Magic Lanthon

               

ফারুক আলম

প্রকাশিত ১১ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আসা যাওয়ার মাঝে

মেগাসিটি অর্থশাস্ত্রের নির্বাক ব্যবচ্ছেদ

ফারুক আলম


কর্মময় জীবনের ব্যস্ততম নারী-পুরুষের দিন-রাত। ২৪ ঘণ্টার চিত্রায়িত জীবনযুদ্ধ। দাম্পত্য জীবনের সুশৃঙ্খল ঘর-গৃহস্থালি। পুরুষের বাজার-ঘাট আর নারীর রান্নাবান্না। নারী-পুরুষের কর্মময় রঙচটা বর্ণিল জীবন। নাওয়া-খাওয়া। আহার তা যারই হোক, নারী-পুরুষ, বিড়াল। ঘরে বা রাস্তায়। বাসে-ট্রামে বা কর্মস্থলে। বিচিত্র চিত্রের দৃশ্যায়ন। গলিপথ, রাস্তা, ট্রাম, বাস, কর্মস্থল, সকালে বা সন্ধ্যায়, দ্রুতগতিতে কাজে যোগদান, দিন শেষে সন্ধ্যায় বা রাত পোহালে কাক ডাকা ভোরে কাজ শেষে ঘরে ফেরা। একঘেয়েমি মেশিনের শব্দের মধ্যে মাঝে মাঝে গানের সুর-কথা, সানাই, মিছিলের বিক্ষুব্ধ স্লোগান বা প্রতিবাদ সভার বক্তৃতা। ফাটা-ফুটা দাগলাগা রঙচটা দেয়াল। রঙিন কাপড়। নিরলস রাস্তার চলাচল। দুরন্ত পায়রাদের নিঃশব্দ উড়াউড়ি। এই সব মেট্রোজীবনের মেট্রোপলিটন বিচিত্র চিত্র নিয়ে মেট্রোমুভি আসা যাওয়ার মাঝে। পুঁজিবাদী সমাজ-বাস্তবতার ব্যবসায়ী জীবনের অব্যবসায়ী চলচ্চিত্র। সবকিছুই বাকরুদ্ধ (কারণ নির্বাক বললে ভুল হবে)। নৈশব্দের নৈসর্গিক খেলায় কথা ও সুরের চাবুক, শব্দের বিস্ফোরণ, আলোর ঝলকানি, কালো ছায়ার দাপট, ভাবনার প্রতিভাতে প্রতিচ্ছায়া। হচ্ছেটা কী, বলে যারা প্রশ্ন করে তারা বারংবার ফিরে যাবে সেই আলো-আঁধারির খেলায়, প্রতিবাদে প্রতিরোধে। বলবে, ‘বন্ধুগণ, আজ প্রতিশোধের দিন; বলবে, ‘সনাতন দা, আমরা তোমাকে ভুলিনি, ভুলবো না


নারী-পুরুষের কোলাহল মুক্ত দাম্পত্য জীবন। নামবিহীন দুই চরিত্র। কলাকুশলীদের তালিকা থেকে নিজ নামে পরিচিত। বাসবদত্তা চ্যাটার্জি ও ঋত্বিক চক্রবর্তী। শব্দবিহীন পারিবারিক পরিবেশ বললে অন্যায় বলা হবে। কোলাহল মুক্ত বললে কিছুটা হয়, তাও ঠিক হবে না। বলা যায়, কথোপকথন মুক্ত ঘর গৃহস্থালি। আহা কী দাম্পত্য! স্বামী ব্যস্ত রাতে; স্ত্রী দিনে। যে যার মতো কর্মব্যস্ত। স্ত্রী ভোরে বের হন, সারাদিন লেদার মিলের ব্যাগ তৈরির কারখানায় কাজ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। স্বামী সন্ধ্যায় বের হন, সারারাত সংবাদপত্রের প্রেসে কাজ করে ভোরে বাড়ি ফেরেন। যে যার মতো বাড়ি ফিরে একাকী বসবাস। মাঝে মাঝে শুধু টাকা গোনা আর যথাযথ নিত্যনৈমিত্তিক কাজকর্ম সম্পাদন। আর একটা কাজ বার বার চোখে পড়বেই-ভাবে গদগদ গৃহদেবতাকে সশ্রদ্ধ বিনয়াবনত প্রণাম বা নমস্কার। বাক্সে সংরক্ষিত টাকা গোনাগাঁথার ফাঁকে পূজা নাকি পূজার ফাঁকে তহবিলের খবর নেওয়া-বুঝে পারা মুশকিল। মুশকিল হলো, এই বিশ্ব পুঁজি-বাজারে অর্থনৈতিক মন্দার ঢেউয়ে যেমন করে চাকরি ছাঁটাইয়ের হিড়িক পড়েছে; যেমন করে অর্থনৈতিক মন্দার খবর রটিয়ে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতি তথা করপোরেট পুঁজি নিজেদের সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে; যেমন করে নির্বিচারে সাধারণ প্রচলিত রীতিনীতি ও শ্রম আইন অমান্য করে কর্মী ছাঁটাই করছে এবং ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে; তেমন করে পুঁজিবাদী সমাজের সঙ্কটও ঘনীভূত হচ্ছে। আর এতে করে বার বার তহবিল গুণে ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে, আগামী দিনের জীবন চলার নিশ্চয়তার পরিমাপ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি পরম শক্তিধর দেব-দেবতাদের স্মরণ করে ভাগ্য বিপর্যয়ের হাত থেকে ভাগ্য সুরক্ষার প্রচেষ্টা। দুর্যোগের দুর্বিপাকে মতিভ্রমইবা কী? মরীচিকার মোহ বা আলেয়ার হাতছানিও মানুষের বেঁচে থাকার বড়ো অবলম্বন হতে পারে।


দুই.

আঁধার রাতে আলেয়ার পিছনে পথ সন্ধান উপমহাদেশের রাজনীতির এক উপসর্গ। খালি চোখে দেখলেই এই রাজনীতির রকমফের বোঝা যায়; এর জন্য রাজনীতি বিশ্লেষক বা টক-শোর বিশেষজ্ঞ টকার (তার্কিক) হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী ধর্ম রক্ষার রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। ভারতে দেখছি, বাবরি মসজিদ বনাম রাম মন্দিরের রাজনীতি। পাকিস্তান, চিন তথা বিদেশি শত্রুদের শায়েস্তার রাজনীতি। গো দেবতার রাজনীতি। এমনকি যোগাসনের রাজনীতি। পাকিস্তানে সীমান্ত যুদ্ধ ও কমিউনিস্ট বিরোধী জঙ্গিবাদের রাজনীতি। তালেবানের প্রেতাত্মাদের নাচন কোদন। এখন সারাবিশ্বে দুর্নীতি মুক্ত আন্দোলন গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্র নামক  প্রতিষ্ঠানটির বয়স এখন অনেক। শোষণের এই কলুষ যন্ত্রে দুর্নীতি মুক্তির প্রশ্নটাই অবান্তর। ছাই-গাদাতে শুয়ে সাবান কচলানো আরকি! তবুও যতো মত ততো পথ দিয়ে নিজস্ব রাজনীতির নিজস্ব পথ। ক্ষমতা ধরে রাখার বা ক্ষমতাসীন হওয়ার নানান কৌশল। মানুষের নাম হয়েছে ভোটার। মানুষের থেকে ভোটার অনেক বেশি দামী। মানুষের ভোট কোথায় কীভাবে যাবে সেসব প্রকৌশলীয় বিদ্যা চর্চাই এখন রাজনীতির আসল খেলা। পুঁজিবাদের বয়স যতো বাড়ছে ততোই মানবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র নামক শোষণযন্ত্রকে শক্তিশালী করছে শাসক গোষ্ঠী। রাষ্ট্রের চলৎশক্তির চাবিকাঠি রাজনীতি তার নামকরণ যাই হোক না কেনো, তা স্বকীয় আর্থ-সামাজিক বলয়ে শ্রেণি স্বার্থে বৃত্তাবদ্ধ। রাজনৈতিক অনুষঙ্গগুলোও সেই মতো অনুশীলনীয় অনুকরণীয়। 



সমাজ-বাস্তবতায় এমনকি ব্যক্তি থেকে রাজনৈতিক জীবনে ফ্রাঙ্কস্টাইনের গল্প ঘুরেফিরে আসে। ইংল্যান্ডে পুনর্জাগরণের যুগে সেই যে ক্রিস্টোফার মার্লো তার ‘ডক্টর ফাউস্টাস-এর মধ্যে ফাউস্টের যুগ যন্ত্রণা তুলে ধরলেন, আজও তার পুনরাবৃত্তি চলছেই। অর্থহীনতার চরম নিদর্শন। উৎকর্ষতার নামে মানব সভ্যতার বিরুদ্ধে অনৈতিক অবস্থান নিজেকে কী নিদারুণ ধ্বংসের শিকার করে, তার করুণ কাহিনি চলে আসছে যুগে যুগে। মার্লো তার কাহিনি বিনির্মাণে অনুসরণ করেছিলেন পৌরাণিক কাহিনি, যা ল্যাটিন থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছিলো। সে কাহিনিতে ক্ষমতার লোভে নানা অপকৌশলে কালো যাদুর চর্চায় ভবিষ্যত দ্রষ্টা ও ক্ষমতাশালী হতে চেয়েছিলেন ফাউস্টাস। কিন্তু তার সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে তাকে নির্বাসিত করা হয়। এই যে অধিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যা ব্যক্তি-মানুষকে নিঃসন্দেহে ক্ষমতাশালী করছে, তাতে কী কারো কোনো লাভ হচ্ছে নাকি শুধু যন্ত্রণাকেই বাড়িয়ে চলেছে? ফ্রাঙ্কস্টাইন সেই যে মরা লাশ ও রাসায়নিক পদার্থ থেকে নতুন এক ধ্বংসাত্মক আবিষ্কার করলেন, তা না কবে মানবজাতিকে গ্রাস করে?


তিন.

সভ্যতা এখন আগ্রাসী। সবাইকে গ্রাস করছে। মানব সভ্যতার অগ্রগতির নামে ব্যবসা বাণিজ্য চলতে চলতে তা আজ মুক্ত বাজারে গিয়ে ঠেকেছে। উৎপাদন সবদিনই সামাজিক। তা কখনো ব্যক্তিগত হওয়া সম্ভব না। সবদিন সামাজিকই থাকবে। মালিকানাটা ক্ষমতাকেন্দ্রিক। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত। ব্যক্তিস্বার্থের মালিকানা উৎপাদনকারীদেরকে নিঃশেষ করে নিজে লাভবান হয়। বিজ্ঞান যখন ব্যক্তি-মানুষের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন এই নিঃস্বায়ন প্রক্রিয়া আরো সহজতর হয়। তাই বিশ্বায়নের আর এক নাম হয়েছে নিঃস্বায়ন। নিঃস্বায়ন যখন সর্বসাধারণের বাজারে থলে নিয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন নেমে আসে মহামন্দা। অর্থাৎ পণ্য উৎপাদন যখন অলাভজনক বা লোকসানী খাতে রূপান্তর হয় এবং পুঁজি বাজার বা শেয়ার মার্কেটের লেনদেনের সূচক নিম্নগামী হয়, তখন নেমে আসে আর্থিক মহামন্দা। পুঁজিপতিরাও সেখান থেকে তাদের টাকা তুলে নিতে থাকেন। বন্ধ হতে থাকে কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ব্যাপক শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই হয়। ফলে নিঃস্বদের জীবন অচল হয়ে পড়ে।


আধুনিক অর্থনীতি গড়ে ওঠার আগে দার্শনিকসহ প্রজ্ঞাবানদের উদ্যোগ ছিলো মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনকে পণ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে রাখার। ভোগবাদের বিপরীতে সহজিয়া জীবনব্যবস্থা। হয়তোবা তাই সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘নিজেকে জান। নিজেকে জানলে খুব বেশি ঝামেলা থাকে না। অপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে পৃথিবীর বোঝা বাড়ে না। ব্যবসা ও পুঁজিবাদ দিয়ে মানুষকে শোষণ করা ও অমানুষ হওয়ার সুযোগ থাকে না। কিন্তু ব্যবসা ও পুঁজিবাদ মানুষকে বাজারমুখি করেই ছাড়লো। জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের প্রয়োজনকে বাজারে বিক্রি করতে থাকলো। বিপণন ব্যবস্থায় মূল্য তালিকা যৌক্তিক করার জন্যে পুঁজিবাদের ভাড়া করা অর্থনীতিবিদরা বললেন, ‘বাজারে কোনো পণ্যের দাম নির্ভর করে সরবরাহ ও চাহিদার ওপর। তাই তারা পুঁজি বিনিয়োগের ঝুঁকি নেয়, লাভ করে। বাদ সাধলেন কার্ল মার্কস। তিনি লাভের বিষয়টা স্পষ্ট করলেন, পুঁজির সঙ্গে শ্রম যোগ হয়ে লাভ হয়। শ্রমিক আন্দোলন শক্তিশালী হতে থাকলো। মার্কসের তত্ত্ব অনুযায়ী পুঁজিবাদ তার নিজের সঙ্কট মোকাবিলা করার ক্ষমতা হারাবে, বিধায় সমাজ তার নিজস্ব প্রয়োজনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করবে। পুঁজিবাদের ভরা যৌবনে লেনিন বুঝলেন, পুঁজিবাদ তার নিজস্ব সঙ্কট মোকাবিলা করতে কৌশল অবলম্বন করে। পুঁজির সঙ্কট দূর করতে বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারকে একচেটিয়া করার জন্য পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদে রূপান্তরিত হয়। নয়া নয়া কৌশল অবলম্বন করে। যুদ্ধ সংঘাতসহ নানান ঝামেলায় মানুষকে জড়িয়ে ফেলে। 


লেলিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে হলো রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এর কিছু কাল আগেই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা গেলো পড়ে। মালিকানার কুক্ষিগত অর্থনৈতিক শক্তি মানুষকে অসহায় করে তুললো। অন্যদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতায় বিধ্বস্ত সামাজিক সম্পর্ক বাজারকে করে তুললো বিশৃঙ্খল। নিঃস্ব হতে হতে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা গিয়ে পৌঁছালো শূন্যের কোঠায়। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে উৎপাদনের ওপর নজর দেওয়াতে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলো। পণ্যের প্রাচুর্যতা বাজারকে স্থবির করলো। পুঁজি পড়লো ঘোর সঙ্কটে। শুরু হলো বিশ্ব মহামন্দা। পুঁজিবাদ যখন চরম সঙ্কটে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার তখন রমরমা।


১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের মহামন্দার কবলে যখন গোটা বিশ্ব, তখন উৎপাদিত পণ্য সাগর মহাসাগরে ফেলেও সমাধান হলো না। মহামন্দার সুযোগে শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দিলো পুঁজিপতিরা। শ্রমিক কর্মচারী ছাঁটাই করলো। একদিকে কর্মহীন মানুষ মহা মন্বন্তরের কবলে ধুঁকছে। অন্যদিকে পুঁজিপতিরা হাজার হাজার টন খাদ্য ফেলছে সাগরে। কেইনসপুঁজিবাদীদের রক্ষায় কোমর বেধে নামলেন; তত্ত্ব দিলেন। চাহিদা, সরবরাহ-যতো সব সেকেলে ধারণা দিয়ে বাজার চলবে না। পণ্যই তার নিজের চাহিদা সৃষ্টি করে নেবে। পণ্য তৈরির আগেই পণ্যের বিজ্ঞাপন দাও। প্রচারেই প্রসার। কাজেই পণ্যের মান গুণ পরিচিতি মানুষের সামনে তুলে ধরো অর্থাৎ বিজ্ঞাপন দাও। মানুষের ভোগবাদকে উসকিয়ে দাও। ভোগবাদী মানুষ গড়ে তোলো। খাও-দাও ফূর্তি করো। মানুষ বাঁচার জন্য খাবে না, খাওয়ার জন্য বেঁচে থাকবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে মানুষের বেতন নিয়ন্ত্রণ করে, সব মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দাও। অর্থ সঞ্চয় নয়, অর্থ ব্যয় হলো অর্থমন্দা উত্তরণের পথ। বিজ্ঞাপন ও মানুষের কর্মসংস্থাপনের সুযোগ বিশ্ব মহামন্দা উত্তরণে সক্ষম হলো। প্রকৃতপক্ষে মহামন্দাতেও পুঁজিপতিদের লাভ হয়। একচেটিয়া বাজার গড়ে তোলে। তারা পুঁজিকে কুক্ষিগত করে ছোটো পুঁজিকে গিলে খায়। শ্রমিকের শ্রম আরো সস্তায় কিনে নেয়। লাভের জন্য হেন কাজ নেই যা তারা করে না। মধ্যযুগীয় নরবলি থেকে শুরু করে দেশে দেশে যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় উন্মাদনা, আঞ্চলিকতা, বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ। পৃথিবীর সবকিছুকে পণ্যায়নের প্রক্রিয়াভুক্ত করে। কেইনস এই পণ্যায়ন প্রক্রিয়ার মডেল দাঁড় করালেন। তাই ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কেইনস পুঁজিবাদের সেরা পুরস্কার অর্থনীতিতে নোবেলও পেলেন।


কেইনস-এর তত্ত্বে চলছে পৃথিবী। বিশ্বায়নের যুগ। তবুও ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে অর্থনৈতিক মহামন্দা গ্লোবাল ভিলেজকে ছেড়ে কথা কইলো না, বিশ্বজুড়ে শুরু হলো শ্রমিক ছাঁটাই, কলকারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনা। ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বের কলকারখানা থেকে ছাঁটাই হয়ে প্রবাসীরা দেশে ফিরতে শুরু করলো। কলকাতা নামক মেগাসিটিতেও লাগলো তার ঢেউ। বার বার মহামন্দার কারণে পুঁজিপতিরা চাচ্ছে বিকল্প কর্মী। সর্বসাধারণ মানুষ চাচ্ছে, এই রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তন।


পুঁজিপতিরা এখন মানুষকে বাদ দিয়ে রোবট নিয়ে কাজ করতে চায়। তাদের মনোলোকে যে হিটলার বাস করে সে তাদেরকে বলেছে, এতো বেশি মানুষ পৃথিবীতে দরকার নেই। কারণ তারা জানে না, মানুষই পৃথিবীর চালিকা শক্তি। কোনো রোবট তাকে রক্ষা করতে পারে না, স্নেহ মায়া মমতা ভালবাসা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। আজকের দিনে ইন্টারনেট নির্ভর জীবনব্যবস্থা ব্যক্তি-মানুষের বিচ্ছিন্নতাকে যতো প্রকট করছে, ততোই মানবিকতার দিকটা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ছে। মানুষ এখন সবাইকে ছাড়তে চাচ্ছে। একা থাকতে চাচ্ছে। পাশের শিশু সন্তানের থেকে প্রাধান্য পাচ্ছে ভার্সুয়াল জগৎ। তাই দেখা যাচ্ছে, বাথটবে স্নানরত মা ফেইসবুক চালাতে চালাতে ভুলে যাচ্ছেন নিজের সন্তানকে। স্নান ও ফেইসবুক ছেড়ে যখন তিনি বাস্তবে আসছেন, তখন দুর্ঘটনায় সন্তান চলে গেছে না ফেরার দেশে। বন্ধুর পাশে বসে ফেইসবুকে চলছে নানা তামাসা। লাইক শেয়ার কমেন্ট। জীবন্ত মানুষের ভাবের আদান-প্রদান এখন স্থবির। বাসস্ট্যান্ডে, স্টেশনে, বিমানবন্দরে সামাজিক যোগাযোগ কমছে। যে যার মতো ভার্সুয়াল জগৎ নিয়ে ব্যস্ত। কে কোথায় যাচ্ছে, কে কেমন আছে, কারো কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা আগের মতো কেউ কারো খোঁজখবর নিচ্ছে না। ভাবের আদান-প্রদান করছে না। সবাই যেনো রোবট।


সবাই চাচ্ছে রোবট নির্ভর জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলতে। একটা রোবট ফিল্ড প্রতিদিন মোবাইল বা কম্পিউটারের মতো হাজার হাজার রোবট তৈরি করে বাজারজাত করবে, আর সেই রোবট দিয়েই মানুষের সব কাজকর্ম, পরিসেবা, উৎপাদন চলবে। চলতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর এই সাতশো কোটি মানুষের কী হবে? তার একটা সমাধান জনশ্রুত হয়ে আছে। রোবট সব মানুষ ধ্বংস করে এই পৃথিবীটাকে দখল করে রোবট রাজত্ব তৈরি করবে। আবার এমনও হতে পারে, এখন যেমন চলছে মানুষ অমানুষের অধীনে তাবেদারীর জীবনযাপন করছে, তেমনই রোবটের অধীনে মানুষেরা দাসত্বের জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। এবং এ ব্যবস্থাকে নিরাপদ মনে করে সানন্দে সেই দাসত্বকে মানুষ খুশি মনে মেনে নিয়ে এক দায়-দায়িত্বহীন নির্ভেজাল জীবনযাপন করতে পারে।


ফর ফিল্মস নিবেদিত আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের আসা যাওয়ার মাঝে দেখতে দেখতে এসব কথা বার বার মনে পড়তে পারে। এখানে কথোপকথন নেই। বাদ-প্রতিবাদ নেই, কিন্তু না বলা কথা আছে অনেক, আছে অনেক নীরব প্রতিবাদ। সংবাদ আছে, দৃশ্যায়ন আছে, আছে মিছিলের প্রতিবাদী সেøাগান, মিটিংয়ের আবেগভরা জ্বালাময়ী ভাষণ। যন্ত্রণা অনিশ্চয়তা সর্বত্র। ব্যক্তি-মানুষের বেঁচে থাকার জীবনসংগ্রামের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা। তবুও দাম্পত্য জীবনের রোমান্টিং মুহূর্ত ঘড়ির কাটায় আটকে দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামে ন্যস্ত হয়ে পড়ে।


আচ্ছা, এতো প্রতীক্ষার পর দুজন একান্তে, আরো একটু বেশি সময় নিয়ে, আরো একটু কিছু সময় স্বামী-স্ত্রীর শরীরী ভাষাগুলো পড়ে নিলে কার কী ক্ষতি হতো? না, তা হবে না। হাতঘড়ি বলে দিচ্ছে সময় নেই, ঠোঁটে ঠোঁট, লোম, চর্ম, কেশ স্পর্শের সময় নেই, ‘অঙ্গ লাগি অঙ্গ কাঁদলেও সমস্ত অঙ্গ দিয়ে আর এক অঙ্গের অনুভূতির অন্তরস্থলে ঢুকে অবগাহনের সময় এখানে হাতঘড়িতে বাধা। এমন কী ক্ষতি হতো সেই অনুভূতি খুঁড়ে খুঁড়ে শুক্রাণু আর ডিম্বানুর মিলনে যদি অনুভূতির বাস্তব রূপ একটা তরতাজা মানব সন্তানের জন্ম হতো! কিন্তু সময় নেই। টি এস এলিয়টের মতো বলতে হয়, সন্তান জন্ম দিবে না, তবে বিয়ে করলে কেন?’ হায় রে, ‘নিষ্ঠুর বসন্ত!’ রোবটের মতো চাপা হাসির মাপা অনুভূতি নিয়ে বেশ চলছে জীবন। আর কদিন পরে আধুনিক মানুষ রোবট নিয়ে থাকবে। নিজের রোবটের জীবন কেটে যাবে নিজের অজান্তে।


চার.

একটু ভাবলে দেখা যাবে, মেগাসিটির মেট্রোপলিটন জীবনে সাধ আহ্লাদগুলো সময়ের ছকে বাধা। এখানে বাহুল্যতায় সময় নষ্ট করে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিলেই অনেক মাশুল দিতে হবে। একার উপার্জনে দুটো জীবন চলতে গেলে যে অনিশ্চয়তার জীবন বেছে নিতে হবে, তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরাবে। তখন সদর দরজা দিয়ে অভাবের শীতল বাতাস হু হু করে ঢুকবে আর জানালার ফাঁক গলে বসন্তের ভালবাসা সুখের পায়রাদের সঙ্গে এক এক করে উড়ে যাবে। সেই ভয়ে এই রোবটের জীবন।


এক ঘণ্টা ২১ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডের আসা যাওয়ার মাঝেতে প্রাথমিকভাবে পর্যায়ক্রমে উঠে এসেছে এক জোড়া নারী-পুরুষ। দাম্পত্য জীবনে নারী বাসবদত্তা ও পুরুষের ভূমিকায় ঋত্বিক। দুজনের এক বাড়ি, এক ঘর, এক রাস্তা, এক বাজার, এক খাবার কিন্তু দুজনের এক হওয়ার সময় নেই। কাজের শেষে দিনের শুরুতে দুজনের দেখা-সাক্ষাৎ একটুখানি সুখের স্বাদ। স্বল্পকালের মিষ্টি হাসি মধুর সময়। প্রতিদিনকার তবুও মনে হয় কতো সে কাল পরে, কতো যে কঠিন সময় পেরিয়ে।


আমরা এখন চলচ্চিত্রের মুহূর্তগুলোর একটা ভাষাগত বিশ্লেষণে মনোনিবেশ করব। চলচ্চিত্রের শুরুতেই পর্দায় উৎসবে অংশগ্রহণ ও পুরস্কারের তালিকা। ২৮ সেকেন্ডে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘ফর ফিল্মস লেখা, এবং তারপর কয়েক সেকেন্ড অন্ধকার। যেনো কতো যুগের প্রতীক্ষার পর অন্ধকারে ভেসে আসে আকাশবাণীর মতো সময় জ্ঞান সম্পন্ন প্রশিক্ষিত খবর পাঠিকার কণ্ঠস্বর-


গত এক সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গে তথ্য, সংস্কৃতি ও শিল্প ক্ষেত্রে প্রায় ১২০০ জন লোকের চাকরি হারানোর খবর পাওয়া গিয়েছে। এভাবে হঠাৎ করে চাকরি হারানোতে সভাবত এসব অফিসের কর্মী মহলে ভয়ানক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। গতকাল দূর্গাপুরের একটি অফিসে উত্তেজিত কর্মীরা জেনারেল ম্যানেজারের কাছে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং অফিসে ভাঙচুর চালায়। তাদেরকে কাজে ফিরিয়ে নেবার দাবিতে তারা ম্যানেজারকে আটক করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হলে, স্থানীয় পুলিশ গিয়ে তা সামাল দেয়। এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, জরুরি ভিত্তিতে একটি অ্যাকশন কমিটি গঠন করে এর কারণ খতিয়ে দেখা হবে। চাকরি হারানোর ক্ষোভে কর্মীরা বিক্ষোভ দেখান বলে জানা গিয়েছে। খোদ কলকাতার শিল্প তারকে একটি তথ্য প্রযুক্তি সংস্থার কর্মীরা তাদেরকে কাজে ফিরিয়ে নেবার দাবিতে দুঘণ্টা পথ অবরোধ করে রাখে। বর্তমান বিশ্ব বাজারে ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি, টাকার দাম পড়তে থাকা ও তৎসঙ্গে প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে অর্থনৈতিক অচলাবস্থার প্রভাব এসে পড়েছে এ রাজ্যেও। একদিকে বাজারে নিত্যনৈমিত্তিক জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে বিভিন্ন সংস্থায় কর্মী সঙ্কোচন নীতি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে মধ্যবিত্ত সমাজকে।


এক মিনিট ৪২ সেকেন্ডে বিসমিল্লাহ খানের সানাই। রাগ তিলক কামোদ। অতল অন্ধকারে প্রাণকে জাগিয়ে তোলে। জীবনকে জুড়ে দেয় উৎসবের আমেজে রৌদ্রজ্জ্বল চঞ্চলতায়। অন্ধকার ভেদ করে আবছা আলো উঠতে থাকে। এই তো জীবন। জীবনের ধূসর রঙ মিলিয়ে আসে রঙধনুর রঙের ছটা। ধূসর পাণ্ডুলিপি ছিঁড়ে ফুঁড়ে অথচ নির্লিপ্ত, নির্মোহ, ধারাবাহিক গতিতে চলমান রঙ। এখানে সবুজ বনাঞ্চল নেই, নেই সাগর নদী মরু। কিংবা ধোঁয়া বা কুয়াশার কুণ্ডলী। ঊর্ধ্বমুখি দেয়াল। তার রঙ দৃষ্টিনন্দন না হলেও দৃষ্টিগ্রাহ্য। রঙচটা, ফাটল ধরা এই যে মেগাসিটির ক্রমবর্ধমান বর্ধিষ্ণু দেয়াল অসীম অনন্ত সুরের সঙ্গে মিশে যায়। মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় জীবনের সাথে। পর্যায়ক্রমে আসে ইংরেজি ভাষায় লেখা কলাকুশীলবদের নাম ও ভূমিকা। কালো রঙের মাঝে সাদা কালি।


দুই মিনিট ২৮ সেকেন্ডে পর্দায়-একটি ফর ফিল্মস প্রযোজনা। আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের চলচ্চিত্র আসা যাওয়ার মাঝে বা LABOUR OF LOVE। বাংলা ও ইংরেজি নামকরণ বিস্তর ব্যবধানে ঠাসা। দ্য রেইন-যখন বৃষ্টি এলো এর মতোও না। যদিও দুটি নামই অর্থবহ, তাৎপর্যপূর্ণ। মহাভারতের চরিত্রের মতো। সময়ের সাথে সাথে ঘটনা বদলায়; ঘটনার সাথে সাথে নাম। গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম, যার প্রথম পর্যায়ের নাম ছিলো দেবব্রত। কিংবা ধরা যাক ধ্রুপদী যার আরেক নাম পাঞ্চালি। যাইহোক চলচ্চিত্রটির বাংলা নাম যদি অন্য কিছু হতো, তাতেও শ্রম শোষণ বন্ধ হতো না। যে টানে মানুষ জীবনকে বিক্রি করছে এবং পুঁজিবাদের হাড়িকাঠে বলির পাঠা হওয়ার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় রীতিমত প্রতিযোগিতায় নামছে, সেই টানই তো লেবার অব লাভ। অভিনয়ে ঋত্বিক চক্রবর্তী, বাসবদত্তা চ্যাটার্জী, সিনেমাটোগ্রাফি মাহেন্দ্র জে শেঠি ও আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত, শব্দ পরিকল্পনা আনিশ জন, কালারিস্ট সিদ্ধার্থ মীর, প্রযোজনা পরিকল্পনা জোনাকি ভট্টাচার্য্য, সম্পাদনা আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত, ব্যবসায় ও বিপনণে বিক্রম মহিনতা, নির্বাহী প্রযোজক জোনাকী ভট্টাচার্য্য, প্রযোজনায় ফর ফিল্মস এবং কাহিনি ও পরিচালনা আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত।


চলচ্চিত্র শুরুর চার মিনিটের মাথায় পর্দায় হাঁটতে থাকা বাসবদত্তা। অনন্ত গলি পথ। দুই পাশে দেয়াল। সামনে একবারে নগ্ন ইটের প্রাচীর। তা পেরিয়ে রঙচটা দেয়াল আর দেয়াল। এ যেনো দেয়ালের উপর রঙের খেলা। গলির মাথায় বড়ো রাস্তার আলো। পৌঁছাতেই চলমান ট্রাম ঠুন ঠুন আওয়াজে থামলে বাসবদত্তা উঠে পড়েন। ট্রামে বসেই সকালের হালকা নাস্তা। আলো-আঁধারির খেলা। এই তো জীবন। থামলে চলে না। প্রয়োজনে বাহন বদলাতে হয়। বাসবদত্তা গন্তব্যে যেতে বাহন বদলে বাস স্টপে যান। ফুটপথে ফুলের দোকান। আরো কতো কী। এইতো ফেরিওয়ালারা আজ যখন বিশ্বের সেরা ধনী (আমাজান ডটকম), তখন এই ফুটপথের ফুলের ব্যাপারী আর চলমান শ্রমের ব্যাপারীর মধ্যে পার্থক্য থাকে না। বাসবদত্তার হাতের কব্জিতে থাকা ০৫৯ নম্বর বলে দেয়, সেও মানুষ নয় বরং একটা নম্বর মাত্র। রোবট বা শ্রমিক।


আট মিনিটের মাথায় ঋত্বিকের দেখা। একা দাঁড়িয়ে আছেন জানালার পাশে। হাতে চায়ের কাপ। পায়রা বসার শূন্য আসন। সুখের পায়রারা উড়ে গেছে কতো দূর। পাশে সাইকেল, বিশ্বস্ত ও প্রিয় বাহন। আগের আমলের চলচ্চিত্র হলে সিগারেট হাতে গান থাকতো, ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয় ফিরে আয় ...’; এখন তা নেই, আছে ভাবনা। চা শেষ। ঘর-গৃহস্থালির নানান জিনিস। রান্না ঘর। জামা কাপড় বদল। অবশেষে স্নান ঘর। পায়ের ছাপ যেতে যেতে ঘরে প্রবেশ। সারারাতের ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে কাপড়-চোপড় তোয়ালেটাকে রোদে মেলে দেওয়া হয়। শঙ্খের পাশে সকালে গৃহিনীর জ্বালানো ধুপবাতি সুগন্ধ ছড়াতে থাকে, ঋত্বিক দেবতাদের উদ্দেশে জোড়া হাতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেন।


১২ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড, রঙিন শাড়ি পরা নারীর আবির্ভাব। শাড়ির রঙয়ের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে মনোলোকে আবির্ভূত নারী মিলিয়ে যায়। জাগরণের বিরহ ভাবনা। স্নানের পর ঋত্বিক নাস্তা করবে এটাই স্বাভাবিক। কেক খেতে খেতে আবহসঙ্গীত। ইন্দুবালা দেবির কন্ঠে, ‘মোর ঘুম ঘোরে (কে) এলে মনোহর/ নম নম নম নম নম নম/ শ্রাবণ মেঘে নাচে নটবর রম ঝম ঝম ঝম রম ঝম/ শিয়রে বসে চুপি চুপি চুমিলে নয়ন ...’। দৃশ্যপটের চলমান ক্যামেরায় ঘর গৃহস্থালির বিচিত্র দৃশ্য ছাড়িয়ে তা চলে যায় গলি পথে, ঘুরে আসে। ব্যক্তি, পুঁজি ও সঞ্চয়ের প্রতীক লক্ষ্মীর ঘট। ক্রীড়া কৌতুকের প্রতীক বিড়ালের সন্তর্পণ হেঁটে যাওয়া। ভাবনা জগতে টেনে আনে বিভিন্ন প্রতীকী অর্থ।


১৫ মিনিট চার সেকেন্ডে কর্মস্থলের কাছাকাছি ব্যস্ত বাসবদত্তা। স্যান্ডেলের খট খট। কারখানার ইলেকট্রিক বেল বাজতে থাকে। শব্দ যেনো জাদুকরী। দ্রুত শব্দ হতে থাকে। তার থেকে বেশি দ্রুত বাসবদত্তা চলতে থাকে। একপর্যায়ে ক্রিকেটের শেষ রান নেওয়ার মতো করে দৌড়। হাফ ছেড়ে বাঁচা। শেষ পর্যন্ত সময় মতো পৌঁছে যান বাসবদত্তা। ১৫ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে শুরু হয় গান। সন্ধ্যা মুখার্জীর কণ্ঠে, ‘উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা/ সূর্যের উজ্জ্বল রৌদ্রে চঞ্চল পাখনায় উড়ছে ...’; সঙ্গে প্যাকিং চলছে। শব্দ বলে দেয় এই এলাকা খুবই কর্মচঞ্চল, খুব বেশি ব্যস্ততম। গোনাগাঁথা, লেখালিখি, লিফটে ওঠা।


১৮ মিনিট ৫১ সেকেন্ড ঘরে বসে ঋত্বিক ঝিমুচ্ছেন। বাইরে হারমোনিয়ামে সঙ্গীতশিক্ষা বা সুর সাধনা চলছে। কালিদাস, বিদ্যাপতি নাকি মিঞা তানসেনের আদি সুর? রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে আধুনিক জীবনে অনুরণন তোলা যাবে কিনা দর্শক জানে না। অ্যান্টি রোমান্টিকের এই যুগে পশ্চাতে ফিরে দেখার চেষ্টা বার বার। নতুন করে শিক্ষা দিতে গিয়ে কল্পনায় ভেসে যাওয়া। তবু বহু দূর থেকে ভেসে আসা সুর দর্শককে অনেক পথ যাওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়, ঝিমুলে চলবে না। ঋত্বিক উঠে দাঁড়ান। ব্যাংকের চেকটা আরেকবার মিলিয়ে নিয়ে চলতে শুরু করেন। চলা মানে সাইকেল নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গলি পথে ঘটাঙ ঘটাঙ করে সাইকেল চালানো। টাকা তুলে ভালো করে গুনে নিয়ে বাজার। নগর পরিষ্কারক কালো কাকের কা কা। পানিতে জ্যান্ত রুই। মুদি দোকান। লক্ষ্মী নারায়ণ ভাণ্ডার। দরদামের বিবরণ। ভুল বানান নজরে পড়লেও ব্যবসায় এদের ভুল করলে চলে না। মুনাফা সেখানে আসল কথা। তবু ক্রেতা হিসাব করে কিনে-কেটে সন্তুষ্ট চিত্তে বাড়ি ফেরেন। ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড, ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বাজার নিয়ে ঘরে ফেরারও একটা আনন্দ আছে। ফিরে এসে ফ্রিজে মাছ, টাকার নোট টাকার বাক্সে রেখে, লক্ষ্মীর ঘটে দরদামে ফেরত পাওয়া খুচরা মুদ্রাগুলো ফেলে, ঢেকে রাখা খাবার নিয়ে বসেন ঋত্বিক। খাওয়া শেষে কাটাকুটিগুলো বিড়ালদেরই প্রাপ্য, যতোই চিতা বাঘের মতো ডোরাকাটা থাক, বিড়ালকে তো এটো কাটা কুড়িয়েই খেতে হবে।


পাঁচ.

বাজার সওদা শেষ; শেষ খাওয়া-দাওয়াও। এখন বিশ্রামের পালা। শুয়ে পড়েন। জানালা দিয়ে রোদ এসে চোখে-মুখে পড়ে। জানালার পর্দা টেনে দেন। লোকজনের যাতায়াত। ঘুম আসা সহজ নয়। রাতে কাজ করতে হয়, তাই এখন ঘুমটা বাধ্যতামূলক। রুচিশীল নকশায় ফুলতোলা সফেদ চাদর বালিশ। মনোরম বিছানা। দুজনের জায়গা আছে, আছে দুটো বালিশ কিন্তু আছেন মাত্র একজন। অন্যজনকে পাওয়া যায় না। তিনি কর্মস্থলে জীবন জীবিকার অনুসন্ধানে পরিব্যাপ্ত। বিছানা নরম তবু ঘুম আসে না।


২৯ মিনিট ২১ সেকেন্ড, কর্মব্যস্ত কারখানায় বাসবদত্তা ব্যস্ত। কাজের ফাঁকে সবার সঙ্গে বসে খেয়ে নিতে হয়। গোনাগাঁথা হিসাবনিকাশ চলতে থাকে। সহকর্মীরাও খুব বেশি ব্যস্ত। দূরে দুরন্ত পায়রার উড়াউড়ি। ট্রেনের হুইসেল, ঝম ঝম আওয়াজ মিশে যায় কারখানার শব্দের সাথে। এদিকে ঋত্বিক ঘুমিয়েছেন। স্বপ্নে দাঁড়াতে তার কষ্ট হয় না। দূর আকাশে পায়রার উড়াউড়ি। ট্রেনের শব্দ। সেলফোন বেজে চলে। বাটনে চাপ দিয়ে বাজনা বন্ধ করেন, ঘুম শেষ। পুনরায় কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি। কিছুক্ষণের মধ্যে দিনের শেষ হবে। রোদে দেওয়া কাপড় তোলা, হাত-মুখ ধোয়া। জলের শব্দ।


৩৫ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড বাসবদত্তা কারখানায় বসে আছেন। সময় শেষের প্রতীক্ষা। কখন বাজবে সেই ঘণ্টা। অবশেষে সারাদিন পরে কারখানার শব্দ ভেদ করে ছুটির ঘণ্টা বাজে। সবাই ফিরছেন। ফিরছেন বাসবদত্তা। চিরপরিচিত স্যান্ডেলের খট খট। ইট-কাঠ-পাথরে বন্দি নাগরিক জীবনের সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যায়। পায়রার দল উড়ে গেছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে। সুখ মানুষের ধরা-ছোয়ার বাইরে। জীবন এখানে কঠিন কঠোর।


৩৭ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডে বেলা ডুবে গেলো। দিনের পর রাত, রাতের পর দিন আসে। সব শেষ হয়ে যায়, কিন্তু জীবন চলমান। ডঙ ডঙ একটানা সুরেলা ঘণ্টা ধ্বনি সূর্যদেবকে বিদায় জানায়। ঋত্বিক প্রস্তুতি নেন। তাকে বের হয়ে কর্মস্থলে যেতে হবে। প্রস্তুতির প্রথমে গৃহস্বামী হিসেবে জগৎস্বামীর উদ্দেশে সন্ধ্যা-আহ্নিকের জন্যে দিয়াশলাই জ্বেলে ধুপবাতি ধরিয়ে গৃহদেবতাদের সামনে রাখে। ঈশ্বরের কৃপা প্রার্থনা করে। অদৃশ্য রহস্যময় ঈশ্বর, বাস্তব শক্তিশালী পুঁজিবাদের কাছে বহু আগেই পরাজিত। সে কথা জানলে তার অনিশ্চিত জীবনের চারিধার অন্ধকার হয়ে যাবে। ইডিপাস-এর মতো সর্বগ্রাসী কৌতূহল বিনাশী আবেগ বা আগ্রহ নেই। কোনো টাইরাসিসকে সে হত্যার হুমকি দিবে না। বরং নিরিবিলি নির্বিবাদ জীবনযাপন করাই তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সাবানের ফেনার মধ্যে দিনে পরিহিত জামা-কাপড় ভিজিয়ে দেয় ঋত্বিক। আয়নার প্রতিবিম্বে একবার মনে হয়, গৃহিণী এসেছে; কিন্তু সে তো চোখের ভুল। সব প্রস্তুতি সুসম্পন্ন। জীবনের প্রতি মুহূর্তের সঙ্গে তাল রেখে সাবানের বুদ্বুদ আলোর ছটা দিতে দিতে চুপসে যায়। কখন যেনো এসব বুদ্বুদ মিলিয়ে যাবে, কালের অতল তলে তলিয়ে যাবে।


৪০ মিনিট তিন সেকেন্ড থেকে ৪১ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড পর্যন্ত ভেসে আসে ঝাঁঝালো কন্ঠস্বর, প্রতিবাদী বক্তৃতা। কোথাও স্পষ্ট কোথাও অস্পষ্ট। অস্পষ্ট কথাগুলো অনেক শক্তিশালী; মনের ভিতরে গেঁথে যায়-


বন্ধুগণ, আজ আমাদের প্রতিশোধের দিন। আমাদের দীর্ঘ লড়াইয়ের সাথি, শ্রমিকদের ঐক্যের প্রতীক সনাতন কর্মকার আমাদের মধ্যে নেই। সবাই জানে, সনাতন দা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। বাড়িতে রুগ্ন স্ত্রী, চার-পাঁচ বছরের মেয়ে আজ পিতৃহারা। সে আর জানবে না কোনোদিন বাবার ভালবাসা কী? কিন্তু মালিকপক্ষ যেভাবে গত তিন-চার মাস ধরে শ্রমিকদেরকে ব্যাপকভাবে ছাঁটাই করে চলেছে। তার উত্তর কে দেবে? হঠাৎ করে কোনো নোটিশ না দিয়ে মুখের ওপর কারখানা বন্ধ করে দেয়া। এর জবাব তোমাদেরকে দিতে হবেই, দিতে হবে। সনাতন দা আর তার মতো মিল থেকে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের সংসার চলে না। তার দায়িত্ব কে নেবে? আমরা বার বার মালিকপক্ষের কাছে গিয়েছি। সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বার করতে চেয়েছি। মিল যাতে সুষ্ঠুভাবে চলে, এতোগুলো লোকের যাতে রুজি রোজগার বন্ধ হয়ে না যায়। কিন্তু ওরা তা চায়নি। দিনের পর দিন বিশ্ব আর্থিক মন্দার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে, তারা আরো বড়োলোক হলো। আর বড়োলোক হলো। আজ আমরা দেনার দায়ে দুবেলা দুমুঠো খাবার জুটাতে পারছি না, ডাক্তার দেখানোর পয়সা নেই। ছেলেমেয়েদেরকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছি। তখন সনাতন দার মতো শ্রমিকরা যাবে কোথায়?


সন্ধ্যায় কলকাতা শহরের মনুমেন্টটাকে দৈত্যের মতো মনে হয়। তার চোখে রক্ত জবার মতো লাল আলো জ্বলে ওঠে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দূর থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেগাসিটির বাসিন্দাদের তো কথাই নেই। ভয়ঙ্কর ভবিতব্য ভেবে ভগবানের স্মরণ করার কোনো বিকল্প নেই। মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তদের এই কঠিন সঙ্কটের নির্বাক দলিল হয়ে রইলো আসা যাওয়ার মাঝে।


ছয়.

৪২ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে বাড়ির সব আলো একে একে নিভিয়ে দিয়ে কর্মস্থলে যাত্রা করেন ঋত্বিক। শঙ্খধ্বনি শেষ হতে না হতেই হেমন্ত কুমারের লেখা গীতা দত্তের কন্ঠে গান বাজে-তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার/ কানে কানে শুধু একবার বলো তুমি যে আমার। ৪৪ মিনিটে ঋত্বিকের সামনে বিড়াল চলতে চলতে বাম থেকে ডানে চলে যায়। শুভাশুভর বিচারে মাঙ্গলিক যাত্রা সঙ্কেত। হায়রে মেট্রোপলিটন মন! গান শেষ না হতেই গৃহদ্বারে বাসবদত্তা। তখন দর্শক শুনছিলো-আমার পরাণে আসি, তুমি যে বাজালে বাঁশি/ সে যে আমার সাধনা, চাই না তো কিছু আর/ তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার। ৪৪ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে বাসবদত্তা সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। মাথা উঁচু করে উঠছেন। তিনি রীতিমতো পরিশ্রম করা সমাজের সম্মানজনক গৌরবময় শ্রমজীবী মানুষ। তার নিজের একটা ঘর-সংসার আছে। তাই নিয়ে তার অহংকার। ৪৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডে নির্ধারিত জায়গায় সংরক্ষিত চাবি নিয়ে ঘরে প্রবেশ। ঘরে ঢুকে অন্ধকার দূর করার প্রচেষ্টা। তখনো গান বাজছে-তুমি যে আমার দিশা অকুল অন্ধকারে ...। সুইচ অন করে বাতি জ্বালানো হলো। গান অস্পষ্ট হতে থাকে। অন্ধকার নেই। আলোতেও মানুষ ভয় পায়; বাসবদত্তা পেলেন। স্বামীর মেলে রাখা প্যান্ট দেখে চমকে উঠলেন। প্রতিটি রাত তার একা কাটে, ভয় পান না। কিন্তু তিনি যেমনটি আশা করেননি, তেমনটি দেখে ভয় পেলেন। পুরুষ জাতিটাকে তিনি যে ভয় পান, এ তারই প্রতিফলন। তিনি তো জানেন না, পুঁজিবাদের সেরা সঙ্কটকালে পুরুষেরা পুরুষাঙ্গটা হারিয়ে ক্লিব হয়ে গেছেন। বাসবদত্তা প্যান্টটাকে বিরক্তি নিয়ে সরিয়ে ফেলেন। গান মিলিয়ে যায়। এই যে রোমান্টিকতার সুরের মিলনের মধ্যে কোনো খলনায়ক এসে বিঘ্ন ঘটায়নি। নেই কোনো হরর বা রিভেঞ্জ। রক্তপাতের প্রশ্নই ওঠে না। তবুও যেনো খুব সন্তর্পণে রক্তপাত হয় অন্তরে। আর এই অদৃশ্য খল-অভিনেতারাই নির্বাক কাহিনি নাট্যকে পৌঁছে দেয় ক্লাইমেক্সে।


৪৭ মিনিটে বাসবদত্তা বিশ্রাম নিতে নিতে শুনতে পান স্লোগান-‘বিপ্লব জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ/ রুটিরুজির দাবিতে এ লড়াই চলছে, চলবে/ কাজের নামে ভাওতাবাজি চলতে দেয়া হবে না। স্লোগানের সঙ্গে সানাইয়ের সুর দর্শককেও আশাবাদী করে তোলে। মোটেই নিরাশাবাদী নন নায়িকাও। তার চোখে-মুখে আশার চিহ্ন। মিছিল চলছে সারা মেগাসিটি জুড়ে। স্লোগান শেষ হতে না হতেই এই জীবনযুদ্ধের নায়ক ঋত্বিককে দেখা যায় চোয়াল শক্ত করে সাইকেল চালিয়ে কাজে যাচ্ছেন। রাত নয়টায় কাজে যোগদান। তার দুই মিনিট আগেই তিনি পোশাক বদলে কাজের পোশাক পরে নেন। অন্য প্রান্তে ৫০ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে, স্ত্রী বাসবদত্তা দেবতার আরাধনায় একনিষ্ঠ। স্বামীর জ্বালানো ধুপের ধোঁয়ায় স্ত্রীর পূজা আর স্ত্রীর জ্বালানো ধুপকাঠিতে স্বামীর দিব্যি চলে যাওয়া। একঘরে এক জায়গায় দুটি মানুষ একই কাজে ভাগাভাগি করে চলছে। যেনো একক জীবনের অংশীদারত্বের বোধ বা সম্মিলিত জীবনবোধ। বাজার ঘাটের পরিপাটি ব্যবস্থাপনা। ডাল, চাল, তেল, হলুদ, কুমড়ো বড়ি প্রভৃতির সুদৃশ্য শৈল্পিক সাজসজ্জা। সাংসারিক জীবনের যে একটা অত্যন্ত শৈল্পিক দিক আছে, তা এই দম্পতির সুন্দর উপলব্ধিতে ধরা পড়ে। এই কঠিন বাস্তবতা তাদেরকে দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করেছে। রাতের আহার সেরে থালা-বাসন ধোয়া, কাপড়-চোপড় গোছগাছ। নচিকেতা ঘোষের লেখা গীতা দত্তের গান-নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে/ চুপি চুপি বাঁশি বাজে বাতাসে বাতাসে। আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব বাঁকা হোক দূরে হোক পরিবেশকে মোহনীয় করে তোলে বটে, তবুও হাওয়ায় ভেসে গেলে চলে না। ঠিকই বাক্স খুলে টাকা গুণে দেখতে হয়। দেবতা কিংবা গান দিয়ে জীবন চলে না। জীবন চলতে লাগে খাবার, কাপড়; লাগে টাকা। ৫৪ মিনিট তিন সেকেন্ডে সেলাই করছেন বাসবদত্তা। মনের চিন্তাগুলিকে গুছিয়ে নিচ্ছেন, গান শুনছেন, পরিকল্পনা করছেন। হয়তো স্বপ্ন দেখছেন সাংসারিক জীবনে সফলতার। সেলাই শেষে শক্ত গিট দিচ্ছেন। ঘুমিয়ে পড়েন অবশেষে।


সাত.

৫৫ মিনিট, ঋত্বিকের কর্মস্থল কঠিন কঠোর পরিশ্রমের। লোক সংখ্যা কম। একা হাতে ঝাড়া-মোছা রঙ দেওয়া। ছাপা কাগজে প্রোডাকশন পর্যন্ত তাকে গুনে নিতে হয়। মাঝরাতে বড়ো রাস্তায় ফাঁকা বাতাসে দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেন। দেখেন একপাল ছাগল নিয়ে যাচ্ছে দুই বালক। এই হেঁটে চলা ছাগলেরা রাতের অন্ধকারে প্রস্তুত হবে। উঠবে আগামীকাল সুদৃশ্য খাবার থালায়। মানুষের জীবন চক্রে এদের জীবন বাধা পড়ে গেছে। আদিম যুগে তবুও এদের স্বাধীনতা ছিলো। নিজের মতো বনে-জঙ্গলে মাঠে-ময়দানে চরে বেড়াতো। এখন জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত লাভা-লাভের নিবিড় বন্ধনে বাধা।


৫৯ মিনিটে মশারির মধ্যে বাসবদত্তা। দূরে বাচ্চার কান্নার শব্দ। ঘুম ভেঙ্গে যায়। মা হওয়ার আকুতি মেয়েদের মনের ভিতরে থাকতেই পারে। বিছানা থেকে নেমে সময় দেখা। তারপর একসময় সকাল আসে। কাক ডাকা ভোর। ফোন বাজতে থাকে। স্বামী রিঙ করে তাকে ডেকে দিচ্ছেন। ঘুম ভেঙে যায়। রাতের বেলা একা ঘরে থাকার অভ্যাস তাকে রাত কাটাতে সাহায্য করে। এক ঘণ্টায় রাত শেষ। ঋত্বিক মেশিন বন্ধের প্রস্তুতি নেন। ধুয়ে-মুছে সাফ করেন মেশিন হাত সবকিছু। টেলিফোন করা মানে আর একজনকে ডেকে দেওয়া এবং বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। বাসবদত্তা টেলিফোন ধরেন না। কিন্তু উঠে সাংসারিক প্রস্তুতি নিতে থাকেন। কাক ডাকা ভোর। মেট্রো রাস্তা। একে একে আলো নিভতে থাকে। এক ঘণ্টা চার মিনিট ২০ সেকেন্ডে তাওয়া গরম হচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক। ভাজতে যখন হবে, তখন তাওয়া গরম করতে হবে; পানি ফুটতে ফুটতে বাষ্প হয়ে যায়, তেল তেতে রঙ বদলায়। জীবন পরিক্রমায় তপ্ত হওয়ার অনুভূতি বহুমুখি হলেও এখানে তা বেশ অর্থবহ। আর এই অর্থ যে যার মতো করে মনে মনে সাজিয়ে নেওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত ও তাৎপর্যপূর্ণ। সুনিপুণ হাতের রান্না, খাবার গুছিয়ে রাখা ও রুটি বানানোর শৈল্পিক ভাষা মুখের ভাষার প্রয়োজনীয়তাকে ম্লান করে দেয়।


এক ঘণ্টা সাত মিনিট ৫৪ সেকেন্ড, ঋত্বিক সাইকেলে ফিরছেন। দুই চাকার উপর ভারসাম্য বজায় রেখে সাবলীল গতি। ভোরের মেগাসিটি। ঘরে স্ত্রী, দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গা ধুয়ে ঘরে গেলেন। মেঝেতে ভেজা পায়ের দাগ; তা মিলিয়ে যাচ্ছে। চুল মুছছেন। কাপড় মেলে দিচ্ছেন। দর্শক হয়তো এই কাপড় মেলার দৃশ্য আর দেখবে না। এই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কাপড় মেলা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, দৈনন্দিন জীবনাচরণের রুটিন বজায় রাখার দৃশ্য। জীবন সাজানোর, স্পর্শকাতর অঙ্গ সুরক্ষার, লজ্জা নিবারণের তথা মৌলিক চাহিদার একটি উপাদান হলো কাপড়; তার বহুবার ব্যবহার দর্শককে সাদামাটা জীবনযাপনের সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। এই দম্পতি যে গতিশীল মানুষ তা তাদের এই আচরণ থেকে প্রমাণ হয়। তাদের এই কাপড় যতোবার দেখি, ততোবার বুঝতে পারি, বেঁচে থাকার জন্য একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বাইরে তারা যেতে পারেননি। ঋত্বিক সাইকেলে ফিরতে থাকেন। সাইকেলের প্যাডেল চলছে। একটা যান্ত্রিক শব্দ হচ্ছে। দিয়াশলাইয়ের আগুনে ধুপকাঠি জ্বালানোর পুনরাবৃত্তি। এবার বাসবদত্তা। আবার ভক্তির প্রণাম।


আট.

এক ঘণ্টা ১১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড, সানাই বাজে। ঋত্বিকের আগমন। পাখির শব্দ। রোমান্টিক দৃশ্য। নায়ক নায়িকার মিলন। এক নৈসর্গিক স্বপ্নের আবহ। স্বামী-স্ত্রীর দেখা এক ঘণ্টা ১৩ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে, স্বর্গের পারিজাত বা বেহেশতের গুলবাগিচায় তারা একসঙ্গে হাঁটতে থাকে। তারা জানে, তাদের এই মিলন জাগতিক বাস্তবিক; কোনো স্বর্গীয় বিষয় নয়। সুতরাং ঘড়ির কাটার সময় শাসন তারা হাসি মুখে মেনে নেয়। পরিতৃপ্ত নারী স্বামীকে চা এনে দেন, চিরুনি নিয়ে চুল আচড়ান, হাসি হাসি মুখ নিয়ে জীবনযুদ্ধে আবারও নেমে পড়েন। শাড়ি ঠিক করেন। পাখি ডাকে। স্বামী শাড়ির ভাজে সেপটিপিন লাগিয়ে শক্ত করে দেন। এ বন্ধন যেনো না খোলে। হাসি মুখে স্ত্রী বেরিয়ে পড়েন। কুয়াশার রাস্তায় গলি পথে হাঁটেন তিনি। আশার কথা হলো, গলির মুখে উজ্জ্বল আলো। হতাশার কথা হলো, এই দম্পত্তির দৈনন্দির রুটিন থেকে দর্শক যা জানে তাহলো, এ রকম মিলন তাদের কল্পনার কাঙ্খিত স্বপ্ন। বাস্তব হওয়া অসম্ভব। এতো ব্যস্ততার মধ্যেও যদি এতোটুকু মিলন হতো, তবুও তা কিছুটা মানা যেতো। সানাইয়ের সেই জীবন জাগানো সুর বাজতে বাজতে কলাকুশলীদের নাম ভেসে যেতে যেতে চলচ্চিত্রের পরিসমাপ্তি। দর্শক মনে যে স্বপ্ন, যে আশা জাগে, সে আশাহতের বেদনা বিশ্ব মন্দার এই মেগাসিটির জীবন থেকে উড়ে যেতে চায়। মনের কোণে যদি সনাতন দার নাম উঁকি মারে তবে অবশ্যই তার ঘরের পাঁচ-সাত বছরের সন্তানের জন্যে, আগামী প্রজন্মের মনুষ্য প্রজাতির জন্যে, একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার সংকল্প মনে জাগে।


বিশ্ব মহামন্দায় যে ঘটনা ঘটে তার প্রতিক্রিয়ায় তিলে তিলে গড়ে ওঠা মানব সভ্যতা হুমকিতে পড়ে। যেমন পড়েছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে। অ্যান্টি রোমান্টিক শার্লবোদলেয়ার আকাশে দেখেছিলেন পিচঢালা কালো রঙ। আনন্দের বিপরীতে জীবনকে দেখেছিলেন, যন্ত্রণার আধার হিসেবে। নারীকে দেখেছিলেন যৌনদাসী হিসেবে। আর আফসোস করে পুরুষ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘দাসীর দাসত্ব করে নরকের কীট। তার বন্ধুদের প্রিয় আড্ডায় কেউ বাবার মাথার খুলিটিকে পানপাত্র বানিয়ে পান করতেন আর গল্পে গল্পে বর্ণনা করে বলতেন, বাবাকে সে কীভাবে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু উপহার দিয়েছিলো সেই কাহিনি।


নোবেল বিজয়ী আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য সান অলসো রাইজেজ, ১৯২০ এর পর থেকে এখন পর্যন্ত সাড়া জাগানো উপন্যাসগুলির অন্যতম। এখানে লেডি ডাফ টয়াইসডেনকে নিয়ে লেখকের অভিজ্ঞতার অনুভূতির কাহিনিতে নায়িকা লেডি ব্রেট এশলেকে কেন্দ্র করে আবর্তিত জ্যাক বার্ন, পেড্রো রোমারিও, রবার্ট কোহন ও মাইক ক্যামবেল। এদের ঘিরেই গড়ে উঠেছে ফ্রান্সের সাগর পাড়ে প্যাম্পলোনায় ষাড়ের লড়াই কেন্দ্রিক ফিয়েস্টার কাহিনি। পঙ্গু সৈনিক জ্যাক প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তার পুরুষ অঙ্গটিই হারিয়ে ফেলেছেন। যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত পুঁজিবাদ কী তার শক্তি হারাইনি? গোটা পুরুষ জাতিই আজ পঙ্গু ও পরাজিত। লেডি ব্রেট পছন্দ করে জ্যাককে। তার সঙ্গে থাকে। কিন্তু যৌন সম্পর্ক যার সঙ্গে সম্ভব নয়, সে তাকে বিয়ে করবে কী করে? ফলে বেছে নেয় পতিতার জীবন। পছন্দের পুরুষদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে তার ভাল লাগে।


আর্নেস্ট হেমিংওয়ের শক্তিশালী ভাষার আকর্ষণীয় সিনেমাটিক শারীরিক বর্ণনায় লেডি ব্রেট পাঠককে আকৃষ্ট করে এবং পাঠক ধারণা করে নেয়, যে কাজের যে যোগ্য, তাকে সেই কাজই মানায়। তাকে দোষ দেয় না। বরং জ্যাক বেশ্যার দালালি করছে মনে হলেও বিস্ময় বোধ করেন না কেউ। কাহিনির নায়ক যে কে, বুল ফাইটার পেড্রো রোমারিও, জ্যাক বার্ন, বক্সিং এ সেরা রবার্ট কোহন নাকি প্রচুর টাকার মালিক মাইক ক্যামবেল, বোঝা দায়। লেডি ব্রেট পছন্দ করে পেড্রোকে। তার সঙ্গে যৌন সম্পর্কে সে সুখি; কিন্তু তার সঙ্গে তার বয়সের ব্যবধানকে বড়ো করে দেখছে সে নিজেই। এবং তাকে বিয়ে করার বিষয়টি নাকচ করছে। অবশ্য কাহিনির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব অন্য কথা বলে। কথোপকথনে লেডি ব্রেট বুঝে নিয়েছিলেন, এই তরুণকে যদি তিনি বিয়ে করেন, তবে তার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে। বিয়ের চেয়ে স্বাধীনতা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই জ্যাক হলো তার জন্য নিরাপদ পুরুষ যার কোনো দাবি-দাওয়া নেই। কারণ তার পুরুষত্বই নেই। টেলিগ্রাম করে ডেকে আনেন তাকে। তিনি পেড্রো রোমারিওকে সর্বোচ্চ চেষ্টায় সন্তুষ্ট করেছেন। তিনিই হোটেলের পাওনা মিটিয়েছেন। তার চাহিদা পূর্ণ করেছেন। অনেক টাকাও দিতে চেয়েছিলেন। তিনি নেননি। ব্রেট অবশেষে মাইককে বিয়ে করবেন। জ্যাককে সব ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ শুধু আত্মিক ভালোবাসা ব্রেটকে তুষ্ট করতে পারে না। ফিল্ডিং এর কথাটা মেনে নেওয়াই ভালো-‘যুদ্ধ হলো ভালোবাসার মৃত্যু। যুদ্ধের পরে আর রমণীকে ভালোবাসা যায় না। তাকে কোনোকিছু দিয়ে সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা সবাই হারিয়েছে। বক্সার কোহন তার শক্তির প্রদর্শনে লেডি ব্রেটের ভালোবাসা জয় করতে চেয়েছিলো। যুদ্ধ পূর্ববর্তী রোমান্টিক ধারণা যুদ্ধের পরে অচল; সে কথা বুঝতে তার অনেক সময় লেগে যায়। ব্রেট কার সঙ্গে শোয় তা নিয়ে ধনকুবের মাইক ক্যামবেল বিব্রত নন। বোতলের মদ কে খেলো তা নিয়ে তিনি ভাবিত নন। পান করার সময় কেবল তার মদের ঘাটতি না পড়লেই হলো।


আসা যাওয়ার মাঝে যুদ্ধোত্তর কাহিনি নয়, কিন্তু অর্থনৈতিক মহামন্দা মানুষকে কী পরিমাণ পঙ্গু করেছে, তার প্রতিচ্ছবি শ্রমিক নেতার বর্ণনার মধ্যে সুস্পষ্ট। কারখানা বিনা নোটিশে বন্ধ ঘোষণা করায় অর্থ সঙ্কটে সনাতন দা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। পরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই। চারিধারে বিক্ষোভ স্লোগান, কিন্তু সবাই চলছে স্রোতের শেওলার মতো। ঋত্বিকদের বেছে নিতে হচ্ছে যান্ত্রিক জীবন। তাও বড়ো অনিশ্চিত। সেই সঙ্কটটা কিন্তু সরাসরি উঠে আসেনি। বুঝে নিতে হচ্ছে। নোবেল বিজয়ী ও মরণোত্তর পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া নাট্যকার ইউজিন ওনিলের ট্রাজেডি ‘দ্য হ্যারি অ্যাপ এর কথা না বললেই নয়। শারীরিক শক্তিতে বলিয়ান প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা ইয়াঙ্ক জাহাজের ফোরম্যান। কয়লার ইঞ্জিনে তিনি কয়লা যোগান দিচ্ছেন দলবল নিয়ে। ইঞ্জিনিয়ারের বার বার গতি বাড়ানোর সাঙ্কেতিক ঘণ্টা ধ্বনির তাগিদে বিরক্ত হয়ে অভিশাপ দিতে দিতে কাজ করে তারা। সেখানে হাজির হয় পুঁজিপতি তথা শিল্পপতির সুন্দরী নন্দিনী মিলড্রেড ডগলাস। তিনি জাহাজ ঘুরে আনন্দ খুঁজছিলেন। তিনি শক্তিশালী ঘর্মাক্ত কর্মচঞ্চল লোমশ দেহের ইয়াঙ্ককে দেখে আনন্দের পরিবর্তে ‘ওহ কী ভয়ঙ্কর লোমশ গরিলা বলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ইয়াঙ্ক তার এই মন্তব্যে আঘাত পান।


পুঁজিপতিরা মানুষকে জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে তুলনা করে ভেবে, তিনি অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগতে থাকেন। জাহাজ থেকে ফিরে এসে তিনি যোগ দেন শ্রমিক সংগঠনে। সেখানে তিনি পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে চান। কিন্তু তারা নিয়মতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী। তার চিন্তাকে তারা গ্রহণ করে না। ইয়াঙ্ক অবশেষে চিড়িয়াখানায় গরিলার খাঁচায় গিয়ে তার সঙ্গে কুলাকুলি করে আত্মযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পান। পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের এই অস্তিত্ব সঙ্কটকে যে ব্যাখ্যাই দিই না কেনো, এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার রাস্তা তার সামনে কিন্তু এখনো আসেনি।


এখন পুঁজিবাদের চরম সঙ্কটকাল। সমাজ-বাস্তবতায় জীবনচিত্র আটকে আছে। বর্তমান সমাজ-বাস্তবতার সঙ্কট তুলে ধরার সেই প্রচেষ্টা সৃজনশীল শিল্প কর্মের সর্বত্র। সঙ্কট উত্তরণের আশাবাদও রয়েছে সাথে সাথে। শিল্পকলায় সমৃদ্ধ শ্রীজিৎ মুখার্জীর নির্বাক রোবটিক জীবনকে ট্রাজেডির পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। রক্তপাত তথা মৃত্যুতে চলচ্চিত্রের শেষ হয়েছে। বিয়োগাত্মক বেদনা ও বিষাদ মানুষের মনকে নৈতিক অনুধাবনের দিকে ধাবিত করে। আসা যাওয়ার মাঝেকে সেদিক দিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী কাহিনিচিত্র না বলে পারছি না। এখানে আছে পুঁজি বাজারের সঙ্কট এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন।

নয়.

আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের আসা যাওয়ার মাঝে চিত্রনাট্যটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কথোপকথন বিযুক্ত কাহিনি এগিয়েছে পর্যায়ক্রমে। ২৪ ঘণ্টার কাহিনি। নায়ক-নায়িকা আছে, কিন্তু এখানে নেই কোনো খলচরিত্র। বলা যায়, সময়ের বাস্তব পরিস্থিতি এখানে খলনায়কের ভূমিকায় আসীন। ক্ল্যাসিক নাটক বা সেনেকান ট্রাজেডি বা শেক্সপিয়ারের নাট্য ফর্ম বা আধুনিক কালের ওনিলের নাট্য ফর্মের সঙ্গে এর বিশেষ মিল নেই। নাটকের কাহিনি বিনির্মাণের চিরাচরিত ধারার সঙ্গেও নেই মিল। তবু এখানে প্লট ও সাব-প্লট আছে চিরাচরিত ধারার মতো শক্তিশালী ভূমিকায়। বিয়োগাত্মক পরিণতির বদলে আছে মিলনাত্মক চিত্রায়ণ; তবু একে কমেডি বলা যাচ্ছে না।  নেই কোনো রক্তপাত তবু খানিকটা ট্রাজি-কমেডি। নানাভাবে পুরস্কার পাওয়া এই চলচ্চিত্র ঢালিউড, গুজরাটি, তামিল বা মুম্বাইয়ের মারপিট চলচ্চিত্র নয়। তবু পোয়েটিক জাস্টিস বা যৌক্তিক কাহিনি বিন্যাসের অস্পষ্টতা দর্শককে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। যেমন কাহিনি শুরু হয়েছে সকালে, বাসবদত্তা প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছেন কর্মস্থলে। তার বেরোবার অনেক পরে বাড়িতে ফেরেন ঋত্বিক। আবার সন্ধ্যায় তিনি বেরিয়ে রাত নয়টায় কাজে যোগ দেন। ফেরেন সকালে। তাহলে সকালে বাসবদত্তা ও ঋত্বিকের যে কাক্সিক্ষত স্বপ্নময় মিলন দৃশ্যের উপস্থাপন করা হলো তা কি শুধুই স্বপ্ন? নাকি মহামন্দার এই যুগে কর্মক্ষেত্রে ছুটি নেওয়া বা ফাঁকি দেওয়ার ব্যবস্থা নেই?


আসা যাওয়ার মাঝে শুধু একটা চলচ্চিত্র বললে ভুল হবে; সফল সৃষ্টিশীল শিল্পকর্ম। কথোপকথন বিহীন একটি শক্তিশালী কাহিনিচিত্র। প্রতীকী প্রতিবাদ প্রতিরোধ। মুক্তবাজার অর্থনীতির বিষাক্ত ছোবলে সাধারণ মানুষের মর্মবেদনা মরমী মানুষের মর্মে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা। পুঁজিবাদের অতি মুনাফা তথা শ্রম শোষণের নিগূঢ়ে বাধা বাজার ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে নির্বিচার বেকারত্ব, শ্রমিক ছাঁটাই, মেট্রোজীবনের কর্মহীনতার যন্ত্রণা ও আতঙ্ক। যুগযন্ত্রণা তথা বাজার ব্যবস্থার ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মহামন্দা, পুঁজিবাদের চরম পরাজয় মানুষকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। টমাস আলভা এডিসন থেকে এ পর্যন্ত আসা চলচ্চিত্রের গতিশীল যে ইতিহাস, তার চলচ্চিত্রিক পথ পরিক্রমার মধ্যে সংযুক্ত হয়েছে আসা যাওয়ার মাঝে। এর মধ্যে রয়েছে সুর, রঙ, আলো-ছায়া ও বিষয়কে পরিপাটি করে সাজানোর নান্দনিক উদ্যোগ। গণমানুষের কথা, সমাজের সবকিছু। সমাজকে ভেঙ্গে-চুরে সবধরনের গণ্ডিবদ্ধতার বাইরে যাওয়ার জন্য সেই গণমানুষের প্রাণে সচেতন প্রাণ যোগ করার এই উদ্যোগ অবশ্যই সৃষ্টিশীল মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। চলচ্চিত্রের সঙ্গে যারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাদের জন্য আসা যাওয়ার মাঝে হবে পাথেয়; সুরের শিক্ষা ও সাধনায় যেমন কণ্ঠের গান হয়ে ওঠে অনন্য সাধারণ, আবেদনময়ী ও বিশ্বজনীন। 


লেখক : ফারুক আলম, সাহিত্যিক ও ছড়াকার। তিনি খুলনার একটি কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়ান। তার প্রকাশিত ছড়ার বই ‘গোলাপ-কাঁটা


falamsmc@gmail.com

 

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. ১৯৩০-এর দশকে কেইনস অর্থনীতিতে এক নতুন চিন্তার সূত্রপাত করেন। যা নব্য-ধ্রুপদী অর্থনীতির পুরনো ধারণাগুলোকে খণ্ডন করে-যেখানে মনে করা হতো মুক্ত বাজার ব্যবস্থা স্বল্প থেকে মাঝারি মেয়াদে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ কর্মসংস্থান প্রদান করবে, যতোক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিকরা তাদের মজুরির পরিমাণের ব্যাপারে নমনীয় থাকবে। কেইনস পক্ষান্তরে যুক্তি দেখিয়েছিলেন, মোট চাহিদা অর্থনৈতিক কার্যকলাপের পরিমাণ নির্ধারণ করে এবং অপর্যাপ্ত মোট চাহিদা দীর্ঘ সময়ের জন্য উচ্চ বেকারত্ব সমস্যা তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভের পরবর্তী সময়ে প্রধান পশ্চিমা দেশগুলো কেইনস-এর অর্থনৈতিক নীতির ধারণাগুলো গ্রহণ করে। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে কেইনসিয়ান অর্থনীতির সাফল্যের কারণে প্রায় সব পুঁজিবাদী সরকার এর নীতিগত পরামর্শগুলো অনুসরণ করা শুরু করে।

কেইনসকে আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম জনক ও বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে টাইমস ম্যাগাজিন কেইনসকে বিংশ শতাব্দীর ১০০ গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেয় এই বলে যে, ‘সরকারের উচিত অর্থ আয়ের আগেই ব্যয় করা-তার এই বৈপ্লবিক ধারণাই সম্ভবত পুঁজিবাদকে রক্ষা করেছে।

২. টি এস এলিয়টের ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড কবিতার ১৬৪তম লাইন থেকে নেওয়া। অনুবাদ লেখকের।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন