নাজমা পারভীন
প্রকাশিত ১১ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
রঙ রসিয়া
শিল্প আর নৈতিকতা বিচারে রবি বর্মা পাঠ
নাজমা পারভীন

শিল্পীর শিল্পসত্তা ও শিল্পকলা
প্রত্যেক মানুষ দৃশ্য-অদৃশ্য কিছু উপাদানের সমন্বয়ে সৃষ্টি। যদিও দৃশ্যত সব মানুষ দেখতে প্রায় একই রকম। কিন্তু অদৃশ্য যেটুকু তাতেই মানুষের পার্থক্য। আর এই অদৃশ্যের মধ্যেই থাকে ব্যক্তিত্ব। মহাভারতে যাকে বলা হয় তিন গুণ-তম, রজো, সত্ত্ব। তম হলো অন্ধকারাচ্ছন্ন আত্মা; আর সত্ত্ব হলো জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ, নানা পরিস্থিতিতে বিবেক ও ধর্মজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে জীবন পরিচালিত করা। রজো হলো এই দুইয়ের মাঝামাঝি একটি গুণ, যাদের জ্ঞান আছে কিন্তু অহংকারাচ্ছন্ন মন। শিল্পীদের সত্ত্ব গুণের অধিকারী হতে হয়। কেননা, সাধারণ মানুষেরা তম কিংবা রজো গুণের অধিকারী হয়। শিল্পীরা যেহেতু আগে মানুষ তারপর শিল্পী; তাই সাধনার দ্বারা তাদের লাভ করতে হয় সত্ত্ব গুণ। যা তাকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে। চিন্তাধারা, কাজ-কর্ম, এমনকি কেউ বিপদে পড়লেও অনেকের আগে শিল্পীরা সাধারণত এগিয়ে আসে, ব্যথিত হয়। এটিই শিল্পীর শিল্পসত্তা। শিল্পী মানে কেবলই ছবি আঁকা, গান গাওয়া, নাচ করা নয়; বড়ো বিষয় শিল্পসত্তা তৈরি হওয়া।
এই যেমন ধরেন, সুলতান হাত দিয়ে সাপের খোলস ছাড়াতেন, নিজে না খেয়ে তাদের দুধ খাওয়াতেন। বিখ্যাত কোলাজ শিল্পী বলদেব রাজ পানেসর প্রত্যেকদিন দুপুরে পায়রাদের খেতে দিতেন।
অনেক পায়রা জমে গেলে পানেসর উঠোনের পাশে একটি সিমেন্ট বাঁধানো চাতালে সেই খাদ্যোর [খাদ্যের] পাত্রটি নিয়ে বসেন। কিছু দানা ছড়িয়ে দেন মাটিতে। পায়রারা জড়ো হয়ে খুঁটে খুঁটে খেতে থাকে। এক ঝাঁক উড়ে এসে বসে পানেসরের কোলে। হাতে, পায়ে, কাঁধের উপরে উড়ে এসে বসে তারা। কোলের উপর রাখা পাত্র থেকে খুঁটে খুঁটে খেতে থাকে। পানেসর পরিপূর্ণভাবে পাখিদ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে যান। তারপর সহসা এক ঝটকায় উড়তে শুরু করে পাখিরা। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে অনেকটা উচ্চতায় উঠে যায়। তৈরি হয় উড়ন্ত পায়রার একটা পিরামিড। ফুলের পাঁপড়ি বিস্তারের মতো ফুটে ওঠে তারা। আবার একে একে নেমে আসতে থাকে মাটিতে। ফিরে যেতে থাকে পূর্বের শৃঙ্খলায়। কেউ ভূমিতে খাদ্য সংগ্রহ করে। কেউবা আবৃত করে পানেসরের শরীর। আর শিল্পী যেন তাঁরই একটা সৃষ্টির মধ্যে তন্ময় মুগ্ধতায় চোখ বুজে থাকেন।১
আবার ভিনসেন্ট ভ্যান গগ, কী অসাধারণ ছবির-জীবন অতিবাহিত করেছেন! কী পেয়েছেন তিনি ছবি এঁকে? তথাকথিত মানুষ যাকে সুখ স্বাচ্ছন্দ বলে, তার কিছুই তো তিনি পাননি। তাহলে কেনো এই জীবন!
মানুষের ভিতরে যখন শিল্পসত্তা কাজ করে, তখন সে সাধারণের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে উঠে যায়। ক্রমেই নিজের ভিতরে এক ধরনের ঐশ্বরিক শক্তি উপলব্ধি করে। এটি অনেক সময় সাপেক্ষ এবং কচুপাতাতে পানি ধরার মতো দুরুহ কার্য। কিন্তু সময় নিয়ে সাধনা করে যা অর্জন হয়, তা অমৃত। আর এই শিল্পসত্তা সম্পূর্ণ শিল্পী যা কিছু করে তাই শিল্পকলা। বলদেব রাজ পানেসর যখন পরিত্যক্ত কাগজ দিয়ে কোলাজ করেন সেটা যেমন শিল্প, পায়রাকে যখন খেতে দেন সেটাও তেমনই শিল্প। আবার আমেরিকান উদ্ভিদবিজ্ঞানী বুর ব্যাংক যখন তার কাঁটাযুক্ত ক্যাকটাসের সঙ্গে কথা বলে তাদের কাঁটা মুক্ত করেন২-তখন সেটিও শিল্প। শিল্পীর গান করাও শিল্প; গান দিয়ে ক্যান্সার থেরাপি দেওয়াও শিল্প। আসলে যা কিছু কল্যাণকর, তাই শিল্প। যদিও এ নিয়ে ভিন্ন মত আছে।
এই শিল্পসৃষ্টিতে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়োজিত ছিলেন ভারতবর্ষের এক অনন্য শিল্পসাধক রাজা রবি বর্মা। শিল্পসৃষ্টির তাগিদে সব করেছিলেন রবি-কখনো সংসার ছেড়েছেন, কখনো মিথ্যা সংসার-সংসার খেলা খেলেছেন, আবার কখনো শিল্পের সন্ধানে চষে বেড়িয়েছেন তামাম ভারত। রাতদিন একাকার করে কেবলই ছবি এঁকেছেন। সেই ছবি রিপ্রোডাকশন করে দু-হাতে টাকাও কামিয়েছেন। আবার জীবনের শেষ ভাগে নিজের ছাপাখানা বিক্রির পুরো টাকা দান করে গেছেন আরেক শিল্পের প্রয়োজনে। রবির টাকাতেই ভারতবর্ষে চলচ্চিত্রের সূচনা হয়েছিলো দাদাসাহেব ফালকে’র হাত ধরে। রবির এই বিচিত্র জীবন নিয়ে কেতন মেহতা নির্মাণ করেছেন রঙ রসিয়া (২০১৪)। এই প্রবন্ধ কেতন নির্মিত রবির জীবনী নিয়ে।
শিল্পকলা : প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য
প্রাচ্য অর্থাৎ পূর্বদেশীয়র মধ্যে ভারতবর্ষ এমন এক স্থান, যেখানে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন শাসক শোষণ করেছে। ফলে এ অঞ্চলের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে শাসকশ্রেণির নিজ নিজ চিন্তার একটা প্রভাব সবসময়ই কাজ করেছে। শিল্পকলার ক্ষেত্রেও এটি খুব বেশি ব্যতিক্রম ছিলো না। যদিও ভারতীয় শিল্পকলার প্রাচীন কোনো নিদর্শন আছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা জরুরি। ভাস্কর্যে প্রাচীন কিছু উপাদান পাওয়া গেলেও প্রাচীন চিত্রকলা বলতে অজন্তা চিত্রকেই (খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় থেকে খ্রিস্টাব্দ নবম) বোঝায়। ভাস্কর্যে সিন্ধু সভ্যতা থেকে মোর্য, গুপ্ত, পালদের আমলেও কিছু কাজ পাওয়া যায়। তবে মোঘলরা যখন শাসন শুরু করলো, তখন অপার চিত্রসম্ভার পেলো ভারতবর্ষ। এরা রাজদরবারে শিল্পী নিয়োগ করে চিত্র এঁকে নিতো। কিন্তু ১৭ শতকে শাহজাহান স্থাপত্যশিল্পে মনোনিবেশ করেন; পরবর্তী সময়ে আওরঙ্গজেবের অবহেলায় দরবারি শিল্পীরা জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ততোদিনে ইংরেজরা ভারতকে কলোনি বানিয়ে বাণিজ্য শুরু করে দিয়েছে। ক্রমেই ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিস্তার লাভ করে। তারা সাধারণ জনগণের কাছে প্রভুর স্থান অধিকার করে নেয়। কেননা, সে সময় ‘পশ্চিমা’ শব্দটি ছিলো উন্নত সভ্যতার পরিপূরক। স্টুয়ার্ট হল এর ভাষায়,
পশ্চিম হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক নির্মাণ, এটি ভৌগোলিক নয়। ‘পশ্চিমা’ বলতে বোঝনো হয় এমন ধরনের সমাজ যা উন্নত, শিল্পায়িত, নগরীয়, পুঁজিবাদী, ধর্ম-নিরপেক্ষ এবং আধুনিক। ... এ কারণেই ‘ওয়েস্ট’ হচ্ছে একটি প্রত্যয়। ... এটি মূল্যায়নের নির্ধারক প্রদান করে যার চারদিকে জড়ো হয় শক্তিশালী ‘ভালো’ কিংবা ‘মন্দ’ অনুভূতিসমূহ। যেমন, ‘ওয়েস্ট’ হচ্ছে উন্নত = ভালো = কাক্সিক্ষত; আর ‘বাদবাকি’ হচ্ছে অনুন্নত = খারাপ = অনাকাক্সিক্ষত। হল বলেন, সংক্ষেপে বললে, এটি মতাদর্শ হিসেবে কাজ করে।৩
সেসময় ইউরোপের কোম্পানিগুলো ভালোভাবে ব্যবসা চালু রাখার জন্য, তাদের সমাজ, সংস্কৃতি, পোশাক সবকিছু বাঙালিদের চোখে অনুসরণীয়ভাবে দেখাতে চাইতো। বাঙালিরাও তখন তাদের জিনিসপত্র ক্রয় করতে থাকে; সঙ্গে গ্রহণ করতে থাকে তাদের সংস্কৃতিকেও। যার প্রভাব চিত্রকলার ওপরও পড়ে। পশ্চিমা শিল্পকলা তাদের কাছে অনেক বড়ো কিছু হয়ে ওঠে। বাঙালিরা এগুলো অনুসরণ করতে থাকে।
ইউরোপ থেকে বিভিন্ন শিল্পীও এই উপমহাদেশে এসেছে বিভিন্ন সময়ে। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে আসেন টিলি কেট্ল। তারপর ক্রমান্বয়ে আসেন জন জোফানি (১৭৮৩-১৭৮৯), আর্থার ডেভিট (১৭৮৫-১৭৯৫), জন স্মার্ট (১৭৮৬-১৭৯৫), জর্জ চিনারি (১৮০২-১৮২৫), সামুয়েল অ্যান্ডুজ (১৭৯১-১৮০৭) প্রমুখ। আওরঙ্গজেবের অবহেলায় যে দরবারি শিল্পীরা জীবিকার অন্বেষণে ছড়িয়ে পড়েছিলো, তাদের প্রত্যেকের ওপর ইংরেজ এই শিল্পীদের প্রভাব পড়তে থাকে। যার ফল পাওয়া যায় কালীঘাটের পট, বটতলার ছাপাখানার ছবি ও কোম্পানি শৈলীতে।
চরম রিয়েলিস্টিক চিত্রকলা কখনোই ভারতে ছিলো না। ইংরেজরা ভারতীয় শিল্পীদের তা শেখানোর চেষ্টা করে। তাদের পছন্দ ও রুচি মতো চিত্রকর তৈরি হতে থাকে। চিত্রশিল্পী নয়, চিত্রকর হচ্ছে কারিগর, বায়না মতো কাজ করার লোক। অথচ শিল্পী তো আবেগ, কল্পনা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ক্যানভাসে নন্দন ও দর্শন আঁকে। ফলে সেসময় ইংরেজদের চাহিদা মতো চিত্র তৈরি করতে গিয়ে যা হলো-তা ঠিক ইউরোপিয়ানদের মতো নয়, আবার ভারতীয়দের মতোও নয়। দুইয়ের মিশ্রণে অন্য কিছু; যা ‘কোম্পানি শৈলী’ নামে পরিচিত। গোটা ১৮ শতক এবং ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে যখন সবাই এই প্রথায় মেতে ছিলো, সেই সময় রবি বর্মা নতুন কিছু ভাবলেন। তিনি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে না শিখলেও পাশ্চাত্যের হাওয়ায় ঠিকই রিয়েলিস্টিক চিত্র আঁকা শিখেছিলেন। তার চিত্রে উচ্চ আলোছায়ার ব্যবহার এবং দক্ষ হাতের নিপুণ চিত্র দর্শককে বিমোহিত করে। তিনি অল্প সময়ে দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন এবং প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। তাই বলে তিনি কিন্তু তার নিজস্বতা বর্জন করেননি। টেকনিকে রিয়েলিস্টিক থাকলেও বিষয়বস্তুতে ছিলেন ভারতীয়। যা তার বহুসাধনারই ফল। এ নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষ্য হলো,
রবিবর্মার চরিত্র অনুশীলন করিয়া দেখিলে আমরা বেশ বুঝি যে তিনি কঠোর সাধনা করিয়াছিলেন এবং সাধনার কঠোরতা অনুযায়ী সিদ্ধিলাভও করিয়াছিলেন। কিন্তু এই সিদ্ধি লাভ করিয়া কেবল মেডেলরূপ স্বর্ণমৃগের পশ্চাতে যদি তিনি ঘুরিয়া বেড়াইতে [ন] যদি তাঁর প্রাণ দেশীয় শিল্পের জন্য না কাঁদিত এবং সাধনার ফল স্বদেশে বিতরণ না করিয়া বিলাতির সেবায় যদি তিনি অর্পণ করিতেন তবে আজ তিনি আমাদের মতো একান্তই হেয় হইয়া থাকিতেন এবং আমরা বলিতে বাধ্য হইতাম যে, তিনি ক্ষমতা সত্ত্বেও নিজের দেশকে বঞ্চিত করিয়া গেলেন।৪
রবি বর্মা থেকে অবনীন্দ্রনাথ : ইতিহাসের নিম্নবর্গীয় পাঠ
যদিও এই লেখার বিষয় কেতন মেহতার রঙ রসিয়া, কিন্তু একটা বিষয়ে এই চলচ্চিত্রের মধ্যে থাকা সম্ভব হলো না। তাই এই আলোচনার অবতারণা। ভারতীয় উপমহাদেশে ঠাকুর পরিবার নিজ কর্মেই স্বনামধন্য। ভারতে জমিদারপ্রথা থাকার সময়ে তারা ছিলেন জমিদার; উপনিবেশ আমলেও পশ্চিমের সঙ্গে ছিলো তাদের ভালো যোগাযোগ। পশ্চিমা সংস্কৃতির অনেক কিছুই তাদের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করে। ঠাকুর পরিবারের নারীরা পরতে শুরু করে ব্লাউজ, জুতা, হাতঘড়ি প্রভৃতি।
শ্রেষ্ঠত্বে ঠাকুর পরিবার সর্বকালেই এগিয়ে। জমিদার থাকা অবস্থায় এই পরিবারের প্রায় প্রত্যেকেই শিল্প সাহিত্যের জগতে রত্ন বনে যায়-এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। ভারতবর্ষের সব শ্রেণির মানুষের কাছে এখনো রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) এক পরিচিত নাম। আর ভারতীয় চিত্রশিল্পে সেই পরিবারের আরেকজন অবনীন্দ্রনাথ (১৮৭১-১৯৫১) নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তারা প্রত্যেকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে চিরস্মরণীয়, একথা যেমন সত্য; তেমনই ইতিহাস যে সবসময় ক্ষমতাবানের পক্ষে থাকে সেটাও সত্য। ঠাকুর পরিবারের যে সদস্য যখন যে চর্চায় মনোনিবেশ করেছেন, তিনিই খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন! অবনীন্দ্রনাথের ছোটোবোন সুনয়নী দেবী (১৮৭৫-১৯৬২), কারো কাছে শিল্প শিক্ষা গ্রহণ না করে, অন্তঃপুরে বসেই ছবি এঁকেছিলেন। সেসব ছবিতে শিল্প সমালোচকরা বেঙ্গল স্কুলের ‘প্রিমিটিভ’, সারল্য অর্থাৎ নাইভিটি খুঁজে পেয়েছিলেন। এমনকি সুনয়নী দেবীর আঁকা চোখ দেখে নাকি যামিনী রায় প্রভাবিত হয়েছিলেন।
১৯২৮ সালে সমালোচক ভেঙ্কাটাচালাম সুনয়নী দেবীর বেনেপুকুরের বাড়িতে এসেছিলেন তাঁর আঁকা ছবি দেখতে। তিনি সুনয়নী দেবীর মধ্যে লোকশিল্প বা folk art -এর প্রভাব দেখে অবাক ও মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি সুনয়নী দেবীর আঁকা ‘চোখ’ নিয়ে মত প্রকাশ করেন যে, যামিনী রায় সেই ‘চোখ’ দেখে প্রভাবিত হয়েছিলেন।৫
এখন প্রশ্ন হলো, ভারতবর্ষের অন্য কারো নয়; ঠাকুরবাড়ির এক মেয়ের চিত্রকলাই কেনো তিনি দেখতে এলেন? আর এসে শুধু তার ভালো দিকগুলোই বললেন! পরবর্তী সময়ে তা থেকে রেফারেন্স টেনে অন্যান্য শিল্প-সমালোচকরা প্রশংসাসূচক আলোচনা করছেন। যুগে যুগে এই হয়েছে! অবনীন্দ্রনাথ আর রাজা রবি বর্মার কথাই ধরুন। স্বদেশি আন্দোলনে ছবির জগতে অবনীন্দ্রনাথ প্রথম ও প্রধান যোদ্ধা। ভারতীয় চিত্রের যে দুর্গতি তা থেকে তিনি রক্ষা করেছেন। ড. সুশান্ত কুমার অধিকারীর ভাষায়,
ব্রিটিশ ভারতে উচ্চবিত্ত সমাজে পাশ্চাত্য ধারার চিত্র তথা ‘ব্রিটিশ একাডেমিক রিয়েলিজম’-এর চর্চা এবং সমাদর প্রচলিত হয়। এই ক্ষেত্রে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ... বস্তুতঃ তিনি [অবনীন্দ্রনাথ] নতুন পথের অনুসন্ধান করছিলেন যার মধ্যে থাকবে ভারতীয় পরম্পরা শিল্পের ঐতিহ্য। তাই ভারতীয় মিথ, পুরাণ, কাব্য, সাহিত্য ও ইতিহাস থেকে বিষয় নির্বাচন করলেন এবং মোগল, রাজপুত ও অন্যান্য চিত্র শৈলী অবলম্বনে ছবি এঁকে তাঁর সৃজন চিন্তার প্রকাশ ঘটান। অবনীন্দ্রনাথ ঐতিহ্যবাহী জাপানী চিত্রকলা অঙ্কন পদ্ধতির সাথে পাশ্চাত্যের স্বচ্ছ জলরঙ পদ্ধতির সমন্বয়ে নতুন আঙ্গিকে ‘ওয়াটারকালার- ওয়াশ টেকনিক’ বা ‘জলরঙ- ধৌত পদ্ধতি’ নামক একটি পদ্ধতির সৃষ্টি করেন। ভারতীয় চিত্রশিল্পের মাধ্যমগত দিকথেকে এটি একটি নতুন পদ্ধতির সংযোজন। ... এই ধারায় আঁকা ছবিই পরবর্তীতে বেঙ্গল স্কুল শৈলীরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে আছে স্বদেশ বা জাতীয়তার অন্তর্নিহিত বোধ। শিল্পরসিক, গবেষক ও শিল্প ঐতিহাসিকগণ মনে করেন-অবনীন্দ্রনাথের এই ধারার ছবিই ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক চিত্রকলায় নতুন পথ দেখিয়েছিলেন।৬
অথচ অবনীন্দ্রনাথের কমপক্ষে ২৫ বছর আগে রবি বর্মা এ বিষয়ে কাজ করেন। কিন্তু অবনীন্দ্রনাথ মর্যাদার যে আসনে রয়েছেন, তা রবি পাননি। তার কারণ হতে পারে, রবি বর্মা কেবল বিষয়বস্তুতে দেশীয়তা এনেছেন, টেকনিকে ছিলেন পাশ্চাত্য শৈলীতে। হাই লাইট অ্যান্ড ডার্ক-এর ব্যবহারে তার চিত্রকলা চরম রিয়েলিস্টিক ছিলো। পক্ষান্তরে অবনীন্দ্রনাথ বিষয় এবং শৈলী দুটোতেই দেশীয় রীতি এনেছেন; যা ভারতের শিকড়ের কথা বলে। এ ক্ষেত্রে অবনীন্দ্রনাথ অবশ্যই এগিয়ে; কিন্তু রবি বর্মা তার সময়ে (১৮৪৮-১৯০৬) বিষয়বস্তুতে যে নতুনত্ব এনেছিলেন তাও কম কীসে! সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সেটা নিঃসন্দেহে বড়ো ব্যাপারই ছিলো। অথচ ইতিহাসে রবি বর্মা নিষ্প্রভ থাকলেও সম্পূর্ণ কৃতিত্ব পেয়েছেন অবনীন্দ্রনাথ। এ বিষয়ে মৃনাল ঘোষকে স্মরণ করা যায়। তার ভাষায়,
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার সঙ্গে ঊনবিংশ শতকের শেষ পর্বে ও বিংশ শতকের গোড়ায় আমাদের দেশে জেগে ওঠা স্বদেশ চেতনার সংঘাত থেকে আমাদের চিত্রকলায় আধুনিকতার সূত্রপাত। অ্যাকাডেমিক স্বাভাবিকতার রীতি থেকেই আধুনিকতা জেগেছে, না তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার উদ্যোগ থেকে, এ নিয়ে অনেক বিতর্ক। রবি বর্মা ছিলেন সেই ব্রিটিশ অ্যাকাডেমিক স্বাভাবিকতার রীতির শ্রেষ্ঠতম এক প্রবক্তা। সেই আঙ্গিকেই তিনি সেই সময়ের স্বদেশ চেতনাকে রূপ দিতে চেষ্টা করেছিলেন। এজন্য প্রথম আধুনিকের শিরোপা তাঁরই প্রাপ্য, এরকম মনে করেন অনেকে। বা এই স্বাভাবিকতার রীতিতেই ছিল আধুনিকতার বীজ, এরকম ভাবনাও যে নেই, তা নয়। এ সমস্ত সত্ত্বেও আমরা অবনীন্দ্রনাথেই ভারতীয় চিত্রকলার আধুনিকতার সূচনা বলে মনে করেছি।৭
রবি বর্মার টেকনিককে মৃনাল ঘোষ ‘ব্রিটিশ অ্যাকাডেমিক স্বাভাবিকতার রীতি’ বলেছেন; আর সে কারণেই তিনি আধুনিক চিত্রের জনক হতে পারছেন না! অথচ রঙ রসিয়ার ৪২ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে মহারাজাকে উদ্দেশ্য করে রবি বর্মাকে বলতে শোনা যায়,
মহারাজা : যখন আমি ইউরোপে ছিলাম, তখন আমি একের পর এক ভালো চিত্র দেখেছি। কী শিল্প, কী শিল্পকর্ম! আমার আফসোস হয় আমাদের চিত্রশিল্পীরা এতো ভালো চিত্রকর্ম সৃষ্টি করতে পারে না কেনো? ইউরোপে গিয়ে ওদের চিত্রকর্ম দেখো এবং আমার দরবার হলের জন্য কিছু চিত্র কপি করো।
রবি বর্মা : মাফ করুন মহারাজা, আমি এটি করতে পারবো না। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমাদের দেশেও গুপ্তধনের মতো কাহিনি আছে। রামায়ণ, মহাভারতের এই মহান কাহিনিগুলো আমি দুনিয়াকে দেখাতে চাই। এদের চিত্র নির্মাণ করতে চাই।
রাজা : তো বানাও। আজ থেকেই শুরু করো। কেউ যেনো এটা বলতে না পারে, যে হিন্দুস্তানিরা শিল্প জানে না।
রবি : আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো। কিন্তু আমি এখনই এটা করতে পারবো না। অনেক প্রস্তুতি নিতে হবে; সারাদেশ ঘুরে বুঝতে হবে, এই কাহিনিগুলোর জন্ম কোথায়। সেজন্য আমার সময় লাগবে মহারাজ।
রাজা : আমি অপেক্ষায় থাকবো।
রবি চাইলেই কিন্তু ইউরোপের চিত্র নকল করতে পারতেন। অথচ সেটা না করে শুধু দেশপ্রেমের জন্য, নিজস্বতা খুঁজতে তিনি ভারত ভ্রমণে বেরোলেন। এ সময়ে তিনি অনেক ছোটো ছোটো স্কেচ করেছিলেন। বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপত্য দেখেছিলেন, যেগুলোর দেয়ালে প্রচুর টেরাকোটা; কামসূত্রের ৬৪টি কলার রূপ চিত্রায়িত রয়েছে। রবি এগুলো দেখে মুগ্ধ হন এবং অনুকৃতি করতে থাকেন। যা চলচ্চিত্রের ৪৪ মিনিট পাঁচ সেকেন্ড থেকে ৪৮ মিনিট ১৩ সেকেন্ড পর্যন্ত দেখানো হয়। এই সময় আবহে গান বাজতে থাকে আর রবি উদয়পুর, মোঘল মিনিয়েচার, রাজপুত চিত্রশৈলী দেখতে থাকেন। এছাড়া তাকে ভারতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী সব মেলা ঘুরে লোকজ শিল্পকলা দেখতেও দেখা যায়।
সাধারণত সাধনায় বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে সিদ্ধি অর্জন করে। কেউ কেউ মনে করেন, সাধনায় মাদক বা নেশাদ্রব্যের কোনো স্থান নেই। তারা ধ্যানের মাধ্যমে চঞ্চল রূপ ও মনকে বশে আনেন। আবার কেউ কেউ নেশার মাধ্যমে কৃত্রিম একটি ঘোর সৃষ্টি করে। রঙ রসিয়ার ৪৭ মিনিট পাঁচ সেকেন্ডে দেখা যায়, রবি গঙ্গার তীরে বসে নেশা করছেন; এরপর ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে তিনি বুঝতে পারেন, তার ছবির বিষয়বস্তু পেয়ে গেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেই খবর মহারাজার কাছে পাঠাতে বলেন। এর কিছু সময় পর দেখা যায়, নিজে রঙ তৈরি করে সেসব চিত্র আঁকছেন। এ সময়ে রবির অনেক শিষ্যদেরকেও তার ছবিতে কাজ করতে দেখা যায়।
রবির এই কাজের সঙ্গে বাংলাদেশের এস এম সুলতান ও কামরুল হাসানের কাজের মিল পাওয়া যায়। সুলতান দুনিয়া ঘুরে এসে বসত গাড়েন তার গ্রামে, সেখানেই তিনি বাকি জীবন কাটিয়ে দেন; ছবি আঁকেন বাংলার কৃষকদের নিয়ে। তিনি অসাধারণ শক্তিতে বলিষ্ঠ করে দেন তার কৃষকদের পেশির মাধ্যমে। কী অপার শক্তি ধারণ করে নড়াইল তথা বাংলার কৃষক; প্রকৃতির কাছে তারা মাথা তো নোয়াবেই না, বরং প্রকৃতিকে শাসন করবে। দর্শককে সত্যি বিমোহিত করে দেয় এসব ছবি; যেনো তারাও নিজেদের মধ্যে অপার শক্তি ও কর্মোদ্যম খুঁজে পান। আর কামরুল হাসান তো সারাজীবন কাটালেন পটচিত্র এঁকে। বাংলার লোকশিল্পের ফর্ম ধরে তিনি চিত্র এঁকেছেন। যা শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তার পরও ইতিহাস কিন্তু জয়নুল আবেদিনকে বড়ো করে দেখে। জয়নুলের শিল্পের সুবর্ণ যুগ ৭৬-এর দুর্ভিক্ষ; তার পরের সময়ে শিল্পসৃষ্টির চাইতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে তিনি বেশি মনোযোগী হলেন। তবুও অবনীন্দ্রনাথের মতো জয়নুলের পাল্লাই যেনো ভারী!
শিল্পকলা, মডেল এবং নারী
রঙ রসিয়ার ৪৭ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে ঘুম থেকে জাগার পর রবি কল্পনায় গঙ্গার ধারে কিছু দৃশ্য দেখতে পান। সেই দৃশ্যে বিভিন্ন ভঙ্গিতে একজন নারী (রবির কল্পনার সে নারী বাস্তবের সুগন্ধা) এবং সঙ্গে যোগীরূপী রবিকে দেখা যায়। মহারাজাকে ছবি এঁকে দেওয়ার জন্য সারা ভারতবর্ষ ঘোরার যে ব্রত রবি নেন, তারই শেষ পর্যায়ে গঙ্গায় রাত্রিযাপন শেষে ভোরে হঠাৎই তিনি কল্পনায় এসব দৃশ্য দেখতে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে রবি তার ছোটোভাই রাজকে বলেন, মহারাজকে টেলিগ্রাম করতে এবং তাকে জানাতে যে, তার পেইন্টিং তৈরি হয়ে গেছে। এই দৃশ্যে আবহসঙ্গীতের ব্যবহার অসাধারণ। প্রথমে শঙ্খ ধ্বনি, অতঃপর তার সঙ্গে মন্দিরের ঘণ্টা মিশিয়ে দর্শকের মনে একধরনের পূজার আমেজ তৈরি হয়।
১৬ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে রবির বাড়ির কাজের লোক কামিনী ঝাড়ু দেওয়ার সময় হঠাৎ যখন চুল বাঁধার জন্য দাঁড়িয়ে যান। তখন রবি তাকে দেখে ঠিক ওইভাবেই তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেন। সঙ্গে সঙ্গে রবি সব কাজ ফেলে কাগজ ও পেন্সিল নিয়ে খুব দ্রুত কামিনীর ওই ভঙ্গির ড্রইং করতে থাকেন। ড্রইং করার সময় রবির যে অভিব্যক্তি, সেটা দেখে মনে হয়েছে, তিনি কতোইনা তৃষ্ণার্ত ছিলেন এমন একটা স্কেচ আঁকার জন্য।
এক ঘণ্টা নয় মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের একটি দৃশ্যে রবির মন খারাপ, তিনি বসে আছেন। সুগন্ধা জিজ্ঞাসা করছেন, কী হয়েছে? রবি তখন সুগন্ধার কাছে মহাভারতের উর্বশীর কাহিনি বর্ণনা করেন এবং বলতে থাকেন, এতো সুন্দর কাহিনি অথচ এর জন্য উপযুক্ত কোনো মডেল নেই। এই কথা শেষে মন খারাপ করে রবি তার লে-আউটগুলো পুড়িয়ে ফেলেন। রবির এই পরিস্থিতি দেখে ঠিক তখনই সুগন্ধা ধীর পায়ে এগিয়ে যান এবং রবির ঠিক উল্টো দিকে নিজেই উর্বশীর চরিত্রে মডেল হওয়ার জন্য সেই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে যান। সামান্য ব্যবধানে রবি পিছন ফিরে উর্বশীর ভঙ্গিতে সুগন্ধাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অভিভূত হয়ে যান। পরিস্থিতি অনেকটা এ রকম যে, রবি যেনো তার কল্পিত উর্বশীকে পেয়ে গেছেন; সঙ্গে সঙ্গে তিনি পাগলের মতো সুগন্ধার সেই ভঙ্গি ধরে আঁকতে শুরু করেন। অদ্ভুত অনিন্দ্য সেই দৃশ্য! দুজন মিলে শিল্প সৃষ্টির কী অসাধারণ তাড়না!
এভাবে ছবি আঁকায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর মডেল কিন্তু শুধুই আর মডেল থাকেন না; তিনিও শিল্পীর পর্যায়ে চলে যান। দুজনের মধ্যে এক আধ্যাত্মিক সম্পর্ক বিরাজ করতে থাকে, যেখানে শিল্পী কিছু চাওয়ার আগেই মডেল তা অনুভব করতে পারে। এই সম্পর্কই হয়তো একনাগাড়ে কোনো মডেলকে একভাবে স্থির থাকতে সহায়তা করে। শিল্পী, মডেল তখন একাকার হয়ে যায়। যদিও সুগন্ধা কোনো পেশাদারি মডেল ছিলেন না; হঠাৎই একদিন মন্দিরে তাকে খুঁজে পেয়েছিলেন রবি।
শিল্পী সবসময় কিছু না কিছু খুঁজে ফেরেন; তিনি হয়তো কখনো কখনো নিজেও জানেন না, সেটা কী? তার অচেতনে খেলা করে অনেক কিছু। এই খেলায় হয়তো সাধারণ থেকে শিল্পীকে পৃথক করে ফেলে। আবার হঠাৎই তিনি কোনো কিছু খুঁজে পেলে তৎক্ষণাৎ আঁকতে শুরু করেন। যেমন, কামিনীর চুল বাঁধার দৃশ্য, গঙ্গার ধারে বিষয় খুঁজে পাওয়া কিংবা সুগন্ধার মধ্যে উর্বশীকে পাওয়া। মন্দিরে অতো অতো মানুষের ভিড়ে সুগন্ধাকে খুঁজে পেয়েছিলেন রবি। তিনি সুগন্ধার মধ্যে তার খুঁজে ফেরা কিছু পেয়েছিলেন নিশ্চয়। কিন্তু শিল্পীর কাছে তার ছবির বিষয়বস্তু আর মডেল কিন্তু এক নয়। শিল্পী যাকে অবলম্বন করে আঁকে, তাই subject বা বিষয়। বিষয়কে ফুটিয়ে তোলার জন্য কখনো কখনো (স্মৃতি থেকে ছবি আঁকতে প্রয়োজন হয় না) মডেলের প্রয়োজন হয়।
ইংরেজি model শব্দের অর্থ প্রতিরূপ বা প্রতিচ্ছবি। শিল্পকলায় মডেল হলো এমন এক ব্যক্তি; যে শিল্পীর পছন্দ মতো ভঙ্গিতে শিল্পীর সামনে অবস্থান করে। আর শিল্পী তাকে দেখে তার প্রতিরূপ গড়ে। সাধারণত বিষয় শব্দটির সঙ্গে জড়বস্তু আর মডেল শব্দটির সঙ্গে প্রাণী বা মানুষ জড়িত। যাকে অবলম্বন করে আঁকা হোক না কেনো; তাকে প্রথমে দেখে, তার ছবি হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। এরপর শিল্পী তার প্রতিরূপ আঁকে। এজন্য শিল্পকলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে পর্যবেক্ষণ বা অবলোকন করা। শিল্প সৃষ্টির এক চরম মুহূর্ত এটি। চলচ্চিত্রে ১৬ মিনিট ৩৯ থেকে ৪৪ সেকেন্ড এবং এক ঘণ্টা ১৩ মিনিট ২১ সেকেন্ডে রবি বর্মার বিভিন্নভাবে এই অবলোকন দেখানো হয়েছে।
বিশেষ সময়ে শিল্পী শিল্পের প্রয়োজনে ন্যুড চিত্রও আঁকেন। শিল্প সৃষ্টির এই প্রক্রিয়ায় শিল্পী এবং মডেল দুজনের মধ্যেই শিল্পীসত্তা চরম রূপ নিয়ে হাজির থাকে; দুজনই নিমগ্ন থাকে শিল্প সৃষ্টিতে। ফলে সুগন্ধা আর সুগন্ধা থাকেন না, তিনি উর্বশী হয়ে ওঠেন আর রবি হয়ে ওঠেন উর্বশীর নির্মাতা। বিশেষ এই মুহূর্তে ঠিক কী ঘটে তা শিল্পী ও মডেলের ঊর্ধ্বে চলে যায়। আর সাধারণের কাছে এর ব্যাখ্যা তো একেবারেই ভিন্ন। সেজন্য সুগন্ধার অবয়বে উর্বশীর চিত্রকর্ম যখন বাজারে বিকায়, তখন সুগন্ধাকে হতে হয় বিদ্রুপের শিকার। কিংবা মডেল থেকে সুগন্ধা যখন আর দশজন নারীর মতো জীবনে ফিরে আসেন, তখন এই সমাজ-সংসার তাকে মেনে নেয় না।
কারণ সুগন্ধা পেশাদারি মডেল নন। পেশাদারি মডেলের বিষয় অন্য, তারপরও আর দশটি পেশার মতো এটি নয়। কারণ অর্থের বিনিময়ে মডেলরা কাজ নয়, সার্ভিস দেয়। যদিও পেশাদারি মডেলের ক্ষেত্রে সেই অর্থে শিল্পীর কোনো দায়বদ্ধতা কাজ করে না। তাই সেই চিত্র প্রদর্শিত হবে নাকি বাজারে বিক্রি হবে তাতে তার কিছু আসে যায় না। তার কাজ মডেল দেওয়া পর্যন্তই। কিন্তু সুগন্ধা সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। মন্দিরে তাকে দেখে পছন্দ করেন রবি। তারপর সুগন্ধার কিছু পোট্রেইট তিনি স্কেচ করেন। সুগন্ধাকে সেগুলো দেখান রবি। সুগন্ধা সেগুলো তার বাড়িতে নিয়ে যান, বার বার দেখেন, অভিভূত হন। একপর্যায়ে তিনি মডেল হওয়ার জন্য আসেন রবির কাছে। পরে তাদের মধ্যে প্রণয়ও হয়।
রবির কাছে একটা সময় চিত্রের প্রয়োজনে সুগন্ধা ন্যুড মডেল হন। এই মডেল হওয়ার সময় সুগন্ধা কিংবা রবি কারো মাথাতেই হয়তো ছিলো না এর ভবিষ্যৎ কী হবে। তবে শিল্প সৃষ্টির পর শিল্পী স্বাভাবিকভাবে চান, তার শিল্পের প্রকাশ করতে। আবার পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে সুগন্ধার মতো একজন অপেশাদারি মডেল নিশ্চয় চাইবেন না, তার ন্যুড চিত্র অন্যরা দেখুক। এমতাবস্থায় সুগন্ধা এবং রবির অনুমতি না নিয়ে, রবির ছাপাখানার অংশীদার সুগন্ধার ন্যুড মডেল হওয়া চিত্রগুলো ছাপিয়ে বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা করলে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাতে সমস্যায় পড়েন রবি ও সুগন্ধা। তবে এই সমস্যা যতো না সুগন্ধা-রবির, তার চেয়ে অনেক বেশি সমাজের। ফলে ব্যক্তি সুগন্ধা-রবির উদ্বেগের চেয়ে অন্যদের উদ্বেগ তাদেরকে অনেক বেশি বিচলিত করে। এমনকি রবির বিরুদ্ধে দেবীর নগ্ন ছবি আঁকার অভিযোগে মামলা পর্যন্ত হয়। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৩৮ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে আদালত সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সুগন্ধাকে ডাকলে, তিনি রবি বর্মার বাড়িতে যান। সেখানকার কথোপকথন ছিলো এমন-
সুগন্ধা : আমাকে আদালত সাক্ষ্য দিতে ডেকেছেন। যদি যাই, তাহলে সবার সামনে আমাকে বেইজ্জত করবে। আর না গেলে আদালত আমাকে দোষী মনে করবে। আর এটা তোমার কাছে কোনো ব্যাপার না!
রবি : দেখো, আমি কিন্তু তোমাকে বাধ্য করিনি; তুমি যা করেছো, নিজের ইচ্ছাতেই করেছো। এখন আমাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
সুগন্ধা : বাহ্! শিল্পী বাহ্, জোঁকের মতো তুমি অন্যদের জীবন চুষে খাও, তারপর ব্যবহার করে ফেলে দাও। আর তোমার কোনো দোষ নেই!
রবি : ব্যস সুগন্ধা।
সুগন্ধা : তোমার শিল্প কারো জীবনও নিতে পারে। কিন্তু তোমার তাতে কিছু আসে যায় না, তাই না। তুমি একবারও ভাবলে না, আমার কী হবে?
রবি : আমার কল্পনার বাইরে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই।
সুগন্ধা : আমার অস্তিত্বই নেই!
তবে রবি ও সুগন্ধার মধ্যের এই দ্বন্দ্ব যাই হোক না কেনো, এর সমাধান কিন্তু হয়েছিলো সুগন্ধার প্রাণের বিনিময়ে। অথচ মহাকাল কিন্তু কেবল একজন শিল্পীকেই মনে রাখে, মডেলকে নয়। আচ্ছা, মডেল সুগন্ধা নারী না হয়ে পুরুষ হলেও কি তার জীবনের পরিণতি একই হতো? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ শিল্পীসহ সমাজের অন্যান্যরাও এই প্রশ্নকে হয়তো খুব স্বাভাবিকভাবে নেয় না। অনেকে আবার শিল্পের জন্য সব ত্যাগকে মহান করে দেখে। আচ্ছা, মানুষের জন্য যদি শিল্প হয়, তাহলে সেটা মানুষের জীবনের চেয়ে বড়ো হয় কীভাবে!
ধর্ম ও শিল্প
সমাজ থেকে শিল্প বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। শিল্পী যেহেতু সমাজের মানুষ, তার বিষয়বস্তুও সেখান থেকেই আসে। ফলে সমাজের অনেক কিছুই শিল্পকে প্রভাবিত করে। আবার সমাজও শিল্প দ্বারা প্রভাবিত হয়। সেটা হতে পারে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়। ভারতবর্ষে সনাতন ধর্মে শুরুর দিকে মূর্তি পূজা না থাকলেও, পরবর্তী সময়ে চালু হয়। যদিও ভারতে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের আগে ভাস্কর্যের চল ছিলো। যার বিষয় ছিলো বাৎসায়নের কামসূত্র এবং হিন্দুদের পৌরাণিক কাহিনি। সেখানে নগ্ন ভাস্কর্যে কাম, বহুকাম ও সমকাম যথেষ্ট প্রাধান্য পায়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে অজন্তা গুহায় জাতক কাহিনি নিয়ে প্রথম চিত্রকলার চর্চা হয়; এর শেষের দিকে অল্প কিছু চিত্র ছিলো হিন্দু পৌরাণিক কাহিনির।
পরবর্তী সময়ে পুরোহিতরা মনে করে, নৈরূপের চেয়ে রূপ বা দৃশ্যমান কিছু থাকলে তাদের পূজা দৃঢ় হবে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ধর্ম কেন্দ্রিক মূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ হতে থাকে। ফলে সাধারণ মানুষ মহাদেব, পার্বতী, বিষ্ণু, সূর্য এমন অনেকের রূপ দেখে। বৌদ্ধ ধর্মে ঈশ্বর না থাকলেও; বুদ্ধের মৃত্যুর পর বুদ্ধের প্রতিকৃতি ভাস্কর্য হয়ে ওঠে ভগবান। শুধু ইসলাম ধর্ম এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ‘নিরাকার ঈশ্বর’ এখানে আকার পায়নি এখনো। কিন্তু এই ধর্মের গ্রন্থ এবং উপাসনালয় সাজানো হয় ফুল-লতা-পাতার নকশায়। এমন কী আরবি অক্ষর নিয়ে ক্যালিগ্যাফিও তৈরি হয়।
এদিকে শিল্পকলায় যে রেনেসাঁ পাশ্চাত্যে শুরু হয়েছিলো; সম্ভবত ভারতে তার প্রবক্তা ছিলেন রবি বর্মা। তিনি যতোদূর সম্ভব মাইকেল অ্যাঞ্জেলো দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। মাইকেলের সময় পাশ্চাত্যে প্রকাশ্য নগ্নতা বিরল থাকলেও, সিস্টান চ্যাপেল গির্জার দেয়ালে দেবদেবীর নগ্ন চিত্র তিনি আঁকেন। ভারতে এ নগ্নতা বিরল না হলেও, সনাতন ধর্মে পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে আধুনিক শিল্পীদের মধ্যে রবি বর্মা ভারতবর্ষে প্রথম ছবি আঁকেন; যা রঙ রসিয়ার শুরুতেই দেখা যায়। চলচ্চিত্রের দুই মিনিট ৪০ সেকেন্ডে যখন রবি বর্মার ছবি নিলামে ওঠে, তখন ঘোষণা দেওয়া হয়-রবি বর্মা আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার জনক। তিনি পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে ছবি এঁকে দেব-দেবীকে মন্দিরের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। যা মানুষের মধ্যে ধর্ম-ভাবনার উদ্রেক করে।
আর সাধারণ মানুষ তো ধর্ম নিয়েই বাঁচে। তার প্রতি অবিচার হলে, সে ঈশ্বরের কাছে বিচার দেয়; ঈশ্বর দেখবে সেই আশাতেই বুক বাঁধে। রবি পৌরাণিক বিষয় নিয়ে যে চিত্র এঁকেছেন, তাতে সাধারণ মানুষ পূজা দেয়। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা সাত মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে রবিকে মন্দিরে ডেকে নিয়ে কামিনী এই দৃশ্য দেখান। পূজা বা ধর্ম-ভাবনা মানুষের মধ্যে শান্তি আনে। মানুষ তার সব দায়ভার কাউকে সঁপে দিতে চায়; এমনকি ‘পাপ’ করে এসেও, সে সন্তর্পণে কারো কাছে বলে কিছুটা শান্তি পেতে চায়।
সেসময়ে রবি তার চিত্রের মাধ্যমে মানুষের আধ্যাত্মিক এই শক্তির উন্নয়ন করেছিলেন। মানুষকে পার্থিব হাহাকার থেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন, ধর্ম-ভাবনা দিয়ে। যখন তার চিত্রকে মানুষ পূজা করতে শুরু করলো; তখন তার চিত্র সত্যি আর সাধারণ কিছু থাকেনি। অন্যভাবে ভাবতে গেলে, তিনি হয়ে ওঠেন ঠাকুর দেবতাদের স্রষ্টা। তবে এখানে একটি বড়ো বিষয় লক্ষণীয়, রবি বর্মার চিত্রকর্মে নগ্ন দেবীকে পাওয়া গেলেও কোনো দেবতাকে পাওয়া যায় না। যদিও এই সময়ে এসে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে আশঙ্কা থেকেই যায়, তিনি কি তবে দেবীর নগ্নতার মধ্য দিয়ে ‘নারীর নগ্নতা’র যে বাজার রয়েছে সেটাকে পুঁজি করতে চেয়েছিলেন?
তবে এজন্য রবিকে ধর্ম-সংস্কারকদের বিদ্রুপের শিকার হতে হয়। কেননা, নগ্ন দেবী মন্দিরে থাকতেই পারে, মৌলবাদীরা তার পূজাও করতে পারে। তাই বলে নগ্নদেবীর প্রিন্ট রাস্তাঘাটে বিক্রি হবে, সাধারণের ঘরে ঘরে পৌঁছাবে! এটা হলে তো বিপত্তি! চলচ্চিত্রে ৫৫ মিনিট সাত সেকেন্ডে রবি বর্মার প্রথম একক প্রদর্শনী ধর্ম-সংস্কারক চিন্তামনি মহারাজ দেখতে আসেন। সেখানে রবি বর্মার সঙ্গে তার কিছু কথোপকথন হয়-
চিন্তামনি কর : আপনার তো আমাদের ধর্মরক্ষা সমিতির সদস্য হওয়া উচিত। আমরা সমাজ উদ্ধারের জন্য অনেক বড়ো বড়ো কাজ করি।
রবি : খুব ভালো কথা। কিন্তু আমি তো সময়ই পাই না।
চিন্তামনি : সময় বের করে নিতে হয়। এটা আপনার জন্যই ভালো। নতুন নতুন সম্পর্ক তৈরি হবে, যোগাযোগ বাড়বে, সংগঠনের সম্পূর্ণ শক্তি আপনার সঙ্গে থাকবে।
রবি : অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আমার এসব জিনিসের দরকার নেই।
এই কথাতে চিন্তামনি রেগে যান এবং বলেন,
দেবতাদের ছবি আঁকার অনুমতি আপনাকে কে দিয়েছে?
রবি : দেবতারা নিজেই; স্বপ্নে এসে।
চিন্তামনি : দেবী-দেবতার চিত্রায়ণ মানবরূপে হতে পারে না। দেবী-দেবতা মন্দিরেই শোভা পায়। এটা সবার জন্য নয়।
রবি : আর এ নিময়টা কে বানিয়েছে? আপনার সংগঠন? ক্ষমা করবেন, আমি এসব ফাজলামোতে বিশ্বাস করি না।
চিন্তামনি : অহংকারী! অধার্মিক!
কথোপকথনের একপর্যায়ে রবি তার ছোটো ভাই রাজকে চিন্তামনির যাওয়ার পথ দেখিয়ে দিতে বললে তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে দ্রুত পদক্ষেপে চলে যান। তবে যাবার আগে বলেন, ‘কথাটা মনে রেখো।’
ঠিক তখনই একটি ছবির সামনে কিছু মানুষ প্রার্থনা শুরু করে এবং রামকে নিয়ে গান ধরে। অর্থাৎ এই চিত্রগুলোকে মানুষ পূজা করতে শুরু করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও রবিকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়, পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে চিত্র অঙ্কনের জন্য। চলচ্চিত্রে ১২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে আদালতে তাকে প্রশ্ন করা হয়। উকিল বলেন,
এটা কোনো সাধারণ মামলা নয়। আজ এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম থাকবে। কেউ খুন করলে তাকে ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়। আর যদি কেউ হাজার বছরের সভ্যতা-সংস্কৃতিকে খুন করে, তবে তার কী সাজা হওয়া উচিত? এই যে ব্যক্তিটি আপনাদের সামনে নির্লজ্জভাবে দাঁড়িয়ে আছে, আর নিজেকে শিল্পী দাবি করে, আসলে এই ব্যক্তি মানবতার কলঙ্ক এবং সভ্য সমাজের জন্য বিপজ্জনক; মাননীয় আদালত। এই ব্যক্তি শিল্পের নামে সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়েছে। সমাজের নৈতিকতাকে আঘাত করেছে। দেব-দেবীর বেহুদা ছবি এঁকে লাখো কোটি মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে।
এই সব অপরাধের জন্য মৌলবাদীরা ক্ষেপে যান এবং সেজন্য রবির জীবন সঙ্কটাপন্ন হয়। শিল্পীদের পথ চলা সত্যি দুর্গম। প্রত্যেক শিল্পীর জীবন বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে যাপিত হয়। তা সত্ত্বেও শিল্পীরা শিল্প সৃষ্টি করে। বাস্তবিক ধর্ম একেক জনের কাছে একেক রকম। এক্ষেত্রে অঞ্জন দত্তের দত্ত ভার্সেস দত্ততে দাদুর কাছে ভায়োলিন ধর্ম হওয়ার কথা মনে পড়ে। তার ভাষায়, ভগবান মানে আর্ট, ভগবান মানে হিন্স, ক্যেরেল্স, সংকীর্তন। ভগবান মানে আমার ভায়োলিন।
আবার রবির কাছে তার স্বপ্নটাই সব অর্থাৎ তার স্বপ্নের যে চিত্রকল্প তাই তার ধর্ম। আবার চিন্তামনির কাছে সমাজ-সংস্কার, মন্দির নির্মাণ প্রভৃতি ধর্ম; আবার কেউ কথা না শুনলে, তার কাজকে ধর্মের বিরুদ্ধাচরণের আওতায় এনে তাকে শাস্তি দেওয়াও ধর্ম। অথচ “এমন একটা সময় ছিলো যখন ‘ধর্ম দাবী করেছিল যে জীবনের প্রত্যেকটি বিভাগই ধর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে। সে দাবী সংকীর্ণতর হতে হতে এখন কেবল মন্দিরে মসজিদে গির্জাতেই আশ্রয় নিয়েছে।”৮ আর মানুষের হৃদয়েও সেই সংকীর্ণতা বাসা বেঁধেছে; তাই যে যার মতো ধর্মকে ব্যবহার করছে নিজেদের প্রয়োজনে।
লেখক : নাজমা পারভীন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।
তথ্যসূত্র
১. ঘোষ, মৃণাল (২০০৬ : ২৮); শাকিলা, জীবনের কোলাজ; প্রতিক্ষণ, কলকাতা।
২. মামুন, নাসির আলী (২০১৩ : ৫৬); আহমদ ছফার সময়; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।
৩. স্টুয়ার্ট হল, উদ্ধৃত; আহমেদ, রেহনুমা ও মানস চৌধুরী (২০০৩ : ১৩); নৃবিজ্ঞানের প্রথম পাঠ সমাজ ও সংস্কৃতি; একুশে পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ঢাকা।
৪. ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ (২০১১ : ২৫৭); অবনীন্দ্র রচনাবলী ৯; প্রকাশ ভবন, কলকাতা।
৫. কিশোর চট্টোপাধ্যায়, উদ্ধৃত; ঘোষ, মৃণাল (২০০৫ : ৪৫১-৪৫২); বিংশ শতকে ভারতের চিত্রকলা আধুনিকতার বিবর্তন; প্রতিক্ষণ, কলকাতা।
৬. অধিকারী, সুমান্ত কুমার; ‘শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথের সৃজনচিন্তার সূচনাপর্ব এবং কয়েকটি চিত্র পর্যালোচনা’; রিসার্চ জার্নাল অব মিউজিক; সম্পাদনা : ড. পদ্মিনী দে; সংগীত বিভাগ, বর্ষ ৩, সংখ্যা ৩, মার্চ ২০১৭, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ. ১২।
৭. ঘোষ, মৃণাল (২০০৫ : ৪৫১-৪৫২); বিংশ শতকে ভারতের চিত্রকলা আধুনিকতার বিবর্তন; প্রতিক্ষণ, কলকাতা।
৮. রায়, অন্নদাশঙ্কর (১৯৯৯ : ৭১); ‘সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ’; সংস্কৃতির বিবর্তন; বাণীশিল্প, কলকাতা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন