Magic Lanthon

               

মুহাম্মদ হাসান ইমাম

প্রকাশিত ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ধারাবাহিক পাঠ চলচ্চিত্রের কথা

মুহাম্মদ হাসান ইমাম


১৯৩১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এটা পরিষ্কার হয় যে, হলিউডের বদৌলতে সবাক চলচ্চিত্রের অধিষ্ঠান নিশ্চিত হয়ে গেছে; শেষ হয়ে গেছে নির্বাকের দিন। তবে প্রথম ২০ বছরেই নির্বাক চলচ্চিত্র এতো সব পর্যায় অতিক্রম করে যে, তা শৈল্পিক ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বৈপ্লবিক বলা যায়। মজার ব্যাপার হলো, ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ নির্বাক চলচ্চিত্রের মালিকরা আবার তাদের পুরনো চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শন করতে শুরু করে। The old time movie shwo নামে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এদের রমরমা ব্যবসা লক্ষ করা যায়। এই নামে আগের নির্বাক চলচ্চিত্রগুলো দর্শকদের ব্যাপকভাবে আকর্ষণও করে। এটি ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের সাধারণ চিত্র।

২০ দশকের শেষের দিকে সবাক চলচ্চিত্রের আগমন দর্শকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। কিন্তু তখনো আমেরিকার অনেক প্রেক্ষাগৃহে সবাক চলচ্চিত্র দেখানোর মতো শব্দ-ব্যবস্থা ছিলো না। সুতরাং অনেক জায়গায় সবাক চলচ্চিত্রকে নির্বাক হিসেবেই দেখানো হতো। তবে ৩০-এর দশকে প্রায় সব প্রেক্ষাগৃহে শব্দ-ব্যবস্থা চলে আসে। কিন্তু সবাক চলচ্চিত্রের প্রদর্শন শুরু হলে যে সমস্যাটি প্রকট হয়, তা হলোএর ইংরেজি ভাষা। নির্বাক চলচ্চিত্রের ভাষাহীনতার ভাষা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলো। কিন্তু যখন ইংরেজি ভাষায় সবাক চলচ্চিত্রের আবির্ভাব ঘটলো, তখন অনেক দেশের দর্শক ইংরেজির সঙ্গে পরিচিত ছিলো না; বিধায় দর্শক অপ্রস্তুত মনোভাব প্রকাশ করতো। অর্থাৎ ভাষা যখন ছিলো না, তখন যা বোধগম্য ছিলো; ভাষা যখন এলো, তখন তার বোধগম্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হলো।

৩০ দশকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাক চলচ্চিত্র তৈরি হতো। এর সংখ্যা কম হলেও তা ব্যবসাসফল ছিলো। অনেকেই মনে করতো, সবাক চলচ্চিত্রের আবির্ভাব ঘটলেও নির্বাকের দিন শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো ভবিষ্যতে সবাক ও নির্বাক পাশাপাশি চলতে সক্ষম হবে। প্রথম সংলাপহীন চলচ্চিত্র হিসেবে দ্য সাইলেন্ট এনিমি : অ্যান এপিক অব দ্য অ্যামিরিকান ইন্ডিয়ান (১৯৩০) মুক্তি পায়। কানাডার হার্ডসন বে অঞ্চলের ইন্ডিয়ানদের জীবনী নিয়ে নির্মিত নাটকীয় একটি চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটিতে সঙ্গত কারণেই রেড ইন্ডিয়ানদের চিরাচরিত বন্য স্বভাব ও যুদ্ধবাজ হিসেবে যে উপস্থাপন, তা এড়িয়ে যাওয়া হয়। বরং সাদা মানুষদের আগমনের আগে এসব লাল মানুষদের যে দৈনন্দিন জীবনধারা ছিলো, তাকেই বেশি প্রশ্রয় দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে এই চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু যথেষ্ট সত্তায় যথার্থ মনে হয়। এবং চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সৎ চলচ্চিত্র প্রস্তুতের প্রচেষ্টা হিসেবে এটি আজও সমাদৃত ও প্রশংসিত।

বিলীয়মান রেড ইন্ডিয়ান সংস্কৃতির এই সন্ধিক্ষণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে চিত্রায়িত এই চলচ্চিত্রটি মূল্যবান দলিল হিসেবে পরিগণিত হয়। দ্য সাইলেন্ট এনিমি নির্মাণের পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক ইতিহাস, জাদুঘর ও কানাডিয় সরকারি আর্কাইভসগুলো অর্থায়ন করে। এ রকম আরো চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে দ্য সাইলেন্ট এনিমি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। তবে ভবিতব্য এই যে, দ্য সাইলেন্ট এনিমিকে খুব তাড়াতাড়ি সাইলেন্ট হয়ে যেতে হয়। ভয়ঙ্করভাবে আলাদা এবং আনন্দদায়কভাবে বাস্তব নামে এই চলচ্চিত্রটি আলোচিত-সমালোচিত হয় ভীষণভাবে। এ নিয়ে দ্য নিউইয়র্ক ইভনিং পোস্ট এই বলে মন্তব্য করে যে,

a picture so faithfull, so honest, so beautiful and so romantic as to make a permanent contribution to the mysterious story of the north American continent„ this is no ordinary moving picture. It feeds the love of the out-of-those. That is inherent in all of us. Is struggle against "the silent enemy", hunger„ meets the need for dramatic content. Is record of the first American appeals to all present-day Americans„ what a find thing it is for a young American thus to preserve the ancient life of his own continent!... if the rules permit, Mr. Burden's The Silent Enemy might today be put down upon the list for the next Pulityer pri“e as the best American dramatic creation of 1930.১৭

দ্য সাইল্যান্ট এনিমির সাফল্য স্বাভাবিকভাবেই নির্বাক চলচ্চিত্রের ব্যাপারে পুনর্বিশ্বাস জন্ম দিয়েছিলো। তারই ফল হিসেবে চার্লি চ্যাপলিনের সিটি লাইটস মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্র করতে গিয়ে চার্লি এমন ধারণা পোষণ করেন যে, শিল্পের সত্যিকার ভাষা হলো নির্বাক; যার বয়স সিকি শতাব্দী পার হয়ে এসেছে। চার্লি চ্যাপলিন পিকচার প্রোডাকশনস বছরে পাঁচ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার নির্বাক চলচ্চিত্রের জন্য ব্যয় করতে শুরু করলেন। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে সিটি লাইটস-এর দৃশ্য ধারণ শেষে চ্যাপলিন ঘোষণা করেন, আগামী বছর হলিউড ৪০ শতাংশ নির্বাক চলচ্চিত্র জন্ম দেবে। এইসব বক্তব্যের কারণেই তাকে নির্বাক চলচ্চিত্র বেঁচে থাকার সংগ্রামে নিয়োজিত যোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চ্যাপলিন বিশ্বাস করতেন, তার নির্বাক চলচ্চিত্র নতুন দিনের সবাক চলচ্চিত্রের চেয়ে সবদিক থেকে উত্তম হবে। অনেক প্রযোজকই অপেক্ষা করছিলেন চ্যাপলিনের সিটি লাইটস-এর গ্রহণযোগ্যতা দেখার জন্য। কারণ এটি গ্রহণের মধ্য দিয়েই প্রমাণ হবে, নির্বাক চলচ্চিত্র আরো কতোদিন বেঁচে থাকবে।

সাধারণভাবে এমন ধারণা করা হয়, চ্যাপলিনের নিজস্ব উদ্যোগ ও অভিনয়ের কারণে নির্বাক সত্ত্বেও সিটি লাইটস যথেষ্ট সাফল্য লাভ করে। এ প্রসঙ্গে চ্যাপলিনের একটি মন্তব্য স্মরণীয়তার চলচ্চিত্র বিনোদনের জন্য এবং সাধারণ মানুষ তার সংলাপহীন চলচ্চিত্র দেখতে আসবে। টকিজ অনেক সহজেই তৈরি করা যায়। তবে টকিজ আর নির্বাক চলচ্চিত্রের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য সৌন্দর্যেও। পূর্ব-উপকূলে আরেকটি প্রিমিয়ার শো উপলক্ষ্যে ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে চ্যাপলিন উপস্থিত ছিলেন। চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন শেষে জনতার উৎফুল্ল উপস্থিতি তাকে এতোটাই আমোদিত করে যে, তিনি পর্দার সামনে লাফিয়ে পড়ে বলেন, আজ আমি খুশি; দর্শককে তিনি ধন্যবাদ জানান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন-এ একজন মন্তব্য করেন এভাবেসিটি লাইটস সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ; যা চলচ্চিত্রের মহান ব্যক্তিত্বকে সুখী করতে পেরেছে এবং তার চিরাচরিত মনোভঙ্গিকে ব্যক্ত করার সুযোগও করে দিয়েছে।১৮

এই পর্যায়ে ট্যাবু : স্টোরি অব দ্য সিজ নিয়ে আলোচনা করা যাক। বোরাবোরা দ্বীপে চিত্রায়িত এক প্রেমের গল্প নিয়ে এর কাহিনি। এক পলিনেসিয় দম্পতির জীবন নিয়ে গড়া এই কাহিনিচিত্রের করুণ সমাপ্তি ঘটে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের মাধ্যমে। পুরুষতান্ত্রিক চার্চ, সুন্দরী স্ত্রীকে ঈশ্বরের সম্পত্তি বলে ঘোষণা দেওয়ায় যুবক স্বামী তাকে উদ্ধারের জন্য প্রাণপণ প্রচেষ্টায় লিপ্ত হন। নির্মাতা মারনাও-এর ৮১ মিনিটের কাহিনিচিত্রটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগের নাম প্যারাডাইস এবং দ্বিতীয়টি প্যারাডাইস লস্ট। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ১১ মার্চ ট্যাবুর আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ারের এক সপ্তাহ আগে মারনাও ক্যালিফোর্নিয়ায় মারা যান। নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল পার্ক থিয়েটারে ১৮ মার্চ ট্যাবু মুক্তি পায়। মুরডোন্ট হাল নিউইয়র্ক টাইমস-এ এর প্রশংসা করে লেখেন, একটি চিত্তাকর্ষক ফটোগ্রাফি এই চলচ্চিত্র; যাকে কবিতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। যে কবিতার শুরুতে সূর্যালোক ও সুখের সন্ধান পাওয়া গেলেও শেষাংশে দেখা যায় এক ঝঞ্ঝামুখর নাটকীয়তা।১৯ এখানে নেটিভরা প্রশংসনীয় অভিনয় দক্ষতা দেখায়। তাদের কর্ম ও অভিব্যক্তি রুশ চলচ্চিত্রের মতোই স্বাভাবিক ও সৌন্দর্যময় ছিলো।

লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস লেখে, সত্যিই এটা একটি সুন্দর, ছন্দময় ছবি; যা নির্বাক হওয়ায় যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয়। তবে এর সঙ্গীতায়োজন ছিলো উপলব্ধি করবার মতো। চলচ্চিত্রটি নিঃসন্দেহে দীর্ঘস্থায়ী হবে; যদিও এটি সীমিত বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছে।২০ বাণিজ্যিক সাফল্যের সীমাবদ্ধতা সংক্রান্ত ভবিষ্যৎবাণী সত্ত্বেও ট্যাবু প্রচুর পরিমাণ দর্শক টানতে সক্ষম হয়। একটানা ১২ সপ্তাহ চলার ইতিহাস এই চলচ্চিত্রের রয়েছে। সমস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই চলচ্চিত্রের প্রশংসা করে লেখালেখি প্রকাশ হয়। ওয়ালেস রেলিস লেখেন, মারনাও একটি ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্র সৃষ্টি করেছেন। ট্যাবু হলো দক্ষিণ সাগরের সম্মোহন চিত্র। এর আবেগময় আবেদন অনস্বীকার্য। এর গল্প সাধারণভাবে ব্যক্ত ও মসৃণভাবে উন্মোচিত। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই দক্ষিণ সাগর দ্বীপের অধিবাসী।২১

মারনাও চ্যাপলিনের মতোই বিখ্যাত ও কিংবদন্তি নায়ক হতে পেরেছিলেন। এখানে দুজনের একটি অদ্ভুত মিল লক্ষ করা যায়; তা হলো সারল্য ও কাব্যিক সৌন্দর্যকে চলচ্চিত্র-নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া। টকির যুগে নির্বাকের এই দুই সফল নির্মাতা আরো দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র গবেষণায় উল্লিখিত হবেন। সে সময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে চ্যাপলিনের ধারণা ছিলো এ রকম যে, কিছু একটা ভুল হচ্ছে। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশে পাঁচ মিলিয়ন মানুষ বেকার, সেখানে সব ঠিকঠাক চলছে এমন ভাবা ঠিক নয়। পক্ষান্তরে মারনাও তখন সমাধিক্ষেত্রের নীরব কণ্ঠস্বর। অসাধারণ চিত্রের গীতিময় চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে স্মরিত হয়ে আসছিলো। মারনাও-এর মৃত্যুর পর নিউইয়র্কে যখন তার ট্যাবু চলছিলো, তখন গ্রিলবার্ট সোয়ান-এর একটি বক্তব্য ছিলো এমন

I have found at least a place where politics is an unknown word; where no one has been trust by sofistification; where there is simplicity and charme and art that is not self-conscious; where there is sunlight and the complexities, as we knwo them, are strengerswhere there are none of the social involvements. It is primitive and lovely.২২

যখন নির্বাক চলচ্চিত্রকে অচল ভাবা হচ্ছিলো এবং সবাককে অপেক্ষাকৃত নতুনতর উদ্ভাবন মনে করা হচ্ছিলো, তখনো কিছু সমালোচক নির্বাকের অনন্যতাকে স্থায়ীভাবে উত্তমর্ণ ভাবতে অভ্যস্থ ছিলেন। তাদের মতে, নন্দনতত্ত্বে শব্দের আগমন নিঃসন্দেহে পশ্চাৎপদতার উদাহরণ। তবে ৩০-এর দশকের বহু ধারার সমালোচনার মধ্য থেকে এ কথাটি স্পষ্ট যে, ট্যাবু অসাধারণ গুণাত্মক মৌলিকত্ব ধারণ করে। যা পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্রপাগল মানুষেরা বিশ্বাস করে। 

ব্রিটেনে নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আবির্ভাব ও প্রতিক্রিয়া চলচ্চিত্রের ইতিহাস নির্মাণে এক নতুনতর মাত্রা যোগ করে। চলমান নির্বাক চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতায় ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আবির্ভাব স্বাভাবিকভাবেই চলচ্চিত্রের গতি-প্রকৃতি ও বিষয়বস্তু পাল্টে দেয়। পরবর্তী সময়ে এই পরিবর্তন চলচ্চিত্র-নির্মাণের ক্ষেত্রে একটা স্থায়ী প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে সংঘটিত সেই বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব দেখতে গিয়ে মাইকেল হেমন্ড ও মাইকেল উইলিয়ামস বলেন, এক্ষেত্রে দুটো জিনিস আমাদের মনে রাখা দরকার; তা হলোএক. ব্রিটিশ চলচ্চিত্র সংস্কৃতির নির্বাক অংশে আবির্ভূত প্রথম মহাযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সবাক চিত্রের আবির্ভাব; দুই. প্রথম মহাযুদ্ধের আবির্ভাব ও তার প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে সবাক চিত্রের আবির্ভাব। প্রথম বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই একটা বিশেষ সময়ের চলচ্চিত্রশিল্প সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভের চেষ্টা বুঝায়। সেসময় ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে প্রথম মহাযুদ্ধ চলচ্চিত্র-নির্মাণে বিরাট ছাপ ফেলে। বলা যায়, একটি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক শক্তি ও নন্দনতাত্ত্বিকভাবে চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশে মহাযুদ্ধের ভূমিকা নির্ণয় এখানে মুখ্য। দ্বিতীয় যে বিষয়টি দেখা দরকার, সেটি হলো ব্রিটিশ চলচ্চিত্র কীভাবে মানুষের স্মৃতিতে যুদ্ধের চিত্রকল্প নির্মাণ করে। সুতরাং এই দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্বের অধিকারী। যদিও তাদের মধ্যে সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে বিরোধপূর্ণ।

প্রথম প্রশ্নের সাংস্কৃতিক শক্তি বলতে এখানে চলচ্চিত্রশিল্পের দ্রুত বিকাশ বুঝানো হয়েছে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই চলচ্চিত্রশিল্পের এই বিকাশ জনপ্রিয় এবং বিনোদনমাধ্যম সামাজিকভাবে স্বীকৃত হতে পেরেছিলো। দ্বিতীয় প্রশ্নটি আমাদের জানতে সাহায্য করে, কী তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিস্তৃত চলচ্চিত্রশিল্প একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে জনসাধারণের যুদ্ধবিষয়ক স্মৃতি নির্মাণের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলো। হেমন্ড ও উইলিয়ামস তাদের আলোচনাকে তিনটি ভাগে ভাগ করেনমহাযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮), যুদ্ধোত্তর স্মৃতি ও সৌধ এবং যুদ্ধবিষয়ক আর্কাইভস।২৩

প্রথমটি চলচ্চিত্র-নির্মাণ ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে মহাযুদ্ধের প্রভাব পর্যালোচনা করে। এছাড়া দর্শক-শ্রোতার অভিজ্ঞতাও বিচারবিবেচনার মধ্যে আসে। যেমন : চলচ্চিত্রের দর্শক কীভাবে বাড়ছে, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা কী রকম পড়ছে ইত্যাদি। দ্বিতীয় ভাগে ২০-এর দশকে যুদ্ধের স্মৃতিমন্থন ও স্মৃতিযাপনকে বিস্তৃতভাবে দেখার চেষ্টা করে। আর আর্কাইভস আমাদেরকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করে। যাতে আমরা সেই সব লোকদেরকে জানতে পারি, যারা যুদ্ধের স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো।

এছাড়া আর্কাইভস আমাদের ঐতিহাসিক ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি সরবরাহ করতে পারে। সেখানে বহু সংখ্যক চলচ্চিত্র ইতিহাসকার, আর্কাইভিস্ট, উৎসব আয়োজক ও সঙ্গীত শিল্পীদের পরিচয় পাওয়া যায়। যারা যুদ্ধের বিভিন্ন রকম স্মৃতি চিহ্নকে আর্কাইভস ও জাদুঘরসমূহে স্থান করে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবদান রেখেছে। ব্রিটেনে মহাযুদ্ধের একটা বড়ো প্রভাব ছিলো হলিউড ও অন্যান্য ইউরোপিয় চলচ্চিত্রের প্রদর্শনকে বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে। চলচ্চিত্রের মধ্যে যুদ্ধবিষয়ক খবর ও ছবি প্রদর্শন একটা নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এছাড়া যুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র দ্য ব্যাটল অব দ্য সউমসহ (১৯১৬) বিভিন্ন ধরনের প্রোপাগান্ডামূলক চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয়। প্রদর্শক মহল ব্রিটিশ চলচ্চিত্র সংস্কৃতিতে চলচ্চিত্রকে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোর মুখোমুখি করে দেয়। চলচ্চিত্র যেনো দেশাত্মবোধের এক ব্যবহারিক প্রক্ষালন হয়ে দাঁড়ায়।

যুদ্ধকালীন চলচ্চিত্র হিসেবে দ্য ব্যাটল অব দ্য সউম নিঃসন্দেহে যুদ্ধক্ষেত্রের অবিশ্বাস্য চিত্রধারণ করে, চলচ্চিত্র দর্শকদের অনুভূতিকে সাংঘাতিকভাবে নাড়া দেয়। এছাড়া এই ছবির অনেক চিত্রই পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুতরাং এই চলচ্চিত্রটি যেমন যুদ্ধের, তেমনই যুদ্ধোত্তর স্মারক ছবি ও প্রকাশনার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। তবে অনেকের মতে, এতে যুদ্ধের সামগ্রিক বিয়োগান্তক বিষয়গুলো উঠে আসেনি। এবং ব্রিটিশ সমাজের যুদ্ধবিষয়ক প্রোপাগান্ডা হিসেবেও এটা ব্যবহার হতে পারেনি। বরং যুদ্ধের বিয়োগান্তক স্মারক হিসেবে তা প্রভূত প্রভাব রেখেছে। চলচ্চিত্র-নির্মাণের বিষয়টি প্রাধান্য পাওয়ায় অনেকটা ব্যাহত হয়েছে ঘটনার সত্যতা। যে কারণে অনেকে মনে করেন, এই চলচ্চিত্রটি কল্পনাশ্রিত নির্মাণ, যা গণমাধ্যমের সুবাদে জনসমক্ষে আসতে পেরেছিলো। সরকারি উদ্যোগে অনিয়মিত ছিলো বিধায় চলচ্চিত্রটি নান্দনিক তাৎপর্য বহন করতে ব্যর্থ হয়।

গল্প, কার্টুন ও সমালোচনার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রটি ভালো ও মন্দের মধ্যকার চিরন্তন সংঘাতকে তুলে ধরে। বাস্তবতার যথাযথ প্রতিনিধিত্ব না করলেও, চলচ্চিত্রটি দর্শকদের এমন ধারণা দেয় যে, যুদ্ধক্ষেত্রের একটি অত্যন্ত প্রতিনিধিত্বশীল চেহারা তারা দেখতে পাচ্ছে। সরকারি ও ঘটনানির্ভর এমন চলচ্চিত্র যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি যথাযথ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এর ফলে প্রথমত, সমকালীন দর্শক বাস্তবতার ফটোগ্রাফিক সত্যতা এবং চলমান ফটোগ্রাফিক ইমেজকে গ্রহণ করতে শেখে। দ্বিতীয়ত, বাস্তবতাকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর তারা আস্থা রাখতে শুরু করে। তৃতীয়ত, স্ববিরোধী বিষয়গুলোর সমাহার চলচ্চিত্রের গুণাগুণ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ অধিদপ্তর নির্মিত এই চলচ্চিত্র সৈনিকদের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়। বিষয়টি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া পত্রপত্রিকা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবেই চলচ্চিত্রটি গ্রহণ করে। গ্রিফিথের দ্য বার্থ অব অ্যা নেশন-এর (১৯১৫) সঙ্গে তুলনীয় একটি সর্বাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্র হিসেবে এটি স্বীকৃতি লাভ করে।

অনেকে চলচ্চিত্রটিকে জনপ্রিয় বলতে চান না এ কারণে যে, কাহিনিচিত্র বা বিনোদনমূলক চলচ্চিত্রের সঙ্গে জনপ্রিয় শব্দটি যতোটা সাবলীলভাবে ব্যবহার করা যায়; যুদ্ধের বীভৎস চিত্র সমন্বয়ে গঠিত প্রামাণ্য-চলচ্চিত্রের সঙ্গে তেমনভাবে মানায় না। সে কারণেই এই চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও বিষয়ের মানবিক গুণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সবকিছু বিবেচনা করে চলচ্চিত্রটির মধ্যে তথ্য ও বিনোদনের বিরোধপূর্ণ সংযোজন দৃশ্যমান বলে স্বীকার করতে বাধা নেই।

মহাযুদ্ধ ব্রিটিশদের হলিউড চলচ্চিত্রের অভিযান ও রোমান্স ছাড়াও বিশেষ চরিত্রভিত্তিক চলচ্চিত্র-নির্মাণের আবহ এনে দেয়। ব্রিটিশ চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সাহিত্য ছাড়াও পূর্ববর্তী চলচ্চিত্রগুলো দৃশ্যভিত্তিক চলচ্চিত্রে বিশেষ অনুপ্রেরণা রাখে। ২০-এর দশকে উইমেন টু উইমেন এবং ওয়াল্টার সামারস-এর চলচ্চিত্রের কথা উল্লেখ করা যায়। এছাড়া ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে জেমস হোয়েল-এর জার্নিস বেয়ন্ডকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভয়ঙ্কর যুদ্ধচিত্র সম্পৃক্ত চলচ্চিত্র ও হলিউডের অপরাধপ্রবণ চলচ্চিত্রসমূহের সম্মিলিত প্রভাব আক্রান্ত বলে মনে করা হয়। এই নির্বাককালীন ব্রিটিশ যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র, দর্শকের যুদ্ধ প্রত্যক্ষণ ও স্মারক অনুষ্ঠান উদ্যাপনের সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পেরেছিলো।

(চলবে)   

লেখক : প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

himam_ru@yahoo.com

 

তথ্যসূত্র

১৭. Newark Advocate and American Tribune, 18 September 1930; Cited in: Drew, William M. (2010: 4); The Last Silent Picture Show; THE SCREW PRESS, INC.

১৮. Drew, William M. (2010: 15); The Last Silent Picture Show; THE SCREW PRESS, INC.

১৯. প্রাগুক্ত; Drew (2010: 23-32).

২০. প্রাগুক্ত; Drew (2010: 23-32).

২১. প্রাগুক্ত; Drew (2010: 23-32).

২২. প্রাগুক্ত; Drew (2010: 23-32).

২৩. Hammond, Michael and Michael Williams (2011: 1-15); 'Goodbye to All That or Business as Usual? History and Memory of the Great War in British Cinema'; British Silent Cinema and the Great War; PALGRAVE MACMILLAN.

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন