Magic Lanthon

               

মৃণাল সেন

প্রকাশিত ৩০ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আমাদের সাহিত্যবোধ ছিল বলেই ভালো ছবি করতে পেরেছি

মৃণাল সেন


দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে উৎসবের প্রধান অতিথি হয়ে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে ঢাকায় এসেছিলেন খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। ২৪ জানুয়ারি প্রত্যুষে তিনি ‘বিচিত্রা’কেএক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। ‘বিচিত্রা’র পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নেন মাহমুদা চৌধুরী। সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ দেওয়া হল।

বিচিত্রা : আপনার পূর্ব জীবনের কথা দিয়ে শুরু করুন।

মৃণাল সেন : পাবলো নেরুদার কবিতা এবং বিশ্ব ও দেশী শিল্প সংস্কৃতি নিয়ে আমরা আলোচনা করতাম। দোকান মালিক ছিলেন সদাশয় ব্যক্তি। রেস খেলতেন বলে, তিনি সবসময় রেসের বই হাতে নিয়ে তাতে নিবিষ্ট থাকতেন। আজ সেই দোকানটি নেই। আমার ওপর ডকুমেন্টরি তুলতে গিয়ে জার্মান পরিচালক রায়ান হোপ সেটির খোঁজ করেছিল। সেখানে এখন চারতলা বিল্ডিং হয়েছে। তখন দু’পয়সায় ১ প্যাকেট বিড়ি পাওয়া যেতো। ১ প্যাকেটে ২০টি বিড়ি থাকতো। ওই বিড়ি খেয়ে মাথা ঘুরতো, শরীর দুর্বল লাগতো। তারপরও একদিন দেখি, পাশের দোকান থেকে ঋত্বিক ঘটক বাকিতে আশি টাকার বিড়ি খেয়ে ফেলেছে। তাপস সেন নিউ থিয়েটার্সে কাজের জন্য এসেছিলেন কিন্তু উগ্র রাজনৈতিক মতবাদের জন্য সেখানে তিনি কাজ করতে পারেননি। বস্তিতে থাকতেন। একদিন এসে বললেন,‘একটা টাকা দিতে পারবেন, দু‘দিন খাইনি।’ আমাদের অবস্থাও ভাল নয়। বড় বৌদি তিনটে টাকা দিয়েছিলেন, তার ছেলের ছবি তোলার ফিল্ম কেনার জন্য। সেই টাকায় পার্কসার্কাসের এক রেস্টুরেন্টে বসে দু’জনে খেলাম। এক সময় নিউ রিয়েলিজম’-এর খবর পেলাম। ইউরোপে যুদ্ধোত্তর যুগে যেভাবে ছেলেরা ছবি করতো সেইভাবে ছবি করবো বলে, সুধীন দত্ত, গোপাল হালদার আর আমি মিলে একটা স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললাম। ঠিক করলাম প্রথম ছবিতে কিছুটা পপুলার এলিমেন্ট থাকবে। পয়সা ফিরে এলে শুরু করবো স্ট্রং আইডোলজী নিয়ে ছবি। তারপর শুরু হল আমাদের লোকের পেছনে ঘোরাঘুরি। অবশেষে ছবি করলাম-প্রথম ছবি ‘রাত ভোর’, অখাদ্য। ঋত্বিক-এর প্রথম ছবি, ‘নাগরিক’ও খারাপ। তবে আমার ছবি আরও প্রচণ্ড খারাপ। এখন ভাবতে গেলে গা শিউরে ওঠে। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি পৃথিবী তোলপাড় করে। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। প্রথম ছবি করার পর আমি মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভের চাকরি নেই। ৩০ বছর ধরে ছবি করে যাচ্ছি। আগে আমার ছবি বেশি চলতো না। ধীরে ধীরে দর্শক বাড়ছে। সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছাতেই হবে এমন কোন কথা নেই।

ফিল্ম হচ্ছে ক্রস ফারটালাইজেশন অব আর্ট। সব শিল্পের সঙ্গে ওর আনাগোনা। সিনেমার সঙ্গে থিয়েটারের সম্পর্ক নেই¾এটা ঠিক নয়। এই অমূলক ধারণার জন্য ছবির অনেক ক্ষতি হয়। সাহিত্যের সঙ্গেও রয়েছে ওর যোগাযোগ। তবে সাহিত্যের আক্ষরিক ছবি নির্মাণ করা যায় না। আঁদ্রে বাঁযা এক সময় মায়াকোভস্কিকে সম্পাদক ও মিলটনকে চিত্রনাট্যকার বানিয়ে ছবি নির্মাণের আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। মূলত চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে সাহিত্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া দরকার। আমাদের সাহিত্যবোধ ছিল বলেই ভাল ছবি করতে পেরেছি।

‘আমরা যখন পায়ের তলায় মাটি পেলাম, তাকিয়ে দেখি সেই পুরনো দিনের কাছের মানুষরা ছিটকে পড়েছে অনেক দূরে। কেউ কারও খোঁজ রাখি না। আজ ঋত্বিকের মেয়েকে সামনে দেখলে আমি চিনবো না। পুরনো দিনের কারো কারো সঙ্গে ফেস্টিভ্যাল বা বিয়ে বাড়িতে দেখা হয়। কিন্তু সেই টান খুঁজে পাই না কেউ। খ্যাতির প্রতিযোগিতা, প্রশংসা পরস্পরের কাছ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে আমার কষ্ট হয়।’

বিচিত্রা : বাঙালি পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় বলে পরিচিত, ‘রাত ভোর’ (১৯৫৬), ‘বাইশে শ্রাবণ’ (১৯৬০), ‘মাটির মনিষ’ (১৯৬৬), ‘ভুবন সোম’ (১৯৬৯), ট্রিলজি¾ ‘ইন্টারভিউ’, ‘কলকাতা-৭১’, ‘পদাতিক’, ‘মৃগয়া’ (১৯৭৫) এবং সর্বশেষ ‘মহাপৃথিবী’র নির্মাতা মৃণাল সেনের কাছে প্রশ্ন ছিল তার বর্তমান ও আগামী ছবি নিয়ে।

মৃণাল : এই মুহূর্তে আমি যে ছবি নিয়ে ব্যস্ত, আমার সমস্ত অস্তিত্বের সঙ্গে সেটাই জড়িয়ে আছে¾চিন্তা-ভাবনায়-সত্তায়। সুতরাং পরবর্তী ছবি কি করবো আমি জানি না। যে ছবি করছি, তার নাম ‘অন্ত্যেষ্টি’ রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হয়, ছবির নাম পাল্টানো দরকার। নাম রেখেছি ‘মহাপৃথিবী’। এর ইংরেজি নাম : World within, world without.

বিচিত্রা : এই ছবি করার অনুপ্রেরণা কোথায় পেলেন?

মৃণাল : গত দু’বছর আমি কোনো ছবি করিনি। করার মতো মন মানসিকতা আমার ছিলো না। আমি এতই কনফিউজ ছিলাম আরও দশজনের মতো। সারা পৃথিবীতে কত ওলট পালট ঘটে গেলো। নানা চিন্তা-ভাবনা-জীবন দর্শন, সবকিছু উল্টে-পাল্টে যাচ্ছে। একটা প্রচণ্ড বিশ্বাসহীনতা, সারা পৃথিবী জুড়ে চেপে বসেছে। পূর্ব ইউরোপের ঘটনা, মানুষের বিশ্বাসের শেকড় ধরে টান দেয়। গত দু’বছর ধরে আমি কনফিউজড। অঞ্জন দত্ত, অল্প বয়সী একজন অভিনেতা, আমার বিভিন্ন ছবিতে অভিনয় করেছে এবং একজন থিয়েটার একটিভিস্ট; ও একটা নাটক লিখেছে। যেদিন নাটক লেখা শেষ হলো, ও রাতে এসে আমার ও আমার স্ত্রীকে পড়ে শোনালো। নাটকটাতে বিশ্ব পরিবেশ ছিলো না। একটা পরিবার নিয়ে গল্প। যে গল্পটার একটি ব্যাপার আমাকে টানে। হয় কি, আমি দেখেছি, সাধারণ গল্প উপন্যাস পড়ে হয়তো একটা লাইন আমাকে খুব নাড়া দিলো। তখন সেই গল্পটা আমি কিনে নিই। সেটাকে একটা টেক অব পয়েন্ট হিসেবে ধরি। আমি তো নিজে উপন্যাস লিখিয়ে হতে চাই না, আমি চলচ্চিত্রকার, সেভাবে থাকতে চাই। আমি তার নাম-ই ব্যবহার করি, গল্পকার হিসেবে। কারণ তার ওই লাইনটা না পেলে, আমার চিন্তা উসকে উঠতো না। সম্প্রতি কলকাতায়, আমার যে ছবিটা চলছে¾‘একদিন আচানক’। সেটাও রমাপদ চৌধুরীর ‘বীজ’ নামক ছোট একটি উপন্যাস থেকে নেয়া। এবং সেখানে পড়তে পড়তে একটা লাইন আমি পেলাম¾ইতিহাসের রিটায়ার্ড একজন অধ্যাপক, তার একটা লেখায় ছিলো, ‘মানুষের জীবনের বড় যন্ত্রণা হচ্ছে, মানুষের জীবন একটাই।’ এই একটি কথাই আমাকে নাড়া দিলো।

তারপর যে ছবিটি আমি করলাম, রমাপদ চৌধুরীর গল্প অবলম্বনেই বলা¾কিন্তু সামান্যই আছে, সেখান থেকে। তো ওই যে একটি কথা, আমার কাছে খুব দামী হয়ে উঠেছিলো। 

এখানেও অঞ্জনের সেই রকম, পারিবারিক গল্পের মূল ব্যাপারটা আমাকে নাড়া দিয়েছিলো। এখানে, সবাই যেন বিশ্বাসহীনতায় ভোগে। একই ছাদের তলায় আমরা বাস করি, কিন্তু সবাই আইসোলেটেড। পরেরদিন খুব ভোরবেলা ওর বাড়িতে আমি চলে গেলাম। ঘুম থেকে উঠেই চলে গেলাম। বললাম তুমি আমাকে ম্যানাস্ক্রিপটা [ম্যানুস্ক্রিপ্ট] দাও। সেটা পড়ে দু’দিন ভাবলাম। ওকে বললাম যে, ছবিটা আমি এভাবে করতে চাচ্ছি। এবং ওর সঙ্গে আমার খুব তর্ক-টর্ক কিছুক্ষণ হলো। আমি তর্ক করতে খুব ভালবাসি। ভারতীয় দার্শনিক ব্রজেন সেনের একটি কথা রঁমা রঁলা কয়েকবার উদ্ধৃত করেছেন[,] ইউ নিড টু কারেক্ট ইওর ওন কনক্লুশান। আমার ‘একদিন আচানক’-এ একথাই বলতে চেয়েছি। জীবনের সবকিছু মুছে যদি জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করতে পারতাম। এই ক্রাইসিস পয়েন্ট থেকে শুরু করি ‘অন্ত্যেষ্টি’, যা এখন ‘মহাপৃথিবী’ বলে পরিচিত হবে।

বিচিত্রা : ছবির নাম পাল্টে ‘মহাপৃথিবী’ রাখার উদ্দেশ্য?

মৃণাল : গল্পের বিষয় হচ্ছে-বিশ্বাসহীনতা, স্থান হচ্ছে কলকাতা। সময়¾বর্তমান, পরিবেশ¾পৃথিবীর পরিমণ্ডল। ঘটনাটা হচ্ছে, এক মধ্যবিত্ত পরিবার। কলকাতার গলিতে থাকেন। সেই পরিবারের ইনট্রোভার্ট টাইপের বৃদ্ধ বয়সী ভদ্রমহিলা দুই জার্মান [জার্মানি] একত্রিত হওয়ার ঠিক চারদিন আগে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এই মহিলার মেজ ছেলে বুলু¾বাম রাজনীতি করতো। ১৯৭১-এ পুলিশের গুলিতে মারা যায়। সেই থেকে ভদ্রমহিলা দুনিয়ার টুকরো টুকরো কথা একটা খাতায় লিখে রাখতেন। সে খাতা কেউ কখনও পড়েনি। পুলিশ সেটা নিয়ে গিয়েছিলো আত্মহত্যার ক্লু খুঁজতে। সেটা ফেরত দেয়। ভদ্রমহিলার স্বামী বেঁচে আছেন। তিন নম্বর ছেলে জার্মানীতে। বড় ছেলে রঞ্জু হঠাৎ কয়েক দিনের অসুখে মারা যায়। বড় ছেলের বিধবা বউ ও একটি বাচ্চা আছে। মায়ের মৃত্যুর চার দিনের দিন ঠিক যেদিন দুই জার্মানী এক হলো, ৩ অক্টোবর, সেজ ছেলে জার্মানী থেকে ছয় বছর পর দেশে ফিরে এলো। এসে শুনলো মায়ের মৃত্যুর খবর। মোট ২৪ ঘণ্টার গল্প। কিন্তু একটা জায়গায় এসে বাইরের পৃথিবী এবং পরিবারটি একাকার হয়ে যায়। ‘দূরদর্শনে’ প্রতি সপ্তাহে একটা অনুষ্ঠান হয়। ‘ওয়ার্ল্ড ইন ওয়ার্ল্ড’ পৃথিবীর নানা ঘটনা দেখানো হয়। সেখানে ইস্ট ইউরোপের ঘটনাও প্রায় দেখানো হত। সেগুলো মা দেখে খাতায় লিখেছিলেন, ওরা মনে করে ওদের পূর্ব পুরুষ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাই ওরা সব পাল্টে দিতে চাইছে। বুলু তুইও তো তাই চেয়েছিলি, তুইও তো ঝান্ডা উঁচু করে রেখেছিলি। ওরা সেই ঝান্ডা পুড়িয়ে ফেলেছে। আমি কোথায় দাঁড়াবো। আমি কি করবো।

বিচিত্রা : এই হতাশা থেকেই বৃদ্ধার আত্মহনন?

মৃণাল : না না, আরও অনেক কারণ আছে। মানে যে ছেলেটি জার্মানী চলে গিয়েছিলো, তার সঙ্গে বড় ছেলের বৌয়ের একটা সম্পর্ক হয়েছিলো। সমাজনীতির ভয়ে সে ছেলে জার্মানী পালিয়ে যায়। তাকেও মা একটা চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু ডাকে ফেলা হয়নি। সে চিঠিতে মা লিখেছেন, তুই আসছিস? আয় , যা এতদিন পারিসনি, তা কি আর পারবি? লোকে কি বলবে সেটাই বড় হলো? নিজেদের কথা ভাববি না? তোরা নিজেকেও ঠকালি আমাদেরও ফাঁকি দিলি¾এমনি টুকরো টুকরো নানা পারিবারিক ঘটনা জড়িয়ে আছে মায়ের লেখা ডায়েরীতে। আমরা দেখতে পাই পরিবারের সবাই একই ছাদের তলায় বাস করেও কেউ কাউকে চেনে না। জানে না। এটা জীবনের মস্ত ট্রাজেডী।

বিচিত্রা : এই গল্প কি আপনি ন্যারেটিভ স্টাইলে বলেছেন?

মৃণাল : পুরোপুরিভাবে ন্যারেটিভ বলা যাবে না। মিশ্র বলা ভালো। ডায়েরীর উদ্ধৃতি মাঝে মাঝে তুলে ধরে আমি ৭১/৭২ সালের বারুদ গন্ধ মাখা কলকাতাকে ধরেছি। আমার কলকাতা ত্রয়ী ‘ইন্টারভিউ’, ‘কলকাতা ৭১’ ও ‘পদাতিক’¾এর কিছু কিছু অংশে চলে এসেছে ডকুমেন্টেশন হয়ে। এই ছবিতে আমার চরিত্রদের আমি বাস্তবের মুখে দাঁড় করিয়ে দেই। ছবির শেষের দিকে, বাড়ির বৃদ্ধ অর্থাৎ ভদ্রমহিলার স্বামী সকাল বেলার খবর কাগজ পড়তে পড়তে হঠাৎ বলেন, ‘সবকিছু কেমন জানি তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ঘরে-বাইরে, সমস্ত জায়গায় বিশ্বাস-আশা-ভরসা সব যেনো আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। সেজ ছেলে, জার্মানী থেকে যে এসেছে সেও যেনো নিজেকে আউটসাইডার বলে মনে করছে, বলে ঠিক, এই বাড়িটার মতো। মনে হয় যে, এতবড় একটা কথা হঠাৎ বেরিয়ে  গেলো। ভেবে বলেনি।

এভাবেই হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর মুহূর্তে প্রত্যেকের মুখোশ খুলে পড়ে। গোপনীয়তাগুলো বেআব্রু হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যখন অতীতে ফিরে যাই, যেখানে ইস্ট ইউরোপের ঘটনাগুলোও বেরিয়ে আসে। মানে¾সেখানেও মায়ের অনেক সন্দেহ¾অনেক প্রশ্ন। মায়ের প্রশ্নগুলো কিন্তু খুব সহজ এবং আটপৌরে¾যেন পাঁচফোড়নের গন্ধ পাওয়া যায়। তারপরও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে সেগুলো। এখান থেকে একটা জায়গায় চলে আসতে আমরা চেষ্টা করি। যেখান থেকে বোঝা যায় একটা প্রচণ্ড বিশ্বাসহীনতায় পেয়ে বসেছে সবাইকে। সত্যি কথা বলতে কি, আজকের যুগে খুব আশাবাদী হওয়া আমার কাছে খুব মেকী মনে হয়। জীবন বিরোধী মনে হয়। আমি মনে করি, যদি বিশ্বাসহীনতার কথা খুব জোরের সঙ্গে¾একেবারে অস্তিত্বের গোড়া থেকে তুলে আনতে পারি, তাহলে এই বিশ্বাসহীনতা থেকেই নতুন বিশ্বাসের জন্ম নেবে।

বিচিত্রা : আপনার ছবিতে যেমন ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘খারিজ’ এবং ‘খন্ডহর’-এর কথা বলবো¾শেষ হয়েছে বিশ্বাসহীনতায় বা হতাশায়। যেমন ‘একদিন প্রতিদিনে’¾মা উনুন ধরাচ্ছেন। তার পাথর মুখে নতুন আশার হাতছানি দেখিনি।

মৃণাল : এটা অত্যন্ত ভুল ব্যাখ্যা। আমি মনে করি আপাতত হতাশার পেছনে একটা ভয়ঙ্কর রকমের শক্তি ইনটেরিয়র স্ট্র্ন্থে লুকিয়ে আছে। এই শক্তিটাই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। আমাকে স্বপ্ন দেখায়। কারণ আমরা জানি, এই মা দু’ঘন্টা আগে মেয়েকে একটা উঠোনে ফেলে রেখে তিনি নিজের ঘরে পালিয়ে গেলেন লোকলজ্জার ভয়ে। কিন্তু এই মুহূর্তে মা পরিষ্কার জানেন, তার মেয়ে কাল রাতে কোথায় ছিলো¾লোকের এ প্রশ্নের জবাব কি করে দিতে হয়। এটাই হচ্ছে এক ধাপ এগিয়ে আসা। অর্থাৎ সমাজ জীবনেও এক ধাপ এগিয়ে আসা। ‘খারিজ’ও আমি পর্দায় বিপ্লব করতে চাইনি। দর্শকের মনে সেন্স অব গিল্টি আসুক। আমি বাইরের শত্রুকে চিহ্নিত না করে ভেতরের শত্রুকে চিহ্নিত করতে চাই। আমি আমার ছবির চরিত্রদের বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাই। এই বাস্তবের মুখোমুখি হতে আমরা নারাজ। ভয় পাই। তাই পালিয়ে বেড়াই। কল্পনাতে আশ্রয় নেই।

বিচিত্রা : সত্যজিৎ, ঋত্বিক এবং আপনি¾এই তিনজনকে বাদ দিয়ে নতুন প্রজন্মের যারা এসেছেন তাদের সম্পর্কে আপনার অভিমত?

মৃণাল : এই যে গৌতম, বুদ্ধদেব, উৎপলেন্দু, অপর্ণারা আছেন¾ওদের সব ছবি আমার পছন্দ না হলেও, এটা সত্য আমরা সবাই চেষ্টা করছি। প্রধান ধারার সিনেমার বাইরে চলে আসছে। ভারত বর্ষে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ছবি তৈরি হয়। কিন্তু তার সিংহ ভাগই অখাদ্য। তারপরও যারা এ প্রধান ধারা থেকে বেরিয়ে আসছে¾তাদের ছবির ধরন, জীবন দর্শনের সঙ্গে আমার মতের মিল না হলেও তাদের আমি স্বাগত জানাবো। পাশে এসে দাঁড়াবো।

বিচিত্রা : সারা পৃথিবীতে ‘মিডল অব দ্য রোড সিনেমা’ নামে নতুন একটা ধারার কথা উঠেছে। এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?

মৃণাল : আমি তাতে বিশ্বাস করি না। একটু এই। একটু ওই। এগুলো খুবই ভয়ঙ্কর।

বিচিত্রা : এখন বুদ্ধদেব, গৌতমরা যে ছবি করছে¾সেগুলো কি সত্যজিৎ রায়ের ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে প্রভাবমুক্ত বলে মনে হয়?

মৃণাল : সত্যজিৎ রায় শুরুতে গ্রামভিত্তিক ছবি করেন। তারপর শহরে এলেন। বুদ্ধদেবের ছবি প্রধানত শহরকেন্দ্রিক। গ্রামের গল্পও বলেছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমাকে টানেনি। গৌতম গ্রাম নিয়ে আছে। সে গ্রামের এলিমেনটারি চেহারা নিয়ে আসছে। সত্যজিৎ বাবু সেটা করেননি। সত্যজিৎ বাবু মার্জিত জীবনের কথাই বলতে চেয়েছেন।

বিচিত্রা : অপর্ণা?

মৃণাল : অপর্ণা পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের অবস্থা ধরতে চেয়েছে। এক একজন একেকভাবে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ছবির ভাষা, স্টাইল পাল্টাচ্ছে। একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। এটা সত্যি কথা, সত্যজিৎ বাবু প্রথম ছবি দিয়ে ভারতের চলচ্চিত্র জগতে একটা বিপ্লব আনলেন। সেটাই শুরু হলো। কেউ দাঁড়িয়ে নেই কিন্তু। উই হ্যাভ ট্রাই টু গো ফরোয়ার্ড। এ যেনো একটা খাড়া পাহাড় ডিঙানোর মতো। সাহিত্যে যেমন ভাষা পাল্টাচ্ছে ছবিরও ধরন ধারণ পাল্টাচ্ছে। ডিকেন্স-এর স্টাইল আর আজকের ভার্জিনিয়া উলফের স্টাইল এক নয়। নতুন টেকনোলজির উদ্ভাবনের সঙ্গে ছবির ভাষাও দ্রুত পাল্টাচ্ছে।

বিচিত্রা : এ পর্যন্ত অনেক ছবি করেছেন। সেই সূত্রে বহু নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। কার সঙ্গে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দবোধ করেছেন?

মৃণাল : এতো মহা মুশকিলের প্রশ্ন। কাকে বলতে গিয়ে কাকে বলবো। আরও তো ছবি করতে হবে। আমার একটা স্টক জবাব আছে। যখন যাকে নিয়ে ছবি করি, তখন তাকেই অসম্ভব ভালো মনে হয়।

বিচিত্রা : তাহলে অন্যভাবে প্রশ্নটা করি, ‘আকালের সন্ধানে’ স্মিতাকে দিয়ে যে চরিত্রটি করিয়েছেন সেটি কি শাবানাকে দিয়ে করাতে পারতেন?

মৃণাল : তা নিশ্চয় পারতাম না।

বিচিত্রা : কিংবা সুহাসিনী মুলে।

মৃণাল : সুহাসিনীর কথা আলাদা। ও প্রফেশনাল অভিনেত্রী নয়। চৌদ্দ/পনের বয়সে ওকে প্রথম দেখি। ওর মা আমার পুরনো বন্ধু। সেই সময় ওর চালচলন দেখে, খুব পজিটিভ সেন্সেই বলছি¾অত্যন্ত নির্লজ্জ মনে হয়েছিলো। ভূবন সোমের গৌরীর ভূমিকায় এমন একটি মেয়ে খুঁজছিলাম, যাকে দেখে মনে হবে গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হাসছে। ওর কথা তখন মনে হল। প্রথম শটে মোষের পিঠে ও চলে যাচ্ছে। সেই দৃশ্যটি তোলার সময় মোষটি হঠাৎ এমন দৌড় দেয় যে ও পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যায়। তারপরও শট্ দেবার জন্য সে রেডি। তো ওই ছবিতে সুহাসিনী বাস্তবিকই চমৎকার। কিন্তু তাই বলে ওকে পাওয়ার ফুল একট্রেস বলা যাবে না। পরে ও আমার সহকারী হয়ে কাজ করেছে। তবে শাবানা, স্মিতা হাইলী প্রফেশনাল। এবং ভেরী ইফিশিয়েন্ট। যেকোনো রোলেই চালান যায়। স্মিতার চেহারার ভেতর এমন একটা কিছু আছে, যার জন্য ওকে মহারাষ্ট্রীয় মারাঠী, সাউথ ইন্ডিয়ান, বাঙালী, গুজরাটি যেকোনো রোলে চমৎকার মানিয়ে যায়। ওর সবচেয়ে বড় গুণ হলো এক্সট্রা অর্ডিনারিলি অর্ডিনারি। এটা ওর প্লাস পয়েন্ট।

শাবানা অসম্ভব ক্যালকুলেটিভ। একটা টেক যেভাবে দেবে, বরাবর প্রত্যেকটা টেকও তাই করবে। ‘খন্ডহর’ করার সময় দেখেছি, বাঙালী মেয়েদের চাইতে ও বেশি বাঙালী ছিলো। বাংলায় কথা বলে না। বোম্বেতে লেখাপড়া। তবু পাওয়ার অব অবজারভেশন অসম্ভব ভালো। প্রফেশনাল ইফিশিয়েন্সী ওর আছে। ও জানতে চেষ্টা করে, ঘরেতে কি পোশাক পরবে, মিনিমাম কতটুকু সাজা দরকার ইত্যাদি। বাড়িতে পরার জন্য একটা রংচটা শাড়িই সে বেছে নেবে।

বিচিত্রা : শ্রীলা মজুমদার?

মৃণাল : শ্রীলার হাঁটাটা গ্রেসফুল নয়। মমতার হাঁটাটা আবার ভারী সুন্দর। শ্রীলার ফর্সা হওয়ার খুব শখ। ‘একদিন প্রতিদিনে’ অসম্ভব ভালো অভিনয় করেছিল। দশদিন পর ওর একটা শট্ নিতে হবে। দেখি ও ভ্রু প্লাক করছে। আমি রাগ করে বলি তুমি এটা করলে কি? অথচ শাবানা জেনেসিস করার সময়, একমাস শ্যাম্পু করেনি। চুল আঁচড়ায়নি। কলকাতার মেয়েদের কাছে এটা আশাই করা যায় না। ওরা একটু সাজতে ভালবাসে।

বিচিত্রা : বাংলাদেশের ছবি দেখেছেন? কেমন লেগেছে?

মৃণাল : বাংলাদেশের ছবির পরিবেশ এখনও গড়ে ওঠেনি। ‘স্টপ জেনোসাইড’ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তবে সামগ্রিকভাবে উত্তেজিত হওয়ার মতো কোন ছবি পাইনি। তুলনামূলকভাবে ভারতের ভাল ছবির আন্দোলন, অনেক বেশি জোরদার। তবে বেসরকারি উদ্যোগে আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘের চলচ্চিত্র উৎসবের এই আয়োজনকে¾একটি বড় মাপের ঘটনা বলব। কিন্তু যে মুহূর্তে সরকার এসে পড়বে, সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে, শিল্পের কথা বলতে আসবে, সেটা বড় গোলমালের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আজ এ পর্যন্তই।

দায়স্বীকার : এই প্রবন্ধটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি, বর্ষ ১৯, সংখ্যা ৩৮ থেকে নেওয়া।

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন