Magic Lanthon

               

ইব্রাহীম খলিল

প্রকাশিত ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি চাকচিক্যের অন্তরালে নারী তারকার আর্তনাদ

ইব্রাহীম খলিল


সরষের মধ্যে একই ভূত

বর্তমানে মানুষ আর মুখের কথা বিশ্বাস করতে চায় না। সেটার জন্য হাতেনাতে প্রমাণ চায়। প্রমাণ করতে না পারলে উত্থাপিত সেই দাবি সবসময় হয়তো একেবারেই মিথ্যা প্রতিপন্ন হয় না, তবে সেটাকে সত্য বলে ধরা হয় না। অবশ্য সবক্ষেত্রেই যে সেটা ঘটে তেমনটাও নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে মানুষ অভিযোগকারী আর অভিযুক্তের ব্যক্তিগত, সামাজিক ভাবমূর্তির ওপর নির্ভর করে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে, পক্ষ-বিপক্ষ নেয়। একসময় সেটা কোনোভাবে প্রমাণ হলে বা না হলে রথী-মহারথীরা গণমাধ্যমের সামনে হাজির হয়। নানা বিষয়ে তাদের মতামত দেয়; কারণে অকারণে নানা পদ্ধতিতে জরিপ করে। কিন্তু যে বিষয় নিয়ে তারা কথা বলে, সেটাতে নিজেদের কৃতকর্ম বা দায় নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলে না।

সম্প্রতি সারাবিশ্বে বহুল আলোচিত বিষয়, কর্মক্ষেত্রে কাস্টিং কাউচ বা যৌন হেনস্তা/যৌন হয়রানি। এ নিয়ে সৃষ্ট আন্দোলনের নাম ‘হ্যাশ ট্যাগ মিঠু’ (#MeToo)। যেটা নিয়ে নারী-পুরুষের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একধরনের ভার্চুয়াল একাত্মতা ও সহমর্মিতা পরিলক্ষিত হয়েছে। তথাকথিত ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী পুরুষের বিরুদ্ধে অনৈতিক কার্মকাণ্ড নিয়ে সরব হয়েছে তাদের অধীনস্থরা। এ পর্যন্ত পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ থেকে কোটি কোটি নারী গণমাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছে এই বার্তা-‘হ্যাঁ, আমিও তোমার মতো যৌন হয়রানির শিকার।’ আর এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন ঘটনার সূত্রধর প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিন। বাদ যাননি উবারের সি ই ও ট্রাভিস ক্যালানিক, টুডে শো’র উপস্থাপক ম্যাট ল্যু, একশো ৭৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন জিমন্যাস্টিক চিকিৎসক ল্যারি নাসার; দত্তক নেওয়া কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগে নির্মাতা উডি অ্যালেন এবং অক্সফাম ও সেভ দ্য চিলড্রেনের মতো প্রতিষ্ঠানও দাঁড়িয়েছে কাঠগড়ায়। #মিঠু প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নেমেছে হাজার হাজার নারী। অস্কার, গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, বাফটা অনুষ্ঠানে কালো পোশাক, জুতা, ব্যাজ বা গোলাপ নিয়ে দলে দলে প্রতিবাদ করছে নারী অভিনয়শিল্পী ও সঙ্গীতশিল্পীরা। হলিউড থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও চলচ্চিত্রজগতের গণ্ডি পেরিয়ে তা একসময় ছড়িয়ে পড়ে সব ক্ষেত্রে, সব দেশে।

প্রশ্ন উঠেছে, ভালো মানুষ সেজে থাকা এসব ‘পবিত্র’ আত্মাদের কথা কি মানুষ কখনো আঁচও করতে পারেনি? করে থাকলে স্বাধীনতায় বিশ্বাসী বলে গলা ফাঁটানো পশ্চিমারা এতোদিন চুপ ছিলো কেনো? অভিযুক্তরা কি এতোটাই ক্ষমতাধর ছিলো যে, তাদের বিচারের সম্মুখীন করা সম্ভব নয়? একই সঙ্গে সারাবিশ্বে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নিয়ে আওয়াজ উঠলেও বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র কেনো? কেনো কোনো অভিযোগ ওঠার পর পক্ষ-বিপক্ষ দাঁড় করিয়ে তাকে ধুপ করে নিভিয়ে দেওয়া হয়? এর পিছনে কি সেই ক্ষমতাবান পুরুষরাই জড়িত নাকি অন্য কিছু?

যৌন হয়রানি থেকে #মিঠু

২০১৭ খ্রিস্টাব্দে #মিঠু আন্দোলনে সরব হয়ে ওঠে সারাবিশ্বের নানা পেশার নারীরা। একের পর এক রথী-মহারথী, খ্যাত-অখ্যাত যৌন হেনস্তাকারীর মুখোশ উন্মোচন হয়। তবে এই #মিঠু আন্দোলনের শুরু কিন্তু ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে। সমাজকর্মী তারানা ব্রুক প্রথম তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানি নিয়ে মুখ খোলেন। সেসময় ১৩ বছরের এক কিশোরী প্রভাবশালী এক ব্যক্তির দ্বারা যৌন নিগ্রহের শিকার হয়ে তার কাছে সাহায্যের জন্য এসেছিলো। কিন্তু তিনি কিছুই করতে পারেননি। তারানা অশ্রুসজল চোখে সেই কিশোরীকে কেবল বলেছিলেন, #মিঠু; মানে আমিও তোমার মতো যৌন হেনস্তার শিকার। পরে তিনি #মিঠু নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেন। কিন্তু এসব দিয়ে তেমন সাড়া ফেলতে পারেননি তারানা। এরই মধ্যে কেটে যায় প্রায় এক দশক। মাঝেমধ্যে কয়েকজন নারী এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেছিলেন বটে, কিন্তু সেগুলো নিয়েও কোনো কথা ওঠেনি। অবশেষে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ অক্টোবর ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ ও ১০ অক্টোবর ‘দ্য নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিন’ যৌন হেনস্তা নিয়ে দুটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে (এ প্রতিবেদনের জন্য তাদেরকে পুলিৎজার পুরস্কার দেওয়া হয়)। প্রতিবেদনে হলিউডের প্রভাবশালী এক ব্যক্তির নাম আসে। এরপর একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুখ খোলেন রোজ ম্যাকগাওয়ান, অ্যাশলে জুড ও এশিয়া আর্জেন্টো’র মতো হলিউডের ডজনখানেক নারী অভিনয়শিল্পী। অভিযুক্ত সেই ব্যক্তির নাম হলিউডের প্রভাবশালী মিরাম্যাক্স স্টুডিও ও দ্য ওয়াইনস্টিন কোম্পানি স্টুডিওর কর্ণধার ৬৬ বছর বয়সি হার্ভি ওয়াইনস্টিন।

এসব খবরে ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন হলিউডের আরেক তারকা অ্যালিসা মিলানো। কারণ তিনিও হার্ভি ওয়াইনস্টিনের কাছে যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের ভয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলার সাহস পাননি তিনি। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর সবকিছু ভুলে নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে অ্যালিসা লেখেন, ‘আপনিও যদি এমন যৌন নিগ্রহ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে এই টুইটের উত্তরে লিখুন #মিঠু!’ পরদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে মিলানো দেখেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার টুইটের উত্তরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দুই লাখ নারী লিখেছেন ‘#মিঠু’! এর পরদিন ওই সংখ্যাটি গিয়ে পৌঁছায় পাঁচ লাখে! এভাবে একের পর এক নারী ভার্চুয়াল জগতে #মিঠু’র সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে; একই সঙ্গে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকে। হার্ভির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, কেট বেকিনসেল, হিদার গ্রাহাম, গিনেথ প্যালট্রো, অ্যাশলে জুড, কারা ডালাভিনেন, লিয়া সেদ্যু, লুপিতা নিয়োঙ্গো, মিরা সরোভিন, এশিয়া আর্জেন্টো, রোজ ম্যাকগাওয়ানও, জেসিকা বার্থ, রোজানা আরকেট, উমা থারম্যান, লিজা ক্যাম্পবেল, লিনা হিডি, স্টোন, এভা গ্রিনসহ হলিউডের কমপক্ষে ৯০ জন নারী। তাদের সঙ্গে একত্মাতা প্রকাশ করে অপরাহ উনফ্রে, সোফিয়া হায়াত, ম্যাডোনা ও লেডি গাগাও কথা বলেন নিজেদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যৌন হেনস্তা নিয়ে। ফলে যৌন নির্যাতন ও হয়রানির বিরুদ্ধে মুখ খোলা নারী-পুরুষের ‘সাইলেন্স ব্রেকারস’ অ্যাখ্যা দিয়ে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে তাদেরকে ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ খেতাব দেয় ‘টাইমস ম্যাগাজিন’।

সেই সূত্র ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিমন্যাস্টিকস দলের সাবেক চিকিৎসক ল্যারি নাসারের বিরুদ্ধেও যৌন হয়রানির অভিযোগ করে দুইশো ৬৫ জন নারী অ্যাথলেট। আদালত তাকে একশো ৭৫ বছর কারাদণ্ডাদেশ দেন। একপর্যায়ে হলিউডের গণ্ডি পেরিয়ে #মিঠু আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে। হলিউড থেকে বলিউডেও ধাক্কা দেয় #মিঠু আন্দোলন। কিঞ্চিত আঘাতের চেষ্টা হয় বাংলাদেশের ঢালিউডেও। তাদের বার্তার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়, যৌন হয়রানির নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্র নেই; তবে এর অধিকাংশই প্রকাশ পায় না। ফলে সমাজের সব ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের দুইশো নারী তারকা একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নারী তারকারা ‘টাইমস আপ’ নামে নতুন একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে অর্থ সংগ্রহও শুরু করে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার নারী-পুরুষের মধ্যে যাদের আইনি লড়াই চালানোর সামর্থ্য নেই, তাদের আইনি সহায়তা দিতেই এ অর্থ ব্যয় করা হবে বলে জানায় তারা। 

ক্ষমতাবান হার্ভি বনাম ‘অবোলা’ নারী তারকারা

                           বহুবার তাঁকে আমার ‘না’ বলতে হয়েছে।

                           তাঁর সঙ্গে গোসল করায় না।

                           আমাকে গোসল করতে দেখার আবদারে না।

                           আমার অঙ্গমর্দনে না।

                           তাঁর নগ্ন কোনো বন্ধুকে দিয়ে আমার অঙ্গমর্দনের আবদারে না।

                           মুখমেহনে না।

                           অন্য নারীর সঙ্গে নগ্ন হওয়ার আবদারে না।

                           না, না, না, না, না ...

এভাবেই হার্ভি ওয়াইনস্টিনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন হলিউডের নারী তারকা সালমা হায়েক। সালমা জানিয়েছেন, তার এ ‘না’-এর অর্থ হার্ভি কখনোই হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। বরং বার বার না না বলায় হার্ভি নাকি একপর্যায়ে তাকে মেরে ফেলারও হুমকি দিয়েছিলেন! শুধু সালমা হায়েক নন, তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছে অসংখ্য নারী তারকা। দ্য ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ও ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে হলিউডের প্রভাবশালী অভিনেত্রী থেকে শুরু করে উঠতি মডেল, এমনকি ওয়াইনস্টিন কোম্পানির নারী কর্মচারীরাও হার্ভির বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন ও হয়রানির রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। হার্ভির মাইটি আফ্রোদিতি চলচ্চিত্রের জন্য অস্কার পাওয়া অভিনেত্রী মিরা সরোভিন দাবি করেন, ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে টরেন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের সময় তাকে নিজ হোটেল রুমে ডেকে অভিনয় জীবনে সাফল্য এনে দিতে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন হার্ভি। ওই একই প্রতিবেদনে ইতালিয়ান তারকা এশিয়া আর্জেন্টো অভিযোগ করেন, হার্ভি ওয়াইনস্টিনের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেননি বলে এখনো অপরাধবোধে ভোগেন তিনি। এছাড়া ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন রোজ ম্যাকগাওয়ান’সহ ফ্রান্স, নরওয়ে, ইতালির প্রায় অর্ধশত নারী তারকা। প্রশ্ন হলো, যে হার্ভিকে নিয়ে এতো কথা, তিনি আসলে কে? হলিউডে তার এতো দাপটইবা কোত্থেকে এলো?

দ্য কিংস স্পিচ, শেক্সপিয়র ইন লাভ, পাল্প ফিকশন, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, ম্যালেনা’র মতো অসংখ্য বিখ্যাত চলচ্চিত্রের প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিন। একই সঙ্গে হলিউডের প্রভাবশালী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দ্য ওয়াইনস্টিন কোম্পানি ও মিরাম্যাক্স ফিল্মসেরও প্রধান তিনি। হলিউডের এমন কোনো বড়ো তারকা নেই, যিনি তার সঙ্গে কাজ করেননি। প্রভাব আর ক্ষমতার দিক থেকে হলিউডে ‘মিডিয়া মুঘল’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন হার্ভি। শুধু তা-ই নয়, অস্কার মনোনয়ন কিংবা বিজয়ী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোট দিতে পারতেন তিনি। ফলে অস্কার আসরেও হার্ভি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন। এ পর্যন্ত হার্ভি প্রযোজিত প্রায় তিনশো চলচ্চিত্র অস্কারে মনোনয়ন এবং বিভিন্ন বিভাগে ৮১টি পুরস্কারও জিতে নিয়েছে! ফলে হলিউডের মাধ্যমে পুরস্কার, নাম ও সাফল্য পেতে হার্ভির সঙ্গে কাজ করতে চাইতো অধিকাংশ তারকাই। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, অস্কার জেতার পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বক্তৃতায় স্টিভেন স্পিলবার্গের পর বিজয়ীরা সবচেয়ে বেশিবার ধন্যবাদ দিয়েছে হার্ভিকে। এমনকি জয়ের পর অস্কার বিজয়ীরা ঈশ্বরকেও এতোবার স্মরণ করেনি!আর এ সুযোগটিই গ্রহণ করেছেন হার্ভি।

মজার বিষয় হলো, হার্ভির যৌন কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর এসব দৃশ্যপট একেবারেই পাল্টে যায়। যে তারকা তার সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন, তারা কয়েকগুণ নিন্দায় মেতে উঠেন। ইতোমধ্যে অস্কার কর্তৃপক্ষ ও বাফটা চলচ্চিত্র উৎসব কমিটি হার্ভির সদস্যপদ বাতিল করেছে। সঙ্গে ফরাসি সরকার হার্ভির কাছ থেকে দেশটির সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘লিজিয়ন অব অনার’ও ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তার নিজ প্রতিষ্ঠান মিরাম্যাক্স ফিল্মস ও দ্য ওয়াইনস্টিন কোম্পানি থেকেও তাকে পদচ্যুত করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এতো নারীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হার্ভির বক্তব্য কী? প্রথমদিকে অভিযোগ উঠলে হার্ভি এক বিবৃতিতে জানান, অতীতের ভুল শুধরে তিনি নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। ভবিষ্যতে তিনি আর এমন কাজ করবেন না। কিন্তু যখন একের পর এক অভিযোগ উঠতে থাকে, তখন তিনি নিজের বোল পাল্টে ফেলেন। হার্ভি তখন বলেন, সম্মতি ছাড়া কোনো নারীর সঙ্গে তিনি যৌন সম্পর্ক করেননি! অন্যদিকে তার আইনজীবী জানান, স্বচ্ছ তদন্তই প্রমাণ করে দেবে অভিযোগগুলো আসলেই ভিত্তিহীন।

যে যৌন হেনস্তাকারী হার্ভির বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ এতো অভিযোগ, তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন? যুক্তরাষ্ট্র সরকারইবা তার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নিয়েছে? বাস্তবতা হলো, হার্ভি মোটেও জেলখানায় বন্দি নন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিয়ানা রাজ্যের একটি পুনর্বাসনকেন্দ্রে প্রতিদিন থেরাপি নিচ্ছেন! এখন প্রশ্ন হলো, যার জেলে থাকার কথা তিনি পুনর্বাসনকেন্দ্রে কেনো? এর কারণ হিসেবে দেশটির সরকার জানিয়েছে, তারা মনে করছে হার্ভি যৌনবিকারগ্রস্থ; তাই তিনি এসব করেছেন! অথচ তার দেশের চিকিৎসকরা কিন্তু একেবারেই ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের দাবি, হার্ভি যৌন হেনস্তার যে কাণ্ড ঘটিয়েছেন সেটা মোটেই কোনো রোগ নয়; তার সঙ্গে কথা বলে তারা এ ধরনের কোনো লক্ষণও পাননি। তবে গবেষকরা বলছেন-যৌন নিপীড়ন কখনোই যৌন ইচ্ছা থেকে তৈরি হয় না, এটা হয় পুরুষের ক্ষমতার চর্চা থেকে। আর সেই ক্ষমতা হার্ভির ছিলো। আরো মজার বিষয় হলো, হার্ভির বিরুদ্ধে অর্ধশত নারী তারকা গণমাধ্যমে অভিযোগ করলেও তাদের অধিকাংশই কিন্তু এ নিয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি! ঘটনার প্রায় চার মাস পেরিয়ে গেলে প্রথম মামলাটি হয় নিউ ইয়র্কে। মামলাটি করা হয় হার্ভি, তার ছোটো ভাই রবার্ট ওয়েনস্টিন ও তাদের মালিকানাধীন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ওয়েনস্টিন কোম্পানির বিরুদ্ধে। মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে-

হার্ভি বাচনিকভাবে বা কথার মাধ্যমে তার নারী কর্মীদের হুমকি দিয়েছেন; হুমকিতে তিনি বলেছেন, আমি তোমাকে হত্যা করব বা আমি তোমার পরিবারের সবাইকে হত্যা করব। তিনি আলাদা করে নারী কর্মীদের ডেকে নিয়েছেন এবং তাদের নিয়োগ দিয়েছেন, যাতে তিনি এসব নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক করতে পারেন। হার্ভি স্টুডিওতে নারীদের ভাল কাজ এবং ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে যৌন সম্পর্ক করেছেন। তিনি সব সময় তার গাড়ির ড্রাইভার দিয়ে কনডম ও যৌন উত্তেজক ইঞ্জেকশন নিয়ে আসতেন যা তার গাড়িতেই সব সময় থাকতো। তিনি অফিস কিংবা তার নিজের কাজের সময় নিজের নারী কর্মীদের সাথে যৌন সম্পর্ক করতেন। হার্ভি নারী সহকর্মীর ঋতুচক্রের সময় তাকে এর জন্য অপমান করতেন এবং একজন নারী নিজের ভালোর জন্য তার কোম্পানি থেকে বের হয়ে সন্তান জন্ম দিতে চাওয়ায় তিনি তার সাথে বাজে ব্যবহার করেন। ... ওই স্টুডিওর নারী কর্মীদের ওপর কয়েক বছর ধরে যৌন নিপীড়নের নথিপত্রও রয়েছে। কিন্তু কোম্পানিটি প্রমাণ থাকার পরেও নারী কর্মীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে একজন অভিযোগকারী জানিয়েছেন তিনি হার্ভির ভাই রবার্ট ওয়েনস্টিনকে তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা লিখে সরাসরি ইমেইলে জানান। কিন্তু তিনি এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।

মামলায় সবকিছু এমনভাবে সাজানো হয়েছে, দেখে মনে হয় হার্ভি আসলেই অতিরিক্ত যৌনাসক্ত এক পুরুষ। যিনি ঘুমানো, কাজ এমনকি গাড়িতে চলার সময়ও যৌনক্রিয়া করতেন। ফলে তাকে জেলে না পাঠিয়ে পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানোই যথার্থ হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বুঝলাম হার্ভি অসুস্থ হওয়ায় তার থেরাপি চলছে; কিন্তু প্রমাণ থাকার পরও হার্ভির ভাই রবার্ট ওয়েনস্টিনকে গ্রেপ্তার করা হয়নি কেনো? তারা তো মামলায় উল্লেখ করেছে, রবার্ট জানার পরও এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। আসলে এখানেও সেই ক্ষমতা। যে ক্ষমতার বদৌলতে অর্ধশত নারীর অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয় না রাষ্ট্র। কারণ পুরুষ প্রাধান্যশীলতায় হার্ভিদের সঙ্গে রাষ্ট্রের ক্রীড়ানকদের ভালো সম্পর্ক থাকে। সরাসরি অর্থ সরবরাহের বাইরেও অনেক কিছুই হার্ভিদের সরবরাহ করতে হয় ক্ষমতাবানদের। ফলে দিনশেষে ট্রাম্পও এ নিয়ে কোনো কথা বলেন না। যদিও তিনি সমান দোষে দুষ্ট! তার বিরুদ্ধেও রয়েছে কয়েক ডজন যৌন হয়রানির অভিযোগ।

‘... মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে

থাকি-তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে’

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে এ বছরের জানুয়ারিতে বসে ৭৫তম গোল্ডেন গ্লোব আসর। সম্মানজনক এ আয়োজনকে কাজে লাগিয়ে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বিশ্বখ্যাত তারকারা। নীরব প্রতিবাদ হিসেবে কালো রঙকে বেছে নেয় তারা। একই সঙ্গে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য কালো পোশাক পরে তারা হাজির হয় গোল্ডেন গ্লোব আসরে। আয়োজনে ছিলো না লাল, নীল, হলুদ, গোলাপী দ্যুতির কোনো জৌলুস; আলোকচিত্রীদের ক্যামেরা একবারের জন্যও খুঁজে পায়নি বাহারি রঙের ঝলমলে পোশাকপরা কাউকে। সবমিলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গোল্ডেন গ্লোব আসর যেনো হয়ে ওঠে প্রতিবাদের অন্যরকম এক মঞ্চ। নানাভাবে প্রশংসিত হতে থাকে তাদের কার্যক্রম, বক্তৃতা। এর পাশাপাশি সেখানে কারা কোন পুরস্কার পাচ্ছে, সেটা নিয়েও চলে নানা উন্মাদনা। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অভিনেতা আজিজ আনসারি আলোচনায় আসেন প্রথম এশীয় ও ভারতীয় হিসেবে গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার জিতে। উপমহাদেশের সংবাদমাধ্যমও তাকে নিয়ে বেশ রঙে-ঢঙে সংবাদ প্রকাশ করে। আজিজ ‘টাইমস আপ’ উদ্যোগের সমর্থন দেওয়ায় তার দিকে আলোর ঝলকানি যেনো আরো বেড়ে যায়। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় খোদ আজিজের বিরুদ্ধেই যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনের ২৩ বছর বয়সি এক নারী আলোকচিত্রী! মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায় আজিজের গর্ব।

নারী আলোকচিত্রীর ভাষ্য, গোল্ডেন গ্লোব আসরে আজিজ আনসারিকে ‘টাইমস আপ’ উদ্যোগের সমর্থনে কথা বলতে দেখে ভীষণ অবাক হয়েছেন তিনি। তখন তার ঠিক একবছর আগের কথা মনে পড়ে যায়। এক পার্টিতে আজিজ আনসারির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আলাপের পর তাদের মধ্যে আদান-প্রদান হয় ফোন নম্বর। কিছুদিন পর তারা ঘুরতে বের হলে আজিজ তাকে হোটেল রুমে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন। তবে তিনিও অন্য সব নারী তারকাদের মতো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি। কেবল #মিঠু আন্দোলনকে আরো তাড়িত করেছেন। আর তাতেই আজিজকে নিয়ে শুরু হয় নানা তর্কবিতর্ক। অন্যদিকে আজিজ আনসারি দাবি করেন, ‘তাঁর আচরণেও আমি সম্মতিসূচক ইঙ্গিত পেয়েছিলাম। কিন্তু পরদিন সে আমাকে একটি খুদে বার্তা পাঠায়। তখন জানতে পারি, আগের রাতের ঘটনায় সে আমার ওপর নাখোশ হয়েছে।’আজিজ আরো বলেন, মেয়েটি তখন সাবলীল থাকায় তার অস্বস্তির কথা আমি টের পাইনি। বিষয়টা জানার পর আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। তবে ওই নারীকে বিব্রত করার জন্য তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন আজিজ।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আজিজ জানিয়েছেন তিনি নাকি ওই আলোকচিত্রীর কাছ থেকে শারীরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। হয়তো সেই ইঙ্গিত বিভিন্নভাবে হতে পারে। কিন্তু তিনি তা কীভাবে পেয়েছেন, সেটা কিন্তু উল্লেখ করেননি। কারণ মুখে বলা আর আকারে ইঙ্গিতে সম্মতি পাওয়া এক কথা নয়। ইঙ্গিতীয় সমর্থন যেকোনো সময় বদলে যায়; সময় ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে আদৌ সেটা কোনো ইঙ্গিত ছিলো কিনা। আর সেটা না বোঝার মতো বোকা আজিজকে মনে হয়নি। কিন্তু ওই নারী যখন ক্ষুদে বার্তায় জানিয়েছেন তার ওপর তিনি নাখোশ; তখন কিন্তু আজিজ ক্ষমা প্রার্থনা করেননি; করেছেন #মিঠু আন্দোলনে জনসম্মুখে নিজের পরিচয় ফাঁস হবার পর। তার মানে তিনিও ক্ষমতা আর পুরুষত্বের দাপট দেখিয়েছেন। আর যখন তার মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে তখন তিনি বলেছেন, ‘আমি সব সময় এই আন্দোলনকে সমর্থন করে যাব। আমাদের সংস্কৃতিতে এর প্রয়োজন আছে। আরও আগেই এই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।’১০

অন্যদিকে চলচ্চিত্রজগতের আরেক প্রভাবশালী তারকা দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্রনির্মাতা কিম কি দুক। এ বছর ৬৮তম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্যানোরমা বিভাগে (পৃথিবী শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রনির্মাতাদের চলচ্চিত্র এ বিভাগে দেখানো হয়) তার নতুন চলচ্চিত্র হিউম্যান, স্পেস, টাইম অ্যান্ড হিউম্যান নির্বাচিত হয়। একই সঙ্গে চলচ্চিত্র উৎসবে তাকে আমন্ত্রণও জানানো হয়। তখনই শুরু হয় বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে বিতর্ক। কারণ বার্লিন উৎসব শুরুর আগেই গত বছর কিমের বিরুদ্ধে #মিঠু আন্দোলনের অংশ হিসেবে মারধর ও যৌন হেনস্তার অভিযোগ করেন তার মোয়েবিয়াস চলচ্চিত্রের এক নারী অভিনয়শিল্পী। তবে শুটিংয়ের সময় অভিনয়শিল্পীকে চড়-থাপ্পড় মারার কথা আদালতে স্বীকার করলেও, যৌন হয়রানির কথা অস্বীকার করেন কিম। আদালত মারধরের ঘটনায় কিমকে দোষী সাব্যস্ত করে চার হাজার ছয়শো ডলার জরিমানাও করেন। তবে যৌন হেনস্তার অভিযোগ ওই অভিনয়শিল্পী প্রমাণ করতে না পারায় খালাস পান কিম। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে যেহেতু যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে সেহেতু #মিঠু আন্দোলনের সমর্থকরা কিম কি দুকের চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো ও তার উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি তোলে। কিন্তু উৎসব পরিচালক ডিয়েটর কসলিক বলেন, ‘বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব যৌন বা অন্য যে কোনো ধরণের নৃশংসতাকে বর্জন করে। ২০১৮ সালের পরিচালকের সঙ্গে পূর্বে ঘটা কোনো ঘটনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়।’১১ অন্যদিকে প্যানোরমা বিভাগের প্রধান পাজ লজারো বলেন, ‘আমরা ছবিটির সামাজিক দায় ও শিল্পগুণ বিচার করেই নির্বাচন করেছি। পরিচালকের ব্যক্তিগত জীবন এখানে বিবেচনার বিষয় নয়।’১২

এখানেও কিম কি দুকের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কারণ তার বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানির অভিযোগ হয়তো প্রমাণ হয়নি, কিন্তু তিনি যে তাকে মারধর করেছেন সেটা কিন্তু স্বীকার করেছেন। সেই মারধর তিনি ওই অভিনয়শিল্পীকে অভিনয় শেখাতে গিয়ে দেন, আর উদ্দেশ্যমূলক দেন, অবশ্যই কিম সেটা অপরাধ করেছেন। তাই আদালতও তাকে জরিমানা করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো অভিনয়শিল্পীকে মারধরের ঘটনায় তাকে জরিমানা করলে সেটা কতোটুকু ন্যায় বিচার হয়? অন্যদিকে ওই নারী অভিনয়শিল্পী যদি ভুয়া যৌন হয়রানির অভিযোগ করেই থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কেনোইবা কোনো ব্যবস্থা নিলেন না কিম? আবার বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষ সেখানে কিমের চলচ্চিত্র দেখাবে কি দেখাবে না, সেটা হয়তো তাদের বিষয়। কিন্তু তারা দেখানোর স্বপক্ষে যে যুক্তি দিয়েছে সেটা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ তারা এখানে অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়নি, দিয়েছে ব্যক্তিকে। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের আগের অভিযোগ পুরনো হয়েছে ভেবে, তা একেবারেই অমূলক এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে সবাই যদি শিল্পগুণ বিচার করেই কোনো ব্যক্তিকে বিচার করে এবং তার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডকে বাদ দেয়, তাহলে সেটাও ন্যায়সঙ্গত নয়। কারণ সেই হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে, তাদের অনেকেরই বিচার হওয়ার কথা নয়।

অন্যদিকে অস্কারজয়ী নির্মাতা রোমান পোলানস্কি। সারাবিশ্বে তার নাম-ডাকও অনেক। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১০ বছর বয়সি এক কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া গত বছর #মিঠু আন্দোলনের জেরে পুলিশের কাছে আরো এক নারী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে পোলানস্কির বিরুদ্ধে কিন্তু ধর্ষণের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কারণ এর আগেও তার বিরুদ্ধে ১৩ বছর বয়সি আরেক কিশোরীকেও ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। এর বিপরীতে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৪২ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের বিচারকরা তার সাজার সময়সীমা বাড়ানোর আগেই ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে পালিয়ে যান তিনি। এছাড়া জার্মান অভিনয়শিল্পী রেনেট ল্যাঙ্গারও গত বছর এ পরিচালকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনেন। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ অভিনয়শিল্পী ক্যারোলেট লুইসও করেন একই অভিযোগ। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, পোলানস্কিকে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বিচারের কাঠগড়ায় উঠতে হয় না। তার ক্ষমতা আর প্রভাবে তিনি যেনো আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন। এর কারণ হয়তো উনি যেসব দেশে কাজের সূত্রে যান, সেখানে অনায়াসেই যৌন কর্মকাণ্ড চালান। কিন্তু ফ্রান্সে যেহেতু তিনি আশ্রয় নিয়েছেন, সেহেতু সেই দেশের নারীদের প্রতি তিনি বড়োই সংযমী! ফলে সে দেশের কোনো নারী তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করে না! প্রশ্ন হলো, ফ্রান্স, জার্মান ও বৃটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য, তা সত্ত্বেও পোলানস্কিকে কেনো কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না? এসব দেশে অভিন্ন মুদ্রা, পাসপোর্ট (যদিও সম্প্রতি বৃটেন এই ইউনিয়ন থেকে বের হয়েছে) ও একে অন্যের বন্দি বিনিময়ের চুক্তি থাকলেও কেনো পোলানস্কির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় না তা অধরাই থেকে যায়!

হার্ভির পর #মিঠু আন্দোলনের মাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত অভিযুক্ত হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিমন্যাস্টিকস দলের সাবেক চিকিৎসক ৫৪ বছর বয়সি ল্যারি নাসার। যার বিরুদ্ধে দুইশো ৬৫ জন নারী অ্যাথলেট যৌন হেনস্তার অভিযোগ তুলেছে। তার কাছে যারা যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছে তাদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সি কিশোরীও রয়েছে। এই অভিযোগের দায়ে নাসারকে এরই মধ্যে দেশটির আদালত একশো ৭৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে, মিশিগানের একটি জিমন্যাস্টিকস ক্লাবে তিনি রোগীদের যৌন হয়রানি করতেন। মিশিগান ইউনিভার্সিটির সাবেক চিকিৎসক ল্যারি নাসার গত বছর মামলার শুনানিতে নিজের দোষ স্বীকারও করে নেন। সব মামলার শুনানি শেষ হলে নাসারের আরো ২৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বাড়তে পারে।

তবে নাসারের শাস্তিতে এমন কিছু ভাববার কারণ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র আসলেই সব অপরাধীদের সাজা দেয়। বরং সন্দেহ জাগে হার্ভির বিরুদ্ধে অর্ধশত নারীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কেনো তাকে যৌন বিকারগ্রস্ত বলে পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়, আর নাসারের বিরুদ্ধে দুইশো ৬৫ জন নারীর অভিযোগের পরও কেনো সরাসরি বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। এর মানে তারা ধরেই নিয়েছে, নাসার এক্ষেত্রে ‘যৌন বিকারগ্রস্ত’ নন! তাই হার্ভির মতো তাকে কোনো পুনর্বাসনে পাঠানো হয়নি। এর কারণ হিসেবে যদি কেউ অভিযোগ করেন, নাসার কেবল প্রভাবশালী না হওয়ার কারণেই এ দণ্ড হয়েছে, তাহলে সেটাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই! কারণ যুক্তরাষ্ট্র ল্যারি নাসার বিচারকে একধরনের ‘রোল মডেল’ হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছে। তার বিচার প্রক্রিয়া ইন্টারনেট, টেলিভিশন ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়! অন্যদিকে ‘পুনর্বাসনে’ থাকেন কেবল হার্ভি!

আগেই উল্লেখ করেছি, #মিঠু আন্দোলনের মাধ্যমে হার্ভির বিরুদ্ধে অর্ধশত নারী তারকা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করলেও মামলা করেছে মাত্র কয়েকজন। ঘটনার চার মাস পর প্রথম মামলা করে নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্য। প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক শ্নেইডারম্যান ওই মামলার প্রক্রিয়া শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া শুরুর পর এক টুইটে শ্নেইডারম্যান বলেছিলেন, যৌন হয়রানি, নিগ্রহ আর আতঙ্ক মুক্ত একটি কর্মপরিবেশ পাওয়ার অধিকার নিউ ইয়র্কের প্রত্যেক নাগরিকেরই আছে। যদি কেউ ওই ধরনের কোনো অসদাচরণের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।১৩ একই সঙ্গে ওই মামলায় ওয়াইনস্টিন তার প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীদের যৌন নিপীড়ন করতেন, এমনকি হত্যার হুমকি দিতেন বলেও জানান শ্নেইডারম্যান। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে এই শ্নেইডারম্যানই চার নারীকে নির্যাতনের অভিযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন! ফলে সহজেই বোঝা যায়, পশ্চিমারা নারী স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী হয়েও সভ্যতার ঠিক কোথায় অবস্থান করছে!

সম্প্রতি ‘বি বি সি’র এক জরিপে উঠে এসেছে, কর্মক্ষেত্রে বা পড়াশুনার জায়গায় অর্ধেক বৃটিশ নারীই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে, এমনকি এক পঞ্চমাংশ পুরুষও শিকার হয়েছে যৌন হয়রানির। আর এক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার প্রায় ৬৩ শতাংশ নারী ঘটনার পর এ বিষয়ে কোনো রিপোর্ট করেনি বা কাউকে জানায়নি। অন্যদিকে যৌন হয়রানির শিকার ৭৯ শতাংশ পুরুষ জানিয়েছে, বিষয়টি তারা চেপে রেখেছে নিজেদের মধ্যেই। ফলে #মিঠু আন্দোলনে যতো নারী-পুরুষ সাড়া দিয়েছে, অবস্থাদৃষ্টে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ।

টাইমস আপ : পক্ষ-বিপক্ষে #মিঠু

গোল্ডেন গ্লোবে এবার প্রথম কোনো কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘সেসিল বি ডেমিল’ বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক অপরাহ উইনফ্রে। নিজের অভিব্যক্তি জানাতে স্টেজে যান তিনি। কিন্তু তার চোখে-মুখে যেনো পুরস্কার পাওয়ার কোনো আনন্দ নেই; দর্শকের সামনে নিজের হাস্যোজ্জল চেহারাও মেলে ধরেননি তিনি। #মিঠু আন্দোলনে সাড়া দিয়ে সবাই কালো পোশাক পরে হাজির হওয়ায় সেটাকে শোকের কোনো অনুষ্ঠান বলেই মনে হয়। স্তব্ধ দর্শক-শ্রোতার উদ্দেশে কথা বলা শুরু করেন অপরাহ। তার ভাষায়, ‘আমাদের সবার কাছে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হচ্ছে-সত্যি কথা বলা। পুরুষদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্য বলার সাহস করা নারীদের কথা শোনা কিংবা বিশ্বাস করা হত না বহুকাল। সে সময় পেরিয়ে গেছে। তাদের সময় পেরিয়ে গেছে। টাইমস আপ।’১৪

অপরাহর এ বক্তব্যে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে সমর্থন জানায় উপস্থিত নারী-পুরুষ সবাই। তাদের নতুন প্রকল্প ‘টাইমস আপ’-এর কার্যক্রম আরো প্রখর হয়। এই প্রকল্পটি কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার অস্বচ্ছল নারী-পুরুষের আইনি সহায়তার জন্য গঠিত হওয়ায়, কিছুদিনের মধ্যেই ১৫ মিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ১৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ উঠে আসে!১৫ তবে এতে একটা প্রশ্ন বার বার উঁকি দেয়। হার্ভিসহ যেসব বাঘা বাঘা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নারীরা অভিযোগ তুলেছে, তাদের কিন্তু টাকার অভাব ছিলো না। তাদের অধিকাংশই তারকা এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত সাবলম্বী নারী। কিন্তু তারা এসব যৌন হয়রানিকারীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অভিযোগ করেনি। #মিঠু আন্দোলনে প্রতিবাদের জোয়ার না উঠলে তারাও এ নিয়ে মুখ খুলতো কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ আছে! কারণ অনেক ভুক্তভোগী এখনো নীরব আছে এবং যারা অভিযোগ করেছে তাদের অধিকাংশই কোনো লিখিত অভিযোগ করেনি। তাহলে শুধু টাকা থাকলেই যে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব সেটা ভাবা অবান্তর। কারণ আর্থিক সহায়তার আগে তাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় হয়েছে সেটা কেনো প্রকাশ করা প্রয়োজন, সেই বোধই তাদের মধ্যে এখনো গড়ে ‘ওঠেনি’। অন্যদিকে সার্বিক দিক থেকে দেখলে মনে হয়, পশ্চিমা নারী-পুরুষ সবাই এ আন্দোলনের সমর্থক। কিন্তু পরিস্থিতি মোটেও তা নয়।


হলিউডের চলচ্চিত্র প্রযোজক হার্ভির বিরুদ্ধে যখন একের পর এক নারীরা মুখ খুলেছে, তখন অস্কারজয়ী অভিনয়শিল্পী মেরিল স্ট্রিপ বলেন, ‘হার্ভি আমার সঙ্গে সব সময় সম্মানজনক আচরণ করেছেন। অন্যদের সঙ্গে তিনি কী করেছেন, তা আমার জানা নেই।’১৬ এ বক্তব্যে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। কারণ তার এ বক্তব্যে অন্যদের অভিযোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সন্দেহ জাগায়। পরে মেরিল ভুল স্বীকার করে জানান, তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন হার্ভি তার সঙ্গে ওই ধরনের আচরণ করেননি। তবে তিনি অভিযোগকারীদের পক্ষে আছেন। এরপর অন্য তারকাদের সঙ্গে বিতর্ক এড়াতে গ্লোল্ডেন গ্লোবে যৌন হয়রানির নীরব প্রতিবাদ হিসেবে কালো পোশাক পরার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যারা এ পদক্ষেপ নেন, তাদের ওপর হার্ভির দ্বারা যৌন হেনস্তার শিকার রোজ ম্যাকগাওয়ান ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন,

মেরিল স্ট্রিপের মতো অভিনেত্রীরা শূকররূপী দানবদের সঙ্গে হাসিমুখে কাজ করেছেন। তাঁরাই এবার নীরব প্রতিবাদ হিসেবে গোল্ডেন গ্লোবে কালো পোশাক পরতে যাচ্ছেন। আপনাদের এই নীরবতাটাই আমাদের কাল হয়েছে। আপনারা নির্দ্বিধায় বানোয়াট সব পুরস্কার গ্রহণ করবেন, এতে কোনো কিছুই বদলাবে না। আপনাদের এই ভন্ডামির প্রতি ধিক্কার জানাই।১৭

এমন বিদ্রুপের প্রত্যুত্তরে মেরিল বলেন, ‘ ... ওয়াইনস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে আমি আসলেই কিছু জানি না। এমনকি নব্বইয়ের দশকে যখন রোজ হেনস্তা হন, তখনো না। ... আমি ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থাকিনি। আমি এই বিষয়টি জানতাম না।’১৮

অন্যদিকে ফরাসি অভিনয়শিল্পী ক্যাথরিন দ্যুনভ তো সরাসরি #মিঠু আন্দোলনের মাধ্যমে অভিযোগকারীদেরই সমালোচনা করেছেন। সমালোচনা করেছেন যারা ঢালাওভাবে আন্দোলনকারীদের পক্ষাবলম্বন করেছে তাদের। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা ফ্লার্ট করলেও তো তাহলে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। ধর্ষণ অপরাধ, কিন্তু কেউ যদি নারীর মন জয়ের চেষ্টা করে সেটা তো তার অপরাধ নয়।’১৯ দ্যুনভের পর ফ্রান্সের আরেক কিংবদন্তি তারকা ব্রিজিত বারদুত বলেন, ‘যেসব অভিনেত্রী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছেন, তারা আসলে প্রচারণা পাওয়ার উদ্দেশ্যে এমনটি করেছেন। ... অধিকাংশ অভিযোগই সঠিক না, হাস্যকর এবং এতে কোনো স্বার্থ নেই।’২০ হাজারো অভিযোগকারীর ভিড়ে দ্যুনভ ও ব্রিজিতের অভিযোগও বেশ আলোচনায় আসে। কারণ তারাই সরাসরি #মিঠু আন্দোলনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। প্রশ্ন জাগায়, আসলেই তো, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারীর মন জয়ের চেষ্টা চালায়, তবে সেটাও কী যৌন হয়রানির মধ্যে পড়বে? তবে এর উত্তরও সহজে মিলে যায়। কারণ কোন স্পর্শ আর আচরণ আপত্তিজনক বা অস্বাভাবিক সেটা কেবল নারীই বলতে পারে। ফলে তিনিই তো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোনটি যৌন হয়রানি আর কোনটি মন জয়ের চেষ্টা।

অন্যদিকে ব্রিজিত যে অভিযোগ করেছেন সেটা হয়তো একেবারেই অমূলক নয়। কারণ অভিযোগকারীরা কেবল #মিঠু আন্দোলনের মাধ্যমেই নিজেদের জানান দিয়েছে, গণমাধ্যমের খবরে পরিণত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে ব্রিজিত যেভাবে ঢালাও সব নারীকে গণমাধ্যমের আলোচনায় আসার অভিযোগ তুলেছেন, সেটা হয়তো একটু বাড়াবাড়িই। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে তিনিও হয়তো সেই চেষ্টার কমতি রাখেননি। অন্যদিকে #মিঠু আন্দোলনে মুখ খোলা নারী-পুরুষকে ‘সাইলেন্স ব্রেকারস’ অ্যাখ্যা দিয়ে গত বছর তাদেরকে ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ খেতাব দিয়েছিলো ‘টাইমস ম্যাগাজিন’। সেখানে তারা ছয় নারীকে নিয়ে প্রচ্ছদও করে। প্রচ্ছদে #মিঠু’তে অভিযোগ করা অ্যাসলি জুড, টেইলর সুইফট, ইসাবেলা পাসচুয়াল, আদামা উওয়ু ও সুসান ফাউলারসহ পাঁচ নারীকে দেখানো হলেও এক নারীর কেবলই ডান হাত দেখানো হয়। পরে কারণ হিসেবে বলা হয়, ওই নারী নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। তাই তাকে সম্মান জানিয়েই কেবল হাতের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। তার মানে সমাজে এমন নারীও আছে, যারা নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিবাদ করে, কিন্তু নতুন করে ঝামেলায় জড়াতে চায় না। হয়তো এদের সংখ্যাই সমাজে বেশি। ফলে ব্রিজিত যে অভিযোগ করেন সেটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

বলিউড ও ‘মৃদুমন্দ’ #মিঠু আন্দোলন

ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে #মিঠু আন্দোলন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না। ফলে হলিউডের পাশাপাশি বলিউডেও দ্রুত এর আঁচ লাগে। বলিউডে #মিঠু আন্দোলনের সূত্রে প্রথম অভিযোগ ওঠে ৭৫ বছর বয়সি অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজক জিতেন্দ্রর (পোশাকি রবি কাপুর) বিরুদ্ধে। আর সেই অভিযোগ করেন তারই এক খুড়তুতো বোন। একই সঙ্গে যৌন হেনস্তার অভিযোগে ওই নারী হিমাচল রাজ্যে পুলিশের ডি আই জি বরাবর লিখিত অভিযোগও করেন। অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে তার অজান্তে সিমলা থেকে নয়াদিল্লিতে নিয়ে রাতে মদ্যপ অবস্থায় হোটেলে শ্লীলতাহানি করেন জিতেন্দ্র।২১ আর এর পর পরই বলিউডে #মিঠু আন্দোলন নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। তবে সেটা ওই পর্যন্তই। কারণ প্রভাবশালী প্রযোজক ও অভিনয়শিল্পী জিতেন্দ্রের বিরুদ্ধে করা মামলায় শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে তা আর জানা যায় না। তার খুড়তুতো বোন ৪৭ বছর পর নিজের কষ্ট লাঘবের সুযোগ পেলো কিনা সেটাও অধরা থেকে যায়। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই একটি ঘটনা ছাড়া বলিউডে আর কেউ সরাসরি কারো বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেনি।

তবে এক্ষেত্রে বলিউডে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। অভিনয়শিল্পী রাহুল ভাট প্রথম বলিউডের কোনো পুরুষ হিসেবে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। তিনি গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমি যখন মডেল হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করি, তখন আমাকে এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আমাকে অনেকে কুরুচিকর প্রস্তাব দিয়েছেন। এই তালিকায় অনেক খ্যাতিমান ছেলে এবং মেয়ে ফ্যাশন ডিজাইনার ছাড়াও নামকরা চিত্র পরিচালকও আছেন।’২২ কিন্তু তাদের পরিচয় সম্পর্কে মুখ খোলেননি রাহুল। তবে আশা দিয়ে রেখেছেন, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে এক এক করে তিনি নাকি সবার মুখোশ খুলে দিবেন! এখন মুখ খুললে তিনি প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন না, নাকি অন্য কোনো সমস্যা আছে সেই বিষয়টি তিনি পরিষ্কার করেননি। রাহুলের পর পরই কাস্টিং কাউচের শিকার হয়েছেন বলে স্বীকার করেন রাখি সাওয়ান্ত। একই সঙ্গে বলিউডে কাউকে ধর্ষণ করা হয় না, দু’পক্ষের সম্মতিতেই শারীরিক সম্পর্ক হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে রাখি কার কাছে হয়রানির শিকার হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলেননি। এই কয়েকজন ছাড়া সাধারণত আর তেমন কাউকেই #মিঠু আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়নি বলিউডে।

প্রশ্ন হলো, জাঁকজমক কিংবা ব্যবসার দিক দিয়ে হলিউডের চেয়ে খুব বেশি পিছিয়ে নেই বলিউড। অনেকে বলিউডকে হলিউডের চাইতেও অনেক দিক দিয়ে এগিয়ে রাখেন। কিন্তু #মিঠু আন্দোলনের ক্ষেত্রে হলিউডের মতো বলিউডে সাড়া পড়েনি কেনো? এখানকার এ নীরবতার অর্থ কী? ভারতের মাটিতে কি হার্ভির মতো ‘বাঘা’ কোনো যৌন হেনস্তাকারী নেই? যে দেশে প্রতি ২২ মিনিটে একটি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে,২৩ যে দেশে সাম্প্রদায়িকতার জেরে আট বছরের মুসলিম কন্যাশিশুকে টানা এক সপ্তাহ মন্দিরে আটকে রেখে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়; নিস্তার মেলে না স্বজাতি, নিম্ন জাতির যেকোনো বয়সি নারীর, সেই দেশের এতো বড়ো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে এই নীরবতা একটু কি অস্বাভাবিক নয়! বলিউডের তারকা রাধিকা আপ্তেকেও ভাবিয়েছে এ ‘ভৌতিক’ নীরবতা। তিনি কাস্টিং কাউচ তথা যৌন হেনস্তার শিকার হননি, তবে তিনিও বিশ্বাস করেন না বলিউডে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। বরং গভীর নীরবতায় ক্ষুদ্ধ হয়ে তিনি বলেছেন-

বলিউডের এ নীরবতার কারণেই অভিনেত্রীরা লোকসম্মুখে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ভয় পান। ... বলিউড তারকাদের সবসময় ‘ঈশ্বর’ হিসেবে বিবেচনা করার একটা দীর্ঘ ইতিহাস রচিত হয়ে গেছে। ঠিক এ বিষয়টিই এক ধরনের ফাঁদ। ... কিছু কিছু তারকা এতটাই ক্ষমতাবান যে, তাদের কারণে সাধারণ অভিনেত্রীদের কোনো অভিযোগ এ ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো পাত্তাই পায় না। ফলে তুলনামূলক কম অভিনেত্রীরা যদি এ নিয়ে কথাও বলেন, তাহলে তাদের পুরো ক্যারিয়ারই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এভাবেই একটার পর একটা অপরাধ ঘটার সুযোগ তৈরি হয়।২৪

রাধিকার দাবি মিথ্যা নয়, হয়তো বলিউডের ‘ঈশ্বর’ ভীতি ও ক্যারিয়ারের ভয়েই সেখানে এ নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, #মিঠু আন্দোলনে শরিক হলে তাকে হয়তো নানাভাবেই হয়রানি-বঞ্চনারও শিকার হতে হবে। ফলে নাম বলা দূরের কথা, তার সঙ্গে যে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে সেটা বলারই সাহস দেখায়নি অনেকে। তবে রাধিকা আশা ব্যক্ত করেন, একদিন হলিউডের মতো বলিউডেও সবাই এক হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে। জনপ্রিয় তারকা অক্ষয় কুমারও একই সুরে বলেন, ‘এই দেশেও যদি এমনটা সম্ভব হতো, তাহলে খুব ভালো হতো।’২৫

তবে রাধিকা, অক্ষয়ের মতো #মিঠু আন্দোলনে সমর্থনের পাশাপাশি এর বিরোধিতাও করেছে অনেকে। ‘সেরা কোরিওগ্রাফি’ বিভাগে তিন বার ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া নৃত্যশিল্পী সরোজ খান তাদেরই একজন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘কাস্টিং কাউচ কোনো খারাপ বিষয় নয়। কাজ দেয়। অন্তত ধর্ষণ করে ছেড়ে তো দেয় না।’২৬ আর তাকে সমর্থন জানিয়ে বলিউডের বরেণ্য অভিনেতা ও বি জে পি’র সাংসদ শত্রুঘ্ন সিনহা বলেন, ‘বিনোদন ও রাজনীতি, এই দুই জায়গায় কাজের বিনিময়ে যৌন সম্পর্ক গড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সরোজ খান কিছু ভুল বা মিথ্যা বলেননি। রাজনীতি, বিনোদন-দুই জায়গায়ই জীবনে উন্নতি করার বহু পুরোনো প্রথা কাস্টিং কাউচ। বিষয়টা এ রকম, আপনি আমাকে খুশি করুন, আমিও আপনাকে করব। সোজা কথায় দেওয়া-নেওয়া। খারাপ লাগার কী আছে!’২৭

সরোজ খান ও শত্রুঘ্ন সিনহার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, কেনো ভারতে #মিঠু আন্দোলনে বলিউডের নারী তারকারা নীরবতায় আছে। রাধিকার নাম না বলা ওই সব ক্ষমতাধর ঈশ্বরদের ব্যাপারেও কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। তাদের বক্তব্য নিয়ে বলিউডে বিতর্ক হয়, ক্ষোভ প্রকাশ করে অন্য অনেক তারকা-গণমাধ্যমকর্মী। কিন্তু সরোজ, শত্রুঘ্নের বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ তোলে না। একবারের জন্যও কেউ প্রশ্ন তোলে না অধীনস্থদের ক্যারিয়ার, উন্নত জীবনধারণের লোভ দেখিয়ে ‘সম্মতি’ নিয়ে যৌন সম্পর্ক করাও অপরাধ। কারণ ওই অধীনস্থ নারী-পুরুষ তার কাছে যেতে বাধ্য হয়েছে। আর তারা সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে। ফলে ফাঁদে ফেলে সম্মতিতে হোক আর অসম্মতিতে হোক, কোনো কাজই কখনো বৈধ হতে পারে না। শত্রুঘ্নের বক্তব্যে এটাও আন্দাজ করা যায়, চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজনীতিতেও কেনো এ ধরনের কোনো অভিযোগ ওঠে না। ফলে ভারতে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা পুরুষের কেনো সচারচর বিচার হয় না। আর কখনো কখনো এসব নিয়ে যদি মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েই যায়, তাহলে রাষ্ট্রের ‘ললিপপ রাজনীতি’ তো আছেই।

#মিঠু আন্দোলন ও ‘অপরিণত’ বাংলাদেশ

নারীর প্রতি যৌন নিগ্রহ নিয়ে গোটা পৃথিবী #মিঠু আন্দোলনে ‘কেঁপে’ উঠলেও বাংলাদেশে প্রতিবাদের মঞ্চটা নীরব। তার মানে এ দেশে যৌন হয়রানি বা নারীর প্রতি যৌন নিপীড়নের মতো কোনো ঘটনা যে ঘটে না, তা কিন্তু নয়। বরং এ হার ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এক জরিপে জানিয়েছে, দেশে ধর্ষণের ঘটনা ও তার ভয়াবহতা অনেক বেড়েছে। এক বছরে সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে আটশো ১৮ জন নারী, আর ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে প্রায় অর্ধশত। এছাড়া আত্মহত্যা করেছে মোট ১১ জন। এসব কিতাবি হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে আরো অপ্রকাশিত অনেক খবর। কিন্তু বাংলাদেশের নারীরা এসব যৌন হয়রানি/ধর্ষণের বিষয়ে কারো কাছে মুখ খোলেনি।

হলিউডের সূত্র ধরে পশ্চিমে যেভাবে #মিঠু আন্দোলনের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রেও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে, তার কিছুই হয়নি বাংলাদেশে। কিন্তু এ অনীহার কারণ কী? বিচার না পাওয়া না কি সামাজিক ভয়? এক্ষেত্রে হয়তো দুটিই সত্য। কারণ প্রায় তিন বছর আগে পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে গণহারে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার ছবি গণমাধ্যমে উঠে এলেও দোষীদের বিচার আজও করতে পারেনি সরকার। বরং সেই বিচারের দাবি ক্রমেই স্তিমিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে আলোচিত তনু হত্যার বিচার নিয়ে মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠলেও সেটা আশানুরূপ এগোয়নি। কিন্তু তার পরও ন্যূনতম অভিযোগ না ওঠার পিছনের কারণ কী? সামাজিক আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. সামিনা লুৎফা বলেন,

যেকোন যৌন নিপীড়নের বিষয়ে কথা বলার বিষয় নির্ভর করে কিভাবে সমাজে নিপীড়ণকারী [নিপীড়নকারী] এবং নিপীড়িতকে দেখা হচ্ছে তার ওপরে। যদি সমাজে যৌন নিপীড়ককে একজন অপরাধী হিসেবে দেখা না হয় এবং দেখা হয় পৌরুষের অংশ হিসেবে তাহলে দুধরনের বিষয় ঘটে। একটা হচ্ছে যৌন নিপীড়নকে বুঝতে চিনতে পারেনা মানুষ। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে যে পরিস্থিতিতে আছেন সে অবস্থায় তিনি সেটা বলার সাহস পাচ্ছেন কি-না। ... ক্ষমতাশালী পুরুষের বিরুদ্ধে নারী কথা তখনই বলবে যখন সে বিচারের সম্ভাবনা জানবে। কিন্তু এ সমাজ নিপীড়িত নারীকে আরো বেশি নিপীড়ন করে।২৮

ড. সামিনার কথায় স্পষ্ট যে, কেনো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে #মিঠু আন্দোলনে তেমন জোয়ার ওঠেনি। তবে বাংলাদেশে এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি অন্যরকম ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্বের কোথাও দেখা যায়নি। বাংলাদেশে হাতেগোনা যে কয়েকজন নারী যৌন হয়রানি নিয়ে অভিযোগ তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধেই আরেক দল নারী-পুরুষ আন্দোলন করেছে। মিথ্যুক, চক্রান্তকারী আখ্যা দিয়ে উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই শাস্তি দাবি করেছে! আর এ বিষয়ে প্রথম আক্রমণের শিকার হন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ ফারিয়া শাহরিন। বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করে অভিনয় জগতে আসা ফারিয়া বলেন,

আমার ওই বিজ্ঞাপনচিত্র এত হিট হয়, এরপরও আমার কাজ কম। এমন একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের পর শোবিজের কিছু মানুষ বাজে প্রস্তাব দিয়েছেন, অনেক বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আপত্তিকর প্রস্তাব পেয়েছি। তাঁরা আমার সঙ্গে ঘুরতে চান। সরাসরি বলেছে, ‘কত টাকা হলে আপনি যাবেন?’ এসব শোনার পর নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। ভয় পেয়ে যাই। বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনের পর বিয়ের প্রস্তাবও পেয়েছি। অনেকে বলতেন, বিদেশে নিয়ে যাবেন। ... বিশ্ববিদ্যায়ের [বিশ্ববিদ্যালয়ের] একজন শিক্ষক ও একটি পত্রিকার সম্পাদক আমাকে বিয়ে করার জন্য নাটক প্রযোজনায় নেমে গেলেন। ... সরাসরি অফার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আমাদের সাথে ‘পার্সোনাল রিলেশন’ মেইনটেইন করতে হবে। ... যেখানে আমার মনে হয়েছে আমার কোয়ালিটির চেয়ে ‘স্যাক্রিফাইস’ টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।২৯

এরপরই ফারিয়াকে নিয়ে শুরু হয় নানা তর্কবিতর্ক। অনেকের কাছে তার বক্তব্যকে প্রশংসনীয় মনে হলেও বেশ কয়েকজন অভিনয়শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক বিষয়টি মোটেই ভালো চোখে দেখেনি। আর তখনই ফারিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম তীর ছোড়েন অভিনয়শিল্পী বন্যা মির্জা। তিনি ফেইসবুকে লেখেন,

কে ইনি? কী করেন? অভিনয়? লাক্স সুপারস্টার? এই অবস্থা কেন? ওনাকে সাহায্য করতে হবে যাতে কিছু কাজ পান। ঠিকঠাক কাজ। মানে অভিনয়। বেচারা তো খুব বিপদে আছে। কিছু কাজ পেলে কেউ আর এমন বলতে পারবে না। আহারে ... খুব মায়া লাগছে। সবার উচিত তাঁকে সাহায্য করা। কী যেন নাম? আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। দেখি কার এত সাহস। ইশ্ মেয়েটা। মায়া লাগছে খুব।৩০

এরপর ফারিয়ার বক্তব্যে ক্ষিপ্ত হয়ে ফেইসবুকে লাইভে আসেন ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতার সেরা ১০-এ থাকা অভিনয়শিল্পী নাফিজা জাহান। তিনি ফারিয়াকে ‘প্রিন্সেস ডায়না’ উল্লেখ করে বলেন, ‘আফা, বিশ্ব বিখ্যাত প্রিন্সেস ডায়না। যার কারণে সবাই তাঁকে কফি খাওয়ার জন্য, এই করার জন্য, সেই করার জন্য প্রস্তাব দেন। ... আপনি যদি দুধে ধোয়া তুলসীপাতা হতেন, তবে মিডিয়া নিয়ে মানুষের সামনে এতটা খারাপভাবে বলতে পারতেন না। ... পাবলিকের সামনে মিডিয়াকে খারাপ না করে আগে আমরা ভালো হই।’৩১ ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতার ২০১০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম রানারআপ মৌসুমী হামিদ বলেন, ‘তিনি এক প্রযোজকের সঙ্গে ফারিয়া শাহরিনকে দেখেছেন কফি খেতে।’৩২ অন্যদিকে ফারিয়াও তাদের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিতে থাকেন। চলে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ। পরে ফারিয়া একটি সংবাদপত্রকে বলেন,

আমি যা বলেছি, তা নিতান্তই আমার অভিজ্ঞতা। আমার ভালো অভিজ্ঞতার বাইরে শুধু খারাপগুলো তুলে ধরেছিমাত্র। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এসব বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। অথচ এসব বলার পর সহকর্মীরা কোথায় আমাকে সাপোর্ট করবে, পাশে এসে দাঁড়াবে, উল্টো আমার বিরুদ্ধে সমালোচনায় মেতে যায়। অচেনা-অজানা অনেককে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফেসবুকে আপত্তিকর সব মন্তব্য করাচ্ছে। আমার সহকর্মীদের কেউ কেউ আমার সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা খুব দুঃখজনক।৩৩

অন্যদিকে এর চেয়ে আরো ‘ভয়ঙ্কর’ আর ‘বিব্রতকর’ ঘটনাটি ঘটে অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা ও ডিরেক্টরস গিল্ডের সভাপতি গাজী রাকায়েতকে নিয়ে। ঘটনার শুরুতে এক তরুণী ফেইসবুক মেসেঞ্জারে গাজী রাকায়েতের সঙ্গে তার এক বান্ধবীর কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন। যেখানে দেখা যায়, গাজী রাকায়েত ওই তরুণীকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। পরে রাকায়েত জানান, তার ফেইসবুক আইডি হ্যাক হয়েছিলো। একই সঙ্গে যাচাই-বাছাই না করে স্ক্রিনশট প্রকাশ করায় ওই নারীর বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন রাকায়েত। অন্যদিকে ফেইসবুকে অশ্লীল প্রস্তাব পাওয়া ওই তরুণী রাকায়েতের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা করেন। আর এরপর ভুক্তভোগী তরুণীর পক্ষে শাহবাগে আন্দোলন শুরু করে বেশকিছু নারী-পুরুষ। অন্যদিকে রাকায়েতের পক্ষ নিয়েও আন্দোলন করে তারই সংগঠন ডিরেক্টরস গিল্ড, অভিনয় শিল্পী সংঘ ও টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রোডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন। রাকায়েতের পক্ষের আন্দোলনকারীদের যুক্তি ছিলো, কেনো তথ্য যাচাই-বাছাই না করে স্ক্রিনশট ফেইসবুকে দেওয়া হলো। এর জন্য আগে এসব সংগঠনকে জানানো উচিত ছিলো! অন্যদিকে ভুক্তভোগীর যুক্তি ছিলো, সেটা হ্যাক করা আইডি থেকে দেওয়া হয়নি, রাকায়েত নিজেই সেটা করেছেন। ফলে যাচাই-বাছাইয়ের কিছু নেই। পরে কেনো এটা হ্যাক করা আইডির কথোপকথন নয় তার যুক্তি দেন ভুক্তভোগী তরুণীর পক্ষের আন্দোলনকারীরা। প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, রাকায়েত হ্যাক হয়েছে বলে যে ঘোষণা দিয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, সেখানে একটি শব্দের বানানে ভুল আছে। ঠিক একই ভুল বানান মেসেঞ্জারের ওই স্ক্রিনশটেও রয়েছে। পরে পাল্টাপাল্টি মামলা ও আন্দোলন শুরু হওয়ায় উভয়পক্ষ বিষয়টি সমাধান করে নেয়।

এখানে ফারিয়ার ঘটনায় দেখা যায়, একজন নারীর বিরুদ্ধে অন্য নারীরা ক্ষুদ্ধ হয়েছে। যারা ক্ষুদ্ধ হয়েছে, তারাও আবার মিডিয়া জগতের নারী। কিন্তু ফারিয়া যেভাবে এক বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে রাতারাতি তারকা হয়েছেন, অন্যদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। তারা বেশ সময় ধরে কাজ করে পরিচিতি পেয়েছে, মিডিয়ায় জায়গা করে নিয়েছে। ফলে পরিবেশ, সময় আর অভিজ্ঞতা সবার এক হওয়ার কথা নয়। ফারিয়া যে বক্তব্য দিয়েছেন তা কেবলই তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা। সেখানে তিনি যদি বাড়তি কিছু বলেও থাকেন, তাহলে সেটার প্রতিক্রিয়া জানানোর ভাষাও ভিন্ন হতে পারতো। কিন্তু বন্যা মির্জা, মৌসুমীরা যেভাবে ফারিয়াকে আক্রমণ করেছে, সেটা মোটেও একজন ‘নির্যাতিত’ নারীর প্রতি সমবেদনা নয়। বরং এটা পুরুষতান্ত্রিক অনুশাসনেরই বহিঃপ্রকাশ।

অন্যদিকে রাকায়েত প্রথম দিকে কখনো বলেছেন, তার আইডি হ্যাক হয়েছে, আবার কখনো বলেছেন তার আইডির পাসওয়ার্ড আরো কয়েকজনের কাছে আছে, তারাই হয়তো কেউ এটা করেছে।৩৪ কিন্তু পাসওয়ার্ড যদি অন্য কয়েকজনের কাছে থেকে থাকে এবং সেটা যদি তিনি নিজেও জেনে থাকেন, তাহলে সেটা হ্যাক বলা যায় কি না? বরং যাদের কাছে ওই পাসওয়ার্ড ছিলো তাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যেতো। অন্যদিকে তার স্ট্যাটাসের বানান এবং ফাঁস হওয়া স্ক্রিনশটের ঠিক একই বানান কীভাবে ভুল হলো সেটার সদোত্তর কিন্তু দিতে পারেননি রাকায়েত। প্রশ্ন উঠতে পারে, মামলাটি তাহলে নিষ্পত্তি হলো কেনো? এর সহজসরল উত্তর-উভয়পক্ষই হয়তো ‘শান্তি’ চায়! যে শান্তির কথা ভেবেই হয়তো #মিঠু আন্দোলনের ভরা জোয়ারেও নিশ্চুপ ‘উন্নয়নশীল’ বাংলাদেশ।

হাসি পেলে হাসতে পারো খিলখিলিয়ে হাসি

খেয়াল রেখো তোমার মুখে ঢুকতে পারে মাছি

#মিঠু আন্দোলনের মাধ্যমে একের পর এক যৌন নিপীড়নের অভিযোগে হার্ভি ওয়াইনস্টিন তখন বিধ্বস্ত। শেষমেষ সবকিছু ছেড়ে অ্যারিজোনা রাজ্যের একটি পুনর্বাসনকেন্দ্রে থাকা শুরু করেছেন তিনি। পরিস্থিতি এমন যে, কোথাও একান্ত ঘুরতে বা কোনো কিছু খেতে মন চাইলেও তাকে রাতের আঁধারে বের হতে হয়। এমন সময় ঘটলো অন্যরকম এক ঘটনা। সেদিন নিরিবিলি পরিবেশে রাতের খাবার সেরে হার্ভি টেবিল ছেড়ে উঠে যাচ্ছেন, এমন সময় অপরিচিত এক ব্যক্তি তার গালে কষে দুটো চড় লাগিয়ে দেন! সঙ্গে আচ্ছামতো গালিও দেন তাকে! পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি হার্ভিকে মোটেও তার যৌন কেলেঙ্কারির অপরাধে চড় মারেননি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘টিএমজি’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপরিচিত ওই ব্যক্তির নাম স্টিভ। তিনি ঘটনার দিন রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশনের আগে হার্ভির সঙ্গে ছবি তুলতে চেয়েছিলেন। হার্ভি তাতে রাজি না হওয়ায় কষে চড় মারেন স্টিভ; একই সঙ্গে গালি দিয়ে সেখান থেকে হার্ভিকে বের হয়ে যেতে বলেন!৩৫

হার্ভিকে চড় মারার এই খবর সংবাদমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে মনে হয় এবার অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়েছে তাকে। যে পুরুষ এতো নারীকে যৌন নিপীড়ন করেছে তাকে আবার কীসের সম্মান! ফলে স্টিভ নামের ওই অপরিচিত ব্যক্তির চড়ে নিজের অজান্তে পাঠকের মনও পুলকিত হয়, নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার আনন্দ তারা উপভোগ করে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এপ্রিল মাসকে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতীয় সচেতনতার মাস হিসেবে ঘোষণা করেন।৩৬ তখনো মানুষের হাসি পায়, তার যৌন নিপীড়ন বিরোধী বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রোল হয়। কারণ, যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধেই ১৫ জন নারী যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছে, সেই কিনা এর নিন্দা করছে!

পাঠকও জানে এ বক্তব্য ট্রাম্পের মনের নয়, মুখের; অনেকটা পরম্পরা। কিন্তু সবলকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে না পেরে নিজের মতো করে ‘অপমান’ করাও ক্ষমতাহীনদের একধরনের প্রতিশোধ! হয়তো এ প্রতিশোধে ক্ষমতাবানদের কিছুই আসে যায় না, তবে ঠিক একদিন এসব মানুষ জেগে উঠবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজ হয়তো সবাই মুখ খুলতে পারেনি; অপরাধের কথা বললেও আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেনি; কেউ কেউ প্রতিপক্ষের বাক্যবানে জর্জরিত; আবার কেউ হয়তো #মিঠু আন্দোলনে নানা কারণে টুঁ-শব্দটিও করতে পারেনি; কিন্তু ঠিক একদিন পারবে। হয়তো সেদিন পাল্টাপাল্টি মামলায় আপস নয়, শত্রুর বিধ্বস্ত হওয়ার খবরেও আনন্দ কিংবা হাসি নয়, প্রতিবাদী হয়ে বিধ্বস্ত করেই সে হাসি হাসবে। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা!

লেখক : ইব্রাহীম খলিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি বণিক বার্তা সংবাদপত্রে শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন।

ibrahimrumcj@gmail.com

তথ্যসূত্র

1. https://goo.gl/fG5Cqf; retrieved on: 08.05.2018

2.  https://goo.gl/3ugHW5; retrieved on: 08.05.2018

3. https://goo.gl/Grkv5g; retrieved on: 08.05.2018

4. https://goo.gl/sz1TfZ; retrieved on: 08.05.2018

5. https://goo.gl/mJFsKT; retrieved on: 08.05.2018

6. https://goo.gl/6WXV4Q; retrieved on: 08.05.2018

7. https://goo.gl/sz1TfZ; retrieved on: 08.05.2018

8. https://goo.gl/a4TbXu; retrieved on: 08.05.2018

9. https://goo.gl/a4TbXu; retrieved on: 08.05.2018

10. https://goo.gl/a4TbXu; retrieved on: 08.05.2018

11. https://goo.gl/MMcerL; retrieved on: 08.05.2018

12. https://goo.gl/KLp49T; retrieved on: 08.05.2018

13. https://goo.gl/CUGtYp; retrieved on: 08.05.2018

14. https://goo.gl/FfVxWp; retrieved on: 08.05.2018

15. https://goo.gl/a9VSV3; retrieved on: 08.05.2018

16. https://goo.gl/AxRd8P; retrieved on: 08.05.2018

17. https://goo.gl/y8RS63; retrieved on: 08.05.2018

18. https://goo.gl/y8RS63; retrieved on: 08.05.2018

19. https://goo.gl/QWVtN5; retrieved on: 08.05.2018

20. https://goo.gl/2597Ac; retrieved on: 08.05.2018

21. https://goo.gl/Yvf56F; retrieved on: 08.05.2018

22. https://goo.gl/zbn1QD; retrieved on: 08.05.2018

23. https://goo.gl/ppsMnv; retrieved on: 08.05.2018

24. https://goo.gl/KP81aU; retrieved on: 08.05.2018

25. https://goo.gl/qXCmtV; retrieved on: 08.05.2018

26. https://goo.gl/Yo4Sjf; retrieved on: 08.05.2018

27. https://goo.gl/BV3U2i; retrieved on: 08.05.2018

28. https://goo.gl/U1FKWy; retrieved on: 08.05.2018

29. https://goo.gl/LZtBP5; retrieved on: 08.05.2018

30. https://goo.gl/1C1eqk; retrieved on: 08.05.2018

31. https://goo.gl/1C1eqk; retrieved on: 08.05.2018

32. https://goo.gl/1C1eqk; retrieved on: 08.05.2018

33. https://goo.gl/1C1eqk; retrieved on: 08.05.2018

34. https://goo.gl/KnHcTF; retrieved on: 08.05.2018

35. https://goo.gl/4ygd2Q; retrieved on: 08.05.2018

36. https://goo.gl/KhhjV5; retrieved on: 08.05.2018

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন