Magic Lanthon

               

দীপা মাহবুবা ইয়াসমিন  

প্রকাশিত ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

প্রসঙ্গ ডুব

চলচ্চিত্রের দর্শন বড়ো নাকি দৃশ্য নির্মাণ

দীপা মাহবুবা ইয়াসমিন  


বিবিধ ট্যাগের অন্তরালে থাকা ডুব দর্শন

২০১৭-এর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা গোটা বাংলাদেশে ছিলো ডুব-এর পক্ষ-বিপক্ষ সমর্থন ও মন্তব্যের ছুড়াছুড়ি। মুক্তির আগে নানাবিধ আলোচনাসহ ডুব দেখার পর যতো মন্তব্যধর্মী সংক্ষিপ্ত লেখা অর্থাৎ রিভিউ এবং তাত্ত্বিক মূল্যায়ন, আলোচনা-সমালোচনা ও ব্যাখ্যার জোয়ারে আলোচক মহল ভেসেছে, তাতে করে ডুব নিয়ে কিছু লেখা মানেই বিতর্ক মঞ্চে নতুন করে পদার্পণ হওয়া। ডুব নিয়ে যাদের অসন্তোষ তারা বলছে, ‘কেবলমাত্র রক্ষণশীল মানুষেরা এমন চলচ্চিত্র বানায়’; অন্যদিকে ডুবকে নিয়ে নিন্দা মাত্রই একদল ভক্ত বা সমর্থকমহল বলে বসেছে, ‘ওরা শিল্প বোঝে না’। স্বভাবতই প্রথম যে প্রশ্নটি জাগে-চলচ্চিত্রটির রক্ষণশীল মনোভাবকে কোনো সমালোচকই অস্বীকার করতে পারছে না-সে চলচ্চিত্রটি শিল্প হলো কেনো/কীভাবে? উত্তর সেই সমালোচকদের লেখায় পাওয়া যায় ডুব-এর বিভিন্ন দৃশ্যের শিল্পমান বর্ণনায়।

জানিয়ে রাখছি, ডুব নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে কোনো আগ্রহ নেই। তবে এমতাবস্থায় ডুব বিতর্কে অবতরণের আগে চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা বিচার ও বিশ্লেষণের নানারূপ এবং সমালোচকের দৃষ্টি ও বিভিন্ন মানদণ্ডের আলোচনাও বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে।

নান্দনিকতার বিচার-বিশ্লেষণ বনাম ডুব সমালোচনা

সমালোচক চলচ্চিত্রের ভালো ও মন্দ বিচার করার ক্ষেত্রে প্রধানত বিবেচনা করেন গোটা চলচ্চিত্রের বক্তব্য, আমলে নেন নির্মাতার আদর্শিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক অবস্থান। এরপর গুরুত্ব দেন দৃশ্যবিন্যাস, বেছে নেন চলচ্চিত্রের নানা অংশ, সংলাপ, সম্পাদনা এবং সর্বোপরি পরিচালনার সবটা মিলিয়ে গোটা চলচ্চিত্র সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ দৃষ্টিভঙ্গি সমালোচক পাঠকের সামনে হাজির করেন। তবে অনেক সমালোচকের কাছে চলচ্চিত্রে কী দেখানো হলো, এর চেয়ে বেশি গুরুত্ববহ কীভাবে তা দেখানো হলো। চলচ্চিত্রের সৌন্দর্য/নান্দনিকতার বিষয়ে হাসনাত আব্দুল হাই বলেন,

সৌন্দর্য সব সময়ই তার উপকরণ-প্রকরণের সমষ্টির অতিরিক্ত কিছু। এই অতিরিক্ত কিছুর জন্য কেবল পুঁথিগত বিদ্যা বা কারিগরি দক্ষতা থাকাই যথেষ্ট নয়। সেই সঙ্গে থাকতে হবে সৃজনশীল প্রতিভা বা প্রবণতার স্পর্শ। বুদ্ধির সঙ্গে এখানে যুক্ত হতে হবে বোধের বা স্বজ্ঞার (ইনটুইশন) মিলন।

একাধিক শিল্পের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় চলচ্চিত্র। যদিও চলচ্চিত্রের অন্তর্গত কোনো শিল্পমাধ্যমই স্বাধীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। বরং একটি অন্যটির ওপর নির্ভরশীল তো বটেই, ক্রমিক ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট। ফলে চলচ্চিত্রের নান্দনিকতার বিচারও সামগ্রিক বা কমপোজিট হওয়া প্রয়োজন। গুণী অভিনয়শিল্পীদের অপূর্ব চরিত্রায়ণ, দুর্দান্ত চিত্রগ্রহণ, শিল্পনির্দেশনা, সম্পাদনা সবমিলেই সম্ভব চলচ্চিত্রে এক একটি অনন্য দৃশ্য নির্মাণ। সুদৃশ্য নির্মাণে পরিচালকের নিশ্চিত কৃতিত্ব রয়েছে, তবে চলচ্চিত্র মূলত একটি দলগত প্রচেষ্টার ফল। কিন্তু চলচ্চিত্রের দর্শন নির্ভর করে কেবলই এর নির্মাতার দার্শনিক অবস্থানের ওপর। গল্পের বুনন বা গল্পের চয়ন এবং তার চিত্রনাট্য নির্মাণ সবই নির্মাতার দার্শনিক অবস্থানকে নিশ্চিত করে। চলচ্চিত্রটি যদি কোনো প্রামাণ্যচিত্র বা জীবনীচিত্র না হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে রক্ষণশীল সমাজের নির্মিত ও প্রতিপালিত দর্শনের পুনরাবৃত্তি, নিতান্তই নির্মাতার হীন দর্শন ছাড়া কিছু নয়। 

আলোচকদের মতানুসারে, ডুব-এর নান্দনিক দিক তার দৃশ্যগুলো, ‘সবচেয়ে বড় কথা, কী দারুণ নৈঃশব্দ্য।’ ডুব-এর নৈঃশব্দের বিষয়টা এর সব প্রশংসাপত্রেই উঠে এসেছে। তাদের দাবি, এই চলচ্চিত্রটি দেখলে কানে শান্তি হয়, চোখে আরাম হয়। খুবই অল্প চরিত্র, চিৎকারের সংলাপ নেই, পরিমিত আবহসঙ্গীত। বার বারই সিনেমাটোগ্রাফি আর শব্দসম্ভার ভালো বলে কিছুটা স্বস্তি বাড়াতে চেয়েছে দর্শক।

বিভিন্ন লেখা পড়ে এই কাহিনির ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্রের দৃশ্যের যে প্রশংসাগুলো পাওয়া যায় তার একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা এমন-

প্রথমত, শুরুর দৃশ্যের প্রশংসায়,

সেই বিশাল সবুজের পটভূমিকায়, দুইটি ত্যাক্ত [ত্যক্ত] মানুষের যোগাযোগহীনতা আর হৃদ্যতা ভেঙে পড়ার সময় চারিদিকে শো শো বেগে তীব্র হাওয়া বয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ ধরে সেই হাওয়া বইতে থাকে। সেই হাওয়ার মধ্যে সবুজের মধ্যে পাশাপাশি যোগাযোগহীন বসে থাকে ক্ষদ্র [ক্ষুদ্র] দুটি প্রাণ-মায়া ও জাভেদ। এই দৃশ্যটি কেবলি কাব্যিকতা হিসেবে হাজির করা হয়নি। আমার মনে হয়েছে, মায়া ও জাভেদের জীবনে যে তুমুল ঝড় আসছে, জীবন উলোট-পালট করে দেয়া তুমুল পরিবর্তন আসছে, তারই পূর্বাভাস সেই প্রলম্বিত হাওয়ার দৃশ্য।

দ্বিতীয়ত,

সংসারটার মৃত্যু হচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে আঁধারে। চরিত্রগুলোকে আমরা দেখি ফ্রেমের ভিতরে ফ্রেমে। কখনও জানালার এপাশ থেকে ভিতরে, অথবা এক ঘর থেকে অন্য ঘরে। মায়া সন্তানদের নিয়ে মায়ের বাড়ি চলে যায়। ক্লোজ-আপে জাভেদ, ফ্রেমটি ঈষৎ দোলে। ফ্রেম কাঁপে যখনই চরিত্রটি সঙ্কটে বা সিদ্ধান্তহীনতার দোদুল্যমানতায়। নিতু জাভেদকে কাছে পাবার প্রয়াসে সিগারেট শেয়ার করতে বলে, জাভেদ যুক্তি আর অনুভূতির টানাটানিতে দুলছে, শট্টিও দোলে।

তৃতীয়ত,

চরম ঝগড়ার মুহূর্তে ঘরে খাবার টেবিলে পানি পান করতে গিয়ে জগে জাভেদের পানি না পাওয়ার দৃশ্যটি। ... পানি না পেয়ে তৃষ্ণার্ত বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে সাবেরী পানি ভরা গ্লাস হাতে দৌড়ে গিয়েও সে বুঝেছে, ‘জীবন যখন শুকায়ে আসে’ তখন তাতে জল ঢেলে লাভ নেই। আর এই বোধ তাকে ঠেলে দিয়েছে আরো বেশি হতাশায়। এই সিনেমার সাবেরী চরিত্রে তিশার অভিনয় হয়েছে অসাধারণ, দূর্দান্ত [দুর্দান্ত]।

চতুর্থত,

রাতের বৃষ্টি গাড়ির ছাদজুড়ে, হলে বসে দর্শকের শরীর ভিজে যায়, ক্লোজ-আপে এ দৃশ্য একটি মায়াবি জগৎ তৈরি করে, শুরু হয় জাভেদ ও নিতুর সংসার। সম্পাদনার এ রকম সৌকর্য এদেশে অনুপস্থিত। হয়তো গ্লানি এবং নিশ্চিত মনোকষ্টের পীড়ায় ডুবছে জাভেদ। কিন্তু এর জন্য কোনো নাটক নেই, নেই কাহিনির ঘোড়দৌড়। জাভেদ নিতুকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে, আমরা অস্পষ্ট কিছু শব্দ শুনতে পাই। একই শট্্, ক্যামেরা বাঁয়ে প্যান করে, শব্দ স্পষ্ট হয়-লোকজন দোয়া-দরুদ পড়ছে। জাভেদ মারা গেছে। একটি শটে অনেকটুকু সময় পার হয়ে যায়, অনেক ঘটনা মারিয়ে সময়, কিন্তু সব ঘটনা দেখার প্রয়োজন নেই সিনেমায়। অনুপস্থিতিই তো সিনেমায় অনেক উপস্থিতির জানান দেয়। 

পঞ্চমত,

মৃত্যুতে মানুষ ডুবে যায়। কিন্তু মৃত্যুই আবার আপনজনের কাছে মায়া মমতা ও সম্মান ফিরিয়ে আনে। মৃত্যু মানুষকে ডুব থেকে তুলেও আনে। তাই জাভেদের প্রথম স্ত্রী মায়া ড্রয়ারে তুলে রাখা জাভেদের ছবি বের করে দেয়ালে টাঙায়। মায়াও উঠে আসে তার যন্ত্রণা ও কষ্টের ডুব থেকে, কিছুটা হলেও। বাইরে তখন প্রকৃতিতে প্রশান্তি-হাওয়ায় দুলছে গাছের ডাল ও পাতা।

ষষ্ঠত,

এই কাহিনীর [ডুব-এর কাহিনির] অন্যতম প্রধান উপজীব্য এক কন্যার চোখের সামনে তার প্রিয়তম জনক-জননীর সম্পর্কে যোগযোগহীনতা তৈরি হওয়া এবং ক্রমশই অনতিক্রম্য হয়ে ওঠা সেই জটিলতা, দূরত্ব ও যোগযোগহীনতাকে শত চেষ্টাতেও জয় করতে না পারার আক্ষেপ ও বেদনা। তাই, মূলত বাবাকে ঘিরে এক ‘বাবা-ন্যাওটা’ কন্যার গভীরতর ভালোবাসা, তীব্র অভিমান আর দুঃখবোধের গল্প ডুব।

অস্বীকার করছি না, দৃশ্যের নির্মাণভঙ্গির মধ্যেও দর্শন রয়েছে। দৃশ্যের যে শিল্প সেটা কখনো কখনো বিখ্যাত নির্মাতাদের প্রতি অনুপ্রেরণারও ফলাফল। যেমন, ডুব-এর নির্মাণশৈলী দেখে দাবি করা যায়, আব্বাস কিয়ারোস্তামির ক্লোজ শটের  ‘ক্লোজ আপ’ দ্বারাও ফারুকী অনুপ্রাণিত। কিন্তু দৃশ্যকে ছাড়িয়ে যায় যে প্রসঙ্গটি, তা হলো দর্শন। আর তাই চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতা ফারুকীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেই যে প্রসঙ্গটি চলে আসে তা হলো, ডুব-এর খুব পরিচিত কিছু টুকরো টুকরো দৃশ্য, যা বাস্তবেও দেখা যায়। সেই ‘বাস্তব ইতিহাস’ সাক্ষী দেয়, এ সমাজে পুনর্বিবাহ বা অসম বয়সের বিয়ের জন্য সম্মানিত তারকাদের লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অপমান, অপবাদ আর গালমন্দ শুনতে হয়। এবং যার কিয়দংশ শোনে পুরুষ আর বাদবাকিটা এই পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজ শোনায় একজন নারীকে। ডুব কি সেই ধারণার বাইরে আসতে পেরেছে?

ডুব : মানবীয় সম্পর্কের অমানবিক ও একপাক্ষিক বয়ান

বিবাহিত এক পুরুষের সঙ্গে ষোড়শী নারীর প্রেম। সেই পুরুষ তার আগের সংসারটার মৃত্যু ঘটাচ্ছে এবং নতুন সংসারে ডুবে যাচ্ছে আঁধারে। প্রচারণায় বার বার বলা হয়েছে সম্পর্কের জটিলতার গল্প ডুব। কিন্তু সম্পর্কের জটিলতাকে রক্ষণশীল সমাজের গতানুগতিক কাঠামোতে আবদ্ধ থেকেই কি দেখেননি ফারুকী? অসুখী দাম্পত্যকে বয়ে না বেড়ানো, দ্বিতীয় বিয়ে কিংবা মেয়ের বান্ধবীকে বিয়ে বা অসম বয়সের বিয়েকে উদার যুক্তিতে তুলে আনার অনেক সুযোগ ছিলো এ চলচ্চিত্রে। কিন্তু ফারুকী সেই উদারতার ব্যাপারে উদাসীন। বাঙালি সমাজে বিবাহিত পুরুষের প্রেমে পড়েছে যে নারী, সে নিশ্চয়ই নির্লজ্জ, অশ্লীল, লোভী ও অসৎ নারী; যেনো প্রেমটা ছিলো খুব একপাক্ষিক, গড়পরতায় এটাই বাঙালির মন-ভাবনা। সেই গতানুগতিক ভাবনাকে ভাঙার ক্ষুদ্রতম কোনো প্রয়াসও কি এ চলচ্চিত্রে দেখা যায়? প্রচলিত সম্পর্কের কাঠামোকে ভেঙে সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ করা মানুষগুলোকে যে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অপমান, অপবাদ আর গালমন্দ শুনতে হয়, সেখানে পূর্ণ সমর্থন জানানোর নামই কি ডুব?

ডুব-এর কাছে প্রশ্ন থেকে যায়, কেনো গতানুগতিক সমাজের চোখ দিয়ে দেখা কিংবা ভেঙে যাওয়া সংসারের এক বাবা-ভক্ত আবেগী মেয়ের চোখে দেখা বাবার দ্বিতীয় দাম্পত্যের জটিলতা বা অনুশোচনার বয়ান হয়ে উঠলো; কেনো এমন ‘পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি’র নির্মাণ ও সমর্থন? নির্মাতা কেনো দর্শককে তথা সমাজকে প্রথম সংসার ছেড়ে এসে নতুন সংসার গড়া মানুষটির যুক্তিগুলোকে ফেলে শুধু হাহাকার দেখালো! 


ডুব দেখবার শুরুতেই যে প্রশ্ন ভাবিয়েছে, কেনো বান্ধবীর বাবাকে বিয়ে করে একজন নারী? শুধুই কৈশোরের ঈর্ষাকে জয়যুক্ত করার জন্য? কোনো আবেগ-ভালোবাসা কিছুই কি নাই! যদি থাকে, তবে চিত্রনাট্য কেনো দাবি করবে-প্রিয়জনদের কাছ থেকে মানুষ দূরে গেলে, প্রয়োজন ফুরালে সে মানুষটি মারা যায়! সদ্য সংসার শুরু করা তরুণীটির কাছে স্বামীর প্রয়োজন কেনো ফুরিয়ে গেলো?

আরো প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, নায়িকা হওয়ার পর কি সাবেরির বাবার মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টায় মগ্ন হয় নিতু? কিন্তু সে জাভেদের চলচ্চিত্রের নায়িকা হলো কেমন করে? সেটা কি তার নিজ প্রতিভা ও দক্ষতা? যেহেতু শুরুতেই জেনে গেছি, নিতু কৈশোর থেকেই সাবেরিকে ঈর্ষা করতো, কেননা সাবেরিই সবসময় জাভেদের মেয়ে হওয়ার ফলশ্রুতিতে তার চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতো। তাহলে সাবেরির বদলে কেনো হঠাৎ নিতু নায়িকা হলো? নিতুর প্রতি জাভেদের কোনো দুর্বলতা নাকি শুধুই নিতুর প্রতিভা! জাভেদ কোনো বহুগামী চরিত্র নন, এটা বোঝা যায়; কেননা তার স্ত্রী পত্রিকায় জাভেদ-নিতুর সম্পর্কের গুঞ্জন দেখে বলেন, এতো বছর তো এমন গুঞ্জন হয়নি। সুতরাং ডুব-এর কাছে আরো প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, নিতুর প্রতিভার স্বীকৃতিতে কেনো এতো কার্পণ্য! সেটা কি চিত্রনাট্যের সামঞ্জস্য হারাবার ভয়? কেননা প্রতিভাবান ও দক্ষতাসম্পন্ন একজন অভিনয়শিল্পী শুধুই কৈশোরের ঈর্র্ষায় ত্বরান্বিত হয়ে হঠাৎ বিয়ে করে গৃহিণী বনে যায়, বিন্দুমাত্র প্রেম ছাড়া! এই যুক্তি বোধহয় রক্ষণশীল দর্শককে তুষ্টি দেয় না।

ডুব জাভেদের পরকীয়া ও পুনর্বিবাহের গল্প। কিন্তু কেনো নায়ক চরিত্রকে দ্বিচারী/বহুগামী দেখাতে এতো দ্বিধা রক্ষণশীল বাংলা চলচ্চিত্রের? কেনো দুই কিশোরীর ঈর্ষার বলি করে জাভেদকে নতুন দাম্পত্যে নিয়ে আসে চিত্রনাট্য? ডুব-এ এ রকম বহু প্রশ্নকে অমীমাংসিত রাখার একটি কারণকে ব্যাখা করেছেন শিক্ষক ও চলচ্চিত্র সমালোচক ফাহমিদুল হক। তার ভাষায়, “পরিচালক গুরুতর তথ্যগুলো আমাদের দেবেন না। সম্পাদনার ভাষায় যাকে বলে ‘ইলেপসিস’, কাহিনীর ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে ছোট লাফ দেওয়া, এ রকম বহু ইলেপসিস আছে ‘ডুব’ চলচ্চিত্রে। ফলে আমরা যদি চিত্রনাট্যেও গাঁথুনি খুঁজতে যাই, হতাশ হবো। সুবিন্যস্ত চিত্রনাট্যের প্রতিশ্রুতি এই চলচ্চিত্র দেয় না। ঘটনাক্রমের প্রায় অসংলগ্ন বর্ণনা এই চলচ্চিত্রের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য।”

যদিও ডুব নিয়ে সম্পাদনায় ইলেপসিসের প্রয়োগ হয়েছে এমনটা দাবি করা যেতে পারে-তবে আমার ব্যক্তিগত ধারণা চিত্রনাট্যের অসততাই এই কাহিনির সব অস্বচ্ছতার একমাত্র কারণ।

দর্শন বনাম দৃশ্য নির্মাণ

নির্দ্বিধায় বাংলা চলচ্চিত্রে ফিরছে সুসময়। বাংলা চলচ্চিত্রের যে গর্বভরা ইতিহাস ছিলো, মাঝপথে সেটা ঝিমিয়ে পড়ে এখন আবার জেগে উঠছে। তবে চলচ্চিত্রের এই পুনর্জাগরণ সমাজ বির্নিমাণের কোনো অংশ হতে পারছে কি? নির্মাতাদের দর্শন কি ধর্মীয়, সামাজিক মৌলবাদকে সমর্থন করে? স্বীকার করতেই হবে, জাতিগতভাবে এখন ভয়াবহ দুঃসময় পার হচ্ছে। হিসাববিহীনভাবে বেড়েছে ধর্ষণ, হত্যা, সন্ত্রাস। নারীদের অবস্থা ও অধিকার দিনে দিনে খর্ব হচ্ছে। বাল্যবিবাহকে জায়েজ করিয়ে নেওয়ার জন্য নারীদের বিয়ের বয়স কমিয়ে আনা হয়েছে। ধর্মীয়/জাতিগত/যৌনতার ভিত্তিতে যারা সংখ্যালঘু তাদের ওপর চলছে নির্যাতন-কুপিয়ে মারা হচ্ছে, দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। বিচারহীনতা বাড়াচ্ছে এসব অপরাধ। শুধু এ দেশেই নয়, পৃথিবীজুড়েই যখন চলছে ধর্মঘেঁষা জাতীয়তাবাদের উত্থান, ঠিক তখনই ‘হলিউড বানিয়েছে পাশ্চাত্যের ভয়ের মাপের গল্প : গেম অব থ্রোনস। বিশ্বনেতার আসন দখলে পরাশক্তিগুলোর দলাদলির সঙ্গে খুব মেলে এর গল্পটা। পরাশক্তির খেলায় প্রভাবশালী বিনোদন-অস্ত্র খুবই উপযোগী।’১০

মোদির ভারতে বাহুবলী বা পদ্মাবত-এর মতো চলচ্চিত্রের প্রকাশ, প্রচার এবং স্বগর্ব উপস্থিতি। বাহুবলীর জাতীয়তাবাদ মিথ থেকে শক্তি নেয়, বিনোদনের ছলে ধর্মহীন ভিলেনকে পরাজিত করে হিন্দুরাজ্যের কল্পনায় একাকার করে দেয় দর্শককে। এদিকে পদ্মাবত গোটা ভারতকে আবারও মনে করিয়ে দিতে চায়, নারীর জীবনের চাইতে যোনির মূল্য অনেক বেশি! ভারতে যখন এইসব হিন্দু মৌলবাদী চলচ্চিত্রের আবির্ভাব, ঠিক তখনই তুরস্কে টেলিভিশন সিরিজ ‘এরতুগরুল’-এর জয়জয়কার। তুর্কি ভাষায় ‘দিরিলিস : এরতুগরুল’-এর মানে ‘পুনরুজ্জীবন : এরতুগরুল’। তুর্কি দর্শক এরতুগরুলের মধ্যে পাচ্ছে প্রেসিডেন্ট রিদওয়ান’কে। ৬০টি দেশে এই সিরিয়ালটি চলেছে। যার প্রধান উদ্দেশ্য মুসলিম বিশ্বকে অটোমান সাম্রাজ্য পুনরুজ্জীবনের স্বপ্নে তাতিয়ে তুলে ক্ষমতা সংহত করা। একই কাতারের তুরস্কের আরেকটি টেলিভিশন সিরিজ ‘সুলতান সুলেমান’। যা পৃথিবীর ৪০টি দেশসহ মাতিয়েছে বাংলাদেশের দর্শককে। ‘সুলতান সুলেমান’-এর একটি পর্বে তো দেখতে হলো, ইসলাম ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলবার জন্য সুলতান ১০ জন ‘নাস্তিক’-এর শিরচ্ছেদ করেন। বুঝতে দেরি হলো না, বর্তমান মৌলবাদী বাংলাদেশের জন্য শতভাগ জুতসই সিরিয়াল এটা।

এ তো গেলো ধর্ম আর রাজনৈতিক উসকানির সংক্ষিপ্ত নমুনা। এবার আসা যাক, সামাজিক রক্ষণশীলতার উসকানি প্রসঙ্গে। সামাজিক রক্ষণশীলতা আসলে কী? ধরা যাক, কেউ তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোটো বা অনেক বড়ো কারো প্রেমে পড়েছে কিংবা কেউ ধর্ষিত কোনো নারী বা অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া কারো প্রেমে পড়েছে নয়তো মুসলিম হয়ে কোনো হিন্দুকে ভালোবাসে; আবার ছেলে হয়ে ছেলেকে বা মেয়ে হয়ে মেয়েকে পছন্দ করে কিংবা কেউ কেউ কারো প্রতি যৌনাকর্ষণ অনুভব করে না। তাহলে সমাজ কি মেনে নিবে? সমাজের ভয়েই তো প্রতি মুহূর্তে লুকাতে হয় ব্যক্তিকে! এইসব সামাজিক রক্ষণশীলতার গল্পকে সংপ্রশ্ন করবার মতো সাহস রয়েছে এমন চলচ্চিত্র বাংলাদেশে কয়টি রয়েছে? ‘আধুনিক নির্মাতা’/‘নতুন প্রজন্মের নির্মাতা’/‘নতুন ধারা বা বিকল্পধারার নির্মাতা’ প্রভৃতি উপাধি পাওয়া কোনো নির্মাতার কাজে যদি এই সামাজিক রক্ষণশীলতার উসকানির প্রবৃত্তি পাওয়া যায়, তখন তা ভাববার বিষয় হয়ে ওঠে।

নন-ন্যারেটিভ ফিল্ম বাদ দিলে চলচ্চিত্র মাত্রই গল্প। নির্মাণশৈলী আলাদা কোনো বিষয় নয়। ন্যারেটিভে প্রকাশ পায় ব্যক্তিমানুষের দর্শন। নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে দর্শন ও ন্যারেটিভকে নির্মাতা রিপ্রেজেন্ট করেন। গল্পটা ভালো কিন্তু নির্মাণটা ভালো না, চলচ্চিত্র এমন বিষয় নয়। দুইটা মিলে নির্মাতার চিন্তায় যেটা কাজ করে সেটাই নির্মাণশৈলী। নির্মাণশৈলী ও গল্প আলাদা করতে গেলেই বিপদ। গল্প বলার ভিন্নতাটা তৈরি হয় ‘কে কেমন করে বলে’ তার ভিত্তিতে। তাই অনেক সমালোচক দাবি করে, চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ‘কী বলা হলো’কে অনেক ক্ষেত্রেই ছাপিয়ে যায় ‘কেমন করে’ বলা হলো সেটি। তাই অধিকতর শক্তিশালী দৃশ্য কখনো হয়ে যায় নিঃশব্দ। দৃশ্যের এক একটি প্রতীকী-ব্যঞ্জনায় ফুটে ওঠে গল্পের বুনন। তবে সেসব চলচ্চিত্র প্রায়শই হয় বাজারবিমুখ। যার শিল্পমূল্য ‘বিশেষ শ্রেণির শিল্প বোদ্ধা দর্শক’ ছাড়া বুঝে উঠতে পারে না। স্বভাবতই সেসব নির্মাতাদের শিল্পীর মর্যাদা দেওয়া হয়। 

কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, শিল্প কোনো ফাজলামো নয়; যেকোনো চলচ্চিত্র ‘শিল্পবাজার’ (ইন্ডাস্ট্রি) হারালেই তা ‘শিল্প’ (আর্ট) হয়ে ওঠে না। শিল্পী মাত্রই সমাজকে বিনির্মাণের সৎ সাহস থাকতে হয়। শিল্পী কখনোই সমাজের দাসত্ব স্বীকার করে না। সুতরাং গল্পের শৈল্পিক বর্ণনাভঙ্গির জন্য নিশ্চয়ই চলচ্চিত্রে গল্প থাকতে হবে এবং যেই গল্পের দর্শন, দর্শক ও বোদ্ধাদের নতুন ভাবনার দুয়ার খুলে দিবে। সুতরাং রক্ষণশীল সমাজের দাসত্ব স্বীকার করা ডুব-এর নির্মাণশৈলী নিয়ে যতোই প্রশংসা করার সুযোগ থাকুক না কেনো, ডুব কখনোই শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পারেনি।

পুনশ্চ : ডুব-এর সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ এবং তার পরিবারগুলোকে পরোক্ষে সম্পৃক্ত করাটা চলচ্চিত্রটির বাজার ধরার একটি চাতুর্য কৌশল। এবং একজন ব্যক্তিকে শুধুই বাবার অবস্থানে রেখে, সেই বাবার দ্বিতীয় বিবাহের একপাক্ষিক বয়ান-যা অতি দুর্বল চিত্রনাট্যের জন্ম দিয়েছে-এটি তার পক্ষেরই একটি সাফাই ছাড়া অন্য কিছু মনে হয়নি আমার কাছে। যদিও পরবর্তী সময়ে বক্স অফিস বিবেচনায় তা সর্বোপরি একটি ব্যর্থ বাজারি অভিপ্রায় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে পুরো লেখায় ‘হুমায়ূন আহমেদ’ বিষয়টিকে উহ্য রাখাই শ্রেয় মনে করেছি।

লেখক : দীপা মাহবুবা ইয়াসমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে ব্যক্তিগত প্রযোজনা সংস্থা ‘এ্যাপিফানিয়া ফিল্ম প্রোডাকশন’ চালাচ্ছেন।

dipamahbuba@gmail.com

তথ্যসূত্র

1.https://bit.ly/2wFUY5A; retrieved on: 30.03.2018

2. https://goo.gl/LRAUdn; retrieved on: 30.10.2017

3. https://goo.gl/eYdHCc; retrieved on: 1.11.2017

4. https://goo.gl/aQMxc5; retrieved on: 17.11.2017

5. https://goo.gl/f1XesU; retrieved on: 2.11.2017

6. https://goo.gl/ugWkih; retrieved on: 10.12.2017

7. https://goo.gl/HJoHwA; retrieved on: 10.12.2017

8. https://goo.gl/b2efRP; retrieved on: 2.11.2017

9. https://goo.gl/bgcGAE; retrieved on: 5.11.2017

১০. ওয়াসিফ, ফারুক; ‘ভারতীয় বাহুবলী বনাম তুর্কি এরতুগরুল’; প্রথম আলো, ১৭ মে ২০১৭।

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন