অমিত খান্না ভাব-ভাষান্তর : সোহেল রান
প্রকাশিত ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
প্রাযুক্তিক বিলাসিতায় বলিউডের বেরসিক যাত্রা
অমিত খান্না ভাব-ভাষান্তর : সোহেল রান

এমন কোনো ভারতীয় নেই, যাকে চলচ্চিত্রের সর্বাত্মক প্রভাব স্পর্শ করেনি। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে গত শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র ছিলো দেশটির প্রভাবশালী বিনোদনের মাধ্যম। ভারতের মানুষের জীবনধারা, সামাজিক আচরণ এবং সাংস্কৃতিক প্রবণতাগুলো অনেকাংশে চলচ্চিত্র দ্বারা প্রভাবিত হতো। তারকাবহুল আর সঙ্গীতসমৃদ্ধ ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বব্যাপী প্রভাব ছিলো আমাদের এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশটিতে।
৫০-এর দশকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শবাদ বা ৬০-এর দশকের রোমান্স, অপরাধ, ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে ধর্ম, যৌথ পরিবার ব্যবস্থার পুনর্গঠন বা নিছক পল্লিব্যবস্থা থেকে শহুরে অভিবাসনের মূল্যবোধ চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু যাই হোক না কেনো স্বাধীনতার পর থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত ১২ হাজার প্রেক্ষাগৃহে চার কোটির বেশি দর্শকের যাতায়াত ছিলো। তারপর যখন হঠাৎ টেলিভিশনের আগমন ঘটে এবং এর মাধ্যমে জনপ্রিয় বিনোদনের গতির পরিবর্তন ঘটে; বিশেষ করে ৯০ দশকের শুরুতে যখন স্যাটেলাইট চ্যানেল যেমন, ‘জিটিভি’, ‘স্টার টিভি’, ‘সনি এন্টারটেইনমেন্ট’ আসে।
পুরো দেশে না হলেও বেশিরভাগ শহর এবং নগরের লাখ লাখ ঘর স্থানীয় অপারেটরদের মাধ্যমে ক্যাবল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। এতে মানুষ মাসিক স্বল্প খরচে বিনোদন ও তথ্যের মিশ্র সুবিধা লাভ করে। এটা ধারাবাহিকভাবে দর্শক হারিয়ে বন্ধ হতে থাকা প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি প্রভাবিত করে ভগ্নপ্রায় চলচ্চিত্রকে। বর্তমানে ভারতীয় চলচ্চিত্র এমন একটা অবস্থার মধ্যে আছে, যখন সামাজিক ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
এবার হিন্দি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি, যা বলিউড নামে পরিচিত, তার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। গত কয়েক দশক ধরে এটা ছিলো এমন একটা ক্ষেত্র যা হাজারো স্বপ্নকে লালন করতো। যে সময় খ্যাতিমান সব ব্যক্তি যেমন, ৩০ ও ৪০-এর দশকের ভি সান্তারাম, মেহবুব খান ও দেভকি বোস; ৫০-এর দশকে বিমল রায়, রাজ কাপুর ও গুরু দত্ত; ৬০-এর দশকে বিজয় আনন্দ, রাজ খোশলা ও যশ চোপড়া এবং ৭০-এর দশকে রমেশ সিপ্পি, প্রকাশ মেহরা ও মনমোহন দেশাই কাজ করতেন।
তবে বর্তমানে অনুসরণীয় কোনো চলচ্চিত্রনির্মাতা নেই বললেই চলে। এমনকি ৯০-এর দশকেও সুরাজ ভার্জেতিয়া, আদিত্য চোপড়া ও করণ জোহরের মতো নির্মাতারা আইকনিক স্ট্যাটাস অর্জন করেছিলেন। বর্তমানে কয়েকজন নির্মাতা যেমন, রাজকুমার হিরানি, এস এস রাজামৌলি, রহিত শেট্টি অনেক বড়ো সাফল্য পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। বলিউডের তিন খান আমির, শাহরুখ এবং সালমান বিশেষ তারকাখ্যাতি অর্জন করলেও, তাদের দুই দশকের সাফল্যের সঙ্গে আরো অনেক কিছু করতে হবে। সর্বশেষ সুপারস্টার, যিনি এখনো সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন, তিনি অমিতাভ বচ্চন।
আজ বলিউডে কোথায় সেই মধুবালা, নারগিস, সাধনা, হেমা মালিনি এমনকি শ্রীদেবীর মতো নায়িকারা? নেই হেলেন, বিন্দু কিংবা অরুণা ইরানির মতো নৃত্যশিল্পী; নেই প্রাণ, আমজাদ খান বা অমরেশ পুরীর মতো পর্দার খলনায়ক কিংবা জনি ওয়াকার, মেহমুদ, অসরানী’র মতো কৌতুকাভিনেতা। আমি মনে করি, গত শতাব্দীর শেষ অবধি বলিউডে যে জৌলুস ছিলো, সেটা অতি চাকচিক্য প্রদর্শনের কারণে হারিয়েছে। অতি প্রচার চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুকে ছাপিয়ে গেছে, পণ্যের অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন এবং টাকার বিনিময়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচার জন্য তারকাদের উপস্থিতির কারণে তাদের তারকাখ্যাতি হারিয়ে গেছে। তবে এটা ঠিক যে, আজকের তারকাদের তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে অনেক বেশি টাকা আছে, কিন্তু পূর্বসূরিদের মতো তাদের তারকাখ্যাতি নেই।
তাহলে প্রশ্ন, ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ ও প্রচার সত্ত্বেও চলচ্চিত্র তার জৌলুস ও আবেদন হারাচ্ছে কেনো? এর জন্য চলচ্চিত্র দেখার ক্লান্ত-শ্রান্ত মাধ্যমই অনেকাংশে দায়ী। আগ্রাসী বিপণন ব্যবস্থা এবং কিছু কারিগরি ব্যবস্থার মাধ্যমে যেনোতেনোভাবে টিকিয়ে রাখা হিন্দি চলচ্চিত্র দেশটির প্রধান বিনোদন হিসেবে তার প্রাধান্য হারিয়েছে।
বর্তমানে শত কোটি লোক তাদের টেলিভিশনে পাঁচশোর বেশি চ্যানেল থেকে যেকোনো একটি দেখার মাধ্যমে দিনের নির্ধারিত অবসর সময় কাটাতে পারছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির বদৌলতে পুরো নতুন বিশ্বব্যবস্থা এখন অনলাইন বিনোদননির্ভর এবং মোবাইলফান সেট কেন্দ্রিক বিনোদন ভারতীয়দের জীবনে, বিশেষ করে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের জীবনে প্রাধান্যবিস্তার করতে শুরু করেছে। বর্তমানে আই পি এল ম্যাচগুলোই বলিউড চলচ্চিত্রের চেয়ে বেশি দর্শককে আকৃষ্ট করে। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফ আই সি সি আই) ও দ্য কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সি আই আই)-এর বিভিন্ন বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী এবং শিল্প প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী টানা পাঁচ বছর ধরে চলচ্চিত্রের এই নিম্নমুখী ধারা। শুধু তাই নয়, বর্তমানে প্রেক্ষাগৃহ আছে আট হাজার দুইশোটি, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দেও যার সংখ্যা ছিলো ১৩ হাজার।
অতিরিক্ত চলচ্চিত্র-নির্মাণ (ভারতে প্রতিবছর ২০টি ভাষায় ১৫শোর বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়), প্রেক্ষাগৃহের স্বল্পতা এবং সেই সঙ্গে তিন হাজারের বেশি প্রেক্ষাগৃহে একই সঙ্গে একই চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার ফলে বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই দুই সপ্তাহের বেশি টিকতে পারে না। ফলে চলচ্চিত্রের ব্যবসাটা তাৎক্ষণিকভাবে বড়ো সাফল্য অর্জন করলেও খুব দ্রুতই তা শ্লথ হয়ে যায়। এ অবস্থায় চলচ্চিত্রগুলোর কথা এক শুক্রবার থেকে পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত মানুষের মনে থাকে, তারপর তা শত শত টেলিভিশন চ্যানেলে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং যা একটা নিরবচ্ছিন্ন চক্রে চলতেই থাকে।
শুধু চটকদার ও পারিবারিক কাহিনিনির্ভর রোমান্টিক কমেডি ধাচের চলচ্চিত্রগুলোই বক্স অফিসে ভালো সাড়া ফেলে বলে মনে হচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে জীবনীধর্মী কিছু চলচ্চিত্রও দর্শককে আকর্ষণ করছে। হিন্দি চলচ্চিত্র তার প্রাধান্য হারাচ্ছে বলে আঞ্চলিক চলচ্চিত্রের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু মেধাবী তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতা আছে, কিন্তু তারা বৃহত্তর মূলধারার শ্রোতা-দর্শকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, শিল্পনৈপূণ্য আজ অনেক উন্নততর এবং আমাদের অনেক কলাকুশলী ও অভিনয়শিল্পী বিশ্বমানের, কিন্তু মধ্যযুগীয় নিয়মনীতিই এ ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করছে। যেহেতু যেকোনো বিষয়ে মানুষের মনোনিবেশের সময় কমে যাচ্ছে এবং অতিরিক্ত ডিজিটাল বিনোদনব্যবস্থা মানুষের মনকে বিশৃঙ্খল করে দিচ্ছে, ফলে খুব কম সংখ্যক লোকই চলচ্চিত্র দেখতে যাচ্ছে। এটা নিশ্চিত যে, অনেক বেশি লোক বাড়িতে বসে চলচ্চিত্র দেখছে; তবে পরিবার কিংবা প্রিয়জনকে নিয়ে বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার প্রবণতা কমে এসেছে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের সমস্যাগুলোর অন্যতম পরিবর্তনের প্রতি অনীহা। সবসময়ই নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এর ধীরগতি দেখা যায়। শুধু তাই নয়, এখানে বিষয়বস্তু বা উপস্থাপনায় কোনো নতুনত্ব নেই। তবে এটা ঠিক যে, এখন চলচ্চিত্রে ভালো প্রোডাকশন ডিজাইন করা হয় এবং এটি দর্শককেও কাছে টানছে। কিন্ত তার পরও অপ্রথাগত কাহিনির কারণে এটা গ্রহণযোগ্য কাঠামোর বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এটা সত্য যে, টিভি এবং বর্তমানের ডিজিটাল মাধ্যমগুলো দর্শককে বেশি আকৃষ্ট করছে। এখানে প্রেক্ষাগৃহ ছাড়াও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনেক মাধ্যম রয়েছে। বেশিরভাগ চলচ্চিত্রপ্রেমীর আগ্রহটা তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চলচ্চিত্রবিষয়ক আন্তর্জাতিক উৎসবে আমাদের উপস্থিতি প্রকৃতপক্ষে কমে আসছে, যেহেতু আমাদের নির্মাতারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় আত্মতৃপ্ত থাকে।
সঙ্গীত, যা দশকের পর দশক ধরে আমাদের চলচ্চিত্রের প্রতীক ছিলো, তা এখন ধার করা শব্দ ও ধ্বনির পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। অস্বাভাবিক রকমের বাজনা গানের সুরকে আড়াল করে দিচ্ছে এবং গানের কথাগুলোও প্রায় পুরোটাই অর্থহীন। যেমন, সারকায়ো লো খাটিয়া, তু হে মেরা ফ্রাই কিংবা চিকনি চামেলি। সত্যিকার অর্থে এখানে এ আর রহমান ছাড়া কোনো সুরকার নেই। এ আর রহমানকে ৬০-এর দশকের সুরকারদের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কোরিওগ্রাফি নেই বললেই চলে, এমনকি একটি রোমান্টিক গানও কেনো জানি শারীরিক কসরতের শো হয়ে ওঠে। তাই আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকে না, যখন একটি গান মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তার আবেদন হারিয়ে ফেলে। কখনো কখনো দৃশ্যায়ন অতি চটকদার, কিন্তু মারপিটের দৃশ্য এতোটাই প্রবল এবং অতিরঞ্জিত যে, তা নিতান্তই এক হাস্যকর বস্তুতে পরিণত হয়। কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই সমাজ বিচ্ছিন্নতা পুরোপুরি দৃশ্যমান।
চলচ্চিত্রের মাধ্যমটি পুনর্বিন্যাসের পর্যায়ে আছে। প্রযুক্তি ও অবসর কাটানোর বিকল্প কিছু মাধ্যম যেমন, গেমিংয়ের দ্বারা এটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ায় একে অবশ্যই একটা নতুন গতিপথ খুঁজে বের করে নিতে হবে। স্বল্পকাল স্থায়ী মনোযোগ উপযোগী বর্ণনা কৌশল এবং আরো শক্তিশালী কাহিনি নির্ভরতা এটার একটা উপায় হতে পারে। যেটা আমাদের মেনে নিতে হবে, তা হলো নিত্য নতুন মাধ্যমের সুবিধা এবং চলচ্চিত্রের কাঠামো উভয়ই প্রতিনিয়ত পুনর্বিন্যাস হচ্ছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টায় একদিন হয় এবং প্রত্যেক মিনিটই কিছু না কিছু নতুন দাবি রাখে। অর্থও বিভিন্ন নতুন নতুন খাতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
এই অবস্থায় বলিউডকে করণীয় সমস্ত কিছুই করতে হবে। তার রাজস্ব মডেলের পুনর্নির্মাণ করতে হবে, বাজার বাড়াতে হবে, উৎপাদন খরচ কমাতে হবে এবং নতুনত্ব আনতে হবে। সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন যেটা আনতে হবে সেটা হলো, প্রেক্ষাগৃহ ছাড়াও অন্যান্য খাত থেকে আয়ের রাস্তা খুঁজে বের করা। যেমনটা আমি উল্লেখ করেছি, অবসরে বিকল্পের বহুমুখী সুবিধার কারণে চলচ্চিত্রের গল্পের বর্ণনা কাঠামো নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। দর্শকের প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার জন্য একটি আকর্ষণীয় কারণ থাকা দরকার, অন্যথায় তারা অন্যান্য মাধ্যমে চলচ্চিত্র দেখতে চাইবে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য চলচ্চিত্রকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে।
ভারতে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। তবে এখানে উন্মুক্তভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অভিপ্রায়ের ঘাটতি আছে। চলচ্চিত্র, বিশেষ করে বলিউডকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এটা দ্রুত পরিবর্তন হবে এবং নতুন বিনোদন মাধ্যমের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবে নাকি আরো নিচের দিকে ধাবিত হবে।
লেখক : অমিত খান্না, চলচ্চিত্রনির্মাতা, প্রযোজক, কবি, গীতিকার। ১৫ বছর ধরে তিনি ভারতের রিলায়েন্স এন্টারটেইনমেন্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
সোহেল রানা, সমকাল-এ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন