সারা মনামী হোসেন
প্রকাশিত ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ডুব : বিষাদের জালে ক্যামেরার সুর
সারা মনামী হোসেন
1771250927.jpg)
সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে ছোট্ট একটি নৌকা। সুবিশাল জলরাশির সামনে নিঃসঙ্গ, একাকী। ঠিক যেনো চলচ্চিত্রটির প্রধান চরিত্রের মতো। জীবন যাকে অনেক কিছু দিয়েছে। সম্পদ, প্রভাব-সবকিছু। কিন্তু তারপরও সে ছিলো শূন্য। তার মনকে বুঝতে পারার মতো মানুষ যেমন সে পায়নি, তেমনই নিজেকে কারো সামনে নিঃসঙ্কোচে মেলেও ধরতে পারেনি ফারুকী এর আগেও তার চলচ্চিত্রে ক্যামেরার বিভিন্ন কৌশল দেখিয়েছেন। পিঁপড়াবিদ্যার অনেক জায়গায় ফ্রেম উইদিন অ্যা ফ্রেমের ব্যবহার ছিলো। আবার এমন একটি শট্ ছিলো, যেখানে চাবি দেওয়া পুতুল দাঁড়িয়ে নাচে। সেসময় মিঠু আর মিনাকে বেডরুমে কথা বলতে শোনা যায়, কিন্তু দেখা যায় না। এছাড়া মিড ক্লোজ শট্ আর ক্লোজ শটের ভালো ব্যবহার করেছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ডুব মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সপ্তম চলচ্চিত্র। জীবন দর্শন আর টানাপড়েন এখানে একই সূত্রে গাঁথা। চলচ্চিত্রের গল্পটি সাধারণ। জাভেদ হাসান একজন স্বনামধন্য চলচ্চিত্রনির্মাতা। স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে তার পরিবার। জাভেদের চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পী নিতু, যার সঙ্গে তিনি একসময় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ভাঙন শুরু হয় দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা সংসারে। নির্মাতার মেয়ে সাবেরি মেনে নিতে পারেনি বন্ধু নিতুর সঙ্গে বাবার সম্পর্ক। স্ত্রী মায়া, সংসারই ছিলো যার জগৎ, তিনিও দূরে চলে যান। একসময় জাভেদ বিয়ে করেন নিতুকে। সংসার সাগরে যখন এক নৌকা ডুবছে, অন্যদিকে তখন জন্ম নিচ্ছে নতুন জীবন।
ভাঙা-গড়ার এই খেলায় জাভেদ বরবারই নিঃসঙ্গ থেকে গেছেন। বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করা জাভেদ-মায়ার মধ্যে ফিকে হয়ে পড়েছিলো ভালোবাসার রঙ। আবার নিতুর সঙ্গে জীবনে প্রেম এলেও, নিজ সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা তিনি সেভাবে প্রকাশ করতে পারতেন না। চলচ্চিত্রের শেষে দেখা যায়, মৃত্যুর পরও তার শব নিয়ে চলছে টানাটানি। কোথায় হবে তার শেষ ঠিকানা! অবশেষে তার ব্যক্তিগত ফিল্ম সিটি নয়নতারায় চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। এই মৃত্যুই আবার তার কাছাকাছি এনে দেয় সন্তান আর মায়াকে। এজন্যই বুঝি, পাহাড়ের মাঝে হেঁটে চলার সময় জাভেদ মায়াকে বলেছিলেন, ‘মাঝে মাঝে দূরে যেতে হয়, কাছে আসার জন্যে’।
২.
ডুব-এর সিনেমাটোগ্রাফার শেখ রাজিবুল ইসলাম। যিনি ইট-কাঠকে অবয়ব দেওয়ার পরিবর্তে জীবন্ত করে চলেছেন মানুষের অনুভূতিকে। বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ থেকে পাস করা রাজিবুল হাসান তাই সিনেমাটোগ্রাফিকে নিজস্ব ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। যেখানে নির্মাতা তাকে গল্প শোনান, আর তা তিনি তুলে ধরেন ক্যামেরার চোখে। একজন সৃষ্টিশীল নির্মাতার সহায়ক হিসেবে শিল্পমান নিশ্চিত করার দায়িত্বের একটি বড়ো অংশ সিনেমাটোগ্রাফারের ওপর বর্তায়। তাই ফারুকী যখন ক্যামেরার কারিকুরি দিয়ে নতুন একটি পথ খোলার চেষ্টা করলেন, সিনেমাটোগ্রাফার তাতে সাহায্য করেছেন। আর সেজন্য ডুব-এর সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে আলোচনা চলছে।
৩.
ডুব-এর কাহিনি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক নাকি ফারুকীর নিজস্ব, তা নিয়ে শুরু থেকেই বির্তক ছিলো। তবে যতো তর্ক-বির্তকই থাকুক, যে বিষয়টি নিয়ে দর্শক একমত হবে, সেটি হলো ডুব-এর চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি। সিনেমাটোগ্রাফার রাজিবুল যেভাবে গল্পের মূলভাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চলচ্চিত্র-ভাষা তৈরি করেছেন তা প্রশংসাযোগ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ চলচ্চিত্রে অনেকবার ‘ফ্রেম উইদিন ফ্রেম’ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ চলচ্চিত্রে প্রতিটি শটের যে ফ্রেম থাকে, তার মধ্যে আরেকটি ফ্রেম তৈরি করা। এতে বিষয়বস্তু আরো সুনির্দিষ্ট হয়ে ওঠে, মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। কাহিনিতে গভীরতা নিয়ে আসে। সেই সঙ্গে আছে টপ শট্, লঙ শট্, হাই অ্যাঙ্গেল শট্, মিড শট্, ক্লোজ আপ শট্, রিভার্স শট্, ক্যান্টেড শটের (সাধারণত চরিত্র বা পরিস্থিতির টালমাল অবস্থা, অস্বস্তি, পাগলামি এসব বোঝাতে একটু বাঁকা করে এ ধরনের শট নেওয়া হয়) ব্যবহার। যা কাহিনি বর্ণনায়, সময়ের প্রয়োজনে চলচ্চিত্রটিকে গতিশীল রেখেছে। বস্তু বা প্রকৃতিকে চিত্রায়ণ করা হয়েছে চরিত্র ও ঘটনার মনোভাব বোঝাতে। যে নিঃসঙ্গতা, হাহাকার চলচ্চিত্রজুড়ে বলার চেষ্টা করা হয়েছে, ক্যামেরার চোখ তা ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে।
চলচ্চিত্রে ক্যামেরার কাজ সম্পর্কে বেলা বালাজ তার ‘থিওরি অফ দ্য ফিল্ম : গ্রোথ অফ আ নিউ আর্ট’ গ্রন্থে বলেছেন, ক্যামেরার সাহায্যে যে চলচ্চিত্র তৈরি হয়, তা একটি সৃজনশীল সৃষ্টি। বাস্তবের পুনরুৎপাদন নয়।১ অর্থাৎ এখানে যে ইমেজটি তৈরি হয়, সেটি বাস্তবতার প্রতিরূপ মাত্র। সুতরাং, বাস্তবতা আর চলচ্চিত্রের মধ্যে থাকা বাস্তবতার পার্থক্যটাই চলচ্চিত্রকে শিল্পে পরিণত করে। হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা : কারিগরি ভাষা’ প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, শিল্পে সৌন্দর্য সম্বন্ধে জার্মান চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক আর্নহাইম বলেছিলেন, ইমেজকে হতে হবে বাস্তবের অতিরিক্ত কিছু অর্থাৎ অর্থময়ভাবে আয়োজিত।২
৪.
ডুব-এর শুরুতেই দেখা যায়, সাবেরি আর নিতু পাশাপাশি বসা। স্কুলের পুনর্মিলনী উপলক্ষে সব বন্ধু এক জায়গায় জমায়েত হয়েছে। ক্যামেরা প্যান করে সাবেরি আর নিতুকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় শৈশবে। দুই বন্ধু একসঙ্গে বসে টিফিন খেতে খেতে গল্প করছে। ওপেন ফ্রেমের ব্যবহারের মাধ্যমে নিতুর কণ্ঠ শোনানো হলেও তার অভিব্যক্তি দেখানো হয় না। অর্থাৎ সিনেমাটোগ্রাফার যখন আশপাশের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তার প্রধান চরিত্র বা বিষয়বস্তুর স্থান নির্ণয় করে, তখন সেটি হয় চলচ্চিত্রের ফ্রেম। আর পরিচালক যদি ফ্রেমের ভিতর শটের কমপোজিশন এমনভাবে নির্ধারণ করেন, যাতে মনে হয় এটি ফ্রেমের বাইরে, তাহলে একে বলা হয় ওপেন ফ্রেম।৩ চলচ্চিত্রের ফ্রেমিংকে তাই বলা হয়, কমপোজিশনের মূলনীতি। যা চলচ্চিত্রের সাবজেক্টকে মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সাদামাটা কোনো দৃশ্যকে অর্থ দান করে এবং কাহিনিকে সহজে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।
ডুব-এ ক্লোজ ফ্রেমের পাশাপাশি ওপেন ফ্রেমের বেশ ভালো ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। ডুব-এর গল্প যখন পিছিয়ে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে চলে যায়, তখন ওপেন ফ্রেমে শট্ নেওয়া হয়। ১৭ বছর বয়সি মায়া তখন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস তরুণ জাভেদের সঙ্গে ঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। ক্লোজ শটে দেখা যায়, একজনের হাতে কিশোরী মায়ার ছবি। তিনি কারো কাছে মায়া সম্পর্কে জানতে চাইছেন। এ শটের শুরুতে বোঝা যায়নি ব্যক্তিটি কে এবং তিনি কার সঙ্গে কথা বলছেন। হাতটি একসময় কলম তুলে নিয়ে ডায়েরি খুলে বসে। স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের শট্ দর্শকের মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়-এখানে কে বা কারা, কেনো? এর পরের শটেই জানা যায়, হাতটি একজন পুলিশের আর তিনি কথা বলছিলেন মায়ার বাবা শওকত সাহেবের সঙ্গে। জাভেদের বর্ণনা দেওয়ার সময়ও একই ফ্রেম পাওয়া যায়। যেখানে পুলিশ একজন হাস্যোজ্জ্বল যুবকের ছবি ক্যামেরার সামনে ধরে। এতে করে দর্শকের মনে প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দেয়, হাতে ধরা ছবিটি কার। পরের সংলাপেই দর্শক জেনে যায়, এটি জাভেদের ছবি।
চলচ্চিত্র নির্মাণে নির্মাতা ও সিনেমাটোগ্রাফারের সম্পর্ক
হয় হরিহর আত্মা। দুই জনের কল্পনা ও পরিকল্পনার মিশেলে তৈরি হবে শিল্প। তবে কল্পনার
আল্পনা কাঁটায় সিনেমাটোগ্রাফারের স্বাধীনতা থাকবে না, তা নয়। সিনেমাটোগ্রাফার নির্মাতাকে
সঙ্গে নিয়ে তার ভাবনা কাহিনির সুনির্দিষ্ট টোনে ফেলতে পারলেই চলচ্চিত্র অর্থবহ হয়ে
ওঠে। ফারুকী গল্পটি মাথায় নিয়েছিলেন ফ্রেমের ভিতরে ফ্রেম রেখে (Frame
within a frame)|)। রাজিবুলও তাই দর্শককে এই আঙ্গিকে গল্প শুনিয়েছেন। তিনি ব্যবহার করেছেন
হাই অ্যাঙ্গেল শট্, ওয়াইড লঙ শট্, মিড শট্, ক্লোজ আপ শট্, এক্সট্রিম ক্লোজ আপ শট্,
টিল্ট ডাউন শট্। কোনো দৃশ্যে ফ্রেমের ভিতরে ফ্রেমের গুরুত্ব এই যে, এ ধরনের ফ্রেমিং
প্রধান চরিত্র বা বিষয়টির প্রতি মনোযোগকে আরো বাড়িয়ে তোলে। এটি কাহিনির গভীরতাকে আরো
দৃঢ় করে। যেমন, মায়ার বাবা কয়েকজন লোক নিয়ে মেয়েকে খুঁজতে বেরিয়েছেন। গাড়ির দৃশ্যটিতে
ছাদের উপরে একটু অংশ রেখে মিড শটে এমনভাবে নেওয়া হয়েছে যে, আরেকটি ফ্রেমে তারা উপস্থিত
হয়েছে। গাড়ি চলন্ত অবস্থায়, পরে একটি খাবার হোটেলে পৌঁছানো-সব জায়গায় দরজা, জানালাকে
মূল ফ্রেমের ভিতর আরেকটি ফ্রেম হিসেবে দেখানো হয়। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়
একবার বলেছিলেন, কলাকৌশল কখন জরুরি হওয়া দরকার তা শুধু পরিচালক বুঝতে পারেন। অর্থাৎ
একজন পরিচালক যখন কোনো গল্প ভাবতে শুরু করেন, তখনই তার মাথায় শটের হিসাব চলে আসে। কোন
পরিপ্রেক্ষিতে কোন শট্ তিনি ব্যবহার করতে চান বা কীভাবে ব্যবহার করতে চান, সেটি মোটামুটি
তৈরি হয়ে থাকে। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডার দিয়ে তিনি পর্দায় দৃশ্যটি কেমন দেখাবেন, তার
হিসাব কষতে শুরু করেন। বিষয়টি এমন যে, হুট করে কোনো শট্ নেওয়ার মতো ঘটনা চলচ্চিত্রে
ঘটে না। দর্শককে নাড়া দেওয়ার জন্য ক্যামেরার কৌশলগত সব দিক পরিচালকের পরিকল্পনা অনুসারে
হয়। সিনেমাটোগ্রাফারকে তিনি পরিস্থিতি বা বিষয়বস্তু বুঝিয়ে দেন। সিনেমাটোগ্রাফার চেষ্টা
করেন সেটি বাস্তবায়ন করার। সুতরাং নির্মাতা যেভাবে চান একটি চলচ্চিত্র সেভাবেই সৃষ্টি
হয়। তিনি চাইলে একটি সহজ বিষয়ের ভিন্ন অর্থ দাঁড় করাতে পারেন। আবার জটিল কোনো সমীকরণকে
সহজে তুলে আনতে পারেন।
চিত্র- ১
ডুব-এ জাভেদ তার মেয়ে সাবেরির সঙ্গে লঞ্চে করে কোথাও যাচ্ছেন। সেখানকার একপাশে জানালার শিকের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে এক চিলতে নদী। মেয়েকে তিনি শোনাচ্ছেন তার বাবার গল্প। মারা যাওয়ার আগে যিনি তার ছেলেকে বলেছিলেন, মানুষ মারা যায় তখন, যখন পৃথিবীর কাছে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। নদীর বয়ে চলা স্রোত যেনো বলে চলে জীবনটা এমনই। সবার প্রয়োজন একদিন ফুরিয়ে যায়। জীবন কেটে যেতে থাকে জীবনের নিয়মে। এই দৃশ্যের চমৎকার দিকটি হলো, শুরুতে দর্শকের মনে হতে পারে, ওই জানালার ফাঁক দিয়ে তিনি তাকিয়ে আছে। কিন্তু পরের শটে দেখা যায়, সাবেরি ও তার বাবা জানালার সামনে বসে আছেন।
চিত্র- ২
অর্থাৎ ফ্রেম উইদিন অ্যা ফ্রেম-এর ভাষাটি এমন যে, কেউ তার বাড়ির জানালা বা দরজা দিয়ে কোনো ঘটনা দেখছে। ডুব-এ আরেকটি দৃশ্যে সাবেরির জন্য জাভেদ উপহার কিনে এনেছেন। কিন্তু ততোদিনে মেয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করায় বাবার সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করে দিয়েছেন সাবেরি। বাবার দেওয়া উপহার সাবেরি দারোয়ানের হাতে ফেরত পাঠান। এ সময় গাড়ির পিছনের কাঁচ দিয়ে দৃশ্যটি দেখা যায়। এতে দর্শকের মনে হয়, সে ওই গাড়িতে উপস্থিত। গাড়িতে বসে বসে সে দৃশ্যটি দেখছে। এতে ওই দৃশ্যের সঙ্গে দর্শকের সরাসরি একটি সংযোগ তৈরি হয়।
চিত্র- ৩
ক্যান্টেড শটের ব্যবহার পাওয়া যায় ডুব-এ। সাধারণত চরিত্রের বা পরিস্থিতির টালমাল অবস্থা, অস্বস্তি, পাগলামি এসব বোঝাতে একটু বাঁকা করে এ ধরনের শট্ নেওয়া হয়। একে অনেক সময় ডাচ অ্যাঙ্গেলও বলে। চলচ্চিত্রের এই ভাষা ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট ওয়েন পরিচালিত বিখ্যাত জার্মান চলচ্চিত্র দ্য ক্যাবিনেট অব ডক্টর ক্যালিগারিতে প্রথম ব্যবহার করা হয় বলে জানা যায়।৪ ডুব-এ ২৫ মিনিট নয় সেকেন্ড চলার সময় দেখা যায়, নিতু-জাভেদের সম্পর্ক পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় মায়া সবাইকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেছেন। পত্রিকার সংবাদটি সম্পর্কে জাভেদের তখনো কোনো ধারণা নেই। বাসায় কেউ নেই টের পাওয়ার পরও হতবিহ্বল জাভেদ ডাকতে থাকেন মায়াকে। এ শটের ফলে তার মানসিক অবস্থা অনুমান করতে কারো কষ্ট হয় না।
৫.
এছাড়া নয়নতারায় একা একা দুপুরের খাবার খাওয়া, রাতে দেয়াল টপকে চলে আসা নিতুর সঙ্গে জাভেদের গল্প, বাবার জন্য সাবেরির পানি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা, নিতুর পাঠানো খাবার নেওয়া, পুরনো ভাঙা বাসের দরজা দিয়ে ছোট্ট সাবেরির দেখা কিংবা মায়ার কাছে জাভেদের সময় চাওয়ার দৃশ্যগুলো বেশ দৃষ্টিনন্দন। একই সঙ্গে ওয়াইড লঙ শটে নেওয়া পাহাড়ি ঝরনার সামনে বাবা-মেয়ের বসে থাকার দৃশ্য, পাহাড়ের চূড়ার ছোটো ঘর, গোধূলির আভায় ঢাকা ব্যস্ত শহরও আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে। এখানে অ্যাটমোসফেয়ারিক ডিটেইলের ব্যবহারে কোনো অতিরঞ্জন ছিলো না। ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ বইয়ে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, বিমূর্ত বা অ্যাবস্ট্রাক্ট শিল্প ছাড়া সব শিল্পে বিষয়বস্তুর ব্যবহার আছে। আর স্থান, কাল, পাত্র, মনের ভাব-সবকিছুর বর্ণনাতে তাই ডিটেইলের প্রয়োজন আছে। তাই বিষয়বস্তুকে সমৃদ্ধ করাই থাকে এর উদ্দেশ্য।৫ মানুষ একটি পরিবারকে বস্তুগতভাবে যেমনটি চিন্তা করে, তার পরিবেশ তেমনই ছিলো। দেয়ালে ঝোলানো জাভেদ-মায়া অথবা সাবেরি-জাভেদ-আহিরের ছবি, মন খারাপ করে থাকা সাবেরির পাশে উল্টানো টেডি বিয়ার বা তার চঞ্চল বিড়ালটি, যে সাবেরির পা ধরে ঝুলতে থাকে কিংবা নয়নতারায় ৫১ মিনিট নয় সেকেন্ডে পাওয়া জাভেদের ঘরের দেয়ালে টাঙানো তার ধারাবাহিক ছবি, মাটির ভাস্কর্য, বাইরের দেয়ালে বিভিন্ন চলচ্চিত্রের পোস্টার, আবার চলচ্চিত্রের শেষে সাবেরি ও নিতুর মাঝে থাকা বাতাসার ঠোঙা দেখতে পাওয়া যায়। আবার এক ঘণ্টা ১১ সেকেন্ডে জাভেদ তার মেয়ের জন্য উপহার পাঠিয়ে বাইরে অপেক্ষা করেন। নির্জন রাস্তায় একজন ঝালমুড়িওয়ালা ডাক দিতে দিতে পাশ কেটে যান। এই ডিটেইলও এখানে যোগ হয়েছে। এছাড়া এ সময় টপ অ্যাঙ্গেলে সাদা তিনটি সমান্তরাল বিদ্যুতের তার দেখা যায়। তারের একদিকে জাভেদ আরেকদিকে সেই ঝালমুড়ি বিক্রেতা। মাঝে সাবেরির জন্য অপেক্ষা। যার হয়তো শেষ নেই।
এছাড়া ডুব-এ আলো ও রঙের উপস্থিতি ছিলো লক্ষণীয়। এ দুইটি উপাদান যেহেতু ঘটনাকে আরো অর্থবহ করে, তাই চলচ্চিত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। আধা ফিকে টোনের ব্যবহার আছে সব জায়গায়। বেশিরভাগ সময়ে প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যেহেতু চলচ্চিত্রজুড়ে একটি শূন্যতা অনুভব করা যায়, তাই হয়তো উজ্জ্বল আলোর ব্যবহার তেমন করা হয়নি। হঠাৎ মনে হয়, ব্যক্তিমানুষের নিত্যকার জীবনের আলোটাই সেখানে খেলা করছে। এছাড়া চরিত্রের গুরুত্ব বোঝাতেও যে রঙের ব্যবহার হয়, সেটিও রাজিবুল দেখিয়েছেন। মায়ার বাবা শওকত সাহেব যখন পুলিশ স্টেশনে জাভেদের বাবার পাশে বসে থাকেন, তখন তার পরনে ছিলো লাল রঙের শার্ট আর ছেলের বাবার পরনে সাদা পাঞ্জাবি। আর পাহাড়ি রাস্তায় হেঁটে বেড়ানো জাভেদ-মায়ার পরনে হালকা রঙ। তাত্ত্বিকভাবে মূল চরিত্ররা হালকা রঙেই প্রকাশ পায়। তবে এখানে সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে তাদের দাম্পত্য জীবনের রঙ ফিকে হয়ে যাওয়ার অনুভূতি। চলচ্চিত্রে নেতিবাচক চরিত্রদের জন্য গাঢ় রঙ ব্যবহার করা হয়। যা এখানে নিতুর ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এছাড়া চলচ্চিত্রের শুরুতে ও শেষে মোটামুটি উজ্জ্বল রঙে দেখা যায়, সাবেরি ও নিতুকে। কারণ প্রিয় মানুষটি হারিয়ে গেলেও জীবন থেমে থাকে না।
আবার কোনো কোনো সময় চরিত্রের জন্য অপেক্ষার অনুভূতির তৈরি হয়েছে। সংবাদপত্রে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর মায়া তার মায়ের বাড়ি চলে যান। বাড়ির দোতলায় সাবেরি অপেক্ষা করতে থাকেন তার বাবার জন্য। কিন্তু বাবার পায়ের আওয়াজ শুনেই তিনি দ্রুত ঘরে চলে যান। ক্যামেরা প্যান করে সিঁড়ির সামনে থামে। কয়েক সেকেন্ড পর জাভেদকে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে দেখা যায়। ওই কয়েক সেকেন্ড দর্শকও জাভেদের জন্য অপেক্ষা করে। পরে নয়নতারায় তিনি থাকতে শুরু করলে একদিন নিতু এসে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন। সেখানেও দর্শক কয়েক সেকেন্ড জাভেদকে দেখতে পায় না।
কোনো ধরনের কথা ছাড়াই বাবা-মেয়ের মানসিক অবস্থা ফুটে উঠেছে কয়েকটি শটে। তার মধ্যে একটি হলো, পত্রিকায় জাভেদ-নিতুর বন্ধুত্ব সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশ হলে সাবেরি স্কুল থেকে পালিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। নিজের গন্তব্যে ফেরার ইচ্ছে নেই-এমনভাবে পা টেনে টেনে ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়ি বেয়ে তিনি নামতে থাকেন (২৪ মিনিট ১৩ সেকেন্ড)। এ দৃশ্য দেখানোর জন্য সিনেমাটোগ্রাফার রাজিবুল শটে আনেননি সাবেরির চেহারাকে; মিড শটে এনেছেন সাবেরির পা জোড়া। ঠিক এর পরের শটে জাভেদ তার ঘরের সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকেন দ্রুততার সঙ্গে। কারণ সকালের চা এখনো খাওয়া হয়ে ওঠেনি। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে তখনো তিনি ওয়াকিবহাল নন। ফলে আর দশটা দিনের মতোই শুরু হয়েছে তার সকাল। সেখানেও একই ধরনের শট্ ব্যবহার করেন সিনেমাটোগ্রাফার। কিন্তু সাবেরির দিনটা ছিলো অন্যদিনের তুলনায় আলাদা। তাই এই দুই চরিত্রের পা জোড়ার উপস্থাপনও ভিন্ন।
৬.
ডুব-এ ছোটো ছোটো কয়েকটি দৃশ্য আছে, যা বেশ চমৎকার। এর মধ্যে একটি হলো, নয়নতারায় নিতুর মুখের ওপর জাভেদের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। নিতু এরপরও গাড়িতে বসে জাভেদের দরজা খোলার অপেক্ষায় থাকেন। একসময় মুষলধারে বৃষ্টি নেমে গাড়ির ছাদ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। ক্লোজ আপ শটের এ দৃশ্যটি দেখে মনে হয়, মানুষের মনের কষ্ট-গ্লানি সব ধুয়ে-মুছে যাচ্ছে। এই বৃষ্টির পর হয়তো মাথার উপর থাকবে ঝকঝকে আকাশ। অন্যদিকে এর পরের দৃশ্যেই দেখা যায়, বিমর্ষ মায়া অন্যান্য সব দিনের মতো রান্নার কাজে ব্যস্ত। মায়ার বিমর্ষতা উঠে এসেছে পাশে থাকা চকচকে ফ্রিজের মধ্যে। চলচ্চিত্রের শেষের দিকে, আহিরের সঙ্গে দেখা করার পর জাভেদ বাড়ি ফিরেছেন। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর দৃশ্যটি প্যান করে চলে যায় মৃত ব্যক্তির জন্য চলতে থাকা কোরআন তেলাওয়াতের দিকে। জীবনের পরই মৃত্যু। দৃশ্যটি হঠাৎ করে একটু থমকে দেয় দর্শককে। আবার অন্য দৃশ্যে সাবেরির কষ্টের প্রতিফলন হয়েছে জানালার কাঁচে। আবার জাভেদের লাশ যখন পৌঁছাচ্ছে তার অন্তিম ঠিকানায়, মায়া তখন নিজের চুল থেকে পানি ঝরাচ্ছেন অন্যান্য দিনের মতো। কানে দুল পরছেন, জাভেদের ছবি আবারও সাজিয়ে রাখছেন।
বেশিরভাগ সময় চরিত্রগুলোর হাঁটা-চলার দৃশ্যে ক্যামেরা প্যান করা হয়েছে। একটি গতি এসেছে এতে। যারা দেখছে তাদের মনে হতে পারে, তারাও চরিত্রগুলোর সঙ্গে হাঁটছেন। চরিত্র যখন ধীরে হাঁটছে, ক্যামেরার মুভমেন্ট তখন ধীর। আবার যখন স্বাভাবিক গতিতে হাঁটছে, তখন ক্যামেরার গতিও তার সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে। সিনেমাটোগ্রাফার অনেক সময় ক্যামেরা হাতে নিয়ে চরিত্রদের সঙ্গে থেকেছেন। একজন সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, ক্যামেরাও উঠছে। আবার কেউ এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাচ্ছে, ক্যামেরা সেভাবে প্যান করা হচ্ছে। এছাড়া ৫০ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে আরেকটি প্যানিং শট্ আছে, যেখানে জাভেদ বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছেন। বুকে হাত ভাঁজ করে নয়নতারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। গাড়ির ভিতরে বসে ক্যামেরা প্যান করা হচ্ছে। এ সময় মূল ফ্রেমের ভিতরে গাড়ির জানালা আরেকটি ফ্রেম তৈরি করেছে। ভাবটি এমন, দর্শক জাভেদকে দেখতে দেখতে মাথা ঘুরিয়েও দেখার চেষ্টা করছে তিনি শেষমেষ পৌঁছালেন কিনা।
এছাড়া জাভেদের মনের একটি অংশ পড়ে থাকতো সন্তানদের কাছে। সন্তানের কণ্ঠ শোনার আকুলতায় তিনি ফোন দেন মেয়েকে। কিন্তু সাবেরি কোনো কথা বলেন না। এখানে একজন বাবার অনুভূতি বোঝাতে ক্লোজ আপ শটের ব্যবহার করা হয়েছে। একটি দৃশ্য আছে, ছেলের সঙ্গে বাবা দেখা করতে এসেছে। টপ অ্যাঙ্গেলে দেখা যায়, আহিরকে জড়িয়ে ধরেছেন বাবা। এটিকে মিলনাত্মক দৃশ্য বলা যেতো। কিন্তু জাভেদ ও তার সন্তানদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তাকে ইঙ্গিত করেছে টপ শটে দেখানো সেই তিনটি সমান্তরাল বৈদ্যুতিক তার। অর্থাৎ এ সম্পর্ক আর কোনোদিন কোনো বিন্দুতে গিয়ে মিলবে না। ব্যবধান থেকেই যাবে। এছাড়া ছেলে আহিরের সঙ্গে কথা বলার সময় জাভেদের চোখে পানি দেখা যায়। দৃশ্যে কোনো বিষয় স্পষ্ট করা ও বৈচিত্র্য আনার জন্য সাধারণত এ ধরনের শট্ ব্যবহার করেন সিনেমাটোগ্রাফাররা।৬
ডুব-এর শেষের দিকের কিছু দৃশ্য কিছুটা ভিন্নতা আছে। ওপেন ফ্রেমিংয়ে জাভেদের মৃত্যুর পর সুর করে পড়তে থাকা কোরআন তেলাওয়াত দেখানো হয়েছে। একই ফ্রেমে মৃতের বাড়িতে আত্মীয়-স¦জন, পরিচিতজন, টপ শটে বাড়ির লনে রাখা লাশ, এরপর লাশের সঙ্গে গাড়িবহর ও দোয়া পড়া, নয়নতারায় মানুষের ঢল এবং সবশেষে লাশ কাঁধে নিয়ে সবাই উচ্চস্বরে দোয়া পড়তে পড়তে যাচ্ছে-ধারাবাহিকভাবে এগুলো দেখানো হয়েছে। মুভমেন্টগুলো দেখানোর ক্ষেত্রে টপ শট্, মিড শট্ আর লঙ শটের ব্যবহার ছিলো। গাড়ি বহর বা শব কাঁধে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ক্যামেরা কিছুটা ওপার থেকে ধরার কারণ হলো, এতে ঘটনার ছন্দ বোঝাটা সম্ভব হয়। এমনভাবে এসব দেখানো হয়েছে যে, তাতে দর্শকও একাত্ম হয়ে পড়ে। মৃত্যুর পর জাভেদকে মায়ার বাড়িতে দেখা যায়। চারিদিক ঘুরে ঘুরে একসময় তিনি বলে ওঠেন-মৃত্যু ভালোবাসা-মমতা-সম্মান সব ফিরিয়ে দেয়। শেষের এই শট্গুলোতে মানুষের উপস্থিতিকে সেভাবেই দেখানো হয়েছে। নিতুকে বিয়ে করে জাভেদ হয়তো অনেকের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যু তাকে আবারও সবার কাছাকাছি এনে দিয়েছে।
ক্যামেরার মাধ্যমে দর্শক-মনে সামান্য অস্বস্তিও তৈরি করেছেন রাজিবুল। জাভেদের মৃত্যুর খবর পান মায়া; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সন্তানদের জানান না। মিড লঙ শটে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে তিনি সন্তানদের শোবার ঘরে উঁকি দেন। নিজের ঘরে ঢুকে আয়নায় মুখ দেখেন। এর মধ্যে একজন অপরিচিত ব্যক্তি মায়ার বাসায় আসেন। তিনি বসে চা পান করতে থাকেন। এদিক-সেদিক তাকান। কিছুক্ষণ পর সাবেরিরা সবাই তার সামনে খাবার টেবিলে হাজির হয়। এ সময়ের একটি অংশে পর্দায় মায়া-সাবেরি-আহিরকে দেখা যায় না। টেবিলে প্লেট-চামচের টুঙটাঙ শব্দ পাওয়া যায়। এমনকি মায়া যখন মৃত্যু সংবাদটি দেন, তখন সাবেরির কণ্ঠ শোনা যায়। কিন্তু তাকে দেখা যায় না। ক্যামেরা তখনো ওই ব্যক্তির ওপর স্থির। তিনি চমকে উঠে অস্বস্তিতে উসখুস করছেন। পুরোটা সময় তাকে লঙ শটে ধারণ করা হয়। দর্শকও এতে কিঞ্চিৎ অস্বস্তিবোধ করে। কারণ জাভেদের সঙ্গে মায়ার পরিবারের সম্পর্ক কেমন তা সবাই জানে। একসময় তিনি এক দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকেন। কিন্তু এও খেয়াল রাখেন, মায়া কখন চেয়ার ছেড়ে উঠে আসছে। দৃশ্যটিতে কোনো অতিরঞ্জন নেই। ওই ব্যক্তির চা পানের সময়, তার সামনেই আউট অব ফোকাসে মায়াকে হাঁটাচলা করতে দেখা যায়। স্বাভাবিক তালে প্রতিটি কাজ সম্পন্ন হতে দেখা গেছে।
হাই অ্যাঙ্গেল শট্কে ব্যবহার করা হয় চরিত্রের ক্ষুদ্র বা অসহায় অবস্থা বোঝাতে। এ ধরনের শট্ খুব বেশি ব্যবহার করা হয়নি। নিতুকে বিয়ের পর চুপিচুপি ছেলে আহিরকে চুম্বন আর তার মৃত্যুর পর খাটিয়ায় দেখানোর মাধ্যমে প্রকাশ পায়, প্রকৃতি আর পরিস্থিতির কাছে মানুষ বড়ো অসহায়। মায়া, যিনি শাড়ি কোনটা পরবেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাবোধ করেন, তখন তাকে দেখানো হচ্ছে হাই অ্যাঙ্গেল থেকে। এরপর টিল্ট আপ করে পরে ক্যামেরা নেওয়া হচ্ছে সাবেরির দিকে।
৭.
স্থিরচিত্র ও চলচ্চিত্রের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো গতিতে। তাই চলচ্চিত্রে ফ্রেমিংয়ের সঙ্গে কমপোজিশনের সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। দৃশ্যে সমতা ও নান্দনিকতা বজায় রাখতে তাই চাই পরিকল্পিত কমপোজিশন। ডুব-এর প্রকৃতিগত কমপোজিশন চমৎকার। পাহাড়ি রাস্তা ধরে জাভেদের গাড়ি যখন এগিয়ে যায়, তখন ওয়াইড লঙ শট্ নেওয়া হয়েছে। সেই দৃশ্যে প্রকৃতির সজীবতা ইঙ্গিত দিয়েছে একটি পরিবারের ভালো দিনগুলোর গল্প। আর জীবনের রহস্যময় বাঁকের। গাড়ির ছাদে ঝরে পড়া বৃষ্টি জানিয়েছে, কষ্ট ধুয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার কথা। টপ শটে ফ্লাইওভারে চলতে থাকা একটি মাত্র গাড়ি। নিচে ব্যস্ত শহর। সবার অগোচরে গড়ে উঠছে নতুন কোনো গল্প। সেই সঙ্গে সাদা কাশফুলের মধ্যে মা-মেয়ের ক্লোজ শট ও আকাশের চাঁদ ওঠার দৃশ্য শূন্যতার মধ্যেও দর্শককে হালকা স্বস্তি দেয়। প্রকৃতি, শহুরে রাস্তার নিয়ন আলো হয়তো মানুষের মনের হাহাকারকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেছে কিছুটা। কারণ একজন নির্মাতা সবসময় চেষ্টা করেন দর্শকের আবেগের জায়গাগুলো বুঝে কাজ করতে।
তবে হঠাৎ হঠাৎ কিছু দৃশ্য চোখে লাগার মতো। যেমন, ফ্রেমিংয়ের একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, কোনো দৃশ্যপট ফ্রেমে থাকলে এর উপরের অংশের মাথা কাটা না গেলে ভালো। এর অর্থ তাতে হেড রুম ও ফুট রুমের জায়গার মধ্যে সমতা থাকবে। কিন্তু ডুব-এ এ ধরনের ফ্রেমিংয়ের কিছু দৃশ্যে চরিত্রের মাথা কাটা গেছে; যা একটু অসামঞ্জস্য লাগে। চলচ্চিত্রের শুরুতে জাভেদ আর মায়া যখন একসঙ্গে বসে গল্প করেন তখন, আবার রিভার্স শটে মায়া যখন জাভেদকে খাইয়ে দিচ্ছেন সে সময়। একই সঙ্গে জাভেদ-নিতুর প্রেম, জাভেদের মৃত্যু-এ ধরনের বিষয়গুলো আরো কয়েকটি শটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে ভালো হতো বলে মনে হয়।
৮.
‘আহারে জীবন’-শুধু গান নয়, একটি বিষাদের গল্প। শূন্য থেকে শুরু, আবার শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার গল্প। কী পেলাম, কী পেলাম না-এসবের হিসাবনিকাশে কেটে যায় প্রতিটি মুহূর্ত। জাভেদ তাই বলেন, মানুষের মৃত্যু হয় তখন, যখন প্রিয়জনের সঙ্গে তার যোগাযোগহীনতা তৈরি হয়। যে দূরত্ব দিয়ে সাবেরি-নিতু কাহিনি শুরু করে, সেই একই দূরত্বে গল্প শেষ। একজন নির্মাতার সঙ্গে সিনেমাটোগ্রাফারের সম্পর্কের বোঝাপড়া সেরকম না হলে হয়তো অতলে হারিয়ে যেতো বিষাদের সুর। তাই ডুব দেখতে দেখতে অনেক সময় ওংকার কার-ওয়াই-এর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ইন দ্য মুড ফর লাভ-এর কথা মনে পড়ে। যেখানে ফ্রেমের ভিতরে ফ্রেম সাজিয়ে একটি গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফিতে নতুন কিছু করার উৎসাহ এবং চলচ্চিত্রকে শিল্পে উন্নীত করার প্রচেষ্টার জন্য ডুব নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পেতে পারে।
লেখক : সারা মনামী হোসেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন-এ পড়ান।
তথ্যসূত্র
১. https://bit.ly/2F6rqyy; retrieved on: 23.03.2018
২. https://bit.ly/2HUsIgs; retrieved on: 23.03.2018
৩. https://bit.ly/2HUsIgs; retrieved on: 23.03.2018
৪. https://bit.ly/2JVOn8O; retrieved on: 24.03.2018
৫. রায়, সত্যজিৎ (১৯৮২ : ৫৬); বিষয় চলচ্চিত্র; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।
৬. দাশগুপ্ত, ধীমান (১৯৮৮ : ৪২); ‘শট ও শট বিভাজন’; চলচ্চিত্রের টেকনিক ও টেকনোলজি; সম্পাদনা: ধীমান দাশগুপ্ত; বাণীশিল্প, কলকাতা।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন