মো. হারুন-অর-রশিদ
প্রকাশিত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
'ট্যাক্সি ড্রাইভার' : পুঁজির ভয়ানক ছোবলের জীবন্ত সাক্ষী
মো. হারুন-অর-রশিদ

বিশ্ব-অর্থনীতি গুটিকয়েক ব্যক্তির মুঠোয় বন্দি। বিশ্বের মোট সম্পদের প্রায় ৯৯ ভাগই তাদের মালিকানাধীন, বাকি একভাগ পুরো বিশ্ববাসীর। অর্থনীতির অভূতপূর্ব এ বৈষম্য কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। যেদিন মানুষ উৎপাদন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, সেদিনই এর বিস্তার শুরু। এ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলে এক অনন্য অর্থনৈতিক কাঠামো, যা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে ব্যক্তির সামাজিক চৈতন্য সৃষ্টিতে। ফলে সময়ের পরিক্রমায় শোষণের স্বীকৃত অস্ত্র হয়ে ওঠে পুঁজি। শ্রমিক পণ্য উৎপাদন করে আর সেই পণ্যকে কেন্দ্র করেই পুঁজিপতি তাদের শোষণ করে। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় নিচু স্তর থেকে রস শুষে নিয়ে পাঠানো হয় উপরের স্তরে। অর্থনীতির এই একরৈখিকতা একপর্যায়ে সমাজে বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়, সৃষ্টি হয় নানামুখী অবক্ষয়।
পুঁজি প্রাধান্যশীল বিশ্বে এ ধরনের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ আমেরিকা। পুঁজিবাদ যেখানে চরমে পৌঁছেছে, মানুষ ভুলে গেছে তার সত্তাকে; সেখানে মানুষ মাত্রই পুঁজির প্রতিনিধি। তবে আমেরিকাতেও যে এর বিরুদ্ধে কথা ওঠেনি এমন নয়, অনেকেই এর প্রতিবাদ করেছে, করছে; চেয়েছে মুক্তি। অন্যান্য মাধ্যমের সঙ্গে প্রতিবাদের এই ধারায় চলচ্চিত্রও ছিলো, আছে। কেননা চলচ্চিত্র শুধু পণ্য কিংবা বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং দৃশ্য-শ্রুত মাধ্যম হিসেবে এর প্রভাবন ক্ষমতা অনেক বেশি। এর একদিকে আছে যেমন কৃত্রিমতা, অন্যদিকে জীবন ছুঁয়ে যাওয়া বাস্তবতা। মার্টিন স্করসিস এমনই একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা, যিনি চলচ্চিত্রে কৃত্রিমতার পাশাপাশি সমাজ-বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এবারের আলোচনা মার্টিন স্করসিস ও তার ট্যাক্সি ড্রাইভার নিয়ে।
পুরো নাম : মার্টিন মার্কেন্টোনিও লুচিয়ানো স্করসিস (মার্টিন স্করসিস)
জন্ম : ১৭ নভেম্বর ১৯৪২, কুইন্স, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
চলচ্চিত্রে অবদান : আমেরিকান নবতরঙ্গ ধারার অন্যতম সফল নির্মাতা
মার্টিন-এর চলচ্চিত্র জীবন
চলচ্চিত্রশিল্প বিকাশে যে মানুষগুলোর অবদান অনস্বীকার্য, তাদের অন্যতম মার্টিন মার্কেন্টোনিও লুচিয়ানো স্করসিস (Martin Marcantonio Luciano Scorsese)। চলচ্চিত্রপাড়ায় যিনি মার্টিন স্করসিস নামে পরিচিত। তিনি একাধারে নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক ও অভিনেতা। প্রায় অর্ধশতক ধরে চলচ্চিত্র জগতে বিচরণকারী মার্টিনের জন্ম নিউইয়র্কের কুইন্সে, ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর। মার্টিনের বাবা চার্লস স্করসিস ও মা ক্যাথরিন স্করসিস নিউইয়র্কের একটি গার্মেন্টে কাজ করতেন। কারখানায় কাজের পাশাপাশি তারা অভিনয়ও করতেন। এদিকে ছোটোকাল থেকেই হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ায় খেলাধুলা করতে পারতেন না মার্টিন। পরিস্থিতি এতো খারাপ ছিলো যে, তিনি অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক কাজকর্মেও সক্রিয় থাকতে পারতেন না। সেকারণে তার বাবা ও বড়ো ভাই প্রায়ই মার্টিনকে নাটক-চলচ্চিত্র দেখাতে নিয়ে যেতেন। এভাবে জীবনের একেবারে শুরু থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি মার্টিনের ভালোবাসার জন্ম।
চলচ্চিত্রের প্রতি মার্টিনের এই ভালোবাসা স্কুলে এসে আরো প্রবল হয়। তখন বাড়ির পাশে একটি দোকানে প্রজেক্টরসহ চলচ্চিত্রের রিল ভাড়া পাওয়া যেতো। সেখানেই ছিলো দ্য টেলস অব হফম্যান-এর একটি রিল। সেই দোকান থেকে মার্টিন সেটি ভাড়া নিয়ে বাড়িতে এনে দেখতেন। এছাড়া প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখা তো ছিলোই। কলেজ পেরিয়ে মার্টিন ভর্তি হন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াশিংটন স্কয়ার কলেজে। সেখান থেকে তিনি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি সাহিত্যে সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। এ সময় চলচ্চিত্রের প্রতি তার ভালোবাসা শুধু দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরো গভীরে যায়। ইংরেজি সাহিত্য পড়ার পাশাপাশি মার্টিন এ সময় নির্মাণ করেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হোয়াট’স অ্যা নাইস গার্ল লাইক ইউ ডুইঙ ইন অ্যা প্যালেস লাইক দিস? (১৯৬৩) ও ইট’স নট জাস্ট ইউ, মুরে! (১৯৬৪)।
স্নাতক শেষ করে মার্টিন ভর্তি হন চারুকলায়। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্টস থেকে তিনি স্নাতকোত্তর করেন। সাহিত্য, শিল্পকলায় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে মার্টিন আবার হাত দেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে তিনি নির্মাণ করেন বিখ্যাত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য বিগ শেভ; যা ভিয়েত ’৬৭ নামেও পরিচিত। চলচ্চিত্রটি নিয়ে সেসময় বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয়। একই বছর মার্টিন তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হু’স দ্যাট নকিঙ অ্যাট মাই ডোর নির্মাণ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে মার্টিন ভারতীয় অভিনয়শিল্পী সাবু দস্তগীর এবং আমেরিকান মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনয়শিল্পী ভিক্টর মার্চার-এর অভিনয় দ্বারা বেশ প্রভাবিত হন। মাইকেল পাওয়েল ও ইমারিক প্রেসবার্জার-এর ব্ল্যাক নার্কিসাস-এর (১৯৪৭) নির্মাণ কৌশল এবং ঐতিহাসিক মহাকাব্যভিত্তিক চলচ্চিত্র হাওয়ার্ড হক্স-এর ল্যান্ড অব দ্য ফারাওস ও অ্যান্থনি মান-এর ইএল সিড তার চলচ্চিত্রিক চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে। ইতালিয় নব্য-বাস্তববাদ ধারায় প্রভাবিত মার্টিন সেসময় এর প্রশংসা করেন। শুধু তা-ই নয় ইতালির নব্য-বাস্তববাদ ধারা নিয়ে তিনি মাই ভয়েস টু ইতালি (Il mio viaggio in Italia) নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেন। মার্টিন তার চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণে ফ্রেন্স নিউওয়েভের কাছেও দায়স্বীকার করেন। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, ‘বর্তমানেও যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে তারা ফ্রেন্স নিউওয়েভ দ্বারা প্রভাবিত, তারা সেসব চলচ্চিত্র দেখুক আর না দেখুক।’ এছাড়াও মার্টিনের কর্মজীবনে সত্যজিৎ রায়, ইঙ্গমার বার্গম্যান, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো আন্তোনিও ও ফেদরিকো ফেলিনি যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।
মার্টিন মনে করেন, একজন নির্মাতার চারটি গুণ থাকা আবশ্যক-ভালো গল্পকথন, জাদুকরী ক্ষমতা, অন্যের চলচ্চিত্র থেকে নেওয়ার ক্ষমতা (smuggler) ও মূলধারায় আঘাত করার ক্ষমতা। নির্মাতা হিসেবে মার্টিন অবশ্য এগুলোর যথাযথ প্রয়োগের চেষ্টাও করছেন। তার চলচ্চিত্রে আমেরিকান নবতরঙ্গ ধারার প্রভাব লক্ষণীয়। যেখানে তিনি সিসিলিয়ান-আমেরিকান জাতীয়তাবাদ, রোমান ক্যাথলিকের ভ্রান্ত ধারণা, দায়মুক্তি, ধর্ম বিশ্বাস, সাহসিকতা, ক্রমবর্ধমান অপরাধ ও সংঘবদ্ধ সহিংসতাকে নিপুণ দক্ষতায় তুলে ধরেন। তবে অপবিত্রতা ও সহিংসতার উদার ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধবোধকে তুলে ধরায় বেশ খ্যাতি রয়েছে মার্টিনের।
এছাড়া মার্টিনের চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ধীর গতির ব্যবহার। কোনো বিষয়কে সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরতে তিনি অনন্য এক কৌশল ব্যবহার করেন; যাকে বলা হয়, ‘ফ্রিজ ফ্রেম’। ‘ফ্রিজ ফ্রেম’ কৌশলকে ‘ফ্রিজ ফ্রেম শট্’ বলা হয়। এতে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে একটি শট্ বার বার দেখানো হয়। অনেক সময় স্থির দৃশ্য কিংবা শব্দের পুনঃব্যবহার করেও এটা বোঝানো হয়। সাধারণত তার চলচ্চিত্রে নারীকে স্বর্গীয় অপ্সরী বা দেবীরূপে তুলে ধরা হয়। সেজন্যই চলচ্চিত্রে স্বর্ণকেশী, ফর্সা, সাদা পোশাক পরিহিত প্রধান নারীচরিত্রগুলো ধীর গতিতে আবির্ভূত হয়। এমনকি তার অধিকাংশ চলচ্চিত্রের মূল নারীচরিত্রের বিষয়ে পুরুষচরিত্র দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। তারা নারীকে কল্পনা করে, কামনা করে, কিন্তু তার কাছে যেতে পারে না।
মার্টিন তার চলচ্চিত্রে প্রায়শই লঙ ট্রাকিঙ শট্ ব্যবহার করেন। জনপ্রিয় আবহসঙ্গীত, আক্রমণাত্মক ক্যামেরা ভঙ্গি ও দ্রুত সম্পাদনা তার নির্মাণের অন্যতম কৌশল। কখনো কখনো নির্দিষ্ট চরিত্রকে দৃশ্যে ফুটিয়ে তুলতে রংধনুর ব্যবহারও করেন তিনি। পর্দায় না ফেলে নিজের কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে গল্পের সারমর্ম তুলে ধরা চলচ্চিত্র-নির্মাণে তার আরেকটি কৌশল। বর্তমানেও তার নির্মিত চলচ্চিত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন রূপে তুলে ধরা হয়। তবে তিনি চলচ্চিত্রে বিষয় হিসেবে কলুষতা বা অপরাধকেই বেশি প্রাধান্য দেন। এ বিষয়ে পুলিৎজার বিজয়ী চলচ্চিত্র সমালোচক রজার এবার্ট-এর প্রশ্নের উত্তরে মার্টিন বলেন,
সে [ট্যাক্সি ড্রাইভার-এর ট্রাভিস] কিন্তু বরাবর যেখানে ভায়োলেন্সের সূত্রপাত, সেখানেই ফিরে যাচ্ছিলো। এক সমালোচক আমার কাছে জানতে চেয়েছেন, ফোর্টি সেকেন্ডে স্ট্রিটকে নরকের রূপক হিসেবে এতোবার ব্যবহার করা যৌক্তিক কি না? কিন্তু আদতে এটাই নরকের ধর্ম, নরক থেমে থাকে না, ফিরে আসে। সে এই নরক থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। আমরা ইচ্ছা করেই তার অতীত সম্পর্কে তেমন কিছুই জানায়নি। সে অজানা কোথাও থেকে এসে সমস্যাগুলোকে পথিমধ্যে নিজের সঙ্গী করে নিয়েছে।
যাহোক, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে বক্সার বার্থা নির্মাণ করেন মার্টিন। রজার করম্যান এর প্রযোজক ছিলেন। এ সময় রজারের কাছ থেকে মার্টিন পরামর্শ নেন কীভাবে অল্প সময় ও অল্প বাজেটে বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায়। অবশ্য এর ফল পাওয়া যায়, ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত তার মিন স্ট্রিটস-এ। পরের বছর মার্টিনের এলিচ ডাজেন্ট লিভ হেয়ার অ্যানিমোর-এ (১৯৭৪) অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ নারী অভিনয়শিল্পীর অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পান ইলেন বার্স্টিন। আর নির্মাতা হিসেবে আরো এক ধাপ এগিয়ে যান তিনি। ওই বছরই মার্টিন তার মা-বাবার জীবনী নিয়ে নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র ইতালি-আমেরিকান।
এর এক বছর পর নিঃসঙ্গ এবং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এক ব্যক্তির সমাজের প্রতি ক্ষোভ নিয়ে মার্টিন নির্মাণ করেন ট্যাক্সি ড্রাইভার (১৯৭৬)। এটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ চারটি বিভাগে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরস্কার পায় না। তবে অস্কার না পেলেও এটি তিন শাখায় বাফটা ও কান-এ পাম ডি’অর (Palme d'Or) জিতে নেয়। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে মার্টিন দক্ষ নির্মাতাদের তালিকায় জায়গাও করে নেন। শুধু তা-ই নয়, চলচ্চিত্রটির জন্য সমালোচকদের অনেক প্রশংসা পান তিনি। ট্যাক্সি ড্রাইভার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মার্টিন নির্মাণ করেন বড়ো বাজেটের নিউইয়র্ক, নিউইয়র্ক (১৯৭৭)। তবে এ চলচ্চিত্রটি আশানুরূপ সফল না হওয়ায় তিনি কিছুটা হতাশায় পড়েন। এর কয়েক বছর পর বক্সিং চ্যাম্পিয়ন জ্যাক লা মোতা’র জীবনী নিয়ে মার্টিন তার সবচেয়ে আলোচিত র্যাগিঙ বুল (১৯৮০) নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্র জগতে এটি গৃহীত হয় মাস্টারপিস হিসেবে; এমনকি ব্রিটেনের ‘সাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ ম্যাগাজিন ৮০’র দশকে নির্মিত শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি দেয় র্যাগিঙ বুলকে। এটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতাসহ আটটি বিভাগে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পায়। প্রথমবারের মতো শ্রেষ্ঠ নির্মাতা হিসেবে অস্কারে মনোনয়ন পান মার্টিন। তবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বখ্যাত রবার্ট ডি নিরো’র শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী এবং সম্পাদনায় স্কনমেকার-এর পুরস্কার নিয়েই খুশি থাকতে হয়।
১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে মার্টিন প্রথমবারের মতো ব্যঙ্গধর্মী দ্য কিং অব কমেডি নির্মাণ করেন। পরাবাস্তববাদ ধারায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্ব গণমাধ্যম ও তারকাদের নানা দিক তুলে ধরেন তিনি। মার্টিন ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে অল্প বাজেটে নির্মাণ করেন আফটার আওয়ার। এর পরের বছর তিনি দ্য কালার অব মানি নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পীর অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পান পল নিউম্যান। চলচ্চিত্রটির এমন সফলতায় উজ্জীবিত হয়ে মার্টিন নির্মাণ করেন দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অব ক্রিস্ট (১৯৮৮)। ৯০-এর দশকের শুরুতে তিনি নির্মাণ করেন গ্যাঙস্টার চলচ্চিত্র গুডফেলাস। চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ নির্মাতাসহ ছয়টি বিভাগে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পায়। গুডফেলাস-এ অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ¦চরিত্র অভিনয়শিল্পী হিসেবে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পান জো পেসকি (joe pesci)।
১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে মার্টিন নির্মাণ করেন ক্যাপ ফেয়ার। দ্য অ্যাভিয়েটর (২০০৪) ও দ্য ডিপার্টেড (২০০৬) নির্মাণের আগ পর্যন্ত তার সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ছিলো এটি। ক্যাপ ফেয়ার দুইটি বিভাগে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পায়। এরপর ১৯৯৩-এ দ্য এজ অব ইনোসেন্স নির্মাণ করে নিজেকে একজন ব্যতিক্রমধর্মী নির্মাতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন মার্টিন স্করসিস। যা চলচ্চিত্রপাড়ায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যসহ পাঁচটি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে শেষ পর্যন্ত কেবল কস্টিউম ডিজাইনে অস্কার জিতে নেয়। ১৯৯৭-তে কুনডুন নির্মাণ করেন মার্টিন। কুনডুন নির্মাণের পাঁচ বছর পর তিনি নির্মাণ করেন তার অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্র গ্যাঙস অব নিউইয়র্ক (২০০২)। যা শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, অভিনয়শিল্পী, পরিচালকসহ ১০টি বিভাগে অস্কারে মনোনয়ন পায়। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত দ্য অ্যাভিয়েটর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, পরিচালক, চিত্রনাট্য ও অভিনয়শিল্পীসহ ছয়টি বিভাগে গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পায়। পরে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও অভিনয়শিল্পীসহ তিনটি বিভাগে পুরস্কার পায় দ্য অ্যাভিয়েটর।
বিংশ শতাব্দীতে সঙ্গীত শিল্পী বব ডিলান ও আমেরিকার শিল্প-সংস্কৃতিতে তার প্রভাব নিয়ে মার্টিন নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র নো ডিরেকশন হোম (২০০৫)। ২০০৬-এ দ্য ডিপার্টেড নির্মাণ করে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছান তিনি। এটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, চিত্রনাট্য, সম্পাদনা বিভাগে অস্কার পায়। শুধু তা-ই নয়, এর আগে মার্টিনের অনেক চলচ্চিত্র বিভিন্ন বিভাগে অস্কার পেলেও এটিই ছিলো নির্মাতা হিসেবে তার প্রথম পুরস্কার। এছাড়া দ্বিতীয় বারের মতো শ্রেষ্ঠ পরিচালকের গোল্ডেন গ্লোব জিতে দ্য ডিপার্টেড। চলচ্চিত্রটি একশো ২৯.৪ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসাও করে। এরপর ২০১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি নির্মাণ করেন শাটার আইল্যান্ড। যা মার্টিনের সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী জর্জ হ্যারিসনকে নিয়ে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র জর্জ হ্যারিসন : লিভিং ইন দ্য ম্যাটারিয়াল ওয়ার্ল্ড। ওই বছরই তিনি নির্মাণ করেন থ্রিডি চলচ্চিত্র হুগো। প্রথমবারের মতো থ্রিডি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তৃতীয় বারের মতো গোল্ডেন গ্লোব পান তিনি। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি নির্মাণ করেন দ্য ওল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট।
মার্টিন চলচ্চিত্র-নির্মাণের পাশাপাশি হলিউডের ম্যাড ডগ অ্যান্ড গ্লোরি (১৯৯৩), ক্লোকারস (১৯৯৫) এবং অল্প বাজেটের দ্য গ্রিফটার (১৯৯০), ন্যাকেড ইন নিউইয়র্ক (১৯৯৩), গ্রাস অব মাই হার্ট (১৯৯৬), দ্য হাই লো কান্ট্রি (১৯৯৮), উইথ ক্লোজড আই (১৯৯৪), লাইম লাইফ (২০০৮) ও দ্য ইয়ঙ ভিক্টোরিয়া (২০০৯) প্রযোজনা করেন। কিংবদন্তি এই নির্মাতা এ পর্যন্ত মোট ২৩টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। বর্তমানে তিনি ব্যস্ত আছেন দ্য আইরিশ ম্যান-এর নির্মাণকাজ নিয়ে। যেটি ২০১৮-তে মুক্তি পাবে।
ব্যক্তিগত জীবনে মার্টিন এ পর্যন্ত পাঁচ বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সংসার গড়েন লারাইনে ম্যারি ব্রেনান-এর সঙ্গে। ১৯৭১-এ তাদের বিচ্ছেদের পর ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে জুলিয়া ক্যামেরুনের সঙ্গে ঘর বাঁধেন তিনি। মাত্র এক বছর স্থায়ী হয় তাদের সংসার। এর পর অভিনয়শিল্পী ইসাবেলা রোসেলিনির সঙ্গে কাটান তিন বছর (১৯৭৯-১৯৮২)। মার্টিন ১৯৮৫-তে বারবারা ডি ফিনা’র সঙ্গে চতুর্থ বারের মতো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে তাদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে এসে হেলেন মরিসকে বিয়ে করেন তিনি। ক্যাথেরিন, ডমেনিকা ও ফ্রান্সেস্কা নামে তিন কন্যার জনক মার্টিন; যারা প্রত্যেকেই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত।
মার্টিন স্করসিস নির্মিত চলচ্চিত্র ২০টি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, ২৩টি বাফটা ও ১১টি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। জীবিত নির্মাতাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পেয়েছে মার্টিনের চলচ্চিত্র। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘চলচ্চিত্র ফাউন্ডেশন’ নামে একটি অলাভজনক চলচ্চিত্র সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং ২০০৭-এ প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিশ্ব চলচ্চিত্র ফাউন্ডেশন’।
গল্প-কথায় ট্যাক্সি ড্রাইভার
চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, ট্যাক্সি ড্রাইভার পোস্টমডার্ন যুগের অন্যতম প্রভাবশালী চলচ্চিত্র। এখন পর্যন্ত সেলুলয়েড জগতকে প্রভাবিত করার মতো নির্মাতা, লেখক, প্রযোজক কম আসেনি। তাদের সবাই কাউকে না কাউকে প্রভাবিত করেছে। কখনো কখনো নিউওয়েভ, ফ্রি সিনেমার মতো নতুন চলচ্চিত্র দৃষ্টিভঙ্গির দ্বার উন্মোচন করেছে এদের কেউ। আবার কখনো গল্প বলার কিংবা দৃশ্যায়ণের আঙ্গিকই বদলে দিয়েছে। এক্ষেত্রে ট্যাক্সি ড্রাইভার একক চলচ্চিত্র হিসেবে যতোটা সফল, তা হয়তো অন্য কোনোটির চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে হয়নি।
ট্যাক্সি ড্রাইভার নির্মাণের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে চিত্রনাট্যকার পল শ্র্যাডারের। পল তখন ২৭ বছরের তরুণ। মাত্র কদিন আগেই স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে; আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে বিবাদ আর সমালোচকের চাকরি হারানো নিয়ে রীতিমতো বিধ্বস্ত তিনি! পকেটে তখন কানাকড়িও নেই, সম্বল বলতে নিজের একটা গাড়ি, সেখানেই তিনি বেশিরভাগ সময় কাটান। আর পুসিক্যাট নামে এক পর্নোগ্রাফিক থিয়েটারে গিয়ে শ্র্যাডার রাতের ঘুম সেরে নেন। এ রকম সময়েই পেটের আলসার বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হন শ্র্যাডার। আর তখনই তার মনে হয়, আমেরিকার রাস্তায় ট্যাক্সি নামের চলমান লোহার কফিনে তিনি দেখেছেন তার মতোই আরো অনেককে! চোখে-মুখে কোনোরূপ অভিব্যক্তি ছাড়া হাজারো তরুণ হলুদ ট্যাক্সির স্টিয়ারিঙ হাতে নিশিকন্যা, গুণ্ডা-পাণ্ডা, বারবনিতা কতোজনকে সওয়ার করে চলেছে রাতবিরেতে, যেনো তারা সবাই মিলে এই সমাজ তৈরি করেছে; অথচ প্রত্যেকেই একা! এর পর এক মাসের মধ্যে প্রাক্তন এক প্রেমিকার বাসায় বসে ৬০ পৃষ্ঠার একটা খসড়া লিখে ফেলেন শ্র্যাডার, যেটা পরবর্তী সময়ে জন্ম দেয় চলচ্চিত্র জগতে এক মাইলফলকের!
মার্টিনের এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনার কথা ছিলো না। ব্যাপারটা নেহাতই দৈবাৎ। পল শ্র্যাডার প্রথমে স্ক্রিপ্ট দেখান স্কারফেইস, দ্য আনটাচেবলস খ্যাত কিংবদন্তি পরিচালক ব্রায়ান ডি পালমা’কে। ব্রায়ান ডি পালমা তখন থাকতেন নিকোলস বিচে। সেখানে প্রতিবেশী প্রযোজক মাইকেল ফিলিপস’কে তিনি একদিন বলেন, হাতে নতুন এক স্ক্রিপ্ট রাইটারের লেখা একটা স্ক্রিপ্ট আছে। ফিলিপস চাইলে এটা নিয়ে কাজ করতে পারেন। স্ক্রিপ্ট পড়েই ফিলিপস সিদ্ধান্ত নেন, তিনি চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করবেন। এরপর খোঁজাখুঁজি শুরু হয় নির্মাতার। শ্র্যাডার আর ফিলিপস দুইজনই মার্টিনের মিন স্ট্রিটস দেখে সিদ্ধান্ত নেন, তরুণ নির্মাতা মার্টিনই হবেন তাদের এই কাহিনির পরিচালক আর রবার্ট ডি নিরো হবেন সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার। এর পরের কাহিনি চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাস!
ট্যাক্সি ড্রাইভার একজন নিঃসঙ্গ, একাকী মানুষের গল্প। ট্রাভিস বিকল তখনকার লক্ষাধিক আমেরিকান তরুণের মতোই একজন, যিনি ইউ এস মেরিনের হয়ে সদ্য শেষ হওয়া ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশে ফিরেছেন। পুরো আমেরিকায় তখন চলছে এক অস্থির সময়। সমগ্র জাতি হতাশ, বিভ্রান্ত। ট্রাভিস সেই সময়েরই একজন প্রতিনিধি। তিনি ইনসমনিয়া’য় (রাতে ঘুমাতে না পারা) আক্রান্ত। ফলে রাতের বেলায় কেবলই ট্যাক্সি চালান। দুর্বিষহ সময় কাটিয়ে একটু ক্লান্ত হওয়ার জন্য তার এ জেগে থাকা! চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখা যায়, ট্রাভিস নামের ২৬ বছরের এক যুবক ট্যাক্সি ড্রাইভারের চাকরির জন্য সাক্ষাৎকার দিতে আসেন। যখন গ্যারেজ ম্যানেজার তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনার ড্রাইভিং রেকর্ড কেমন? মুখে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটিয়ে ট্রাভিস উত্তর দেন, ‘পরিষ্কার, একদম আমার বিবেকের মতোই পরিষ্কার!’ যেনো ভিয়েতনাম যুদ্ধ-ফেরত ২৬ বছরের এই যুবক কয়েকদিনেই বুঝে গেছেন, পৃথিবীতে পরিষ্কার সত্য বা মিথ্যা বলে আদৌ কিছু নেই, সবই আপেক্ষিক!
এরপর চলচ্চিত্র এগিয়ে চলে ট্রাভিসের হলুদ ট্যাক্সি ক্যাবের মতো। ট্রাভিস পর্নোগ্রাফি দেখে একাকিত্ব ঘোচানোর চেষ্টা করেন। তবে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হলেও তিনি পতিতা, চোর, বাটপার, বদমায়েশদের মোটেও সহ্য করেন না। একদিন প্রচুর বৃষ্টি হয়ে সব ময়লা পরিষ্কার হয়ে যাবে-এমনটাই ভাবনা ট্রাভিসের। গল্পের একপর্যায়ে নিঃসঙ্গ ট্রাভিস স্বপ্ন দেখেন বেটসি নামের এক নারীকে কাছে পাওয়ার। যিনি আমেরিকার সিনেটর প্রার্থী চার্লস প্যালাটিনের সমর্থক। প্রথম পরিচয়ে তাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে, একদিন বেটসিকে প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে যান ট্রাভিস। সেখানে চলা পর্নোগ্রাফি ট্রাভিসের কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও বেটসি’র কাছে ছিলো ঠিক বিপরীত, অস্বাভাবিক ও ঘৃণ্য। রেগে প্রেক্ষাগৃহ থেকে চলে যান বেটসি। ট্রাভিস তার ভালোবাসার কথা তাকে বোঝোতেও ব্যর্থ হন। এরপর ট্রাভিসের সঙ্গে তিনি আর যোগাযোগও রাখেন না। এমতাবস্থায় আবারও হতাশা গ্রাস করে তাকে, ঘিরে ধরে একাকিত্বের সেই যন্ত্রণা। পরিস্থিতি তাকে এতোটাই একাকী করে দেয় যে, আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব-ই ছিলো তার একমাত্র কথা বলার সঙ্গী। আর সব একাকী মানুষের মতো নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আর ইউ টকিঙ টু মি’। একপর্যায়ে বেটসি’র সমর্থিত প্যালাটিনকে হত্যার চেষ্টাও করেন হতাশ ট্রাভিস। কিন্তু ব্যর্থ হন।
এরই মধ্যে রাতের ঝলমলে আলোর রাস্তায় ইরিশ নামের এক যৌনকর্মীর সঙ্গে পরিচিত হন ট্রাভিস। ইরিশ তার মনে দাগ কাটে, তাকে ভাবায়। ট্রাভিস এবার ইরিশকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। তার সঙ্গে দালালের যে আচরণ, তা কোনোভাবে মানতে পারেন না ট্রাভিস। তিনি স্বপ্ন দেখেন ইরিশ’কে বৃত্তবন্দি দশা থেকে মুক্ত করার। কিন্তু তাকে দালাল ম্যাথিউয়ের ছাঁয়ামুক্ত করাটা এতো সহজ ছিলো না। তবুও ট্রাভিস দমে যান না। একদিন তিনি পতিতালয়ে দালালদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধান। ম্যাথিউ ও তার সহকারীদের হত্যা করে ইরিশকে অনাকাক্সিক্ষত জীবন থেকে মুক্ত করেন তিনি। ইরিশ পরিবারে ফিরে, আবারও স্কুলে যাওয়া শুরু করে। এদিকে গণমাধ্যমের কল্যাণে রাতারাতি নায়ক বনে যান ট্রাভিস, ফিরে যান পুরনো পেশায়। বেটসি’র সঙ্গে আবারও দেখা হয় তার। কিন্তু পুনরায় সম্পর্ক গড়ার ইচ্ছা আর থাকে না ট্রাভিসের। মোটাদাগে এই ছিলো ট্যাক্সি ড্রাইভার-এর কাহিনি।
আসলে ট্যাক্সি ড্রাইভার ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের চেয়েও একটু বেশি কিছু। সেজন্যই হয়তো মুক্তির ৪০ বছর পরও ট্যাক্সি ড্রাইভার আশ্চর্য রকমের প্রাসঙ্গিক! ট্রাভিস ‘অস্বাভাবিক’ একটি চরিত্র হওয়া সত্ত্বে¡ও তার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় সহজেই। কারণ আদতে আমরা সবাই কখনো না কখনো তার মতোই একা। ট্রাভিস দেশের হয়ে যুদ্ধ করে আসার পরও বেটসি’র সঙ্গে প্রথম কথোপকথনেই বোঝা যায়, আসলে তিনি রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের যেকোনো কিছু নিয়ে কোনোদিনই মাথা ঘামাননি। অথচ রাষ্ট্র তাকে ইতোমধ্যেই শুষে নিয়ে জড়বস্তুতে পরিণত করে ফেলেছে। ট্রাভিস ব্যক্তিমানুষের নিজের ক্ষুদ্র সামর্থ্যরে সঙ্গে অস্বস্তিকর পরিচয় করিয়ে দেন নিজেকে। শেষমেষ যৌনকর্মী ইরিশকে বাঁচানোর মাধ্যমেই তিনি শান্তি খুঁজে ফিরেন। কিন্তু তাতেও কি ব্যক্তিমানুষের প্রত্যেকের হৃদয়ে বাস করা সেই নিঃসঙ্গ ট্যাক্সিচালক শান্তি পায়?
লেখক : মো. হারুন-অর-রশিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
harunmcj25@gmail.com
পাঠ সহায়িকা
http://www.filmsite.org/taxi.html; retrieved on 30.04.2017
http://mukhomukhosh.net/2016/04/14/taxi-driver-40yrs/; retrieved on 30.04.2017
http://www.biography.com/people/martin-scorsese-9476727; retrieved on 30.04.2017
http://archive.samakal.net/print_edition/details.php?news=28&view=archiev&y=2012&m=11&d=25&action=main&menu_type=tabloid&option=single&news_id=308272&pub_no=1235&type=; retrieved on 30.04.2017
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন