Magic Lanthon

               

 তামান্না মৌসী ও আলী আকবর শিপ্লু  

প্রকাশিত ২৫ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

  পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স : প্রযুক্তির কাছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের পরাজয়

 তামান্না মৌসী ও আলী আকবর শিপ্লু  

 

গল্পটি অচেনা মানুষদের নয়! রোজকার জীবনের ঘনিষ্ঠ ক’জন বন্ধুর একটি সান্ধ্য আড্ডাই এই চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য। তাহলে প্রশ্ন জাগতেই পারে, কেনো পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স! নির্মাতাও আসলে আমাদেরকে এই প্রশ্নের মুখোমুখিই করতে চেয়েছেন। প্রতিদিনের চেনা মুখগুলো কতোটা চেনা কিংবা কতোটাইবা অচেনা! কারো চেনা রূপের আড়ালে যে অচেনা রূপ লুকিয়ে থাকতে পারে, তার খোঁজে তিনি আমাদের ব্যতিব্যস্ত করতে চেয়েছেন। এই পৃথিবীতে একজন মানুষকে পুরোপুরি চেনা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকতেই পারে। তবে আড়ালের মানুষটাকে খুঁজে বের করা কতোটা জরুরি, এই প্রশ্নটাই হয়তো এক জীবনে সুখ ও অসুখের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

 

পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স-এ আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই এক সন্ধ্যায় প্লাস্টিক সার্জন রোকো ও থেরাপিস্ট ইভা দম্পতির বাড়িতে রাতের খাবার খেতে আসেন তাদের পাঁচ বন্ধু-লেলে ও শার্লট দম্পতি, কসিমো ও বিয়াঙ্কা দম্পতি এবং সদ্য বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া পেপে। যতোটুকু দেখা যায়, তাতে প্রত্যেককেই সুখী, হাসিখুশি মনে হয়; তারা আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। পেপে যে লুসিলো নামে নতুন একজন সঙ্গী পেয়েছেন সেটা সবাই জানতো। তার পরেও কেনো তিনি একা এসেছেন-সবার জিজ্ঞাসার জবাবে জানান, লুসিলো অসুস্থ তাই তাকে নিয়ে আসেননি।


আড্ডার পাশাপাশি খাওয়াদাওয়া, হাসিঠাট্টা চলতে থাকে। সাধারণত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাগুলোতে যেমন হয় আর কি! এসবের মধ্যেই কারো কারো ফোন বেজে ওঠে। কারোটাতে ক্ষুদেবার্তাও আসে। সবকিছুই স্বাভাবিক, যেমনটা হওয়ার কথা। এরই মধ্যে হঠাৎ একজন বলে ওঠেন-নিজ নিজ সঙ্গীর কাছে তাদের লুকোনোর কিছু আছে কি না? উপস্থিত কেউই গোপন কোনো কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করে না। কিছুক্ষণ তর্কবিতর্কের পর ইভার পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে, এরপর থেকে প্রত্যেকে যার যার ফোন সামনে রাখবে এবং যেকোনো কল বা ক্ষুদেবার্তার জবাব সবার সামনেই দেবে; সবাই কল রিসিভ করবে লাউড স্পিকারে। আর ক্ষুদেবার্তাগুলো পড়ে শোনাতে হবে সবাইকে। দু-একজন এতে মৃদু আপত্তি তুললেও একপর্যায়ে সবাই এই প্রস্তাব মেনে নেয়।


যথারীতি সবারই একটি-দুটি কল, ক্ষুদেবার্তা আসতে থাকে। সবাই প্রস্তাব মতো লাউড স্পিকারে কথা বলে; ক্ষুদেবার্তাও সবাইকে পড়ে শোনাতে থাকে। সেই সঙ্গে চলতে থাকে গল্পগুজব। কিন্তু বেশিক্ষণ সময়টা এমন স্বাভাবিক থাকে না। অল্পক্ষণের মধ্যে আমরা জানতে পারি, ইভা সার্জারি করে তার স্তনের আকার পরিবর্তন করতে চাইছেন, যেটা রোকো জানেন না। আবার রোকো থেরাপি নিচ্ছেন, যেটা ইভা জানেন না! অন্যরাও এসব জেনে বিস্মিত হয়। তবে ব্যাপারগুলো নিয়ে কেউই তেমন কথা বাড়ায় না। 


এরপর শার্লট-এর কাছে ফোন আসে এক বৃদ্ধাশ্রম থেকে, তাদের বেশকিছু সুযোগ-সুবিধার কথা জানিয়ে। লেলে অবাক হয়ে জানতে চান, বৃদ্ধাশ্রম থেকে তার কাছে কেনো ফোন এসেছে। শার্লট জানান, তার এক বান্ধবীর সঙ্গে গত সপ্তাহে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। সেসময়ই তারা তার ফোন নম্বর চেয়েছিলো এমনি-ই! লেলে এই যুক্তি মানতে নারাজ। তার ধারণা, শার্লট বৃদ্ধাশ্রমে গিয়েছিলেন, লেলের মাকে ওখানে রাখা যায় কি না তা যাচাই করতে। লেলের এই ধারণায় আপত্তি জানান শার্লট। কিন্তু তার কথাতেই এটি স্পষ্ট বোঝা যায়, শাশুড়ির সঙ্গে শার্লটের সম্পর্কটা তেমন ভালো নয়। রগচটা এই বৃদ্ধা প্রত্যেক ব্যাপারেই নাক গলান। লেলের বন্ধুরাও হেসে তার কথায় সম্মতি দেয়। দর্শকও বুঝতে পারে, ওই নারী আসলেই খানিকটা বদমেজাজি। 


এর মধ্যেই চন্দ্রগ্রহণ শুরু হয়; ওই সন্ধ্যায় একসঙ্গে চন্দ্রগ্রহণ দেখাটাও এই আড্ডার অন্যতম উপলক্ষ ছিলো। সবাই বারান্দায় গিয়ে চন্দ্রগ্রহণ দেখতে থাকে, সঙ্গে চলে সেলফি তোলাও। এরই এক ফাঁকে লেলে চুপিচুপি তার বন্ধু পেপে’কে ডেকে নেন। পেপের কাছে তিনি অনুরোধ করেন, যেহেতু তাদের দুই জনের ফোনই দেখতে এক, তাই ফোন দুটি কিছুক্ষণের জন্য অদলবদল করা যায় কি না। পেপে অবাক হয়ে জানতে চান, কেনো? লেলে জানান, রোজ রাত ১০টার সময় তার এক বান্ধবী তাকে ছবি পাঠায়; স্বভাবতই শার্লট এই ব্যাপারটি জানেন না। পেপের নতুন সঙ্গীকে কেউ দেখেনি, সুতরাং পেপে সহজেই এই দায় নিজের কাঁধে নিয়ে লেলে’কে বাঁচিয়ে দিতে পারেন! পেপে শুরুতে প্রবল আপত্তি জানালেও বন্ধুর আবেগী কথায় তার দাবি শেষ úর্যন্ত মেনে নেন। যথারীতি ঠিক রাত ১০টায় পেপের হাতে থাকা লেলের ফোনে একটি ছবি আসে। পেপে দেখাতে না চাইলেও সবাই জোর করে দেখে এবং পেপেকে নিয়ে হাসাহাসি করতে থাকে। তবে পেপের জন্য এটি কোনো ঝামেলা সৃষ্টি করে না। যেহেতু তার সঙ্গী এখানে নেই এবং কেউ তাকে দেখেওনি।


একটু পরেই লেলের হাতে থাকা ফোনে একটি ক্ষুদেবার্তা আসে। লেলের হাতের ফোনটি তো আসলে পেপের! সেই ক্ষুদেবার্তায় লুসিলো নামে একজন জানতে চান, তিনি এখন কোথায় আছেন? লেলে সবাইকে বলেন, তার এক সহকর্মী ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েছেন। লেলেকে বলেন পেপে, বলে দাও তুমি ঘরে আছো; কিন্তু বাকিরা যারা জানে না ফোনটি পেপের, তারা বলে, লেলে কেনো মিথ্যা বলবে! সবার চাপাচাপিতে লেলে উত্তর দেন, তিনি একটি পার্টিতে আছেন। এইভাবে কিছুক্ষণ ক্ষুদেবার্তা চালাচালির পর কল করেন ওই প্রান্তের ব্যক্তিটি। পেপের চরম আপত্তি সত্ত্বেও লেলে বাধ্য হন কলটি রিসিভ করতে। কথাবার্তার একপর্যায়ে সবাই চরম বিস্মিত হয়ে জানতে পারে, ওই প্রান্তের ব্যক্তিটি লেলের পার্টনার; মানে তারা সমকামি! বাকরুদ্ধ লেলে চেয়ে থাকেন পেপের দিকে। কিন্তু কিছু করার থাকে না দুজনের! তার স্বামী সমকামি, একথা জেনে শার্লট বুঝতে পারেন না কী বলবেন। তবে বেশকিছু দিন আগে থেকেই দুজনের সম্পর্কটা ঠিক ভালো যাচ্ছে না বলে বোঝা যায়। শার্লট এজন্য লেলেকে ছেড়ে যেতেও চান। কিন্তু পারেন না; কারণ কিছুদিন আগে শার্লট এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটান, যার দায় লেলে নিজের কাঁধে নিয়ে তাকে বাঁচিয়ে দেন। এজন্য স্থগিত করা হয় লেলের গাড়ি চালানোর লাইসেন্সও। কিন্তু সমকামি স্বামীর সঙ্গে বসবাস কী করে সম্ভব! যদিও শার্লটের কাছে এর কোনো উত্তর নেই। বাকিরাও বুঝতে পারে না, লেলে কী করে সমকামি হতে পারেন! আর লেলে বুঝতে অক্ষম, পেপে কী করে এই কাজ করলেন! অন্যদিকে পেপে বুঝতে পারেন না, সবাইকে আসল ঘটনা জানানো উচিত কি না!

 

কসিমোর কাছে বেশ কয়েকবার কল আসে; কিন্তু তিনি অফিসের সহকর্মী ফোন করেছেন বলে ধরেন না। একপর্যায়ে সবার চাপাচাপিতে তিনি কলটি রিসিভ করেন এবং ওপাশ থেকে একটি মেয়ে জানান, প্রেগনেন্সি টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। এ কথায় বিয়াঙ্কাসহ সবাই হতবাক হয়ে যায়! বিয়াঙ্কা রাগে-ক্ষোভে চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের বাইরে চলে যান। ইভা ব্যস্ত হন তাকে সান্ত্বনা জানাতে। বাকিদের প্রশ্নবোধক চোখ খুঁজে ফিরে কসিমোর চেহারা, যাতে এখন রাজ্যের অস্বস্তি ও লজ্জা! পুরো ঘরের পরিস্থিতি থমথমে। এরই মধ্যে দর্শক জানতে পারে ইভার কানে যে নতুন দুলজোড়া দেখা যাচ্ছে, তা কসিমোর দেওয়া! আমরা সহজেই বুঝতে পারি, কেনো ইভা তার বুকে সার্জারি করাতে যাচ্ছেন। বিয়াঙ্কা গোসলখানায় খিল এঁটে বসে থাকেন, আর ইভা চেষ্টা করেন তাকে বের করে আনতে। এমন ঘনঘটার মধ্যেই রোকো-ইভা দম্পতির মেয়ে ফোন করেন তার বাবাকে। কথায় কথায় হঠাৎ ইভাকে বিচ্ছিরি একটি গালি দেওয়ায় বোঝা যায়, মেয়ে তার মাকে কতোটা অপছন্দ করে। আবার ছেলেবন্ধুর সঙ্গে বাইরে বেরোনোর আগে রোকোই যে মেয়েকে কনডম দিয়েছেন, সেটা জেনে ইভার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার দশা হয়।


এক সন্ধ্যার জন্য এতোগুলো ঘটনা যথেষ্টই হতে পারতো, কিন্তু তা আর হয় না। শার্লটের কাছে আসা একটি ক্ষুদেবার্তা থেকে জানা যায়, তিনি এক অপরিচিত লোকের সঙ্গে নিয়মিত সেক্সটিং-এ (sexting-ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে যৌনতাবিষয়ক আলাপ আলোচনা) জড়িয়ে পড়েছেন। লেলে মানতে চান না লোকটি অপরিচিত, ইভা এসে পরিস্থিতি সামলে নেন। লেলে লোকটিকে কল করেন; শার্লট সেজে কথাও বলেন। বোঝা যায়, আসলেই লোকটি অপরিচিত যার সঙ্গে শুধুই ক্ষুদেবার্তা আদান-প্রদান হয়। সবশেষে আসে পেপের পালা। লেলেকে সমকামি বলে সবাই অপদস্থ করছে দেখে রেগেমেগে তিনি স্বীকার করে নেন, ফোনটি আসলে তার। আগের বান্ধবীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তিনি এ সম্পর্কে জড়িয়েছেন। তার মত, যে যাই বলুক না কেনো, যতো ঘৃণাই করুক না কেনো, প্রত্যেকেরই অধিকার আছে যার যার মতো সুখী হওয়ার। এবং পেপে তার নতুন এই অবস্থান নিয়েই সুখী।



৯৬ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে চমকের এখানেই শেষ নয়। বড়ো একটি চমক নির্মাতা রেখে দেন এর একদম শেষে। মনোমালিন্য আর তর্কবিতর্কের পরের দৃশ্যে হুট করে দেখা যায়, সবাই গাড়িবারান্দায় একে অন্যের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন! শুধু তা-ই নয়, প্রত্যেকে যার যার সঙ্গীকে নিয়ে গাড়িতেও চেপে বসেন হাসিমুখে। আর বাড়ির ভিতরে শোবার ঘরে ইভা অভিযোগের সুরে রোকোর কাছে জানতে চান-কেনো তিনি সবার সামনে ফোন রিসিভ ও ক্ষুদেবার্তার উত্তর দেওয়ার খেলায় আপত্তি জানিয়ে সেটা বাতিল করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ এতোক্ষণে দর্শক বুঝতে পারে, যা ঘটতে দেখেছে, তার সবটাই আসলে একটা সম্ভাবনা মাত্র! কিন্তু কিসের? যদি পরস্পরের গোপনীয়তাগুলো উন্মোচন হয়ে যায়, তাহলে কী ঘটতে পারে, সেটাই নির্মাতা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। আদতে এসবের কিছুই ঘটেনি। কারণ সবার সামনে ফোন রিসিভ ও ক্ষুদেবার্তার উত্তর দেওয়ার এই খেলায় কেউই আসলে রাজি হননি তখন।


২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত ইতালির চলচ্চিত্র পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স-এর (Perfetti Sconosciuti) নির্মাতা পাওলো জেনোভিস (Paolo Genovese)। চলচ্চিত্রটি ওই বছরই সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে ‘দাভিদ দি দোনাতেল্লো’ (L'accademia del Cinema Italiano¾ACI) পুরস্কার পায়। অস্কারের মতো ২৪টি ক্যাটাগরিতে ইতালিয় এবং একটি বিদেশি চলচ্চিত্রকে এখানে পুরস্কৃত করা হয়। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে থেকে চালু হওয়া এ পুরস্কার বিতরণ করা হয় ৫ জুলাই, রোমে। পুরস্কারপ্রাপ্ত এ চলচ্চিত্রের আই এম ডি বি রেটিং ৭.৭। আর রোটেন টমেটোতে পেয়েছে ৮২ শতাংশ। চিত্রনাট্যকার : ফিলিপ্পো বোলোগনা (Filippo Bologna) এবং পাওলো কস্তেল্লা (Paolo Costella)। অভিনয় করেছেন-গিউসেপ্পে বাত্তিস্তন (Giuseppe Battiston), আনা ফগ্লিয়েত্তা (Anna Foglietta), মার্কো গিয়াল্লিনি (Marco Giallini), এদুয়ার্দো লিও (Edoardo Leo), ভ্যালেরিও মাস্তান্দ্রেয়া (Alba Rohrwacher), অ্যালবা রোহরওশের (Kasia Smutniak), কাসিয়া স্মুতনিয়াক (কধংরধ ঝসঁঃহরধশ) প্রমুখ। ২০ অগাস্ট ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইতালির রোমে জন্ম নেওয়া পাওলো জেনোভিস-এর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে তুত্তাকোল্পা দ্য ফ্রদ (২০১৪) ও উনা ফ্যামিগ্লিয়া পারফেত্তা (২০১২)।


আপাতদৃষ্টিতে পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্স-এ শুরু করা নিরীহ, নির্বিরোধী খেলাটিই একসময় প্রত্যেকের দোষ-ত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে শুরু করে। এমনকি সামাজিক সম্মান রক্ষার স্বার্থে বন্ধুদের মধ্যে দুজন ফোন অদলবদল পর্যন্ত করে! নির্মাতার ভাষ্য মতে-‘স্মার্ট ফোনসেট আমাদের জীবনের এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। সম্ভবত এই ক্ষুদে কালো বক্সটিই একমাত্র বস্তু যা আমরা সারাক্ষণ বয়ে নিয়ে বেড়াই। আর এটির ব্যবহারে এত্তো এত্তো নাটকীয়তা যুক্ত হয়েছে যে, প্রায় সময় নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের বিষয়টি আমাদের মাথাতেই থাকে না।’  মানুষের হাতের মুঠোয় এখন অজস্র যোগাযোগ মাধ্যম। ফেসবুক, টুইটার থেকে শুরু করে মুঠোফোনের নানা সফটওয়্যার, যা দিয়ে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা কারো সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করা সম্ভব। সহজে যোগাযোগের এই সুযোগ মানুষকে অধিকতর বৈচিত্র্য পিয়াসী করে তুলেছে। সম্পর্কের সহজলভ্যতা সম্পর্কগুলোকে তুলনামূলক কম স্থিতিশীল ও আবেগহীন করে ফেলছে। একই সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে গোপনীয়তাও।


বৈচিত্র্যের খোঁজে নানা মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মানুষজনের সঙ্গে মিশতে চায় অনেকেই। আবার এটাও নিশ্চিত করতে চায়, প্রত্যেকটি সম্পর্কই যেনো স্বতন্ত্র অবস্থা বজায় রাখে। কিন্তু ব্যক্তি ভুলে যায়, সময় ও প্রচেষ্টা দুটোরই একটা সীমা আছে, একদিকে হেলে পড়লে অন্যদিকে অবহেলা জুড়ে বসে। তখন অন্যপক্ষের মনে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণের জন্য প্রয়োজন হয় নতুন আরেকটি সম্পর্ক। এটা যেনো এক অসীম শৃঙ্খল; যা মানুষকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে এবং নিঃসঙ্গ করে ফেলছে দিন দিন। পরিণামে টিনেজ পেরোনোর আগেই সম্পর্ক ভেস্তে যাওয়া মানতে না পেরে আত্মহত্যা করতে হচ্ছে ফেইসবুক লাইভে! আজকাল যেনো আমরা আর প্রযুক্তি ব্যবহার করি না, প্রযুক্তিই আমাদের ব্যবহার করে। তাইতো সকালে ঘুম ভাঙার পর প্রথম কাজই হয় মোবাইল ফোনসেট হাতে নিয়ে লেটেস্ট আপডেট চেক করা। ইন্টারনেট কানেকশন ছাড়া দিন কাটাতে গেলে মনে হয় মধ্যযুগে ফিরে গেছি।


খাবার টেবিলে বসেই একের পর এক বিব্রতকর মুহূর্ত তুলে ধরা হয়েছে এ চলচ্চিত্রে। এমন পরিস্থিতিতে নির্মাতার পক্ষে খেই হারিয়ে ফেলাটাই স্বাভাবিক। অথচ জেনোভিস নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ ঠিক রাখার পাশাপাশি  চরিত্রগুলোতেও এনেছেন বৈচিত্র্য। কসিমো টিপিক্যাল ইতালিয়, খুবই মাতৃভক্ত আবার মেয়ে পটানোতে ওস্তাদ। অন্যদিকে সার্জন রোকো একজন সম্মাননীয় ব্যক্তি। তিনি যেমন জ্ঞানী, তেমনই বুদ্ধিদীপ্ত। এদের প্রত্যেকের চরিত্রেই একধরনের দ্বৈত সত্তা কাজ করছে। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু সমস্যা রয়েছে; আবার সবাই কোনো একটা বিষয়ে ভুক্তভোগী। এদের সবাই জানে, তারা জীবনে ভুল করেছে। আবার সেটা শোধরানোর নিরন্তর চেষ্টাও করে যাচ্ছে তারা। যেমন ইভার সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করতেই রোকো লুকিয়ে থেরাপি নিতে শুরু করেছেন। লেলেকে নিয়ে শার্লট সুখী নন; তার পরও ছেড়ে যেতে চেয়েও পারেন না কৃতজ্ঞতাবোধের কারণে। আবার কসিমোর স্বভাব যেমন বহুগামী, তেমনই সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত। কিন্তু বিয়াঙ্কাকে বিয়ের পর তিনি স্ত্রীকে নিয়েই ভালো থাকার চেষ্টা করছেন। এজন্যই তারা দ্রুত সন্তানের বাবা-মা হতেও আগ্রহী। আর সমকামি পেপের পক্ষে স্ত্রীর সঙ্গে মিথ্যা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছিলো না বলেই তা থেকে বেরিয়ে এসেছেন।


‘কমেডি ইতালিয়ান স্টাইল’ (commedia all'Italiana) নামে পুরনো এ ধারাকে নতুন করে চলচ্চিত্রে ব্যবহার করে সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন জেনেভিস। ৫০-এর দশকের শেষ থেকে ৮০’র দশকের শুরুর পর্যন্ত জনপ্রিয় ছিলো এ ঘরানা। সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে যাওয়ার ধারাটি আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করাটা যেমন সাহসের, তেমনই ঝুঁকিপূর্ণও ছিলো জেনেভিস-এর জন্য। কমেডি ইতালিয়ান স্টাইলের চলচ্চিত্রগুলো নিওরিয়েলিস্টিক চলচ্চিত্রের চেয়ে খানিকটা স্যাটায়ারিকাল (ব্যঙ্গাত্মক) ও সিনিকাল (ব্যক্তিস্বার্থবাদী চিন্তা)। এ নিয়ে ফিল্ম রেফারেন্স’র বক্তব্য এমন-এ ধারার চলচ্চিত্র ইতালির শতাব্দী প্রাচীন ভ্রান্ত ধারণাগুলোর মূলে আঘাত হানে। সমাজের প্রতিষ্ঠানের ও ক্ষমতাশীলদের কাজকর্ম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় এসব চলচ্চিত্রে। সেই সঙ্গে গড়পড়তা ইতালিয়ানদের মানসিক দোদুল্যমানতাকে দূরে সরিয়ে সচেতনতা বাড়াতেও এসব চলচ্চিত্র সাহায্য করে। অমøমধুর হাস্যরসের আড়ালে এ যেনো ফ্যাসিজমের মুখে সরাসরি চপেটাঘাত! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্শাল প্ল্যানের আওতায় চলচ্চিত্রশিল্প আর্থিকভাবে অনেকটা স্বাধীনতা পায়। আর সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেশকিছু দক্ষ নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও অভিনয়শিল্পী চলচ্চিত্রের নতুন এ ধারা সৃষ্টি করে। কমেডি ইতালিয়ান স্টাইলে রোজকার জীবনের ঘটনাগুলোকেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়। আর যেখানে ব্যঙ্গ সেখানে সমালোচনা তো থাকবেই।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইতালির সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা ছিলো নব্য-বাস্তববাদ। অনেকটা বাধ্য হয়েই এ ধারায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হয়েছিলো দেশটিকে। কারণ যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সেখানকার অবস্থা খুবই ভঙ্গুর ছিলো। স্টুডিওগুলো ভেঙে গেছে। নির্মাতাদের হাতেও টাকাপয়সা নেই। এমন পরিস্থিতিতে অপেশাদার অভিনয়শিল্পীদের দিয়ে স্টুডিওর বাইরে তারা কাজ শুরু করেন। আর এসব চলচ্চিত্র দেখে তাদের সমাজব্যবস্থার একটা চিত্রও পাওয়া যায়। ফ্যাসিজম-বিরোধী ও আধুনিক জীবনের টানাপড়েনকে উপজীব্য করে তৈরি হতো এসব চলচ্চিত্র। বহির্বিশ্বে এ ধারার চলচ্চিত্র প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়। তবে ইতালিয় দর্শকের ঝোঁক বরাবরই স্থানীয় হাস্যরসে ভরপুর কমেডি চলচ্চিত্রগুলোর দিকেই ছিলো। কমেদিয়া অল ইতালিয়ানা ধারার চলচ্চিত্রে যুদ্ধ পরবর্তী ইতালির ব্যর্থতাকে হাস্যরসের আড়ালে তুলে ধরা হয়।


পারফেক্ট স্ট্রেঞ্জার্সও কিন্তু তাই করেছে। মোবাইল ফোনসেট বর্তমানে ব্যক্তিমানুষের জীবনকে যেভাবে গ্রাস করছে, সেদিকটিকেই তুলে ধরা হয়েছে এখানে। তবে প্রযুক্তির খারাপ দিক না বুঝিয়ে নির্মাতা এখানে ব্যক্তিমানুষের মূল্যবোধের দৈন্যদশাই তুলে ধরেছেন। সাত বন্ধুর মধ্যে একমাত্র যে বিষয়টি মিল, তাহলো গোপনীয়তা। তাই তো চলচ্চিত্রটির ট্যাগ লাইনে নোবেলজয়ী কলাম্বিয়ান লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখা থেকে ধার নিয়ে  ব্যবহৃত হয়েছে-‘আমরা প্রত্যেকেই তিন ধরনের জীবন যাপন করি-একটা  সামাজিক, একটা ব্যক্তিগত আর অন্যটা গোপনীয়।’


নির্মাতা চলচ্চিত্রজুড়ে গড়পড়তা মানুষের শিশুসুলভ আচরণ তুলে ধরতে চেয়েছেন। দক্ষ অভিনয়শিল্পীদের কল্যাণে চলচ্চিত্রের প্রতিটি চরিত্র যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলাও সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তার পরেও কোথায় যেনো একটু গভীরতার অভাব রয়ে গেছে চরিত্রগুলোতে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের বখে যাওয়া জীবন নিয়ে অসুখী, অথচ পরিবর্তনে অনাগ্রহী মানুষগুলোকে পছন্দ করার মতো কারণও নেই অবশ্য। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, শুরু থেকে শেষ অবধি খাবার টেবিলে দৃশ্যায়িত এই চলচ্চিত্রে একটিবারের জন্যও কেউ খাবার ও এর পরিবেশনা নিয়ে কথা বলেনি। তবে কুশলী এ নির্মাতা অ্যাপার্টমেন্টের বিভিন্ন ঘরে ক্যামেরা ঘুরিয়ে একঘেয়েমি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পেরেছেন। বাইরে চন্দ্রগ্রহণ দেখাতে যে স্পেশাল ইফেক্ট ব্যবহার করা হয়েছে সেটা এতোটা নিম্নমানের হওয়ার কারণও ঠিক বোঝা যায় না! তাছাড়া চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থার পরিবর্তন বোঝাতে যে আবহসঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে সেটাও তেমন আহামরি কিছু নয়।

 

লেখক : তামান্না মৌসী ও আলী আকবর শিপ্লু, বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ চুকিয়ে ফ্রিল্যান্স অ্যাকাউন্টট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন।


tammcj@gmail.com


shibloo01@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

1. https://www.italianfilmfestival.com.au/films/perfect-strangers; retrieved on 21.04.2017

2.http://www.filmreference.com/encyclopedia/Independent-Film-Road-Movies/Italy-THE-COMMEDIA-ALL-ITALIANA-SOCIAL-SATIRE-AND-CULTURAL-CRITICISM.html; retrieved on  22.04.2017

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন