Magic Lanthon

               

কাওসার বকুল

প্রকাশিত ২২ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

বার্ডম্যান : নির্দিষ্ট ফরমুলায় ইনারিতুর টেস্টি স্যালাইন

কাওসার বকুল


 

তবু এই পৃথিবীর সব আলো একদিন নিভে গেলে পরে,

পৃথিবীর সব গল্প একদিন ফুরাবে যখন,

মানুষ র’বে না আর, র’বে শুধু মানুষের স্বপ্ন তখনঃ

সেই মুখ আর আমি র’বো সেই স্বপ্নের ভিতরে।

 

ভালোলাগা দিয়ে শুরু


মেক্সিকোর বিখ্যাত নির্মাতা আলজান্দ্রে গনজালেস ইনারিতু’র বার্ডম্যান অর (দ্য আনঅ্যাক্সপেক্টেড ভারচু অব ইগনোরেন্স) দেখার আগেই গণমাধ্যমে চোখ পড়ে চলচ্চিত্রটির নির্মাণ, মুক্তি ও অস্কারে মনোনয়ন থেকে শুরু করে পুরস্কার জেতার খবর। সেসব খবরের সঙ্গে চলচ্চিত্রটির পোস্টারও ছাপা হয়; তাতে সুপারহিরো বার্ডম্যান হিসেবে মাইকেল কিটন'’কে দেখা যায়। সবমিলিয়ে তাই আগে থেকেই বার্ডম্যান দেখার একটা উত্তেজনা ছিলো। সেই উত্তেজনা নিয়েই পুরস্কার প্রাপ্তির অনেক পরে বার্ডম্যান দেখতে বসা।


চলচ্চিত্রটি শুরুর প্রথম দৃশ্যেই (ওপেনিং ক্রেডিট সিকোয়েন্স) দেখা যায়, আকাশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের (উল্কাও হতে পারে) মতো কিছু একটা দ্রুত গতিতে নিচের দিকে নামছে। তারপরের দৃশ্যেই একজনকে মেঝে থেকে কোমর অবধি উচ্চতায় শূন্যের ওপর ভেসে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। সামনের দিকের জানালা খোলা আর পিছন থেকে ধরা হয়েছে ক্যামেরা। অদৃশ্য একজনকে গম্ভীর কণ্ঠে থেমে থেমে বলতে শোনা যায়, ‘কীভাবে এখানেই আমরা থেমে যেতে পারি? এই জায়গাটি ভয়ঙ্কর। খারাপ কিছুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আমরা মেনে নিতে পারি না।’ কথাগুলো শুনে দর্শক হিসেবে একধরনের শিহরণ যেমন অনুভব করি, চলচ্চিত্রটি দেখতে আরো আগ্রহী হয়ে উঠি।


এরপর বার্ডম্যান-এর দুই মিনিট ৩২ সেকেন্ডে দেখা যায়, ঘরের মধ্যে টেবিলের উপরে থাকা একটি ল্যাপটপে সিগন্যাল আসছে এবং শূন্যে ধ্যানমগ্ন অবস্থা থেকে নেমে হেঁটে এসে সিগন্যালে সাড়া দেন সেই ব্যক্তি; বোঝা যায়, তিনি মেয়ে স্যাম-এর সঙ্গে কথা বলছেন। কথা শেষে ল্যাপটপ গুছিয়ে রাখলে প্রথমবার চেহারা দেখা যায় শূন্যে বসে ধ্যান করা সেই ব্যক্তির। রিগ্যান থমসন (মাইকেল কিটন); ব্যাটম্যান এবং ব্যাটম্যান রিটার্নস-এ সুপারহিরো চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনিই।


পরের দৃশ্যেই মাইকে ঘোষণা আসে, মঞ্চে যাওয়ার সময় হয়েছে রিগ্যানের। তড়িঘড়ি করে জামা-প্যান্ট পরে রওনা হন তিনি। ঘর থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামেন; ক্যামেরা অনুসরণ করতে থাকে তাকে। মঞ্চে কয়েকজন বসে আছে। সেখানে তারা গল্পকার রেমন কারভারের ছোটোগল্প ‘হোয়াট উই টক অ্যাবাউট হোয়েন উই টক অ্যাবাউট লাভ’ অবলম্বনে মঞ্চ নাটকের রিহার্সেল করছিলেন। একপর্যায়ে হঠাৎ করেই রালফ নামে অভিনয়শিল্পীর মাথার উপর একটি লাইট ভেঙে পড়ে। তবে যে নাটকের রিহার্সেল ছিলো, তা বোঝা যায় দুর্ঘটনার পর এটা বন্ধ হলে।


বার্ডম্যান-এর প্রথম কয়েকটি দৃশ্যের মধ্যে দুটি টুইস্ট পেয়ে যায় দর্শক। যদিও পরে এর পরতে পরতে এ ধরনের টুইস্ট রয়েছে। বোঝা যায়, মঞ্চে দুর্ঘটনায় রালফের মাথায় কিছু ভেঙে পড়েনি, বরং রিগ্যান সেই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। এরপর ঘরে ফিরে হাতের ইশারায় রিগ্যান টেলিভিশন বন্ধ করে দেন। খানিকবাদে দেখা যায়, তিনি মাথার চুলও খুলে ফেলছেন; তার টাকমাথা দেখার পর আরেকবার মুগ্ধ হয়ে ভাবতে হয়, এতোক্ষণ তাহলে পরচুলা লাগানো ছিলো! অথচ দর্শক হিসেবে তা অনুমানও করা যায়নি। এ ধরনের ঘটনা দর্শককে বেশ আগ্রহী করে তোলে চলচ্চিত্রটি দেখতে।


শুরু করার আগে


২০১৮ খ্রিস্টাব্দে বসে যখন বার্ডম্যান (২০১৪) দেখছি, তখন চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর কেটে গেছে চারটি বছর। এই চার বছরে বহু দর্শক চলচ্চিত্রটি দেখার পর নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছে। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই ধরনের মন্তব্যই পাওয়া যায়।


একদল বলছে, অসাধারণ চলচ্চিত্র; তারা বার্ডম্যানকে ইনারিতুর মাস্টারপিস আখ্যা দিচ্ছে। আবার অন্যদল বলছে, ‘বোরিং’ চলচ্চিত্রটি দেখার কারণে সময় আর টাকা দুটোই পানিতে পড়েছে। ইনারিতুকে এক হাত দিতেও ছাড়েনি অনেকে। ঝাল ঝেড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাসও দিয়েছে কেউ কেউ। কিন্তু চলচ্চিত্রটি না দেখা পর্যন্ত তো আর সিদ্ধান্তে আসতে পারি না। তাছাড়া অস্কার পাওয়া চলচ্চিত্র বলে কথা! অস্কারের ৮৭তম আসরে নয়টি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়ে পাঁচটিতে পুরস্কার জেতা চাট্টিখানি কথা নয়। সেরা পরিচালক হিসেবে মেক্সিকোর দ্বিতীয় নির্মাতা হিসেবে অস্কার জিতেছেন ইনারিতু। সেই চলচ্চিত্র সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শুনে এর বাজেট ও বক্স অফিস সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করে। যদিও কোনো চলচ্চিত্রের মূল্যায়ন কোনোক্রমেই বাজেট ও ব্যবসার ওপর নির্ভর করে না।


তার পরেও আগ্রহের জায়গা থেকে ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখি, ১৬ দশমিক পাঁচ মিলিয়ন ডলারে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি-মার্চে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়। ২৭ আগস্ট ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ৭১তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন করা হয় বার্ডম্যান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। পরে ওই বছরের ১৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তির পর বিশ্বব্যাপী তা আয় করেছে একশো তিন দশমিক দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বক্স অফিস দেখে আরো জানতে ইচ্ছে করে মাইকেল কিটন অভিনীত ব্যাটম্যান (১৯৮৯), ব্যাটম্যান রিটার্নস (১৯৯২) এবং ব্যাটম্যান-এর সিক্যুয়াল ব্যাটম্যান ফরএভার (১৯৯৫)-এর নির্মাণ ব্যয় ও বক্স অফিস সম্পর্কে।



টিম বার্টনের পরিচালনায় ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নির্মিত ব্যাটম্যান বক্স অফিসে ঝড় তোলে। সেসময় আয় হয় চারশো ১১ দশমিক তিন মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যাটম্যান রিটার্নসও বক্স অফিসে ঝড় তোলে। তবে ব্যাটম্যান-এর তুলনায় সেটা কম; দুইশো ৬৬ দশমিক আট মিলিয়ন মার্কিন ডলার।


তিন বছর পর আবারও নির্মাণ করা হয় ব্যাটম্যান-এর সিক্যুয়াল-ব্যাটম্যান ফরএভার। এতে মাইকেল কিটনের পরিবর্তে ভ্যাল কিরমার’কে নেওয়া হয়। এবারে আর পরিচালক হিসেবেও থাকেননি টিম বার্টন; চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছেন তিনি। জোয়েল চুমাছের-এর পরিচালনায় একশো মিলিয়ন ডলারে নির্মিত ব্যাটম্যান ফরএভার তিনশো তিন দশমিক পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। সেই হিসেবে এতো বছর পর এসে নির্মিত বার্ডম্যান-এর এতো কম বাজেট দেখে খটকা লাগে। নির্মাণের পর পরই সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে এটি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড, বাফটাসহ ৩১টি পুরস্কার জেতে; সঙ্গে অস্কার তো আছেই।


স্বল্প বাজেটের বার্ডম্যান এতো এতো পুরস্কার জেতার কারণে সন্দেহ জাগে, কী আছে তাতে! অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরস্কার পাওয়া চলচ্চিত্রগুলোর নির্মাণ ব্যয় খুব বেশি হয় না। স্বল্প বিনিয়োগে অধিক মুনাফা লাভের আশায় অস্কারের মতো দামি পুরস্কারে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করেন অনেক নির্মাতা-প্রযোজক।


সেজন্য ইতিহাস, যুদ্ধ, জীবনীভিত্তিক ও ড্রামা-চলচ্চিত্র নির্মাণ করে কর্তাদের খুশি করার মানসে আধেয়তে টোপ হিসেবে রাখা হয় রাজনৈতিক কূটকৌশল, যুদ্ধাপরাধ, শ্বেতাঙ্গদের উচ্চ-আসন এবং সর্বোপরি বিশ্ব মোড়লের স্বার্থ। সেই সঙ্গে বার্ডম্যান-এর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও সন্দেহের আরেক কারণ। এ যাবৎ যেসব চলচ্চিত্র অস্কার জিতেছে এবং মনোনয়ন পেয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কয়েকটির অন্যতম বার্ডম্যান-এর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে অস্কারে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতা টুয়েলভ ইয়ারস অ্যা স্লেভও (২০১৩) একই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের। ফক্স সার্চলাইট পিকচারস, নিউ রেগেন্সি পিকচারস এবং ওয়ার্ল্ডভিউ এন্টারটেইনমেন্টের অর্থায়নে নির্মিত হয় বার্ডম্যান। বয়হুড, দ্য থিওরি অব এভরিথিং, সেলমা, দ্য ইমিটেশন গেইম, দ্য গ্রান্ড বুদাপেস্ট হোটেল, অ্যামেরিকান স্নাইপার ও হুইপলাশ-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সেরার আসন ছিনিয়ে নেয় বার্ডম্যান। সাধারণ দর্শকের কাছে চলচ্চিত্রটি যেরকমই লাগুক না কেনো, অস্কারের লোভে ইনারিতু প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ঠিক করা থেকে শুরু করে অভিনেতা বাছাই কিংবা সংলাপে টোপ ফেলেছেন কিনা তা বোঝার জন্য চলচ্চিত্রটির আধেয় বিশ্লেষণ করা জরুরি।


ইনারিতুর পুরস্কারপ্রীতি ও বার্ডম্যান


চলচ্চিত্রনির্মাতা আলজান্দ্রে গনজালেস ইনারিতুর জন্ম মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটির নারভারতে; ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট। বাড়িতে শিল্প-সাহিত্য চর্চা করলেও স্কুলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর ধরাবাঁধা নিয়ম তার ভালো লাগতো না। বার বার ফেল করতে করতে একপর্যায়ে তাকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বের করে দেয়। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইনারিতু হয়ে যান জাহাজের পেশাদার নাবিক। দুই বছরের মধ্যেই জাহাজে চড়ে দেখে ফেলেন আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।


পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে। কিন্তু নাবিক হয়ে জীবন পার করে দিতে হবে, সেটা আর মেনে নিতে পারেন না ইনারিতু; একপর্যায়ে ফিরে যান পড়ার টেবিলে। মেক্সিকো সিটির বেসরকারি ইবরোমেরিকানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যোগাযোগবিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন ‘রেডিওর’ উপস্থাপক হিসেবে। মাত্র ছয় বছরের মাথায় এফ এম রেডিওটির পরিচালক হয়ে যান ইনারিতু। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে এসে চালু করেন নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘জেড ফিল্মস’।

মূলত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপন নির্মাণ করা হতো জেড ফিল্মসের ব্যানারে। অবশ্য মেক্সিকোর চলচ্চিত্রের জন্য টুকটাক কয়েকটি সঙ্গীতের কাজও করেছেন ইনারিতু। কিন্তু তার মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় কাহিনিচিত্র নির্মাণের ভাবনা। তবে কাহিনিচিত্র নির্মাণের জন্য তখনো নিজে উপযুক্ত হয়ে গড়ে উঠতে পারেননি ভেবে পাড়ি জমান মার্কিন মুল্লুকে। চলচ্চিত্র নির্মাণের খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে কারিগরি দিক সম্পর্কে পড়াশোনা করে ফিরে আসেন মেক্সিকোতে। এবার মেক্সিকান সাহিত্যিক গুইল্লেরমো আরিআগার গল্প অবলম্বনে চিত্রনাট্য রচনা শেষে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র আমোরেস পেরোস।


নির্মাণের পর আমোরেস পেরোস নিয়ে কান চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেন ইনারিতু। ১৪ মে ২০০০ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই চলচ্চিত্রটির প্রথম প্রদর্শনী হয়; ক্রিটিক চয়েস অ্যাওয়ার্ড পায় আমোরেস পেরোস। ১৬ জুন ২০০০ খ্রিস্টাব্দে মেক্সিকোতে মুক্তির পর বেশ সাড়া পান ইনারিতু। সে বছর দেশটির সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার জেতে আমোরেস পেরোস। ওই বছর অস্কারে বিদেশি ভাষার সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়নসহ গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড পায় ইনারিতুর প্রথম চলচ্চিত্র।


এরপর ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে তার নির্মিত টোয়েন্টি ওয়ান গ্রামস ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পায়। এছাড়া বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পায় ৭৬তম অস্কারে। ৭৯তম অস্কারে সাতটি শাখায় মনোনয়ন পায় ইনারিতুর তৃতীয় চলচ্চিত্র বাবেল (২০০৬)। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালক বিভাগে মনোনয়নসহ গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার জেতে চলচ্চিত্রটি। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ইনারিতুর নির্মিত বিউটিফুলও অস্কারে মনোনয়ন পায় সেরা অভিনেতা ক্যাটাগরিতে। তাছাড়া কান চলচ্চিত্র উৎসবে আয়োজন করা হয় এর প্রথম প্রদর্শনী। সেখানে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জেতে বাবেল-এর বারডেম। মাত্র চারটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই ততোদিনে বেশ নামডাক হয়ে যায় ইনারিতুর। বিভিন্ন উৎসবে মনোনয়ন পেয়ে পুরস্কার জিতলেও চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার অস্কার পাওয়ার আক্ষেপ থেকেই যায়। বিউটিফুল নির্মাণের পর মেক্সিকো ছেড়ে হলিউডে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন ইনারিতু; এবার নির্মাণ করেন বার্ডম্যান



একসময়ের ব্যাপক জনপ্রিয় অভিনেতা রিগ্যান থমসনকে ঘিরে বার্ডম্যান-এর কাহিনি। বার্ডম্যান-এ ২০ বছর আগে সুপারহিরো চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন রিগ্যান। বর্তমানে বয়স বাড়লেও ক্যারিয়ার ধরে রাখতে মরিয়া তিনি। তাই নিজেকে সেরা অভিনেতা হিসেবে প্রমাণের জন্য নিজেরই পরিচালনায় মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন। কিন্তু নিজের মেয়ে থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র সমালোচকরা তাকে সেভাবে মেনে নিতে পারে না। এদিকে রিগ্যানও ২২ বছর আগে অভিনয় করা সুপারহিরো চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। বিভিন্ন সময় নানা বিষয়ে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, সেসব ব্যাপারে সেই সুপারহিরো চরিত্রের বার্ডম্যান তাকে পরামর্শ দিতে থাকে। বার্ডম্যান ও রিগ্যানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং নাটকের রিহার্সেলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় চলচ্চিত্রের কাহিনি।


বার্ডম্যান-এ থিয়েটারের মধ্যেই বেশিরভাগ দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাস্তব এবং মঞ্চ নাটকের রিহার্সেলের মধ্যকার পার্থক্যটা অনেক সময় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কোনটা অভিনয় আর কোনটা বাস্তবতা, সেটা বুঝতে দর্শক হিসেবে যেমন খেই হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে; খেই হারিয়ে ফেলেন রিগ্যানও। বাস্তবে কারো সঙ্গে কথা বলার সময়ও তিনি অভিনয়ের আশ্রয় নেন, আবার মঞ্চে অভিনয়ের সময় যেনো বাস্তবে ঢুকে পড়েন। কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য এক চুলও পিছপা হন না তিনি। সেজন্য প্রেমিকার ডাকে সাড়া যেমন দেন না, ক্লান্ত শরীর নিয়েও মেজাজ খারাপ থাকা অবস্থায় কেবল দর্শককে ফেরাবেন না বলে মঞ্চে হাজির হন। একপর্যায়ে সফলও হন; পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রধান সংবাদ ছাপা হয় তার সফলতা নিয়ে।


রিগ্যানকে সেরা অভিনেতা হওয়ার জন্য যেমন সংগ্রাম করতে হয়, তেমনই অস্কার জেতার জন্য কিন্তু ইনারিতুকেও কম সংগ্রাম করতে হয়নি। প্রথম চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে টানা চারটিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছে তার চলচ্চিত্র; কিন্তু শেষাবধি তা আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া ইনারিতু বরাবরই নিজের চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার আগে কোনো না কোনো উৎসবে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন; এতে করে তার পুরস্কারপ্রীতিও গোপন থাকে না। বার্ডম্যান-এর ক্ষেত্রে সেই ঘটনার ব্যতিক্রম ঘটেনি; যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি দেওয়ার আগে ‘ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এ চলচ্চিত্রটির প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। কিন্তু বার্ডম্যানকে কেনো সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার দেওয়া হলো, সেই রাজনীতিটা পরিষ্কারভাবে জানার জন্য কিছু বিষয়ে আলোচনা করা দরকার।


ইনারিতু জহুরি বটে!


বার্ডম্যান নির্মাণের জন্য যখন সব আলোচনা চূড়ান্ত, তখন থেকেই রিগ্যান থমসন চরিত্রে মাইকেল কিটনকে প্রথম পছন্দ নির্মাতা আলজান্দ্রে গনজালেস ইনারিতুর। এমনকি কিটন যদি চলচ্চিত্রটিতে অভিনয়ে রাজি না হতেন, তাহলে বিকল্প কাউকে নেওয়ার চিন্তা মাথাতেই ছিলো না ইনারিতুর। তিনি সবসময় ভেবেছেন, রিগ্যানের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কিটনের চেয়ে উপযুক্ত আর কেউ নেই।


চলচ্চিত্রটি দেখার পর মাইকেল কিটন সম্পর্কে জানলে যে কেউ ইনারিতুর সঙ্গে একমত হবেন। এমনকি মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় যে, এটা আসলে মাইকেল কিটনের বাস্তব জীবনকে ঘিরে নির্মিত চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রে রিগ্যান যেমন ২০ বছর আগে বার্ডম্যান চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়; বাস্তবেও ২২ বছর আগে সুপারহিরো ব্যাটম্যান চরিত্রে অভিনয় করেছেন কিটন। পরপর দু’টি সুপারহিরো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কারণে বহু মানুষ তাকে ব্যাটম্যান হিসেবেই চেনে; ব্যাটম্যান হয়ে গেছে তার ডাকনাম।


বার্ডম্যান-এ রিগ্যান যেমন মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগেন, কিটনও অনেকটা সেরকম। ১৯৮৯ এবং ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে সুপারহিরো ঘরানার দু’টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর সেটার সিক্যুয়ালে আর অভিনয় করেননি তিনি; বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন ব্যাটম্যান চরিত্রের বাইরে। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বিয়ের পর ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে তার বিচ্ছেদ হয়; বার্ডম্যান-এও স্ত্রীর সঙ্গে সেরকমই টানাপড়েন দেখা যায়। মজার ব্যাপার হলো, বার্ডম্যান-এ যেমন স্যাম নামে তার একজন মেয়ে রয়েছে, বাস্তবেও কিন্তু কিটনের ছেলের নাম স্যান। সেসব বিবেচনায় রিগ্যানের চরিত্রে মাইকেল কিটনের মতো এতো মিল আর কার ক্ষেত্রেইবা পাওয়া যেতো!


তাছাড়া মাইকেল কিটন কিন্তু যেনোতেনো অভিনেতা নন; দীর্ঘ অভিনয় জীবনে ৩১টি পুরস্কারে মনোনয়ন পেয়ে ২০টিতে পুরস্কার জিতেছেন। বার্ডম্যান-এর প্রযোজনা সংস্থার বড়ো বাজেটের বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ইনারিতু যেমন সব বিবেচনায় রিগ্যান হিসেবে কিটনকে পছন্দ করেছেন, কিটনও কিন্তু ইনারিতুর প্রস্তাব ফেরাতে পারেননি। অভিনয়ে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন।


কেবল অভিনয়শিল্পী ঠিক করেই ক্ষান্ত হননি ইনারিতু। চলচ্চিত্রের দৃশ্যধারণের প্রতিও বাড়তি নজর দিয়েছেন। সে কারণে ক্যামেরা সঞ্চালক ইমানুয়েল লুবাকির কাছে যান। তাকে বুঝিয়ে বলেন, সুপারহিরোর কাহিনি নিয়ে বার্ডম্যান নির্মাণ করা হবে। ক্যামেরা সঞ্চালক এ ধরনের প্রস্তাবে খানিকটা ভড়কে যান। তিনি ভেবেছিলেন, সুপারহিরো ঘরানার চলচ্চিত্র যেহেতু সেখানে নিশ্চয় অসংখ্য শট্ নিতে হবে। কখনো আকাশে তো কখনো পাতালের দৃশ্য ধারণ করতে হবে। কিন্তু ইনারিতু তাকে আশ্বস্ত করে চলচ্চিত্রটা যে ভিন্ন প্রকৃতির সেটা বুঝিয়ে বলেন। এও জানান, দর্শকের চোখের ওপর চাপ ফেলে কোনো কিছু দেখানোর চেয়ে অল্প কয়েকটি শটে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হবে।


বার্ডম্যান-এ নারী-পুরুষের উপস্থাপনেও টোপ ফেলেছেন ইনারিতু; যাদের প্রায় সবাই শ্বেতাঙ্গ। আর অস্কার কমিটিতে পুরুষের আধিপত্য তো জানা কথা। এমনকি অস্কারে পুরস্কার হিসেবে যে স্ট্যাচু বা প্রতিকৃতি দেওয়া হয়, সেটাও কিন্তু একজন পুরুষ যোদ্ধার। সেসব বিবেচনায় হয়তো বার্ডম্যান-এর উপস্থাপনও অনেকটাই পক্ষপাতদুষ্ট।


‘হোয়াট উই টক অ্যাবাউট হোয়েন উই টক অ্যাবাউট লাভ’-এর পরিচালক রিগ্যান নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য এতোটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, চলচ্চিত্রের ২০ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে লরা তাকে যৌনমিলনের প্রস্তাব দেওয়ার পরেও সে ব্যাপারে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। ফলে এ ধরনের পুরুষের কাছে নারী কতোটা নিরাপদ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যৌন-সম্পর্ক স্থাপনের পরিবর্তে সেখানকার কথোপকথন থেকে মঞ্চে অভিনয়ের রসদ সংগ্রহ করেন তিনি। চরিত্রবান হিসেবে উপস্থাপন করা হয় সেই নাটকের অভিনেতা মাইককেও। স্যাম তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ইঙ্গিত দিলেও তাকে কমবয়সি ভেবে কোনোরকম আগ্রহ দেখান না মাইক; অথচ বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। হলিউডের প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনের যৌনকেচ্ছা এখন আর কারো অজানা নয়; বহু অভিনেত্রীকে যৌন হয়রানি করেছেন তিনি। আরো অনেক প্রযোজক, পরিচালকের যৌন কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছে। #মিঠু ট্যাগে অভিনেত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছে; হলিউডে কাজ করতে গিয়ে নারীরা কতোটা যৌন হয়রানির শিকার তা উঠে এসেছে।


সেগুলোকে আড়াল করে পুরুষদের এবার আরো মহান করে তোলা হয়। লেসলি’র যখন প্রশংসা করেন রিগ্যান, সব কষ্ট দূর হয়ে যায় তার। তার মানে পুরুষ যখন তার মূল্যায়ন করে, স্বীকৃতি দেয়, তখন নারীর জীবন সার্থক হয়ে ওঠে। অন্যভাবে বললে, পুরুষরা মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত নারীদের দাম থাকে না। তেমনটাই মনে করেন লরা; রিগ্যান গত দু’বছরে তার প্রশংসা না করার কারণে দুঃখ-কষ্টে মুষড়ে পড়েন। দু’চোখের পানি আটকে রাখতে পারেন না; আক্ষেপ করে লেসলির কাছে বলেনও সেই কথা। এবার রিগ্যানের করা প্রশংসাবাক্য হুবহু লরাকে শোনান লেসলি। কিন্তু তাতে মন না ভরলেও অনেকটাই তৃপ্তি পান লরা।

লেসলি কিংবা লরার মতো বিষয় লক্ষ করা যায় স্যামের ক্ষেত্রেও। লেসলি যে প্রতিভাধর, সেটার স্বীকৃতি যেমন রিগ্যান দেন, তেমনই স্যামের মধ্যে তারকা হওয়ার লক্ষণ প্রথমবারের মতো দেখতে পান মাইক। অথচ নিজের প্রেমিকাকে বিনা কারণে ছেড়ে গেছেন তিনি; স্ত্রী সিলভিয়াকে দেখভাল না করে লরার সঙ্গে লিভ টুগেদার করছেন রিগ্যান। সেসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই ইনারিতুর।


সম্পর্কের ফ্রেমবন্দি উপস্থাপন


প্রায় আটশো মানুষের সামনে মঞ্চ নাটকের রিহার্সেল চলছে। স্বপ্নদৃশ্যে অভিনয় করছে লেসলি ও মাইক শাইনার। বলে রাখা ভালো, কিছুদিন আগে তারা লিভ টুগেদার করলেও বর্তমানে যে যার মতো আলাদা থাকেন। রিগ্যানের পরিচালনায় নাটকটিতে অভিনয়ের জন্য লেসলিই কাজ পাইয়ে দেন মাইককে। কাজের সুবাদে একসঙ্গে থাকলেও নতুন করে তাদের মধ্যে আর সম্পর্কের উন্নতি ঘটেনি।


অথচ আটশো মানুষের সামনে মঞ্চে যখন চাদরে ঢাকা অবস্থায় তাদের কথোপকথন চলে, সেখানে লেসলির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা পোষণ করেন মাইক; এমনকি এজন্য তাকে জোরও করেন। এতে করে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যান লেসলি। কিন্তু মঞ্চের বাইরে এসে যখন মাইক তাকে বলেন, দৃশ্যটাকে প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন; সত্যিকারার্থে তিনি লেসলির সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতে চান না। একে তো আটশো মানুষের সামনে আত্মসম্মানে আঘাত দিয়েছেন, তার ওপর পছন্দের সেই মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের কথা শোনার পর একেবারে মুষড়ে পড়েন লেসলি। হন্তদন্ত হয়ে ফিরে যান নিজের ঘরে।


লেসলিকে মনঃক্ষুণ্ন অবস্থায় দেখে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন লরা। পুরুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত এই দুই নারী একপর্যায়ে একে অন্যকে চুমু খেতে থাকে। মঞ্চে মাইকের আচরণের ব্যাপারে কোনোরকম প্রশ্ন না তুলে রিগ্যানের কাছে অবহেলিত লরা এবং সেই মাইকের কাছে প্রত্যাখ্যাত লেসলির মধ্যে যে সমকামিতা দেখানো হয়, সেই সম্পর্কের পিছনে যেমন যুক্তি দেখানো যায়; এ রকম উপস্থাপনের পিছনে ইনারিতুর কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা সেই সন্দেহও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


বিষয়টি একটু ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য সমকামিতা ইস্যুতে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের মনোভাবের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ৯ মে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সম্প্রচার মাধ্যম ‘এ বি সি’ টেলিভিশনের ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’ অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে যান তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেখানে তিনি সমকামিদের বিয়ের পক্ষে মত দেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট সমকামিদের ব্যাপারে খোলাখুলিভাবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেননি। অন্যদিকে ওবামার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান দলের মিট রমনি সমকামিদের বিয়ের বিপক্ষে অবস্থান নেন। ফলে সমকামি ইস্যুটা ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ৫৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে ভোটের ব্যবধানও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক জরিপে দেখা যায়, ৩৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ওবামার মতের পক্ষে এবং ২৭ শতাংশ বিপক্ষে মতামত দিয়েছে। ২৩ শতাংশ নাগরিক মনে করে, সমকামিদেরও সুশীল সমাজ গড়তে অংশ দেওয়া উচিত।


যদিও ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বরই সমকামিদের পক্ষে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে ওবামা প্রশাসন। জেনেভায় কূটনীতিকদের সামনে দেওয়া এক বক্তৃতায় তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঘোষণা করেন, সমকামিদের অধিকারও মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। মার্কিন উন্নয়ন সহায়তা দেওয়া থেকে রাজনৈতিক আশ্রয় বিবেচনার ক্ষেত্রেও সমকামিদের অধিকারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। হোয়াইট হাউসের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একটা দেশকে যখন বৈদেশিক সহায়তা দেওয়া হবে কিংবা সে দেশের কারো রাজনৈতিক আশ্রয়ের কথা বিবেচনা করা হবে, তার আগে মার্কিন সংস্থাগুলো সেই দেশের সমকামি নাগরিকদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করে, সেটা খতিয়ে দেখবে।


বলে রাখা ভালো, ওবামা প্রশাসন কেবল এ ধরনের ঘোষণা দিয়েই থেমে যায়নি; সমকামি বিয়ের অনুমোদন দিয়ে আইন প্রণয়ন করেছে। এছাড়া ২৩ মে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে সমকামিদের স্কাউটে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে যে নিষেধাজ্ঞা ছিলো তাও তুলে নেওয়া হয়। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি থেকেই স্কাউটে সমকামিরা যোগ দিতে পারবে বলে ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়।


২০১১ খ্রিস্টাব্দে যে দেশের আট দশমিক এক মিলিয়ন নাগরিক লিভ টুগেদার করে এবং পাঁচ লাখ ১৪ হাজার সাতশো ৩৫ জন সমকামি, সেখানে ঝুঁকি জেনেও ভোটের আশায় তাদের পক্ষ নিতেই পারেন ওবামা। রাজনীতির অংশ হিসেবেই নিজেদের সমর্থন করা বার্ডম্যানকে সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে অস্কার দেওয়াটাই ‘যৌক্তিক’। কারণ, মার্কিন রাজনীতিতে যখন বড়ো কোনো ধরনের সঙ্কট, বিরোধ, উত্তেজনা কিংবা সমর্থনের প্রয়োজন পড়ে, সেটার প্রভাব যৌগিক শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্রের ওপরও পড়ে। তাছাড়া ক্ষমতাসীন সরকারের স্বার্থ দেখাটা অস্কার কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তাই বার্ডম্যানকে অস্কার দেওয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন ওবামা প্রশাসনেরই সমর্থন করা হয়। আর ইনারিতু তো কেবল সমকামিতাই দেখাননি, লিভ টুগেদার, বহুবিবাহও দেখিয়েছেন। সেই দিক বিবেচনায় অস্কারের যোগ্য দাবিদার তিনি।


এ কেমন মানবিকতা!


১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে বিমান হামলায় দুই হাজার নয়শো ৯৭ জন নিহত এবং ছয় হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়; ধ্বংস হয়ে যায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবকাঠামো ও সম্পদ। হামলার ঘটনায় নড়েচড়ে বসে মার্কিন প্রশাসন। দায় গিয়ে পড়ে আল কায়েদার ওপর; আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন হয়ে পড়েন টার্গেট। মাঝখানে বেশ কয়েক বছর কেটে গেলেও কোনোভাবেই ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে পাচ্ছিলো না মার্কিন গোয়েন্দারা।


পরে ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ২ মে দিবাগত রাতে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন কমান্ডোদের চালানো ‘অপারেশন জেরোনিমো’য় (হামলায়) ওসামা বিন লাদেন নিহত হন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিজেই হোয়াইট হাউসে সেই ঘোষণা দেন। লাদেনকে হত্যার খবর শুনে হোয়াইট হাউসের বাইরে হাজারে হাজারে মানুষ জমায়েত হয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে; ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন ওবামা। কিন্তু লাদেনকে হত্যার মধ্য দিয়েই সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই শেষ হয়ে যায় না। অন্যভাবে বললে, এই লড়াই একেবারে শেষ করে দিলে চলে না যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্রের। সে কারণেই হয়তো মার্কিন গণমাধ্যমে উঠে আসতে থাকে, লাদেন পরবর্তী সময়ে সংগঠনটির নতুন নেতৃত্বের কথা। এভাবেই খুঁড়ে খুঁড়ে শত্রুর খোঁজ চালিয়ে যায় ‘মানবিক’ যুক্তরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে আলোচনায় আসতে থাকে নতুন শত্রু ইসলামিক স্টেট (আই এস)।


এবার একটু বার্ডম্যান-এর দিকে আলোচনাটা ফেরানো যাক। ‘হোয়াট উই টক অ্যাবাউট হোয়েন উই টক অ্যাবাউট লাভ’-এর প্রথম রিহার্সেল সেদিন। একটা টেবিলের চারপাশে বসে ভালোবাসা কী সে সম্পর্কে আলোচনা করছে রালফ, লরা, লেসলি ও রিগ্যান। লেসলি বলেন, আমি ভালোবাসি। কিন্তু রালফের ভাষায়, ‘সেটা ভালোবাসা নয়।’ তার মতে, ভালোবাসা হতে হবে খাঁটি। সেই খাঁটি ভালোবাসা কেমন হবে সেটারও বর্ণনা দেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আমি যে ধরনের ভালোবাসার কথা বলছি সেটা হলো, তুমি মানুষ মারার চেষ্টা করো না।’


এর পাল্টা যুক্তি দেখান লেসলি; তার মতে, ‘কে কী বললো তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। সে এটার জন্য মারা যেতেও প্রস্তুত। সে নিজের মুখের ওপর গুলি চালিয়ে দিয়েছে।’ লেসলির এ ধরনের কথা শুনে বিস্মিত রালফ বলে ওঠেন, ‘গাধা নাকি! এ ধরনের লোকেরা বিপজ্জনক।’



এতোক্ষণে নীরবতা ভেঙে লরাও বলে ওঠেন, ‘কীভাবে তিনি সাহস করে নিজের মুখে গুলি চালিয়ে দিতে পারলেন!’ সেই উত্তরও পাওয়া যায় রালফের কাছে। তার ভাষায়, ‘ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে কিংবা গাড়িতে করে এসে তারা গুলি চালানো শুরু করছে। তারা একেবারেই ক্ষ্যাপাটে, যেকোনো কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে।’ এরপর বীভৎসভাবে তাদের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিতে থাকলে, তা সহ্য করতে না পেরে রালফের মাথায় আঘাত হানেন রিগ্যান। বোঝার বাকি থাকে না, বীভৎস এই বর্ণনা সহ্য করা কতোটা কঠিন হয়ে পড়েছিলো রিগ্যানের জন্য।


বার্ডম্যান-এর এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে সমর্থন করে। কিন্তু ইনারিতু একবারও প্রশ্ন তুললেন না, সেই মানুষগুলো কেনো আত্মঘাতী হয়, কারা তাদের বিপজ্জনক হতে বাধ্য করে, কেনো মানুষকে ‘জঙ্গি’ হতে হয়। অথচ তার বদলে যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন শত্রুর খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে, সেটাকে যুক্তি দিয়ে সমর্থন করেন নির্মাতা।


মানবিকতার ফেরিওয়ালা যুক্তরাষ্ট্র নিপীড়নের শিকার কোনো গোষ্ঠীকে বাঁচানোর জন্য বরাবরই সেখানে হামলা চালায়। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের সেনাদের বিরুদ্ধে সেখানকার বেসামরিক নাগরিকদের ওপর রাসায়নিক গ্যাস হামলা চালিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল সেখানে মিত্রদের নিয়ে একশো পাঁচটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ সেখানকার নাগরিকদের বাঁচানোর মতো কার্যত কোনো পদক্ষেপই তারা নেয়নি। এর আগে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দেও সিরিয়ার খান শাইখৌনে রাসায়নিক হামলার জেরে ৫৯টি টমাহুক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র; তাতে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকও নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রের মানবিকতা আর ইনারিতুর উপস্থাপনে আলাদা কোনোকিছু তো দেখি না। এমনকি নাটকের রিহার্সেলের অন্য দিনগুলোতেও উঠে আসে একই ধরনের প্রসঙ্গ। তাছাড়া এক ঘণ্টা ২৮ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে যখন বার্ডম্যান সশরীরে হাজির হন, সেসময়ও প্রসঙ্গটি আরেকবার তুলে ‘জঙ্গিদের’ সঙ্গে ঠিক কী আচরণ করতে হবে, সেই পথও দৃশ্যত বাতলে দেন ইনারিতু।


আমাদের বাপু হীরের টুকরো ছেলে চাই!


২০ বছর আগে সুপারহিরো চরিত্রে অভিনয় করেছেন রিগ্যান থমসন। অর্থ, খ্যাতি সবই পেয়েছেন বার্ডম্যান চরিত্রে অভিনয় করে; তবে তিনি যে ভালো অভিনেতা হওয়ার বাসনা মনের মধ্যে লালন করেন, তা হতে পারেননি। বয়সের ভারে আর সুপারহিরো চরিত্রেও অভিনয় করতে পারছেন না। না পারছেন বার্ডম্যান চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসতে, আবার বড়ো অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে।


এক্ষেত্রে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার শারীরিক অবস্থা ও বয়স। সে কথা নিজেও স্বীকার করেন রিগ্যান; নিজেকে লিউকোমিয়া রোগীর সঙ্গে তুলনাও করেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। তার পরেও হাল ছাড়েন না; নিজেকে সেরা হিসেবে প্রমাণের জন্য নাটক পরিচালনায় হাত দেন।

প্রথমবারের মতো নাটকটির রিহার্সেল শুরু হবে, এর আগে নিজের কক্ষে বসে বিষয়টি নিয়ে গভীর চিন্তায় তিনি ডুবে আছেন। এ সময় তার চিন্তার মধ্যেই অদৃশ্যভাবে হাজির হয় বার্ডম্যান। সেই বার্ডম্যান রিগ্যানকে বলতে থাকেন, ‘কীভাবে এখানেই আমরা থেমে যেতে পারি? এই জায়গাটি ভয়ঙ্কর। খারাপ কিছুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আমরা মেনে নিতে পারি না।’ অবশ্য চলচ্চিত্রজুড়েই মোট সাতবার বার্ডম্যান হাজির হয়ে রিগ্যানের সঙ্গে যুক্তিতর্ক করে, পরামর্শ দেয়। যখনই রিগ্যানের কোনো টানাপড়েন তৈরি হয়, ঠিক সেই সময়েই বার্ডম্যানের ‘উপস্থিতি’ লক্ষ করা যায়।


মঞ্চে দুর্ঘটনায় রালফের মাথায় লাইট ভেঙে পড়ার পর রিহার্সেল স্থগিত করে দেন রিগ্যান। ঘরে ফিরে আসার পর দ্বিতীয়বারের মতো কথোপকথন হয় বার্ডম্যানের সঙ্গে। এরপর স্ত্রী সিলভিয়া যখন তার কাছে এসে আলোচনা শেষে চলে যান, রিগ্যানের বিরহের সেই মুহূর্তে তৃতীয়বারের মতো বার্ডম্যান হাজির হন। মাইকের দেওয়া তথ্যানুসারে, পত্রিকার ভিতরের পাতায় রিগ্যানকে নিয়ে সংবাদ ছাপা হলে রাগে ফুঁসতে থাকেন তিনি; ঠিক সেই সময় চতুর্থবারের মতো শোনা যায় বার্ডম্যানের কণ্ঠস্বর। খানিকবাদে মাইকের সঙ্গে হাতাহাতি শেষে ফিরতেই বার্ডম্যানও ফিরে আসে।


আসলে বার্ডম্যান রিগ্যানের অচেতন মনের কল্পনারই বহিঃপ্রকাশ। তার ভিতরে যে আশা, স্বপ্ন ও চাওয়ার বসতি, এবং সেগুলো পূরণে যে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে; সেই বিষয়গুলোই তাকে বার্ডম্যান হয়ে তাড়া করে ফেরে। প্রত্যেক মানুষেরই আসলে নিজের সঙ্গে কথা বলার, যুক্তিতর্কের ক্ষমতা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয় নিয়ে ব্যক্তি নিজের সঙ্গে এই যুক্তিতর্ক চালিয়ে যায়। এক্ষেত্রে কখনো চুপচাপ থেকে আবার কখনো সশব্দে একাকী আলোচনাও হতে পারে; যার নাম অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ।


কিন্তু বিপত্তি ঘটে বার্ডম্যান দৃশ্যত হাজির হলে। চলচ্চিত্র সমালোচক তাবিথা যখন রিগ্যানের নাটক না দেখেই শিল্প-বিবর্জিত আখ্যা দিয়ে চলে যান, তার পরদিন বাস্তবে হাজির হন বার্ডম্যান। এর ব্যাখ্যা মেলে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কাছে; তার মতানুসারে, মানুষ সবসময় সুখ চায়। যে ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে সে যায়; সেগুলোর মধ্য থেকে রাগ, ক্ষোভের অনেক কিছুই ভুলে যেতে চায়। অবদমিত সেই ক্ষোভের অনেককিছুই থেকে যায় ব্যক্তির অচেতনে। পরে সেগুলো স্বপ্নের মাধ্যমে কিংবা অন্যভাবে ফিরে আসে। যেমনটা ঘটে রিগ্যানের ক্ষেত্রেও; জাগ্রত অবস্থায় বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তার মধ্যেই অচেতনভাবেই চলে আসে বার্ডম্যান।


ইনারিতু হয়তো চেয়েছেন, মানুষের অবদমিত ইচ্ছেকে সব ধরনের অবদমন থেকে মুক্ত করতে। সেজন্য রিগ্যানের অবদমিত বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন বার্ডম্যানের মাধ্যমে। ঘটনার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক ‘পক্ষিমানব’কে বাস্তবে হাজির করে দ্বন্দ্ব তৈরি করে দিয়েছেন মানুষের চিন্তায়। কিন্তু সমস্যাটা দেখা দেয় বার্ডম্যানকে বাস্তবে হাজির করার ঘটনায়; বার্ডম্যানের যুক্তি মেনে নিয়ে রিগ্যানও পাখির মতো শূন্যে উড়তে পারার মধ্য দিয়ে। অন্তর্ব্যক্তিক যোগাযোগ কিংবা অচেতন মনের ব্যাখ্যা তৈরি করতে ইনারিতু যেনো ফ্রয়েডের চেয়েও এক পা এগিয়ে। এখানেই মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন নির্মাতা।


এই বার্ডম্যানকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। বার বার হোঁচট খাওয়া রিগ্যানের স্বাধীনতা হিসেবে দেখা যেতে পারে পক্ষিমানবকে। যিনি মেয়ে, সহ-অভিনেতা মাইক শাইনার, স্ত্রী সিলভিয়া, মেয়ে স্যাম, প্রেমিকা লরা কিংবা সমালোচক তাবিথার কাছ থেকে পালিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চান। তাদের বিরুদ্ধে রিগ্যানের মনে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, সেই অবদমিত ইচ্ছেগুলো অচেতনভাবেই তাকে পালিয়ে বার্ডম্যান হয়ে বাঁচারই পরামর্শ দেয়। কিন্তু স্বাধীনভাবে বাঁচার পথও যে খুব একটা সহজ নয়; সেটাও দেখিয়েছেন ইনারিতু।


কারো স্বাধীনতা হরণের জন্য যে অপশক্তি ওত পেতে বসে থাকে; সেটা ইনারিতু দেখিয়েছেন বার্ডম্যান সশরীরে হাজিরের দৃশ্যে। রিগ্যান যখন বার্ডম্যান হতে রাজি হন, ঠিক সেই সময় হুট করেই আত্মঘাতী গাড়িবোমা বিস্ফোরণ, বিমান হামলা এবং সেটা ঠেকানোর চেষ্টা লক্ষ করা যায়। যে ভবনের নিচ দিয়ে বার্ডম্যান আর রিগ্যান হেঁটে যাচ্ছিলেন, সেই ভবনের ছাদে বসে থেকে নিচের দিকে হামলে পড়ার চেষ্টা করে বৃহদাকার কাক। কিন্তু অপশক্তিকে নস্যাৎ করে, কীভাবে নিজের স্বাধীনতা রক্ষা করা যায়, সেই পন্থাও শিখিয়ে দেন নির্মাতা। বৃহদাকার সেই কালো কাক হামলে পড়ার আগেই পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে ধ্বংস করে দেন। সেই সঙ্গে বার্ডম্যানকে বলতে শোনা যায়, ‘তারা রক্ত ভালোবাসে, তারা অ্যাকশন ভালোবাসে। তারা তাত্ত্বিক ফালতু কচকচানি পছন্দ করে না।’ আপাত বিষয়গুলো সুপারহিরো ঘরানার মনে হলেও, এর মধ্য দিয়ে কিন্তু যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্রেরই সমর্থন করেছেন ইনারিতু। কর্তাদের সুরে সুর মিলিয়ে তিনিও বোঝাতে চেয়েছেন, কেবল নিজে স্বাধীনতা চাইলেই হবে না, স্বাধীনভাবে বাঁচতে গেলে ‘দুষ্টদের’ দমনের বিকল্প নেই। সেটা করতে পারলেই আসে কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।


কিন্তু রিগ্যানকে স্বাধীন করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল সমর্থনই করেননি, একেবারে মাথায় তুলে নেচেছেন ইনারিতু। খটকা লাগার কোনো কারণ নেই; একটু ব্যাখ্যা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।


যুগ যুগ ধরে বাবা-মা, দাদা-দাদিরা যেমন হীরার টুকরা ছেলে চেয়ে আসছে, সমাজতাত্ত্বিকরা বলে আসছে ‘কোয়ালিটি পিপল প্রোডাক্ট’-এর কথা। এই দুইয়ের মধ্যে আসলে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। কারণ,


কোনও সমাজব্যবস্থা বা তন্ত্র, তা সে ধনতন্ত্র গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র রাজতন্ত্র মিলিটারিতন্ত্র যে তন্ত্রই হোক, মানুষের অস্তিত্ব ও বিকাশের পক্ষে অনুকূল কি না; তার এক এবং একমাত্র মাপকাঠি হল, ব্যবস্থাটি হীরের টুকরো প্রজা সৃষ্টি করতে পারে কি না। যে-ব্যবস্থা কৃষি শিল্প সুরক্ষা প্রভৃতি সমস্ত ক্ষেত্রেই সফল, কিন্তু হীরের টুকরো প্রজা সৃষ্টি করতে অপারগ; সেটি একটি অযোগ্য সমাজব্যবস্থা। বিপরীতে যে রাষ্ট্র ওইরূপ গুণসম্পন্ন প্রজা সৃষ্টিতে সক্ষম, অন্য ক্ষেত্রে সে ব্যর্র্থ হলেও সেই ব্যবস্থাটিকেই আদর্শ ব্যবস্থা বলে বুঝতে হবে। ... একটি সমাজব্যবস্থা, আপনি তাকে রাষ্ট্র বা সরকার যাই বলুন, সেটি সেই সমাজের পক্ষে শুভ যোগ্য উপযুক্ত অনুকূল যথার্থ কিনা, সেটা বিচার করে দেখার এই একমাত্র মাপকাঠি। কেবলমাত্র এর সাহায্যেই একটি সরকার ঠিক না বেঠিক তা নির্ণয় করা যায়, সরকার চেনা যায়। দেখতে হয়, সে হীরের টুকরো প্রজাসৃষ্টিতে কতখানি সফল।


সেই দিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে সফল হিসেবে তুলে ধরেন ইনারিতু; সেখানকার প্রজা হতে পারে বার্ডম্যান। অন্যভাবে বললে, বার্ডম্যান কিংবা হীরের টুকরা সৃষ্টি করতে পারে সেই রাষ্ট্র। কারণ কোনো রাষ্ট্র হীরের টুকরো ছেলে তৈরি করতে পারলে, তার সেই ছেলেরাই সব করে ফেলে। এখানকার নাগরিক রিগ্যানও কেবল স্বাধীনই হন না; সেরা অভিনেতা হওয়ার যে অধ্যবসায় চালিয়ে যান, তাতে সফলও হন। স্বাধীনতাকে পিছনে ফেলে আরো অনেক উচ্চতায় উঠে যান। সেটা বোঝাতেই হয়তো বার্ডম্যানের সপ্তমবারের আগমণে তাকে তেমন একটা গা করেন না রিগ্যান। বাথরুমে বার্ডম্যানকে রেখে বিদায় জানিয়ে অনেকটা আয়েশি ভঙ্গিতে শূন্যে উড়ার প্রস্তুতি নেন।


রিগ্যান কেবল নিজেই স্বাধীন হন না; তার মেয়ে স্যামও সেই পথে হাঁটেন। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে এক ঘণ্টা ৫২ মিনিট আট সেকেন্ডে দেখা যায়, হাসপাতালে রিগ্যান যে ঘরটিতে ছিলেন সেখানে তাকে না পেয়ে স্যাম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন; জানালা খোলা দেখে ভয় পেয়ে যান। কিন্তু জানালা দিয়ে উপরে তাকানোর পর স্যামের অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে বাকি থাকে না, তার বাবা আকাশে উড়ছেন; এ সময় রিগ্যানকে দেখা না গেলেও তার হাসির শব্দ ভেসে আসতে থাকে। স্যামের এ ধরনের ‘কল্পনার’ মধ্য দিয়ে ‘হীরের টুকরো প্রজা’ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলমান দেখা যায়। ইনারিতুর এ ধরনের উপস্থাপন কি তাহলে কর্তাদের খুশি করার মানসে? 

  

হিসাব মেলানোর পালা


মালিকের স্বার্থরক্ষার জন্যই যে অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচারস আর্ট অ্যান্ড সায়েন্সস-এর যাত্রা শুরু হয়েছিলো, এই সময়ে এসে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং তাদের স্বার্থরক্ষা অর্থাৎ চাহিদা মাফিক আধেয় নির্মাণ করে সমর্থন জানালে পাওয়া যায় বাহবা, পুরস্কার। অন্যথায় বাহবা তো মেলেই না, জুটতে পারে তিরস্কার। যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্রও অবশ্য সবসময় সমর্থন পছন্দ করে। এটা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। যারা পুরস্কার দেয়, তারা সবাই এ কাজই করে।


ইনারিতু সেই চালটা ভালো করেই জানেন। সে কারণে বার্ডম্যান-এ পুরুষের প্রাধান্য দেখা যায়, মহান করে তোলা হয় পুরুষদের; অভিনয়শিল্পী হিসেবে বেছে নেওয়া হয় শ্বেতাঙ্গদের। সংলাপে থাকে সন্ত্রাসবাদ আর আত্মঘাতী হামলার প্রসঙ্গ, মানবতাবাদী যুক্তরাষ্ট্রের আদলে আওড়ানো হয় বুলি। ফলে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে আধেয় নির্মাণ, অস্কার পাওয়ার সব শর্তই পূরণ করেন ইনারিতু। অন্যদিকে অস্কার কর্তৃপক্ষও বরাবরই সেই টোপ গিলে আসছে; ইনারিতুর টোপও পছন্দ হয়ে যায় তাদের। তারা যেমন সমর্থন চান, ইনারিতুও সমর্থন দেন।


বার্ডম্যান-এর টাইটেল কার্ডে যেমনটা লেখা ওঠে, ‘জীবনে আপনি যা হতে চেয়েছেন, তা হতে পেরেছেন কি? আমি পেরেছি।’ আসলেই ইনারিতু পেরেছেন। আলোচনার শেষ প্রান্তে এসে এটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, তিনি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে দামি পুরস্কার অস্কার পেতে চেয়েছিলেন। সেটা তিনি পেয়েছেন; আর তার জন্য যা যা করা দরকার সেটাও করেছেন।


তবে এতোকিছু করেও ইনারিতু কিন্তু কাঠামো ভাঙতে পারলেন না। রাষ্ট্রের ভিতরে থেকে তিনি আসলে সে চেষ্টাটা করতেই পারেননি; হয়তো সচেতনভাবেই সেটা করেননি। চাইলে প্রতিভাধর ইনারিতু কিন্তু লুই বুনুয়েলের মতো ফ্যান্টম অব লিবার্টি করে অন্য কাতারে নিজের স্থান করে নিতে পারতেন। চলচ্চিত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নড়িয়ে দিতে পারতেন রাষ্ট্রের ভিত। আজকের দিনে যে সেরকম নির্মাতার বড়োই অভাব!


লেখক : কাওসার বকুল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠ-এ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

bokulmcj71@gmail.com

 

তথ্যসূত্র


১. কবিতার লাইন কয়টি কবি জীবনানন্দ দাশের ‘স্বপ্ন’ কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে।

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Birdman_(film)#Rehearsal_and_filming; retrieved on: 10.04.2018

৩. http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2012-05-10/news/256696; retrieved on: 13.04.2018

৪. http://www.banglanews24.com/international/news/bd/198594.details; retrieved on: 08.04.2018

৫. https://kalerkantho.com/online/world/2018/04/14/625230; retrieved on: 15.04.2018

৬. https://www.jagonews24.com/international/news/251167; retrieved on: 15.04.2018

৭. খান, কলিম (২০০০ : ১৭); ‘হিরোর হাইটটাই প্রবলেম ১’; ফ্রম এন্লাইটেন্মেন্ট টু ইমোশনাল বন্ডেজ : জ্যোতি থেকে মমতায়; হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, কলকাতা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন