রাশেদ রিন্টু
প্রকাশিত ০১ অক্টোবর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ভোজপুরি চলচ্চিত্র : স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়েই স্বপ্নভঙ্গের পথে
রাশেদ রিন্টু

প্রসঙ্গ আলাপন
গ্লুটোগনি বা ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে চর্চা বেশ পুরনো। হাজারো বছরের পুরনো নথি, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞান থেকে পাওয়া নানা তথ্যাদির মাধ্যমে ভাষা বিকাশের এক চিরাচরিত রূপ পাওয়া যায়। প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞানের সেই গবেষণা থেকে অনেকটাই স্পষ্ট হওয়া যায়, আদিকালে মানুষের চিহ্নের ব্যবহার, বিভিন্ন আওয়াজ, সঙ্কেত, ইশারা প্রভৃতি যোগাযোগের পদ্ধতি সম্পর্কে। মানবের বিকাশের কথা বলতে গিয়ে ভাষা নিয়ে কথা বলেছেন বিখ্যাত দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্কসও। তার বর্ণনায় সুনিপুণভাবে অতীতের সেই মাত্রাহীন মানব ভাষার সন্ধান মেলে। তবে প্রাচীনযুগ থেকেই স্থানভেদে ভাষার পরিবর্তনশীল রূপ পরস্পর বোঝাপড়ার ক্ষেত্রকে যেমন জটিলতর করেছে, একই সঙ্গে নতুন এক সমঝোতার দিগন্তও রচনা করেছে। সেই সমঝোতার ঠিক-ভুল দুই রূপই রয়েছে।
কল্পনা করি একটা স্তন্যপায়ী জন্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর ভাষা তন্ত্র নেই কিন্তু আমাদের মতো মস্তিষ্ক আছে এবং অন্যান্য অঙ্গ আছে এবং আমাদের মতো একটা কনসেপচুয়াল ইন্টেনশন্যাল ব্যবস্থা (conceptual intentional system) রয়েছে, যার ফলে এই দুনিয়াদারীটা আমাদের মতো করে বুঝতে পারে, যতোটুকু ভাষা না থাকলে বোঝা যায় আর কি।১
বিষয়টা এমন যে, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ভাষার ভিন্নতা থাকলেও সবারই বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে একটা সাধারণ অবস্থান রয়েছে। যেটা অন্যকে নিজের করে তুলতে সাহায্য করে। যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ভাষার পরিধি সৃষ্টির শুরু থেকেই বেড়ে চলেছে। মানবজাতির মধ্যে একসময় ভাষার যে বীজ বপন হয়েছিলো, তা আজ স্ফীত; প্রতিনিয়ত তা নির্মাণ করে চলেছে বাস্তব, কখনো সত্য। নানা ঘটনা তো বটেই; ভাষার মিশ্রণে এই সত্য-বাস্তবতার ঘোর লাগানো আরেক দৃশ্যমান মাধ্যম চলচ্চিত্রও।
ভাষা, চলচ্চিত্র ও অন্যান্য
১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে লুই লুমিয়ের ও অগাস্ত লুমিয়ের যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন, সেটা ছিলো নির্বাক। দর্শক শুধু চলচ্চিত্র দেখতে পারতো। কিন্তু তারা তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ‘কারণ এর [চলচ্চিত্রের] অন্যতম প্রধান অঙ্গ—ধ্বনি বা শব্দ, তখনো অধরাই ছিলো। তবে এই অধরা বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা মানুষ চলচ্চিত্র আবিষ্কারের পর পরই বোধ করেনি। কারণ তখন পর্দায় বাস্তবের মতো চলমান ছবি দেখাটাই ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ধীরে ধীরে ধ্বনির প্রতি দর্শকের আকাক্সক্ষা বাড়তে থাকে।’২ কারণ স্বাভাবিক জীবন থেকে এই নির্বাক চলচ্চিত্র তখনো অনেক দূরে। চলচ্চিত্র সবাক করতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রযুক্তি ব্যর্থ হলেও চেষ্টা থামায়নি চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। ভাষার আকাক্সক্ষা মেটাতে
১৯ শতকের শুরুতে জাপানে চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগে বেনসি (benshi) বলে কিছু লোক কাজ করতো। এদের কাজ ছিলো অনেকটা সূত্রধরের মতো। কোনো চলচ্চিত্র শুরুর আগে তারা সেই কাহিনী দর্শকদের বর্ণনা করতো। এমনকি চলচ্চিত্র চলাকালীন ধারাবিবরণীও দিতো তারা। চলচ্চিত্রে আকাশ দেখানো হলে তারা বলতো, ‘এখন আপনারা আকাশ দেখছেন।৩
চলচ্চিত্রকে আরো বাস্তবের মতো দেখার এই যে প্রচেষ্টা সেটা কেবল এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কখনো পর্দার পিছনে বাদ্যযন্ত্র, গাড়ির হর্ন, ঘোড়ার খুরের শব্দের মাধ্যমেও চলচ্চিত্রকে বাস্তবের কাছাকাছি আনার চেষ্টা করা হয়েছে। চলচ্চিত্রে ভাষা সংযুক্তির এই বিষয়টি শুধু যে উন্নত বা পশ্চিমা বিশ্বেই ছিলো তা নয়। ভারতবর্ষেও এই চেষ্টার দৃষ্টান্ত মেলে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মাতা হীরালাল সেন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের নেতা সুনেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য আলাদাভাবে টকিং মেশিন ও প্রক্ষেপণ যন্ত্রের সংমিশ্রণে প্রদর্শন করেন।৪ যা কিছুটা হলেও দর্শককে শান্তি দেয়। অর্থাৎ মানুষ পর্দায় নিজের মতো কোনো বাস্তব বা তার কাছাকাছি কোনো বিষয়কে দেখতে চায়।
এদিকে, চলচ্চিত্রশিল্পে বাস্তবসম্মত ভাষা যোগ না হওয়ায় একসময় দর্শক চলচ্চিত্র বিমুখ হয়ে পড়লো। ভাষার কতো ক্ষমতা তা চলচ্চিত্রশিল্পে আরো বেশি করে ধরা পড়ে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে। যখন অ্যালান ক্রসল্যান্ড দ্য জ্যাজ সিঙ্গার নির্মাণ করে চলচ্চিত্র বিশ্বে তাক লাগিয়ে দেন। চলচ্চিত্রবিমুখ মানুষ হুমড়ি খেয়ে চলচ্চিত্র দেখতে আসতে শুরু করে। দর্শক যে তাদের ভাষা চলচ্চিত্রে ফিরে পেয়েছে! তাইতো পাঁচ লক্ষ মার্কিন ডলারে নির্মিত ওই প্রথম সবাক চলচ্চিত্রটি আয় করেছিলো প্রায় ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলার।৫
তবে হ্যাঁ, ‘চলচ্চিত্রের একটি সাধারণ ভাষা আছে; সারা পৃথিবীর তাবৎ চলচ্চিত্র একই ভাষায় কথা বলে অন্তত এরকম একটি ভাষা যা বিশ্বের সকল চলচ্চিত্র-দর্শক একটি পর্যায় পর্যন্ত পাঠ বা উপলব্ধি করতে পারে।’৬ যা সব শ্রেণির দর্শকের জন্য প্রযোজ্য। সেটা হলো ইমেজের ভাষা। যদি সেই ইমেজ নির্বাক কিংবা নিঃশব্দও হয়, তার পরও সেটা কোনো পরিস্থিতির বর্ণনা করে। তবে ইমেজের এই সাধারণ বৈশিষ্ট্যের খেলাকে নিজের করে তুলতে চলচ্চিত্রে নানা ভাষা সংযুক্তির মাধ্যমে নতুন দিকে মোড় নেয়। নির্মাণ হতে থাকে ভাষাভিত্তিক পৃথক পৃথক চলচ্চিত্র। যার মাধ্যমে দর্শক কেবল নিজের ভাষাকে, নিজের সংস্কৃতিকে খুঁজতে থাকে। নিজেকে খোঁজার চেষ্টার ব্যাপক প্রভাব চলচ্চিত্রশিল্পে ধরা পড়ে শুরু থেকেই। ভাষা সংযুক্তির শুরুতে মূলত চলচ্চিত্র ইংরেজি ভাষায় নির্মিত হচ্ছিলো। সারাবিশ্বে তথা ভারত উপমহাদেশেও সেই ইংরেজি চলচ্চিত্রই প্রদর্শন হতো। কিন্তু একপর্যায়ে পর্দায় নিজের ভাষা-অস্তিত্বের অমিল হওয়ায় দর্শক ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রবিমুখ হতে থাকে। প্রয়োজন পড়ে নিজের ভাষায়, নিজের সংস্কৃতিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের। কারণ ভাষা দেশ বা অঞ্চলের জাতীয়তার প্রতিনিধিত্ব করে। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ভারতে নিজের ভাষা খুঁজে পেয়ে দর্শক হুমড়ি খেলো প্রথম হিন্দি সবাক চলচ্চিত্র আলম আরা দেখতে। যদিও ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকেই দাদাসাহেব ফালকের হাত ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিলো।
ভারতের চলচ্চিত্র বিকাশে ৫০-এর দশকের ভাষাভিত্তিক রাজ্য সীমানা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজ্য বিভাজনের বিষয়টা দেশ পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণের জন্য হলেও এটা বেশ প্রভাবিত করে ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পকেও।
চলচ্চিত্র বাজারে দক্ষিণ ও হিন্দি চলচ্চিত্রের ম্যারাথন দৌড়টা শুরু হয় মূলত ভাষার স্বকীয়তা বিস্তারের তাগিদ থেকে। ৫০-এর দশকে ভাষার ভিত্তিতে ভারতে বিভিন্ন সীমানা নির্ধারণ করা হয়। আর হিন্দিকে ঘোষণা করা হয় সর্বভারতিয় ভাষা হিসেবে। ফলে যেটা হয়, জাতীয় স্বকীয়তার চিন্তা থেকে দক্ষিণের চারটি প্রদেশে [তামিল নাড়– (তামিল চলচ্চিত্র), অন্ধ্রপ্রদেশ (তেলেগু চলচ্চিত্র), কর্ণাটক (কান্নাড়া চলচ্চিত্র) ও কেরালা (মালায়লাম চলচ্চিত্র)] নিজ ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণের চাহিদা বেড়ে যায়।৭
দরকার হয় ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি; যা স্থানভেদে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। তাইতো চলচ্চিত্র দেখে প্রায়শই বোঝা যায়, সেটা কোন ইন্ডাস্ট্রির। এর মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতিতে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে, কেবল তা নিজের ভাষায় চলচ্চিত্র দেখার তাগিদ থেকে। একই গল্পের বিক্রমারকুডু, সিরুথাই, ভিরা মাদারকারি ও রাউডি রাঠোর পর্দায় ভেসে ওঠে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়। দরকার পড়ে তেলেগু রেডি থেকে হিন্দি রেডি, গজনি থেকে গজনি, মালায়লাম বডিগার্ড থেকে হিন্দি বডিগার্ড, তামিল বন্ধা পরমাশিবমে থেকে হিন্দি হাউজফুল ২-এর মতো চলচ্চিত্রের। এছাড়া হিন্দি ভাষায় হিট নায়ক (২০০১), সাথিয়া (২০০২), রান (২০০৪), ইয়ুবা (২০০৪), নো এন্ট্রির (২০০৫) মতো চলচ্চিত্রগুলোও মৌলিক নয়, তামিল থেকে নেওয়া। যার মানে হলো, চলচ্চিত্রের কাহিনির নতুনত্বের চেয়ে সেই কাহিনিতে দর্শকের স্বকীয়তা কতোটুকু সেটাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যদিও এই আলোচনা চলচ্চিত্রের ভাষাভিত্তিক তুলনা বা রিমেক নিয়ে নয়। এই নানা ভাষা নানা জাতীয়তার মধ্যে ভারতের পূর্বে উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমে বিহার এবং নেপালের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা ভোজপুরিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে নিয়মিত। যার নাম ভোজপুরি চলচ্চিত্র। এই আলোচনা ভোজপুরি চলচ্চিত্রকে সঙ্গে নিয়েই এগোবে।
ভোজপুরি চলচ্চিত্রশিল্প
ভোজপুরি মূলত হিন্দি ভাষার উপভাষা। বিহার ও উত্তর প্রদেশের প্রায় নয় কোটি মানুষ প্রথম ও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে এ ভাষায় কথা বলে। তবে ভারত ও নেপালের দক্ষিণাঞ্চলের বাইরেও পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এই ভাষার মানুষের সন্ধান মেলে। ব্রাজিল, ফিজি, গায়ানা, দক্ষিণ আফ্রিকা, সিরিয়া, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং নেদারল্যান্ডেও এ ভাষাভাষীর মানুষ রয়েছে। এরা ইউরোপিয় ও নিগ্রোদের মিশ্রণে বিশেষ একটি জাতি, যারা ‘ক্রেত্তল’ নামে পরিচিত। ১৮ ও ১৯ শতকের দিকে ওই সব এলাকার ঔপনিবেশিকরা চরম শ্রমিক সঙ্কটে পড়ে। তখন তারা ভারত থেকে প্রচুর শ্রমিক নেয়, যাদের অধিকাংশই ছিলো ভোজপুরি ভাষাভাষীর। শ্রমিকদের মাধ্যমেই মূলত এই ভাষা ছড়াতে থাকে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ ভোজপুরি ভাষায় কথা বলে। এর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকায় বসবাসরত ভারতীয়রা মাতৃভাষা ও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ভোজপুরিতে কথা বলে।৮
১৯৫০-এর দশকে রাষ্ট্রীয় এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিহারের রাজেন্দ্র প্রসাদ। একই অনুষ্ঠানে তৎকালীন হিন্দি চলচ্চিত্রের খ্যাতনামা অভিনেতা নাজির হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। নাজিরও বিহার থেকে আসা। দুই জনেরই ভাষা ভোজপুরি। অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে নাজির হোসেন সাক্ষাৎ করেন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে। রাষ্ট্রপতি কথার একপর্যায়ে নাজির হোসেনকে বলেন, ‘তোমরা ভোজপুরি ভাষায় চলচ্চিত্র বানাও না কেনো?’৯ রাষ্ট্রপতির এই আক্ষেপ নাজিরকে উৎসাহিত করে। এর কিছুকাল পরে তিনি ভোজপুরি ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করেন। যদিও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের অনেক আগে থেকেই নাজির হোসেন ভোজপুরি চলচ্চিত্র নির্মাণের বিষয়টি ভেবে রেখেছিলেন। এমনকি তিনি একটা চিত্রনাট্য প্রস্তুত করেছিলেন; যেটা কেবল নির্মাণ হতে বাকি ছিলো। রাষ্ট্রপতির আক্ষেপ এই চেষ্টাকে গতিশীল করে। এরই মধ্যে নাজির প্রযোজক হিসেবে পেয়ে যান বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সিদ্ধার্থ প্রসাদ শাহাবাদিকেও। আর নির্মাতা কুনদান কুমার চিত্রনাট্যটিকে পর্দায় তুলে আনেন।
ভোজপুরি ভাষায় নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্রটির নাম গঙ্গা মাইয়া তোহে পেয়ারি চাধাইবো (১৯৬৩)। নাজির নিজে অবশ্য এতে অভিনয়ও করেন। নাজিরের শুরুটা হিন্দি মুনিমজ্বি (১৯৫৫) দিয়ে শুরু হলেও নিজের ভাষা, সংস্কৃতিকে চলচ্চিত্রের মধ্যে খুঁজতে ভোলেননি এই অভিনেতা। নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি নাজির নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন ভোজপুরি চলচ্চিত্রের উন্নয়নে; কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ভোজপুরি চলচ্চিত্রের পিতামহের উপাধি।
৬০-এর দশকে নির্মিত ভোজপুরি চলচ্চিত্রের মধ্যে বিদেসিয়া (১৯৬৩), লাগি নাহি চুহতে রাম (১৯৬৩), ভাওজি (১৯৬৫), গঙ্গা (১৯৬৫), লহা সিঙ (১৯৬৬), নাগপঞ্চমী, গোস্বামী তুলসী দাস ইত্যাদি অন্যতম। ৮০’র দশকে নির্মিত উল্লেখযোগ্য ভোজপুরি চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে বৈরি কঙ্গনা (১৯৮৩), চান্দুয়া কে থেকে চাকর (১৯৮১), হামার ভাইজি (১৯৮৩), গঙ্গা কিনারে মরা গান (১৯৮৪), রোস গাইলেন সাইলেন হামার (১৯৮৮), বিটিয়া ভেইল সায়ান প্রভৃতি।
ভারতের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে নির্মাণের দিক দিয়ে ভোজপুরি চলচ্চিত্রের অবস্থান অষ্টম। এই ইন্ডাস্ট্রিতে ২০১২-তে ৮৭টি, ২০১৩ ও ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ৭২টি এবং ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ৫৯টি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়।১০ দেশটির অন্যতম এই ইন্ডাস্ট্রি থেকে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো ব্যবসাও করছে দেদার, তবে নিতান্তই তা তাদের মতো করে।
ভোজপুরি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন মনোজ তিওয়ারি, রবি কিশান, পবন সিং, খেসারি লাল যাদব, দিনেশ লাল যাদব প্রমুখ। এদের মধ্যে মনোজ তিওয়ারি ও রবি কিশান এই ইন্ডাস্ট্রির মেগা তারকা হিসেবে পরিচিত। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে বি বি সি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মনোজ তিওয়ারি প্রতিটি চলচ্চিত্রের জন্য ৯০ হাজার মার্কিন ডলার নেন।’১১ মনোজ তিওয়ারি একাধারে রাজনীতিবিদ, অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা, গায়ক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও সঙ্গীত পরিচালক। ভোজপুরি চলচ্চিত্র নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মনোজ তিওয়ারি ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এক প্রতিবেদনে বলেন,
ভোজপুরি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে আরো ভালোভাবে বিন্যাস করা প্রয়োজন। চলচ্চিত্র নির্মাণ কৌশল, বাজেট ও অভিনয়শিল্পীদের মান সব বিষয়েই বিন্যাস করা উচিত। আমি বুঝতে পারি না দর্শক কেনো ভোজপুরিকে অমার্জিত ভাষা মনে করে? আমি জানি, এখানে কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় যেগুলো খানিকটা অশালীন, মানের দিক থেকে সস্তাও। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, এসব চলচ্চিত্র পুরো ভোজপুরি ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিত্ব করে না। আর ভাষা হিসেবে ভোজপুরি মোটেও অমার্জিত নয়। ৩০ কোটি রুপি দিয়ে নির্মিত কোনো হিন্দি চলচ্চিত্রের সঙ্গে এক কোটি বাজেটের ভোজপুরি চলচ্চিত্রের মোটেও তুলনা করা উচিত নয়। মানসিকভাবেই আমাদের দর্শক ভিন্ন। ভোজপুরি আমার মাতৃভাষা। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই ভাষাকে আমি সম্মান করবো।১২
যদিও ভোজপুরি চলচ্চিত্রকে অশালীন ও সস্তা বলে অভিহিত করেছেন খোদ ইন্ডাস্ট্রির নির্মাতারাই।১৩ যাক সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। শুরুতেই বলেছি, এই আলোচনা ভোজপুরি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে। যদিও ভৌগোলিক দূরত্ব ও অনলাইনে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় এ নিয়ে যথাযথ আলোচনা বেশ সঙ্কটের। তাই এক্ষেত্রে ভোজপুরি চলচ্চিত্রকে বোঝার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে অন্যতম ব্যবসাসফল খিলাড়ি (২০১৬) ও নাগিনকে (২০১৫) বেছে নেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র দুটিকে টেক্সট ধরে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভোজপুরি ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্যই এই প্রয়াস।
খিলাড়ির চিরচেনা খেলা
খিলাড়ির নির্মাতা আসলাম শেখ। দুই ঘণ্টা ২৯ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন হালযুগের অন্যতম ভোজপুরি তারকা খেসারি লাল যাদব। নায়িকার ভূমিকায় মধু শর্মা। চলচ্চিত্রটি শুরু হয় যৌন উত্তেজক দৃশ্যের মধ্য দিয়ে—এক ব্যক্তি সাইকেল চালিয়ে দেয় নারীর দুই উরুর মাঝখান দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে ওই নারী রাস্তায় পড়ে যান, ক্যামেরা এসে স্থির হয় স্তনের ভাঁজে। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা চলে। পরের দৃশ্যে নায়কের বোন একদল চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে কথা বলায়, তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। এ সময় দেবদূতের মতো হাজির হয়ে বোনকে উদ্ধার করেন নায়ক খেসারি লাল।
এরপর নয় মিনিট ২৯ সেকেন্ডে হাস্যরসাত্মকভাবে একটি পরকীয়া প্রেমের দৃশ্য দেখানো হয়। খোলামেলা পোশাকে ওই দৃশ্যটি কেবলই নারী শরীর প্রদর্শনের লক্ষ্য বলে মনে হয়েছে। ১৪ মিনিটের মাথায় মদের দোকানে শুরু হয় নায়কের সঙ্গে এক নারীর উদ্দাম নৃত্য। এরপর ২৯ মিনিটে নায়িকার ওপর নজর পড়ে খলনায়কের ছেলের। নায়িকাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে আবারও নায়কের আগমন। নাটকীয় মারপিটে উদ্ধার হওয়া মাত্রই নায়কের প্রেমে পড়েন মধু শর্মা। শুরু হয় গান। গতানুগতিক কাহিনির এই চলচ্চিত্রে একসময় হাজির হন পার্শ্ব নায়িকা। নায়কের মন জয় করতে তার সঙ্গে আবারও গান আর অপ্রয়োজনীয় শরীর প্রদর্শন। এভাবে ৪৮ মিনিট, ৫৭ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড, এক ঘণ্টা ২৫ সেকেন্ড, এক ঘণ্টা ছয় মিনিট, এক ঘণ্টা ১৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ড, এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড ও দুই ঘণ্টা এক মিনিটে নানা ভঙ্গিতে আইটেম সঙ, যৌন হয়রানি ও অন্যান্য দৃশ্যের মাধ্যমে নারী শরীরকে উপস্থাপন করা হয়েছে। নায়কের সঙ্গে নায়িকার দেখা, অতঃপর প্রেম, মাঝে খলচরিত্রের আগমন, প্রেমে বাধা, নায়কের প্রিয়জন হারানো, অতঃপর প্রতিশোধ এবং পরিশেষে নায়ক-নায়িকার মিলন—এ রকম চিরচেনা কাহিনি দিয়ে শেষ হয় খিলাড়ি।
যদিও নির্মাতা আসলাম শেখের দাবি,‘ভোজপুরি চলচ্চিত্র গত সাত-আট বছরে বেশ উন্নতি করেছে।’১৪ সেই হিসাবে তার চলচ্চিত্রটি হয়তো উন্নতির পর্যায়েই পড়ে। তবে দর্শকের সমীকরণ দেখাতে বোধহয় ভুল করেননি আসলাম শেখ। তার ভাষায়, ‘আমাদের ভোজপুরি চলচ্চিত্রগুলো মোট দর্শকের মাত্র ১৫ শতাংশ দেখতে পারে। এই যে ১৫ শতাংশ মানুষ ভোজপুরি চলচ্চিত্র দেখছে তাদের মধ্যে নেই ছাত্র, যুবক বা কোনো বৃদ্ধ। এক নিম্নবিত্ত শ্রেণির দর্শক সস্তা টিকিটে এই চলচ্চিত্রগুলো দেখছে।’১৫ ৮৫ শতাংশ দর্শকশ্রেণিকে বাদ রেখে একটি ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে সেটাই এখন ভাবনার বিষয়!
নারী সর্বস্ব নাগিন
ফ্যান্টাসি এক কাহিনি নিয়ে নাগিন। নাগমণির লোভে এক সাপুড়ের হাতে মৃত্যু হয় নাগের। পরে দিশেহারা নাগিনীকে দেবতা জানিয়ে দেন, পরজন্মে তার নাগের সঙ্গে আবার মিলন হবে; তবে নাগ পৃথিবীতে আসবে মানুষ হয়ে। চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আবারও খেসারি লাল যাদব ও মোনালিসা। এদিকে পরজন্মে নায়কের পরিবারের সঙ্গে আরেক পরিবারের দ্বন্দ্ব থাকে। ফলে বারবার নায়ক ও তার পরিবারের ওপর হামলার চেষ্টা চালায় বিরোধী পক্ষ। ঠিক তখনই নায়িকা নাগিনী তার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে নায়কের পরিবারকে রক্ষা করে। তবে দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে নায়িকার বারবার সাপ হওয়া বা সাপ থেকে মানুষ রূপ ধারণ করার অ্যানিমেশন বিরক্তির উদ্রেক করেছে।
ব্যবসাসফল নাগিন-এও অযথা নারী শরীর প্রদর্শনের প্রবণতা লক্ষণীয়। রাজকুমার পাণ্ডে নির্মিত নাগিন-এ নারীকে অপ্রয়োজনে অর্ধনগ্ন, যৌন উত্তেজক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শুরুতেই নাগিনী নায়ককে খলনায়কের হাত থেকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধারের পর নিজেই অদৃশ্য হয়ে যান। পরে নায়ক বাসায় ফিরেই ভাবতে থাকে তার ওপর হামলার কথা। এই ভাবনা থেকেই ১৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে শুরু হয় গান। এরপর ২০ মিনিট নয় সেকেন্ডে নায়কের কলেজে দেখানো হয় শিক্ষক-শিক্ষিকার ধাক্কা খাওয়ার যৌন উত্তেজক দৃশ্য। ২২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে শ্রেণিকক্ষে ভালোবাসা নিয়ে শিক্ষকের বক্তৃতার সময় নায়কের সঙ্গে গানে হারিয়ে যান আরেক সহপাঠী পার্শ্ব নায়িকা। গানটিতে সুইমিং পুলে নায়িকার গোসলের দৃশ্য ও খোলামেলা পোশাক ঘুরেফিরে আসে। নায়কের প্রতি সহপাঠীর দুর্বলতা কাটাতে নাগিনী মানুষ রূপে কলেজে হাজির হন। ৩৩ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে আবার শুরু হয় নায়ক ও দুই নায়িকার নাচগান। ৪৭ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে কলেজের এক অনুষ্ঠানে আবার উদ্দাম নাচগান করেন দুই নায়িকা। এক ঘণ্টা ১০ মিনিটে নায়কের পরিবারকে খলনায়কের হাত থেকে বাঁচাতে গাড়ির পিছনে দৌঁড়াতে থাকেন মানুষরূপী নাগিনী। এ সময় স্লো মোশনে ক্যামেরায় ধরা পড়ে নায়িকার বুক।
এছাড়া ১৭ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড, ৩৯ মিনিট ১০ সেকেন্ড, ৪৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড, ৫৩ মিনিট ২৩ সেকেন্ড, এক ঘণ্টা ছয় সেকেন্ড, এক ঘণ্টা তিন মিনিট নয় সেকেন্ড, এক ঘণ্টা ১৯ মিনিট, এক ঘণ্টা ৩৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড, দুই ঘণ্টা ও দুই ঘণ্টা ১৩ মিনিট ২৮ সেকেন্ডে বিভিন্ন গানে-দৃশ্যে খোলামেলা পোশাকে নাভি-নিতম্ব, স্তন প্রদর্শন চলচ্চিত্রে নারীর নাজুক অবস্থাকে স্পষ্ট করে।
ভোজপুরি চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য
আমরা বিশ্বের চলচ্চিত্র ঘেঁটে দেখতে পারি কীভাবে জাতীয় চলচ্চিত্রের একটা ধারা ক্রমাগত নির্মিত হতে পারে। একেবারে গোড়ায় ডি ডব্লিউ গ্রিফিথ আর তারপর জনফোর্ড, হাওয়ার্ড হকিন্স, চার্লি চ্যাপলিন, ফ্রানক কাপরা, অরনস ওয়েলস প্রমুখ মিলে তৈরি করেছিলেন এমন এক আমেরিকান চলচ্চিত্র জগৎ যা বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে সে দেশের মানুষের যাপিত জীবনের পাঠগুলি তুলে আনে।১৬
এ রকম একটা ধারণা থেকে যদি ভোজপুরি চলচ্চিত্রকে ব্যাখ্যা করা হয় তাহলে কী পাওয়া যাবে? গত ৫০ বছরের ভোজপুরি চলচ্চিত্র সেই অঞ্চলের মানুষের যাপিত জীবনের কতোটুকু পাঠ তুলে আনতে পেরেছে তা স্পষ্ট নয়। আবার, স্থানীয় চলচ্চিত্রের বাজার বিবেচনা করলে দেখা যায়, তারা নিজেদের দর্শকও ধরে রাখতে পারেনি। অথচ এটা তো সত্য যে, স্থানীয় বাজারে ভালো ব্যবসা করতে গেলে সাধারণত নিজেদের শিকড়ের উপাদান নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র কিছুটা সুবিধা পায়। বাংলাদেশের রূপবান, সিরাজউদ্দৌলা, বেদের মেয়ে জোসনা কিংবা মনপুরার ক্ষেত্রে অন্তত তাই হয়েছে। হুমড়ি খেয়ে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখেছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কী আছে ভোজপুরি চলচ্চিত্রে কিংবা নেই?
প্রথমত, নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে কোন নায়িকা কী করছেন, কী খাচ্ছেন-কী খাচ্ছেন না, কতো ঘণ্টা শরীরচর্চা করছেন—এ রকম নানা ঘটনা গণমাধ্যমে অহরহই পাওয়া যায়। মূলত শারীরিক সৌন্দর্যের এক আদর্শ মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬-২৪-৩৬, অর্থাৎ উন্নত বুক, সরু কোমর এবং গুরু নিতম্ব; যা কেবল ফর্সা মেয়েদের জন্যই প্রযোজ্য। অথচ ইতিহাস বলছে অন্য কথা। সময়ের ঘুরপাকে সুন্দরের সংজ্ঞাও পাল্টেছে। ইথিওপিয়ার শাসনামলে ‘ব্ল্যাক বিউটি’ ধারণারও প্রচলন ছিলো। অপেক্ষাকৃত ‘নাদুসনুদুস’ নারীদের সুন্দরী বলে বিবেচনা করা হতো। এই কালোরা যখন ক্ষমতা হারিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে তাদের সৌন্দর্যও। অর্থাৎ ক্ষমতাবানরা সবসময়ই সুন্দর। এই সুন্দরীদের সেভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে, যেভাবে ক্ষমতাবানরা চেয়েছে। তাই হয়তো ১৯৯৪ থেকে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শুধু ভারত থেকেই টানা ছয় বার মিস ওয়ার্ল্ড, মিস ইউনিভার্স নির্বাচনের প্রয়োজন পড়ে। মুসলিম দেশগুলোর সুন্দরীরাও বাদ যায় না, এমনকি আবারও সেই কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা সেরা সুন্দরী নির্বাচিত হয়।
তবে হালের সেই সুন্দরী ধারণার বাইরে গিয়ে ভোজপুরি চলচ্চিত্রের নারীদের স্বাস্থ্যবান শরীরে উপস্থাপন দেখা যায়। শুধু খিলাড়ি কিংবা নাগিন নয়, হাতেগোনা কয়েকটি বাদে ভোজপুরি চলচ্চিত্রের প্রায় সব নায়িকার ক্ষেত্রেই এই বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। যে বৈশিষ্ট্যের কারণে এসব চলচ্চিত্র চলমান শৈল্পিকতার বিচারে স্থান পায় না। অথচ কারিনা, ক্যাটরিনা, দীপিকা, সানির অর্ধনগ্ন নাচ দেখে সেন্সর, দর্শক সেটাকে অশ্লীল ভাবতে পারে না বা ভাবে না। কারণ সুন্দরের ওই তথাকথিত চর্চা। ফল হিসেবে ‘অশ্লীলতা’র দায়ে সেন্সরে ভোজপুরি চলচ্চিত্র স্থান পায় ‘বি’ কিংবা ‘সি’ গ্রেডে।
দ্বিতীয়ত, তথাকথিত ‘একপাক্ষিক’ বিশ্বায়নের মহামিলনে সামিল হতে ব্যস্ততা বেড়েছে। পুঁজিপতিরা তাদের পুঁজি বাড়াতে আরো ব্যস্ত। টিকে থাকার তাগিদে আর পুঁজির নেশায় নিজের বিনোদনের সময় মেলানোই মুশকিল। সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের মতো দীর্ঘ ব্যাপ্তির গণমাধ্যমকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নেওয়ার কথা তো বলাই বাহুল্য। এই ব্যস্ততার ফল হিসেবেই হয়তো ভারতীয় উপমহাদেশে শুরুর দিকে তিন ঘণ্টা বা তার বেশি সময়ের চলচ্চিত্রগুলো ধীরে ধীরে ছোটো হতে শুরু করে। বর্তমানে এই চলচ্চিত্রগুলোর ব্যাপ্তি প্রায় দুই ঘণ্টা বা তার কাছাকাছি দৈর্ঘ্যে এসে ঠেকেছে। এমন বিবেচনায় ভোজপুরি চলচ্চিত্রের ব্যাপ্তি এখনো অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রির তুলনায় বেশি। এই ইন্ডাস্ট্রিতে এখনো কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা বা তার বেশি দৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। কারণ হিসেবে উপযুক্ত ব্যাখ্যা হয়তো দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এটা জানা, ভোজপুরি চলচ্চিত্রের দর্শক সাধারণত নিম্নবিত্ত শ্রেণির। এ দিক থেকে হয়তো দক্ষিণ রায়ের ভাষায় সুর মিলিয়েই বলতে হয়,‘নিরক্ষর জনসাধারণের এ ধরনের ছবি ভালোলাগা স্বাভাবিক। ছবির দৈর্ঘ্যও তাঁদের কাছে পীড়াদায়ক নয়। রাত জেগে যাঁরা যাত্রা দেখেন তাঁদের বরঞ্চ ছবি বড়ো হলেই বেশি পছন্দ হয়। এই জাতীয় ছবিতে গল্পের কেন্দ্র হন প্রধানত নায়িকারাই।’১৭ আর নায়িকাদেরকে চলচ্চিত্রের ভোগের কেন্দ্রে বসিয়ে হয়তো এই শ্রেণির দর্শকদেরই ধরার চেষ্টা করেছেন ভোজপুরি নির্মাতারা।
তৃতীয়ত, নাচগান উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য; যা সারা পৃথিবী থেকে এখানকার চলচ্চিত্রকে আলাদা করেছে। তবে উপমহাদেশের প্রায় সবগুলো ইন্ডাস্ট্রিতে এই নাচগানের দৃশ্য থাকলেও ভোজপুরি চলচ্চিত্রে অধিক গান ও আইটেম সঙ ব্যবহার লক্ষণীয়। এতে প্রায়ই দেখা যায়, চলচ্চিত্রের কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন নাচগানের দৃশ্য। কখন গান শুরু হয় তা বোঝাই মুশকিল; ব্যবসাসফল খিলাড়ি কিংবা নাগিন-এ তো তা আছেই, এর বাইরে পিছনের সারির চলচ্চিত্রগুলোর অবস্থা আরো শোচনীয়। বড়ো দৈর্ঘ্যরে এসব চলচ্চিত্রে দর্শকের মনোযোগ বা জৌলুস ধরে রাখতেই হয়তো নাচগানের এ অতি ব্যবহার!
চতুর্থত, চলচ্চিত্রে অ্যানিমেশনের ব্যবহার শুরু থেকেই ছিলো। এখন তাতে যোগ হয়েছে নানা মাত্রা। বর্তমানে প্রায় সব ধরনের চলচ্চিত্রেই অ্যানিমেশনের কমবেশি ব্যবহার লক্ষ করা যায়। নাগিন-এ অনেক দৃশ্যে অ্যানিমেশন ব্যবহার করা হয়েছে। চলচ্চিত্রের শুরুতেই অবশ্য বলে নেওয়া হয়েছে, কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে সব সাপের দৃশ্যগুলো তৈরি করা। কিন্তু এমনভাবে এসব অ্যানিমেশন ব্যবহার হয়েছে, যা দেখে হালের হলিউড-বলিউডের ঝকঝকে জীবন্ত চলচ্চিত্র দেখা দর্শকের বিরক্ত না হয়ে উপায় থাকে না। যদিও ভোজপুরির বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে অ্যানিমেশনের এ ধরনের আনাড়ি হাতের কাজ লক্ষ করা যায়।
পঞ্চমত,‘চলচ্চিত্রের জন্য যৌনতা’ এবং ‘চলচ্চিত্রে যৌনতা’ নামক দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সেই চলচ্চিত্রকে ব্যাখ্যা করা হয়। কাহিনির প্রয়োজনে যৌনতা আসতেই পারে; সেটা চলচ্চিত্রের জন্য যৌনতা। তবে ‘চলচ্চিত্রে যৌনতা’ কেনাবেচার বাজারে নারীকে সস্তা পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সেটা আরো বেশি করে নজরে আসে ভোজপুরি চলচ্চিত্রে। খিলাড়ি ও নাগিন-এর মতো ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে যৌনতার অতি অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার লক্ষণীয়। মূল চলচ্চিত্রের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যাপ্তি ধরে নারী শরীরকে নানাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই দুটি চলচ্চিত্রে। শুধু এ দুটো নয়, প্রায় সব ভোজপুরি চলচ্চিত্রেই খাটে এই গাণিতিক হিসাব।
দর্শক বনাম ভোজপুরি চলচ্চিত্র
জাতীয়তার বিচারে চলচ্চিত্র তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে। সাধারণত চলচ্চিত্রের ভৌত আবহ, কথোপকথন, সঙ্গীত, উপস্থাপিত সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতির নানা উপাদানের মধ্য দিয়ে এই বৈশিষ্ট্য সহজেই অনুমেয়। হলিউড, বলিউড, ঢালিউড—সে যে ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্রই হোক না কেনো, তা দেখে পারিপার্শ্বিক আবহ বা বৈশিষ্ট্য অনেকক্ষেত্রেই অনুধাবন করা সম্ভব হয়। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। কিন্তু বিপত্তি বাধে তখনই যখন সংস্কৃতির বিচারে নির্দিষ্ট কোনো কিছুকে আদর্শ ভাবা হয়, তখন এর বাইরে অন্য সবকিছু হয় অশ্লীল, বিকৃত। তবে বিশ্বায়নের এ যুগে চলচ্চিত্র যে দেশ-কাল ভেদে এক সাধারণ মঞ্চে এসে ঠেকছে না—এ কথাও বলা যায় না। এখন, অবস্থান ভেদে নারী শরীরের বিশেষ বিশেষ কাঠামো বিদ্যমান। তথাকথিত স্লিম বা জিরো ফিগারের নারীকে চলচ্চিত্রে উপস্থাপনের চেষ্টা প্রায় সব ইন্ডাস্ট্রিতেই। তবে সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থা বিচার না করে পুরুষের চাহিদা মেটাতে পাশ্চাত্যের মতো সব ইন্ডাস্ট্রিতে স্লিম নারীর উপস্থাপন নিয়ে সঙ্কটও আছে। কারণ এই উপস্থাপনের ধরনে নারী শরীর যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই তার পোশাক-পরিচ্ছদও। জিরো ফিগারের এই বাজারে নারীদের অপেক্ষাকৃত ভিন্ন উপস্থাপন দেখা যায় ভোজপুরি চলচ্চিত্রে। এসব চলচ্চিত্রে অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যবান নারীদের প্রদর্শনের চেষ্টা থাকে। শুধু তাই-ই নয়, প্রায় পুরো চলচ্চিত্রে চলে নারী শরীরের যৌন উত্তেজক স্থানগুলো ক্লোজ, মিড ক্লোজ কিংবা স্লো মোশনে দেখানোর চেষ্টা।
দুই ঘণ্টা ২৯ মিনিটের খিলাড়িতে নারী শরীরকে নানাভাবে উপস্থাপন করতে দেখা যায় প্রায় ৩৫ মিনিট। যা চলচ্চিত্রটির মোট সময়ের প্রায় ২৫ শতাংশ। আবার দুই ঘণ্টা ৪০ মিনিটের নাগিন-এ ৪০ মিনিট ধরে নানারকম খোলামেলা দৃশ্য দেখানো হয়। এটাও চলচ্চিত্রটির প্রায় ২৫ শতাংশ। পাটনা উইমেন কলেজের তিন শিক্ষার্থীর গবেষণায় ভোজপুরি চলচ্চিত্রের দৈন্যদশার কথা উঠে এসেছে। তারা দেখিয়েছেন, নারীদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন, অপ্রয়োজনীয় সংলাপ, দুর্বল কাহিনি, প্রাযুক্তিক অক্ষমতা, অধিক আইটেম সঙ, বাজারি সঙ্গীতায়োজন, সংস্কৃতিকে ভুলভাবে উপস্থাপনসহ নানা কারণে ভোজপুরি চলচ্চিত্র তার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলছে।১৮ তবে এ প্রসঙ্গে একেবারে ভিন্ন মত দিয়েছেন সিনেমাটোগ্রাফার অঞ্জনি ধার। তিনি তার নিজের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন,
আমি বলিউডের এমন প্রায় এক ডজন চলচ্চিত্রের কথা বলতে পারি, যেগুলোও প্রায় এইসব ভোজপুরি চলচ্চিত্রের কাহিনির মতোই ছিলো। কিন্তু সে চলচ্চিত্রগুলো মানুষ পরিবারের সঙ্গে গিয়ে দেখেছে। মূল ব্যাপারটা হলো দর্শক। আসলে ভোজপুরি চলচ্চিত্রকে শিক্ষিত মানুষেরা এখনো ঘৃণা করে।১৯
দর্শকের বিবেচনায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে ভোজপুরির কিছুটা সাদৃশ্য চোখে পড়ে। বাংলাদেশের বর্তমান চলচ্চিত্রের দর্শক নেই বললেই চলে।
নব্বই দশকের শুরু থেকে স্যাটেলাইট চ্যানেল, ডিভিডি-ভিসিডি ইত্যাদি প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদেশী, বিশেষত, হলিউড ও বলিউডের চলচ্চিত্র সহজলভ্য হয়ে যাবার কারণে দর্শক ঘরে বসেই পছন্দসই চলচ্চিত্র দেখতে শুরু করে। এভাবে প্রেক্ষাপৃহে-গিয়ে-ছবি-দেখার অভ্যাসটি কমে আসে এবং নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকেই চলচ্চিত্র-ব্যবসায় মন্দা নেমে আসে।২০
এ মন্দা কাটাতে ও ইন্ডাস্ট্রির নানা দুর্বলতা থেকে ৯০ দশকের শেষের দিকে চলচ্চিত্রে যৌন উত্তেজক ‘কাটপিস’ (কাটপিস হলো চলচ্চিত্রের মূল কাহিনির সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন কোনো দৃশ্য) লাগিয়ে নিম্নবিত্ত শ্রেণির দর্শককে আকৃষ্ট করার একটা অপপ্রয়াস লক্ষ করা যায়। এর ফল হিসেবে দুই-তিন বছর বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শকের উপস্থিতি লক্ষ করা গেলেও তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বিশেষ করে চলচ্চিত্রের নারী দর্শক একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। যার জের অবশ্য এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে।
ভোজপুরি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শক প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এখন যেসব ভোজপুরি চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে, সেগুলো কেবল এক পর্দার প্রেক্ষাগৃহের জন্য। সেখানে ওই সব প্রেক্ষাগৃহের টিকিটের মূল্য ১৫-৩০ রুপির মধ্যে। কিন্তু বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় এক পর্দার প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে তৈরি হচ্ছে মাল্টিপ্লেক্স। ওই সব মাল্টিপ্লেক্সে বসে চলচ্চিত্র দেখার সামর্থ্য ‘আম আদমি’র নেই। এমনকি তাদের সংস্কৃতির সঙ্গেও সেটা যায় না। ফলে ভোজপুরি চলচ্চিত্রের দর্শক আর বাড়ছে না।
ভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র
জাতিগত বিভাজন বা ভাষাগত ভিন্নতা—স্ব স্ব অবস্থান থেকে একের পর এক তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র। তবে ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রের সামগ্রিক একটি ভাষা রয়েছে, যা চলচ্চিত্রকে সবার কাছে বোধগম্য করে। কিন্তু সেটা ব্যক্তির আপনার হয়ে ওঠে না। তাইতো ভারতে এতো এতো চলচ্চিত্র প্রতিবছর বিভিন্ন ভাষায় রিমেক হয়। একই কাহিনি নানা ভাষায় পর্দায় আসে। বহুভাষিক এই দেশে প্রায় ২১টি ভাষায় নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে। এর মধ্যে তেলেগু, তামিল, হিন্দি, বাংলা, মালায়লাম, মারাঠি, ভোজপুরি, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, অসমী অন্যতম।
সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ ভারতের চলচ্চিত্র বাজারও নেহাতই ছোটো নয়। তাই হয়তো ভাষাভিত্তিক চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিগুলো ভালোমতেই টিকে আছে। ভিতরে ভিতরে এসব ইন্ডাস্ট্রি নিজেদের মধ্যে চলচ্চিত্রিক উপাদান বিনিময় করে। বিশেষ করে অভিনেতারা নিজেদের যুক্ত করেন নানা ইন্ডাস্ট্রিতে। অমিতাভ বচ্চন, অজয় দেবগান, মিঠুন চক্রবর্তী, প্রিয়াঙ্কার মতো খ্যাতনামা অভিনয়শিল্পীরা ভেসে ওঠেন ভোজপুরি চলচ্চিত্রসহ নানা ইন্ডাস্ট্রির পর্দায়। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে মিঠুন চক্রবর্তী অভিনীত ভোলে শঙ্করকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সুপারহিট ভোজপুরি চলচ্চিত্র বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু অমিতাভ বচ্চন, অজয় দেবগানের মতো খ্যাতিমান তারকারা অভিনয় করলেও তারা ভোজপুরি চলচ্চিত্র দর্শকের মন জয় করতে পারেনি। অমিতাভের গঙ্গা (২০০৬) হিট করলেও গঙ্গোত্রি (২০০৭) তেমন চলেনি। সব থেকে বড়ো কথা এ রকম তারকার সংমিশ্রণে বা একক তারকার অভিনয়ে বহু ভাষিক-জাতিক-উপজাতিক দেশ ভারতে প্রতিবছর বিভিন্ন ভাষায় প্রায় দুই হাজার চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে। জাতীয়তার বিচারে যেটা অনন্য।
বাংলাদেশেও বাংলা ব্যতীত আদিবাসীদের ভাষা নিয়ে—চাকমা, সাঁওতালি, অসমীয়, মৈতৈ, মারমা, পাংখু, গারো, খাসিয়া—চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা বলাই বাহুল্য। তবে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় কেনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে বা হয়—তার ব্যাখ্যা পুরনো। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে নির্মাণ হয় চাকমা ভাষার প্রথম চলচ্চিত্র মর থেঙ্গারি (আমার বাইসাইকেল)। যা রাজনৈতিকসহ নানা কারণে শেষ পর্যন্ত ছাড়পত্র পায়নি। সেন্সর বোর্ড দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চলচ্চিত্রটি আটকে রেখে শেষ পর্যন্ত ছাড়পত্র দেয়নি। নির্মাতা অং রাখাইনের ভাষ্য, চলচ্চিত্রে দেখানো কিছু দৃশ্যে সেনাবাহিনী সংশ্লিষ্ট বিষয় থাকায় সেন্সর বোর্ড আপত্তি তুলেছে।২১
যদিও ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ৯-১৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত রাশিয়ার উফা আই এফ এফ (সিলভার আকবুজাত অ্যাথনিক ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভাল) উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার জিতে নেয় মর থেঙ্গারি।২২ এই শুরুই হয়তো শেষ নয়। চাকমা ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে আরো চলচ্চিত্র হয়তো নির্মাণ হবে, মুক্তি পাবে; ভোজপুরির মতো শুধু ভাষাকেন্দ্রিক আরেকটি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে এদেশে।
সব শেষেরও শুরু আছে
কোনো সৃষ্টি যখন সামগ্রিক হয়ে ওঠে, তখন সেই সৃষ্টির সমৃদ্ধি ঘটে; সেটা হয়ে ওঠে আঞ্চলিক থেকে জাতীয়, বৈশ্বিক। ভারতের নাজির হোসেন ও রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ যে আকাক্সক্ষা নিয়ে ভোজপুরি চলচ্চিত্রের শুরুটা করেছিলেন, তা হয়তো একসময় ইন্ডাস্ট্রিতেও রূপ নিয়েছে। কিন্তু সেটা আজও সামগ্রিক হয়ে উঠতে পারেনি, যেমনটি ভাষিক দূরত্বকে ছাপিয়ে বলিউড-টলিউডসহ ভারতের অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিগুলো আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে। ভোজপুরি চলচ্চিত্রের এ রকম দুরবস্থার পিছনে যে কেবল ‘অশ্লীলতা’ই দায়ী তা কিন্তু নয়। বরং দর্শকহীনতা, বিহার ও ঝাড়খণ্ড মিলে মাত্র তিনশো ৭২টি প্রেক্ষাগৃহ অর্থাৎ অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যথাযথ প্রশিক্ষিত কলাকুশলী ও নির্মাতার অভাবই মূলত এজন্য দায়ী। আর শিল্প হিসেবে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ সমস্যা তো রয়েছেই। তাই এসব সমস্যা কাটিয়ে ভোজপুরি চলচ্চিত্রকে আঞ্চলিকতার গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সীমানা ছুঁতে হলে এ শিল্প সংশ্লিষ্ট সবার সদিচ্ছা ও পরিশ্রম জরুরি। শুধু নারী শরীরের প্রদর্শনের বদলে চিন্তা-চেতনার উন্নয়ন ঘটানো দরকার নির্মাতা-প্রযোজকদের। আর তেমনটা ঘটলেই হয়তো ভোজপুরি ভাষাভাষী অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে ভোজপুরি ইন্ডাস্ট্রিতে।
লেখক : রাশেদ রিন্টু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কম-এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।
rashed.rin2@gmail.com
তথ্যসূত্র
১. চমস্কি, নোম; ‘ভাষা এবং এর বিন্যাস’; অনুবাদ : মাহমুদুল সুমন; যোগাযোগ; সম্পাদনা : ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, সংখ্যা ৮, ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃ. ২৮১।
২. রিন্টু, রাশেদ; ‘সবাক দিয়ে অবাক করলেন অ্যালান’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বর্ষ ৪, সংখ্যা ৮, পৃ. ২৪৫।
৩. হায়দার, কাজী মামুন; ‘পটের গান : চলচ্চিত্র উদ্ভব ইতিহাসের নিম্নবর্গীয় পাঠ’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বর্ষ ৩, সংখ্যা ৫, পৃ. ৭১।
৪. ঘোষ, জয়ন্তকুমার (২০০৮ : ৬১); ব্রাত্যজনের বায়োস্কোপ; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
৫. প্রাগুক্ত; রিন্টু (২০১৫ : ২৪৮)।
৬. www.shilpaoshilpi.com/চলচ্চত্রিরে-ভাষা-জনজীবন/; retrieved on 12.11.2016
৭. মৌ, মাহফুজা; ‘ভাষিক দূরত্বে বাড়ছে রিমেকের কদর’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, বর্ষ ৩, সংখ্যা ৫, পৃ. ১০২।
৮. http://www.liquisearch.com/bhojpuri_language/number_of_speakers; retrieved on 17.11.2016
৯. https://en.wikipedia.org/wiki/Bhojpuri_cinema; retrieved on 17.09.2016
১০. http://www.bhojpurifilmiduni“a.com/2016/11/bhojpuri-films-2012.html; retrieved on 03.09.2016
১১. http://news.bbc.co.uk/2/hi/south_asia/4512812.stm/; retrieved on 03.09.2016
১২. http://timesofindia.indiatimes.com/entertainment/bhojpuri/movies/news/Bhojpuri-films-demand-compromise-Manoj-Tiwari/articleshow/17872865.cms; retrieved on 16.10.2016
১৩. http://timesofindia.indiatimes.com/entertainment/bhojpuri/movies/news/Bhojpuri-films-demand-compromise-Manoj-Tiwari/articleshow/17872865.cms; retrieved on 05.08.2016
১৪. http://starblockbuster.com/how-lift-bhojpuri-cinema-its-current-state-doldrums; retrieved on 04.08.2016
১৫. http://starblockbuster.com/how-lift-bhojpuri-cinema-its-current-state-doldrums; retrieved on 04.08.2016
১৬. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৭৩); ‘জাতীয় চলচ্চিত্র : পরিপ্রেক্ষিত ও সম্ভাবনা’; সিনেমা; ফ্ল্যাট ১/বি, বাড়ি ২৮, সড়ক ১৫ (নতুন), ধানমণ্ডি, ঢাকা।
১৭. রায়, দক্ষিণ (২০১৬ : ১৩৪); ‘পশ্চিম ভারতের অভিনেত্রী’; চলচ্চিত্র; সম্পাদনা : কমলকুমার মজুমদার ও মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়; নালন্দা, ঢাকা।
১৮. http://timesofindia.indiatimes.com/city/patna/Why-dont-Bhojpuri-flicks-win-awards/articleshow/25236188.cms; retrieved on 11.09.2016
১৯. http://timesofindia.indiatimes.com/city/patna/Why-dont-Bhojpuri-flicks-win-awards/articleshow/25236188.cms; retrieved on 11.09.2016
২০. http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/28771171; retrieved on 08.09.2016
২১. http://www.bbc.com/bengali/news/2015/12/151215_mor_thengari_film_bangladesh; retrieved on 16.11.2016
২২. goo.gl/rTbvO3; retrieved on 05.11.2016
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন