আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির
প্রকাশিত ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পুরাতন ব্রহ্মপুত্রে নতুন ছবির ঢেউ : ময়মনসিংহে এক অনন্য চলচ্চিত্র আন্দোলনের গল্প
আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

নদ বেয়ে চলে
ব্রহ্মপুত্র নদ অত্যন্ত প্রবীণ। অতিবৃদ্ধ এই নদের তীরে গড়ে ওঠা বেশ পুরাতন শহরের নাম ময়মনসিংহ। দুই শতাব্দীর প্রাচীন এই শহরের গায়ে নদের উত্তাল ঢেউ এখন আর খুব একটা লাগে না। জীর্ণ জলধারার এপার থেকে ওপার এখন চাইলে অতি সহজেই পার হওয়া যায়। নির্বিবাদ শান্ত এর বুক। শীতে শুকিয়ে মৃতপ্রায় নদের বুকে জেগে থাকে বালুর অজস্র চর।
এই শহরে সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাসও এই নদের মতোই প্রাচীন। সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক ইত্যাদির ঢেউ একসময় ব্রহ্মপুত্রের সুবিশাল সব ঢেউয়ের মতোন প্রাণবান ছিলো। শহরের মোটামুটি মধ্যখানে এখনও একটা প্রাচীন নাটকঘর দাঁড়িয়ে-‘অমরাবতী নাট্যমন্দির’। হলদে মলিন দালানটার কপালে ‘অমরাবতী নাট্যমন্দির’ লেখাটা স্পষ্ট ফুটে আছে আজও। তবু এই নামে এটাকে এখন আর কেউ চেনে না। বর্তমান নাম ‘ছায়াবাণী’। চলচ্চিত্র দেখানোর হল। এখানে প্রায় প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন চলচ্চিত্র প্রদর্শন হয়, যার প্রায় সবগুলোই ঢাকায় বানানো।
সারা বাংলাদেশে আদতে ওই একটাই শহর, যেখানে চলচ্চিত্র বানানো হয়। গত শতকের ৫০-এর দশকে এই ভূখণ্ডে শুরু হয় চলচ্চিত্র যাত্রা। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় সমস্ত চলচ্চিত্রই ওই শহরে বানানো। ওই শহরে আছে ‘এফ ডি সি’ নামের একটা চলচ্চিত্র তৈরির কারখানা। ৭০-এর দশক অবধি সেখানেই সব হয়েছে। ৮০’র দশকে এসে যখন ‘বিকল্প’ চলচ্চিত্র আন্দোলন হলো। তখন কয়েকজন তরুণ চলচ্চিত্রকার এফ ডি সি থেকে বেরিয়ে ‘অন্য’ ধারায় চলচ্চিত্র বানানো শুরু করলো। কিন্তু তারাও ঢাকা থেকে বের হলো না। আর সবকিছুর মতোই ঢাকা হয়ে রইলো চলচ্চিত্রের জন্য এক ও অদ্বিতীয় কেন্দ্র। বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে ‘বিকল্পধারা’, পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে স্বল্পদৈর্ঘ্য, সব চলচ্চিত্রই বলতে গেলে ওই একটা শহরেই তৈরি হয়। ফলে ঢাকায় বাস করাকে এই দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের পূর্ব শর্ত বলে মনে করা হয়। কিন্তু সত্যিই কি ঢাকার বাইরে কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় না? নাকি সেসব চলচ্চিত্রের খোঁজ, আমরা যারা ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বুঝি না, তারা রাখি না বা রাখতে চাই না?
ব্রহ্মপুত্র ও চলচ্চিত্র
২০০৯ খ্রিস্টাব্দ। ময়মনসিংহ শহরের কয়েকজন তরুণের হঠাৎ শখ হলো নিজেদের আড্ডা ধারণ করে রাখবে মোবাইলফোন সেটের ক্যামেরায়। সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা তরুণ এরা। এরপর হয়তো একেকজন একেক শহরে যাবে পড়তে। স্মৃতি রক্ষার জন্যই হোক অথবা শহরের প্রতি মায়ার টানেই হোক-তারা একসময় মোবাইলফোন সেটের ক্যামেরায় ধারণ করা শুরু করলো তাদের দৈনন্দিন সহজাত আড্ডাগুলো।
কিছুদিন পর তাদের এক কাছের বড়ো ভাইয়ের অকাল মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। সেই ভাইয়ের স্মৃতি নিয়ে তারা একটা ফিকশন বানাবার পরিকল্পনা করলো। ততদিনে হাতে চলে এসেছে একটা ১০ মেগা পিক্সেলের ডিজিটাল ক্যামেরা। নিজেদের সময় আর পছন্দের মানুষদের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রথম ক্যামেরা হাতে নিলেও একপর্যায়ে এসে তারা সিদ্ধান্ত নিলো নাটক তৈরির। এক পর্বের টিভি নাটকের আদলে বেশকিছু ফিকশন বানালো তারা। কিন্তু কিছুতেই যেনো তাদের মন ভরছিলো না। নাটক নয়, আদতে চলচ্চিত্রের প্রতি অজানা এক টান অনুভব করছিলো সবাই।
একপর্যায়ে এসে কেনা হলো একটি হ্যান্ডিক্যাম। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে এসে তারা প্রথম হাত দিলো চলচ্চিত্র নির্মাণে। স্বল্পদৈর্ঘ্যের সেই চলচ্চিত্রের নাম ক্ষীণ আলোর আর্তনাদ। একধরনের প্রতিবাদ বা আক্ষেপের জায়গা থেকে চলচ্চিত্রটির গল্পের উদ্ভব। সেই বছর ডিসেম্বরে প্রচণ্ড শীতে সারাদেশ তখন কাতর। সেই শীতে এক হতদরিদ্র লোককে রাস্তায় বস্ত্রহীন দেখে গল্পটির ধারণা আসে। একধরনের অসহায়ত্বের গল্প। মূল চরিত্রে একজন বোবা লোক। বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের ভাষাহীনতাই ছিলো চলচ্চিত্রটির মূল বিষয়বস্তু। এই ক্ষীণ আলো অনেকটা এক পৃথিবী অন্ধকারে জ্বলতে থাকা জোনাকির মতো।
বাপ্পি, ববি, সাগর, নিজাম-ময়মনসিংহের এই চার তরুণের চলচ্চিত্র নিয়ে কাব্যিক পথচলার মূলত শুরু হয় এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই। এরপরের দুই বছর ধরে তারা মূলত এই চলচ্চিত্র নিয়েই ব্যস্ত থাকে। এডিটিং-রিএডিটিং চলতে থাকে। একপর্যায়ে এসে তারা নিজ উদ্যোগে ময়মনসিংহ শিল্পকলা একাডেমিতে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে। আয়োজন করা হয় একটি চলচ্চিত্র উৎসবেরও। টিকেট শো ছিলো। পোস্টার, ব্যানার সবই ছিলো আয়োজনে। কিন্তু খুব বেশি দর্শক হয়নি। তবু তাদের উৎসাহের কমতি ছিলো না। ব্রহ্মপুত্র পাড়ের এই শহরে চলচ্চিত্র বানানো হয়েছে, তার প্রদর্শনীও হচ্ছে এই শহরে এটাইবা কম কীসে।
রাজিব খান পাঠান বাপ্পি, আতিকুর রহমান সাগর, রাকিব ববি-তিনজনের চলচ্চিত্র যাত্রার পরবর্তী ফসল অনাকাক্সিক্ষত অনুশীলন। মাঝখানে যদিও খানিকটা আশাহত, দিকহীন হয়েছিলেন তিনজন। কিন্তু একটা দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে এসে আব্বাস কিয়ারোস্তামির ১৯৭০-এ নির্মিত চলচ্চিত্র ব্রেড এন্ড অ্যালির সরল গল্প আর নির্মাণে মুগ্ধ হয়ে তারা তৈরি করেন অনাকাক্সিক্ষত অনুশীলন। চলচ্চিত্রটি কোথাও দেখানো না হলেও এটি মূলত তাদের জন্য একধরনের পথ প্রদর্শকের কাজ করেছে। যার ধারাবাহিকতায় ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে তারা নির্মাণ করে কাগজের নৌকা।
জীবনের নৌকা কাগজের নৌকা
চলচ্চিত্রটির শুরু কোনো এক শীতের রোদহীন সকালে। ব্রহ্মপুত্রে কুয়াশা জমে আছে। ধীরে ধীরে পর্দায় প্রবেশ করে একটা নৌকা। সেখানে দেখা মেলে একজন যাত্রী আর একজন মাঝির। দুই জনেরই গা চাদরে জড়ানো। যাত্রী বয়োবৃদ্ধ আর মাঝি যুবক। নৌকা তীরে এসে ভিড়লে বৃদ্ধকে ধরে নামায় যুবক। ধরে ধরে তাকে একটা চেয়ারে বসান। এরপর বৃদ্ধকে একলা রেখে নৌকা নিয়ে ফিরে যেতে থাকে যুবকটি। দু’জনের চোখ-মুখ দুঃখে গভীর হয়ে আছে। দেখতে দেখতে যুবকের মুখ দূরে হারিয়ে যায়।
কাগজের নৌকার দৈর্ঘ্য মোটামুটি ছয় মিনিট। কিন্তু মানবজীবনের শুরু থেকে শেষ, জন্ম থেকে মৃত্যু, শৈশব থেকে বার্ধক্য-সমস্তই আছে। চলচ্চিত্রটি সাদাকালো কিন্তু এর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ জুড়ে জীবনের সমস্ত রঙই বিদ্যমান। একটা দৃশ্যে দেখা যায়-পিতা-মাতা আর শিশু সন্তান বসে আছে নৌকায়। শিশুটি নদের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে কাগজের নৌকা। সেই জলে ধীরে ধীরে তার সমস্ত জীবন ভাসতে থাকে। কৈশোর, যৌবন, প্রেম, বিরহ, সুখের স্মৃতি সবকিছু যেনো একেকটা কাগজের নৌকা-অসংখ্য অজস্র ভেসে যাচ্ছে জলে। শেষ দৃশ্যে সেই ফেলে যাওয়া বৃদ্ধ। বোধ হয় মৃত্যুর অন্য পাড়ে বসে সমস্ত জীবন বার বার দেখে চলেছেন।
এই চলচ্চিত্রটি মূলত একটি সাদাকালো আধুনিক কবিতা। একটা গল্প আছে। কিন্তু গল্পের ছবিগুলো একজন আরেকজনের থেকে আলাদা। নিজেরা একেকটা স্বতন্ত্র গল্প। আবার ছবির পিছনে শব্দের যে আবহ সেই আবহে অন্য আরেক গল্পের দেখা মেলে।
মানবজীবনের সবচেয়ে পরিচিত গল্প নিয়ে বানানো চলচ্চিত্র। কিন্তু কাগজের নৌকা এই গল্প বলতে গিয়ে লিখে ফেলেছে অনন্য এক কবিতা। আর ঠিক এ কারণেই একটা অন্য রকম স্বর পাওয়া গেছে বাংলাদেশের এই চলচ্চিত্রে। একধরনের নতুন চলচ্চিত্রের ঢেউ ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীন বুক থেকে উঠে এসেছে।
এরপর থেকে নিয়মিতভাবে আতিকুর রহমান সাগরের লেখা চিত্রনাট্যে, রাজিব খান পাঠান বাপ্পির পরিচালনায়, রাকিব ববির সিনেমাটোগ্রাফিতে তৈরি হতে থাকে একের পর এক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এর মধ্যে প্রযোজক হিসেবে এই তরুণ দলে যুক্ত হন রাজন চৌধুরী। বেশ গুছিয়ে কাজ শুরু হয় এই পর্যায়ে এসে। দলের নাম দেওয়া হয়-‘ফিল্মমেকার প্রডাকশনস’। হোয়াইট লাইস, মিরর ২৭, রান ইনটু দ্য স্যান্ড, সিনে ডিয়ে-পরপর চারটি সাদাকালো চলচ্চিত্রের পর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে এসে তারা নির্মাণ করেন প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র লাস্ট স্ট্র।
শিকলে বাঁধা লাস্ট স্ট্র
লাস্ট স্ট্র-এর প্রধান শক্তি রঙ আর প্রতীক। লাল টকটকে মলাটের একটা অক্ষরহীন বই শিকল দিয়ে বাঁধা। এর নানারকম অর্থ হতে পারে। আবার দেখা যায়, হলদে রঙচটা দেয়ালে একজন লোক সাদা ভাষাহীন ছবিহীন পোস্টার সেঁটে যাচ্ছে একের পর এক। এই ধরনের শক্তিশালী ইমেজগুলো রূপক গল্পের মতোই কাজ করে। রাজনীতি আর অর্থনীতির নানান দানবিক রূপকে কটাক্ষ করা হয়েছে হয়তো। নয়তো প্রতিবাদ, প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে হতাশা, ক্ষোভের প্রকাশ পেয়েছে।
চলচ্চিত্রটির ক্যামেরার কাজ অনন্য এবং পরিণত। দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। আরও মুগ্ধতা তৈরি করে শব্দের ব্যবহার। সাধারণত আমরা মনে করি, শব্দ ছবির পিছনে থেকে ছবিকে সাহায্য করে। গল্পের আড়ালে থেকে গল্পকে স্পষ্ট করে। কিন্তু লাস্ট স্ট্র প্রমাণ করে, শব্দেরও আলাদা ছবি আর গল্প থাকতে পারে।
একটা দৃশ্যে দেখা যায়, পর্দার দুই পাশে তিনটা হাত-দুইজন ভিন্ন ব্যক্তির। একজনের হাতে একটা কলম, তিনি কিছু লেখার চেষ্টা করছেন নিচে রাখা কাগজে। আরেকজনের দুই হাতে ধরা লাল সুতাওয়ালা নাটাই। কলমটা বাঁধা আছে সেই সুতায়। ডান দিকের হাত কী লিখতে পারবে, না পারবে-সমস্তই নিয়ন্ত্রণ করছে বামের নাটাই হাতের মানুষটি।
চলচ্চিত্রটি মূলত স্বাধীনতা নিয়ে। মুক্তির অদ্ভুত আকাক্সক্ষা নিয়ে চলচ্চিত্র জুড়ে ছড়ানো রয়েছে বহু প্রতীক, অজস্র রঙ। কিন্তু মুক্তির এই গল্প তৈরি হয়েছে আধুনিক কবিদের ভাষায়। ২০ শতকের গোড়ার দিকে ডব্লিউ বি ইয়েটস, টি এস এলিয়ট; বা ৩০-এর দশক থেকে জীবনানন্দ দাশ যেই গহীন, গম্ভীর, উদাস শব্দে লিখে গেছেন কবিতা, সেই রকম ভাষা পাওয়া যায় এই চলচ্চিত্রে। আবারও বোঝা যায়, ব্রহ্মপুত্রের এই সন্তানেরা কবিতার সুরে চলচ্চিত্র বানানোর এক নতুন শৈলি তৈরি করেছেন। এই দেশ, এই শহর, এই সময়-সমস্তকে ধারণ করে বয়ে চলা নদীর স্রোত যেমন গম্ভীর, উদাস আর গহীন।
২০১৭-তে আরও তিনটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ফিল্মমেকার প্রডাকশনস-এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম, মিডাস টাচ এবং ফুল’স প্যারাডাইস।
মিডাস টাচ কথা বলে
একটা বিষয় না বললেই নয়, কাগজের নৌকা থেকে এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম পর্যন্ত চলচ্চিত্র যাত্রায় কোনো সংলাপের ব্যবহার ছিলো না। মিডাস টাচ-এ এসে প্রথম তারা সংলাপ ব্যবহার করেন। ময়মনসিংহ শহরের একজন প্রতিমা শিল্পীর মুখে তার নিজের জীবন, শিল্প, পরিবার আর সন্তানের কথা শুনতে শুনতে চলচ্চিত্রের শুরু। অনেকটা সাক্ষাৎকারের মতো শোনালেও এই কথাগুলো আসলে এক জবানে হাজার গল্প বলে চলে। দর্শক অবশ্য সেই প্রতিমা শিল্পীর মুখ দেখতে পায় না। কেবল তার কাজ দেখানো হয় পর্দায়। যে হাতে কাজ করেন, সেই হাতও দেখানো হয়।
১১ মিনিটের সাদাকালো চলচ্চিত্রটির মাঝামাঝি এসে দর্শক একজন নির্মাণ-শ্রমিকের কণ্ঠ শুনতে পায়। যদিও ছবি ভিন্ন গল্প বলে। একটা সাদা ধবধবে কাপড়ে ঢাকা টেবিলে একটা খালি ঝুড়ি রাখা। একের পর এক গোলাকার ফল রেখে ঝুড়ি ভরছে কোনো একজন না-দেখা মানুষের হাত। খানিক পরে দেখা যায়, সারি সারি করে রাখা হাজার টাকার নোট। উপরে প্রচুর ধাতব মুদ্রা; এক জোড়া কালো হাত সেই মুদ্রা বিলিয়ে যাচ্ছে। এরপর বহমান নদী। এই চলচ্চিত্রেও কয়েকটা আলাদা আলাদা গল্প আছে। সব গল্প মিলিয়ে তৈরি হয় আরেকটা নতুন গল্প।
আবার গল্পহীনতাও আছে। এই চলচ্চিত্রের খানিকটা প্রামাণ্যচিত্রের আদলে তৈরি, আর বাকিটা কবিতা। মিডাস টাচ শেষ হয় একটা অ্যাবসার্ড ইমেজের মধ্য দিয়ে। কেউ একজন একটা চালকুমড়া কিনে নদীর শুকনা বুকে চেয়ার পেতে বসে, তা ছোটো ছোটো টুকরো করে কাটছে। এরপর সামনের টেবিলে রাখা গয়না মাপার পাল্লায় মেপে ভরে রাখছে ছোটো ছোটো গয়নার বাক্সে।
সাক্ষাৎকারে শুরু অ্যাবসার্ডিটিতে শেষ হওয়া এই চলচ্চিত্র একাধারে অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দেয়। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতির নানা গলদকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করে; তেমনই মানুষের শ্রম, ঘাম আর কাজের ফলাফল প্রাপ্তি নিয়েও প্রশ্ন তোলে নানা অংশে, প্রতীকী ঢঙে।
ময়মনসিংহ থেকে প্যারিস
ফিল্মমেকার প্রডাকশনস-এর চলচ্চিত্রগুলো দেশে-বিদেশে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। যেমন, কাগজের নৌকা রাশিয়ার ‘কিনোপ্রভা ফিল্ম ফেস্টিভালে’ দেখানো হয়। অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলোও বিভিন্ন সময় প্রদর্শিত হয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে সবচেয়ে বড়ো সাফল্য আর অনুপ্রেরণার দেখা মেলে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের শেষে। এই দলের পরিচালক রাজিব খান পাঠান বাপ্পি এক অনন্য সম্মানে ভূষিত হন। ‘প্যারিস ইন্টারন্যাশলান ফিল্ম ফেস্টিভালে’র অন্যতম বিচারক নির্বাচিত হন তিনি। খবরটি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে বেশ দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে।
ফিল্মমেকার প্রডাকশনস-এর কাজের সমস্তই ময়মনসিংহে করা হয়। এখানেই তৈরি হয় গল্প, চিত্রনাট্য। এখানেই চলে দৃশ্য আর শব্দ ধারণ। এখানকার মানুষই অভিনয় করে। সম্পাদনার কাজও এখানেই হয়। ঢাকার বাইরেও যে মান সম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব তা প্রমাণ করে ছেড়েছে এই তরুণের দল। নিজেদের কাজ নিয়ে আরো নানারকম নিরীক্ষার ইচ্ছা আছে তাদের। ভবিষ্যতে তারা দীর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মাণেরও স্বপ্ন দেখে। নিজেদের সাতন্ত্র্য বজায় রেখে নিজেদের বার বার ভেঙে ফেলার ইচ্ছাও আছে তাদের; তাই বিচিত্র গল্প আর বিভিন্ন চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করতে চান শীঘ্রই।
তারা স্বীকার করে, এই শহর আর এই নদ ছেড়ে দূরে গেলে হয়তো আর এভাবে চলচ্চিত্র বানাতে পারবে না। এই যে তাদের চলচ্চিত্রের কবি হয়ে ওঠার চেষ্টা; এই যে তাদের চলচ্চিত্র অন্য সুরে কথা বলতে জানে, ভিন্ন রঙে ফুটতে জানে-সবকিছুর পিছনে এই শহরের রূপ-রঙ-গন্ধ, নদীর জল, আকাশ-মাটি ইত্যাদির অসামান্য অবদান আছে।
চলচ্চিত্র আর ব্রহ্মপুত্র-এই দুই ভালোবাসা তাদের স্বপ্ন দেখিয়ে ধীরে সুদূরে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
লেখক : আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে পড়ান।
muktadir137@gmail.com
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন