Magic Lanthon

               

তাসনিয়া মিন্নি

প্রকাশিত ০৬ জানুয়ারী ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

নিভৃতে থাকা হার না মানা ‘অগ্নিকন্যা’ মালতি দে

তাসনিয়া মিন্নি


ধন্য ধন্য বলি তারে

পরিবারের অধিকাংশ সদস্য চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত, এমন ঘটনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে বেশ বিরল; তাও আবার সেই পরিবারের নেতৃত্ব দিয়েছেন একজন নারী। যিনি সংসার থেকে কর্মক্ষেত্র, সব দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। এর আগে ঢাকাই চলচ্চিত্রে অভিনয়, প্রযোজনাসহ অন্য অনেক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ছিলো বটে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই এসেছিলেন স্বামীর হাত ধরে। কেউ এসেছিলেন শখের বশে, আবার কেউ নিজেদের থমকে যাওয়া অভিনয়জীবনে নতুন গতির সঞ্চার করতে। তবে তিনি এসেছিলেন চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে। স্বামীর হাত ধরে কিংবা শখের বশে নয়, চলচ্চিত্র নির্মাণের নেশা থেকেই পার করে দিয়েছেন গোটা জীবন। চলচ্চিত্রশিল্পের উত্থান-পতনেও নিয়েছেন নানা পরিকল্পনা। তিনি চলচ্চিত্রের প্রতি এতোটাই আকৃষ্ট ছিলেন যে, বিনিয়োগ ফেরত নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না, বরং চলচ্চিত্র-নির্মাণ, দর্শক দেখে সেটা থেকে নতুন কিছু পাবে-এটাই ছিলো তার আরাধ্য। যিনি একাধারে ছিলেন কণ্ঠশিল্পী, অভিনয়শিল্পী, প্রযোজক, পরিবেশক ও বুকিং এজেন্ট! চলচ্চিত্রজগতে সবার কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘দিদি’ হিসেবে। বিস্ময় জাগানো এ নারীর নাম মালতি দে।

অনেক সময় মালতি দের পরিবারের কোনো সদস্যের পরিচালিত ও প্রযোজিত কোনো চলচ্চিত্র ভালো ব্যবসা না করলে তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, ‘এটা ব্যবসা করেনি তো কী হয়েছে? মানুষ তো সিনেমাটাকে ভালো বলেছে। টাকা এটাতে ওঠেনি, সামনেরটায় ঠিক উঠে আসবে।’ এভাবেই সৃষ্টির আনন্দে আবার মেতে উঠতেন, কিন্তু অবিচল থাকতেন নিজের যেকোনো সিদ্ধান্তে। ঢালিউডের প্রথম নারী পরিবেশক ও বুকিং এজেন্ট মালতি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ১১ নভেম্বর জীবনমঞ্চ ত্যাগ করেছেন। রেখে গেছেন তার বৈচিত্র্যময় জীবনের অসংখ্য সব গল্প; হয়েছেন অসংখ্য নারীর পথপ্রদর্শক।

একজন মালতি দে

মালতি দে বিংশ শতকের প্রথম দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাথাভাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন (তবে ভোটার আইডি অনুযায়ী তার জন্ম ১৬ ডিসেম্বর ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি যখন ১৪Ñ১৫ বছরের কিশোরী তখন তার বিয়ে হয় চাঁদপুরের অজিত কুমার দে’র সঙ্গে। অজিত কর্মসূত্রে থাকতেন কলকাতায়, পাশাপাশি তিনি ফটোগ্রাফার হিসেবেও কাজ করতেন; ছিলেন ভীষণ সংস্কৃতিমনাও। বিয়ের পর মালতিকে নিয়ে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। সেখানে অজিতের উৎসাহ ও সহযোগিতায় তিনি গান শেখা শুরু করেন বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে’র মামা কানা কেষ্ট’র কাছে। মালতির গানের প্রতি আগ্রহ ও একাগ্রতা দেখে গুরু কেষ্ট তাকে আলাদাভাবে তালিম দেন। একসময় তার গান রেকর্ড করারও আগ্রহ প্রকাশ করেন গুরু। গানের গুরু কেষ্টর কাছে সেসময় চলচ্চিত্রজগতের অনেক মানুষ আসা-যাওয়া করতো। তাদেরই একজন চলচ্চিত্রে অভিনয় করার জন্য মালতিকে প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্তে অজিতও উৎসাহ দেন। অবশেষে ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র জাগ্রতভারত-এ অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশ করেন মালতি। সেসময় মোট দুইটি চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি।

চলচ্চিত্রে মালতির অভিনয়ের খরব চাঁদপুরে শ্বশুরের কানে আসতে খুব বেশি দেরি হয় না। কিছুদিন পর মালতির শ্বশুর ছেলে অজিতকে চিঠিতে জানান, ১৫ দিনের মধ্যে বউ নিয়ে দেশে না আসলে তাকে ত্যাজ্যপুত্র করা হবে। ঘরের লক্ষ্মীকে চলচ্চিত্রজগতে নামিয়ে অজিত ভীষণ ভুল করেছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। ফলে বাধ্য হয়ে মালতিকে নিয়ে সবকিছু ছেড়ে অজিতকে চাঁদপুরে ফিরে আসতে হয়। তখন কোনো সন্তানকে ত্যাজ্যপুত্র করা সমাজের চোখে অত্যন্ত অপমানের ছিলো।

যাহোক, চাঁদপুরে অজিত পরিচিত ছিলেন গোবিন্দ নামে। অন্যদিকে মালতি তার স্বামীর সূত্র ধরেই পরিচিত হয়ে ওঠেন মিসেস গোবিন্দ নামে। অভিনয় ছেড়ে কলকাতা থেকে চাঁদপুরে ফিরে আসলেও গান ছাড়তে পারেননি মালতি। তবে তাতে বিশেষ কোনো আপত্তিও ছিলো না শ্বশুরের। ফলে একসময় চাঁদপুরে প্রায় প্রতিটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই নিয়মিত শিল্পী হয়ে উঠলেন তিনি। একই সঙ্গে প্রশাসনের বড়ো বড়ো কর্মকর্তার ছেলে-মেয়েদের তিনি গান শেখানো শুরু করেন। এদিকে অজিত চাকরি ছেড়ে এসে নাটক, যাত্রা নিয়েই পড়ে থাকতেন; সঙ্গে চাঁদপুরে ইত্তেফাক পত্রিকায় স্টাফ ফটোগ্রাফার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সংসারে তার মন না থাকায় যাবতীয় খরচ মালতিকেই বহন করতে হতো। এর কিছুদিন পরে অজিত ‘মায়া স্টুডি’ (মালতির ডাকনাম মায়া) নামে চাঁদপুরে একটি ফটোগ্রাফিক স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এই স্টুডিও ও গান শেখানোর টাকা দিয়েই সংসার ও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন মালতি।

কলকাতা থেকে ফিরে আসার বছর চারেক পরে ইহলোক ত্যাগ করেন অজিতের বাবা, মানে মালতির শ্বশুর। পরে সুযোগ বুঝে কিছুদিনের মধ্যেই স্বামী অজিত স্টুডির কাজ ছেড়ে পুরোদমে নেমে পড়েন গান, নাটক, যাত্রা ও পালাগানে। এমনকি বাড়িতে স্থানীয় মেথরদের নিয়েও তিনি গানের আসর বসাতেন। পাশাপাশি এ সময় চাঁদপুরে অজিত নিজেই মঞ্চ নাটক পরিচালনা শুরু করেন। অজিত পরিচালিত এমনই একটি মঞ্চ নাটকে অভিনয় করতে ঢাকা থেকে চাঁদপুরে যান অনুরাধা ও মিলন সেন নামে তৎকালীন দুই অভিনয়শিল্পী। তারা মালতির গানে মুগ্ধ হয়ে তাকে ঢাকায় এসে রেডিও-টেলিভিশনে অডিশন দেওয়ার পরামর্শ দেন। অজিতও তাতে রাজি হয়ে যান। কারণ তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংস্কৃতিপ্রেমী ও মালতির একমাত্র অনুপ্রেরণা। তিনি এতোটাই সংস্কৃতিপ্রেমী ছিলেন যে, এ বিষয়ে মালতির বড়ো ছেলে অশোক দে বলেন,

মুক্তিযুদ্ধে পালিয়ে যাওয়ার সময় নৌকায় করে যখন যাচ্ছিলাম, তখন আমার বাবা হাতে করে ব্রিফকেসের মতো দেখতে তার প্রিয় হারমোনিয়ামটা নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন। মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কেনো নেও?’ তখন তিনি বলেছিলেন, ‘সেটা তুমি বুঝবা না।’ মানুষের চাপে পথে যখন আমি পা পিছলে নৌকা থেকে পানিতে পড়ে গেলাম, তখন আমার বাবা এতোটুকু বিচলিত হননি। সবাই তাড়াহুড়ো করে আমাকে উঠাতে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু আমার বাবা হারমোনিয়াম নিয়ে চুপ করে বসেছিলেন। নৌকার অন্য যাত্রীরা বকাবকি করলে আমার বাবা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি জানি, আমার ছেলে পড়ে গিয়েছে তাকে আপনাদের কেউ না কেউ তুলে আনবেই। কিন্তু আমার হারমোনিয়ামটা পড়ে গেলে আমি আর পাবো না।’ ২০০২ সালে বাবা যেদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, সেদিন সকালেও তিনি ওই হারমোনিয়াম বাজিয়ে কীর্তন গেয়েছেন।

পেশাদার কণ্ঠশিল্পী হওয়ার ইচ্ছায় অজিত-মালতি ছেলে-মেয়েদের গ্রামে রেখে ঢাকায় এসে অনুরাধার বাসাতে ওঠেন। পরে রেডিও-টেলিভিশনে অডিশন দিয়ে মালতি গান গাওয়ার সুযোগও পেয়ে যান। তারপর সুযোগ বুঝে সন্তানদেরও ঢাকায় নিয়ে আসেন তারা। কিন্তু রেডিও-টেলিভিশন থেকে যে সামান্য আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চলতো না মালতির। তখন বিভিন্ন মানুষের পরামর্শে ও স্বামীর সম্মতিতে তিনি আবারও অভিনয় জগতে পা বাড়ান। তবে ততোদিনে তার বয়স অনেকটা পেরিয়ে গেছে। ফলে ভাবি কিংবা মা’য়ের চরিত্রে অভিনয় করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে মালতিকে।

মালতি দে অভিনীত ঢাকায় প্রথম চলচ্চিত্র জহির রায়হানের শেষ পর্যন্ত। এরপর অভিনয় করেন ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম-এ। এ চলচ্চিত্রে কবরীর মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন তিনি। জহির রায়হানের সুয়োরাণী দুয়োরাণী, খান আতার জোয়ার ভাটা, সুখ দুঃখ, আপন পর-এ অভিনয় করেও তিনি বেশ সুনাম কুড়ান। এছাড়া শীত-বসন্ত, আঠারো পেরিয়ে, অন্ধ অতীত, অশ্রু দিয়ে লেখা, মমতা, স্বপ্নডিঙ্গা, চম্পাকলি, অন্তরঙ্গ, বাংলার মুখ ও রাতের পর দিনসহ প্রায় ৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন মালতি।

মুক্তিযুদ্ধ ও ‘যাযাবর’ মালতি

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানি বাহিনী যখন বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন মালতি অভিনয় আর কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে স্বামী অজিত থাকতেন গানবাজনা আর ফটোগ্রাফি নিয়ে। কিন্তু সনাতন ধর্মালম্বী হওয়ায় সেসময় তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করে পাকিস্তান সরকার। ফলে গহনা বিক্রির অর্থ শেষ হওয়ার পর বেশ অর্থকষ্টে পড়েন মালতি। তখন তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন চলচ্চিত্রনির্মাতা খান আতা। তিনি অর্থসহ যাবতীয় পরামর্শ দিয়ে অসম্ভব সাহায্য করেছিলেন মালতির পরিবারকে। যেকোনো সমস্যায় পড়লে অজিতকে নিয়ে মালতি প্রায়ই বোরকা পরে চলে যেতেন খান আতার বাড়ি কিংবা অফিসে। মালতি যখন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে খান আতাকে প্রশ্ন করতেন, ‘আপনার এই ঋণ কীভাবে শোধ করবো?’ খান আতা নাকি কেবল হেসে জবাব দিতেন, ‘দেশ স্বাধীন হলে আমার সিনেমায় অভিনয় করে শোধ করে দিও।’

কিন্তু একসময় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। খবর আসে মালতির পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে মিলিটারি ক্যাম্পে অভিযোগ গেছে। যেকোনো সময় পাকিস্তানি সেনারা তাদের বাড়িতে অভিযান চালাতে পারে। ফলে তাদের পালানো ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। এসব শুনে খান আতাও কিছু সাহায্য দিয়ে কিছুদিনের জন্য তাদের আত্মগোপনের পরামর্শ দেন। কিন্তু কোথায় যাবেন সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন মালতি। এই পরিস্থিতিতে প্রতি রবিবার মালতির বাড়িতে যে লোকটা মাংস দিয়ে যেতেন, তিনিই পুরো পরিবারকে আশ্রয় দেন। ওই মাংস বিক্রেতার বাড়ি ছিলো ঢাকার পূর্বাচল এলাকায়। তবে তার মগবাজারের বাড়িতে মিলিটারিরা না আসলেও স্থানীয় নেতারা সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়। তবে পালিয়ে গিয়েও শান্তি পাননি মালতি। মানুষ যখন জানতে পারে তারা সনাতন ধর্মের, তখনই তাদের শঙ্কা আরো বেড়ে যায়। একসময় জীবন বাঁচার তাগিদে পরিবারের সবাই নাম পরিবর্তন করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সঙ্গে মিল রেখে মালতি দে নিজের নাম রাখেন ফজিলাতুন্নেসা, আর অজিতের নাম রাখেন রশিদ পাটোয়ারি। বড়ো ছেলে অশোক দে কামাল পাটোয়ারি ও ছোটো ছেলে উত্তম আকাশের নাম হয় জামাল পাটোয়ারি। অন্যদিকে বড়ো মেয়ে কৃষ্ণা কাবেরি দের নাম হাসিনা পাটোয়ারি ও মেজো মেয়ে শুভ্রা দের নাম রাখেন রেহেনা পাটোয়ারি। আর সেজো মেয়ে একেবারে অল্প বয়সি হওয়ায় তখন তার কোনো নাম রাখা হয়নি। শুধু তাই নয়, পুরো পরিবার তখন পরিচিত মানুষের কাছে নবমুসলিম বলেও নিজেদের পরিচয় দিতো। এমনকি মুসলমান প্রমাণের জন্য অজিতকে সেসময় মুখে দাড়িও রাখতে হয়েছিলো। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আগের বাড়িতে ফিরে আসে মালতির পরিবার। আবার নতুন করে শুরু হয় তাদের চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক জীবন।

অভিনয় থেকে পরিবেশক ও বুকিং এজেন্ট ‘দিদি’

তখন চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয়শিল্পী মালতি। পাশাপাশি চলচ্চিত্রজগতের বাইরেও অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছেন তিনি। একদিন টাঙ্গাইলের একটি প্রেক্ষাগৃহের মালিক মালতিকে অনুরোধ করেন, তার প্রেক্ষাগৃহের জন্য একটি চলচ্চিত্র বুকিং দিতে। মালতি তখন ওই চলচ্চিত্রের পরিবেশকের কাছে গিয়ে প্রেক্ষাগৃহের জন্য বুকিং দিয়ে আসেন। তাড়াহুড়ো করে বুকিং শেষ করে মালতি যখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিলেন, তখন ওই পরিবেশক তাকে আবার ডেকে নিয়ে চলচ্চিত্র বুকিং দেওয়ার জন্য কমিশন হিসেবে এক হাজার টাকা দেন। মালতি তো অবাক! কারণ তিনি তখন জানতেন চলচ্চিত্র বুকিং দিলে কেবল প্রেক্ষাগৃহ মালিকের পক্ষ থেকে দুইÑতিন হাজার টাকা কমিশন পাওয়া যায়। পরে ওই চলচ্চিত্র পরিবেশকের কাছেই তিনি প্রথম জানতে পারেন, মালিক ও পরিবেশক দুই দিক থেকেই কমিশন দেওয়া হয়। এরপর অভিনয়ে কিছুটা ভাটা পড়ায় বুকিং এজেন্ট ও পরিবেশক হিসেবে পথ চলা শুরু করেন মালতি। আর এর মাধ্যমেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম নারী বুকিং এজেন্ট এবং পরে পরিবেশক।

বুকিং এজেন্ট হিসেবে মালতি একসঙ্গে ২০Ñ২৫টি প্রেক্ষাগৃহে কাজ করতেন। শুরুতে অল্প কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহের এজেন্ট হিসেবে থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকার বাইরের অনেক মালিক তাকে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করে। চলচ্চিত্রের লোকজনের সঙ্গে আগে থেকে পরিচয় থাকায় মালতি খুব দায়িত্বের সঙ্গে নির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের কাক্সিক্ষত চলচ্চিত্র নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন। সেসময় দুই হাজার টাকা করে প্রতি সপ্তাহে একেকটা প্রেক্ষাগৃহ থেকে কমিশন পেতেন মালতি। অবশ্য ঈদের সময় এ কমিশন বেড়ে চলচ্চিত্র প্রতি পেতেন ১৫Ñ২০ হাজার টাকা। একই সঙ্গে পরিবেশকদের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট হারে কমিশন পেতেন। ফলে অল্প সময়েই ব্যবসাটা দ্রুত আয়ত্ব করে ফেলেন মালতি। কিছুদিন পর তিনি নিজেও পরিবেশকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এর জন্য প্রথমে তিনি ঢাকার সোনারগাঁয়ে ‘মায়া মহল’ নামে একটি প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন। পরে ব্যবসা ভালো হওয়ায় ঠাকুরগাঁও জেলায় যন্ত্রপাতিসহ ‘মানবী টকিজ’ নামে আরেকটি প্রেক্ষাগৃহ কিনে নেন। এ দিক দিয়ে হিসাব করলে তিনিই হয়তো বাংলাদেশের প্রথম নারী হল মালিক। মালতির এ কর্মতৎপরতা ও চলচ্চিত্রের সব ক্ষেত্রে পদচারণায় স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্র জগতে সবার প্রিয় ‘দিদি’। একই সঙ্গে অভিনয়শিল্পী, পরিচালক, প্রেক্ষাগৃহের মালিকসহ অধিকাংশের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন নির্ভরশীল এক মানুষ। শুরু হয় স্বপ্ন ছোঁয়ার আরেক যাত্রা।

তবে বাইরে এতো ব্যস্ত সময় কাটালেও পরিবারের সব দায়িত্বও কিন্তু মালতি ঠিক পালন করেছেন। পাঁচ মেয়ে দিপালী দে, কৃষ্ণা কাবেরী দে, শুভ্রা দে, শিপ্রা দে ও শুল্কা দে এবং দুই ছেলে অশোক কুমার দে ও উত্তম আকাশকে নিয়ে ছিলো মালতি-অজিতের সংসার। তবে স্বামী অজিতের উদাসীনতায় পুরো সংসারে যেনো মালতিই ছিলেন ত্রাতা। সকালে নিজে গাড়ি চালিয়ে বাজার করে কাজের লোককে সব বুঝিয়ে তারপর বের হতেন কর্মক্ষেত্রে। শুক্রবার পরিবারের সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতেন, সেদিন রান্না করতেন নিজের হাতেই।

ঢাকাই চলচ্চিত্র এবং প্রযোজনায় ‘উত্তম কথাচিত্র’

দিদি হিসেবে খ্যাত মালতি চলচ্চিত্রে অভিনয়, বুকিং এজেন্ট ও পরিবেশক হিসেবে কাজ করতে করতে একসময় সিদ্ধান্ত নিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের। হাতে পর্যাপ্ত টাকা থাকায় কিছুদিনের মধ্যে ‘উত্তম কথাচিত্র’ নামে তিনি একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করে ফেলেন। অনেকেই মনে করে, তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রযোজক। কিন্তু তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, তার আগেও বেশ কয়েকজন নারী প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে অভিনয়শিল্পী সুজাতা তার ‘সুজাতা প্রডাকশনস’ থেকে প্রতিনিধি নামে চলচ্চিত্র দিয়ে শুরু করে পরে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এরপর কবরী, ববিতা, শাবানার নামও উঠে আসে এ তালিকায়।

মালতি প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র সংঘাত। তার এই চলচ্চিত্রটি তেমন ব্যবসা করতে পারেনি। এরপর তিনি প্রযোজনা করেন সতী পুত্র আবদুল্লাহ। যা বেশ ব্যবসা করে। তবে এ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি একটু তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। পরিচালক এ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য মালতির কাজ থেকে প্রায় দুই বছর সময় নিয়েছিলেন। মালতির অভিযোগ, পরিচালক তার ব্যক্তিগত স্বার্থে চলচ্চিত্রটি নির্মাণে অহেতুক বিলম্ব করছিলেন। সেসময়ই মালতি সিদ্ধান্ত নেন, শান্তিতে কাজ ও ব্যবসা করতে হলে নিজের ঘরের নিমার্তা হওয়া প্রয়োজন। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই পরে নিজের ছোটো ছেলে উত্তম আকাশকে গড়ে তোলেন চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে। মায়ের প্রযোজনায় উত্তম আকাশের নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র দুষ্ট ছেলে মিষ্টি মেয়ে। শুধু তাই নয়, মালতি দুই মেয়ে শুভ্রা দে আর কৃষ্ণা কাবেরি দে’কেও বানালেন অভিনয়শিল্পী। মণিমালা আর নিমাই সন্নাসীতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কৃষ্ণা। তবে বিয়ে আর সন্তানের কারণে তার দুই মেয়ে পাঁচ/ছয়টার বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারেনি।

অন্যদিকে বড়ো ছেলে অশোক কুমারকে নিজের সঙ্গে রেখে তার মতোই প্রযোজক বানাতে চেয়েছেন মালতি। কোনো কিছু করার আগে দুই ছেলেকে নিয়ে সার্বিক আলোচনা করে তারপর মাঠে নামতেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি অন্য নির্মাতার চলচ্চিত্র প্রযোজনা করার ক্ষেত্রেও আগে গল্প শুনতেন। যদি কোথাও প্রয়োজন বোধ করতেন, তাহলে সেই গল্পে পরিবর্তন আনতে বলতেন। আবার কোথাও কোথাও যোগও করে দিতেন তিনি। দুই লাখ টাকায় সাত ভাই চম্পার স্বত্ব কিনে রিমেক করেন মালতি; রাজ্জাকের রংবাজ-এর স্বত্ব কিনেও ওমর সানি-মৌসুমিকে দিয়ে বানান রঙিন রংবাজ। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তিনটা ইউনিট নিয়ে এফ ডি সি’র ভিন্ন ভিন্ন স্পটে শুটিং করেছেন মালতি। তবে জীবনের শেষ দিকে স্বপ্নের পুরোটাই ছেড়ে দিয়েছিলেন দুই ছেলের হাতে। মাঝেমধ্যে কেবল খোঁজখবর রাখতেন। কারণ মালতির জীবনের শেষ দিনগুলো চলচ্চিত্রের জন্য খুব সুখকর সময় ছিলো না। ফলে তাদের চলচ্চিত্র-নির্মাণেও ধীরগতি নেমে আসে। তবুও ছেলে উত্তমকে কেবলই ডেকে বলতেন, ‘গল্প লিখো, সিনেমা বানাও। চলুক না চলুক সিনেমা বানাও, একের পর এক সিনেমা বানানো চলবে। আমার ঘরে ছবি বন্ধ থাকবে না।’ যখন শুনতেন এফ ডি সি’তে তার কোনো চলচ্চিত্রের শুটিং চলছে, তখন যেনো শান্তি পেতেন। মালতির প্রযোজিত শেষ চলচ্চিত্র রাজা ৪২০।

মালতি যখন প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ ছিলো বলেই মনে করেন তার বড়ো ছেলে অশোক দে। তার ভাষায়,

ওই সময় কোনো সিনেমা ফ্লপ হলেও তাতে ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা লাভ হতো। সিনেমাটি যখন মুক্তি দেওয়া হতো তখন প্রথম সপ্তাহে কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব ছিলো না সেটা ফ্লপ নাকি হিট! পরের সপ্তাহে সিনেমাহলে দর্শকের সমাগম দেখে বোঝা যেত আসলেই ফ্লপ হলো কিনা। তবে লস মানে একেবারেই লস ছিলো না। সিনেমা বানানোর টাকাটা যেভাবেই হোক উঠে আসতো। কারণ সেসময় সারাদেশে প্রায় ১২০০ সিনেমাহল ছিলো। ফলে কোনো সিনেমা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতো। কিন্তু এখন সেটা চলে না। কারণ এখন মনে হয় সবমিলে দুইশো সিনেমা হল আছে। সে কারণে এখন আর সিনেমা বানানো হয় না। আমরা পরিবারের সবাই সবসময় সিনেমা নিয়েই পড়েছিলাম। জায়গা জমি কেনা আমাদের জন্য তখন কোনো বিষয় ছিলো না। আমরা কোনো কোনো সিনেমায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যবসা করেছি। হয়তো ওই টাকা দিয়ে জমি কিনে রাখলে সেটা এখন কয়েকশো কোটি টাকা হতো। অথচ আমাদের তখন মনে হয়েছিলো, আমরা এখান থেকে কোথাও যাবো না। আমরা অমর থাকবো।

মালতি যে এটা বোঝেননি তা নয়। ফলে এর জন্য প্রায়ই নাকি ছেলেদের বলতেন, এক পেশার ওপর নির্ভর না করে সিনেমা বানানোর পাশাপাশি অন্য কিছু করো। একসময় বড়ো ছেলে ‘অশোক এন্টার প্রাইজ’ নামে একটা ফার্ম করেছিলেন বটে, কিন্তু কিছুদিন পর আবারও তিনি চলচ্চিত্রে ফিরে আসেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন,

আসলে সিনেমাটা নেশার মতো ছিলো। আনন্দে ভরপুর। শুটিং হচ্ছে, গান হচ্ছেআর তার মধ্যে চেয়ার নিয়ে বসে আছি; সেটা বিশাল একটা ব্যাপার, জমিদারি-জামিদারি একটা ভাব। মানুষ চারপাশে দাঁড়িয়ে দেখছে, কী যে ভালোলাগা! সেই ভালোলাগা তো দোকান থেকে কিনতে পাওয়া যাবে না। টাঙ্গাইলের এক গ্রামে একদিন রাত ১০টার দিকে ভাত খেতে বসেছি। তখন গ্রামের লোকদের সঙ্গে সিনেমার গল্প করতে করতে ভোর হয়ে গেছে। শাবানা কীভাবে হাঁটে, শুটিংয়ের পর আর কী করে? রাজ্জাক কী দিয়ে ভাত খায়। এগুলোর উত্তর দিতে দিতেই সকাল। ফলে এই আনন্দ ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়াটা ছিলো অকল্পনীয়।

তবে মালতি যতোদিন কাজ করেছেন সেই সময়টা ছিলো আসলেই অন্যরকম। একসময় ‘উত্তম কথাচিত্র’র পাশাপাশি ‘মা কথাচিত্র’ নামেও আরেকটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান তিনি। ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টির কারণে চলচ্চিত্রনির্মাতা খান আতা মালতিকে ‘বিজনেসম্যান’ হিসেবেই ডাকতে পছন্দ করতেন। কারণ খান আতার ভাষায়চলচ্চিত্রে প্রযোজনা, বুকিং এজেন্ট, পরিবেশক, প্রেক্ষাগৃহ মালিক এতোকিছু কখনোই একজনকে হতে দেখেননি তিনি। ফলে মালতি এতোকিছু কীভাবে একসঙ্গে সামলাতেন, সেটা তার কাছে ছিলো অনেকটা বিস্ময়ের। মালতি দে সবমিলিয়ে প্রায় ২৬টি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন।

বন্ধুর পথে তিনিও একজন পথচারী

মালতি দের জীবনের গল্প পড়ে মনে হতে পারে, তিনি মসৃণ পথ পাড়ি দিয়ে এমন সফল হয়েছেন। কিন্তু আদতে মোটেই সেরকম নয়। তার চলার পথও ছিলো কণ্টকাকীর্ণ। সেই চাঁদপুরে শুরু করেছিলেন তার সেই সংগ্রামী জীবন; আর চলেছে সফল না হওয়া পর্যন্ত। অভিনয়জগৎ ছেড়ে তিনি যখন বুকিং এজেন্ট ও পরিবেশক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন, সে সময়টা ছিলো আরো সংগ্রামের। তবে তিনি কাউকে পরোয়া করেননি। মা সম্পর্কে অশোক বলেন,

আমার মা অনেক কষ্ট করেছেন, নারী হিসেবে প্রথম দিকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। গুলিস্তানে যখন মার অফিস ছিলো তখন পিছন থেকে মানুষ অনেক বাজে কথা বলতো, শিস দিতো। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পথ আটকাতো। অনেকে টিটকারি করে বলতো, ‘ওই দেখ অভিনয় করে ভাত পায়নি, সব ফেলে এখন এই পথে আসছে।’ তবে তিনি ছিলেন অন্য রকম অপ্রতিরোধ্য নারী। কারো কথায় ভেঙে পড়েননি। কারণ তিনি বলতেন, ‘মানুষ যেটাই বলুক, আমি নিজে তো সঠিক পথে আছি।’

তবে সংসারে উদাসীন হলেও মালতিকে সবসময় সাহস দিয়ে গেছেন স্বামী। ফলে পথ চলাটা অনেক সহজ হয়েছিলো, পিছপা হতে হয়নি তাকে। একপর্যায়ে মালতি যখন সফল হলেন, তখন ওই লোকেরাই সবার আগে তাকে সম্মান জানিয়েছে। সম্মান পেয়েছেন চলচ্চিত্রজগতের বাইরের মানুষের কাছেও। আর সেজন্যই তিনি সবার দিদি হতে পেরেছিলেন। বয়সের ভারে তিনি যখন ন্যুব্জ, শয্যাশায়ী; তখনো তিনি কাকরাইলে নিজের অফিসে আসার কথা বলতেন। কারণ মালতি তখনো বিশ্বাস করতেন, তিনি অফিসে বসলে চলচ্চিত্রের লোকজন আসবে, তার সঙ্গে চলচ্চিত্রনির্মাণ নিয়ে কথা বলবে।

এই ছিলো তার ঘটে!

মালতির একসময়ের ব্যস্ততম প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘উত্তম কথাচিত্র’ ও ‘মা কথাচিত্র’ এখন ধীর-স্থির, নিষ্প্রভ। আর চলচ্চিত্র প্রযোজনা হয় না বললেই চলে। অশোক ও উত্তম এখন অনেকটাই কর্মহীন, নিরুপায়। সর্বশেষ ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে তারা নির্মাণ করেছিলেন শাকিব খান অভিনীত রাজা ৪২০। আবার কবে কোন চলচ্চিত্র প্রযোজনা করবেন সেটাও জানেন না তারা। কারণ হিসেবে অশোক বলেন,

বাংলদেশের সিনেমার এ পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রোডিউসার, পরিবেশক, পরিচালকরাই দায়ী; আর্টিস্ট বা টেকনেশিয়ানরা না। আমরা দায়ী হওয়ার মূল কারণ হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যে অ্যাডভান্স হওয়ার কথা ছিলো সেটা হতে পারিনি। সময় মতো সিনেমাহল সংস্কার করিনি। দিনের পর দিন তামিলসহ বিদেশি সিনেমা দেখে আমাদের পরিচালকরা কপি-পেস্ট করেছে। সারাবিশ্ব যে অ্যাডভান্স আমরা সেই বাস্তবতা মানিনি। ফলে পিছিয়ে গিয়েছি। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে আসা কোনো শিক্ষার্থীকে গল্প লেখার পর যদি মাত্র ৫০ হাজার টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে কেনো সিনেমার জন্য গল্প লিখবে? লেখাপড়ার যে মূল্য সেটা দিতে হবে। কারণ এর পিছনে অর্থনৈতিক দিকটিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া বিদেশি সিনেমার সঙ্গে আমাদের তো যুদ্ধ করার দরকার নেই। বিদেশি সিনেমা আসলেও আমরা টিকে থাকবো। পাকিস্তান আমলে উর্দু সিনেমা এখানেও চলেছে কিন্তু বাংলা সিনেমার সঙ্গে পারেনি। আপনি যতোই হাসুন না কেনো, বেদের মেয়ে জোস্নার গান শুনলে আপনার একটু না একটু লাগবেই। কারণ ওটাই আপনার সংস্কৃতি, ওটাই আপনার মূল।

সারাজীবন চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে আসা মালতি দে শেষ জীবনে এসে চলচ্চিত্রের এ পরিস্থিতি কিছুটা আন্দাজ করে গেছেন। বার্ধক্যকালীন নানা জটিলতায় শয্যাশয়ী হলেও নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। তবে ঢাকাই চলচ্চিত্র এতোটা পরিবর্তন হয়ে যাবে সেটা হয়তো তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। মৃত্যুর কিছুদিন আগে হঠাৎই ছেলে অশোকের কাছে বায়না করেন, একদিন কিছু সময়ের জন্য হলেও অফিসে যাবেন। মালতি গিয়েছিলেন। চারদিকে টেবিল-চেয়ার সাজানো দেখে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এসব জায়গায় চেয়ার টেবিল থাকলে ছবির প্রিন্ট রাখবি কোথায়?’ ছেলে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘মা, সেসব তো পেনড্রাইভে চলে গেছে।’ মালতি কেবল অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘এটা আবার কবে হলো! কী জানি কী।’ মালতি আর কোনোদিন অফিসে যাননি। যতোদিন বেঁচে ছিলেন বেশিরভাগ সময়ই চুপ করে থাকতেন। জীবনের সবচেয়ে ভালোবাসার স্বপ্নটি ভেঙে গেলে হয়তো এমনই হয়!

লেখক : তাসনিয়া মিন্নি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করে এখন চাকরি খুঁজছেন।

tasniyaminnimcj@gmail.com

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : প্রবন্ধটি লেখার ক্ষেত্রে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন মালতি দে’র বড়ো ছেলে অশোক কুমার দে।


বি. দ্র. প্রবন্ধটি ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই ১৫তম সংখ্যায় প্রকাশিত। 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন