অমিতাভ রেজা চৌধুরী
প্রকাশিত ২৩ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ম্যাজিক কথামালা
চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণশৈলী
অমিতাভ রেজা চৌধুরী

তারিখ : ১৯ মার্চ ২০১৮
স্থান : ১২৩, রবীন্দ্র কলাভবন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়প্রথম পর্ব.
সঞ্চালক-এক : শুভ সন্ধ্যা। আজ ১৯ মার্চ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ। ১৪২৪ বঙ্গাব্দের ৬ চৈত্র। উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা। কথামালা সঞ্চালনায় আছি আমি আনতারা সোনিয়া।
সঞ্চালক-দুই : আমি অধরা মাধুরী। আজ আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৭’ আরম্ভ করতে চলেছি। শুরু করার আগে স্মরণ করছি, চলচ্চিত্র জগতের সেই সব ব্যক্তিদের, যাদের আমরা সম্প্রতি হারিয়েছি-সঙ্গীতশিল্পী শাম্মী আখতার, চলচ্চিত্রব্যক্তিত্ব কাজী আজিজ আহমেদ, সঙ্গীত পরিচালক আলি আকবর রুপু ও অভিনয়শিল্পী শ্রীদেবী। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে শুরু করছি আজকের আয়োজন।
সঞ্চালক-এক : চলচ্চিত্রবিষয়ক গবেষণা পত্রিকা ম্যাজিক লণ্ঠন যাত্রা শুরু করে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে। চলতি বছর প্রকাশ হয়েছে এর ১৪তম সংখ্যা।
সঞ্চালক-দুই : প্রতিবছর চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন পেশাদার ব্যক্তি নিয়ে কথামালার আয়োজন করে ম্যাজিক লণ্ঠন। প্রথমবার কথামালা অনুষ্ঠিত হয় ২০১২ খ্রিস্টাব্দে। সেই কথামালায় অতিথি ছিলেন নূরুল আলম আতিক। এরপর ম্যাজিক লণ্ঠন ছয়টি কথামালা সফলভাবে আয়োজন করে।
সঞ্চালক-এক : এর আগে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর আমন্ত্রণে আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন নির্মাতা আবু সাইয়ীদ, গোলাম রাব্বানী বিপ্লব, অভিনয়শিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী কাজী হায়াৎ এবং রোকেয়া প্রাচী। সর্বশেষ কথামালায় রোকেয়া প্রাচী কথা উপস্থাপন করেন ‘অভিনয় ও পেশাদারিত্ব’ নিয়ে।
সঞ্চালক-দুই : এবারে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর আয়োজনে কথামালা ৭-এ উপস্থিত হয়েছেন নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী। তিনি কথা উপস্থাপন করবেন ‘চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণশৈলী’ নিয়ে। প্রযুক্তির প্রভাবে এখন চলচ্চিত্র নির্মাণ সেলুলয়েড যুগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে। তাই চলচ্চিত্রের সংখ্যাও বাড়ছে দ্রুত গতিতে। কিন্তু গুণগত মানের দিক থেকে আদৌ এগুলোকে চলচ্চিত্র বলা যায় কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তরুণ প্রজন্মের বিশাল একটা অংশ এখন চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী। অনেকের হাতে চিত্রধারণ ও শব্দধারণের যন্ত্র এসেছে। কিন্তু চলচ্চিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘চলচ্চিত্রের ভাষা’ নিয়ে খুব বেশি কথা হচ্ছে না। তাই আমরা মনে করি, সম্ভাবনাময় এই সময়ে দাঁড়িয়ে ‘চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণশৈলী’ নিয়ে অংশগ্রহণমূলক আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমাদের আজকের আয়োজন।
সঞ্চালক-এক : আমাদের আজকের অতিথি নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী চলচ্চিত্র জগতে যাত্রা শুরু করেন টেলিভিশন ফিল্ম নির্মাণের মধ্য দিয়ে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি নির্মাণ করেন প্রথম টেলিভিশন ফিল্ম হাওয়া ঘর। এরপর তিনি ২০ পর্বের আলোচিত টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘বন্ধন’ নির্মাণ করেন। এর বাইরে তার নির্মিত প্রায় দেড় হাজার বিজ্ঞাপনচিত্র বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন নির্মাণশিল্পে নতুন ধারা তৈরি করেছে। অতঃপর তিনি প্রথম চলচ্চিত্র আয়নাবাজি নিয়ে ফিচার ফিল্মের জগতে পদাপর্ণ করেন ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে। বর্তমানে তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র রিকশাগার্ল-এর কাজ চলছে।
সঞ্চালক-দুই : আয়োজনের এ পর্যায়ে সম্মাননীয় অতিথি অমিতাভ রেজা চৌধুরীকে মঞ্চে আসন গ্রহণ করবার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। (দর্শকের হাততালি) এবার সম্মাননীয় অতিথিকে স্মারক প্রদান করবেন ম্যাজিক লণ্ঠন-এর শুভাকাক্সক্ষী এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মশিহুর রহমান। মঞ্চে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি মো. মশিহুর রহমান স্যারকে (দর্শকের হাততালি)।
সঞ্চালক-১ : স্মারক-প্রদান পর্ব শেষ হলো। আয়োজনের মূল অংশে যাওয়ার আগে শুভেচ্ছা বক্তব্য নিয়ে আসছেন ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সহকারী সম্পাদক হিরু মোহাম্মদ। মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি হিরু মোহাম্মদকে।
হিরু মোহাম্মদ : ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৭-এ আমন্ত্রিত অতিথি এবং উপস্থিত সবাইকে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আমাদের কথামালা শুরু হওয়ার কথা ছিলো এখন থেকে দুই ঘণ্টা আগে। কিন্তু বিমানের ফ্লাইটে বিঘ্ন ঘটার কারণে অতিথির আসতে দেরি হয়। এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য আমরা ম্যাজিক লণ্ঠন পরিবার আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
গল্প, উপন্যাস, নাটক, নৃত্য, চিত্রকলা ও চলচ্চিত্র; সব শিল্পকলার একটা নিজস্ব ভাষা আছে। গল্প, উপন্যাস, নাটকে বাকপ্রতিমা, চিত্রকলায় চিত্রপ্রতিমা আর চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে থাকে ইমেজ বা দৃশ্য। লাইনের পর লাইন গেঁথে সাহিত্যিক তার মনের ভাষাকে সাহিত্যে রূপ দেন। তা পড়ে পাঠক নিজের মতো করে কল্পনায় ইমেজ আঁকে। কল্পনায় অবশ্য প্রত্যেকের ইমেজ ভিন্ন হয়ে থাকে। চলচ্চিত্র বিষয়টিও অনেকটা একই রকম। যদিও চলচ্চিত্রে যে ইমেজ দেখানো হয়, দর্শককে তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। আলাদা করে দর্শককে ইমেজ কল্পনা করতে হয় না।
চলচ্চিত্রনির্মাতা যা তুলে ধরেন, তার প্রত্যেকটা দৃশ্য বা ইমেজের একটা অর্থ থাকে। চলচ্চিত্রে সামান্য একটা গাছের পাতা ঝরে পড়ার যেমন অর্থ আছে, তেমনই অভিনয়শিল্পীর শরীরের প্রত্যেকটা অংশ কথা বলে; তার চারপাশের প্রতিটি বিষয়ই অর্থ তৈরি করে। তাই ইমেজ নির্মাণে নির্মাতাকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়।
আদিতে চলচ্চিত্রের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো স্থিরচিত্রকে গতিশীল দেখানো। নির্মাতাও সেভাবেই ইমেজ ধারণ করতো। গতিকে ধরে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করাই ছিলো তাদের লক্ষ্য। কিন্তু শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই চলচ্চিত্র শুধু গতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দর্শকের দেখায়ও পরিবর্তন আসে, তারা ভিন্ন কিছু দেখতে চেয়েছে। ফলে সময় যতো গড়িয়েছে চলচ্চিত্রে নতুন নতুন বিষয় সংযোজন হয়েছে। চলচ্চিত্র যতোটা পেরেছে মানুষের জীবনের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছে, বাস্তবকে ধরার চেষ্টা করেছে। তাই তো চলচ্চিত্র দেখে দর্শক আনন্দে হাসে, বিরহে কাতর হয়।
মূলত চলচ্চিত্রে ইমেজই সব। ইমেজের পর ইমেজ সাজিয়েই একজন নির্মাতা কোনো বাস্তবতা নির্মাণ করেন। যে বাস্তবতা দর্শক অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে দেখে। এই বাস্তবতা নির্মাণের জন্য ‘চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণশৈলী’ জানা আবশ্যক। আর জানার সেই আগ্রহ থেকেই ম্যাজিক লণ্ঠন-এর আজকের এই আয়োজন। আমাদের অতিথি আয়নাবাজি খ্যাত নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী। তাকে অনেক ধন্যবাদ ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের মাঝে উপস্থিত হওয়ার জন্য, সময় দেওয়ার জন্য। আমাদের সবার অনেক কিছু তার কাছ থেকে জানার আছে। তাই আর কথা নয়। উপস্থিত সবাইকে আবারও ধন্যবাদ।
সঞ্চালক-দুই : ধন্যবাদ হিরু মোহাম্মদকে। আমরা আর বিলম্ব না করে আয়োজনের মূল অংশে চলে যাবো। মূল অংশে যাওয়ার আগে জানিয়ে রাখি, কথা উপস্থাপনের পর সবার অংশগ্রহণে থাকবে প্রশ্নোত্তর পর্ব। কথা উপস্থাপন চলাকালে আপনাদের প্রত্যেকের কাছে একটি করে সাদা কাগজ পৌঁছে যাবে। সেখানে আপনার প্রশ্ন, নাম এবং নিজের বিভাগ লিখে আমাদের সদস্যদের হাতে দিয়ে দিবেন। সবশেষে সেই সব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করবেন আমাদের আজকের অতিথি। এ পর্যায়ে ‘চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণশৈলী’ নিয়ে কথা উপস্থাপন করবেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী। তাকে অনুরোধ করছি কথা উপস্থাপন করার জন্য। (হাততালি)
অমিতাভ রেজা চৌধুরী : আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত দেরি করার জন্য। যদিও এটা আমার হাতে ছিলো না। ফ্লাইট ছিলো দুইটা ৪০ মিনিটে; আমি দুইটার সময়ই এয়ারপোর্টে চলে গেছিলাম। তারপর আমাকে জানানো হলো, ফ্লাইটটা চারটায়। কেনো চারটায়? কারণ নেপালের ত্রিভুবন বিমাবন্দরে দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশবাহী যে বিমানটা আসছিলো সেটার জন্য। তারপরে জানানো হলো, চারটায় নয়, পাঁচটায়। তারপর যখন ফ্লাইটে উঠতে গেলাম তখন বললো, বিমানের চাকা পাঙ্কচার। চাকা ঠিক করতে আরো ২৫ মিনিট লাগলো। তারপরে বিমানে উঠলাম এবং আসলাম। সো, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। এটাতে কিছু করার নাই। বিমান এবং তাদের ম্যানেজমেন্টের সমস্যা।
আপনারা আলোচনা শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বের কথা বললেন, সেটাতে আমার খুব একটা আরাম লাগে না। আমি শিক্ষক নই। আমার শুধু কিছু কাজের এক্সপেরিয়েন্স আছে, সেই জায়গা থেকে আমি আপনাদের সঙ্গে কিছু জিনিস শেয়ার করতে পারি মাত্র। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম ডিপার্টমেন্টে আমাকে একটা বিষয় পড়াতে হয় ‘ফিল্ম ডিরেকশন’। সেটাও মোটামুটি আমি আমার অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেই পড়াই। আমি গত ১৫-১৬ বছর যাবৎ যে কাজ করছি সেটার যে অভিজ্ঞতা, সেই জায়গা থেকে কিছুটা জিনিস আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি। আর সবকিছুর শেষে যে প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকবে, এটার দরকার নেই। আপনারা যেকোনো সময় প্রশ্ন করতে পারেন, কিছু না বুঝলে। প্রথম কথা হচ্ছে, আমি আমার ফোন বন্ধ করতে চাই। যদি ফোন বেজে ওঠে ...।
সাতটা ২০ বাজে। আমার একটু বোঝা দরকার, আমাদের হাতে সময় আছে কতোক্ষণ। সেই অনুযায়ী আলাপের বিস্তার করবো আরকি। কারণ আপনারা যে স্লাইড প্রেজেন্টেশন আমার কাছে দেখতে পাচ্ছেন, তাতে দুইশো ১৪টা স্লাইডের ওপর আমার প্রস্তুতি নেওয়া। সুতরাং দুই মিনিট করে বললেও তো অনেক সময় লাগবে। অবশ্য এর অনেক কিছুই আপনারা জানেন। আমি তাই কিছু বিষয় স্কিপ করতে পারি। দুইশো ১৪টা স্লাইড তো আর আলাপ করা যাবে না। যতোগুলো আলাপ করা যায় আরকি।
প্রথমে আমি দুই-তিনটা প্রশ্ন নিবো, কারণ আমার বোঝা দরকার আপনারা আসলে কী জানতে চাচ্ছেন। আমি একটু বুঝতে চাই। সে অনুযায়ী কথা বললে আমার একটু আরাম হবে মনে হয়। ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে তো কথা বলবোই। এটা এতো বড়ো একটা বিষয় যে, এটা নিয়ে কথা বলে শেষ করা যাবে না। তারপর ফর্ম নিয়ে তো কথা বলবোই। আপনাদের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে জানার আগ্রহ আছে কি না। সিনেমার। কেউ যদি বলেন আপনাদের মধ্য থেকে, মাইক লাগবে না, এমনই বলেন।
দর্শক : চলচ্চিত্রের যে ভাষা তার বেসিকটা (ভিত্তি) কী?
অমিতাভ রেজা : হ্যাঁ। উত্তরটা পেয়ে যাবেন। আর কেউ?
তানজিনা তাসনিম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আসলে যেখানে ভাষা আছে সেখানে ব্যাকরণও আছে। চলচ্চিত্রের ভাষার ক্ষেত্রে কি কোনো ব্যাকরণ আছে? না কি যে যেভাবে বানাবে সেটাই ব্যাকরণ?
অমিতাভ রেজা : অবশ্যই আছে। আসলে ভাষা তো রিপ্রেজেন্ট করতে হয়। যদি এটা কোনো নিয়মে ফেলা না হয়, তবে তো সেটা রিপ্রেজেন্ট করবে না কিছুই। সে কারণেই আছে। পরে বলছি বিস্তারিত। আর কেউ? বুঝতে পেরেছি আপনাদের আগ্রহের জায়গা।
দর্শক : একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়ার পরে এর নিজস্ব একটি ভাষা তৈরি হয়। আর একটা হচ্ছে চলচ্চিত্রের কলাকুশলীরা তাদের সংলাপে ভাষা ব্যবহার করে। কোন ভাষাটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
অমিতাভ : ডায়ালগ সিনেমার একটা পার্ট মাত্র। ডায়ালগ হলো চলচ্চিত্রের একটা টুল মাত্র। মানে টু কমিউনিকেট অ্যানিথিং। চলচ্চিত্রের ভাষা বলতে যা বোঝায় সেটা আসলে অন্য জিনিস। সেটা আসলে হাউ ভিজ্যুয়ালি অর ননভিজ্যুয়ালি, যেটা সিগনিফাইঙ করে সেটাকে বোঝায়। আর ডায়ালগ ছাড়া তো সিনেমা হয় না। পৃথিবীতে সিনেমার জন্মই হয়েছে ডায়ালগের মাধ্যমে। তবে সেটাকে আমরা চলচ্চিত্রের ভাষা বলি না।
আমি প্রথম যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলবো সেটা হলো, সিনেমা আসলে কী? সিনেমার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে বিষয়টা দাঁড়ায় সেটা হলো ইমেজ; ইমেজ তৈরি করা। বি কনস্ট্রাকশন ইমেজ। আমরা ইমেজ তৈরি করি। শার্ট, প্যান্ট যেমন বানানো হয়, তেমনই ইমেজও তৈরি করা হয়। সিনেমার আরেকটা জিনিস হলো রিপ্রেজেন্টেশন। এটা রিপ্রেজেন্ট করে। আমরা যেকোনো কিছু নতুন করে দেখাই। আবার রিপ্রেজেন্টেশনেরও বিভিন্ন ভাব-ভঙ্গি আছে। আরেকটা হচ্ছে রিক্রিয়েট রিয়্যালিটি। সিনেমা ইজ নট রিয়্যালিটি। ইটস রিক্রিয়েটেড রিয়্যালিটি। আমরা নতুন একধরনের বাস্তবতা নির্মাণ করি। এবং সেটাও একধরনের বাস্তবতা। সিনেমার একটা বড়ো জিনিস হচ্ছে ইটস অথর এক্সপ্রেশন। এটা ইনডিভিজ্যুয়াল মানুষের এক্সপ্রেশন। আমরা যে সিনেমাকে বিশ্বাস করি, এটা আসলে একটা আলাদা আলাদা মানুষের ভাবনা। সেই ভাবনা আমরা মানুষের কাছে ছড়ানোর চেষ্টা করি।
প্রথমে আমরা কথা বলবো ইমেজ নিয়ে-ইমেজ কী, কোথায়? সিনেমা বোঝার ক্ষেত্রে ইমেজ আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সিনেমা বুঝতে, সিনেমার ভাষা বুঝতে ইমেজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এটা ভুলে যাই যে, ইমেজ আসলে কথা বলে। ইমেজের মধ্যে অনেক কিছু আছে। অনেক আইকন, অনেক সিগনাল আছে। যে সিগনালের মাধ্যমে আমরা অনেক কিছু বুঝতে পারি।
আপনারা স্ক্রিনে এখন একটা ইমেজ দেখছেন। সেখানে কোনো শব্দ নেই। সাধারণভাবে ইমেজটাতে কয়েকজন বসে কিছু একটা করছে আরকি। এখন যদি এই ইমেজ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়, ইমেজটা দেখে কী বোঝা যায়? ইমেজটা আসলে কী উপস্থাপন করছে? ইমেজের মানুষগুলো কোন দেশের হতে পারে? তাদের মধ্যে সম্পর্ক কী হতে পারে?
এর উত্তরে কেউ হয়তো বলবে, এতে কয়েকজন বসে একটা বিষয়ে আলাপ করছে, যেটাতে তাদের মতভেদ/দ্বিমত রয়েছে। তাদের মধ্যে রাগ-অভিমান-ঝগড়া এসবও হতে পারে। কেউ বলবে, পরিবারের কয়েকজন বসে গল্প করছে বা আড্ডা দিচ্ছে। সম্পর্কের বিষয়ে হয়তো বলবে, তারা মা-বাবা-সন্তান, স্বামী-স্ত্রী-ভাই আবার তারা ভিন্ন কোনো সম্পর্কেরও হতে পারে। আবার তারা যে জায়গায় বসে আড্ডা দিচ্ছে সেটা বাংলাদেশের কোনো স্থান বা অন্য কোনো দেশও হতে পারে। তার মানে একই ইমেজ নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন ভাবনা আছে। প্রত্যেকের চিন্তা-ধারণা আলাদা। একই ইমেজ ভিন্ন বার্তা দেয়। আমরা ইমেজ থেকে যোগাযোগ করি। ইমেজ থেকে আমরা ধরে নিই। এটাকে বলে অবাচনিক যোগাযোগ। অবাচনিক যোগাযোগ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এতে থাকে শরীরী ভাষা, মুখের এক্সপ্রেশন। এটা ভাষার প্রথম ধাপ। মুখভঙ্গি অবাচনিক যোগাযোগে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সিম্পলি, মানুষের ভ্রু দিয়েই অনেক ভঙ্গি হয়; অনেক কিছু বোঝানো যায়। এতে আশ্চর্য, অবাক হওয়া, রাগ, অবিশ্বাস-এ রকম অনেক কিছুই থাকে। সামান্য ভ্রু ওঠা-নামার মাধ্যমে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবাচনিক যোগাযোগ করি।
আমরা যদি আয়নাবাজির কিছু ইমেজ দেখি এবং শিল্পীদের ভ্রু খেয়াল করি, তবে দেখা যাবে, প্রতিটি ভঙ্গির মাধ্যমেই এর পাত্র-পাত্রীরা যোগাযোগ করছে। তার মানে মুখভঙ্গির মাধ্যমে আমরা যোগাযোগ করি এবং এক্সপ্রেশন অনুযায়ী বার্তা ভিন্ন হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অন্য যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো কে দেখছে? চলচ্চিত্রে প্রাথমিকভাবে আমরা যে ইমেজ দেখি সেটা আসলে নির্মাতার দেখা।
আয়নাবাজিতে যখন চঞ্চল ও নাবিলা ছাদে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো, সেই ছবিটায় ক্যামেরাটা হালকা টপ থেকে ব্যাকগ্রাউন্ড দেখানো হয়েছে। এটা আসলে ডিরেক্টরস পয়েন্ট অব ভিউ। যেটা আমরা সবাই দেখেছি। এরপর স্বামী-স্ত্রী যখন ‘হলিউড স্টুডিও’তে ছবি তুলতে যায়, তাদের ছবি তোলার সময় দেখবেন ওভার দ্য শোল্ডার শট্। এটা এই চরিত্রের পয়েন্ট অব ভিউ। অবজেশটিভ শট্। এটা ক্যামেরা পয়েন্ট অব ভিউ। তার মানে ক্যামেরার মাধ্যমে বোঝানো হয় এটা সাবজেকটিভ নাকি অবজেকটিভ। কীভাবে দেখানো হয়; কার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে আমরা দেখছি। আরেকটি বিষয় হলো পশ্চার, জেশ্চার, বডি মুভমেন্ট। অর্থাৎ বডি মুভমেন্ট বা শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও আমরা যোগাযোগ করি। আয়নাবাজিতে জেলখানার গানের দৃশ্যে চঞ্চলের বডি মুভমেন্টটা খেয়াল করা যেতে পারে। সেখানে নাচের সময় ক্যামেরা উপর থেকে সবাইকে দেখানো হয়। এভাবে প্রতিটি বডি মুভমেন্টের মাধ্যমে আমরা যোগাযোগ করি। এর সঙ্গে কাজ করে বডি কন্টাক্ট। বডি কন্টাক্টের ওপর নির্ভর করে তারা বন্ধু, স্বামী-স্ত্রী, মা-সন্তান নাকি অন্য কোনো সম্পর্কের। বডি কন্টাক্ট ইজ ভেরি ইম্পর্টেন্ট ফর ইমেজ। আপনারা যখনই কোনো ইমেজ দেখবেন, সেই ইমেজকে কীভাবে ডিফাইন করবেন-ইমেজের মাধ্যমে কী কমিউনিকেট করে তা গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনো ইমেজ দেখা হয়, এর মাধ্যমে কী বোঝানো হচ্ছে, সিনেমা বোঝার জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা চলচ্চিত্রের ভাষা তৈরি হয় অনেকগুলো শটের মাধ্যমে। আর শট্ই প্রথম। ফলে শট্টা যখন নিচ্ছেন, তা দিয়ে কী বোঝানো হচ্ছে, কী কমিউনিকেট করা হচ্ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম শটে কী নেওয়া হচ্ছে, সেটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
যেকোনো চলচ্চিত্র, ইমেজ বা অন্যকিছু-সবকিছুর মধ্যে এক্সপ্রেশন আছে। এর একটাকে আমরা কনট্রাস্ট বলি, আরেকটাকে অ্যাফিনিটি। কনট্রাস্টের মাধ্যমে সাদাকালো, অনেক জটিল স্টোরি তৈরি করা যায়। যদি দুটি ছবি দেখা যায়, যার মধ্যে কালারফুল, ব্ল্যাক, অনেক লাইন আছে। ইমেজের মধ্যে এগুলো কনট্রাস্ট তৈরি করে থাকে। অ্যাফিনিটি একদম সাদামাটা। কোনো জটিলতা থাকে না। দেয়ার ইজ নো কালার টোন। এটা ফিল্মে কীভাবে আসে তা বোঝার জন্য আমরা রান লোলা রান (Run Lola Run)-এর একটা দৃশ্য দেখতে পারি (পর্দায় ওই চলচ্চিত্রটিতে লোলার দৌড়ানোর দৃশ্য দেখানো হয়)। এখানে ক্যামেরার শট্ গ্রহণ, অ্যাঙ্গেলস, লাইনস সবকিছু খেয়াল করা যেতে পারে। এটা একটা কমপ্লেক্স স্টোরি।
ফিলিপাইনের চলচ্চিত্রনির্মাতা লাভ দিয়াজ, যিনি আট ঘণ্টার একটা সিনেমা নির্মাণ করেন। উনার সিনেমায় সম্ভবত দুটো গল্পের ভাব এক হতে পারে, কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে, ইমেজগুলো সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা যখন সিনেমা দেখি বা নির্মাণের চেষ্টা করি, তখন আমাদের বোঝাতে হবে, ইমেজ ঠিক কীভাবে বানাচ্ছি। এটা কনট্রাস্ট নাকি অ্যাফিনিটি। কী ধরনের ছবি, কীভাবে আমরা অ্যাপ্রোচ করি। যে গল্প যে ধরনের, তার ইমেজ ঠিক সেই ধরনেরই হবে। আয়নাবাজি খুব কনট্রাস্টি, অ্যাফিনিটি নয়। এগুলো এজন্য বলছি যে, এভাবে আপনি ভিজ্যুয়াল কম্পোনেন্ট করতে পারেন।
এখন প্রশ্ন এগুলো আসলে কী? স্পিস, টোন, কালার, লাইন অ্যান্ড শেপ, মুভমেন্ট এ সবই থাকে ভিজ্যুয়াল কম্পোনেন্টে। স্পিস কী? স্পিস ইজ অ্যা থিঙ্ক। যেটাতে আসলে ডেফ্থ স্পেস, ডেফ্থ কিউ, ওয়ান পয়েন্ট র্পাসপেক্টিভ থাকে; যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তারা এসব ভালো করে বোঝেন। তাই এসব নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। আলোচনা করলে, ফিল্মের বাইরে যারা আছেন তাদের কাছে একটু বিরক্তিকর লাগবে। আমরা স্পেসকে কীভাবে ডিফাইন করি, এটা বুঝতে হবে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য, চলচ্চিত্রের ভাষা বোঝার জন্য। ডেফ্থ কিউ একটি সিম্পল ফ্রেম। কিন্তু এটা আপনাকে গভীর অনুভূতি এনে দেয়। আকার নির্ধারণেও সমগুরুত্ব রাখে। কোনো ইমেজ বড়ো কিছুর সামনে তুললে, সেটা নিশ্চয় তার সমান হয় না। তবে ফোরগ্রাউন্ড, ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে ইমেজের আকার সমান মনে হতে পারে।
লাইন অ্যান্ড শেপ বলতে আমরা কী বোঝাই। চলচ্চিত্র নির্মাণে আমাদের মূল সমস্যাটা হলো, আমরা যারা নির্মাণ করতে চাই, আমাদের বেসিক কম্পোজিশন জ্ঞান অনেক দুর্বল। কারণ আমাদের দেশে ভিজ্যুয়াল অনেক কম। ভিজ্যুয়াল নিয়ে আমরা কম কাজ করছি। ঐতিহাসিকভাবে এদিকের মানুষের মধ্যে এর অভাব রয়েছে। সে কারণে বেসিক কম্পোজিশন নিয়ে যে ধরনের আলাপ করা হয়, সাধারণভাবে সেগুলো বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি থাকে। এ কারণে টেলিভিশনে আমরা যখন নাটক দেখতে যাই, ভালো লাগে না। কিন্তু কেনো? কেনো এটা আরাম লাগে না, দেখতে ভালো লাগে না। তার মানে বেসিক জায়গায় সমস্যা। একটা ক্যামেরা কোথায় ধরে আল্লাহই জানে! এটা ঠিকভাবে করা হয় না।
প্রথমেই প্রশ্ন ছিলো, নির্মাণের ক্ষেত্রে নিয়মকানুন (ব্যাকরণ) আছে কি না। অবশ্যই আছে। এটা বোঝা অনেক গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রতিটা জিনিসেরই নিয়ম থাকে। যেটা যেভাবে কাজ করা হয়। আপনি যদি নিয়ম না জানেন, তবে আপনি তা কখনোই ভাঙতে পারবেন না। নিয়ম ভাঙতে হলে নিয়ম জানতে হবে। কেননা এই নিয়মগুলো এমনি এমনি আসেনি। এটা প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে। এমন না যে, কেউ একজন বলছে এটা এই নিয়ম।
ইমেজে মূল বিষয়টা হচ্ছে ফোকাল এলিমেন্ট। আমি যদি রোমের বিশাল কোনো স্থাপত্যের ছবি তুলি, সেটাতে কোনো ফোকাল এলিমেন্ট থাকবে না। এটা এর বিশালতার কারণেও হতে পারে। স্ট্রেইট, ফেয়ার, ফ্ল্যাট ইমেজ; স্ট্রেইট ভেরি ফ্ল্যাট-এর হাইলাইটস করার মতো কিছু নেই। এবার অন্য একটি ইমেজ দেখি, যেটাতে নির্দিষ্ট ক্যারেক্টার, ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। মানে ফোকাল এলিমেন্ট আছে। সেটা দেখতে ভালো লাগবে। আমরা যদি ক্রিস কোলস্কি’র শর্টফিল্ম সম্ভবত লাভ-এর কিছু ইমেজ দেখি, সেগুলো দেখতে ভালো লাগে না। আবার যখন তাতে চরিত্র আসে অর্থাৎ ফোকাল এলিমেন্ট আসে, তখন সেটা দেখতে ভালো লাগে। প্রত্যেকটা ইমেজেই ক্যারেক্টার, ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে। এর ওপরই ভালোলাগা নির্ভর করে।
আমরা যদি চারটি একই রঙের ছবি দেখি তাতে বিশেষ কিছু নাও থাকতে পারে। তবে এর মধ্যে একটা ভিন্ন রঙের ছবি থাকলে দেখার দৃষ্টিও ভিন্ন হয়। মানে যেকোনো একটি রঙের মধ্যে দিয়ে আপনি দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে পারেন। হাই কন্ট্রাস্ট, অবস্থান, ক্যামেরা ফোকাস, মোশন, মুভমেন্ট, ফেসেজ ও ফিগার-এগুলো দিয়ে ফোকাল এলিমেন্ট অনেকটা ঠিক হয়। আমরা একটু সিনেমাটিকভাবে বলতে পারি, আয়নাবাজিতে জেলখানায় ‘না বুঝি দুনিয়া/ না বুঝি তোমায়/ আমার কী দোষ খালি পাপ জমায়’ গানের শেষের শটে সবাই যখন গোল হয়ে ঘুরছে, তখন চঞ্চলের পাশে একজনের ওপর আমাদের চোখ আটকে যায়। তার দিকে দর্শক বেশি খেয়াল করে। কারণ ক্যামেরা পজিশন, ফোকাস, সবকিছু। অন্যরা যখন মুভমেন্ট করছে ওই চরিত্রটি তখন মোটামুটি স্ট্যাটিক ছিলো।
তারপর ধরুন, কোনো একটা ইমেজে চরিত্র দৌড়াচ্ছে। তখন অবশ্যই আমাদের আকর্ষণ তার প্রতি থাকবে। তাই ফ্রেমে ফোকাল এলিমেন্ট থাকা বা ফোকাল এলিমেন্ট কী সেটা জানা-বোঝা-আমরা যখন ক্যামেরা ধরি, ইমেজ তৈরির চেষ্টা করি-এটার সঙ্গে বোঝাপড়া থাকাটা খুব জরুরি। আরেকটা বিষয় হলো স্ট্রাকচার। আমরা জানি, ওয়ান-থার্ড রুল ব্যবহার করে কীভাবে অনেক সুন্দর ইমেজ তৈরি করা যায়। এবং এটা দেখতে চোখে আরাম লাগে। আয়নাবাজি যখন জার্মান ফেস্টিভালে যায়, আমি সেখানে অনেক ছবি পাঠিয়েছিলাম। তারা সেগুলো পছন্দ করেছিলো। আমি ভাবছিলাম, কেনো তারা ছবিগুলো পছন্দ করলো। তখন আমি বুঝলাম, এগুলো পছন্দ করার কারণ হতে পারে, ছবিগুলো অনেকটা ভালো ফ্রেমে ছিলো। আয়নাবাজিতে ওয়ান-থার্ড রুলে অনেকটা সঠিক পয়েন্টে ছবি তোলা হয়েছিলো।
ইমেজ বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গোল্ডেন রেশিও। আপনি বলতে পারেন, পৃথিবীর যেকোনো কিছুই গোল্ডেন রেশিওতে তৈরি হয়। আপনি যেকোনো কিছু হাতে নেন, এটা প্রাকৃতিকভাবেই গোল্ডেন রেশিও মেইনটেইন করে। আমরা অনেক সময় বলি, এই ছবিটা দেখতে ভালো, এটা খারাপ লাগছে। কিন্তু কেনো ভালো-খারাপ লাগে? কারণ ছবিকে ফ্রেমে ঠিকঠাক রাখতে হয়। আরেকটি বিষয় হলো ব্যালেন্স। যখন একটি ইমেজে একাধিক চরিত্র থাকে, তখন একটির সঙ্গে আরেকটির ব্যালেন্স করতে হয়। ফ্রেমে সঠিকভাবে ব্যালেন্স করা অনেক জরুরি। ইউটিউবে লগইন করে ‘এভরি ফ্রেম ইজ পেইন্টিং’ সার্চ করে, সেটাতে সাবস্ক্রাইব করলে কমপোজিশনের অনেক আইডিয়া পাওয়া যায়। এগুলো আর কীভাবে আপনি ডেভেলপড করবেন? অবশ্যই করা যাবে, যদি আপনি ইমেজ দেখার অভ্যস্ততা তৈরি করেন। ইমেজ নিয়মিত দেখা বা চর্চা করেন কি না তার ওপরও এটা নির্ভর করে।
আমার পছন্দের একজন পেইন্টার, ভ্যানগগের পরেই যার অবস্থান, তিনি ডাচ পেইন্টার ভার্নিয়া। আপনি ভার্নিয়ার পেইন্টিং দেখতে পারেন, যদি চলচ্চিত্রনির্মাতা হয়ে উঠতে চান। ডাচ পেইন্টাররা সবাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা অনেকটা ভিন্নভাবে আলোর ব্যবহার করেছেন। ইমেজের য়েস্থেটিকস নিয়ে চর্চা করতে চাইলে, পেইন্টিং দেখার অভ্যস্ততা খুব জরুরি। আবারো বলছি, পেইন্টিং দেখার অভ্যস্ততা চলচ্চিত্রনির্মাতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। ইমেজ নিজের ভিতরে নিয়ে রস আস্বাদন করার জন্য, রস তৈরি করার জন্য খুব বেশি দূর যাওয়া লাগবে না। আপনি শুধু পেইন্টিং দেখার চর্চা করেন-বিশেষ করে রেনেসাঁ, ফিফটিন্থ সেঞ্চুরির পেইন্টিংগুলো দেখতে হবে। ক্ল্যাসিকাল পেইন্টিং দেখলেও আপনার দেখার চোখ উন্নত হবে। এগুলোতে লাইটিং, শ্যাডোর খুব ভালো কাজ আছে।
আমরা যে কথাগুলো বলছি, তা কিন্তু ৫০ বছর আগের গল্প। অথচ আপনি এখনকার সিনেমা বানাবেন। কথা হলো, আপনার যদি ৫০ বছর আগের ধারণা না থাকে, আপনি ভালোভাবে ইমেজ তৈরি করবেন কীভাবে? কারণ এর মাধ্যমেই আপনার ইমেজ সম্পর্কে ভালো ধারণা জন্মাবে। একজনের প্রতি আমার খুব রাগ লেগেছিলো। তিনি হলেন ইরানিয়ান রিয়েলিস্টিক পেইন্টার ইমাম মালিকি (পর্দায় ইমাম মালিকির ছবি দেখানো হয়)। যার বয়স মাত্র ২৭। উনি কিছু পেইন্টিং করেছেন যা অবিশ্বাস্য। দেখে মনে হবে ফটোগ্রাফি। কমপোজিশন, লাইটিংয়ের চমৎকার ব্যবহার করেছেন, না দেখলে বুঝবেন না।
ইমেজ অত্যন্ত শক্তিশালী। আপনি যদি চলচ্চিত্র ভালোবাসেন, চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রথম যেটা ভালোবাসা দরকার তা হলো ইমেজ। ইমেজকে ভালোবাসা। ইমেজের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। কারণ ইমেজ দিয়েই চলচ্চিত্র তৈরি হয়। এক্ষেত্রে শব্দও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাষার ক্ষেত্রে ইমেজই প্রধান। চলচ্চিত্রে ইমেজের সঙ্গে আরেকটা বিষয় জড়িত। তা হলো সময়। সিনেমা ইজ অ্যা প্লাস্টিক টাইম। সিনেমায় সময় ভূমিকা পালন করে। আমরা সিনেমার শুরু থেকে শেষ অবধি দেখি। সময় নিয়ে সবচেয়ে বড়ো সুন্দর কথা বলেছেন, তারকোভস্কি তার ‘স্ক্যালাপ্টিং অব টাইম’ বইয়ে। সময়ের ভাস্কর্য। তারকোভস্কির সিনেমা দেখার অভ্যস্ততা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা।
সময়কে তুলনা করতে পারে এমন আরেকটা শিল্প-মাধ্যম কোনটি। সেটা হলো সঙ্গীত। সঙ্গীতের মধ্যে সময়ের কমপেয়ার আছে। এটার মধ্যে গান আছে, কথা আছে।
এখন আমরা আসি আমাদের মূল আলোচনায়। সিনেমা। সিনেমার একটা মজার জিনিস আছে সেটা হলো স্কোপোফিলিয়া (Scopofilia)। কোনো গোপন স্থান থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার আনন্দ। এই যে দেখা, এটা ফ্রয়েডীয় আলোচনা। এটা সিনেমায় একটা মজার জিনিস। সিনেমায় দেখবেন অভিনেতা কখনো আপনার দিকে তাকায় না। তাকালে এলিনিয়েশন ঘটে। মনে হয়, আমার দিকে তাকাচ্ছে কেনো। তার মানে আপনি দেখবেন, কিন্তু অভিনেতা আপনাকে দেখবে না। এটার একটা ফূর্তি আছে সিনেমায়। এটাই স্কোপোফিলিয়া।
এখন আপনারা বলুন তো সিনেমা কী? ক্রিস্টিয়ান মেজ (Christian Metz) বলেছেন, ফিল্ম ইজ ডিফিকাল্ট টু এক্সপ্লেইন, বিকজ ইট ইজ ইজি টু আন্ডারস্ট্যান্ড। চলচ্চিত্রকে ব্যাখ্যা/বর্ণনা করা খুব কঠিন; কারণ এটি বোঝা অনেক সহজ। চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে অনেকেই কাজ করেছেন। এদের মধ্যে চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন ক্রিস্টিয়ান মেজ, তার ‘দ্য ইমাজিনারি সিগনিফায়ার’ এবং ‘ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজ’ বই দুটির মাধ্যমে।
তাহলে সিনেমা কী? এ বিষয়টি বর্ণনা করতে টারমিনোলজি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সিনেমা বলতে আমরা কী বুঝি-রিক্রিয়েট রিয়্যালিটি, রিপ্রেজেন্টেশন-কী বোঝায়? বলবেন সাহস করে কেউ (দর্শকের উদ্দেশে)?
প্রথম দর্শক : এটা একধরনের বাস্তবতা। অন্য কাউকে দেখানো।
দ্বিতীয় দর্শক : এটা একটা সময়ের গল্প।
অমিতাভ : হ্যাঁ। এটা গল্প, ন্যারেটিভিটি।
তৃতীয় দর্শক : সিনেমা হলো, ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে তা।
অমিতাভ : ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে। এটা খুবই ভালো দিক। আমি যদি বলি, সিনেমা ইজ অ্যা কেমিস্ট্রি। কেনো এটা কেমিস্ট্রি জানেন? এখন ডিজিটাল মাধ্যম এসেছে, সেটা ঠিক আছে। বাট হোয়াট ইজ অল অ্যাবাউট? ফিল্ম ইজ কেমিস্ট্রি। ইটস সিম্পলি সেলুলয়েড। যেটার মধ্যে আলো পড়ে এবং কেমিকালি প্রতিক্রিয়া করে। বিউটিফুল কেমিস্ট্রি। যেটা অনুভূতি সৃষ্টি করে। ইজ নাথিং। এটা সিম্পল, একটা সেলুলয়েডের মধ্যে আলো পড়ে, কেমিকাল রিয়েকশনে ওটা ছেপে যায়, আলোটা ওখান থেকে বিচ্ছুরিত হয়, আলোটা দেয়ালে পড়ে। এই আলো দেখে আপনি আবেগী হয়ে ওঠেন। এভাবেই সিনেমার জন্ম হয়েছে। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে সিনেমা একটা কৌতূহলের নাম ছিলো। এটা কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে, আলো এসে পড়ে, নড়াচড়া করে; আবার এটা দিয়ে মানুষ হাঁটাহাঁটি করে! এডিসনের প্রথম চলচ্চিত্রের কথা বলুন। আর আজকে সেই চলচ্চিত্র কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। বার্থ অব অ্যা ন্যাশন-এ মানুষের গলা কেটে ফেলে। এটা নিষিদ্ধ হলো! চার্চ থেকে বলা হলো, শরীরটা ঈশ্বরের দান, এটা কাটাকাটি কেনো; ক্লোজ আপ কেনো ব্যবহার করছেন; মানুষের পুরো শরীর দেখাতে হবে। সিনেমা, আপনারা যেটাকে ম্যাজিক নাম দিয়েছেন, এটা এ রকম। সিনেমা একটা ইমেজ। এবং এই ইমেজগুলোকে আমরা এমনভাবে তুলে ধরি যে, আবেগ জন্ম নেয়।
সিনেমা ইজ অ্যা চুজেন উইনডো অব রিয়্যালিটি। এই কথাটার মানে হচ্ছে, আমি বাস্তবতা থেকে একটা বিষয় নির্বাচন করে সিনেমায় তুলে ধরি। পৃথিবীতে অনেক কিছু হচ্ছে। বাস্তবতা তো অনেক। কিন্তু আমি সেখান থেকে বাছাই করে ঠিক করি কোনটা তুলে ধরবো। অসাধারণ একটা চলচ্চিত্রের নাম জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা। এই চলচ্চিত্র দেখলে মনে হবে, মুম্বাই কী সুন্দর! মুম্বাই থেকেই তো গল্পটা শুরু; তারপর মুম্বাই থেকে স্পেনে গেছে। সেখানে মুম্বাইয়ের সবকিছু কী সুন্দর মনে হয়, তাই না? আপনারা অনেকেই সেখানে গিয়ে থাকবেন। আমিও অনেকবার গেছি। আমি ট্রেনে করে মুম্বাইয়ে যেতাম। তো সকালবেলা যখন মুম্বাইয়ে ঢুকতাম, ভোর পাঁচটা-ছয়টার দিকে, তখন বের হওয়ার মতো অবস্থা থাকে না। কারণ কী জানেন, শত শত পাছা হাগতে (পায়খানা করতে) বসেছে! জানালার বাইরে, বস্তির পর বস্তি, কিলোমিটারের পর কিলোমিটার। এটা কী হাগার জায়গা! অথচ সিনেমায় ওরা নাকি পানির নিচে দুনিয়া খুঁজতে স্পেনে গেছে। দ্যাট ইজ অ্যা চুজেন রিয়্যালিটি। ওই পরিচালক ওই বাস্তবতা পছন্দ করেছেন। এটা তারা ধারণ করে না। ওই বাস্তবতা মুম্বাইতে নাই। প্রতি মুহূর্তে মানুষ সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে সেখানে জীবন চালাচ্ছে, গরীব মানুষেরা।
আর চলচ্চিত্রে যা দেখায় তা তো তারা ধারণই করে না। অথচ ওই বাস্তবতাকে আমরা সত্য ভেবে কতো কী না করি! কয়েকদিন আগে শুনলাম, একটা বিয়ে বাড়িতে নয়টা অনুষ্ঠান হচ্ছে, মেন্দি, হেন্দি, চেন্দি ...তারপরে নাকি বিয়ে! এই অদ্ভুত বাস্তবতা কোথা থেকে আসছে? এটাই চলচ্চিত্রের বাস্তবতা। চলচ্চিত্রে আসলে একটা বাস্তবতা নির্মাণ করা হয়। এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ যে, আপনি স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে কোন বাস্তবতা গ্রহণ করবেন, কোন বাস্তবতা উপস্থাপন করবেন।
এখন চলচ্চিত্রের বেসিক কিছু টেকনিকাল বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চাই। চলচ্চিত্রের একটি টেকনিকাল বিষয় হলো অ্যাসপেক্ট রেশিও। এটা খুবই টেকনিকাল, তবে চলচ্চিত্র বোঝার জন্য বা নির্মাণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এটা এক দশমিক ৭৮, এক দশমিক ৮৫, দুই দশমিক ৭৫ থেকে চার পর্যন্ত যায়। ব্যক্তিভেদে প্রত্যাশা আর পছন্দ অবশ্যই ভিন্ন হয়। এটা দার্শনিক কথা হয়ে যায়। যদি কোনো একটা ছবি চার বাই তিন অনুপাতে পেইন্টিং করা হয়, আর আপনি যদি তা এইচ ডি তে দেখেন, তা ভুল। কারণ তাতে মূল বিষয়টি থাকে না। তাই এটা গুরুত্বপূর্ণ, কোন ধরনের ফ্রেম কমপোজিশনে জিনিসটা করবেন। আরো যে বিষয়গুলো বোঝা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো-ফ্রেম সাইজ, অ্যাঙ্গেল, হাইট, লেভেল, ডেফ্থ অব ফিল্ড, মোশন। এগুলো ফ্রেমিংয়ে বেসিক হিসেবে কাজ করে। ফ্রেম সাইজে আমরা জানি, কোনটা লঙ শট্ মানে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, মিডিয়াম শট্ মানে পা পর্যন্ত দেখা যাবে। আমেরিকান স্টাইলে এর নাম কাউ বয় শট্। কোমরে রাখা পিস্তলের মাথাটা যাতে দেখা যায়, এজন্য এই শটের নাম কাউ বয় শট্। মিডিয়াম শটে স্পেসটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড স্পেস। কোন স্পেসে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছে। এগুলো সবাই জানে।
প্রতিটি শট্ যেমন আলাদা অর্থ তৈরি করে, তেমনই ফ্রেমিংয়ে প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কীভাবে ইমেজ তৈরি করবেন? এখানে যেহেতু কথা হচ্ছে ফিল্মের ভাষা নিয়ে, তাই এটা জানা দরকার। যেমন ধরেন, একটি মেয়ে জঙ্গলে বসে কাঁদছে। জঙ্গল লঙ শট্, মেয়েটি ক্লোজ শট্, বসে থাকাটা মিড শট্, কাঁদছে এক্সট্রিম শট্। চরিত্র, অবস্থান, অ্যাকশন, ইমোশন এসব বিস্তারিত বোঝাতে আলাদা আলাদা শট্ ব্যবহার করা হয়। আরেকটি বিষয় হলো অ্যাঙ্গেল। হাই অ্যাঙ্গেলে চরিত্রকে অনেক লো লাগে। আবার লো অ্যাঙ্গেলে চরিত্র অনেক শক্তিশালী মনে হয়। এগুলো মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। এভাবে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে বিভিন্ন শটে বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়। এর মধ্য দিয়ে চরিত্রের সঙ্গে চরিত্রের সম্পর্ক তৈরি করে। আপনারা যদি আমার নির্মিত ‘বাংলালিংক ফিসারম্যান টিভিসি’টা দেখেন, তবে এই বিষয়গুলো একটু হলেও স্পষ্ট হবে। কীভাবে আমরা ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলের মধ্য দিয়ে থিসিস, অ্যান্টিথিসিস, সিন্থিসিস ব্যবহার করে গল্প নির্মাণ করি।
আয়নাবাজি নিয়ে আমি বলতে পারি, ইজ অ্যান এভরি শট্ আই টেক, আই নো আই অ্যাম টেকিং ইট। আয়নাবাজি’র আমার যেকোনো ইমেজ বলুন, আমি এক্সাক্টলি জানি, আমি কেনো কোন লেন্স ব্যবহার করেছি। আপনাকে জানতে হবে, কেনো আপনি কী করছেন। কেনো আপনি লাল জামা পরবেন, কেনো আপনি কী ব্যবহার করবেন।
এখনো আমার অনেক কিছুই বলার আছে। আমরা একশো ১৪ নম্বর স্লাইডে আছি। হাতে আছে আরো একশোটি। আর আমাদের হাতে সময় তো খুব বেশি নেই। তাই সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বে যাওয়াই ভালো হবে।
দর্শক : ফিল্মে ও বিজ্ঞাপনে শট্ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য আছে কি?
অমিতাভ : না, নেই। দুটোই এক। প্রথম কথা হচ্ছে, এটি আর্ট অব ফিল্ম মেকিং। আপনি যেভাবে মেকিংটা করতে চান-সেটা করপোরেট, এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম, ন্যারেটিভ ফিল্ম, টেলিভিশনের জন্য কোনো কাজ-এটা কোনো বিষয় নয়। বিষয় হলো আপনার উপস্থাপন। নির্মাণের ক্ষেত্রে ফিল্ম, বিজ্ঞাপন আলাদা কিছু নয়। এটা একটা ফর্ম। ডেইলি সোপ, টকশো-প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা ক্যামেরার পজিশন করা হয়। একেকটা ফর্মে আলাদা করে যেটা প্রয়োজন হয়, সেটা ব্যবহার করা হয়। আমি মনে করি, ফিল্ম আলাদা কিছু নয়। আমি যে গল্পটা নির্মাণ করবো, সেই গল্পটা বলার জন্য চরিত্রকে যেভাবে ব্যবহার করা দরকার করবো। তাই আমি তা নির্ধারণ করবো। গল্পটা বলার জন্য এটা প্রয়োজন। আয়নাবাজি করার জন্য আমি রেড ক্যামেরা নির্ধারণ করি। এটা করার পিছনে একটা কারণ আছে। আয়নাবাজি করার জন্য দুই দশমিক ৩১ অ্যাসপেক্ট রেশিওতে শুট করেছি। ইচ অ্যান এভরি স্টোরি রিকয়ার আলাদা আলাদা অ্যাকশন। আপনি যদি মনে করেন, আমি এটা স্ট্যাটিক শটে করবো, করবেন। প্রতিটা গল্পই আপনাকে তাড়িত করবে, আপনি কীভাবে শুট করবেন সেটা আপনার ব্যাপার।
দর্শক : ভিডিও আর ফিল্মের মধ্যে পার্থক্য কী? আমার কথা হচ্ছে, আমাদের চারপাশে প্রচুর গল্প আছে। বিভিন্ন নির্মাতা এই গল্পগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে বলছে। আমি একটা ভিডিও করছি, সেই ভিডিওটাই সিনেমা হয়ে উঠছে। আবার একেকজন নির্মাতার বানানোটা একেক রকম। নির্মাতাদের এই পার্থক্য তৈরি হয় কীভাবে?
অমিতাভ : এটা সিম্পলি নির্মাণ। একটা হচ্ছে ইনসেডিকালি আর একটা সিনেমাটিকালি। দিনশেষে আপনি যেটা দেখেন, সেটা তো আপনার মস্তিষ্ক এবং আপনার জ্ঞান। আপনার দেখাটাকে আপনি জ্ঞান দিয়ে রিড আউট করতে চান। পড়ার চেষ্টা করেন। আপনি যখন জ্ঞান ও মস্তিষ্ক দিয়ে পড়ার চেষ্টা করবেন; যখন দেখবেন, আপনি ওটা পড়তে পারছেন না, আপনি ওটার স্ট্যাটিকের সঙ্গে যাচ্ছেন না, তখন ওটা আপনার ভালো লাগবে না। যখন আপনার কাছে ভালো লাগে না, তখন আপনার কাছে ওটা সিনেমা নয়। ওটা সিনেমা হয়ে উঠুক না উঠুক, সেটা বিষয় না। বিষয় হলো, আপনি ওটার সঙ্গে নিজেকে সংযোগ করতে পারছেন না। আর ভালো-খারাপ, এটা আমি বলতে পারবো না। পৃথিবীতে হাজার হাজার নির্মাতা নির্মাণ করছেন। কোনোটা সিনেমা হয়ে উঠছে আবার কোনোটা সিনেমা হয়ে উঠছে না। সময় চলে যাবে, আপনার কাছে যেটা থাকার কথা সেটা থাকবে, অন্যটা থাকবে না।
দর্শক : চলচ্চিত্রের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে মন্তাজ, মেটাফর, সিম্বল অ্যান্ড সিমেলি কি গুরুত্বপূর্ণ?
অমিতাভ : চলচ্চিত্রের ভাষায় মন্তাজ, মেটাফর, সিম্বল-একেকটা জিনিস একেক রকম। মন্তাজ একটা টার্ম। আমরা জানি, যেটা আইজেনস্টাইন ব্যবহার করেছেন। এবং এর অর্থ হচ্ছে এডিটিং, আর কিছু না। আইজেনস্টাইন মন্তাজে এডিটিংকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন। এটা নিয়ে কথা বলতে গেলে আগে বলতে হবে, মন্তাজের আগে আসলে কী ছিলো। গ্রিফিথ আসলে কীভাবে কাজ করেছেন। ওটা নিয়ে কথা না বললে ভালো বোঝা যাবে না। কেনো মন্তাজ গুরুত্বপূর্ণ? কারণ মন্তাজ শুধু এডিটিং নয়। চলচ্চিত্র হলো সোসিও পলিটিকাল ফেনোমেনা। সুতরাং চলচ্চিত্রের সঙ্গে পলিটিক্স ও সোসিওলজিকাল বিষয়গুলো নিয়ে যদি আমরা আলাপ না করি, তাহলে বিচ্ছিন্নভাবে মন্তাজ বা কোনো কিছু নিয়ে কথা বলা খুব কঠিন। এর উপস্থাপনের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা কঠিন। তবে এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে, কেনো আইজেনস্টাইন এটার ব্যবহার করেন? এই পুরা মন্তাজ তত্ত্বকে খারিজ করে দেয় তারকোভস্কি। কারণ তাদের কাছে মন্তাজের একটা ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। আমাদের জন্য ফিল্ম রিয়েলিস্টিক হিসেবে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সিম্বল আলাদাভাবে একটা টার্ম মাত্র। এ নিয়ে আলাদা করে কথা বলার কিছু নেই। চলচ্চিত্রের ভাষা এর ভাষাই; সিগনিফায়ার সিগনিফায়ারই। টাইমিঙ, সিগনিফায়িঙ, মেটাফরও অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো আলাদা টার্ম। এই মুহূর্তে বিশ্লেষণ করাটা আমার জন্য কঠিন। তবে চলচ্চিত্রের ভাষার জন্য এগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নিঝুম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : বিদেশি চলচ্চিত্রের আমদানি বা প্রদর্শনী দেশীয় চলচ্চিত্রের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে আপনি মনে করেন?
অমিতাভ : এখনকার সময়ে আপনি দেশ-বিদেশের সব সিনেমাই দেখবেন। এতে প্রভাবের কিছু নাই। আমদানি করি আর যাই করি, আপনি সারা পৃথিবীর ইমেজ দেখছেন; এখনকার বাস্তবতাই তাই। এটা তেমন অসুবিধার বলে আমার কাছে মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়, আমি সব সিনেমা দেখার অধিকার রাখি; সব ভাষার সিনেমা দেখার অধিকার রাখি।
মোহাম্মদ ফারহান রুশাদ নিয়ন, ইংরেজি বিভাগ : টিভি ড্রামা ও রুপালি পর্দার সিনেমার ধরনটা আলাদা করা যায় কীভাবে? আপনার প্রিয় ফ্রেম রেট কতো?
অমিতাভ : আমার প্রিয় কোনো ফ্রেম রেট নাই। ফ্রেম একটাই, ২৫ আর ২৪। এখানে আলাদা করে প্রিয় বলার কোনো কারণ নাই। বেসিকালি টিভি ড্রামা আর সিনেমার যে পার্থক্য, এটা এখনকার সময়ে এসে আলাদা করা একটু কঠিন। কারণ স্টুডিও সিস্টেমে টেলিভিশনে টেলি প্লে যেভাবে আগে নির্মিত হতো, এখন আর নির্মিত হয় না। আপনি যদি ‘টোয়েন্টি ফোর’, ‘ব্ল্যাক মিরর’-এর মতো টেলিভিশন সিরিজগুলো দেখেন, দেখবেন সিনেমায় যা যা প্রস্তুতি নেওয়া হয়, এখানেও ঠিক একইভাবে পরিকল্পনা করা হয়। ডেইলি সোপ ব্যতীত বা এই রকমের টেলিভিশন প্রোডাকশন, মাল্টি ক্যামেরা আলাদাভাবে উপস্থাপন করে। তবে টিভি সিরিজ বা ওয়েব সিরিজগুলোও এখন একইভাবে নির্মিত হয়।
টিভি ড্রামার আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য আছে, সেটা বেসিকালি মোর অন ডায়ালগ। এটা চরিত্রের ওপর নির্ভর করে; তাদের মধ্যে মিল রাখার জন্য। এটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা ফর্ম। আর সিনেমা হচ্ছে মোর ভিজ্যুয়াল। যাতে অবাচনিক যোগাযোগ বেশি থাকে। বেসিক পার্থক্য আমার কাছে এর বেশি কিছু মনে হয় না।
আনোয়ার হোসেন মানিক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : বর্তমান চলচ্চিত্রে প্রতিবাদ ও নির্মাণশৈলীর নতুনত্ব নিয়ে কিছু জানতে চাই।
অমিতাভ : অনেক কঠিন প্রশ্ন, একটু ভাবতে হবে। পরে বলছি।
জাকির হোসেন, দর্শন বিভাগ : একটি সিনেমার সঙ্গে কীভাবে দেশের বেশিরভাগ শ্রেণির মানুষকে সংযুক্ত করা যায়? কিংবা কীভাবে নানা অর্থনৈতিক শ্রেণিকে কাভার করা যায়?
অমিতাভ : আমি আগেই বলেছি। এটার উত্তরটা খুব পরিষ্কার। সিনেমা তো পলিটিকাল। আর যেকোনো শিল্প-মাধ্যমই আমার কাছে পলিটিকাল। সিনেমা তার অন্যতম। এটার মধ্যে প্রধান যে বিষয়টা আছে সেটা হলো প্রোডাকশন। অর্থনৈতিক প্রোডাকশন এবং পরিবেশন। এই পুরো প্রক্রিয়াটার মধ্যে, যেকোনো পুঁজিবাদী সমাজ এগুলো যেভাবে ঘটায়, সিনেমা কিন্তু এর বাইরে এখনো কিছু ধারণ করে না। এক্ষেত্রে অবশ্য থার্ড সিনেমা ভিন্ন। এই ফর্ম ব্যতীত অর্থনৈতিক দিক থেকে যে শ্রেণি সিনেমাটা বানায়, তারা মূলত সেই শ্রেণিরই গল্প বলে। এখানে অন্যান্য শ্রেণিকে কাভার করার কিছু নাই। শিল্প কখনো মানুষের হাতে টার্গেটেড না। এটা ভিন্ন ভিন্ন মানুষের অনুভূতি।
(চলবে)
amitabhcinema@icloud.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন