Magic Lanthon

               

আব্দুর রাজ্জাক রাজ

প্রকাশিত ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চলচ্চিত্রের বই

‘নতুন সিনেমার সন্ধানে’ রোবের্জ-এর প্রাচ্য দর্শন

আব্দুর রাজ্জাক রাজ


চলচ্চিত্রের ‘সূতিকাগার’ খ্যাত ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেছে কিংবদন্তি সব চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক। তাদের অন্যতম গাস্তঁ রোবের্জ। যিনি তার জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত করেন ভারতে। এ সময় তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র, নির্মাতা ও দর্শককে খুব কাছ থেকে আপন নিরিখে দেখার সুযোগ পান; সাধুবাদ জানান নতুন ধরনের চলচ্চিত্রের সন্ধানরত ভারতীয় নির্মাতা ও দর্শককে। রোবের্জ হয়তো নিজেও অনুভব করেছিলেন একটা নতুন ধরনের চলচ্চিত্রের প্রয়োজনীয়তার। আর সেই নতুন চলচ্চিত্র বিকাশের প্রয়াস থেকেই লিখেছেন ‘নতুন সিনেমার সন্ধানে’ নামে গ্রন্থটি। এতে তিনি বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করেছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রকে, ইঙ্গিত করেছেন এর নানা সমস্যা এবং বর্তে দিয়েছেন সমাধানের বিভিন্ন উপায়ও। এটা আসলে রোবের্জের একটি ইংরেজি পাণ্ডুলিপির অনুবাদ। রোবের্জ ইংরেজি বইটির নাম দেন ‘Another Cinema for Another Society’। অনুবাদক সুস্মিতা ভট্টাচার্য এর বাংলা ভাষান্তর করেন ‘নতুন সিনেমার সন্ধানে’। মূলত চলচ্চিত্রের নানা প্রায়োগিক দিক উঠে এসেছে এই গ্রন্থে; পাশাপাশি বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক নিয়েও আলোচনা  হয়েছে।

‘নতুন সিনেমার সন্ধানে’ চারটি প্রধান অংশে ভাগ করে লেখা-১. মুখবন্ধ; ২. প্রথম পর্ব; ৩. দ্বিতীয় পর্ব ও ৪. উপসংহার। মুখবন্ধ অংশে ‘একটি জঙ্গি কর্মসূচি’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন রোবের্জ। জঙ্গি কর্মসূচি বলতে লেখক এখানে নতুন চলচ্চিত্রের প্রসারের জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যকর করা জরুরি সেসবকেই নির্দেশ করেন। এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পাঁচটি সূত্রকে। সূত্রগুলো নতুন চলচ্চিত্রের প্রসারের জন্য অনুসরণীয় ও বেশ কার্যকর বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। মুখবন্ধের শেষে লেখক ঘোষণা দিয়েছেন, গ্রন্থের পরবর্তী অংশে জঙ্গি কর্মসূচি বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

প্রথম পর্বের মূল আলোচনার বিষয় মোটাদাগে চলচ্চিত্র। এই পর্বে মোট প্রবন্ধ পাঁচটি। প্রথম প্রবন্ধের টাইটেল ‘কীসের জন্য সিনেমা সিনেমা হয়ে উঠেছে?’। প্রবন্ধজুড়ে টাইটেলের প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। রোবের্জ এখানে চলচ্চিত্রের সংজ্ঞাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এতে তিনি বেশ সচেতন ছিলেন বলে মাত্র কয়েকটি লাইনে চলচ্চিত্রের সংজ্ঞাকে সীমাবদ্ধ না করে, বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে এ নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সচেষ্ট হন। যদিও আপাতদৃষ্টিতে সেটাকে মোটেও সংজ্ঞা বলা ঠিক হবে না। এছাড়া তিনি চলচ্চিত্রের মাধ্যম, মাধ্যমের গতিপ্রকৃতি ও বিভিন্ন উপাদান নিয়েও আলোচনা করেছেন। চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান দুই উপাদান হলো—কাল ও স্থান। গল্প বলার প্রয়োজনে চলচ্চিত্রে কাল বা সময়কে ধরতে হয়। এতে রক্ষিত হয় গল্পের ধারাবাহিকতা। আর চিত্রপ্রতিমার সাহায্যে গল্পের উপস্থাপনে স্থানও জরুরি বিষয় হয়ে ওঠে। চিত্রপ্রতিমার বিন্যাসের মাধ্যমে এই স্থান পর্দায় ধরা দেয়। এছাড়া চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অবতারণা হয়েছে আঁদ্রে বাঁযা’র চিন্তা-চেতনার। রোবের্জের ধারণা, আঁদ্রে বাঁযার ‘সিনেমা কাকে বলে’ —প্রশ্নটির এরূপ উত্থাপন ভুল ছিলো। কারণ চলচ্চিত্র বলতে বাঁযা শুধু নিওরিয়েলিজম ধারার চলচ্চিত্রকেই বুঝতেন। তিনি সমালোচনা করতেন শুধু এই ধারার চলচ্চিত্রেরই। এছাড়া এই প্রবন্ধে চলচ্চিত্রের আরেকটি বড়ো উপাদান নাটককে টেনে আনা হয়েছে। নাটকের বিভিন্ন উপাদান ও নীতি সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে সংক্ষিপ্তাকারে। সবশেষে নতুন চলচ্চিত্র বিকাশের প্রয়াস ও সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় চলচ্চিত্রের চলচ্চিত্রিক হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

প্রথম পর্বের অন্য প্রবন্ধগুলোতে মন্তাজের গঠন-কাঠামো, চলচ্চিত্রের নৃতত্ত্ব, চলচ্চিত্রের রসাস্বাদন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মূলত মন্তাজ নিয়ে রোবের্জ এখানে প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন। একাধিক চিত্রপ্রতিমার পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গ্রথিত একধরনের অর্থবহ বিন্যাস হলো মন্তাজ। আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্ক নেই এমন কিছু চিত্রপ্রতিমার মধ্যে ঐক্য সাধন করা হয় মন্তাজের মাধ্যমে। আইজেনস্টাইন মূলত মন্তাজের মাধ্যমে একটি নতুন চলচ্চিত্র রীতি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। মন্তাজ ছিলো তিনটি ক্রমিক স্তরে সজ্জিত। আইজেনস্টাইন এই তিনটি স্তরের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মন্তাজ ব্যবহার করেন।

নৃতত্ত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লেখক মানুষকে নিয়ে চলচ্চিত্র, এর শ্রেণিবিভাজন, প্রস্তাবিত শ্রেণিবিভাজন ও ভারতীয় দর্শকের মনস্তত্ত্বের প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্রের অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। চলচ্চিত্র মানুষের জীবনের গল্পই বলে; চলচ্চিত্রে মানুষ নিজেকেই দেখতে চায় এবং দেখে পরিতৃপ্ত হয়। এখানে উঠে আসে মানুষের নানা ভাবমূর্তি। রোবের্জ সেই অসংখ্য ভাবমূর্তির শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে জানাতে প্রবৃত্ত হয়েছেন। তবে রোবের্জ এখানে চলচ্চিত্রকে শুধু জীবনপঞ্জি হিসেবে দেখতে রাজি নন; চলচ্চিত্রকে বড়ো একটি শিল্পভাষা বলেও তিনি উল্লেখ করেন। চলচ্চিত্রের শ্রেণিবিভাজনের বিষয়ে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, এর নিখুঁত শ্রেণিবিভাজন সম্ভব নয়। আসলেও পৃথিবীতে এতো বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, সেগুলোকে শ্রেণিতে বিভাজন করার একটি নির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি আবিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব। চলচ্চিত্রের শ্রেণিবিভাজনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রোবের্জ তাই নানা সীমাবদ্ধতা খুঁজে পেয়েছেন এবং তা তুলেও ধরেছেন। তবে তিনি মনে করেন, সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রের শ্রেণিবিভাজনে এসব পদ্ধতি প্রয়োগ চলচ্চিত্রের যথার্থ মূল্যায়ন করবে। তাই চলচ্চিত্রের শ্রেণিবিভাজনে বিভিন্ন কার্যকরী পদ্ধতি উপস্থাপন এবং তা কার্যকরের উপায়সমূহ তুলে ধরা হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্বের মূল আলোচ্য বিষয় সমাজ। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক, সমাজের পরিবর্তনে চলচ্চিত্রের প্রভাব, সমাজ পরিবর্তনের উপাদানের উপস্থিতি-অনুপস্থিতি, চলচ্চিত্রের শিল্প ও বাণিজ্যিক রূপ ইত্যাদি বিষয় এ পর্বে আলোচিত হয়েছে। এক শ্রেণির দর্শক চলচ্চিত্রকে সমাজ পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে দেখতে চায়। তবে রোবের্জ মনে করেন, চলচ্চিত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে এটাকে শুধু সমাজ পরিবর্তনের উপাদান হিসেবে দেখলে হবে না; শিল্প হিসেবে এর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাও জরুরি। চলচ্চিত্রের শিল্পরূপ ও বাণিজ্যিকীকরণের মধ্যে এমনভাবে পার্থক্য দেখানো হয়, মনে হয় এই দুইয়ের মধ্যে মিলন অসম্ভব। তবে ‘এক যুগের অবসান’ নামের প্রবন্ধে এ ধারণাকে ভুল বলে অভিহিত করেছেন রোবের্জ। তার মতে, বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র সাধারণত একটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর প্রয়োজন এবং শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র একটি আদর্শ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন মেটায়। তারপরও এমন চলচ্চিত্রের আশা করা যেতেই পারে, যা দুই শ্রেণিরই প্রয়োজন মেটাবে। এভাবেই শিল্প ও বাণিজ্যের মিলনে চলচ্চিত্র তার আসল মহিমায় আবির্ভূত হবে।

‘হরেক তথ্য, কিছু বিভ্রান্তি’ টাইটেলের প্রবন্ধে চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশে একটি কার্যকরী গোষ্ঠীর উদ্যোগ ও ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই কার্যকরী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ছিলো ভারতীয় চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক ও শিল্পরূপের বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা ও তার উন্নয়নে জাতীয় চলচ্চিত্র কৌশল প্রস্তাবনা করা। এই উদ্দেশ্যে তারা অনুসন্ধানমূলক পরীক্ষা চালিয়ে একটি প্রতিবেদনও তৈরি করে। প্রতিবেদনে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিকাশে সহায়ক এমন অনেক সুপারিশ করা হয়। জাতীয় চলচ্চিত্র কৌশল গঠনের জন্য কার্যকরী গোষ্ঠীর সামনে বহু তথ্য তুলে ধরা হয়েছিলো। কার্যকরী গোষ্ঠী তথ্যগুলোকে বিবরণীতে রূপ দেয় এবং চলচ্চিত্র কৌশলের ভিত্তিভূমি হিসেবে ধরে নেয়। গৃহীত তথ্যগুলোকে তারা মিশ্রিত করে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্যগুলোর মধ্যে ভেদাভেদ পরিলক্ষিত হয়। প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে বিবরণীগুলো উদ্ধৃত এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বিবরণীতে চলচ্চিত্রকে উল্লেখ করা হয়েছে, জনসংস্কৃতির সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম হিসেবে। এখানে চলচ্চিত্রের শক্তিশালী অবস্থানকে ব্যবহার করে ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। এছাড়া ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন অনুন্নত দিক তুলে ধরার পাশাপাশি দেখানো হয়েছে উন্নয়নের বিভিন্ন উপায়।

পরবর্তী প্রবন্ধ ‘অনেক ছবি সম্পর্কে কিছু কথা’য় চলচ্চিত্রকে বিশেষভাবে চিহ্নিত ও নির্দিষ্ট শ্রেণিভুক্ত করার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রোবের্জের মতে, শ্রেণিভুক্তকরণের এ ধরনের প্রবণতার জন্য অনেক চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। তারপরও শ্রেণিবিভাজনের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তবে মন্দ, বাণিজ্যিক, দায়িত্বহীন ও কুশিক্ষামূলক চলচ্চিত্রের বিপরীতে ভালো, অব্যবসায়িক, শিল্পসম্মত, শিক্ষামূলক, দায়িত্বশীল চলচ্চিত্র বলে যে শ্রেণিবিন্যাস করা হচ্ছে, সেটা চলচ্চিত্র সম্পর্কে ধারণার অস্পষ্টতা থেকেই করা হয়। রোবের্জের ভাষায়, বিভেদকে বৈপরীত্যে রূপান্তরিত করা এক সাংস্কৃতিক অভ্যাসের ফল। তাই রোবের্জ মনে করেন, শিল্পসম্মত ও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র দুটি ভিন্ন মাধ্যম, এরা দুটি ভিন্ন সামাজিক উদ্দেশ্য সাধন করে। এই দুই উদ্দেশ্য একটি আরেকটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত, কখনো কখনো অভিন্নও। ফলে কোনো কোনো নির্মাতা বাণিজ্যিক কাঠামোর মধ্যে থেকেও শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র করতে পারে। 

‘সমাজ পরিবর্তনের কাজে ফিল্ম’ টাইটেলের প্রবন্ধে চলচ্চিত্রকে সমাজ পরিবর্তনের কাজে ব্যবহারের নানা উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রোবের্জ ইঙ্গিত করেন, সাধারণত নির্মাতারা চলচ্চিত্র দিয়ে সমাজ পাল্টে ফেলা এবং প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে স্বীকার করে নেওয়ার ভিত্তিতে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। যারা চলচ্চিত্রকে সমাজ পরিবর্তনের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তারা ফিল্ম এস্টাবলিশমেন্টের ভিতর কিংবা বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। এছাড়া এস্টাবলিশমেন্টের ভিতরে ও বাইরে নির্মিত চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সুবিধা ও সমস্যা দেখানো হয়েছে। প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে আলোচনা হয়েছে একটি জটিল বিষয় নিয়ে। তথাকথিত সমান্তরাল ও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তা একই সঙ্গে সরকার ও চলচ্চিত্র কারখানাকে সমস্যায় ফেলছে। সরকারি পুরস্কার তালিকায় সাধারণত স্থান পায় সমান্তরাল চলচ্চিত্র, এতে চলচ্চিত্র কারখানা নির্মিত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলোকে তিরস্কার করা হয়। অন্যদিকে দর্শক সমান্তরাল ধারার চলচ্চিত্রকে গ্রহণ করতে চায় না। তাদের ঝোঁক চলচ্চিত্র কারখানার বাণিজ্যিক প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রের ওপর। বাধ্য হয়েই সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র সম্প্রচার করে। এতে আবার সরকার বিব্রত হয়। যেহেতু দর্শক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র গ্রহণ করছে, সেহেতু রোবের্জ মনে করেন, আলাদাভাবে সমান্তরাল বা শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণের চেয়ে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে শিক্ষা উপকরণ জুড়ে দেওয়া তুলনামূলক সহজ। 

‘ছবিতে রাজনীতি’ প্রবন্ধে তথাকথিত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অবশ্য লেখক আলোচনার শুরুতে স্বীকার করে নিয়েছেন, রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকে আসলে তালিকাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তবুও তিনি এখানে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন। রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়, নির্মাতা চলচ্চিত্র দিয়ে সমাজব্যবস্থাকে প্রভাবনের চেষ্টা করে। এ উদ্দেশ্যে তিনি চলচ্চিত্রে এমন সব চিত্রপ্রতিমা জুড়ে দেন, যার প্রতীকী অর্থ প্রচলিত সমাজব্যবস্থার কোনো অসঙ্গতিকে ইঙ্গিত করে। এসব ইঙ্গিত দর্শকের মনোযোগকে সামাজিক সমস্যার দিকে টেনে নিয়ে যায়। এই প্রতীকী অর্থ সবসময় সুস্পষ্ট হয় না। এ বিষয়ে রোবের্জের বক্তব্য, রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে গেলে এ ধরনের চলচ্চিত্রকে নান্দনিকতার স্তরে পৌঁছাতে হবে এমন নয়। রাজনৈতিক চলচ্চিত্র আসলে আঙ্গিকের প্রসঙ্গে নয়, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তালিকাবদ্ধ করতে হবে। তবুও এই চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে গঠন-কাঠামোও একটি বিবেচ্য বিষয়; বর্ণনাত্মক চিত্রপ্রতিমাই এর প্রধান উপাদান। তবে বক্তব্য উপস্থাপনের হুজুগে সাধারণত জোরালো ও বিশ্বাসযোগ্য চিত্রপ্রতিমা নির্মাণ সম্ভব হয় না। এতে এ ধরনের চলচ্চিত্রের শিল্পমান ক্ষুণ্ন হয়। যাহোক পরিশেষে রোবের্জ চেয়েছেন, দর্শক যেনো রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের ছুতোয় তার নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে হারিয়ে না ফেলে। প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রকে দর্শকের নিজের মতো করে দেখার ও সমালোচনা করার অধিকার আছে। এতে তারা উপকৃত এবং নির্মাতার সঙ্গে তাদের সংযোগ স্থাপিত হবে। এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে দর্শক এবং উদ্ভূত সমালোচক শ্রেণিকে।

‘বিদেশী ছবির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব’ প্রবন্ধটিতে ভারতীয় চলচ্চিত্রে বিদেশি চলচ্চিত্রের প্রভাব বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। রোবের্জ মনে করেন, অন্য সমাজের জন্য অন্য সিনেমার প্রসারে বিদেশি চলচ্চিত্র প্রায়ই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই তিনি বিদেশি চলচ্চিত্রের এই ‘কু-প্রভাব’ থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে রক্ষার তাগিদে কিছু নীতি নির্ধারণের প্রয়োজন অনুভব করেন। সে উদ্দেশ্যেই তিনি এখানে সম্ভাব্য কিছু নীতি প্রস্তাব করেছেন। প্রস্তাবিত এই সম্ভাব্য নীতিগুলোই প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যায়, এখানে মোট ১০টি নীতি বা সূত্র প্রস্তাব করা হয়েছে। রোবের্জ এই নীতিগুলোকে তিনটি আলাদা শ্রেণিতে বিভাজন করেছেন—অঙ্গীকার, পদ্ধতি ও প্রত্যাশা। ‘প্রত্যাশা’ শ্রেণিতে লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেছেন—মানুষের জীবনযাত্রার অবস্থা যখন পাল্টাবে, চলচ্চিত্রও তখনই পাল্টাবে। আসলেই, চলচ্চিত্র মানুষের জীবনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার ধরন তার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে চলচ্চিত্রের ওপর। তাই চলচ্চিত্রকে পাল্টিয়ে মানুষকে পাল্টানোর আশা করা লেখকের মতে যুক্তিসঙ্গত নয়।

‘ছবিতে ইতিহাস ও চিত্রায়িত ইতিহাস’ প্রবন্ধে লেখক চলচ্চিত্রে ইতিহাসকে খুঁজে দেখতে এবং ইতিহাস নির্ভর চলচ্চিত্রকে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণিতে ফেলতে চেষ্টা করেছেন। এছাড়াও এখানে চলচ্চিত্রের সাহায্যে ইতিহাস পাঠের প্রসঙ্গটিও এসেছে। লেখকের ভাষায়, এতে যেমন ছাত্রদের পক্ষে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপাদান দৃষ্টিগোচর করা সহজ হবে, তেমনি তাদের মধ্যে চলচ্চিত্র সম্পর্কে একধরনের মাধ্যমগত সচেতনতাও বৃদ্ধি পাবে।

যে প্রবন্ধটি দিয়ে গ্রন্থটির উপসংহার টানা হয়েছে সেটা ‘নতুন দর্শকের জন্য চলচ্চিত্র-শিক্ষা’। রোবের্জ এখানে চলচ্চিত্র-শিক্ষার দুটি অর্থ করেছেন— ‘চলচ্চিত্র বিষয়ে শিক্ষা’ ও ‘চলচ্চিত্রের কাছ থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই’। যাই হোক চলচ্চিত্র-শিক্ষা বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে এখানে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয় টেনে আনা হয়েছে। শুরুতে লেখক দাবি করেছেন, চলচ্চিত্র সংস্কৃতিকে পুষ্ট করে। তার মতে, চলচ্চিত্র থেকে জনসাধারণ যে শিক্ষা নেয়, সেই শিক্ষা জনসাধারণের লালিত সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে; তবে তা খুব দ্রুত নয়। যদিও চলচ্চিত্র থেকে গৃহীত শিক্ষা ধীরে ধীরে সংস্কৃতির ধারাকে পাল্টে দেয়, তবে তা গোয়ার্তুমি করে নয়; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা প্রচলিত ধারাকে সমর্থন দিয়েই।

এ প্রবন্ধে চলচ্চিত্র-শিক্ষাকে মাধ্যম শিক্ষার অংশবিশেষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ চলচ্চিত্র ছাড়াও মাধ্যম শিক্ষার আরো অনেক উপাদান রয়েছে। আসলে মাধ্যমের যে উপাদানই হোক না কেনো, আমাদের উচিত সেটাকে মাধ্যম বিষয়ক শিক্ষা পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা। কেননা মাধ্যমের প্রতিটি উপাদান থেকেই শিক্ষা লাভ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে চলচ্চিত্র অনেকটা ব্যতিক্রম। চলচ্চিত্র এমন একটি উপাদান, যা মাধ্যমের অন্যান্য উপাদানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এখানে চলচ্চিত্রসহ মাধ্যমের অন্যান্য উপাদান নিয়ে শিক্ষার একটা সাধারণ ও আদর্শ পাঠক্রমের প্রয়োজনীয়তার কথাও এসেছে। প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে তরুণদের জন্য চলচ্চিত্র-শিক্ষা ও চলচ্চিত্র-শিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তরুণদের জন্য চলচ্চিত্র-শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রত্যাশা করা হয়েছে, তারা যেনো তাদের চিত্রাভিজ্ঞতা কাজে লাগায়। তরুণরা যদি দায়িত্বশীল চিত্রনির্মাতা হয়ে ওঠে, তাহলে তা নতুন চলচ্চিত্রের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এজন্য তরুণদেরকে চলচ্চিত্র শিক্ষাদানের কোনো বিকল্প নেই। চলচ্চিত্র-শিক্ষা তরুণদেরকে আদর্শ ও সচেতন বিচার-শক্তি সম্পন্ন দর্শক হিসেবেও গড়ে তুলবে; যা তাদেরকে পরবর্তী সময়ে দায়িত্বশীল চলচ্চিত্রনির্মাতা হয়ে উঠতে সাহায্য করবে। পরিশেষে, চলচ্চিত্র-শিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রবন্ধের ইতি টানা হয়। আর এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে রোবের্জ চলচ্চিত্র-শিক্ষক হিসেবে তরুণদের চলচ্চিত্র শিক্ষাদানে নিজের প্রয়োগকৃত পদ্ধতিগুলো তুলে ধরেন।

‘নতুন সিনেমার সন্ধানে’ চলচ্চিত্র ঘরানায় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলেও এর ভাষাশৈলী অতি জটিল এবং বাক্যবিন্যাস এমন যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল অর্থ উদ্ধারে পাঠককে অনেক সময় নিতে হয়। রোবের্জ তার ইংরেজি পাণ্ডুলিপিটি যে জটিল ভাষারীতিতে লিখেছেন—তা সহজ-সরল ভাষায় অনুবাদ করা দুরূহ বলে অনুবাদক স্বীকারও করে নিয়েছেন। তাই চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও হয়তো যথাযথ প্রাঞ্জল ভাষায় তা অনুবাদ করা সম্ভব হয়নি। তবে অনুবাদ সহজ-সরল করতে গিয়ে কিছু সমস্যা যে হয়নি তা নয়, কোনো সময় আক্ষরিক অনুবাদ ছেড়ে আশ্রয় নেওয়া হয়েছে ভাবানুবাদের; যা থেকে আবার রোবের্জের মূল বক্তব্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তারপরও গ্রন্থটি নতুন চলচ্চিত্রের বিকাশের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের শিক্ষার্থীদের জন্যও জরুরি। এটা থেকে তারা যেমন নতুন চলচ্চিত্র সম্পর্কে ধারণা পাবে, নতুন সমাজের জন্য নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণেও ব্রত হবে।

বইয়ের নাম : নতুন সিনেমার সন্ধানে

লেখক : গাস্তঁ রোবের্জ

প্রকাশক ও প্রকাশকাল : ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ, বাণীশিল্প, কলকাতা

প্রচ্ছদ : রবি দত্ত

লেখক : আব্দুর রাজ্জাক রাজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।

///////////

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন