Magic Lanthon

               

সুজন নাজির

প্রকাশিত ০৪ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ভুবন মাঝি : এলোমেলো গল্পের নান্দনিক উপস্থাপনায় একপাক্ষিক বন্দনা

সুজন নাজির



পৃথিবীতে বড়ো বড়ো বিপ্লব সংগঠিত হয় সুনির্দিষ্ট দর্শনের ওপর ভর করে। বঞ্চিত, নির্যাতিত জাতিগুলো নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয় স্বাধীনতার মাধ্যমে। তাই শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব আবহমানকাল থেকে আজ অবধি অস্থির-সংঘর্ষময় এই বিশ্বে প্রধান সঙ্কট হয়ে চোখ মেলে আছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়ে আসছে ধারাবাহিকভাবে। তবুও থেমে নেই শাসক-শোষকের আধিপত্য বিস্তারের আধুনিক খড়গের নানারূপ। শুধু সময় ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পরিবর্তন, পরিমার্জন হয়েছে শাসকের শাসনের ধরন। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে ভূমির পরিবর্তে বাজার দখলের চল হয়েছে। প্রভাবশালীরা খারাপ-ভালো, সত্য-মিথ্যা, সাদা-কালোর ত্রিমাত্রিক দ্বন্দ্বের তকমা লাগিয়ে উজাড় করছে বিশ্বমানবতা। শান্তির নামে চলছে সংঘর্ষ। সমঝোতার নামে চলছে দখলদারিত্ব। তিলে তিলে নিঃশেষ হতে চলেছে শোষিতরা। তার পরও মৃতপ্রায় নির্যাতিত জনগোষ্ঠী সুনির্দিষ্ট দর্শন ও আদর্শের ওপর আশ্রয় করে ঘুরে দাঁড়াতে শেখে নতুন করে। ভয়কে মাথায় নিয়ে মুক্তিসংগ্রামের আকাক্সক্ষায় আনাড়ি যুবকরাও হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। যেমনটি ঘটেছিলো ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে। সেসময় শত্রুর হাত থেকে সাময়িক মুক্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদি চক্রান্তের কুয়া খুঁড়তে থাকে পরাজিত শক্তিরা। সুযোগ বুঝে ঝাঁপটে ধরে আদর্শিকভাবে পরাজিতর বংশধররা। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক নব্য সামন্তবাদের খেলোয়াড়রা। স্বাধীনতা দেখেনি, এমন প্রজন্মের আদর্শিক যোদ্ধারা হাল ধরে মাঝি হিসেবে। চলতে থাকে নতুন প্রজন্মের সংগ্রামের চাকা। ভিন্ন দুই সময়ের যোদ্ধাদের নিয়ে সরকারি অনুদানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ভুবন মাঝি নির্মাণ করেছেন ফাখরুল আরেফীন খান। চলচ্চিত্রটি মুক্তিযুদ্ধের গল্পে এগিয়ে গেলেও তা কেবল তাতেই আটকে থাকেনি, ডালপালা ছড়িয়েছে প্রাসঙ্গিক নানা দিকে।


দুই.

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র: চলচ্চিত্রের মুক্তিযুদ্ধ শিরোনামে তারেক মাসুদের একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। সেখানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের ময়নাতদন্ত করেছেন প্রয়াত এই নির্মাতা। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে ৬০টি। এর মধ্যে স্বাধীনতা-পূর্ব একটি এবং স্বাধীনতা-উত্তর ৫৯টি। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে ৬০টি চলচ্চিত্রের মুক্তি, সংখ্যার দিক থেকে খুব বেশি নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই চলচ্চিত্রের কয়টি শিল্পমান সম্পন্ন? যদিও এই বিচার খুবই প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এটা ঠিক যে, অধিকাংশ চলচ্চিত্রই গৎবাঁধা কাহিনি, দুর্বল বিষয়বস্তু ও সংলাপ নিয়ে নির্মিত হয়েছে। তারপরও কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে ভিন্ন চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গিতে কথা হয়েছে-অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী (১৯৭২), ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩), আলোর মিছিল (১৯৭৪), মেঘের অনেক রং (১৯৭৬), আগুনের পরশমনি (১৯৭৪), হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭), শ্যামলছায়া (২০০৪), মেহেরজান (২০১১) প্রভৃতি।


মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর প্রথম দিকের চলচ্চিত্র নিয়ে তারেক মাসুদ বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ছবি সঙ্গত কারণেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এবং প্রামাণ্যধর্মী। সদ্য-স্বাধীন-হওয়া দেশের প্রথম ছবিতে বিজয়উল্লাস-জাতীয় ভাবাবেগ থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক।সেই আবেগ হয়তো ছিলো, সঙ্গে বাড়াবাড়িও। ফলে ওই পথেই হেঁটেছে পরের বেশিরভাগ চলচ্চিত্র। যদিও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রকে শৈল্পিক মানে অধিষ্ঠিত করাটা নিশ্চয়ই খুব সহজতরও কাজ নয়।



আলমগীর কবীরের ধীরে বহে মেঘনাই স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে সবচাইতে শিল্পসুন্দর ছবি। মুক্তিযুদ্ধের বিপর্যয় থেকে ক্রমশ মাথা তুলে দাঁড়ানো বাংলাদেশের দুটো তরুণ-তরুণীর ভালোবাসা দেখাবার সাথে সাথে পরিচালক এ ছবিতে কাহিনীর সূত্র ধরে দর্শককে নিয়ে গেছেন স্বাধীনতাযুদ্ধের কঠিন সত্যগুলোর মুখোমুখি। শান্তিপ্রিয় বাঙালিদের ওপর চালানো হানাদারবাহিনীর ধ্বংসলীলা-পরিচালকের এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সাথে চমৎকারভাবে মিশে গেছে দর্শকের অভিজ্ঞতা।


তিন.

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের সত্য কাহিনির ওপর ভর করে ফাখরুল আরেফীন খান ভুবন মাঝি নির্মাণ করেছেন। কুষ্টিয়া জেলার দুই-তিন জন মুক্তিযোদ্ধার সংগ্রামী ইতিহাস পর্দায় নান্দনিকভাবে তুলে ধরেছেন নির্মাতা, সঙ্গে রয়েছে নতুন প্রজন্মের যোদ্ধাদের কথাও। ১৯৭০-এর নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে, সারাদেশ উত্তাল। এমন সময় ডিগ্রি পড়ার উদ্দেশ্যে কুষ্টিয়া শহরে চাচার বাড়ি আসেন নহির। সহজসরল-শান্ত স্বভাবের নহির হত্যা, মারামারি, দাঙ্গা-হাঙ্গামাকে প্রচণ্ড ভয় পান। পড়াশোনার পাশাপাশি থিয়েটার চর্চা, গানবাজনা, কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়ে সময় কাটে তার। চাচাতো বোনের বান্ধবী ফরিদার সঙ্গে নহিরের সখ্য গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। নহিরকে যুদ্ধে যেতে বলেন ফরিদা। কিন্তু মৃত্যুকে যে ভয় পান নহির, তিনি মরতে চান না। তারপরও প্রেমিকার চাপে ও অনুপ্রেরণায় শেষ পর্যন্ত মুক্তিসংগ্রামের মিছিলে সামিল হন তিনি। এদিকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা রাতের অন্ধকারে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহে হামলা চালায় নিরীহ বাঙালির ওপর। কাগজের মতো পুড়িয়ে দেয় শহরগুলো।


যুদ্ধের ডামাডোলে ফরিদার সঙ্গে নহিরের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে চিঠি। নহির চিঠির মাধ্যমে ই পি আর বিদ্রোহ, মুজিবনগর সরকার গঠন, কলকাতা-বিহারে যুদ্ধের প্রস্তুতি, ট্রেনিং ক্যাম্পের সংবাদ জানান ফরিদাকে। নহিরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সঙ্গ দেন বন্ধু মিজান। নহিরকে সশরীরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে ফরিদার পাশাপাশি মিজানেরও ভূমিকা থাকে। সুদূর থেকেও ভালোবাসার তাগিদ অনুভব করে ফরিদা ও নহির। দেশ তখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে, ফরিদা ধর্ষণের শিকার হন। শান্ত-ভদ্র-নম্র নহির তখন মুক্তিসংগ্রামের আগুনে পুড়ছেন। তার হৃদয়ে উড়তে থাকে প্রতিশোধের নিশান। কুষ্টিয়ায় ফিরে তিনি গুলি করেন ফরিদার ঘটনার মূলহোতা আসলাম রাজাকারকে।


ভুবন মাঝির কাহিনি এখানেই শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু না, গুলিবিদ্ধ আসলাম কাকতালীয়ভাবে বেঁচে যান। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে কুষ্টিয়ায় বাউল সাধকদের চুল দাঁড়ি কেটে দেয় দুর্বৃত্তরা। ভুক্তভোগী বাউলদের মধ্যে নহির শাহ্ অন্যতম। ব্যতিক্রমী বাউল নহির শাহ্কে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় আসেন সোহেল ও এলি। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে বাউল নহির শাহ্ ইহলোক ত্যাগ করলে এই প্রামাণ্যচিত্রই হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর এক অখণ্ড সত্য দলিল। তখন অবশ্য যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও ব্লগার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শাহবাগসহ উত্তাল সারাদেশ। সোহেলের প্রামাণ্যচিত্র আসলাম রাজাকারকে গ্রেপ্তারে ব্যাপক সহযোগিতা করে। জানা যায়, বাউলদের চুল-দাঁড়ি কেটে দেওয়ার পিছনে ইন্ধন ছিলো আসলামের। যদিও নহির অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ফরিদাকে আর পায় না। গড়াই নদীর কাছে বীরাঙ্গনা ফরিদা এবং এ সময়ের যোদ্ধা সোহেল ও এলিকে দেখা যায় ভুবন মাঝির শেষ দৃশ্যে।


চার.

ফাখরুল ভুবন মাঝির কাহিনি সাজিয়েছেন ভিন্নমাত্রায় ত্রিমাত্রিকভাবে। গতানুগতিক ভাবনার বাইরে এসে নিরীক্ষামূলক চিন্তার প্রয়াসের ওপর ভর করে মুন্সিয়ানার সঙ্গে পথ পাড়ি দিয়েছেন নির্মাতা। ভুবন মাঝির স্টোরি টেলিং (গল্প বলা) পর্বে ‘নন লিনিয়ার টাইমলাইন ধারা লক্ষ করা যায়।


নন লিনিয়ার টাইমলাইন হলো যেখানে চলচ্চিত্রের কাহিনি সরলগতিতে এগোয় না। অথবা বলা যায়, যেখানে চলচ্চিত্রের দৃশ্য পরম্পরা বাস্তবের ঘটনার পরম্পরা অনুসরণ করে না। আগের ঘটনা পরে, পরের ঘটনা আগে এভাবে মিলিয়ে-মিশিয়ে দেখানো হয়। এ ধরনের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড়ো উপকারিতা হলো, এতে কাহিনি এমন জটিলভাবে সাজানো যায়, যে চলচ্চিত্রজুড়ে শেষের ঘটনাগুলো সম্পর্কে কিছু কিছু আভাস দিয়ে আকর্ষণও তৈরি করা যায়, আবার মূল রহস্যটা একেবারে শেষ দৃশ্যে এসে উন্মোচিত করা যায়। ফলে পুরো চলচ্চিত্রজুড়েই চলচ্চিত্রটি দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে।


ভুবন মাঝিতে তিন কালের ঘটনা একসঙ্গে পর্দায় তুলে ধরা হয়েছে। ১. মূলকাহিনি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধ। এখানে ৭০-এর নির্বাচন, মুজিবনগর সরকার গঠন, স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, যুদ্ধ, ই পি আর বিদ্রোহ, প্রেম-ভালোবাসা, মুক্তি সংগ্রামে ভারতের অবদান, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহের মুক্তিযুদ্ধকালীন ধ্বংসলীলা তুলে ধরা হয়েছে।


২. এই পর্বে স্থান পেয়েছে ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের বাংলাদেশ। স্বাভাবিক চোখে দেখলে তা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে ভুবন মাঝিতে এসেছে এই সময়ের ঘটনাবলি। প্রামাণ্যচিত্র ধারণ, প্রেম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়টি এ পর্বে পর্যায়ক্রমে উঠে এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো ১৯৭১ ও ২০১৩-এর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছে ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ।


৩. শেষ পর্বে মৌলবাদী চেতনার উত্থান উঠে এসেছে ঘটনার ধারাবাহিকতায়। এখানে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের বাংলাদেশ ঘুরেফিরে এসেছে। সাম্প্রদায়িক চেতনার উত্থান, শাহবাগ আন্দোলন, ব্লগার হত্যা প্রভৃতি প্রাসঙ্গিকভাবে এ অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে। ২০১৩-এর নানা ঘটনার নেপথ্যের কারণ ধরতে ২০০৪-এর পর্ব দারুণ ভূমিকা রেখেছে। তিন কালের তিন ভিন্ন বিষয় একই সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করেছেন ফাখরুল। ১৯৭১, ২০০৪ ও ২০১৩-এর ভিন্ন কাল, ভিন্ন বিষয়, ভিন্ন প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও গল্প বলার গুণে এক ক্যানভাসে উপস্থাপন সম্ভব হয়েছে ভুবন মাঝিতে। বিশ্ব চলচ্চিত্রে এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ক্রিস্টোফার নোলান-এর মেমেন্টো, দ্য প্রেস্টিজ, ফলোয়িঙ, পাল্প ফিকশন-এর কথা উদাহরণ হিসেবে বলা যায়।


পাঁচ.

কাহিনি বা স্টোরি টেলিং পর্বে সতর্কতার সহিত পাড়ি দিয়েছেন ভুবন মাঝির কাহিনি, চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতা ফাখরুল আরেফীন খান। চলচ্চিত্রের ৩২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে একটি লঙ শটে ঘর-বাড়ি পোড়ার দৃশ্য খুবই সাজিয়ে-গুছিয়ে দেখানো হয়েছে, তা দর্শকের কাছে কতোটা গ্রহণযোগ্য হয়েছে তা ভাববার বিষয়। ১৯৭১-এর রাস্তাঘাট, দেয়াল লিখন গল্পের সঙ্গে বেশ মানানসই ছিলো। তবে পাকবাহিনীরা ৭১-এ নিশ্চয় বাঙালিদের ঘরবাড়িতে নান্দনিকভাবে বা সাজিয়ে-গুছিয়ে আগুন দেয়নি! নৃশংসভাবেই দিয়েছে! তাই দৃশ্যগুলো নিয়ে নির্মাতার ভাবনার ঘাটতি নজরে এসেছে। তবে শিল্পনির্দেশনার পাঠটি অন্যান্য দৃশ্যে বেশ সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। ঝিনাইদহ থানা, মাঠ, মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের দৃশ্য, মোটরসাইকেল, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট তৎকালীন সময়ের পরিচয় বহন করে।




ভুবন মাঝির মূল পাত্র-পাত্রী ছিলো কলকাতার অভিনয়শিল্পী পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের অপর্ণা ঘোষ। পরমব্রত তার নিজ অভিনয় সত্তার পুরোটা উজাড় করে এতে অভিনয় করেছেন বলে মনে হয়েছে। চরিত্রটিকে যে তিনি নিজের ভিতর ধারণ করতে পেরেছেন অভিনয়ে তার ছাপ ছিলো। পাকসেনাদের ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের দৃশ্যে গ্রেনেড ছুড়তে গিয়ে প্রাণ হারান একজন মুক্তিযোদ্ধা। চলচ্চিত্রের ৫৫ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডের এই দৃশ্যে ছোটো একটি সংলাপই পরমব্রতকে নিজ গুণে পরিচয় করে দেয়-‘এই এই এই এই মিজান, একে ধরতো হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওই মুহূর্তে তার মুখের অভিব্যক্তি হাজারো সংলাপকে হার মানায়, যুদ্ধের ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে।


গল্পের প্রয়োজনে পরমব্রতর মধ্যে ভীরু ও শান্ত স্বভাবের চরিত্রায়ণ লক্ষণীয়। মইয়ে উঠে বোমা ছোড়ার দৃশ্যে (এক ঘণ্টা ৩৪ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে) নহির চরিত্রের দ্বিমাত্রিক দ্বান্দ্বিক টানাপড়েন তার মুখের অভিব্যক্তিতে দারুণভাবে ভেসে ওঠে। এছাড়া এক ঘণ্টা ছয় মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে নদীর চরে ফরিদা যখন নহিরকে বলেন, ‘তুমি ভারত যাবে? যুদ্ধে যাবে না?’ নহিরের উত্তর, ‘আমার মরতে খুব ভয় করে ফরিদা। ছোট্ট এই সংলাপে জীবনের যে দর্শন থাকে তা বলার ভঙ্গির গুণেই দুর্দান্তভাবে প্রকাশ পায়। এর জন্য আরো অনেক বেশি ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। তাই হয়তো দ্বিধা নেই ‘দুর্দান্ত অভিনয়ে ছবিটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন পরমব্রত। কলকাতার ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয়ে [অভিনয়] তুলে এনেছেন তিনি। ... অভিনয়ের মধ্যে অতিরঞ্জিত কোনোকিছু পাওয়া যায়নি।


মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারীদের শুধু বীরাঙ্গনা হিসেবেই তুলে ধরতে চায় অধিকাংশ নির্মাতা। যদিও ভুবন মাঝি এর ব্যতিক্রম নয়। তারপরও শুরুতে ফরিদা চরিত্রের অপর্ণা রাজনীতি ও সমাজ সচেতন সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে হাজির হন। চলচ্চিত্রের নয় মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে তিনি অসাধারণ ভঙ্গিতে এক সংলাপ বলেন, ‘এই নেন এ সময়ের চিত্রনাট্য। ছয় দফা ইশতেহার নহিরের হাতে তুলে দিয়ে ছোট্ট এই সংলাপ দিয়েই অনেক কিছু বলে ফেলেন ফরিদা। একইভাবে ১৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে ‘দেশের এমন অবস্থায় বীররা যদি রেললাইনে বসে থাকে, তাহলে চলবে? বীরদের লড়াই করতে হয়। এমন সংলাপ ফরিদাকে দিয়ে বলিয়েছেন নির্মাতা। চরিত্র ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে সংলাপগুলোর অসাধারণ প্রক্ষেপণ করেছেন অপর্ণা।


নহিরের বন্ধু মিজান চরিত্রে রূপ দিয়েছেন মাজনুন মিজান। তার অভিনয়ে প্রদেয় পরিস্থিতির সঙ্গে বিশ্বাস, আনন্দ, সমঝোতার সংমিশ্রণ ছিলো লক্ষণীয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে বিশ্বাস করে পুরো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের চেষ্টা ছিলো তার। পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণের সময় (৫৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড) উৎকণ্ঠা, ফিসফিস করে সংলাপ প্রক্ষেপণ, ভয়, উত্তেজনা মিলে যেনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাই হয়ে উঠেছিলেন মাজনুন মিজান।


এছাড়া বড়ো হুজুরের চরিত্রটি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে ধরেছেন মামুনুর রশীদ। যদিও প্রপ্স হিসেবে ব্যবহৃত তার দাড়ি নিয়ে কথা না বললেই নয়। তার পরও অভিনয়ের গুণে তা অনেকটাই উতরে গেছে। কাজী নওশাবা আহমেদ, ওয়াকিল আহাদ, সুষমা সরকার খুব মন্দ করেছে তা নয়, তবে আরো ভালো করার সুযোগ ছিলো। আসলাম চরিত্রে শুভাশিষ ভৌমিক একটু ওভার অ্যাকটিং করেছেন। যদিও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এন্টাগনিস্ট (খলচরিত্র) চরিত্র দর্শক এভাবেই দেখে অভ্যস্ত। তবে এ ধরনের অভিনয়ে শিল্পের মানদণ্ডের ঘাটতি ঘটে ব্যাপক।


ছয়.

পোশাক ও মেকআপ অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ থিয়েটার ও চলচ্চিত্র উভয় শিল্পমাধ্যমের ক্ষেত্রেই। তবে চলচ্চিত্রে তা আরো গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য যে, ক্যামেরার ক্লোজ শটে ত্রুটিগুলো বড়ো করে ধরা পড়ে দর্শকের চোখে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বেশিরভাগ অভিনয়শিল্পীর স্থান, কাল, পাত্রভেদে সঙ্গতিপূর্ণ পোশাক পরিকল্পনা হয়নি ভুবন মাঝিতে। যা চলচ্চিত্রটির মানকে নিম্নগামী করেছে। নহির ও মিজানের পোশাকে বর্তমান সময়ের ছাপ ছিলো স্পষ্ট। রোমান্টিক দৃশ্যে ফরিদার উজ্জ্বল শাড়ি, ব্লাউজ ৭১-এর সঙ্গে কতোখানি যুক্তিসঙ্গত তা ভাববার বিষয়। পোশাক পরিকল্পনার মৌলিক বিষয় হলো সময় ও সামর্থ্যরে বিবেচনা করা। সময়কে প্রাধান্য দেয় সংশ্লিষ্ট পরিকল্পক। ৭১-এর পরিবেশ, পরিস্থিতির সঙ্গে পোশাক পরিকল্পকের চিন্তার বিস্তর ফারাক লক্ষ করা যায়। নহির ও মিজানের পোশাকের ৭১-এর সময়কে কোনোভাবেই প্রতিনিধিত্ব করে না। কারণ সোহেল ও নহিরের পোশাক প্রায় একই ধরনের সময়কে (ডিজাইন ও রঙের ক্ষেত্রে) উপস্থাপন করে।


আবার ফরিদা ও এলির পোশাকের মধ্যে রঙ, ধরন, ডিজাইনে বর্তমান সময়ের ছাপ দৃশ্যমান। কিন্তু দুই প্রজন্মের ঘটনা বা সময়ের ফারাক কখনো ৩৩ বছর আবার কখনো ৪২ বছর ছিলো। চলচ্চিত্রের ১১ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গানের দৃশ্যে পৃথক সময় ও ভিন্ন দুই জুটিকে পর্দায় দেখানো হয় একসঙ্গে। ওই দৃশ্যে ফরিদা নীল ও এলি লাল রঙের শাড়ি পরে ছিলো। শাড়ির ডিজাইন, উজ্জ্বলতা ও পড়ার ধরন ছিলো প্রায় একই। যদিও ১৯৭১ আর ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে শাড়ির রঙ, ডিজাইনে মোটাদাগের ফারাক রয়েছে।


মেকআপের ক্ষেত্রেও আগাগোড়া ত্রুটি ছিলো চলচ্চিত্রজুড়ে। বড়ো হুজুরের দাড়িটা চরিত্রের সঙ্গে বেমানান লেগেছে, আলগা দাড়ি। যেসব চরিত্রের দাড়ি ছিলো প্রায় অধিকাংশেরই একই অবস্থা। তাছাড়া ফরিদাকে অধিকাংশ সময়ই উজ্জ্বল মেকআপে দেখা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনো নারীর মুখাবয়বের ধরন সুনির্দিষ্ট সময় ধরে উপস্থাপনের ঘাটতি ছিলো ভুবন মাঝির। ৭১-এ মফস্বল শহরের কোনো নারীর মুখ নিশ্চয় ফেসিয়াল ও ভ্রু তোলা ছিলো না। এ ধরনের ত্রুটি চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সময়, প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতির সঙ্গে ফরিদার মেকআপের অসঙ্গতিও ছিলো চোখে পড়ার মতো। চলচ্চিত্রে ফরিদা চরিত্রের আবেদনের ঘাটতির যতোটুকু দৃশ্যমান, তার অনেকগুলো কারণের অন্যতম মেকআপের প্রায়োগিক ত্রুটি। এছাড়াও চলচ্চিত্রের দুই ঘণ্টা এক মিনিটে রাজাকার আসলামের দেহরক্ষীর মুখের ক্লোজ শটে অতিমাত্রায় ফাউন্ডেশন মেকআপ জ্বলজ্বল করেছে। পরিস্থিতি ও চরিত্রানুযায়ী ওই ধরনের মেকআপ সাংঘর্ষিক ছিলো।


আলো ও শব্দের ব্যবহারে অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছে দুই পরিকল্পক। এই কারিগরি দিকটির ঘাটতি বাংলাদেশের অধিকাংশ চলচ্চিত্রেই লক্ষণীয়। ভুবন মাঝির শব্দ ও আলোর ব্যবহার প্রশংসার দাবি রাখে। চলচ্চিত্রের ৪২ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে রাস্তার পাশে মুক্তিযোদ্ধা ও ই পি আর বাহিনী অবস্থানের সময়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী রাতের আলো ও গাড়ির শব্দ দারুণ উত্তেজনা তৈরি করে দর্শকের মনে। আলো-শব্দের খেলার এ ধরনের অনেক দৃশ্যই রয়েছে ভুবন মাঝিতে।


সাত.

সম্পাদনা গুণেও অনেক চলচ্চিত্র নিম্নমান থেকে শৈল্পিকমানে অধিষ্ঠিত হয়। আবার একই ত্রুটির কারণে চলচ্চিত্রের মান হয় নিম্নগামী। ভুবন মাঝিতে সম্পাদনা গুণে ছোটোখাটো অনেক ত্রুটি দর্শকের চোখের আড়ালে ছিলো। চলচ্চিত্রের প্রথম দিকে মাদ্রাসার দৃশ্যে ছোটো হুজুরের সংলাপ, ‘হুজুর আপনি একজন বেশরোয়া ফকিরের জন্যে দোয়া করলেন? এইডা আপনি কী করলেন হুজুর?’ সংলাপের পর বড়ো হুজুরকে মিড শট-এ লো অ্যাঙ্গেল থেকে দেখানো হয় দাঁতন হাতে। ওই দৃশ্যে ২০১৩ সময়কাল থেকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের কুষ্টিয়া শহরের রাস্তার একটি গলির দৃশ্য দেখানো হয়। এই দৃশ্য দিয়ে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে খুবই যুক্তিযুক্তভাবে সংযোগ ঘটানো হয় ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের। যা সৃজনশীল সম্পাদনা গুণেই সম্ভব হয়েছে। ‘নন লিনিয়ার বা এলোমেলো গল্পকে এক ক্যানভাসে যুক্তিসঙ্গতভাবে উপস্থাপন করা চাট্টিখানি কথা নয়। তিন সময়ের গল্প এক ধারায় বলার অসঙ্গতিকে শৈল্পিকভাবে সঙ্গতিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে শুধু চমৎকার সম্পাদনার গুণের জোরে। তাছাড়া হিতে-বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাও ছিলো। কারণ ছবিটির মূল চমক এর এডিটিং বা সম্পাদনায়। প্যারালাল এডিটিং বা সমান্তরাল সম্পাদনার মাধ্যমে ১৯৭১, ২০০৪ ও ২০১৩ সালের অবস্থা একই সঙ্গে দেখানো হয়েছে। ১৯৭১ সালের অবস্থার সঙ্গে ২০১৩ সালে অস্থিতিশীল দেশের পরিস্থিতির একটি সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। চমৎকার সম্পাদনায় দুই সময়ের সংগ্রামের গল্প ফুটে উঠেছে। প্রথমটি স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম আর দ্বিতীয়টি মৌলবাদীদের হাত থেকে স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম।


ভুবন মাঝির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন প্রয়াত কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। এতে মোট ছয়টি পূর্ণাঙ্গ গানের ব্যবহার রয়েছে। ছয়টি গানের ব্যবহার যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়াও মৌলিক গানের ব্যবহার সমৃদ্ধ করেছে ভুবন মাঝিকে। এক ঘণ্টা ২৭ মিনিট এক সেকেন্ডে ‘আমি তোমারই তোমারই তোমারই নাম গাই/ আমার নাম গাও তুমি গানটি একই সঙ্গে মাতৃভূমি ও প্রেমিকার জন্য যুদ্ধের রোমান্টিক ইঙ্গিত বহন করে। যুদ্ধের মধ্যে জীবন তো থেমে থাকে না। প্রেম-ভালোবাসা নিয়েই মানুষ পুনরায় স্বপ্ন দেখে। তা যেমন দেশমাতৃকাকে ঘিরে, তেমনই কোনো ব্যক্তিমানুষকে নিয়েও।


এক ঘণ্টা দুই সেকেন্ডে ‘ছিলো ছায়ায় ঘেরা, পাখি ডাকা, মায়া ঘেরা ঘর ধীর লয়ের এ গানটির আবেদন করুণ রসের উদ্বেগ ঘটায়। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের দেশত্যাগের সঙ্গে এই গানটির আবহ তৎকালীন যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার জানান দেয়। এছাড়াও নহির ও মিজানের কলকাতা যাওয়ার পথে (এক ঘণ্টা ১৪ মিনিট ২০ সেকেন্ডে) ‘পদ্মা নদীর নৌকা ভিড়লো গানটিও অসাধারণ।


চলচ্চিত্রজুড়ে আবহসঙ্গীতের প্রয়োগও প্রশংসার দাবি রাখে। আবহসঙ্গীতে প্রধান চমক ছিলো সুর-তাল-লয় ঠিক রেখে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার নিরীক্ষামূলক মিশ্রণ। চলচ্চিত্রের শুরুতেই টাইটেল কার্ড দেখানোর সময় আবহসঙ্গীতই দর্শককে চলচ্চিত্রের মধ্যে ঢুকাতে শুরু করে। পাকিস্তানি ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধার নিথর দেহ পড়ে থাকার দৃশ্যে (৫৭ মিনিট ১০ সেকেন্ড) করুণ বাঁশির সুর দর্শকের গায়ের লোম খাঁড়া করে। যুদ্ধের সিরিয়াস মিউজিক যেমন দর্শককে সিরিয়াস করে তোলে, পাশাপাশি রোমান্টিক দৃশ্যে ফরিদার কানে নহির দুল পরিয়ে দেওয়ার সময় (এক ঘণ্টা সাত মিনিট ২০ সেকেন্ড) ‘লীলাবালি লীলাবালি বড়ো যুবতি সই গো, বড়ো যুবতি সই গোর আবহের সুরে মুগ্ধ হয় দর্শক। এছাড়াও নহিরের বোমা ছোড়ার দৃশ্যের (এক ঘণ্টা ৩৪ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড) আবহসঙ্গীত দর্শককে চুম্বকের মতো আটকে রাখে ঘটনার সঙ্গে। চলচ্চিত্রের সঙ্গীত আয়োজক হিসেবে এটাই শেষ কাজ ছিলো কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের। এরপরই সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।


আট.

একটি চলচ্চিত্রের ভিত তৈরি হয় নানা দর্শন, চেতনা, মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনীতির চেতনার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবের ফলে। একটু গভীরভাবে খোঁজ করা যাক, ভুবন মাঝির নেপথ্যের নানা চেতনা ও দর্শনের অস্তিত্ব। ভুবন মাঝিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার লড়াই শুরু থেকেই নানা সংলাপের মধ্যে বিরাজমান। ফরিদার বড়ো ভাইয়ের সংলাপ (২৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ড) ‘পাকিস্তান! এখনো পাকিস্তান চাস?’ সেবিকার মুখে শোনা যায় (এক ঘণ্টা ৪০ মিনিট ২০ সেকেন্ড), ‘যারা আমাদের শেকড়হীন করলো, এতো এতো মানুষদের হত্যা করলো, তাদের বিরুদ্ধে লড়বেন না?’ এসব সংলাপ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উৎকৃষ্ট উদারণ। ফাখরুল খুব সচেতনভাবে নানা চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে চেয়েছেন ভুবন মাঝিতে। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও কী, এই দেশটি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন? নির্মাতা বার বার এ প্রশ্ন রেখেছেন চলচ্চিত্রের নানা দৃশ্যে,


বিজয়ের এই ৪৭ বছরে হিসেবের খেরোখাতা হাতে আমাদের দাঁড়াতে হয় আমাদেরই মুখোমুখি। জাতি হিসেবে আমাদের সকল অর্জন ও ব্যর্থতার চেহারা আমরা চিনে নিতে চাই। আমরা প্রায়ই যে শব্দটি ব্যবহার করি মুক্তিযুদ্ধের প্রতিজ্ঞাকে মনে করতে, সেই বহুল ব্যবহৃত অথবা অতি ব্যবহারে জর্জরিত ‘চেতনা নামক শব্দের ভাবকে আমরা কতোটুকু ধারণ করলাম, লালন করলাম, আমাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্পচর্চা এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের জীবনে? পূর্ব-প্রজন্মের কাছ থেকে উত্তর-প্রজন্মের কাছে কী কী ‘বস্তু হাতবদল হল এই সমগ্র সময়ে?


অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার দায় থেকে এ সঙ্কটগুলো ভুবন মাঝিতে উঠে এসেছে ক্যামেরার চোখ দিয়ে। নিঃসন্দেহে শুধু নির্মাতা হিসেবে নয়, সামাজিক দায় থেকেই এমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন নির্মাতা। যা চেতনার শক্তি ছাড়া আদৌও সম্ভব নয়। একটি জাতির সাংস্কৃতিক মুক্তি যদি না মেলে, তাহলে জাতি হিসেবে তা বিশ্বের দরবারে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে বারংবার। এই সঙ্কটকে মাথায় রেখেই সংস্কৃতিকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো ৭১-এ। ‘একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একদল তরুণ কলকাতায় নাট্যচর্চার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হন। তারা যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে এলে শুরু হয় নতুন এক অভিযাত্রা।১০ মুক্তিযুদ্ধে সাংস্কৃতিক চেতনার প্রভাব ও সংস্কৃতিকর্মীদের অবদান চলচ্চিত্রে বড়ো করে তুলে ধরেছেন নির্মাতা।


ভুবন মাঝির প্রধান চরিত্র নহির ও ফরিদা দুজনই সংস্কৃতিকর্মী। সহঅভিনেতা মিজানও থিয়েটারকর্মী। তবে তারা থিয়েটারকে রাজনীতির বাহিরে দেখে না। যা ফরিদার সংলাপে বোঝা যায় (নয় মিনিট ২০ সেকেন্ড), ‘থিয়েটার রাজনীতির বাইরে নয়, এই নিন এ সময়ের চিত্রনাট্য। ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসলে পাকিস্তানিরা রবীন্দ্রসঙ্গীত বন্ধ করে দিতো। কারণ তৎকালীন পাকিস্তানবিরোধী প্রতিবাদের অন্যতম ভাষা ছিলো রবীন্দ্রসঙ্গীত। কলকাতার ‘আকাশবাণীর যুদ্ধকালীন অবদানও চোখে পড়ে দর্শকের।


৭১-এ সংস্কৃতিকর্মীদের অবদান এবং একইভাবে ২০১৩-তে এসেও ৭১-এর পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এ প্রজন্মের ভূমিকার উঠে এসেছে ভুবন মাঝিতে। নহির ও মিজান ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। পক্ষান্তরে সোহেল ও এলি ২০১৩-তে এসে একই চেতনায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে রাজপথে পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে। নিঃসন্দেহে এটি সাংস্কৃতিক চেতনার অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ। পৃথক সময়ে নহির (এক ঘণ্টা ছয় মিনিট ২০ সেকেন্ড) ও সোহেল বলে ওঠেন (এক ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড)-‘আমার যে মরতে বড়ো ভয় লাগে। এই সংলাপের মধ্য দিয়ে পৃথক সময়ে একই ধরনের ভীতির ইঙ্গিত করে সংযোগের চেষ্টা হয়েছে।১১


মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ইতিহাস স্বীকৃত। এজন্য নির্মাতা খুবই সচেতনভাবে বার বার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭০-১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের নানা ভিডিও ফুটেজ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণার জন্য সবাই যখন অপেক্ষা করছিলো, তখন নহির ই পি আর ক্যাম্পের সবাইকে মনে করিয়ে দেন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের কথা। এছাড়া প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে লালন দর্শনের প্রভাব ভুবন মাঝিতে দৃঢ়ভাবে প্রতীয়মান। চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে নহির লেখাপড়ার জন্য কুষ্টিয়া শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন, ওই দৃশ্যে একটি ক্লোজ শটে দেখানো হয় (পাঁচ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড) লালন সাঁইয়ের বাঁধানো ছবি। নির্মাতা খুব পরিকল্পিতভাবেই মনে হয় এই শট্টি ব্যবহার করেছেন। পুরো চলচ্চিত্রেই লালন দর্শন জাগ্রত বিবেকের ভূমিকা পালন করে।


এছাড়া ২০১৩ এসেও নহির শাহ্ বা আনন্দ শাহ্রা মুক্ত নয়। তাদের চেতনার ওপর হায়েনারা আঘাত হানছে সুযোগ বুঝে। নহির ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে রাজনীতি না করেও মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন; হারিয়েছেন ভালোবাসার মানুষকে। ২০১৩-তে এসেও মুক্তিযোদ্ধা নহির পুরনো শত্রুর নজর থেকে মুক্ত নন। তাদের চেতনাকে সুযোগ বুঝে গলা টিপে ধরে পুরনো শত্রুরা।


নয়.

ভুবন মাঝিতে আলাদা আলাদা দৃশ্যে প্রয়োজন অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন লেন্সের শট্ লক্ষণীয়। যাতে প্রত্যেক শটের ভিতরে স্বতন্ত্র অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। লঙ শটের ব্যবহারগুলো শিল্পের মাপকাঠিতে বা শৈল্পিক দৃষ্টিতে অসাধারণ সংযোজন বলতে হয়। রাজাকার আসলামকে গুলি করার দৃশ্যে লঙ শটে আবছা নীল আলোতে মাঝ নদীতে নৌকায় নহির, মিজান, আসলাম ও তার দেহরক্ষীকে একটি ফ্রেমের ভিতরে চোখে পড়ে। এই ফ্রেমটি নতুন অর্থ খুঁজতে সমালোচকদের পথ দেখায়। এছাড়া রাতের দৃশ্য বা যুদ্ধের দৃশ্যগুলো নির্মাতা জীবন্ত করে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন। ফরিদা ও নহিরের প্রেম-ভালোবাসার দৃশ্যগুলো সঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়েছে। প্রেম-ভালোবাসা জীবনেরই অংশ, এই উপলক্ষ দেখাতে গিয়ে মূল লক্ষ্য থেকে পথভ্রষ্ট হননি ফাখরুল। এখানে লক্ষ্য হলো মুক্তিযুদ্ধ আর উপলক্ষ প্রেম-ভালোবাসা।


সিম্বলের ব্যবহার লক্ষ করা যায় ভুবন মাঝিতে। ফরিদার মুখে যখন শোনা যায়, ‘পত্রিকায় পড়লাম ভুট্টো অধিবেশনে আসছে না। তখন একটি ক্লোজ শটে দেখা যায়, ফণা তোলা গোখরা সাপ ফসফস শব্দ করছে। ২৫ মার্চ রাতে বাঙালিদের ওপর ঠিকই ছোবল মেরেছিলো ভুট্টো মানে পাকিস্তানিরা। এছাড়া ভাসমান কচুরিপানা ও বাচ্চাদের লাটিম খেলার শট্ অনেক তাৎপর্যপূর্ণ সিম্বল হিসেবে হাজির হয়েছে-৭১-এ বাঙালির দেশত্যাগ এবং ২০১৩-তে এসেও পরাজিত শক্তির উত্থান বোঝাতে।


দশ.

চলচ্চিত্রটির স্টোরি টেলিং নিয়ে প্রশংসা করেছি অনেক আগেই। তবে নির্মাতা ন্যারেটিভ ভাঙলেও নারীর গতানুগতিক উপস্থাপন থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি।

যুদ্ধ-চলচ্চিত্র এমন একটি জরার প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে নারী খুব কমই প্রধান ভূমিকায় থাকেন। বৈশ্বিক যুদ্ধ-চলচ্চিত্রের প্রেমওয়ার্কেও মূলত যেসব চরিত্রে তাঁদের দেখা যায়, সেসব হল-নার্স, মা, প্রেমিকা-বান্ধবী, প্রতিরোধ যোদ্ধা, সৈনিক, কদাচিৎ অফিসার এবং অবশ্যই অসহায় শিকার।১২


ভুবন মাঝিতে নারীর সেই গতানুগতিক উপস্থাপনই চোখে পড়ে। চলচ্চিত্রের শুরু থেকে ফরিদাকে অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন নারী হিসেবে উপস্থাপন করেন নির্মাতা। যে নারী তার প্রেমিককে ৭১-এর চিত্রনাট্য হিসেবে ছয় দফা হাতে তুলে দেন; যুদ্ধে যেতে উৎসাহী করেন; নাটকের মধ্যে বিপ্লব খোঁজেন। অথচ যুদ্ধ শুরু হলে সেই ফরিদাকে অনেকটা গৃহবন্দি হয়ে থাকতে দেখা যায়। ঘরে শুয়ে-বসে প্রেমিকের কথা ভাবা, চিঠি পড়া ছাড়া তার যেনো আর কাজ নেই। এক ঘণ্টা তিন মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে ফরিদাদের বাড়ির ছাদে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গোপন সভায় যদিও তাকে দেখা যায়, সেটা মোটেও অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, চা পরিবেশনকারী হিসেবে। এছাড়া দিনশেষে আর দশটা মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের মতোই ভুবন মাঝিতেও নারীর ‘ইজ্জতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেজন্যই হয়তো এক ঘণ্টা ৪১ মিনিটে নৌকায় আসলাম রাজাকারকে মারতে গিয়ে মিজানকে প্রশ্ন করতে দেখা যায়, ‘ওই কুত্তার বাচ্চা এ পর্যন্ত কতোজনের ইজ্জত নিছোস?’ একটু পরে মিজান আরো বলেন, ‘ফরিদার ইজ্জত নিছোস ক্যান? ক (বল), ফরিদার ইজ্জত নিছোস ক্যান?’ ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা কেন্দ্রে একজন নারীকে সেবিকা হিসেবে দেখা যায়। নহিরের চাচাতো বোনকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানিরা। নারী মানেই সেই ধর্ষণ, সেবিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী, বীরাঙ্গনা!


এগারো.

নহির ভারতের বিহার থেকে চিঠি লেখেন ফরিদার কাছে। সেই চিঠিতে তিনি ট্রেনিং ক্যাম্পের তিনটি ভয়ের কথা উল্লেখ করেন-শেয়াল, সাপ আর নকশাল। বনে শেয়াল, সাপ না হয় থাকে, কিন্তু নকশাল কেনো! এ নিয়ে কথা বলার জন্য একটু পিছন ফিরে দেখা যেতে পারে। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ছোটো একটি গ্রাম নকশালবাড়িতে ‘নকশালবাড়ি আন্দোলনের সূচনা হয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদ) একাংশ তাদের নেতৃত্বের বিরোধিতা করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদ-লেনিনবাদ) নামে একটি পৃথক সশস্ত্র দল গঠন করে। এর নেতৃত্বে ছিলো চারু মজুমদার, কানু স্যানাল, সুশীতল রায়চৌধুরী ও জঙ্গল সাঁওতাল প্রমুখ। চারু মজুমদার চিনের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুঙ-এর অনুসারী ছিলেন। নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষকদের ওপর স্থানীয় ভূ-স্বামীদের ভাড়াটে গুন্ডারা অত্যাচার চালাতো। কৃষকরা জোট হয়ে ভূ-স্বামীদের সেখান থেকে উৎখাত করে। এই আন্দোলন খুব দ্রুত পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য ইন্দিরা গান্ধী সরকার কঠোর হাতে নকশালবাড়ি আন্দোলন প্রতিহত করে। এই রকম একটা সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। নকশালবাড়ি আন্দোলনকে বাংলাদেশে সমর্থন দেয় কমিউনিস্ট পার্টির আবদুল হক ও তোহা গ্রুপ। তারা সেসময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ি অভিহিত করে, এতে সর্বহারার কোনো লাভ হবে না বলে এর বিরোধিতা করে। এর ফলে তখন মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী ভারত সরকার, নকশাল ও মুক্তিযোদ্ধা সবমিলে একটি নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বর্তমান ভারতে প্রায় ৪০ শতাংশ অঞ্চলে সেই মাওবাদী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের রাজনীতিকদের একাংশ মনে করে, দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সর্বাপেক্ষা বড়ো হুমকি এখন এই মাওবাদ। স্বাধীনতার এতো বছর পরে বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্রে হঠাৎ করেই শুধু এক শব্দে ‘নকশাল-এর অবতারণা, বিশেষ কাউকে খুশি করার জন্য কি না, তা নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক।


ভুবন মাঝিতে ঘুরেফিরে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেসময়ের রাজনীতি, জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা-ধর্ষণ নানা ঘাত-প্রতিঘাত পর্দায় তুলে ধরেছেন ফাখরুল। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ। যুদ্ধে এ দলের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণ বেশি ছিলো নিঃসন্দেহে। এক ঘণ্টা ২৪ মিনিট পাঁচ সেকেন্ডে কলকাতায় নহির তার বক্তৃতায় বলেন, ‘২৫ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগদের বাড়িতে পাকিস্তানিরা ঢুকে পড়ে এবং নির্বিচারে তাদের হত্যা করতে থাকে। শেষ দিকে ফরিদার বাবাকে উদ্দেশ করে রাজাকার আসলাম বলেন, ‘চাচা আপনেরা যে আওয়ামী লীগ করেন, সেসব কথা পাকিস্তান আর্মিকে আমি এখনো বলি নাই। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম অত্যাচারের কথা নানাভাবে চলচ্চিত্রে এসেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তো আরো অনেক রাজনৈতিক দল সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলো। তারাও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। অথচ চলচ্চিত্রজুড়ে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের নাম একবারও শোনা যায় না! এমনকি এ নিয়ে পুরো চলচ্চিত্রে কোনো ইঙ্গিতও নেই।


৯/১১-এর পর সারা পৃথিবীতে ‘ভালো এবং ‘খারাপ মুসলমানের এক ধারণায়ন চালু হয়েছে। ভুবন মাঝিও এর বাইরে যেতে পারেনি। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৪২ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে দেখা যায়, বড়ো হুজুর বলছেন, ‘কালাম তুমি কোরানে হাফেজ, তুমি ওদের মাপ করে দেও। পক্ষান্তরে ছোটো হুজুরকে বলতে শোনা যায়, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে। এছাড়া চলচ্চিত্রজুড়ে আনন্দ শাহের মৃত্যু নিয়ে সংঘাত, তা নিয়ে প্রচারণা, শহর থেকে রাজনৈতিক ক্যাডার ডাকা, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়েও ভালো ও খারাপ মুসলমানের নানা কর্মকাণ্ড দর্শকের নজরে আসে। পুরো পৃথিবীতে এ ধরনের ‘ফেনোমেনন-এর সুবাদে শাসনকার্য পরিচালনা করছে প্রভাবশালীরা। এটা এখন দখলদারিত্বের অন্যতম হাতিয়ার।


তার মানে বর্তমান দুনিয়ায় ‘মুসলমান পুরোদস্তুর রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিচয় যাকে দিতে হয় তার যেমন রাজনীতি আছে, যার কাছে দিতে হয় তারও রাজনীতি আছে। পরিচায়কের রাজনীতি হলো, তিনি মুসলিমদের এই পরিচয়ের মাধ্যমে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর দুনিয়ার একচ্ছত্র পশ্চিমা আধিপত্যকে ইচ্ছা-নিরপেক্ষভাবে স্বীকার করেন। আর পরিচয়গ্রহীতার রাজনীতি হলো, ‘খারাপ মুসলমানের মিথকে সামনে ঝুলিয়ে গোটা মুসলিম সমাজকে দিয়ে এর দায় বহন করানোর নৈতিক বৈধতা অর্জন করা।১৩ তবে ভুবন মাঝিতে এলি একটি দৃশ্যে সোহেলকে পাঞ্জাবি পরে বাইরে বের হতে বলেন। কিন্তু সোহেল পাঞ্জাবি পরে বের হন না। ফোনে কথা বলার সময় এলি তা নিয়ে খানিকটা রেগে গেলে সোহেল বাধ্য হয়ে (১১ মিনিট ১৯ সেকেন্ড) তার অফিসের এক কোর্তা-টুপি পরা যুবকের সঙ্গে পোশাক অদল-বদল করেন। সেই যুবকের কোর্তা পরে এলির সঙ্গে দেখা করতে যান সোহেল। তাদের এই পোশাক বিনিময়ের দৃশ্যটি খারাপ ও ভালো মুসলমানের ফেনোমেনন-এ নতুন মাত্রা যোগ করে। এর মধ্য দিয়ে নির্মাতা কিছুটা হলেও খারাপ ও ভালো মুসলমান বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।


বারো.

বাংলাদেশে বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রের বাইরে দর্শকের আগ্রহ যথেষ্ট কম। পর্যাপ্ত প্রেক্ষাগৃহও ভাড়া পায় না এ ধাঁচের চলচ্চিত্রগুলো। এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের স্টেরিওটাইপ ভাবনার বাইরে গিয়ে ভুবন মাঝি নির্মাণের চেষ্টা করেছেন নির্মাতা। এলোমেলোভাবে গল্প উপস্থাপন করেও কোনো চলচ্চিত্রকে যে নান্দনিক পর্যায়ে নেওয়া যায় তার প্রমাণ ভুবন মাঝি। প্রতিষ্ঠিত নানা দর্শনের সঙ্গে নির্মাতা তার নিজস্ব দর্শনের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে চলচ্চিত্রটিকে অনন্যতা দিয়েছেন। তবে এর মধ্য দিয়ে অনেক বিষয়ে তিনি আলোচনার দ্বার উন্মোচন করেছেন।


কোনো শিল্পই শতভাগ সফল হয় না; আর যদি পূর্ণাঙ্গভাবে কোনো শিল্প সফল হয়, সেটি আর শিল্প থাকে না। প্রত্যেক শিল্পের স্রষ্টার উদ্দেশ্য থাকে সেই শিল্প দ্বারা রসিকের মন আস্বাদন করা। সেই তর্কে ভুবন মাঝি সৃষ্টিতে তার স্রষ্টা অনেকটাই সফল।


লেখক : সুজন নাজির, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বর্তমানে থিয়েটারের পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যুক্ত রয়েছেন।


sujonnazeer91@gmail.com


তথ্যসূত্র


১. মাসুদ, তারেক; ‘মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র : চলচ্চিত্রের মুক্তিযুদ্ধ; হালখাতা; সম্পাদনা : শওকত হোসেন ও শরমিন নিশাত; বর্ষ ৮, সংখ্যা ১, ২০১৪, ঢাকা, পৃ.২৯।

২. http://www.risingbd.com/risingbd-special-news/248316; retrieved on: 14.04.2018

৩. প্রাগুক্ত; মাসুদ (২০১৪ : ২৯)।

৪. সরকার, শিহাব; ‘মুক্তিযুদ্ধের ছবি : লুণ্ঠিত বিবেক; হালখাতা; সম্পাদনা : শওকত হোসেন ও শরমিন নিশাত; বর্ষ ৮, সংখ্যা ১, ২০১৪, ঢাকা, পৃ.৩৪।

. http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29574852; retrieved on: 15.04.2018

৬. http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29574852; retrieved on: 15.04.2018

৭. https://www.ntvbd.com/entertainment/118605/; retrieved on: 20.04.2018

৮. https://www.ntvbd.com/entertainment/118605/; retrieved on: 20.04.2018

৯. মামুন, বেলায়াত হোসেন; ‘বিজয়ের চার দশকে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র; হালখাতা; সম্পাদনা : শওকত হোসেন ও শরমিন নিশাত; বর্ষ ৮, সংখ্যা ১, ২০১৪, ঢাকা, পৃ.৪৯।

১০. ভৌমিক, মলয়; ‘বাংলাদেশের নাটক : নতুন দিগন্তের প্রতিভাস; নীললোহিত; সম্পাদনা : বাসদ দাশগুপ্ত; জুলাই-ডিসেম্বর ২০১১ ও জানুয়ারি-জুন ২০১২, কলকাতা, পৃ.২৫৩।

১১. ntvbd.com/entertainment/118605/; retrieved on: 20.04.2018

১২. গায়েন, কাবেরী (২০১৩ : ১১৯); ‘গেরিলা : সেলুলয়েডে মুক্তিযোদ্ধা নারীর প্রথম স্বীকৃতি; বাংলাদেশের অন্য সিনেমা তৃতীয় খণ্ড; সম্পাদনা : সুশীল সাহা; অভিযান পাবলিশার্স, কলকাতা।

13. http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2010-03-21/news/50539; retrieved on: 25.04.2018

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন