শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
নেপালি চলচ্চিত্রের ‘জীবনবৃত্তান্ত’ কথক যখন ‘ঝোলা’
শফিকুল ইসলাম

হিমালয় কন্যার অন্য উপাখ্যান
মাউন্ট এভারেস্টের দেশ হিসেবে পরিচিত নেপাল এশিয়ার অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। ৮০ ভাগ হিন্দু জনগোষ্ঠীর ছোটো এই দেশটির বৈচিত্র্য এর অনন্য বৈশিষ্ট্য। জাতীয় ভাষা নেপালি হলেও একশো ২৫ ধরনের নৃগোষ্ঠীর এই দেশে প্রচলিত ভাষার সংখ্যা প্রায় একশো ২৩টি।১ জনগোষ্ঠী ও ভাষার বৈচিত্র্যের এ ছাপ তাই স্পষ্ট হয় এদেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে। দেশটির উত্তরে চিন, অন্য তিন পাশে ভারত। এই দুই দেশের মানুষেরও বসবাস সেখানে রয়েছে। তাই চিন-ভারতের সংস্কৃতির প্রভাব এখানে চোখে পড়ার মতো। সংস্কৃতি অধিগ্রহণের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, এটি পৃথিবীর অন্যতম ভ্রমণপ্রিয় দেশ। এছাড়া বছরজুড়ে এখানে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় নানা বাৎসরিক উৎসব লেগেই থাকে-চৈত্র দসাই, ঘণ্ট কর্না, ডুমজি, গুরু পূর্ণিমা, নাগা পঞ্চমী, জনাই পূর্ণিমা, কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী, ইন্দ্র যাত্রা ইত্যাদি। শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে সঙ্গীত, নাটকের ব্যাপক উপস্থিতির পাশাপাশি দেশটিতে বৃহৎ শিল্পমাধ্যম হিসেবে পরিচিত চলচ্চিত্র। শুরুতে নেপালের নিজস্ব চলচ্চিত্র না থাকলেও বিদেশি চলচ্চিত্র এখানে প্রদর্শন করা হতো নিয়মিতই। বিশেষ করে ভারতীয় চলচ্চিত্র এখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রদর্শন হয়ে আসছে। তবে সেই সমস্ত চলচ্চিত্রে অন্যের সংস্কৃতি নিজের ভূমিতে দর্শক হিসেবে দেখতে থাকলেও, চাহিদা তৈরি হয় নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি পর্দায় দেখার। কিন্তু সেটা নেপালিদের জন্য মোটেও সহজ কাজ ছিলো না।
নেপালি চলচ্চিত্রের শুরুর কথা
৫০-এর দশক পর্যন্তও কিন্তু নেপালে চলচ্চিত্রের আবির্ভাব ঘটেনি। তবে ততদিনে চলচ্চিত্র মাধ্যমে বিদেশি ভাষার পাশাপাশি নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি পর্দায় দেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু শুরুর দিকে সঙ্কটের শেষ ছিলো না। কারণ নেপালে তখনো নেই কোনো স্টুডিও, অভিনয়শিল্পী ও অন্যান্য কলাকুশলী। তার পরও চাই তখন নিজেদের চলচ্চিত্র। এ থেকেই নির্মাণ হয় নেপালের ও নেপালি ভাষার প্রথম চলচ্চিত্র সত্য হরিশচন্দ্র।২ নেপালের নিজের চলচ্চিত্র হলেও এটি নির্মিত হয় ভারতে। এমনকি এর নির্মাতা, অভিনয়শিল্পীসহ সব কলাকুশলীও ভারতীয়। সত্য হরিশচন্দ্র নির্মাণের পর এর নাম ও নির্মাতা নিয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। প্রথমদিকে ডিবি পারিয়ারকে চলচ্চিত্রটির নির্মাতা হিসেবে বলা হলেও কিছুকাল পরে চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে আরেকটি নতুন তথ্য সামনে চলে আসে। নেপালি সাহিত্যিক ও গবেষক অবিনাশ থ্রেস্টা চলচ্চিত্রটির একটি পোস্টার প্রকাশ করেন। সেখানে চলচ্চিত্রটির নাম দেখা যায় হরিশচন্দ্র এবং নির্মাতা সঙ রাথি।৩ চলচ্চিত্রটির অভিনয়শিল্পী প্রেম নাজির, চন্দ্রকান্তা, রোজি মেরি, শিলাদেবী, নন্দলাল, বাল বাহাদুর সায়ন্ডু, পিটার রায়, সাগর দত্ত কইরালা, ধরনাথ শর্মা, বি.বি.পারিয়ার প্রমুখ নামগুলোও সেখানে উল্লেখ করা হয়। নেপালি চলচ্চিত্রের বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায়, সত্য হরিশচন্দ্র নির্মিত হয় ভারতীয় বিখ্যাত নির্মাতা দাদাসাহেব ফালকের রাজা হরিশচন্দ্রকে অনুসরণ করে। যেটা মুক্তি পায় ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর।
সত্য হরিশচন্দ্র নেপালি চলচ্চিত্রে আশার দিশারী হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও তা দ্রুতই নিভে যেতে থাকে; বন্ধ হয়ে যায় নিজস্ব চলচ্চিত্র নির্মাণ। সত্য হরিশচন্দ্র-এর প্রায় এক যুগ পর আবার নেপালি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এবার এগিয়ে আসে নেপাল সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবে কিন্তু নির্মাতা কোথায়! এবারও ভারতের নির্মাতা হীরা সিংহ খাটরি’কে আমদানি করা হয় নেপালি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ৭ অক্টোবর হীরা সিংহ খাটরির পরিচালনায় নেপালের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র আমা (মা) মুক্তি পায়। তবে আশার কথা হলো, চলচ্চিত্রটি নির্মাণের জন্য এবার আর ভারতে যেতে হয়নি; নেপালের চলচ্চিত্র স্টুডিও ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই এটি নির্মিত হয়। এমনকি এর অভিনয়শিল্পী, কলাকুশলী সবই ছিলো নেপালি। আমার কেন্দ্রীয় চরিত্র শিভা শঙ্কর মানাধর ও ভুয়ান চাঁদের অভিনয় এবং নির্মাতা হীরা সিংহ খাটরির দক্ষতায় এটি দর্শক হৃদয়ে স্থান করে নেয়। এই সফলতায় পরবর্তী সময়ে নেপাল সরকারের সহযোগিতায় হিজো আজা ভালি (১৯৬৮) ও পরিবর্তন (১৯৭১) নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন হীরা সিংহ।
আমার সফলতায় বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থার পক্ষ থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে নেপালে। সরকারি সহায়তার বাইরের কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রথম চলচ্চিত্র মৈতিঘর (একটি মেয়ের জন্মভূমি) মুক্তি পায় ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে। এটি নেপালে নির্মিত হলেও এর অভিনয়শিল্পী ও অধিকাংশ কলাকুশলীই ছিলো ভারতের। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও নেপালে তখনো মাধ্যমটির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত দাঁড়ায়নি। সরকার আবার নড়েচড়ে বসে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়নে নেপাল সরকার ‘রয়াল নেপাল ফিল্ম করপোরেশন’ প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর এর সহযোগিতায় প্রথম নির্মাণ হয় প্রকাশ থাপা পরিচালিত মন কো বন্ধ (১৯৭৪)।
এতদিন ধরে নির্মিত নেপালের সব চলচ্চিত্র ছিলো সাদাকালো। প্রথম রঙ্গিন চলচ্চিত্র কুমারি (১৯৭৭) নিয়ে পর্দায় হাজির হন নেপালি নির্মাতা প্রেম বাহাদুর বাসনেট। এরপর থেকে নেপালে রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে। সিন্ধুর (১৯৮০), জীবন রেখা সিরিজ ও বাধলিন্ডু (১৯৮৪) এ সময়ে নির্মিত উল্লেখযোগ্য কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ায় কিছুদিনের মধ্যে নেপালি চলচ্চিত্রে পুঁজি বিনিয়োগ শুরু হয়। বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় ব্যক্তি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসে।
নেপালি চলচ্চিত্রের সোনালি যুগ বলা হয় ৮০’র দশককে। নির্মাতা, স্টুডিও, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীর সঙ্কটগুলো এই সময়ে কাটিয়ে ওঠে নেপাল। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে পুরোদমে। চলচ্চিত্রের গল্পগুলো সৃজনশীল, সমসাময়িক হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্র নির্মাণকে অনেকেই পেশা হিসেবে নিতে থাকে। নেপালি চলচ্চিত্রের দর্শকও বৃদ্ধি পেতে থাকে দেশব্যাপী। বিদেশি চলচ্চিত্রের আমদানি কমতে থাকে এই সময়ে। শ্যামঝাহানা, কুসুম রুমাল, যুদ্ধ, লহরি, কাঞ্চি, বাসুদেব, সায়নো, কোশলি, চিহ্ন, সন্তান, সম্পত্তি, অর্পণ, চুট, মিলন, তপসা ১৯৮০ থেকে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের উল্লেখযোগ্য সব চলচ্চিত্র। এই সময়ে ভুয়ান কে সি ও ট্রিপ্তি নাদাকর ছিলেন জনপ্রিয় জুটি। এর পরের দশকে অবশ্য এই ইন্ডাস্ট্রি পায় আরেক জুটি রাজেশ হামাল ও কারিশমা মানাধর’কে।
নেপালে ৯০-এর দশকজুড়ে ছিলো নানা সংঘাত-সহিংসতা। পরিসংখ্যান বলে, নেপালে ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সহিংসতায় ১৩ হাজার নাগরিক নিহত হয়।৪ এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প-সংস্কৃতিতে নানারকম প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। আর স্বাভাবিকভাবে এর আঘাত তখন চলচ্চিত্রশিল্পেও পড়ে। স্টুডিও বন্ধ হয়ে যায়, নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীরা দেশত্যাগ করে এ সময়। ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিমাণ কমে যায়। আর যে দুই-চারটি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়, তা ছিলো অপেক্ষাকৃত কম বাজেটের। তবে এই পরিস্থিতিতেও কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় নেপালে। তুলসি ঘিমাই’য়ের বলিদান (১৯৯৭) ও রাজানি রানা’র সীমা রেখা সেসময়ে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এছাড়া অনর্থ, আন্দোলন, দাইজো, ঈশ্বর, বাহাদুর, চোর, আওয়ারা সেময়ের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।
২০০৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে নেপালে রাজনৈতিক অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়। এ সময় নেপালি চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে-দুনিয়া (২০০৬), ক্রোধ (২০০৬), যুদ্ধ (২০০৭), অন্ত (২০০৭), কাগবেনি (২০০৮), সানো সনসার (২০০৮), মেরো ইটা সাথি চা (২০০৯), হিম্মত (২০০৮), ফার্স্ট লাভ (২০১০), কোহি মেরি (২০১০), ধর্ম (২০১১), মাসান (২০১১), লুট (২০১২), অপবাদ (২০১২), হোস্টেল (২০১৩), সি-মালা (২০১৩)। বাইরের দেশের প্রভাব থেকে চলচ্চিত্রকে মুক্ত করে নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে সবসময় চেষ্টা করেছে নেপাল। এ চেষ্টায় অনেকটা সফলও হয় দেশটি। তবে নেপালের চলচ্চিত্র এখনো বিশ্ববাসীর অগোচরেই থেকে গেছে।
এই প্রবন্ধে নেপালের চলচ্চিত্রকে জানা-বোঝার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে সমসাময়িক সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ঝোলা’কে (২০১৪) বেছে নেওয়া হয়েছে। কৃষ্ণ ধারাবাসী’র উপন্যাস ‘ঝোলা’ থেকে যাদব কুমার বাত্তারি’র পরিচালনায় ঝোলায় উঠে এসেছে নির্মম সতীদাহ প্রথার করুণ চিত্র।
ঝোলায় যা আছে
কাহিনির শুরু একজন কেরানির বাড়িতে একটি কাপড়ের থলেতে, যার স্থানীয় নাম ঝোলায় একটি প্রাচীন হস্তলিপি খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে। কেরানি সেই প্রাচীন হস্তলিপিতে ভারতীয় উপমহাদেশের ভয়াবহ সতীদাহ প্রথার একটি কাহিনি পান। সেই কাহিনি ফ্ল্যাশব্যাকেই ঝোলায় হাজির হয়। চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র কাঞ্চির বিয়ে হয় তার চেয়ে ৪০ বছরের বড়ো এক ব্যক্তির সঙ্গে। কাঞ্চির স্বামী বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। পরে কাঞ্চিকে সামাজিক, ধর্মীয় ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী চিতায় সহমরণের ব্যবস্থা করা হয়। চিতায় বসানোর পর সুযোগ বুঝে রাতের অন্ধকারে কাঞ্চি সহমরণ ফাঁদ থেকে পালিয়ে পাহাড়ি নদীতে লাফ দেন। পরে আশ্রয় নেন একটি গুহায়। এর কিছুদিন পর কাঞ্চির একমাত্র ছেলে গরু খুঁজতে গিয়ে তাকে দেখতে পায়। গুহা থেকে বের হয়ে তার সম্পর্কে কাউকে না জানাতে কাঞ্চি সাবধান করে দেয় ছেলেকে। কারণ তার বেঁচে থাকার কথা জানলে সমাজপতিরা তাকে আবার চিতায় তুলবে।
মায়ের নিষেধ সত্ত্বেও ছেলে এই ঘটনা তার মা সমতুল্য চাচীকে জানায়। সতীদাহ প্রথার ঘোর বিরোধী ওই চাচী কাঞ্চির জন্য খাবার ও কাপড় পাঠায়। কাঞ্চির দেবরও বিষয়টি জানতে পারে। জা ও দেবর মিলে ভাবে, কাঞ্চির বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় এই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া। একপর্যায়ে তারা নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে কাঞ্চির সঙ্গে দেখা করে ছেলেসহ তাকে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার জন্য বলে। সেই অনুযায়ী কাঞ্চি তার নাবালক সন্তানকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমায়। প্রাচীন হস্তলিপির কাহিনি সেখানে শেষ হলেও ঝোলার গল্প শেষ হয় না। সতীদাহের এই গল্প পড়ে কেরানি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি নেপালে সতীদাহ প্রথা বন্ধের অগ্রদূত চন্দ্র শমশের-এর একটি বাধানো ছবি তার ঘরে সাজিয়ে রাখেন।
সতীদাহের সেই কাল
ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন এক নির্মম প্রথার নাম সতীদাহ। মূলত এটি ভারতীয় সনাতন ধর্মালম্বীদের একটি প্রথা। তবে শুধু ভারতবর্ষে নয়, এশিয়ার অন্যান্য হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও এটা প্রবল আকারে ছিলো। হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত নেপালেও পাকাপোক্তভাবে জেঁকে বসেছিলো এ প্রথাটি। তবে কখন কীভাবে এই প্রথা এশিয়ায় শুরু হয়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণ মেলা মুশকিল। পুরাণে সতীদাহ শব্দটি এসেছে সতীর আত্মাহুতি থেকে। দক্ষরাজের মেয়ে সতীর সঙ্গে কৈলাস অধিপতি শিবের বিয়ে হয়। পরবর্তী সময়ে সতীর বাবা এক যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করেন। কিন্তু এই যজ্ঞে তিনি জামাতাকে নিমন্ত্রণ জানান না। সতী বাবার বাড়িতে এসে এই বিশাল যজ্ঞে দক্ষরাজের কাছে জানতে চান, কেনো তার স্বামীকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়নি? দক্ষরাজ তখন তার জামাতাকে নিয়ে অপমানকর কথা বলেন; যা সতী সহ্য করতে পারেন না। ক্রোধে-অপমানে তিনি যজ্ঞের আগুনে আত্মাহুতি দেন।৫ অন্যদিকে, গুপ্ত সাম্রাজ্যের (খ্রিস্টাব্দ ৪০০) পূর্ব হতেই এ প্রথার প্রচলন সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়। গ্রিক দিগ্বিজয়ী সম্রাট আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারতে এসেছিলেন ক্যাসান্ড্রিয়ার ইতিহাসবেত্তা এরিস্টোবুলুস। তিনি তার লেখনীতে তক্ষশীলা শহরের সতীদাহ প্রথার নানা ঘটনা সংরক্ষণ করেছিলেন। ৩১৬ খ্রিস্টাব্দে গ্রিক জেনারেল ইউমেনেস এর এক ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যুতে তার দুই স্ত্রী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সহমরণে যান। তখন থেকেই এই প্রথাটি শুরু বলে ধারণা করা হয়।৬
তবে প্রথাটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হলেও শাস্ত্রে কোথাও উল্লেখ নেই যে, স্বামী মারা গেলে তার চিতায় স্ত্রীকেও পুড়তে হবে। এটা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও ভারতীয় বেদ ভাষ্যকরগণদের মতে, বেদে সতীদাহের কোনো উল্লেখ নেই। বরং স্বামীর মৃত্যুর পর পুনর্বিবাহের ব্যাপারেই সেখানে মত দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অথর্ববেদের দুটি মন্ত্র এ রকম : ‘ইয়ং নারী পতি লোকং বৃণানা নিপদ্যত উপত্ব্য মর্ন্ত্য প্রেতম্। ধর্মং পুরাণমনু পালয়স্তী তস্ম্যৈ প্রজাং দ্রবিণং চেহ ধেহি (অথর্ববেদ ১৮.৩.১)। এর অর্থ : হে মনুষ্য! এই স্ত্রী পুনর্বিবাহের আকাক্সক্ষা করিয়া মৃত পতির পরে তোমার নিকট আসিয়াছে। সে সনাতন ধর্মকে পালন করিয়া যাতে সন্তানাদি এবং সুখভোগ করতে পারে।’ এছাড়া অন্য জায়গায় উল্লেখ আছে, ‘উদীষর্ব নার্ষ্যভি জীবলোকং গতাসুমেতমুপশেষ এহি। হস্তাগ্রাভস্য দিধিষোস্ত বেদং পত্যুর্জনিত্বমভি সংবভূব (অথর্ববেদ ১৮.৩.২)। এর অর্থ : হে নারী! মৃত পতির শোকে অচল হয়ে লাভ কি? বাস্তব জীবনে ফিরে এস। পুনরায় তোমার পাণিগ্রহনকারী পতির সাথে তোমার আবার পত্নীত্ব তৈরি হবে।’৭
শাস্ত্রে সতীদাহ নেই, তাহলে এটা কীভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলো? জানা যায়, তখন সমাজের প্রাধান্যশীল মানুষের (ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়) মাধ্যমে সতীদাহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।৮ কেননা, তখন ব্রাহ্মণরাই ছিলো সমাজের রীতিনীতি নির্ধারক। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ প্রথা অল্প অল্প করে এগিয়েছে। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। সেসময় রাজা-বাদশা থেকে শুরু করে সমাজের নিম্নশ্রেণি পর্যন্ত সবাই ব্রাহ্মণদের কথা শুনতো। তাদের নির্দেশ মতো চলতো এবং বিশ্বাস করতো। উচ্চবর্ণের ধনী পরিবারগুলোতে মৃত্যুর পর সম্পত্তি অধিকার করার লোভে তার আত্মীয়রা সদ্য বিধবা স্ত্রীকে সহমরণে যেতে বাধ্য করতো।
সতীদাহ নিষিদ্ধে চন্দ্র শমশের
অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে সতীদাহ প্রথায় পুড়তে হয়েছে অসংখ্য নারীকে। ভারত উপমহাদেশের এ প্রথাকে দূর করার লক্ষ্যে প্রথম বিদ্রোহ করেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতায় এ প্রথাকে দূর করতে সক্ষমও হয়েছিলেন। নেপালেও এ প্রথার প্রচলন ছিলো প্রকট আকারে। কখন থেকে নেপালে সতীদাহ প্রথা চালু হয়, সে বিষয়ে কোনো তথ্যপ্রমাণ না পাওয়া গেলেও, ভারতে সতীদাহ বন্ধের প্রায় ৯০ বছর পর ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে সেখানে এটি বন্ধ হয়। নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্র শমশের জঙ বাহাদুর রানা এই প্রথা বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে সতীদাহ বন্ধ এবং এটাকে নিরুৎসাহী করতে বেশকিছু আইন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো, ১৬ বছরের নারীকে সতী করা যাবে না; যে নারীর ১৬ বছরের নিচে ছেলে ও পাঁচ বছরের নিচে মেয়ে সন্তান আছে, সেই নারী সতীতে নিষিদ্ধ; যদি কোনো নারীর একাধিক স্বামী থাকে কিংবা গর্ভবতী হয় তবেও সতী নিষিদ্ধ; ক্রীতদাসী নারীদের ক্ষেত্রেও সতী নিষিদ্ধ করা হয়।৯
তবে সতীদাহের মতো এতো শক্তিশালী প্রথা বন্ধে চন্দ্র শমশেরের আইনগুলো ছিলো খুবই ‘দুর্বল’। পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে কেবল আইন দিয়ে এ ধরনের প্রথা দূর করার চিন্তাও যথাযথ ছিলো না। তার পরও সেই সময় সতীদাহের বিরুদ্ধে ওই ধরনের পদক্ষেপ ছিলো অত্যন্ত সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ। চন্দ্র শমশের এই আইন দিয়ে তার নিজের ভাইয়ের স্ত্রীদের সতী থেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, সতীদাহ প্রথা বন্ধে চন্দ্র শমশের আইন করলেও মৃত্যুর পর তার স্ত্রীদের সহমরণে যেতে বাধ্য করা হয়! তার পরও চন্দ্র শমশেরের এই সাহসী পদক্ষেপ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সফল হয় এবং নেপাল থেকে সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়ে যায়।
একটা খোলা তো হাজারটা বন্ধ
নেপালে বর্তমানে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত; ঠিক সেসময়ই যাদব কুমার বাত্তারি নির্মাণ করলেন সতীদাহ প্রথার মর্মান্তিক কাহিনি নিয়ে ঝোলা। সেখানে স্বামী মারা যাওয়ার পর সহমরণ থেকে বেঁচে যান কাঞ্চি। কিন্তু কাঞ্চি বেঁচে গেলেও এই প্রথায় আটকা পড়ে বাঁচতে পারেনি অসংখ্য নারী। নেপালে গত শতাব্দীতে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিলো প্রকট। বর্তমানে তা ভারত-নেপালে প্রথা হিসেবে চালু না থাকলেও এখনো মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে উঠে আসে নির্মম সহমরণের কথা। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দেও ভারতের বিহার রাজ্যে এক বৃদ্ধা স্বামীর চিতায় ঝাঁপ দিয়ে ‘সহমরণে’ যান। স্থানীয় লোকজন বলেছে, স্বামীর প্রতি অগাধ ‘ভালোবাসায়’ তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন!১০ তবে তা নিয়ে বির্তক রয়েছে। এর আগে ভারতের রাজস্থানে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে রুপা কানোয়ার নামে এক তরুণীকে বাধ্য করা হয় সতীদাহ প্রথায়।১১
আপাত সতীদাহ প্রথা থেকে নারী রক্ষা পেলেও, মুক্তি মেলেনি আরো সব ভয়াবহ প্রথা থেকে। নেপালে এখনো চালু আছে চৌপাড়ি প্রথা। এ প্রথানুযায়ী নারীদেরকে ঋতুস্রাবের সময় অপবিত্র জ্ঞান করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়! তাদেরকে আটকে রাখা হয় খোঁয়াড়ের মতো ‘চৌপদী’ ঘরে। বাড়ির কেউ তাদের স্পর্শ পর্যন্ত করে না। প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও এই নারীদের দেওয়া হয় না গরম পোশাক। নিষিদ্ধ থাকে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং স্নান। সম্প্রতি ‘চৌপদী’ ঘরে থাকার সময় সাপের কামড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়। এছাড়া ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ঋতুস্রাবের সময় কুঁড়ে ঘরে শীতের হাত থেকে বাঁচতে আগুন জ্বালানোর পর ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এক নারী মারা যায়।১২ যদিও নেপালে চৌপাড়ি প্রথা ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে সুপ্রিম কোর্ট নিষিদ্ধ করে। তবে এই আইন অমান্য করলে শাস্তির কোনো বিধান রাখা হয়নি। আশার কথা এই যে, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে নেপাল সরকার এ নিয়ে নতুন একটি আইন করে।১৩ আইনে বলা হয়, যে বা যারা এই প্রথায় কোনো নারীকে ঋতুস্রাবের সময় চৌপাড়িতে বাধ্য করবে, তাকে বা তাদেরকে তিন মাসের জেল এবং ৩০ ডলার জরিমানা করা হবে।
সতীদাহ বন্ধ ও বিধবা বিবাহ আইন করে চালু হলেও বিধবা নিয়ে হিন্দু-মুসলিম উভয় ক্ষেত্রে এখনো নানা মূল্যবোধ চালু আছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর এখনো রঙিন কাপড় পরতে পারে না নারী। খাদ্য তালিকায় পরিবর্তন আসে, তারা অলঙ্কার পরিহার করে। অল্প বয়সে কোনো নারী বিধবা হলে এখনো অনেক ‘শুভ’ অনুষ্ঠানে নারীকে কাজ করতে দেওয়া হয় না। ভাবা হয় তার সম্পৃক্ততায় ‘অমঙ্গল’ হবে! বাংলাদেশেও এ ধরনের মূল্যবোধ প্রচলিত আছে। এছাড়া নেপালি সমাজে স্বামীকে ‘ভগবান’ বলে মনে করা হয়। খুব ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে স্বামীর পা ধুয়ে, সেই জল খাওয়ার কথাও শোনা যায় সেখানে।১৪ স্বামীকে সকালে পূজা দিতে হয়। স্বামী না খেলে স্ত্রী খেতে পারে না। শুধু স্বামী কেনো, পরিবারের যেকোনো পুরুষ না খাওয়া পর্যন্ত কোনো নারী খেতে পারে না। খাওয়ার আগেও স্ত্রীকে স্বামীর পায়ের কাছে এসে ভক্তি দিতে হয়। ঝোলায় কাঞ্চিকে দেখা যায়, তার স্বামীর সেবা করতে, খাওয়াতে। কারণ স্বামীর বেঁচে থাকার ওপরই নির্ভর করে কাঞ্চির বেঁচে থাকা। এ রকম একটা নির্মম পরিস্থিতিতে স্বামীর সেবা-যত্ন করতে হয় কাঞ্চিকে। সতীদাহ নেই, তবে বর্তমানেও অন্যান্য নানা দিকে নারীর অবস্থার যে খুব বেশি পরিবর্তন হয়েছে এটা সহজে বলা যায় না।
ঝোলার অতীত, নির্মাতার বর্তমান
কোনো চলচ্চিত্র রোমান্টিক, কমেডি, ট্রাজেডি, পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, লোকগাঁথা, যাই হোক না কেনো দর্শক চায় সেই চলচ্চিত্রের বাস্তবতার কাছাকাছি পৌঁছাতে। এজন্য সব নির্মাতাই বাস্তবতার কাছাকাছি গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করে। চলচ্চিত্র সাধারণত কোনো সময়কে ধরে নির্মিত হয়, নির্দিষ্ট সেই সময়ের কোনো না কোনো উপস্থাপন থাকে সেখানে। যাদব কুমার বাত্তারির ঝোলা নির্মিত ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের সতীদাহ প্রথার একটি কাহিনিকে ঘিরে। এক্ষেত্রে নির্মাতার জন্য সময়কে ধরার বিষয়টি অনেকখানি চ্যালেঞ্জের মতোই ছিলো। তবে সেই সময়কে ধরতে নির্মাতা যে খুব সফল হয়েছেন এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না। চলচ্চিত্রজুড়ে এমন কোনো জায়গা নেই, যার মধ্যে দিয়ে অতীতের সেই সময় ভালোভাবে রিপ্রেজেন্ট হয়েছে। তিনি সেই সময়ের অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক যে পরিবেশ-পরিস্থিতি ঝোলায় দেখিয়েছেন, তা আলাদা কোনো অর্থ বহন করেনি। বিশেষ করে গ্রামীণ ব্যবহার্য জিনিসপত্র, পোশাক, গরু-ছাগল, জমিতে চাষাবাদ সবমিলিয়ে একটা সামগ্রিক আঠারো শতকীয় পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছেন নির্মাতা। কারণ পরিচ্ছন্ন, ফিটফাট মেকআপের কাঞ্চি যখন ঢেঁকিতে ধান ভানেন কিংবা যাঁতাকলে ডাল ভাঙেন, তখন সময়নির্ভর এ চলচ্চিত্রে আলাদা কোনো বাস্তবতা তৈরি হয় না। ফলে ঝোলা কখনোই ঘোর লাগাতে পারে না।
ঝোলা জুড়ে দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবহসঙ্গীত আয়োজনের চেষ্টা করেছেন নির্মাতা। কখনো সেটা করুণ বাঁশির সুরে আবার কখনো নানা বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে। কাঞ্চির ছেলেসহ অন্যরা যখন মাঠে গরু-ছাগল চরানোর জন্য যায়, তখন আবহে একেবারেই গতানুগতিক বাঁশির সুর শোনা যায়। এছাড়া কাঞ্চির সতীদাহের পর ফ্লাশব্যাকে যখন ছেলেটিকে তার বাবার পড়ানো, মায়ের গোসল করা কিংবা খাইয়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়, তখন আবহে বাঁশির যে সুরটি বাজে তা একধরনের সমানুভূতি তৈরি করে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে কাঞ্চির স্বামীর শেষকৃত্য প্রক্রিয়া এবং সতীদাহে যাওয়ার সময় নেপালি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র সহযোগে যে অর্কেস্ট্রা পরিবেশিত হয়, তা পাহাড়ি উঁচুনীচু পথের লঙ শটের সঙ্গে অসাধারণ এক দ্যোতনার সৃষ্টি করে।
এছাড়া নেপালের বর্তমান পরিস্থিতির বিবরণ পাওয়া যায় একেবারে চলচ্চিত্রের শুরুতে। দেখা যায়, কিছু মানুষের জটলা। সেখানে একটি ঝোলায় ‘বোমা’ সদৃশ্য বস্তুকে ঘিরে রেখেছে পুলিশ। একইরকম আরেকটি ঝোলা ঝোলানো থাকে কেরানির বাড়িতে। কেরানি ও তার স্ত্রীর মধ্যে এই ঝোলা কার, এ নিয়ে একপ্রকার রাগারাগি হয়। তারা বিষয়টি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও জানাতে ঠিক আস্থা পান না। সাধারণ মানুষের এই আস্থাহীনতার মধ্যে দিয়ে নির্মাতা হয়তো নেপালের সমসাময়িক চিত্রই তুলে ধরতে চেয়েছেন। কারণ নিকট অতীতে নেপালের অস্থিরতা যে ছিলো, তার সমাধান হলেও তা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দেও নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঝাপা জেলায় খ্রিস্টানদের কয়েকটি গির্জায় দফায় দফায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।১৫ এছাড়া একই বছর ভারতীয় পর্যটকদের একটি বাসে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।১৬ এছাড়াও দেশব্যাপী বিভিন্ন সময়ে নানা সহিংস ঘটনা তো রয়েছেই। ফলে ঝোলায় নির্মাতা শুধু অতীতের সতীদাহকেই দেখাননি; কৌশলে বর্তমানকেও উপস্থাপন করেন।
‘এনেছে এক নবীন গোরা
নতুন আইন নদীয়াতে’
পৃথিবীতে টিকে থাকতে প্রতি ক্ষেত্রেই যুদ্ধ করতে হয়, কখনো কখনো হতে হয় প্রতিবাদী। পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে নারীদের ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ-প্রতিবাদ আরো বেশি। যদিও এই সমাজ নারীদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবাদ নয়, কেবল মেনে নিতে শেখায়। আর মেনে নেওয়া মানে সমাজে প্রচলিত কিছু প্রথার কলে নিজেকে আটকে রাখা। তবে এই প্রথার বিপরীতে নারীরা যে একেবারে যায়নি এমন নয়, সেই নারীর সংখ্যাও অনেক। নারীর পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে গেছে তারা। তার ফল হয়তো কিছু ভোগ করছে বর্তমানের নারীরা। সারা পৃথিবীতে নারীদের এখন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে পাওয়া যাচ্ছে। ঝোলাতেও একই সঙ্গে অসহায় ও প্রতিবাদী দুই নারীকেই দেখা যাচ্ছে। সতীদাহের মতো নির্মম ও পুরুষ প্রাধান্যশীল প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করেছেন একজন নারীই। কাঞ্চিকে যখন সহমরণের জন্য প্রস্তুত করা হয়, তখন তার জা বলেন,
স্ত্রী মারা গেলে স্বামী খুশি হয় এবং যৌন চাহিদা মেটানোর জন্য নতুন আরেক যুবতীকে বিয়ে করে। কিন্তু যখন স্বামী মারা যায়, তখন তাকে স্বামীর সঙ্গে চিতায় জ্বলতে হয়। এটা কিসের প্রথা? কীসের তোমাদের ধর্ম? তারা কীভাবে এই অন্যায়কে ধর্ম বলে? সে তো ইচ্ছা করেই তার চেয়ে ৪০ বছরের ছোটো মেয়েকে বিয়ে করেছিলো। এখন এই বয়সে তাকে জোর করে কীভাবে সতী বানায়? সতী বানানোর অধিকার তারা পায় কীভাবে?
এই প্রতিবাদের উত্তরে তার স্বামীকে (কাঞ্চির দেবর) বলতে শোনা যায়, ‘তুমি কী করতে পারবে? এটা অনেক বছরের ঐতিহ্য আমাদের। এটা আমাদের প্রথা, আমাদের ধর্ম। আমার মা, দাদী সবাই এটা মেনেছে।’ পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজের প্রতিনিধি ওই স্বামী যুক্তি নয়, ধর্মের দোহাই দিয়ে বোঝাতে চান, এটা নারীকে মেনেই নিতে হবে। ধর্মের ধুয়া তুলে নারীর এই প্রতিবাদকে আটকে রাখার চেষ্টা হয়েছে। আবার নারীকে এ রকম প্রশ্ন তোলার মাশুলও দিতে হয়েছে অনেক। ঝোলায় কাঞ্চির দেবরকে গ্রামবাসী ভয় দেখিয়ে বলে, ‘যদি তুমি এই ধরনের কথা বলো, তাহলে গ্রামের মানুষ তোমাকে দোষী সাব্যস্ত করে তাড়িয়ে দেবে। তাই চুপ করো।’ নারী আর কতদিন চুপ করে জুলুম মেনে নেবে। ঝোলার ওই নারী প্রতিবাদী কণ্ঠ বর্তমানেও নেপালে পাওয়া যায়-অনুরাধা কৈরালা। শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে অনুরাধা ২৪ বছর ধরে নারীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। নারী ও শিশুদের পাচার ঠেকাতে ‘মাইতি নেপাল' প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।১৭ পরিসংখ্যান বলছে, যৌনকর্মী হতে বাধ্য করেছিলো এমন ১২ হাজার নারীকে উদ্ধার করে তাদের পুনর্বাসন করেছেন অনুরাধা। পাচার হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন আরো অন্তত ৪৫ হাজার নারীকে। শুধু অনুরাধাই নন। নেপালের নারীরা আজ শিক্ষা-সংস্কৃতির নানা দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে নানারকম বাধা-বিপত্তি থাকা সত্ত্বেও।
ঝোলা ঝোলায় আবদ্ধ
স্বামীর মরদেহের সঙ্গে স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করলে স্বামীর ‘চৌদ্দগোষ্ঠী’ স্বর্গ পাবে। সতীদাহ নিয়ে এমন ‘সুখবর’ দিয়েছিলো তখনকার ধর্মগুরুরা। ধর্মগুরুদের এই ধারণার প্রতি মানুষের অন্ধবিশ্বাসের ফলে তা রয়ে যায় সবার অন্তরে। পরে এই অন্ধবিশ্বাস থেকে তৈরি কুসংস্কারই হয় সমাজের আইন। এই আইনে যে নারীর স্বামী মারা যায় তাকে সম্বোধন করা হয় ‘সতী’; এমনকি ওই ‘সতী’কে ‘দেবতা’র আসনে বসানো হয়। সবার ধারণা, তার মাধ্যমেই স্বর্গলাভ হবে। নিজেদের স্বর্গলাভের পিপাসায় অল্প সময়ের জন্য হলেও সমাজের সবাই তখন ‘সতীর’ সেবায় ব্রত হয়। ঝোলায় ‘সতী’ কাঞ্চির উপস্থাপন ঠিক এ রকমই।
যদিও কাঞ্চির স্বামী মারা যাওয়ার পর সহমরণের প্রস্তুতিকালে কাঞ্চির জা এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, প্রতিবাদ করেন। পুরুষের ভূমিকাকেও তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেন। অবশ্য কাঞ্চির জা এ সময় তার স্বামীর পরোক্ষ সমর্থনও পান। কিন্তু সহমরণ থেকে কাঞ্চির বেঁচে ফেরার খবর পেয়ে তারা যখন বনের মধ্যে তার সঙ্গে দেখা করতে যায়, তখন তার চেয়ে বয়সে বড়ো দেবর ও জা’কে কাঞ্চির পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে দেখা যায়! কাঞ্চির ছেলেও অবশ্য বিদায় বেলা তার চাচা-চাচীর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে সম্মান জানায়। কিন্তু একমাত্র কাঞ্চিকেই এটা করতে দেখা যায় না। যদি এমনটা ধরে নিই, এটা নেপালের প্রথা, তাহলে তো কাঞ্চির একই ধরনের আচরণ করার কথা। কারণ তিনি তার জা’কে বলছেন, পারিবারিক সম্পর্কে আপনি হয়তো আমার ছোটো। তার পরও আপনি আমার মায়ের মতো। কিন্তু বিদায় বেলা কাঞ্চিকে তার দেবর-জা এর ব্যাপারে এ ধরনের কোনো প্রথা মানতে দেখা যায় না। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই কাঞ্চি খানিকটা উঁচু আসনে অবস্থান করেন। এমনকি নির্মাতা না চাইলেও তা ‘সতী’ হিসেবে কাঞ্চিকে উপস্থাপন করে। এর মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের মনের ভিতরে প্রথা নিয়ে যে ভাববাদী অবস্থান থাকে, তা খুব সহজেই স্পষ্ট হয়।
চলচ্চিত্রিক ভাষার খোঁজে
ইমেজ চলচ্চিত্রের প্রাণ। ক্যামেরা দিয়ে ফ্রেমের ভিতর এই ইমেজ সৃষ্টি হয়ে থাকে। ইমেজে প্রাধান্য পায় চলচ্চিত্রের চরিত্র। তাই ইমেজ শুধু কাহিনির বাস্তব চিত্র নয়, এর চেয়েও বেশিকিছু। চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক আর্নহাইম যেমনটা বলেন, ইমেজকে হতে হবে বাস্তবের অতিরিক্ত কিছু অর্থাৎ অর্থময়ভাবে আয়োজিত।১৮ তাই ইমেজ ব্যবহারে নির্মাতাকে দক্ষ হতে হয়। আর এই দক্ষতায় সৃষ্টি হয় নতুন সৃষ্টি। বেলা বালাজ তার ‘দি ক্রিয়েটিভ ক্যামেরা’ গ্রন্থে বলছেন, চলচ্চিত্রের নির্মাণে সবচেয়ে শক্তিশালী উপকরণ হলো ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, যার জন্য বাস্তবতার পুনরুৎপাদন নয়, নতুন সৃষ্টি সম্ভব হয় (থিওরি অফ দি ফিল্ম, ১৯৫২)।১৯ অর্থাৎ পুরো ব্যাপারটাই এমন যে, নির্মাতা তার আজ্ঞাধীন ক্যামেরার সাহায্যে গল্পটি দর্শকের কাছে পরিবেশন করবেন শিল্পরস দিয়ে। আর এই ব্যাপারটি প্রথম অনুধাবন করেছিলেন মার্কিন নির্মাতা ডি. ডব্লিউ গ্রিফিথ। গ্রিফিথ চলচ্চিত্রে গল্প বলার প্রয়োজনে যুক্ত করেছিলেন ক্যামেরার নানান ধরনের শট্ ও দৃষ্টিকোণ পরিবর্তন, দৃশ্যবস্তুর সূক্ষ্মতম পর্যবেক্ষণ।২০
ঝোলায় ২৬ মিনিটে কাঞ্চির ছেলে গোয়েনসেম’কে দেখা যায়, ঝরনার ধারে পানিতে দুই পাশে দুটি ছোটো খুঁটি গেড়ে তাতে একটি উদ্ভিদের অংশ দিয়ে তৈরি গোল চাক ঘুরাতে। পানির চাপে চাকতি ঘোরে, আর কাঞ্চিদের জীবনের গতিও ঘুরে যায়। ইমেজটি বেশ কার্যকর। ৩২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে যখন কাঞ্চির স্বামী মারা যান, তখন ছেলে বাবার মারা যাওয়ার খবর শোনার সময় তার তৈরি একটি খেলাঘর ভেঙে যায়। এই খেলাঘর আর কোনোদিন বানানো হবে না তার। ঝোলার আরেক জায়গায়, বাবা-মা হারা গোয়েনসেম খাবার খাচ্ছে। তখন তার মায়ের কথা মনে পড়ে, চোখ দিয়ে পানি ঝরে। কাট টুতে দেখানো হয় চুলায় আগুন জ্বলছে। কাঞ্চিকে সহমরণে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি একটি ওয়াইড অ্যাঙ্গেল শটে দেখানো হয়। ২০ মিনিট ২১ সেকেন্ডে যখন কাঞ্চি ধান ভানছেন আর পাশে তার স্বামীর কাশির শব্দ ভেসে আসছে, ঠিক সেই সময়ে দেখানো হয় একটি টিল্ট-আপ শট্। ঝোলাজুড়ে এ ধরনের অনেক শটের ব্যবহার চোখে পড়ে। এর বেশিরভাগেই প্রতীকের ব্যবহারের ছড়াছড়ি। দেখে মনে হয়েছে, নির্মাতা ঝোলায় নানা শটের মধ্য দিয়ে একটি চলচ্চিত্রিক দ্যোতনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু এসব শটের বেশিরভাগই কেনো জানি চলচ্চিত্রিক হয়ে ওঠেনি। নির্মাতা একটা একরৈখিক গল্প বলে গেছেন। যদিও সেটা একজনের চিন্তার মধ্যে দিয়ে পর্দায় হাজির হয়েছে।
একটা সাদামাটা গল্পও নির্মাতার হাতে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে, যদি তাতে চলচ্চিত্রভাষার যথাযথ ব্যবহার হয়। ঝোলায় চলচ্চিত্রভাষার সেই ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ চলচ্চিত্রের একটা সামগ্রিকতা আছে। গল্পের একরৈখিকতায় সেই সামগ্রিকতা সচল থাকলেও চলচ্চিত্রে তা অচল। একটার পর একটা ঘটনা বলে গেলেই, আর পর পর শটে তা যুক্ত করা হলেই চলচ্চিত্র হয় না। নির্মাতার কাজ শুধু একটা গল্প বলা নয়, সেই গল্প কীভাবে বলা হলো সেটাও জরুরি। ঝোলায় সেই জরুরি বিষয়টি অনুপস্থিত। উনি শুধু একটা গল্প বলে গেছেন। তাই এই সব বিবেচনায় চলচ্চিত্র হিসেবে ঝোলার নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
লেখক : শফিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি অনলাইন সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।
shafiqulislamru32@gmail.com
তথ্যসূত্র
1.http://www.imnepal.com/nepal-people-culture-traditions-festivals/; retrieved on 10.08.2017
2. https://goo.gl/Etrzj6; retrieved on 10.08.2017
3.https://filmsofnepal.com/satya-harishchandra-1951/; retrieved on 10.08.2017
4.https://www.historyguy.com/nepal_civil_war.html; retrieved on 10.08.2017
5.http://kathamukh-banglablog.blogspot.com/2013/11/blog-post_11.html; retrieved on 12.08.2017
6.goo.gl/fWtxgk; retrieved on 12.08.2017
7. goo.gl/fWtxgk; retrieved on 12.08.2017
৮. রায়, রুম্পা ও হালিমা খুশি; ‘সতী, অন্তর্জলী যাত্রা ও ওয়াটার : দাহ নারীর সেকাল একাল’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বর্ষ ২, সংখ্যা ৪, পৃ. ১২৩।
9. http://ecs.com.np/heritage-tale/sati; retrieved on 19.08.2017
10. https://goo.gl/gNP57d; retrieved on 19.08.2017
11. https://goo.gl/XxpXnM; retrieved on 19.08.2017
12. goo.gl/ng1LYU; retrieved on 10.09.2017
13. https://goo.gl/bzREjh; retrieved on 10.09.2017
14.https://goo.gl/wXdJVR; retrieved on 10.09.2017
15.https://goo.gl/pYWYfp; retrieved on 11.09.2017
16. https://goo.gl/XYi5Cz; retrieved on 11.09.2017
17.goo.gl/FTcxtj; retrieved on 15.09.2017
18. goo.gl/uXKzgm; retrieved on 15.10.2017
19. goo.gl/uXKzgm; retrieved on 15.10.2017
20. goo.gl/M7KCNU; retrieved on 15.10.2017
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন