প্রকাশিত ২৪ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ম্যাজিক আড্ডা
যৌনতার হাত ধরেই কি বাংলা ছবি সাবালক হবে?

নারী অভিনয়শিল্পীরা শরীরের কতোটুকু দেখাতে পারবে, কতোটুকু দেখালে ‘অশ্লীল’ হবে; আবার পুরুষ অভিনয়শিল্পীদের ক্ষেত্রে নিয়মের বালাই নেই কেনো-এই বিতর্ক দীর্ঘদিনের। তবে এই বিতর্ককে আরো জোরালো করে ছত্রাক (২০১১) নামের একটি চলচ্চিত্র। যার নির্মাতা শ্রীলঙ্কান বিমুক্তি জয়সুন্দরা। কোনোভাবে চলচ্চিত্রটির একটি ‘ন্যুড’ ভিডিও ক্লিপ ইন্টারনেটে প্রকাশ পায়, যেটি কিনা মূল চলচ্চিত্রে দেখানো হয়নি। যদিও সেই ক্লিপে টালিগঞ্জের পাওলি দাম ও অনুব্রত’কে দেখা যায়; কিন্তু ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে কেবল পাওলিকে নিয়ে; প্রশ্ন ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রের মান নিয়েও। এ রকম পরিস্থিতিতে ‘যৌনতার হাত ধরেই কি বাংলা ছবি সাবালক হবে?’ শিরোনামে ভারতের স্যাটেলাইট চ্যানেল ‘স্টার আনন্দ’ আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে সুমন দে’র সঞ্চালনায় উপস্থিত হন সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা পাওলি দাম ছাড়াও গৌতম ঘোষ, অঞ্জন দত্ত, ঋতুপর্ণ ঘোষ, হরনাথ চক্রবর্তী, প্রীতম, চন্দ্রিল ভট্টাচার্য, সুমন মুখোপাধ্যায় ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্র, নারী স্বাধীনতা, যৌনতার নানা দিক ও সেন্সরশিপ। সেই আলোচনার ভিডিওটি ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করে ম্যাজিক লন্ঠন-এর পাঠকের জন্য অনুলিখন করা হয়েছে। যে কেউ চাইলে অবশ্য এই লিঙ্কটিতে https://www.youtube.com/watch?v=OOpDLGkCtjg; retrieved on: 10.10.2016 ঢু মেরে আসতে পারেন মূল ভিডিওটি দেখার জন্য। আড্ডার দ্বিতীয় পর্ব এবার প্রকাশ করা হলো।
ঋতুপর্ণ ঘোষ : হ্যাঁ, প্যারেন্টাইল গাইডেন্স। আমি বলেছিলাম, প্যারেন্টাইল গাইডেন্স ইজ পাস্ট। এখন আর কোনো বাবা-মা সন্তান সঙ্গে নিয়ে সিনেমা দেখতে যায় না; এমনকি সন্তানও বাবা-মার অনুমতি নিয়ে সিনেমা দেখতে যায় না। লীলা (লীলা স্যামশন; ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন-এর চেয়ারম্যান, ২০১১-২০১৫) তাতে এগ্রি করলেন। ফারদার আমাদের একটা মিটিং আছে। যাক সে কথা, ভারতীয় সেন্সরশিপে প্যারালাল অনেক সিনেমা টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে, যেগুলো ..., কিন্তু অনেক ছোটো বাচ্চা সেগুলো দেখছে।
গৌতম ঘোষ : আমার প্রশ্ন তো সেখানেই ঋতু!
ঋতু : তাহলে তো এটা প্যারাডক্স!
গৌতম : এটা বিরাট ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, টেলিভিশনে কোনো রকম সার্টিফিকেশনও লাগে না!
ঋতু : অলমোস্ট পার্সিয়াল!
গৌতম : এই যে সার্টিফিকেশন, তার মানে কোনো একটা ইন্সটিটিউশন তোমাকে ক্লিয়ারেন্স দিচ্ছে। সেটা টেলিভিশনে লাগছে না। এটাই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। একই দেশে তো দুটি আইন হতে পারে না। এটা হচ্ছে পাবলিক ব্রডকাস্ট, পাবলিক ভিউন। একটা পাবলিক ব্রডকাস্টে ভিউয়ারশিপ সিনেমার থেকে অনেক বেশি। শত শত চ্যানেল, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ সফট্্ওয়্যার, তার ওপর কোনো কন্ট্রোল নেই; তাহলে সিনেমার ওপর কেনো থাকবে! এটাই প্রশ্ন। তাহলে ব্রডকাস্ট বিল এনে সবকটাকে কন্ট্রোল করো! সেই মেশিনারি আছে সেন্সরবোর্ডে? (হরনাথ’কে লক্ষ করে)
হরনাথ চক্রবর্তী : না।
গৌতম : সম্ভব না। আমি বলছি কেনো, তাহলে টেলিভিশনে আমরা মুক্ত পৃথিবী দেখতে পারবো, কোনো বাধা থাকবে না! সিনেমার ক্ষেত্রে একটা সার্টিফিকেশন লাগবে। এটা নিয়ে ন্যাশনাল ডিবেট হওয়া উচিত!
ঋতু : এবং সিনেমার ক্ষেত্রে সার্টিফিকেশন লাগবে, সেটা আমি নিজেও জানি। আমার দোসর সিনেমাটা অ্যাডাল্ট, সি বি এফ সি (সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন) অনুযায়ী ওটা অ্যাডাল্ট। কিন্তু ওটা ‘স্টার জলসা’ যে কতোবার দেখিয়েছে, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই!
হরনাথ : সেটা অ্যাডাল্ট হলে ফারদার সেন্সর করিয়ে ...।
ঋতু : আমরা কিছুই করিনি, কিছু করা হয়নি!
হরনাথ : কেউ যদি না করে থাকে, সেটা আলাদা ব্যাপার। কিন্তু একটা নিয়ম আছে।
গৌতম : ও (ঋতু) না হয় একটা সিনেমার কথা বললো। যদি একটা টেলিভিশন প্রোগ্রাম দেখানো হয়, যাতে প্রাপ্তবয়স্কদের দেখার মতো দৃশ্য রয়েছে; সেটার জন্য কি সার্টিফিকেশনের ...।
হরনাথ : আমি বলছি ...।
গৌতম : বা ‘স্টার জলসা’ একটা টেলিফিল্ম প্রোডিউস করেছে, সেটা কি সেন্সর ...।
হরনাথ : আমি ‘স্টার আনন্দ’-এর কথা বলছি। সুমন (সঞ্চালক) অনেক সময় অনেক কিছু দেখাতে গিয়ে দর্শককে বলেছে, আমরা এখানে এটা করছি, আমরা এটা দর্শককে দেখাতে চাই না। সেটা কিন্তু তারা নিজেরাই করে নেয় (গৌতম : সেটা সেল্ফ সেন্সরশিপ)। টিভিতে ফ্যামিলির সবাই যেসব সিনেমা দেখে-টিভি যারা পরিচালনা করছে তারা এটা জানে-সেখানে এমন কিছু করলে তাদের টি আর পি নেমে যাবে-চলবে না। সেটা মনে হয় সবাই জানে, সেখানে কোনো বিতর্ক নেই।
সুমন : এটা শর্ট টার্ম এবং লঙ টার্মের চিন্তার ব্যাপার। এবার আমি চন্দ্রিলের [কবি, কলাম লেখক, নির্মাতা চন্দ্রিল ভট্টাচার্য] কাছে যাবো। এই যে কোনটা শ্লীল, কোনটা অশ্লীল-এ ধরনের আপেক্ষিক বিষয় কে নির্ধারণ করবে? কোন সেন্সরবোর্ড, কোন মানুষ, কোন পণ্ডিত? এ বিষয়ে শেষ কথা বলবে এবং এমন কোনো শেষ কথা বলবে; যেটা যুগের সঙ্গে সঙ্গে কোনোরকম পরিবর্তন হবে না। এটা কি সম্ভব!
চন্দ্রিল ভট্টাচার্য : এটার সহজ উত্তর হলো, এমন কথা কেউ বলবে না। কোনো ভদ্র জায়গায় কেউ বলে না। কারণ, সিনেমা দেখে যার ভালো লাগলো না, সে চলে গেলো। সিনেমাহলের সব জায়গায় কিন্তু এক্সিট লেখা আছে, সেটা জ্বল জ্বল করছে; বেরিয়ে যাওয়ার কোনো বাধা নেই। রেডিও, টিভিতে অফ করার একটা নব থাকে, ভারতের অনেকেই মনে হয় এটা জানে না! ঋতু দা একটু আগে বললো না-খুব তর্ক করলো না, বাংলা সিনেমা অনেকদিন আগে ওয়ার্ল্ড সিনেমা হয়ে গেছে। যদি সত্যই হতো তাহলে কন্টোভার্সি বা এই ডিবেটটা হতো না! তাহলে গৌতম ঘোষের মতো পরিচালককে বলতে হতো না, ‘আমি ওটা কায়দা করেছি যাতে সেন্সর ওটা পাস করে’। অঞ্জন দত্তের মতো পরিচালককে বলতে হতো না, ‘আমার মনে হয় অনেক সিনেমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে; ওটা দেখাতে না পেরে। কারণ সেটা ডিমান্ড করছে।’
এমনটা তো হতেই পারে। একটা লোক যাকে আমরা চিনিই না, সে হয়তো পৃথিবীর সেরা পরিচালক। সে হয়তো ১৭টা যৌন দৃশ্য দিয়ে একটা সিনেমার কথা ভেবেছিলো, বাংলায় করতে হবে বলে কোনোদিনও করে উঠতে পারলো না! কে বলতে পারে, সেটা হতে পারতো পথের পাঁচালীর চেয়ে ১০ গুণ ভালো সিনেমা! কেনো আমরা এ রকম একটা জায়গায় পড়ে থাকবো? সত্যজিৎ রায় অপুর সংসার করতে গিয়ে বলেছিলেন, যেহেতু অপু আর অপর্ণাকে তিনি কোনো যৌন দৃশ্যে দেখাতে পারবেন না; সেহেতু উনি সেই প্যারামিটারটা মেনে নিয়ে অন্য একটা সিকোয়েন্স করেছিলেন। যেটা ওর মতে, বিশ্ব সিনেমায় একটা সুইটেস্ট সিকোয়েন্স। তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
সত্যজিৎ মনে করতেন একটা সমাজের বাস্তবতা মেনে সিনেমা করতে হবে। পৃথিবীতে এ রকম পরিচালক থাকতেই পারেন, যিনি মনে করতে পারেন, সমাজ আমাকে ঠিক করে দেবে, তবেই আমি চিত্রনাট্য লিখবো; এটা আমি মানবোই না। পৃথিবীতে যতো শিল্প আছে-আজকে তো চলচ্চিত্র নিয়ে কথা হচ্ছে। ধরো, ক্যানভাসে একটা লোক আকঁছে, পিকাসো মনে করলো এটা হয়নি-চোখের নিচে একটা চোখ বসে দিবো। এবার পিকাসো বললো, ব্র্যাক (Georges Braque, ১৮৮২-১৯৬৩ খ্রি.) তুই এটা কী বলছিস? ব্র্যাক আর পিকাসো মিলে কিউবিজমটা তৈরি করেছিলেন। সেটা বলে, সবকিছুকে ভাঙো, যেখানে যেটা খুশি বসাও। এটা কী হতে পারে, একটা চোখের নিচে আর একটা চোখ হয়? না সনে তলায় একটা কুমির হয়? এটা হতেই পারে না। ফলে সে করবে না। কিন্তু সমস্ত শিল্প এগিয়ে গেছে একভাবেই-পৃথিবীতে যতো শিল্প আছে, লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন প্যারিস যখন বার্তোলুচি করেছিলেন; গৌতম দা যেটা বলছিলেন-পাগলের মতো সব জায়গায় হইহই পড়েছিলো। ইতালিতে বললো, এটাকে ঢুকতে দেবো না, অমুক করবো না ইত্যাদি। তারপর কান-এ যখন সিনেমাটা দেখালো, লেখালেখি হলো-আর এখন তো ওটা লিজেন্ডারি সিনেমা।
এই ঝগড়াঝাঁটি চিরকাল হয়েছে, কবি জয়দেবকে ‘গীতগোবিন্দ’ লেখার জন্য কম কুৎসা শুনতে হয়নি। এর মধ্যে তোমার এতো রতি-রস যে, জল তুলতে গিয়ে-মা তার বাচ্চাকে কুয়োয় ফেলে দিলেন। এইটাকে বিষয় করে বলা হলো, জয়দেব খুব খারাপ লিখেছেন! এবার তোমাকে কেউ ঠিক করে দিবে না-যেই তুমি কাউকে বলবে, অমুক ঠিক করে দিবে; তখন পৃথিবীর যে কেউ একটা করে ...। আমি একটা লেখা লিখেছিলাম-আমি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে বলছি না। ধরো, সেন্সরবোর্ডে পাঁচ জন লোক আছে, তাদের রুচি অনুযায়ী একটা সিনেমা পাস হবে। তো ধরা যাক, সেন্সবোর্ডে জগদীশ [চন্দ্র] বসু বসে আছে, ঋতু দার একটা সিনেমায় প্রেমিক একটা গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে প্রেমিকার খোঁপায় পরিয়ে দিলো। জগদীশ বসু বললো, এটা ব্যান! কারণ একটা গাছ, যার প্রাণ আছে; তুমি তার অঙ্গ মুচড়িয়ে নিলে, এটা কি হয়! একটা বাচ্চার আঙ্গুল আপনি ছিঁড়ে আঁচলে ঢুকিয়ে দেখাতে পারেন? পারেন না। জগদীশ বসু বললো, এই সিনেমাটা ব্যান করো!
ঋতু দা বললো, কেনো? জগদীশ বসু বললো, না-হবে না। কারণ গাছের প্রাণ আছে। তুমি পাথর দেখাতে পারতে, ললিপপ দেখাতে পারতে; তুমি কেনো ফুল দেখালে! ফলে তুমি পৃথিবীতে যাই করবে-ধরো, হিটলারের বিরুদ্ধে একটা সিনেমা করছি। আমাদের কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভালে একবার একটা সিনেমা আসছিলো, লেলিনকে নিয়ে; লেলিনের বিরুদ্ধে নয়! সেখানে টরাস বলে একটা সিনেমা দেখানো হয়েছিলো। সেই সিনেমা নিয়ে বিরাট হট্টগোল হয়। এর কারণ ছিলো দুটি। এক. এখানে লেলিনকে একবার পিছন থেকে নগ্ন দেখানো হয়েছিলো; দুই. লেলিনের এমন একটা অসুখ দেখানো হয়েছিলো, যাতে তিনি সবকিছু ভুলে যাচ্ছেন।
আমি জানি না এ নিয়ে আপত্তি কেনো হয়েছিলো। তবে এর প্রধান কারণ হতে পারে-লেনিনের কখনো নিতম্ব থাকতে পারে না! তিনি এতো বড়ো একজন মানুষ, হয়তো বুক পর্যন্ত ছিলো; আবক্ষ। দ্বিতীয় ঝনঝনিটা হলো-লেনিনকে কেনো দেখানো হবে, তিনি সবকিছু ভুলে যাচ্ছেন! আমরা সবাই লেনিনের নাটক পড়েছি ‘লাল ঘাসের নীল ঘোড়া’, সেখানে তার ব্রেনে একটা গুলি লেগেছিলো। তিনি সবসময় এটা জানতেন, এই সমস্যাটা হতে পারে। কিন্তু বিপ্লবের জন্য তার এতো কাজ যে, উনি এটা নিয়ে ভাবার সময় পাননি। এই নিয়ে হইহই হয়ে গেলো। ঠিক আছে, খুব ভালো কথা; এটা দেখানো উচিত না। পরের দিনই আরেকটি সিনেমা দেখানো হলো মুলাস, সেটা হিটলার’কে নিয়ে। এটাতে দেখানো হলো, হিটলারের এতোই পেট খারাপ যে, যখন তখন তার মলত্যাগের দরকার হয়। একটা জায়গায় তিনি পিকনিকে গেছেন, প্রেমিকা, বন্ধু-বান্ধব, অধস্তন লোকদের নিয়ে। সেখানে হিটলারের এতো পেয়ে গেলো, সবাইকে তাড়িয়ে দিয়ে একটা জায়গায় চুপি চুপি মলত্যাগ করে সেটা বরফ দিয়ে ঢেকে গটমট করে চলে এলেন।
আরেকটা দৃশ্য-হিটলারের এক বান্ধবী তাকে অনেকক্ষণ তাড়া করে লাথি মেরে চৌবাচ্চায় ফেলে দেন। সেটা দেখে কলকাতার একজন লোকও বললো না, হিটলার এতো বড়ো লোক; তাকে অপমান করছো কেনো? তার মানে হিটলারকে অপমান করা যায়, লেনিনকে যায় না!
গৌতম : হিটলার ভিলেন তো!
চন্দ্রিল : এইবার যদি সেন্সরবোর্ডে নিউ নাৎসির কেউ থাকে, তার মনে হলো-হিটলার যা করেছে, বেশ করেছে, ভালো করেছে। এবার সে ওই সিনেমাকে ব্যান করবে। লেনিনের সিনেমাকে ব্যান করবে না। কিন্তু সত্যিকারের উদার মানুষ তো সেই, যে কোনোটাকেই ব্যান করবে না। বাংলা সিনেমার মোশনটাকে আমি পুরোপুরি সাপোর্ট করি, বাংলা সিনেমা সাবালক হয়নি। নিশ্চয় সত্যজিৎ পথের পাঁচালী করেছেন, সাবালক হয়েছেন। কিন্তু সবাই কী করেছে, একটা প্যারামিটার মেনে চলছে যে, ভাই এর বেশি কিন্তু করতে দিবে না! গৌতম দা যেটা বললেন-এক হচ্ছে, এটা করলে সেন্সর অ্যালাউ করবে না (গৌতম : তুমি দর্শককে সিনেমাটা দেখাতে পারবে না); দুই হচ্ছে, যদিও দর্শককে দেখাও, রুচি অনুযায়ী দর্শক ওটা নেবে না! এখানে ঋতু দা বলছে, এটা বলে তোমরা বাঙালিকে প্রভৌক করছো। আমি মনে করি, এটা বলে দর্শককে প্রভৌক করা উচিত। কারণ, কোনো না কোনোভাবে বাঙালির এটা ফেইস করা উচিত! সাবালক কে? নাবালক কে? নাবালক হচ্ছে, যে সবসময় ভয় পায়, ওখানে জুজু আছে, সেখানে হাম্বুরা আছে ওখানে ... আছে; যাবো না। ওমা, আমি এখন বাথরুমে যেতে পারছি না, ওখানে ভূত আছে। আর সাবালক কে? যে বলে, যা ফেইস কর; কিচ্ছু নেই! অন্ধকার মানে ভূত না, যা। কাউকে না কাউকে প্রয়োজন, সেটা ১০ জন, দুশো জন বা দু’হাজার জন; যারা বলবে এটা ফেইস কর।
তুমি যৌনতার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছো-একবার একটা খবরের কাগজে খবর বের হলো, একজন বাঙালি নারী নগ্ন হয়ে পোজ দিয়েছেন। আর কোনো কথা নেই, চায়ের দোকান, কফির দোকান, কেউ বাথরুম পর্যন্ত যাচ্ছে না-ক্লিপিংটা কোথায়, ক্লিপিংটা কোথায়? তার মানে তুই এ থেকে এই রকম আনন্দ আশা করিস। তাই যদি হয়, যেটা এতো আনন্দ দিচ্ছে, এতোটা প্রলোভ দিচ্ছে; সেটাকে আবার নোংরা বলছিস কেনো! আমরা যখন ফিল্ম ক্লাবে যেতাম বা সিনে সেন্ট্রাল অসাধারণ একটা ফেস্টিভাল করতো, লাইন দিতাম। কী সিনেমা, কী সিনেমা? না অমুক সিনেমা। কটা নোংরা সিন আছে, কটা নোংরা সিন আছে?
গৌতম : হ্যাঁ, আমি একটা গল্প বলি চন্দ্রিল। একটা পোলিশ ফিল্ম ফেস্টিভাল হচ্ছে-জ্যোতি সিনেমায়। তার শেষ সিনেমাটা হচ্ছে, আমাদের আন্দ্রে ভাইদা’র এভ্রিথিং ফর সেল। আমার পাশে এক লোক বসে আছে, সে ব্ল্যাকে টিকিট কিনেছে; গালাগাল দিতে দিতে বের হচ্ছে। সে বলছে, এতো টাকা দিয়ে টিকিট কিনলাম। একজন আমাকে বোঝালো ছবিটা একটা মেয়ের গল্প, জীবনে আর কিছুই নেই, এভ্রিথিং ফর সেল; শেষ অব্দি তার সবকিছু সেল করতে শুরু করলো। কিন্তু কিছুই তো পেলাম না। মানুষের মধ্যে কিন্তু এই কৌতূহল রয়ে গেছে। একটা সময় কিন্তু ফিল্ম সোসাইটির সব সদস্য কেবল ভালো সিনেমা দেখার জন্য সদস্য হয়নি; বহু লোক কিন্তু আনসেন্সর সিনেমা দেখার জন্যও সদস্য হয়েছে।
চন্দ্রিল : কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভালে ডেলিগেট হওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায় কেনো? সবাই কি আন্তর্জাতিক সিনেমা আর ইংরেজি সাবটাইটেল পড়ার জন্য যাচ্ছে। ঘণ্টা যাচ্ছে! এখানে আনসেন্সর সেক্স দেখা যায় বলে যাচ্ছে। আর কোনো কারণে যাচ্ছে না ওখানে। এবার আমার প্রশ্ন হলো, এই যে নোংরা সিন, নোংরা সিন বলে চ্যাচাচ্ছিস; তাহলে নোংরামিটা কোথায়? তোকে তো এটা চমৎকার একটা স্নান দিচ্ছে! যদি ওটা নোংরা হয়, তাহলে তোমার দেখার জন্য এতো উদগ্র আগ্রহ থাকা উচিত নয়। আর যদি আগ্রহ থাকে, আনন্দ দেয়, তাহলে ওটা নোংরা নয়; পরিষ্কার। এদিক দিয়ে বাঙালি কিন্তু সত্যিই একেবারেই নাবালক, সাবালক হয়নি। সেটা কোনো শিল্পেই হয়নি! অবশ্য কবিতায় যৌনতা থাকলে কেউ বলছে না, কারণ সেটা কেউ পড়েই না। ভিজ্যুয়াল সরাসরি আসে। নইলে এ রকম একটা বিষয় হই-হুল্লোড় হচ্ছে, পাগলের মতো চতুর্দিকে একটা কথা-দূর্গা পূজা আসছে, আরে ওসব ছাড়ো, ছত্রাক নিয়ে কথা বলো। তার পরেও ঋতু দা বলছে, না, বাংলা সিনেমা ওয়ার্ল্ড সিনেমা হয়ে গেছে!
আরে কেট উইন্সলেট যদি একটা ন্যুড পোস্ট করে-করবে। তাই নিয়ে তার বাবা পর্যন্ত চিঠি লিখবে না। আর আমাদের এখানে হই-হুল্লোড়ে, চিৎকার-চেঁচামেচিতে কাণ্ড হচ্ছে। এবং আমি মনে করি, বাংলা সিনেমার সাবালক হওয়ার দরকার আছে। তুমি (সুমন) যে প্রশ্নটা করেছিলে, কে শেষ কথা বলবে? যেটার শেষ নেই, কে সেই শেষ কথা বলবে! কেউ বলতে পারে না। পৃথিবীতে একটা সময় ঝামেলা হয়েছে, এখন আস্তে আস্তে কনজারভেটিজম থেকে লিবারালের দিকে আসছে। কিন্তু অন্য কোথাও এখন তো কিচ্ছু করার নেই-যেটা ঋতু দা বললো। সরাসরি বলে দেওয়া যে, ভাই এগুলো আছে। জেনে যদি আসো, তাহলে এসো।
হর দা বলছিলেন, তুমি কি এটা বাচ্চা নিয়ে দেখতে পারবে? প্রশ্ন হচ্ছে, অ্যাডাল্ট সিনেমাতে বাচ্চাদের ঢুকতেই দিবে না। বাইরে বাচ্চা আইসক্রিম খাবে, বাবা-মা’রা দেখবে। এটা কথা নয়, বাচ্চা ঢুকবে কেনো!
হরনাথ : না, আমি হাউজের কথা বলিনি। আমি বাড়িতে বাচ্চাদের নিয়ে ওই সিনেমা দেখতে পারবো না। হাউজে একটা ব্যাপার থাকে, সেখানে ১১ বছরের ছোটো বাচ্চাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এখন ১১-১২ বছরের বাচ্চারা লুকিয়ে সিনেমা দেখে না? (চন্দ্রিল : নিশ্চয় দেখে) লুকিয়ে ব্লু ফিল্মও দেখে। ব্লু ফিল্ম দেখে বলেও তা আমরা বাজারে নিষিদ্ধ করে রেখেছি কেনো? কেনো নিষিদ্ধ করে রেখেছি অনেক অশ্লীল বই? খুলে দাও, ওপেন করে দাও! আপনি দিল্লি গিয়ে অগ্নি কেশের সঙ্গে বসুন, কথা বলুন-তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে!
ঋতু : অনেক দেশে ব্লু ফিল্ম দেখার জন্য থিয়েটার আছে।
হরনাথ : তার জন্য ক্যাটাগরি করা আছে।
গৌতম : পর্নোগ্রাফির ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভাল হয়।
হরনাথ : সেটা ১১+, ১৮+ ক্যাটাগরি আছে।
চন্দ্রিল : এবং কান ফেস্টিভালে এটা প্যারালালি হয়।
হরনাথ : সেটা বহু দেশে আছে, আমাদের দেশে হয়নি। কিন্তু ১৯৫২-এর পর যে সেন্সরটা হয়েছে, তার এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেই সেন্সরটা, ঋতু যেটা বললো-সেটাই বাস্তব, সেটা নিয়ে তাদের মিটিং চলছে। এটা গভর্মেন্টের প্রসেস; যা হয়। এটা ১১+ থেকে ১৮+ ..., যেটা বিদেশে আছে। সেই সিস্টেমে হওয়ার পরিকল্পনা চলছে।
চন্দ্রিল : কিন্তু আপনি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন।
অঞ্জন দত্ত : বদলানোটা প্রয়োজন, আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, সেটা যদি না বদলায়! তাহলে তো ...।
হরনাথ : বলছি তো, বদলানো প্রয়োজন। একটা কথা, আপনি, অঞ্জন দা, আমরা কলকাতায় বসে এ কথা বলছি। আপনি কলকাতার বাইরে একটু গ্রামের দিকে যান, একটা খারাপ সিন নিয়ে বসুন, অর্ধেক মহিলা উঠে চলে যাবে। (চন্দ্রিল : একদম একমত।)
অঞ্জন : হতেই পারে! সেটা শিল্প তৈরি ...।
হরনাথ : এমন সেন্সর তারা কেনো করেছে? যারা করেছিলো, তারা নিশ্চয় একটা কিছু ভেবে করেছিলো, কোথাও একটা সীমাবদ্ধতা থাকা দরকার। সেটা যাতে মানুষকে কষ্ট না দেয়। আজকে যদি আপনি মেথরকে গালাগালি দেন বা অন্য জাতির কোনো মানুষকে ছোটো করে দেখেন-সেন্সরে সেগুলো বলা হয়েছে, এগুলো করা উচিত নয়। এ ধরনের হার্ট করা উচিত নয়।
ঋতু : না, সেন্সরশিপ তৈরি হয়েছিলো যখন ভারতবর্ষ সবে স্বাধীন হয়েছে। ভারতবর্ষের স্বাধীন সত্তাকে ...।
হরনাথ : ১৯৪৮-এ, পরে ১৯৫২-তে নিয়ম তৈরি হয়।
ঋতু : তখন যাতে ভারতীয় সত্তাটাকে পাবলিকের কাছে রক্ষা করা যায়, ভাবমূর্তি রক্ষা করা যায়; সেই জন্য সেন্সরশিপ তৈরি করা হয়। তার মানে এই নয় যে, আজকেও সেটার রেলেভেন্স আছে? (হরনাথ : আছে) হাউ কান অ্যা ফিউ পিপলস ডিসাইড ... ?
হরনাথ : পরিবর্তনের জন্য তারা ভাবছে, সেটা বিদেশে আছে-আমাদের দেশে করতে হবে!
ঋতু : কয়েকজন মানুষ মিলে সারাদেশের বা পৃথিবীর রুচি নির্ধারণ করতে পারেন না!
গৌতম : ঋতু যে কথা বললো, সেই সূত্র ধরে আমি কিছু বলতে চাই। অবশ্যই তখন একটা অন্য ধরনের অ্যাসপেরিয়েশন, নতুন ভারত গড়ার; একটা ভারতীয় চরিত্র ধরে রাখার। আরেকটা হচ্ছে, একটা পলিটিকাল কারণ ছিলো, যাতে এমন কোনো সিনেমা নতুন ভারতবর্ষে না হয়, যা ভারত সরকারের বিরোধিতা করবে। এ রকম অনেক কিছু ভেবে সেন্সরশিপ করা হয়েছিলো। কিন্তু দ্বিচারিতাটা এখানেই, একটা সময় পর আমরা যখন সবকিছু খুলে দিলাম, সেখানে তো ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। আমার দেশটা তো অসম ...।
অঞ্জন : তাহলে আমরা শুধু ভারতীয় সিনেমা দেখি, ভারতের বাইরে সিনেমা দেখা উচিত নয়!
গৌতম : এখানে তো আমি পৃথিবীটাকে খুলে দিলাম, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সবকিছু দেখতে পারছি। আবার কতোগুলো বিষয়ে বলছি, এগুলো ওই মানুষগুলো দেখলে খুব খারাপ মনে করবে। ফলে বিষয়গুলো এখানে জটিল। ভারত পৃথিবীর একটি জটিল দেশ।
অঞ্জন : ভারতবর্ষে বসে সারা পৃথিবীর সিনেমা দেখছি, সেখানে কিছু লোক বসে সারাদেশের মানুষের রুচি কীভাবে ডিসাইড করবে!
গৌতম : সেজন্য চন্দ্রিল বললো না, তুমি ছেড়ে দাও। (অঞ্জন : অ্যাবসোলুটলি) যে যার মতো করে দেখে নিবে। চিনে সুন্দর একটা উপকথা ছিলো না-‘দুই মায়ের গল্প’। এক মা বলে, একদম নদীর কাছে যাবি না, ডুবে যাবি; কখনো যাবি না। আরেক মা বলে, এখনই গিয়ে সাঁতার শেখ; কখনো ডুবে যাবি না। এই রকম একটা ব্যাপার।
চন্দ্রিল : আমার একটা কথা বলার আছে। এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে, অধিকাংশ মানুষ এটা চান-যেটা ধরছেন কিছু জ্যাঠা মশাই। সেটাকেই ভারতীয় রুচি বলে ডিসাইড করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ভারতীয় রুচিতে এটা হবে, ওটা হবে না। এটা ঠিক তো-ঠিক। এবার প্রশ্ন হলো, জিনিসটা কিন্তু দুদিক থেকে হয়-একটা লোক জন্মালো এক দেশে, সেখানে সমস্ত মেয়ে লোকের গান গাওয়া বারণ। সে মেয়ে লোকের গলা শুনলেই বলে ওটা অশ্লীল, কারণ সে তো এই সমাজে জন্মেছে।
এবার ধরা যাক, একটা [মেয়ে] লোক সমাজের সবকিছুর বিরোধিতা করে বললো, ও গান গাইবে। তখন তাকে মারা হবে, কারণ মেয়েদের গান গাওয়া অশ্লীল। সে আরেক দেশে গিয়ে দেখলো, এটা অশ্লীল নয়। তাই এই বলা হচ্ছে, রুচি, লোকজন যা চায়-ও রকম কোনো কথা নেই। স্টিভ জবস একটা কথা বলেছিলেন, যখন আইপড বের করলেন। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, এর জন্য আপনি কি মার্কেট রিসার্চ করেছেন? তিনি বললেন, আমি তো কোনো মার্কেট রিসার্চ করিনি এর জন্য। (সুমন : মার্কেট তো তৈরি করবো) তার কারণ হচ্ছে-ইট’স নট কনজিউমার্স ডিউটি, হোয়াট হি অর শি ওয়ান্টস? আমি যদি এমন একটা শিল্প করি, সেটা ধাক্কা মারার পর লোকে বলবে; তাই তো এ রকমও হয়। (সুমন : এটাই আমার চাহিদা ছিলো) তার মানে কী? লোকে শুধু বোঝে না, সে আসলে কী চায়। শিল্পীকেও বলতে হয়, দেখ না এটা! তা না হলে কোনো শিল্পের প্রমোটই হতো না।
ধরো, আমি একটা কথা বলছি, ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে একটা লোক, খাটো বেটে, বাজে দেখতে; কিন্তু প্রচণ্ড জেদি। সে দুটি বই লিখলো, যার সারমর্ম হলো-বিধবাদের আবার বিয়ে দেওয়া উচিত। লোকটার নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এবার হইহই পড়ে গেলো, তার কারণ কী? এটা তাবৎ জনরুচিকে আহত করে। বিধবার বিয়ে আবার কী করে হয়, সে তো তার শরীরকে একজনের কাছে দান করছে; তার শরীরের সতীত্ব চলে গেছে। তার স্বামী মারা গেছে, তার শরীর তো অন্য আরেকজনকে দিতে পারে না। এবার বিদ্যাসাগর সই সংগ্রহ করলেন, কয়টা হলো-নয়শো ৮৭টা। আমি রাউন্ড ফিগারে ধরছি এক হাজার। রাধাকান্ত দেব এর বিরোধিতা করে সই সংগ্রহ করলেন ৩৬ হাজার সাতশো ৬৩-আমি ধরছি ৩৭ হাজার। ৩৭ গুণ লোক বলছে, বিদ্যাসাগর জনরুচিকে আহত করছেন। তাহলে কর্তৃপক্ষের কী করা উচিত ছিলো? তখন বিদ্যাসাগরের নামে রাস্তায় খেউর চলে, যা ইচ্ছা অশ্লীল গান লেখা হলো এবং বলা হলো, মার বেটাকে। মারার জন্য আবার লোকও আছে, তাদের একজনের কাছে গিয়ে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, এখানেই মারো; এতোদূর গিয়ে আবার কষ্ট করবে কেনো? তখনকার দিনে বলে লোকটা লজ্জা পেয়েছিলো, এখন হলে মাথা ফাটিয়ে দিবে।
এবার ঘটনা হলো, তাহলে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে যদি জিনিসটা দেখি, জনরুচিটা কী বলছে, মূল্যবোধ কী বলছে? বিধবা বিয়ে প্রমোট করে এই লোকটা খারাপ কাজ করেছে, বই দুটোকে ব্যান করো। পারলে এই রাজ্য থেকে লোকটাকে তাড়াও। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা করেনি, তা না করে কি খারাপ কাজ করেছে? এখন আমরা কী মনে করি ইন্ডিয়ার পারস্পেক্টিভে, আমার তো ধারণা খারাপ করেনি। ফলে মানুষ কী চায়, এর বড়ো কথা হলো-অঞ্জন দা বার বার হার্ট করেছে, শিল্পীর স্বাধীনতা। এ রকম বহু শিল্পী আছেন, যারা সমাজের কোনো কিছুই তোয়াক্কা করেন না। সালভাদোর দালি একটা ক্যানভাস আঁকলেন, এক্সিবিউট হলো-সেখানে একটা লোকের প্যান্টের পিছনে পায়খানা লেগে আছে। তখন বলা হলো, ফ্রান্সের মতো জায়গায় এটা চলবে না; তুমি এটা আঁকতে পারো না। লুই আরা গা প্রবন্ধ লিখলেন, ... করলেন, তখন সালভাদোর দালি ভ্যালিডেটেড হলেন কোথাও।
ফলে তর্ক হবে, কিন্তু কোথাও শিল্পীর স্বাধীনতা হরণ করা যাবে না। অঞ্জন দার ওই কথাটাকে আমি মনে করি মূল্যবান। কে বলতে পারে যে, কতো সিনেমার কতো ক্ষতি হয়ে গেছে ওটা না দেখাতে পেরে! আমরা তো জানি না, সে লোকটার হয়তো সিনেমা করার সাহসই হলো না। আর ভারতের মূল্যবোধটা কী? যেটা গৌতম দা বলছে, অসম। আমার মূল্যবোধ, অমুক জায়গার মূল্যবোধ-এইভাবে কেয়ার করতে গেলে, সবাইকে ভালোবেসে, সবার সঙ্গে পরামর্শ করতে গেলে-স্যার এটা করবো তো, এটা লিখবো তো, এটা আঁকবো? এভাবে কোনো শিল্পী তৈরি হয়নি, হতে পারে না। এ রকমভাবে করতে গেলে একটা গান লিখতে ছয় বছর লাগবে! গোটা ভারতে ভোট নিতে হবে।
গৌতম : অসম্ভব! এখন কী হচ্ছে আমি তার একটা ছোট্টো উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের সৌমিক দা মনিপুর থেকে একটা ফিল্ম ফেস্টিভাল দেখে এসে বললেন, জানো গৌতম, ওখানে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটছে। ওখানে যুবকরা ফতোয়া দিয়ে দিয়েছে, তারা ভারতীয় টেলিভিশন দেখবে না; হিন্দি সিনেমা দেখবে না। দর্শক-লোকজন সেটা মানছে। ওরা নিজেরাই সিনেমা তৈরি করছে, সেটা দেখছে। কারণ তারা মনে করছে, ওইগুলো আমাদের সংস্কৃতি নয়, ওটা আমার ভাষা নয়; তারা দেখছে না। এটা বলা মুশকিল, কোনটা ভারতীয়-এটা হতে পারে না।
চন্দ্রিল : ১২ নম্বরে একটা প্রশ্ন ছিলো, ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি। শুধু ওইখানে ছাড়া কিন্তু ভারতে অন্য কোনোখানে কালচারাল ইউনিটি নেই। ইতিহাসে ভালো লিখলে আট, সাড়ে আট অব্দি আমরা পেয়েছি। (সবাই হাসি) কিন্তু ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি নেই। একথা আমরা বহু বার বলি না। (গৌতম : দ্যাট ইজ ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া; নেই বলে, ডাইভার্স বলে) এটা কোনো কথা হতে পারে না-একটা কথা আমি বার বার শুনছি, অনেকে বলছে, এটা কোনো কথা হতে পারে, দাঁড়াও দাঁড়াও। ওটা প্রাসঙ্গিক কি অপ্রাসঙ্গিক? সেটা এখানে কয়েকজন বলছে, আবার প্রশ্ন উঠছে-একজন শিল্পীর এমনকি অপ্রাসঙ্গিক জিনিস রাখার অধিকার আছে।
ধরা যাক, যেকোনো একটা গড় বাংলা সিনেমার কথা-মেইনস্ট্রিম সিনেমা, ছ’খানা গান থাকে; কোন গানটা প্রাসঙ্গিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো গানই প্রাসঙ্গিক নয়, ওখানে গান ঢুকাতে হবে বলে ঢুকানো হয়। কেউ কি তার প্রতিবাদ করেছে? বিভূতিভূষণ পাতার পর পাতা আসশেওড়া গাছের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছেন, না ওটা প্রকৃতি প্রেম। কিছু বলা হলো না। রবীন্দ্রনাথের যে কবিতাটা চার লাইনে শেষ হতে পারতো সেটা চারশো লাইনে বাড়িয়ে নিয়ে গেলেন, শুধু ভল্যুম বাড়াবেন বলে। কারো কোনো আপত্তি হলো না। সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালী করছেন, সেখানে দেড় মিনিট ধরে জলফড়িং নাচছে, সেখানে অপু জলফড়িং, না দূর্গা? কেউ না। কেউ আপত্তি করলো না। আর করবেইবা কেনো। আমরা জানি, ওটা একটা তুলনাহীন সিকোয়েন্স। কারণ এটা গ্রাম-জীবনকে যেভাবে ধরে এবং একটা মহিলার স্বামীর চিঠি পাওয়ার যে আনন্দ, সেটা যে জলের রিপ্লে এবং ফড়িংয়ের নাচ নিয়ে সিগনিফায়ার করা যায়; এটা তো কেউ কল্পনাই করেনি!
যদি অপ্রাসঙ্গিক বলে কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়, তাহলে ওটার ওপরও পড়তো। তাই না? কিন্তু এটা কেউ বলে না। শুধু যৌনতার ক্ষেত্রে বলে, দাঁড়াও ওটা অপ্রাসঙ্গিক। আরে তোকে এতোগুলো সিন দেখানো হলো, যেগুলো কোনোটা প্রাসঙ্গিক নয়। কোনো অসুবিধা নেই, বিচ্ছিরিভাবে হাসিয়ে যাচ্ছে, কাতুকুতু দিয়ে, ভালো লাগছে না-কিন্তু কী হচ্ছে। তখন কী বলবে, আচ্ছা, করেছে করেছে-আমার ভালো লাগছে না; উঠে যাবো। আমি কী চোখ বুজে বসে থাকবো। কিন্তু যৌনতা হলে বলবে, দাঁড়াও তুমি এটা দেখাতে পারবে না। এতোক্ষণ ব্যাপার কী ছিলো, শিল্পী দেখিয়েছেন, আমার ভালো লাগছে না; আমি দেখবো না। একটা হিউমার; জনি লিভার কী করছে, ভালো লাগছে না; তাই বলে কি বলা হয় জনি লিভারকে মারো? বলা হয় না। বলা হয়, সিনেমাটা ভালো লাগছে না রে, দেখিস না। সমস্ত প্রাসঙ্গিকতার ক্ষেত্রে কিন্তু তাই। একটা ভূতের নাচ ছয় মিনিট ধরে হলো গুপি গাইন বাঘা বাইন-এ, কেনো হলো কেউ জানে না। সত্যজিৎ, কেউ কিছু বলতে পারলো না।
ঠিক আছে-কেউ কেউ গুপি গাইন বাঘা বাইন দেখে বলে ধুরও মশাই, কী করে ছয় মিনিট ধরে-এটা কী গুপি বাঘার বন্ধু? কেউ জানে না। কোনো আপত্তি নেই, শুধু আপত্তি যৌনতার ক্ষেত্রে-সবাইকে তোমার দায়বদ্ধ, জবাবদিহি করতে হবে কেনো করেছেন, ওই শটটার কী দরকার ছিলো? আরে শিল্প জিনিসটারই তো দরকার ছিলো না! সিনেমা জিনিসটা না তুললে কী ক্ষতি হতো? পাউরুটির দাম বাড়তো ...।
গৌতম : আরে, আমার একটা সিনেমার পোস্টারে দেবশ্রীর খালি পিঠ ছিলো (ঋতু : তোমার দেখা সিনেমায়)-সে নিয়ে কাগজে লেখালেখি হলো! বাংলা সিনেমার পোস্টার কোথায় যাচ্ছে!
চন্দ্রিল : আমরা যখন ইংরেজি সিনেমা দেখতাম-যে যে পোস্টারে আলকাতরা মারা আছে, সেগুলোই দেখতাম। এর কারণ তাতে সেক্স থাকবে। সেখানেও মিস লিডিং ছিলো, তারা ইচ্ছা করে চমৎকার পোস্টারেও আলকাতরা মেরে রাখতো। (সবার হাসি)
গৌতম : না না, সাহেবরা সেক্স করতে পারবে, আমরা সেক্স করি না যেনো। এমন একটা ব্যাপার।
চন্দ্রিল : না, আমরা সেক্স করি না, সারস পাখিরা এসে ছোটো ছোটো বাচ্চা চৌকাঠে রেখে যায়!
গৌতম : আমি তোমাকে বলছি, রিনা’র (অপর্ণা সেন) থার্টি সিক্স চৌরঈী লেন নিয়ে সেন্সরবোর্ডে একটা আলোচনা হয়েছিলো। ওই চুম্বন দৃশ্যগুলো অনেকের আপত্তিকর মনে হয়। তারপর অনেকেই বললো, না, চুম্বন দৃশ্যগুলো তো ইংরেজিতে; কোনো সমস্যা নেই। তার মানে তুমি ইংরেজি ভাষায় কথা বললে চুমু খেতে পারবে, বাংলায় বললে খেতে পারবে না। এটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার।
চন্দ্রিল : এটা তো মাল্টিপল স্ট্যান্ডার্ড। আমরা যখন টিভি চ্যানেল সার্চ করি, হর দা যেটা বার বার বলছে ...।
ঋতু : ইংরেজিতে আমরা শিট্ বলতে পারি। গালাগালি করতে গেলে, আমরা সেটা ইংরেজিতে পারি।
গৌতম : ঋতু ঠিক কথা বলেছো।
চন্দ্রিল : বাংলায় একটা লেভেলের পর গেলে সিনেমা অশ্লীল হয়ে যায়।
গৌতম : না, বিশেষ করে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজে। ইংরেজিতে ওগুলো চলবে, যা তা বলতে পারি। কথায় কথায় আমেরিকান স্লাঙ বলতে পারি, কিন্তু ওইটা বাংলায় ট্রান্সলেট করে বলো, তাহলে লোকে উঠে যাবে।
চন্দ্রিল : এখন লোকে চা চলকে গেলে শিট্ বলছে। সেটা তো খারাপ কথা। বাড়িতে চা চলকে গেলে ধ্যাত শালা বললেও একটা সময় চেঁচামেচি হতো। এটা কেনো করেছো? এখন ডাবল স্ট্যান্ডার্ডও নয়, অ্যাকচুয়ালি মাল্টিপল। আবার যে হিন্দি চ্যানেলটা সার্চ করে আসলাম সেটা আর একটু কনজারভেটিভ, তবুও কিছুটা লিবারাল। কিন্তু সেটা থেকে যদি বাংলা সিরিয়ালে আসি; এইবার কিছু কিছু জিনিস আমি একেবারেই অ্যালাউ করবো না। ওই যে বুড়ো আঙ্গুলের চাপ, তার সঙ্গে সঙ্গে মনটা বদলে যায়।
ঋতু : ফাক-এর সাবটাইটেল সবসময় হেল (সবার হাসি) (গৌতম : তারা) বা তারা। হোল অ্যাট ওয়ার্ড, তার মানে তারা। হোয়াট দ্য ফাক ইজ হোয়াট দ্য হেল। সবসময় তার সাবটাইটেলটা দেখবে হোয়াট দ্য হেল!
গৌতম : ভাবা যায় না, অদ্ভুত ব্যাপার!
সুমন : আমি প্রীতমের কাছে আসবো, তোমার প্রথম সিনেমা ফ্লপ ই কিছুদিনের মধ্যে রিলিজ করবে, তার নায়িকা পাওলি। আমরা যেটা জানলাম, ছত্রাক-এ কেনো পাওলি এ রকম দৃশ্যে অভিনয় করেছে, তার শাস্তি হিসেবে তুমি এবং তোমার প্রযোজক সমস্ত প্রমোশনাল কাজ থেকে তাকে বাদ দিয়েছো। এর দুটো কারণ পাওয়া যাচ্ছে, একটা যেটা বললাম; আরেকটা হচ্ছে, সেসময় পাওলি মুম্বাইয়ে থাকায় অ্যাভেইলঅ্যাবল ছিলো না-এটা একটা বাণিজ্যিক গিমিক। দ্বিতীয়টা হলে আমার কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো বক্তব্যও থাকতে পারে না। প্রথমটা হলে তোমার কাছ থেকে জানতে চাইবো, প্রমোশন থেকে ডেলিবারেটলি তোমার নায়িকাকে তুমি বাদ দিয়েছো?
প্রীতম : প্রথমত, একটা কথা আগে বলে নিই, এখানে যতোজন উপস্থিত আছেন, প্রত্যেকের সমন্ধে দর্শকের একটা ধারণা আছে। তারা কী ভাবে বা তাদের সম্পর্কে দর্শকের পূর্ব-ধারণা আছে। কিন্তু আমার সম্পর্কে দর্শকের কোনো ধারণাই নেই। যেটা হয়েছে-এখানে বলে রাখি, এই টোটাল ইস্যুটাই আমার মত। প্রথমত, আমি পূর্র্ণভাবে বিশ্বাস করি, শিল্পের স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই। ও (পাওলি) একজন স্বাধীন আর্টিস্ট। ও ঠিক কতোটা কী শট্ দিবে-সে বিষয়ে আমার বলার কোনো প্রশ্নই নেই, আমি না ওর লোকাল গার্ডিয়ান, না মরাল পুলিশ। আমি এই সময়কার প্রাসঙ্গিক দুটো ঘটনা নিয়ে আসবো, যেটা ঋতু দা বললেন। আমার খুব ভালো লাগলো কথাটা-সত্যি কথা বলতে এনাদের সিনেমা দেখে আমরা শিখেছি। ঘটনাটা হচ্ছে, যে সিনটা নিয়ে এতো কথা হচ্ছে, সেই সিনে আরেকটি ছেলেও আছে, তাকে নিয়ে কিন্তু কোনো কথা উঠছে না।
আমি ঠিক উল্টো আরেকটা কথা বলবো, একটা সাফল্যের কথা। এই সময়ে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে সফল যে সিনেমাটা, সেখানে পরিচালক হিসেবে একজন পুরুষ ও একজন মহিলা আছে। হোয়্যারঅ্যাজ, সেখানে কিন্তু আমরা পরিচালক হিসেবে পুরুষের নামটা বেশি জানতে পারছি। (ঋতু : ইচ্ছে) রাইট, তার মানে অদ্ভুতভাবে আমরা মহিলার প্রতি-যৌনতার ক্ষেত্রে পাওলি যেনো ক্রিমিনাল অফেন্স করছে, এটা একটা দিকের মত। আরেক দিকের মত, পাওলি যেনো বাংলা ইন্ডাস্ট্রিটাকে উদ্ধার করছে। আসলে তো দুটোর কোনোটাই নয়।
যৌনতা যেমন মানুষের স্বাভাবিক ঘটনা, এখানেও স্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দুই ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টার সিনেমা যাই হোক, এই টোটাল অংশ থেকে দেড় বা তিন মিনিট ইউটিউবে তুলে দিলাম-যেহেতু বিখ্যাত ডিরেক্টর এবং পাওলি স্বনামধন্য নায়িকা। আমাকে যে দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হলো, পাবলিসিটি গিমিক। এই প্রশ্নটা উনাদের (পাওলি ও বিমুক্তি জয়সুন্দরা) করা উচিত নয়; কারণ এতো বড়ো মানুষের অকারণে প্রচারের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু তিন মিনিটের একটা ভিডিও ফুটেজ তুলে দেওয়া হলো, তখন এটা নিয়ে প্রশ্ন করা হলো-আমরা যাই করি সমাজটাকে পুরোপুরি তো ...। কেউ যদি প্রশ্ন করে বা প্রশ্নটা আসতে পারে, কারণ ওভাবেই তারা তৈরি। তখনই বলা হচ্ছে পুরো সিনেমাটা দেখুন, তবেই বুঝতে পারবেন। এখান থেকে দুটি প্রশ্ন আসে-এক. পাবলিসিটির কারণে। পাওলির সঙ্গে ১২ দিন কাজ করে, সেটা আমি বিশ্বাস করি না। আর যদি সেটা পাবলিসিটি হয়ে থাকে, পাওলি সেটা জানে না-এটা আমার মত। তার থেকেও আরেকটা বিষয় হলো, ছত্রাক যিনি করেছেন-তার সম্পর্কে যেটুকু শুনেছি; সত্যি তার কোনো ছবি দেখিনি-তাতে তার মতো ডিরেক্টরের এ রকম পাবলিসিটি গিমিকের প্রয়োজন নেই।
আরেকটা প্রশ্ন, যেটা বার বার উঠে আসছে-পাইরেসি। অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, যখন বাংলা সিনেমা আস্তে আস্তে ভালো বাণিজ্যের দিকে এগোচ্ছে, সেখানে বড়ো ক্রাইসিস বলা হচ্ছে পাইরেসিকে। হোয়্যারঅ্যাজ সেই পাইরেসিটা কোথায়-হলে সিনেমা রিলিজ হওয়ার পর, হল থেকে কপি। আমরা যারা, আমি তো একদম নবিশ, এখানে পুরনো যারা আছেন, তারা আরো ভালো বলতে পারবেন; একটা আনএডিটেড ফুটেজ কোন কোন জায়গার হাতে থাকে? সেটা একদম প্রোডাকশনের নিজস্ব জায়গার মধ্যে থাকে। তার মানে এটা কতো বড়ো-বার বার বলছি, আমরা হলিউড হয়ে গেলাম, উন্নত হয়ে গেলাম। কিন্তু এটা কতো বড়ো ইম্যাচিউরড বা নাবালক পরিকাঠামোয় আমরা কাজ করছি; যেখানে প্রোডাকশনের ভিতর থেকে একটা সিক্রেট সিন-সেটা যৌনতা, মৌনতা, গৌণতার সিন হতে পারে, যা খুশি হতে পারে। কিন্তু আনএডিটেড ভার্সন প্রোডাকশনের মধ্যে থেকে বেরিয়ে যায়! আমার তো মনে হয়, প্রথমে আমাদের এটা নিয়ে আলোচনা করা উচিত, কীভাবে প্রোডাকশনের ভিতর থেকে একটা সিকোয়েন্স এভাবে বেরিয়ে যায়?
তাহলে এবার আপনার (সুমন) প্রশ্নের অংশটা, আমরা পাওলির সিদ্ধান্তটা কেনো নিয়েছি? দর্শককে আমি এতোটা বোকা মনে করি না, পাওলিকে বাদ দিচ্ছি আর ...।
সুমন : কী সিদ্ধান্ত নিয়েছো, সেটা আগে তোমার কাছে জানতে চাই।
প্রীতম : কেনো আমি সিদ্ধান্তটা নিয়েছি সেটা বললে, সিদ্ধান্তটার বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে। আমাদের যেটা মনে হয়েছে, আমাদের কাছে ফোনকলও এসেছে। সত্যি কথা বলতে কি, এনারা যখন কোনো শিল্প তৈরি করেন, তখন কিন্তু সিনেমাটা এ রকম হয়-এটা ঋতুপর্ণের সিনেমা, গৌতম ঘোষ, অঞ্জন দত্ত কিংবা হরনাথ চক্রবর্তীর সিনেমা। আর আমার সম্পর্কে তো কোনো ধারণাই নেই, আমি একদমই নতুন। আমার ক্ষেত্রে এ রকম আসে যে, পাওলির পরের সিনেমা, সেটার ডিরেক্টর প্রীতম। সার্বিকভাবে আমি কোনো বিপ্লব করতে আসিনি, একদম একটা সিনেমা করতে এসেছি; যেখানে আমার মতো করে একটা গল্প বলতে এসেছি। এবং সেটা করতে গিয়ে পাওলির টোটালি ছত্রাক এপিসোড-অদ্ভুত লাগলো, একজন সেলিব্রেটি তার অজান্তে বা জানতে কীভাবে যেনো সেল্যেবল প্রোডাক্ট হয়ে গেলো। যেটা আমাকে হার্ট করেছে। সত্যি কথা বলতে কি দেখুন, তখনই আমি বা আমার প্রোডাকশন ...।
সুমন : পাওলি সেলিব্রেটি হিসেবে সেল্যেবল প্রোডাক্ট বলেই তো তুমি নায়িকা করেছো?
প্রীতম : সে স্ট্রং অ্যাক্ট্রেস, সে জন্যেই নায়িকা করেছি। আমি অন্য কথা বলছি-এখন তিন মিনিটের একটা ফুটেজ নিয়ে কী হচ্ছে-অনেকেই বলবেন যে, তুমি দেখতে গেছো? অব্ভিয়াসলি আমি দেখতে গেছি এবং নেটে এটাকে ডাউনলোড করার জন্য কার্ডও চাওয়া হচ্ছে। আমি এই সেন্সে সেল্যেবল প্রোডাক্টের কথা বললাম-তো আমার এবং প্রডিউসারের কাছে অনেক ফোন এসেছে, সেখানে বলা হয় আপনার সিনেমায় পাওলি আছে, তাহলে কী ...। যদি আমরা প্রথম পাঁচটি প্রশ্ন সাজাই; তার প্রথম তিনটি প্রশ্ন হচ্ছে, পাওলি আছে, তাহলে কি ওখানে কোনো ইন্টিমেট সিন আছে? পাওলির ড্রেস কী এখানে? আমার এ সিনেমায় পাওলি যে ক্যারেক্টারটা করেছে-সেটা মৃত্তিকা। আমার মনে হয়েছে, আমরা খুব সচেতনভাবে ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম। আমরা চাইনি, বেড সিন আছে এই আশা নিয়ে, ভুল বুঝে, সিনেমাটা দেখতে একজন মানুষও বেশি আসুক বা বেড সিন আছে সেই আশঙ্কায় একজনও কম যান। হরনাথ বাবু যেটা বললো, বেড সিন আছে এই ভেবে ৮০ ভাগ লোকই নাকি যায় না। সত্যি কথা বলতে, প্রথম সিনেমায় আমি কোনো বিপ্লব করতে আসিনি।
সুমন : তাহলে তো প্রথম সিনেমায় যেখানে যেখানে পাওলি আছে, সেটা পুরোটা এডিট করে দেওয়া উচিত।
প্রীতম : না, আমরা ইনিশিয়ালি প্রচারের যে অংশটা ...। আমি এটা বিশ্বাস করি দর্শক এতো বোকা নয়, পাওলিকে বাদ দিলাম; আর হুড়মুড় করে সবাই হলে সিনেমা দেখতে চলে গেলো। ঘটনাটা এ রকম নয়। ফলে আমি একটা বললাম, সবাই মিলে সঙ্গে সঙ্গে হইচই শুরু করে দিলো, এ রকম কিন্তু নয়। এখান থেকে আমরা নিঃশব্দে চলে আসতে চেয়েছিলাম। এবং আমরা এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টিই করতে চাইনি। পরবর্তী সময়ে দেখলাম, প্রথম যে কথাটা বের হলো-এটা হতে পারে আমার অনভিজ্ঞতার কারণ। আমি একদমই বলবো না, প্রেস আমার কথা উল্টো করে বলেছে। যেটা বলবো, আমি বোঝাতে পারিনি প্রেসকে! প্রথম যে প্রশ্নগুলো ছিলো, তার যে উত্তরগুলো দিয়েছিলাম।
সুমন : তোমরা সরে আসতে চেয়েছিলে, এর মানে কী? আমি অ্যাকশন পয়েন্ট জানতে চাইছি।
প্রীতম : ইনিশিয়ালি, এখন যেহেতু গায়ে গায়ে ছত্রাক বিতর্ক এবং আমাদের সিনেমার রিলিজ। পাওলির যতো ছবি-পাবলিসিটির অংশ হিসেবে ব্যানার বা পোস্টারে খুব একটা রাখছি না। যতোটা সম্ভব কম রাখছি, যদিও রাখছি সেটা কাভার্ড ঠিকঠাক; যেগুলো আমাদের প্রিন্ট হয়ে গেছে। ইনফ্যাক্ট এই সিনেমায় পাওলির যে ড্রেস, তার মাক্সিমাম ব্লেজার পরা। ফলে যে ব্যানার পোস্টার হয়ে গেছে, নতুন করে ব্যানার পোস্টারে তাকে রাখছি না।
সুমন : পোস্টার ব্যানারে রাখছো না, তোমার কাছে যেগুলো মনে হচ্ছে ঠিকঠাক, সেগুলো সিন রাখছো?
প্রীতম : একদমই না, পাওলির এখানে যে চরিত্র, সেই চরিত্র অনুযায়ী সিন ...।
সুমন : সেটা তো অবশ্য; তুমি ডিরেক্টর, ভুলভাল সিন নেবে কেনো?
প্রীতম : তা একদমই না, আমি আবার বলছি সিনেমার স্বার্থে যা দরকার, সেটা করতেই পারি। ছত্রাক নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই, আমি বিশ্বাসও করি না। কারণ আমি বার বার বলছি যে ...।
অঞ্জন : ভাই, আমি একটা কথা বলছি। এটা আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি। তোমার কথা শুনে আমার যেটা মনে হচ্ছে, তুমি কিন্তু একটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে রয়েছো। তুমি একদিক থেকে পাওলির ডিরেক্টর, তাকে তুমি অ্যাক্ট্রেস হিসেবে গ্রহণ করেছো, তারপর তুমি তোমার সিনেমার জায়গা থেকে তাকে মার্জিনালাইজ করছো! এটা কিন্তু ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ভাই। তুমি কিছু মনে করো না। আমি এটা বলতে বাধ্য হচ্ছি।
ঋতু : আমি সযত্নে এড়িয়ে রাখছি মানে কী? পাওলি একজন অভিনেত্রী। সে তো কলগার্ল নয়-অভিনেত্রী। একটা দৃশ্যে ... (অঞ্জন : না। কলগার্ল হলেও সে আমার সিনেমায় অভিনয় করে, সুতরাং সে ...)।
প্রীতম : না না, তিনি আমার সিনেমায় অভিনয় করছেন এবং অবশ্যই প্রধান অভিনেত্রী।
ঋতু : ... এটা কেউ ভাববে না! এই ভাবনাটা কেবল একটা ...।
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় : একটা সার্টেন এক্সটেন্ট অব্দি উনার (প্রীতম) কথা আমার ভালো লাগছিলো। তারপর মনে হলো কেনো জানি খেই হারিয়ে গেলো। আমি জানি না, আপনি কি এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ডটা এড়ানোর জন্য ...। পাওলিকে সিনেমার ব্যানার, পোস্টারে দেখলেই লোকে ভাববে এতে অনেক উত্তেজক দৃশ্য আছে-আপনার (প্রীতম) ভাষায়-তারা সেই দৃশ্য দেখতে আসবে এবং সেটা পাবে না। তাই তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাবে এবং বাড়ির লোককে বলবে, তোরা ওই সিনেমাটা দেখতে যাস না! কারণ পাওলিকে দেখে সিনেমাটা দেখতে গিয়েছিলাম, উত্তেজক দৃশ্য থাকবে। কিন্তু আদতে তা নেই। এই ওয়ার্ড অব মাউথ পাবলিসিটিটা হবে না। এই ভয় থেকে কি করা?
প্রীতম : এর উত্তরটা দিয়ে নিই। আবার হয়তো একই ভুল হলো যে, হয়তো আমি বোঝাতে পারলাম না। ঘটনাটা হচ্ছে, আমি বা আমরা চাইনি, ভুল বুঝে একজন দর্শকও বেশি বা কম আসুক। তার আগে মাউথ পাবলিসিটি কী করলো না করলো, তার সঙ্গে কিন্তু আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ সত্যি কথা বলতে, প্রথম সিনেমায় আমার সিনেমার বাইরে এতো প্রশ্ন ফেইস করতে হয়, যে প্রশ্নগুলো কোনোভাবে উত্তর দেওয়ার জায়গাতে নেই এবং প্রয়োজনও নেই।
অঞ্জন : প্রশ্ন ফেইস করতে হতেই পারে বা এ রকম ঘটনা ঘটতেই পারে যে, তুমি আমাকে নিয়ে একটা সিনেমা করলে, আমি তাতে অভিনয় করলাম, তারপর আমি এমন একটা কিছু করলাম-ধরো ক্রাইম করলাম। আমি সায়ান মুনশি’কে নিয়ে দ্য বঙ্গ কানেকশন করেছি, হি ওয়াজ অ্যাকিউজ অব ক্রিমিনাল অ্যাক্ট। কিন্তু সে যখন আমার সিনেমায় কাজ করছে, আমি তাকে ক্রিমিনাল বলবো? আমার কথাটা হচ্ছে ...।
প্রীতম : এখানে স্যার আমার কথাটা বুঝতে ভুল হচ্ছে! আমি কিন্তু পাওলিকে কোনোভাবে ...।
অঞ্জন : আমি একটা বেআইনি কাজ করে ফেলতে পারি ...।
ঋতু : তোমার কথা যদি সবার বুঝতে ভুল হয়, তাহলে তুমি বুঝাইও না। ভুল বুঝানোর চেয়ে কিছু না বলা ভালো।
প্রীতম : ওই সিনটা করে পাওলি প্রস্টিটিউট হয়ে গেছে, আমি কিন্তু একবারও বলিনি। এ রকম কোনো কথাবার্তা বলিনি।
ঋতু : তুমি বলোনি সেটা আমরা জানি। তোমার হাবভাব সেটা বলে দিচ্ছে।
পরমব্রত : সেটা বলার প্রশ্ন আসছে না। সেটা বললে, আরো গভীর আপত্তির জায়গা থাকতো!
প্রীতম : অবশ্য। এটা কোনো প্রশ্নই নয়!
ঋতু : আপাতত আমরা এ বিষয়টা ছেড়ে দিই।
গৌতম : তোমার (প্রীতম) সূত্র ধরেই বলছি, একজন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে পরিচালক একটা চরিত্র দেয় এবং সেই চরিত্র করার পর সে অন্য চরিত্রে অন্য একটা সিনেমায় অভিনয় করে। সেই চরিত্রের জন্যই কি শুধু দর্শক সিনেমাটা দেখতে আসে!
প্রীতম : না স্যার, এটা নয়।
গৌতম : কতোগুলো স্টার সিস্টেম হয়-অনেকেই উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেনকে দেখতেই যেতো। সেটা অন্য ব্যাপার।
ঋতু : পাওলি, তুই কি সুচিত্রা সেন হয়েছিস এখনো?
গৌতম : না, এখনো হয়নি। এখন ব্যাপার হচ্ছে, একজন ভালো অভিনেত্রী একটি সিনেমায় অভিনয় করছেন, সেটার একটা ক্লিপিং বেরিয়ে হইচই হয়েছে, তার সঙ্গে আমরা দর্শককে অ্যাসেস করছি কীভাবে? আর একটা ব্যাপার, সিনেমা নিয়ে যতো বিতর্ক হোক-বিতর্ক হলে অনেক সময় কৌতূহল বাড়ে, লোকে বলে যাই, কেনো বিতর্ক হলো দেখে আসি। কিন্তু সিনেমা এমন একটা ব্যাপার, তাতে যদি জোর না থাকে; কোনোকিছু দিয়েই সেই সিনেমা চলবে না।
প্রীতম : আমি এই কথাটা বার বার বলছি। অকারণ বিতর্ক দিয়ে আমার সিনেমার পাবলিসিটি করার কোনো ইচ্ছা নেই। কারণ এটা সম্ভব না। এটা ভুল কথা। যদি এটা সম্ভব হতো, এর চেয়ে বড়ো বড়ো বিতর্ক অনেক সিনেমাতেই হয়েছে ...।
গৌতম : কারণ সিনেমা তার নিজের জোরে চলে। শুধু বির্তকের জোরে সিনেমা চলে না।
সুমন : পাওলি কিছু বলতে চাচ্ছে।
চলবে
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন