Magic Lanthon

               

আমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘তারে জামিন পার’ : চলচ্চিত্রে যোগাযোগ ও মনোবৈকল্যের রূপায়ণ

আমিনুল ইসলাম


ভূমিকা


যোগাযোগ ও গণমাধ্যম বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য বর্তমান বিশ্বে খুবই আলোচিত বিষয়। অথচ এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা খুবই সামান্য। সচেতনতা তো নেই বরং ভ্রান্তি ও কুসংস্কারের মাত্রাই বেশি। পর্যাপ্ত ধারণা ও সচেতনতার অভাবে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে একেবারে প্রান্তিকতায় ঠেলে দেওয়া হয়। পরিবারের কোনো ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত হলে মনে করা হয়, তা সেই পরিবারের জন্য অভিশাপস্বরূপ। পাড়া-প্রতিবেশী মনে করে, বাবা-মা’র অতীতের কোনো পাপকর্ম ও অপরাধের শাস্তি হিসেবে সৃষ্টিকর্তা সন্তানের এই রোগ দিয়েছে। আর এই ধারণা কেবল অশিক্ষিত কিংবা অর্ধশিক্ষিত মানুষের মধ্যেই নয় বরং উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যেও বিদ্যমান। এ নিয়ে সমাজে আরো অনেক বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে। মানসিক অসুস্থতা ও গণমাধ্যমের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাও খুব বেশি দিনের নয়। তাই বিশ্বে এ ধরনের গবেষণার সংখ্যাও খুব সামান্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংখ্যা তো প্রায় শূন্যের কোঠায়। তবে ক্রমেই বাড়ছে বিশ্বে এ ধরনের গবেষণার পরিমাণ। গবেষণা বাড়ছে মানসিক স্বাস্থ্য-সমাজ ও গণমাধ্যমের মধ্যকার সম্পর্কের জায়গাটি নিয়েও। যোগাযোগ বৈকল্য ও মনোবৈকল্য খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। ব্যক্তি মনোবৈকল্যে আক্রান্ত হলে তার সামাজিক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়; বিচ্ছিন্ন হয় সামাজিক জগৎ থেকেও। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মনোরোগে আক্রান্ত ও যোগাযোগ বৈকল্য রয়েছে এমন ব্যক্তির উপস্থিতি ব্যাপক। তবে বিষয়টি সমাজে তেমনভাবে স্বীকৃত নয়। যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য নিয়ে বেঁচে থাকা মোটেও সহজ নয়।


বলা হয়ে থাকে বাস্তবতাকে উপস্থাপন, উপলব্ধি ও ব্যাখ্যার প্রশ্নে চলচ্চিত্র খুবই কার্যকর মাধ্যম। এটি শক্তিশালী যোগাযোগ মাধ্যমও। চলচ্চিত্র তাই যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য সম্পর্কে ধারণা লাভের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে টেক্সটবুকের মতো কাজ করতে পারে। লুসি রজার্স ১৯২৭ থেকে ২০১২ পর্যন্ত অস্কার বিজয়ী চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক কিংবা মানসিক বৈকল্যে আক্রান্ত ব্যক্তির চরিত্রে রূপদানকারী অভিনয়শিল্পীরাই অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় কিংবা পুরস্কার লাভ করে। তিনি দেখিয়েছেন, এ সময়ের মধ্যে পুরস্কার বিজয়ী শতকরা ১৬ ভাগ অভিনয়শিল্পী শারীরিক কিংবা মানসিক রোগে আক্রান্ত নানা চরিত্রে রূপদান করেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, মনোবৈকল্যকেন্দ্রিক গল্পের বয়ান ও চরিত্রের রূপায়ণের বিষয়টি বেশ প্রকট।


বর্তমান আলোচনায় ভারতের হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র তারে জামিন পার-এ যোগাযোগ ও মনোবৈকল্যের উপস্থাপনার বিষয়টি উপলব্ধির চেষ্টা করা হবে। আর সেক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করা হবে এর প্রধান চরিত্র ইশানকে। যোগাযোগ বৈকল্য শব্দটি ইংরেজি কমিউনিকশন ডিসঅর্ডারের প্রতিরূপ; মনোবৈকল্য শব্দটি ইংরেজি মেন্টাল ইলনেস-এর প্রতিরূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই আলোচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগাযোগ, মনোবৈকল্য, মানসিক অসুস্থতা ও মনোরোগকে ব্যবহার করা হয়েছে সমার্থক হিসেবে। আর যোগাযোগ বৈকল্যকে মনোবৈকল্যের ফলাফল হিসেবে দেখা হয়েছে।


যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য : তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ


যোগাযোগ হলো একধরনের সামাজিক ক্রিয়া। কোনো সামাজিক পরিসরে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই দুই ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত হতে হয়। আর এই প্রক্রিয়াটি খুবই জটিল। কেননা এটি কেবল অন্যের ভাষা বা শব্দ বোঝার ব্যাপার নয়। সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক অলিখিত নিয়ম থাকে। পরিস্থিতি ও ব্যক্তিভেদে এই নিয়মের পরিবর্তন ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির কোনো চিন্তা কিংবা বাচনিক, অবাচনিক ও গ্রাফিক প্রতীক ব্যবস্থার বার্তা গ্রহণ, প্রেরণ প্রক্রিয়াকরণ ও উপলব্ধি করতে না পারাই হলো যোগাযোগ বৈকল্য। যোগাযোগ বৈকল্যে আক্রান্ত ব্যক্তি বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারে না। যেমন কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলা, হাসা, সম্বোধন করা, কাউকে চিত্তাকর্ষক কোনোকিছু দেখাতে পারা; তারা ভিন্ন মানুষের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্নভাবে যোগাযোগ করতে পারে না। সমবয়সি, ছোটো-বড়ো সবার সঙ্গে তারা যোগাযোগ করে একইভাবে। সামাজিক রীতিনীতি; বাচনিক ও অবাচনিক ইঙ্গিতগুলো উপলব্ধি ও ব্যবহার করতে পারে না। কোনো শব্দের নিহিত অর্থও তারা উপলব্ধি করতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, বক্তার বক্তব্যের টোন ও প্রেক্ষাপটও বুঝতে পারে না। কাজেই যোগাযোগ বৈকল্য বলতে ব্যক্তির মধ্যে যেকোনো ধরনের বৈকল্যকে বোঝায়, যা তার জাগতিক বাস্তবতা উপলব্ধি, চৈতন্যবোধ, চিহ্নিতকরণ সক্ষমতা, অন্যের সঙ্গে কথাবার্তা-আলাপ-আলোচনায় লিপ্ত হওয়ার প্রশ্নে ভাষার প্রয়োগ ও অন্যান্য বাচিক প্রকাশ ক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। যোগাযোগ বৈকল্যের বিষয়টি দৃশ্যমান হয় ব্যক্তির শ্রবণ, ভাষা প্রয়োগ এবং বাচিক যোগাযোগ দক্ষতার মাধ্যমে।


শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে যে যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য দেখা যায় তা হলো ডিসলেক্সিয়া। ইংরেজি ডিসলেক্সিয়া এসেছে গ্রিক ডিস (dys) ও লেক্সিস (lexis) শব্দ থেকে। ডিস মানে দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত। আর লেক্সিস হলো শব্দভাণ্ডার। ইন্টারন্যাশনাল ডিসলেক্সিয়া অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই রোগের ফলে শিশুর ভাষিক যোগাযোগে সমস্যা হয়। এই রোগে আক্রান্ত হলে শিশু কোনোকিছু ঠিকমতো পড়তে, বানান করতে, হাতে লিখতে পারে না; পাটিগণিতেও দুর্বল হয়। এটি আসলে একটি ভাষাভিত্তিক বৈকল্য; যা নিহিত থাকে নিউরন ও জন্মগত জিন-এ। ফলে শিশু কোনো শব্দের অর্থ উন্মোচন ও উপলব্ধি করতে পারে খুব ধীরে। বয়সের অনুপাতে তাদের মানসিক বিকাশ হয় না এবং প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে পড়ে। এরা শব্দকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে পারে না। কোনো শব্দের মানে সঠিকভাবে উপলব্ধি ও প্রকাশ করতে পারে না। কিংবা পারলেও খুব অল্পমাত্রায়, ধীরে। তবে এদের বুদ্ধিমত্তার পরিমাণ বা মাত্রা সাধারণ শিশু থেকে কোনো অংশেই কম নয়। বরং কখনো কখনো বেশিই হয়।


যোগাযোগের দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য বোঝার ক্ষেত্রে অবধারণ তত্ত্ব বা কগনিশন থিওরি, সামাজিক অবধারণ তত্ত্ব বা সোশাল কগনিশন থিওরি, মনো-ভাষাতত্ত্ব বা সাইকোলিঙ্গুইস্টিকস-এর আশ্রয় নিতে হবে। সমাজের অন্য মানুষের সঙ্গে মিশতে, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি ও বোধ উপলব্ধি করতে পারা বা না পারা বিষয়টি বোঝার ক্ষেত্রে কগনিশন ও সোশাল কগনিশন তত্ত্বটি বেশ সহায়ক। এই দুটি তত্ত্ব থেকে জানা যায়, মানুষের মানবিক সত্তাগত অস্তিত্বের মূল কারণ হচ্ছে তার মন। সমাজে ব্যক্তির মানবিক অস্তিত্বের প্রকাশ ও স্বীকৃতি পায় তার মানসিক অবস্থার নিরিখেই। আর অবস্থাগুলো হলো তার চিন্তা ও চিন্তন সক্ষমতা, চাহিদা, উদ্দেশ্য, আবেগ ও অনুভূতি ইত্যাদি। যেসব সূচক, মনস্তাত্ত্বিক কর্মকৌশল, যোগাযোগীয় ক্রিয়া ও চিহ্ন, মানবিক চিন্তা ও ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এই দুটি তত্ত্ব থেকে। যেকোনো মানবীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা দুটি পন্থায় ক্রিয়াশীল থাকে-প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ। পরোক্ষ পন্থাটি ক্রিয়াশীল থাকে সামাজিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে। আর প্রত্যক্ষ পন্থায় যোগাযোগ মানুষের মন, মনন, বোধ, অনুধাবন সক্ষমতা এবং সামাজিক দক্ষতা ও সম্পৃক্তিবোধ ইত্যাদিকে উদ্দীপিত, ক্রিয়াশীল ও উৎকর্ষমণ্ডিত করে। এই যোগাযোগ মূলত পরিবার ও বিদ্যালয়ে শিক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। অন্যদিকে সামাজিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে যোগাযোগ হয় ব্যক্তির সামাজিক সম্পর্কজাল-পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী প্রমুখ।


মনো-ভাষাতত্ত্বের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হলো মানুষের ভাষা শিক্ষণ ও ভাষা অর্জন প্রক্রিয়া। বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্র হিসেবে এটি মনস্তত্ত্ব ও ভাষা বিজ্ঞানের সমষ্টি। মনস্তত্ত্ব অধ্যয়ন করে মানুষের আচরণ নিয়ে। আর ভাষাবিজ্ঞান অধ্যয়ন করে ভাষার আচরণ নিয়ে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী লিখিত কোনো টেক্সট-এর পাঠোদ্ধারের ক্ষেত্রে কোনো পাঠক তিন স্তরভিত্তিক সঙ্কেত ব্যবস্থার আশ্রয় নেয়। আর সেগুলো হলো গ্রাফিক সঙ্কেত (বর্ণ ও শব্দমালা), সিনট্যাকটিক সঙ্কেত (শব্দের ব্যাকরণভিত্তিক বিন্যাস), সিমানটিক সঙ্কেত (কোনো শব্দের অর্থ ও ধারণা যা পঠন প্রক্রিয়ার সময় পাঠকের মনে ক্রিয়াশীল থাকে)। আর এই পঠন প্রক্রিয়ার চারটি ধাপ-শব্দ ও শব্দবন্ধ গুচ্ছকরণ, কোনো শব্দ বা শব্দবন্ধের পর অন্য কী কী শব্দ বা শব্দবন্ধ আসতে পারে তা অনুমান করা এবং সেই অনুমানের সঠিকতা যাচাই করা ও সত্যতা নিশ্চিত করা।



চলচ্চিত্র ও মনোবৈকল্য


যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালী। সামাজিকীকরণের কার্যকর হাতিয়ার। সমসাময়িক সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এই মাধ্যমটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। জনগণের অনুধাবন ও উপলব্ধিকেও প্রভাবিত করে ব্যাপক মাত্রায়। প্রতিফলন ঘটায় সমাজের মনস্তত্ত্ব ও মূল্যবোধের। এটি সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াবলি, মানুষের আবেগীয় ও আচরণগত বিষয়সমূহ বেশ জোরালোভাবে রূপায়ণ করে। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সম্পর্কে  গণমাধ্যম বিশেষত চলচ্চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালী ও জনমানসে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। বাস্তব ঘটনাবলি তুলে ধরার প্রশ্নেও চলচ্চিত্র খুবই শক্তিশালী মাধ্যম। কখনো কখনো এটি বাস্তব বাস্তবতা ও ফিতাবদ্ধ বাস্তবতার মাঝখানে আটকা পড়ে। তার পরও এটি বিনোদন দেওয়া, শিক্ষিত করা, সচেতনতা সৃষ্টি এবং অভ্যাস-মনোভাব ও আচরণে পরিবর্তন আনার প্রশ্নে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মোটাদাগে মানুষের মনোজাগতিক বাস্তবতা উপলব্ধি ও প্রকাশের প্রশ্নে এটি খুবই শক্তিশালী হাতিয়ার। 

একটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে প্রতীয়মান হয়, চলচ্চিত্র-নির্মাণ ও মনোরোগ বিদ্যার দার্শনিক জায়গাটি কিন্তু প্রায় একই রকম। উভয়ের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হলো মানবীয় আচরণ ও প্রেষণা। উভয়েরই আলোচনা করে মানবীয় অনুধাবন প্রক্রিয়া, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, ব্যক্তির  একান্ত  মানবিক অভিজ্ঞতা এবং মানবীয় আচরণের প্রেষণা নিয়ে। চলচ্চিত্রনির্মাতারা দর্শককে বিনোদন দেওয়ার জন্য আকর্ষণীয় কোনো চরিত্র এবং দুর্দান্ত কোনো গল্পের আশ্রয় নেয়। অন্যদিকে মনোরোগবিদ ও মনস্তত্ত্ববিদদের কাজের জায়গাটি হচ্ছে মানুষের মন কীভাবে কাজ করে তা উপলব্ধি করা এবং মনোবৈকল্যে আক্রান্ত ব্যক্তির আরোগ্যের পন্থা অনুসন্ধান করা। কাজেই দেখা যাচ্ছে, উভয়ই কোনো না কোনোভাবে মানবীয় আবেগ ও অনুভূতি নিয়ে কাজ করে।


চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত চরিত্রের সঙ্গে দর্শক নিজের আচরণ-মনোভাব ও ক্রিয়ার মিল-অমিলের জায়গাটি খুঁজে পায়। এক্ষেত্রে তারা নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রের আবেগ ও অনুভূতিকে উপলব্ধির চেষ্টা করে। কেউ কেউ আবার আবেগীয় ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার জন্যই চলচ্চিত্র দেখে, যা তাকে ইতিবাচকভাবে উদ্দীপিত করে। বাস্তবে মনোচিকিৎসক ঠিক এই কাজটিই করে থাকে। তারা মানবীয় আবেগের প্রেরণমূলক ক্ষমতাটি উপলব্ধির চেষ্টা করে। এই আবেগ কীভাবে মানবীয় আচরণকে প্রভাবিত করে তা-ও বোঝার চেষ্টা করে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, দর্শকের আগ্রহ জন্মানো কিংবা গল্পের প্লট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র মূলত দুর্দান্ত কোনো আচরণকে কাজে লাগায়। আর মনোরোগবিদ্যা মানবীয় আচরণে বহুমাত্রিক মিল-অমিলের কারণ অনুসন্ধান করে। বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতা নির্মাণের প্রশ্নে চলচ্চিত্রনির্মাতারা মনোরোগবিদ্যার বিভিন্ন ধারণাকে কাজে লাগায়। বিভিন্ন আবেগ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কিংবা কোনো চিন্তার যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন চলচ্চিত্রিক কৌশল ও ক্যামেরা কৌশলের আশ্রয় নেয়। চলচ্চিত্রিক কৌশলগুলো হলো রঙ, শব্দ, সময় ও দৃষ্টিকোণকে প্রয়োজন মতো কাজে লাগানো।


মনোরোগবিদদের বলা হয়, আত্মার চিকিৎসক। অন্যদিকে চলচ্চিত্র হলো শিল্পমাধ্যম। এখানে সর্বোচ্চ মাত্রার আবেগ-অনুভূতি ও সম্মোহনীয় প্রেরণার রূপায়ণ ঘটে। কখনো কখনো মনোরোগবিদগণ চলচ্চিত্রে মনোবৈকল্যের রূপায়ণের বিষয়টি খানিকটা সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের ধারণা, চলচ্চিত্রনির্মাতারা বিষয়টি যথাযথভাবে রূপায়ণ করতে পারে না। কেননা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কেবল বিনোদন মূল্যের ওপর জোর দেয়। তবে বেশকিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যোগাযোগ মনোবৈকল্যে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রকে সফলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। নির্মাতারা মানবিক অভিজ্ঞতার নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ বা উদ্দীপিত করার প্রশ্নে বহু সংবেদী উদ্দীপককে কাজে লাগায়। একাধিক সংবেদন ইন্দ্রিয়কে একই সঙ্গে উদ্দীপিত করে দর্শককে একধরনের অর্থময়তার বোধ বা অভিজ্ঞতা দেয়; নির্মাণ করে নতুন কোনো অর্থময়তা। আর সেই অর্থময়তা হতে পারে বাস্তব কিংবা মায়াময়। ফলে দর্শক কোনো বিষয়বস্তু বা ধারণার সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে পায়। এবং সেই সম্পর্কের প্রতি সাড়া দেয়। কেননা এই মাধ্যমটি অত্যন্ত জোরালো ন্যারেটিভকে কাজে লাগিয়ে জনগণকে সচেতন ও শিক্ষিত করে তোলে। মোটাদাগে চলচ্চিত্রে যেসব যোগাযোগ ও মনোবৈকল্যের রূপায়ণ ঘটে তা হলো-অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, বধিরতা, আবেগ বা আচরণগত ডিসঅর্ডার, ঈশ্বর প্রদত্ত বিশেষ মেধা-দক্ষতা-গুণসম্পন্ন, শারীরিক অক্ষমতা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, শিক্ষণে অক্ষমতা, বাচিক ডিসঅর্ডার, ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি এবং দর্শন সক্ষমতা না থাকা।


চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে মনোবৈকল্য রূপায়ণের মাত্রা, প্রকৃতি ও প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে জেন পারকিন্স, আর অরউইক ব্লাড, ক্যাথেরিন ফ্রন্সিস ও ক্যারি ম্যাককলাম (২০০৬)। তারা দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষ মনোরোগ ও এতে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে তথ্য ও ধারণা পেয়ে থাকে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র থেকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব মাধ্যমে শারীরিক অসুস্থতার তুলনায় মানসিক অসুস্থতাকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়; যা এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি সাধারণ মানুষের মনোভাব ও বিশ্বাসকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। যেসব চলচ্চিত্রে যোগাযোগ ও মনোবৈকল্যের রূপায়ণ ঘটানো হয়, সেসব চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শক উপলব্ধি করতে পারে, বাস্তবে কোনো ব্যক্তি কীরূপ আচরণ করে, আবেগ ও অনুভূতি কীরূপ, কীভাবে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে, রোগের লক্ষণগুলো কী এবং জীবন অভিজ্ঞতাইবা কেমন। শুধু তাই নয়, এই রোগ থেকে আরোগ্য লাভের প্রশ্নে ব্যক্তি চিকিৎসকের সহায়তা গ্রহণ করবে কি না সেই সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করে।


জনপ্রিয় মাধ্যমে ব্যক্তিসমষ্টি ও গোষ্ঠীকে উপস্থাপনার ধরন এবং তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। বলা যায়, এই উপস্থাপনা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে ব্যাপক মাত্রায়। আনাত ক্লিন ও দাফনা লেমিশ (২০০৮) দেখিয়েছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই উপস্থাপনা অস্পষ্ট, বাস্তবতা বিবর্জিত, ভ্রান্তিপূর্ণ ও বিকৃত। কেননা বিষয়টি উপস্থাপনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বেঠিক, অতিরঞ্জিত কিংবা অর্ধসত্য তথ্য হাজির করে। মনোবৈকল্যে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কেবল অদ্ভুত, অস্বাভাবিক ও ভিন্ন কিসিমের হিসেবেই হাজির করা হয় না, বরং পরিবার ও সমাজের জন্য বিপজ্জনক হিসেবেও তুলে ধরা হয়। ফলে গণমাধ্যম যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য বিষয়টি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা আরো দৃঢ় করে১০ এবং এতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হেয় প্রতিপন্ন করে। মোটাদাগে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলো মনোরোগ ও মনোবৈকল্যে আক্রান্ত চরিত্রগুলোর মাধ্যমে কিছু ভ্রান্ত ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। ভ্রান্ত ধারণাগুলো হলো-এসব ব্যক্তি সহিংস স্বভাবের; তাদের আচরণ ও মনোভাব ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। কাজেই তাদের সম্পর্কে কোনোরূপ পূর্বানুমান করা যায় না; তারা কখনোই আরোগ্য লাভ করে না; কেবল ওষুধে এই রোগ সারে; এ ধরনের শিশুরা জীবনে সফল হতে পারে না। তারা জীবনে একটি পর্যায় পার করে মাত্র; তাদের নিজস্ব কোনো বোধবুদ্ধি থাকে না বরং ‘শয়তান’ কর্তৃক সমস্ত আচরণ ও ক্রিয়া চালিত হয়। তবে এরা কখনো কখনো দুর্দান্ত কিছু করে ফেলে!


মোটাদাগে চলচ্চিত্রে যেসব মনোরোগ ও মনোবৈকল্যের রূপায়ণ ঘটে-অ্যামনেসিয়া (Amnesia), রেট্রোগ্রেড অ্যামনেসিয়া (Retrograde amnesia), সাইকোজেনিক অ্যামনেসিয়া (Psychogenic amnesia), ল্যাকুনার অ্যামনেসিয়া (Lacunar amnesia), অ্যান্টিসোশাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (Antisocial personality disorder), বিষণ্নতা ডিসঅর্ডারস  (Anxiety disorders), অ্যাগোরাফোবিয়া (Agoraphobia), সোশাল অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (Social anxiety disorder), অ্যাটেনশন ডেফিসিট ডিসঅর্ডার (Attention deficit disorder), অ্যাসপারজার সিন্ড্রম (Asperger syndrome), অ্যাভইড্যান্ট পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (Avoidant personality disorder), বাইপোলার ডিসঅর্ডার (Bipolar disorder), বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (Borderline personality disorder), কনডাক্ট ডিসঅর্ডার (Conduct disorder), ডিলিউশনাল ও সাইকোটিক ডিসঅর্ডার (Delusional and psychotic disorder), ডিমেনশিয়া (Dementia), ডিপ্রেশন (Depression), ডিসথ্যামিয়া (Dysthymia), ডিসঅ্যাসোসিয়েটিভ আইডেনটিটি ডিসঅর্ডার (Dissociative identity disorder), ইটিং ডিসঅর্ডারস (Eating disorders), ইরোটোম্যানিয়া (Erotomania), হিস্ট্রিওনিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (Histrionic personality disorder), হাইপারসেক্সুয়ালিটি (Hypersexuality), ম্যালিংগারিং (Malingering), মানচৌসেন সিনড্রম (Munchausen syndrome), নারসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (Narcissistic personality disorder), অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (Obsessive-compulsive disorder), প্যারানয়েড পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (Paranoid personality disorder), পিডোফিলিয়া (Pedophilia), পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (Personality disorder), পারভাসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার (Pervasive developmental disorder), পোস্ট্রামাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (Posttraumatic stress disorder), স্যাডিজম (Sadism), সিজোঅ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার  (Schizoaffective disorder), সিজোয়েড পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার (Schizoid personality disorder), সিজোফ্রোনিয়া (Schizophrenia), সেল্ফ-ইনজুরি (Self-injury), সাবস্ট্যান্স ইউজ ডিসঅর্ডার (Substance use disorder), সুইসাইড (Suicide), আলঝেইমার্স (Alzheimers) ও প্রোজেরিয়া (Progeria) ইত্যাদি।

 

বলিউডি চলচ্চিত্রে যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য


বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো তারে জামিন পার চলচ্চিত্রে যোগাযোগ ও মনোবৈকল্যের রূপায়ণ। হিন্দি চলচ্চিত্রে এই বিষয়টির রূপায়ণ উপলব্ধি করার জন্য খানিক পিছন ফিরে তাকাতে হবে। বলিউডি চলচ্চিত্রের গোড়াপত্তন ঘটে দেশটির স্বাধীনতার পর পরই, ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে। প্রচলিত ধারণা হলো, বলিউডি চলচ্চিত্র মানেই নাচ, গান, প্রেম, ভালোবাসার পৌনঃপুনিক বয়ান। কিন্তু একটু ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যায়, মানসিক অসুস্থতার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও সেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তা বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে খানিকটা অসামঞ্জস্য হলেও বহু চলচ্চিত্রে বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এসব চলচ্চিত্রে চরিত্রের বৈচিত্র্যময়তাও লক্ষণীয়। এই রূপায়ণ ও দৃষ্টিকোণগুলো ঠিক এ রকম-করুণা, হাস্যরস, ক্যারিক্যাচারিঙ, সমবেদনা, বীরত্ব, অসাধারণত্ব, বৈষম্যের শিকার, ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা করা এবং যন্ত্রণাময় জীবন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংগ্রাম, আবেগীয় দোলাচাল এবং মানবীয় আত্মার আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়া ও প্রেরণা-হতাশার চিরন্তন, বৈচিত্র্যময় ও বহুমাত্রিক প্রকাশ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ ও মনোবৈকল্যকে উপজীব্য করে যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে তা নিচের ছকে১১ তুলে ধরা হলো :

 

 

চলচ্চিত্রের নাম ও মুক্তির সময়

 বিষয়বস্তু

১৯৫০-এর দশকে

 

ফানুস

মনোরোগে আক্রান্ত

হাফ টিকিট

মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী

ক্রোড়পতি

মানসিক প্রতিবন্ধী

১৯৬০-এর দশক

 

রাত অর দিন

মাল্টিপল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার বা বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব বৈকল্য

১৯৭০-এর দশক

 

পাগল কাহিন কা

মানসিক অসুস্থতা/বংশ পরম্পরায় মনোবৈকল্য

কোশিশ

শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা

খামোশি

শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা

১৯৮০’র দশক

 

ইনসাফ কা তারাজু

সাইকোপ্যাথ

যাখমি আওরাত

সাইকোপ্যাথ

১৯৯০-এর দশক

 

খলনায়ক

অ্যান্টিসোশাল পারসোনালিটি বা সমাজবিরোধী ব্যক্তিত্ব 

ডর

সাইকোপ্যাথ

আনজাম

সাইকোপ্যাথ

দিওয়ানা

সাইকোপ্যাথ

দস্তক

 সাইকোপ্যাথ

দিলওয়ালে

সাইকোসিস

কৌন

সাইকোপ্যাথ

পেয়ার তুনে কেয়া কিয়া

সহিংসতা ও ডিপ্রেশন

২০০০-এর দশক

 

তেরে নাম

সাইকোপ্যাথ, সিজোফ্রেনিয়া

কিউন কি

মানসিক অসুস্থতা

অ্যাপার্টমেন্ট

ডিলিউশন

দুশমন

অ্যান্টি সোশাল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার

রাজ

পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার বা ব্যক্তিত্ব বৈকল্য

মে আইসা হি হু

মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী

ইউ মি অর হাম

ডিমেনসিয়া

চেহারা

সাইকোসিস

ক্রেজি

মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী

তারে জামিন পার

ডিসলেক্সিয়া

গুজারিস

ইউথানাসিয়া

পা

প্রোজেরিয়া

মাই নেইম ইজ খান

অ্যাসপার্জার সিন্ড্রোম

গজনি

অ্যান্টারোগ্রেড অ্যামনেসিয়া

ব্ল্যাক

সিজোফ্রোনিয়া, ডিমেনসিয়া

কোই মিল গায়া

মেন্টাল রিটারডেশন/মানসিক প্রতিবন্ধী

ম্যায়নে গান্ধিকো নেহি মারা

আলঝেইমার্স

আপনা আসমান

অটিজম

একলব্য

নিউরোসি/ম্যানিয়া

সাদি সে পেহলে

মাদকাসক্তি

মুম্বাই এক্সপ্রেস

মাদকাসক্তি

জুরম

প্যারনইয়া

চেহরা

মানসিক অসুস্থতা

দেবদাস

মাদকাসক্তি

মনসুন ওয়েডিঙ

শিশু নির্যাতন

সংঘর্ষ

সাইকোপ্যাথ

কুছ তো হে

সাইকোপ্যাথ

কার্তিক কলিঙ কার্তিক

সিজোফ্রেনিয়া

হন্টেড-৩ডি

প্যারাসাইকোলোজি

বারফি

অটিজম

হিরোইন

বাইপোলার ডিসঅর্ডার

টম ডিক অ্যান্ড হ্যারি

 

 

 

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, শূন্য দশকের আগে মনোবৈকল্যের বিষয়টিকে অত্যন্ত নেতিবাচক, হাস্যরসাত্মক, ব্যাঙ্গাত্মক, বিনোদনমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হতো। কিন্তু এ দশকের পর শুরু হয় নতুন ধারা। এ পর্যায়ে বৈকল্যের বিষয়টিকে অনেকটা দায়িত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।


হিন্দি চলচ্চিত্রে যোগাযোগ বৈকল্যের বিষয়টি তুলে ধরার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে ধরা হয় গুলজারের কোশিশকে। চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখানো হয় সঙ্কেত ভাষার বর্ণমালা। সঞ্জীব কুমার ও জয়া ভাদুড়ী অভিনীত কোশিশ-এ এক বধির ও বাকপ্রতিবন্ধী দম্পতির জীবন যন্ত্রণা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের রূপায়ণ করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে কীভাবে একজন বধির ব্যক্তিও যোগাযোগ করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারে। অন্যদিকে স্পর্শ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের স্কুলের এক শিক্ষকের জীবন সংগ্রামকে ঘিরে। স্পর্শ শব্দটির মানে হচ্ছে সংবেদন বা স্পর্শের অনুভূতি। যোগাযোগের ক্ষেত্রে দৃষ্টিহীন ব্যক্তিরা এই স্পর্শ অনুভূতির ওপরই নির্ভর করে। এই চলচ্চিত্রে এক অন্ধ প্রিন্সিপাল, তার শিক্ষার্থীদের জীবন সংগ্রাম এবং পরস্পরের প্রতি অনুভূতি তুলে ধরা হয়েছে। এখানে অন্ধ সেই শিক্ষকের শক্তি, প্রত্যাশা ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয় অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে। প্রধান চরিত্রের ভূমিকায় নাসিরউদ্দীন শাহ্ অন্ধ হলেও বিভিন্ন কাজ কারো সাহায্য ছাড়াই করেন-স্কুল চালান, রান্না করেন, কাপড় পরিষ্কার করেন। এর মধ্য দিয়ে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়-শারীরিক দিক থেকে ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা কারো করুণা প্রত্যাশা করে না। তবে সমাজ তাদের শারীরিক বিশেষত্বের কথা বার বার মনে করিয়ে দিলে তারা প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। এই যন্ত্রণা কখনো কখনো ডিপ্রেশনে রূপ নেয়।


প্রখ্যাত নির্মাতা সঞ্জয়লীলা বানসালি’র প্রথম চলচ্চিত্র খামোশির বিষয়বস্তুও বধির ও বাক প্রতিবন্ধী এক দম্পতির জীবন সংগ্রামকে ঘিরে। নাসিরউদ্দীন শাহ্ অভিনীত এই চলচ্চিত্রটিতেও দেখানো হয়েছে ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তির জীবন যন্ত্রণা ও সাফল্যের গাঁথা। মানবিক সম্পর্কের বিষয়টিও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দারুণভাবে। দেখানো হয়েছে, ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা যেকোনো মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রকৃত ভালোবাসাই প্রত্যাশা করে। এছাড়া খামোশিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়-ব্রেইল টেক্সট বই না থাকায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা মূলধারার শিক্ষা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।


অমিতাভ বচ্চন ও রানী মুখার্জী অভিনীত ব্ল্যাক-এর মূল বিষয়বস্তু আলঝেইমার্স রোগ। এর কাহিনি গড়ে উঠেছে একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মানবিক সম্পর্ক নিয়ে। বারফিতে বাকপ্রতিবন্ধী এবং অটিজম-এ আক্রান্ত দুই মানব-মানবীর হৃদয়াবেগ ও সম্পর্কের জায়গাটি তুলে ধরা হয়েছে। এখানে প্রধান দুই চরিত্র সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও যোগাযোগে সক্ষম নয়। তারা বার বার একইরকম আচরণ প্রদর্শন করে। দেবদাস-এ দেখানো হয় ভালোবাসা বুভুক্ষু, বিষণ্ন ও মাদকাসক্ত ব্যক্তির জীবনের বিভিন্ন মাত্রা। অন্যদিকে হিরোইন-এর প্রধান চরিত্রটি বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত। এখানে অবশ্য বৈকল্য বিষয়টির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং মানসিক অসুস্থতার কারণে একজন নারী অভিনয়শিল্পীর ক্যারিয়ারের পতন ঘটে। হিরোইন-এর প্রধান চরিত্রটি মানসিকভাবে বিষণ্ন ও অবসাদগ্রস্ত; ক্ষণে ক্ষণে তার মন পরিবর্তন হয়। এর ফলে তিনি বিভিন্ন পেশাগত সমস্যার মুখোমুখি হন।


অন্যদিকে শাহরুখ খান অভিনীত মাই নেইম ইজ খান প্রধান চরিত্র অ্যাসপারজার সিনড্রোম নামে একধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। এই রোগের কারণে তিনি সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হতে পারেন না। তিনি কোনো বিশেষ আচরণ ও আগ্রহের বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটান। তার সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা খুবই দুর্বল। শুধু তাই নয়, ভাষার সঠিক ব্যবহার এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে নিজেকে তিনি খাপ খাওয়াতে পারেন না। এছাড়া তেরে নাম-এর প্রধান চরিত্র সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। সিজোফ্রেনিয়া রোগের অনেক লক্ষণই-বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, অডিটরি হ্যালুসিনেশন, প্যারনয়েড আচরণ, ডিল্যুশন ও চিন্তায় বিক্ষিপ্ততা-ওই চরিত্রে ফুটে উঠেছে। এছাড়া শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মে আইসা হি হু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এতে মনোরোগ, প্রতিবন্ধী ও পাগল ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।


তারে জামিন পার-এ যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য


তারে জামিন পার-এর কাহিনি প্যাট্রিসিয়া পোলাক্কোর বই ‘Thank You, Mr. Falker’ থেকে অনুপ্রাণিত। এই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র ইশান আওয়াস্থি। আট বছরের বালক। সে স্কুল ও পড়ালেখা কোনোটাই পছন্দ করে না; অকৃতকার্য হতে থাকে প্রত্যেক পরীক্ষায়। স্কুলে পাঠ্য প্রতিটি বিষয় তার কাছে অসম্ভব কঠিন মনে হয়। পড়ালেখায় অমনোযোগ ও অসামর্থ্যরে কারণে সহপাঠী এমনকি শিক্ষকরা তাকে অপমান, হেয় প্রতিপন্ন করে বিভিন্নভাবে। শিক্ষক থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব, বাবা-মা সবাই তার ওপর বিরক্ত। স্কুল থেকে আসা একের পর এক অভিযোগের কারণে এবং ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাধ্য হয়ে ছেলেকে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করান বাবা। আর সেখান থেকেই শুরু হয় চলচ্চিত্রের মূলগল্প।


আট বছরের বালক ইশান আওয়াস্থি ডিসলেক্সিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ায় সে কোনোকিছু পড়তে কিংবা বানান করতে পারে না। অক্ষরগুলো তার চোখের সামনে নেচে বেড়ায়। মাছ, ঘুড়ি, কুকুর হয়ে ঘুরে বেড়ানো সেই শব্দগুলো বালক মনের আনন্দের খোরাক হলেও তা বড়োদের কাছে বিরক্তিকর ছাড়া আর কিছুই না। তাই বড়োভাই জোহান (Yohaan) যখন ক্লাসের সব বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে মায়ের কাছে ছুটে আসে, তখন ইশানের রেজাল্টকার্ড তার পোষা কুকুরের মুখে ঘুরে বেড়ায়। ইশানের জগৎ বৈচিত্র্যময় বিস্ময়ে ভরা। সেই জগতে আছে নানান রঙ, মাছ, কুকুর ও ঘুড়ি। বয়স্কদের জগতে এগুলোর কোনোই মূল্য নেই। তারা স্কুলের বাড়ির কাজ, পরীক্ষার নম্বর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতিই বেশি আগ্রহী। এই গল্পটি দর্শকের চেনাজানা জগৎ, চলচ্চিত্র ও বয়ানে খানিকটা অপ্রচলিত কিন্তু অজানা নয়। এর মূল বার্তাটি অবশ্য সবারই জানা। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়টি নিয়ে সবাই অসচেতন।


কিন্তু তারে জামিন পার-এ দেখানো হয়, প্রত্যেক শিশুই বিশেষ গুণ ও অমিত সম্ভাবনাময়। এর মধ্য দিয়ে আসলে প্রত্যেকের মধ্যে থাকা শিশুটিকে দেখতে ও চিনতে পারা যায়। সমাজে কেউই পরমভাবে পরিপূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ নয়। সবারই রয়েছে কোনো না কোনো ঘাটতি। সক্ষমতা, অক্ষমতা মিলিয়ে প্রতিটি শিশুই বিশেষ ও মেধাবী। তবে সেটা আপন আপনভাবে, আপন আপন দৃষ্টিকোণ ও জায়গা থেকে। কাজেই তারে জামিন পার কেবল ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারের জীবনসংগ্রাম নিয়ে নয় বরং এটি বর্তমান দুনিয়ায় সাফল্য বুভুক্ষু বাবা-মায়ের অজ্ঞতা ও ব্যর্থতার রূপায়ণ। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই দর্শক তাই উপলব্ধি করতে পারে, নিজেদের আর্থ-সামাজিক অহম ও অজ্ঞতাকে ঢাকতে গিয়ে কীভাবে শিশুদের স্বপ্নগুলোকে তারা চিনতে ব্যর্থ হয়; অক্ষম হয় শিশুর জন্মগত মেধাকে লালন করতে।


বাস্তবে ইশান অসম্ভব রকমের মেধাবী। প্রচণ্ড কৌতূহলী ও কল্পনাপ্রবণ। তার অন্তর্জগৎ বিস্ময়ে ভরপুর। কিন্তু এসব কিছু সে অন্যকে জানাতে পারে না। সে দুর্দান্ত ছবি আঁকে। অথচ তার এই মেধা ও দক্ষতা সম্পর্কে কেউ জানে না; জানতেও চায় না। মোটাদাগে চলচ্চিত্রটির প্রধান চরিত্র ডিসলেক্সিয়া রোগে আক্রান্ত হলেও চলচ্চিত্রটি কিন্তু এই রোগ কিংবা বৈকল্য নিয়ে নয়। বরং ওই শিশু ও তার বাবা-মাকে নিয়ে। এই চলচ্চিত্রটি দর্শককে নিয়ে যায় শিশুর মনোজগতে। অনেক বাবা-মা তার সন্তানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিসামর্থ্য করতে চান। এটা করতে গিয়ে তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়, তাদের সন্তানের অজানা মেধা ও অমিত সম্ভবনার জায়গাটি। অথচ সামান্য একটু স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা ও উৎসাহ পেলেই সেই লুকানো মেধার বিকাশ ঘটতে পারে ব্যাপক মাত্রায়। তাই তারে জামিন পার-এর মূল বার্তাটি খুবই জোরালো। এটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাবা-মাদের সচেতনতা বোধকে জাগ্রত করে। তাদের উপলব্ধি করায়, শিশুটির আগ্রহ, শখ, শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলোকে।


ডিসলেক্সিয়া নিউরনজনিত রোগ। শিশুর বুদ্ধিমত্তা, কল্পনা ও আবেগীয় মাত্রার মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটে। তারে জামিন পার সেই সব মানুষকে উদ্দীপিত করে, স্পর্শ করে, দিশা দেয় এবং প্রণোদিত করে, যারা এই রোগে আক্রান্ত শিশু লালনপালন করছেন; মোকাবিলা করছেন বাস্তবতা; যারা এসব শিশুদের শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন কিংবা শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন।


ইশানের ডিসলেক্সিয়া আক্রান্তের বিষয়টি তার আট বছর বয়সের আগে বোঝা যায় না। সে কোনোকিছু পড়া, বানান করা, লেখা এবং শিক্ষকদের লেখা ঠিকমতো উপলব্ধি করতে পারে না। এছাড়াও তার দ্রুত পড়তে সমস্যা, শব্দের সঠিক উচ্চারণে সমস্যা, হাতের লেখা খুব খারাপ, বানানে অসঙ্গতি ও প্রতিবিম্বিক লেখন ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। এটি আসলে একটি ভাষাভিত্তিক বৈকল্য যা নিহিত থাকে নিউরন ও জন্মগত জিন-এ। ফলে শিশু কোনো শব্দের অর্থ উন্মোচন ও উপলব্ধি করতে পারে খুব ধীরে। বয়সের অনুপাতে ইশানের মানসিক বিকাশ হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় সে পিছিয়ে পড়ে। উপলব্ধি করতে পারে না পাঠ্য আধেয়। শব্দকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে পারে না কিংবা পারলেও খুব অল্পমাত্রায় ও ধীরে। এসব কারণে সহপাঠীরা তাকে উত্যক্ত করে। পাঠানুধাবন খুব ধীর হওয়ায় শিক্ষকরা তাকে ভর্ৎসনা করে।


অন্যদিকে ইশানের বাবা গতানুগতিক সাফল্য প্রত্যাশী কর্মকর্তা। ইশানের আচরণ তার কাছে ইচ্ছাকৃত ও দুষ্টুমি ছাড়া আর কিছুই নয়। আর তাই তিনি ইশানকে ধরাবাঁধা নিয়মের নিগড়ে আবদ্ধ করতে বোর্ডিং স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এখানেও ইশান আগের মতোই ধরাবাঁধা ও চাপিয়ে দেওয়া পঠনপাঠনের নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। ফলে নিজের জীবন বাস্তবতার প্রশ্নে সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে; নিদারুণ অসহায়ত্ব বোধ করে। এর মধ্যেই স্কুলে যোগ দেন নতুন শিক্ষক রাম শংকর। তিনি খেয়াল করেন, ইশান শ্রেণিকক্ষে খুবই চুপচাপ ও নীরব থাকে। খানিকটা কৌতূহলী হয়ে তিনি ইশানের নোটবুক দেখতে চান। সেই নোটবুকে তিনি খেয়াল করেন, বয়সের তুলনায় ইশানের হাতের লেখার উন্নতি হয়নি। আর বানানের ক্ষেত্রেও সে খুবই বিভ্রান্ত। যেমন : solid †K soiled, top †K †j‡L pot ইংরেজি solid কে soiled, top কে লেখে pot। শুধু তাই নয়, প্রায় একই রকম বর্ণ লেখার ক্ষেত্রে সে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। যেমন ইংরেজি bd এর মধ্যে সে পার্থক্য করতে পারে না। কোনো কোনো বর্ণকে আবার উল্টো করে লেখে- SIR বদলে লেখে ЯIƧ । কোনো কোনো শব্দের বানান সে ভিন্নভাবে লেখে- animal কে লেখে aminal। কোনো কোনো শব্দের বানানকে আবার সে লেখে সংক্ষিপ্ত করে। রাম শংকর আরো খেয়াল করেন, ইশান বর্ণ সঠিকভাবে চিনতে পারছে না। কোনো শব্দের সঠিক বানানের ক্ষেত্রে তার স্মৃতিশক্তি খুবই দুর্বল।


আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, মনো-ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোকিছু পাঠের প্রক্রিয়াটি চার ধাপে সম্পন্ন হয় : এক. শব্দ ও শব্দবন্ধগুলো বাছাই করা; দুই. একটি শব্দ বা শব্দবন্ধের পর কোন শব্দ বা শব্দবন্ধ আসতে পারে পারে তা অনুমান করা; তিন. অনুমানটি সঠিক কি না তা যাচাই করা এবং চার. সেই অনুমানের সঠিকতা নিশ্চিত করা।১২ কোনো কিছু পাঠের দুটি কৌশল রয়েছে-উপর-নিচ ও নিচ-উপর।১৩ যেসব পাঠক উপর-নিচ অভিমুখী পাঠ করে, তারা কোনো টেক্সটের শব্দগুলো আলাদা আলাদা করে পাঠের প্রতি মনোযোগ দেয় না। বরং সেই টেক্সট-এ চোখ বুলানোর সময় পরবর্তী শব্দের অর্থ অনুমান করে নেয়। অন্যদিকে উপর-নিচ অভিমুখী পাঠকরা একেবারে বর্ণ থেকে পাঠ শুরু করে। তারপর শব্দ, তারপর বাক্য এবং সবশেষে অর্থ উপলব্ধি হয়।


মাতৃভাষায় লিখিত কোনো টেক্সট পড়ার ক্ষেত্রে কোনো পাঠক নিচ-উপর কৌশল অবলম্বন করে। অন্যদিকে মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা পাঠের ক্ষেত্রে পাঠক উপর-নিচ পদ্ধতিতে পড়তে পছন্দ করে। কেননা সেই ভাষার নিয়মকানুন ও ব্যাকরণ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা থাকে না। ফলে তারা পুরো টেক্সট-এর অর্থ অনুমান করে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে। আবার কোনো পাঠক যদি তার পড়া টেক্সটটির সাংস্কৃতিক বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকেন, তাহলে শব্দ ও বাক্যের অর্থ অনুমান করে টেক্সটের মূল বার্তাটি উপলব্ধির চেষ্টা করেন। আর এই প্রক্রিয়াটি কিন্তু উপর-নিচ পঠন কৌশলেরই অংশ। অন্যদিকে টেক্সট সম্পর্কে কোনো পূর্ব ধারণা না থাকলে পাঠক পুরো টেক্সট-এর মর্মোদ্ধারের চেষ্টা করেন। কাজেই দেখা যাচ্ছে, মাতৃভাষা কিংবা দ্বিতীয় কোনো ভাষার পাঠক উভয়ই নিচ-উপর পঠন প্রক্রিয়াই অনুসরণ করে।


কোনো টেক্সটের বার্তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারা বা এর মর্মোদ্ধার করতে পারার প্রশ্নে সবচেয়ে দরকারি বিষয়টি হলো, যে ভাষায় টেক্সটটি লেখা তার প্রতিটি উপাদান বা অংশকে পৃথক পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে পারা। ভাষার সেই উপাদানগুলো হলো ফোনেম, মরফোম, সিনট্যাক্স ও সিমানটিক্স। ডিসলেক্সিয়া রোগে আক্রান্ত সমস্যার জায়গা কিন্তু সেটিই। কেননা তারা ভাষার উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে না। ফলে তারা টেক্সট-এর মর্মোদ্ধার বা মূলবার্তাটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। আর পঠনের এই প্রক্রিয়াটি কিন্তু একজন স্বাভাবিক পাঠক বা শিশুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ঠিক এখানেই নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রশ্নটি ওঠে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রাথমিক পড়ালেখা কোন ভাষায় করানো হবে? মাতৃভাষা না ইংরেজি, আরবি নাকি অন্য কোনো ভাষায়? এখানে বাংলাদেশের বাস্তবতা বুঝে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেননা এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের প্রাথমিক পর্যায়ে ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনা করতে একরকম বাধ্যই করা হচ্ছে। আর এই বাধ্যতার জায়গা থেকে আরেকটি প্রশ্ন হাজির হয়। তা হলো প্রাথমিকে ইংরেজি ভাষায় পঠনপাঠনে বাধ্য করে আমরা কি ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত প্রজন্ম তৈরি করতে যাচ্ছি?


এই প্রশ্নটির উত্তর কিন্তু তারে জামিন পার-এর ইশান চরিত্রের পাঠ সমস্যা বিশ্লেষণ করে পাওয়া সম্ভব। জন্মগতভাবে ইশানের মাতৃভাষা হিন্দি। পরিবারেও হিন্দি ভাষার প্রচলন রয়েছে। অথচ স্কুলে তার পড়ার মাধ্যম হচ্ছে ইংরেজি। কাজেই স্কুলে পাঠদানের মাধ্যম হিন্দি না হওয়ায় যেকোনো পাঠের ক্ষেত্রে ইশান বেশ বেকায়দায় পড়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইংরেজিতে কোনো বানান করা বা বর্ণের সঠিক বিন্যাসে অর্থবোধক শব্দও সে লিখতে পারছে না। সুতরাং ইশানের সমস্যা ডিসলেক্সিয়ার কারণে হোক আর অন্য কোনো কারণেই হোক, মূল প্রশ্নটি কিন্তু ইংরেজি ভাষায় তার দক্ষতার ঘাটতি। আর এ কারণে সে বিদ্যালয়ের পড়ালেখায় কাক্সিক্ষত দক্ষতা দেখাতে পারছে না।


মনো-ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে, ইশান ফনোলজিকাল প্রসেসিং সমস্যায় ভুগছে। সে বিভিন্ন শব্দের উচ্চারণ পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে পারে না। কোনো বাক্য পড়ার ক্ষেত্রে কোনো কোনো শব্দ বাদ দিয়ে দেয়। ফলে তার পাঠ ঠিক হয় না। বর্ণসমষ্টির উচ্চারণ বা আওয়াজ সম্পর্কে তার স্মৃতিশক্তি খুবই দুর্বল। ফলে তার পাঠও খুব ধীর গতির। এই ধীর গতি তার টেক্সটের বার্তা উপলব্ধি, অনুধাবন বা মর্মোদ্ধারের গতি কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারে না। কোনো বাক্য পড়ার সময় তা একই সঙ্গে শব্দের বানান ও অর্থের প্রতি মনোযোগ দিতে পারে না। লিখিত শব্দগুলো সে বিকৃতরূপে দেখতে পায়। বর্ণগুলো যেনো এলোমেলোভাবে অবিরাম গতিশীল থাকে, চক্রাকারে ঘুরতে থাকে এবং কাগজে লাফিয়ে ওঠানামা করতে থাকে।


পড়া ও বানানে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিশু ক্লাসের কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে জীবন ও দক্ষতা সম্পর্কে। চূড়ান্তরূপে নিঃশেষ হয়ে যায় মানবীয় আবেগ-অনুভূতির জায়গাটি। ইশানের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। ঠিকমতো লিখতে ও পড়তে না পারার কারণে স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছ থেকে কোনো রকম সহযোগিতা, উৎসাহ ও প্রেরণা সে পায় না। বরং তাদের কাছ থেকে রূঢ় সমালোচনা ও কটূক্তির শিকার হয়। একই ঘটনা ঘটে বাড়িতেও। ফলে তার মধ্যে একধরনের বিচ্ছিন্নতা বোধ কাজ করে। এই বিচ্ছিন্নতা থেকেই সে বাড়ি ও বিদ্যালয়ের তুলনায় বাইরের জগতটিকেই বেশি উপভোগ করে। আর এর শাস্তি হিসেবেই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বোর্ডিং স্কুলে। এখানে তাকে আরো বিরূপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে সে। নিজেকে গুটিয়ে ফেলে সবকিছু থেকে। চূড়ান্ত পর্যায়ে একেবারে চুপ হয়ে যায়। ইশানের এই চুপ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তার শিক্ষক রাম শংকর লক্ষ করলেও এ রকম অগণিত শিশুর অমিত সম্ভাবনার নৈঃশব্দের প্রক্রিয়াটি বিরাজমান বাংলাদেশেও এবং তা রয়ে যায় সবার অলক্ষেই। ইশানের আত্মিক অবস্থা ও মানসিক মনোভাব যথাযথভাবে উপলব্ধি করে তাকে অনুপ্রেরণা না দেওয়ার কারণে সে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে থাকে। তবে রাম শংকরের স্পর্শে সে ফিরে পায় আত্মবিশ্বাস। বাংলাদেশে হয়তো এ রকম অসংখ্য রাম শংকরের-ই দরকার। 


উপসংহার

বিদ্যায়তনিক পরিসরে যোগাযোগ ও মনোবৈকল্য সম্পর্কিত আলোচনা খুবই নতুন। তবে সমাজে এর উপস্থিতি নতুন নয়। এটি ব্যাপক মাত্রায় বিরাজিত। কিন্তু এ নিয়ে সচেতনতার বড়োই অভাব। অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি বেশ জোর দিয়েই বলা যায়। বাংলাদেশে এ ধরনের বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্রও নির্মাণ হয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। তবে বিশ্ব চলচ্চিত্রে মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি নানাভাবে গুরুত্ব পেয়েছে ব্যাপক মাত্রায়। পিছিয়ে নেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চলচ্চিত্রও। তবে শূন্য দশকের আগে সেখানে মনোবৈকল্যের বিষয়টিকে অত্যন্ত নেতিবাচক, হাস্যরসাত্মক, ব্যাঙ্গাত্মক, বিনোদনের দৃষ্টিকোণ তুলে ধরা হতো। কিন্তু শূন্য দশকের শুরু থেকে তা নতুন ধারা পায়। এ পর্যায়ে তাদের মধ্যে মনোবৈকল্যের বিষয়টিকে অনেকটা দায়িত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।


তারে জামিন পার-এর প্রধান চরিত্র ইশান ডিসলেক্সিয়া রোগে আক্রান্ত। এখানে এই বিষয়টি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে নির্মাতা তুলে ধরেছেন। তার পরও এই চলচ্চিত্রটি কিন্তু মনোরোগ বা মনোবৈকল্য নিয়ে নয়; বরং এই রোগের প্রতি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও সামগ্রিকভাবে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।


লেখক : আমিনুল ইসলাম, রাজশাহীর বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে পড়ান। সম্প্রতি তার প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মানবীয় যোগাযোগ’।


mukul.ru@gmail.com

 

তথ্যসূত্র


1. Rodgers, Lucy; `How to win an Oscar'; http://www.bbc.com/news/entertainment-arts-16932374; retrieved on 22.05.2017

2. Piaget, J. (1936); Origins of intelligence in the child. London: Routledge & Kegan Paul.

3. Bandura, A. (2001: 265–299); `Social Cognitive Theory of Mass Communication';  Media Psychology; Volume 3, Issue 3.

Bandura, A. (1989); Social cognitive theory. In R. Vasta (Ed.), Annals of child development. Vol.

4. Chomsky, N. (2000); `New Horizons in the Study of Language and Mind'; Cambridge: Cambridge University Press.

Hayes, Christopher G. (1980: ); `An Overview of Psycholinguistic Reading Theory'; Paper presented at the Annual Meeting of the Conference on College Coaposition and Communication (31st, Washington, DC, March 13Ñ15).

5. Farhady, H. (1995); `Language, Linguistics and Communication'; Journal of Humanities.

6.cÖv¸³;Hayes, (1980).

7. Pirkis, J., Warwick Blood,  R., Francis, C., and McCallum, K.; `On-Screen Portrayals of Mental Illness: Extent, Nature, and Impacts'; Journal of Health Communication; Volume 11, Issue 5, P. 523Ñ541.

8. cÖv¸³; Pirkis et al (2006).

9. Klin, Anat,  Lemish, Dafna; `Mental Disorders Stigma in the Media: Review of Studies on Production, Content, and Influences'; Journal of Health Communication; Volume 13, Issue 5, P. 434Ñ449.

10. Wahl, Otto; `Depictions of mental illnesses in children's media'; Journal of Mental Health; Volume 12, Issue 3, P. 249Ñ258.

11. Kumar, K., Gupta, A., and Gupta, R.; `Mental Illness in India: A cinematographical review'; Journal of Mental Health and Human Behavior; Volume 17, Issue 2, P. 95Ñ100.

12.cÖv¸³;Hayes, (1980).

13. Smith, Frank (2004; 233Ñ238); `Notes To Preface, Pp. Vii-Xii'; Psycholinguistics And Cognitive Science, Understanding Reading: A Psycholinguistic Analysis of Reading and Learning To Read; Mahwah: Lawrence Erlbaum Associates, Publishers.

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন