Magic Lanthon

               

ফারহানা মনিকা

প্রকাশিত ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দেশহীন এক মানুষের আর্তি নির্বাসিত

ফারহানা মনিকা


প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গতি অথবা অসঙ্গতি সকলের গা-সওয়া হয়ে ওঠে নাএই নিরিখে কেউ কেউ আলাদা। প্রাকৃতিক নিয়মেই একজন মানুষ আলাদা, আবার আলাদা নয়। আবার আলাদাদের একত্র বা বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে সেও আলাদাই হয়। এই আলাদা হওয়ার দরুণ তার একটি নির্দিষ্ট নাম পাওয়া যায়, যা তার মানুষ পরিচয়কে আড়াল করে ফেলে অনেক সময়। যেমন : একজন নির্বাসিত। তার দুটো পরিচয়মানুষ এবং নির্বাসিত। এর মধ্যে দ্বিতীয় পরিচয়টি বাঁধা, তার জন্য যেনো আর কোনো সর্বনাম ব্যবহার হবে না কোনোদিন। এবার নির্বাসিত ঠিক কারা, তা নিয়ে দু-একটি কথা বলা যেতে পারেপ্রচলিত কাঠামোর বাইরে যাদের যুক্তি-তর্ক-বিষয় এক কাতারে দাঁড়িয়ে মিছিল করে একই স্লোগানে, মূলত তারাই নির্বাসিত। তারা নির্বাসিত বলেই হয়তো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে সৃষ্টির খেয়ায়। তবে আমি এও বিশ্বাস করি নির্বাসিতের গল্প প্রত্যেক ঘরে ঘরে আছে, ঘর থেকে উঠোন, উঠোন থেকে লোকালয়, লোকালয় থেকে যতোদূর চিন্তা করা যায় ততোদূর পর্যন্ত আছে। শুধু সাহস যাদের আছে, তারাই কেবল কালের খেয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

দুই.

যে বিষয়ে এখন কথা বলবো, তা আমার অলস দুপুরে দেখা একটি সিনেমা নিয়েনাম নির্বাসিত (২০১৪)। পশ্চিম বাংলার গুণী ও জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী চূর্ণী গাঙ্গুলী নির্মিত প্রথম সিনেমা এটি। নির্বাসিততে একজন লেখক ও তার সন্তানতুল্য বিড়ালের গল্পকে মুখ্য করে নানান বলয়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে। যিনি একজন প্রথাবিরোধী লেখক, একজন চিকিৎসক; তিনি ধর্মের খোলস উন্মোচন করেছেন তার লেখনীতে। তিনি বাংলাদেশ থেকে ভারতে নির্বাসিত হন। এই নির্বাসনের যখন সিক্যুয়াল বার্তা থাকে, তখন কারো বুঝতে বাকি থাকে না তিনি বাংলাদেশের সর্বাধিক আলোচিত লেখক তসলিমা নাসরিন। তসলিমাকে নিয়ে যাদের অগাধ ভালোবাসা, তারা জেনে থাকবেন তসলিমার বিড়াল মিনুর কথা। তসলিমা ও মিনুর বিচ্ছেদের কাহিনি নিয়ে চূর্ণী গাঙ্গুলীর পরিচালক হয়ে ওঠা। নির্বাসিততে মিনু হয়ে যায় বাঘিনি। এবার নির্বাসিতর উৎসর্গ প্রসঙ্গে আসি। অভিনয়শিল্পী থেকে সদ্য পরিচালকের আসনে আসীন চূর্ণীর মস্তিষ্ক ছিলো নির্বাসনমগ্ন। সেজন্য তিনি নির্বাসিত চিত্রকর মকবুল ফিদা হুসেনকে উৎসর্গ করেছেন সিনেমাটি; লিখেছেনA tribute to Maqbool Fida Husain... A Painter who died in exile, far away from his motherland.     

তিন.

সিনেমা একটি শিল্প, যে শিল্পে স্থান পায় একটি গল্প, একটি কাহিনি, একটি সমাজ, কিছু কালচার সর্বোপরি এসব কিছুর একটি ব্যবচ্ছেদ। নির্বাসিত এই বলয়ের বাইরে নয়। আগেই বলেছি, নির্বাসিতর গল্প একজন লেখক এবং তার বিড়াল বাঘিনিকে নিয়ে। সিনেমার শুরুতে দেখা যায়, ‘Rawdon Street, Kolkata’র একটি বাড়িতে বিড়াল বাঘিনির ছুটোছুটির সঙ্গে টিভি স্ক্রিনে টম অ্যান্ড জেরির ছুটোছুটির দৃশ্য। তারপর শৃঙ্খলহীন কলকাতা নগরের চিত্র। সেখানে একটিই স্লোগান আর কোনো স্লোগানকে স্বাধীন হতে না দিয়ে বেজে উঠেছেধর্মের শত্রু, কলকাতা ছাড়ো; ধর্মের শত্রু, কলকাতা ছাড়ো।’ প্রীতম লেখককে ফোন করে বাড়ি থেকে বের হতে বারণ করেন, লেখকের বন্ধুত্বের স্বীকৃতিটুকু দর্শককে জানিয়ে দেন। নির্বাসিতর পোস্টারে নীচে লেখা ছিলোA woman has no country’.’ কথাটির স্পষ্টতা যেনো এখান থেকেই শুরু। মৌলবাদীরা সারা নগর কাঁপাচ্ছে যখন, তখন লেখক নিজে জানিয়ে দিচ্ছেন‘তোমরা লেখককে ভাবতে দিতে চাইছো না, লিখতে দিতে চাইছো না, বাঁচতে দিতে চাইছো না।

লেখকের এই সংলাপ সিনেমাটির মূল ভাষ্য বুঝতে শুধু সহায়তা করে না, বরং একজন লেখকের নির্বাসিত হওয়ার কারণ যে ‘লেখনী দ্বারা সত্য উপস্থাপন করা’ তা বুঝিয়ে দেয়। সিনেমার মিনিট দশেক অতিক্রান্ত হলে দেখা যায়, লেখককে চোরের মতো প্রথমে রাজস্থানে, পরে দিল্লি; সর্বশেষ স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেনে নির্বাসন দেওয়া হয়। চোখের নিমিষেই যেনো লেখক ও বাঘিনির মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। অথচ Rawdon Street-এর বাড়িতে বাঘিনি‘লেখক’ একে অপরের সঙ্গে তাদের নির্বাসন ঘুচিয়েছেন। এরপর বাঘিনি’র নির্বাসিত জীবন শুরু হয় লেখকের বন্ধু প্রীতমের বাড়িতে।

চার.

নির্বাসিতর এ পর্বে দুটো দিনযাপনের দেখা মেলে। এক. কলকাতায় বাঘিনির দিনযাপন। দুই. সুইডেনে লেখকের দিনযাপন। কলকাতার জীবনে প্রীতমের দাম্পত্য কলহ নিত্যতায় পরিণত হয় বাঘিনিকে নিয়ে। দাম্পত্য টানাপড়েনের মধ্যে প্রীতমের সম্মুখে তৈরি হয় যেনো বিধুর খেলা। ‘বন্ধুর শান্তি বনাম বাঘিনি—‘মর্মান্তিক সত্যটি লেখক নিজে ইমেইলে জানিয়ে দেন প্রীতমকে‘এবার তোমার দশা সরকারের মতো, হয় বাঘিনিকে ভাগাও, নয়তো বউয়ের সাপোর্ট পাবে না। এদিকে লেখকের বন্ধু হওয়ার সুবাদে প্রীতম খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। কারণ তখনো নগরজুড়ে রমরমা কথার ব্যবসা চলছে লেখককে নিয়ে। প্রীতমের অফিসে লেখককে নিয়ে ধুন্ধুমার আলোচনা; সেখানে লেখকের ধর্ম ও আত্মজীবনীমূলক লেখা নিয়ে যাচ্ছেতাইভাবে বলছে এক পক্ষ, আরেকপক্ষ বলছে লেখকের সাহসের কথা। প্রীতমের মতো লেখকের সন্তান বাঘিনি হয়ে ওঠে very important cat বা VIC(P) বলে নেওয়া ভালো, পুরো সিনেমায় লেখককে সম্বোধন করা হয় উনি’ ও ম্যাডাম’ বলে। যাহোক ‘উনার সন্তান বাঘিনি’কে ‘উনা’র কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়াতে ওই সমাজের শাসনতান্ত্রিক জটিলতার রূপ ফুটে ওঠে। তবে বাঘিনিকে বিদেশ পাঠানোর প্রক্রিয়াটাকে মনে হয়েছে ফেইরি টেল-এ বর্ণিত রাজকুমারীর প্রাণ বাঁচানোর জন্য অভিনব কায়দায় একটা করে স্টেজ পার হয়ে সোনার কাঠি ও রুপোর কাঠি চিনে নেওয়ার মতন। মায়ের আঁচলে জায়গা করে নেওয়ার জন্য বাঘিনিকে পাসপোর্ট স্টেজ, ‘ছবি তোলা স্টেজ ও ‘আঙুলের ছাপ দেওয়া’ স্টেজ পার করতে হয়। সিনেমাটিতে বাঘিনির চোখে লেখক মায়ের জন্য যে ভালোবাসা তা যেনো সুর-ছন্দের মতো স্পষ্ট। বাঘিনির আবাসনটি একটি খাঁচা। বহু দৃশ্যে দেখা যায়, বাঘিনি বারংবার খাঁচার ভিতরে ছুটে যাচ্ছে, যেনো স্বেচ্ছায় নির্বাসিত হচ্ছে মায়ের ব্যথাকে অনুভব করার জন্য। বাঘিনিকে নির্বাসিত মায়ের কাছে পাঠানোর তোড়জোড়ের মধ্য দিয়েই কলকাতা পর্ব এগোতে থাকে।

অন্যদিকে সুইডেনের শিকড়হীন ধূসর শহরে স্বাধীনতা এবং মানবতায় বিশ্বাসী লেখকের নিঃসঙ্গ দিনযাপনের গাথা কাব্য রচিত হতে থাকে। লেখকের টুকরো টুকরো আবৃত্তি ঘরে ফেরার আকুতিকে বাঁচিয়ে রাখে এবং দর্শককে মনে করিয়ে দিতে থাকে নির্বাসিতের দীর্ঘশ্বাসগুলো শুষে নিচ্ছে মধ্যরাত :

মধ্যরাতের ফোন

মধ্যরাতের ফোন, তুমি বেজো না।

...

স্বজন বন্ধুহীন পড়ে আছি একা, দূর বরফের দেশে।

হঠাৎ হঠাৎ খবর আসে রাজনীতির কাদা-মাঠে

আকাট মূর্খরা বিষম

দৌড়াচ্ছে, আর ফাঁক পেলেই উঠোনে মাঠে

ধানক্ষেত বুনছে ধর্মের বীজ।

বস্তি উঠছে, গ্রাম ছেয়ে যাচ্ছে পতিতায়, পীরে,

ভিক্ষুকে

বাবার বুকের ব্যথাটি শুনেছি আজকাল আরো

বেড়েছে, চোখেও কম দেখেন,

বন্ধুরা এক-এক জন দুম করে কোথায় পালাচ্ছে কে

জানে

মধ্যরাতের ফোন, বেজো না। এতো রাতে কেউ

জেগে নেই,

রাতের মাতালগুলোও এক-এক করে ঘুমিয়ে গেছে,

তুমিও ঘুমোও।

পাঁচ.

পুরো সিনেমায় আমার মনে হয়েছে, লেখক’ ও ‘বাঘিনি’ তাদের নির্বাসিত জীবনকে যাপন’ করেছে। কিন্তু ‘যাপন’টাকে আপন করে নিতে পেরেছে কি! পারেনি, পারার কথাও নয়। পারেনি বলেই দুজনকেই যেনো আর্টিফিসিয়াল ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছে। বাঘিনির চোখের ভাষা দেখে কান্নার কাছে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় থাকেনি আমার। নির্বাসিততে দুটি গান আবহসঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার হয়েছে—‘‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি’ এবং সবকটা জানালা খুলে দাও না ...’। গানের সুর শুনে খানিক সময়ের জন্য আমার অলিন্দ ও নিলয়দ্বয়ে মৃদু কম্পনের অনুভূতি হয়েছে। সিনেমাটিতে কাব্যিক আবহে নির্বাসিত জীবনের কথামালা প্রকাশের ধরন বেশ আলাদা লেগেছে। গাঠনিক দিক বিচার করলে নির্বাসিতর তিনটি বিশেষ দিক আমাকে আকৃষ্ট করেছেবিষাদময়তা, হাস্যরস সঙ্গে নাটকীয়তা। এই তিনের মেলবন্ধনে সিনেমাটি অন্য মাত্রার হয়ে উঠেছে। নির্বাসিতর শেষ দিকে যখন লেখক ঘরে ফেরার প্রতিজ্ঞা করেন এভাবে

ব্রহ্মপুত্র শোনো, আমি ফিরবো।

শোনো শালবন বিহার, মহাস্থানগড়, সীতাকুণ্ড পাহাড়

আমি ফিরবো।

যদি মানুষ হয়ে না পারি পাখি হয়েও ফিরবো একদিন।

তখন একজন লেখকের আর্তি ও দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি দর্শক মনে।

শেষতক বলবো, নির্বাসিতকে চূর্ণী গাঙ্গুলী যেভাবে সাজিয়েছেন তা এক দুঃসাহসিক ব্যাপার। নির্মাতা নিজে তসলিমাকে ধারণ করে দর্শককে উপলব্ধি করিয়েছেনএই নির্বাসন কেবল একজন লেখকের নয়, একজন ব্যক্তি-মানসের নির্বাসন, একটি সম্পর্কের নির্বাসন, একটি বোধের নির্বাসন, বিশ্বাসের নির্বাসন সর্বোপরি একটি দর্শনের নির্বাসন।

 

লেখক : ফারহানা মনিকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে সম্প্রতি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।

www.facebook.com/farhana.monika

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন