয়েছে। যে-কাহিনী পরিচালকের ভালো লেগেছে, বুঝতে হবে যে, সে-কাহিনীর সমগ্রতার মধ্যে নিহিত রূপের সত্যটিকে তিনি কল্পনা করতে, বুঝতে ও দেখতে পেরেছেন। তবু দেখা যায় যে, তিনি তারই প্রিয় মূর্তিটির অঙ্গহানি করে নূতনতর অঙ্গ যোজনা করেছেন। অভিনেতার সুবিধার জন্য এমন কাণ্ড করবার কোনই স্বার্থকতা থাকতে পারে না, যদিও সমগ্রতার রূপ ও আবেদনের দিকে লক্ষ্য রেখেই কাহিনীর কিছু গৌণ সংস্কারের প্রয়োজন হয়।


পরিচালকের কর্তব্য বড়ই কঠিন, রূপকলার আদর্শ সম্বন্ধে তাঁর চিন্তা ও অভিরুচির সতর্কতা ও নিষ্ঠা তাই তাঁর প্রতিভারই পক্ষে একটি বৃহৎ সহায়ক সম্বল। প্রবন্ধের লেখক কাহিনী রচনা করতেই অভ্যস্ত, তবু ছায়াছবির পরিচালনার কিছু দৃশ্য দেখবার অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। স্মৃতির পটে অতীতের দেখা সেই দৃশ্যটি আজও দেখতে পাই। হাজারিবাগের কানারি পাহাড়ের কাছে শাল-জঙ্গলের একটি নিভৃতে ‘শুটিং’ চলছে। কপালকুণ্ডলা ছবির শুটিং। পরিচালক নীতিন বসু। তরুণ বয়সের কৌতুহলের কাছে শুটিং-এর সেই দৃশ্যটি শুষ্ক কঠোর ও ছন্নছাড়া একটা কর্তব্যের দৃশ্য বলে বোধ হয়েছিলো। নবকুমার (দুর্গাদাস) একটি বন্য গাছের বিষতিক্ত ফল হাতে তুলে নিয়ে কামড় দিলেন এবং পরমুহূর্তে থু-থু করে সেই ফল দূরে নিক্ষেপ করলেন। কপালকুণ্ডলা (উমাশশী) দূরে দাড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছেন। তিনবার কি চারবার ক্যামেরাতে ওই একই দৃশ্যের রূপ গ্রহণ করা হলো। মধ্যাহ্নের রৌদ্রজ্বালার মধ্যে দাঁড়িয়ে পরিচালক তাঁর কপালের ঘাম মুছছেন। মনে হয়েছিলো, পরিচালকের কাজটাই বস্তুত একটা শুষ্ক ও কঠোর ও রৌদ্রজ্বালাময় ব্যস্ততার কাণ্ড। বিস্ময়ও বোধ করতে হয়েছিলো, কী আশ্চর্য, পরিচালকেরা এইভাবে টুকরো-টুকরো দৃশ্যের ছবি নিয়ে একটি কাহিনীর পূর্ণ রূপ নির্মাণ করেন?


বাঙালীর [বাঙালির] বিয়েতে বাসরঘরের একটি আনন্দের ক্রিয়াচার প্রতিপালিত হতে দেখা যায়। বড় একটি পাত্রের মধ্যে জল ঢেলে তার উপর দুটি শোলার টুকরো ভাসিয়ে দেওয়া হলো। আচারিকা তরুণী তাঁর হাত চালিয়ে পাত্রের জল বার-বার টলিয়ে দিচ্ছেন, এবং শোলার টুকরো দুটিও এদিক থেকে ওদিক ভেসে চলে যাচ্ছে। তারপর দেখা গেল, দুই শোলার টুকরো কাছাকাছি হয়ে পরস্পরকে স্পর্শ করেছে। বাসরঘরের সব তরুণীর হর্ষ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো। কারণ এই দৃশ্যটি বর-বধূর মধুর মিলনের একটি প্রতীকদৃশ্য। প্রতীকের এ-রকম সমাদর বাসরঘরের লঘু পরিহাসের জগতে একটা সার্থক দৃশ্য বলে সমাদৃত হতে পারে।


কিন্তু ছায়াছবির রূপের মধ্যে কি প্রতীকের কোন সার্থক প্রয়োজন থাকতে পারে? প্রতীকের ব্যঞ্জনার শক্তি খুবই সীমিত, এবং রূপায়ণে তার কোন শক্তিই নেই। কোন কোন বাংলা ছবি দেখে মনে হয়েছে পরিচালক যেন প্রতীককে একটি সার্থক রূপকল্প বলে ধারণা করেছেন। প্রতীকের প্রকোপে অভিভূত ছায়াছবি কখনই রসোত্তীর্ণ সৃষ্টি হতে পারে না, সেই প্রতীকের মধ্যে যতই কৌশলের চমক থাকুক না কেন। প্রতীক বরং শিল্পকর্মের বাধা এবং শিল্পীর প্রতিভার দূর্বলতার পরিচায়ক বলে বিবেচিত হয়েছে। গাণিতিক ধাঁধার মধ্যে যে রস (?) থাকে, ছায়াছবির মতো রূপান্বিত সৃষ্টির পক্ষে সে রসের কোন প্রয়োজন থাকতে পারে না। ছায়াছবি গুণে ও ধর্মে এবং রূপে ও স্বভাবে প্রত্যক্ষানুভূতির বিনোদক উপচার। প্রত্যক্ষানুভূতি যদি বিড়ম্বিত হয়, তবে ছায়াছবির ছায়া ও ছবির উভয়েরই কোন সার্থকতা থাকে না। জীবনের দৃশ্যটি সহজ আবেগের গুণে হৃদয়সংবেদ্য না হলে সেটা কাব্য না হয়ে অংক হয়ে যায়।


ছায়াছবি কলানুশীলন হিসাবে বিংশ শতাব্দীর একটি মহৎ সৃষ্টি। আধুনিক টেকনোলজির উদার সাহায্য নিয়ে ছায়াছবির প্রকর্ষ রূপান্বিত হয়েছে। সুতরাং, বাংলা ছবির অথবা ভারতীয় ছবির কি একটি বিশিষ্ট ‘জাতীয় চরিত্র’ নিয়ে রূপান্বিত হতে পারে? ছায়াছবি নির্মাণের রীতি ও পদ্ধতির পক্ষে জাতীয় চরিত্রে বিশেষিত হবার উপায় নেই; কারণ রীতি ও পদ্ধতির যান্ত্রিক সৌষ্ঠবটি বয়সে আধুনিক এবং চরিত্রে আন্তর্জাতিক। কিন্তু ছবির রূপের মধ্যে কি ভারতীয়তার রূপ বিশেষিত হতে পারে না? এই প্রশ্নের বিচার অবশ্য তর্কসাধ্য, কিন্তু মীমাংসা বোধহয় তর্কসাধ্য নয়। তবে দর্শক, প্রযোজক ও পরিচালক সকলেরই চিন্তার ক্ষেত্রে একটি সতর্কতা প্রয়োজন। বিদেশের প্রশস্তি সম্পর্কে সতর্কতা। বিদেশের প্রশস্তি ভালো, কিন্তু সে প্রশস্তি ভারতীয় ছায়াছবির উন্নত সৌকর্যের একমাত্র কিংবা প্রধানতম প্রমাণ নয়। বরং মনে হয় যে, বিদেশের প্রশস্তির জন্য যদি একটা আকুলতার ভাব ব্যাপক হয়ে ওঠে, তবে তাতে ভারতীয় ছায়াছবির উৎকর্ষ ও উন্নতিরই হানি বড় হয়ে উঠবে। ছায়াছবির ভবিষ্যত পরিণাম রমণীয়, এবং সেই ভবিষ্যতেরই দিকে অগ্রসর হবার জন্য ভারতীয় ছায়াছবিকে নিজ প্রতিভার সহায়তায় এবং অনুকরণের মোহ বর্জন করে, ‘স্বে মহিম্মি’ প্রতিষ্ঠার পথ বেছে নিতে হবে।


দায়স্বীকার : সুবোধ ঘোষের এই প্রবন্ধটি ৪৫ বছর আগে ১৩৮০ বঙ্গাব্দে (১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে) প্রখ্যাত দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।


লেখক : সুবোধ ঘোষ, ভারতীয় লেখক ও কথাসাহিত্যিক। বাঙালি পাঠক সমাজে তিনি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে তার ‘অযান্ত্রিক’ এবং ‘ফসিল’ বাংলা সাহিত্যের যুগান্তকারী দুটি গল্প। এছাড়া তিনি ‘তিলাঞ্জলি’ (১৯৪৪) নামে একটি রাজনৈতিক উপন্যাস রচনা করেন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন