হিরু মোহাম্মদ
প্রকাশিত ২০ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
আই অ্যাম নজুম, এজ টেন অ্যান্ড ডিভোর্সড : বৃত্তে বন্দি জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
হিরু মোহাম্মদ

সিনেমাটা বাস্তব, কিন্তু গল্পটা সত্য
সারাদেশে ভয়ঙ্কর অস্থিরতা, আতঙ্ক-কখন কার কী হয়, বলা মুশকিল! প্রতিক্ষণে লড়াই চলছে সরকারি ও বিদ্রোহী বাহিনীর মধ্যে; নিহত হচ্ছে নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ। আর যে মুসলিম বিশ্ব গাজায় ইসরাইল হামলা চালালে ব্যাপক প্রতিবাদ করে, তারাও (সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরো ১০টি মুসলিম দেশ) জোট বেঁধে ৯৯ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত ইয়েমেনে বিদ্রোহ দমনের নামে সামরিক, নৌ, বিমান হামলা শুরু করেছে। বিদ্রোহ দমনের নামে চলা এই হামলার নির্মমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না বাকি বিশ্ব! তাদের কাছে ‘উলুখাগড়া’র প্রাণের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু সাধারণের মৃত্যুর মিছিলে মুসলিম জোট আর ইসরাইলের হামলার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কী! অন্যদিকে আল কায়দা, আই এস দমনের নামে দেশটিতে মার্কিন ড্রোন হামলা তো আছেই।
ইয়েমেনে এই অবস্থায় যখন জীবন, ঘরবাড়ি, সম্পদ কোনো কিছুই নিরাপদ নয়; তার মধ্যেই এক নারী খাদিজা আল সালামি ক্যামেরা হাতে তুলে ধরতে চান তার সমাজকে। মনে হয়, তিনি কোনো অজানা ব্রত নিয়েছেন চলচ্চিত্র-নির্মাণে। যে চলচ্চিত্রের কাহিনিটা সত্য। ১০ বছরের নারী শিশু নজুম। যার সারাদিন কাটে খেলা করে। একদিন হঠাৎ কয়েক নারী তাকে দেখতে আসে। নজুমকে সাজিয়ে তাদের সামনে আনা হলেও কারো প্রতি তার যেনো লক্ষ নেই। তার মন পড়ে থাকে খেলার সাথিদের কাছে। তাই খেলার সাথিরা ডাকতে আসলে চুপিসারে তাদের পিছু নেয় নজুম। খেলা করতে করতে মনে হয়, উপহার পাওয়া আংটি দিয়ে পুতুল কিনলে খারাপ হয় না। আংটি বিক্রি করে কেনা হয় পুতুল। বন্ধুদের নিয়ে সেই পুতুলখেলায় মগ্ন হয় নজুম।
একপর্যায়ে বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বর যখন বউয়ের জন্য অপেক্ষা করে, নজুম তখনো সাথিদের নিয়ে পুতুলখেলায় ব্যস্ত। সেখান থেকে ধরে এনে তাকে পাঠানো হয় স্বামীর ঘরে। তখনো নজুমের একমাত্র সাথি সেই পুতুল। পুতুল নিয়ে স্বামীর বাড়িতে আসলেও, সেখানকার জীবনটা পুতুলখেলার মতো ছিলো না। শুরু হয় মাঝবয়সি স্বামীর যৌন নির্যাতন, সঙ্গে ঘরকন্নার চাপ। তবে এই নির্যাতন শিশু নজুম মুখ বুঝে সহ্য করেনি, প্রতিবাদ করে। মা-বাবা’কে বলেও এর সুরাহা না হলে, আদালতের দ্বারস্থ হয় নজুম।
নিজ দেশের এই বাস্তবতা তুলে ধরেন খাদিজা আল সালামি আই অ্যাম নজুম, এজ টেন অ্যান্ড ডিভোর্সড-এ (২০১৪)। যা সত্যিই ঘটেছিলো নজুড আলী নামে ইয়েমেনেরই এক নারী শিশুর জীবনে। শুধু নজুড আলী নয়, ইয়েমেনের অসংখ্য নারীশিশুর জীবনের ঘটনা এটি। এমনকি নির্মাতা খাদিজার জীবনের ‘গল্প’টাও একই রকম। তার জীবনে এটা ঘটে প্রায় চার দশক আগে; দীর্ঘ সময় গড়ালেও সমাজের রূপ বদলায়নি। নীরবে চলে চেনা সেই বাস্তবতা। তাই এই নির্মম বাস্তবতার চিত্র সবার সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করেন খাদিজা এবং মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন চলচ্চিত্রকে।
‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে’
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক দুই বছর আগে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে খাদিজা আল সালামির জন্ম রাজধানী সানায়। জন্মের কিছুকাল পরে বাবা-মার বিচ্ছেদ হয়। তারপর মা’র বিয়ে হয় অন্য জায়গায়। শিশু খাদিজার আশ্রয় হয় সেখানে, কখনোবা নানির কাছে। অন্যের টাকায় কোনোরকমে চলে পড়াশোনা। কিন্তু ১১ বছর বয়সে খাদিজার জীবনে আসে এক বড়ো ধাক্কা, যেটা সারাজীবন তাকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। এই সময় তাকে বিয়ে করতে হয়, তার বয়সের প্রায় তিন গুণ এক পুরুষকে। বিয়ের পর প্রতি রাতে খাদিজাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয় স্বামীর হাতে। খাদিজা সমাজের আর দশটা নারীর মতো তা সহ্য করেননি, প্রতিবাদ করেছেন বর্বর সেই অত্যাচারের। এর জন্য অবশ্য তাকে অনেক কষ্ট পেতে হয়। শেষ পর্যন্ত খাদিজাকে তালাক দেন তার স্বামী।
খাদিজার স্বপ্ন এখানে থেমে যেতে পারতো; যেমনটা ঘটে সমাজের আর দশটা মেয়ের। কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল জেদ আর টিকে থাকার লড়াই তাকে জীবনের কিনারা থেকে ফিরিয়ে এনেছে। বাল্যবিবাহ, স্বামীর নির্যাতন আর বিবাহবিচ্ছেদের অন্ধকার অধ্যায়ের দিকে না ফিরে, তিনি আবার শূন্য থেকে শুরু করেন। নতুন করে শুরু হয় স্কুলে যাওয়া। কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদে সম্মানহানি হয়েছে বলে আত্মীয়স্বজনরা খাদিজার পড়াশোনার খরচ দিতে নারাজ। তবুও এসবের কাছে হার মানার মেয়ে খাদিজা নন। সবার অবজ্ঞাকে তোয়াক্কা না করে তিনি কাজ খোঁজা শুরু করেন। প্রথমে কাজ নেন সানা’র একটি টেলিফোন কোম্পানিতে। সকালে স্কুল করে বিকালে কাজ করতেন সেখানে। ঘটনাক্রমে সেখানেই পরিচয় হয় এক টেলিভিশন পরিচালকের সঙ্গে; পরে সেই টেলিভিশনে কাজ নেন খাদিজা। আর সেখানেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
খাদিজা শিশুদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। সেখানেই তিনি প্রথম দৃশ্য মাধ্যমের ক্ষমতা ও প্রভাব অনুধাবন করতে পারেন। ধনী-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই অনুষ্ঠান দেখে এবং প্রশংসা করে। এরপর থেকে দৃশ্য মাধ্যমের প্রতি খাদিজার আগ্রহ বেড়ে যায়। এই সময়ে তার পড়াশোনার ইচ্ছা আরো প্রবল হয়; বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি। সমাজের মানুষের অবহেলাকে প্রেরণা হিসেবে নিয়ে তিনি পড়াশোনা চালাতে থাকেন। অবশেষে মাধ্যমিক পাশ করে ১৬ বছর বয়সে স্কলারশিপ নিয়ে খাদিজা পাড়ি জমান আমেরিকায়। ভর্তি হন ওয়াশিংটনের ‘মাউন্ট ভারনেন কলেজ ফর উইমেন’-এ। সেখানে পড়াশোনা শেষে কিছু সময় ইয়েমেন ও প্যারিসে ঘুরে আবার তিনি ওয়াশিংটনে ফিরে আসেন এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দৃশ্য মাধ্যমের প্রতি গভীর আগ্রহী হয়ে খাদিজা পড়াশোনা করেন সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নিয়ে। গবেষণার মাধ্যম হিসেবে তিনি চলচ্চিত্র-নির্মাণে হাত দেন। একে একে নির্মাণ করেন প্রায় ২৫টি তথ্যচিত্র। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে খাদিজা নির্মাণ করেন তার জীবনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আই অ্যাম নজুম, এজ টেন অ্যান্ড ডিভোর্সড।
প্রতিটি তথ্যচিত্রে খাদিজা ইয়েমেনের বাস্তবতাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন; বিশেষ করে ইয়েমেনের নারী ও শিশুদের বিভিন্ন সমস্যা ও দুর্নীতি। খাদিজা সবসময় চেয়েছেন, যে প্রতিবন্ধকতার মধ্য থেকে তিনি নিজে বেরিয়ে এসেছেন, তা যেনো অন্য কোনো নারীর জীবনে না আসে। তিনি সবসময় বলেন,
আমার চলচ্চিত্র ও কাজ দিয়ে আমি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে চাই। আমার পরিবার আমাকে ভালোবাসতো, কিন্তু বিয়ে দিয়ে দেয়। কারণ, সেটাই ছিলো তাদের প্রথা। আমি প্রতিবাদ করেছি, কারণ সেটা আমার চরিত্রে আছে। কিন্তু সবাই তো আর আমার মতো নয়। তাছাড়া পরিবার ও সমাজের চাপ তো আছেই।
ইয়েমেনের মতো যুদ্ধ-সংঘাতময় পিছিয়ে পড়া দেশে খাদিজার চলচ্চিত্র-নির্মাণের পথ কতোটা কঠিন ছিলো তা বোঝার জন্য দেশটির চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা জানা জরুরি। ইয়েমেনের অভ্যন্তরে যখন জাতি-গোত্র ভেদাভেদ চরমে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকে থাকার লড়াই নিয়ে সবাই ব্যস্ত, তখন ফ্রান্স, আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দেশ চলচ্চিত্র দিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে। তখনো চলচ্চিত্র সম্পর্কে অবগত নয় ইয়েমেনের জনগণ। তবে ইয়েমেনের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য, গোত্র ও উপজাতিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ইউরোপের নির্মাতাদের চলচ্চিত্র-নির্মাণের বিষয় হয়েছে। হান্স হেলফ্রেজ, ওয়াল্টার ডস্টাল, গার্ডিয়ান ট্রেলার ও ম্যারি ক্লদ-এর মতো নির্মাতারা ৩০, ৬০ ও ৭০-এর দশকে তাদের চলচ্চিত্রে ইয়েমেনকে তুলে ধরেন। ইতালিয়ান নির্মাতা পিয়ার পাওলো পাসোলিন ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করেন দ্য ডেকামেরোন (১৯৭০) ও অ্যারাবিয়ান নাইটস (১৯৭৩)। তবে এই দুটি চলচ্চিত্রে ইয়েমেনের বাইরে যৌন উত্তেজক নানা দৃশ্যই বেশি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়।১ এছাড়া হলিউডও বেশকিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ করে ইয়েমেনকে উপজীব্য করে। ইয়েমেনের সমাজ-সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও দেশটিতে নিজেদের কোনো নির্মাতা তৈরি হয়নি।
এদিকে দীর্ঘ সময় উত্তর ইয়েমেনে ইমাম ও দক্ষিণ ইয়েমেনে উপজাতিদের শাসনামলে জনগণের কাছে চলচ্চিত্র অধরায় থেকে যায়। অধিকাংশ লোকের কাছে চলচ্চিত্র সম্পর্কে দৃশ্যত কোনো ধারণাই ছিলো না। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে এসে উত্তর ইয়েমেন ও মার্কসবাদী গণপ্রজাতন্ত্রী দক্ষিণ ইয়েমেন একীভূত হয়ে প্রজাতান্ত্রিক ইয়েমেনের জন্ম হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দক্ষিণ ইয়েমেন দীর্ঘদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাবাদর্শে পরিচালিত হলেও কেনো জানি সেখানে চলচ্চিত্র নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ লক্ষ করা যায়নি। ৯০-এর দশকে এসে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে গুটিকয়েক নির্মাতার চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি হয়। দীর্ঘ সময় পর ইয়েমেনের ‘প্রথম’ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অ্যা নিউ ডে ইন ওল্ড সানা (২০০৫) নির্মাণ করেন ইয়েমেনি বংশীয় ব্রিটিশ নির্মাতা বেদের বেন হিরসি।২ বেন হিরসি’র হাত ধরে ইয়েমেনে যে চলচ্চিত্রযাত্রার শুরু, তা-ই এখনো চলছে। যদিও চলচ্চিত্র-নির্মাণের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম।
সমাজ-রাষ্ট্র ভিন্ন হলেও চরিত্রটা অভিন্ন নয়!
আই অ্যাম নজুম-এ এক ঘণ্টা ১০ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে আদালতে বিচারক নজুমের বাবার কাছে জানতে চান, কেনো তিনি এতো অল্প বয়সে নজুমকে বিয়ে দিয়েছেন? নজুমের বাবার উত্তর, ভয়ে। কিন্তু কিসের ভয়, সে কথা অবশ্য তিনি সবার সামনে বলতে চান না। বিচারক তাই সবাইকে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন এবং নজুমের বাবার চেপে রাখা ভয়ের কথা শোনেন। নজুমের বাবা স্মৃতিচারণ করেন এভাবে-একসময় তার ঘরবাড়ি, সম্পদ সবই ছিলো; দিন কাটছিলো সুখেই। কিন্তু হঠাৎ তার সংসারে ঝড় নেমে আসে। গ্রামের এক ছেলে তার বড়ো মেয়েকে ধর্ষণ করে। এরপর গ্রামের লোকেরা তাকে ‘খারাপ মেয়ের বাবা’ বলে সম্বোধন করতে থাকে। পরিস্থিতি এমন হয় যে, তিনি ঘরবাড়ি, সম্পদ ছেড়ে পরিবার নিয়ে শহরে আসতে বাধ্য হন; সেখানে তাকে ছেলে-মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়। জীবন বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত তার ছেলে-মেয়েরা ভিক্ষার পথ বেছে নেয়। তার পরেও তিনি ভয়ে থাকেন, যদি আবার সেই ঝড় আসে; আবার শুনতে হয় ‘খারাপ মেয়ের বাবা’ ডাক।
এই ভয়েই তিনি একপর্যায়ে ছোটো মেয়ে নজুমকে বিয়ে দেন মাঝবয়সি লোকের সঙ্গে। এ রকম ঘটনা শুধু ইয়েমেনের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত, উপজাতি শাসিত দেশে ঘটে এমনটা নয়; নির্মাতা খাদিজার ভাষায়, ‘এটা সারা দুনিয়ার সমস্যা বটে। আমাদের দেশে প্রত্যেক বছর অসংখ্য মেয়ের বিয়ে হয় শিশু বয়সে; আমারও হয়েছিলো; আমার মায়ের হয়েছিলো।’৩ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও এ সমস্যা নেহাত কম নয়। নজুমের বাবার মতো হাজারো বাবা এখানেও ভয়ে থাকে, যদি ঝড় আসে! এখানে বরং এই ঝড়ের ভয়াবহতা আরো বেশি-‘গত বছর [বাংলাদেশে] (২০১৬) তিন শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।’৪ ধর্ষণের পর শিশু হত্যার প্রবণতাও বেশ চোখে পড়ার মতো।
নজুমের বাবার মতো কতো বাবাকে ভয় চেপে রাখতে হয়, তার হিসাব নেই! তবে মাঝেমধ্যেই সংবাদপত্রে দেখা যায়-‘খারাপ মেয়ের’ পরিবার একঘরে, ধর্ষিতা মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ। আবার মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে পা হারান শাহানূর, তার পরও ভিটামাটি হারানোর ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।৫ কিন্তু এই ‘খারাপ মেয়ের’ ও তার পরিবারের কোনো দায়ভার সমাজ-রাষ্ট্র নিতে চায় না। তাই কখনো সম্মানের ভয়ে নজুমদের পরিবারকে অন্যত্র চলে যেতে হয়, নয়তো অন্য কোনো উপায় খুঁজতে হয়। আর সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগায় গ্রাম প্রধান, গোত্রের শেখ, সমাজ-রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা। তাই কখনো বিচারের নামে দুটি গরু দিয়ে নজুমের বাবার সঙ্গে ওই ধর্ষকের বাবার আপস করে দেন গোত্রের শেখ, আবার কখনো বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮’র নিচে করে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ পাশ করতে চায় সরকার।
এ বিষয়ে সরকারের প্রতিনিধিরা যুক্তি দেন-
যেকোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটতেই পারে। কোনো ঘটনা ঘটলে আদালত ও বাবা-মায়ের সম্মতি থাকলে তবেই বিয়ে হতে পারে। ... বাল্যবিবাহ বন্ধ করলেও কিশোর-কিশোরীদের প্রেম বন্ধ হয়ে যাবে এমনটি নয়। কোনো কিশোরী পরিস্থিতির শিকার হয়ে গর্ভবতী হলে তখন তার ভবিষ্যৎ কী হবে? অভিভাবকহীন প্রতিবন্ধী কিশোরীর থাকার জায়গা না থাকলে ১৮ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে মঙ্গলজনক মনে হলে বিয়ে দেওয়া যেতে পারে।৬
তার মানে রাষ্ট্র ধরেই নিয়েছে, এই অবস্থা চলতে থাকবে! এর কোনো প্রতিরোধ ও প্রতিকার নেই। তাই বিকল্প হিসেবে এই ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন’।
শেখ যেমন ধর্ষককে সাজা না দিয়ে আপস করে, অন্যায় জিইয়ে রাখে, তেমনই সরকার শিশুদের সুরক্ষা না দিয়ে বরং শিশু নির্যাতনের পথকে সহজ করে এই আইনের মাধ্যমে। ধর্ষণ, ইভটিজিং ও শিশু নির্যাতন অনেকটাই ‘বৈধ’ এই আইনে। একসঙ্গে প্রতিবন্ধীদের ওপর রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব, তা পালন না করে বরং অল্প বয়সে বিয়ের আইন করে তাদের বিপদের মুখে ফেলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এটা তো সত্য, অন্যায় অন্যায়ের জন্ম দেয়। শেখের বিচারের নামে প্রতারণায় যেমন নজুমের পরিবারকে খেসারত দিতে হয়, তেমনই ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬’ কার্যকর হলে এর কুফল ভোগ করতে হবে পরবর্তী প্রজন্মকে।
ভয়টা সবার!
চলচ্চিত্রের শুরুতেই নজুম দোকানে রুটি আনতে গেলে দোকানি তাকে বলেন, ‘এই মেয়ে! তুমি কি রুটি নিবে?’ তখন ডিজলভ শটে দেখা যায়, রুটি ভাজা চুলার আগুনের মধ্যে স্বামীর হাতে নজুমের শারীরিক নির্যাতন আর শ্বাশুড়ির অমানসিক কাজের চাপ। এই দৃশ্য নজুম কোনোভাবেই স্মৃতি থেকে সরাতে পারে না, যেখানেই সে ‘এই মেয়ে’ বাক্যাংশটি শোনেন, সেখানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার সেই নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য। এই শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য রুটি না কিনে, সেই টাকা দিয়ে আদালতে যায় নজুম। বিচারকের কাছে তালাক চায় সে; তখন ফ্ল্যাশব্যাকে দেখানো হয় তার জীবনের সেই নির্মম পরিণতি, যা এতোদিন সে চেপে রেখেছিলো নিজের শরীর-মনে। শুধু যে নজুম শরীর-মনে এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়ায়, এমনটা নয়। কতো নজুমের জীবনেই এটা ঘটেছে, ঘটছে তার হিসাব নেই। কিন্তু এর খুব কমই প্রকাশ পায়, সিংহভাগ অধরাই থেকে যায়। যেমনটা ঘটেছিলো নির্মাতা খাদিজার ক্ষেত্রে। খাদিজার যখন বাল্যবিবাহ হয়, তখন তিনিও নজুমের মতো স্বামীর নির্যাতনের শিকার হন। পরে অবশ্য এ থেকে রক্ষা পান; কিন্তু স্মৃতিতে থেকে যায় স্বামীর সেই নির্যাতনের ইমেজ। এক মুর্হূতের জন্যও ভুলতে পারেন না সেই দুঃসহ স্মৃতি; আর তিনিও নিশ্চয় নজুমের মতো চোখ বুজলেই দেখতে পান সেই দৃশ্য।
তার মতো আর কোনো মেয়েকে যেনো এ রকম যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে না হয়, সেজন্য অবশ্য খাদিজা সবাইকে সচেতন করার কাজ করে যাচ্ছেন; আন্দোলন করছেন নারীমুক্তি, অধিকার ও স্বাধীনতার। যাতে তার মতো কোনো মেয়ের জীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা ফ্ল্যাশব্যাকে আর দেখাতে না হয়। কিন্তু এই সমস্যা শুধু অনুন্নত ইয়েমেনের নজুমদের নয়, সারা দুনিয়ার। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মেয়ে শারমিন আক্তার নিজের বাল্যবিবাহ নিজেই আটকে দিয়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেন। মা ও হবু স্বামীর কথা মতো বিয়ে না করায় নানা চাপ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় শারমিনকে। শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষার জন্য নিজের মা ও হবু স্বামীকে জেলহাজতে দেন শারমিন।৭ এরপর সংবাদপত্র, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে শারমিনের দুঃখের চিত্র উঠে আসে। সম্প্রতি শারমিন তার এ দুঃসাহসী কাজের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘সাহসী নারী’র পুরস্কার পান। সারাবিশ্বে যারা শান্তি, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে ব্যতিক্রমী সাহসিকতা দেখায় তাদেরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পুরস্কার দিয়ে থাকে।
‘সাহসী নারী’র পুরস্কার পাওয়ার সুবাদে শারমিন আক্তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন এবং মতবিনিময় করেন সেখানকার স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। শারমিনের কাছে এই সময় মার্কিন শিক্ষার্থীরা জানতে চায়, তারা বিপদে পড়লে শারমিন তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে কি না? শারমিন তাদের আশ্বস্ত করেন, সাহস দেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের এই প্রশ্নের বিপরীতে আরেকটা প্রশ্ন উঁকি দেয়। তাহলে সভ্যতা ও নারী স্বাধীনতার ধারক-বাহক যুক্তরাষ্ট্রের নারীরাও কী নিজেদের নিরাপদ মনে করে না! নজুম, শারমিনদের ভয় কি তাদেরও তাড়া করে ফেরে?
তুমি না জাগলে মাগো কেমনে সকাল হবে!
যেদিন থেকে সমাজে ব্যক্তিমালিকানার সূত্রপাত, সেদিন থেকেই শোষণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু। সেই থেকে প্রতিনিয়তই চলছে অন্যকে দমিয়ে রেখে নিজে ‘ভালো’ থাকার প্রচেষ্টা-রাষ্ট্র, সমাজ, এমনকি পরিবারেও। যদিও বলা হয়, পরিবার গঠিত সম্প্রীতির বন্ধনে। কিন্তু সেখানেই সুকৌশলে চলে শোষণ ও শাসনের হাতেখড়ি। যা পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়ে সমাজ, রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। চাইলেও কেউ সেই কাঠামোর বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। তাই মানুষ হয়েও আজ সমাজে নারী ও পুরুষ দুটি শ্রেণি। যেখানে পুরুষ কর্তারূপে সর্বেসর্বা। তাদের ভাষ্য, তারা যা-ই করে নারীদের ‘মঙ্গলের’ জন্য। দেড়-দুইশো বছর আগে ভারতবর্ষে হিন্দু ধর্মে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিলো। যেখানে স্বামীর মৃত্যুতে একই চিতায় স্ত্রীকে আত্মাহুতি দিতে হতো। যুক্তি দেওয়া হতো, স্বামী ছাড়া নারী জীবন একাকী, দুঃখে ভরা। তাই তার বেঁচে থাকার প্রয়োজন নেই। তাই চিতার আগুনে আত্মাহুতিই তার স্বর্গের পথ। পুরুষশাসিত সমাজের এই নিয়ম ওই নারীরা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে, এক্ষেত্রে সমাজের অন্য নারীদের ভূমিকাও কম ছিলো না। তারাই স্বামীহারা ওই নারীদের সাজিয়ে চিতায় পাঠিয়েছে, আত্মোৎসর্গে উৎসাহিত করেছে।
সময় গড়িয়ে সমাজের পরিমাণগত পরিবর্তন হলেও গুণগত পরিবর্তন হয়নি। দৃশ্যত এখন হয়তো নারীদের চিতার আগুনে পোড়ানো হয় না, এক নারী অন্য নারীকে সাজিয়ে দেয় না চিতার জন্য; কিন্তু অন্য আগুনে তাদের ঠিকই ‘পুড়তে’ হয়; ধরনটা বদলালেও পোড়ানোর ব্যবস্থাটা ঠিকই টিকে আছে। আগে মৃত স্বামীর চিতার আগুনে স্ত্রীকে দেওয়া হতো, এখনো তাই হয়; পার্থক্য কেবল এ চিতায় নজুমদের যন্ত্রণা আর শেষ হয় না। আগে চিতার আগুনে কিছু সময়ের মধ্যে নারীর শরীর ছাই হয়ে যেতো; এখন তা হয় না। নজুমরা পুড়তেই থাকে।
সেসময় জেনে-বুঝে-শুনে নারীরাই যেমন স্বামীহারা ওই নারীদের চিতায় পাঠাতো, তেমনই বর্তমানেও মা-বোনরা আদর করে সাজিয়ে নজুমকে পাঠায় স্বামীর বাড়ি। চিতায় ওই নারীদের পোড়ানোর সময় ঢাকঢোল-কাঁসর উচ্চ শব্দে বাজানো হতো, যাতে ওই নারীর আর্তনাদের শব্দ কারো কানে না আসে। আই অ্যাম নজুম-এ ৪০ মিনিট থেকে ৪১ মিনিট ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত বাসর রাতে স্বামীর হাতে নির্মমভাবে রক্তাক্ত হয় নজুম। নজুমের সেই আর্তনাদ যেনো কেউ শুনতে না পায়, সেজন্য স্বামীর গোত্রের লোকেরা বাইরে ঢাকঢোল বাজিয়ে আনন্দ করে। ফলে ঢাকঢোলের উচ্চ শব্দ অতিক্রম করে নজুমের সেই আর্তনাদ আর কারো কান অব্দি পৌঁছায় না।
পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজের এই কাজকে আরো সহজ করে নজুমের মা-বোন ও শাশুড়ি। তারা মনে করে, নারীদের জীবন নজুমের মতোই হওয়া উচিত। তাই রক্তাক্ত নজুমকে দেখে সকালে তার শাশুড়ি কষ্ট না পেয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। কারণ নজুমের সতীত্বে তিনি গর্বিত হন। যদিও নজুমের কাছে রাত মানেই জীবন-মরণের প্রশ্ন-ধর্ষণের শিকার হতে হয় স্বামীর হাতে। নজুমের কাছে বিয়ে, সংসার, প্রেম, কামের কোনো মূল্য নেই। স্বামীর পাশবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কখনো নজুম ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকে, আবার কখনো পাহাড় থেকে লাফ দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু তাতেও রক্ষা হয় না; বরং রাতে পুরুষ-স্বামীর নির্যাতন আর দিনে নারী-শাশুড়ি তাকে অমানবিক পরিশ্রমে বাধ্য করে।
নজুম তার কষ্টের কথা মাকে বলে। মাকেও তখন শান্তভাবে বলতে শোনা যায়, স্বামীর সঙ্গে শারীরিক মিলনে সব নারীই একটু একটু রক্তাক্ত হয়, এটাই স্বাভাবিক। তিনিও নজুমকে সবকিছু মেনে নিতে বলেন। নজুমের মা, বোন, শাশুড়ি সবাই মেনে নেয়। একপর্যায়ে তারা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধ পক্ষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। যদিও দুইÑএকজন নজুমকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়; কিন্তু তারা কেউই তার শ্রেণিভুক্ত নয়। এখানে অর্থনৈতিক শ্রেণির কথাই বলা হচ্ছে। নজুম যখন তালাক নেওয়ার জন্য স্বামী ও বাবাকে আদালতে হাজির করায়, তখন চারপাশের সবাই তাকে ধিক্কার দেয়। অবশ্য নজুম আদালতে গেলে আইন-বিচারক সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, পত্র-পত্রিকায়, টেলিভিশনে তার সাহসিকতার খবর আসে। তখন তার সাহসিকতার গুণগান করে উচ্চশ্রেণি।
নজুমের মুক্তির ত্রাতা হিসেবে এখানে দেখানো হয়েছে তার শ্রেণির বাইরের একটি উচ্চ শ্রেণিকে। যে শ্রেণি নজুমের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যের কেউ না। তারা কেউই নজুমের এই জীবনের সঙ্গে পরিচিত না। কিন্তু সেই উচ্চ শ্রেণিই ত্রাতা হিসেবে হাজির হয় নির্মাতা খাদিজা’র উপস্থাপনায়। যদিও এই শ্রেণি কখনোই পরিবর্তনের কাণ্ডারি হয়ে মুক্তির কথা বলেনি। ইতিহাস জানান দেয়, যুগে যুগে নিজেদের মুক্তির জন্য সর্বহারাকেই সংগ্রাম করতে, রক্ত দিতে হয়েছে। ‘স্পার্টাকাস’ থেকে ‘ফরাসি’ কিংবা ‘অক্টোবর বিপ্লব’, সব জায়গাতেই তার প্রমাণ মেলে। কিন্তু খাদিজা এখানে নজুমের পরিবর্তন দেখান এমন এক উচ্চ শ্রেণি দিয়ে, যার সঙ্গে নজুমের কোনো প্রকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
এক্ষেত্রে এমন হতে পারে চলচ্চিত্রটির ঘটনা সত্য; কিন্তু সত্য ঘটনা অবলম্বনে হলেও খাদিজা কিন্তু প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেননি; তিনি ফিকশন করেছেন, সত্যের সঙ্গে মিল রেখে। সত্য ঘটনায় নজুড আলী স্বামীকে তালাক দেওয়ার পর রাগে-অভিমানে দীর্ঘদিন কারো সঙ্গে কথা বলেননি, স্কুলে যাননি। এখানে যদিও নজুম স্কুল যায়, এতে হয়তো স্বপ্ন জিইয়ে থাকে। কিন্তু শেষ দৃশ্যে খাদিজা যেভাবে নজুমকে গাড়িতে করে স্কুলে যাওয়া দেখান, মনে হয় নজুমের অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে এবং যে পরিবর্তন শ্রেণিগত।
এক নজুম স্বামীর নির্মম নির্যাতন থেকে বেরিয়ে, সবাইকে জানান দিয়ে গাড়িতে করে স্কুলে যাওয়া শুরু করলো, বুঝলাম; কিন্তু সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ নজুমের কী একই পরিণতি সম্ভব! আশাবাদী ও স্বপ্নবান খাদিজা, নজুমদের মুক্তির স্বপ্ন দেখান কিন্তু তার ‘চাবি’ রেখে দিলেন উচ্চ শ্রেণির হাতে! সে জন্যই হয়তো মূল ঘটনার নজুড আলীকে বলতে শোনা যায়, ‘সংবাদপত্র, টিভি, রেডিওতে এত সাক্ষাৎকার দিলাম, কী হলো এতে! আমাকে নিয়ে এন্তার লেখালেখি হয়েছে। লাভ কী হলো তাতে! কী পেলাম আমি?’৮ নজুমদের এই পাওয়া, না-পাওয়ার হিসাবটা অনেক দিনের, শুধু শিল্পের বিচারে সেটার সমাধান সম্ভব নয়। এই সমাধান জীবনের কাছে খুঁজতে হয়। খাদিজা সেই হিসাবটা করেছেন, কিন্তু তাতে কিছুটা গোঁজামিলও রেখে দিয়েছেন।
পথ চলা মুক্তির দিকে ...
ইয়েমেনের ‘ধ্বংস্তূপ’ থেকে এক টুকরো আলো হয়ে উঠে আসেন নির্মাতা খাদিজা আল সালামি। সেই আলোয় তিনি চারপাশটা আলোকিত করার প্রচেষ্টা চালান। এই চাওয়া থেকেই খাদিজা’র পথচলার শুরু। ফলে তার চলচ্চিত্র, লেখা ও কাজে ইয়েমেনের বাস্তবতা, নারীর বঞ্চনা, পরাধীনতা, শোষণ ফুটে ওঠে। খাদিজা এর মাধ্যমে হয়তো সমাজের পরিবর্তন দেখতে চান, তাই বার বার প্রশ্ন তোলেন, কথা বলেন। তবে এর কোনোটাই সহজ ছিলো না খাজিদার জন্য; নানা বাধা আসে চারপাশ থেকে; বিশেষ করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে। এর প্রধান কারণ ইয়েমেনে চলচ্চিত্র-নির্মাণের কোনো পরিকাঠামো নেই। আর খাদিজা কোনোভাবে সেটাকে সম্ভব করলেও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় অর্থ। ফলে সাধ থাকার পরেও চলচ্চিত্রে হাত দিতে পারেন না খাদিজা। নিরুপায় খাদিজা কাজ শুরু করেন প্যারিসে, অ্যাম্বাসি অব ইয়েমেনের তথ্য দপ্তরে। বিন্দু বিন্দু করে নিজের মাসের বেতনের টাকা জমাতে থাকেন স্বপ্ন পূরণের জন্য। সেই টাকায় চার বছরে নির্মাণ হয় আই অ্যাম নজুম, এজ টেন অ্যান্ড ডিভোর্সড। নির্মাণকালের দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় খাদিজাকে। গল্প ঠিক হয়, টাকা প্রস্তুত কিন্তু সমস্যায় পড়তে হয় নজুম চরিত্রের মেয়ে পাওয়ার ক্ষেত্রে। ইয়েমেনের কোনো পরিবার তাদের ১০ বছরের মেয়েকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করাতে রাজি নন। শেষ পর্যন্ত শরণাপন্ন হতে হয় নিজের পরিবারের ওপর, বোনকে রাজি করান, তার মেয়েকে অভিনয়ে দেওয়ার জন্য।
খাজিদা’র বয়ানে সেই কষ্টকর সময় আরো স্পষ্ট হয়। তার ভাষায়,
সরকারের অনুমতি নিইনি। তাই দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে শ্যুটিংয়ের সময়টা। আমার অভিনেতাদেরও পুরোটা ভেঙে বলিনি, কী করতে চাইছি। তাদের চিত্রনাট্যে লাইনগুলো দিয়ে বলতাম, বলো। তারা পাখি-পড়ার মতো বলতো। মৌলবাদীরা আমার ছবির বিষয় জানতে পেরে শ্যুটিং পণ্ড করে দিতে চায়। ঠিক দু’দিনের মাথায় এসে তারা আমার ক্যামেরা থেকে সমস্ত ইমেজ মুছে দেয়। বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। জেনারেটর চুরি করে নিয়ে যায়। ... শ্যুটিংয়ের সময় এমন একটা দিনও যায়নি, যেদিন আমি কাঁদিনি।৯
কিন্তু এতো সমস্যার মধ্যেও খাদিজা থামেননি। খাদিজারা থামতে জানে না। যেমন থামানো যায়নি সৌদি আরবের হাইফা আল মনসুর, লেবাননের নাদিন লাবাকি, পাকিস্তানের শারমিন ওবায়েদ-চিনয়, বাংলাদেশের শারমিন, ঘাসফুলের সাত কিশোরী-তুলি দেবনাথ, সানজিদা ইসলাম ছোঁয়া, স্নেহা বর্মণ, লিজুয়ানা তাবাসসুম, জান্নাতুল ইসলাম প্রান্তি, জীবননিসে খানম শ্যামা, জান্নাতুল আক্তার ও ঝিনাইদহের মেয়ে রত্নাকে।১০
লেখক : হিরু মোহাম্মদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
hirumohammad.ru301@gmail.com
তথ্যসূত্র
1. http://www.yementimes.com/en/1533/Variety/150/Yemen-through-Films.htm; retrieved on 12.03.2017
2.http://www.yementimes.com/en/1533/Variety/150/Yemen-through-Films.htm; retrieved on 12.03.2017
3.http://m.eisamay.com/city/kolkata/yemens-first-film-director-khadija-showcases-her-lifes-work-at-kiff2015/articleshow/49837303.cms; retrieved on 12.03.2017
৪. ‘গড়ে প্রতিদিন একটি শিশু খুন’; প্রথম আলো, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।
৫. ‘দুই পা হারানোর পর এখন ভিটে ছাড়ার ভয় বাবার’; প্রথম আলো, ২২ নভেম্বর ২০১৬।
৬. ‘মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়’; প্রথম আলো, ২৫ নভেম্বর ২০১৬।
৭. ‘পুরস্কার দেশের সব মেয়ের জন্য’; প্রথম আলো, ৮ এপ্রিল ২০১৭।
8.http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2009-09-26/news/7725; retrieved on 12.03.2017
১০. সৌদি আরবের প্রথম চলচ্চিত্রনির্মাতা হাইফা আল মনসুর। যে দেশের পুরুষরাই চলচ্চিত্র-নির্মাণের সাহস পায় না; সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যাচ্ছেন। লেবাননে চলচ্চিত্র-নির্মাণের কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই; সেখানেই দাঁড়িয়ে প্রতিকূল পরিবেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যাচ্ছেন নাদিন লাবাকি। শারমিন ওবায়েদ-চিনয় পাকিস্তানের মতো রক্ষণশীল দেশে নারীদের কথা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তুলি দেবনাথ, সানজিদা ইসলাম ছোঁয়া, স্নেহা বর্মণ, লিজুয়ানা তাবাসসুম, জান্নাতুল ইসলাম প্রান্তি, জীবননিসে খানম শ্যামা ও জান্নাতুল আক্তার ময়মনসিংহের নান্দাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তারা সাত জন মিলে বাল্যবিবাহ ও যৌন হয়রানির প্রতিবাদী ‘ঘাসফুল’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। যা বেশ কয়েকটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে দেয়। ঝিনাইদহের মেয়ে রত্না খাতুন; নিজের বাল্যবিবাহ নিজেই আটকে দেন।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন